কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

আমার বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির পিতা। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান রূপকার, বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের সার্থক অগ্রনায়ক। তিনি বিশ^ময় বাঙালি সমাজে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে সতত স্মরণীয়।


পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ও সামরিকতান্ত্রিক শাসন-শোষণের বলয় ভাঙার সংগ্রামে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারির সফল গণঅভ্যুত্থানে অনবদ্য নেতৃত্ব দেয়ার স্বীকৃতি হিসেবে এদেশের ছাত্র জনতা তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তৎকালিন ছাত্রনেতা, ডাকসুর ভিপি এবং বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ম-লির সদস্য বর্ষীয়ান জননেতা জনাব তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধু শব্দটি প্রথম ঐ  সমাবেশে উচ্চারণ করেন। সেই থেকেই এ তার ভুবন জোড়া পরিচয়, নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি যেমন সরল ও সহজবোধ্য তেমনি আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের আদি নাম বঙ্গ। বঙ্গ ও বঙ্গে যারা বাস করে তিনি তাদের অকৃত্রিম বন্ধু। তাই ‘বঙ্গবন্ধু’। এই উপাধি তার বিশ^াস, কর্ম ও আচরণের সাথে এতটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, তা সার্থকতার এভারেস্টশৃঙ্গসম উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। তাই তো তিনি আমাদের মনের মণিকোঠায় সর্বদা বীরত্বের ব্যঞ্জনায় সমাসীন বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মহানায়ক।


আমার আজকের এই লেখায় আমি স্মরণ করার চেষ্টা করছি ইতিহাসের এই মহানায়ক কখন থেকে কিভাবে আমার মনোজগতে স্মরণীয়দের তালিকার শীর্ষে স্থাপিত হলেন। আর সে কারণেই এই লেখার শিরোনাম ‘আমার বঙ্গবন্ধু।’


বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তবর্তী অধুনা চুয়াডাঙ্গা জেলার চিনিকল সমৃদ্ধ দর্শনা বাজারের কাছাকাছি ‘হৈবৎপুর’ নামের এক সত্যিকারের অজপাড়াগাঁয়ের এক কৃষক পরিবারে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এই গ্রামের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হলো ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় এ গ্রামের শতভাগ হিন্দু পরিবার পাশর্^বর্তী পশ্চিমবঙ্গে চলে যায় এবং আমাদের পরিবারসহ নিকটবর্তী পশ্চিম বঙ্গের জয়ঘাটা গ্রাম থেকে বিতাড়িত ২৫-৩০টি পরিবার এই গ্রামে বসতি স্থাপন করে। সেই বিবেচেনায় আমার বাবার বয়সী প্রজন্মই এক অর্থে নতুন করে স্থাপিত এই গ্রামের আদি বাসিন্দা যারা দ্বিজাতি তত্ত্বের নিষ্ঠুরতার শিকার, হিন্দু মুসলিম বিভাজনে ক্ষত-বিক্ষত এক মানবগোষ্ঠী। আমাদের জন্মের পর ১৯৬৫ সালে এই জনগোষ্ঠীকে আবার এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। আমাদের পরিবারের কিছুটা সচ্ছলতা থাকার সুবাদে একটি প্রশস্ত বৈঠকখানা ও বিস্তৃত উঠোন ছিল। এই বৈঠকখানা ও উঠোনে গ্রামবাসীদের বৈঠক, সলা পরামর্শ, এমনকি খেলাধুলাও হতো। এই যুদ্ধের সময় বৈঠকখানার আলোচনা থেকে আমরা প্রথম হিন্দু-মুসলমান বিভেদতন্ত্রের পাঠ গ্রহণ করি। রাজনীতির বিভিন্ন সংলাপ আমাদের মনোজগতে মানুষের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে নানান ধারণার  বীজ বপন করতে থাকে।


প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে পাশর্^বর্তী মেমনগর বিপ্রদাস উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই ১৯৬৮ সালে। এই স্কুলটি চিনিকলের শ্রমিক অধ্যুষিত দর্শনার সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় এ স্কুলে রাজনীতির প্রভাব ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায়। হাইস্কুলে ভর্তি হয়েই এ বিষয়টি টের পেলাম। মাঝে মধ্যেই স্কুলের বড় ভাইয়েরা মিছিল বের করতেন। সেই মিছিলে যোগ দিতে হতো আমাদের। বড় ভাইয়েরা দুই দলে বিভক্ত- একদলের নাম ‘ছাত্রলীগ’ অন্য দলের নাম ছাত্র ইউনিয়ন। সেই ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হিসেবে এই দুই দলের কোনো এক দলে না গিয়ে কোন উপায় ছিল না। আমরা ক’জন বন্ধু চিন্তায় পড়ে গেলাম কোন দলে যাব।


স্কুলের দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের ছাত্র এবং ৮ম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়া ক্লাসে প্রথমস্থান অধিকারী কেরামত আলী ভাই ছাত্রলীগ করেন। তারই সহপাঠী অত্যন্ত সুদর্শন ও সুবক্তা এবং স্কুল ফুটবল দলের গোলকিপার আজাদ ভাইও ছাত্রলীগ করেন। তাদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করলাম এবং তাদের সাথে মিছিলে যোগ দেয়া শুরু করলাম। এই মিছিলে একটি সতত উচ্চারিত অনিবার্য স্লোগান ছিল- ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো শেখ মুজিবকে আনবো’। তাদের বক্তৃতায় শুনতে থাকি কিভাবে শেখ মুজিব পাকিস্তানি সামরিকজান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কারাবরণ করেছেন। আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে শেখ মুজিবকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করতে চায়। এ অন্যায়, মস্ত বড় জুলুম, একজন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা  যিনি দেশকে, মানুষকে ভালোবেসে তাদের পক্ষ নিয়ে লড়াই সংগ্রাম করছেন তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হবে এ কেমন কথা। আমার কিশোর মনে সেই থেকে বীরত্ব ও বেদনার আখরে লেখা এক নামÑ শেখ মুজিব। এই নামের জপমালা কণ্ঠে ধারণ করে সেই থেকে আজ অবধি আমার পথ চলা।


এল ঐতিহাসিক ১৯৬৯ সাল। জানুয়ারিতেই তুমুল আন্দোলন। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন এক হয়ে আন্দোলন করছে। প্রতিদিনই আমাদের মিছিলে যেতে হয়। প্রবল উদ্দীপনা এবং উত্তেজনা। সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে পরাজিত করে রাজবন্দিদের মুক্ত করতে হবে। এ সময়েই আমার ‘রাজবন্দি’ শব্দের সাথে পরিচয়। কেমন যেন সম্ভ্রম উদ্যোগকারী শব্দ। শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায়-ভক্তিতে মাথা নত হয়ে আসে। তখন শেখ মুজিব, মওলানা ভাসানী এবং মনি সিং এই তিন নেতার নামে স্লোগান হতো বেশি। ঢাকায় ডাকসু নেতাদের তৎপরতার কথা আমরা আমাদের নেতাদের বক্তৃতায় শুনতাম। ঊনসত্তরের উন্মাতাল জানুয়ারির ২৪ তারিখ আইয়ুব খানের পতন হলো। আমাদের প্রতিদিনের স্লোগান- ‘আইয়ুব শাহীর গদিতে আগুন জ¦ালো একসাথে’ স্বার্থক হলো। সূচিত হলো ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। জানুয়ারির ২০ তারিখ পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের শহীদ হওয়ার অভিঘাতে এই গণঅভ্যুত্থান ত্বরান্বিত হয়। শেখ মুজিবসহ অন্যদের বিরুদ্ধ দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অবসান হলো। মাস খানেকের মধ্যেই শেখ মুজিব মুক্তি পেলেন কারাগার থেকে। সংগ্রামের বিজয়ে আনন্দে উদ্বেলিত ছাত্র জনতা ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত বিজয় উৎসব ও সংবর্ধনা সভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় ভূষিত করলেন। সেই থেকে তিনি বাঙালির অনন্তকালের বঙ্গবন্ধু আমারও বঙ্গবন্ধু। আমার কাছে এই নামের অর্থ হলো বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি ও বিশ^মানবের জন্য ভালোবাসা, তাদের কল্যাণের জন্য উৎসর্গকৃত এক চিরসংগ্রামী অমর মহামানবের প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধুর অগ্রজ প্রাতঃস্মরণীয় দুই মহান বাঙাালি কবির একজন ‘রবীন্দ্রনাথ’ তাঁর গানে ‘ঐ মহামানব আসে’ এবং অন্যজন ‘নজরুল’ তাঁর ‘আমি সৈনিক’ প্রবন্ধে মানবের দুঃখ বিনাশী এক মহামানবের আগমনের আগাম বার্তা ঘোষণা করেছিলেন। আমার কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তিদূতরূপী সেই মহামানব। ইতিহাসের পাতায় পাতায় কীর্তিময় আপন অবদানের স্বর্ণ খচিত স্বাক্ষর রেখে তিনি হয়ে আছেন মহীয়ান, গরিয়ান, অবিস্মরণীয়, চিরঞ্জীব।


জীবনের ছাপান্ন বছরের দৈর্ঘ্য এমন বড় কিছু নয় অথচ এই জীবন পরিধির ভেতরেই তিনি আধুনিক বাঙালি জাতিসত্তা সংগঠিত করেছেন। বাংলাদেশ নামের জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। ধর্ম, বর্ণ, কর্মের বিভাজনে নিপীড়িত, নির্যাতিত  মানবগোষ্ঠীর সহমর্মী ও সংগ্রামী নেতা হিসেবে তিনি ভুবনজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর একজন নগন্য ভক্ত ও একনিষ্ঠ অনুসারী এবং বাঙালি হিসেবে আমার প্রাণের গভীরে দেশপ্রেম ও মানব প্রেমের যে অনুপ্রেরণা সঞ্চারিত হয়েছে তা ধারণ করতে এবং লালন করতে পেরে আমি ধন্য। তাই ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি আমার কাছে অসম সাহসিকতা এবং সুগভীর দেশপ্রেম ও মানব প্রেমের সমার্থক এক প্রবল অনুপ্রেরণাসঞ্চারী মানব অভিধা।


ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হলেন আর এক সামরিক স্বৈরাচার ইয়াহিয়া খান। বঙ্গবন্ধু সময় ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে মনোযোগী  হলেন। নিজ দল আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে নিরন্তর সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন। চলতে থাকল ব্যাপক জনসংযোগ। লক্ষ্য, নির্বাচনে জয়ী হওয়া। নির্বাচনের দিন ধার্য হলো ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর। এই নির্বাচনে আমাদের নির্বাচনী এলাকায় এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলি) পদে ব্যারিস্টার আবু মোহাম্মদ আফজালুর রশীদ (বাদল ব্যারিস্টার নামে খ্যাত) এবং এমপিএ (মেম্বার অব প্রভেনশিয়াল অ্যাসেম্বলি) পদে অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী নৌকা মার্কা নিয়ে আওয়ামী লীগের হলেন। আমার জীবনে সেই প্রথম ভোটের মিছিলে শরিক হওয়া এবং ঘোড়ার গাড়িতে মাইক লাগিয়ে অ্যাড. ইউনুস আলীর পক্ষে ভোট চাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জন। এই নির্বাচন উপলক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু চুয়াডাঙ্গা কলেজের বিশাল মাঠে জনসভা করতে আসবেন জেনে আমাদের মাঝে সে কী বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা! বঙ্গবন্ধুকে দেখার প্রবল উত্তেজনা নিয়ে আমরা স্কুল থেকে দর্শনা এবং দর্শনা থেকে রায়টার লোকাল নামের ট্রেনে চেপে যখন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের মাঠে এসে পৌঁছলাম-তখন সভাস্থলে লোকে লোকারণ্য। মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে দোতালা ঘর সমান উঁচু করা বিশাল মঞ্চ। হেমন্তের অবিস্মরণীয় সেই বিকেলে আকাশ জোড়া মেঘ রৌদ্রের খেলা। অনর্গল বক্তৃতা চলছে স্থানীয় নেতাদের। মঞ্চের আশপাশজুড়ে দড়িতে ঝুলছে “সোনার বাংলা শ্মশান কেন?” শিরোনামের সেই অসাধারণ পোস্টার। যে পোস্টার খুব যৌক্তিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে-পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের এক দ্রোহ উদ্যোগকারী চিত্র। আমার আজও মনে হয় ঐ পোস্টার সাধারণ বাঙালির মনে পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি যে তীব্র ঘৃণার রেখাপাত ঘটিয়েছিল-তার তুলনা মানব সভ্যতার ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। আমি আজ অবধি ঐ পোস্টারের তুল্য কোন রাজনৈতিক পোস্টার দেখিনি।


বিপুল স্লোগান আর করতালির মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাস্থলে এলেন। বর্ণনাতীত সেই দৃশ্য। তিনি হাত নেড়ে জনতার প্রতি অভিনন্দন জানাচ্ছেন। আবার উচ্ছ্বসিত উদ্বেলিত জনতার অভিবাদন গ্রহণ করছেন। সেই প্রথম দেখলাম বঙ্গবন্ধুকে। আমার মনের মণিকোঠায় অম্লান হয়ে রইল সেই স্মৃতি। তার সফেদ পাঞ্জাবি শোভিত সুদর্শন চেহারা ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরলেন। ছয় দফা ও ১১ দফা দাবিভিত্তিক নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে, বাঙালির অধিকার নিয়ে কথা বললেন। জনগণকে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানালেন। উপস্থিত জনতাকে তার আহ্বানে সাড়া দেয়ার সমর্থক সূচক হাত তোলার আমন্ত্রণ জানালে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সূচনা হলো। লক্ষ জনতার উত্তোলিত হাত, তারপর মহুর্মুহু হাততালি। হাততালি যেন থামতেই চায় না। সভাশেষে আমরা ঘরে ফিরলাম-যেন দেশাত্মবোধে প্রবলভাবে উদ্বুদ্ধ এক নতুন মানুষ। এই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের বিস্ময়কর বিজয় ঘটল। জাতীয় পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হলেন।


সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরের ঘটনা আমাদের সবার জানা। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান ও তার দোসর জুলফিকার আলী ভুট্টো গং নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সরকার গঠন করার আহ্বান জানানোর পরিবর্তে নানান ছলচাতুরি ও ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকলেন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত চলল এই খেলা। পরিস্থিতি ও পরিণতি আঁচ করতে পেরে বঙ্গবন্ধু তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূর্ণ করতে প্রস্তুত হলেন। মার্চ মাসের ৭ তারিখে রেসকোর্সের মাঠে লক্ষ লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে উচ্চারণ করলেন প্রতিটি বাঙালির মনের কথা। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। ভাষণের শেষের এই কাব্য পঙ্ক্তিতে বাঙালির শোষণমুক্তির চিরকালীন আকাক্সক্ষা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হলো। তাঁর সেই ১৭ মিনিটের কাব্যময় ভাষণ বিশে^র ইতিহাসে মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকঠিন ঐক্যে সংযুক্ত করার এক অনন্য ঐতিহ্যের দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। আমরা রেডিও মারফত সেই ভাষণ শুনে প্রবল উদ্দীপনায় শিহরিত ও আবিষ্ট হলাম। তার তুল্য উদ্দীপনার কোনো ঘটনা বুঝি এ জীবনে আর ঘটেনি। ঘরে ঘরে সাজ সাজ রব, যুদ্ধের প্রস্তুতি। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা বিস্ময়করভাবে আন্দোলিত। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু হলো। ২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরপরাধ বাঙালির ওপর। সবার আগে আক্রান্ত হলো ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, পিলখানার ইপিআর ক্যাম্প ও রাজারবাগের পুলিশ হেডকোয়ার্টার এবং বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করা হলো। বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু বন্দি হবার আগেই তাঁর সহযোগিদের সহায়তায় ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) এর ওয়ারলেস সিস্টেমে প্রচার করার জন্য প্রস্তুত করে রাখেন স্বাধীনতার ঘোষণা। সেই ঘোষণা প্রচারিত হলো চট্টগ্রাম বেতারের কালুর ঘাট কেন্দ্র থেকে। বঙ্গবন্ধুর নামে প্রথমে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান এবং তারপর মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন। স্ফুলিঙ্গের মতো তা ছড়িয়ে পড়ল দিকবিদিকে। আমাদের গ্রামে তখন একটি মাত্র রেডিও। সিরাজুল ভাই এরই শ^শুর বাড়ি থেকে পাওয়া। আমরা সেই রেডিওর চারপাশে জড় হই, শুনি স্বাধীনতার অমিয়বাণী, দেশাত্মবোধক গান। সে এক অনন্য সময় আমাদের কৈশরকে উন্মাদনায় উদ্বেলিত করে তুলল। আমাদের বড়রা, যারা স্কুলের গ-ি পেরিয়ে কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ে পড়েন তারা চলে গেলেন যুদ্ধে। গ্রামগুলো যুবকশূন্য হয়ে গেল। আমরা যারা বয়সের কারণে যুদ্ধে যাবার যোগ্য হয়ে উঠিনি, তারা রয়ে গেলাম গ্রামে। গভীরতর দুশ্চিন্তার বিষয় হলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি কোথায় আছেন? কেমন আছেন? আদৌ বেঁচে আছেন কি না? এসব বিষয়ে মুখে মুখে নানা কথা রটতে থাকল। পাকিস্তান রেডিও নিশ্চিত করে বলছে বঙ্গবন্ধু বন্দি অবস্থায় তাদের কারাগারে আটক রয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী সন্তানেরা কে কোথায় আছেন? কেমন আছেন? সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে সেই জিজ্ঞাসাও নিরন্তর স্পষ্ট। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বলছে বঙ্গবন্ধু মুক্ত আছেন। পরে ধীরে ধীরে খোলসা হলো বঙ্গবন্ধু সত্যি সত্যিই পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। মুরব্বিরা, মা-বোনেরা নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন বঙ্গবন্ধুর জীবন ভিক্ষার। এপ্রিল মাসের ১৭ তারিখে এক আশাজাগানিয়া ঘটনা ঘটলো। চুয়াডাঙ্গার খুব কাছে মেহেরপুরে সদর থানার দৈন্যনাথ তলার (পরবর্তীতে মুজিব নগর) আম বাগানে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠিত হল বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে। উপ-রাষ্ট্রপতি ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম আর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সকল সঙ্কটকালের অনুগত সঙ্গী তাজউদ্দীন আহমেদ এই সরকার মুজিবনগর সরকার নামে খ্যাত হল। যুদ্ধ চলল ৯ মাস ১১টি সেক্টর জুড়ে। সেই সাথে বর্ষাকাল জুড়ে প্রবল বন্যা। মানুষের দুঃখ দুর্দশার সীমা রইল না। আমাদের গ্রামের দক্ষিণে ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন বারাদী গ্রামে প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প হলো জুন মাসের দিকে। এ ক্যাম্পে প্রায় সকল মুক্তিযোদ্ধাই আমাদের মেমনগর স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। লিয়াকত, বিল্লাল, নূরহাকিম, রঞ্জু, মোবারক, নওশের, গোলাম হোসেন প্রমুখ। একগুচ্ছ টগবগে তরুণ। তারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ভারতের দেরাদুন থেকে। লিয়াকত আলী এদলের কমান্ডার। ওপারের বানপুরের ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজের পরবর্তীতে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও সংসদ সদস্য নেতৃত্বে আর একদল মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নিলেন। এর কিছুদিন পরে আমাদের গ্রামে চার সদস্যের মুজিব বাহিনী ক্যাম্প করল সিরাজুল ভাইয়ের পরিত্যক্ত বাড়িতে। এ দলের নেতা রহমতুল্লাহ তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেছেন। তার সাথে আছেন আজাদুল ইসলাম (বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক), মির্জা শাহারিয়ার লন্টু, মির্জা সুলতান রাজার ছোট ভাই ও বর্তমানে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও আরাফাত মাস্টার মদন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক বিএসসি শিক্ষক। সবাই সুশিক্ষিত। তারা গ্রাম গ্রামান্তরে ঘুরে যুদ্ধের পক্ষে মানুষের মনোবল অটুট রাখা এবং নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন করতে লাগলেন। এরপর আমাদের গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের ছোটবলদিয়া গ্রামে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের আর একটি ক্যাম্প হল। এ ক্যাম্পের অনেক যোদ্ধাই আমাদের উত্তর পাশের মদনা গ্রামের যুবক। রেজাউল করিম এদের কমান্ডার। মোফাজ্জল, আশরাফ, লুৎফর আছেন এই দলে। আমাদের গ্রামের একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী ৮নং সেক্টরের অন্যত্র যুদ্ধরত। বারাদী, বানপুর ও ছোট বলদিয়া থেকে মুক্তিযোদ্ধারা নিয়মিত পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে গেরিলা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে লাগলেন। আমাদের জীবন হয়ে উঠল হুমকির সম্মুখীন। তাছাড়া আমাদের বাড়িতে মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত আসা যাওয়া, বিশ্রাম নেয়া ও খাওয়া দাওয়া করার বিষয়টি নিয়ে এক শ্রেণির লোক আমার বাবা-মায়ের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালাতে থাকলেন। বাবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলেন। কিন্তু মা পরম মমতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান স্নেহে খাবার যোগাতে লাগলেন। আমাদের কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য খাবার পৌঁছে দেয়া-তাদের হুমুক শোনা। এতেই আমরা ছোটরা হাফ মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেলাম। সেসময় আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে চুয়াডাঙ্গা ও দর্শনা থেকে আসা আমাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি পরিবার। তাদের মধ্যে বিক্রমপুর সানোয়ার দর্জির স্ত্রী-কন্যা সন্তান প্রসব করলেন। আমরা এই সদ্যজাত শিশুর নাম রাখলাম মুক্তি। আমাদের গ্রাম চারবার আক্রান্ত হলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দ্বারা। গ্রামের অদূরে ভারত সীমান্ত হওয়ায় এবং পাকিস্তানি মিলিটারি আগমণের আগাম সংবাদপ্রাপ্তির সুবাদে আমরা চারবারই পালিয়ে বাঁচলাম। কিন্তু পাশের গ্রামের ৪ জন কৃষক এবং একজন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রাণ দিতে হলো আমাদের মাঠে সম্মুখ সমরে। মুজিব বাহিনীর সদস্যরা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান সৌভাগ্যক্রমে। যুদ্ধ শেষে সেসব ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে আমার। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম আব্দুল মান্নান আর কৃষকেরা হলেন- আবু ইছাহাক, আবুদাউদ, জুড়ন ম-ল ও বাহার আলী। বাহার আলী ছিল পলিও আক্রান্ত কিশোর। এদের স্মরণে আমাদের গ্রামে সম্প্রতি একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে আমাদের ইউপি চেয়ারম্যান জাকারিয়া আলমের প্রচেষ্টায়। যুদ্ধে গুলি খাওয়ার ক্ষত চিহ্ন নিয়ে এই স্মৃতিসৌধের পরিচর্যা করছে টুকু মিয়া। যার ভাই মোহাম্মদ আলী ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এবং বাবা মোতাহার হোসেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।


মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্যে বেড়ে উঠতে উঠতে আমরা আসল বয়সের তুলনায় অধিক বয়সী হয়ে উঠলাম। আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া আমার ফুফাতো বোনের স্বামী ইলিয়াস হোসেন মাস্টারের একটি করাচি নির্মিত ফিলিপস তিন ব্যান্ডের রেডিও ছিল। এই রেডিওতে আমরা নিয়মিত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ “বজ্রকণ্ঠ” শুনতাম। বজ্রকণ্ঠ প্রচারের সাথে প্রায় অবধারিতভাবে যুক্ত হতো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত দুটি অবিস্মরণীয় গান- ‘শোন একটি মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’/‘আকাশে বাতাসে ওঠে রণি/’ এবং মুজিব বাইয়া যাওরে-/ নির্যাতিত দেশের মাঝে, জনগণের নাও  রে/ মুজিব বাইয়া যাওরে।’ এমআর আকতার মুকুলের জল্লাদের দরবার ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। এসব ছাড়াও নিয়মিত গান ও কবিতা প্রচারিত হতো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী।’ ‘ওভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’/‘সোনা সোনা সোনা... লোকে বলে সোনা’/ ‘কারার ঐ লৌহকপাটÑএই শিকলপরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল’/ রবীন্দ্রাথের অমোঘ বাণী ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই/নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ নজরুলের কাব্য পঙ্তি ‘হিন্দু না ওরা মুসিলম ্ঐ  জিজ্ঞাসে কোন জনকা-ারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার বা ‘ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হয় ভারতের দিবাকর/আমাদের খুনে রাঙিয়া সে রবি উদিবে পুনর্বার’ আকাশবাণীর দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়ের বৈশিষ্টম-িত কণ্ঠের সংবাদ পাঠ শুনতে আমরা উৎসুক হয়ে থাকতাম। এ সঙ্কটকালে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিশেষত বিবিসির মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হলাম বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে আটক আছেন এবং তার বিচার চলছে। মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রাণন্ত চেষ্টা করছেন বিশ^জনমত গঠন করে বঙ্গবন্ধুর বিচার বন্ধ করতে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করতে। ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীও মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তির। একদিকে রণাঙ্গনের লড়াই অন্যদিকে বিশ^জনমতকে পক্ষে নেয়ার প্রবল প্রচেষ্টা। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল বাঙালি বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নেয়া এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ত্বরান্বিত করার প্রক্রিয়া নিয়ে বিপুল তৎপরতায় লিপ্ত। এসব খবর আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছাড়াও আকাশবাণী ও বিবিসির মাধ্যমে নিয়মিত জানতে পারছি। শেষবার সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ তারিখে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের গ্রাম আক্রমণ করে সেবার তারা এই রেডিওটি আছাড় মেরে ভেঙে পদপৃষ্ঠ করে রেখে যায়। আমরা গভীরভাবে বেদনাহত হই। এই ঘটনা থেকে আমরা উপলব্ধি করি চুরমার করে পাক     বাহিনীর সদস্যদের রেডিওর ওপর কী প্রবল আক্রোশই না ছিল।


১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সে পাকিস্তানের সেনাপতি এনকে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করলে আমরা স্বাধীন হলাম। পরমারাধ্য স্বাধীনতা এখন আমাদের হাতের মুঠোয়- সে এক অনির্বচনীয় উপলব্ধি। যারা এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি তাদেরকে এই আনন্দের উচ্ছ্বাস বোঝানোর কোন যুতসই ভাষা বুঝি এখনো আবিষ্কার হয়নি।


আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। আনন্দের জোয়ার বইল। কিন্তু তবু বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন স্বদেশে ফিরে না পাওয়ার বেদনা আমাদের প্রতি মুহূর্তে উদ্বিগ্ন করে রাখল। তারপর এলো সেই সোনালি দিন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে এলেন আমাদের মাঝে। আমরা রেডিওতে ধারা বর্ণনা শুনি আর আনন্দাশ্রুতে ভাসি। বঙ্গবন্ধুর ক্রন্দনসিক্ত কণ্ঠস্বর আজও কানে বাজে “কবিগুরু দেখে যাও আমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে”।


শুরু হলো নতুন দেশের নবযাত্রা। হাল ধরলেন বঙ্গবন্ধু। আমরা ফিরে এলাম স্কুলে। লুটপাটে বিধ্বস্ত বিবর্ণ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অর্ধশতাব্দি বয়সী ঐতিহ্যবাহী স্কুল। দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলো ফিরে আসছে, চলছে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজ। অক্লান্ত বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীরা নিরন্তর সচেষ্ট থেকে কাজ করছেন পুনর্গঠনের। এর মধ্যে খবর পেলাম বঙ্গবন্ধু যশোরে আসবেন। জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন স্টেডিয়ামে।


আমাদের দর্শনা থেকে যশোর ৫২ মাইল দূরে। তাতে কি? অনেক চেষ্টায় কেরু কোম্পানির একটি ট্রাক যোগাড় করা গেল। এই খোলা ট্রাকে দাঁড়িয়ে আমরা ছাত্রলীগের কর্মীরা গেলাম- স্বাধীনতার মহানায়ককে সালাম জানাতে, তাঁকে একনজর দেখতে। স্টেডিয়ামের কাছে ট্রাক নিয়ে যাওয়া গেল না, মানুষের ঢল নেমেছে। আমরা জনস্রোতে মিশে স্টেডিয়ামের দিকে প্রবাহিত হচ্ছি। পাছে হারিয়ে না যাই- সেজন্য একজন আর একজনের কোমর ধরে বা হাত ধরে এগোচ্ছি। অনেক কষ্ট করে পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে শেষ পর্যন্ত স্টেডিয়ামের এক কোনায় ঠাঁই নিতে পারলাম। দুচোখ সার্থক হলো ইতিহাসের মহানায়ককে দেখে, শ্রবণ ধন্য হলো-তার দেশ গড়ার মন্ত্রে উজ্জীবিত ভাষণ শুনে। এরপর বঙ্গবন্ধুকে শেষবার দেখি ১৯৭৩ সালের ২২ জুলাই ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে। ছাত্রলীগের মহাসম্মেলনে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এ দিনটিও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দেড় বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ দুই ভাগ হয়ে গেল এই দিনে। মহান মুক্তিযুদ্ধে যে সংগঠন অনন্য ভূমিকা পালন করেছে সেই সংগঠনের এই পরিণতি ছিল অতীব দুঃখজনক। রাষ্ট্রবিপ্লবের ইতিহাসে প্রতিবিপ্লবের দৃষ্টান্ত নেহাত কম নয়। বাংলাদেশের ললাটেও সেই দৃষ্টান্তের কালিমা লেপনের অপপ্রয়াস শুরু হলো যুদ্ধ ফেরত এক শ্রেণির অতিবিপ্লবীদের দ্বারা। আ স ম আব্দুর রব ও শাহজাহান সিরাজের প্রকাশ্য নেতৃত্বে এবং সিরাজুল আলম খানের নেপথ্য প্ররোচনায় রাতারাতি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচারণায় লিপ্ত হলো এক অপশক্তি। তাদের সাথে দ্রুত যুক্ত হলো মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাক বাহিনীর এদেশীয় দালালরা। ছাত্রলীগের একাংশ রব-সিরাজপন্থী অন্য অংশ নূরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল কুদ্দুস মাখনপন্থী। আমরা হতচকিত হলাম কিন্তু দিকভ্রষ্ট হলাম না। সিদ্ধান্ত নিলাম সম্মেলনে যাব এবং বঙ্গবন্ধু যাদের সাথে থাকবেন আমরাও তাদের সাথে যোগ দেব। ভরা শ্রাবণ, হার্ডিঞ্জ সেতু ভাঙা। দর্শনা থেকে ভেড়ামারা ট্রেনে এসে তারপর নৌকায় চড়ে উন্মত্ত পদ্মা নদী পাড়ি দেয়া, সে এক ভীষণ ঝুঁকি। নৌকায় উঠে আমাদের বন্ধু মোসাহেব কান্নাকাটি শুরু করল এবং ঢাকায় না যাওয়ার জন্য বায়না ধরল। আমরা তাকে ‘মরণ ভিতুর ডিম’ আখ্যায়িত করে ফেরত পাঠালাম। তারপর পাকশী থেকে ঈশ^রদী, ঈশ^রদী থেকে ট্রেনে সিরাজগঞ্জ ঘাট। এই ঘাটে এসে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলাম। ছাত্রলীগের সম্মেলন উপলক্ষ্যে যে লঞ্চের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তাতে এত পরিমাণ ছাত্র উঠেছে যে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আমাদের দলের সিনিয়র ভাই আনোয়ারুল ইসলাম বাবুর বাড়ি সিরাজগঞ্জে। তিনি অনেক কষ্ট করে আবারো একটি নৌকা  ভাড়া করলেন, আমরা সেই নৌকায় চড়ে রওনা দিলাম। হাকলবেরী ফিনের সমুদ্রযাত্রা যেন। বাইরে যতই সাহস দেখাই না কেন বুক দুরু দুরু কাঁপছে। বড় বড় ঢেউয়ের দুলনীর সময় বার বার মনে হচ্ছে মোসাহেবই বুঝি ঠিক করেছে। কিন্তু তবু ঢাকায় যেতে হবে। আমরা স্কুলে ছাত্রলীগের নেতা। সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। আমাদের ভিতু হলে চলবে কেন। একবার প্রবল বাতাসে আর স্রোতের টানে আমাদের নৌকা ডুব চরে আটকে গেল। লুঙ্গি-গামছা পরে সাহসী কয়েকজন নদীতে নেমে নৌকা ঠেলে আবার চালানোর মতো জায়গায় নিলে আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে এসে ট্রেনে উঠব কিন্তু কোনো যাত্রীবাহী বগিতে ঠাঁই পেলাম না। ঠাঁই মিলল মালবাহী বগিতে। যেখানে বমন উদ্রেগকারী শুঁটকি মাছের গন্ধ। তবু ঢাকায় যাওয়া চাই। শুনতে হবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। যে ভাষণে থাকবে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। দেড় দিনের যাত্রা শেষে আমরা যখন কমলাপুর স্টেশনে নামলাম তখন আর আমাদের হাঁটার ক্ষমতা নেই। তাতে কি? আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম, আমাদের পৌঁছাতেই হবে গন্তব্যে। গন্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা টিএসসি বরাবর আসার পর নানা উল্টাপাল্টা খবর শুনতে লাগলাম, রব-সিরাজের নেতৃত্বে পল্টনের মাঠে আয়োজিত সম্মেলনে যাবেন বঙ্গবন্ধু। অপর পক্ষ বলছে না তিনি রেসকোর্সে সিদ্দিকী-মাখন গ্রুপের সভায় আসবেন। কেউ কেউ বলছেন তিনি কোনোটাই যাবেন না। আমরা মহসীন হলে অবস্থান নিলাম। রাতে থাকতে হবে। পর দিন সম্মেলন। পরিস্থিতির কারণে আমরা মুখ খুলছি না কোন দিকে যাব। পরদিন সকালে গুজবের অবসান ঘটল। জানা গেল বঙ্গবন্ধু আসবেন রেসকোর্সে, আমরা প্রসন্ন হলাম। আমরা রেসকোর্সের সম্মেলনে গেলাম। এই সেই রেসকোর্স যেখানে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে ভাষণ দিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এখানে আত্মসমর্পণ করেছে পরাজিত পাকিস্তানের সেনাপতি নিয়াজি। আমরা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনলাম। মনোকষ্ট আর আবেগের সংমিশ্রণ ছিল সেই ভাষণে। নিজ হাতে গড়া সংগঠনের এই পরিণতি তার জন্য সহজভাবে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না।


আমরা বিভক্তির বেদনা বুকে চেপে রেখে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আবারো যাত্রাপথের দূরত্বতা অতিক্রম করে ঘরে ফিরলাম। সামনে সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের এসএসসি পরীক্ষা, সে দিকেই মনোযোগ দিতে হবে এখন।


এসএসসি পরীক্ষা হলো গোলেমালে। ভালো পরীক্ষা হওয়ার কোন কারণ ছিল না। এত বড় যুদ্ধের ধাক্কা-স্কুল ও ছাত্র শিক্ষকদের পরিবারের বেহাল অবস্থা এবং সর্বোপরি ক্লাস নাইনে পড়ার সুযোগ না পাওয়া  এসবই পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচ্চ্য। সকল ক্লাসের শিক্ষার্থীদের জন্য ১৯৭১ সালের না পড়া ক্লাসটি অটো প্রমোশনের আওতায় নেয়া হয়। এসএসসির সিলেবাস কমিয়ে ৯০০ নম্বরের পরীক্ষা নেয়া হয়। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলে দেখা গেল যারা অনেক ভালো ফলাফল করার কথা তারা তা করতে পারেনি। আমরা মাত্র তিনজন ফাস্ট ডিভিশনে পাস করলাম। এরপর কলেজে পড়ার পালা।


১৯৭৪ সালের শুরুতে ভর্তি হলাম যশোর এমএম কলেজে। বড়ই বিশৃঙ্খল অবস্থা। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবণতি ঘটতে লাগলে, আ স ম আব্দুর রবের ও মেজর জলিলের জাতীয় সমাজতন্ত্রী দল গোপন শাখা গণবাহিনী গঠন করলো। চীনপন্থী বিপ্লবীরা তখনও অর্জিত স্বাধীনতা গ্রহণ করতে পারিনি তারা পূর্ববাংলা বিপ্লবী কমিউিনিস্ট পার্টির নামে অরাজকতা শুরু করল। ভারতের নক্সাল আন্দোলনের নেতা চারুমজুমদারের অনুসারী কেউ কেউ রাতারাতি সমাজবিল্পব সমাধা করার জন্য শ্রেণি শক্র খতমের নামে অরাজকতা শুরু করল। সিরাজ সিকদার এই ধারার বিপ্লবী নেতা। আওয়ামী লীগের সাথে ন্যাপ (মোজাফফর) ও কমিউনিস্ট পার্টি (মনিসিং) আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় এগিয়ে এলো। কিন্তু অরাজকতা বেড়েই চলল। আমাদের নিজ থানা দামুড়হুদা-আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আবুল কালামকে হত্যা করা হলো, কুষ্টিয়া-কুমারখালীর এমপি গোলাম কিবরিয়াকেও। মুক্তিযোদ্ধের পরাজিত শক্তি এদেশীয় দালাল রাজাকার আলবদরদের পরিবার এই শক্তির সাথে মিশে ইন্ধন যোগাতে লাগল। যুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১ কোটি মানুষের পুনর্বাসন, বিধ্বস্ত অবকাঠামো কার্যাপেযোগী করা, শূন্যের অবস্থান থেকে অর্থব্যবস্থাকে একটি চলনসই কাঠামোর দাঁড় করানো ইত্যাদি বড় বড় চ্যালেঞ্জও মোকাবিলায় যখন সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার কথা তখন এই বিভক্তি ও বৈরিতা ছিল নিতান্তই অনভিপ্রেত ও অপ্রত্যাশিত। ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা ঘোষণা করা হয়েছে। কাজেই তার দায়দায়িত্বের শেষ নেই। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সাহায্যের জন্য দুনিয়ার দেশে দেশে হাত পেতে তিনি যে সহযোগিতা পাচ্ছেন


Share with :

Facebook Facebook