কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

সুগন্ধি চাল : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বিশেষ জাতের ধান থেকে সুগন্ধি চাল তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে এলাকাভিত্তিক প্রচুর সুগন্ধি ধান আবাদের প্রচলন আছে। দেশি জাতগুলোর চাল আকারে ছোট ও অনেকটা গোলাকার হয়। সুগন্ধি ধানের জাতগুলোর বেশির ভাগই আলোক সংবেদনশীল, দিনের দৈর্ঘ্য কমে গেলে হেমন্ত কালে ফুল ও দানা গঠন হয়। প্রধানত আমন মৌসুমে (খরিফ-২ তে) সুগন্ধি ধানের চাষ করা হয়। এ মৌসুমে প্রায় ১০% জমিতে সুগন্ধি ধানের আবাদ করা হয়। প্রধান পোলাও, বিরিয়ানি, কাচ্চি, জর্দা, ভুনা-খিচুড়ি, ফিরনি, পায়েশসহ আরও নানা পদের সুস্বাদু ও দামি খাবার তৈরিতে সুগন্ধি চাল বেশি ব্যবহার হয়। বিয়ে, পূজা-পার্বণ, সেমিনার, ওয়ার্কশপসহ সব ধরনের অনুষ্ঠানে সুগন্ধি চালের ব্যবহার অতি জনপ্রিয়। অনেক সচ্ছল পরিবারে, বনেদি ঘরে সাধারণ চালের পরিবর্তে সুগন্ধি (কাটারিভোগ, বাংলা মতি) সিদ্ধ চালের ভাত খাওয়ার রেওয়াজ অহরহ দেখা যায়।

 

ছক-১ : সুগন্ধি ধানের জাত ও তার বৈশিষ্ট্য

ক্রমিক নং

    জাত

  জাতের বৈশিষ্ট্য

মৌসুম ও  জীবনকাল ফলন 

ফলন (হেক্টরপ্রতি)

১.    

ব্রিধান-৩৪

আলোক সংবেদনশীল, কালিজিরার মতো দানা ছোট, ফলন কালিজিরার দ্বিগুণ, গাছের উচ্চতা ১১৭ সেন্টিমিটার।

আমন মৌসুমি, ধান পাকতে সময় লাগে ১৩৫ দিন, (১৯৯৭ সালে অবমুক্ত), উচ্চতা ১২৫ সেন্টিমিটার।

৩.৫ টন

২.   

ব্রিধান-৩৭ 

ধানের রঙ, চালের আকার কাটরিভোগের মতো, তবে কাটারিভোগের চেয়ে ৫-৭ দিন নাবি, ধানের আগায় শুঙ আছে। 

আমন মৌসুমি, ধান পাকতে সময় নেয় ১৪০ দিন, ১৯৯৮ সালে অবমুক্ত করা হয়।       

৩.৫ টন

৩.  

 ব্রিধান-৩৮

আলোক সংবেদনশীল, ধানের অগ্রভাগে শুঙ আছে, চালের আকার অপেক্ষাকৃত লম্বা ও সুগন্ধিযুক্ত, গাছের উচ্চতা ১২৫ সেন্টিমিটার।

আমন মৌসুমি, ধান পাকতে সময় নেয় ১৪০ দিন ১৯৯৮ সালে অবমুক্ত করা হয়। 

৩.৫ টন

৪.  

 ব্রিধান-৫০

(বাংলা মতি)    চাল লম্বা, চিকন ও সাদা। গাছের উচ্চতা ৮২ সেন্টিমিটার, ফলন খুব বেশি।

 বোরো মৌসুমে চাষ উপযোগী, এ জাতের জীবন কাল-১৫৫ দিন, ২০০৮ সালে অবমুক্ত করা হয়।   

৬ টন

৫.  

ব্রিধান-৬৩ (সরু বালাম)

অনেকটা পাকিস্তানি বাসমতির মতো লম্বা, সুগন্ধ নেই, তবে চাল মূল্যবান ও ভাতের স্বাদ বেশি। চাল সরু, রান্নার পর লম্বায় ভাতের আকার বাড়ে, গাছের উচ্চতা ৮৬ সেন্টিমিটার। 

বোরো মৌসুমে চাষযোগ্য, জীবন কাল ১৪৮-১৫০ দিন, এ জাত ২০১৪ সালে অবমুক্ত করা হয় ।   

৬.৭ টন

৬.   

বিনা ধান-৯

কালিজিরা ও ব্রি ধান-৩৮ এর চেয়ে ২৫-৩০ দিন আগে পাকে, এ দুটি (কালিজিরা ও ব্রি ধান৩৮) জাতের চেয়ে চাল চিকন লম্বা এবং ফলন বেশি।    

আমন মৌসুমি, জীবনকাল ১২৩ দিন, এ জাত ২০১২ সালে অবমুক্ত করা হয়।   

৩.৭ টন

৭.  

 বিনা ধান-১৩  

 সরু, লম্বা, সুগন্ধি চাল, কালিজিরা জাত থেকে উদ্ভাবিত, কালিজিরার তুলনায় বেশি উজ্জ¦ল, কিছুটা কালো বর্ণের।  

আমন মৌসুমি, জীবন কাল ১৩৮-১৪২ দিন, এ জাত ২০১৩ সালে অবমুক্ত করা হয়।   

৩.৫ টন

চাইনিজ, ইটালিয়ান, ইন্ডিয়ান হোটেল/ রেস্টুরেন্ট, পাঁচ তারকা হোটেল/ মোটেল পর্যটন কেন্দ্রে প্রধানত সুগন্ধি চালের ভাত, পোলাও নানা পদের খাবার পরিবেশনে সুগন্ধি চাল ব্যবহার করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এ দেশি অতি উন্নত মানের সুগন্ধি চালের জাতগুলো সম্বন্ধে ধারণা ও প্রচারণার অভাব দেখা যায়। এর ফলে নামি-দামি হোটেলে আমাদের জনপ্রিয় সুগন্ধি ধানের জাতগুলোর পরিবর্তে বিদেশি বাসমতি জাতের চাল ব্যবহার প্রচলন মাঝে মাঝে দেখা যায়। এ অবস্থার উন্নয়নে ও দেশি সুগন্ধি জাতগুলো যেন তারা নানা পদের খাদ্য তৈরিতে বেশি আগ্রহী হয়, সেজন্য সব ধরনের উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থা নেয়া অত্যাবশ্যক।
 

জাত
বিভিন্ন জেলায় অঞ্চলভিত্তিক প্রচুর সুগন্ধি ধানের জাত আছে। জাতগুলোর মধ্যে অধিকাংশই অতি সুগন্ধি। এ জাতগুলো প্রধানত চিনি গুঁড়া, কালিজিরা, কাটারিভোগ, তুলসীমালা, বাদশাভোগ, খাসখানী, বাঁশফুল, দুর্বাশাইল, বেগুন বিচি, কাল পাখরী অন্যতম। হালকা সুগন্ধযুক্ত জাতগুলোর মধ্যে পুনিয়া, কামিনী সরু, জিরাভোগ, চিনি শাইল, সাদাগুরা, মধুমাধব, গোবিন্দভোগ, দুধশাইল প্রধান।
প্রচলিত জাতগুলোর বেশির ভাগই হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ক্ষমতা তুলনামূলক অনেক কম। এজন্য সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রচলিত সুগন্ধি ধানের জাতগুলো উন্নয়নে ও নতুন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে তৎপর হয়। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে মোট ৫টি এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে দুটি মিলে এ দেশে মোট ৭টি সুগন্ধি ধানের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। অবমুক্ত করা এসব ধানের জাত ও তার বৈশিষ্ট্য ছক-১ এ তুলে ধরা হলো। (ছক-১ দেখুন)।

 

দেশি সুগন্ধি চাল জনপ্রিয়করণ ব্যবস্থা
এ দেশে উদ্ভাবিত ও প্রচলিত সুগন্ধি ধানের জাতগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে যেভাবে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল ততটা অনুসরণ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এ কারণে ঢাকাসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরের নামি-দামি হোটেল মোটেল ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এ দেশি সুগন্ধি চালগুলো থেকে তৈরি নানা পদের খাবার পরিবেশন অর্জন কাক্সিক্ষত মাত্রায় খুব একটা দেখা যায় না। উৎপাদক ও গবেষকদের এ চাল উৎপাদন এবং উদ্ভাবন তৎপরতার পাশাপাশি নামি-দামি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মোটেলে দেশি সুগন্ধি চাল ব্যাপকহারে জনপ্রিয়করণ ব্যবস্থা নেয়া সংশ্লিষ্ট সবারই কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে করণীয় দিকগুলোর কিয়দংশ তুলে ধরা হলো-
ক. গুরুত্বপূর্ণ হোটেল মোটেলগুলোর ও পরিবেশিত খাদ্যতালিকা নিরূপণ : ঢাকাসহ বড় বড় শহরস্থ নামি-দামি হোটেলগুলোর শুরুতেই একটা তালিকা তৈরি করে নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা চাল দিয় যেসব খাদ্য আইটেম তৈরি করে পরিবেশন করে থাকে সেগুলো সংগ্রহ করে নিতে হবে। নির্ধারিত সার্ভে ফরম তৈরি করে নিয়ে তা পূরণ ব্যবস্থা করা হলে কাক্সিক্ষত তথ্য বেরিয়ে আসবে। এরপর দেশের দামি বাবুর্চিকে (টমি মিয়া) দিয়ে আমাদের উপযোগী সুগন্ধি চাল দিয়ে সব ধরনের রেসিপি তৈরি করে নিয়ে তার ছবিসহ উপকরণ বিবরণী উল্লেখ করে উন্নত মানের আকর্ষণীয় রঙিন পুস্তিকা তৈরি করে নিতে হবে। সে আলোকে হাতে-কলমে এ রেসিপির অনুসরণে খাদ্য তৈরি করে তালিকাভুক্ত নামি-দামি হোটেলে প্রশিক্ষণ আয়োজনের মাধ্যমে হাতে-কলমে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বুদ্ধকরণ দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। এছাড়াও হোটেলগুলোর তালিকাবহির্ভূত কিছু নতুন রেসিপি চিহ্নিত করে তা ওইসব দামি হোটেলগুলোতে জনপ্রিয় করার ব্যবস্থা একইভাবে নিতে হবে। এ কাজের দায়িত্ব এআইএস, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এমনকি কে.জি.এফ এর মাধ্যমে নতুন প্রকল্প সহায়তা আকারে জনপ্রিয় করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন উদ্যোগ নিতে হবে।
খ. সুগন্ধি চালে তৈরি ফাস্ট ফুড : দেশ-বিদেশে আজ কাল নানা পদের আধা সিদ্ধ চালের সঙ্গে কিছু পরিমাণ ডাল, সবজি ও প্রক্রিয়াজাত মিট একত্রে মিশিয়ে ম্যালামাইন জাতীয় গ্লাসে বা মগে সংরক্ষণ করে তা সিল করে বিপণন করা হয়। ফাস্ট ফুড দোকান থেকে তা কিনে উপরের মোড়ক সরিয়ে তাতে পরিমাণমতো গরম পানি মেশানো হলে তা উপাদেয় পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। যুবক-যুবতী বিশেষ করে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এ খাবার অতি জনপ্রিয়। সুগন্ধি চাল দিয়ে এ ধরনের ফাস্ট ফুডের অনুকরণে তা তৈরি ও বিপণনে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিলে সুগন্ধি চাল জনপ্রিয়করণে গুরুত্বপূর্ণ একনতুন মাত্রা যোগ হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এ ফাস্ট ফুড তৈরির রেসিপি তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করে তা উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানকে তা বাজারজাত করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
গ. খাদ্য মেলার আয়োজন : এ উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থাকে বেগবান করতে হলে এলাকাভিত্তিক দিনব্যাপী কিছু সংখ্যক খাদ্য মেলার আয়োজন করার প্রয়োজন হবে। সেখানে বিদেশি মিশনসহ বিভিন্ন তালিকাভুক্ত হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মোটেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের জন্য দাওয়াত পত্র বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারীরা খাদ্য তৈরি প্রক্রিয়া ও দেশি সুগন্ধি চালের নানা গুণাগুণ সরেজমিন দেখে উদ্বুদ্ধ ও আকর্ষিত হবে।
ঘ. ভিডিও তৈরি করে তা সরবরাহ : দেশি সুগন্ধি চাল সংশ্লিষ্ট হরেক রকম খাবার ও এর তৈরি রেসিপির ভিডিও তৈরি করে নানা পদের আকর্ষণীয় খাবারগুলোর প্রচার উপযোগী দিকগুলো তা হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে সরবরাহ করে তাদের এ খাবার পরিবেশনে আকৃষ্ট করার ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশি সুগন্ধি চালের উপকারী ও আকর্ষণীয় দিকগুলো সুন্দরভাবে ভিডিওতে তুলে ধরে প্রচারের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সুগন্ধি চালের তৈরি খাদ্য পরিবেশন : রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যেন দেশি সুগন্ধি চালের তৈরি নানা পদের আকর্ষণীয় খাদ্য পরিবেশিত হয় সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও যেন একই পন্থা অবলম্বন করতে সক্রিয় হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
চ. বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যবহার : দেশি সুগন্ধি চাল ব্যবহার জনপ্রিয়করণের লক্ষ্যে গণমাধ্যম ব্যবহারের সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। সে মতে সরকারি/বেসরকারি রেডিওগুলোতে যেন সুগন্ধি চাল ও তা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন খাবারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়, তার সুব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে বিভিন্ন টেলিভিশনে কৃষি বিষয়ক সংশ্লিষ্ট সব অনুষ্ঠানে এমনকি টকশোতে দেশি সুগন্ধি চাল ও তা থেকে তৈরি খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে ব্যাপক প্রচার ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে।
ছ. ওয়ার্কশপ ও সেমিনার আয়োজন : দেশি সুগন্ধি চালের ওপর আঞ্চলিক ও কেন্দ্রীয়ভাবে সেমিনার/ওয়ার্কশপ আয়োজনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থাকবে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণবিদ, নামি-দামি হোটেলের বাবুর্চি, ম্যানেজার, উৎপাদনকারী ও বিভিন্ন মিডিয়া ব্যক্তিবর্গ। আলোচনায় যেসব সুপারিশমালা উঠে আসবে সে আলোকে উৎপাদনকারীরা প্যাকিং, গ্রেডিং, লেবেলিংয়ের মান উন্নয়ন এবং তা থেকে নিত্যনতুন সুস্বাদু খাবার তৈরি ও পরিবেশন জনপ্রিয়করণে সংশ্লিষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হবে।

 

সুগন্ধি চাল আমদানি ও রপ্তানি পরিস্থিতি  
এ দেশে সুগন্ধি চালের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি উৎপাদিত সুগন্ধি চালের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বিদেশিদের কাছে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রচলিত জাতগুলোর আকার ও আকর্ষণীয় সুগন্ধকরণে বিভিন্ন দামি খাবার তৈরিতে উপযোগিতা সুবিধার দিকগুলো বিবেচনায় এ দেশি সুগন্ধি চালের চাহিদা বহির্বিশ্বে প্রচুর রয়েছে। পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভারতের লম্বা-সরু বাসমতি চালের বিদেশে যে একচেটিয়া বাজার ছিল তা কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছে বলা যায়। বিচিত্র স্বাদ ও রুচির পরিবর্তন আনয়নে বিকল্প চাল হিসেবে এ দেশি সুগন্ধি চালের প্রতি আগ্রহ বিদেশিদের মাঝে বৃদ্ধি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বৈধ ও অবৈধ পথে এমন কি যাত্রীদের বিদেশ ভ্রমণকালে কয়েক কেজি সুগন্ধি চাল, এমনকি কাটারিভোগ জাতের সুগন্ধি চিড়া সঙ্গে নেয়ার আগ্রহ অহরহ লক্ষ করা যায়। এ চাহিদা পূরণে সাধারণ রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি স্বনামধন্য দেশি প্রক্রিয়াজাতকারকরাও পিছিয়ে নেই। তাদের হরেক পণ্যের সঙ্গে এ দেশি সুগন্ধি চাল সুন্দরভাবে প্যাকিং করে তা রপ্তানি করতে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে।
সুগন্ধি চাল রপ্তানির জন্য সরকারিভাবে বিদেশি বাজার সৃষ্টির বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা একান্ত দরকার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলায় সুগন্ধি চাল ও তা থেকে উৎপাদিত হরেক রকম খাবার প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হলে বিদেশি ক্রেতারা এ দেশি সুগন্ধি চালের প্রতি আরও আগ্রহী হবে। আমাদের বিদেশি মিশনগুলো দেশের বৈচিত্র্যময় সুগন্ধি চাল জনপ্রিয় করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এ সুগন্ধি চালের রকমারি খাবার উপস্থাপন করেও তারা ভোজন বিলাসীদের বিভিন্নভাবে আকৃষ্ট করতে পারে। ইউএন মিশনে বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার  ডিফেন্স অফিসিয়াল কর্মরত আছে। তাদের প্রদত্ত দায়িত্ব পালন ছাড়াও তারা বাংলাদেশী কালচার ও এদেশে উৎপাদিত পণ্য বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এদেশি সুগন্ধি চাল ও তা থেকে তৈরি রকমারি খাবার প্রচলন ব্যবস্থা নিয়ে তারাও অনন্য অবদান রাখতে পারে।
যেহেতু সুগন্ধি চাল একটা নন- পেরিশেবল আইটেম, সেলফ লাইফ ৫-৭ মাসেরও বেশি, এ জন্য ‘জলজ পথে’ কম খরচে দেশি সুগন্ধি চাল রপ্তানি সুবিধাকে কাজে লাগানো সহজ। রপ্তানির জন্য সুন্দর আকর্ষণীয় মোড়ক ব্যবহার ও তাতে বাংলাদেশের উপযোগী ব্র্যান্ড ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি এ সুগন্ধি চালের গুণাবলি ও বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার তৈরির সংক্ষিপ্ত নিয়মাবলি সংবলিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্যাকেটের উপরে বা ভেতরে ছোট ফোল্ডার আকারে প্রদানের ব্যবস্থা নিয়ে ক্রেতা সাধারণকে সহজেই আকৃষ্ট করা যাবে।
চাল মিলিং করা
এ দেশের প্রচলিত জাতের সুগন্ধি চাল মিলিং ব্যবস্থায় তেমন কোনো সমস্যা নেই। পাশাপাশি ঢেঁকি ছাঁটা সুগন্ধি চাল তৈরি করার প্রচলন এখনও মাঝে মাঝে দেখা যায়। দেশি পুরাতন মিল যা এ্যাংগেল বার দিয়ে তৈরি তাতেও দেশি সুগন্ধি চাল তৈরি করতে তেমন একটা অসুবিধা হয় না। তবে বাসমতি ধরনের সুরু-লম্বা চাল (বাংলা মতি, ব্রিধান-৬৩) মিলিং করা এ দেশের পুরনো মডেলের মিলিং যন্ত্র (এ্যাংগের বার বিশিষ্ট) দিয়ে সম্ভব হয় না। এ ধরনের বহু পুরানো মিলিং যন্ত্র ভরত অনেক আগেই সরকারিভাবে বাতিল করে আধুনিক অটো রাইস মিল সর্বস্তরে চালু করেছে। এ দেশে আধুনিক অটো রাইস মিল প্রচলন শুরু হলেও তার পাশাপাশি পুরাতন মডেলের চালের মিল এখনও রয়ে গেছে। বর্তমানে রাইস ব্রান থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদন প্রচলন বাড়ছে। পুরনো মডেলের রাইস মিল দিয়ে এ ব্রান প্রাপ্তি সম্ভব হয় না। এসব গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা বিবেচনায় ভারতের মোত একই পন্থা অবলম্বন করে পুরনো রাইস মিলগুলোর পুনর্বাসন উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
এ ধরনের প্রচার প্রচারণা ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে এ দেশের উৎপাদিত সুগন্ধি চালের ব্যবহার ও বাজার প্রসারিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বিধায় তার ইচ্ছা বাস্তবায়নে এ বিষয়ে  সংশ্লিষ্ট সবারই দেশের ও দশের বৃহত্তর স্বার্থে তৎপর হওয়া অত্যাবশ্যক।

 

কৃষিবিদ এম এনামুল হক*

*মহাপরিচালক (অব:), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর


Share with :

Facebook Facebook