কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পারিবারিক খামার : পরিবেশসম্মত খাদ্য জোগান ও সমৃদ্ধির মূল সোপান

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২০১৪ সনকে পারিবারিক খামার বছর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। সে প্রেক্ষিতে এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘পারিবারিক কৃষি : প্রকৃতির সুরক্ষা, সবার জন্য খাদ্য’। পারিবারিক খামার থেকে একটি পরিবার তার প্রয়োজনে নিজের সম্পদ সুযোগ-সুবিধাগুলোকে কাজে লাগিয়ে পরিবারের প্রয়োজন আর চাহিদা মাফিক খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করে। এর সঙ্গে উদ্বৃত্ত অংশ পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনকে বিলিয়ে দেয়া আর অতিরিক্ত অংশকে বাজারে বিক্রি করে দু’পয়সা আয় করে। এভাবে তৃতীয় বিশ্ব আর উন্নয়নশীল দেশের খামারিরা তাদের খাদ্যের জোগান মোটামুটি নিশ্চিত করে। পারিবারিক খামারে দানাদার, অর্থকরী, তেল, ডাল, শাকসবজি, ফলমূল, মসলা, ঔষধি, বাহারি সব ধরনের উৎপাদনের জোগানকেই বুঝায়। সঙ্গে মাছ, গবাদিপশু-পাখিতো আছেই। কৃষকরা মাঠের জমিতে ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, তেল, ফসল, মশলা আবাদ করে, পারিবারিক বাগানে শাকসবজি, ফলমূল ভেষজ, মসলা আবাদ করে, মাছ চাষ করে, গবাদিপশু পালন করে, ফসল তোলে প্রক্রিয়াজাত করে চলমান প্রয়োজন মেটায় আর অতিরিক্ত অংশ সংরক্ষণ করে রেখে দেয় সুখময় আগামীর জন্য। এভাবেই তারা পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এদের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী কেউ খুব ভালো থাকে কেউ মোটামুটি ভালো আর কেউ নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন অবস্থায় বিরাজ করছে। তবুও তাদের জীবন গতিময় থাকে কেটে যায় যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে। এটা ঠিক কৃষি উৎপাদন আর উন্নয়নের মহানায়ক অধিকাংশ কৃষক গরিব, ক্ষুদ্র, মাঝারি, নিম্নবিত্ত বলে তাদের প্রয়োজনটা সুষ্ঠু পরিকল্পনার সঙ্গে কিংবা আরও বিশুদ্ধভাবে যদি বলি আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে ততটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সব কাজে আমাদের মনে রাখতে হবে জমির মালিকরা কৃষক না, আবার যারা কৃষক তাদের জমি নেই। সেকথা ভেবে আমাদের পরিকল্পনা করে এগিয়ে যেতে হবে।

ঘরের পাশে কিংবা বাড়ির পাশে পতিত জায়গায় বা এজমালি পতিত জায়গার বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে খাওয়া, ঘরের চালে আঙিনায় বারো মাসে কোনো না কোনো শাকসবজি আবাদ তাদের নিত্য বহমান প্রতিচ্ছবি। এখান থেকেই তাদের খাদ্য পুষ্টি আসে দিনের পর দিন। প্রয়োজন এদের বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক কৌশল শিক্ষা দেয়া এবং এগুলোকে তাদের কাজ কর্মের অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করা। প্রাসঙ্গিকভাবেই খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্যের কথা বিশেষভাবে বলা দরকার। আমরা প্রায় সবাই খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে হাজারো কথা বলি, পরামর্শ দেই ও পরিকল্পনা কর্মসূচি গ্রহণ করি। কিন্তু ভাবি কী হাজার মেট্রিক টন খাদ্য যদি উৎপাদিত হয় এবং সেগুলো যদি নিরাপদ না হয়, বিষাক্ত বা কাক্সিক্ষত মানের না হয় তাহলো এসব লাখ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য আমাদের কী কাজে লাগবে? সুতরাং খাদ্য নিরাপত্তার কথা বললে আমরা যেন সর্বপ্রথম আবশ্যকীয়ভাবে নিরাপদ খাদ্যের কথা ভাবি এবং সেভাবে কাজ করি। আর জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে খাদ্য নিরাপত্তার কথা নিশ্চিত করাতে পারলে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা এমনিতেই চলে আসবে। পারিবারিক কৃষি খামার পরিবার এবং ছোটখাটো কৃষি খামার বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত; কৃষি খামার প্রচলিত খাদ্য উৎপাদনকে সংরক্ষণ করে যেটা সুষম খাদ্য খেতে বা পেতে দারুণ সহায়তা করে; এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে পারিবারিক কৃষি খামার স্থানীয় কৃষি, কমিউনিটি বা আর্থসামাজিক নীতি প্রশাসন আর উন্নয়ন সমৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

পারিবারিক খামারকে এবার বিশ্ব খাদ্য দিবসে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কারণ অবারিত প্রাকৃতিক সম্পদকে যুক্তিযুক্তভাবে ব্যবহার করে বিশ্ব ক্ষুধা আর দারিদ্র্যকে দূর করে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিকে নিশ্চিত করে জীবন যাত্রার মানকে কাক্সিক্ষত সীমানার কাছাকাছি পৌঁছে দেয়ার জন্য। পারিবারিক কৃষি মানে পরিবারভিত্তিক কার্যক্রম এবং এটি গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পারিবারিক কৃষি মানে মাঠের কৃষি, কৃষি বনায়ন, মৎস্য, গোচারণ ভূমি, গবাদিপশু লালন পালন এসব। আর এগুলো পরিবারের পুরুষ মহিলা সব সদস্য মিলে সম্মিলিত শ্রম বিনিয়োগ করে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো পারিবারিক কৃষি কাজ উৎপাদন ও সমৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তবে পারিবারিক কৃষির মাহাত্ম্য আর অবদান যাই থাক না কেন এর সঙ্গে জাতীয় অনেক কিছুর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে আছে জাতীয় কৃষি পরিবেশ অবস্থা, ভূ-প্রকৃতি, ভৌগলিক অবস্থান, রাষ্ট্রীয় নীতি, বাজার নীতি, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, তথ্যপ্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার, সম্প্রসারণ কর্মকা-, জনসংখ্যা, আর্থসামজিক অবস্থা, শিক্ষা এসব। এগুলো যে দেশের যত সুন্দর সুষ্ঠু আর সমৃদ্ধ সেদেশের পারিবারিক কৃষিও তত উন্নত ও সমৃদ্ধ।

প্রায় দেড় লাখ বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশের জনসংখ্যা দেড় লাখ মিলিয়নের বেশি যা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অষ্টম দেশ হিসেবে স্বীকৃত। এদেশে প্রায় দেড় শতাংশ হারে জনসংখ্যা বেড়ে প্রতি বছর মোট জনসংখ্যার সঙ্গে যোগ হচ্ছে প্রায় ২ মিলিয়ন মানব শিশু। জনসংখ্যা আগামী ২০৩০ সনে তা দাঁড়াবে প্রায় ২০০ মিলিয়ন। মোট জনসংখ্যা শতকরা ৩২ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, যার অর্ধেক চরম দারিদ্র্য, পুুষ্টিহীনতা এবং খাদ্য নিরাপত্তার শিকার। অর্ধেকের চেয়ে একটু কম ভাগ শিশু বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম বা খর্বাকৃতি, আমাদের আদুরে শিশুরা উচ্চতার তুলনায় রুগ্ণ ও বয়সের তুলায় কম ওজনের। প্রায় ৫ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার। শুধু ভিটামিন ‘এ’র অভাবে দেশে প্রতি বছর ৩০ হাজারেরও বেশি শিশু অন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং কয়েক লাখ লোক রাতকানা রোগে ভুগছে। বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অভাবে রক্তশূন্যতা, মুখের ঘা, দাঁতের রক্ত পড়া, বেরিবেরি, গলগ- রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পরিবেশ আর প্রকৃতিগতভাবে আমাদের খাদ্য তালিকায় বেশি স্থানজুড়ে আছে দানাদার খাদ্যশস্য। প্রতিদিন একজন মানুষের ২২০ গ্রাম শাকসবজি খাওয়া প্রয়োজন হলেও আমরা খাই মাত্র ৮০ গ্রাম অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। প্রয়োজনীয় পরিমাণ শাকসবজি না খাওয়ার কারণে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ চরম পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এবং এর নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

জনবহুল কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৯০ লাখ হেক্টরের সামান্য বেশি হলেও বিভিন্ন কারণে বছরে প্রায় দেড় ভাগ হারে কমে যাচ্ছে। জনসংখ্যার বাড় বাড়তি, কৃষি জমি নতুন বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, কলকারখানা নির্মাণ মানে অকৃষি কাজে ব্যবহার হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়তই বাংলাদেশের বনজসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে এবং সে সঙ্গে কমে যাচ্ছে বনভূমির পরিমাণ। পরিবেশবিদদের মতে জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য যতটুকু বন থাকা দরকার আমাদের তা নেই। বনভূমির পরিমাণ এর কম হলে আবহাওয়া, জলবায়ু, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য বিঘিœত হয়। সে কারণে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঝড়, আইলা, সিডর, শেফালি, নার্গিস, মহাসেনের মতো প্রাকৃতি দুর্যোগ, সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি বেড়ে যাওয়া, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতা দেখা দিচ্ছে। কৃষি বনায়ন আর খাদ্য উৎপাদনকে সমন্বয় করতে পারলে আমরা আরও বেশি ভালো থাকব।

বর্তমান বিশ্বে হতদরিদ্র বেশির ভাগ কৃষক যা ৮০% গ্রামে বসবাস করে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার গ্রামে ৭৩% বাস করে। গ্রামীণ জনসংখ্যার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষকের হার শতকরা ৮০ ভাগ। জিডিপিতে কৃষির আবদান ১৯% এর মতো। প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ এর একটু বেশি আর কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ২.১৭% অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের মোট আবাদযোগ্য জমির সিংগভাগ বর্তমানে চাষের আওতায় এসেছে। মোট আবাদি জমির ৫% বসতবাড়ির আওতায় থাকলেও এসব বসতবাড়ির আঙিনার সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না। দানাদার শস্য উৎপাদনে আমরা স্বয়ংভরতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছলেও ফল ও শাকসবজি উৎপাদনে আমরা এখনও অনেক দূরে। আমাদের দেশে মাথাপিছু শাকসবজি উৎপাদন হচ্ছে মাত্র অর্ধশত গ্রাম, আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতে উৎপন্ন হয় আমাদের ৩ গুণ। দৈনিক মাথাপিছু ৮৫ ভাগ ফল খাওয়ার সুপারিশ থাকলেও আমরা খাচ্ছি তার অর্ধেক। কৃষি গবেষণার শাকসবজি উৎপাদন মডেল অনুসরণ করে সারা বছর শাকসবজি উৎপাদন সম্ভব। বসতবাড়িতে সবজি ও ফল চাষের মাধ্যমে পরিবারের সব সদস্যের উৎপাদনে কাজে লাগিয়ে পারিবারিক শ্রমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সবজি বিক্রি করে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের সংস্থান করা যায়।

বসতবাড়ির আশপাশের অব্যবহৃত খোলা রৌদ্রোজ্জ্বল সুনিষ্কাশিত উঁচু জায়গা নিবিড়ভাবে অনেক ফসলের চাষ করা যায়। স্থান নির্বাচন করে উপযোগী নকশা করে পাশাপাশি কয়েকটি বেড-মাদা তৈরি করে রকমারি ফসল আবাদ করা যায়। খামারের ফসল পশুপাখি থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করতে হবে। জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বয়ে সুষম সার ব্যবহার করে বীজ বপন-চারা রোপণ করতে হবে। থাকার ঘর, রান্নাঘর, গোয়াল ঘরের চালাকে সবাজি চাষের জন্য ব্যবহার করা যায়। ঘরের আশপাশের ফাঁকা জায়গা ও পুকুর পাড় যেখানে পর্যাপ্ত রোদ পড়ে এমন জায়গায় বাঁশ, পাটখড়ি ও জিআই তার দিয়ে মাঁচা তৈরি করে কিংবা বসতবাড়িতে থাকা জিগা, বাবলা, মাদার সবজির বাউনি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সাধারণত গাছের নিচে বা ঘরের পেছনে যেখানে ভালোভাবে সূর্যের আলো পড়ে না সেখানে বিভিন্ন ধরনের ছায়াসহনশীল সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল উৎপাদন করা যায়। বাড়ির চারদিকে সীমানায় স্বল্পমেয়াদি দ্রুত বাড়ে এমন ফলের চাষ করা যায়। বাড়ির পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় বড় বহুবর্ষজীবী সবজি চাষ করা যায়। পারিবারিক খামারে বালাইয়ের আক্রমণ হলে জৈব ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। গাছের উৎপাদন কৌশলে প্রয়োজন অনুযায়ী এবং সময়মতো সব ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত রাখতে হবে। তাছাড়া বাড়তি সুবিধা নিয়ে সবজি ও ফলের নার্সারি স্থাপন করা যায়।

পারিবারিক খামারে পরিবারের চাহিদা অনুসারে বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ; অপেক্ষাকৃত কম সময়ে চাষ; বছরে কয়েকবার সবজি চাষ; পুষ্টির দিক থেকে উন্নত মানের শাকসবজি হয়; বছরব্যাপী অনুমোদিত পরিমাণ সবজি খেয়ে পুষ্টিহীনতা দূর করে রোগমুক্ত থাকা; পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সবজি বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সংস্থান করা; পরিবারের সব সদস্যদের অবসর সময়ে সবজি চাষের কাজে লাগিয়ে পারিবারিক শ্রমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এক্ষেত্রে শুধু প্রয়োজন পরিবেশসম্মত একটা সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন। চলমান ধারায় আমাদের প্রতি পরিবারে শাকসবজির উৎপাদন বেড়েছে অর্ধ শতকের বেশি এবং ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বেড়েছে প্রায় ৭০ ভাগের মতো। পুষ্টি সুপারিশ মাত্রায় ভিটামিন-এ, সি এবং আয়রনের শত ভাগ, ক্যালসিয়ামের ৮৭% এবং প্রোটিনের ৪৭% অনায়াসে পূরণ করা যায় গবেষণা পরীক্ষিত মডেল অনুসরণ করে। পরিবারের সদস্যরা মিলে জমি তৈরি, রোপণ, জাবড়া প্রয়োগ, বেড়া দেয়া, সেচ, আগাছা দমন, বালাইদমন, বাজারজাতকরণ, ফসল সংগ্রহ কার্যক্রমে লিপ্ত থাকে। উন্নত পদ্ধতিতে সবজি চাষে পরিবারে ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বাড়ে এবং অর্থনৈতিকভাবে ও লাভবান হওয়া যায়।

খামারভিত্তিক কার্যক্রমে প্যাকেজ প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে উন্নত জাতের মানসম্মত বীজ-চারা ব্যবহার, সময় মতো বপন রোপণ, সেচ ব্যবস্থাপনা, বালাই ব্যবস্থাপনা, আন্তঃপরিচর্যা, কর্তন উত্তর কৌশল এসবই বিজ্ঞানসম্মতভাবে লাগসই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে করতে হবে। একটি পারিবারিক বাগান থেকে ৪ থেকে ৫ সদস্যে বিশিষ্ট পরিবারের বছরের পুষ্টি উপাদান সরবরাহে অনেকাংশে মেটানো সম্ভব। খামারিদের উদ্বৃত্ত সবজি বিক্রি করে কিছু বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা থাকে। আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের বিতরণের ফলে সামাজিক সৌহার্দ সম্প্রীতি বাড়ে। বাংলাদেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্যবিমোচন, আয় বাড়া, জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বসতবাড়িতে সবজি চাষের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি বাড়ি একটি খামার কর্মসূচি বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০১৪ এর এবারের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বেশ মিল রয়েছে। পারিবারিক খামার ব্যবস্থাপনায় কৃষি বনায়ন পুরনো ধারণা হলেও নতুনভাবে কাজে লাগানো যায় সুন্দরভাবে। কৃষি বনায়ন এমন একটি টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা যা ভূমির সার্বিক উৎপাদন বাড়ায়; পর্যায়ক্রমিকভাবে কৃষিজাত ফসল, বৃক্ষজাত ফসল ও বনজ উদ্ভিদ অথবা পশুপাখিকে একত্রিত-সমন্বিত করে এবং সেসব পরিচর্যা পদ্ধতি অবলম্বন করে যা নির্দিষ্ট এলাকার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ধ্যান-ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার কৃষি বনায়ন হচ্ছে একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি যেখানে বৃক্ষ, ফসল এবং পশুপাখিকে এমনভাবে সমন্বয়-একত্রিত করা হয় যেটা বৈজ্ঞানিকভাবে নিখুঁত হয়, পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, ব্যবহারিক দিক থেকে সম্ভাব্য হয় এবং সামাজিক দিক থেকে কৃষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।

কৃষি বনায়ন ১. বৃক্ষ ও অন্যান্য বহু বর্ষজীবী কাষ্ঠল উদ্ভিদ; ২. মৌসুমি অথবা একবর্ষজীবী কৃষিজাত উদ্ভিদ-ফসল; ৩. পশুপাখি ও মৎস্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠে। এসব উপাদানের সমন্বয়ে পারিবারিক কৃষি বনায়ন ধারা গড়ে উঠতে পারে। কৃষি বনায়নে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়; একই জমি থেকে একই সঙ্গে ফসল, শাকসবজি, পশুখাদ্য, জৈবসার, কাঠ, ফল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ উৎপাদন সম্ভব; মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণ উন্নত হয়; একক চাষাবাদের শস্যহানির ঝুঁকি কমে যায়; ফসল, বৃক্ষ, পশুপাখি ও মাছের সমন্বয়ে পরস্পর উপকৃত হয়; প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে; বেকারত্ব দূর হয়ে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়; বসতবাড়ির প্রাকৃতিক দৃশ্য সুন্দর হয় এবং পরিবেশ উন্নত হয়। আবার অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ ও ফসল এক সঙ্গে চাষাবাদ করলে স্থান, সূর্যরশ্মি, পানি ও পুষ্টি নিয়ে প্রতিযোগিতা বেড়ে ফলন কম হয়। তাই বিবেচনায় এনে বৃক্ষ ও ফসল নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে এটাই কৃষি বনায়নে জনগণের সুখ সমৃদ্ধির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

পারিবারিক কৃষি বনায়নে বসতবাড়ির খামারে বনজ বৃক্ষ, ফলদ বৃক্ষ, শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ, অন্যান্য উদ্ভিদ, বৃক্ষ ফসল, উদ্ভিদ ফসল, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ এসবের সমন্বয়ে সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠে। পারিবারিক খামারের কৃষি বনায়নে পরিবারের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার প্রতিশ্রুতি থাকে। সাধারণত ক্ষুদ্র ও দরিদ্র বা স্বল্প সামর্থ্য যুক্ত পরিবারগুলো পারিবারিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ধারা হতে বেশি উপকৃত হতে পারে। পারিবারিক খামারে কৃষি বনায়নের অস্তিত্ব থাকলেও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে তা থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। পরিকল্পনা মাফিক পারিবারিক খামারে কৃষি বনায়নের মাধ্যমে একটি পরিবারের সার্বিক চাহিদা মেটানো সম্ভব। পারিবারিক খামারে সুষ্ঠু পরিকল্পনা,  খামারের নকশা, জীবন্ত বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রয়োজনীয় সব ধরনের ফসল নির্বাচন করে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত আবাদ বৃক্ষরোপণ; পুকুরে মাছ চাষ, আঙিনায় সমন্বিত সব ধরনের গবাদিপশু ও পাখি পালন যথাযথ যত্ন-আত্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবেই পরিবেশসম্মত ফলন পাব নামে ও দামে।

এদেশের অধিকাংশ জনগণই অত্যন্ত গরিব, অনেকের শুধু বসতবাড়ি ছাড়া আর কোনো কৃষি জমি নেই। অথচ গ্রামাঞ্চলে বসতবাড়িগুলো সনাতন পারিবারিক খামার ব্যবস্থাপনার বিশেষ ধারার বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাচীন উদাহরণ।  আামদের গ্রামীণ জনগণ বহুকাল থেকেই একই আঙিনায় নিজেরা বসবাস করা ছাড়াও শাকসবজি চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, ফলদ, বনজ এবং শোভাবর্ধনকারী গাছপালা একই সঙ্গে উৎপাদন করে আসছেন। বাংলাদেশে বসতবাড়ির বাগান থেকেই অধিকাংশ ফল, কাঠ, জ্বালানি, পশুখাদ্য উৎপাদন ও সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে গৃহস্থালি জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান বসতবাড়ি এবং পাশের জমি থেকেই আসে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনা ভালো হলে কাক্সিক্ষত উৎপাদন ফলন আসবে অনায়াসেই। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ বসতবাড়ি এখন প্রয়োজনের তুলনায় কম ব্যবহৃত। ভৌত অবস্থান, কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা সম্পদভিত্তিক বিবেচনায় রেখে কৃষি বনায়ন তথা একটি সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, বর্তমানে পুরো বিশ্বে ৮৪২ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করছে। আবার অনেক মানুষ সংস্থা এ বিশ্ব ক্ষুধা নিবারণের জন্য সর্বোতভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। পৃথিবীতে ৫১৭ মিলিয়ন পরিবারের মধ্যে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন কৃষি পরিবার আছে যা পুরো কৃষির ৯৮% ভুবনকে প্রতিনিধিত্ব করে। তারা পৃথিবীর ৫৬% জমি থেকে ৫৬% কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করছে। একথা ঠিক পারিবারিক কৃষি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। পরিবারের বা কৃষি খামারের প্রধান তার বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে অনেক সতর্ক সহনশীলতা আর যত্নের সঙ্গে তার সীমিত সম্পদ জমিজমা পুঁজিকে সম্বল করে এগিয়ে যায় প্রথমত পরিবারের আবশ্যকীয় প্রয়োজনীয়তাকে মেটানোর জন্য। আর বাড়তি আয়ের অংশ সে তো সৌভাগ্যের প্রসূতি।

এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে যুগে যুগে দেশে পারিবারিক কৃষি খামার পুরো বিশ্বের সুষম খাবারের জোগান, কৃষি জীববৈচিত্র্যতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়িত্বশীল অবস্থায় বিরাট ভূমিকা রেখে চলছে। শুধু তাই নয় পারিবারিক কৃষি বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের কৃষি অর্থনীতিকে শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ করে। তারা তাদের সীমিত পুরনো প্রচলিত জ্ঞান অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যতটুকু পারে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এখানেই প্রশ্ন এসে হাজির হয় আমরা কী তাদের এসব প্রচলিত ধ্যান ধারণা আর জ্ঞান অভিজ্ঞতাকে আরও শানিত করে আধুনিক করতে পারি না? যা আমাদের কৃষিভিত্তিক পারিবারিক কৃষি খামার বা ব্যবস্থাপনাকে সমৃদ্ধ করে পুরো অর্থনীতি আর সামাজিক জীবনযাত্রার মানকে সুসমৃদ্ধ করবে। পারিবারিক খামার ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে অসম্মান করে কোনো দেশের অর্থনীতি দাঁড়াতে পারবে না। বরং আসল কাজ হলো কীভাবে এ চলমান কার্যক্রম আর কর্মসূচিকে আরও আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত করে খরচ সাশ্রয়ী করে পরিবেশসম্মতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে অনেক দূরের বাতিঘরে। ভুলে গেলে চলবে না আমাদের অগণিত কৃষি খামার শ্রমিক আর কৃষক-কিষাণিদের কথা। তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বস্ত্র, সেফটি, সঞ্চয় বীমা এগুলোকে যত দিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সম্মান মর্যাদা দিয়ে আগলে রাখা না যাবে ততদিন কোনো ধরনের দৈন্যতা কমবে না, শেষ হবে না। আমাদের মূল আয়োজন আর সমৃদ্ধির উৎসকে আন্তরিকতা পরম ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তবেই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত মনজিলে মকসুদে পৌঁছতে পারব অনায়াসে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২০১৪কে পারিবারিক কৃষি বছর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘোষণায় খাদ্য নিরাপত্তাসহ পারিবারিক আয় নিশ্চিতে অনেকটুকু সহায়ক হবে। এবারে আমাদের প্রতিশ্রুতি হোক আমাদের সার্বিক প্রচেষ্টা হোক পারিবারিক খামারে আমরা বিনিয়োগ করব আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করব, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সব কাজ করব, জৈব কৃষিকে প্রাধান্য দিয়ে সবুজ সতেজ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করব এবং নিজেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নিবেদিত থাকব, চাহিদা প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে সার্বিকতাকে নিশ্চিত করব। তখন আমাদের ক্ষুধা মিটবে, পুষ্টি আসবে, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে পরিবেশসম্মতভাবে সুনির্মল পৃথিবীতে বেঁচে থাকব আমাদের মতো করে। সুপরিকল্পিত পরিবেশবান্ধব সমন্বিত বা পারিবারিক কৃষি খামার আমাদের জীবনে নতুন আশা আর সফলতার সুবাতাস বয়ে আনবে। আমরাও সুখ সমৃদ্ধির মায়াজালে জড়িয়ে গিয়ে আত্মতৃপ্তির সঙ্গে বলব সার্থক জনম মাগো জন্মেছি এ দেশ।
 
কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম
* উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

Share with :

Facebook Facebook