কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

টমেটো জুস তৈরি পুষ্টিমান ও ব্যবহার

টমেটো একটি সুস্বাদু, স্বাস্থ্যকর এবং উচ্চ পুষ্টি মানের সবজি। এটি লাইকোপেন, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও পটাসিয়াম সমৃদ্ধ। উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে টমেটো ২য় সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী সবজি। ২০১২ সনে বিশ্বে ১৬১.৪ মিলিয়ন টন টমেটো উৎপন্ন হয় এবং উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ১ম চীন, ২য় ভারত, ৩য় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে ২৬৩১৬ হেক্টর জমিতে ২,৫০,৯৪৭ মেট্রিক টন টমেটো উৎপাদিত হয় এবং দিন দিন উৎপাদন বাড়ছে (বিবিএস ২০১৩)। উৎপাদন বাড়লেও বাংলাদেশে এ সবজির সংগ্রহোত্তর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩২.৯% (হাসান, ২০১০)। অধিক ঠা-ায় সংরক্ষণ করলে টমেটোর টাটকাভাব ও বুনটের মান নষ্ট হয়ে যায়। যেহেতু বাংলাদেশে শীত মৌসুমে অধিক টমেটো উৎপাদিত হয় এবং এ উৎপাদনের ফলে সরবরাহ বেড়ে চাহিদা কমে যায়, ফলে প্রচুর টমেটো নষ্ট হয়। এর পরিণামে উৎপাদনকারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টমেটো একটি পচনশীল সবজি এবং সংরক্ষণকাল কম থাকায় মৌসুমের দিকে টমেটোর দাম বেড়ে যায়। তাই টমেটো প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এর সংরক্ষণ কাল এবং সারা বছর সরবরাহ বাড়ানো যায়। টমেটো প্রক্রিয়াজাত করে কেচাপ, সস, পুরী, পেস্ট ও জুস তৈরি করা যায়। আমেরিকাতে প্রায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত টমেটোর ৮০-৯০% টমেটো প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ করে সারা বছর সরবরাহ সহজলভ্য করা হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণ শুধু সংরক্ষণকালই বাড়ায় না বরং মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে।
 

টমেটো জুস টমেটো থেকে উৎপাদিত দেহ সতেজকারী পুষ্টিকর কোমল পানীয়। বিভিন্ন দেশে বিমানযাত্রীদের জন্য এটি একটি জনপ্রিয় পানীয়। জার্মান বিমানযাত্রীদের মাঝে ২০০৮ সনে ১৭ লাখ লিটারের বেশি টমেটো জুস সরবরাহ করা হয়। টমেটো থেকে টমেটো জুস তৈরির মাধ্যমে একদিকে যেমন সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমানো যায় অন্যদিকে চাহিদা ও মূল্যের ভারসাম্য রক্ষা করে সারা বছর পুষ্টিকর এ জুসের সরবরাহ বাড়ানো যায়। তাছাড়া উৎপাদনকারী উৎপাদিতপণ্যের সঠিক মূল্য পায়। উন্নত বিশ্বে টমেটো জুসের ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও বাংলাদেশে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। অথচ এ জুস তৈরির পদ্ধতি অত্যন্ত সহজ এবং বাসাবাড়িতে অতি সহজে তৈরি করা যায়। টমেটো জুস উৎপাদনের মাধ্যমে টমেটোর অপচয়রোধ করে সঠিক ববহার নিশ্চিত হবে এবং সারা বছর সরবরাহসহ উৎপাদনকারীদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। তাছাড়া নিজ বাসাবাড়িতে অতি সহজে টমেটো জুস তৈরি এবং ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
 

জুস প্রস্তুত প্রণালি :
সম্পূর্ণ পাকা এবং লাল রঙ বিশিষ্ট টমেটো নির্বাচন, সহজ ও অসম পাকা টমেটো বাদ দিতে হবে।
টমেটো উত্তমরূপে ধুয়ে ধুলাবালু পরিষ্কার এবং ছোট ছোট করে কাটতে হবে।
নরম করার জন্য ৭০-৯০০  সে. তাপে ৫ মিনিট তাপ দেয়া ও কাঠের দণ্ড দিয়ে পাল্পিং করে লোহার চালুনি দিয়ে ছাল ও বীজ জুস থেকে আলাদা করতে হবে।
জুসের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ০.৫% লবণ, ২% চিনি, ০.৪% সাইট্রিক এসিড যোগ করা
                  বা
১ লিটার জুসে ১০ গ্রাম চিনি, ৫ গ্রাম লবণ ও ১ গ্রাম সাইট্রিক এসিড যোগ করা (সাইট্রিক এসিডের পরিবর্তে লেবুর রস দেয়া যেতে পারে)।
উপাদানসমূহ উত্তমরূপে মিশানো এবং কয়েক মিনিট ৫৫০ তাপে তাপ দেয়া।
অধিক সময় সংরক্ষণের জন্য ১ গ্রাম/ লিটার এ সোডিয়াম বেনজোয়েট যোগ করা। প্রথমে এক চামচ জুস চামচ দিয়ে উঠিয়ে তাতে সোডিয়াম বেনজোয়েট মিশিয়ে পরে তা সম্পূর্ণ অংশে মিশিয়ে দিতে হবে, যেন সমভাবে মিশ্রিত হয়। (টিএসএস ৫% হতে হবে)
উত্তপ্তাবস্থায় জীবাণুমুক্ত বোতল ভর্তিকরণ বা প্যাকেজিং করা
গরম পানিতে বোতলকে জীবাণুমুক্তকরণ (৩০ মিনিট)
ঠা-করণ ও লেবেলিংকরণ
গুদামে সংরক্ষণ
    
পুষ্টিমান
১. টমেটো জুস বিটা ক্যারোটিন (১০৯৪ আইইউ/কাপ) ও খনিজসমৃদ্ধ পানীয়। এতে উচ্চমাত্রার পটাসিয়াম (৫৫৮ মি. গ্রাম/কাপ) থাকে। যা উচ্চরক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। বিটা ক্যারোটিন চোখের দৃষ্টি বাড়াতে সহায়তা করে।
২. টমেটো জুস উচ্চমাত্রার লাইকোপেনসমৃদ্ধ। লাইকোপেন তাপে স্থায়ী ও সহজলভ্যতা বাড়ে। তাই প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় তাপের ফলে লাইকোপেনের পরিমাণ ২-৩ গুণ বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা যায়, টাটকা ১ কাপ টমেটোতে ৫ মি. গ্রাম লাইকোপেন থাকে অথচ ১ কাপ প্রক্রিয়াজাত টমেটো জুসে ২১ মিলি. গ্রাম লাইকোপেন থাকে। এ লাইকোপেন একটি পিগমেন্ট এবং শক্তিশালী এন্টি অক্সিডেন্ট। লাইকোপেন দেহকে ক্যান্সার ও হৃদরোগ হতে রক্ষা করে। উচ্চমাত্রা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হওয়ায় দেহে উৎপাদিত ফ্রি র‌্যাডিক্যাল নষ্ট করে এবং দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে ফ্রি র‌্যাডিক্যালের ক্ষতি হতে রক্ষা করে।
৩. ব্রিটিশ নিউট্রিশন জার্নাল মোতাবেক প্রতিদিন ১০০ মিলি টমেটো জুস পান করলে ৫-৯% কোলস্টেরল কমে এবং রক্তের জমাট বাধার প্রবণতা কমায়।
৪. এ ছাড়াও টমেটো জুসে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন বি, ভিটামিন সি, ফলিক এসিড বিদ্যমান, যা সহজেই শরীর কর্তৃক গৃহীত হয়ে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ সম্পাদন করে এবং দ্রুত দেহের ক্লান্তি, ট্রেস ও দুর্বলতা দূর করে।
৫. বোতল বা টিন জাতীয় পাত্রে সংরক্ষণ করে দীর্ঘ সময় পান করা যায় এবং শক্তি ও রুচিবর্ধক পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

 

মো. সাইফুল ইসলাম*
*উপজেলা কৃষি অফিসার (এলআর), খামারবাড়ি, ঢাকা ও পিএইচডি ফেলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সালনা, গাজীপুর


Share with :

Facebook Facebook