কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার ও উপকারিতা

বাংলাদেশে একটি নতুন কৃষি প্রযুক্তি চালু হয়েছে, যা কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের কোনো কোনো জেলায় কৃষক ব্যবহার করে ব্যাপক সুফল পেয়েছেন। প্রযুক্তিটির নাম মাটির গভীরে ইউরিয়া  প্রয়োগ প্রযুক্তি বা Urea Deep Placement (UDP) Technology এটি প্রায় ২০ বছর আগে চালু হলেও গত ৫ বছর ধরে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলসহ ২২টি জেলায় ব্যাপকভাবে কৃষকরা ব্যবহার করে লাভবান হয়েছেন।   
মাটির গভীরে সারপ্রয়োগ প্রযুক্তি কী? এটি মূলত ছিটিয়ে ইউরিয়া ব্যবহারের একটি অত্যন্ত কার্যকর বিকল্প। এ পদ্ধতির মর্মকথা হচ্ছে মাটির গভীরে সার (গুটি ইউরিয়া) প্রয়োগ, যার মাধ্যমে সার সাশ্রয় হয় ও ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়। এ পদ্ধতির দুইটি ধাপ। প্রথমে একটি মেশিনের (ব্রিকেট মেশিন) মাধ্যমে প্রচলিত গুঁড়া ইউরিয়াকে গুটি ইউরিয়ায় রূপান্তর এবং দ্বিতীয়ত মাটির ৩-৪ ইঞ্চি নিচে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ।
গুটি ইউরিয়া : গুটি ইউরিয়া কোনো নতুন সার নয়। এটি গুঁড়া ইউরিয়া সারেরই রূপান্তর। বাংলাদেশেই উদ্ভাবিত একটি মেশিনের (ব্রিকেট মেশিন) মাধ্যমে গুটি ইউরিয়া সহজেই তৈরি করা যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে দুই সাইজের গুটি ইউরিয়া তৈরি করা হয়। আউশ ও আমন মৌসুমের জন্য ১.৮ গ্রাম এবং বোরো মৌসুমের জন্য ২.৭ গ্রাম ওজনের গুটি। গুটি ইউরিয়ায় গুঁড়া ইউরিয়ার মতোই ৪৬ ভাগ নাইট্রোজেন বিদ্যমান।  
গুটি ইউরিয়া ব্যবহার কেন লাভজনক : গুটি ইউরিয়া বাজারে প্রচলিত গুঁড়া ইউরিয়ার তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক। কারণ গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে ধানের ফলন ১৫-২৫% বৃদ্ধি পায়, ইউরিয়া সার তিন ভাগের এক ভাগ লাগে তথা ২০-২৫% খরচ সাশ্রয় হয় এবং আগাছা দমনের খরচ ৩০-৫০% ভাগ কমে যায়। এক হেক্টর জমিতে গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে ধানের ফলন অন্তত ১০০০ কেজি বাড়ে। অর্থাৎ কৃষক অতিরিক্ত ফলনের মাধ্যমে বাড়তি ১৫০০০ টাকা (প্রতি কেজি ধান ১৫ টাকা করে) আয় করতে পারবে।
গুটি ইউরিয়া প্রতি হেক্টরে আউশ আমন ধানে মাত্র ১১২ কেজি এবং উফশী বোরো ধানে ১৭০ কেজি প্রয়োগ করতে হয়। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ফার্টিলাইজার গাইড ২০১২ অনুযায়ী গুঁড়া ইউরিয়া আউশ ও আমন ধানে অন্তত প্রতি হেক্টরে গড়ে ২০০ কেজি ও বোরো ধানে ৪৩৪ কেজি প্রয়োগ করতে হয়। বোরো ধানে যদি ৪০০ কেজি গুঁড়া ইউরিয়াও প্রয়োগ করা হয় তাহলে কৃষকের খরচ পড়বে ৬৪০০ টাকা (প্রতি কেজি ১৬ টাকা করে) অথচ গুটি ইউরিয়া ১৭০ কেজি প্রদানে খরচ পড়ে মাত্র ৩০৬০ টাকা (প্রতি কেজি ১৮ টাকা করে)। অতএব, গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে হেক্টরপ্রতি সাশ্রয় হয় ৩৩৪০ টাকা।
গুটি ইউরিয়ার উপকারিতা : গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের উপকারিতা অনেক। গুটি ইউরিয়া একবার প্রয়োগ করলেই চলে, ধান পাকা পর্যন্ত আর প্রয়োগ করতে হয় না। গুটি ইউরিয়া ব্যবহৃত জমিতে ঘাস বা আগাছা কম হয়। খড়ে পুষ্টিমান বেশি থাকে। পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের উপদ্রব কম হয়। গুটি ইউরিয়া গুঁড়া ইউরিয়ার মতো তিনভাবে অপচয় হয় না। অর্থাৎ বাতাসে উবে যায় না, মাটির গভীরে চুইয়ে অপচয় হয় না এবং পানির সাথে বিলে বা নদী-নালায় চলে যায় না। ফলে পরিবেশ ভালো থাকে। সার কম লাগে বিধায় ভরা মৌসুমে সারের অভাব থাকে না। ইউরিয়া সার ২০-২৫% কম লাগে এবং ধানের ফলন ১৫-২৫% বৃদ্ধি পায়। কৃষক লাভবান হয়।
গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ পদ্ধতি : গুটি ইউরিয়া কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের পূর্বশর্ত হচ্ছে লাইনে চারা রোপণ। চারা রোপণের ৭ দিনের মধ্যে মাটি শক্ত হওয়ার আগে জমিতে ২-৩ সেমি. পানি থাকা অবস্থায় গুটি ইউরিয়া মাটির ৩-৪ ইঞ্চি নিচে প্রয়োগ করতে হয়। জমিতে ২০
×২০ সেমি. (৮×৮ ) দূরত্বে লাইন থেকে লাইন এবং চারা থেকে চারার দূরত্বে ধানের চারা বোপণ করতে হবে। এরপর প্রতি চার গোছার মাঝখানে একটি করে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। গুটি ইউরিয়া হাতেও প্রয়োগ করা যায়। তাছাড়া বারি (BARI) ও আইএফডিসি উদ্ভাবিত প্রয়োগ যন্ত্র (Applicator) দিয়েও প্রয়োগ করা যায়।
অধিক ফলন লাভে করণীয় : গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে অধিক ফলন পেতে হলে অন্যান্য যা করণীয় তা হচ্ছে ভালো জাতের ফলন সম্পন্ন বীজ ব্যবহার, অন্যান্য প্রয়োজনীয় সার ব্যবহার, সময়মতো সেচ প্রয়োগ, বেলে মাটিতে ব্যবহার না করা, সময়মতো পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন।  শুধু ধান নয়, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলেও ব্যবহার করা যায়।
বর্তমানে অন্তত ১২০০ ব্রিকেট মেশিনের মাধ্যমে আইএফডিসির উদ্যোগে দেশে প্রায় ২ লাখ টন গুটি ইউরিয়া উৎপাদন ও ব্যবহার হচ্ছে। ফলে গুঁড়া ইউরিয়া ব্যবহার আস্তে আস্তে হ্রাস পাচ্ছে।
গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে দেশ ও কৃষক অনেক লাভবান হচ্ছে। ইউরিয়া ব্যবহার হ্রাস পাওয়ায় ইউরিয়া সার সাশ্রয় হচ্ছে ও ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সার আমদানি ও চাল আমদানি ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
এখন সময় এসেছে এই সার সাশ্রয়ী, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার। এতে কৃষক লাভবান হবে ও দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ ব্যাপারে ব্যাপকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই সময়।

কৃষিবিদ মাহমুদ হোসেন*

*মহাব্যবস্থাপক (অব.), বিএডিসি, মোবা. ০১৮৩৭৩৫৩৯৭০

 


Share with :

Facebook Facebook