কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

খাদ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বিকল্প প্রযুক্তি

খাদ্যে ভেজাল মেশানোর খবর আর ভেজালবিরোধী অভিযান বাংলাদেশের একটি নৈমিত্তিক খবর। খাদ্য মানুষের জীবনধারণের এবং সুস্থতার জন্য প্রথম মৌলিক উপাদান। আর এ খাদ্যই যখন জীবনকে নানা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয় তখন মানব সভ্যতার সার্বিক অর্জনই বিস্বাদে পরিণত হয় যাকে বিপন্ন মানবতাই বলা যায়। ভেজাল খাদ্যের সর্বব্যাপী বিস্তারে দেশের সর্বস্তরের মানুষই যে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে তা নানা জটিল রোগের প্রাদুর্ভাবই প্রমাণ করে। খাদ্যের ভেজাল প্রতিরোধে সরকার এবং জনসাধারণ যে নানাভাবে তৎপর সেটা অনুধাবন করা যায় নিত্য সভা-সমাবেশ, নতুন নতুন আইন এবং আইন প্রয়োগের নানা অভিযানে। দুঃখের বিষয় এসবের পরও খাদ্যের ভেজাল এবং বিষ প্রয়োগ থেমে নেই। ভেজালকারী চক্র আবিষ্কার ফাঁকি দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাজারজাতের মাধ্যমে ভেজাল পণ্য ভোক্তার আহারের উপকরণ হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে শিকার হচ্ছে নানা দুরারোগ্য রোগের। অন্যদিকে ভেজাল খাদ্যের ওপর মিডিয়ার খবর আর সচেতনতায় মানুষ অবশ্য প্রয়োজনীয় নানা ফলমূল আহার থেকে বিরত থাকছে যা সুস্বাস্থের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। বলা যায়, ভোক্তার একপ্রকার নিরূপায়। শুধু কি ভোক্তারই? ভেজাল এবং খাদ্যে বিষ প্রয়োগকারীদের এসব অমানবিক এবং মুনাফালোভী কর্মকা-কে পুরোপরি ঘৃণা করেই প্রশ্ন রাখছি-এসব ভেজালকারীরাও কি নিরূপায় নয়? একটু চিন্তার অবকাশ আছে মনে করেই আমার অভিক্ততার আলোকে এ প্রশ্ন রেখেই দুকথা বলার ইচ্ছাতেই কলম ধরা।
 
জীবন আর জীবিকার তাগিতেই আমরা সবাই নানা পেশা বা ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে একটু স্বচ্ছলতার মধ্যে সংসারের চাকাটা ঘুড়ায়ে চলার চেষ্টা করছি। সে রকম প্রয়াসেই নিয়োজিত খাদ্য প্রস্ততকারী বা সরবরাহকারী ও বাজারজাতকারী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও। পুঁজি আর শারীরিক পরিশ্রমের বিনিময়ে দুইপয়সা উপার্জনই তাদের উদ্দেশ্য। সমস্যাটা ঘটছে তখনই যখন তারা তাদের পুঁজির নিশ্চয়তা বিধানে ভোক্তার জীবনের, অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের জীবনেরও দুর্ভোগের সৃষ্টি করছে যা তারা অনুধাবনের চেষ্টা করে না বা গুরুত্ব দেয় না। আবারও এসব অমানবিক কর্মকাণ্ডকে কোন প্রকার সমর্থন না করেই তাদের প্রক্রিয়াকে অনুধাবনের চেষ্টা করলে দেখা যায় যে এসব খাদ্য জোগান প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যবসায়ীরা শুধুই চেষ্টা করছে তাদের পণ্যের অপচয় বা পচন রোধ করে মুনাফা ধরে রাখতে। অর্থাৎ রয়েছে প্রযুক্তির চাহিদা। শাকসবজি ফলমূল সরবাহকারী ও বাজারজাতকারী ব্যবসায়ীরা আবিষ্কার করেছেন যে এসব টাটকা পণ্যের আকৃষ্টতা ধরে রেখে সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ালে ভোক্তার মনোরঞ্জন সহজ এবং অধিক মুনাফাও সম্ভব যদিও তাদের অসাধু প্রক্রিয়ার দ্বারা সুষম খাদ্যগুলো বিষময় খাদ্যে পরিণত হচ্ছে যা প্রকারন্তরে মরণঘাতী রোগের কারণ দাঁড়াচ্ছে।
 
বর্তমান অবস্থায় খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের এক কথায় সমাধান হচ্ছে ভেজালকারীরা যেসব কারণে প্রাণঘাতী রাসায়নিক ব্যবহারের আশ্রয় নিচ্ছে সেসবের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত কোন পদ্ধতি থাকলে তা ব্যবহার করে খাদ্যের পচন রোধ করা এবং দীর্ঘায়িত সংরক্ষণের সুব্যবস্থা করা। সমাধান এক কথার হলেও এর প্রয়োগ কিন্ত এক-দুই এর ব্যাপার নয় তবে অসম্ভবও নয় আবার সুদূরপ্রসারীও নয়। শুধু প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার সাথে সাথে কার্যকরী পদক্ষেপ।
 
বিশ্বজুড়ে এসব খাদ্যের বাজারজাতকরণে স্বাস্থ্যসম্মত টেকসই নানাবিধ পদ্ধতির চর্চা হচ্ছে যা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োগিক গবেষণার দ্বারা স্বল্পতম সময়ে প্রচলন সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তি এবং কারিগরি ব্যবস্থাপনার দ্বারা ভেজালকারীদের চাহিদা মোতাবেক এসব টাটকা ফলমূল স্বাস্থ্যসম্মতভাবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সহজলভ্য এবং সহজপ্রাপ্যই বলা যায়। এখানে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ব্যাপার হলো যে টাটকা খাদ্য বাজারজাতকারী ব্যবসায়ীদের সেসব আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ এবং প্রয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান। একাজটি জরুরিভিত্তিতে যথাশিগগির সম্ভব কার্যকর করতে হবে। এ কাজে প্রয়োজনীয় খরচের চাহিদা মেটানো কষ্টকর হলেও এর ব্যর্থতার মাশুল দাঁড়াবে বহুগুণ। আর তার ভুক্তভোগী হবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। বিপর্যয় নেমে আসবে চিকিৎসা ব্যবস্থায় যার পরিণতিতে দেখা  দেবে পারিবারিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ও।
 
সরকারের নানা অভিযানের পরও বাজারে ক্রমবর্ধমান ভেজাল খাদ্যের উপস্থিতিতে একথা বলা যায় যে, সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না, যার কারণ হতে পারে পদ্ধতিগত ক্রটি। যেমন ভেজালবিরোধী অভিযানের শুরুতেই ঢাকার আড়ৎ এবং ঢাকা আমশূন্য, ক্রেতারা আম কিনছে দ্বিগুণ দামে। অভিযানের ফলাফল দাঁড়াল-খাদ্যহীন বাজার, কর্মহীন আড়ৎ ও খাদ্য সরবরাহকারী অগণিত শ্রমিক, উৎপাদন মূল্যবঞ্চিত কৃষক এবং পরিশেষে বিনষ্ট উৎপাদিত খাদ্য যা কিনা অপচয়। কার্যকরী ভেজালবিরোধী তাৎপরতার জন্য ভেজালের উৎপত্তিস্থলকেই নির্মূল করতে হবে বা উৎপত্তিস্থলেই এর ব্যবস্থা নিতে হবে নতুবা এর স্থায়ী সমাধান আসবে না এটা বোধকরি সংশ্লিষ্ট সব মহলই জানেন। ভেজালবিরোধী অভিযান দ্বারা জরিমানা এবং উৎপাদিত খাদ্য ধ্বংস করে প্রকৃত অপরাধীর বদলে অনেক ক্ষেত্রে পুঁজি হারাচ্ছে ছোট খুচরা ব্যবসায়ীরা আর খাদ্যস্বল্পতার দেশে ধ্বংস করা হচ্ছে অনেক মূল্যবান খাদ্য। টেকসই সমাধান শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প প্রক্রিয়ার প্রচলনের দ্বারাই সম্ভব এসব টাটকা খাদ্যের পচনরোধ করে দীর্ঘ সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। যথাযথ ব্যবস্থার দ্বারাই কেবল সামগ্রিক সমাধানে দেয়া যেতে পারে যা একদিকে যেমন কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাত নিশ্চিত করবে তেমনি ব্যবসায়ী মহলও পুঁজির নিশ্চয়তা নিয়ে ব্যবসা চালাতে পারবে সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তারাও ভেজালমুক্ত খাদ্যগ্রহণে তৃপ্তি নিয়ে সুস্বাস্থের অধিকারী হতে পারবে। আর কালক্ষেপণ নয়। আমার দৃষ্টিতে কিছু সরকারি উদ্যোগই কেবল স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে যা নিম্নরূপ পদক্ষেপের দ্বারা বাস্তবায়ন সম্ভব-
 
১. বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্যসম্মত উপায়েই টাটকা শাকসবজি বা ফলমূল পচনরোধের যেমন নানা প্রযুক্তির প্রচলন আছে তেমনি টাটকা অবস্থায় সেসবের দীর্ঘ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও আছে। একইভাবে আছে ফলমূল কৃত্রিম উপায়ে পাকানোর সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা। কৃষক চাইলে একই জাতের গাছে আগাম এবং স্বাভাবিক মৌসুমের ফল সংগ্রহ করতে পারে স্বাস্থ্যসম্মতভাবেই।
 
২. প্রচলিত উন্নত প্রযুক্তির স্বল্পতম সময়ে বাংলাদেশে প্রয়োগিক গবেষণা করে কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের মাঝে সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করলেই ভেজালরোধ করা সহজতর হবে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে খাদ্যের মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি হবে বটে কিন্তু তাতে টাটকা পণ্যের খাদ্যমান বজায় থাকবে যা সুস্বাস্থের  জন্য সহায়ক হবে সঙ্গে সঙ্গে মরণব্যাধির প্রকোপ কমবে যা সর্বস্তরের মানুষের চিকিৎসা খরচ কমাবে।
 
৩. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বেরকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক টাটকা পণ্যের উপযোগী উন্নত প্রযুক্তি ও স্থাপনা নির্মাণ করে দেশেবিদেশে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি উৎপাদনকারী এলাকায় চাষি সমিতি গঠন করে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে টাটকা পণ্যের বাজারজাতকরণের পদ্ধতি চালু করতে হবে। স্বাস্থসম্মত ও ভেজালবিহীন খাদ্য সরবরাহে ব্রতী চাষিরাই কেবল সমিতির সদস্যপদ সংরক্ষণ করতে পারবে।
 
৪. ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিটি এলাকায় পণ্য ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে সমিতির নিবন্ধিত চাষিদের কাছ  থেকে টাটকা পণ্য ক্রয় করে স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করবে। এজন্য প্রতিটি ক্রয় কেন্দ্রে সংগ্রহোত্তর উন্নত পরিচর্যা ও প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এতে খাদ্যের ভেজাল যেমন রোধ করা যাবে তেমনি অপচয়ও অনেকাংশে কমানো সম্ভব কেননা ক্রয় কেন্দ্রে প্যাকিং করা পণ্য পাইকারি বাজার হয়ে একই প্যাকেট বা ঝুঁড়িতে খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাবে।
 
৫. পাইকারি বাজারগুলোকে উন্নয়নের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গড়ে তুলতে হবে যেখানে টাটকা পণ্যের উন্নত সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। এ জাতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দ্বারা টাটকা পণ্যের সুষ্ঠু স্বাস্থ্যসম্মত বাজারজাতকরণ যেমন সম্ভব তেমনি সৃষ্টি করবে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এবং বৃদ্ধি করবে সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদনও। সঙ্গে সঙ্গে ভেজালমুক্ত পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণে উন্নত স্বাস্থ্য গঠনের মাধ্যমে একদিকে জাতীয় কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে অপরদিকে কমে যাবে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক ভোগান্তিও।
 
ড. আনোয়ারুল ইসলাম বক্ সী*
* কৃষি গবেষক, সিডনি ইউনিভার্সিটি, গ্রাম-কৃষ্ণপুর (বকসীপাড়া), পো:+ জেলা: কুড়িগ্রাম

Share with :

Facebook Facebook