কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ উন্নয়নে পারিবারিক কৃষি
এ বছরের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘পারিবারিক কৃষি : প্রকৃতির সুরক্ষা, সবার জন্য খাদ্য’ এর যথার্থতা  হলো এ রকম যে, পরিপূর্ণ পারিবারিক সম্পৃক্ততায় কৃষির সব শাখায় উন্নত পদ্ধতি চর্চার মাধ্যমে পরিবেশকে অক্ষুণ্ন রেখে পণ্য উৎপাদন ও বিশ্ব চাহিদা পূরণ করা। কৃষিভিত্তিক সব শাখা বলতে ফসল, মাৎস্য, প্রাণিসম্পদ, ফলজ ও বনজসহ সবকিছুকেই বুঝানো হয়েছে। জাতিসংঘ কর্তৃক ২০১৪ সনকে International Year of Family Farming (IYFF) ঘোষণা করা হয়েছে। স্লোগানটি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মানানসই ও বাস্তবায়নযোগ্য। এ ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট করণীয় আছে।

মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো খাদ্য। সরকারের তাই প্রধান লক্ষ্য মানুষের এ মৌলিক চাহিদা যেন নিশ্চিত হয়। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার দেশের জনগণের এ মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে এবং এ তৎপরতা অব্যাহত আছে। গত কয়েক দশকে দেশের জনসংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তার সমহারে বিপরীতমুখী প্রবণতায় কৃষি জমি কমে গেছে। এ ছাড়াও কৃষি উৎপাদনে ঋণাত্মক ভূমিকার প্রভাবকগুলো যেমন আবহাওয়া পরিবর্তন, বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, পোকামাকড়ের উপদ্রব ইত্যাদির কারণে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার সঙ্গে তালমিলিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়াস অব্যাহত আছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সনে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। তখন মানুষ ছিল সাড়ে ৭ কোটি। দেশে এখন মানুষ প্রায় ১৬ কোটি। মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আবাদি জমি প্রায় ৩০ শতাংশ (স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) কমে যাওয়ার পরও খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে তিনগুণেরও বেশি। খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ানোর গতিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তালিকায় এখন বাংলাদেশ। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এখন বাংলাদেশ অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। একই জমিতে দুই বা ততোধিকবার চাষ তো হচ্ছেই। ক্ষেত্র বিশেষে চারবারও কোনো কোনো জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নেও বাংলাদেশ সফলতার পরিচয় দিয়েছে। ক্ষুধা সূচকেও বাংলাদেশের অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে। ২০১৩ সনের ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (IFPRI) প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাত্র এক বছরেই এ সূচকে ১১ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। দেশে এখন আর চাল আমদানি করতে হয় না। পর্যাপ্ত মজুদ রেখে বর্তমানে চাল রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেল (IPCC) তাদের চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলেছিল, চলতি শতকের মধ্যে বাংলাদেশের ধান ও গমের উৎপাদন যথাক্রমে ২০ ও ৩০ শতাংশ কমবে। কিন্তু উৎপাদন কমেনি বরং তাদের ভবিষ্যৎ বাণীকে ভুল প্রমাণ করে গত পাঁচ বছরে ধান ও গমের উৎপাদন গড়ে ২.৫ থেকে ৩.০ শতাংশ হারে বেড়েছে।

এক্ষেত্রে কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের কর্মীরা কৃষকের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। নেপথ্যে গবেষণাগারের কর্মীরা প্রতিনিয়ত কৃষক ও দেশের চাহিদা মোতাবেক উৎপাদন বৃদ্ধির প্রযুক্তি এবং কলাকৌশল সরবরাহ করে আসছেন। এসব তৎপরতার পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দিচ্ছেন কৃষক সমাজের একান্ত আপনজন বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, এমপি। ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দিচ্ছেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, কৃষকরত্ন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। আমি আমার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এজন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন ১৯৯৬ অনুযায়ী ‘খাদ্য নিরাপত্তা তখনই আছে বলে মনে করা হয় যখন প্রত্যেক নাগরিকের সব সময়ের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য প্রাপ্তির প্রত্যক্ষ ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা থাকে যা তাদের সক্রিয় ও সুস্থ জীবন নিশ্চিতকরণের জন্য সঠিক পরিমাণ খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে’। খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন ১৯৯৬ এ গৃহীত এ সংজ্ঞা প্রায় সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশে হচ্ছে। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ খাদ্য আছে ঠিকই; কিন্তু দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ অর্থাভাব কিংবা অজ্ঞতার কারণে এখনও অপুষ্টির শিকার। এ পুষ্টি চাহিদা পূরণ সহজেই সম্ভব যদি Family Farming এর মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালানো যায়। অধিক উৎপাদন ও বিপণনকে উৎসাহিত করতে সরকার কৃষি খাতে করমুক্ত আয়ের সীমা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করেছে। গত বছরের চেয়ে ১১১ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য। উৎপাদনশীল কার্যক্রম গ্রহণ করলে আমার ধারণা, বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার যে কোনো সম্ভাবনাময় পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ বরাদ্দ দিতে পারে। পাশাপাশি কৃষকদের উপকরণ সহায়তা দিয়ে কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহী করা হচ্ছে। কৃষি ঋণ সহজে পেতে ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। Family Farming ধারণায় গড়ে ওঠা কৃষি উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য ঋণদান যে কোনো ব্যাংকের জন্য অনেক সহজ। সেক্ষেত্রে ওই ধারণার  আলোকে অনেক কর্মসূচি গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, জনসাধারণের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিবেশনায় পুষ্টির বিভিন্ন উপাদানের ঘাটতি বাংলাদেশে সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এ কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছেন। ফলে এরা দৈহিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সমগ্র পরিবার, সমাজ ও দেশ এজন্য সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।  পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের যথেষ্ট প্রযুক্তি ও কলাকৌশল আমাদের হাতে আছে। শিশুরা যেন পরিপূর্ণ পুষ্টি নিয়ে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারে সেজন্য এ চাহিদা মোকাবিলায় সরকার ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, কৃষির আদি মাতা হলো নারী। আর একজন নারীকে কেন্দ্র করেই একটি পরিবার গড়ে ওঠে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা নারীদের কৃষি ও কৃষি কাজের উন্নত কলাকৌশল বাস্তবায়নের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থেকে দূরে রাখি। এটা Family Farming ধারণার বিপরীত। আমাদের গ্রামীণ জনপদে এখনও পর্যন্ত  একটি পরিবার যে পরিমাণ জমি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে তা ওই পরিবারের পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। Family Farming ধারণাকে অনুসরণ করে যদি বাড়ির আঙিনায় বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তি ও কলাকৌশল ব্যবহার করে শাকসবজি, ফল, ফুল, ঔষধি গাছ, মাছ চাষ ও সংরক্ষণ, হাঁস-মুরগি এবং গরু-ছাগল লালন পালন করা যায়; তবে একটি পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণে কৃষি পণ্য কিনতে বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণে খণ্ডিত কৃষি জমি একটি বড় প্রতিবন্ধক। একটি নির্দিষ্ট এলাকার উপযোগী নির্দিষ্ট ফসল চাষে community approach এর মাধ্যমে চাষিদের Family Farming ধারণায় ক্রপ জোনিং করে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে যদি কৃষি পণ্য উৎপাদন করা যায় তবে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মধ্যম ও বড় সব ধরনের চাষির উৎপাদনে একটি বাজার ব্যবস্থা সেখানে গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ খরচ কম হবে এবং সবাই বাজারে পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমে লাভবান হতে পারেন।
বাংলাদেশে কৃষি পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ। যদি ১ কোটি পরিবারে একটি করে গাভী থাকে তবে তা থেকে কমপক্ষে ২০ কোটি লিটার দুধ পাওয়া যেতে পারে। জনপ্রতি প্রতিদিন ২৫০ মিলি হিসেবে সবার প্রয়োজনে দুধের চাহিদা হতে পারে ৪ কোটি লিটার।  কিন্তু বর্তমানে চাহিদার মাত্র ২২% দুধ দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। সে হিসেবে আমরা জনপ্রতি দিনে মাত্র ৯১ মিলি দুধ পাচ্ছি। শিশু খাদ্য হিসেবে দুধের চাহিদার সিংহভাগই বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আনতে হচ্ছে। গোখাদ্যের অভাব দেশে হওয়ার কথা না। অধিক উৎপাদনক্ষম প্রজাতির গরু এবং তাদের খাদ্য উন্নতজাতের ঘাস দেশেই আছে। খাল, বিল, নদী নালার পাড়, রাস্তার ধারে ও অন্যান্য পরিত্যক্ত জমিতে পরিকল্পনামাফিক ঘাস উৎপাদন করে গো-খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। গরু, ছাগল, দুধ এবং ঘাস বিক্রি করে গ্রামীণ মহিলারাও স্বাবলম্বী হতে পারেন।

খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ
খাদ্য নিরাপত্তা বলতে খাদ্যের প্রাপ্যতা  ও মানুষের খাদ্য ব্যবহারের অধিকারকে বোঝায়। কোনো বাসস্থানকে তখনই ‘খাদ্য নিরাপদ’ বলা যায়, যখন এর বাসিন্দারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বসবাস করেন না। বাংলাদেশে এখন একটি লোকও পাওয়া যাবে না যে না খেয়ে রাত্রি যাপন করে।  বাংলাদেশে  এখন পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য মজুত আছে। বর্তমান সরকার দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দানা শস্য উৎপাদনের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করায় খাদ্য নিরাপত্তা আরও  নিশ্চিত হয়েছে। খাদ্যের ভাণ্ডার হাওর অঞ্চলে রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য অবকাঠামো বৃদ্ধির কার্যক্রম চলছে, এলাকা উন্নয়নের আরও  পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সে অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ও  ছোটখাট  শিল্প স্থাপনের জন্য  সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ, এসএমই ঋণের সম্প্রসারণসহ অনেক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন; যা এ অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন ও উৎপাদনে ভূমিকা রাখবে।

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন
যারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খাদ্য উৎপাদন করছেন তারা শুধু অর্থের কথা, লাভের কথা চিন্তা করেই পণ্য উৎপাদন করছেন। পণ্যটি ভোক্তাকে কতটুকু সন্তুষ্ট করবে এটা তাদের মাথায় থাকে না।  যে কারণে কৃষি পণ্যে নির্বিচারে বিষাক্ত দ্রব্য প্রয়োগের মাধ্যমে তার বাহ্যিক রূপটি শুধু সুন্দর রাখার ব্যবস্থা করা হয়। বেশি-লাভের আশায় অপরিপক্ব ফসল তুলে রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে পাকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। দেশে যদি পুরো পরিবার কোনো পণ্য উৎপাদনে জড়িত থাকে এবং পরিবারের সব সদস্যদের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় ‘নিজেরা খাব এবং বাজারে বিক্রি করব’ এ ধারণায় পণ্য উৎপাদন করে তাহলে উৎপাদিত পণ্যের গুণমান অব্যশ্যই ভালো থাকবে। জাতি এক্ষেত্রে বিষাক্ত খাবার ভক্ষণের হাত থেকে বেঁচে যেতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় যে, বাপ দাদা বা তারও পূর্বপুরুষদের সময়ে লাগানো গাছপালা থেকে তেমন ভালো উৎপাদন হচ্ছে না। এগুলো দীর্ঘদিন একই পরিবেশে বেড়ে ওঠায় তা হয়ে  থাকে রোগ প্রতিরোধী। এগুলোকে উৎপাদনমুখী করার জন্যও আছে প্রযুক্তি যা ‘টপ ওয়ার্কিং’ নামে পরিচিত। অনাবাদি ফলগাছগুলোকে সার ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া দিয়ে উৎপাদনের ধারায় ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।

সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি পরিবার। কাজেই পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ হলে সভ্যতার ক্রমবিকাশও সহজ হয়। পুষ্টির অভাবে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ ব্যাহত হয়। মানুষকে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ফিরিয়ে আনতে সুস্থ মানুষের প্রয়োজন। এ সুস্থ মানুষ সৃষ্টির জন্য পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ জরুরি। যা ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’ ধারণার বাস্তবায়ন থেকে সহজ প্রাপ্য। একটি বাড়ি বা খামারের আকার কী হবে এটা চিন্তা না করে তার প্রতি ইঞ্চি জমিকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা যায় এবং বাড়তি আয় রোজগারের মাধ্যমে উন্নত মননশীলতার চর্চায় সে অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে। আকার আকৃতি বিবেচনায় না এনে আলোক চাহিদা, মাটি ও বেড়ে ওঠার প্রকৃতিকে বিশ্লেষণপূর্বক স্থান ও সময়ানুযায়ী ডিজাইন করে শাকসবজি, ফল, ফুল, ঔষধি গাছ, মাছ চাষ ও সংরক্ষণ, হাঁস-মুরগি, কোয়েল পাখি, কবুতর এবং গরু-ছাগল, খরগোশ ও মৌমাছি লালন পালনসহ বাড়তি কর্মসংস্থানের জন্য কুটির শিল্প, মাশরুম চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করা, সেলাই, মুড়ি, খৈ, চিড়া, দই ও আচার তৈরি ইত্যাদি কাজকর্মগুলো করা যেতে পারে। এভাবে গ্রাম বাংলার খাদ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ ও সংস্কৃতি প্রবাহের মূল স্রোতধারা হতে পারে পারিবারিক কৃষি।
 
 
কৃষিবিদ মো. আব্বাস আলী*
* মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
বিস্তারিত
পারিবারিক খামার : খাদ্য অর্থ পুষ্টি বারো মাস
গাঢ় সবুজে লাল বৃত্তে খচিত বিশ্ব মানচিত্রে অঙ্কিত একটি দেশ বাংলাদেশ। ১,৪৭,৫৬৯ বর্গকিলোমিটারের এ ক্ষুদ্র বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬০ মিলিয়ন যা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৪৭%  অর্থাৎ প্রতি বছর যোগ হচ্ছে প্রায় ২ মিলিয়ন নতুন মুখ। আগামী ২০২০ সনে জনসংখ্যা হবে ১৭৩ মিলিয়ন এবং ২০৩০ সনে হবে ১৯৬ মিলিয়ন। এ দেশের মোট জনসংখ্যা শতকরা ৩১.৫ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, যার ৫০% চরম দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা এবং খাদ্য নিরাপত্তার শিকার। বাংলাদেশে ৪১ শতাংশ শিশু বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম বা খর্বাকৃতি, ১৬ শতাংশ শিশু উচ্চতার তুলনায় রুগ্ণ ও বয়সের তুলনায় ওজন কম ৩৬ শতাংশ শিশুর। প্রায় পাঁচ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার ২০১১ সালে তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশু ছিল ১৬%, ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮%। শুধু ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে দেশে প্রতি বছর ৩০ হাজারেরও বেশি শিশু অন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং কয়েক লাখ লোক রাতকানা রোগে ভুগছে। বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অভাবে রক্তশূন্যতা, মুখের ঘা, দাঁতের রক্ত পড়া, বেরিবেরি, গলগ- ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের খাদ্য তালিকায় বেশি স্থান জুড়ে আছে দানাদার খাদ্যশস্য। প্রতিদিন একজন মানুষের যেখানে ২২০ গ্রাম শাকসবজির খাওয়া প্রয়োজন সেখানে আমরা খাই মাত্র ৮০ গ্রাম। প্রয়োজনীয় পরিমাণ শাকসবজি না খাওয়ার কারণে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ চরম পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এবং এর নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের ৮০% গ্রামে বসবাস করে যার বেশিরভাগই হচ্ছে কৃষক। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার গ্রামে ৭৩% বাস করে। মোট ২৮.৬ মিলিয়ন পরিবারের মধ্যে কৃষি পরিবারের সংখ্যা ১৫.১ মিলিয়ন (৫৩%)। গ্রামীণ জনসংখ্যার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষকের হার শতকরা ৮০ ভাগ। জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৮.৭% প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬.০৩ আর কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ২.১৭% অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি গুরুত্ব অনস¦ীকার্য। আমাদের মোট আবাদযোগ্য জামির ২ থেকে ৩ শতাংশ ছাড়া বাকিটুকু বর্তমানে চাষের আওতায় আনা হয়েছে। মোট আবাদি জমির শতকরা প্রায় পাঁচ ভাগের মতো বসতবাড়ির আওতায় রয়েছে। কিন্তু এসব বসতবাড়ির আঙিনার সুষ্ঠু ব্যবহার অধিকাংশ ক্ষেত্রে হচ্ছে না। জমির অপর্যাপ্ততা, ক্ষুদ্র কৃষকের আধিক্য সত্ত্বেও গ্রামের প্রায় প্রত্যেক বসতভিটার এক টুকরা জায়গাকে পরিকল্পিত উপায়ে আবাদের দ্বারা সারা বছরই শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের সর্ববৃহৎ বহুবিধ ফসলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান। দানা, কন্দাল, তেল, ডাল, সবজি, ফল, ফুল, মসলা ইত্যাদি উচ্চফলনশীল জাত এবং এসব জাতের উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবন করে তা কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করছে। ফসলের পরিচর্যা, রোগ ও পোকামাকড়ের দমন ব্যবস্থা, মৃত্তিকা ও সেচ ব্যবস্থাপনা, কৃষি যন্ত্রপাতি, উন্নত ফসল বিন্যাস ও খামার পদ্ধতির উন্নয়ন, জৈব প্রযুক্তি প্রয়োগ করে কাক্ষিত জাত উদ্ভাবন, শস্য সংগ্রহেরও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উদ্ভাবিত প্রযুক্তি আর্থসামাজিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি এ প্রতিষ্ঠানের গবেষণার আওতাভুক্ত। এ প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৪১৭টি উচ্চফলনশীল জাত এবং ৪৪২টি ফসল উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবন করেছে। উদ্যানতত্ত্ব ফসলের ওপর গবেষণা করে শাকসবজি ও ফল উৎপাদনে বিশেষ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সনে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার (স্বর্ণপদক) ১৪১৭ এবং সম্প্রতি গবেষণা ও প্রশিক্ষণের স্বীকৃতিস্বরূপ বেসামরিক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার ২০১৪ লাভ করেছে। বিটি বেগুনের জাত উদ্ভাবন ও চাষ করে বিশ্বের ২৯তম জিএমও ফসল আবাদকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। খাদ্যশস্যে উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছলেও ফল ও শাকসবজি উৎপাদনে আমরা অনেক দূরে। আমাদের দেশে মাথাপিছু শাকসবজি উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫৩ গ্রাম, আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতে উৎপন্ন হয় ১৬৮ গ্রাম অর্থাৎ আমাদের তুলনায় প্রায় ৩ গুণ বেশি। দৈনিক মাথাপিছু ৮৫ ভাগ ফল খাওয়ার সুপারিশ থাকলেও আমরা খেয়ে থাকি ৬০ গ্রাম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অঞ্চলভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে শাকসবজি উৎপাদন মডেল অনুসরণ করে সারা বছর শাকসবজি উৎপাদন সম্ভব। বসতবাড়িতে সবজি ও ফল চাষের মাধ্যমে পরিবারের সব সদস্যের শ্রম উৎপাদন কাজে ব্যবহার এবং মহিলা ও ছেলেমেয়েদের অলস সময় সবজি চাষের কাজে লাগিয়ে পারিবারিক শ্রমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সবজি বিক্রি করে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের সংস্থান করা যায়।

মডেলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
লক্ষ্য
প্রতিটি চাষির বাড়িতে পরিকল্পিত সবজি বাগান তৈরি করে খাদ্য, পুষ্টি ও আয় বৃদ্ধিসহ পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করা।
উদ্দেশ্য
বসতবাড়িতে পরিকল্পিত লাগসই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফলদ, মসলা,  ঔষধি ও সবজির বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পারিবারিক খাদ্য, পুষ্টি ও আয় বৃদ্ধি করা।
পরিবারের সব সদস্যের শ্রম উৎপাদন কাজে লগিয়ে স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে জাতির বেকার সমস্যার সমাধান করা।  বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষমতায়ন করা।
বসতবাড়ির বিদ্যমান সম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা।
বসতবাড়িতে পরিকল্পিত গাছপালা লাগানো ও পরিচর্যার মাধ্যমে ফল-ফলাদির উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

অঞ্চলভিত্তিক সবজি চাষের বিভিন্ন মডেলগুলো
 ক. গয়েশপুর মডেল, পাবনা (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১১, ১২)
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগ কর্তৃক বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের জন্য ‘কালিকাপুর মডেল’ প্রথম উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে খামার পদ্ধতি গবেষণা সাইট, পাবনা জেলার সদর উপজেলার গয়েশপুরে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়ে একটি নতুন বসতবাড়ির মডেল উদ্ভাবন করা হয় যার নামকরণ করা হয় ‘গয়েশপুর মডেল’।

এ মডেলের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো পুরো বসতবাড়িটিতে ব্যবহারযোগ্য শাকসবজি, ফল ও কিছু মসলাজাতীয় ফসল আবাদ করা। এতে যেমন পরিবারের পুষ্টি চাহিদা অনেকাংশে পূরণ হয়, তেমনি বাড়ির গৃহিণী এবং স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা অবসর সময়ে বসতবাড়ির বাগানে কাজ করতে পারে। (মডেল পরের পৃষ্ঠায় দেখুন)।

খ.  সৈয়দপুর মডেল, রংপুর (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-২, ৩ এবং ২৭)
গ্রামীণ মহিলাদের জন্য বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ একটি লাভজনক প্রযুক্তি। সঠিক পদ্ধতিতে নিয়মিতভাবে চাষ করলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া সম্ভব। এর ভিত্তিতে সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, রংপুর খামার পদ্ধতি গবেষণা সাইট, সৈয়দপুরে গবেষণা চালিয়ে বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ মডেল উদ্ভাবন করা হয়।

গ. আটকপালিয়া মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১৭, ১৮)
নোয়াখালী জেলার চরজব্বার এবং চরজুবিলী চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকায় রবি মৌসুমে লবণাক্তার পরিমাণ ২-৮ ডিএস/মি. আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ, চাষির চাহিদা এবং আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন মৌসুমে ১৪টি সবজি নির্বাচন করে সারা বছর বসতবাড়িতে চাষ করা যায়।

ঘ. পালিমা মডেল, টাঙ্গাইল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৮, ৯)
টাঙ্গাইলে অন্যান্য এলাকার তুলনায় বসতবাড়ির আয়তন কম। কারণ এ এলাকার বসতবাড়ির ভিটা অন্য জায়গা থেকে মাটি এনে উঁচু করে তৈরি করা হয় বলে তা আকারে ছোট হয়ে থাকে। পালিমা, টাঙ্গাইলে কয়েক বছর গবেষণা করার সবজি মডেল উদ্ভাবন করা হয়।

ঙ. নারিকেলি মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল- ৯)
জামালপুর জেলার নারিকেলি এলাকায় খামার পদ্ধতি এলাকায় গবেষণা করে সারা বছরব্যাপী শাকসবজি ও ফলমূল চাষের মডেল উদ্ভাবন করা হয় যা বৃহত্তর ময়মনসিংহয়ের অধিকাংশ এলাকার জন্য প্রযোজ্য।

চ. লেবুখালী মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল- ১৩)
পটুয়াখালী এলাকায় অধিকাংশ সময় জমির জোয়ারের পানিতে ডুবে থাবে সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সবজির চাহিদা পূরণ ও পারিবারিক পুষ্টির উন্নয়নকল্পে পটুয়াখালীর লেবুখালীতে এ মডেলটি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

ছ. ঈশান গোপালপুর মডেল, ফরিদপুর (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১১, ১২)
ঈশান গোপালপুর, ফরিদপুর, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ কর্তৃক সবজি মডেল অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর সুপারিশ করা হয়। এ মডেলে উন্মুক্ত জমিতে অনেকগুলো বেড (৭ থেকে ৮) করা হয়। এছাড়া মাচা, ঘরের চাল, অফলা গাছ, ছায়ামুক্ত ও স্যাঁতসেঁতে জায়গা, বাড়ির চারপাশ এর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।

জ. বরেন্দ্র মডেল, রাজশাহী (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৫, ৬ ও ২৬)
বরেন্দ্র অঞ্চলের মুষ্টিমেয় কয়েকটি ধনী পরিবার ছাড়া অধিকাংশই গরিব যাদের বসতি ভিটেমাটি ছাড়া তেমন কোনো ফসলি জমি নেই। তার ওপর মাটির বিরূপ গঠন, খরা, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয় এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের সাথী। এ পরিপ্রেক্ষিতে বরেন্দ্র মডেলটি ব্যবহার করে খরাপ্রবণ এলাকার কৃষকদের সবজির ও পুষ্টির চাহিদা এবং আয় বহুলাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।

ঝ. গোলাপগঞ্জ মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল- ২০)
বৃহত্তর সিলেট দেশের একটি বৃষ্টি বহুল অঞ্চল। এ অঞ্চলে পাহাড়, টিলা, পাহাড়ের পাদভূমি ও সমতল ভূমি রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে সিলেটের গোলাপগঞ্জে উদ্ভবিত এ মডেলের দ্বারা সারা বছরব্যাপী সবজি উৎপাদন সম্ভব হবে।

ঞ. খাগড়াছড়ি মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল- ২৯)
 দেশের মোট আয়তনের এক-দশমাংশ পাহাড়ি এলাকা। সমতল থেকে ভিন্নতর এবং পানির দুষ্প্রাপ্যতা সত্ত্বেও এ এলাকার আবহাওয়া ফলমূল ও শাকসবজি চাষের বেশ উপযোগী। পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, খাগড়াছড়িতে ২০০৯ সন থেকে বেশ কয়েক বছর গবেষণা করে এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়।

বসতবাড়ির অব্যবহৃত রৌদ্রোজ্জ্বল উন্মুক্ত সুনিষ্কাশিত উঁচু জায়গা নিবিড় সবজি চাষ করার উপযোগী। উন্মুক্ত স্থান নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখতে হবে যে বড় কোনো গাছের ডাল এ জায়গার ছায়া সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য ডাল পালা ছেঁটে দিতে হবে। ৫ মিটার দীর্ঘ, ১ মিটার প্রস্থ এবং ৩০ সেমি. দূরত্ব আকারে পাশাপাশি কয়েকটি বেড তৈরি করতে হবে। উন্মুক্ত স্থানের বেডের সবজি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অবশ্যই বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ বেড়ার ভেতরে চারপাশে ২ মিটার অন্তর অন্তর মাদা তৈরি করতে হবে যাতে বর্ষাকালে পানি না জমে। মাদাতে প্রয়োজনীয় সার দিয়ে বীজ বা চারা রোপণ করা যায়। বসতবাড়িতে বিভিন্ন ধরনের ঘর যেমন থাকার ঘর, রান্নাঘর, গোয়াল ঘর ইত্যাদি ঘরের চালাতে সবাজি চাষের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের আশপাশের ফাঁকা জায়গা ও পুকুর পাড় যেখানে পর্যাপ্ত রৌদ্র পড়ে এমন জায়গায় বাঁশ, পাটখড়ি ও জিআই তার দিয়ে মাঁচা তৈরি করা যেতে পারে। বসতবাড়িতে বিদ্যমান বিভিন্ন অফলা গাছ যেমন জিগা, বাবলা, মাদার ইত্যাদি বিভিন্ন সবজির বাউনি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সাধারণত গাছের নিচে বা ঘরের পেছনে যেখানে ভালোভাবে সূর্যের পূর্ণ আলো পৌঁছায় না সেখানে সফলভাবে বিভিন্ন ধরনের ছায়া সহনশীল সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল যেমন- ওল কচু, মৌলভি কচু, মানকচু, আদা, হলুদ ও বহুবর্ষী মরিচ ইত্যাদি উৎপাদন করা যায়। বাড়ির চারদিকে সীমানা বরাবর স্বল্প মেয়াদি ফলের চাষ করা যায়। বাড়ির পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় বড় আকারের সবজি গাছ যেমন- সজিনা, লাইজনা, কাঁচকলা ইত্যাদির চাষ করা যায়। সবজি বাগানে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় ও রোগ বালাইয়ের আক্রমণ দেখা দিলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। জমিতে পর্যাপ্ত পানি সেচ এবং বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী এবং সময়মতো সার ও আগাছা  দমন করা জরুরি। বসতবাড়িতে যদি পর্যাপ্ত জায়গা না তাকে তাহলে সবজি ও ফলের নার্সারি স্থাপন করেও বাড়তি আয়ের সুযোগ থাকে। তবে নার্সারি তৈরির কলাকৌশল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকতে হবে।

বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের সুবিধা
* অল্প পরিমাণ জমিতে অনেক ধরনের সবজি ও ফল আবাদ  করা যায়।
* সবজি আবাদে অপেক্ষাকৃত কম সময় লাগে। একই জমিতে বছরে কয়েকবার সবজি চাষ করা সম্ভব।
* পুষ্টির দিক থেকে প্রায় সব শাকসবজি উন্নত মান সম্পন্ন হয়ে থাকে। ফলে বছরব্যাপী উপযুক্ত পরিমাণ সবজি খেয়ে পুষ্টিহীনতা দূর করা এবং রোগমুক্ত থাকা সম্ভব হয়।
* পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সবজি বিক্রি করে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের সংস্থান করা যায়।
* বসতবাড়ির আঙিনায় পরিবারের মহিলা ও ছেলেমেয়েদের অবসর সময়ে সবজি চাষের কাজে লাগিয়ে পারিবারিক শ্রমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
রহমান এবং অন্যদের (২০০৮) গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, কৃষি গবেষণা কর্তৃক উদ্ভাবিত মডেল অনুসরণের ফলে প্রতি পরিবারে শাকসবজির উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ৫৬% এবং ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পায় ৬৮%। সুপারিশকৃত মাত্রায় (Recommended Dietary Allowance) ভিটামিন-এ, ভিটামিন সি এবং আয়রনের শতভাগ, ক্যালসিয়ামের ৮৭% এবং প্রোটিনের ৪৭% এ মডেল অনুসরণের ফলে পূরণ করা যায়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, বসতবাড়িতে সবজি চাষে মহিলা ও ছেলেমেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায় যথাক্রমে ৩২% থেকে ৪২% এবং ৭% থেকে ১২%। খান এবং তার সহযোগীরা (২০০৯) এক গবেষণায় দেখতে পান, পালিমা মডেল অনুসরণ করার ফলে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের পুষ্টির চাহিদার ৭৩% প্রোটিন, ১১৫% ভিটামিন এ, ১৭৯% ভিটামিন সি, ১২০% ক্যালসিয়াম এবং ১২১% আয়রনের চাহিদা পূরণ করা যায় অর্থাৎ প্রোটিন ছাড়া অন্যান্য পুষ্টির ক্ষেত্রে তা চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত থাকে। ২.৫ শতক জমিতে খরচ বাদে লাভ হয় ১৭২৯ টাকা এবং আয় ব্যয়ের অনুপাত ২.৭ যা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পুরুষরা জমি তৈরি, রোপণ, জাবড়া প্রয়োগ, বেড়া দেয়া, বাজারজাতকরণ ইত্যাদি এবং মহিলারা সেচ, আগাছা দমন, বালাইদমন, ফসল সংগ্রহ ইত্যাদিতে বেশি অংশগ্রহণ করে থাকে। বাড়ির ছেলেমেয়েরাও তাদের অভিভাবকদের কাজে সহায়তা প্রদান করে থাকে। আসাদুজ্জামান এবং তার সহযোগীরা (২০১১) ও তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে অনুরূপ ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে সবজি চাষ অপেক্ষা উন্নত পদ্ধতিতে সবজি চাষে পরিবারে ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিকভাবে ও লাভবান হওয়া যায়। এ পদ্ধতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মনোন্নয়নে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় সুলভ প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

এ প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে উন্নত জাতের বীজ ও চারা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পানি  সেচের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষাণ ও কৃষাণি উভয়কেই সবজি উৎপাদন কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বসতবাড়িতে সবজি চাষ পারিবারিক খামারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এ বাগান থেকে ৪ থেকে ৫ সদস্যের পরিবারের পুষ্টি উপাদান সরবরাহে অনেকাংশে মেটানো সম্ভব। দরিদ্র কৃষকদের উদ্বৃত্ত সবজি বিক্রি করে কিছু বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা থাকে। আত্মীয়স¦জন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের উপহার দেয়ার ফলে সামাজিক সৌহার্দ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের বর্ধিষ্ণু জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্যবিমোচন, আয়বৃদ্ধি তথা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বসতবাড়িতে সবজি চাষের গুরুত্ব অপরিসীম। তদুপরি এসব মডেল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ কর্মসূচির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেও কাজ করে আসছে। জাতিসংঘ ঘোষিত পারিবারিক কৃষি বছর ২০১৪ এর একটি মডেল হিসেবে খাদ্য নিরাপত্তাসহ পারিবারিক আয় নিশ্চিন্তে কাজের সহায়ক হবে।

ড. মো. রফিকুল ইসলাম মণ্ডল*
ড. মো. কামরুল হাসান**
* মহাপরিচালক, **এসএসও, জীব প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট
বিস্তারিত
বসতবাড়িতে পরিকল্পিত কৃষি বনায়ন : খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার এক শক্তিশালী হাতিয়ার
বাংলাদেশ একটি জনবহুল কৃষিপ্রধান দেশ। কিন্তু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ৯০,৯৪,০০০ হেক্টর এবং দিন দিন তা বিভিন্ন কারণে কমে (বছরে প্রায় ১.৬ ভাগ হারে) যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাদযোগ্য জমির অন্য কোনো কাজে (যেমন নতুন বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, কলকারখানা নির্মাণ ইত্যাদি) ব্যবহার হচ্ছে এর মূল কারণ। আবার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়তই বাংলাদেশের বনজসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে এবং সেসঙ্গে কমে যাচ্ছে বনভূমির পরিমাণ। কোনো অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বনভূমির পরিমাণ ২৫% এর কম হলে আবহাওয়া, জলবায়ু, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য বিঘ্নিত হয়। সরকারি হিসাবে এ দেশে যদিও বনের আয়তন ১৫ থেকে ১৬% কিন্তু বেসরকারি হিসাবে ও বাস্তবতার নিরিখে ১০% এরও কম বলে মনে হয়। এতে দেখা দিচ্ছে অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি বৃদ্ধি, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি প্রভৃতি রকমের প্রতিকূলতা। ফলে এ মুহূর্তে প্রয়োজন খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি। আর এ ক্ষেত্রে বসতবাড়িতে পরিকল্পিত কৃষি বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

কৃষি বনায়ন কী?
কৃষি বনায়ন হচ্ছে এমন একটি টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা, যা ভূমির সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি করে; যুগপৎ বা পর্যায়ক্রমিকভাবে কৃষিজাত ফসল, বৃক্ষজাত ফসল ও বনজ উদ্ভিদ অথবা পশুপাখিকে একত্র-সমন্বিত করে এবং সেসব পরিচর্যা পদ্ধতি অবলম্বন করে, যা ওই নির্দিষ্ট এলাকার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ধ্যান-ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আবার অনেকের মতে, কৃষি বনায়ন হচ্ছে একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি যেখানে বৃক্ষ, ফসল এবং পশুপাখিকে এমনভাবে সমন্বয়-একত্র করা হয় যেটা বৈজ্ঞানিকভাবে নিখুঁত হয়, পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, ব্যবহারিক দিক থেকে সম্ভাব্য হয় এবং সামাজিক দিক থেকে কৃষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।
উপরে বর্ণিত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-
ক. কৃষি বনায়নে দুই বা ততোধিক ফসল থাকবে যার মধ্যে অন্তত একটি ফসল হতে হবে বহুবর্ষজীবী কাষ্ঠল উদ্ভিদ।
খ. কৃষি বনায়ন ধারা থেকে দুই বা ততোধিক উৎপাদন অথবা উপকারিতা বেরিয়ে আসবে।
গ. কৃষি বনায়ন ধারা পরিবেশগত (কাঠামো এবং কার্যকারিতার দিক থেকে) এবং অর্থনৈতিকভাবে একক চাষাবাদ অপেক্ষা অধিকতর জটিল এবং লাভজনক।

কৃষি বনায়ন নিম্নের তিনটি প্রধান উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে উঠে
১. বৃক্ষ ও অন্যান্য বহু বর্ষজীবী কাষ্ঠল উদ্ভিদ।
২. মৌসুমি অথবা একবর্ষজীবী কৃষিজাত উদ্ভিদ ফসল।
৩. পশুপাখি ও মৎস্য।

উপরোক্ত তিনটি উপাদানের সব ক’টি অথবা যে কোনো দুটি উপাদানের সংমিশ্রণে-সমন্বয়ে একটি কৃষি বনায়ন ধারা গড়ে উঠতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে যে কোনো কৃষি বনায়ন ধারার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হচ্ছে বৃক্ষ বা কাষ্ঠল বহু বর্ষজীবী উদ্ভিদ যা বহুবিধ ব্যবহারযোগ্য।

উপকারিতা
১. কৃষি বনায়নে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
২. একই জমি থেকে একই সঙ্গে ফসল, শাকসবজি, পশুখাদ্য, জৈবসার, কাঠ, ফল, মাছ, গোশত, ডিম, দুধ ইত্যাদি উৎপাদন সম্ভব।
৩. কৃষি বনায়নের ফলে মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণ উন্নত হয়।
৪. একক চাষাবাদ এর শস্যহানির ঝুঁকি কমে যায়।
৫. ফসল, বৃক্ষ, পশুপাখি ও মাছের আন্তঃক্রিয়ায় পরস্পর উপকৃত হয়।
৬. প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ঘরবাড়ি ও ফসল রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৭. বেকারত্ব দূরীকরণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়।
৮. সর্বোপরি বসতবাড়ির প্রাকৃতিক দৃশ্য সুন্দর হয় এবং পরিবেশ উন্নত হয়।

সীমাবদ্ধতা
১. অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ ও ফসল একসঙ্গে চাষাবাদ করলে এদের মধ্যে স্থান, সূর্যরশ্মি, পানি ও পুষ্টি নিয়ে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে এবং এতে ফলন কম হবে। তাই বিভিন্ন দিক বিবেচনায় এনে বৃক্ষ ও ফসল নির্বাচন করতে হবে।
২. বৃক্ষ ও ফসলের রোগবালাই পরস্পরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৩. সেচের পরিমাণ বেশি লাগবে।
৪. গাছ কাটার সময় ফসল এবং অন্যান্য উদ্ভিদের ক্ষতি সাধন হতে পারে।
৫. জমি চাষ ও ফসল পরিচর্যায় অসুবিধা হয়।
৬. শ্রমের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
৭. পরিকল্পিত কৃষি বনায়নে জনগণের জ্ঞান বৃদ্ধি এক বড় চ্যালেঞ্জ।

বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন
বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন হলো কৃষি বনায়নের একটি ধারা, যেখানে বসতবাড়ির নির্দিষ্ট ভূখ-ে বনজ বৃক্ষ, ফলদ বৃক্ষ, শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ, অন্যান্য উদ্ভিদ, বৃক্ষ ফসল, উদ্ভিদ ফসল, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মৎস্য ইত্যাদির সমন্বয়ে সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠে যা কৃষি বনায়নের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যম-িত এবং প্রাচীন উদাহরণ। এটি আবার জীবন নির্বাহ কৃষি বনায়ন ধারাও বটে। এ ধারার মূল লক্ষ্য হতে পারে পরিবারের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা। সাধারণত ক্ষুদ্র ও দরিদ্র বা স্বল্প সামর্থ্যযুক্ত পরিবারগুলো পারিবারিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ধারা হতে বেশি উপকৃত হতে পারে।

একটি আদর্শ বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন ধারার গঠন
প্রায় প্রতিটি বসতবাড়িতে কৃষি বনায়নের অস্তিত্ব থাকলেও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে তা থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। ফলে ধারণাটি পুরনো হলেও মানুষ এটা নিয়ে খুব একটা ভাবে না। অথচ পরিকল্পনা মাফিক বসতবাড়িতে কৃষি বনায়নের মাধ্যমে একটি পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব। একটি আদর্শ বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন ধারা গড়ে তোলার জন্য নিম্নলিখিত প্রধান দিকগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে-

১. বসতবাড়ির চারপাশের সীমানায় বেড়া হিসেবে মান্দার, ভেরেন্ডা, পলাশ, জিগা ইত্যাদি উদ্ভিদ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে বসতবাড়ির সীমানা নির্ধারণ ছাড়াও সুরক্ষার কাজও করবে।
২. বাড়ির আঙিনায় শাকসবজির চাষ করতে হবে।
৩. বসতবাড়ির আঙিনার ফাঁকা স্থানে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, বেল, পেঁপে, নিম, বহেড়া, হরীতকী, তুলসী, সজিনা, নারিকেল, সুপারি, বকুল ইত্যাদি গাছ রোপণ করা যায়।
৪. বসতবাড়ির সীমানায় পুকুর থাকলে সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাছের চাষ করতে হবে। পুকুরের পাড়ে বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষরোপণ (নারিকেল, সুপারি, ইপিল-ইপিল, মেহগণি, খেজুর, কড়ই ইত্যাদি) করতে হবে। এতে গরমের সময় মাছের উপকার হয়। এখানে বেশি শিকড় বিশিষ্ট গাছ লাগালে পুকুরের পাড়ের মাটি ভাঙবে না।
৫. বিভিন্ন ছায়াসহ্যকারী উদ্ভিদ যেমন- আদা, হলুদ ইত্যাদি দুই বৃক্ষের মাঝে লাগতে হবে।
৬. বসতবাড়িতে যতটুকু সম্ভব গবাদিপশু-পাখি (হাঁস-মুরগি, কোয়েল, কবুতর, গরু, ছাগল, মৌমাছি ইত্যাদি) পালন করতে হবে।
৭. সর্বোপরি স্থান-অবস্থান, উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা, সামর্থ্য, সহজ প্রাপ্যতা ইত্যাদি বিবেচনা করে বসতবাড়ির কৃষি বনায়ন ধারার উপাদানগুলো নির্বাচন করতে হবে এবং যথাযথ নিয়মে এর পরিচর্যা করতে হবে।

বসতবাড়িতে পরিকল্পিত কৃষি বনায়নের প্রয়োজনীয়তা
কিন্তু এদশের অধিকাংশ জনগণই অত্যন্ত গরিব, অনেকের শুধু বসতবাড়ি ছাড়া আর কোনো কৃষি জমি নেই। অথচ এদেশের গ্রামাঞ্চলে বসতবাড়িগুলো হচ্ছে সনাতন কৃষি বনায়ন ধারা তথা বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাচীন উদাহরণ। কৃষাণ-কৃষাণিরা বহু পূর্বকাল থেকেই একই আঙিনায় নিজেরা বসবাস করা ছাড়াও শাকসবজি চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, হরেক রকমের ফলদ, বনজ এবং শোভাবর্ধনকারী গাছপালা একই সঙ্গে উৎপাদন ও পালন করে আসছেন। বাংলাদেশে বসতবাড়ির বাগান থেকেই অধিকাংশ ফল, কাঠ, জ্বালানি, পশুখাদ্য ইত্যাদি উৎপাদন ও সংগ্রহ করা হয়। দেখা গেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে গৃহস্থালি জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান বসতবাড়ি এবং পাশের জমি থেকেই আসে। তবে সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতি থাকায় বসতবাড়িভিত্তিক এ উৎপাদন ব্যবস্থার ফলন তেমন আশাব্যঞ্জক নয়।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ বসতবাড়ি এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম ব্যবহৃত। ভৌত অবস্থান, কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা সম্পদ ভিত্তি ইত্যাদিকে বিবেচনায় রেখে কৃষি বনায়ন তথা একটি সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে সেটা হবে আগামী শতকের প্রধান অবলম্বন, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য বহু বছর ধরে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যাদি জোগান দেবে।

এ ছাড়া গাছ বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে এবং ভূমিক্ষয় রোধ করবে ও ঝড়-বাতাস থেকে ঘরবাড়িকে রক্ষা করবে। কৃষি বনায়ন আয়েরও একটি ভালো উৎস হতে পারে। তাই সুপরিকল্পিতভাবে কৃষি বনায়ন ধারা অনুসরণ করে বসতবাড়ির আঙিনা ও তার আশেপাশের জমি থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল, শাকসবজি, ফল, কাঠ, জ্বালানি, পশু খাদ্য, মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি উৎপাদন করা একান্তই প্রয়োজন। এজন্য দ্রুত বর্ধনশীল ফলজ এবং বনজ বৃক্ষের সমন্বয়ে একটি বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য বসতবাড়ি বাগান গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে করে খাদ্যের চাহিদা মেটানোর সঙ্গে সঙ্গে বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং সে সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।
 
ড. মো. শহিদুল ইসলাম*
কৃষিবিদ জহিরুল ইসলাম খান**
* মৃত্তিকা বিজ্ঞানী এবং সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ** নির্বাহী সম্পাদক, উর্বরা
বিস্তারিত
পারিবারিক খামার : পরিবেশসম্মত খাদ্য জোগান ও সমৃদ্ধির মূল সোপান
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২০১৪ সনকে পারিবারিক খামার বছর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। সে প্রেক্ষিতে এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘পারিবারিক কৃষি : প্রকৃতির সুরক্ষা, সবার জন্য খাদ্য’। পারিবারিক খামার থেকে একটি পরিবার তার প্রয়োজনে নিজের সম্পদ সুযোগ-সুবিধাগুলোকে কাজে লাগিয়ে পরিবারের প্রয়োজন আর চাহিদা মাফিক খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করে। এর সঙ্গে উদ্বৃত্ত অংশ পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনকে বিলিয়ে দেয়া আর অতিরিক্ত অংশকে বাজারে বিক্রি করে দু’পয়সা আয় করে। এভাবে তৃতীয় বিশ্ব আর উন্নয়নশীল দেশের খামারিরা তাদের খাদ্যের জোগান মোটামুটি নিশ্চিত করে। পারিবারিক খামারে দানাদার, অর্থকরী, তেল, ডাল, শাকসবজি, ফলমূল, মসলা, ঔষধি, বাহারি সব ধরনের উৎপাদনের জোগানকেই বুঝায়। সঙ্গে মাছ, গবাদিপশু-পাখিতো আছেই। কৃষকরা মাঠের জমিতে ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, তেল, ফসল, মশলা আবাদ করে, পারিবারিক বাগানে শাকসবজি, ফলমূল ভেষজ, মসলা আবাদ করে, মাছ চাষ করে, গবাদিপশু পালন করে, ফসল তোলে প্রক্রিয়াজাত করে চলমান প্রয়োজন মেটায় আর অতিরিক্ত অংশ সংরক্ষণ করে রেখে দেয় সুখময় আগামীর জন্য। এভাবেই তারা পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এদের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী কেউ খুব ভালো থাকে কেউ মোটামুটি ভালো আর কেউ নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন অবস্থায় বিরাজ করছে। তবুও তাদের জীবন গতিময় থাকে কেটে যায় যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে। এটা ঠিক কৃষি উৎপাদন আর উন্নয়নের মহানায়ক অধিকাংশ কৃষক গরিব, ক্ষুদ্র, মাঝারি, নিম্নবিত্ত বলে তাদের প্রয়োজনটা সুষ্ঠু পরিকল্পনার সঙ্গে কিংবা আরও বিশুদ্ধভাবে যদি বলি আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে ততটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সব কাজে আমাদের মনে রাখতে হবে জমির মালিকরা কৃষক না, আবার যারা কৃষক তাদের জমি নেই। সেকথা ভেবে আমাদের পরিকল্পনা করে এগিয়ে যেতে হবে।

ঘরের পাশে কিংবা বাড়ির পাশে পতিত জায়গায় বা এজমালি পতিত জায়গার বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে খাওয়া, ঘরের চালে আঙিনায় বারো মাসে কোনো না কোনো শাকসবজি আবাদ তাদের নিত্য বহমান প্রতিচ্ছবি। এখান থেকেই তাদের খাদ্য পুষ্টি আসে দিনের পর দিন। প্রয়োজন এদের বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক কৌশল শিক্ষা দেয়া এবং এগুলোকে তাদের কাজ কর্মের অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করা। প্রাসঙ্গিকভাবেই খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্যের কথা বিশেষভাবে বলা দরকার। আমরা প্রায় সবাই খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে হাজারো কথা বলি, পরামর্শ দেই ও পরিকল্পনা কর্মসূচি গ্রহণ করি। কিন্তু ভাবি কী হাজার মেট্রিক টন খাদ্য যদি উৎপাদিত হয় এবং সেগুলো যদি নিরাপদ না হয়, বিষাক্ত বা কাক্সিক্ষত মানের না হয় তাহলো এসব লাখ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য আমাদের কী কাজে লাগবে? সুতরাং খাদ্য নিরাপত্তার কথা বললে আমরা যেন সর্বপ্রথম আবশ্যকীয়ভাবে নিরাপদ খাদ্যের কথা ভাবি এবং সেভাবে কাজ করি। আর জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে খাদ্য নিরাপত্তার কথা নিশ্চিত করাতে পারলে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা এমনিতেই চলে আসবে। পারিবারিক কৃষি খামার পরিবার এবং ছোটখাটো কৃষি খামার বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত; কৃষি খামার প্রচলিত খাদ্য উৎপাদনকে সংরক্ষণ করে যেটা সুষম খাদ্য খেতে বা পেতে দারুণ সহায়তা করে; এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে পারিবারিক কৃষি খামার স্থানীয় কৃষি, কমিউনিটি বা আর্থসামাজিক নীতি প্রশাসন আর উন্নয়ন সমৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

পারিবারিক খামারকে এবার বিশ্ব খাদ্য দিবসে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কারণ অবারিত প্রাকৃতিক সম্পদকে যুক্তিযুক্তভাবে ব্যবহার করে বিশ্ব ক্ষুধা আর দারিদ্র্যকে দূর করে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিকে নিশ্চিত করে জীবন যাত্রার মানকে কাক্সিক্ষত সীমানার কাছাকাছি পৌঁছে দেয়ার জন্য। পারিবারিক কৃষি মানে পরিবারভিত্তিক কার্যক্রম এবং এটি গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পারিবারিক কৃষি মানে মাঠের কৃষি, কৃষি বনায়ন, মৎস্য, গোচারণ ভূমি, গবাদিপশু লালন পালন এসব। আর এগুলো পরিবারের পুরুষ মহিলা সব সদস্য মিলে সম্মিলিত শ্রম বিনিয়োগ করে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো পারিবারিক কৃষি কাজ উৎপাদন ও সমৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তবে পারিবারিক কৃষির মাহাত্ম্য আর অবদান যাই থাক না কেন এর সঙ্গে জাতীয় অনেক কিছুর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে আছে জাতীয় কৃষি পরিবেশ অবস্থা, ভূ-প্রকৃতি, ভৌগলিক অবস্থান, রাষ্ট্রীয় নীতি, বাজার নীতি, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, তথ্যপ্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার, সম্প্রসারণ কর্মকা-, জনসংখ্যা, আর্থসামজিক অবস্থা, শিক্ষা এসব। এগুলো যে দেশের যত সুন্দর সুষ্ঠু আর সমৃদ্ধ সেদেশের পারিবারিক কৃষিও তত উন্নত ও সমৃদ্ধ।

প্রায় দেড় লাখ বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশের জনসংখ্যা দেড় লাখ মিলিয়নের বেশি যা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অষ্টম দেশ হিসেবে স্বীকৃত। এদেশে প্রায় দেড় শতাংশ হারে জনসংখ্যা বেড়ে প্রতি বছর মোট জনসংখ্যার সঙ্গে যোগ হচ্ছে প্রায় ২ মিলিয়ন মানব শিশু। জনসংখ্যা আগামী ২০৩০ সনে তা দাঁড়াবে প্রায় ২০০ মিলিয়ন। মোট জনসংখ্যা শতকরা ৩২ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, যার অর্ধেক চরম দারিদ্র্য, পু