কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দ্বিস্তর সমবায় ও কৃষি

আলোচ্য প্রবন্ধটির রয়েছে তিনটি অংশ। প্রথম অংশে বিআরডিবির শুরু থেকে হাতে নেয়া গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পগুলো থেকে যে অর্জন পাওয়া গেছে তার একটা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মূলত কৃষি সেক্টরে যে পরিবর্তনগুলো হয়েছে তার দৃশ্যমান পরিবর্তনটাকে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অংশে অর্জন প্রাপ্তির পরবর্তীকালে সংস্থাটির ক্রান্তিকালের একটি চিত্রসহ পরিবেশের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করার চেষ্টা নেয়া হয়েছে। অর্জনের সুফলগুলোকে দ্রুততার সঙ্গে পল্লীর জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায়  পৌঁছে দেয়া এবং যথাযথ যধহফষব করতে ব্যর্থ হওয়ার একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তৃতীয় অংশে সংস্থাটির অভিজ্ঞতাগুলোকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তার সুপারিশ করা হয়েছে। আলোচনাটি মূলত গুণগত ও বিশ্লেষণাত্মক পর্যায়েই রাখা হয়েছে।

 বিআরডিবি হচ্ছে একমাত্র সরকারি সংস্থা যেটা গ্রামীণ দারিদ্র্যবিমোচন এবং সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। বিআরডিবি সাধারণত গ্রামীণ ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকদের সমবায় সমিতি গঠনের মধ্য দিয়ে একত্রিত করে তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের সংগঠন সৃষ্টি এবং উন্নত চাষ পদ্ধতির কলাকৌশলগুলো কৃষকদের মাঝে হস্তান্তরের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করে আসছে। পাশাপাশি গ্রামের বিত্তহীন পুরুষ ও দুস্থ মহিলাদের সমবায় সমিতি-অপ্রাতিষ্ঠানিক  দলে  সংগঠিত করে আয়বর্ধনমূলক কর্মকা- পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে অবদান রেখে আসছে।

১৯৭১ সন থেকে তদানীন্তন ‘সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি’র মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৮২ সনে বোর্ডে উত্তোরণের মধ্য দিয়ে বিআরডিবি আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে প্রশিক্ষণ প্রদানসহ ঋণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়ে এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে গ্রামের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খুব কাছাকাছি থেকে গ্রামীণ দরিদ্রতা কমিয়ে আনার কাজ সম্প্রসারিত করেছে।

পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি : যেভাবে আসল
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করলে অপ্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে হয় না। এ যাবত পল্লী উন্নয়ন সেক্টরে যেসব পরিবর্তন ঘটেছে এবং এখনও পরিবর্তন ঘটে যাছে তার সবই হচ্ছে দ্বিস্তর সমবায়ের মাধ্যমে পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির প্রভাব থেকে বা অভিজ্ঞতা থেকে। এ অর্জনটা কিন্তু  জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর দেখা অনেকগুলো স্বপ্নের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের বাস্তবায়ন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীকে (বর্তমানের দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া) খাওয়াতে হলে এমন সব পদক্ষেপ নিতে হবে যার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটে।  তাই ১৯৭১ সনে স্বাধীনতা অর্জনের পর কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পল্লীর জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনি দুটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে ছিলেন।

প্রথমত কৃষি গ্রাজুয়েটদের সরকারি চাকুরিতে তিনি প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দিয়ে গেছেন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন বর্ধিত জনগোষ্ঠীকে খাওয়াতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর উৎপাদন বাড়াতে হলে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে। এর জন্য দক্ষ কৃষি বিজ্ঞানী গড়ে তুলতে হবে। সুতরাং কৃষি গ্রাজুয়েটদের মর্যাদার আসনে না বসালে এ সেক্টরে মেধার সমাবেশ ঘটবে না। আর মেধার সমাবেশ না ঘটাতে পারলে উন্নত প্রযুক্তিরও উদ্ভাবন সম্ভব হবে না। বর্তমানে উন্নত জাতের ধান বীজসহ বিভিন্ন ধরনের প্রধান ও অপ্রধান শস্যের বীজ উদ্ভাবিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। উন্নত ফসল উৎপাদন কৌশল আবিষ্কৃত হচ্ছে এর সবই বঙ্গবন্ধুর দেখা স্বপ্নের ফসল।

দ্বিতীয়ত কৃষকদের মাঝে এসব উদ্ভাবিত নতুন নতুন প্রযুক্তিগুলো পৌঁছে দেয়ার জন্য তৎকালীন সময়ে কৃষি বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত সম্প্রসারণ কৌশল (টিঅ্যান্ডভি পদ্ধতি) কাজ হচ্ছিল না বিধায় তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের সংগঠন গড়ে তুলে উদ্বুদ্ধকরণসহ নতুন প্রযুক্তিগুলো ব্যবহারের কৌশল পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে কুমিল্লা মডেলের সর্বশেষ কম্পোনেন্ট অর্থাৎ দ্বিস্তর সমবায় পদ্ধতির বাস্তবায়নের জন্য আইআরডিপি অর্থাৎ সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। এ কর্মসূচির মাধ্যমেই  পল্লী উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

কর্মসূচিটি যেভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল
প্রথম ধাপে আইআরডিপির মাধ্যমে গ্রামের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সংগঠিত করে গ্রাম পর্যায়ে সমবায় সমিতি গঠন করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপে সংগঠিত সমবায় সমিতিগুলোকে সমবায বিভাগ কর্তৃক নিবন্ধন করার মাধ্যমে কৃষকদের সংগঠনগুলো সরকারের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়।
তৃতীয় ধাপে নিবন্ধিত সমবায় সমিতিগুলো থানা-উপজেলা পর্যায়ে তাদের কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি গঠন করে। এ কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির অফিসে প্রতি মাসে প্রাথমিক সমবায় সমিতির প্রতিনিধিরা (সভাপতি-ম্যানেজার-আদর্শ কৃষক) একত্রিত হয়ে এবং নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য আলোচনায় অংশগ্রহণ করে। যাকে মাসিক প্রশিক্ষণ বলা হতো। কৃষি বিভাগসহ থানা-উপজেলা দপ্তরের অন্যান্য জাতি গঠনমূলক সংস্থাগুলো মাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে উদ্ভাবিত-নতুন প্রযুক্তিগুলো নিয়ে হাজির হতো এবং ব্যবহারের কলাকৌশল শিখিয়ে দিত।

চতুর্থ ধাপে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন উন্নত প্রযুক্তিগুলো সংগ্রহ-বিদেশ থেকে আমদানি করে ভর্তুকি মূল্যে কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতিগুলোর মাধ্যমে সমবায়ী কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়া নিশ্চিত করত।

পঞ্চম ধাপে সমবায় সমিতিগুলো কর্তৃক চাহিদাকৃত প্রযুক্তি সংগ্রহের অর্থের জোগান দিত রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। এ পদ্ধতিতে অর্থাৎ সমন্বিত পদ্ধতিতে কাজ করার ফলে ৮০’র দশকের শেষ দিকে এসে দেশ marginally খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়।
কর্মসূচির অর্জন ভালো দিক
শুরু থেকেই বিআরডিবি (তদানীন্তন আইআরডিপি) পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন-বিকাশ ঘটানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে এবং এখনও তাদের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। এ সংস্থাটি এরই মধ্যে প্রায় ১০৩টি গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং বর্তমানে ৭টি পল্লী উন্নয়ন ও আইজিএ ভিত্তিক দারিদ্র্যবিমোচন প্রকল্প চলমান আছে। বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো থেকে জাতি যে অর্জনগুলো প্রাপ্ত হয়েছে-

ক. বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ ও বিদ্যমান খাদ্য ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে উন্নত চাষ পদ্ধতির প্রচলন অর্থাৎ উচ্চফলনশীল জাতের বীজ, সার ও কীটনাশক এর ব্যবহার, এক ফসলি জমিগুলোকে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে দো-ফসলি বা তিন-ফসলি জমিতে উত্তোরণের মাধ্যমে দেশের খাদ্য ঘাটতি দূর করার মতো সফলতা দেখিয়েছে। ফলে আজ-

সার উৎপাদনসহ বিতরণ ও বিপণন ব্যবস্থা প্রাাইভেটাইজেশন হয়েছে।
উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা প্রাইভেটাইজেশন হয়েছে এবং কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।

কীটনাশক ব্যবহারের ফলে শস্য ক্ষেতে নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে।
সেচ যন্ত্র তৈরি ও বিতরণ ব্যবস্থাতেও প্রাইভেটাইজেশন হয়েছে।

খ. উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি গ্রহণ ও সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণের ফলে আজ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী যথেষ্ট সচেতন হয়েছে। গ্রামীণ জনগণ তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো মূল্য পাওয়ার জন্য শহরের বাজারগুলোতে নিয়ে আসছে। ছোট ও মাঝারি আকারের হাঁস-মুরগরি খামার গড়ে তুলে নিজেদের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। প্রাকৃতিক মৎস্য আহরণ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন কৌশল শিখেছে এবং বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে মাছের চাষ করছে।

এভাবে কৃষকদের যেমন আয় বৃদ্ধি পেয়েছে পাশাপাশি তাদের উৎপাদনের উপকরণের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গড়ে উঠেছে এবং ক্রমবর্ধমান উপকরণ সরবরাহসহ উৎপাদনের জন্য অর্থের জোগান দিচ্ছে। একদিকে যেমন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্ব-কর্ম  সৃষ্টি হয়েছে। তেমনি বেসরকারি সংস্থাগুলোতে গ্রামীণ শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়ে কাজ করে আয় রোজগার করছে। গ্রামীণ বেকারত্ব দূর হচ্ছে। তবে এখনও অনেক দূর যেতে হবে।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটানোর জন্য ব্যবসায়িরাও বাণিজ্যিকভাবে হাঁস-মুরগির খামার ও মৎস্য খামার গড়ে তুলেছে। গ্রামে গ্রামে কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসার ঘটে চলেছে। হাঁস-মুরগির ও মাছের খাবার চাহিদা মিটানোর জন্য খাদ্য তৈরির কারখানাও গড়ে উঠছে। অর্থাৎ গোটা অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে আর্থিক কর্মকাণ্ড (Economic Activities) সৃষ্টি হয়েছে এবং সব ক্ষেত্রে Value Chain এবং Value addtion এর মতো বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন ঘটে চলেছে।

অর্জন : বিপরিত দিক
পরবর্তী সময়ে দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে কখনও কৃষি উপকরণের বিভিন্ন উপ খাতগুলো থেকে ক্রমে ভর্তুকি কমিয়ে সহজ ঋণ আবার কখনও ব্যক্তি মালিকানায় সেচ যন্ত্রের সুবিধা প্রদান সব মিলিয়ে এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি দুর্বলতাগুলোকে পুঁজি করে বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের পরিধি বাড়াতে থাকে। ফলে কৃষির উপকরণসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি বিদেশ থেকে আমদানিসহ  এগুলোর উৎপাদন ও বিতরণ মুক্তবাজার পদ্ধতিতে নিয়ে যাওয়ার ফলে এবং সর্বোপরি কৃষকদেরও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা নিজেরাই সীমাবদ্ধতার মধ্যে না থেকে আরও উন্নত কৃষি উপকরণ ও উৎপাদন কৌশল খুঁজতে থাকে। ফলে ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি উপকরণ ও কৌশল আমদানিসহ স্থানীয় বাজারে বিক্রির ব্যবসা গড়ে তুলে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। দারিদ্র্য পণ্যে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতির সেই পুরনো কথা-পুঁজি সেখানেই বেশি বিনিয়োগ হবে যেখানে মুনাফা বেশি হবে।

কিন্তু কৃষির উপকরণ ও কৌশল আমদানি স্থানীয় বাজারে বিপণন এবং রাসায়নিক সারসহ কীটনাশকের অবাধ প্রাপ্যতা এবং অবাধ ব্যবহার, সেচ যন্ত্রপাতি অবাধে বাজারে আনয়ন, সেচযন্ত্র বসানোর নীতিমালার কোনো প্রয়োগ ও কার্যকারিতা না থাকা এবং সেচের পানি ব্যবহারের কোনো জাতীয় সেচ নীতি না থাকার কারণে কৃষি ব্যবস্থা এখন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। এসব কারণে যেমন-

বর্তমান কৃষি ব্যবস্থাকে আর পরিবেশবান্ধব বলা সম্ভব হচ্ছে না।

কৃষি খাত থেকে ভর্তুকি কমিয়ে আনা বা তুলে নেয়া এবং উপকরণ আমদানি, উৎপাদন privatization  এর ফলে লাভটাকে  মুখ্য দেখা হচ্ছে। পরিবেশের বিষয়টা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।

বাণিজ্যিকিকরণের ফলে লাভটা মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। Subsistance কৃষি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পুষ্টিমানসহ শরীর-স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাবটা কোনোমতেই বিবেচনায় আনা হচ্ছে না।

হাইব্রিড জাত বিদেশ থেকে আমদানিসহ দেশে অবস্থিত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কর্তৃক হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদনের ফলে গ্রামীণ বীজ শিল্প ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়েছে। ফলে ব্যবসায়িরা অধিক মুনাফার জন্য সরবরাহ ব্যবস্থাটা নিয়ন্ত্রণ করে উপকরণের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে কিন্তু কৃষকরা উৎপাদিত মূল্যের যথাযথ মূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলে বর্ধিত উৎপাদনের সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে না উঠায় কৃষকরা পণ্যের দাম এখনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

কী করা উচিত
একটু দেরি হয়ে গেছে। কারণ বিআরডিবি কর্তৃক গৃহীত দারিদ্র্যবিমোচনের মিশন-প্রচেষ্টাগুলো fulfil করতে হলে তার Organizational Strategy তে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে এবং জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজির ধার্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের জন্য নতুন organizational Action Plan তৈরি করতে হবে অথবা বিদ্যমান organizational Action Plan টাকে redesign করতে হবে।
দ্বিস্তর সমবায়ের মাধ্যমে বিআরডিবির ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের পাশাপাশি দারিদ্র্যবিমোচনের লক্ষ্যে বাস্তবমুখী প্রকল্প হাতে নিতে হবে।
কৃষকদের তথা সমবায়ী কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য ‘সমবায় বাজারজাতকরণ’ কর্মসূচির ওপর জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে ‘মার্কেটিং সমবায় সমিতি’ গঠন করে  উৎপাদন ও বিতরণ-মার্কেটিংয়ের মধ্যে একটি Chain সৃষ্টি করা উচিত হবে। বাড়তি উৎপাদন সংরক্ষণ করে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বিআরডিবি-উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতিগুলোর বিদ্যমান গোডউনগুলোকে কোল্ডস্টোরেজে রূপান্তর করার উদ্যেগ নেয়া যেতে পারে।

দ্বিস্তর সমবায় ব্যবস্থাকে বর্তমান কৃষি-পল্লী উন্নয়ন ও দারিদ্র্যবিমোচনবান্ধব কর্মসূচির উপযোগী করার লক্ষ্যে কুমিল্লা মডেলটাতে কিছু  Adjustment আনা যেতে পারে। এতে দ্বিস্তর সমবায় ব্যবস্থার মূল theme এর কোনো বিকৃতি ঘটবে না।

সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষিঋণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষুদ্র বিনিয়োগ (Micro Investment) কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।

পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার পাশাপাশি কৃষিবান্ধব পল্লী উন্নয়ন ও দারিদ্র্যবিমোচন পদক্ষেপ বা কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

বিআরডিবিকে জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি এবং রূপকল্প-২০২১ এর আলোকে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করে যেতে হবে।

পরিবর্তিত গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে সদর দপ্তরের কর্মকর্তাসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযোগী করে তুলতে হবে।

কেবল কর্মকর্তা না হয়ে Process Facilitator এর ভূমিকা পালনের মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বর্তমানে প্রচলিত ও গতানুগতিক তথ্য প্রবাহ ধারা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করতে হবে।

জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে উন্নয়ন কর্মকা-গুলোকে অতি দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও সমাধান দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।

শেষ কথা
এ প্রবন্ধে যে Adjustment এর কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে ‘কুমিল্লা মডেল’ এর পল্লী উন্নয়ন কৌশলের  দ্বিস্তর সমবায় পদ্ধতির মাধ্যমে Group Approach এর কথা বলা হয়েছে তার ওপর। কুমিল্লা মডেলের এ শিক্ষাটাকে ধারণ করে এবং কিছু Adjust করে (অর্থাৎ সমবায়টাকে পাশ কাটিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক দল গঠনের মাধ্যমে) এনজিওগুলো ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। তবে এনজিওরা যে সফল হয়েছে সে কথাও বলা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের কাজের সামগ্রিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

আবার আমি এটাও বলতে চাচ্ছি না যে, কুমিল্লা  মডেলের দ্বিস্তর সমবায় ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিস্তর সমবায় ব্যবস্থা সফল হয়েছে এবং একটা সময় পর্যন্ত ভালোভাবে কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। যেগুলো বিবেচনায় অবশ্যই আনতে হবে। বিশেষ করে কৃষি ক্ষেত্রে পরিবেশের বিপর্যয়টাকে আমার বিবেচনায় আনার প্রস্তাব।

সুতরাং আমার প্রস্তাবটা হচ্ছে ষাটের দশকে উদ্ভাবিত পল্লী উন্নয়ন মডেলটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কতটুক কার্যকরভাবে কাজ করছে? কোনো সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা। সমন্বয়ের প্রয়োজন থাকলে কোনো কোনো ইস্যুতে সমন্বয় ঘটাতে হবে হতে পারে এগুলো চিহ্নিত করে জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজির দারিদ্র্যবিমোচন টার্গেটগুলো  এবং রূপকল্প-২০২১ এর আলোকে Action Plan তৈরি এবং জাতীয় অর্জনে কতটুকু অবদান রাখা সম্ভব হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে স্থির করে কাজ করে যাওয়া।
 
কৃষিবিদ খুরশীদ আলম*
* যুগ্ম পরিচালক (আরইএম), বিআরডিবি, ঢাকা

Share with :

Facebook Facebook