কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় আজকের কৃষি

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ১৯৭১ সালে এ দেশের মুক্তিপাগল মানুষ পরাধীনতার শিকল ভাঙ্গতে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র-বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ আর বঞ্চনার শিকার ছিল এই বাংলা । এ বাংলার অর্থনীতির অবস্থান ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল  শোষণমুক্ত, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে সোনালি ফসলে ভরপুর দেখতে চেয়েছিলেন। সে কারণে স্বাধীনতার পর তিনি ডাক দিয়েছেন সবুজ বিপ্লবের, কৃষিকে দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব। কৃষকের সব বকেয়া খাজনা ও সুদ তিনি মাফ করে দেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরতরে মওকুফ করেন। ১৯৭২-৭৩ সালে ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দে ১০১ কোটি টাকা তিনি রাখেন শুধু কৃষির উন্নয়নে। কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক ও আনুষঙ্গিক উপকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, সেচ সুবিধা সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে  ১৯৭২ সালে ১৬ হাজার ১২৫ টন উচ্চফলনশীল ধানবীজ, ৪৪ টন পাটের বীজ, এক হাজার ৩৭ টন গমের বীজ বিতরণের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের অগ্রযাত্রা সূচিত করেন। টেকসই কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে গবেষণাসহ কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী, ইক্ষু গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং পুনর্গঠন করেন। তিনি আধুনিক ও উন্নত কৃষির প্রয়াসে কৃষি শিক্ষায় মেধাবীদের চাকরিতে আকৃষ্ট করে উন্নত কৃষি ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে, কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদান করেন। তাঁর এই যুগান্তকারী পদক্ষেপে দেশের মেধাবী সন্তানগণ আগ্রহী হয় কৃষি পেশায়।    


বঙ্গবন্ধুর প্রাণাধিক চেয়েও প্রিয় ছিল বাংলার কৃষক। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন এ দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ লোক ছিল কৃষির উপর নির্ভরশীল। তিনি বলেছিলেন, ‘গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে। কেননা গ্রামই সব উন্নয়নের মূল কেন্দ্র। গ্রামের উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন যখন বেগবান হবে, তখন গোটা বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।’ তাঁর অদম্য ইচ্ছা ছিল যে কোনো উপায়ে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা। কেননা কৃষকরাই এ দেশের উন্নয়নের আসল নায়ক যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের সবার অন্ন জোগায়। কৃষকদের চলমান চাহিদা যথোপযুক্তভাবে নিশ্চিত করতে পারলে কৃষক অনেক আগ্রহে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেকে বিনিয়োগ করতে পারবে। উন্নয়নের জোয়ার বইবে তখন।


বঙ্গবন্ধু কৃষিপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের স্বপ্নবীজ বুনেছিলেন। তিনি পাট, চা, পশুর চামরা, মৎস্য, বনজসম্পদ ইত্যাদি রপ্তানি করে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রয়াস নিয়ে ছিলেন। স্বাধীনতার পর স্বাধীনতাবিরোধীদের কুৎসিত ষড়যন্ত্রে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ জাতির পিতা সপরিবারে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন। থমকে যায় উন্নয়নের চাকা। এই বাংলার দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রের হাত থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাইনি বহুকাল। ১৯৯৬-২০০১ সনে বাংলার আপামর মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর কৃষিভিত্তিক মিশন আর ভিশনকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সফল প্রধানমন্ত্রী কৃষকরত্ন শেখ হাসিনা জাতির পিতার অসমাপ্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে সর্বপ্রথম খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। এর ফলশ্রুতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ভূষিত হন জাতিসংঘের গৌরবময় সেরেস পদকে। পরবর্তীতে সরকার বদলের প্রেক্ষিতে সে উন্নয়নের ধারা চরমভাবে ব্যাহত হয়।


২০০৯ সালে এ আওয়ামী লীগ সরকার আবার রাষ্ট্র পরিচালনায় এলে দেশের উন্নয়নের চাকা আবার সচল হতে থাকে। জাতিসংঘের হিসেব খাতায় আমাদের দেশ ছিল স্বল্পউন্নত দেশের কাতারে। সেখান থেকে উন্নয়নশীল দেশের সম্মানে উন্নীত হতে আর্থসামাজিক সকল সূচক অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। আর এ সম্মান অর্জন সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারের সৎ, দক্ষ ও সাহসী, নেতৃত্বের কারণে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে-এই মূলমন্ত্রের প্রতি অবিচল থেকে বর্তমান সরকার কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুধা, অপুষ্টি, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ১৯৭১-৭২ সালে খাদ্যশস্যের উৎপাদন হয়েছিল ৯৭ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন হয়েছে ৪১৩.২৫ লাখ মেট্রিক টন  বাংলার শস্যভা-ার আজ কানায় কানায় পূর্ণ, খাদ্য স্বল্পতার দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।


সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টা, বিনিয়োগ, সময়োপযোগী নীতি-পদক্ষেপ এর ফলে কৃষি উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত হয়েছে ধানের ১০৮টি জাত খরা, লবণাক্ত ও জলাবদ্ধতা, জিংকসমৃদ্ধ এবং স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন কৃষি ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গম, আলু, ভুট্টা, ডাল, তেল, শাকসবজি, ফলমূল, মসলা ফসলের এ পর্যন্ত ৫৪৫টি উচ্চফলনশীল উন্নত জাত এবং আখের ৮টি, সুগারবিটের ৪টি ও তুলার ৭টি  উন্নত জাত এখন কৃষকের কাছে। উদ্ভাবিত হয়েছে ৫০৫টি উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি যা কৃষিকে আরও নিবিড়ভাবে নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপ বিশ্ব কৃষিকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে দারুণভাবে। বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বের কৃষি উন্নয়নের রোল মডেল। কৃষি উৎপাদনের নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ^ আসরে মর্যাদার আসন লাভ করেছে। বাংলাদেশ এখন পাট রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম, পাট  ও কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, ধান উৎপাদনে বিশ্বে  চতুর্থ, বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম, আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম, পেয়ারা ও আলু উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম, মৌসুমি ফল উৎপাদনে বিশ্বে দশম। ইতোমধ্যে পাট, ধৈঞ্চা ও ইলিশের জন্ম রহস্য আবিষ্কার হয়েছে। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ইলিশ ও খিরসাপাত আমের স্বীকৃতি পেয়েছে। শস্য নিবিড়তা বেড়েছে কাক্সিক্ষত মাত্রায়। বর্তমান সরকার কৃষি প্রণোদনা ও কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করেছে। কৃষক ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পেয়েছে। সরকারের দেয়া প্রণোদনার টাকা কৃষকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ সহনীয় মাত্রায় আনতে সারের মূল্য কমিয়ে এনেছে। বর্তমান সরকার সর্বপ্রথম কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড চালু করেছে। বাংলাদেশ কৃষি যান্ত্রিকীকরণেও উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ফসলের ক্ষতি বিবেচনা করে আধুনিক কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে ভর্তুকি প্রদানে অব্যাহত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৫০% থেকে ৭০% উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে পাটের জিনোম রহস্য উন্মোচনে বাংলাদেশ পায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন অঞ্চলসহ সেচের পানি স্বল্পতা অঞ্চলে কৃষিতে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে খাপখাইয়ে নেয়ার প্রত্যয়ে সরকার সম্প্রসারণ করছে জলমগ্ন হাওর এলাকায় ভাসমান সবজি চাষ। এ পদ্ধতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক সমাধৃত হয়েছে। আর আমরা পেয়েছি বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। খাটো জাতের নারিকেলের চাষাবাদ দুর্যোগ প্রতিরোধে উপকূলীয় বেষ্টনী এলাকা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে  কৃষিতে গতি সঞ্চারিত হয়েছে। কিষান-কিষানি এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সেবা পেয়ে থাকে নানাভাবে। কৃষিক্ষেত্রে অসামান্য অবদানে স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার প্রবর্তন করেছে বর্তমান সরকার।


বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এবং কাঠামোগত উৎকর্ষতা দৃশ্যমান। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন অভিপ্রায় ইতোমধ্যে আমরা দানাদার খাদ্যশস্যে পুনরায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। সবজি, ফল, সুগন্ধি চালসহ কৃষিপণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছি। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিল্প-বাণিজ্য এবং কাঠামোগত উন্নয়নে সব দিক থেকে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এখন আমাদের লক্ষ্য হলো সবার জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অর্থাৎ নিরাপদ ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ  এবং ২০৪১ সালের মধ্যে স্বপ্নের উন্নত দেশের সম্মান। সে লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছে নানামুখী উন্নয়ন প্রকল্প ও কর্মসূচি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের দীপ্ত পদক্ষেপের ফলে সে লক্ষ্যে নিশ্চিতভাবে পৌঁছে যাবো বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

 

কৃষিবিদ ড. মো. নুরুল ইসলাম১ কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম২

১পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। ফোন : ৯১১২২৬০, ই-মেইল :  dirais@ais.gov.bd ২সম্পাদক, কৃতসা, খামারবাড়ি, ফোন : ৫৫০২৮৪০৪, ই-মেইল : editor@ais.gov.bd

 


Share with :

Facebook Facebook