কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলাদেশের কৃষি : চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ

আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ। সুজলা সুফলা, শস্য-শ্যামলা মলয়জ শীতলা এক অপরূপ অনিন্দ্য সুন্দর বাংলাদেশ। বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের যে নাইকো শেষ বাংলাদেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র ও বুড়িগঙ্গা বিধৌত বাংলার রূপ ও সৌন্দর্যে সবই মনোমুগ্ধকর। বাংলাদেশ সবুজের দেশ। ষড়ঋতুতে বাংলাদেশ বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়। কবি তাই যথার্থই বলেছেন, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি। কিন্তু আমাদের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে আজ আমাদের দেশ তথা বাংলাদেশের মেরুদণ্ড কৃষি নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জীবন জীবিকার জন্য এদেশের জনগণ ও অর্থনীতি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এখনও শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ জনসাধারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং মোট জিডিপির ২২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। তাই কৃষি উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটলে দেশের সামাজিক অর্থনীতি তথা অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে।
 
পৃথিবীর মধ্যে জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। লোক সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে ৭ হাজার নতুন মুখ, বছরে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রায় ২৫ লাখ লোক। অপরদিকে রাস্তাঘাট, মিল-কারখানা, অপরিকল্পিত বাড়িঘর ইত্যাদি অবকাঠামো তৈরিতে চাষযোগ্য জমি থেকে প্রতিদিন ২২০ হেক্টর হিসেবে প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি। বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য পাল্লা দিয়ে নিবিড়ভাবে চাষ করা হচ্ছে ধান আর ধান। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ধানের সঙ্গে আনুপাতিক হারে অন্যান্য ফসলের (ডাল, তেল, শাকসবজি, ফল-মূল) চাষ আশানুরূপ বাড়ানো যায়নি। দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করতে পারেনি। খাদ্য নিরাপত্তার প্রথম এবং প্রধান শর্তই হচ্ছে- খাদ্য জোগানের সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা থাকা অর্থাৎ নিশ্চিত আয়ের সংস্থান থাকা যার দ্বারা সবাই চাহিদা ও পছন্দমতো নিরাপদ এবং প্রয়োজনীয় আমিষসহ পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করতে পারে।
 
স্বাধীনতা উত্তর ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য ওই খাদ্য পর্যাপ্ত ছিল না। এর পরের ৪২ বছরে এখানে মানুষ বেড়েছে দিগুণের বেশি, আর আবাদি জমি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। অথচ দেশে এখন খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে তিন গুণ বেশি, ভুট্টাসহ এর পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি মেট্রিক টন (প্রথম আলো, নভেম্বর ২০১৩)। বাংলাদেশে ৩-৪ বছর ধরে আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান থাকা এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের তৎপরতায় কৃষক ভালো বীজ, জমিতে সুষম সারের ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিমিত সেচের কারণে বর্তমানে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন হচ্ছে। তবে কৃষি গবেষকদের মতে, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ মুহূর্তে ধানের আবাদ কমানো যাবে না। প্রধান ফসল ধানের আবাদ ঠিক রেখে অন্যান্য ফসলের (গম, ভুট্টা, ডাল, তৈল, সবজি) আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে (বিএইউ-গবেষণা প্রতিবেদন-২০১৩)।
 
বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চালের মূল্য বেশি অথচ এ দানাদার খাদ্যশস্য চাল আমরা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে খেয়ে থাকি। বাংলাদেশে প্রতিজন প্রতি বছর চাল খায় ১৬৫-১৮৩ কেজি, ভারত-১১৪ কেজি, ইন্দোনেশিয়া-১০৪ কেজি, শ্রীলঙ্কা-৮৩ কেজি, চীন, কোরিয়া, জাপান ৪০-৪৫ কেজি। এক পরিসংখানে বলা হয়েছে, দৈনিক মাত্র ৫০ গ্রাম করে চাল কম খেলে বাংলাদেশে ২৮ লাখ মেট্রিক টন আর ১০০ গ্রাম করে কম খেলে ৫৬ লাখ মেট্রিক টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে। এতে খাদ্য আমদানি করাত দূরে থাক বরং খাদ্য রপ্তানি করা যাবে।
 
অন্যদিকে ভিটামিন, খনিজ লবণের ঘাটতি পূরণ, সুস্থ কর্মক্ষম রোগব্যাধিমুক্ত জীবন গড়তে ফল-মূল, শাকসবজির ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সবজি খায় দক্ষিণ কোরিয়া-৬৮৬ গ্রাম, জাপান-৪৫০ গ্রাম, চীন-২৯০ গ্রাম, ভারত-১২৪ গ্রাম, বাংলাদেশ খায় মাত্র ৪৭ গ্রাম/জন/প্রতিদিন। ফল দেহে আনে বল, ভিটামিনের একমাত্র উৎস। প্রতিদিন একজন লোকের ১১৫-১২০ গ্রাম ফল খাওয়া দরকার। আমাদের দেশে মাথাপিছু ফলের উৎপাদন প্রায় ৩৫-৪০ গ্রাম, ভারতে উৎপাদন ১১১ গ্রাম, ফিলিপাইনে উৎপাদন হয় ১২৩ গ্রাম, থাইল্যান্ডে উৎপাদন হয় ২৮৭ গ্রাম। এর পরিপেক্ষিতে আমাদের প্রচলিত ফলের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া অপ্রচলিত ফল যেমন- আতা, কদবেল, শরিফা, সফেদা, লটকন, ডেউয়া, গাব, কাউফল, ক্ষুদিজাম ইত্যাদি ফলের আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে।
 
বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে ৮০ লাখ  মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়। সংরক্ষণের অভাবে এর উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়। পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন-ডেনমার্ক, হল্যান্ড, ব্রাজিলের জনগণ প্রধান খাদ্য হিসেবে আলু খেয়ে থাকে। আমরা ১০০ গ্রাম চালের পরিবর্তে আলুসহ অন্যান্য সবজি ও ফল খাদ্য তালিকায় প্রতিস্থাপন করতে পারলে চালের ওপর অনেকাংশে চাপ কমবে। আর এর জন্য প্রয়োজন একটু সচেতনা বৃদ্ধি, মানসিকতা এবং খাদ্যাভাসের পরিবর্তন।
 
মাটির স্বাস্থ্য নির্ভর করে মাটির মধ্যে বিদ্যমান পানি, বায়ু আর জৈব উপাদানের ওপর। আর এসব নির্ভর করছে মাটির নিচে বসবাসরত অনুজীব সমষ্টির ওপর। অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে এ অনুজীব ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু মাটির অনুজীব বা মাটির স্বাস্থ্য নয়, ধ্বংস হচ্ছে জীবচৈত্র্যসহ পরিবেশের। ফসলের জমিতে ক্রমাগত আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাসসহ ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে। নিবিড় ফসল ও ফল চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক সার। মাটির প্রাণ হচ্ছে জৈবসার। জৈব পদার্থ হারিয়ে মাটি অনুর্বর ও অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ছে। মাটিতে ৫% জৈব পদার্থ থাকা দরকার কিন্তু মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে জৈব পদার্থ রয়েছে শতকরা ০.৫ - ১.০ ভাগ বা তারও কম। জমির আদর্শ খাদ্য হলো গোবর সার, দেশের অনেক এলাকায় এই আদর্শ গোবর সার জমিতে প্রয়োগের পরিবর্তে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ডেনমার্কসহ অনেক উন্নত দেশে মাটির জৈব পদার্থ সংরক্ষণের জন্য জমিতে গোবরসার ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বলা হয় ‘সবার আগে জৈব সার তারপর অন্য সার’ আমরা চলছি উল্টো পথে।
 
অপরিকল্পিত বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে পোকামাকড়, রোগবালাইয়ের প্রাকৃতিক শত্রু, বন্ধু পোকা ধবংস হচ্ছে। শত্রু পোকার বালাইনাশক সহনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কম ক্ষতিকারক নিম্ন প্রজাতির পোকামাকড় ক্ষতিকারক হিসেবে আত্ম প্রকাশ করছে। ফসলে যথেচ্ছা কীটনাশক ব্যবহার, ফলে ও মাছে বিভিন্ন ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মেশানোর ফলস্বরূপ মানবদেহে সৃষ্টি হচ্ছে- ব্লাড ক্যান্সার, ব্রেন ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, ফুসফুস ক্যান্সার ইত্যাদি। খাদ্যে ভেজালের কারণে গ্যাসট্রিক, আলসার, হৃদরোগ, অন্ধত্ব, কিডনি রোগ, স্নায়ু রোগ প্রভৃতি জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী আজ অসহায় হয়ে পড়ছে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের  বিষাক্ত খাদ্য জনস্বাস্থের জন্য হুমকি শীর্ষক সেমিনারে বলা হয় শুধুুমাত্র ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার, কিডনি রোগের আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ। এছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকালঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। যাহা এক কথায় ভয়াবহ (বাংলাদেশ প্রতিদিন-২৬ অক্টোবর ২০১৪)। বাতাসে সিসা, পানিতে- আর্সেনিক, চালে- ক্যাডনিয়াম, মাছে- ফরমালিন, ফলে- কার্বাইড, ফলের রসে ও বিস্কিটে বিভিন্ন ইন্ডাসট্রিয়াল- রঙ, সবজিতে কীটনাশক, মুরগির মাংসে- ক্রোমিয়াম সর্বদিকে বিষ আর বিষ আমরা যাব কোথায়?
 
শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার জন্য ৭০এর দশকে এদেশে সার ও কীটনাশক ব্যবহার শুরু হয়। ফসল আবাদ বৃদ্ধির কারনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অনেক শিল্পাঞ্চল এলাকার উত্তম আবাদি জমি আজ পরিবেশ দূষণের মারাত্মক শিকার। কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য গিয়ে মিশছে নদী-নালা, খাল-বিলে। খাল-বিলের পানি ব্যবহৃত হচেছ জলাশয়ের আশপাশের আবাদি জমিতে। আবাদি জমি হারাচ্ছে উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা। শিল্পের বর্জ্যরে মাধ্যমে এসব এলাকার মাটিতে জমা হচ্ছে ভারি ধাতব বস্তু (লেড, ক্যাডনিয়াম, ক্রোমিয়াম)। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওইসব এলাকার উৎপাদিত চালে ক্যাডনিয়াম পাওয়া যাচ্ছে।
 
‘বেশি ওষুধ বেশি পোকা, কম ওষুধ কম পোকা’-এ প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে আইপিএম, আইসিএম বর্তমানে আইএফএম  বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্লাবের সদস্যদের প্রচার-প্রচারণা ও মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকির ফলেই বালাইনাশকের ব্যবহার কমতে শুরু করেছে। আশার কথা হলো, সারা দেশে যেখানে ২০০৮ সালে দেশে বালাইনাশক ব্যবহার হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন, ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৮২ মেট্রিক টন। সারা দেশে আইপিএম, আইসিএম ক্লাবের বর্তমান সংখ্যা ১০০০০টি এবং প্রশিক্ষিত কৃষক-কৃষানির সংখ্যা ৩০০০০০ জন। আগামীতে ২০০০০টি আইপিএম/আইএফএম ক্লাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে কীটনাশকের জুডিশিয়াল/পরিমিত ব্যবহার, পরিবেশ রক্ষায় কীটনাশকের পরিবর্তে সবজিতে ফেরোমেন ট্রাপ, ব্রাকন, ট্রাইকোগামা (উপকারী অনুজীব দ্বারা ক্ষতিকর পোকা দমন) ব্যবহার বৃদ্ধি করা, ধানের জমিতে পার্চিং করা ও  ফল পাকানোতে প্রাকৃতিক পদ্ধতি অবলন্বন  করে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো পরিহার এবং এর ক্ষতিকারক প্রভাব সম্পর্কে পত্রপ্রত্রিকায় ও রেডিও-টেলিভিশনে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। আমাদের বাঁচার তাগিদেই এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
 
একদিকে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ফসলি জমিতে বেআইনিভাবে ইটভাটা স্থাপন করায় তার কালো ধোঁয়া আশপাশের ফসলি জমি ও গাছ পালার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। প্রতি বছর কোথাও না কোথাও ধানে চিটা, ফসলহানীসহ ফল গাছে ফলশূন্য হওয়ার অনাকাক্সিক্ষত ঘটছে। গত ২০১৩ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ ও তাড়াশ উপজেলার বোরো ধানের জমি এতে অক্রান্ত হয়েছে। আমাদের কৃষি প্রকৃতি এখনও জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল।  বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি ওপর পড়ছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব। এর ফলে শুরু হয়েছে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
 
নদ-নদীর উৎস পথে বা তার গতিপথে বাধা সৃষ্টিকারী বাঁধ পানির স্বল্পতাসহ খরার সৃষ্টি করছে। উজানে বিভিন্ন অপরিকল্পিত বাঁধ ভাটিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর কারণে বাংলাদেশে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে। শুধু তাই নয় সমুদ্রের পানির উজানমুখী ধাক্কা বাড়ছে। কারণ খরার সময় উজানের পানি প্রবাহ বাধার কারণে নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামার কারণে এবছর বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া উপজেলার ৩৮০টি অগভীর নলকূপ ৮-১০ ফুট গভীরে স্থাপন করে সেচ প্রদান করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলায় চরাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ৪৪,০০০ হেক্টর (২৪%) যাহা নদীর নাব্যর কারণে প্রতি বছর বেড়েই চলেছে।
 
নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃর্ণ এলাকা লবণাক্ততায় ভরে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ত আক্রান্ত। তার মধ্যে মাত্র ২,৫০,০০০ হেক্টর জমিতে লবণসহিষ্ণু ফসল চাষাবাদ সম্ভব হচ্ছে। বাকি জমি এখনও চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের ১২টি জেলায় লবণাক্ততার প্রভাবে স্বাভাবিক চাষাবাদ হয় না। ২০০৭ সালে সিডর, ২০০৯ সালে আইলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জমি লবণাক্রান্ত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। যাহা এখনও কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি।

তাপমাত্রা ও উষ্ণতা রোধে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫% গাছপালা/বন থাকা দরকার, আমাদের দেশে রয়েছে বর্তমানে মাত্র ১০-১২%। এ সমস্যা উত্তরণের জন্য সরকার বৃক্ষরোপণের ওপর অত্যধিক জোর দিয়েছেন। কিন্তু কিছু আগ্রাসী প্রজাতির গাছ আমাদের দেশকে মরুময়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে রাস্তার দুইপাশে কড়াই গাছ বিশেষ করে সিরাজগঞ্জে ইউক্যালিপটাস গাছ বাগান আকারে চাষ করা হচ্ছে। যে গাছে পাখি বাসা বাঁধে না, মৌমাছি মধু আহরণ করে না এবং আমাদের ভূ-নিম্নস্থ পানি ব্যাপক শোষণ করে উড়িয়ে দিয়ে দ্রুত মরুময়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগতভাবে নিম্নমুখী হচ্ছে, ফলশ্রুতিতে পানিতে আর্সেনিকসহ অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারপরও যদি এ প্রজাতির গাছ লাগানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে তাহা সহজেই অনুমেয়। অথচ আমরা এর পরিবর্তে বেলজিয়াম, একাশিয়া, ইপিল-ইপিল, মেহগনি ইত্যাদি কাঠের গাছের সাথে ফল গাছ (আম, জাম, কলা, লিচু, পেয়ারা, কাঁঠাল, তাল, খেজুর ইত্যাদি) লাগিয়ে একদিকে পরিবেশের উন্নতি সাধন অন্যদিকে ফলের চাহিদা ও পূরণ করতে পারি।

 
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন বীজ ব্যবহার হয় তার মধ্যে বিএডিসি সরবরাহ করে মাত্র ধানের ৩৫-৪০ ভাগ এবং অন্যান্য ফসলের মাত্র ১০-১২ ভাগ। সরকার কৃষক ভালো মানের বীজ সরববাহের লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে (ডিএই) কৃষক পর্যায়ে ভিত্তি বীজের প্রদর্শনী স্থাপন করে এ সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে। কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত এ বীজ দিয়ে বর্তমানে প্রায় ৭০ ভাগ উন্নত মানের ধান বীজের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছে। সরকারের নন ইউরিয়া সারের মূল্য কমানো এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তদারকির ফলে বর্তমানে জমিতে সুষম সারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গত ৫ বছর ধরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফল স্বরূগত ৩ বছর ধরে এক টন চালও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়নি। এত প্রতিকূল পরিবেশেও কৃষি উৎপাদন গত ৫ বছর শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে।
 
নার্স কর্তৃক আয়োজিত ‘খাদ্য নিরাপত্তায় বিজ্ঞান-সেমিনার-২০১০’ সালের একটা গবেষণায় দেখা গেছে, জনসংখ্যা বর্তমান হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে এবং খাদ্য গ্রহণ ৪৫৪ গ্রাম/জন/দিন হিসেবে আগামী ২০২৫ সালে বাংলাদেশের লোক সংখ্যা দাঁড়াবে ১৯ কোটি, খাদ্যের প্রয়োজন হবে ৩ কোটি ১৫ লাখ মেট্রিক টন। আর ২০৫০ সালে লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ২৫ কোটি এবং খাদ্য চাহিদা দাঁড়াবে ৪ কোটি ২৫ লাখ মেট্রিক টন। সেই সাথে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ দাড়াবে ২০২৫ সালে বর্তমানে ৮১ লাখ হেক্টর থেকে কমে ৬৯ লাখ হেক্টরে এবং ২০৫০ সালে দাঁড়াবে মাত্র ৪৮ লাখ হেক্টরে। সুতরাং এত অল্প পরিমাণ চাষযোগ্য জমিতে ৪.২৫ কোটি মেট্রিক টন চাল উৎপাদন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতএব এখন থেকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি সমুন্নত রেখে খাদ্যাভাস পরিবর্তন এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
 
উপসংহার
আমরা জানি কৃষিতে নানাবিধ সমস্যা আছে যার সমাধান ও রয়েছে। আমরা কৃষিতে অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি। আমাদের চাল উৎপাদন যথেষ্ট যা ধরে রাখতে হবে। শ্রীলঙ্কতে এবছর ১ লাখ টন চাল রপ্তানি হচ্ছে। তাপমাত্রা সহিষ্ণুু গমের জাত উদ্ভাবনের ফলে গমের আবাদ বৃদ্ধি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ টন গমের চাহিদা রয়েছে, উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১১-১২ লাখ টন। যার জন্য খাদ্যশস্য হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হচেছ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ টন আলু উৎপাদন হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণ করে স্বল্প পরিসরে বিদেশে আলু রপ্তানি হচ্ছে। এ মহূর্তে সবজি ও ফলের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে। ডাল ও তেল জাতীয় ফসলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ভোজ্যতেলের প্রায় ৭০% ভাগ আমদানি করতে হচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে ধানের কুড়া থেকে রাইস বার্ন অয়েল উৎপাদনের ফলে সয়াবিন তৈরি আমদানি দিন দিন কমে যাচেছ। সরিষার আবাদ বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। নতুন নতুন সরিষার জাত উদ্ভাবিত হয়েছে যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ডালের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ডালের মূল্য ও আমদানির পরিমাণ কমেছে। এ সময়ে চাহিদার ৫০% ডাল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। চাষিরা মূল্য পাওয়ায় পেঁয়াজ-রসুনের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে এবং আমদানিও কমেছে। সারা বছরব্যাপী ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কলা, পেঁপে, থাই পেয়ারা, আপেল কুল চাষ বেড়েছে। আংশিক বৃষ্টি নির্ভর আউশ ও পুরো বৃষ্টি নির্ভর রোপা আমন চাষে সরকার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কৃষি খামার স্থাপন, খামার যান্ত্রিকীকরণ ও সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরলস প্রচেষ্টা বর্তমান কৃষিকে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে যাবে। যেখানে কৃষি, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আর ও গতিশীল করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
 
ড.  মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার*
* শস্য উৎপাদন বিশেষজ্ঞ, ডিএই, সিরাজগঞ্জ, মোবাইল-০১৮১৫৫৯৭৩০৪ dhossain1960@yahoo.com

Share with :

Facebook Facebook