কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পারিবারিক পুষ্টির জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য অপরিহার্য

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে খাদ্যের গুরুত্ব সর্বাধিক। খাদ্য আমাদের ক্ষুধা  নিবৃত্তি, পুষ্টিসাধন ও স্বাস্থ্য রক্ষা করে। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রকৃতির পরিচর্যা এবং সবার জন্য খাদ্য’। এ দেশে প্রত্যেকটি পরিবারে শিশু, কিশোর, গর্ভবতী-স্তন্যদানকারী মা ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ বাস করে। তাদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণে সুষম খাদ্যের প্রয়োজন হয়। পরিবারের পুরুষরা উপার্জনের জন্য বাড়ির বাহিরে বিভিন্ন কাজ করেন এবং মহিলারা সবার জন্য খাদ্য তৈরি ও সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। গ্রামীণ মহিলাদের বাড়ির বাইরে উপার্জনের সুযোগ খুব কম। তাই পারিবারিক পুষ্টি উন্নয়নের জন্য মহিলারা সাংসারিক কাজের ফাঁকে পুরুষদের পাশাপাশি বাড়ির আশপাশে সবজি-ফল বাগান ও হাঁস-মুরগি পালন করে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এতে পারিবারিক পুষ্টির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বাড়বে, সারা বছর পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনের ফলে পরিবারের সদস্যদের ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন এবং অন্যান্য খাদ্য উপাদানের চাহিদা পূরণ হবে ও পারিবারিক আয় বৃদ্ধি  পাবে। তাদের উৎপাদনের বাড়তি অংশ বিক্রি করে পরিবারের জন্য প্রধানতম খাদ্য সংগ্রহ করতে পারবে। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এ দেশের মানুষের পুষ্টির জন্য যেসব খাদ্য উৎপাদন করা হয় তার সবটাই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত এবং বাজারজাতের ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করার কারণে বিষমুক্ত ও ভেজালমুক্ত খাদ্য সহজলভ্য করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে সর্বোচ্চ পরিমাণে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন এবং খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহƒত হয়। প্রায় ৭৫% ভাগ খাদ্য উৎপাদনের সময় মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক এবং মাত্র ২৫% ভাগ খাদ্য সংরক্ষণ, বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ফরমালিন ও অন্যান্য বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয়। ধান, শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য ফসলের পোকা-রোগ দমনে মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক এবং কাঁচা ফল পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোপেন ও রাইপেন ব্যবহার হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সবজি-ফল মাঠে থাকা অবস্থায় পোকা-রোগ দমনে মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক, সংগ্রহোত্তর পাকার জন্য কার্বাইড এবং পচনরোধের জন্য ফরমালিন ব্যবহারের কারণে এসব ফসল বিষটোপে পরিণত হয়। তাই এগুলো খাওয়ার সঙ্গে কিছু পরিমাণ বিষ খাওয়া হয়। জৈব কৃষিকে অবহেলা করে রাসায়নিক কৃষির ওপর অধিক জোর দেয়ার কারণে খাদ্যের বিষাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাসায়নিক পদ্ধতিতে ফসল চাষের সময় কৃষকের অজ্ঞতার কারণে মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে খাদ্যের মধ্যে কিছু বিষাক্ত পদার্থ থেকে যায় যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আমরা অধিকাংশ ফল টাটকা এবং কিছু সবজি কাঁচা অবস্থায় সালাদ হিসেবে ও সব ধরনের শাকসবজি অল্প আঁচে রান্না করে খাই। এ কারণে বালাইনাশক প্রভাবের ঝুঁকি অনেক বেশি। অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের কারণে মাটিদূষণ, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ ও খাদ্যদূষণ হচ্ছে। এছাড়াও মাটির  অভ্যন্তরের অনুজীবের কার্যাবলি লোপ পাচ্ছে। উপকারী  পোকামাকড়, কেঁচো, ব্যাঙ, গুইসাপসহ নানা ধরনের জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। এতে কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের কারণে স্বল্পস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বল্পস্থায়ী প্রভাবে শ্বাসকষ্ট, অরুচি, বমিভাব, মাথাধরা ও শরীর দুর্বল ইত্যাদি লক্ষণ এবং মাস বা বছর পরে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে চর্ম রোগ, বন্ধ্যাত্ব, জন্মগত ত্রুটি, স্নায়ু-বৈকল্য, ক্লোন রেক্টাল, কিডনিজনিত সমস্যা, প্রস্টেট, যকৃত, ফুসফুস ও পাকস্থলী ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দিচ্ছে। পরিবারের শিশু ও ছোট ছেলেমেয়েরা এতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ফসলে ব্যবহারের জন্য স্বল্পস্থায়ী, মধ্যস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের বিভিন্ন গ্রুপের বালাইনাশক রয়েছে। এগুলো ফসলের ধরন, জীবনকাল ও পারিপার্শি¦ক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকদের বালাইনাশক এবং এর বিষক্রিয়া প্রভাব সম্পর্কে ভালো ধারণা না থাকার কারণে তারা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কীটনাশকগুলো এলোপাতাড়িভাবে শাকসবজি ও ফলে স্প্রে করে যা ঠিক নয়। তারা প্রয়োজনের তুলনায় ততধিকবার অর্থাৎ ১০ থেকে ১৫ বার স্প্রে করে। অনেক সময় দেখা যায়, স্প্রে করার কয়েক ঘণ্টা পর বাজারে বিক্রয় করে। এসব কারণে খাদ্য বিষাক্ত হয়। ভোক্তারা না জেনে এসব বিষাক্ত পণ্য ক্রয় করে এবং খাওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়। কৃষকের অসচেতনতা ও অজ্ঞতার খেসারত ভোক্তাকে দিতে হয়। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে এর অপব্যবহার রোধ করা হয়তোবা সম্ভব হবে। কিন্তু ফসলে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার রোধের উপায় কী? এ বিষয়ে সবার চিন্তাভাবনা করা উচিত। প্রতি বছর ফসলে ব্যবহারের জন্য প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন কীটনাশক আমদানি করা হয়। এ বিশাল পরিমাণ কীটনাশক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উৎপাদিত চালের মান নিয়ে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির একটি গবেষণা প্রতিবেদন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি জার্নালে প্রকাশ পেয়েছে। এ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের চালের মধ্যে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যান্ত ক্ষতিকর ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি অতিমাত্রায় রয়েছে। এ বিষাক্ত রাসায়নিক ক্যাডমিয়াম মানুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অর্গান যেমন- কিডনি, লিভার ও ফুসফুসের ক্ষতি করে। বাংলাদেশের চাল ছাড়াও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্যের মধ্যেও ক্যাডমিয়ামসহ অন্যান্য উপাদান রয়েছে যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। প্রতি বছর প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ টন ফরমালিন আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০০ টন ফরমালিন বিভিন্ন রাসায়নিক কারখানা, ট্যানারি, প্লাস্টিক, ফরমিকা শিল্প, হাসপাতাল ও পরীক্ষাগারে এবং অবশিষ্ট প্রায় ১৮০ টন খাদ্যসামগ্রীর পচনরোধে ব্যবহৃত হয়। ফরমালিন ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করার কারণে অমদানি অনেকটা কমেছে। বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন, খাদ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য সহজলভ্য করার বিষয় সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো-  

ক. জৈব ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন
১. জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার : জৈব সার তৈরির জন্য বাড়ির পাশে একাধিক গর্ত তৈরি করে রৌদ্র ও বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষার জন্য উপরে চালা দিতে হবে। এসব গর্তে গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, ছাই, লতাপাতা, সবুজ সার, কচুরিপানা, ফসলের উচ্ছিষ্টাংশ, রান্নাঘরের আবর্জনা ইত্যাদি স্তরে স্তরে জমা করে ভালোভাবে পচাতে হবে। তারপর ফসলের জমি তৈরির সময় জৈব সারগুলো ভালোভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রোগবালাই মুক্ত উন্নতমানের বীজ-চারা সারিবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট দূরত্বে লাগাতে হবে। শোধনকৃত বীজ ও নিঃরোগ, সুস্থ-সবল চারা লাগাতে হবে। সাধারণ জৈব সারের পাশাপাশি ভার্মি কম্পোস্ট ও  ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহার করে ফসলের ফলন আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। বিশেষ প্রজাতির লাল রঙের কেঁচোকে বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে গোবর-জৈব বর্জ্যরে মধ্যে লালন পালন করে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করা যায়। কেঁচোগুলো গোবর-বর্জ্য থেকে খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে বেঁচে থাকে এবং অল্প সময়ে বংশ বিস্তার ও প্রচুর মল ত্যাগ করে। কেঁচোর এ মলগুলোই মূলত ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো কম্পোস্ট। ট্রাইকো কম্পোস্ট এক ধরনের অনুজীব দ্বারা বিশেষ প্রক্রিয়ায় গোবর পচিয়ে তৈরি করা যায়। এ অনুজীবগুলো গোবর থেকে খাদ্য গ্রহণ ও পচনক্রিয়ার মাধ্যমে কম্পোস্ট তৈরি করে। অধিক হারে জৈব সার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সার কম লাগে, মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে ও ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়।

২. ফসলের পোকামাকড় দমন : প্রথম গভীর চাষের মাধ্যমে জমির মাটি উলট-পালট করে ভেতরের পোকামাকড় ও রোগ জীবাণু ধ্বংসের জন্য কয়েক দিন রৌদ্রে শুকিয়ে অথবা সম্ভব হলে খড়-কুটা দ্বারা আগুন জ্বালিয়ে শোধন করতে হবে। আধুনিক পদ্ধতিতে বালাই সহনশীল জাতের ফসল চাষাবাদ করতে হবে। পোকামাকড়ের আশ্রয়স্থল ধবংসের জন্য ফসলের মাঠ-বাগানের ভেতর ও চারপাশের অবাঞ্ছিত আগাছা, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। পোকা আক্রান্ত পাতা, শাখা-প্রশাখা ও ফল মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। পোকা, লার্ভা ও ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। ফসলের মাঠ বা বাগানের কিছু দূরে ফাঁকা স্থানে রাত্রি বেলায় বাতি জ্বালিয়ে নিচে কেরোসিন মিশ্রিত পানি রেখে দিলে পোকামাকড় বাতির পাশে আসবে ও কেরোসিন মিশ্রিত পানিতে পড়ে মারা যাবে। ফলের মাছি পোকা দমনের জন্য একটি মাটির পাত্রে ১০০ গ্রাম পাকা মিষ্টিকুমড়া পিষিয়ে ২ গ্রাম ডিপটেরেক্স বা কয়েক ফোঁটা নগস মিশিয়ে বিষ টোপের পাত্রটি একটি খুঁটির মাথায় আটকিয়ে বাগানের এক পাশে স্থাপন করতে হবে। এতে বিষ টোপের ফাঁদে মাছি আকৃষ্ট হয়ে মারা যাবে। প্রয়োজনে হাত জাল-মশারি দিয়ে পোকা দমন করতে হবে। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের মাধ্যমে সফলভাবে পোকা দমন করা যায়। উপকারী পোকা-প্রাণী, যেমন- লেডি বার্ড বিটল, ক্যারাবিড বিটল, মাকড়সা, পিঁপড়া, বোলতা, প্রেইং-মেন্টিড, মিরিড বাগ, ড্যামসেল ফড়িং, ট্রাইকোগামা, ব্যাঙ, গুইসাপ, সাপ ও ব্যাঙ ক্ষেতের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে। এরা ক্ষতিকারক পোকার ডিম, পুত্তলি, কীড়া ইত্যাদি খেয়ে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করবে। পাখিরা পোকা খায় তাই বাগানের বিভিন্ন স্থানে পাখি বসার জন্য বাঁশের কঞ্চি-ডাল পুঁতে দিতে হবে। বোলতা পোকা খায় তাই বাগানের বিভিন্ন স্থানে বোলতা প্রতিপালনের জন্য বাঁশের বুস্টার স্থাপন করতে হবে। এভাবে পোকার উপদ্রব অনেক হ্রাস পাবে। উল্লিখিত পদ্ধতিতে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে বিভিন্ন ধরনের জৈব কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে, যেমন- জাব পোকা ও পিঁপড়া দমনের জন্য ১ ভাগ আতা পাতা-বীজ ভালোভাবে পিষে ৫ ভাগ (১:৫) পানির সহিত মিশিয়ে কিছুক্ষণ রেখে, তারপর কাপড় দ্বারা ছেঁকে নির্যাস তৈরি করে সঙ্গে সঙ্গে ফসলের পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। বিটল, মাছি, কীড়া ও বিছাপোকা দমনের জন্য ১/২ কেজি দেশি নিম বীজ-পাতা মিহি গুঁড়া করে ২ লিটার পানিতে সারা রাত ভিজিয়ে রেখে পর দিন কাপড় দ্বারা ছেঁকে নির্যাস তৈরি করে, তারপর ওই দ্রবণের সঙ্গে আরও ১০ লিটার পানি মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করে ফসলের পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। মাজরা পোকা, জাব পোকা, কীড়া, উঁইপোকা ও পাতা ছিদ্রকারী পোকা দমনের জন্য ২৫০ গ্রাম তামাক পাতা-ডাঁটা ৪ লিটার পানিতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সিদ্ধ করে (৩ থেকে ৪ দিন পানিতে ভিজিয়ে রেখে) ছেঁকে নিয়ে আরও ৪ লিটার পানি মিশিয়ে ফসলের পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের মাছি, কীড়া ও জাব পোকা  দমনের জন্য ১ কেজি বিষকাটালি পাতা-কাণ্ড পিষে ১০ লিটার পানিতে কিছু সময় রেখে কাপড় দ্বারা ছেঁকে নির্যাস তৈরি করে ফসলের পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। পিঁপড়া ও জাব পোকা দমনের জন্য ১০ গ্রাম মরিচ গুঁড়া ১ লিটার পানিতে গুলিয়ে এক রাত রেখে কাপড় দ্বারা ছেঁকে আরও ৫ লিটার সাবানের ফেনাযুক্ত পানি মিশিয়ে ফসলের পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। জাবপোকা, মিলিবাগ, কীড়া, মোজাইক ভাইরাস দমনের জন্য গোচনা সংগ্রহ করে পাত্রে রেখে মুখ বন্ধ করতে হবে যেন বাতাস প্রবেশ না করে এভাবে ২ সপ্তাহ রেখে ১ ভাগ গোচোনা ১ থেকে ২ ভাগ পানির সঙ্গে মিশিয়ে সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করলে পোকা দমন হবে। পামরি পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, বাদামি ঘাস ফড়িং ও সবুজ পাতা ফড়িং দমনের জন্য ৩% নিম তেল, বিষকাটালি, ধুতুরা, বনকলমি পাতার নির্যাস বা বীজের গুঁড়া ১:১০ অনুপাতে মিশিয়ে আক্রান্ত ফসলের পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। গুদামজাত শস্যের পোকা দমনের জন্য বিষকাটালি, নিম ও নিসিন্দার শুকনো পাতার গুঁড়া মিশিয়ে দিতে হবে।

৩. ফসলের রোগ দমন : ছত্রাকজনিত রোগ দমনের জন্য মাটির পাত্রে ১২ গ্রাম কপার সালফেট ৪০০ মিলি লিটার পানির সহিত ভালোভাবে মিশিয়ে অন্য আরেকটি মাটির পাত্রে ১২ গ্রাম চুন ৪০০ মিলি লিটার পানির সহিত ভালোভাবে মিশাতে হবে। তার পর উভয় পাত্রের মিশ্রন তৃতীয় একটি পাত্রে একত্রিত করে আরও ২০০ মিলিলিটার পানি মিশিয়ে ১ লিটার দ্রবণ তৈরি করে ফসলের পাতা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।

উপরোল্লিখিত পদ্ধতিগুলোর সাহায্যে ক্ষতিকারক পোকামাকড় এবং রোগের আক্রমণ দমিয়ে রাখা যদি সম্ভব না হয় তখন সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে আক্রান্ত জমিতে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়, সঠিক মাত্রায় ও সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্প্রে করার পর বালাইনাশকের প্রভাব বা বিষক্রিয়া শেষ হলে তবে মাঠ থেকে ফসল সংগ্রহ করতে হবে, যেন খাওয়ার পর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর কোনো ক্ষতি না হয়।
 
খ. খাদ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণ : দই-মিষ্টি, আইসক্রিম, চকোলেট, সেমাই, ঘি ও প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য রঙিন করার জন্য ফুড কালারের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে বস্ত্র শিল্পের রঙ। মুড়ি সাদা ও বড় করার জন্য ইউরিয়া-হাইড্রোজের ব্যবহার এবং নিম্নমানের পণ্য দ্বারা ভেজাল সেমাই ও  ঘি তৈরি হচ্ছে। ভোজ্যতেল, মসলা-হলুদ-মরিচের গুঁড়ায় ভেজাল মিশ্রণ, কিছু সবজিতে রঙ এবং মাছ, মাংস, দুধ ও ফলমূলে ফরমালিন ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়াও দেশের অধিকাংশ হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং বেকারিগুলোতে ভেজাল, পচা-বাসি ও নিম্নমানের খাদ্য বিক্রয়ের কারণে লাখ লাখ পরিবারের মানুষ পেটের পীড়া, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, আমাশয়, ডায়রিয়া, ফুডপয়জনিং, কলেরা, জন্ডিস ইত্যাদি জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মূলত সাতটি কারণে খাদ্য বিষাক্ত হচ্ছে- ১. ফসলে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার। ২. কাঁচা  ফল পাকানোর জন্য কার্বাইড, ইথোফেন, রাইপেন ব্যবহার। ৩. খাদ্যের পচনরোধে ফরমালিন ব্যবহার। ৪. খাদ্য রঙিন ও আকর্ষণীয় করার জন্য টেক্সটাইল-ট্যানারির রঙ ব্যবহার। ৫. হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং বেকারিগুলোতে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে খাদ্য তৈরি। ৬. ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য দিয়ে  খাদ্য তৈরি ৭. পচা-বাসি ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বাজারজাত। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, যে কোনো ধরনের পচা-বাসি, মেয়াদোত্তীর্ণ ও বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত খাদ্য নীরব ঘাতক। খাদ্যের মধ্যে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি জানার জন্য ডিজিটাল মেশিন ও কীট বক্স রয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, বণিক সমিতি ও সমগ্র দেশের হাটবাজার কমিটির কাছে এ মেশিন সরবরাহ করে নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। 
     
গ. নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য সহজলভ্য করার উপায় :
১. জৈব উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ না করে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে কৃষকদের  উৎসাহী করতে হবে। ২. পারিবারিক এবং বাণিজ্যিকভাবে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে গোবর-বিষ্ঠা উৎপাদন ও ফসলের জমিতে ব্যবহার করে রাসায়নিক সারের ওপর চাপ কমাতে হবে। ৩. প্রত্যেক কৃষকের বাড়িতে সাধারণ/ভার্মি-ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন ও জমিতে ব্যবহার করতে হবে। ৪. জৈব বালাইনাশক তৈরি ও ব্যবহারের জন্য কৃষকদের আগ্রহী করতে হবে। ৫. বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের আইপিএম প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ এবং কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ৬. ফসল উৎপাদনের সময় এবং সংগ্রহোত্তর ধাপ, যেমন- প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য তৈরিসহ প্রতিটি পর্যায়ে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিষমুক্ত করতে হবে। ৭. খাদ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে বাজার মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট বসাতে হবে। ৮. ভেজাল প্রদানকারী অপরাধীকে প্রচলিত আইনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৯. খাদ্যের কেমিক্যাল শনাক্তকরণ মেশিন স্বল্প মূল্যে বাজারজাত, মেশিন ক্রয়ে ভ্যাট প্রত্যাহার ও ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। ১০. ফরমালিন আমদানি ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে প্রণীত আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ১১. খুচরা বাজারে ফরমালিন বেচা-কেনা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। ১২. বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যগুলো চোরা পথে দেশের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সীমান্ত পথে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে ১৩. খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার জন্য ভ্রাম্যমাণ ও স্থায়ী ল্যাবরেটরির ব্যবস্থা করতে হবে। ১৪. বিষাক্ত কেমিক্যালের ক্ষতিকারক দিকগুলোর ওপর ভিত্তি করে ডকুমেন্টারি ফ্লিম তৈরি করে রেডিও ও টিভি চ্যানেল প্রচার করতে হবে। ১৫. ভোক্তা সংগঠন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশকে (ক্যাব) শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ১৬. সরকারের একার পক্ষে ভেজালবিরোধী অভিযান সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বিধায় জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসার জন্য সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ, মাঠ দিবস ইত্যাদি আয়োজন করতে হবে। ১৭. হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাদ্য তৈরি এবং ধূলা-বালি, মাছি, রোগ-জীবাণু ইত্যাদির হাত থেকে রক্ষার জন্য আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও পচা-বাসি, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বাজারজাত বন্ধের লক্ষ্যে নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৮. বাজার থেকে ক্রয়কৃত সবজি ফল বিশুদ্ধ পানিতে ৩০ মিনিট ডুবিয়ে বা বেসিনে রেখে ট্যাপের পানি ছেড়ে দিলে বিষাক্ত কেমিক্যাল অপসারণ হয়। ফল খাওয়ার আগে স্বল্পমাত্রা গরম পানিতে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে বা ছাল ছাড়িয়ে খেলে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ঝুঁকি কমে যায়।
 

কৃষিবিদ এসএইচএম গোলাম সরওয়ার
* লেখক : ফার্ম সুপারিনটেনডেন্ট (পিএইচডি ফেলো), হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর, ফোন-০১৭১৩১৬৩৩৬৫

Share with :

Facebook Facebook