কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

বাংলাদেশে আলুবোখারা চাষ
আলুবোখারা (Prunus domestica) বাংলাদেশের স্বল্প ব্যবহৃত একটি উচ্চমূল্যের মসলা ফসল। সপ্তদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে আলুবোখারার উন্নত জাতগুলো উদ্ভাবিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় শীত প্রধান ও অবউষ্ণ এলাকায় বিশেষ করে মধ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপ তারপর উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া, চীন, ভারত, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ব্যাপকভাবে আলুবোখারার আবাদ হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন- ইংরেজিতে প্লাম, গেজ, গার্ডেন প্লাম, প্রুন, প্রুন প্লাম, বাংলাদেশ ও ভারতে আলুবোখারা এসব নামে ডাকা হয়।
      আশ্চর্য রকমের সুস্বাদু ও রসালো এ ফল ফ্রেশ খাওয়া চলে অথবা চিনি, মরিচ ও সরিষার তেল সহযোগে চাটনির মতো করে অথবা বিভিন্ন উপাদান যোগ করে রান্না করে খাওয়া হয়। আলুবোখারা দিয়ে জ্যাম, জেলি, চাটনি, কেক, আচার প্রভৃতি তৈরি করা যায়। মধ্য ইংল্যান্ডে সিডার জাতীয় অ্যালকোহলিক বেভারেজ যা প্লাম জাবকাস নামে পরিচিত তা আলুবোখারা থেকেই প্রস্তুত করা হয়। শুকনা আলুবোখারা (যা প্রুন নামে পরিচিত) মিষ্টি, রসালো এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। এতে খাদ্য শক্তি কম (৪৬ কি.ক্যাল.) থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ উপযোগী। এতে যথেষ্ট পরিমাণে পটাসিয়াম, ফ্লোরাইড ও লৌহ রয়েছে যা দেহকোষের সুরক্ষার জন্য উপযোগী। এর অন্যান্য ভিটামিনগুলো শ্বেতসার মেটাবলিজমে ও হাড়ের গঠনে ফসফরাস এবং ভিটামিনকে রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে ও বৃদ্ধদের আলঝেইমা রোগ প্রতিরোধ করে।

 
উৎপাদন প্রযুক্তি
আলুবোখারা বা রোজেসি পরিবারভুক্ত একটি ফল জাতীয় মসলা ফসল। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক জাতগুলোর বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় এবং ফল বিভিন্ন সময়ে ধরে থাকে। যেমন- তাইওয়ানে জানুয়ারিতে, যুক্তরাষ্ট্রে এপ্রিল মাসে ফুল ফোটে। এর ফল মধ্যমাকৃতির ১-৩ ইঞ্চি পর্যন্ত ব্যাসযুক্ত, গোলাকার ও ওভাল হয়।
 
আবহাওয়া ও মাটি
সাধারণত শীতপ্রধান ও অবউষ্ণ আবহাওয়া আলুবোখারা চাষের জন্য উপযোগী। তার ০-৭.২ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী। অবউষ্ণ এলাকার জন্য শীতকালে শৈত্যায়ন হয়ে শীতের পর ফুল আসে এবং ফলধারণ করে। আলুবোখারা রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া ও সুনিষ্কাশিত উর্বর বেলে দো-আঁশ মাটিতে ভালো হয়। পাহাড়ের ঢালে ও পাহাড়ের উপরে ভালো বায়ু চলাচল উপযোগী ও পর্যাপ্ত সূর্যালোকে এর উৎপাদন ভালো হয়।
 
জমি তৈরি
যে জমিতে অন্য ফসল ভালো হয় না সে জমি আলুবোখারা চাষের জন্য নির্বাচন করা যেতে পারে। বাগান আকারে চাষ করতে হলে নির্বাাচিত জমি ভালো করে চাষ ও মই দিয়ে সমতল এবং আগাছামুক্ত করে দিতে হবে। পাহাড়ি এলাকা, বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধার বা পুকুর পাড়ে গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে জমিতে চাষ না দিয়ে শুধু পারিষ্কার করে নিলেই চলবে।
 
জাত : বারি আলুবোখারা-১
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে উদ্ভাবিত বারি আলুবোখারা-১ জাতটি ২০১৩-১৪ সনে অনুমোদন করা হয়। এদেশের মাটিতে ভালো ফলন দিচ্ছে। এর গাছ মাঝারি আকারের, ৫-৬ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট হয়ে থাকে। তবে শাখা ছাটাই না করলে এর গাছ ১২ মিটার লম্বা ও ১০ মিটার পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে। ফেব্রুয়ারি মাসে এ জাতটিতে ফুল আসে আর জুন মাসে ফল পাকে। আকর্ষণীয় উজ্জ¦ল লাল রঙের মাঝারি আকারের (৮.৬৬ গ্রাম/ফল) সুগন্ধিযুক্ত ফল। এর ফলের খাদ্যাংশ বেশি (৯৭%) এবং মাঝারি টক মিষ্টি স্বাদের (টিএসএস ১১.০)। গাছে প্রচুর ফল ধরে  (গড়ে ১৪০০টি), ১১.৩ কেজি বা হেক্টরপ্রতি ৭.০৩ টন। এ জাতটিতে রোগ বালাই এর আক্রমণ অনেক কম।
 
রোপণ পদ্ধতি ও সময়
সমতল ভূমিতে আলুবোখারা চারা সাধারণত বর্গাকার বা ষড়ভূজী প্রণালিতে লাগানো যায়। কিন্তু উঁচু নিচু পাহাড়ে কণ্টুর রোপণ প্রণালি অনুসরণ করতে হবে। মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত আলুবোখারা চারা রোপণ করা যায়।
 
মাদা তৈরি
চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পূর্বে উভয় দিকে ৩-৪ মিটার দূরত্বে ৬০x৬০x৬০ সেন্টিমিটার মাপের গর্ত করতে হবে। প্রতি গর্তে ১৫-২০ কেজি কম্পোস্ট বা পচা গোবর, ৩-৫ কেজি ছাই, ২০০ গ্রাম টিএসপি এবং ২৫০ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করে গর্তের উপরের মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে। গর্ত ভরাট করার ১০-১৫ দিন পর চারা রোপণ করতে হবে।
 
চারা-কলম রোপণ ও পরিচর্যা
এক বছর বয়সী সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত চারা-কলম রোপণের জন্য নির্বাচন করতে হবে। গর্তে সার প্রয়োগের ১০-১৫ দিন পর নির্বাচিত চারা-কলমটি গর্তের মাঝখানে সোজাভাবে লাগিয়ে তারপর চারদিকে মাটি দিয়ে চারার গোড়ায় মাটি সামান্য চেপে দিতে হবে। রোপণের পরপর খুঁটি দিয়ে চারা-কলমটি খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। অতঃপর প্রয়োজনমতো পানি ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
 
গাছের সার প্রয়োগ
সারের নাম    গাছের বয়স
                      ১-৩ বছর    ৪-৭ বছর    ৮-১০ বছর   ১০ বছর এর ঊর্ধ্বে
গোবর/কম্পোস্ট  ১০-১৫         ১৫-২০         ২০-২৫       ২৫-৩০
ইউরিয়া(গ্রাম)    ২০০-৩০০    ৩০০-৪০০    ৫০০-৮০০    ১০০০
টিএসপি (গ্রাম)    ১৫০-২০০    ২০০-৩০০    ৩০০-৪০০    ৫০০
এমওপি (গ্রাম)    ১৫০-২০০    ২০০-৩০০    ৩০০-৪০০    ৫০০
 
আশানুরূপ গুণগতমানসম্পন্ন ফল পেতে হলে আলুবোখারা নিয়মিত পরিমিত মাত্রায় সার প্রয়োগ করা আবশ্যক। গাছের বৃদ্ধির সাথে সারের পরিমাণ বাড়বে। প্রতিটি গাছের জন্য সারের পরিমাণ হবে।
 
সবটুকু সার ৩ ভাগ করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ও ভাদ্র-আশ্বিন ও মাঘ-ফাগুন মাসে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিবার সার দেয়ার পর প্রয়োজনে পানি দিতে হবে।
 
আগাছা দমন
গাছের গোড়া নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। পাহাড়ের ঢালে, বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধার বা পুকুর পাড়ে লাগানো গাছের গোড়ায় আগাছা কেটে পরিষ্কার রাখতে হবে।
 
সেচ প্রয়োগ
চারা রোপণের প্রথমদিকে প্রয়োজনমতো সেচ দেয়া দরকার। খরা বা শুকনো মৌসুমে পানি সেচ দিলে ফল ঝরা কমে, ফলন বৃদ্ধি পায় এবং ফলের আকার ও আন্যান্য গুণাগুণ ভালো হয়।
 
ডাল ছাঁটাইকরণ
চারা অবস্থায় গাছকে সুন্দর কাঠামো দেয়ার জন্য অবাঞ্ছিত ও অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছাঁটাই করে রাখতে হবে। ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে গাছের মরা, রোগাক্রান্ত ও পোকামাকড় আক্রান্ত ডালপালা কেটে পরিষ্কার করতে হবে।
 
রোগবালাই ব্যবস্থাপনা
বারি আলুবোখারা-১ এ রোগ বালাই তেমন দেখা যায়নি। শুধুমাত্র পাতার দাগ বা লিফ স্পট রোগ দেখা গেছে। রিডোমিল বা এ জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করেই তা দমন করা যায়।
 
ফসল সংগ্রহ ও ফলন
আলুবোখারার ফল নন-ক্লাইমেক্টরিক হওয়ায় গাছ থেকেই ভালোভাবে পাকার পর তা সংগ্রহ করতে হয়। আলুবোখারার ফল ভালোভাবে পেকে গাঢ় লাল বা হালকা খয়েরি রঙ ধারণ করলে এবং ফল নরম হলেই সংগ্রহ করা উচিত। হালকা লাল বা হলুদ আবস্থায় সংগ্রহ করা হলে তা অত্যন্ত টক বা হালকা তেতো স্বাদেরও হতে পারে। বারি আলুবোখারা -১ এর বা এ জাতের প্রতি পূর্ণবয়স্ক (১৫-২০ বছর) গাছে দেড় থেকে তিন হাজার পর্যন্ত ফল পাওয়া যেতে পারে। হেক্টরপ্রতি ৭ থেকে ১০ টন সতেজ পাকা ফল পাওয়া যায়। 
 

ড. শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার*
* ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বারি, গাজীপুর
 
বিস্তারিত
মোহনীয় ফল স্ট্রবেরি ভিন্নকথা

ট্রবেরি মোহনীয় লোভনীয় মনোহরি সুস্বাদু উচ্চমূল্যের ফল। স্ট্রবেরির মনোহরি রঙ আর আকার এমন কেউ নেই যাকে বিমোহিত না করে। হয়তো এটি আমাদের ফল নয় বলে এর স্বাদ রুচি কোনটাই এখন আমাদের আসল অর্থে জনপ্রিয়তার পর্যায়ে নেয়া যায় না। অনেকেই প্রচার প্রচারণায় বলেন বাম্পার ফলন, লাখ টাকা কোটি টাকা আয়। এসব চমকীয় চটকদার প্রচারণা। আসল অর্থে কৃষির লাভের চেয়ে লোকসানটাই বেশি হয়। এ দেশের কৃষিতে সার্বিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য আমাদের আর্থসামাজিকতা, বোধ, মিথ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, চাহিদা, বাজার এগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্ট্রবেরি কি এখনো সেভাবে আমাদের কাজে লেগে সার্বিকতার নজর কাড়তে পেরেছে? কিংবা আরো গভীরে গিয়ে যদি বলি আমাদের ষোলোকলা পূর্ণ করতে পেরেছে? না পারেনি সেভাবে আসল অর্থে। বিদেশি ফল বলে নয় কৃষকের মন মানসিকতা, ইচ্ছা আর লাভের কথা চিন্তা করেই সব কাজে এগোতে হবে যৌক্তিকভাবে। হুজুগে শুরু করে আবার কলিতে বিনষ্ট হলে কোন কাজ দিয়েই কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ বা সুদৃঢ় করা যাবে না। ভেবেচিন্তে উদ্যোগী হলে পরিণামে লাভ বেশি হয়। ফল বিশেষজ্ঞ ড. মুন্সী রাশীদ আহ্মদ বলেন স্ট্রবেরি আমাদের প্রচলিত ফলের মতো খাওয়ার ফল নয়। এটি আসলে সতেজ/তাজা (Fresh Fruit) হিসেবে যতটুকু না জনপ্রিয় ও ব্যবহৃত হয় তার চেয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ (Processing fruit) ফল হিসেবে বেশি কার্যকর, জনপ্রিয় এবং ব্যবহৃত হয়। স্ট্রবেরি ফল হিসেবে খাওয়া ছাড়াও বিভিন্ন খাদ্যের সৌন্দর্য ও ঘ্রাণ বাড়াতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া জ্যাম, জুস, জেলি, ক্যান্ডি, মিল্কশেক, শরবত, মিশ্র তরল বানাতে বেশ উপযোগী। এটি ডেকোরেশন, চমক, আকর্ষণ বাগড়াতে, ভ্যালুঅ্যাড করতে উপযোগী ফল। এটিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লাভজনক করতে হলে অবশ্যই পুরো পোলট্রি শিল্পের বিভাজনের মতো এর চারা উৎপাদন, ফল উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ, ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করার জন্য আলাদা ৩টি সেক্টরে ভাগ করে কাজ করতে হবে। একই মানুষ বা একই উদ্যোগে ৩টি কাজ লাভজনকভাবে করতে পারবে না বা সহজসাধ্য নয়। কেননা চারা উৎপাদনে আলাদা ও বিশেষ গুরুত্ব ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। চারা উৎপাদনকারীরা শুধুই চারাই সরবরাহ করবে। আবার ফল উৎপাদনকারীরা শুধু ফল উৎপাদন করবে এবং উৎপাদনের পর অন্যরা শুধু বাজারজাতকরণ বা প্রক্রিয়াজাতকরণে সম্পৃক্ত থাকবে।
 

 স্ট্রবেরি ছোট ঝোপালো লতানো/গুল্ম প্রকৃতির গাছ থেকে হয়। এর শক্ত কোন কা- বা ডালপালা নেই। পাতা সবুজ, ছোট, কিনারা খাঁজকাটা, থানকুনি পাতার মতো; পাতার বোঁটাও লম্বা, সরু, নরম এবং বেশ বাহারি লোমশ। ঝোপের মধ্যেই ছোট ছোট ঘণ্টার মতো সাদা বা ঘিয়া রঙের ফুল ফোঁটে। সরু সুতার মতো বোঁটার মাথায় একটি একটি করে ফল ধরে। কাঁচা ফলের রঙ প্রথমে সবুজ, ক্রমে সাদা এবং পাকলে উজ্জ্বল টকটকে লাল হয়। স্ট্রবেরির ফল আর দশটি ফলের মতো সাধারণ ১টি ফল নয়। এটি একটি পরিবর্তিত যৌগিক ফল। ফলের খাওয়ার উপযোগী রসাল লাল অংশটি পরিবর্তিত স্ফিত থ্যালামাস এবং এর উপর কাল/হলুদ বর্ণের দানাগুলো প্রকৃত বীজ। এক থোকাতে অনেকগুলো ফল ধরে। আকর্ষণীয় রঙ, গন্ধ ও উচ্চ পুষ্টিমানের জন্য স্ট্রবেরি বিশ্বব্যাপী খুবই জনপ্রিয় ও সমাদৃত। এতে ভিটামিন সি ছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে অন্যান্য ভিটামিন, খনিজ পদার্থের পাশাপাশি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু জৈব এসিড ও এন্টিঅক্সিডেন্ট (ইল্লাজিক এসিড) রয়েছে; যা বার্ধ্যক্য ও ক্যান্সার প্রতিরোধে খুবই কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে। তাছাড়া ত্বকের পরিচর্যার জন্যও স্ট্রবেরি বহুল সমাদৃত।
 
স্ট্রবেরির খুব বেশি জাত এখনো আমাদের দেশে আসেনি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি স্ট্রবেরি-১ নামে একটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে এবং আরো দুটি উচ্চফলনশীল জাত মুক্তায়নের অপেক্ষায় আছে। জাত ৩টি বাংলাদেশের সব জায়গায় চাষ করা যায়। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে গাছে ফুল আসতে শুরু করে এবং ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। জানুয়ারি ফেব্রুয়ারিতে অর্থাৎ বেশি শীতে যে ফল আসে সেগুলো গুণে মানে স্বাদে সৌন্দর্যে আকারে বেশি মাতোয়ারা করে। প্রতি গাছে গড়ে ৬০ থেকে ৭৫টি ফল  ধরে যার গড় ওজন সাধারণভাবে ৩৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। গড়ে গাছপ্রতি ৪৫০ গ্রাম। বিক্রয়যোগ্য প্রতিটির গড়পরতা ওজন ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম। প্রিমিয়াম বা ভালো আকারের ফলগুলো ৪৫ থেকে ৫০ গ্রামের হয়। গড়ে প্রতিটি ফল ১৫ গ্রামের হয়। হেক্টরপ্রতি ফলন ১০ থেকে ১২ টন। এ জাতের পাকা ফল আকর্ষণীয় টকটকে লাল বর্ণের। জাতটি যথেষ্ট পরিমাণে সরু লতা হতে উৎপন্ন চারা/রানার উৎপাদন করে বলে এর বংশবিস্তার সহজ। এছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবিত জাত রাবি-১, রাবি-২, রাবি-৩ এবং মডার্ন হর্টিকালচার সেন্টার, নাটোর থেকে সরবরাহকৃত জাত মডার্ন স্ট্রবেরি-১, মডার্ন স্ট্রবেরি-২, মডার্ন স্ট্রবেরি-৩, মডার্ন স্ট্রবেরি-৪, মডার্ন স্ট্রবেরি-৫, আমাদের দেশে চাষযোগ্য জাত হিসেবে আস্তে আস্তে জনপ্রিয়তার দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশে চাষকৃত জাতগুলোর মধ্যে সবগুলোই প্রবর্তন (Introduction) এবং নির্বাচন (Selection) মাধ্যমে প্রচলিত হয়েছে।
 
স্ট্রবেরি মূলত শীত প্রধান অঞ্চলের ফসল। এর আবাদি উৎস দেশে কখনো কখনো বরফ পড়ে। ফুল ও ফল আসার সময় শীতল ও শুকনো আবহাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের আবহাওয়া রবি মৌসুমে স্ট্রবেরি চাষের উপযোগী। সুনিষ্কাশিত উর্বর দো-আঁশ থেকে বেলে দো-আঁশ সমতল মাটি স্ট্রবেরি চাষের জন্য উপযোগী। যেসব জমিতে পানি জমে সেখানে স্ট্রবেরি ফলানো যাবে না। জমি ভালোভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে গভীরভাবে অন্তত ১ ফুট গভীর চাষ দিতে হবে। শেষ চাষের সময় পরিমাণমতো সার  মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। স্ট্রবেরির চারা মধ্য আশ্বিন থেকে মধ্য কার্তিক (অক্টোবর) মাসে রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে নভেম্বর ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত স্ট্রবেরি চারা রোপণ করা যায়। চারা রোপণের জন্য জমিতে বেড তৈরি করে নিতে হবে। প্রতিটি বেড প্রায় ৩ ফুট প্রশস্ত করে তৈরি করতে হবে। দুই বেডের মধ্যে ১ থেকে ১.৫ ফুট চওড়া নালা রাখতে হবে। প্রতি বেডে দুই লাইনের মধ্যে ১.৫ থেকে ২ ফুট দুরত্ব রাখতে হবে। প্রতিটি লাইনে ১ থেকে ১.৫ ফুট দূরে দূরে চারা রোপণ করতে হবে। এ হিসাবে প্রতি শতকে প্রায় ১৫০টি চারা রোপণ করা যায়।
 
ভালো ফলনের জন্য জমিতে পরিমাণমতো সার দিতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে সার দিলে ফলন ভালো হয়। সাধারণ হিসেবে প্রতি শতক জমিতে সারের পরিমাণ  হলো শুকনো পচা গোবর ১২০ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ৮০০ গ্রাম, এমওপি ৯০০ গ্রাম, জিপসাম ৬০০ গ্রাম; শেষ চাষের সময় সম্পূর্ণ গোবর, টিএসপি, জিপসাম ও অর্ধেক পরিমাণ এমওপি সার জমিতে ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ও অবশিষ্ট এমওপি সার চারা রোপণের ১৫ দিন পর থেকে ১৫ থেকে ২০ দিন পর পর ৮ থেকে ৫ টি কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। জমিতে রসের অভাব দেখা দিলেই প্রয়োজনমতো পানি সেচ দিতে হবে। ফল উৎপাদনের সম্পূর্ণ সময়টিতে বেশ কয়েকবার সেচ দিতে হয়। একই সাথে মনে রাখতে হবে স্ট্রবেরি জলাবদ্ধতা একদমই সহ্য করতে পারে না।  তাই বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের করে দিতে হবে।
 
স্ট্রবেরি বীজ এবং রানারের (কচুর লতি/থানকুনির মতো লতা) মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। তাই আগের বছরের গাছ নষ্ট না করে জমি থেকে তুলে  জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে রোপণ করতে হবে। সে গাছ থেকে উৎপন্ন রানারের পর্বসন্ধি হতে শিকড় বের হলে তা মাতৃগাছ থেকে কেটে সুষমভাবে মিশ্রিত ৫০ ভাগ গোবর ও ৫০ ভাগ পলিমাটিযুক্ত পলিথিন ব্যাগে রোপণ করতে হবে। এরপর পলিথিন ব্যাগসহ চারাটি হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে। অতিরিক্ত বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য চারার ওপর পলিথিনের ছাউনি দিতে হবে। রানারের মাধ্যমে বংশবিস্তার করা হলে স্ট্রবেরির ফলন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তাই জাতের ফলন ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য ২-৩ প্রজন্ম পরপর টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত চারা ব্যবহার করা ভালো। বিশিষ্ট ফল বিজ্ঞানী এবং স্ট্রবেরি বিশেষজ্ঞ ড. মুন্সী রাশীদ আহমদ বলেন, এ দেশে স্ট্রবেরি উৎপাদনে চারা উৎপাদন বা চারা প্রাপ্তি বেশ সমস্যাজনক। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে অবশ্যই পোলট্রি শিল্পের মতো একটি সেক্টরে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে মাতৃচারা তৈরি এবং রানার উৎপাদন; দ্বিতীয় সেক্টরে মূল জমিতে স্ট্রবেরি ফল উৎপাদন; এবং তৃতীয় সেক্টরে বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করতে হবে। তবেই কেবল স্থিতিশীল লাভজনকভাবে স্ট্রবেরি আমাদের দেশে উৎপাদন করা যাবে।
 
সরাসরি মাটির সংস্পর্শে এলে স্ট্রবেরির ফল পচে নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য প্রথম ফুল আসার পরপরই স্ট্রবেরির বেড খড় বা কালো পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ৩ মিলিলিটার ডার্সবান ২০ ইসি ও ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন ডিএফ মিশিয়ে সে দ্রবণে খড় শোধন করে নিলে তাতে উঁইপোকার আক্রমণ হয় না এবং দীর্ঘ দিন তা অবিকৃত থাকে। জমি সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। গাছ লাগানোর পর তার গোড়া থেকে প্রচুর রানার বা কচুর লতির মতো লতা বের হতে থাকে। এগুলো মাতৃগাছ থেকে খাদ্য আহরণ করে ফুল ও ফল আসা বিলম্বিত করে। এতে ফলন ভালো হয় না, কমে যায়। এ জন্য ফল উৎপাদনের সময় রানারগুলো ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর কেটে  ফেলতে হবে।
 
অ্যানথ্রাকনোজ স্ট্রবেরির একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এর আক্রমণ পাতা, ফল, রানার এবং ক্রাউনে বা শীর্ষ মুকুলে দেখা যায়। তবে ক্রাউন রুটই (Crown Rot সবচেয়ে ক্ষতিকর। Colletotrichum gloeosporioides নামক ছত্রাক এ রোগের কারণ। এর প্রতিকারের জন্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক টিল্ট প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ৭ থকে ১০ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার গাছের গোড়াসহ সর্বত্র স্প্রে করতে হবে। এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে পাতায় দাগ পড়া রোগ হয়। এ রোগের আক্রমণে ফলন কমে যায় ও ফলের গুণগতমান কমে যায়। ফল পচা রোগের আক্রমণে ফলের গায়ে জলে ভেজা বাদামি বা কালো দাগের সৃষ্টি হয়। দাগ দ্রুত বেড়ে যায় এবং ফল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়। যেহেতু গাছে ফল আসা শুরু করলে বিভিন্ন গাছে বিভিন্ন পর্যায়ের ফল সবসময়ই বিরাজ করে, তাই গাছে ফল আসার পর কোনো প্রকার ছত্রাকনাশক/কীটনাশক প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই শ্রেয়। যেমন- মাঠ আগাছামুক্ত, আবর্জনামুক্ত (মরা পাতা ও পচা ফল) রাখা এবং ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক দ্বারা শোধিত খড় দিয়ে মালচিং করা।
 
নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় এবং মাঠে চারা রোপণের অব্যবহিত পরে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় গাছে মাকড়ের আক্রমণ দেখা দেয়। মাকড়ের আক্রমণে স্ট্রবেরি গাছের বাড়বাড়তি, ফলন ক্ষমতা ও গুণগতমান মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এদের আক্রমণে পাতা তামাটে বর্ণ ধারণ করে ও পুরু হয়ে যায়, আস্তে আস্তে কুঁকড়ে যায় এবং অনেক অনাকাক্ষিত শাখা প্রশাখা গজায়। গাছের স্বাভাবিক বাড়বাড়তি ব্যাহত হয়। এ জন্য ভারটিমেক/অ্যাবামেকটিন (মাকড়নাশক) প্রতি লিটার পানির সাথে ১ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার পাতার নিচে স্প্রে করতে হবে। বুলবুলি পাখি স্ট্রবেরির সবচেয়ে বড় শত্রু। ফল আসার পর সম্পূর্ণ পরিপক্ব হওয়ার  আগেই পাখির উপদ্রব শুরু হয়। এজন্য ফল আসার পর উঁচু করে সম্পূর্ণ বেড/মাঠ জাল দিয়ে ঢেকে দিতে হবে যাতে পাখি ফল খেয়ে নষ্ট করতে না পারে। এ ছাড়া মেরুদণ্ডী প্রাণির মধ্যে ইঁদুর ও শিয়াল ফসল নষ্ট করতে পারে।
 
স্ট্রবেরি গাছ প্রখর সূর্যের আলো ও বেশি বৃষ্টি সহ্য করতে পারে না। এজন্য এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত হালকা ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ফল সংগ্রহের পর সুস্থ সবল গাছ মাঠ থেকে তুলে পলিথিন ছাউনির নিচে রোপণ করলে মাতৃগাছকে সূর্যের খরতাপ ও ভারি বৃষ্টির ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যায়। এ সময় তাদের বাড়বাড়তি বেশি হয় না। মাতৃগাছ থেকে উৎপাদিত রানার পরবর্তী সময়ে চারা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সে রানারকে অফ সিজনে/অমৌসুমে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যেন পরবর্তী মৌসুমে মানসম্মত চারা পাওয়া যায়।
 
আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি (অক্টোবর মাসের শুরু) সময়ে রোপণকৃত বারি স্ট্রবেরি-১ এর ফল সংগ্রহ পৌষ মাসের মাঝামাঝি শুরু হয়ে চৈত্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। ফল পেকে লাল রঙ হলে ফল সংগ্রহ করতে হয়। স্ট্রবেরির সংরক্ষণকাল খুব কম হওয়ায় ফল সংগ্রহের পর পরই তা টিস্যু পেপার স্টাইরোফোমের নেটের জ্যাকেট দিয়ে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের ঝুঁড়ি বা অনূর্ধ্ব ৯ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট ও ছিদ্রযুক্ত শক্ত কাগজের কার্টুনে এমনভাবে  সংরক্ষণ করতে হবে যাতে ফল গাদাগাদি অবস্থায় না থাকে। ফল সংগ্রহের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাজারজাত করতে হবে। স্ট্রবেরি উৎপাদনকারী কৃষকরা ফল তোলার পর বিশেষ রাবার-প্লস্টিকের নেটের জালি দিয়ে প্যাকিং করে রাখেন। এতে পরিবহনে সমস্যা হয় না। বাজারে বিক্রির আগে মোড়ক খুলে অক্ষত সতেজ ফল বিক্রি করেন । মৌসুমের শুরুতে জানুয়ারিতে প্রতি কেজি ১ হাজার  থেকে ১২শ’ টাকা দামে বিক্রি হয়। তবে গরম বাড়তে থাকলে ফেব্রুয়ারির পর দাম কমতে থাকে এবং পরে ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকা কেজি দামেও বিক্রি হয়। আমাদের দেশে গড়ে প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। হেক্টরে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা। তবে আরো বেশি ব্যবস্থাপনা আর যত্নে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকাও আয় করা যায় স্ট্রবেরি আবাদ করে। স্ট্রবেরির গুণগত মান আকার মূলত তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। সেজন্য জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসে ফল আসে এমন হিসাব করেই স্ট্রবেরি আবাদ করতে হবে।
 
আবারো ফলবিজ্ঞানী মুন্সী রাশীদ আহ্মদের মতে বলি, স্ট্রবেরি আমাদের দেশে অবশ্যই লাভজনকভাবে আবাদ করা যাবে। তবে অবশ্যই তা পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। এবং তা অবশ্যই ৩টি সেক্টরে ভাগ করে পোলট্রি শিল্পের মতো করে করতে হবে। এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় স্ট্রবেরি এ দেশের ফল হয়ে গেছে আবহাওয়া জলবায়ুর সাথে খাপ খেয়ে। এখন শুধু প্রয়োজন এর বাকি ব্যবস্থাপনা। মনে রাখতে হবে স্ট্রবেরি ফল সরাসরি খাওয়ার জন্য নয়। কেননা এ ফলটি তোলার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে পঁচে নষ্ট হয়ে যায়। সেদিকটি খেয়াল করে এর চারা উৎপাদন, ফল উৎপাদন এবং ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। আর স্ট্রবেরির কেক, দই, আইসক্রিম, জুস, জ্যাম, ক্যান্ডি, শরবত, মিল্কশেক, মিশ্রতরল কিংবা খাবার সাজাতে তুলনাহীন লোভনীয়, আকর্ষণীয় আইটেম হিসাবে ব্যবহারের কথা স্মরণ রেখে, পরিকল্পিতভাবে সবদিক চিন্তা করে কর্মসূচি গ্রহণ করলে স্ট্রবেরি নিয়ে আমরা অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারব। যারা স্ট্রবেরি সম্পর্কে বুঝেন, গবেষণা করেছেন, গবেষণা ফলাফল হাতে আছে, তাদের সাথে আলাপ করে সামনে এগোতে হবে। স্ট্রবেরি একদিন আমাদের গর্বিত ফল হিসেবে আমাদের ব্যঞ্জরিত উন্নয়ন আর সমৃদ্ধিকে আরো বেগবান করবে, আমাদের কৃষির এ অংশকে দূর বহুদূরে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এ লেখাটিকে পরিপক্ব সমৃদ্ধ করতে মুন্সী রাশীদ আহ্মেদ আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন। স্ট্রবেরি সম্পর্কে যেকোন জিজ্ঞাসার জন্য তার সাথে যোগাযোগ করা যায়।
 
 
কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম
* উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা
 
বিস্তারিত
বোরো ধানের জাত বৈশিষ্ট্য

ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য শস্য। এ দেশ বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে ধানের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৪.২ টন। আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে দেশের ধান উৎপাদনের তিনটি মৌসুম লক্ষ্য করা যায়, যথা- আউশ, আমন ও বোরো। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক বোরো ধানের প্রায় ২৭টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। জাতগুলোর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো-
 

বিআর ৩
একটি উচ্চফলনশীল ধানের জাত, যা বোরো, আউশ এবং আমন তিন মৌসুমের জন্য অনুমোদিত। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৭৩ সনে জাতটি উদ্ভাবন করেছে। বিআর৩-এর জনপ্রিয় নাম বিপ্লব। এ জাতের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- গাছের উচ্চতা ৯৫ সেন্টিমিটার, এর চাল মাঝারি মোটা ও পেটে সাদা দাগ আছে, গাছ হেলে পড়ে না এবং ভাত ঝরঝরে। জাতটির জীবনকাল বোরো মৌসুমে ১৭০ দিন এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৬.৫ টন।
 
ব্রিআর ১৪
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ধান বিআর ১৪ বোরো এবং আউশ মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ১৯৮৩ সনে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। এ ধানের জনপ্রিয় নাম গাজী। এ জাতের বৈশিষ্ট্য হলো- গাছের উচ্চতা ১১৫-১২০ সেন্টিমিটার, কাণ্ড খুব মজবুত এবং পাতা খাড়া, কুশি গজানোর ক্ষমতা মাঝারি, ডিগপাতা কিছুটা হেলে যায়, ফলে শিষ উপরে দেখা যায় এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ছড়ার উপরিভাগের ধানে শুঙ আছে, চাল মাঝারি মোটা, সাদা এবং ভাত ঝরঝরে এবং এ জাতে প্রোটিনের পরিমাণ ৮.১%। এর জীবনকাল বোরো মৌসুমে ১৫৫-১৬০ দিন এবং ফলন- বোরো মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ৬.০-৬.৫ টন।
 
বিআর ১৬
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ জাতটি ইরি থেকে প্রবর্তন করেছে। এটি ১৯৮৩ সনে বোরো ও আউশ মৌসুমে চাষাবাদের জন্য বিআর ১৬ নামে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। এ জাতের জনপ্রিয় নাম শাহীবালাম। ইহা বোরো মৌসুমের বালাম ধান। এ জাতের বৈশিষ্ট্য- গাছের উচ্চতা ৯০-৯৫ সেন্টিমিটার, গাছের কাণ্ড এবং পাতা খাঁড়া ও সবুজ, কুশি গজানোর ক্ষমতা মাঝারি, চাল লম্বা, চিকন এবং সাদা, ভাত ঝরঝরে এবং সুস্বাদু, চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৭.৮%। এ জাতের জীবনকাল বোরো মৌসুমে ১৫৫-১৬০ দিন এবং উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে বোরোতে হেক্টরপ্রতি ৫.৫-৬.০ টন ফলন দিয়ে থাকে।
 
বিআর ১৭
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এটিকে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ হাওর এলাকার উপযোগী বলে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করে। এ জাতটি বিআর ১৭ নামে অনুমোদন লাভ করে। এ ধরনের জনপ্রিয় নাম হাসি। এ জাতের বৈশিষ্ট্য হলো- এটি আগাম জাত, গাছের উচ্চতা ১২৫ সেন্টিমিটার, চাল মাঝারি মোটা ও ভাত ঝরঝরে, ফুল ফোটার সময় শিষগুলো ডিগ পাতার উপরে থাকে। হাওর, বাঁওড় ও বিলাঞ্চলের জন্য এ জাতটি বিশেষ উপযোগী। কারণ গাছ লম্বায় ১২৫ সেন্টিমিটার, তাই ধান পাকার সময় হঠাৎ বন্যায় মাঠে কোমর পানি হলেও ফসল কাটা যায়। এ জাতের জীবনকাল ১৫৫ দিন এবং গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৬.০ টন।
 
বিআর ১৮
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার উপযোগী বলে এ জাতটি ইন্দোনেশিয়া থেকে এদেশে প্রবর্তন করেছে। এটি ১৯৮৫ সনে বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য বিআর ১৮ নামে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। এ জাতের জনপ্রিয় নাম শাহজালাল। এ জাতের বৈশিষ্ট্য : কাণ্ড খুবই মজবুত ও হেলেপড়া প্রতিরোধী, গাছের উচ্চতা ১১৫-১২০ সেন্টিমিটার, চারার উচ্চতা ২০-২৫ সেন্টিমিটার, কুশি গজানোর ক্ষমতা মাঝারি, পাতা প্রশস্ত, লম্বা এবং মোটামুটি খাড়া, চাল মাঝারি মোটা, সাদা ও ভাত ঝরঝরে এবং এ জাতের ধান মাড়াই করা সহজ। জাতটির জীবনকাল ১৬৫-১৭০ দিন এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৬.০-৬.৫ টন। (বিআর ১৮) হাওর, বাঁওড় আর বিলাঞ্চলে এ জাতের আবাদ করা উচিত। কারণ এর কাণ্ড লম্বা, তাই ধান পাকার সময় হঠাৎ বন্যায় মাঠে কোমর পানি হলেও ফসল কাটা যায়।
 
বিআর ১৯
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার উপযোগী বলে এ জাতটি ইন্দোনেশিয়া থেকে এদেশে প্রবর্তন করেছে। এটি ১৯৮৫ সনে বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য বিআর ১৯ নামে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। এ জাতের জনপ্রিয় নাম মঙ্গল। এটি হাওর অঞ্চলের ধান। এ জাতের বৈশিষ্ট্য- গাছের কা- লম্বা কিন্তু মজবুত, গাছের উচ্চতা ১১০-১১৫ সেন্টিমিটার, পাতা এবং কা- গাঢ় সবুজ, ডিগপাতা ছোট ও খাড়া, পাকার সময় শিষ উপরে থাকে এবং চাল লম্বা, সরু এবং স্বচ্ছ। এ জাতের জীবনকাল বীজ বপন থেকে পাকা পর্যন্ত ১৬৫-১৭০ দিন এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৬.০ টন। হাওর, বাঁওড় আর বিলাঞ্চলে এ জাতের আবাদ করা উচিত। কারণ এর কা- লম্বা, তাই ধান পাকার সময় হঠাৎ বন্যায় মাঠে কোমর পানি হলেও ফসল কাটা যায়।
 
ব্রি ধান ২৮
বোরো মৌসুমের একটি আগাম জাত। এ জাত ১৯৯৪ সনে চাষাবাদের জন্য অনুমোদিত হয়।এ জাতের জীবনকাল ব্রি ধান ২৯ এর চেয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ কম। তাই অসচ্ছল কৃষক যারা আগাম ফসল কাটতে চান তাদের জন্য এ জাতটি বিশেষভাবে উপযোগী। এ জাত আগাম বিধায় বন্যাপ্রবণ এলাকায় যেখানে পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যায় সেসব এলাকার জন্যও উপযোগী। এ ধানের মুড়ি ভালো হয়। বোরো ধান চাষের পর যারা সবুজ সার চাষ করে মাটির উর্বরতা বাড়াতে চান তারা এ আগাম জাতটি নির্বাচন করতে পারেন। এ জাতের বৈশিষ্ট্য- গাছের উচ্চতা ৯০ সেমি, পাকার সময় ধানের শিষ উপরে থাকে, চাল মাঝারি চিকন ও সাদা, ভাত ঝর ঝরে ও খেতে সুস্বাদু। এ জাতের জীবনকাল ১৪০ দিন এবং স্বাভাবিক ফলন হেক্টরপ্রতি ৫.৫-৬.০ টন।
 
ব্রি ধান ২৯
ব্রি ধান ২৯ বোরো মৌসুমের একটি নাবি জাতের ধান। ১৯৯৪ সনে এ জাতটি বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন করা হয়। এটি একটি উচ্চফলন ক্ষমতাসম্পন্ন জাত। ব্রি ধান ২৯ জাতের বৈশিষ্ট্য হলো- গাছের উচ্চতা ৯৫ সেন্টিমিটার, কাণ্ড মজবুত তাই হেলে পড়ে না এবং এর চাল মাঝারি চিকন ও সাদা। গুণে ও মানে ব্রি ধান ২৯ সব আধুনিক ধানের সেরা। বলা যেতে পারে বোরো মৌসুমে ব্রি ধান ২৯ সবচাইতে জনপ্রিয় জাত। এর ফলনের পরিমাণ সর্বোচ্চ। তবে উচ্চফলন দেয়ার জন্য এর সার গ্রহণ ক্ষমতাও বেশি। ব্রি ধান ২৯ পাতা পোড়া ও খোল পোড়া রোগে মধ্যম প্রতিরোধশীল। এর জীবনকাল ১৬০ দিন এবং গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৭.৫ টন। অনেক কৃষকের মতে, ব্রি ধান ২৯ হলো বাংলাদেশের হাইব্রিড ধান।
 
ব্রি ধান ৩৬
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের ঠাণ্ডা প্রবণ এলাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ জাতটি ইরি থেকে প্রবর্তন করেছে। এটি ১৯৯৮ সনে বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ব্রি ধান ৩৬ নামে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। এ জাতের বৈশিষ্ট্য- চারা অবস্থায় ঠাণ্ডা সহনশীল, গাছের উচ্চতা ৯০-৯৫ সেন্টিমিটার, পাকার সময় পর্যন্ত গাছ সবুজ থাকে, চাল লম্বা ও চিকন, ভাত ঝরঝরে এবং খেতে সুস্বাদু এবং চালে প্রোাটিনের পরিমাণ ৮.৭%। জাতটির জীবনকাল ১৪০-১৪৫ দিন এবং উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে হেক্টরপ্রতি ৫.০-৫.৫ টন ফলন দিয়ে থাকে। বীজ বপনের সময় বোরো মৌসুমে যেসব এলাকায় তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এর নিচে নেমে যায় সেসব এলাকার জন্য ব্রি ধান ৩৬ খুবই উপযুক্ত।
 
ব্রি ধান ৪৫
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ব্রি ধান ৪৫ জাতটি সংকরায়ন করে উদ্ভাবন করেছে। এটি ২০০৫ সনে বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। ব্রি ধান ২৮ এর সমান জীবনকাল কিন্তু ফলন বেশি। এ জাতের বৈশিষ্ট্য- গাছ ব্রি ধান ২৮ এর চেয়ে অধিক মজবুত, গাছের উচ্চতা ৯৫-১০০ সেন্টিমিটার, ডিগপাতা লম্বা এবং খাঁড়া, ১০০০ ধানের ওজন ২৬ গ্রাম, চাল মাঝারি মোটা এবং সাদা, ভাত ঝরঝরে এবং সুস্বাদু এবং চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৭.২%। এ জাতটির জীবনকাল ১৪০-১৪৫ দিন এবং উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে হেক্টরপ্রতি ৬.০-৬.৫ টন ফলন দিয়ে থাকে।
 
ব্রি ধান ৪৭
২০০৬ সনে জাতটি চাষাবাদের জন্য জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। ব্রি ধান ৪৭ বাংলাদেশের লবণাক্ত এলাকায় বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন করা হয়েছে। এ জাতের বৈশিষ্ট্য- এটি লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাত, গাছের উচ্চতা ১০৫ সেমি., ডিগ পাতা চওড়া, লম্বা ও খাঁড়া, চাল মাঝারি মোটা এবং পেটে সাদা দাগ আছে, এ জাতটি চারা অবস্থায় উচ্চ মাত্রা (১২-১৪ ডিএস/মিটার) লবণাক্ততা সহনশীল এবং বয়স্ক অবস্থায় নিম্ন থেকে মধ্যম মাত্রা ৬ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা সহনশীল। এ জাতটির জীবনকাল ১৫২ দিন এবং লবণাক্ত পরিবেশে হেক্টরপ্রতি ৬.০ টন ফলন দিতে সক্ষম। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৮.৫ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততা কবলিত। ধান সাধারণত লবণাক্ততা সংবেদনশীল ফসল। এ কারণে লবণাক্ত এলাকায় বিশেষত বোরো মৌসুমে উফশী ধান চাষাবাদ ব্যাহত হয়। বোরো মৌসুমে প্রধানত প্রথম দিকে অর্থাৎ চারা অবস্থায় লবণাক্ততা বেশি থাকে। এ অবস্থায় ব্রি ধান ৪৭ আবাদ করে কৃষকরা ব্রি ধান২৮ বা অন্যান্য বোরো ধানের চাইতে অধিক ফলন পেতে পারেন।
 
ব্রি ধান ৫০
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উঁচু জমি এবং সেচ সুবিধা ভালো এমন জমির জন্য ব্রি ধান ৫০ অনুমোদন করেছে। এটি ২০০৮ সনে বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ব্রি ধান ৫০ নামে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। এ জাতের জনপ্রিয় নাম বাংলামতি। এটি বোরো মৌসুমের একমাত্র সুগন্ধিযুক্ত আধুনিক জাত। এ জাতের বৈশিষ্ট্য- গাছের উচ্চতা ৮২ সেন্টিমিটার, গাছ হেলে পড়ে না, চাল লম্বা, চিকন, সুগন্ধি ও সাদা, ভাত ঝরঝরে এবং চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৮.২%। এ জাতের চালে সুগন্ধি আছে এবং চালের মান বাসমতির মতো। ধান ও চাল সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে চাল তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতি এবং সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এ জাতের জীবনকাল বীজ বপন থেকে পাকা পর্যন্ত ১৫৫ দিন এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৬.০ টন।
 
ব্রি ধান ৫৫
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এ জাতটি উদ্ভাবন করে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জাতটি বোরো ও আউশ মৌসুমে চাষাবাদের জন্য নির্বাচন করা হয়। এ জাতটি ২০১১ সনে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। বোরো মৌসুমের চাষাবাদ পদ্ধতি নিম্নে দেয়া হলো। এ জাতের বৈশিষ্ট্যÑ এটি আগাম জাত, অধিক ফলনশীল, গাছের উচ্চতা ১০০ সেন্টিমিটার, চাল লম্বা, মাঝারি চিকন, এক হাজার ধানের ওজন ২৩.৫ গ্রাম, চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৮.৩% এবং চালে এম্যাইলোজের পরিমাণ ২২%। জাতের জীবনকাল ১৪৫ দিন এবং গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৭.০ টন। ব্রি ধান ৫৫ মাঝারি লবণ (৮-১০ ডিএস/মিটার ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত) সহনশীল এবং মাঝারী ঠাণ্ডা ও খরাসহিষ্ণু জাত। অতএব, এ জাতটি ঠাণ্ডা প্রবণ এলাকায় বোরো মৌসুমে চাষাবাদ করা সম্ভব। জাতটি আগাম হলেও অধিক ফলনশীল।
 
ব্রি ধান ৫৮
ব্রি ধান ৫৮ এর কৌলিক সারি নং- BRRI dhan29-SC3-28-16-4-HR2 ওই কৌলিক সারিটি সোমাক্লোনাল ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে উদ্ভাবিত। ওই ভ্যারিয়েন্ট প্রথমত ব্রি ধান ২৯ এর চাল থেকে ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার পদ্ধতির মাধ্যমে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ওই ভ্যারিয়েন্ট গ্রিন হাউসে স্থানান্তর করে জন্মানোর ফলে প্রাপ্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়। ওই বীজ বর্ধন করে বৃহৎ পরিসরে জন্মানো হয় এবং প্রচলিত পদ্ধতিতে কৌলিক বাছাই এর মাধ্যমে চূড়ান্ত কৌলিক সারি নির্বাচন করা হয়। কৌলিক সারিটি প্রজনন প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বোরো মৌসুমে ব্রি ধান ২৮ ও ব্রি ধান ২৯ জাতের চাষাবাদ উপযোগী এলাকায় ফলন পরীক্ষায় সন্তোষজনক হওয়ায় ২০১২ সনে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বোরোর জাত হিসাবে অনুমোদিত হয়। এ জাতের বৈশিষ্ট্য- পূর্ণ বয়স্ক গাছের উচ্চতা ১০০-১০৫ সেমি. অঙ্গজ অবস্থায় গাছের আকার ও আকৃতি ব্রি ধান ২৯ এর চেয়ে লম্বা, এ জাতের ডিগ পাতা হেলানো এবং লম্বা, ধান পরিপক্ব হওয়ার সাথে সাথে ডিগপাতা বেশি হেলে থাকে, ধানের দানা অনেকটা ব্রি ধান ২৯ এর মত তবে সামান্য চিকন, ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২৪ গ্রাম, পাকা ধানের রঙ খড়ের মতো এবং চালের আকার আকৃতি প্রায় ব্রি ধান ২৯ এর মতো। ব্রি ধান ৫৮ এর জীবনকাল ব্রি ধান ২৮ এর চেয়ে ৬-৭ দিন নাবি কিন্তু ব্রি ধান ২৯ জাতের চেয়ে ৭-১০ দিন আগাম। ব্রিধান৫৮ মাঝারি ঢলে পড়া প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন যা ব্রি ধান ২৮-এ নেই। এ জাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোÑ শিষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। পরিপক্ব শিষগুলো ডিগপাতার উপরে অবস্থান করে বিধায় পুরো ক্ষেত দেখতে খুব আকর্ষণীয় এবং অধিক ফলনশীল। এ জাতের জীবনকাল ১৫০-১৫৫ দিন এবং উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ব্রি ধান ৫৮ চাষে হেক্টরে ৭.০ টন থেকে ৭.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।
 
ব্রি ধান ৫৯
ব্রিধান ৫৯ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক INGER (International Network for Germplasm Evaluation of Rice) এর মাধ্যমে সংগ্রহ ও মূল্যায়ন করে জাত হিসাবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। এর কৌলিক সারি নং- ইড৩২৮। জাতটি ২০১৩ সনে NTC- কর্তৃক বোরো মৌসুমে জন্য অনুমোদন লাভ করে। জাতের বৈশিষ্ট্য : অধিক ফলনশীল, গাছের উচ্চতা ৮৩ সেমি. এবং ঢলে পড়ে না, চালের আকার আকৃতি মাঝারি মোটা এবং রঙ সাদা, ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২৪.৬ গ্রাম, চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৭.৫% এবং চালে এম্যাইলোজের পরিমাণ ২৪.৬%। ব্রিধান ৫৯ এর জীবনকাল ব্রিধান ২৮ এর চেয়ে এক সপ্তাহ নাবি কিন্তু গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ০.৬ টন বেশি। এ জাতের পূর্ণবয়স্ক গাছ উচ্চতায় ব্রিধান ২৮ এর চেয়ে খাটো এবং মজবুত বিধায় ঢলে পড়ে না। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৫৩ দিন এবং হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৭.১ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ব্রি ধান ৫৯ এর সম্ভাব্য ফলন (Potential yield) হেক্টরে ৮.৫ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়।
 
ব্রি ধান ৬০
ব্রি ধান ৬০-এর কৌলিক সারি নং- BR7323-4B-1। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক BR7166-4-5-3 এবং BR26 এর মধ্যে সঙ্করায়ন পর বংশানুক্রম নির্বাচনের (Pedigree Selection) মাধ্যমে উদ্ভাবিত। জাতটি ২০১৩ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বোরো মৌসুমে জন্য অনুমোদন লাভ করে। জাতের বৈশিষ্ট্য- অধিক ফলনশীল, গাছের উচ্চতা ৯৮ সেমি. চালের আকার লম্বা ও সরু এবং রঙ সাদা, ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২৩.৮ গ্রাম, চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৭.৮% এবং চালে এম্যাইলোজের পরিমাণ ২২.২%। ব্রি ধান৬০ এর জীবনকাল ব্রি ধান ২৮ এর চেয়ে ৪-৫ দিন নাবি কিন্তু ফলন প্রতি হেক্টরে ০.৮ টন বেশি। এ জাতের পূর্ণবয়স্ক গাছ উচ্চতায় ব্রি ধান ২৮ এর চেয়ে সামান্য খাটো এবং গাছ মজবুদ বিধায় ঢলে পড়ে না। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৫১ দিন এবং হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৭.৩ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ব্রিধান ৬০ এর সম্ভাব্য ফলন (Potential yield) হেক্টরে ৮.৫ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়।
 
ব্রিধান ৬১
ব্রিধান৬১ এর কৌলিক সারি নং- BR7105-4R-2 ওই কৌলিক সারিটি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক IR64419-3B-4-3 এবং BRRI dhan29 এর সঙ্করায়নের এবং কৌলিক বাছাই (Pedigree selection) এর মাধ্যমে উদ্ভাবিত। প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতিতে চূড়ান্ত কৌলিক সারি নির্বাচন করা হয়। জাতটি দেশের বিভিন্ন লবণাক্ততাপ্রবণ অঞ্চলে বোরো মৌসুমে ব্রি ধান ৪৭ জাতের চাষাবাদ উপযোগী এলাকায় চাষের উপযোগী। জাতটি ২০১৩ সনে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বোরো মৌসুমে জন্য অনুমোদন লাভ করে। ব্রি ধান ৬১ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মি (৩ সপ্তাহ পর্যন্ত) লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। উপরন্তু এ জাতটি অঙ্গজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায় পর্যন্ত লবণাক্ততা সংবেদনশীল সব ধাপে (Salt sensitive stages) ৮ ডিএস/মি মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করে ফলন দিতে সক্ষম যা প্রচলিত উচ্চফলনশীল জাত ব্রি ধান ২৮ পারে না। এ জাতটি ব্রি ধান ৪৭ এর মতো লবণ সহ্য করতে পারে তবে এর দানা মাঝারি চিকন ও শিষ থেকে ধান সহজে ঝরে পড়ে না। এ জাতের বৈশিষ্ট্য : অধিক ফলনশীল, চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মি (৩ সপ্তাহ পর্যন্ত) এবং অঙ্গজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায় পর্যন্ত ৮ ডিএস/মি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, গাছের উচ্চতা ৯৫ সেমি. চালের আকার মাঝারি চিকন, ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২১ গ্রাম, চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৮.৮%, চালে এম্যাইলোজের পরিমাণ ২২%, খোলে (Leaf sheath) ও বড় তুষের (Lemma) অগ্রভাগে, এনথোসায়ানিন রঙ আছে এবং গর্ভমুণ্ড (Stigma) পার্পল বর্ণের। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৪৫-১৫০ দিন এবং লবণাক্ততার মাত্রা ভেদে হেক্টর প্রতি ৩.৮-৭.৪ টন ফলন দিতে সক্ষম, যা ব্রি ধান২৮ এর থেকে ১.৫ টন/হেক্টর বেশি।
 
ব্রি ধান ৬৩
ব্রি ধান ৬৩ বোরো মৌসুমের একটি প্রিমিয়াম কোয়ালিটি রাইস। এর কৌলিক সারি BR 7358-30-3-1। ওই কৌলিক সারিটি ইরানিয়ান জাত Amol-3 এবং BRRI dhan ২৮ নামক উচ্চফলনশীল মেগা জাতের সাথে সংকরায়ন করে পরবর্তীতে বংশানুক্রম সিলেকশন (Pedigree Selection)  এর মাধ্যমে উদ্ভাবিত। কৌলিক সারিটি ব্রি সদর দপ্তর, আঞ্চলিক কার্যালয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকের মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ফলন পরীক্ষায় সন্তোষজনক হওয়ায় ২০১৪ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বোরো মৌসুমে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন লাভ করে। এ জাতটির চাল সরু এবং গুণাগুণ বালাম চালের মতো বলে জাতটি সরু বালাম নামে পরিচিতি। এ জাতের পাকা ধানের রঙ সোনালি চালের আকার আকৃতি পাকিস্তানি বাসস্তমির মতো লম্বা ও চিকন চালে আমাইলোজের পরিমাণ ২৫.০% চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৮.২% ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২২.১ গ্রাম।
 
এ জাতের ডিগ পাতা খাড়া ও লম্বা তাই এ ধান দেখতে খুব আকর্ষণীয় হয়। বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য একটি উত্তম জাত, যা বিদেশে রপ্তানিযোগ্য। এ ধানটি ব্রিধান ৫০ এর চেয়ে ৫-৭ দিন আগাম। ব্রিধান ৬৩ জাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শিষ থেকে ধান ঝরে পড়ে না। ব্রি ধান ৬৩ চালের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো রান্নার পর ভাত লম্বায় বাড়ে। এ ধানটি ব্রি ধান ২৮ এর মতো একই পরিচর্যায় করা যাবে। এ ধান চাষ করে কৃষক অধিক লাভবান হবেন। এ জাতের জীবনকাল- এ জাতের গড় জীবনকাল ১৪৮-১৫০ দিন। ফলন- ব্রি ধান ৬৩ উপযুক্ত পরিচর্যায় হেক্টরে ৬.৫-৭.০ টন ফলন দিতে সক্ষম।
 
ব্রি ধান ৬৪
ব্রি ধান ৬৪ জিংক সমৃদ্ধ বোরো ধানের জাত। এ জাতটি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট IR 75382-32-2-3-3 এবং  BR 7166-4-5-3-2-5-5B1-92 এর মধ্যে সঙ্করনের পর বংশানুক্রম সিলেকশন (Pedigree Selection) এর মাধ্যমে উদ্ভাবন করেছে। এর কৌলিক সারি নং- BR7840-54-1-2-5 এ জাতটি ২০১৪ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বোরো মৌসুমে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন লাভ করে। অধিক ফলনশীল।
 
এ জাতের বৈশিষ্ট্য গাছের উচ্চতা ১১০ সেমি.।
চালের মাঝারি মোটা এবং রঙ সাদা।
১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ২৪.৬ গ্রাম।
চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৭.২%।
চালে জিংক এর পরিমাণ ২৪ মিলিগ্রাম/কেজি।
 
ব্রি ধান ৬৪ এর চালে উচ্চ মাত্রায় অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান জিংক রয়েছে। মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, বৃদ্ধিমত্তাসহ নানাবিধ শারীরবৃত্তীক প্রক্রিয়ার জন্য জিংক অতি প্রয়োজনীয়। এর অভাবে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যহত হয়; বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি যেমন, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আমাদের দেশের শতকরা ৪০ ভাগের বেশি মানুষ বিশেষ করে শিশু ও নারীদের জিংকের ঘাটতি রয়েছে। প্রচলিত উচ্চফলনশীল ধানের জাতগুলোতে জিংকের গড় পরতা পরিমাণ ১৫-১৬ মিলিগ্রাম। ব্রি ধান ৬৪ তে জিংকের পরিমাণ প্রচলিত জাতের চেয়ে কমপক্ষে ৮ মিলিগ্রাম বেশি। এ জাতের ভাত নিয়মিত খেলে আমাদের মতো দেশগুলোর দরিদ্র মানুষের দৈনিক জিংক চাহিদার কমপক্ষে শতকরা ৪০ ভাগ পূরণ করা সম্ভব হবে। এ ধানের জাত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জিংকের অভাব জনিত অপুষ্টি লাঘবে টেকসই ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। জীবনকাল- এ জাতের গড় জীবনকাল ১৫০-১৫২ দিন। ফলন : হেক্টরপ্রতি গড় ৬.০-৬.৫ টন ফলন দিতে সক্ষম। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ৭.০ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে।
 
ব্রি হাইব্রিড ধান ১
গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে প্রধানত উচ্চফলনশীল ধানের ব্যাপক চাষাবাদের ফলে চালের উৎপাদন বেড়েছে আড়াইগুণ। কিন্তু অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন সমানতালে বৃদ্ধি না পাওয়ায় দেশে খাদ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। তাছাড়া প্রতি বছর চাষাবাদের জমির পরিমাণ শতকরা ০.৬১ হারে হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থায় উফশী জাত দ্বারা দেশের খাদ্য চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। হাইব্রিড ধান বর্তমানে উচ্চফলনশীল যে কোনো জাতের চেয়ে হেক্টরে প্রায় ১ টন বেশি ফলন দিতে সক্ষম। তাই অল্প জমি থেকে অধিক ধান উৎপাদন বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে হলে হাইব্রিড ধানের চাষ করতে হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ব্রি হাইব্রিড ধান১ বরিশাল ও যশোর অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য ২০০১ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। এ জাতের বৈশিষ্ট্যÑ এর ডিগপাতা ঘন সবুজ এবং খাঁড়া, চাল মাঝারি চিকন, স্বচ্ছ ও সাদা, ভাত ঝরঝরে, এর চালে প্রটিনের পরিমাণ ৮.৯% এবং এম্যাইলোজের পরিমাণ ২৭%। এ জাতটির জীবনকাল ১৫৫-১৬০ দিন এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৭.৫-৮.৫ টন।
 
ব্রি হাইব্রিড ধান ২
ব্রি হাইব্রিড ধান ২ বোরো মৌসুমে চাষ উপযোগী ব্রি উদ্ভাবিত একটি হাইব্রিড ধান। ইহার কৌলিক সারি বিআর১০এইচ। জাতটি ২০০৮ সনে জাতীয় বীজবোর্ড কর্তৃক অনুমোদ লাভ করে। জাতের বৈশিষ্ট্য- গাছের উচ্চতা ১০৫ সেমি. এর কাণ্ড ও পাতা ঘন সবুজ এবং খাড়া, চাল মাঝারি মোটা এবং ভাত ঝরঝরে, এ জাতের চালে ৯.০% প্রোটিন ও ২৩.৩% এম্যাইলোজ রয়েছে। এ জাতের জীবনকাল ১৪৫ দিন এবং গড় ফলন ৮.০ টন/হেক্টর।

ব্রি হাইব্রিড ধান ৩
ব্রি হাইব্রিড ধান৩ বোরো মৌসুমের জন্য চাষ উপযোগী ব্রি উদ্ভাবিত একটি জাত। ইহার কৌলিক সারি বিআরএইচ২। জাতটি ২০০৯ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তক অনুমোদন লাভ করে। এ জাতের বৈশিষ্ট্য- এটি একটি আগাম জাত, গাছের উচ্চতা ১১০ সেন্টিমিটার, চাল মাঝারি মোটা এবং ভাত ঝরঝরে। এর জীবন কাল ১৪৫ দিন এবং এই জাতের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৯.০ টন।
 
 বারি উদ্ভাবিত সর্বশেষ বোরো ধানের জাতগুলো
নানা গুণের আরো পাঁচটি নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে একটি আউশ, একটি আমন ও ৩টি বোরো ধানের জাত রয়েছে। এর ফলে খরা সহ্য করতে পারে এমন জাতের পাশাপাশি এখন প্রোটিন ও এমাইলোজ সমৃদ্ধ ধানের বীজও পাওয়া যাবে। আগ্রহী কৃষকরা চলতি মৌসুম থেকেই এই বীজ নিয়ে আবাদ শুর করতে পারবেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট  উদ্ভাবিত এ জাতগুলো হলো ব্রিধান ৬৫, ব্রিধান ৬৬, ব্রিধান ৬৭, ব্রিধান ৬৮, ব্রিধান ৬৯। জাতীয় বীজ বোর্ডের সভায় এ পাঁচটি ইনব্রিড ও হাইব্রিড ধান জাত অবমুক্ত করা হয়। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্রিধান ৬৭ জাতটি বোরো মৌসুমে আবাদ করা যাবে। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৪০ থেকে ১৫০ দিন। চালের আকার আকৃতি মাঝারি চিকন এবং রঙ সাদা। প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, চারা অবস্থায় ১২ থেকে ১৪ ডিএস/মি. (৩ সপ্তাহ) লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। ফলন হেক্টরে তিন দশমিক আট থেকে সাত দশমিক চার টন। জাতটি পুরো জীবনকাল আট ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
      ব্রিধান ৬৮ জাতটিও বোরে মৌসুমের জন্য। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৪৯ দিন। এ ধানের চাল মাঝারি মোটা এবং রঙ সাদা। চালে শতকরা সাত দশমিক সাত ভাগ প্রোটিন এবং ২৫ দশমিক সাত ভাগ এম্যাইলোজ রয়েছে। ব্রিধান ৬৮ এর জীবনকাল ব্রিধান ২৮ এর চেয়ে চার থেকে পাঁচ দিন নাবী। ফলন হেক্টরে সাত দশমিক তিন টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে নয় দশমিক দুই টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।
      ব্রিধান ৬৯ জাতটিও বোরো মৌসুমের জন্য। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৪৫ থেকে ১৬০ দিন। এ জাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য ধানের দানার রঙ সোনালি রঙের এবং মাঝারি মোটা। চালের আকার আকৃতি মাঝারি মোটা এবং রঙ সাদা। এই জাতের জীবনকাল ব্রিধান ২৮ এর চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ দিন বেশি। ফলন হেক্টরে সাত দশমিক ৩০ টন। এ জাতটি কম উপকরণ ব্যবহারের ভালো ফলন দিতে সক্ষম। জাতটিতে অন্য জাতের চেয়ে ২০ দশমিক ইউরিয়া কম লাগে। (সংকলিত)

 
 
সৈয়দ আবু সিয়াম জুলকারনাইন*
* তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল নং-০১৭১৪২৩৭৪৫৯
 
বিস্তারিত
বিষমুক্ত গুড় উৎপাদন
বাজারে সোনালি, হালকা লাল, চকচকে, উজ্জ্বল সাদাটে গুড় দেখে সবাই আকৃষ্ট হয়। কিন্তু এই গুড়েই যে হাইড্রোজ নামক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ আছে তা আমরা অনেকেই জানি না। আখের, খেজুর, তালের ও গোলপাতার রসের গুড়ের রঙ হাইড্রোজ দিয়ে আকর্ষণীয় সোনালি করা হয়। হাইড্রোজ দেয়া গুড় স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। হাইড্রোজ ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সহজেই কম খরচে ঢেঁড়স, শিমুল, বনঢেড়ঁসের ও  ঘৃতকুমারীর রস দিয়ে গুড় পরিষ্কার করা যায়। এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট।
 
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, জনপ্রতি প্রতিদিন ন্যূনতম ৩৫.৬২ গ্রাম, গুড়-চিনি খাওয়া উচিত। এ হিসেবে দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য বার্ষিক প্রায় ২০ লাখ টন চিনি-গুড় প্রয়োজন। কিন্তু দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩.৫-৪ লাখ টন গুড় ও ১-১.৫ লাখ টন চিনি উৎপাদন হয়। দেশে উৎপাদিত আখের প্রায় ৫০ ভাগেরও অধিক গুড় উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। খেজুর ও তালের রস থেকে প্রতি বছর প্রায় ০.৩ -০.৪ লাখ টন গুড় উৎপাদন হয়। চিনি কলে আখের দাম কম বলে আখচাষিরা গুড় তৈরিকারকদের কাছে আখ বিক্রিতে আগ্রহী বেশি।
 
গুড়ে পুষ্টি বেশি  
দেশে চিনির চেয়ে গুড়ের চাহিদা বেশি। চিনির চেয়ে গুড়ে পুষ্টি বেশি। গুড়ে সুক্রোজ, আমিষ, চর্বি, ক্যালসিয়াম, ফসফেট, ক্যারোটিন, রাইবোফ্ল্যাবিন ও নিয়াসিন থাকে। চিনিতে থাকে শুধু সুক্রোজ ও সামান্য আয়রণ। তালিকায় তা উল্লেখ করা হলো-
 
খাদ্য উপাদান    আখের গুড়    খেজুরের গুড়    তালের গুড়    চিনি
আমিষ (গ্রাম)          ০.৪    ১.৫    ১.০    -
চর্বি  (গ্রাম)            ০.১    ০.৩    ০.১    -
খনিজ লবণ  (গ্রাম)    ০.৬    ২.৬    ১.৮    ০.০২
শর্করা (গ্রাম)           ৯৫.০    ৮৬.১    ৯৬.৫    ৯৯.৭
ক্যালসিয়াম (মি.গ্রাম)  ৮০.০    ৩৫৩.০    ২২৫.৫    -
ফসফেট (মি.গ্রাম)      ৪০.০    ৩৬৩.০    ৪৪.০    -
আয়রন (মি. গ্রাম)     ১১.০৪    ৬২.০        ০.৯৮
ক্যারোটিন    ১৬৪.০    -    -    -
রাইবোফ্লাবিন (মি.গ্রাম)  ০.০৪    -    -    -
থায়ামিন (মি. গ্রাম)      ০.০২    -    -    -
নিয়াসিন (মি. গ্রাম)      ০.৫    -    -    -
 
আখের জাত
দানাদার গুড় উৎপাদনের জন্য পরিপূর্ণ পরিপক্ব আখ প্রয়োজন। উপযোগী জাতগুলো হলো- ঈশ্বরদী ১৬, ঈশ্বরদী ২৬, ঈশ্বরদী ৩০, ঈশ্বরদী ৩৩, ঈশ্বরদী ৩৮। প্রচলিত আখ মাড়াইকলের রস আহরণ ক্ষমতা ৪৫-৫০ ভাগ। বাংলাদেশে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত উন্নত আখ মাড়াইকলের রস আহরণ ক্ষমতা প্রায় ৬০ ভাগ।
 
হাইড্রোজের ক্ষতিকর প্রভাব  
সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড বা সোডিয়াম ডাই থায়োনেট বাণিজ্যিকভাবে ব্লস্ককিট, রেডো রঙ্গালাইট বা হাইড্রোজ নামে পরিচিত। রঙ সাদা, তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ও শক্তিশালী বিজারক পদার্থ। ইহা কোনো কিছুর রঙ খুব দ্রুত পরিবর্তন করতে পারে। হাইড্রোজ খাদ্যে ব্যবহারের অনুমতি নেই। ইহা পেপার মিল, বস্ত্রমিল এবং তৈরি বস্ত্রের রঙ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। অধিকাংশ এলাকার গুড় প্রস্তুতকারীরা ফুটন্ত রসে হাইড্রোজ ব্যবহার করে গুড়ের আশানুরূপ রঙ না পাওয়ায় উত্তপ্ত প্রস্তুত গুড়ে সরাসরি মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজ ব্যবহার করে। ফলে হাইড্রোজের ক্ষতিকর মাত্রা পুরোটাই যৌগ হিসেবে গুড়ে থেকে যায়। ইহা মানবদেহের বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। যেমন- ক্যান্সার, আমাশায়, অন্ত্রের প্রদাহ ও অন্যান্য গ্যাস্ট্রো ইউরিনাল সমস্যাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। হাইড্রোজ দেয়া গুড়ের স্বাদ ও গন্ধ ভিন্ন, গুড় দানা হয় না, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না। এসব সমস্যা দূর করার জন্য ভেষজ নির্যাস ব্যবহার করা প্রয়োজন।
 
গুড় পরিশোধনের ভেষজ নির্যাস তৈরি ও প্রয়োগ  
বিভিন্ন কারণে গুড় পরিশোধন করা কঠিন। কারণগুলো হলো- রোগ ও পোকা আক্রন্ত আখ, অপরিপক্ব বা অধিক  পরিপক্ব আখ, রসে অধিকমাত্রায় গ্লুকোজ ও ফ্রুকটোজ, আখের জাত, রস জ্বাল দেয়ার ভুল পদ্ধতি ইত্যাদি। এসব কারণে উন্নতমানের দানাদার গুড় উৎপাদন সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় গুড় প্রস্তুতকারকরা গুড়ের রঙ দ্রুত পরিবর্তনের জন্য অতিমাত্রায় রাসায়নিক পরিশোধক দ্রব্য হাইড্রোজ ব্যবহার করে। ইহা মানবদেহের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই রস পরিশোধনের জন্য ঢেড়ঁস গাছের কাণ্ড বা শিমুল গাছের শিকড় বা বন ঢেঁড়সের কা- বা ঘৃতকুমারীর রস ব্যবহার করা হয়। ৫০০ গ্রাম বনঢেঁড়স গাছের কাণ্ডের সবুজ অংশ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ও থেঁতলিয়ে ২ থেকে ২.৫ লিটার পানির মধ্যে দুহাতে ১০-১৫ মিনিট ঘষলে ২-৩ লিটার নির্যাস তৈরি হয়। ১৮৫-২২৫ কেজি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন কড়াই বা প্যানের আখের রস পরিশোধন করার জন্য ২-৩ লিটার বন ঢেঁড়সের নির্যাস লাগে। অর্থাৎ প্রতি কেজি রসে ১৫-২৫ গ্রাম নির্যাস দিতে হয়। অথবা ঘৃতকুমারীর উপরের সবুজ খোসা ছুরি দিয়ে তুলে ভেতরের পিচ্ছিল নির্যাস বের করতে হয়। প্রতি কেজি আখের রসে ১০-১৫ গ্রাম এই নির্যাস দিতে হয়। প্যান বা কড়াইয়ে আখের রস জ্বাল দিলে প্রচুর গাদ ওঠে। এই গাদ ছাকনা দিয়ে তুলতে হবে। এর পর বনঢেঁড়সের রস অথবা ঘৃতকুমারীর রস কড়াইয়ে ফুটন্ত আখের রসে মিশিয়ে আশানুরূপ রস পরিশোধন করা যায়। এই ভেষজ নির্যাস মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর তো নয়ই বরং উপকারী। কারণ এই নির্যাসে প্রোটিনজাতীয় পদার্থ থাকে। গাছ থেকে বাকল আলাদা করে বলের মতো গোল করে পেঁচিয়েও সরাসরি ফুটন্ত আখের রসে ব্যবহার করা যায়। রস ঘনীভূত হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত বাকল কড়াইয়ের উত্তপ্ত রসের মধ্যে কিছু সময় পরপর  নাড়া দিতে হবে। এতে আখের রসে বিদ্যমান ময়লা নির্যাসের সাথে জমাট হয়ে দ্বিতীয়বার গাদে পরিণত হয়ে ভেসে উঠবে, যা ছাকনা দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। রস ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় রস হাতল দিয়ে ঘন ঘন নাড়তে হবে এবং চুলার আগুন কমাতে হবে। কাচের গ্লাসের পরিষ্কার ঠাণ্ডা পানিতে গরম একটু রস ঢেলে দিলে যদি জমাট বাঁধে তাহলে বুঝতে হবে রস জ্বাল সম্পন্ন হয়েছে। চুলা থেকে রসের কড়াই নামিয়ে একটু ঠাণ্ডা করে ছাঁচের বা পাত্রে ঢেলে দিলে রস জমাট বেঁধে দানাদার গুড় তৈরি হবে। এই গুড়ের রস উজ্জ্বল সোনালি হলুদ হয়। হাইড্রোজ দেয়া গুড়ে হাইড্রোজের গন্ধ থাকে এবং রঙ হালকা সাদাটে বা অনুজ্জ্বল সোনালি হয়।
     স্বাস্থ্যসম্মত গুড় উৎপাদনের জন্য গুড় প্রস্তুতকারীদের কাছে ভেষজ নির্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। হাইড্রোজ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইন প্রয়োগ করতে হবে। খাদ্য ভেজাল বিরোধী অভিযানের মধ্যে গুড়ও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বাজারের হাইড্রোজ মিশ্রিত গুড় বিক্রেতাদের জরিমানা করতে হবে। ভোক্তাদেরও হাইড্রোজ মিশ্রিত গুড় পরিহার করা উচিত।

 
 
কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ*
* কৃষি প্রাবন্ধিক ও কলেজ শিক্ষক, সহকারী অধ্যাপক, কৃষি শিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল। মোবাইল : ০১৭১১-৯৫৪১৪৩
 
বিস্তারিত
মধু : গুণাগুণ ও উপকারিতা
সাধারণভাবে বলা যায়- মধু হলো লাখ লাখ মৌমাছির অক্লান্ত শ্রম আর সেবাব্রতী জীবনের দান। মৌমাছিরা ফুলে ফুলে বিচরণ করে ফুলের রেণু ও মিষ্টি রস সংগ্রহ করে পাকস্থলীতে রাখে। তারপর সেখানে মৌমাছির মুখ নিঃসৃত লালা মিশ্রিত হয়ে রাসায়নিক জটিল বিক্রিয়ায় মধু তৈরি হয়। এরপর মুখ হতে মৌচাকের প্রকোষ্ঠে জমা করা হয়।
 
কোরআনে মধুর কথা
আরবি পরিভাষায় মধুপোকা বা মৌমাছিকে ‘নাহল’ বলা হয়। পবিত্র কোরআনে এই নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা বিদ্যমান আছে। সূরা নাহল এর আয়াত ৬৯-এ আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন- “ইয়াখরুজু মিমবুতুনিহা শারাবুম মুখতা লিফুন আল্ওয়া নহু ফীহি শিফাউল লিন্নাসি।”
 
অর্থ : তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। মধু হচ্ছে  ওষুধ এবং খাদ্য উভয়ই। মধুকে বলা হয়- বিররে এলাহি ও তিব্বে নব্বী। অর্থাৎ খোদায়ী চিকিৎসা ও নবী করীম (সা.)- এর বিধানের অন্তর্ভুক্ত। সূরা মুহাম্মদ- এর ১৫ আয়াতে আল্লাহ তায়ালার এরশাদ হচ্ছে- “জান্নাতে স্বচ্ছ মধুর নহর প্রবাহিত হবে।”
 
খাদ্য ও ঋতুর বিভিন্নতার কারণে মধুর রঙ বিভিন্ন হয়ে থাকে। এ কারণেই কোন বিশেষ অঞ্চলে কোন বিশেষ ফল-ফুলের প্রাচুর্য থাকলে সেই এলাকার মধুতে তার প্রভাব ও স্বাদ অবশ্যই পরিলক্ষিত হয়। মধু সাধারণত তরল আকারে থাকে তাই একে পানীয় বলা হয়। মধু যেমন বলকারক খাদ্য এবং রসনার জন্য আনন্দ ও তৃপ্তিদায়ক, তেমনি রোগ ব্যাধির জন্যও ফলদায়ক ব্যবস্থাপত্র। কেন হবে না, স্রষ্টার ভ্রাম্যমাণ মেশিন সর্বপ্রকার ফল-ফুল থেকে বলকারক রস ও পবিত্র নির্যাস বের করে সুরক্ষিত গৃহে সঞ্চিত রাখে। মধুর আরো একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য এই যে, নিজেও নষ্ট হয় না এবং অন্যান্য বস্তুকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত নষ্ট হতে দেয় না। এ কারণেই হাজারো বছর ধরে চিকিৎসকরা একে অ্যালকোহল (Alcohol)- এর স্থলে ব্যবহার করে আসছেন। মধু বিরেচক এবং পেট থেকে দূষিত পদার্থ অপসারক।
 
রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর কাছে কোন এক সাহাবি তার ভাইয়ের অসুখের বিবরণ দিলে তিনি তাকে মধু পান করানোর পরামর্শ দেন। দ্বিতীয় দিনও এসে আবার সাহাবি বললেন- অসুখ পূর্ববৎ বহাল রয়েছে। তিনি আবারো একই পরামর্শ দিলেন। তৃতীয় দিনও যখন সংবাদ এল যে, অসুখের কোন পার্থক্য হয়নি, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- আল্লাহর উক্তি নিঃসন্দেহে সত্য, তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যাবাদী। উদ্দেশ্য এই যে, ওষুধের কোনো দোষ নেই। রোগীর বিশেষ মেজাজের কারণে ওষুধ দ্রুত কাজ করেনি। এর পর রোগীকে আবার মধু পান করানো হয় এবং সে সুস্থ হয়ে উঠে।
 
মধুর নিরাময় শক্তি বিরাট ও সতন্ত্র ধরনের। কিছু সংখ্যক আল্লাহওয়ালা বুজর্গ ব্যক্তি এমনও রয়েছেন, যারা মধু সর্বরোগের প্রতিষেধক হওয়ার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ। তারা ফোড়া ও চোখের চিকিৎসাও মধুর মাধ্যমে করেন। দেহের অন্যান্য রোগেরও চিকিৎসা মধুর দ্বারা করেন। হজরত ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তার শরীরে ফোঁড়া বের হলেও তিনি তাতে মধুর প্রলেপ দিয়ে চিকিৎসা করতেন। এর কারণ জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেন- আল্লাহ তায়ালা কোরআনে কি বলেননি যে, তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। -(কুরতুবী)
 
হাদিস শরিফে মধুর গুণাগুণ
পবিত্র হাদিস শরিফে মধু সম্পর্কে প্রচুর রেওয়ায়েত আছে। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)- এর মতে সকল পানীয় উপাদানের মধ্যে মধু সর্বোৎকৃষ্ঠ। তিনি বলেন- মধু এবং কোরআনের মাধ্যমে তোমাদের চিকিৎসা নেয়া উচিত। -(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাকেম)
 
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, “রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- যে ব্যক্তি প্রত্যেক মাসে তিন দিন ভোরে
মধু চেটে খায় তার কোন বড় বিপদ হতে পারে না।” -(ইবনে মাজাহ, বয়হাকী)
 
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং সকাল বেলা খালি পেটে মধুর শরবত পান করতেন। যারা নিয়মিতভাবে মধুর শরবত পান করতে না পারবে তাদের জন্য তিনি বলেন- যে ব্যক্তি মাসে তিন দিন সকাল বেলা মধু চেটে সেবন করবে, ওই মাসে তার কোন কঠিন রোগব্যাধি হবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- যে কেহ আরোগ্য কামনা করে, তার ভোরের নাশতা হিসাবে পানি মিশ্রিত মধু পান করা উচিত।
 
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন- আল্লাহর শপথ যে ঘরে মধু আছে অবশ্যই ফেরেস্তারা সে ঘরের অধিবাসীদের মাগফেরাত কামনা করেন। কোন ব্যক্তি যদি মধুপান করে তবে যেন তার পেটে লক্ষ ওষুধ স্থির হলো এবং পেট হতে লাখ রোগ বের হয়ে গেল। আর যদি সে পেটে মধু ধারণ অবস্থায় মারা যায় তবে তাকে দোজখের আগুন স্পর্শ করে না। -(নেয়ামুল কোরআন)
 
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে হুজুর পাক (সা.) বলেছেন, তোমরা দুটি সেফা দানকারী বস্তুকে নিজেদের জন্য
অত্যাবশ্যকীয় করে নাও। একটি মধু অপরটি কুরআন। -(মিশকাত)
 
মধু ৯৯ প্রকার রোগের প্রতিষেধক। কারণ, মধু রোগব্যাধি শেফা দানে এক অব্যর্থ মহৌষধ। আর  কোরআন দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার গ্যারান্টি। এ দুটির দ্বারা বহু শতাব্দী ধরে মানুষ অশেষ উপকৃত হয়ে আসছে। আমাদের প্রিয় নবী হুজুর পাক (সা.) মধু খেতে বড়ই ভালো বাসতেন।
 
রোগ নিরাময়ে মধুর গুণাগুণ
রোগ নিরাময়ের জন্য মধু কখনো এককভাবে, আবার কখনো ভেষজ দ্রব্যের সঙ্গে মিশ্রিত করে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় সফলতার সঙ্গে ব্যবহার হয়ে আসছে। নিম্নে কয়েকটি রোগের চিকিৎসায় মধুর ব্যবহার উল্লেখ করা হলো-
 
সর্দি, কাশি ও স্বরভঙ্গে
চায়ের সঙ্গে মধু ও আদার রস মিশিয়ে খেলে সর্দি ও শ্লেষ্মা রেগের উপশম হয় (১ চামচ মধু + ১ চামচ আদার রস)।
 
দুই চা চামচের সমপরিমাণ মধু ও বাসকপাতার রস মিশিয়ে খেলে সর্দি ও কাশি সেরে যায়।

তুলসী পাতার এক চা চামচ রস ও সমপরিমাণ মধু মিশিয়ে খেলে অল্প সময়ের মধ্যেই কাশি দূর হয়।
 
সৈন্ধব লবণ, আমলকী, পিপুল, মরিচ ইত্যাদির সঙ্গে সমপরিমাণ মধু মিশিয়ে এক চা চামচ করে খেলে কফ ও স্বরভাঙ্গা ভালো হয়।
খাঁটি মধুর সঙ্গে হরীতকী ও বচচূর্ণ মিশিয়ে লেহন করলে (চেটে খেলে) শ্বাসকষ্টের আশু উপকার পাওয়া যায়।
 
২ চা চামচ মধু ১ গ্লাস গরম দুধের সঙ্গে সকালে ও সন্ধ্যায় খেলে সর্দিকাশি দূর হয়।
হালকা গরম জলসহ মধু মিশিয়ে গড়গড়া করলে গায়কদের গলার স্বর বৃদ্ধি পায়। অনেকের মতে, এটা টনিকের মতো কাজ করে।
এক চা চামচ আদার রস এবং এক চা চামচ মধু একসঙ্গে মিশিয়ে সকালে ও সন্ধেবেলা খেলে সর্দি সেরে যায় ও খিদে বৃদ্ধিপায়।

আমাশয়ে মধু
রক্ত মিশ্রিত পায়খানা, তৈলাক্ত পায়খানা এবং সঙ্গে পেট কামড়ানি থাকলে তাকে আমাশয় বলে। মধু দিয়ে কিভাবে আমাশয় রোগ নিরাময় করা যায় তা তুলে ধরছি-
 
কচি বেল ও আমগাছের কচি চামড়া (বাকল) বাটার সঙ্গে গুড় ও মধু মিশিয়ে খেলে আমাশয় ভালো হয়ে যায়।
কুল বা বড়ই গাছের ছাল চূর্ণের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে আমাশয় ভালো হয়।
 
৫০০ গ্রাম আতপ চাল ভেজে গুঁড়া করে এর সঙ্গে ১২৫ গ্রাম ঘি, ২৫০ গ্রাম খাটি মধু, ১২৫ গ্রাম চিনি এবং ২০টি সবরি কলা ভালোভাবে মিশিয়ে (চটকে) জ্বালাল দিয়ে খাবার উপযোগী করে ৩/৪ দিন নিয়মিত খেলে সব ধরনের আমাশয় ভালো হয়ে যায়।
 
অন্যান্য রোগে মধু
শরীরের বাইরের কোন অংশের ক্ষততে মধুর প্রলেপ লাগালে অনেক সময় মলমের চেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়।
পানিতে অল্প মধু মিশিয়ে খেলে পাকস্থলীর ক্ষত সারে।
মৌরির পানিতে মধু মিশিয়ে পান করলে দূষিত বায়ু পেট থেকে বেরিয়ে যায়।
যারা খুব মোটা হচ্ছেন তাদের মেদ কমানোর জন্য মধুর সঙ্গে সামান্য পানি মিশিয়ে খেলে সুফল পাওয়া যায়।
দুর্বল শিশুকে এক ফোঁটা মধু দুধের সঙ্গে মিশিয়ে দিনে দুবার খাওয়ালে তার স্বাস্থ্য ভালো হয় ও শক্তি লাভ করে।
এক কাপ দুধে এক চা চামচ মধু মিশিয়ে রোজ সকালে খেলে শক্তি বৃদ্ধি পায়।
মধুর সঙ্গে গুড়ের রস মিশিয়ে খেলে বমি বন্ধ হয়ে যায়।
চক্ষু রোগে এক ফোঁটা করে মধু দিনে ৩ বার চোখে লাগাতে হবে।
 
শিশুদের দৈহিক গড়ন, রুচি বৃদ্ধি, ওজন বৃদ্ধি ও পেট ভালো রাখার জন্য প্রত্যহ এক চা চামচ মধু গরম দুধ ও গরম পানির সঙ্গে নাশতা ও রাতের খাবারের সঙ্গে দিতে হবে।
 
আমাশয় ও পাতলা পায়খানা থাকলে গরম পানিতে আড়াই চা-চামচ মধু মিলিয়ে শরবত বানিয়ে বারবার ‘সেবন করতে হবে’।
যক্ষ্মা রোগে বাসক পাতার রস এক চা-চামচ পরিমাণ এক চা-চামচ মধু এবং এক চা-চামচ আদার রস মিশিয়ে কিছু দিন খেলে উপকার পাওয়া যাবে।
 
যক্ষ্মা রোগ ভালো হওয়ার জন্য- আধাতোলা পেঁয়াজের রস, ২৫০ গ্রাম ঘি এবং ২৫০ গ্রাম মধু মিশিয়ে একটা পাত্রে রেখে দিয়ে প্রতিদিন সকাল বিকাল খেলে এবং প্রতি রাতে শোয়ার সময় চিনি দিয়ে অল্প পরিমাণ গরম দুধ খেলে ৪/৫ দিনের মধ্যে যক্ষ্মা ভালো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ।
 
রাসূল (সা.) বলেছেন, মধু হৃদপি-কে সতেজ করে। প্রতিদিন হাতের তালুতে অল্প পরিমাণ মধু নিয়ে চেটে খেলে হৃদরোগ থাকে না।
জার্মান হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ই কচ বলেছেন, ‘উপযুক্ত ঘাস খেয়ে ঘোড়া যেমন তেজী হয় তেমনি নিয়মিত সকালে এক চা-চামচ করে খাঁটি মধু খেলে হৃদপি- শক্তিশালী হয়। এ ছাড়া মধু আয়ুও বৃদ্ধি করে।’
 
ডায়রিয়াতে রাসূল (সা.) মধু খাওয়ানোর কথা বলছেন।
ডায়রিয়া হলে খয়ের ও দারুচিনির গুঁড়া সমপরিমাণ সামান্য মধুর সঙ্গে মিশিয়ে দিনে ৩/৪ বার খেলে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়।
পিপুল ও গোল মরিচের শুকনো গুঁড়ার সঙ্গে মধু মিশিয়ে কিছু দিন নিয়মিত খেলে পুরাতন উদরাময় ভালো হয়ে যায়।
কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে এক গ্লাস গরম দুধ বা গরম পানিতে ২চা-চামচ মধু মিশিয়ে কয়েকবার খেতে হবে।
 
মধু সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কথা
মধুতে গ্লুকোজ ও ফ্রুকটোজ নামক দুই ধরনের সুগার থাকে। অবশ্য সুক্রোজ ও মালটোজও খুব অল্প পরিমাণে আছে। মধু নির্ভেজাল খাদ্য। এর শর্করার ঘনত্ব এত বেশি যে, এর মধ্যে কোনো জীবাণু ১ ঘণ্টার বেশি সময় বাঁচতে পারে না। এতে ভিটামিন এ, বি, সি প্রচুর পরিমাণ বিদ্যমান। অনেক প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানও আছে। যেমন- এনজাইম বা উৎসেচক, খনিজ পদার্থ (যথা পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ), এছাড়াও প্রোটিন আছে। মধুতে কোনো কোলস্টেরল নেই। সুস্থ অসুস্থ যে কেউ মধু খেতে পারেন। সুস্থ মানুষ দিনে দু’চা-চামচ মধু অনায়াসে খেতে পারেন। বেশি খেতে চাইলে শর্করা জাতীয় খাদ্য ভাত, রুটি, আলু কমিয়ে খেতে হবে। অন্যথা মোটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে পরিমিত পরিমাণ খেলে মোটা হওয়ার ভয় নেই। হজমের গোলমাল, হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস প্রভৃতিরোগে আধা চা-চামচ এর বেশি মধু না খাওয়াই ভালো। পোড়া, ক্ষত ও সংক্রমণের জায়গায় মধু লাগালে দ্রুত সেরে যায়।
 
কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম*
* রীতা হোমিও হল, পালপাড়া (জামে মসজিদের সামনে), বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ
 
বিস্তারিত
ভেবে-চিন্তে খাই-অপচয় কমাই
প্রভাতের রবি, রাতের জোছনা, নদীর কলতান, পাখির গুঞ্জন প্রভৃতি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যে আমরা প্রতিদিনই বিমোহিত হই। কিন্তু আমরা আমাদের দৈনন্দিন অবিবেচক কর্মকাণ্ডের দ্বারা একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছি অপরদিকে পরিবেশ দূষণের মাত্রাও বৃদ্ধি করে চলেছি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের বিরূপ প্রভাবে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহ পৃথিবীর পরিবেশ ও জীবন আজ নানাভাবে বিপর্যস্ত। কৃষি পরিবেশও এর থেকে রেহাই পায়নি। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে জানা গেছে, বৈজ্ঞানিক নানা কলাকৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে পূর্বের তুলনায় বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও ভূমির সুপ্ত উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে নিঃশোষিত হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক কারণেই খাদ্য গ্রহণে আমাদের মিতব্যায়িতা অবলম্বনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অপরদিকে সঠিক পুষ্টি জ্ঞানের অভাবও আমাদের মধ্যে রয়েছে। একটি তথ্যে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দিনে তিন বেলা পেট পুরে খেতে পায় না অথচ মানুষ কর্তৃক বিশ্বের মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য অপচয় হচ্ছে। বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ২০১৩ সালে পরিবেশ দিবসের জন্য প্রতিপাদ্য ‘ভেবে-চিন্তে খাই- অপচয় কমাই’ গ্রহণ করে।
 
মানুষের মৌলিক চাহিদা হলো অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। এগুলোর মধ্যে আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্ন বা খাদ্য। এটি না থাকলে মানুষ কোনোভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। খাদ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের উক্তিটি এখানে স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন ‘I would rather take care of the stomachs of the living than the glory of the departed in the form of monuments..’
      ভেবে-চিন্তে খেলে অপচয় কম হয়। খাদ্য গ্রহণে বিজ্ঞানভিত্তিক দুটি বিষয় মনে রাখতে হবে। ১. বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক কাজ, শরীরের ওজন, উচ্চতা অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করতে হবে অর্থাৎ প্রয়োজনীয় পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে ২. দৈনিক খাদ্য তালিকায় ছয়টি খাদ্য উপাদান যেমন শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি সঠিক অনুপাতে গ্রহণ করতে হবে। খাদ্য গ্রহণের সময় যদি আমরা তা অনুসরণ না করি তবে কয়েকটি সমস্যার সৃষ্টি হবে। ১. কম খাদ্য গ্রহণে স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটবে। ২. বেশি খাদ্য গ্রহণে স্থূলকায় হওয়াসহ নানাবিধ শারীরিক অসুবিধা দেখা দিবে। ৩. বেশি খাদ্য গ্রহণে খাদ্যের অপচয় হবে। সুতরাং ভেবে-চিন্তে খাদ্য গ্রহণ করলে একদিকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায় অপরদিকে খাদ্যের অপচয় রোধ করা যায়।

 
বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক কাজ প্রভৃতি বিবেচনায় আমাদের প্রত্যেকের শরীরে ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়। এই শক্তি কিলোক্যালরিতে পরিমাপ করা হয়। পুষ্টিবিদ শাহীন আহমেদ এর মতে, মাঝারি শ্রম বিবেচনায় ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছেলের জন্য ২৬০০ কিলোক্যালরি ও ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলের জন্য ২৮০০ কিলোক্যালরি খাদ্য শক্তির প্রয়োজন। অপরদিকে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী মেয়ের জন্য ২০০০ কিলোক্যালরি ও ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়ের জন্য ২১০০ কিলোক্যালরি প্রয়োজন। মাঝারি শ্রম বিবেচনায় ৫৫ ও ৬৫ ওজনের পুরুষের জন্য যথাক্রমে ২৫৩০ ও ৩০০০ কিলোক্যালরি প্রয়োজন, অপরদিকে ৪০ ও ৫০ ওজনের মহিলার জন্য প্রয়োজন যথাক্রমে ১৬০০ ও ২০০০ কিলোক্যালরি।
 
আমাদেরকে সুষম আহার (Balanced diet) করতে হবে। দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য যে আহারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পরিমাণ মতো থাকে তাকে ‘পুষ্টি আহার’ বলে। এতে ছয়টি খাদ্য উপাদান থাকে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় আমাদের ছয়টি খাদ্য উপাদানই থাকা প্রয়োজন। মাঝারি শ্রম বিবেচনায় সুষম আহারের জন্য ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী  ছেলেমেয়ের জন্য প্রতিদিন শস্য জাতীয় (চাল ও আটা) ২৫০-৪০০ গ্রাম, ডাল ৩০ থেকে ৫০ গ্রাম, সবুজ শাক ১০০ গ্রাম, অন্যান্য সবজি ১০০ গ্রাম, মাছ-মাংস ১১০ থেকে ১২০ গ্রাম, ডিম ১টি, দুধ-দুগ্ধজাত খাদ্য ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম, তেল-ঘি-মাখন ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম, বাদাম ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম, ফল ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম, পানি ৬ থেকে ৭ গ্লাস, চিনি-গুড়-মিষ্টি ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। অপরদিকে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়স্ক ৫০ থেকে ৬০ কেজি ওজনের মানুষের জন্য প্রতিদিন শস্য জাতীয় (চাল ও আটা) ৪৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম, ডাল ৫০ থেকে ৬০ গ্রাম, সবুজ শাক ১০০ গ্রাম, অন্যান্য সবজি ২০০ গ্রাম. মাছ/মাংস ৭০ থেকে ১০০ গ্রাম, তেল-ঘি-মাখন ৪০ গ্রাম, ফল ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম, পানি ৬-৭ গ্লাস, চিনি-গুড়-মিষ্টি ৩০ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন।
 
স্বাধীনতা লাভের পর বিগত ৪ দশকে বাংলাদেশের দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন তিনগুণ বেড়েছে। ওই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। পুষ্টির বিচারে দৈনিক একজন মানুষের ৫০০ গ্রাম শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহণের হিসেবে বাংলাদেশ শর্করা জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে বর্তমানে স্বয়ংভর। তবে আমিষসহ অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি রয়েছে। নানাবিধ উদ্যোগের ফলে এসব খাদ্যের ঘাটতি কমে আসছে। খাদ্য-নিরাপত্তা এবং পুষ্টি পরিস্থিতি-২০১২ এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের খাদ্য-নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে মূলত খাদ্য অপচয ও খাদ্য প্রাপ্তির অসমতার কারণে দেশের এখনও শতকরা ৩৭ ভাগ শিশু অপুষ্টির শিকার। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনিস্টিটিউটের সূত্র মতে, দেশের শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ নিয়মিত খাদ্য সংকটে পড়ে। অথচ বাংলাদেশের মানুষের রাষ্ট্রীয়ভাবে গড়ে মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ২২৫০ কিলোক্যালরি যা গড়ে একজন মানুষের দৈনিক চাহিদার কাছাকাছি। এ থেকে দেশে খাদ্য অপচয় ও খাদ্য গ্রহণের অসমতার চিত্রটি ফুটে ওঠে।
 
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও খাদ্যের অপচয় মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) মহাপরিচালক হোসে গ্রাজিয়ানো দা সিলভা ২০১২ সনে বলেন, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১৩০ কোটি টন খাদ্যের অপচয় হচ্ছে এবং অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে ১০০ কোটি মানুষ স্থূলকায় হয়ে পড়েছে। অথচ বিশ্বে ক্ষুধার্ত ও পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি। যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু ৩৭৭০ কিলোক্যালরি ভোগের বিপরীতে ইরিত্রিয়ার মাথাপিছু ভোগ মাত্র ১৫৯০ কিলোক্যালরি। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের মিছিল অপরদিকে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে মুটিয়ে যাওয়া। বর্তমানে বিশ্বে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হয় তাতে পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষের মাঝে সমানভাগে ভাগ করে দিলে প্রত্যেকে পায় ২৭২০ কিলোক্যালরি যা একজন মানুষের প্রয়োজনীয় ক্যালরির জন্য যথেষ্ট। খাদ্য অপচয় রোধ করতে পারলে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষ থাকবে না। বিশ্বে খাদ্যের দাম কমে আসবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সম্পদের ওপর চাপ হ্রাস পাবে।    
 
বিগত সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি খাদ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা হয়নি। কারণ গত ৩০ বছরে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭০% বৃদ্ধির বিপরীতে গড় মাথাপিছু খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ১৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে খাদ্যের অপচয় ও খাদ্য প্রাপ্তির অসম চিত্র ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতার প্রধান কারণ। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী ও পুষ্টির অভাব দূরীকরণের জন্য কিছু সুপারিশ হলো- ১. ধনী দেশগুলোর অতিরিক্ত খাদ্যভোগের মানসিকতা বর্জন করা, ২. সুষম আহার উপযোগী খাদ্য উৎপাদন করা, ৩. খাদ্য গ্রহণের সময় সুষম আহারের দিকে লক্ষ রাখা, ৪. অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ না করা, ৫. বিশ্বব্যাপী দক্ষ বাজার ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ৬. দরিদ্রতা দূরীকরণে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা, ৭. খাদ্যকে জৈব জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার না করা ৮. মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ করা। সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশলের মাধ্যমে লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে। এতে অপচয় রোধের পাশাপাশি অর্ধহারী মানুষদের প্রয়োজনীয় খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। নিশ্চিত হবে সুখী, সমৃদ্ধশালী ও ঐক্যবদ্ধ এক পৃথিবী। পরিশেষে আমাদের হৃদয়ে যেন সদা সর্বদা জাগ্রত থাকে, ‘সকলের তরে সকলে আমরা/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’
 
মোহাম্মদ মাহবুব-এ-খোদা*
*সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী। মোবাইল : ০১৭১২৫০৬৬৬৫, ইমেইল :mahbubekhoda67@gmail.com
বিস্তারিত
জোয়ারভাটা ও বাংলাদেশের কৃষি
কৃষিতে বৃষ্টি অত্যন্ত অপরিহার্য একটি অনুষঙ্গ। সময়মতো বৃষ্টি ভালো ফসলের জন্য সহায়ক। বৃষ্টি না হলে ফসল চাষ যেমন সম্ভব হয় না আবার অতি বৃষ্টি ফসলের জন্য এত ক্ষতিকর যে ফসল সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই বৃষ্টি বছরের সব সময় সমান হয় না। শীতকালে কম হয় এবং বর্ষাকালে বেশি হয়। শীতকালে উত্তর দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হয়। উত্তর দিক থেকে যে বাতাস আসে তাতে কোনো জলীয়বাষ্প থাকে না বিধায় ওই সময় বৃষ্টিপাত হয় না। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মৌসুমি বায়ু প্রবাহীত হয়। মৌসুমি বায়ু দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত হয়, যার সঙ্গে সমুদ্র থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প ভেসে আসে এবং তদ্বারা প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে। প্রায় ৮০% -৯০% বৃষ্টি এ সময় হয়। এই সময়কাল এবং এ সময়ের বায়ুপ্রবাহ ও তৎসঙ্গে বৃষ্টিপাতকে বলা হয় মনসুন।
 
এক সময় বলা হতো যে, বাংলাদেশের কৃষি হলো মৌসুমি বায়ুর জুয়া খেলা (The Agriculture of Bangladesh is the gambling of the monsoon)। কারণ কোনো বছর অত্যধিক বেশি বৃষ্টি হতো আবার কোনো বছর খুবই কম বৃষ্টি হতো। ফলে ফসলে কাক্সিক্ষত পরিমাণ পানির সংকট হতো অথবা অধিক পানিতে বা বন্যায় ফসল বিনষ্ট হতো।
 
বৃষ্টির আবার নানা কাহিনী আছে। যেমন- বৃষ্টি হলো পানি চক্রের একটি অবস্থা। পানি তাপে গরম হয়ে হালকা হয়ে গ্যাস হয় এবং তা উপরে উঠে যায়। উপরের তাপমাত্রা কম থাকায় গ্যাস বিন্দুগুলো জমাট বাঁধতে থাকে এবং একপর্যায়ে পানির ফোঁটায় রূপ নেয়। অনেকগুলো ফোঁটা একত্রে মেঘে রূপান্তরিত হয়। মেঘ গঠনকারী পানির ফোঁটার স্পেসিফিক গ্রাভিটি যদি বাতাসের চেয়ে কম হয় তাহলে তা মেঘ আকারে ভাসতে থাকে আর যদি বেশি হয় তাহলে ফোঁটাগুলো নিচের দিকে পতিত হতে থাকে অর্থাৎ ফোঁটার ভরে নিচে পড়তে থাকে। এভাবে অনেকগুলো পানির ফোঁটা একসঙ্গে পড়তে থাকলে তাই বৃষ্টি বলে পরিচিত হয়।
 
প্রকৃতপক্ষে বৃষ্টির আসল নাম হলো বারিপাত, ইংরেজিতে যাকে বলে প্রেসিপিটেশন (Precipitation )। বারি অর্থ পানি আর পাত অর্থ পতন বা পড়া। এককথায় পানি নিচের দিকে পড়তে থাকলে তাকে বলা হয় বারিপাত।
 
বারিপাত কয়েক ধরনের হতে পারে যেমন বৃষ্টিপাত (Rainfall) কুয়াশা (fog) শীলাবৃষ্টি (Hailstorm) ইত্যাদি। ফোঁটার আকার ও অবস্থা (যেমন কঠিন বা তরল) পতনের গতি ও তীব্রতা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করেই বারিপাতকে বৃষ্টিপাত (Rainfall), কুয়াশা (fog), শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়ে থাকে।
 
 সাধারণত স্থলভাগের ওপর যে জলীয়বাষ্প থাকে তার পরিমাণ কম থাকায় তা থেকে মেঘ তৈরি হওয়া কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। তাই মেঘ তৈরিতে যে প্রচুর পরিমাণ জলের প্রয়োজন তা মূলত আসে সমুদ্রের বিশাল জলরাশি থেকে। সমুদ্র থেকে যে জলীয়বাষ্প তৈরি হয় তা থেকেই প্রধানত মেঘ তৈরি হয়। মেঘ তৈরিতে সূর্যের ভূমিকা ব্যাপক। সূর্যের তাপে সমুদ্রের পানি গরম হয়ে হালকা হয়ে গ্যাসে পরিণত হয়েই মেঘ তৈরি হয়। এই মেঘ সব সময় সমভাবে তৈরি হয় না। এটার সঙ্গে চান্দ্র মাসের এবং পৃথিবীর বার্ষিক গতির সম্পর্ক আছে। চাঁদের সাথে মেঘ তৈরি তথা বৃষ্টিপাতের সম্পর্ক বিশদ আলোচনার বিষয়।
 
আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর ৩ ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। এই জলরাশির ৯৭% আছে সমুদ্রে। আমরা জানি যে, মহাবিশ্বের সব বস্তু একে অপরকে তার ভর ও দূরত্ব অনুযায়ী কাছে টানে। সূর্য, পৃথিবী, চন্দ্র একে অপরকে টানে। ভর যত বেশি টান তত বেশি; আবার দূরত্ব যত কম টান তত বেশি। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কঠিন পদার্থের বন্ধন তরল পদার্থের তুলনায় অত্যন্ত মজবুত। কঠিন পদার্থের অণুগুলো একে অপরকে বেশি মজবুত অবস্থায় আঁকড়ে থাকে তরল পদার্থের তুলনায়। গ্যাস বা বায়বীয় পদার্থের বন্ধন কঠিন ও তরলের চেয়ে অত্যন্ত দুর্বল।
 
পানি একটি তরল পদার্থ বলে পানির অণু একে অপরকে কম শক্তিতে টেনে রাখে। পানির আর একটি রূপ হলো জলীয়বাষ্প। জলীয়বাষ্প প্রকৃতপক্ষে একটি গ্যাস। বাইরের কোনো শক্তি পৃথিবী থেকে কোনো কঠিন পদার্থের অংশকে ছিনিয়ে নিতে যত মাত্রায় বল প্রয়োগ করতে হবে তরলের ক্ষেত্রে তার চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম শক্তিতেই বিচ্ছিন্ন করা যাবে। গ্যাসের ক্ষেত্রে আরো কম মাত্রা প্রয়োজন হবে।
 
পৃথিবী সূর্যের চার পাশে ঘোরে। আর চন্দ্র ঘোরে পৃথিবীর চার পার্শ্বে। এই ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে সূর্য-চন্দ্র-পৃথিবী একই সরলরেখায় অবতীর্ণ হয়। পূর্ণিমা ও অমাবস্যা তিথিতে পৃথিবী, চন্দ্র আর সূর্য এক সরল রেখা বরাবরে চলে আসে; যাকে বলা হয় সমসূত্রে আসা (Planetary alignment or Syzygy)। এ সময় পৃথিবীর ওপর চন্দ্র ও সূর্যের যৌথ টান পড়ে এবং একই সরল রেখায়। যখন টান বেড়ে যায় তখন পৃথিবী পৃষ্ঠের সব বস্তুকে সূর্য বা চন্দ্র ছিনিয়ে নিতে চায়। চন্দ্র ক্ষুদ্র হলেও তা পৃথিবীর অতি থাকায় পৃথিবীর ওপর এই টানের প্রভাব বেশি। পৃথিবীর ওপর সূর্যের টান চন্দ্রের ৪৬%। অর্থাৎ পৃথিবীর ওপর চন্দ্রের টান সূর্যের টানের চেয়ে প্রায় ২ গুণ বেশি।
 
সূর্য, পৃথিবী ও চন্দ্রের টানাটানিতে দুর্বল বন্ধনযুক্ত পানি ও জলীয়বাষ্প বেশি আকৃষ্ট হয় সূর্য ও চন্দ্রের দিকে। ফলে পানি ও গ্যাস চন্দ্র ও সূর্যের দিকে ধাবিত হতে চায়। ফলশ্রুতিতে তা পৃথিবী ছেড়ে উভয়দিকে উত্থিত হয়। এ সময় অতিরিক্ত পানি ফুলে উঠে সূর্য ও চন্দ্রের অবস্থানের দিকে। এ সময় পৃথিবী পৃষ্ঠের অন্য স্থানের পানি ছুটে আসে ফাঁকা স্থান পূরণের জন্য। এর ফলে ইন্টারটাইডাল এলাকায় (Intertidal zone) পানি বৃদ্ধি পায়। একে বলে জোয়ার (High Tide)। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় জোয়রের পানির সর্বাধিক উচ্চতা হয় বলে তখন একে বলা হয় (Spring Tide)। আবার জোয়ারের ৬ ঘণ্টা পর টান কমে যায় এবং তখন ইন্টারটাইডাল এলাকার (Intertidal zone) পানিও কমে যায়। তখন উপকূলবর্তী নদনদীর পানি শুকে যেতে দেখা যায়। একে বলে ভাটা (Low Tide)। এভাবে বাংলাদেশে প্রতি ৬ ঘণ্টা পরপর জোয়ার ও ভাটা হয়। বাংলাদেশের অবস্থান যেহেতু নিরক্ষীয় (Equator) অঞ্চলের কাছাকাছি তাই জোয়ারের প্রভাব বা টান এ অঞ্চলে বেশি পড়ে। জলীয় বাষ্প পানির বন্ধনের চেয়ে হালকা বলে অধিক জলীয়বাষ্প ওপরে উত্থিত হয়। জলীয়বাষ্প মেঘের মূল উপাদান বিধায় এ সময় মেঘ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং যৌক্তিক কারণই অধিক বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
 
সাধারণত চাঁদের মাস সাড়ে ২৯ দিনে হয় (চাঁদের মাস-সিনোডিক হিসাব অনুযায়ী অর্থাৎ এক নতুন চাঁদ থেকে আরেক নতুন চাঁদ পর্যন্ত সময়- ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট ২.৮ সেকেন্ড)। সে হিসাব অনুযায়ী মোটামুটি বলা যায় চান্দ্র মাসের সাড়ে ১৪ দিন পর পূর্ণিমা হয়। তার সাড়ে ১৪ দিন পর অমাবস্যা। পূর্ণিমার সময় সূর্য ও চন্দ্রের মাঝখানে পৃথিবী থাকে অর্থাৎ ‘সূর্য-পৃথিবী-চন্দ্র’- এভাবে সমসূত্রে অবস্থান করে। আর অমাবস্যার সময় ‘সূর্য-চন্দ্র-পৃথিবি’ - এভাবে সমসূত্রে অবস্থান করে। এ দুই সময় সবচেয়ে বেশি শক্তিতে টান পড়ে পৃথিবীর ওপর এবং ফলশ্রুতিতে জোয়ারের সর্বাধিক টান হয়। আবার চান্দ্র মাসের মোটামোটি হিসাবে ৭ ও ২১ তারিখে (1st and 3rd quarters of the lunar phases) সূর্য ও পৃথিবী সরল রেখায় থাকে বটে কিন্তু চাঁদ সমসূত্রে না থেকে সূর্য ও পৃথিবীর অবস্থানগত সরল রেখার ওপর চাঁদ ৯০ ডিগ্রি কোন করে অবস্থান করে। ফলে সূর্য ও চাঁদের আড়াআড়ি অবস্থানের কারণ পৃথিবির ওপর সূর্য ও চাঁদের টান অনেকটা বিবর্জিত হয়ে সবযেয়ে কম থাকে। এ সময় অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথির চেয়ে অনেক অনেক কম শক্তির জোয়ারভাটা হয়। একে বলা হয় মরাকটাল (Neap Tide)।
 
অমাবস্যা-পূর্ণিমার সময় ঘটিত জোয়ার-ভাটার প্রেক্ষিতে তৈরি মেঘ সমুদ্রোপকূল এলাকায় বৃষ্টি ঘটায় এবং বাতাসের সঙ্গে চারদিকে ছড়ে দূরবর্তী স্থানে চলে যায় এবং সাধারণত পরিচলন পদ্ধতিতে বৃষ্টি ঘটাতে থাকে বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে।
 
আবার মেঘের সাথে পৃথিবীপৃষ্ঠে সূর্যের আলোর আপতন (Incidence) ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা, সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। বিশেষ করে স্থলভাগ ও জলভাগের ওপর সূর্যের আলোর আপতন ও মেঘের ছায়ার দারুণ এক প্রভাব আছে বাতাসের চাপ, আর্দ্রতা ও প্রবাহর ওপর। বাতাসের তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে স্থান ও সময় ভেদে বাতাসের উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় এবং ফলশ্রুতিতে বাতাস প্রবাহের দিক ও বেগ পরিবর্তন হয়। এ কারণই অনেক সময় অমাবস্যা-পূর্ণিমা তিথিতে সমুদ্রোপোকুল ও পার্শ্ববর্তী স্থানে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়।
 
তবে এই তিথির দিনেই বৃষ্টি হবে এমন ধরাবাঁধা নিয়ম আছে তা বলা যাবে না। কারণ বৃষ্টির সঙ্গে আরো অনেক বিষয় সংশ্লিষ্ট আছে। যেমন পৃথিবীর কক্ষপথে পৃথিবীর অবস্থান যাকে প্রকারান্তরে আমরা বলতে পারি ঋতু বা মৌসুম। আরো আছে বাতাসের তাপ, চাপ, আর্দ্রতা, প্রবাহ ইত্যাদি। তা ছাড়া নতুন চাঁদ ও পূর্ণিমার পর থেকে ১ম ও ৩য় কোয়ার্টার পর্যন্ত টান কমতে থাকে এবং ১ম ও ৩য় কোয়ার্টারের পর থেকে তা আবার বাড়তে থাকে। তাই অমাবস্যা ও পূর্ণিমার বেশ আগ থেকেই জোয়ারের পানির আয়তন ও বেগ (Volume and Magnitude) ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং অমাবস্যা-পূর্ণিমাতেই সেটা সর্বাধিক হয়। অনেক সময় এই তিথির দু-এক দিন পর দেশের দূরবর্তী স্থানে বৃষ্টি হতে পারে। কারণ মেঘ তৈরি ও গমনাগমনের জন্য সময়ের দরকার হয়। তা ছাড়া বাতাসের আর্দ্রতার একটি ব্যাপার থেকেই যায়; যার ওপর ভিত্তি করে কোনো স্থানের বৃষ্টি হওয়া অনেকটা নির্ভর করে।
 
বৃষ্টির আনুষঙ্গিক নিয়ামকগুলোর কারণ বৃষ্টি হওয়া না হওয়া অনেকটা নির্ভরশীল। শীতকালে আমাদের দেশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ামক অনুকূলে থাকে না বিধায়, এই অমাবস্যা পূর্ণিমার প্রভাবে বৃষ্টি হবে একথাটা শীতকালের জন্য কিছুটা ক্ষীণভাবে প্রযোজ্য। পক্ষান্তরে নিয়ামকগুলো বছরের অন্যান্য সময় বিশেষ করে বর্ষাকালে অনুকূলে থাকায় এটা বেশি প্রযোজ্য। তবে অমাবস্যা পূর্ণিমার সময়টায় বৃষ্টি না হলেও মেঘলা অবস্থা বিরাজ করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
 
তাছাড়া বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ প্রকৃতি অনেকটাই অনিয়মতান্ত্রিক তথা বিরূপ আচরণ করছে। বায়ুম-লের উপাদানের পরিমাণের দ্রুত তারতম্য ঘটছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় বাতাসে উদ্ভিদ থেকে ট্রানসপিরেশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত জলীয়বাষ্প অনেক কমে গেছে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়েছে। ফলে মেঘ তৈরির উপযুক্ত পরিবেশ সব সময় অনুকূল থাকছে না। তাই বৃষ্টিপাত বলা যায় পুরোপুরি অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
 
আগেকার দিনে জলবায়ুর এমন পরিবর্তন ছিল না এবং প্রকৃতিও অনেকটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে বৃষ্টি পাত ঘটাতো। তখনকার কৃষক হয়তো অমাবস্যা-পূর্ণিমাতে মেঘের আনাগোনা বা বৃষ্টিপাত লক্ষ করত। তাই এই নিয়মের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করে আগেকার কৃষকরা অমাবস্যা-পূর্ণিমা দেখে বীজ বপন, রোপণ, ও শস্যকর্তন করত। বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে অনেক কৃষক এটাকে অবৈজ্ঞানিক মনে করে অগ্রাহ্য করে থাকেন। আসলে আগেকার কৃষক অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েই বিষয়টিকে অবধারিত মনে করে এই অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিকে দেখে ফসলের বপন, রোপণ, কর্তন ইত্যাদি কাজ করত।
 
বর্তমানে স্পার্শো (SPARSO) ও আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে আবহাওয়ার বিভিন্ন নিয়ামকগুলো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এবং/অথবা অন্যান্য আনুষঙ্গিক পদ্ধতিতে উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে অনেকটা নির্ভুলভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে। মেঘলা আবহাওয়া, কুয়াশা, শীলাবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঝড়, টর্নেডো ইত্যাদির পূর্বাবাস বা আগাম আবহাওয়া বার্তা কৃষকের জানানো হচ্ছে বিভিন্নভাবে। কিন্তু কৃষক বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণ সবসময় তা জানতে পারছেন না।
 
তাই কৃষক নিজ থেকে অমাবস্যা-পূর্ণিমার সময়টা একটু সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে বা দু-এক দিন অপেক্ষা করে বপন, রোপণ, ফসল সংগ্রহ, মাড়াইঝাড়াই এর কাজে হাত দিলে উপকার পেতে পারেন। বিশেষ করে আগাম রবি ফসল করতে এটা বেশি কাজে লাগতে পারে।
 
 
কৃষিবিদ স. ম. আশরাফ আলী*
* জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, বনানী, বগুড়া, মোবা: ০১৯৩৮৮২৮৭৮৪
 
বিস্তারিত
গাভীর দুইটি রোগ ও তার প্রতিকার
গাভীর ওলান প্রদাহকে ম্যাস্টাইটিস বা ওলান ফোলা বা ওলান পাকা রোগ বলে, ডেইরি শিল্পের প্রধান ৪টি মারাত্মক সমস্যার মধ্যে (১) ম্যাস্টাইটিস (২) অনুর্বতা (৩) গিরা ফোলা (৪) ক্ষুরা রোগ। ম্যাস্টাইটিস একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। ম্যাস্টাইটিস রোগ অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এ রোগে-
দুধ উৎপাদন কমে যায়।
চিকিৎসা খরচ খুব বেশি।
অনেক সময় গাভী সুস্থ হয় না, ফলে বাদ দিতে (Culling) হয় বা গাভী মারা যায়।
অসুস্থ গাভীকে সেবা দেয়ার জন্য অতিরিক্ত লেবার খরচ হয়।
 
ম্যাস্টাইটিস রোগে আক্রান্ত গাভীর দুধের উপাদান পরিবর্তন হয়ে যায়, যেমন- দুধে ল্যাকটোজ, চর্বি, ক্যাসিন ও ক্যালসিয়াম কমে যায়, বিপরীতে সোডিয়াম, ক্লোরাইড ও রক্তের আমিষ বৃদ্ধি পায়। এ রোগ একটি গাভীর যে কোনো সময় হতে পারে তবে বাছুর প্রসবের পরেই বেশি আক্রান্ত হয়।
 
কারণ : বিভিন্ন প্রকারের ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস, মাইকোপ্লাজমা ও ভাইরাস।
 
সংক্রমণ : যদি শেডের মেঝে দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে ও ভিজা থাকে ওলানের বাঁট কলুষিত মেঝে, দুধ দোহনকারীর হাত, দুধ দোহনের যন্ত্রের মাধ্যমে জীবাণু সরাসরি ওলানে সংক্রামিত করতে পারে। ওলানে বা বাটে আঘাতজনিত কারণে ক্ষত, ক্ষুরারোগের ফলে সৃষ্ট ক্ষত বা দীর্ঘ সময় ওলানে দুধ জমা থাকলেও এ রোগ হতে পারে। বাঁটের মধ্যে কোনো শলা বা কাঠি প্রবেশ করালেও গাভী এ রোগে আক্রান্ত হবে।
লক্ষণগুলো : অতি তীব্র রোগে ওলান হঠাৎ করে লাল হবে, শক্ত হবে ও ফুলে যাবে। হাত দ্বারা স্পর্শ করলে গরম অনুভূত হবে। ওলানে প্রচ- ব্যথা থাকে, গায়ে জ¦র থাকে। পানির মতো দুধ, পুঁজ বা রক্তযুক্ত দুধ বের হবে। ওলানে পচন ধরতে পারে। দুধ কালো কাপড়ে ছাঁকলে জমাট বাঁধা দুধ ধরা পড়বে। গাভী খাদ্য গ্রহণ করবে না। অনেক সময় আক্রান্ত ওলানে গ্যাংগ্রিন হয়ে (ফুলে) যায়। গাভীর মৃত্যুও হতে পারে। সেপটিসেমিয়া ও টাক্সিমিয়ার কারণে গাভী মারা যায়।
 
সুপ্ত সংক্রমণ এমন ক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো দুধে ও ওলানে কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। তবে দুধ উৎপাদন কমে যায়। দুধে ব্যাকটেরিয়া বিদ্যমান থাকে এবং দুধের উপাদান পরিবর্তিত হয়ে যায়।
 
পুরাতন ওলান প্রদাহ এমন ক্ষেত্রে দুধ উৎপাদন কমে যাবে, ছানা বা জমাট বাঁধা দুধ দেখা যায়। ওলান ক্রমে শক্ত হয়ে যায়। গাভীর খাদ্য গ্রহণ কমে যায়। ২-১টি বাঁট চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। দুধে চোখে পড়ার মতো তেমন পরিবর্তন ঘটে না। দীর্ঘদিন পর পর অথবা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর ওলানে প্রদাহের লক্ষণ প্রকাশ পায়। দুধে শ্বেত কনিকা ও সোসাইটিক কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। পুরাতন ওলান প্রদাহযুক্ত গাভী খামারের জন্য খুবই ক্ষতিকর কারণ, ওই গাভী সুস্থ গাভীকে রোগ ছড়াতে সাহায্য করে।
 
চিকিৎসা : খুব দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। বিলম্বে এ রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিয়ে -
উন্নতমানের Antibiotic ইনজেকশন দিতে হবে মাত্রা মতো ৪-৫ দিন।
উন্নতমানের প্রদাহনাশক বা স্টেরওয়েড জাতীয় ইনজেকশন দিতে হবে।
উন্নতমানের Teat infusion আক্রান্ত বাঁটে প্রয়োগ করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা পর পর ৩-৪ দিন।
Povidon  Iodin / ভালো মানের জীবাণুনাশক মাত্রামতো পানিতে মিশিয়ে দিনে ২-৩ বার ওলান ধুয়ে দিতে হবে।
অন্যান্য চিকিৎসা প্রটোকল প্রদান করতে হবে।

ওলান প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ : চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করাই উত্তম পন্থা, একটি ডেইরি ফার্মে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পন্থা অনুসরণ করে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

 
বাঁটের স্বাস্থ্যসম্মত বিধিব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে। ভালো স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান হতে হবে। জীবাণুমুক্ত দুধ দোহনব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে। ওলান ও বাঁটের স্বাস্থ্য ও যেকোনো রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
 
খুব দ্রুত এ রোগ শনাক্ত করতে হবে এবং দ্রুত উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে। অসুস্থ গাভীকে আলাদা জায়গায় রাখতে হবে।
শুষ্ক ও গর্ভবর্তী গাভীকে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও সেবা দিতে হবে। গাভীর ক্ষেত্রে (বকনা বাদে) দুধ দোহনের শেষ দিনে বাঁট সিল করে দিতে হবে।
 
বার বার এ রোগে আক্রান্ত (২-৩ বার) গাভী, (Chronically ofteted)  যেগুলোকে সম্পূর্ণ ভালো করা সম্ভব হচ্ছে না সেগুলোকে বাতিল (Culling) করতে হবে। এ জাতীয় অসুস্থ গাভী রোগের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে ফলে খামারের সুস্থ গাভীতে ছড়াতে সাহায্য করবে। সফল জনকভাবে এ রোগ নিয়ন্ত্রণের এটাই একমাত্র পন্থা।
 
 দৈনিক দুধ দোহনের মেশিন পরীক্ষা করতে হবে ও খামারের ওলান প্রদাহ রোগের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য  সংরক্ষণ  করতে হবে।
একটি দুগ্ধ খামারে ওলান প্রদাহ রোগ প্রতিরোধের জন্য নিম্নলিখিত স্বাস্থবিধি মেনে চলতে হবে-
 
গাভীকে কাঁচা ঘাসসহ পুষ্টিকর সুষম খাদ্য দিতে হবে;
 শেডের মেঝে পরিষ্কার করে ২-৩ দিন পর পর Disinpectant দিয়ে Sprey করতে হবে। মেঝেতে কোনো প্রকার গর্ত থাকা যাবে না।
বিজ্ঞান সম্মতভাবে গাভীর শেড বা ঘর তৈরি করতে হবে।
 
দুধ দোহনের আগে ওলান ধুয়ে নিয়ে হবে এবং প্রতিটি গাভী দোহনের আগে দোহনকারীর হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। অসুস্থ গাভীকে সবার শেষে দোহন করতে হবে।
 
 দোহনকারীর শরীর, হাত পরিষ্কার করতে হবে, হাতের নখ অবশ্যই ছোট রাখতে হবে।
 দুধ দোহনের পর ওলান ধুয়ে তারপর জীবাণুনাশক ওষুধে বাঁট চুবাতে হবে।

Povidon iodin (Povin/Povisep) =      0.5-1.00%

Hypochlorid                  =       4.0%

Chlorite aceted               =       0.5%

 

দুধ দোহনের পর গাভীর পেঁছন অংশ ধুয়ে দেয়া (Back glash)।
 
 দোহনের পর কাঁচা ঘাস খেতে দিতে হবে যাতে করে গাভী ১-২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে বাঁটের দুধ নালী সংকুচিত হয়ে যাবে, ফলে জীবাণু প্রবেশ করতে পারবে না।
 গাভীকে দৈনিক ১-২ ঘণ্টা ব্যায়াম করতে হবে।
 
(১০) কিছু দিন পর পর দুধ পরীক্ষা করে এ রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসা দিতে হবে।
(১১) বাটের ভেতরে শক্ত কাঠি বা Teat Syphon) না ঢুকানোই উচিত।

সন্ধি প্রদাহ
গাভীর পায়ের গিরা ও ক্ষুর ফুলে যাওয়া ও প্রদাহকে সন্ধি প্রদাহ বলে। একটি বাণিজ্যিক দুগ্ধ খামারে ৪টি ক্ষতিকর রোগের মধ্যে গিরা ফোলা রোগের অবস্থান তৃতীয়তম। গিরা ফোলা রোগে হাড়, মাংস ও গিরার অন্যান্য অংশ আক্রান্ত হয়ে থাকে। অর্থনৈতিকভাবে রোগটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ-
 
 দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়।
 এ রোগে চিকিৎসা খরচ বেশি।
 
 সুস্থ না হলে অল্প বয়সেই গাভীকে বাদ (Pre-mature Culling) দিতে হয় ফলে অনেক ক্ষতি হয়ে যায়।
 
 যে কোনো বয়সে গিরা ফোলা রোগ হতে পারে তবে ৫ বছর বয়সের বেশি বয়সী গাভীতে বেশি হয়। এটি জেনেটিক রোগ নয়। গিরা ফোলা রোগ দুই প্রকারের যথা-
 
(ক) অপ্রদাহিক (Noninflamatiory) ডিজেনারেটিভ গিরা ফোলা-এ ক্ষেত্রে ২-৪টি গিরা একসঙ্গে ফুলে যায়। কিন্তু ব্যথা থাকে না।
(খ) জীবাণুঘটিত অস্থি সন্ধি প্রদাহ।
গিরা ফোলা রোগের তথ্য নিম্নরূপ-
 
৯২%    পেছনের পা আক্রান্ত হয়,    
৬৫%    বাহির পাশের ক্ষুর আক্রান্ত হয়,     
১৪%    ভেতরের ক্ষুর আক্রান্ত হয়,    
২৮%     ক্ষেত্রে গাভী খোঁড়াবে,    
২২%     White line Commonset,বঃ,    

কারণগুলো :
সাধারণত দুগ্ধবতী গাভীর শরীরে বিভিন্ন প্রকারের খনিজ পদার্থের ঘাটতি, বিশেষ করে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের অভাব ও অসমতার (৩:১) কারণে হতে পারে।
 
Micoplasma, Preumonia, Mastitis, Arthritism I Neval ill সংক্রমণ হলে হতে পারে।
E Coli, Sfreptococcus, Salmonella, Typhimomim সংক্রমণের ফলে হতে পারে।
 
 গিরা ও টেনডন-এ কোনো আঘাত বা ঘষা খেয়ে ক্ষতের সৃষ্টি হলে হতে পারে।
 বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে হতে পারে।
 
 গাভীর পায়ের ক্ষুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেলে এবং দীর্ঘদিনের Necrotic Pododermatitis অথবা  Sole ulcer অথবা White line disease হলে হতে পারে।
 
বেশি করে শুধুমাত্র দানাদার খাদ্য খাওয়ালে হতে পারে।
ক্ষুরারোগে (FMD) আক্রান্ত হওয়ার পর যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রদান করা না হলে, ক্ষুরের উপরের গিরা আক্রান্ত হতে পারে।
এগুলো ছাড়াও কিছু সহযোগী কারণ রয়েছে যেমন-

আরামদায়ক মেঝে না হলে- অর্থাৎ উঁচু নিচু গর্তযুক্ত মেঝে বা বেশি ঢালু মেঝে ইত্যাদি।
যদি গাভীকে খুব কষ্ট করে শুয়ে থাকতে হয়।
গাভীকে বেশিক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখলে বা হাঁটালে হতে পারে।
 
জায়গার তুলনায় বেশি গরু এক জায়গায় রাখলে (over Crowding) হতে পারে। বিছানা ভালো না হলে Carpal Joint, Stifle Joint, Pelvis, Brisket, Shoulder-এ ঘষা লেগে ক্ষতের সৃষ্টি করে যা পরে জীবাণু দ্বারা সংক্রামিত হয়ে সন্ধি প্রদাহের সৃষ্টি করে।
ব্যয়াম না করালে; সর্বদা ঘরে বেঁধে রাখলে গিরার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা লোপ পায়।
গিরার যে  কোনো সমস্যা দেখা মাত্র যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে।

লক্ষণগুলো :
পায়ের গিরা ফুলে যাবে, উল্লেখযোগ্য ব্যথা থাকবে।
গাভীর কর্মতৎপরতা কমে যাবে।
হাঁটাচলা করতে কষ্ট পাবে, শুতে এবং ওঠার সময় কষ্ট হবে।
গিরা গরম মনে হবে এবং টিপ দিলে পরিবর্তন বুঝা যাবে।
সর্বদা গাভী পা কম নড়াতে চাবে।
রুচি কমে যাবে, জাবর কাটাও কমে যাবে, শ্বাস ও হৃদযন্ত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
গাভীর ওজন কমে যাবে, দুধ উৎপাদন কমে যাবে।
গাভীর উর্বরতা কমে যাবে এবং বাচ্চা দিতে সময় বেশি লাগবে।
ডিজেনারেটিভ টাইপ গিরা ফোলার ক্ষেত্রে ব্যথা থাকবে না।
 
চিকিৎসা :
 Immertion or thorough glushing - ২ সপ্তাহ।
উন্নত মানের Antibiotic যেমন-Inj Tylocin, Inj-Penicillin+ Stneptopen, Inj, Ampicillin, ইত্যাদি গিরার মধ্যে প্রয়োগ করতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যায়। কারণ অস্থিসন্ধিতে সুষ্ঠু রক্ত চলাচল হয় না, মাত্রামতো ৪-৫ দিন প্রয়োগ করতে হবে।

 
ব্যথানাশক ওষুধ যেমন- Asprin, Inj- Ketoprofen, Inj Prednisolon, Inj-Phenay 1-Butazon, Inj Tolfamin ইত্যাদি মাত্রা মতো ৩-৪ দিন প্রয়োগ করতে হবে।

প্রতিরোধ :
সঠিক নিয়মে মেঝে তৈরি করতে হবে।
প্রয়োজনে রাবারের তৈরি ম্যাট বা বিছানা ব্যবহার করতে হবে।
প্রতিদিন ১-২ ঘণ্টা করে গাভীকে ব্যায়াম করাতে হবে। সম্ভব হলে মাঠে ছেড়ে দিয়ে ঘাস খাওয়াতে হবে।
 
পায়ের ক্ষুর বেড়ে গেলে পরিমাণ মতো ছেঁটে (Foot triming) দিতে হবে। মাঝে মধ্যে ব্রাশ করে পায়ের ক্ষুর পরিষ্কার করে দিতে হবে।
গাভীকে Anti xident,  I  Phytochemicalসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য ও কাঁচা ঘাস খেতে দিতে হবে। ফলে গিরা শক্তিশালী হবে ও গিরার ক্ষতিকে মেরামত করবে।
 
প্রয়োজনে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন-ডি খেতে দিতে হবে।
গাভী ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হলে যথাযথ চিকিৎসা দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলতে হবে।
 

কৃষিবিদ ডা. মনোজিৎ কুমার সরকার
* উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর
বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর-১৪২১
আবদুল মোতালেব
হাতিবান্ধা, লালমনিরহাট
প্রশ্ন : পেয়ারা গাছের ডালপালা আগা থেকে মরে যায়, ফল ফেটে যায় ও পচে যায়। করণীয় কী?
উত্তর : ছোট বড় যে কোনো বয়সের গাছ আগা থেকে মরতে পারে, যা ডাই ব্যাক নামে পরিচিত। এক প্রকার ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়। এগুলো রোগাক্রান্ত ডালপালা থেকে বৃষ্টি ও বাতাসের দ্বারা বিস্তার লাভ করে।
 
দমন ব্যবস্থা : মরা ডালপালা কেটে পুড়িয়ে ফেলা ও কাটা স্থানে বোর্দোপেস্ট বা কিউ প্রভিট ২ গ্রাম ১ লিটার পানিতে গুলে ব্রাশ বা তুলা দিয়ে লাগান। প্রতি বছর আক্রমণ হয় জানা থাকলে টিল্ট (০.০৫%), ব্যভিস্টিন বা নোইন (০.২%), ফল মটরদানার মতো অবস্থায় আসার পর থেকে ১৫ দিন পর পর ৪ বার স্প্রে করা। ফল পাকার একমাস আগে থেকেই স্প্রে বন্ধ করতে হবে।
 
মো. আশেক আলী
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
 
প্রশ্ন : সরিষা গাছের পাতার নিচের পৃষ্ঠে সাদা পাউডারের মতো এবং পাতার ওপরের পৃষ্ঠ হলদে রঙের। প্রতিকারের উপায় কী?
উত্তর : পেরোনোস পোরা ব্রাসিসি নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়। গাছের চারা অবস্থার পর থেকে যে কোনো সময় এ রোগে গাছ আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগ পরবর্তীতে সরিষার শুটি আক্রমণ করে। আক্রান্ত বীজ ও বিকল্প পোষকের মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। গাছ ঘন করে লাগালে ও বাতাসের আর্দ্রতা কম হলে এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
 
প্রতিকার : সুষম সার ব্যবহার ও সেচের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করে লাগাতে হবে। রোগ দেখা মাত্র রিডোমিল এম জেড-৭২ বা ডাইথেন এম-৪৫ শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক) ১০ দিন পর পর তিনবার সব গাছে ছিটিয়ে দিতে হবে।
 
কুশল                                                                                    
পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
 
প্রশ্ন : বাঁধাকপির গোড়া পচা রোগ।
উত্তর : ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ব্রকলির চারা রোপণের পর  ২-৩ সপ্তাহ এ রোগের আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। এ রোগে আক্রান্ত চারা গোড়া পচে মারা যায়। এ রোগের জীবাণু মাটিতে থাকে এবং অনুকূল পরিবেশে সহজেই চারার গোড়ায় আক্রমণ করে থাকে।  
 
- ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
- সেচের বা বৃষ্টির পর চারার গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হবে।
- ভিটাভেক্স- ২০০ বা প্রোভেক্স (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম) হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর গাছের গোড়াসহ মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে।                                                                                                     
হাফিজুর রহমান                                                       
মান্দা, নঁওগা  
 
প্রশ্ন : আলুর গায়ে বিভিন্ন আকারের বাদামি দাগ পড়ে, গর্তের মতো হয় কী কী ব্যবস্থা নিলে এ রোগ হবে না জানালে ভালো হয়।
উত্তর : স্ট্রেপ্টোমাইসিস স্কেবিজ নামক জীবাণুর আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। রোগমুক্ত বীজ বপন করতে হবে। আলু লাগানোর সময় ২% বোরিক এসিড দ্রবণে কাটা আলু এবং ৩% দ্রবণে আস্ত আলুকে ৩০ মিনিট ডুবিয়ে রেখে তারপর ভালোভাবে বাতাসে শুকিয়ে লাগাতে হবে। আলু টিউবার ধারণের সময় অর্থাৎ ৩৫-৫৫ দিন পর্যন্ত জমিতে পানির অভাব হতে দেয়া যাবে না এবং গাছের বয়স ৭০ দিনের পর সেচ বন্ধ করতে হবে। জমিতে বেশি মাত্রায় নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করা যাবে না। জমিতে হেক্টরপ্রতি ১২০ কেজি জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে।                                                                                      

মো. মকবুল হোসেন
উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ
 
প্রশ্ন : গম চাষে কয়টি সেচের প্রয়োজন হয়?
উত্তর : মাটির প্রকারভেদে ২-৩টি সেচের প্রয়োজন হয়। প্রথম সেচ অবশ্যই চারা গজানোর ১৭-২১ দিন পর, দ্বিতীয় সেচ গমের শীষ বের হওয়ার সময় (বপনের ৭৫-৮০ দিন পর) প্রয়োগ করতে হবে।
 
প্রশ্ন : পুকুরে প্রাকৃতিক খাবার নেই, মাছ খাবি খায়। এ অবস্থায় করণীয় কী?
উত্তর : মৎস্য চাষে মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য মাছকে সরবরাহকৃত খাবারের সাথে সাথে পুকুরে যে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাকৃতিক খাবার থাকে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি। পুকুরের পানি যদি খুব স্বচ্ছ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে পানিতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাবার নেই। পুকুরে প্রাকৃতিক খাবার উৎপাদনের জন্য প্রতি শতক পুকুরের জন্য ইউরিয়া ১০০-১৫০ গ্রাম, টিএসপি ৫০-৭৫ গ্রাম এবং গোবর ২-৫ কেজি ১৫ দিন পর পর দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনোভাবেই পুকুরের পানি খুব বেশি সবুজ বা গাড় সবুজ হয়ে না যায়। তাতে মাছের অক্সিজেনের অভাব হয়ে মাছ মারা যেতে পারে।
 
মূলত পুকুরের পানিতে অক্সিজেনের অভাব হলে মাছ খাবি খায়। এ অবস্থায় মাছের ঘনত্ব বেশি হলে কমাতে হবে। পানি বদল করতে হবে ও নতুন পানি ঢুকাতে হবে। পানিতে ঢেউয়ের সৃষ্টি বা বাঁশ পিটিয়ে অক্সিজেনের সংযোগ ঘটাতে হবে। পুকুরে হররা টানতে হবে।
 
প্রশ্ন : পুকুরের পানি ধারণক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায়?
উত্তর : পুকুরে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এঁটেল-দোআঁশ মাটি পুকুরের তলায় চারদিকে ৬ ইঞ্চি পরিমাণ ছড়িয়ে দিতে হবে। পুকুর শুকিয়ে গেলে তলায় ও পাড়ে ধৈঞ্চা বুনে ২ ফুট গাছ হলে তা চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
 
প্রশ্ন : পুকুর তৈরির সময় এবং মাছ থাকা অবস্থায় সার প্রয়োগের মাত্রা কেমন হবে?
উত্তর :
পুকুর তৈরির সময়
প্রতি শতাংশে ইউরিয়া- ১৫০ গ্রাম, টিএসপি-১০০ গ্রাম, এমপি-২৫ গ্রাম গোবর ৮-১০ কেজি অথবা কোম্পোস্ট সার- ১০-১৫ কেজি।
 
মাছ থাকা অবস্থায়
প্রতি শতাংশে ইউরিয়া -১৫০ গ্রাম, টিএসপি-১০০ গ্রাম, গোবর-৪-৫ কেজি অথবা কম্পোস্ট সার-৮-১০ কেজি।
মজুদপূর্ব অবস্থায়
ইউরিয়া- ১০০ গ্রাম/শতক, টিএসপি- ৫০ গ্রাম/শতক, গোবর ৮-১০ কেজি/শতক।
 
মজুদ পরবর্তী অবস্থায়
ইউরিয়া-১০ গ্রাম/শতক, টিএসপি-৬ গ্রাম/শতক, গোবর-১০০-১৫০ গ্রাম/শতক হারে ২ দিন পর পর পানির রঙের ওপর নির্ভর করে দিতে হবে।
 
আবদুল আলীম
পাবনা
 
প্রশ্ন : মুরগির বসন্ত হয়েছে। কী করণীয়?
উত্তর : ডেটল বা সেভলন অথবা পটাসিয়াম পার ম্যাঙ্গানেট দ্বারা বসন্তের গুটি দিনে ৪-৫ বার পরিষ্কার করে দিতে হবে।
তারপর নিম্নোক্ত অ্যান্টিবায়োটিক মলম দিতে হবে।
রেনামাইসিন ওয়েন্টমেন্ট আক্রান্ত স্থানে লাগাতে হবে।
কসমিক্স প্লাস কসিট্রিম ১ গ্রাম ওষুধ ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ৫ দিন খাওয়াতে হবে।
                                                    
শাহ আলম                                                                   
দিনাজপুর
 
প্রশ্ন : বাছুরের চোয়ালের নিচে ফুলে গেছে। কী করণীয়?
উত্তর : সেলিভোন ইনজেকশন ১০ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ২ মিলিলিটার ইঞ্জেকশান মাংসপেশি বা শিরায় ধীরে ধীরে প্রয়োগ করতে হবে। ২য় দিনেও এ মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
Inj. Nitronex ১ সিসি করে ১৪ দিন পর পর ২ বার চামড়ার নিচে পুশ করতে হবে।
Inj. Astavet ৩ সিসি করে রোজ ১ বার ৩ দিন মাংসে পুশ করতে হবে।

সাইফুল
রংপুর    
 
প্রশ্ন : গরুর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কী করণীয়?
উত্তর : ফিটকিরি দিয়ে চোখ ধুয়ে দিতে হবে রোজ ১ বার, এভাবে ৭ দিন।
বোরিক এসিড লোশন (১-২%) অথবা নরমাল স্যালাইন দিয়ে দিন ৩ বার করে ২-৩ দিন পরিষ্কার করতে হবে।

চোখে অপসোফেনিকল চোখের ড্রপ দিনে ৩-৪ বার করে ৩-৫ দিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
দিনে ২ বার গোসল করাতে হবে।
 
ইঞ্জেকশন প্রোনাপেন ৪০ লাখ রোজ ১ বার ৩ দিন মাংসে পুশ করতে হবে।
ইঞ্জেকশন অ্যাস্টাভেট ৫ সিসি করে রোজ ১ বার ৪ দিন মাংসে পুশ করতে হবে।
 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ
* কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল : ০১৫৫২৪৩৫৬৯১
বিস্তারিত
মাঘ মাসের কৃষি
মাঘ মাসের কনকনে শীতের হাওয়ার সাথে কিছু উষ্ণতার পরশ নিয়ে আবার আপনাদের মাঝে হাজির হচ্ছি আগামী মাসের কৃষি নিয়ে। মাঘের শীতে বাঘ পালালেও মাঠ ছেড়ে আমাদের পালানোর কোনো সুযোগ নেই। কেননা এ সময়টা কৃষির এক ব্যস্ততম সময়। আসুন আমরা সংক্ষেপে জেনে নেই মাঘ মাসে কৃষিতে আমাদের করণীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো-
 
ফসল / অবস্থা/বিবরণ /করণীয়  
 
বোরো ধান
পরিচর্যা    
মাঠে বোরো ধানের বাড়ন্ত পর্যায় এখন। এ সময় বোরো ধানে প্রয়োজন সারের উপরি প্রয়োগ, নিয়মিত সেচ প্রদান, আগাছা দমন, বালাই ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে। ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগের উপযুক্ত সময় এখন। ধানের চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর প্রথম কিস্তি, ৩০-৪০ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি এবং ৫০-৫৫ দিন পর শেষ কিস্তি হিসেবে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া চারা রোপণের ৭-১০ দিনের মধ্যে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে পারেন। এতে একরে ৬৫ কেজি গুটি ইউরিয়ার প্রয়োজন হয়।
 
বালাই ব্যবস্থাপনা
এ সময় ধান ক্ষেতে রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। রোগ ও পোকা থেকে ধান গাছকে বাঁচাতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, আন্তঃপরিচর্যা, যান্ত্রিক দমন, উপকারী পোকা সংরক্ষণ, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে ধানক্ষেত বালাই মুক্ত করতে পারেন। এসব পন্থায় রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে শেষ উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
 
গম
আন্তঃপরিচর্যা ও সেচ প্রদান
গমের জমিতে যেখানে ঘন চারা রয়েছে তা পাতলা করে দিতে হবে। এ সময় গমের শিষ বেড় হয়।  যদি শিষ বেড় হয় বা গম গাছের বয়স ৫৫-৬০ দিন হয় তবে জরুরিভাবে গম ক্ষেতে একটি সেচ দিতে হবে। এতে গমের ফলন বৃদ্ধি পাবে। মনে রাখতে হবে ভালো ফলনের জন্য দানা গঠনের সময় আরেকবার সেচ দেয়া বেশি জরুরি। এ সময় গম ক্ষেতে ইঁদুরের উপদ্রব হয়ে থাকে তাই ইঁদুর দমন জরুরি। তবে ইঁদুর দমনের কাজটি করতে হবে সম্মিলিতভাবে।
 
ভুট্টা    
আন্তঃপরিচর্যা ও সেচ প্রদান    
ভুট্টা ক্ষেতের গাছের গোড়ার মাটি তুলে দিতে হবে এবং গোড়ার মাটির সাথে ইউরিয়া সার ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর সেচ প্রদান করতে হবে এবং গাছের নিচের দিকের মরা পাতা ভেঙে দিতে হবে। ভুট্টার সাথে সাথী বা মিশ্র ফসলের চাষ করে থাকলে সেগুলোর প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হবে।
 
আলু    
বালাই ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা    
আলু ফসলে নাবি ধসা রোগ দেখা দিতে পারে। সে কারণে স্প্রেয়িং শিডিউল মেনে চলতে হবে। তবে বালাইনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা দরকার। এছাড়া বালাইনাশক কেনার আগে  তা ভালোমানের কিনা তা যাচাই করে নিতে হবে। মড়ক রোগ দমনে দেরি না করে ২ গ্রাম ডায়থেন এম ৪৫ অথবা সিকিউর অথবা ইন্ডোফিল প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। মড়ক লাগা জমিতে সেচ দেয়া বন্ধ করতে হবে। তাছাড়া আলু ফসলে মালচিং, সেচ প্রয়োগ, আগাছা দমনের কাজগুলোও করতে হবে।  আলু  গাছের বয়স ৯০ দিন হলে মাটির  সমান করে গাছ কেটে দিতে হবে এবং ১০ দিন পর আলু তুলে ফেলতে হবে। আলু তোলার পর  ভালো করে শুকিয়ে বাছাই করতে হবে এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
তুলা    
সংগ্রহ    
এ সময় তুলা সংগ্রহের কাজ শুরু করতে হবে। তুলা সাধারণত ৩ পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। শুরুতে ৫০% বোল ফাটলে প্রথম বার, বাকি ফলের ৩০% পরিপক্ব হলে দ্বিতীয় বার এবং অবশিষ্ট ফসল পরিপক্ব হলে শেষ অংশের তুলা সংগ্রহ করতে হবে। রৌদ্রময় শুকনা দিনে বীজ তুলা উঠাতে হয়। ভালো তুলা আলাদাভাবে তুলে ৩-৪ বার রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, ভালো তুলার সাথে যেন খারাপ তুলা (পোকায় খাওয়া, রোগাক্রান্ত) কখনও না মেশে।
 
ডাল ও তেল ফসল    
সংগ্রহ    
মসুর, ছোলা, মটর, মাসকালাই, মুগ, তিসি পাকার সময় এখন। সরিষা, তিসি বেশি পাকলে রোদের তাপে ফেটে গিয়ে বীজ পড়ে যেতে পারে, তাই এগুলো ৮০ ভাগ পাকলেই সংগ্রহের ব্যবস্থা নিতে হবে। আর ডাল ফসলের ক্ষেত্রে গাছ গোড়াসহ না উঠিয়ে মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি রেখে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। এত জমিতে উর্বরতা এবং নাইট্রোজেন সরবরাহ বাড়বে।
 
শাকসবজি    
পরিচর্যা    
শীতকাল শাকসবজির মৌসুম। নিয়মিত পরিচর্যা করলে শাকসবজির ফলন অনেক বেশি পাওয়া যায়। এছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ওলকপি, শালগম, গাজর, শিম, লাউ, কুমড়া , মটরশুঁটি এসবের নিয়মিত যত্ন নিতে হবে। টমেটো ফসলের মারাত্মক পোকা হলো ফলছিদ্রকারী পোকা। ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে পুরুষ মথকে ধরে সহজে এ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রতি বিঘা জমির জন্য ১৫টি ফাঁদ স্থাপন করতে হবে। তাছাড়া ক্ষেতে পতঙ্গভুক পাখি বসার  ব্যবস্থা করতে হবে। আধাভাঙ্গা নিম বীজের নির্যাস (৫০ গ্রাম এক লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ১২ ঘণ্টা ভেজাতে হবে এবং পরবর্তীতে মিশ্রনটি ভালো করে ছাকতে হবে) ১০ দিন পর পর ২/৩ বার স্প্রে করে এই পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আক্রমণ তীব্র হলে কুইনালফস গ্রুপের কীটনাশক (দেবীকইন ২৫ ইসি/কিনালাক্স ২৫ ইসি/করোলাক্স ২৫ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার পরিমাণ মিশিয়ে স্প্রে করে এ পোকা দমন করা যায়। এ সময় চাষিভাইরা টমেটো সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে পারেন। আধা পাকা টমেটোসহ টমেটো গাছ তুলে ঘরের ঠাণ্ডা জায়গায় উপুড় করে ঝুলিয়ে টমেটোগুলোকে পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। পরবর্তীতে ৪-৫ মাস পর্যন্ত অনায়াসে টমেটো খেতে পারবেন। আর শীতকালে মাটিতে রস কমে যায় বলে সবজি ক্ষেতে চাহিদামাফিক সেচ দিতে হবে। তাছাড়া আগাছা পরিষ্কার, গোড়ায় মাটি তুলে দেয়া, সারের উপরিপ্রয়োগ ও রোগবালাই প্রতিরোধ করা জরুরি।
 
গাছপালা    
পরিচর্যা    
শীতে গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ দিতে হবে, গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হবে এবং আগাছামুক্ত রাখতে হবে। সাধারণত এ সময় আম গাছে মুকুল আসে। গাছে মুকুল আসার পরপরই এ মুকুল বিভিন্ন প্রকার রোগ এবং পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো আমের অ্যানথ্রাকনোজ রোগ।  এ রোগ দমনে গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার পূর্ব পর্যন্ত আক্রান্ত গাছে টিল্ট-২৫০ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি অথবা ২ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এছাড়া আমের আকার মটর দানার মতো হলে গাছে ২য় বার স্প্রে করতে হবে। এ সময় প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার নিম্ফ দেখা যায়। আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার পূর্বেই একবার এবং এর একমাস পর আর একবার প্রতি লিটার পানির সাথে ১.০ মিলি সিমবুস/ফেনম/ডেসিস ২.৫ ইসি মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপাল ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।
 
প্রাণিসম্পদ    
হাঁস-মুরগির যত্ন  
শীতকালে পোলট্রি তে যেসব সমস্যা দেখা যায় তা হলো-অপুষ্টি, রানীক্ষেত, মাইকোপাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা। মোরগ-মুরগির অপুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধানে ভিটামিন এ, সি, ডি, ই, কে ও ফলিক এসিড সরবরাহ করতে হবে। তবে সেটি অবশ্যই প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে।  
 
শীতের তীব্রতা বেশি হলে পোলট্রি শেডে অবশ্যই মোটা চটের পর্দা লাগাতে হবে এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পোলট্রি লিটারে অ্যামোনিয়া গ্যাস রোধে ১ বর্গফুট জায়গায় ১ কেজি হারে অ্যামোনিল পাউডার মিশাতে হবে। শীতকালে মোরগ-মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সপ্তাহে দুই দিন খাবারের সাথে ভিটামিন ই এবং ভিটামিন সি মিশিয়ে দিতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে অনেকেই হাঁস পালন করে থাকেন। এ সময় হাঁসের নানা রোগও হয়ে থাকে।  হাঁসের যেসব রোগ হয় সেগুলো হলো- হাঁসের প্লেগ রোগ, কলেরা রোগ এবং বটুলিজম। প্লেগ রোগ প্রতিরোধে ১৮-২১ দিন বয়সে প্রথম মাত্রা এবং প্রথম টিকা দেয়ার পর ৩৬-৪৩ দিন বয়সে দ্বিতীয় মাত্রা পরবর্তী ৪-৫ মাস পরপর একবার ডাক প্লেগ টিকা দিতে হবে।  হাঁসের কলেরা রোগের জন্য ডাক কলেরা টিকা ৪৫-৬০ দিন বয়সে ১ বার, ৬০-৭৫ দিন পর দ্বিতীয় বার এবং পরবর্তী ৪-৫ মাস পর পর টিকা দিতে হবে।
 
গরু-বাছুরের যত্ন  
গোখামারে শীতকালে মোটা চটের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি।  নাহলে গাভীগুলো তাড়াতাড়ি অসুস্থ হয়ে যাবে। এ সময় গাভীর খাবার প্রদানে যেসব বিষয়ে নজর দিতে হবে তাহলো- সঠিক সময়ে খাদ্য প্রদান, গোসল করানো, থাকার স্থান পরিষ্কার করা, খাদ্য সরবরাহের আগে খাদ্য পাত্র পরিষ্কার করা এবং নিয়মিত প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া। তবে গাভীর খাবারের খরচ কমাতে সবচে ভালো হয় নিজেদের জমিতে তা চাষাবাদ করা। আর একটি কাজ করলে ভালো হয় সেটি হলো-সমবায় সমিতি করে ওষুধ ও চিকিৎসা করানো। এতে লাভ হয় বেশি। খরচ যায় কমে।  
 
মৎস্যসম্পদ    
মাছের যত্ন  
শীতকালে মাছের বিশেষ যত্ন নেয়া দরকার। কারণ এ সময়ে পুকুরে পানি কমে যায়। পানি দূষিত হয়। মাছের রোগবালাইও বেড়ে যায়। সে কারণে কার্প ও শিং জাতীয় মাছে ড্রপসি বা উদর ফোলা রোগ বেশি হয়। এ রোগ প্রতিরোধে মাছের ক্ষত রোগ যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। আর এ রোগের প্রতিকারে প্রতি কেজি খাদ্যের সাথে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন বা স্ট্রেপটোমাইসিন পর পর ৭ দিন খাওয়াতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় এ বিষয়ে আপনার কাছের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ গ্রহণ করা।
 
সুপ্রিয় পাঠক, অত্যন্ত সংক্ষেপে মাঘ মাসে কৃষিতে করণীয় কাজগুলোর উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরা হলো। আপনারা আপনাদের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয়ে কৃষিকে নিয়ে যেতে পারেন এক আলোকিত ভুবনে। কৃষির যে কোন সমস্যায় উপজেলা কৃষি অফিস, উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আর আপনাদের মেধা, ঘাম, সচেতনতা এবং আন্তরিকতাই এ দেশের কৃষিকে নিয়ে যাবে সাফল্যের শীর্ষে। সোনালি মাঠ, প্রান্তর, দিগন্ত কৃষির উজ্জ্বল আভায় উদ্ভাসিত হবে। কথা হবে আগামী সংখ্যায়। সবার জন্য শুভ কামনা।
 
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন
* সহকারী তথ্য অফিসার (শস্য উৎপাদন), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫
 
বিস্তারিত
সম্পাদকীয় পৌষ-১৪২১
বাংলাদেশ ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। এ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। রবি মৌসুম কৃষির জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ মৌসুমে একদিকে যেমন বিভিন্ন শাকসবজি উৎপাদিত হয় অন্যদিকে বোরো মৌসুমের ধান উৎপাদনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধানের ওপরই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বহুলাংশে নির্ভরশীল। এজন্য কৃষির সার্বিক উন্নয়নে সুপরিকল্পিতভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এ দেশের সরকার, কৃষি গবেষক, সম্প্রসারণবিদ, কৃষিকর্মী, কৃষক-কৃষাণী সবাই। বোরো মৌসুমে ধানের ফলন কিভাবে বাড়ানো যায় সে প্রচেষ্টা আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে অব্যাহত রাখতে হবে। পরিবর্তিত আবহাওয়ার সাথে তালমিলিয়ে ধানের চারা রোপণ, সার ও সেচ প্রয়োগ, রোগবালাই, পোকামাকড় দমন প্রভৃতি কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। ধানের ফলন বেশি পাওয়ার ক্ষেত্রে জাত নির্বাচন একটি বড় বিষয়। এ ক্ষেত্রে লবণাক্ত এলাকায় ব্রিধান৪৭ ও ব্রিধান৬১ এবং খরাপ্রবণ এলাকায় খরা সহনশীল জাতের ধান নেরিকা-১ চাষাবাদ করা যেতে পারে।
       চাষি ভাইয়েরা, আপনারা জানেন মসলা উচ্চমূল্যের ফসলগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমাদের দেশে মসলার ঘাটতি থাকায় প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে মসলা আমদানি করতে হয়। কিন্তু দেশে মসলা চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বগুড়াতে একটি মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে বিভিন্ন মসলা ফসল চাষের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রচেষ্টার ফল হিসেবে বারি আলুবোখারা-১ নামে আলুবোখারার একটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে যার ফলন হেক্টরপ্রতি ৭ থেকে ১০ টন পাওয়া যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য খুবই খুশির খবর। শুধু আলুবোখারাই নয়, অন্যান্য মসলা ফসল চাষ করে ইতোমধ্যেই যথেষ্ট সুফল পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। আমরা আশা করি অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ মসলা ফসল চাষে আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
         সুপ্রিয় পাঠক, পৌষ মাস শীতের মাস। এ মাসে বাজারে প্রচুর শাকসবজি পাওয়া যায়। সবজি আমাদের শরীর গঠন ও পুষ্টিসাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। এজন্য সবারই পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি খাওয়া প্রয়োজন। তবে শাকসবজি যেন বিষমুক্ত হয় সে ব্যাপারে কৃষক ভাইদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। পারতপক্ষে কীটনাশকের ব্যবহার পরিহার করে শাকসবজি উৎপাদন করতে পারলে নিজের জন্যও মঙ্গল দেশের জন্যও মঙ্গল। অতএব, আসুন এ ব্যাপারে আমরা সবাই সচেতন হই, স্বাস্থ্যবান জাতি ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলি।
 
বিস্তারিত

Share with :