কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বসতবাড়িতে পরিকল্পিত কৃষি বনায়ন : খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার এক শক্তিশালী হাতিয়ার

বাংলাদেশ একটি জনবহুল কৃষিপ্রধান দেশ। কিন্তু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ৯০,৯৪,০০০ হেক্টর এবং দিন দিন তা বিভিন্ন কারণে কমে (বছরে প্রায় ১.৬ ভাগ হারে) যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাদযোগ্য জমির অন্য কোনো কাজে (যেমন নতুন বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, কলকারখানা নির্মাণ ইত্যাদি) ব্যবহার হচ্ছে এর মূল কারণ। আবার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়তই বাংলাদেশের বনজসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে এবং সেসঙ্গে কমে যাচ্ছে বনভূমির পরিমাণ। কোনো অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বনভূমির পরিমাণ ২৫% এর কম হলে আবহাওয়া, জলবায়ু, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য বিঘ্নিত হয়। সরকারি হিসাবে এ দেশে যদিও বনের আয়তন ১৫ থেকে ১৬% কিন্তু বেসরকারি হিসাবে ও বাস্তবতার নিরিখে ১০% এরও কম বলে মনে হয়। এতে দেখা দিচ্ছে অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি বৃদ্ধি, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি প্রভৃতি রকমের প্রতিকূলতা। ফলে এ মুহূর্তে প্রয়োজন খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি। আর এ ক্ষেত্রে বসতবাড়িতে পরিকল্পিত কৃষি বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

কৃষি বনায়ন কী?
কৃষি বনায়ন হচ্ছে এমন একটি টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা, যা ভূমির সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি করে; যুগপৎ বা পর্যায়ক্রমিকভাবে কৃষিজাত ফসল, বৃক্ষজাত ফসল ও বনজ উদ্ভিদ অথবা পশুপাখিকে একত্র-সমন্বিত করে এবং সেসব পরিচর্যা পদ্ধতি অবলম্বন করে, যা ওই নির্দিষ্ট এলাকার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ধ্যান-ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আবার অনেকের মতে, কৃষি বনায়ন হচ্ছে একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি যেখানে বৃক্ষ, ফসল এবং পশুপাখিকে এমনভাবে সমন্বয়-একত্র করা হয় যেটা বৈজ্ঞানিকভাবে নিখুঁত হয়, পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, ব্যবহারিক দিক থেকে সম্ভাব্য হয় এবং সামাজিক দিক থেকে কৃষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।
উপরে বর্ণিত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-
ক. কৃষি বনায়নে দুই বা ততোধিক ফসল থাকবে যার মধ্যে অন্তত একটি ফসল হতে হবে বহুবর্ষজীবী কাষ্ঠল উদ্ভিদ।
খ. কৃষি বনায়ন ধারা থেকে দুই বা ততোধিক উৎপাদন অথবা উপকারিতা বেরিয়ে আসবে।
গ. কৃষি বনায়ন ধারা পরিবেশগত (কাঠামো এবং কার্যকারিতার দিক থেকে) এবং অর্থনৈতিকভাবে একক চাষাবাদ অপেক্ষা অধিকতর জটিল এবং লাভজনক।

কৃষি বনায়ন নিম্নের তিনটি প্রধান উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে উঠে
১. বৃক্ষ ও অন্যান্য বহু বর্ষজীবী কাষ্ঠল উদ্ভিদ।
২. মৌসুমি অথবা একবর্ষজীবী কৃষিজাত উদ্ভিদ ফসল।
৩. পশুপাখি ও মৎস্য।

উপরোক্ত তিনটি উপাদানের সব ক’টি অথবা যে কোনো দুটি উপাদানের সংমিশ্রণে-সমন্বয়ে একটি কৃষি বনায়ন ধারা গড়ে উঠতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে যে কোনো কৃষি বনায়ন ধারার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হচ্ছে বৃক্ষ বা কাষ্ঠল বহু বর্ষজীবী উদ্ভিদ যা বহুবিধ ব্যবহারযোগ্য।

উপকারিতা
১. কৃষি বনায়নে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
২. একই জমি থেকে একই সঙ্গে ফসল, শাকসবজি, পশুখাদ্য, জৈবসার, কাঠ, ফল, মাছ, গোশত, ডিম, দুধ ইত্যাদি উৎপাদন সম্ভব।
৩. কৃষি বনায়নের ফলে মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণ উন্নত হয়।
৪. একক চাষাবাদ এর শস্যহানির ঝুঁকি কমে যায়।
৫. ফসল, বৃক্ষ, পশুপাখি ও মাছের আন্তঃক্রিয়ায় পরস্পর উপকৃত হয়।
৬. প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ঘরবাড়ি ও ফসল রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৭. বেকারত্ব দূরীকরণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়।
৮. সর্বোপরি বসতবাড়ির প্রাকৃতিক দৃশ্য সুন্দর হয় এবং পরিবেশ উন্নত হয়।

সীমাবদ্ধতা
১. অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ ও ফসল একসঙ্গে চাষাবাদ করলে এদের মধ্যে স্থান, সূর্যরশ্মি, পানি ও পুষ্টি নিয়ে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে এবং এতে ফলন কম হবে। তাই বিভিন্ন দিক বিবেচনায় এনে বৃক্ষ ও ফসল নির্বাচন করতে হবে।
২. বৃক্ষ ও ফসলের রোগবালাই পরস্পরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৩. সেচের পরিমাণ বেশি লাগবে।
৪. গাছ কাটার সময় ফসল এবং অন্যান্য উদ্ভিদের ক্ষতি সাধন হতে পারে।
৫. জমি চাষ ও ফসল পরিচর্যায় অসুবিধা হয়।
৬. শ্রমের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
৭. পরিকল্পিত কৃষি বনায়নে জনগণের জ্ঞান বৃদ্ধি এক বড় চ্যালেঞ্জ।

বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন
বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন হলো কৃষি বনায়নের একটি ধারা, যেখানে বসতবাড়ির নির্দিষ্ট ভূখ-ে বনজ বৃক্ষ, ফলদ বৃক্ষ, শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ, অন্যান্য উদ্ভিদ, বৃক্ষ ফসল, উদ্ভিদ ফসল, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মৎস্য ইত্যাদির সমন্বয়ে সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠে যা কৃষি বনায়নের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যম-িত এবং প্রাচীন উদাহরণ। এটি আবার জীবন নির্বাহ কৃষি বনায়ন ধারাও বটে। এ ধারার মূল লক্ষ্য হতে পারে পরিবারের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা। সাধারণত ক্ষুদ্র ও দরিদ্র বা স্বল্প সামর্থ্যযুক্ত পরিবারগুলো পারিবারিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ধারা হতে বেশি উপকৃত হতে পারে।

একটি আদর্শ বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন ধারার গঠন
প্রায় প্রতিটি বসতবাড়িতে কৃষি বনায়নের অস্তিত্ব থাকলেও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে তা থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। ফলে ধারণাটি পুরনো হলেও মানুষ এটা নিয়ে খুব একটা ভাবে না। অথচ পরিকল্পনা মাফিক বসতবাড়িতে কৃষি বনায়নের মাধ্যমে একটি পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব। একটি আদর্শ বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন ধারা গড়ে তোলার জন্য নিম্নলিখিত প্রধান দিকগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে-

১. বসতবাড়ির চারপাশের সীমানায় বেড়া হিসেবে মান্দার, ভেরেন্ডা, পলাশ, জিগা ইত্যাদি উদ্ভিদ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে বসতবাড়ির সীমানা নির্ধারণ ছাড়াও সুরক্ষার কাজও করবে।
২. বাড়ির আঙিনায় শাকসবজির চাষ করতে হবে।
৩. বসতবাড়ির আঙিনার ফাঁকা স্থানে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, বেল, পেঁপে, নিম, বহেড়া, হরীতকী, তুলসী, সজিনা, নারিকেল, সুপারি, বকুল ইত্যাদি গাছ রোপণ করা যায়।
৪. বসতবাড়ির সীমানায় পুকুর থাকলে সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাছের চাষ করতে হবে। পুকুরের পাড়ে বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষরোপণ (নারিকেল, সুপারি, ইপিল-ইপিল, মেহগণি, খেজুর, কড়ই ইত্যাদি) করতে হবে। এতে গরমের সময় মাছের উপকার হয়। এখানে বেশি শিকড় বিশিষ্ট গাছ লাগালে পুকুরের পাড়ের মাটি ভাঙবে না।
৫. বিভিন্ন ছায়াসহ্যকারী উদ্ভিদ যেমন- আদা, হলুদ ইত্যাদি দুই বৃক্ষের মাঝে লাগতে হবে।
৬. বসতবাড়িতে যতটুকু সম্ভব গবাদিপশু-পাখি (হাঁস-মুরগি, কোয়েল, কবুতর, গরু, ছাগল, মৌমাছি ইত্যাদি) পালন করতে হবে।
৭. সর্বোপরি স্থান-অবস্থান, উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা, সামর্থ্য, সহজ প্রাপ্যতা ইত্যাদি বিবেচনা করে বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন ধারার উপাদানগুলো নির্বাচন করতে হবে এবং যথাযথ নিয়মে এর পরিচর্যা করতে হবে।

বসতবাড়িতে পরিকল্পিত কৃষি বনায়নের প্রয়োজনীয়তা
কিন্তু এদশের অধিকাংশ জনগণই অত্যন্ত গরিব, অনেকের শুধু বসতবাড়ি ছাড়া আর কোনো কৃষি জমি নেই। অথচ এদেশের গ্রামাঞ্চলে বসতবাড়িগুলো হচ্ছে সনাতন কৃষি বনায়ন ধারা তথা বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাচীন উদাহরণ। কৃষাণ-কৃষাণিরা বহু পূর্বকাল থেকেই একই আঙিনায় নিজেরা বসবাস করা ছাড়াও শাকসবজি চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, হরেক রকমের ফলদ, বনজ এবং শোভাবর্ধনকারী গাছপালা একই সঙ্গে উৎপাদন ও পালন করে আসছেন। বাংলাদেশে বসতবাড়ির বাগান থেকেই অধিকাংশ ফল, কাঠ, জ্বালানি, পশুখাদ্য ইত্যাদি উৎপাদন ও সংগ্রহ করা হয়। দেখা গেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে গৃহস্থালি জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান বসতবাড়ি এবং পাশের জমি থেকেই আসে। তবে সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতি থাকায় বসতবাড়িভিত্তিক এ উৎপাদন ব্যবস্থার ফলন তেমন আশাব্যঞ্জক নয়।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ বসতবাড়ি এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম ব্যবহৃত। ভৌত অবস্থান, কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা সম্পদ ভিত্তি ইত্যাদিকে বিবেচনায় রেখে কৃষি বনায়ন তথা একটি সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে সেটা হবে আগামী শতকের প্রধান অবলম্বন, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য বহু বছর ধরে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যাদি জোগান দেবে।

এ ছাড়া গাছ বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে এবং ভূমিক্ষয় রোধ করবে ও ঝড়-বাতাস থেকে ঘরবাড়িকে রক্ষা করবে। কৃষি বনায়ন আয়েরও একটি ভালো উৎস হতে পারে। তাই সুপরিকল্পিতভাবে কৃষি বনায়ন ধারা অনুসরণ করে বসতবাড়ির আঙিনা ও তার আশেপাশের জমি থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল, শাকসবজি, ফল, কাঠ, জ্বালানি, পশু খাদ্য, মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি উৎপাদন করা একান্তই প্রয়োজন। এজন্য দ্রুত বর্ধনশীল ফলজ এবং বনজ বৃক্ষের সমন্বয়ে একটি বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য বসতবাড়ি বাগান গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে করে খাদ্যের চাহিদা মেটানোর সঙ্গে সঙ্গে বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং সে সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।
 
ড. মো. শহিদুল ইসলাম*
কৃষিবিদ জহিরুল ইসলাম খান**
* মৃত্তিকা বিজ্ঞানী এবং সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ** নির্বাহী সম্পাদক, উর্বরা

Share with :

Facebook Facebook