কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

গ্রীষ্মের ফল

বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ- এই দুই মাস গরমকাল। ঋতুচক্রে গরমকাল হলেও, ফলের বিবেচনায় এই দুই মাসকে বলা হয় মধুঋতু, জ্যৈষ্ঠ মাস হলো মধুমাস। মধুমাসে কত ফলই না ফলত তখন গাঁয়ের এ বাগানে ও বাগানে, এ বাড়িতে ও বাড়িতে। এক কথায় পুরো গ্রীষ্মকালটাই ছিল যেন এক ফলের মহোৎসব। গ্রামে গেলেও সেই দুরন্ত কৈশোরের মতো এখন আর সেসব ফল পাব কিনা সন্দেহ। কেননা, গাঁয়ের সেসব জঙ্গলও নেই, থাকলেও সেসব জঙ্গলে এখন বাসা বেধেছে ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, মেহগিনি গাছেরা - সেই ঢাকি জাম, ক্ষুদিজাম, হামজাম, চালতা, চুকুর, বেল, বিলিম্বি, বৈঁচির গাছ উধাও।
আদিকালের ফল
পৃথিবীতে মানুষ সবচেয়ে প্রাচীন যে ফলের চাষ করে তা হল ডুমুর, এরপর খেজুর। আজ থেকে প্রায় ৯৫০০ বছর পূর্বে ডুমুর চাষের তথ্য পাওয়া যায়, এরপর ৯০০০ বছর পূর্বে প্রথম খেজুর গাছ রোপণ করার রেকর্ড প্রাচীন নথিপত্রে রয়েছে। ডালিমও অত্যন্ত প্রাচীন ফল। প্রায় ৫৫০০ বছর পূর্বে বিভিন্ন প্রাচীন সাহিত্য ও নথিপত্রে এ ফলের নাম পাওয়া যায়। ৪৫০০ বছর আগে চাষ শুরু হয় আঙ্গুরের। ৪০০০ বছর আগে আমের উৎপত্তি হয়েছিল এ উপমহাদেশেই। আজ থেকে প্রায় ৩০০০ বছর পূর্বে লিখিত ওল্ড টেস্টামেন্টে আঙুর, জলপাই ও ডুমুর ফলের উল্লেখ পাওয়া যায়। আঙুর চাষের উপযুক্ত ভূমির উল্লেখ রয়েছে প্রাচীন পুস্তক কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে অর্থশাস্ত্র লিখিত হয়।
বৈশ্বিক ফল
এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ফলের যে বৈচিত্র্য রয়েছে তা বিশ্বের আর কোথাও নেই। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪০০ রকমের ফল জন্মে। এর মধ্যে বেশির ভাগ ফলই জন্মে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপে রয়েছে ফল উৎপাদনের জন্য বৈচিত্র্যময় আবহাওয়া। যে কারণে নানা রকম ফলের বৈচিত্র্যও বেশি। প্রায় ৫০ রকম ফলের আদি নিবাস বা জন্মস্থান দক্ষিণ এশিয়া। এর মধ্যে অন্তত ২০টি ফল এসব এলাকার দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে আবাদ করা হয়। এসব ফলকে বলা হয় প্রচলিত ফল। এসব ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। এ দেশে যত ফল আছে তার সবই চাষ করা হয় না। অনেক ফল আছে বুনো। স্বাদ বৈচিত্র্যে সেসব ফলও অনন্য। সেগুলোও খাওয়া হয়। এ অঞ্চলে যত ফল জন্মে তার প্রায় ৫৫ শতাংশ ফলই চাষ করা হয় না বা গাছ লাগানো হয় না। ওসব ফলের গাছ এমনি এমনি বা আপনা আপনি বনে বাদাড়ে জন্মে, পাখি খায় ও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বীজ ছড়ায়। তাই অনেকেই সেসব ফলের খোঁজ বা পরিচয় জানেন না। এসব ফলকে তাই বলা হয় অপ্রচলিত ফল।
দক্ষিণ এশিয়ায় আবাদকৃত ফলের সিংহভাগই উৎপাদিত হয় বা গাছ লাগানো হয় বসতবাড়িতে ও তার আশপাশে। স্বল্প কিছু প্রধান ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। আম, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, আনারস, ডুরিয়ান, রাম্বুটান ইত্যাদি এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ফল। তবে এক এক দেশে এক এক ফলকে বেশি চাষ করা হয়। যেমন মালয়েশিয়ায় বেশি হয় ডুরিয়ান, রাম্বুটান, আম ও পেয়ারা; ভারতে বেশি হয় নানা রকমের লেবু ও আম, ইন্দোনেশিয়ায় বেশি হয় কাঁঠাল ও আতা শরিফা, শ্রীলংকায় নারিকেল, আম ও লেবু; নেপালে লেবু ও আম, ভিয়েতনামে আম, লেবু ও লংগান; ফিলিপিনে আম; চীনে লেবু; বাংলাদেশে আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, পেয়ারা ইত্যাদি।
বাংলাদেশের ফল
আমাদের দেশি ফল অর্থাৎ বাংলাদেশের ফল কোনগুলো? এটি একটি বিতর্কিত প্রশ্ন বটে। সহজ উত্তর হলো যেসব ফলের উৎপত্তি ও চাষ এ দেশের ভূখ-ে বা এ অঞ্চলে সেসব ফলকে আমরা দেশি ফল বলতে পারি। ফল তো দেশ চেনে না। ফল তার উপযুক্ত জলহাওয়া ও মাটি পেলেই সেখানে জন্মে থাকে। সে অর্থে যেসব ফলের উৎপত্তি আমাদের অঞ্চলে সেসব ফলের সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ ফলই হাজার হাজার বছর পূর্বে অন্যান্য দেশ থেকে এ দেশে এসে খাপখাইয়ে নিয়েছে এবং কালক্রমে সেগুলো আমাদের ফলে পরিণত হয়েছে। সব বিদেশি ফল আবার এ দেশে ভালো ফল দেয় না। যেসব ফল অনায়াসে এ দেশে জন্মে ও ভালো ফলন দেয় সেসব ফলকে এখন আমরা দেশি ফল হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।
আম, কলা, ফলসা, কাঁঠাল, বেল, আমলকী, পাতিলেবু ইত্যাদি ফলকেই বিজ্ঞানীরা এ দেশের ফল বলে মনে করেন। লিচু, গাব, পিচ, আঁশফল, কমলা এসেছে চীন থেকে। পেয়ারা, পেঁপে, আতা, আনারস, সফেদা, ডালিম ইত্যাদি ফলের আদিনিবাস আমেরিকা। কিন্তু এগুলো এ দেশে এত দীর্ঘদিন ধরে জন্মাচ্ছে যে তা এখন আমাদের দেশি ফলে রূপান্তরিত হয়েছে। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং ভারতবর্ষে এসেছিলেন ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে। তিনি এ দেশে ঘুরে তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে এ দেশে আম, ডালিম, কলা, কুল, আমলকী, কাঁঠাল, গাব, কদবেল, মিষ্টি লেবু তথা কমলা ইত্যাদি ফল দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন। তার মানে সুদূর অতীতে কোনো কোনো ফল এ দেশে এলেও সেগুলো এখন আমাদের দেশি ফলে পরিণত হয়েছে। এ ধারা অনন্তকাল ধরে অব্যাহত থাকবে। কেননা, বিগত দশকেই এ দেশে বিদেশ থেকে আসা ও চাষ হওয়া প্রায় ৩০টি ফলকে ইতোমধ্যেই তালিকাভুক্ত করেছি।
ফল বিজ্ঞানীরা ৭০টি ফল বাংলাদেশে আছে বলে জানিয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৫টি ফল অবৃক্ষ লতানো প্রকৃতির। তবে এ পর্যন্ত ১৩০টি ফলকে দেশি ফল হিসেবে শনাক্ত ও তার বর্ণনা তৈরি করতে আমি সক্ষম হয়েছি। এর মধ্যে ৬০টি বুনো ফল। বাংলাদেশের প্রধান ফল ১০টি, বর্তমানে বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে এমন গুরুত্বপূর্ণ ফলের সংখ্যা ১৮টি। প্রধান ফলগুলো হলো আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কলা, কুল, নারিকেল, লেবু, আনারস, পেঁপে, বাঙ্গি ও তরমুজ। বাকি সব অপ্রচলিত বা অপ্রধান ফল। অপ্রধান ফলের মধ্যে অন্যতম হলো জাম, গোলাপ জাম, জামরুল, তেঁতুল, কদবেল, বেল, সফেদা, কামরাঙা, লুকিলুকি, আঁশফল ইত্যাদি।
এসব দেশি ফলের মধ্যে অনেক ফলের আবার অনেক জাতও এ দেশে রয়েছে। এজন্য প্রথমেই দরকার দ্রুত নানা রকম ফলের ও তাদের জাতসমূহের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। এক তথ্য সূত্রে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ১০১টি আমের জাত, ৬টি লিচুর জাত, ২১টি বরই ও কুলের জাত, ২৫টি কলার জাত এবং ১টি করে জামরুল ও ডালিমের জাত সংগৃহীত হয়েছে। তবে বেশ কিছু আধুনিক ও উচ্চফলা জাত এর মধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে। এ পর্যন্ত ভারতে সংগৃহীত হয়েছে ১১০৬টি আমের জাত, ১০৭টি পেঁপের জাত, ২৪টি আনারসের জাত, ৩৬৩টি কলার জাত ও ৩টি প্রজাতির ১২৩ জাতের পেয়ারা। আর কত রকমের লেবু যে সে দেশে পাওয়া গেছে! এ পর্যন্ত ভারতে মোট ৪৫১ রকম বা জাতের লেবুর জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করা হয়েছে। হরেক রকমের লেবু আছে আমাদের দেশেও। অন্তত ৫০ রকমের লেবু শুধু সিলেট অঞ্চলেই আছে। লেবুর মতই অন্যান্য ফলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করতে হলে সেসব ফলের সম্ভাব্য উৎপাদন এলাকা সম্পর্কেও একটা ধারণা থাকা দরকার। যেমনÑ আম ভালো হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লেবু হয় সিলেটে, আনারস হয় মধুপুর ও সিলেটে, কাঁঠাল হয় গাজীপুরের শ্রীপুরে, কাউফল হয় বাগেরহাটে, সফেদা হয় সাতক্ষীরা ও খুলনায়, পেয়ারা হয় পিরোজপুরে ইত্যাদি। তবে এ ফলগুলোর অধিকাংশই এখন বিপন্ন। বসতবাড়িতে দু-একটি গাছ রয়েছে, বনে জঙ্গলেও কিছু আছে। অথচ পুষ্টি মানে এমনকি স্বাদ বৈচিত্র্যে এসব ফলের কোনো তুলনা হয় না। কেননা, এক এক ফলের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ এবং ভেষজ মূল্য এক এক রকম। অথচ এক রকম অবহেলা করেই আমরা আমাদের এসব ফলকে হারাতে বসেছি। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে, এখনো অল্প স্বল্প হলেও এর অনেক ফলই দেশের মাটিতে টিকে আছে।
দেশীয় এসব ফলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এসব ফল এক রকম বিনা যতেœই এ দেশের মাটিতে ভালো ফলে। সাধারণত এসব ফলের গাছে তেমন কোনো সার ও সেচ দেয়া হয় না। এ দেশের মাটি ও জলবায়ুতে খুব ভালোভাবে এসব ফলের গাছ মানিয়ে গেছে। ঝড়বাতাস কিংবা বন্যা খরাও অনেক দেশি ফলের গাছকে সহজে মারতে পারে না। বরেন্দ্র এলাকার শুকনো খটখটে মাটির বুকে যেমন বরই গাছকে ফল ভরা মাথা নিয়ে হাসতে দেখেছি তেমনি কুয়াকাটার পাশে গঙ্গামতির নোনা বালু চরের জঙ্গলেও সমুদ্রের মধ্যে গোটবরইয়ের গাছকে দেখেছি ফলে ভরা। এই যে দেশি ফলের ব্যাপকভাবে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা বা ওয়াইড অ্যাডাপ্টিবিলিটি, তা কিন্তু অনেক বিদেশি ফলেরই নেই। দেশী ফলের আর একটা সুবিধে হলো, বিদেশি ফলের বা উন্নত জাতের ফলগাছের মতো এসব ফল বা ফলগাছে অত বেশি রোগ পোকার আক্রমণ হয় না। তবে দেশী ফলে সবচেয়ে বেশি যেটা মেলে তা হলো পুষ্টি। দেশি ফলের মতো এত বেশি পুষ্টি কখনো বিদেশি ফলে মেলে না। একটা ছোট্ট আমলকীতে যে পরিমাণ ভিটামিন সি আছে তা পাঁচটা বড় কমলাতে পাওয়া যাবে না।
গ্রীষ্মের ফল
বাংলাদেশ আবহাওয়া উষ্ণপ্রধান দেশ। এ দেশে তাপমাত্রা সাধরণত ১০ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে থাকে। বছরব্যাপী কম বেশি বৃষ্টিপাত হয়, গ্রীষ্মের পর থেকে বৃষ্টি শুরু হয় যা, পুরো বর্ষাকালজুড়ে বজায় থাকে। বর্ষার পর বর্তমানে শরতেও প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এজন্য শরৎ-হেমন্ত ঋতুকে এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ দেশের মাটি উর্বর। তাই অনেক ধরনের ফল এ দেশে জন্মে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত অনুকূলে থাকলে সে বছর বিভিন্ন ঋতুতে প্রচুর ফল উৎপাদন হয়। এ দেশে বেশিরভাগ ফল উৎপাদিত হয় গ্রীষ্ম-বর্ষাকালের চার মাসে। ফাল্গুনে আমসহ অনেক ফলগাছে ফুল আসে, বৈশাখ থেকে বৃষ্টির বারিধারায় মাটি সিক্ত হয়, তাপদাহ শেষে জলের পরশে ফলের পরিপুষ্টি ঘটে। জ্যৈষ্ঠে তাপ বৃদ্ধিতে পুষ্ট ফলের ভেতরে টক অম্ল মধুর রসে পরিণত হয়। ফলের খোসার রঙ বদলে যায় ও ফলে মিষ্টতা আসে। যেসব কারণে গ্রীষ্মঋতুতে জন্মানো প্রায় সব ফলই হয় মিষ্টি, সুঘ্রাণযুক্ত ও সুদর্শন। হয়তো ফল রসিকরা এ জন্য গ্রীষ্ম ঋতু বিশেষ জ্যৈষ্ঠ মাসকে ‘মধুমাস’ নামে অভিহিত করে থাকেন।
গ্রীষ্ম বলা হলেও আসলে এ মৌসুমে উৎপাদিত অনেক ফলের বিস্তৃতি থাকে বর্ষাকাল পর্যন্ত। নাবি জাতের আম বর্ষা ঋতু এমনকি ভাদ্র মাস পর্যন্ত পাওয়া যায়। অথচ আম গ্রীষ্মকালের প্রধান ফল। এ দেশে উৎপাদিত ফলের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদন হয় বৈশাখ থেকে শ্রাবণের মধ্যে অর্থাৎ চার মাসে। বাকি ৪০ শতাংশ ফল উৎপাদিত হয় বাকি আট মাসে। এজন্য গ্রীষ্ম মৌসুমকে বলা হয় ফলের মাস। গ্রীষ্মকালে এ দেশে পেয়ারা, পেঁপে, কলা, নারিকেল, সফেদা, তালশাঁস, লেবু, আম, কামরাঙা, ড্রাগন ফল, ডেউয়া, জাম, কাঁঠাল, তৈকর, প্যাশন ফল, কাজুবাদাম, গোলাপজাম, বাঙ্গি, চুকুর, লিচু, আঁশফল, তরমুজ, ফলসা, করমচা, গাব, হামজাম, বৈঁচি, লুকলুকি, জামরুল, গাব, বেতফল, মুড়মুড়ি, খেজুর, ননিফল, আতা, শরিফা ইত্যাদি ফল পাওয়া যায়। ফলের মাসে এ পল্লীবাংলার ঘরে ঘরে বসে নানা রকম ফলাহারের আয়োজন। জ্যৈষ্ঠ মাসে হয় জামাই ষষ্ঠী অনুষ্ঠান যে অনুষ্ঠানের প্রধান উপকরণ নানা রকমের প্রচুর ফল। গ্রামের হিন্দু রমণীরা বৈশাখ মাস জুড়ে নানা রকম ব্রত পালন করেন। এসব ব্রতের অন্যতম অনুষঙ্গ নানা রকম ফল।
বাড়িতে বাড়িতে এ ঋতুতে তৈরি করা হয় ফল থেকে নানারকম খাদ্য সামগ্রী। চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাকা আমের গোলা দিয়ে যবের ছাতু খাওয়া, গাজীপুরে পাকা কাঁঠালের গোলা দিয়ে চিতোই পিঠা খাওয়া, আমসত্ব বানানো, আমের পলশি শুকানো ইত্যাদি এ দেশের অন্য এক ফল সংস্কৃতির স্বাক্ষর বহন করে।
শেষ কথা
অনেক ফলই এখন বন উজাড়ের ফলে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশে বাঙ্গি, তরমুজ, কলা, পেয়ারা, কুল, আম, আনারস ছাড়া আর কোনো ফলের দেখা হয়তো সহজে মিলবে না। যেমন এখন ইচ্ছে করলেও পাকা বেত ফলের নস্যি রঙের রসালো শাঁসের ফলগুলোকে লবণ মরিচের গুঁড়া দিয়ে ঝেঁকে খেতে পারি না, যেমন খুঁজে পাই না ঢাউস আকারের রসালো শাঁসের ভুতিজাম আর পুঁতি দানার মতো বুটিজামকে, তেমনি হয়তো কদিন পরেই পাব না লুকলুকি, মাখনা, কাউয়াডুলি, পানিজাম, পানকি চুনকি, আইকা গোটা, হামজাম ও ডেউয়াকে। এক আমলকীর মধ্যে লুকিয়ে আছে পাঁচ কমলার ভিটামিন সি, অথচ সেই আমলকীকে হেলা করে কোলে তুলে নিচ্ছি কমলা সুন্দরীকে। আফসোস, বড়ই আফসোস হয়- দেশের মাটিতে দেশের মানুষের কাছেই দেশি ফলেরা উপেক্ষিত। কেউ হাসপাতালে রোগী দেখতে গেলে তাই জাম্বুরা নেন না, সঙ্গে নেন কমলা আপেল। দেশেই যাদের পুষ্টির এত রতœভা-ার সে দেশের মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগবে এটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। তবে আশার কথা, দেশে  এখন আম, পেয়ারা আর কুল চাষে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। ২০১৪-১৫ সালে এ দেশে প্রায় ১ কোটি টন ফল উৎপাদিত হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সূত্র মতে, ২০১৩ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে বিশ্বে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। বিশ্বে বাংলাদেশ আম উৎপাদনে সপ্তম ও পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। বিশ্বে ফল উৎপাদনে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ইতালি, স্পেন, মেক্সিকো, ইরান, ফিলিপাইন, ফ্রান্স শীর্ষ ফল উৎপাদনকারী দশটি দেশ। বিশ্বে মোট ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ২৮তম। এটাও তো কম সুখের কথা নয়।

মৃত্যুঞ্জয় রায়*
*উপ প্রকল্প পরিচালক, আইএফএমসি প্রকল্প, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা

 


Share with :

Facebook Facebook