কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পারিবারিক খামার : খাদ্য অর্থ পুষ্টি বারো মাস

গাঢ় সবুজে লাল বৃত্তে খচিত বিশ্ব মানচিত্রে অঙ্কিত একটি দেশ বাংলাদেশ। ১,৪৭,৫৬৯ বর্গকিলোমিটারের এ ক্ষুদ্র বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬০ মিলিয়ন যা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৪৭%  অর্থাৎ প্রতি বছর যোগ হচ্ছে প্রায় ২ মিলিয়ন নতুন মুখ। আগামী ২০২০ সনে জনসংখ্যা হবে ১৭৩ মিলিয়ন এবং ২০৩০ সনে হবে ১৯৬ মিলিয়ন। এ দেশের মোট জনসংখ্যা শতকরা ৩১.৫ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, যার ৫০% চরম দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা এবং খাদ্য নিরাপত্তার শিকার। বাংলাদেশে ৪১ শতাংশ শিশু বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম বা খর্বাকৃতি, ১৬ শতাংশ শিশু উচ্চতার তুলনায় রুগ্ণ ও বয়সের তুলনায় ওজন কম ৩৬ শতাংশ শিশুর। প্রায় পাঁচ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার ২০১১ সালে তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশু ছিল ১৬%, ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮%। শুধু ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে দেশে প্রতি বছর ৩০ হাজারেরও বেশি শিশু অন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং কয়েক লাখ লোক রাতকানা রোগে ভুগছে। বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অভাবে রক্তশূন্যতা, মুখের ঘা, দাঁতের রক্ত পড়া, বেরিবেরি, গলগ- ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের খাদ্য তালিকায় বেশি স্থান জুড়ে আছে দানাদার খাদ্যশস্য। প্রতিদিন একজন মানুষের যেখানে ২২০ গ্রাম শাকসবজির খাওয়া প্রয়োজন সেখানে আমরা খাই মাত্র ৮০ গ্রাম। প্রয়োজনীয় পরিমাণ শাকসবজি না খাওয়ার কারণে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ চরম পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এবং এর নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের ৮০% গ্রামে বসবাস করে যার বেশিরভাগই হচ্ছে কৃষক। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার গ্রামে ৭৩% বাস করে। মোট ২৮.৬ মিলিয়ন পরিবারের মধ্যে কৃষি পরিবারের সংখ্যা ১৫.১ মিলিয়ন (৫৩%)। গ্রামীণ জনসংখ্যার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষকের হার শতকরা ৮০ ভাগ। জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৮.৭% প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬.০৩ আর কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ২.১৭% অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি গুরুত্ব অনস¦ীকার্য। আমাদের মোট আবাদযোগ্য জামির ২ থেকে ৩ শতাংশ ছাড়া বাকিটুকু বর্তমানে চাষের আওতায় আনা হয়েছে। মোট আবাদি জমির শতকরা প্রায় পাঁচ ভাগের মতো বসতবাড়ির আওতায় রয়েছে। কিন্তু এসব বসতবাড়ির আঙিনার সুষ্ঠু ব্যবহার অধিকাংশ ক্ষেত্রে হচ্ছে না। জমির অপর্যাপ্ততা, ক্ষুদ্র কৃষকের আধিক্য সত্ত্বেও গ্রামের প্রায় প্রত্যেক বসতভিটার এক টুকরা জায়গাকে পরিকল্পিত উপায়ে আবাদের দ্বারা সারা বছরই শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের সর্ববৃহৎ বহুবিধ ফসলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান। দানা, কন্দাল, তেল, ডাল, সবজি, ফল, ফুল, মসলা ইত্যাদি উচ্চফলনশীল জাত এবং এসব জাতের উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবন করে তা কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করছে। ফসলের পরিচর্যা, রোগ ও পোকামাকড়ের দমন ব্যবস্থা, মৃত্তিকা ও সেচ ব্যবস্থাপনা, কৃষি যন্ত্রপাতি, উন্নত ফসল বিন্যাস ও খামার পদ্ধতির উন্নয়ন, জৈব প্রযুক্তি প্রয়োগ করে কাক্ষিত জাত উদ্ভাবন, শস্য সংগ্রহেরও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উদ্ভাবিত প্রযুক্তি আর্থসামাজিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি এ প্রতিষ্ঠানের গবেষণার আওতাভুক্ত। এ প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৪১৭টি উচ্চফলনশীল জাত এবং ৪৪২টি ফসল উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবন করেছে। উদ্যানতত্ত্ব ফসলের ওপর গবেষণা করে শাকসবজি ও ফল উৎপাদনে বিশেষ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সনে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার (স্বর্ণপদক) ১৪১৭ এবং সম্প্রতি গবেষণা ও প্রশিক্ষণের স্বীকৃতিস্বরূপ বেসামরিক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার ২০১৪ লাভ করেছে। বিটি বেগুনের জাত উদ্ভাবন ও চাষ করে বিশ্বের ২৯তম জিএমও ফসল আবাদকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। খাদ্যশস্যে উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছলেও ফল ও শাকসবজি উৎপাদনে আমরা অনেক দূরে। আমাদের দেশে মাথাপিছু শাকসবজি উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫৩ গ্রাম, আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতে উৎপন্ন হয় ১৬৮ গ্রাম অর্থাৎ আমাদের তুলনায় প্রায় ৩ গুণ বেশি। দৈনিক মাথাপিছু ৮৫ ভাগ ফল খাওয়ার সুপারিশ থাকলেও আমরা খেয়ে থাকি ৬০ গ্রাম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অঞ্চলভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে শাকসবজি উৎপাদন মডেল অনুসরণ করে সারা বছর শাকসবজি উৎপাদন সম্ভব। বসতবাড়িতে সবজি ও ফল চাষের মাধ্যমে পরিবারের সব সদস্যের শ্রম উৎপাদন কাজে ব্যবহার এবং মহিলা ও ছেলেমেয়েদের অলস সময় সবজি চাষের কাজে লাগিয়ে পারিবারিক শ্রমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সবজি বিক্রি করে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের সংস্থান করা যায়।

মডেলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
লক্ষ্য
প্রতিটি চাষির বাড়িতে পরিকল্পিত সবজি বাগান তৈরি করে খাদ্য, পুষ্টি ও আয় বৃদ্ধিসহ পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করা।
উদ্দেশ্য
বসতবাড়িতে পরিকল্পিত লাগসই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফলদ, মসলা,  ঔষধি ও সবজির বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পারিবারিক খাদ্য, পুষ্টি ও আয় বৃদ্ধি করা।
পরিবারের সব সদস্যের শ্রম উৎপাদন কাজে লগিয়ে স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে জাতির বেকার সমস্যার সমাধান করা।  বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষমতায়ন করা।
বসতবাড়ির বিদ্যমান সম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা।
বসতবাড়িতে পরিকল্পিত গাছপালা লাগানো ও পরিচর্যার মাধ্যমে ফল-ফলাদির উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

অঞ্চলভিত্তিক সবজি চাষের বিভিন্ন মডেলগুলো
 ক. গয়েশপুর মডেল, পাবনা (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১১, ১২)
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগ কর্তৃক বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের জন্য ‘কালিকাপুর মডেল’ প্রথম উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে খামার পদ্ধতি গবেষণা সাইট, পাবনা জেলার সদর উপজেলার গয়েশপুরে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়ে একটি নতুন বসতবাড়ির মডেল উদ্ভাবন করা হয় যার নামকরণ করা হয় ‘গয়েশপুর মডেল’।

এ মডেলের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো পুরো বসতবাড়িটিতে ব্যবহারযোগ্য শাকসবজি, ফল ও কিছু মসলাজাতীয় ফসল আবাদ করা। এতে যেমন পরিবারের পুষ্টি চাহিদা অনেকাংশে পূরণ হয়, তেমনি বাড়ির গৃহিণী এবং স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা অবসর সময়ে বসতবাড়ির বাগানে কাজ করতে পারে। (মডেল পরের পৃষ্ঠায় দেখুন)।

খ.  সৈয়দপুর মডেল, রংপুর (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-২, ৩ এবং ২৭)
গ্রামীণ মহিলাদের জন্য বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ একটি লাভজনক প্রযুক্তি। সঠিক পদ্ধতিতে নিয়মিতভাবে চাষ করলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া সম্ভব। এর ভিত্তিতে সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, রংপুর খামার পদ্ধতি গবেষণা সাইট, সৈয়দপুরে গবেষণা চালিয়ে বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ মডেল উদ্ভাবন করা হয়।

গ. আটকপালিয়া মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১৭, ১৮)
নোয়াখালী জেলার চরজব্বার এবং চরজুবিলী চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকায় রবি মৌসুমে লবণাক্তার পরিমাণ ২-৮ ডিএস/মি. আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ, চাষির চাহিদা এবং আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন মৌসুমে ১৪টি সবজি নির্বাচন করে সারা বছর বসতবাড়িতে চাষ করা যায়।

ঘ. পালিমা মডেল, টাঙ্গাইল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৮, ৯)
টাঙ্গাইলে অন্যান্য এলাকার তুলনায় বসতবাড়ির আয়তন কম। কারণ এ এলাকার বসতবাড়ির ভিটা অন্য জায়গা থেকে মাটি এনে উঁচু করে তৈরি করা হয় বলে তা আকারে ছোট হয়ে থাকে। পালিমা, টাঙ্গাইলে কয়েক বছর গবেষণা করার সবজি মডেল উদ্ভাবন করা হয়।

ঙ. নারিকেলি মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল- ৯)
জামালপুর জেলার নারিকেলি এলাকায় খামার পদ্ধতি এলাকায় গবেষণা করে সারা বছরব্যাপী শাকসবজি ও ফলমূল চাষের মডেল উদ্ভাবন করা হয় যা বৃহত্তর ময়মনসিংহয়ের অধিকাংশ এলাকার জন্য প্রযোজ্য।

চ. লেবুখালী মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল- ১৩)
পটুয়াখালী এলাকায় অধিকাংশ সময় জমির জোয়ারের পানিতে ডুবে থাবে সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সবজির চাহিদা পূরণ ও পারিবারিক পুষ্টির উন্নয়নকল্পে পটুয়াখালীর লেবুখালীতে এ মডেলটি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

ছ. ঈশান গোপালপুর মডেল, ফরিদপুর (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১১, ১২)
ঈশান গোপালপুর, ফরিদপুর, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ কর্তৃক সবজি মডেল অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর সুপারিশ করা হয়। এ মডেলে উন্মুক্ত জমিতে অনেকগুলো বেড (৭ থেকে ৮) করা হয়। এছাড়া মাচা, ঘরের চাল, অফলা গাছ, ছায়ামুক্ত ও স্যাঁতসেঁতে জায়গা, বাড়ির চারপাশ এর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।

জ. বরেন্দ্র মডেল, রাজশাহী (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৫, ৬ ও ২৬)
বরেন্দ্র অঞ্চলের মুষ্টিমেয় কয়েকটি ধনী পরিবার ছাড়া অধিকাংশই গরিব যাদের বসতি ভিটেমাটি ছাড়া তেমন কোনো ফসলি জমি নেই। তার ওপর মাটির বিরূপ গঠন, খরা, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয় এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের সাথী। এ পরিপ্রেক্ষিতে বরেন্দ্র মডেলটি ব্যবহার করে খরাপ্রবণ এলাকার কৃষকদের সবজির ও পুষ্টির চাহিদা এবং আয় বহুলাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।

ঝ. গোলাপগঞ্জ মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল- ২০)
বৃহত্তর সিলেট দেশের একটি বৃষ্টি বহুল অঞ্চল। এ অঞ্চলে পাহাড়, টিলা, পাহাড়ের পাদভূমি ও সমতল ভূমি রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে সিলেটের গোলাপগঞ্জে উদ্ভবিত এ মডেলের দ্বারা সারা বছরব্যাপী সবজি উৎপাদন সম্ভব হবে।

ঞ. খাগড়াছড়ি মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল- ২৯)
 দেশের মোট আয়তনের এক-দশমাংশ পাহাড়ি এলাকা। সমতল থেকে ভিন্নতর এবং পানির দুষ্প্রাপ্যতা সত্ত্বেও এ এলাকার আবহাওয়া ফলমূল ও শাকসবজি চাষের বেশ উপযোগী। পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, খাগড়াছড়িতে ২০০৯ সন থেকে বেশ কয়েক বছর গবেষণা করে এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়।

বসতবাড়ির অব্যবহৃত রৌদ্রোজ্জ্বল উন্মুক্ত সুনিষ্কাশিত উঁচু জায়গা নিবিড় সবজি চাষ করার উপযোগী। উন্মুক্ত স্থান নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখতে হবে যে বড় কোনো গাছের ডাল এ জায়গার ছায়া সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য ডাল পালা ছেঁটে দিতে হবে। ৫ মিটার দীর্ঘ, ১ মিটার প্রস্থ এবং ৩০ সেমি. দূরত্ব আকারে পাশাপাশি কয়েকটি বেড তৈরি করতে হবে। উন্মুক্ত স্থানের বেডের সবজি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অবশ্যই বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ বেড়ার ভেতরে চারপাশে ২ মিটার অন্তর অন্তর মাদা তৈরি করতে হবে যাতে বর্ষাকালে পানি না জমে। মাদাতে প্রয়োজনীয় সার দিয়ে বীজ বা চারা রোপণ করা যায়। বসতবাড়িতে বিভিন্ন ধরনের ঘর যেমন থাকার ঘর, রান্নাঘর, গোয়াল ঘর ইত্যাদি ঘরের চালাতে সবাজি চাষের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের আশপাশের ফাঁকা জায়গা ও পুকুর পাড় যেখানে পর্যাপ্ত রৌদ্র পড়ে এমন জায়গায় বাঁশ, পাটখড়ি ও জিআই তার দিয়ে মাঁচা তৈরি করা যেতে পারে। বসতবাড়িতে বিদ্যমান বিভিন্ন অফলা গাছ যেমন জিগা, বাবলা, মাদার ইত্যাদি বিভিন্ন সবজির বাউনি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সাধারণত গাছের নিচে বা ঘরের পেছনে যেখানে ভালোভাবে সূর্যের পূর্ণ আলো পৌঁছায় না সেখানে সফলভাবে বিভিন্ন ধরনের ছায়া সহনশীল সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল যেমন- ওল কচু, মৌলভি কচু, মানকচু, আদা, হলুদ ও বহুবর্ষী মরিচ ইত্যাদি উৎপাদন করা যায়। বাড়ির চারদিকে সীমানা বরাবর স্বল্প মেয়াদি ফলের চাষ করা যায়। বাড়ির পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় বড় আকারের সবজি গাছ যেমন- সজিনা, লাইজনা, কাঁচকলা ইত্যাদির চাষ করা যায়। সবজি বাগানে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় ও রোগ বালাইয়ের আক্রমণ দেখা দিলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। জমিতে পর্যাপ্ত পানি সেচ এবং বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী এবং সময়মতো সার ও আগাছা  দমন করা জরুরি। বসতবাড়িতে যদি পর্যাপ্ত জায়গা না তাকে তাহলে সবজি ও ফলের নার্সারি স্থাপন করেও বাড়তি আয়ের সুযোগ থাকে। তবে নার্সারি তৈরির কলাকৌশল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকতে হবে।

বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের সুবিধা
* অল্প পরিমাণ জমিতে অনেক ধরনের সবজি ও ফল আবাদ  করা যায়।
* সবজি আবাদে অপেক্ষাকৃত কম সময় লাগে। একই জমিতে বছরে কয়েকবার সবজি চাষ করা সম্ভব।
* পুষ্টির দিক থেকে প্রায় সব শাকসবজি উন্নত মান সম্পন্ন হয়ে থাকে। ফলে বছরব্যাপী উপযুক্ত পরিমাণ সবজি খেয়ে পুষ্টিহীনতা দূর করা এবং রোগমুক্ত থাকা সম্ভব হয়।
* পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সবজি বিক্রি করে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের সংস্থান করা যায়।
* বসতবাড়ির আঙিনায় পরিবারের মহিলা ও ছেলেমেয়েদের অবসর সময়ে সবজি চাষের কাজে লাগিয়ে পারিবারিক শ্রমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
রহমান এবং অন্যদের (২০০৮) গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, কৃষি গবেষণা কর্তৃক উদ্ভাবিত মডেল অনুসরণের ফলে প্রতি পরিবারে শাকসবজির উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ৫৬% এবং ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পায় ৬৮%। সুপারিশকৃত মাত্রায় (Recommended Dietary Allowance) ভিটামিন-এ, ভিটামিন সি এবং আয়রনের শতভাগ, ক্যালসিয়ামের ৮৭% এবং প্রোটিনের ৪৭% এ মডেল অনুসরণের ফলে পূরণ করা যায়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, বসতবাড়িতে সবজি চাষে মহিলা ও ছেলেমেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায় যথাক্রমে ৩২% থেকে ৪২% এবং ৭% থেকে ১২%। খান এবং তার সহযোগীরা (২০০৯) এক গবেষণায় দেখতে পান, পালিমা মডেল অনুসরণ করার ফলে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের পুষ্টির চাহিদার ৭৩% প্রোটিন, ১১৫% ভিটামিন এ, ১৭৯% ভিটামিন সি, ১২০% ক্যালসিয়াম এবং ১২১% আয়রনের চাহিদা পূরণ করা যায় অর্থাৎ প্রোটিন ছাড়া অন্যান্য পুষ্টির ক্ষেত্রে তা চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত থাকে। ২.৫ শতক জমিতে খরচ বাদে লাভ হয় ১৭২৯ টাকা এবং আয় ব্যয়ের অনুপাত ২.৭ যা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পুরুষরা জমি তৈরি, রোপণ, জাবড়া প্রয়োগ, বেড়া দেয়া, বাজারজাতকরণ ইত্যাদি এবং মহিলারা সেচ, আগাছা দমন, বালাইদমন, ফসল সংগ্রহ ইত্যাদিতে বেশি অংশগ্রহণ করে থাকে। বাড়ির ছেলেমেয়েরাও তাদের অভিভাবকদের কাজে সহায়তা প্রদান করে থাকে। আসাদুজ্জামান এবং তার সহযোগীরা (২০১১) ও তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে অনুরূপ ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে সবজি চাষ অপেক্ষা উন্নত পদ্ধতিতে সবজি চাষে পরিবারে ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিকভাবে ও লাভবান হওয়া যায়। এ পদ্ধতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মনোন্নয়নে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় সুলভ প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

এ প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে উন্নত জাতের বীজ ও চারা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পানি  সেচের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষাণ ও কৃষাণি উভয়কেই সবজি উৎপাদন কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বসতবাড়িতে সবজি চাষ পারিবারিক খামারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এ বাগান থেকে ৪ থেকে ৫ সদস্যের পরিবারের পুষ্টি উপাদান সরবরাহে অনেকাংশে মেটানো সম্ভব। দরিদ্র কৃষকদের উদ্বৃত্ত সবজি বিক্রি করে কিছু বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা থাকে। আত্মীয়স¦জন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের উপহার দেয়ার ফলে সামাজিক সৌহার্দ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের বর্ধিষ্ণু জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্যবিমোচন, আয়বৃদ্ধি তথা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বসতবাড়িতে সবজি চাষের গুরুত্ব অপরিসীম। তদুপরি এসব মডেল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ কর্মসূচির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেও কাজ করে আসছে। জাতিসংঘ ঘোষিত পারিবারিক কৃষি বছর ২০১৪ এর একটি মডেল হিসেবে খাদ্য নিরাপত্তাসহ পারিবারিক আয় নিশ্চিন্তে কাজের সহায়ক হবে।

ড. মো. রফিকুল ইসলাম মণ্ডল*
ড. মো. কামরুল হাসান**
* মহাপরিচালক, **এসএসও, জীব প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

Share with :

Facebook Facebook