কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

গাজরের রসের উপকারিতা
গাজর অত্যন্ত জনপ্রিয় সবজি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লাল, সাদা, হলদে নানা বর্ণের গাজর দেখা যায়। আমাদের দেশে জন্মে কমলা রঙের গাজর। এটা শীতকালীন সবজি। গাজর দেখতে যেমন সুন্দর ও আকর্ষণীয় তেমনি খেতেও সুস্বাদু। তদুপরি পুষ্টিতেও ভরপুর। এত সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন হওয়ার বড় কারণ এর মধ্যে বিদ্যমান বিটা-ক্যারোটিন। গাজর নিজে যেমন সুন্দর তেমনি মানুষের রঙ উজ্জ্বল করতেও এটি সহায়ক।
 
সবজি হিসেবে গাজরের ব্যবহার ব্যাপক। মাছ-গোশতের সঙ্গেও খাওয়া যায়। গাজরের হালুয়া অনেকের কাছেই অতি প্রিয়। সালাদ হিসেবে গাজর বেশ জনপ্রিয়। সামান্য লবণ মিশিয়ে এটি কাঁচাই খাওয়া যায়। পুষ্টিসমৃদ্ধ এ সবজিটির বাজারমূল্য মৌসুমের সময় থাকে একেবারেই সস্তা। এর উচ্চ পুষ্টিমান জানা থাকলে এর বাজারমূল্য চড়ে যেতো বহুগুণ। এখানে গাজরের প্রতি ১০০ গ্রাম আহার উপযোগী অংশে পুষ্টিমান উল্লেখ করা হলো-
 
খাদ্য শক্তি- ৪৮ ক্যালোরি
শর্করা- ১০.৬০ গ্রাম
খনিজ পদার্থ- ১.১০ গ্রাম
ক্যালসিয়াম- ৮০.০০ মি. গ্রাম
ফসফরাস- ৫৩০.০০ মি. গ্রাম
লৌহ- ২.২০ মি. গ্রাম
ক্যারোটিন- ১৮৯০.০০ মাইক্রোগ্রাম
ভিটামিন বি ১ - ০.০৪ মি. গ্রাম
ভিটামিন সি- ৩.০০ গ্রাম
উৎস : কৃষি প্রযুক্তি হাত বই, বারি-২০০৫

অন্যান্য সবজির তুলনায় গাজর অত্যন্ত পুষ্টিকর। উদাহরণস্বরূপ মুলার চেয়ে গাজরে ফসফরাস আছে ২৬ গুণ, ক্যারোটিন প্রায় ৬৩০ গুণ।
 
গাজরের রসের উপকারিতা
১. চোখের মহৌষধ : গাজরের আকর্ষণীয় বর্ণের মধ্যেই রয়েছে এর ঔষধি গুণ। গাজরের বিটা ক্যারোটিন নিজে নিজেই ভিটামিন-এ’তে রূপান্তরিত হয় যা দেহের জন্য খুবই উপকারী। বিটা-ক্যারোটিন আমাদের দেহের ভেতরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে রেটিনল বা ভিটামিন-এ’তে রূপান্তরিত হয়, আর ভিটামিন-এ আমাদের দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার শিশু অন্ধ হয়ে যায় ভিটামিন-এ’র অভাবে। সাধারণত ৫ মাস থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুরাই চোখের সমস্যায় ভোগে। প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ শিশু রাতকানা রোগে আক্রান্ত হয়। তাই শিশুকে প্রতিদিন ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হয়। গাজর ক্যারোটিনের রাজা, যা ভিটামিন-এ’র উৎস। তাই শিশুদের প্রতিদিন অন্তত মৌসুমের সময় গাজর খাওয়ানো উচিত।
 
২. হজমশক্তি বৃদ্ধি করে : গাজরের রস লিভারের কার্যকারিতা বাড়ায়। ফলে হজম শক্তির উন্নতি হয়।
 
৩. হাড়ের রোগ প্রতিরোধে সহায়ক : রোগ প্রতিরোধ গাজরের অস্টিওপরোসিস, আথ্রাইটিস ও বিভিন্ন রস হিতকর।
 
৪. ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক : গাজরে রয়েছে ভিটামিন-ই, যা ক্যান্সার প্রতিরোধী। তাই গাজর ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক। গাজরে বিদ্যমান বিটা-ক্যারোটিন আমাদের ত্বককে সূর্যের অতি বেগুণি রশ্মির হাত থেকে সুরক্ষা করে এমনকি ক্যান্সার থেকে রক্ষা করে।
৫. বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে : বয়সের ছাপ কমাতে গাজরের রস সাহায্য করে। গাজর বিটা- ক্যারোটিন সমৃদ্ধ, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং কোষের ক্ষয় রোধে সহায়ক। ফলে দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়াকে রোধ করে।

 
৬. ওজন কমায় : গাজরে ক্যালোরির পরিমাণ যৎসামান্য, যা ওজন কমাতে বেশ সহায়ক।
 
৭. কোলস্টেরল কমায় : গাজরে পটাসিয়াম বিদ্যমান, যা কোলস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।

৮. চর্বি কমায় : গাজরের রস লিভারের চর্বি ও পিত্ত কমাতে সাহায্য করে।

৯. ত্বকের লাবণ্য বাড়ায় : গাজরের রস ত্বকের লাবণ্য ও উজ্জ্বলতা বাড়ায় এবং ত্বককে সুরক্ষা করে।

১০. ব্যথা ও জ্বালাপোড়া কমায় : বয়সজনিত যে কোনো ব্যথা-বেদনা ও শরীরের জ্বালাপোড়া কমাতে গাজরের রস হিতকর।
 
গাজর আল্লাহর এক অপূর্ব দান। এর উপকারিতার শেষ নেই। তাই-সুস্থ নীরোগ থাকতে যদি চান, বেশি করে গাজর খান।
 
 
মু. ফজলুল হক রিকাবদার
*পরিচালক (অব.) কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫
 
বিস্তারিত
বাংলাদেশের কৃষি : চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ
আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ। সুজলা সুফলা, শস্য-শ্যামলা মলয়জ শীতলা এক অপরূপ অনিন্দ্য সুন্দর বাংলাদেশ। বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের যে নাইকো শেষ বাংলাদেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র ও বুড়িগঙ্গা বিধৌত বাংলার রূপ ও সৌন্দর্যে সবই মনোমুগ্ধকর। বাংলাদেশ সবুজের দেশ। ষড়ঋতুতে বাংলাদেশ বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়। কবি তাই যথার্থই বলেছেন, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি। কিন্তু আমাদের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে আজ আমাদের দেশ তথা বাংলাদেশের মেরুদণ্ড কৃষি নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জীবন জীবিকার জন্য এদেশের জনগণ ও অর্থনীতি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এখনও শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ জনসাধারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং মোট জিডিপির ২২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। তাই কৃষি উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটলে দেশের সামাজিক অর্থনীতি তথা অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে।
 
পৃথিবীর মধ্যে জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। লোক সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে ৭ হাজার নতুন মুখ, বছরে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রায় ২৫ লাখ লোক। অপরদিকে রাস্তাঘাট, মিল-কারখানা, অপরিকল্পিত বাড়িঘর ইত্যাদি অবকাঠামো তৈরিতে চাষযোগ্য জমি থেকে প্রতিদিন ২২০ হেক্টর হিসেবে প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি। বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য পাল্লা দিয়ে নিবিড়ভাবে চাষ করা হচ্ছে ধান আর ধান। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ধানের সঙ্গে আনুপাতিক হারে অন্যান্য ফসলের (ডাল, তেল, শাকসবজি, ফল-মূল) চাষ আশানুরূপ বাড়ানো যায়নি। দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করতে পারেনি। খাদ্য নিরাপত্তার প্রথম এবং প্রধান শর্তই হচ্ছে- খাদ্য জোগানের সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা থাকা অর্থাৎ নিশ্চিত আয়ের সংস্থান থাকা যার দ্বারা সবাই চাহিদা ও পছন্দমতো নিরাপদ এবং প্রয়োজনীয় আমিষসহ পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করতে পারে।
 
স্বাধীনতা উত্তর ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য ওই খাদ্য পর্যাপ্ত ছিল না। এর পরের ৪২ বছরে এখানে মানুষ বেড়েছে দিগুণের বেশি, আর আবাদি জমি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। অথচ দেশে এখন খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে তিন গুণ বেশি, ভুট্টাসহ এর পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি মেট্রিক টন (প্রথম আলো, নভেম্বর ২০১৩)। বাংলাদেশে ৩-৪ বছর ধরে আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান থাকা এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের তৎপরতায় কৃষক ভালো বীজ, জমিতে সুষম সারের ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিমিত সেচের কারণে বর্তমানে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন হচ্ছে। তবে কৃষি গবেষকদের মতে, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ মুহূর্তে ধানের আবাদ কমানো যাবে না। প্রধান ফসল ধানের আবাদ ঠিক রেখে অন্যান্য ফসলের (গম, ভুট্টা, ডাল, তৈল, সবজি) আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে (বিএইউ-গবেষণা প্রতিবেদন-২০১৩)।
 
বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চালের মূল্য বেশি অথচ এ দানাদার খাদ্যশস্য চাল আমরা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে খেয়ে থাকি। বাংলাদেশে প্রতিজন প্রতি বছর চাল খায় ১৬৫-১৮৩ কেজি, ভারত-১১৪ কেজি, ইন্দোনেশিয়া-১০৪ কেজি, শ্রীলঙ্কা-৮৩ কেজি, চীন, কোরিয়া, জাপান ৪০-৪৫ কেজি। এক পরিসংখানে বলা হয়েছে, দৈনিক মাত্র ৫০ গ্রাম করে চাল কম খেলে বাংলাদেশে ২৮ লাখ মেট্রিক টন আর ১০০ গ্রাম করে কম খেলে ৫৬ লাখ মেট্রিক টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে। এতে খাদ্য আমদানি করাত দূরে থাক বরং খাদ্য রপ্তানি করা যাবে।
 
অন্যদিকে ভিটামিন, খনিজ লবণের ঘাটতি পূরণ, সুস্থ কর্মক্ষম রোগব্যাধিমুক্ত জীবন গড়তে ফল-মূল, শাকসবজির ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সবজি খায় দক্ষিণ কোরিয়া-৬৮৬ গ্রাম, জাপান-৪৫০ গ্রাম, চীন-২৯০ গ্রাম, ভারত-১২৪ গ্রাম, বাংলাদেশ খায় মাত্র ৪৭ গ্রাম/জন/প্রতিদিন। ফল দেহে আনে বল, ভিটামিনের একমাত্র উৎস। প্রতিদিন একজন লোকের ১১৫-১২০ গ্রাম ফল খাওয়া দরকার। আমাদের দেশে মাথাপিছু ফলের উৎপাদন প্রায় ৩৫-৪০ গ্রাম, ভারতে উৎপাদন ১১১ গ্রাম, ফিলিপাইনে উৎপাদন হয় ১২৩ গ্রাম, থাইল্যান্ডে উৎপাদন হয় ২৮৭ গ্রাম। এর পরিপেক্ষিতে আমাদের প্রচলিত ফলের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া অপ্রচলিত ফল যেমন- আতা, কদবেল, শরিফা, সফেদা, লটকন, ডেউয়া, গাব, কাউফল, ক্ষুদিজাম ইত্যাদি ফলের আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে।
 
বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে ৮০ লাখ  মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়। সংরক্ষণের অভাবে এর উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়। পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন-ডেনমার্ক, হল্যান্ড, ব্রাজিলের জনগণ প্রধান খাদ্য হিসেবে আলু খেয়ে থাকে। আমরা ১০০ গ্রাম চালের পরিবর্তে আলুসহ অন্যান্য সবজি ও ফল খাদ্য তালিকায় প্রতিস্থাপন করতে পারলে চালের ওপর অনেকাংশে চাপ কমবে। আর এর জন্য প্রয়োজন একটু সচেতনা বৃদ্ধি, মানসিকতা এবং খাদ্যাভাসের পরিবর্তন।
 
মাটির স্বাস্থ্য নির্ভর করে মাটির মধ্যে বিদ্যমান পানি, বায়ু আর জৈব উপাদানের ওপর। আর এসব নির্ভর করছে মাটির নিচে বসবাসরত অনুজীব সমষ্টির ওপর। অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে এ অনুজীব ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু মাটির অনুজীব বা মাটির স্বাস্থ্য নয়, ধ্বংস হচ্ছে জীবচৈত্র্যসহ পরিবেশের। ফসলের জমিতে ক্রমাগত আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাসসহ ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে। নিবিড় ফসল ও ফল চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক সার। মাটির প্রাণ হচ্ছে জৈবসার। জৈব পদার্থ হারিয়ে মাটি অনুর্বর ও অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ছে। মাটিতে ৫% জৈব পদার্থ থাকা দরকার কিন্তু মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে জৈব পদার্থ রয়েছে শতকরা ০.৫ - ১.০ ভাগ বা তারও কম। জমির আদর্শ খাদ্য হলো গোবর সার, দেশের অনেক এলাকায় এই আদর্শ গোবর সার জমিতে প্রয়োগের পরিবর্তে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ডেনমার্কসহ অনেক উন্নত দেশে মাটির জৈব পদার্থ সংরক্ষণের জন্য জমিতে গোবরসার ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বলা হয় ‘সবার আগে জৈব সার তারপর অন্য সার’ আমরা চলছি উল্টো পথে।
 
অপরিকল্পিত বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে পোকামাকড়, রোগবালাইয়ের প্রাকৃতিক শত্রু, বন্ধু পোকা ধবংস হচ্ছে। শত্রু পোকার বালাইনাশক সহনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কম ক্ষতিকারক নিম্ন প্রজাতির পোকামাকড় ক্ষতিকারক হিসেবে আত্ম প্রকাশ করছে। ফসলে যথেচ্ছা কীটনাশক ব্যবহার, ফলে ও মাছে বিভিন্ন ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মেশানোর ফলস্বরূপ মানবদেহে সৃষ্টি হচ্ছে- ব্লাড ক্যান্সার, ব্রেন ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, ফুসফুস ক্যান্সার ইত্যাদি। খাদ্যে ভেজালের কারণে গ্যাসট্রিক, আলসার, হৃদরোগ, অন্ধত্ব, কিডনি রোগ, স্নায়ু রোগ প্রভৃতি জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী আজ অসহায় হয়ে পড়ছে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের  বিষাক্ত খাদ্য জনস্বাস্থের জন্য হুমকি শীর্ষক সেমিনারে বলা হয় শুধুুমাত্র ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার, কিডনি রোগের আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ। এছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকালঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। যাহা এক কথায় ভয়াবহ (বাংলাদেশ প্রতিদিন-২৬ অক্টোবর ২০১৪)। বাতাসে সিসা, পানিতে- আর্সেনিক, চালে- ক্যাডনিয়াম, মাছে- ফরমালিন, ফলে- কার্বাইড, ফলের রসে ও বিস্কিটে বিভিন্ন ইন্ডাসট্রিয়াল- রঙ, সবজিতে কীটনাশক, মুরগির মাংসে- ক্রোমিয়াম সর্বদিকে বিষ আর বিষ আমরা যাব কোথায়?
 
শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার জন্য ৭০এর দশকে এদেশে সার ও কীটনাশক ব্যবহার শুরু হয়। ফসল আবাদ বৃদ্ধির কারনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অনেক শিল্পাঞ্চল এলাকার উত্তম আবাদি জমি আজ পরিবেশ দূষণের মারাত্মক শিকার। কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য গিয়ে মিশছে নদী-নালা, খাল-বিলে। খাল-বিলের পানি ব্যবহৃত হচেছ জলাশয়ের আশপাশের আবাদি জমিতে। আবাদি জমি হারাচ্ছে উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা। শিল্পের বর্জ্যরে মাধ্যমে এসব এলাকার মাটিতে জমা হচ্ছে ভারি ধাতব বস্তু (লেড, ক্যাডনিয়াম, ক্রোমিয়াম)। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওইসব এলাকার উৎপাদিত চালে ক্যাডনিয়াম পাওয়া যাচ্ছে।
 
‘বেশি ওষুধ বেশি পোকা, কম ওষুধ কম পোকা’-এ প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে আইপিএম, আইসিএম বর্তমানে আইএফএম  বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্লাবের সদস্যদের প্রচার-প্রচারণা ও মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকির ফলেই বালাইনাশকের ব্যবহার কমতে শুরু করেছে। আশার কথা হলো, সারা দেশে যেখানে ২০০৮ সালে দেশে বালাইনাশক ব্যবহার হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন, ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৮২ মেট্রিক টন। সারা দেশে আইপিএম, আইসিএম ক্লাবের বর্তমান সংখ্যা ১০০০০টি এবং প্রশিক্ষিত কৃষক-কৃষানির সংখ্যা ৩০০০০০ জন। আগামীতে ২০০০০টি আইপিএম/আইএফএম ক্লাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে কীটনাশকের জুডিশিয়াল/পরিমিত ব্যবহার, পরিবেশ রক্ষায় কীটনাশকের পরিবর্তে সবজিতে ফেরোমেন ট্রাপ, ব্রাকন, ট্রাইকোগামা (উপকারী অনুজীব দ্বারা ক্ষতিকর পোকা দমন) ব্যবহার বৃদ্ধি করা, ধানের জমিতে পার্চিং করা ও  ফল পাকানোতে প্রাকৃতিক পদ্ধতি অবলন্বন  করে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো পরিহার এবং এর ক্ষতিকারক প্রভাব সম্পর্কে পত্রপ্রত্রিকায় ও রেডিও-টেলিভিশনে ব্যাপক প্রচার করতে হবে। আমাদের বাঁচার তাগিদেই এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
 
একদিকে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ফসলি জমিতে বেআইনিভাবে ইটভাটা স্থাপন করায় তার কালো ধোঁয়া আশপাশের ফসলি জমি ও গাছ পালার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। প্রতি বছর কোথাও না কোথাও ধানে চিটা, ফসলহানীসহ ফল গাছে ফলশূন্য হওয়ার অনাকাক্সিক্ষত ঘটছে। গত ২০১৩ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ ও তাড়াশ উপজেলার বোরো ধানের জমি এতে অক্রান্ত হয়েছে। আমাদের কৃষি প্রকৃতি এখনও জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল।  বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি ওপর পড়ছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব। এর ফলে শুরু হয়েছে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
 
নদ-নদীর উৎস পথে বা তার গতিপথে বাধা সৃষ্টিকারী বাঁধ পানির স্বল্পতাসহ খরার সৃষ্টি করছে। উজানে বিভিন্ন অপরিকল্পিত বাঁধ ভাটিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর কারণে বাংলাদেশে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে। শুধু তাই নয় সমুদ্রের পানির উজানমুখী ধাক্কা বাড়ছে। কারণ খরার সময় উজানের পানি প্রবাহ বাধার কারণে নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামার কারণে এবছর বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া উপজেলার ৩৮০টি অগভীর নলকূপ ৮-১০ ফুট গভীরে স্থাপন করে সেচ প্রদান করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলায় চরাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ৪৪,০০০ হেক্টর (২৪%) যাহা নদীর নাব্যর কারণে প্রতি বছর বেড়েই চলেছে।
 
নদীতে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃর্ণ এলাকা লবণাক্ততায় ভরে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ত আক্রান্ত। তার মধ্যে মাত্র ২,৫০,০০০ হেক্টর জমিতে লবণসহিষ্ণু ফসল চাষাবাদ সম্ভব হচ্ছে। বাকি জমি এখনও চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের ১২টি জেলায় লবণাক্ততার প্রভাবে স্বাভাবিক চাষাবাদ হয় না। ২০০৭ সালে সিডর, ২০০৯ সালে আইলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জমি লবণাক্রান্ত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। যাহা এখনও কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি।

তাপমাত্রা ও উষ্ণতা রোধে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫% গাছপালা/বন থাকা দরকার, আমাদের দেশে রয়েছে বর্তমানে মাত্র ১০-১২%। এ সমস্যা উত্তরণের জন্য সরকার বৃক্ষরোপণের ওপর অত্যধিক জোর দিয়েছেন। কিন্তু কিছু আগ্রাসী প্রজাতির গাছ আমাদের দেশকে মরুময়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে রাস্তার দুইপাশে কড়াই গাছ বিশেষ করে সিরাজগঞ্জে ইউক্যালিপটাস গাছ বাগান আকারে চাষ করা হচ্ছে। যে গাছে পাখি বাসা বাঁধে না, মৌমাছি মধু আহরণ করে না এবং আমাদের ভূ-নিম্নস্থ পানি ব্যাপক শোষণ করে উড়িয়ে দিয়ে দ্রুত মরুময়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগতভাবে নিম্নমুখী হচ্ছে, ফলশ্রুতিতে পানিতে আর্সেনিকসহ অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারপরও যদি এ প্রজাতির গাছ লাগানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে তাহা সহজেই অনুমেয়। অথচ আমরা এর পরিবর্তে বেলজিয়াম, একাশিয়া, ইপিল-ইপিল, মেহগনি ইত্যাদি কাঠের গাছের সাথে ফল গাছ (আম, জাম, কলা, লিচু, পেয়ারা, কাঁঠাল, তাল, খেজুর ইত্যাদি) লাগিয়ে একদিকে পরিবেশের উন্নতি সাধন অন্যদিকে ফলের চাহিদা ও পূরণ করতে পারি।

 
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন বীজ ব্যবহার হয় তার মধ্যে বিএডিসি সরবরাহ করে মাত্র ধানের ৩৫-৪০ ভাগ এবং অন্যান্য ফসলের মাত্র ১০-১২ ভাগ। সরকার কৃষক ভালো মানের বীজ সরববাহের লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে (ডিএই) কৃষক পর্যায়ে ভিত্তি বীজের প্রদর্শনী স্থাপন করে এ সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে। কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত এ বীজ দিয়ে বর্তমানে প্রায় ৭০ ভাগ উন্নত মানের ধান বীজের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছে। সরকারের নন ইউরিয়া সারের মূল্য কমানো এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তদারকির ফলে বর্তমানে জমিতে সুষম সারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গত ৫ বছর ধরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফল স্বরূগত ৩ বছর ধরে এক টন চালও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়নি। এত প্রতিকূল পরিবেশেও কৃষি উৎপাদন গত ৫ বছর শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে।
 
নার্স কর্তৃক আয়োজিত ‘খাদ্য নিরাপত্তায় বিজ্ঞান-সেমিনার-২০১০’ সালের একটা গবেষণায় দেখা গেছে, জনসংখ্যা বর্তমান হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে এবং খাদ্য গ্রহণ ৪৫৪ গ্রাম/জন/দিন হিসেবে আগামী ২০২৫ সালে বাংলাদেশের লোক সংখ্যা দাঁড়াবে ১৯ কোটি, খাদ্যের প্রয়োজন হবে ৩ কোটি ১৫ লাখ মেট্রিক টন। আর ২০৫০ সালে লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ২৫ কোটি এবং খাদ্য চাহিদা দাঁড়াবে ৪ কোটি ২৫ লাখ মেট্রিক টন। সেই সাথে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ দাড়াবে ২০২৫ সালে বর্তমানে ৮১ লাখ হেক্টর থেকে কমে ৬৯ লাখ হেক্টরে এবং ২০৫০ সালে দাঁড়াবে মাত্র ৪৮ লাখ হেক্টরে। সুতরাং এত অল্প পরিমাণ চাষযোগ্য জমিতে ৪.২৫ কোটি মেট্রিক টন চাল উৎপাদন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতএব এখন থেকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি সমুন্নত রেখে খাদ্যাভাস পরিবর্তন এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
 
উপসংহার
আমরা জানি কৃষিতে নানাবিধ সমস্যা আছে যার সমাধান ও রয়েছে। আমরা কৃষিতে অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি। আমাদের চাল উৎপাদন যথেষ্ট যা ধরে রাখতে হবে। শ্রীলঙ্কতে এবছর ১ লাখ টন চাল রপ্তানি হচ্ছে। তাপমাত্রা সহিষ্ণুু গমের জাত উদ্ভাবনের ফলে গমের আবাদ বৃদ্ধি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ টন গমের চাহিদা রয়েছে, উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১১-১২ লাখ টন। যার জন্য খাদ্যশস্য হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হচেছ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ টন আলু উৎপাদন হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণ করে স্বল্প পরিসরে বিদেশে আলু রপ্তানি হচ্ছে। এ মহূর্তে সবজি ও ফলের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে। ডাল ও তেল জাতীয় ফসলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ভোজ্যতেলের প্রায় ৭০% ভাগ আমদানি করতে হচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে ধানের কুড়া থেকে রাইস বার্ন অয়েল উৎপাদনের ফলে সয়াবিন তৈরি আমদানি দিন দিন কমে যাচেছ। সরিষার আবাদ বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। নতুন নতুন সরিষার জাত উদ্ভাবিত হয়েছে যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ডালের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ডালের মূল্য ও আমদানির পরিমাণ কমেছে। এ সময়ে চাহিদার ৫০% ডাল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। চাষিরা মূল্য পাওয়ায় পেঁয়াজ-রসুনের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে এবং আমদানিও কমেছে। সারা বছরব্যাপী ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কলা, পেঁপে, থাই পেয়ারা, আপেল কুল চাষ বেড়েছে। আংশিক বৃষ্টি নির্ভর আউশ ও পুরো বৃষ্টি নির্ভর রোপা আমন চাষে সরকার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কৃষি খামার স্থাপন, খামার যান্ত্রিকীকরণ ও সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরলস প্রচেষ্টা বর্তমান কৃষিকে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে যাবে। যেখানে কৃষি, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আর ও গতিশীল করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
 
ড.  মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার*
* শস্য উৎপাদন বিশেষজ্ঞ, ডিএই, সিরাজগঞ্জ, মোবাইল-০১৮১৫৫৯৭৩০৪ dhossain1960@yahoo.com
বিস্তারিত
নীল আর নীলকষ্ট নয়...
ইতিহাস বলে বাঙালিদের প্রধান ফসলই ছিল ধান আর পাট। নীল চাষ তারা কখনও করেনি, করার দরকারও পড়েনি। কারণ এর ব্যবহারিক প্রয়োজন তাদের খুব বেশি ছিল না। কিন্তু সে সময় পৃথিবীর অন্যত্র নীলের চাহিদা ছিল ব্যাপক। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক প্রণালিতে নীল রঙ প্রস্তুত হলেও এটি আবিষ্কারের আগে গাছ থেকে নীল সংগ্রহ করা হতো। ভারতবর্ষের মাটি উর্বর থাকায় ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে নীল চাষ করাত। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর ভারতের শাসন ক্ষমতা ইংরেজরা গ্রহণ করলে ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে এ কোম্পানি সবাইকে নীল চাষ করার এলান জারি করে। এ এলান জারির অধিকার পেয়েও ভারতীয়রা নীল চাষে তেমন আগ্রহী হয়নি। সে সময় শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ ব্যবসায়ীরা অনেকে বঙ্গদেশ ও বিহারের নীল চাষিদের দিয়ে জোর করে নীল চাষ করিয়ে বিদেশে রফতানি করত। এতে লাভ ছিল ব্যাপক। কালক্রমে নীল ব্যবসায়ী ইংরেজরা গ্রামে কুঠি স্থাপন করে নীল চাষ তদারকি করত। সে কুঠিই নীলকুঠি নামে এখনও বাংলার আনাচে কানাচে কষ্টস্মৃতির মিনার হিসেবে ইতিহাসের নীরব কান্না বহন করছে। নীল চাষ করে কোথাও কোথাও তারা এত অর্থ ও প্রতিপত্তি সম্পন্ন হয়ে ওঠে যে, স্থানীয় জমিদারদের জমিদারি পর্যন্ত তারা কিনে নেয়। এরপর অনিচ্ছুক চাষিদের নীল চাষে বাধ্য করে, ভালো উর্বর জমিতে নীল চাষ করার জন্য জবরদস্তি করে খুঁটি পুঁতে আসে, এমন কি নীল সংগ্রহ ও কেনার সময় সব অর্থ পরিশোধও করত না। উপরন্তু তারা তাদের পেয়াদা ও লাঠিয়ালদের দিয়ে দৈহিক নির্মম নির্যাতন করা হতো গরিব চাষিদের। এ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ই নীলকর নামে পরিচিত, যাদের অত্যাচারে বহু বিত্তশালী গৃহস্থ গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে, অনেক স্থানীয় যুবতী তাদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, বহু প্রতিবাদী মানুষ জীবন হারিয়েছে।
 
১৮৪৭ থেকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্ববাজারে নীলের দাম প্রায় দ্বিগুণ বাড়লেও চাষি ও কৃষক ন্যায্যমূল্য পেতো না। কারণ তাদের ক্রেতা ছিল একমাত্র নীলকর ইংরেজ। এ সময় ভাটির বাংলার প্রায় অর্ধেক নীল উৎপাদিত হতো বঙ্গদেশের নদীয়া ও যশোর জেলায়। প্রাণভয়ে কৃষক নীল চাষ করত কিন্তু তাতে অন্য যে কোনো ফসলের তুলনায় তাদের তৎকালীন ৭ টাকা ক্ষতি হতো। এছাড়া কুঠির কর্মচারী, নীলকরদের সঙ্গে বিক্রির মধ্যস্থতাকারী চামচাদের ঘুষ ছিল অতিরিক্ত সাধ্যাতিত। আর যদি মামলায় পড়ে যেত তবে আর রক্ষে নেই আরও বড় অঙ্কের খরচ হয়রানি কষ্টযন্ত্রণা। ব্রিটিশ বেনিয়ারা আমাদের কৃষক তাদের আবাদি ফসল ফলানো বাদ রেখে নিজেদের লাভের জন্য সুন্দর চাকচিক্যের বিলাসিতার জন্য জোর করে নীল চাষ করাত। নীল চাষ না করলে তাদের কঠিন কঠোর অত্যাচার আর অমানসিক নির্যাতন করত। সে কষ্টের ইতিহাস এখনও বয়ে বেড়ায় বাংলার কিছু মানুষ মননে মেধায় স্মৃতিতে বৃতিতে।
 
যদিও দেশের কোথাও আজ নীলকর সাহেবদের পাওয়া যাবে না, তথাপি রংপুর জেলায় বিভিন্ন এলাকায় নীল চাষের দেখা পাওয়া যায় ভিন্ন আঙ্গিকে। ইংরেজরা চলে যাওয়ার পরও বহু বছর ধরে বংশপরম্পরায় চাষ হয়ে আসছে নীল। অনুর্বর জমিকে উর্বর করতে ও জ্বালানি সংস্থান আর জৈবসার তৈরির জন্য স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মাল’ গাছ বালুময় অনুর্বর পতিত জমি যেখানে সাধারণত কোন ফসল হতে চায় না এবং রাস্তার ধারের ফাঁকা জায়গায় লাগানো হয়। অনেকটা রাস্তার পাশের অড়হর গাছ লাগানোর মতো। এ মাল গাছই যে নীলের গাছ তা অনেকেই জানতও না। প্রায় ১৫০ বছরের কষ্টের পরিক্রমা। ১৮৫৯ সনে নীল চাষিদের বিদ্রোহ এখনও জগৎ নাড়া দেয়ার মতো অনুভূতি জাগায় আজো প্রাণের অলিন্দে। আমাদের পূর্বপুরুষদের কষ্টগাথা নিয়ে কত কাব্যকথা প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৫ সন সর্বপ্রথম জানা যায়, এ গাছ থেকে প্রাকৃতিক নীল সংগ্রহ করা যায়। আর আধাবাণিজ্যিকভাবে নীল উৎপাদন শুরু হয় ২০০৭ সনে রংপুর সদরের হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামের ডা. অনীল কুমার রায়ের ছেলে ডা. নিখিল চন্দ্র রায়ের হাত ধরে। রংপুর জেলার সদর, তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া ও নীলফামারী জেলা কিশোরগঞ্জ উপজেলা প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৩ হাজার কৃষক নীল চাষ করছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে। ৩/৪ বছর আগেও প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হতো। মাঝে নীল উৎপাদনকারী কারখানা বন্ধ থাকায় এর আবাদ কমে যায়। বন্ধ কারখানা চালু হওয়ায় এখন নীল চাষে নতুন উদ্যোম সৃষ্টি ও গতি সঞ্চার হয়েছে।
 
কথায় বলে জাত মাছে পাদরি ধরে, ভাত মাছে নীল বাঁদরে। বড় কষ্ট নিয়ে ছড়াটা বানিয়েছিল নীল চাষিরা। এ ছড়া শোনানো সে দীনবন্ধু মিত্রও আর নেই, নেই নীল বাঁদরেরাও। ভারতজুড়ে চাষিদের বিদ্রোহের মুখে নীলকর সাহেবের ল্যাজ গুটিয়েছিল প্রায় ১৫০ বছর আগে। এরপর ধীরে ধীরে ইতিহাসের ঘৃণিত অংশ হয়ে গেছে খোদ ব্রিটিশ শাসকেরাই। ধুলোর নিচে চাপা পড়ে গেছে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার। স্মৃতির চাদরের ভাজে ভাজে জমা হয়েছে কষ্টকথা। বাংলা থেকে নীল চাষও কি হারিয়ে গেছে? না আবার ফিরে এসেছে নীল, নীল, নীল চাষ। আবার বাংলাদেশের জমিতে নীলগাছ লক লক করে উঠে জানান দিচ্ছে নীল আছে আজো। কিন্তু এবার আর এ চাষের পেছনে হাত নেই নীল বাঁদরদের। এবার আর কারও পিঠে শ্যামচাঁদের বাড়ি দিয়ে চাষ করানো হচ্ছে না। মঙ্গাপীড়িত উত্তরবঙ্গে আশীর্বাদ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে নীল চাষ। ক’বছর আগে শুরু হওয়া নীল চাষ নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে গরিব কৃষককে। এরাই নীলগাছের নাম দিয়েছে মাল গাছ। সারা পৃথিবীতেই এখন প্রাকৃতিক রঙের কদর অনেক বেশি। রাসায়নিক রঙের পারিবেশ বিনষ্টকারী প্রভাব সম্পর্কে পরিবেশবিদেরা এখন সরব। ফলে তৈরি হচ্ছে ট্রু বেঙ্গল ইন্ডিগোর মতো প্রাকৃতিক রঙের চাহিদা। জরিপ বলে শুধু ভারতেই প্রতি বছর দরকার হয় ৩০০ মেট্রিক নীলের। সবচেয়ে ভালো নীলের প্রতি কেজি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ২৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দুনিয়াজুড়ে নীলের মূল বেশির ভাগ চাহিদা মিটিয়ে আসছে এল সালভাদর। কিন্তু উত্তরবঙ্গের চাষিরা স্বপ্ন দেখছেন তাদের উৎপাদন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে যাবে দেশের আয় হবে। তারা আন্তর্জাতিক বাজারে গর্বিত বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন যে কোনো দেশের। রংপুরের সদর উপজেলা, পাগলান্দীর, কিশোরগঞ্জ ও জলঢাকার ব্যাপক এলাকায় কৃষক আগে থেকেই মাল বা নীলের চাষ করতেন। উদ্দেশ্য রঙ তৈরি নয়। জমিতে উর্বরতা বাড়ানো আর গাছগুলো শুকিয়ে জ্বালানির প্রয়োজন মেটানোর জন্য। ক’বছর আগে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এমসিসির উদ্যোগে রঙ তৈরির জন্য নীল চাষ শুরু হয়। বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। রংপুরে বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার কেজির বেশি প্রাকৃতিক নীল উৎপাদিত হচ্ছে যা দেশে চাহিদার বড় অংশ পূরণের পর বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে আবার ফিরে আসা নীল চাষ এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছে হতদরিদ্র মঞ্জুরানী, বিমলা, কৃষ্ণা, মিথিলা, রাখাল, তৈমুর, মেহেদী, আরজু বা বুলু মিয়ার মতো লোকদের। এ মানুষই আগে জুলাই-আগস্টে মঙ্গার প্রস্তুতি নিতেন কষ্টজাগানিয়া রাত পোহানোর জন্য। আর সে সময়ের কষ্টের রাত পোহানোর পর এখন এ এলাকার মানুষগুলো ব্যস্ত নিজেদের নীল উৎপাদন প্রক্রিয়া চালানোর কাজে।
 
তাদের মধ্যে কেউ নীলগাছ চাষ করছেন কেউ পাতা সংগ্রহ করছেন আবার কেউ ব্যস্ত সে পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণে। লাভ শুধু নীল উৎপাদন করেই নয় কেন্দ্র থেকে যে নাইট্রোজেন ভরপুর বর্জ্য বেরিয়ে আসছে তা আবার ড্রামে ড্রামে চলে যাচ্ছে ফসলের মাঠে সোনালি ফসলের বাহারি ফলনের জন্য। কৃষক তা ব্যবহার করছে ইউরিয়া সারের বিকল্প পরিবেশবান্ধব জৈবসার হিসেবে। জমির মালিকেরা খুশি, চাষি খুশি, খুশি সবাই। খুশি নিজেদের তৈরি রঙ দিয়ে কাপড় রাঙানোয় যারা ব্যস্ত তারাও। রঙিন সে কাপড় চলে যাচ্ছে দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে বহুমাত্রিক কাজের জন্য। তৈরি হচ্ছে কাঁথা, শাল ও স্কার্ফ। ইতিহাসের কী অপূর্ব পরিহাস এবং তার উল্লেখযোগ্য পুনরাবৃত্তি। যে নীল একদিন তাদের পেটের ভাত কেড়ে নিয়েছিল আজ সে নীল ফিরে এসেছে মঙ্গা তাড়িয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ সুখের নহর বইয়ে দিতে।
 
নীলে বহুমাত্রিক ব্যবহার : নীল সাধারণত সব ধরনের সুতি উলেন সিল্ক টাইপের জামা কাপড়ের রঙ উজ্জ্বল ঝকঝকে চকচকে করার জন্য ব্যবহার করা হয়। একজোড়া জামাকাপড় নীল দিতে ৩ থেকে ৭ গ্রাম নীলের প্রয়োজন হয়। সাধারণ হিসাবে জানা যায়, বছরে ২ মিলিয়ন কিলোগ্রাম নীল উৎপাদিত হয়। দেশের যে কোনো অনাবাদি পতিত জমিতে অনায়াসে নীল চাষ করা যায়। দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনাবাদি পতিত অনুর্বর জমি পরিকল্পিতভাবে নীল চাষের আওতায় আনতে পারলে অভাবনীয় সফলতা আসতে পারে ঐতিহাসিক এ নীল চাষে আমাদের কৃষির বিশেষ সমৃদ্ধিতে। নীলের ব্যবহার শুধু নীল হিসেবেই নয়। নীলগাছ উৎকৃষ্ট জ্বালানি এবং জৈবসার। তাছাড়া নীল দেয়া জামা কাপড় পরলে বাতাসে ভাসমান বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া থেকে শরীরমুক্ত রাখা যায় এবং এলার্জি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। নীল চাষে পতিত অনাবাদি অনুর্বর জমি অর্থনৈতিক মূল্যে ব্যবহার করা যায়। নতুন ও বিশেষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, উত্তরাঞ্চলের ফসলভিত্তিক সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। নীল তামাকের সুবিকল্প প্রতিযোগিতামূলক ফসল হিসেবে অনায়াসে আবাদ করা যায়। নীল তেল ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়াজনিত সমস্যা থেকে শতভাগ রক্ষ পাওয়া যায়। ১ দিনের শিশু থেকে শতায়ু বছরের বয়স্কদের শরীরে অনায়াসে নীলতেল ব্যবহার করে শরীর ভালো রাখে। ডাইং ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে বেশ আবশ্যকীয় উপকরণ হিসেবে নীল ব্যবহার আবশ্যকীয় অংশ। ইদানীং চুলে কলপ দেয়ার জন্য বেশ আয়েশিভাবে ব্যবহার বাড়ছে নীলের। নীল ব্যবহারে চামড়া ভালো থাকে, শরীরের উজ্জ্বলতা বাড়ে। নীল তেলের খৈল লোসন হিসেবে, সেভিং ফোম হিসেবে ব্যবহার দীর্ঘদিনের। দেহের ব্যথা উপশমে নীল ব্যবহৃত হয়। কেনিয়ার জনগণ নীলের ডাল দিয়ে দাঁত মাজেন দাঁতের রোগ থেকে উপশম পাওয়ার জন্য। কেউ কেউ পোকার আক্রমণ ও সাপের কামড়ে ব্যথায় বিষ কমানোর জন্য নীল ব্যবহার করেন। নীলের ওষুধ শিল্পে ব্যবহার রয়েছে বহুমাত্রিক। নীল গাছে কোনো সার দিতে হয় না। পোকা রোগে আক্রমণ তেমন করে না। বলতে গেলে কোনো যতœআত্তি করতে হয় না। গরু ছাগল হাঁস-মুরগি খায় না নষ্ট করে না। নীলের পরাগ রেণু মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসে শারীরিক গঠনে সহায়তা করে। নীল তামাকের শতভাগ বিকল্প চাষ হতে পারে লাভ, পরিবেশ আর সার্বিকতা চিন্তা করে।
 
নীলগাছের পরিচিতি : নীল (Indigoferra sp.) কে প্রাকৃতিক নীলও বলা হয়। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে নীল সাধারণত মৌসুমি গাছ ৬ মাসের জীবনকাল বিশিষ্ট বৃক্ষ নয় তবে আধা শক্ত গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসে বীজ বপন করলে অক্টোবর নভেম্বরে গাছ মারা যায়। বর্ষায় পাতা ঝরে যায়। ১ থেকে ২ মিটার লম্বা ঝোপালো গাছ হয়। পাতা ওভাল গোল ও সমান্তরালভাবে সন্নিবেশিত। ফুল গোলাপি থেকে বেগুনি রঙের হয়। মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়াতে এটা আচ্ছাদন ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। অনুর্বর জমিতে অনাদরেই বেড়ে ওঠে নীল কষ্টের নীলকণ্ঠ। নীলের অন্তত ৭৫০টি প্রজাতি আছে বিশ্বময়। নীলগাছ উষ্ণ ও অবউষ্ণ অঞ্চলে বেশি জন্মে। তবে বেশি প্রচলিত জাত হলো Indigofera আর এরা Fabaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত উদ্ভিদ। বিভিন্ন রকমের ফুল হয়। তবে লাল রঙের একটু ছায়া থাকে লালচে। তবে কিছু কিছু জাতের ফুল সাদা ও হলুদ রঙের। ফল ও বীজ সরিষার মতো। তবে জাতভেদে বিভিন্ন আকারের হয়। নীল বানানোর জন্য দুটো জাত বেশি উপযোগী। এ দুটো জাত হলো Indigofera tinctoria এবং Indigofera suffruticosa| পৃথিবীর কোনো কোন দেশে নীল তাদের দ্বিতীয় অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিগণিত। নীল বা Indigo কে বলা হয় The color of Kings।
 
বীজ বপন : ফেব্রুয়ারি-মার্চ মূলত বীজ বপনের মূল সময়। অর্থাৎ আমাদের দেশে যখন পাট বপন করে তখনই নীলের বীজ বোনার সময় হয়। এক চাষ দিয়ে বীজ বপন করা হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিনা চাষেই বীজ বপন করা হয়। প্রতি একরে ৪-৫ কেজি আর হেক্টরে ১০-১৫ কেজির বীজের প্রয়োজন হয়। নীলের বীজ অনেকটা সরিষার বীজের মতো। ছিটিয়ে বপন করা হয় অনেকটা ধইঞ্চা বা পাটের বীজে মতো।
 
পাতা কাটা ও প্রক্রিয়জাতকরণ : বীজ বপনের ৯০ দিন পর গাছ যখন একটু বড় হয় তখন প্রথমবার পাতা কাটা হয়। ওপর থেকে ১ দেড় ফুট শাখাসহ পাতা কেটে আনা হয়। এভাবে ১ বার কাটার পর ৬ মাস আয়ুকাল মৌসুমে অন্তত ৪-৫ বার পাতা কাটা যায়। পাতা সংগ্রহের পরও গাছের অবশিষ্ট অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বীজের গাছ থেকে নিয়মিত পাতা সংগ্রহ করা হয় না। প্রথমবার পাতা কাটার পর বীজ গাছকে আলাদা করে যত্নআত্তি করে রাখা হয় বীজ সংগ্রহের জন্য। নীল সংগ্রহ কোনো বিশেষায়িত পদ্ধতি নয়। জমি থেকে গাছের উপরের শাখাসহ নীল পাতা সংগ্রহ করে চৌবাচ্চাতে পরিমাণমতো পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় বা জাগ দেয়া হয়। পানি এ পরিমাণে হবে যেন পাতার উপর ১ ইঞ্চি পানি থাকে। এভাবে ২০ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা জাগে ডুবিয়ে রাখা হয়। এরপর প্রথম চৌবাচ্চা থেকে পাতা ডালপালা ছেকে শুধু নীল পানি দ্বিতীয় চৌবাচ্চােেত নেয়া হয়। পাতা ডালপালা জৈবসার কিংবা জ্বালানি হিসেবে শুকিয়ে নেয়া হয় বা জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় চৌবাচ্চা থেকে ১ ঘণ্টা ঝাঁকানির পর প্রচুর ফেনা সৃষ্টি হয়। বর্তমানে অটোমেটিক পদ্ধতিতে পানি নাড়াচাড়া করা হচ্ছে। এরপর পরিমাণমতো কস্টিক সোডা (গোপন ফরমুলা) মিশিয়ে আবার অনবরত নাড়াচাড়া বা ঝাঁকানো হয়। কতক্ষণ পর পুরো দ্রবণকে মাঝারি আকারের ঝুড়ি নিয়ে তারমধ্যে মোটা মার্কিন কাপড় বিছিয়ে দিয়ে ছাকার জন্য ফেনাযুক্ত ঝাঁকানো দ্রবণ ঢালা হয় এবং ১ দিনের জন্য রেখে দেয়া হয়। এতে মার্কিন কাপড়ে তলানি জমা হয় আর থিতানো পানি আলাদা হয়ে যায়। মার্কিন কাপড়ের এ তলানিই নীল। ছাকা পানি গাছের গোড়ায় দেয়া হয় বা বাথরুম মেঝে পরিষ্কার করতে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। এ পানিতে পা ডুবিয়ে রাখলে পা ফাটা বা পায়ের বিভিন্ন চর্মরোগ সংক্রান্ত সমস্যা দূর হয়। পানি ঝরে যাওয়ার পর মার্কিন কাপড় থেকে ছোট চামচের মাধ্যমে কাঁচিয়ে সংগ্রহ করা হয়। এ সেমিসলিড ভেজা শক্ত অংশ নীল রোদে শুকিয়ে দানাদার নীল তৈরি হয়। প্রথমে রোদে শুকালে নরম কয়লার মতো হয়। ১-২ দিন শুকালেই নীল শক্ত হয়। পরে গ্রাইন্ডিং মেশিনে বা হলারে বা পাটাপুতাতে পিশে গুঁড়া করে প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করা হয়। সাধারণভাবে প্রতি প্যাকেট নীলের দাম আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তবে কৌশল আর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে এ দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, লাভও বেশি হবে। অনেক সময় ছোট ছোট আস্ত টুকরা করে ৫ টাকা করে বিক্রি করা হয়।
 
প্রতিবারে প্রতি শতক জমি থেকে ৩০ থেকে ৩৫ কেজি পাতা সংগ্রহ করা যায়। প্রতি ১ একর জমি থেকে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার কেজি পাতা কাটা যায়। প্রতি কেজি পাতা মূল্য ২ থেকে ৩ টাকা হারে বিক্রি হয়। প্রতি একর থেকে ৫০ হাজার টাকার শুধু নীলপাতা বিক্রি করা যায়। তাছাড়া জ্বালানি এবং জৈবসার তো আছেই। এ পদ্ধতিতে ২০০ থেকে ২৫০ কেজি পাতা থেকে ১ কেজি নীল পাওয়া যায়। ১ কেজি নীল পেতে ১ হাজার টাকা খরচ হয়। বিশ্ববাজারে প্রতি কেজি প্রাকৃতিক নীল প্রায় ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো ১০০ ভাগ বিশুদ্ধ মানসম্মত হতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের সংগ্রহ পদ্ধতিতে প্রায় ১০ ভাগ নীল পাওয়া যায়। এ কারণে অনেক দেশে প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রফতানি করা যাচ্ছে না। নীলের বীজ থেকে নীল তেল তৈরি করা যায়। ১০ মিলিলিটার তেল ৩০ মার্কিন ডলার। ৫ কেজি বীজ থেকে ১ কেজি তেল পাওয়া যায়। বীজের মূল্য ১৫০ টাকা ২০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি। নীল চাষে আর উৎপাদন খরচ নেই বললেই চলে। কেননা এটা অনুর্বর জমিতে আবাদ করা হয় জমি উর্বর করার জন্য। তাই কোনো সার পানি বালাইনাশক দেয়ার দরকার হয় না। শুধু শ্রমিক মজুরি লাগে। সর্বসাকুল্যে ১ একরে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়।
 
ডা. নিখিলের নীল চাষে বর্তমান প্রতিশ্রুত সমৃদ্ধির অগ্রপথিক। একা একাই এগোনোর চেষ্টা করছেন। তাকে যথাযথ সহযোগিতা করতে পারলে আমরা নীল নিয়ে আরো অনেক দূরে এগিয়ে যেতে পারতাম। Mennonite Central Committee (MCC) এ থেকে তিনি নীলে কারিশমা আয়ত্ব করেন।  তিনি মনে করেন নীলে এত বৈশিষ্ট্যের কার্যকারিতার পরেও নীলগাছ দিয়ে জাক দেয়ার পর বাছাই করা ডালপালা থেকে উৎকৃষ্ট মানের কম্পোস্ট সার তৈরি; পাতা সংগ্রহের পর গাছের অবশিষ্টাংশ থেকে কয়েল তৈরি এবং নিজের তৈরি বন্ধু চুলাতে ব্যবহার; ছাকনির সময় ফেলে দেয়া পানি মিনি প্যাকেটজাত করে ক্লিনার লিকুইড হিসেবে বাজারে বিক্রি করা যায়। নীল আমাদের ঐতিহাসিকভাবে নীলকণ্ঠ নীলকষ্ট অনেক কষ্টগাথা কথা। কিন্তু রংপুরের ডা. নিখিল এ কষ্টগাঁথাকে সুখ গাঁথায় পরিণত করার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিছুটা এগোতে পেরেছেনও। তবে এগোনোর অনেক বাকি এখনও। ডা. নিখিল বলেন, সরকার যদি আমাকে পতিত অনাবাদি অনুর্বর জমি দেয় আর আমাকে ৪-৫ কোটি টাকার  ঋণ দেয় তাহলে আমি আমার নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে আধুনিক মেশিন তৈরি করে আরও বেশি পরিমাণে আন্তর্জাতিক মানসম্মত নীল তৈরি করে বিদেশে রফতানি করতে পারব, আত্মকর্মসংস্থানে অনেক বেকার যুবক-যুবতীকে কাজের সংস্থান সৃষ্টি করতে পারব। মাত্র ১ ঘণ্টা পুরো ২ দিনের কাজ করা সম্ভব হবে। সবচেয়ে বড় কথা দেশে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি আরও বেগবান করা যাবে অনায়াসে। যারা বিত্তশালী চিত্তশালী তারা এগিয়ে আসবেন এ সুন্দর কাজে। ডা. নিখিলের মতো আগ্রহী অভিজ্ঞ দক্ষ মানুষগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেরা আয় করবেন আবার দেশের অভাবনীয় সফলতায় শরিক হবেন এটা তো কম কথা নয়। ৫০ হেক্টর জমির বর্তমান নীল চাষকে ৫ লাখ হেক্টর জমিতে রূপান্তর করা কোনো ব্যাপারই না। শুধু প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর তার কার্যকর বাস্তবায়ন। শেষ করার আগে নীল কবিতা দিয়ে কিছু কষ্টগাথা তুলে ধরা হলো এভাবে...
নীলকর বিষধর বিষফোড়া মুখ, অনল শিখায় ফেলে দিল যত সুখ।
অবিচারে কারাগারে পিতার নিধন, নীলক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হলেন পতন।
পতিপুত্র  শোকে মাতা হয়ে পাগলিনী, স্বহস্তে করেন বধ সরলা কামিনী।
আমার বিলাপে মার জ্ঞানের সঞ্চার, একেবারে উথলিল দুঃখ পারাবার।
শোকশূলে মাথা হলো বিষ বিড়ম্বনা, তখনি মলেন মাথা কে শোনে সান্ত¡না।
কোথা পিতা কোথা পিতা ডাকি অনিবার, হাস্যমুখে আলিঙ্গন কর একবার।
জননী জননী বলে চারি দিকে চাই, আনন্দময়ীর মূর্তি দেখিতে না পাই।
মা বলে ডাকিলে মাতা অমনি আসিয়ে, বাছা বলে কাছে লন মুখ মুছাইয়ে।
অপার জননী স্নেহ কে জানে মহিমা, রণে বনে ভীতমনে বলি মা, মা, মা, মা।
সুখাবহ সহোদর জীবনের ভাই, পৃথিবীতে হেন বন্ধু আর দুটি নাই।
নয়ন মেলিয়া দাদা দেখ একবার, বাড়ি আসিয়াছে বিন্দুমাধব তোমার।
আহা! আহা! মরি মরি বুক ফেটে যায়, প্রাণের সরলা মম লুকালো কোথায়।
রূপবতী গুণবতী পতিপরায়ণা, মরালগমনা কান্তা কুরঙ্গনয়না।
সহাস বদনে সতী সুমধুর স্বরে, বেতাল করিতে পাঠ মম করে ধরে।
অমৃত পঠনে মন হতো বিমোহিত, বিজন বিপিনে বনবিহঙ্গ সঙ্গীত।
সরলা সরোজকান্তি কিবা মনোহর, আলো করে ছিল মম দেহ সরোবর।
কে হরিল সরোরূহ হইয়া নির্দয়, শোভাহীন সরোবর অন্ধকারময়।
হেরি সব শবময় শ্মশান সংসার, পিতামাতা ভ্রাতা দারা মরেছে আমার।
 
অনুর্বর ও অনিশ্চিত জমিতে ধান বা তামাক লাগিয়ে যে সামান্য শস্য ও আয় হতো তাই ছিল গরিব চাষিদের বাঁচার উপায়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর প্রশাসন অনেক নীলকর সাহেবকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রদান করে বিদ্রোহী ভারতীয়দের দমন করার জন্য। এ ক্ষমতার ব্যবহার হয় গরিব চাষিদের ওপর, নীলচাষে বাধ্য করত। অর্থনৈতিক ও শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য বাংলার চাষি ও কৃষকরা ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট সেপ্টেম্বর মাস হতে ব্যাপকভাবে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে থাকে। যশোর জেলার চৌগাছার বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে হাজার হাজার চাষি এ বিদ্রোহে অংশ নেয়। ঝিনাইদহ জেলার ষোলোকুপাতেই এখন যার নাম শৈলকুপা ৬ হাজার চাষি নীলকর লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। সারা বাংলায় ব্যাপ্ত এ বিদ্রোহই নীল বিদ্রোহ নামে ইতিহাস খ্যাত। নীলকরদের অত্যাচারের কথা এর আগেই প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে Indigo Commission গঠিত হয়। কিন্তু এ কমিশনের তদন্ত ও ব্যবস্থা সমস্যার সমাধান করতে না পারায় নীল বিদ্রোহ ঘটে। নীল দর্পণে এ অগ্নিগর্ভ সময়ের ঘটনা নাটকীয় ফরমেটে উল্লেখ আছে। পরে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে নীলচুক্তি আইন রদ হয় এবং ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নীল উৎপন্ন আরম্ভ হলে নীল অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এ হলো আমাদের নীল কষ্টের কষ্টগাথা। বর্তমানে ইতিহাসের পরের ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন প্রবাহে আমাদের প্রবৃদ্ধির মহিমায় উদ্ভাসিত। ইতিহাসের এ অধ্যায় ধরে আমরা এগোবো আগামীর সুন্দর আর মহাজাগতিক কল্যাণের দিকে। নীল চাষ সুবাসিত সীমাহীন নীলাকাশের মতো বিশালতায় আমাদের অনেক দূরের নীলাভ প্রশান্তির পরিসীমানায় নিয়ে যাবে। এ নীলাশা করতেই পারি।
 
কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম
* উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫
 
বিস্তারিত
খাদ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বিকল্প প্রযুক্তি
খাদ্যে ভেজাল মেশানোর খবর আর ভেজালবিরোধী অভিযান বাংলাদেশের একটি নৈমিত্তিক খবর। খাদ্য মানুষের জীবনধারণের এবং সুস্থতার জন্য প্রথম মৌলিক উপাদান। আর এ খাদ্যই যখন জীবনকে নানা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয় তখন মানব সভ্যতার সার্বিক অর্জনই বিস্বাদে পরিণত হয় যাকে বিপন্ন মানবতাই বলা যায়। ভেজাল খাদ্যের সর্বব্যাপী বিস্তারে দেশের সর্বস্তরের মানুষই যে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে তা নানা জটিল রোগের প্রাদুর্ভাবই প্রমাণ করে। খাদ্যের ভেজাল প্রতিরোধে সরকার এবং জনসাধারণ যে নানাভাবে তৎপর সেটা অনুধাবন করা যায় নিত্য সভা-সমাবেশ, নতুন নতুন আইন এবং আইন প্রয়োগের নানা অভিযানে। দুঃখের বিষয় এসবের পরও খাদ্যের ভেজাল এবং বিষ প্রয়োগ থেমে নেই। ভেজালকারী চক্র আবিষ্কার ফাঁকি দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাজারজাতের মাধ্যমে ভেজাল পণ্য ভোক্তার আহারের উপকরণ হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে শিকার হচ্ছে নানা দুরারোগ্য রোগের। অন্যদিকে ভেজাল খাদ্যের ওপর মিডিয়ার খবর আর সচেতনতায় মানুষ অবশ্য প্রয়োজনীয় নানা ফলমূল আহার থেকে বিরত থাকছে যা সুস্বাস্থের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। বলা যায়, ভোক্তার একপ্রকার নিরূপায়। শুধু কি ভোক্তারই? ভেজাল এবং খাদ্যে বিষ প্রয়োগকারীদের এসব অমানবিক এবং মুনাফালোভী কর্মকা-কে পুরোপরি ঘৃণা করেই প্রশ্ন রাখছি-এসব ভেজালকারীরাও কি নিরূপায় নয়? একটু চিন্তার অবকাশ আছে মনে করেই আমার অভিক্ততার আলোকে এ প্রশ্ন রেখেই দুকথা বলার ইচ্ছাতেই কলম ধরা।
 
জীবন আর জীবিকার তাগিতেই আমরা সবাই নানা পেশা বা ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে একটু স্বচ্ছলতার মধ্যে সংসারের চাকাটা ঘুড়ায়ে চলার চেষ্টা করছি। সে রকম প্রয়াসেই নিয়োজিত খাদ্য প্রস্ততকারী বা সরবরাহকারী ও বাজারজাতকারী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও। পুঁজি আর শারীরিক পরিশ্রমের বিনিময়ে দুইপয়সা উপার্জনই তাদের উদ্দেশ্য। সমস্যাটা ঘটছে তখনই যখন তারা তাদের পুঁজির নিশ্চয়তা বিধানে ভোক্তার জীবনের, অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের জীবনেরও দুর্ভোগের সৃষ্টি করছে যা তারা অনুধাবনের চেষ্টা করে না বা গুরুত্ব দেয় না। আবারও এসব অমানবিক কর্মকাণ্ডকে কোন প্রকার সমর্থন না করেই তাদের প্রক্রিয়াকে অনুধাবনের চেষ্টা করলে দেখা যায় যে এসব খাদ্য জোগান প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যবসায়ীরা শুধুই চেষ্টা করছে তাদের পণ্যের অপচয় বা পচন রোধ করে মুনাফা ধরে রাখতে। অর্থাৎ রয়েছে প্রযুক্তির চাহিদা। শাকসবজি ফলমূল সরবাহকারী ও বাজারজাতকারী ব্যবসায়ীরা আবিষ্কার করেছেন যে এসব টাটকা পণ্যের আকৃষ্টতা ধরে রেখে সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ালে ভোক্তার মনোরঞ্জন সহজ এবং অধিক মুনাফাও সম্ভব যদিও তাদের অসাধু প্রক্রিয়ার দ্বারা সুষম খাদ্যগুলো বিষময় খাদ্যে পরিণত হচ্ছে যা প্রকারন্তরে মরণঘাতী রোগের কারণ দাঁড়াচ্ছে।
 
বর্তমান অবস্থায় খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের এক কথায় সমাধান হচ্ছে ভেজালকারীরা যেসব কারণে প্রাণঘাতী রাসায়নিক ব্যবহারের আশ্রয় নিচ্ছে সেসবের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত কোন পদ্ধতি থাকলে তা ব্যবহার করে খাদ্যের পচন রোধ করা এবং দীর্ঘায়িত সংরক্ষণের সুব্যবস্থা করা। সমাধান এক কথার হলেও এর প্রয়োগ কিন্ত এক-দুই এর ব্যাপার নয় তবে অসম্ভবও নয় আবার সুদূরপ্রসারীও নয়। শুধু প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার সাথে সাথে কার্যকরী পদক্ষেপ।
 
বিশ্বজুড়ে এসব খাদ্যের বাজারজাতকরণে স্বাস্থ্যসম্মত টেকসই নানাবিধ পদ্ধতির চর্চা হচ্ছে যা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োগিক গবেষণার দ্বারা স্বল্পতম সময়ে প্রচলন সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তি এবং কারিগরি ব্যবস্থাপনার দ্বারা ভেজালকারীদের চাহিদা মোতাবেক এসব টাটকা ফলমূল স্বাস্থ্যসম্মতভাবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সহজলভ্য এবং সহজপ্রাপ্যই বলা যায়। এখানে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ব্যাপার হলো যে টাটকা খাদ্য বাজারজাতকারী ব্যবসায়ীদের সেসব আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ এবং প্রয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান। একাজটি জরুরিভিত্তিতে যথাশিগগির সম্ভব কার্যকর করতে হবে। এ কাজে প্রয়োজনীয় খরচের চাহিদা মেটানো কষ্টকর হলেও এর ব্যর্থতার মাশুল দাঁড়াবে বহুগুণ। আর তার ভুক্তভোগী হবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। বিপর্যয় নেমে আসবে চিকিৎসা ব্যবস্থায় যার পরিণতিতে দেখা  দেবে পারিবারিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ও।
 
সরকারের নানা অভিযানের পরও বাজারে ক্রমবর্ধমান ভেজাল খাদ্যের উপস্থিতিতে একথা বলা যায় যে, সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না, যার কারণ হতে পারে পদ্ধতিগত ক্রটি। যেমন ভেজালবিরোধী অভিযানের শুরুতেই ঢাকার আড়ৎ এবং ঢাকা আমশূন্য, ক্রেতারা আম কিনছে দ্বিগুণ দামে। অভিযানের ফলাফল দাঁড়াল-খাদ্যহীন বাজার, কর্মহীন আড়ৎ ও খাদ্য সরবরাহকারী অগণিত শ্রমিক, উৎপাদন মূল্যবঞ্চিত কৃষক এবং পরিশেষে বিনষ্ট উৎপাদিত খাদ্য যা কিনা অপচয়। কার্যকরী ভেজালবিরোধী তাৎপরতার জন্য ভেজালের উৎপত্তিস্থলকেই নির্মূল করতে হবে বা উৎপত্তিস্থলেই এর ব্যবস্থা নিতে হবে নতুবা এর স্থায়ী সমাধান আসবে না এটা বোধকরি সংশ্লিষ্ট সব মহলই জানেন। ভেজালবিরোধী অভিযান দ্বারা জরিমানা এবং উৎপাদিত খাদ্য ধ্বংস করে প্রকৃত অপরাধীর বদলে অনেক ক্ষেত্রে পুঁজি হারাচ্ছে ছোট খুচরা ব্যবসায়ীরা আর খাদ্যস্বল্পতার দেশে ধ্বংস করা হচ্ছে অনেক মূল্যবান খাদ্য। টেকসই সমাধান শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প প্রক্রিয়ার প্রচলনের দ্বারাই সম্ভব এসব টাটকা খাদ্যের পচনরোধ করে দীর্ঘ সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। যথাযথ ব্যবস্থার দ্বারাই কেবল সামগ্রিক সমাধানে দেয়া যেতে পারে যা একদিকে যেমন কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাত নিশ্চিত করবে তেমনি ব্যবসায়ী মহলও পুঁজির নিশ্চয়তা নিয়ে ব্যবসা চালাতে পারবে সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তারাও ভেজালমুক্ত খাদ্যগ্রহণে তৃপ্তি নিয়ে সুস্বাস্থের অধিকারী হতে পারবে। আর কালক্ষেপণ নয়। আমার দৃষ্টিতে কিছু সরকারি উদ্যোগই কেবল স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে যা নিম্নরূপ পদক্ষেপের দ্বারা বাস্তবায়ন সম্ভব-
 
১. বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্যসম্মত উপায়েই টাটকা শাকসবজি বা ফলমূল পচনরোধের যেমন নানা প্রযুক্তির প্রচলন আছে তেমনি টাটকা অবস্থায় সেসবের দীর্ঘ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও আছে। একইভাবে আছে ফলমূল কৃত্রিম উপায়ে পাকানোর সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা। কৃষক চাইলে একই জাতের গাছে আগাম এবং স্বাভাবিক মৌসুমের ফল সংগ্রহ করতে পারে স্বাস্থ্যসম্মতভাবেই।
 
২. প্রচলিত উন্নত প্রযুক্তির স্বল্পতম সময়ে বাংলাদেশে প্রয়োগিক গবেষণা করে কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের মাঝে সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করলেই ভেজালরোধ করা সহজতর হবে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে খাদ্যের মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি হবে বটে কিন্তু তাতে টাটকা পণ্যের খাদ্যমান বজায় থাকবে যা সুস্বাস্থের  জন্য সহায়ক হবে সঙ্গে সঙ্গে মরণব্যাধির প্রকোপ কমবে যা সর্বস্তরের মানুষের চিকিৎসা খরচ কমাবে।
 
৩. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বেরকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক টাটকা পণ্যের উপযোগী উন্নত প্রযুক্তি ও স্থাপনা নির্মাণ করে দেশেবিদেশে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি উৎপাদনকারী এলাকায় চাষি সমিতি গঠন করে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে টাটকা পণ্যের বাজারজাতকরণের পদ্ধতি চালু করতে হবে। স্বাস্থসম্মত ও ভেজালবিহীন খাদ্য সরবরাহে ব্রতী চাষিরাই কেবল সমিতির সদস্যপদ সংরক্ষণ করতে পারবে।
 
৪. ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিটি এলাকায় পণ্য ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে সমিতির নিবন্ধিত চাষিদের কাছ  থেকে টাটকা পণ্য ক্রয় করে স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করবে। এজন্য প্রতিটি ক্রয় কেন্দ্রে সংগ্রহোত্তর উন্নত পরিচর্যা ও প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এতে খাদ্যের ভেজাল যেমন রোধ করা যাবে তেমনি অপচয়ও অনেকাংশে কমানো সম্ভব কেননা ক্রয় কেন্দ্রে প্যাকিং করা পণ্য পাইকারি বাজার হয়ে একই প্যাকেট বা ঝুঁড়িতে খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাবে।
 
৫. পাইকারি বাজারগুলোকে উন্নয়নের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গড়ে তুলতে হবে যেখানে টাটকা পণ্যের উন্নত সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। এ জাতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দ্বারা টাটকা পণ্যের সুষ্ঠু স্বাস্থ্যসম্মত বাজারজাতকরণ যেমন সম্ভব তেমনি সৃষ্টি করবে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এবং বৃদ্ধি করবে সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদনও। সঙ্গে সঙ্গে ভেজালমুক্ত পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণে উন্নত স্বাস্থ্য গঠনের মাধ্যমে একদিকে জাতীয় কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে অপরদিকে কমে যাবে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক ভোগান্তিও।
 
ড. আনোয়ারুল ইসলাম বক্ সী*
* কৃষি গবেষক, সিডনি ইউনিভার্সিটি, গ্রাম-কৃষ্ণপুর (বকসীপাড়া), পো:+ জেলা: কুড়িগ্রাম
বিস্তারিত
পরিবর্তনশীল কৃষির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার
একবিংশ শতাব্দীতে মানবজাতি যখন সভ্যতার চরম শিখরে ঠিক তখনই জলবায়ু পরিবর্তনের করাল গ্রাস বিশ্বের অস্তিত্বকে আজ প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বৈরী জলবায়ুর প্রভাব মানবসভ্যতার জন্য আজ সবচেয়ে বড় হুমকি। Bagnladesh Institute of International and Strategic Studies (BIISS) এর মধ্যে ‘Climate change is predicated to have an overall negative impact on long term security and conflict dynamics, acting as a threat multiplier that increases the volatility of existing causes of confilict and many generate new insecurities.  জলবায়ু এ পরিবর্তনে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকায় খরার প্রকোপ বাড়বে। শুধু তাই নয়, সুন্দরবনও সাংঘাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিতে আগামী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ সমুদ্রে তলিয়ে যাবে। বর্তমানে গরমকালে প্রচন্ড তাপদাহ, আবার শীতের প্রকোপ এবং শীতকালে শীতের তীব্রতা এবং কোনো কোনো সময় অনাকাক্ষিত গরম পড়া, শীতকালে মুষলধারে বৃষ্টি পড়া, বৃষ্টির দিনে কম বৃষ্টি, অকাল বন্যা, বন্যার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান, শিলাবৃষ্টি এ দেশের আবহমান আবহাওয়ার পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। পঞ্চগড়ে ১০-১২ বছর ধরে অস্বাভাবিক শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ধানে পোকার আক্রমণ বেড়েছে। শ্রীমঙ্গল এলাকায় বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ায় রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অতীতে এ দেশে প্রায় আট হাজার প্রজাতির ধান উৎপাদিত হতো। এখন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে এসব জাত। আগামী ৫০ বছরে ধানের উৎপাদন এক-দশমাংশ কমার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এভাবে বিলুপ্ত হতে পারে আলুর বিভিন্ন প্রজাতির এক-চতুর্থাংশ। এছাড়া ২০ শতাংশের বেশি মাছের প্রজাতির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে ১৭টি নদী। বিশ্ব জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকি-২০০৬ এর মূল্যায়নে যে ১০টি দেশকে সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বাংলাদেশ সে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে এবং হন্ডুরাস রয়েছে প্রথম স্থানে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আইনুন নিশাতের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণগুলো হলো- বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়া, সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়া, সঠিক সময়ে শীত শুরু না হওয়া, শীতের প্রকোপ কমে যাওয়া, শীতকালের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়া, প্রতিবছর তাপমাত্রা অল্প করে বৃদ্ধি পাওয়া, আগাম পানি আসা, পানির চাপ বাড়া।
 
২০৩০ সালে বাংলাদেশের জলবায়ুর অবস্থা দাঁড়াবে গরমকালে তাপমাত্রা ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমবে। গরমকালে বৃষ্টিপাত বাড়বে শতকরা ১১ ভাগ কিন্তু শীতকালে কমবে শতকরা ৩ ভাগ। গরমকালে বাষ্পীভবন বাড়বে শতকরা ১৮.৮ ভাগ এবং শীতকালে বাড়বে শতকরা ০.৯ ভাগ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং হুমকির মুখে রয়েছে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে বীজ গজানো, পরাগায়ন, ফুল ও ফল ধরা, পরিপক্বতা হতে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও সূর্যালোক প্রয়োজন। জলবায়ুর এ উপাদানগুলো পরিবর্ধিত হয়েছে কিন্তু বীজ বপন ও চারা রোপণের সময় পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। ফলে কৃষি মৌসুমের সাথে ফসল চাষাবাদ খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। গড় তাপমাত্রা বাড়ার কারণে গম, ছোলা, মসুর, মুগডালসহ কিছু কিছু ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষকরাও এসব চাষে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। গমের বীজ গজানোর তাপমাত্রা হলো ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর কম বেশি হলে বীজ গজাবে না। বাংলাদেশের পরিবেশের ওপর প্রকাশিত টাস্কফোর্স রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০৫০ সাল পর্যন্ত এক মিটার বাড়তে পারে। এর প্রভাবে তিন হাজার মিলিয়ন হেক্টর উর্বর জমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাবে, ২০০ মিলিয়ন টন ধান, গম, আখ, পাট, মটরসহ রবিশস্য উৎপাদন কমে যাবে।
 
বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা প্রকৃতিনির্ভর। ৭০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশে মোট উৎপাদনের প্রায় ২৪% আসে কৃষি থেকে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ৪%। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো সবুজ বিপ্লবের ফলে তথা নানারকম ফসলের জাত উন্নয়নে গত ৫০ বছরে দানাশস্যের ফলন বেড়েছে কয়েকগুণ। উচ্চফলনশীল ধান ও গমের জাতের সূচনার ফলে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। প্রযুক্তি প্রয়োগে কৃষির অন্যান্য শাখা তথা পোল্ট্রি, গবাদিপশু ও মৎস্য চাষেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
 
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় উন্নয়নে কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠিত ক্ষেত্র। বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতিতে পরিবেশবান্ধব টেকসই প্রযুক্তি উন্নয়নে কৃষি গবেষণা কার্যক্রমকে জোরদার করার ওপর যথার্থ গুরুত্বারোপ করেছেন, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।
 
কৃষি গবেষণায় উদ্ভাবিত নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে প্রান্তিক চাষিদের কাছে পৌঁছানোর ওপর কৃষি উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। আমাদের দেশের গবেষণাগারে উদ্ভাবিত কৃষি প্রযুক্তির অধিকাংশই কৃষকের মাঠে প্রয়োগের আগে বা অব্যবহিত পরই জীবনকাল হারায়। উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তিকে প্রকৃত ব্যবহার করতে হবে। কৃষকের খামারে। মাঠে দ্রুত পৌঁছাতে বর্তমান কৃষি সম্প্রসারণ কৌশল এবং মোবাইল ফোন সংযোজনের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক্স এগ্রিকালচার তথা ই-কৃষির প্রচলন প্রয়োজন।
 
 কৃষি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। আর কৃষির উন্নয়ন বহুলাংশে নির্ভর করে তথ্য ও প্রযুক্তির সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহারের ওপর। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়ন তো বটেই, পরিবর্তনশীল কৃষি উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বিশ্ব এখন তথ্য প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
 
বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন কৃষিজ প্রতিষ্ঠান তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।
 
কৃষি মন্ত্রণালয়
ভিশন : ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে উৎপাদনমুখী, লাভজনক ও টেকসই ফসল খাত গড়ে তোলা।

মিশন : খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও লাভজনক কৃষি খাত গড়ে তোলার লক্ষ্যে যথাযথ প্রযুক্তি উদ্ভাবন, হস্তান্তর এবং উপকরণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসল খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি করে একটি দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
 
ওয়েবসাইট : www.moa.gov.bd
 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর : খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের দোরগোড়ায় কারিগরি পরামর্শ, প্রযুক্তি সেবা এবং কৃষি উৎপাদনে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজলভ্য করে তোলার জন্য তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর নিম্নোক্ত সেবা প্রদান করছে-
 
ওয়েবভিত্তিক ফসল উৎপাদন ডাটাবেইজ : এতে ব্লকে পর্যায়ে সাধারণ কৃষিবিষয়ক পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষক ডাটাবেইজ : চাষি পর্যায়ের পরিসংখ্যানসহ অন্যান কৃষি সংক্রান্ত অনলাইন তথ্য সেবা প্রদানের জন্য Farmer’s Database উন্নয়নের কাজ চলছে।
 
এ ছাড়াও www.moa.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে কৃষি সংক্রান্ত নীতিমালা, কর্মকৌশল, ফসলের উৎপাদন পদ্ধতি, ফসল পরিসংখ্যান বিষয়ক তথ্য, মাটি ও ফসল সুরক্ষাবিষয়ক কারিগরি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
 
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন
বিএডিসি প্রবর্তিত 3D-DAM বা Dimentional Digital Elevetion Model বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত প্রথম ডিজিটাল ম্যাপের মাধ্যমে যেকোন স্থানের ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। এর মাধ্যমে Critical ও Perfect শ্যালোটিউবওয়েল জোন ও ডিপটিউবওয়েল জোনে বিভক্ত করা হয়েছে।
 
বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা কাউন্সিল
BARC’র দায়িত্ব হচ্ছে জাতীয় প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ রেখে কৃষি গবেষণা কাঠামোভূক্ত ইনস্টিটিউট এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে কৃষি বিষয়ক বিজ্ঞানে গবেষণা, পরিচালনা, সমন্বয়, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন করা।
 
www.moa.gov.bd নামক Interactive website চালু করেছে। কৃষি খাতে তথ্য প্রযুক্তি কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বার্ক ইতোমধ্যেই নিম্নোক্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে-চালু করেছে। কৃষি খাতে তথ্য প্রযুক্তি কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বার্ক ইতোমধ্যেই নিম্নোক্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে:

Land Resource Inventory (LRI) Database

Land Type

Crop Suitability

Climatic

Map Products

Agro Ecological

General Soil

Flood Prone Area

Early Monsoon

Late Monsoon

Drought

Agro-ecological-Constrained

 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট
বারি দেশের সর্ববৃহৎ বহুবিদ ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকার (প্রায় ১০৩টি) ফসলের ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়াও বারি এসব ফসলের উদ্ভাবিত জাতগুলোর উৎপাদন প্রযুক্তি, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন, মৃত্তিকা এবং পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করছে। ব্রির ইতোমধ্যেই ৩১৬টি নতুন জাতসহ ২৯৩টি অন্যান্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বারির Interactive website www.moa.gov.bd থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ফসল উৎপাদন প্রযুক্তিসহ কৃষি ক্ষেত্রে উদ্ভাবিত নিত্যনতুন প্রযুক্তি সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়াও এ সাইটটিতে বিভিন্ন কৃষি সমস্যার প্রশ্নের বিপরীতে সমাধানের পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে।
 
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট
দেশের প্রধান খাদ্য ও শস্য হচ্ছে ধান। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ব্রি খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য ধানের জাত ও প্রযুক্তিগত তথ্যের সহজলভ্যতার জন্য ব্রির Interactive website www.knowledgebank.brri.org চালু, আধুনিক ধান উৎপাদনে কলাকৌশলের ব্যবহারিক তথ্য সম্বলিত Rice Knowledge Bank বিষয়ক ওয়েবসাইটি তৈরি তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষির উন্নয়নে ব্রির অবদান রয়েছে।
 
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট
SRDI’র Online Fertilizer Recommendation System তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকের কাছে মাটির উর্বরাভিত্তিক ফসলের চাহিদানুযায়ী সার প্রদানবিষয়ক একটি অত্যাধুনিক সফটওয়্যার তৈরি করেছে। SRDI উদ্ভাবিত Soil & Land Resource Information System (SOCARIS) সফটওয়্যারটির মাধ্যমে মৃত্তিকার ভৌত ও রাসায়নিক তথ্য ভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন প্রকার মানচিত্র প্রণয়ন করছে। SRDI তার শক্তিশালী www.srdi.gov.bd সাইটের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
 
বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট
বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট তার কার্যকর ওয়েবসাইট www.bsri.gov.bd এর মাধ্যমে চিনি, গুড় ও সিরাপ উৎপাদন উপযোগী শর্করা সমৃদ্ধ ফসল বা গাছের উৎপাদন প্রযুক্তি; আখ ও চিনি উৎপাদনে উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি প্রদর্শন ও ইক্ষুভিত্তিক খামার তৈরির ওপর কলাকৌশল প্রদর্শন, শর্করা সমৃদ্ধ অন্যান্য ফসল বা গাছের ব্যবহারের কলাকৌশল সম্পর্কে ধারণা প্রদান, ইক্ষুর জাত সম্পর্কিত জার্মপ্লাজমে ব্যাংকের তথ্য ও ছবি, গবেষণালব্ধ ফলাফল ও সুপারিশের ভিত্তিতে সাময়িকী ও প্রতিবেদন প্রকাশ, সরকারের ইক্ষু নীতিবিষয়ক তথ্য কৃষি উন্নয়ন তথা দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে।
 
বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট
সোনালী আঁশের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে bjri গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম ও তার দলের পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন বাংলাদেশের মান অনেকখানি বাড়িয়েছে বৈকি। BJRI তার www.bjri.gov.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে রিবনরেটিং সম্পর্কিত ধারণা ও ছবি, সংগৃহীত পাটের বাজার দর, বিভিন্ন পাট পণ্যের তালিকা ও ছবি প্রদর্শন করে পাট চাষি ও বিজ্ঞানীদের কর্মকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করছে।
 
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে মাধ্যমে বংশগতির ধারায় চিরস্থায়ী পরিবর্তন এনে অধিক ফলনশীল ও উন্নত গুণাবলিসম্পন্ন। ফসলের জাত উদ্ভাবন, মাটির ভৌত, জৈবিক ও রাসায়নিক পদ্ধতি নিরূপণ, রোগ ও পোকা দমনের পদ্ধতি নির্ণয়, সুষ্ঠু সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন, নতুন জাতগুলোর কৃষিতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ আর্থসামাজিক গবেষণা কৃষকের মাঝে উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তর করছে। বিনা  www.bina.gov.bd সাইটের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
 
কৃষি তথ্য সার্ভিস
ভিশন : কৃষি প্রযুক্তি বিস্তারের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কার্যকর যোগাযোগ কৌশলের উন্নয়ন।

মিশন : কৃষি প্রযুক্তি কৃষকদের মাঝে পৌঁছে দেয়া এবং জীবন ও জীবিকা উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যকর তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সময়োপযোগী আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে যুগোপযোগী ও লাগসই কৃষি তথ্যে অবিরত প্রবাহের জন্য এআইএসের যুগান্তকারী

পদক্ষেপগুলো হচ্ছে:
প্রিন্ট মিডিয়া : কৃষিকথা, সম্প্রসারণ বার্তা, কৃষি ডায়রি, টেলিফোন নির্দেশিকা, পোস্টার, লিফলেট, বুকলেট, ফোল্ডার, স্টিকার, ফেস্টুন, ব্যানার ইত্যাদি।
 
ইলেকট্রনিক মিডিয়া : বেতার কার্যক্রম, টেলিভিশন কার্যক্রম, ডকুড্রামা/ফিলার, মোবাইল সিনেমা ভ্যান।

আইসিটি কার্যক্রম :
♦ কৃষি তথ্য যোগাযোগ কেন্দ্র (AICC)
♦ কৃষি আলাপনি (SMS/MMS)
♦ কমিউনিটি রেডিও
♦ প্রমোশনাল টিভি
♦ ভিডিও কনফারেন্সিং
♦ ইন্টার এ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স (IVR)
♦ দেশের সর্ববৃহৎ কৃষি তথ্যভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল ও সার্ভার www.ais.gov.bd ওয়েবসাইট প্রবর্তন।

ধান চাষে সমস্যার সমাধান দেবে অ্যাপ
ধানচাষির ফলন ও আয় বাড়াতে ‘রাইস ক্রপ ম্যানেজার’ (আরসিএম) নামে একটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা হয়েছে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে অ্যাপ্লিকেশনটি (সংক্ষেপে অ্যাপ) ব্যবহার করে ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা পাওয়া যাবে। webapps.irri.org/bd/rcm এছাড়া ধান চাষে নানা সমস্যার সমাধান মাত্র কয়েক সেকেন্ডে পাওয়া যাবে এই অ্যাপ ব্যবহার করে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) ও আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইআরআরআই) যৌথ উদ্যোগে অ্যাপটি তৈরি করেছে।
 
বিআরআরআইয়ের মহাপরিচালক জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস জানান, ইতঃপূর্বে ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত আধুনিক ধানের চাষ বইটিতে উচ্চফলনশীল ধানের জাত পরিচিতিসহ উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতির যে বিবরণ ও পরামর্শ দেয়া হয়েছে, তাই ডিজিটাল পদ্ধতিতে সারা দেশে দ্রুত কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে  দিতে আরসিএম অ্যাপ ব্যবহার করে জমির উর্বরতা শক্তির মাত্রা অনুযায়ী কখন ও কতটুকু সার দিতে হবে, প্রত্যাশিত ফলনের জন্য চারার বয়স কত হবে, বীজ বপন ও চারা রোপণের কৌশল ও পদ্ধতি কী হবে, আগাছা ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের জন্য কখন কী করতে হবে-ধান চাষের এসব জরুরি পরিচর্যার বিষয়ে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার জন্য www.krishimarket.com নামে অনলাইন কৃষি বাজার চালু করেছে।
 
আশার কথা এই যে, কৃষি উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কাজে লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম শাহ্ তার নিজ গ্রাম নওগাঁর মান্দা উপজেলার কালিগ্রামে ২০০৮ সালে www.krishilibrary.com নামক ওয়েবসাইট ও কৃষকদের জন্য গ্রন্থাগার চালু করেছেন, এ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কৃষক তার প্রয়োজনীয় যে কোন ধরনের তথ্য পাচ্ছেন।
 
পরিবর্তনশীল কৃষি উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারে বাংলাদেশের কৃষি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। তবে এর সুফল কৃষকপর্যায়ে নিবিড়ভাবে অদ্যাবধি পোঁছায়নি। এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে কাজ করতে হবে নিজেদেরই স্বার্থে, ভবিষ্যতের প্রশ্নেও উন্নয়নের স্বার্থেই। এ লক্ষ্যে সবাইকে কোমর বেঁধে কাজ করতে হবে।
 
মোহা. আব্দুল মানিক*
* ব্যবস্থাপক, সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বারপুর, ডাক ও জেলা- বগুড়া

 

বিস্তারিত
পান বরজে ব্যবহৃত উপকরণের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি
পান বাংলাদেশের একটি অর্থকরী ফসল। পান সাধারণত বরজ তৈরি করে সেখানে চাষ করা হয়। পান বরজে বাঁশের শলা, খুঁটি, কাইম ও ছন ব্যবহারের প্রয়োজন। এসব জিনিস যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। ঝরে অথবা বাতাসে ভেঙে পড়ে। এতে পানের অনেক ক্ষতি হয়। পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ বেড়ে যায়। তাছাড়া ভেঙে গেলে পানের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। রাসায়নিক সংরক্ষণী প্রয়োগে পান বরজে ব্যবহৃত বাঁশের শলা বা কাঠি, খুঁটি, কাইম, ছন ও অন্যান্য উদ্ভিদজাত সামগ্রীর আয়ুষ্কাল ৪-৫ গুণ বৃদ্ধি করা যায়।
 
সংরক্ষণের পদ্ধতি
তুঁতে (কপার সালফেট), সোডিয়াম ডাইক্রোমেট ও বোরিক এসিডের সংরক্ষণী দ্রবণ সংক্ষেপে সিসিবি দ্রবণে চুবিয়ে কাঠি, ছন ইত্যাদিতে সংরক্ষণী প্রয়োগ করতে হবে। বাঁশের খুঁটি সংরক্ষণের জন্য খুঁটির ভেতরের রস অপসারণ বা স্যাপ ডিসপ্লেসমেন্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।                                                                                                                                    

সংরক্ষণী প্রয়োগ করার আগে করণীয়
-নির্দিষ্ট মাপের বাঁশের শলা তৈরি করে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
-লক্ষ রাখতে হবে, শলার গায়ে যেন কাদা বা মাটি লেগে না থাকে।
-শলাগুলো ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে।
 একইভাবে ৪-৫ ফুট মাপের বাঁশের খুঁটিও তৈরি করে শুকিয়ে নিতে হবে। সংরক্ষণী প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ-
-রাসায়নিক সংমিশ্রণের দ্রবণ।  রাসায়নিক দ্রবণে শলা, কাঠ এবং বাঁশ চুবানোর জন্য একটি ট্যাংক।
-শলা ও খুঁটির মাপের চেয়ে একটু বড় আকারের একটি ট্যাংক (৩x৪) ইঞ্চি তৈরি করতে হবে। সাধারণত এসব কাজ করতে ১০x২x২ আকারের ট্যাংক করা উত্তম।
-ট্যাংকটি পাকা হতে পারে অথবা টিন (প্লেইন শিট) বা কাটা ড্রাম (হাফ ড্রাম) দিয়ে তৈরি করা যাবে। এছাড়া সাময়িকভাবে মাটিতে গর্ত করেও ট্যাংক তৈরি করা যেতে পারে।      
-শুকানো বাঁশের শলা, কাইম বা ৪-৫ ফুট লম্বা বাঁশের খুঁটি ট্যাংকে শুইয়ে দিতে হবে।
-ট্যাংকে সংরক্ষণী দ্রবণ এমনভাবে ঢালতে হবে যেন মিশ্রণের পরিমাণ সংরক্ষণী সামগ্রীর অন্তত তিন ইঞ্চি ওপরে থাকে।

রাসায়নিক মিশ্রণ প্রস্তুত প্রণালি
মাটি, কাদা, বৃষ্টি ও উন্মুক্ত স্থানে ব্যবহৃত সামগ্রীর জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষণী দ্রবণ প্রস্তুতের জন্য রাসায়নিক দ্রব্যসামগ্রীর নাম ও অনুপাত নিচে দেয়া হলো-
রাসায়নিক দ্রব্যের নাম        অনুপাত
কপার সালফেট (তুঁতে)        ২ ভাগ
সোডিয়াম ডাইক্রোমেট        ২ ভাগ
বোরিক এসিড                ১ ভাগ
বাঁশের শলা, কাইম, কাঠি ও ৪-৫ ফুট লম্বা বাঁশের খুঁটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন ১০% ঘনত্বের দ্রবণ। ১০% ঘনত্বের ১০০ লিটার দ্রবণ  তৈরি করতে লাগবে।
রাসায়নিক দ্রব্যের নাম         অনুপাত
কপার সালফেট (তুঁতে)        ৪ কেজি
সোডিয়াম ডাইক্রোমেট         ৪ কেজি
বোরিক এসিড                 ২ কেজি
পানি                           ৯০ লিটার

বাঁশের খুঁটি সংরক্ষণ পদ্ধতি
৮-১০ ফুট লম্বা খুঁটি সহজেই রস অপসারণ বা স্যাপ ডিসপ্লেসমেন্ট পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায়। এজন্য দরকার শতকরা ২০ ভাগ ঘনত্বের সিসিবি দ্রবণ। ২০ ভাগ ঘনত্বের লিটার সংরক্ষণী দ্রবণ প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজন হবে।
 
কপার সালফেট (তুঁতে)    ৮ কেজি
সোডিয়াম ডাইক্রোমেট     ৮ কেজি
বোরিক এসিড             ৪ কেজি
পানি                      ৮০ লিটার     
খুঁটি সংরক্ষণের জন্য সদ্যকাটা বাঁশের কঞ্চিগুলো ছেটে ৮-১০ ফুট লম্বা বাঁশের টুকরা করতে হবে। তারপর একটি ড্রামে সংরক্ষণী দ্রবণে খুঁটিগুলোর এক প্রান্ত ডুবিয়ে দিতে হবে। ড্রামে সংরক্ষণীর গভীরতা কমপক্ষে দুই ফুট থাকতে হবে। সংরক্ষণ প্রক্রিয়া চলাকালীন দ্রবণের উচ্চতা ২ ফুট রাখর জন্য প্রয়োজনে নতুন দ্রবণ ঢালতে হবে। এভাবে ৩-৪ দিন রাখুন। ৩-৪ দিন পর খুঁটিগুলোর অপর প্রান্ত একই দ্রবণে ডুবিয়ে আবার ৩-৪ দিন রাখতে হবে। তারপর দ্রবণ থেকে উঠিয়ে ২-৩ দিন ছায়ায় শুকিয়ে নিতে হবে।

ছন, ধানের খড় সংরক্ষণ পদ্ধতি
ছন, ধানের খড়, পাট-খড়ি চুবানো পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায়। এজন্য প্রয়োজন শতকরা আড়াই ভাগ (২.৫%) ঘনত্বের দ্রবণ। শতকরা আড়াই ভাগ ঘনত্বের ১০০ লিটার দ্রবণ প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজন-
কপার সালফেট (তুঁতে)        ১ কেজি
সোডিয়াম ডাইক্রোমেট        ১ কেজি
বোরিক এসিড            ৫০০ গ্রাম
পানি                ৯৭.৫ লিটার
ছন, ধানের খড়, পাট-খড়ি ৬ ঘণ্টা দ্রবণে চুবিয়ে নিতে হবে। তারপর দ্রবণ থেকে উঠিয়ে দ্রবণ ঝরানোর পর ২-৩ দিন ছায়ায় শুকিয়ে ব্যবহার করতে হবে।
 
-সংরক্ষিত শলা ব্যবহারে প্রথম বছরে পান গাছের বায়বীয় মূল শলার গায়ে একটু কম ধরে, তাই প্রথম দিকে পাতের লতা একটু বেঁধে দিতে হয়। কিন্তু পরের বছরে আর কোনো সমস্যা থাকে না।
-এ শলা ব্যবহারে পান গাছের বৃদ্ধি এবং পানের ফলনে কোনো প্রভাব পড়ে না বা ক্ষতি হয় না।
মনে রাখা প্রয়োজন।
-সংরক্ষণী প্রয়োগের আগে বাঁশ, কাঠি ও অন্যান্য সামগ্রী ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
-সংরক্ষণী প্রয়োগের পর সামগ্রীগুলো ছায়ায় ২-৩ দিন শুকিয়ে পরে ব্যবহার করতে হবে।
যেসব বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
-সংরক্ষণী প্রয়োগের সময় হাতে রাবারের দস্তানা ব্যবহার করতে হবে।
-সংরক্ষণী দ্রবণ বিষাক্ত বিধায় গবাদিপশু ও শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।

 উপসংহার : দেশে মানুষের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। এজন্য পানের চাহিদাও বাড়ছে। শাকসবজি ও দানাদার ফসলের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তির যত উন্নয়ন ঘটেছে পানের ক্ষেত্রে সেটি ঘটেনি। পান চাষের উন্নয়নের জন্য কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। পানচাষিদের পানের জাত, সার ব্যবস্থাপনা, বালাইব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। এতে দেশে পানের উৎপাদন বাড়বে এবং কৃষক লাভবান হবে। পানের বিভিন্ন জাত নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন, বিশেষ করে মিঠা পানের জাত। মিঠাপানের চাহিদা দেশে ও বিদেশে রয়েছে।
 
 
ড. সন্তোষ কুমার সরকার*
* রূপায়ণ লোটাস,৬বি, ১৩ তোপখানা রোড,ঢাকা-১০০০
বিস্তারিত
আলু সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
গোলআলু বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় সবজি। সে সাথে অর্থকরী ফসলও। বাংলাদেশের সর্বত্রই কম বেশি আলুর চাষ হয়। তবে অনুকূল পরিবেশ ও বাজারজাতকরণের সুবিধার জন্য কিছু জেলায় এর চাষ ব্যাপকতা লাভ করেছে। বাংলাদেশে আলুর উন্নয়নের এখনো প্রচুর সম্ভাবনা রয়ে গেছে। প্রতি বছর এ দেশে আলুর উৎপাদন যে পরিমাণে হিমাগারে রাখা যায় তার চেয়েও বেশি। তারপরও খাদ্য হিসেবে আলুর ব্যবহার দিন দিন এমনভাবে বেড়ে গেছে, বাজারে আলুর দাম কখনোই আর কম থাকছে না। সেজন্য প্রতি বছরই আলুর মৌসুম শুরুর আগে শুধু কৃষকই নয়, যারা কৃষি কাজের সাথে জড়িত নন এমন অনেকেই আলু চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কারণ আলু চাষে স্বল্প সময়ে লাভ বেশি। এ দেশে বর্তমানে প্রায় ৪.৭২ লাখ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয় এবং ৮৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়। প্রতি বছরই আবাদ বাড়ছে এবং উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় মানসম্মত আলু সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
 
আলু সংগ্রহ ও স্থানান্তর
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আলু ফসল ৮৫-৯০ দিনের মধ্যে পরিপক্বতা লাভ করে। বীজ আলু ৭০-৭৫ দিন রেখে গাছ কেটে দিলে ভালো। রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। ক্ষেতে আলু পূর্ণবৃদ্ধি হওয়ার ১০-১২ দিন পরে অর্থাৎ গাছ ওপর থেকে মরতে শুরু করলে আলু সংগ্রহ করতে হবে অথবা আলু উত্তোলনের ৭-১০ দিন আগে আলু গাছের গোড়া কেটে ফেলে হাম পুলিং করতে হবে। মেঘলা বা বৃষ্টির দিনে আলু উত্তোলন করা ঠিক হবে না। আলু সকালের দিকে উত্তোলন করতে হবে। মাটি ভেজা অবস্থায় কোনোক্রমেই ফসল সংগ্রহ করা উচিত হবে না। ফসল সংগ্রহের সময় খুবই যতেœর সাথে তুলতে হবে। যাতে কোদাল বা লাঙলের আঘাতে আলু কেটে নষ্ট না হয়ে যায়। আলু সংগ্রহ শেষে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মাঠ থেকে আলু বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। যদি কোনো কারণে আলু ক্ষেতে রাখতে হয়, তাহলে ছায়াযুক্ত জায়গায় বিছিয়ে পাতলা কাপড় বা খড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। প্রখর সূর্যালোকে ফেলে রাখা উচিত হবে না। আধ ঘণ্টার বেশি বীজআলু রৌদ্রে রাখা যাবে না। কারণ এ অবস্থায় আলু পুড়ে যেতে পারে ও ব্লাক হার্ট রোগ হতে পারে। আলু তোলা শেষ হলে তা পরিবহনের জন্য চটের বস্তা ব্যবহার করাই উত্তম। ক্ষেত হতে বীজআলু সাময়িক শেড পর্যন্ত পরিবহনে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সাধারণত আলু বস্তায় ভরার সময় প্লাস্টিকের ঝুড়ি বা গামলা ব্যবহার করা উত্তম। যদি বাঁশের ঝুড়ি ব্যবহার করতে হয়, তাহলে ঝুড়ির মাঝখানে চট বা ছালা বিছিয়ে সেলাই করে নিতে হবে। আলু বাড়িতে এনে পরিষ্কার, শুকনো ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখতে হবে। কোনো মতেই শক্ত মেঝের ওপর ফেলা উচিত নয়, কারণ আলু থেঁতলিয়ে যাবে। আলু ঢালার সময় সতর্ক থাকতে হবে, বেশি জোরে বেশি উঁচু থেকে আলু ফেলা যাবে না।
 
কিউরিং ও গ্রেডিং
কিউরিং বা ছাল শক্তকরণের স্থান ছায়াযুক্ত, ঠাণ্ডা ও সহজে বাতাস চলাচল উপযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়। পরিষ্কার ঠাণ্ডা জায়গায় আলু বিছিয়ে রেখে পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখে কিউরিং করতে হবে। আলু বেশি নাড়াচাড়া করলে ফেটে যেতে পারে বা ক্ষত হতে পারে। কাজেই বেশি নাড়াচাড়া না করে বাতাস চলাচল করে এমন ছায়াযুক্তস্থানে ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু গাদা করে রাখতে হবে। এ অবস্থায় ৬-৭ দিনে চামড়া শক্ত হয় এবং তাতে নড়াচড়ায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। এতে করে আলুর গায়ের ক্ষত সেরে যাবে ও পোকার আক্রমণ থেকে সংগৃহীত আলু রক্ষা পাবে। প্রতিটি বীজআলু সারি থেকে উন্মুক্ত করার পর একত্র করার সময় কাটা, ফাটা, থেঁতলানো, দাগপড়া, ক্ষত রোগাক্রান্ত, সবুজ রঙ, পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত, খুব ছোট আকৃতির এবং অস্বাভাবিক আলু বীজগুলো আলাদা করতে হবে যাকে প্রাথমিক বাছাই বলা হয়৷
 
প্রাথমিক বাছাই না করলে খারাপ বীজ বাছাই শেডের গাদাতে মিশ্রিত হয়ে ভালো বীজগুলো নষ্ট হতে পারে। অন্য জাতের বীজআলু বাদ দিতে হবে। বিভিন্ন রোগাক্রান্ত বীজআলু যেমন-নরম পচা, শুকনো পচা, বাদামি পচন, চক্র পচন ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত বীজআলু থাকলে পুরো গাদা বাতিল করতে হবে। আলুর দাদ রোগের ক্ষেত্রে তিন ভাগের এক ভাগ আলুর ত্বক মুক্ত থাকলে তা বীজ হিসেবে নেয়া যাবে। বীজআলু সবুজ থাকলে ভিত্তি বীজের ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ গ্রহণযোগ্য হবে। অতিরিক্ত ছত্রাকযুক্ত আলু বীজ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তবে ৪০ কেজি আলুতে যদি ১০ কেজি পরিমাণ বীজের গায়ে হালকা ছত্রাক থাকে তবে বীজ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। অনুমোদিত বীজ বেছে গ্রেডিং করতে হবে। ২৮ মিমি. থেকে ৪০ মিমি. পর্যন্ত ‘এ’ গ্রেড। ৪১ মিমি. থেকে ৫৫ মিমি. পর্যন্ত ‘বি’ গ্রেড। বীজআলু গ্রেডিংয়ের পর নতুন রোগমুক্ত শুকনো বস্তায় রাখতে হবে। আলু সংরক্ষণের জন্য ৫০ কেজির ছোট চটের বস্তা সবচেয়ে ভালো। বস্তা বাতাস চলাচলের জন্য পাতলা হলে ভালো হয়। বস্তা বন্দীর পর আলু বীজ বিভাগের দেয়া নমুনা অনুসারে ট্যাগ কার্ড লাগাতে হবে এবং প্রাথমিকভাবে প্রিকুলিং কক্ষে রাখতে হবে। প্রিকুলিং কক্ষে ২৪-৪৮ ঘণ্টা ১২.৫-১৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে, যেন বীজ আলু ঠাণ্ডা সহনশীল হয়। প্রধান কক্ষে বীজ আলু সারি করে খাড়াভাবে রাখা দরকার যেন সহজে ঠাণ্ডা বাতাস চলাচল করতে পারে। একটি কক্ষে ৪-৫ দিনের মধ্যে তাপমাত্রা কমিয়ে ২.২-২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আনতে হবে। তাপমাত্রা কমাতে সময় বেশি লাগলে বীজ গজিয়ে যেতে পারে।
 
গুদামের ধরন
আলু বাড়িতে সফলতার সাথে গুদামজাত করা যায়। আলু তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা এবং বায়ু চলাচল করে এমন কোনো কক্ষে বা স্থানে রাখা যায়। সংরক্ষিত আলু ১০-১৫ সেন্টিমিটার উঁচু করে মেঝেতে বিছিয়ে রাখতে হবে। এছাড়া বাঁশের তৈরি মাচায়, ঘরের তাকে বা চৌকির নিচেও আলু বিছিয়ে রাখা যেতে পারে। সংরক্ষিত আলু ১০-১৫ দিন পর নিয়মিত পরিদর্শন ও বাছাই করতে হবে এবং রোগাক্রান্ত, পোকালাগা ও পঁচা আলু দেখামাত্র ফেলে দিতে হবে।
 
আলু সুপ্তাবস্থায় গুদামজাত
ফসল পরিপক্ব হওয়ার সময় থেকে আলুর সুপ্তাবস্থা আরম্ভ হয়। আলুর সুপ্তাবস্থা ফসল পরিপক্ব হওয়ার পর থেকে প্রায় ২-৩ মাস পর্যন্ত থাকে। যেসব গুদামে শ্বাস-প্রশ্বাসের তাপ বের হওয়ার জন্য বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা আছে, সেসব স্থানে আলু সুপ্তাবস্থায় থাকাকালে খুব সহজে গুদামজাত করা যায়। সচরাচর ব্যবহৃত পাত্রে যেমন- ঝুড়ি এবং ডোল ব্যবহার করা যেতে পারে। গুদামজাতকরণ পাত্রের তলদেশ এমনভাবে তৈরি হতে হবে যাতে বাতাস ঢুকতে পারে এবং আলুর স্তূপের ভেতর যাতায়াত করতে পারে। ঘরের মেঝেতে রাখার ক্ষেত্রে আলুর স্তূপ মিটার গভীর বা ২  মিটারের বেশি প্রশস্ত না হয় এবং যথেষ্ট বায়ু চলাচলের সুযোগ থাকে। রাতে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ এ সময় বাতাস সবচেয়ে ঠাণ্ডা থাকে এবং আলু হতে অতিরিক্ত তাপ বের হতে দেখা যায়। সাধারণত উচ্চফলনশীল জাত ২-৩ মাসের বেশি গুদামজাত করার জন্য উপযুক্ত নয়। দেশি জাতের আলুর সুপ্তাবস্থা ৪-৫ মাস পর্যন্ত থাকে। এসব জাত খামারপর্যায়ে বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব এবং কোন কোনটি প্রায় ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
 
বালি দিয়ে ঢেকে রাখা
পরিষ্কার শুকনো বালু দিয়ে আলু ঢেকেও সংরক্ষণ করা যায়। এ ব্যবস্থায় টিউবার মথের আক্রমণ হতে আলু রক্ষা পায় এবং অংকুর শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত গুদামে নিরাপদে রাখা যায়। ছোট আকারের বীজ আলুও মাটি দিয়ে তৈরি পাত্রে রেখে ঘরের ঠাণ্ডা স্থানে সফলভাবে গুদামজাত করা যায়।
 
বীজ আলুর গুদামজাত
বীজ হিসেবে রাখা আলুর অংকুর গজানো শুরু হলেই আলাদাভাবে গুদামজাত করতে হবে। যেখানে দিনের আলো পড়ে (কিন্তু সকালে এবং দিনের শেষভাগ ছাড়া সূর্যের আলো পড়ে না) এমন স্থানে তাক বা মেঝের ওপর ২-৩টি স্তরে আলু গুদামজাত করা যায়। দিবালোক অংকুরকে ১০-১৫ মিমি. এর বেশি দীর্ঘ হতে বাধা দেয়। বীজ আলু এভাবে কিছুদিন নিরাপদ রাখা ও গুদামজাত করা যায়। আমাদের দেশের আবহাওয়ায় হিমাগারেই আলু সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ ও উত্তম উপায়। হিমাগারে ৩.৩ ডিগ্রি থেকে ৪.৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ৮৫%-৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতা বজায় রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে টিউবার অনেক দিন ভালো থাকে। আলু সরাসরি হিমাগারে না নিয়ে প্রথমে পূর্ব শীতলায়ন করিয়ে নিতে হয়। একইভাবে হিমাগার থেকে বের করার আগে উষ্ণকরণ প্রয়োজন। হিমাগারে আলু রাখলে মাঠ থেকে সংগ্রহের পরে অন্তত এক সপ্তাহ ছায়ায় বিছিয়ে রেখে টিউবারের ক্ষত সারিয়ে নিতে হবে। বীজ আলু হিমায়িতকরণের সময় হিম কক্ষের প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ২.২ ডিগ্রি থেকে ২.৮ ডিগ্রি সে. এ রাখলে বীজ ভালো থাকবে। অধিক ঠাণ্ডায় বীজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে বা অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা হারাতে পারে এবং অধিক তাপমাত্রায় বীজ গজিয়ে যেতে পারে। সংরক্ষণকালে ২-৩ বার বস্তা উল্টিয়ে দিলে বীজ আলু ভালো থাকে এবং অংকুরিত হয় না। বাংলাদেশে এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে একবার এবং আগস্ট মাসের শেষভাগে আরো একবার অর্থাৎ সর্বমোট দুইবার বস্তাবন্দী আলুর স্থান পরিবর্তন করার উত্তম সময়।
 
অহিমায়িত অবস্থায় খাবার আলু সংরক্ষণ
খাবার আলু সংরক্ষণ অনেকটা বীজ আলুর মতোই। তবে খাবার আলু বেশি সংখ্যক বস্তার স্তূপে এবং প্রয়োজনে বড় বস্তায় ভরে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। খাবার আলু সংরক্ষণকালীন পরিচর্যা বিশেষ করে বস্তা পাল্টানোর ব্যাপারে কিছুটা শিথিলতা অবলম্বন করা যেতে পারে। খাবার আলু অবশ্যই হিমাগারে আলাদা কক্ষে বীজ আালু থেকে আলাদা করে সংরক্ষণ করা দরকার। গুদামজাত খাবার আলুতে কোনো প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ তা খেলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। আমাদের দেশে অহিমায়িত অবস্থায় সাধারণত চাষির নিজ ঘরে, বৈঠকখানায় বা যে কোনো চালা ঘরে ২-৩ মাস পর্যন্ত আলু সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। তবে সাময়িকভাবে এসব ঘরে সংরক্ষণের বিষয়ে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করলে সংরক্ষিত আলুর অপচয় কম হতে পারে। তাই যে ঘরে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ভালো এবং অক্সিজেনের অভাব ঘটে না সেখানে আলু রাখা ভালো।
 
খাবার আলু সংরক্ষণের জন্য অহিমায়িত গুদাম নির্মাণ
সম্প্রতি ‘কৃষি বিপণন অধিদপ্তর’ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে খাবার আলু সংরক্ষণের জন্য অহিমায়িত গুদাম নির্মাণ করেছেন, যা বেশ কার্যকর। অল্প খরচে গুদামঘর বিশেষভাবে তৈরি করা যেতে পারে। ৫x১০ মিটার আকারের এবং ৩ মিটার উঁচু ছনের/টিনের ঘরে মাটি থেকে ৪৫-৫০ সেমি. উচ্চতায় শক্ত করে বাঁশের মাচা তৈরি করে ২ থেকে ২.৫ মিটার দূরে দূরে ছিদ্রযুক্ত টিনের চোঙা বা বাঁশের তৈরি চোঙা স্থাপন করার পরে মাচার উপরে চোঙার চারিদিকে আলু সংরক্ষণ করতে হবে। সংরক্ষণের আগে আলু বাছাই করতে হবে, যাতে অপরিপক্ব, পোকা খাওয়া ও কাটা আলু না থাকে। মাচার নিচের ফাঁকা জায়গা এবং চোঙার মধ্য দিয়ে সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারবে। এতে আলু ভালো থাকে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো অসুবিধা হয় না। স্টোর হাউসের নিচে স্যাঁতসেঁতে থাকতে পারবে না। সূর্যের আলো ও বৃষ্টির পানি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বর্ণিত আকারের অহিমায়িত একটি গুদামঘরে ১০০-১৫০ টন আলু সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করা যায়। অহিমায়িত গুদাম সম্ভব হলে পূর্ব পশ্চিমে লম্বালম্বি করে নির্মাণ করলে দক্ষিণের বাতাস গুদামের সমস্ত অংশে প্রবাহিত হতে পারে। এতে সংরক্ষিত আলুর গুণাগুণ ভালো থাকে।
 
গুদামজাত অবস্থায় ক্ষতিকর রোগ পোকামাকড়ের প্রভাব
আলুর সুতলি পোকা
আলুর সুতলী পোকা আলুর উন্মুক্ত অংশে বিশেষ করে চোখের ওপর ডিম পাড়ে। ডিম থেকে শুঁককীট বের হয়ে আলুর ভেতরের চামড়ার নিচে গর্ত করে ক্ষতি করে। এর ফলে আক্রান্ত আলুর অংকুর ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে যায়। পোকার কীড়া মাঠের ফসল ও গুদামজাত আলুর ক্ষতি করে থাকে। এরা আলু গাছের পাতা, বোঁটা ও কাণ্ডে আক্রমণ করে। গুদামে সংরক্ষিত আলুতে পোকার কীড়া সুড়ঙ্গ করে খায় এবং আলু পচে নষ্ট হয়। বাড়িতে সংরক্ষিত আলু শুকনা বালু, ছাই, তুষ অথবা কাঠের গুঁড়ার একটি পাতলা স্তর (আলুর ওপরে ০.৫ সেন্টিমিটার) দিয়ে ঢেকে দিতে হবে৷ নিমপাতা, ল্যান্টেনা, বিষকাটালি পাতা এবং নিশিন্দা পাতা প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। আলু সংরক্ষণ করার আগে সুতলি পোকা আক্রান্ত আলু বেছে ফেলে দিতে হবে। বীজ আলু গুদামে রাখার আগে বালুর সাথে সেভিন ১০% গুঁড়া ব্যবহার করতে হবে। (১ টন বালু+১ কেজি সেভিন+১.৫ টন আলু)।
 
আলুর নরম পচা রোগ
মাঠে ও সংরক্ষিত আলুতে এ রোগ দেখা যায়। আক্রান্ত অংশের কোষ পচে যায়৷ পচা আলুতে এক ধরনের উগ্র গন্ধের সৃষ্টি হয় এবং চাপ দিলে আলু থেকে এক প্রকার দূষিত পানি বেরিয়ে আসে। এজন্য সুস্থ ও রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে; অতিরিক্ত সেচ পরিহার করতে হবে; উচ্চ তাপ এড়ানোর জন্য আগাম চাষ করতে হবে; ভালোভাবে বাছাই করে আলু সংরক্ষণ করতে হবে; ১% ব্লিচিং পাউডার অথবা ৩% বরিক এসিডের দ্রবণে টিউবার শোধন করে বীজ আলু সংরক্ষণ করতে হবে।
 
আলুর ভেতরের কালো দাগ রোগ
টিউবারের কেন্দ্র কালো বা নীলচে কালো রঙ ধারণ করে। অক্সিজেনের অধিক অভাব হলে সমস্ত টিউবারই কালো হয়ে যেতে পারে। আক্রান্ত অংশ সঙ্কুচিত হয়ে ফেঁপে যেতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করা ও গুদামে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
 
আলুর শুকনো পচা রোগ
ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। আলুর গায়ে কিছুটা গভীর কালো দাগ পড়ে। আলুর ভেতরে গর্ত হয়ে যায়। প্রথম পচন যদিও ভেজা থাকে পরে তা শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়। আক্রান্ত অংশে গোলাকার ভাঁজ এবং কখনো কখনো ঘোলাটে সাদা ছত্রাক জালিকা দেখা যায়। আলু ভালোভাবে বাছাই করে সংরক্ষণ করতে হবে। যথাযথ কিউরিং করে আলু গুদামজাত করতে হবে। ডাইথেন এম-৪৫ দ্রবণ ০.২% দ্বারা বীজ আলু শোধন করতে হবে। বস্তা, ঝুড়ি ও গুদামজাত আলু ৫% ফরমালিন দিয়ে শোধন করতে হবে।
 
দেশে প্রায় এক কোটি টনের মতো আলু উৎপাদন হয়। অথচ দেশে অবস্থিত ৩৩৭টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা ২২ লাখ টন। অর্থাৎ উৎপাদিত আলুর মাত্র পাঁচ ভাগের-এক ভাগ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করা যায়। প্রতি বছর শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ আলু নষ্ট হয়। হিমাগারের এক বস্তা আলু সংরক্ষণ করতে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হয়। কৃষক নিজ বাড়িতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণ করলে খরচ পড়বে প্রতি বস্তা মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকা। সুতরাং আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দেশীয় পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণ করলে লাভ হবে অনেক বেশি।
 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ গোলাম মাওলা*
* ফার্ম ব্রডকাস্টিং অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৭১৬৮০৬১৭১ ইমেইল : gmowla_aiO@yahoo.com
বিস্তারিত
মাছ চাষে সমস্যা ও প্রতিকার
শীতকালে মাছের বিশেষ যত্ন নিতে হয়। কারণ এ সময়ে পুকুরে পানি কমে, পানি দূষিত হয়, পানি গরম হয়, অক্সিজেন কমে যায়, গ্যাস সৃষ্টি হয়, রোগবালাইসহ বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হয়। এসব সমস্যার জন্য মাছের মড়ক দেখা দিতে পারে। এতে মাছ চাষি  ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমস্যার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে ও সমস্যা হওয়ার পরেও সমাধান করে মাছের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যায়।
 
খাবি খাওয়া
পানিতে অক্সিজেনের অভাব হলে মাছ পানির ওপর ভেসে ওঠে খাবি খায়। অর্থাৎ বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণের চেষ্টা করে। মনে হয় মাছ পানি খাচ্ছে। মাছ খুব ক্লান্ত হয়। এতে মাছের ফলন কমে যায়।
 
পানিতে সাঁতারকাটা, বাঁশ পানির ওপর পেটানো, হররা টেনে তলার গ্যাস বের করে দেয়া, পুকুরে পাম্প বসিয়ে ঢেউয়ের সৃষ্টি করা, পানি নাড়াচাড়া করে অক্সিজেন বাড়ানো যায়। নতুন পানি সরবরাহ করেও অক্সিজেন বাড়ানো যায়। প্রতি শতাংশে এক কেজি চুন দিলে উপকার পাওয়া যায়।
 
কার্বন ডাইঅক্সাইডজনিত পানি দূষণ
পানিতে কার্বন ডাইঅক্সাইড বেড়ে গেলে মাছের দেহে বিষক্রিয়া হয় এবং শ্বাসকষ্ট হয়। মাছ পানিতে ভেসে ওঠে। খাবি খাওয়া প্রতিকারের মতো পানি নাড়াচাড়া করে অক্সিজেন বাড়ালে কার্বন ডাইঅক্সাইড কমে যায়। পুকুর তৈরির সময় অতিরিক্ত কাদা সরাতে হবে।
 
অ্যামোনিয়াজনিত সমস্যা
পুকুরে অ্যামোনিয়া বেড়ে গেলে পানির রঙ তামাটে অথবা কালচে রঙের হয়। এতে মাছের ছোটাছুটি বেড়ে যায়। মাছ খাদ্য খায় না। বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। মাছের মজুদ ঘনত্ব কমাতে হবে। সার ও খাদ্য প্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। নতুন পানি সরবরাহ করতে হবে।
 
নাইট্রোজেনজনিত সমস্যা
পানিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেড়ে গেলে মাছের দেহে অক্সিজেন সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়ে বিষাক্ততার সৃষ্টি করে। এতে মাছের দেহ বাদামি রঙ ধারণ করে। মাছ খাদ্যগ্রহণ বন্ধ করে দেয়। পুকুরে মাছের ঘনত্ব কমাতে হবে। পুকুরে ২৫০ মিলিগ্রাম লবণ প্রতি লিটার হারে দিতে হবে।
 
পিএইচজনিত সমস্যা
পানিতে পিএইচ কমে গেলে মাছের দেহ থেকে প্রচুর পিচ্ছিল পদার্থ বের হয়। মাছ খাদ্য কম খায়। পিএইচ বেশি হলে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন কমে যায় এবং মাছের খাদ্য চাহিদা কমে যায়। দেহ খসখসে হয়। মাছ রোগাক্রান্ত হয়। পিএইচ কম হলে চুন, ডলোমাইড বা জিপসাম ১ থেকে ২ কেজি প্রতি শতাংশ পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে। পিএইচ বেশি হলে পুকুরে তেঁতুল বা সাজনা গাছের ডালপালা তিন-চার দিন ভিজিয়ে রেখে পরে তুলে ফেলতে হবে। তেঁতুল পানিতে গুলে দেয়া যায়।
 
পানির ওপর সবুজ স্তর
পুকুরের পানির রঙ ঘন সবুজ হয়ে গেলে বা পানির ওপর শ্যাওলা জন্মালে খাদ্য ও সার প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। প্রতি শতাংশে ১২ থেকে ১৫ গ্রাম তুঁতে বা কপার সালফেট অনেক ভাগ করে ছোট ছোট পোটলায় বেঁধে ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পানির নিচে বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে রাখতে হবে। প্রতি শতাংশ পুকুরে ৮০০ থেকে ১২০০ গ্রাম চুন প্রয়োগ করতে হবে।
 
পানির ওপর লাল স্তর
পুকুরের পানির ওপর লাল স্তর পড়লে ধানের খড়ের বিচালি বা কলাগাছের শুকনো পাতা পেঁচিয়ে দড়ি তৈরি করে পানির ওপর দিয়ে ভাসিয়ে নিলে পরিষ্কার হয়।
 
পানির ঘোলাত্ব
পানি ঘোলা হলে মাছ খাদ্য কম খায়, চোখে দেখে না, প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয় না, প্রজননে সমস্যা হয় ও রোগবালাই বেশি হয়। প্রতি শতাংশে ৮০ থেকে ১৬০ গ্রাম ফিটকিরি দিতে হবে। পুকুর তৈরির সময় জৈবসার বেশি দিলে স্থায়ীভাবে ঘোলা দূর হয়। পানিতে কলাপাতা ও কচুরিপানা রাখলেও ঘোলা কমে।
 
পানির ক্ষারত্ব
পানি ক্ষারীয় হলে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি কম হয়। মাছের দৈহিক বৃদ্ধি কমে যায়। মাছের দেহে পিচ্ছিল পদার্থ কমে যায়। পুকুর তৈরির সময় ওপরে শতাংশ প্রতি ১ থেকে ২ কেজি চুন প্রয়োগ করতে হয়। লেবু কেটে দিলেও ক্ষারত্ব কমে। ছাই প্রয়োগেও ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রণ হয়।
 
জলজ উদ্ভিদ
কচুরিপানা, কলমিলতা, চেচরা, পাতাঝাঝি, শাপলা, হেলেঞ্চা, মালঞ্চ এসব জলজ উদ্ভিদ জলাশয়ে রোদ পড়তে বাধা দেয়, মাছের চলাচল, খাদ্য গ্রহণ, প্রজননে সমস্যা করে। এসব ক্ষতিকর জলজ উদ্ভিদ কাঁচি দিয়ে কেটে সব সময় পরিষ্কার রাখতে হয়।
 
রোগবালাই
শীতে মাছের ক্ষতরোগ, লেজ ও পাখনা পচা রোগ ও ফুলকা পচা রোগ হয়। এসব রোগ প্রতিরোধের জন্য যেসব ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন তাহলো-

১. পুকুরের পরিবেশ ও পানির গুণাগুণ ঠিক রাখা ২. জলজ আগাছামুক্ত রাখা ৩. পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পড়ার ব্যবস্থা করা ৪. অনাকাক্সিক্ষত জলজ প্রাণী অপসারণ করা ৫. অতিরিক্ত কাদা সরানো
৬. দুই তিন বছর পর পর পুকুর শুকানো ৭. চুন প্রয়োগ করা ৮. মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা ৯. প্রাকৃতিক খাদ্যের উপস্থিতি পরীক্ষা করা ১০. হররা টানা ১১. পাখি বসতে না দেয়া ১২. জাল শোধন করে ব্যবহার করা ১৩. রোগাক্রান্ত মাছ অপসারণ করা ১৪. সব সময় ঢেউয়ের ব্যবস্থা রাখা ১৫. পানি কমে গেলে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা ১৬. ভাসমান খাদ্য প্রয়োগ করা ১৭. পানি বেশি দূষিত হলে পানি পরিবর্তন করা ১৮. পুকুরে বিভিন্ন স্থানে একটু গভীর বা গর্ত করা যাতে পানি কমে গেলে মাছ সেখানে আশ্রয় নিতে পারে।

 
শীত ও গ্রীষ্মে প্রতিদিন পুকুরে যেতে হবে। সাত দিন পর পর মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। যে কোনো সমস্যা হলে উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
 
 
কৃষিবিদ মো. ফরহাদ হোসেন
* প্রভাষক (কৃষি শিক্ষা), শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল, মোবাইল : ০১৭১১৯৫৪১৪৩

 
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে জনাব মো. ইউনুসুর রহমান-এর যোগদান
জনাব মো. ইউনুসুর রহমান গত ০৭-০১-১৫ তারিখে সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয় হিসেবে যোগদান করেছেন। ইতঃপূর্বে তিনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
 
জনাব মো. ইউনুসুর রহমান বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৯৮২ (বিশেষ) ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে প্রথম সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি  জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, খুলনা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্ম সচিব, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার জেলা প্রশাসক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
 
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্ম জীবনে এসে চাকরির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করাসহ ফ্রান্সের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক এ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা এবং অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন ক্রোস বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি খুলনা বিভাগের ‘বিভাগীয় কমিশনার’ এর দায়িত্ব পালনকালে অন্য একজন লেখকসহ “খুলনা বিভাগের ইতিহাস” শীর্ষক পুস্তক রচনা করেছেন।
 
 
 
 
 
বিস্তারিত
কবিতা ফাল্গুন-১৪২১
মানুষ
ড. মো. আলতাফ হোসেন*
মানব শিশু জন্ম নিলেই প্রকৃত মানুষ হয় না
যদি না  সে পরিধান করে মানবতার গয়না।
মানুষ সৃষ্টি সেরা জীব, কথাটি সত্য ভাই
মানুষ হতে হলে মানবিক গুণাবলি থাকা চাই।
কথা বার্তায় নম্র হবে, বিনয়ী সে থাকবে
আচার আচরণে উগ্রতার ছোঁয়া নাহি সে রাখবে।
চলাফেরায় ভাববে না সে অন্যের কোনো ক্ষতি
চেহারায় তার ফুটে উঠবে ভালোবাসার জ্যোতি।
উদারতায় মনটা তার সবসময় ভরা থাকবে
সংকীর্ণ মানসিকতায় কখনও নাহি সে ভুগবে।
কর্মনিষ্ঠ হবে সে, ব্যস্ত থাকবে গঠনমূলক কাজে
কখনোই জড়াবে না সে ধ্বংসাত্মক কোনো কাজে।
অপরের কল্যাণে থাকবে সে নিবেদিত
কখনোই করবে না সে অন্যের সম্পদ অপহৃত।
পরশ্রীকাতরতায় হবে না সে কখনোই কাতর
অপরের সেবায় ছড়িয়ে দিবে ভালোবাসার আতর।
সময়ের মূল্য দিয়ে সময়ের সাথে সে চলবে
সফলতার চরম শিখরে অবশ্যই সে উঠবে।
সততার মুকুট মাথায় নিয়ে পথ সে চলবে
মাথা উঁচিয়ে দৃঢ়তার সাথে কথা সে বলবে।
মিথ্যা কথা কভু সে নাহি কখনো বলবে
ধর্মীয় অনুশাসনগুলো অবশ্যই মেনে চলবে।
ব্রত হবে, জন্ম যেন শেষ না হয় মৃত্যুকে দিয়ে
কর্মের সুফল বেঁচে থাকে যেন পরবর্তী প্রজন্মকে ঘিরে।

 
পার্চিং
মো. মকবুল হোসেন**
শস্য-শ্যামল বাংলার বুকে লাগিয়েছি বোরো ধান
খাদ্য, অর্থ, শক্তি জোগাবে বাড়াবে আরও মান।
সোনার মাটি অনেক খাঁটি, খাঁটি কৃষক ভাই,
এই মাটিতে সোনা ফলাতে, প্রযুক্তি ছড়াই তাই।
সুষম সার, এডব্লিউডি, এলসিসি, লাইনে চারা লাগাই,
পোকামাকড় দমন করতে, ক্ষেতে পার্চিং বসাই।
বোকার ফসল পোকায় খায়, সবাই তা জানে,
ক্ষতিকর পোকা মারতে, পার্চিং লাগাও ক্ষেতের মাঝখানে।
পার্চিং মানে কঞ্চি, ডালপোতা, নিজের ক্ষেতে,
কম খরচে অধিক লাভ, সন্দেহ নাই তাতে।
সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা, অনেকে মোরা জানি,
তার মধ্যে ক্ষেতে পার্চিং করা, অন্যতম খানি।
পার্চিংয়ে বসে ফিঙ্গে, শালিক আরও কত পাখি,
শত্রু পোকা সাবাড় করে, বন্ধু পোকা রাখি।
কীটনাশকে পোকা দমনে, পরিবেশ দূষণ হয়,
পার্চিং করে পোকা দমন করতে, কৃষিবিদে কয়।
ডেড পার্চিং, লাইভ পার্চিং, লাগাই সমান তালে,
 
                
কৃষি উন্নয়ন

প্রসেনজিৎ কুমার সাহা***
ডালের চাইতে লাইভ পার্চিংয়ে, বাড়তি ফায়দা মেলে।
আমরা কৃষক, আমরা চাষি
আমরা দেশের প্রাণ।
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে,
ফলাই সোনার ধান।
ধানের সাথে আরও ফলাই
শাক, আলু, ডাল,
খাঁটি বাঙালি চাষি আমরা
ফসল মোদের নির্ভেজাল।
ভালো ফসলের অন্তরালে
আছে জৈবসার,
সব ফসলে ব্যবহার করলে
ফলন হবে বাম্পার।
রাসায়নিক দ্রব্য ছাড়াই পতঙ্গ-
নিধনের কৌশল মোরা জানি,
বিষের পরিবর্তে ব্যবহার করি
নিমপাতা সেদ্ধ পানি।

 
* প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত্ব), ডাল গবেষণা কেন্দ্র ও আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা, মোবাইল : ০১৭২৫০৩৪৫৯৫ ** উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, ব্লক-বাঙালিপুর, উপজেলা- সৈয়দপুর, জেলা- নীলফামারী। *** ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার ঈশ্বরদী, পাবনা মোবাঃ ০১৭৫০২৯৬৬৪৮।
বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর ফাল্গুন-১৪২১

মোসা. রোজিনা

লালমনিরহাট
প্রশ্ন : কুমড়া ও লাউজাতীয় ফসলে মাছি পোকা দমনে বিষটোপ তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : কুমড়া ও লাউজাতীয় সবজি ক্ষেতে বিষটোপ ফাঁদ ও কিউলিওর (সেক্স ফেরোমন) ফাঁদ  পাশাপাশি ব্যবহার করলে সবচেয়ে কার্যকরভাবে এ পোকা দমন করা যায়।
 
বিষটোপ ব্যবহার পদ্ধতি : ১০০ গ্রাম মিষ্টিকুমড়া কুচি কুচি করে কেটে তা থেঁতলিয়ে ১ চিমটি পরিমাণ সেভিন ৮৫ ডব্লিউপি পাউডার এবং ১০০ মিলি. বা প্রায় আধা পোয়া পানি মিশাতে হবে। তারপর মিশ্রণটি ছোট একটি মাটির পাত্রে রেখে তিনটি খুঁটির সাহায্যে এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যাতে বিষটোপ পাত্রটি মাটি থেকে ০.৫ মিটার বা দেড় হাত  উচুঁতে থাকে। বৃষ্টি বা রোদে বিষটোপ যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য খুঁটি তিনটির মাথায় অন্য একটি বড় আকারের চ্যাপ্টা মাটির পাত্র দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। বিষটোপ তৈরির পর শীতের দিনে ৭ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করে তা নিরাপদ জায়গায় ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে বিষটোপ ব্যবহার করতে হবে।
 
সোহেল খান
মুন্সীগঞ্জ
প্রশ্ন : আলু গাছের পাতা কোঁকড়ানো ও পাতা হালকা হলুদ রঙের হয়েছে। প্রতিকারের উপায় কী?
উত্তর : আলু ফসলের ভাইরাস রোগের মধ্যে আলুর পাতা মোড়ানো (PLRV) অন্যতম। অধিকাংশ ভাইরাস রোগ জাবপোকার মাধ্যমে গাছ থেকে গাছে ছড়ায়।
 
মো. ইমরান
পাইকগাছা, যশোর
প্রশ্ন : আম গাছের মকুল যাতে ঝরে না পড়ে তার জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
উত্তর : মুকুল আসার সময় শোষক পোকা (হপার) এবং অ্যানথ্রাকনোজ রোগের আক্রমণে ফুল ঝরে যায়।
আম বাগান সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আমের মুকুল এসেছে কিন্তু ফুল ফোটার আগে অর্থাৎ পুষ্প মঞ্জুরি ছড়ার দৈর্ঘ্য ৫-১০ সেন্টিমিটার হয় তখন প্রতি লিটার পানিতে সাইপারমেথ্রিন (রিপকর্ড/সিম্বুশ) ১০ ইসি ১ মিলি. এবং টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলি. হারে মিশিয়ে একবার এবং তার একমাস পর আরেকবার গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।
 
আবু হানিফ
ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : গম গাছের পাতায় মরিচার মতো বাদামি বা কালচে রঙের দাগ দেখা যায়। এর প্রতিকার কী?
উত্তর : এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে গমের পাতায় এ রোগ হয়ে থাকে। এ রোগের লক্ষণ প্রথমে নিচের পাতায় তারপর সব পাতায় ও কাণ্ডে দেখা যায়। দেশের উত্তরাঞ্চলে এ রোগ বেশি হয়ে থাকে।
১। সুষম হারে সার প্রয়োগ করতে হবে।
২। রোগ প্রতিরোধী গমের জাত আকবর, অগ্রাণী, প্রতিভা, সৌরভ ও গৌরব চাষ করতে হবে।
৩। প্রপিকোনাজল জাতীয় ছত্রাকনাশক টিল্ট ২৫০ ইসি (০.০৪%) ১ মিলি. আড়াই লিটার পানিতে মিশিয়ে ১২-১৫ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
প্রতিকার
১। সুস্থ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে এবং রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
২। আক্রান্ত গাছ টিউবারসহ তুলে ফেলতে হবে।
৩। টমেটো, তামাক ও কিছু সোলানেসি গোত্রভুক্ত আগাছা এ ভাইরাসের বিকল্প পোষক। তাই আশপাশে এ ধরনের গাছ রাখা যাবে না।
৪। কীটনাশক ১ মিলি. এডমায়ার প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর জমিতে স্প্রে করতে হবে।
 
মো. রাজীব হোসেন
সাতক্ষীরা
প্রশ্ন : ভুট্টা গাছের পাতা হলুদ হয়ে গেছে। পাতা পোড়া পোড়াভাব হয়েছে। করণীয় কী?
উত্তর : ছত্রাকের আক্রমণে ভুট্টা গাছে এ রোগ দেখা দেয়। রোগের প্রকোপ বেশি হলে পাতা আগাম শুকিয়ে যায় এবং গাছ মরে যায়।
 
প্রতিকার
১। রোগ প্রতিরোধী জাতের (মোহর) ভুট্টা বীজ চাষ করতে হবে।
২। আক্রান্ত ফসলে ছত্রাকনাশক টিল্ট ২৫০ ইসি (০.০৪%) ১৫ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
৩। ভুট্টা উঠানোর পর জমি থেকে আক্রান্ত গাছ সরিয়ে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
 
জহিরুল ইসলাম
টাঙ্গাইল
প্রশ্ন : খাঁচায় তেলাপিয়া মাছের ক্ষত রোগ। প্রতিকারের করণীয় কী?
উত্তর : সাধারণত শীতকালে বিভিন্ন রকম ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে মাছের ক্ষত বা পচন জাতীয় রোগ হয়ে থাকে। তাছাড়া খাঁচায় মাছের জন্য অতিরিক্ত খাবার সরবরাহ, মাছের অধিক ঘনত্ব, অক্সিজেন সরবরাহ কম ইত্যাদি কারণে এ ধরনের রোগ হয়ে থাকে।
 
১. মাছকে পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশ্রিত পানিতে গোসল করাতে হবে।
২. খাঁচায় অধিক পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে,
৩. খাঁচায় মাছের ঘনত্ব কমাতে হবে,
৪. খাদ্য সরবরাহ কমাতে হবে,
৫. নেট পরিষ্কার রাখতে হবে,
৬. অ্যান্টিবায়োটিক ডোজ বাড়াতে হবে,
৭. খাঁচাগুলো সারিবদ্ধভাবে না রেখে আঁকাবাঁকা করে রাখা যেতে পারে।
 
আব্দুল কাদের
ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : পুকুরে প্রচুর রাক্ষুসে মাছ আছে, এজন্য কী করব?
উত্তর : পুকুর শুকিয়ে ফেলতে হবে বা জান টেনে রাক্ষুসে মাছ তুলে ফেলতে হবে।  ঘন মেস সাইজের জাল বার বার টানতে বলা হয় অথবা রটেনন ওষুধ দিতে  বলা হয়। রটেনন পাউডার ৩৫-৪০ গ্রাম প্রতি শতকে প্রয়োগ করতে হবে। রটেননের ২/৩ অংশ পানির সাথে মিশিয়ে এবং ১/৩ অংশ ছোট বল করে ছিটিয়ে দিতে হবে। ফসটক্সিন/কুইকফস ট্যাবলেট ২টি করে প্রতি শতকে ২-৩ ফুট গভীরতার পানিতে এবং ৩টি ট্যাবলেট প্রতি শতকে আরও অধিক গভীরতার পানিতে মাছ চাষের আগে দিতে হবে। এর ২ সপ্তাহ পরে রেণু ছাড়তে হবে।
 
রবিউল ইসলাম
মো. রুবেল মিয়া
ঝিনাইদহ
প্রশ্ন : পানির পিএইচ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?
উত্তর : পুকুর বা খামার তৈরির সময় চুন ১ কেজি/শতক হারে ৩-৫ ফুট পানির গভীরতায় প্রয়োগ করতে হবে। মজুদ পরবর্তীতে ২৫০-৫০০ গ্রাম/শতক হারে প্রয়োগ করতে হবে। পানির পিএইচ পরীক্ষা করে যদি ৬ এর নিচে থাকে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে।
চুনের পরিবর্তে ডিওটক্স/জিওলাইট ২৫০ গ্রাম/শতাংশ প্রয়োগ করা যেতে পারে।
 
এছাড়াও বায়োকেয়ার প্রতি ৭ দিন অন্তর ৮০-১২০ মিলি./শতক হারে দিতে হবে প্রতিষেধক হিসেবে। আর নিরাময়ের জন্য পর পর ২ দিন ১২০-১৬০ মিলি./শতক হারে প্রয়োগ করতে হবে।
 
মোহাম্মদ রনি
নড়াইল
প্রশ্ন : মাছকে কী পরিমাণ খাবার দিতে হবে?
উত্তর : পুকুরে মাছের ওজনের ৩% থেকে ৫% হারে ২ বার সকালে ও বিকালে খাবার দিতে হবে। অর্থাৎ পুকুরে ১০০ কেজি মাছের জন্য ৩-৫ কেজি খাবার দিতে বলা হয়। চিংড়ি দিনের বেলায় খায় না, রাতে খাবার দিতে হবে। পুকুরের তলায় ট্রেতে অথবা ছালায় করে খাদ্য দিতে হবে।
 
তবে পিলেট খাবার ১০০ কেজি মাছের জন্য ৫ কেজি হারে দেয়া যেতে পারে। এসিআই ও সিপি এর পিলেট ফিড গুণগতমানসম্পন্ন ও চিংড়ির জন্য ভালো।
 
স্থানীয়ভাবে  খৈল ৪০%, চালের কুঁড়া (ব্রান) ৩০%, ভুট্টা গুঁড়া/গমের ভুসি ২০%, ফিশ মিল ৯%, ভিটামিন/মিনারেল ১% হারে সামান্য আটা ও পানি মিশিয়ে সম্পূরক খাবার তৈরি করে দেয়া যায়।
 
রবিউল ইসলাম
নোয়াখালী
প্রশ্ন : গরুর আঠালি হয়েছে। কী করণীয়?
উত্তর : দুগ্ধবতী গাভী অথবা বকনাগাভীকে নিয়মিত জীবাণুনাশক দ্বারা গোসল করাতে হবে। গোসল শেষে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে যেন লেজের গোড়ায় পানি না জমে। এছাড়া দুগ্ধবতী গাভীকে আঠালি থেকে মুক্ত রাখার জন্য সকাল-বিকাল সব শরীর ভালোমতো চিরুনি বা ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে।
 
ইঞ্জেকশন  Ivermectin প্রতি ৫০ কেজি ওজনের জন্য ১পপ চামড়ার নিচে দিতে হবে।
 
আহসান হাবীব
গাইবান্ধা
প্রশ্ন : গাঁট ফোলা রোগে করণীয় কী?
উত্তর : জীবাণুর সংক্রমণ রোধে সালফার ড্রাগস কিংবা অক্সিটেট্রাসাইক্লিন জাতীয় ড্রাগস ব্যবহার করতে হবে।
- ব্যথার জন্য ব্যথানাশক ইঞ্জেকশন মাংসপেশিতে দিতে হবে।
- পাশাপাশি যে কোনো একটি অ্যান্টিহিস্টামিনিক ইঞ্জেকশন দিতে হবে।
- করটিকোস্টেরয়েড ইঞ্জেকশন দিলেও ভালো সুফল পাওয়া যায়।
 
শারমীন ইসলাম
রংপুর
প্রশ্ন : ছাগলের নিউমোনিয়া রোগে করণীয় জানালে খুশি হব।
উত্তর : সালফার ড্রাগ ইঞ্জেকশন প্রথমদিন ডাবল ডোজ শিরায় এবং পরের দিন থেকে অর্ধেক ডোজ করে ৩-৪ দিন মাংসে দিতে হবে।
 
- অথবা, এমোক্সিসিলিন কিংবা অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ইঞ্জেকশন দেয়া যাবে।
- অ্যান্টিবায়োটিকের পাশাপাশি অ্যান্টিহিস্টামিনিক ইঞ্জেকশন দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
 
 
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ
* কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল : ০১৫৫২৪৩৫৬৯১
 
বিস্তারিত
চৈত্র মাসের কৃষি
বসন্ত তার রঙের পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির ক্যানভাসে, সে সঙ্গে জানাচ্ছে নতুনের আগমন বার্তা। চৈত্র বাংলা বছরের শেষ মাস। কিন্তু আমাদের কৃষির কাজকর্মের শেষ বলে কিছু নেই। বরং এ মাসে রবি ফসল ও গ্রীষ্মকালীন ফসলের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এক সঙ্গে করতে হয় বলে বেড়ে যায় কৃষকের ব্যস্ততা। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, কৃষিতে আপনাদের শুভ কামনাসহ সংক্ষিপ্ত শিরোনামে এ মাসে কৃষিতে কী কী গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করতে হবে আসুন তা এক পলকে জেনে নেই।
 
বোরো ধান
সময়মতো বোরো ধান চাষ করে থাকলে এরই মধ্যে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার কথা। আর যারা শীতের কারণে দেরিতে চারা রোপণ করেছেন তাদের ধানের চারার বয়স ৫০ থেকে ৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। তবে সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। ক্ষেতে গুটি ইউরিয়া দিয়ে থাকলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে না। এলাকার জমিতে যদি সালফার ও দস্তা সারের অভাব থাকে এবং জমি তৈরির সময় এ সারগুলো না দেয়া হয়ে থাকে তবে ফসলে পুষ্টির অভাবজনিত লক্ষণ পরীক্ষা করে শতাংশপ্রতি ২৫০ গ্রাম সালফার ও ৪০ গ্রাম দস্তা সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে ধানের কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত ক্ষেতে ৩/৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে। পোকা দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে এবং সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আলোর ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে, উপকারী পোকা সংরক্ষণ করে, ক্ষেতে ডাল-পালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে ধানক্ষেত বালাইমুক্ত করতে পারেন। এতে বালাইনাশক লাগবে কম, লাভ হবে বেশি এবং পরিবেশ থাকবে স্বাস্থ্যসম্মত। এসব পন্থায় রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে শেষ উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। এ সময় ধান ক্ষেতে উফরা, ব্লাস্ট, পাতাপোড়া ও টুংরো রোগ দেখা দেয়। জমিতে উফরা রোগ দেখা দিলে যে কোনো কৃমিনাশক যেমন ফুরাডান ৫ জি বা কিউরেটার ৫ জি প্রয়োগ করতে হবে। ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে এবং শতাংশ প্রতি ১.৬ গ্রাম ট্রুপার বা জিল বা নেটিভ ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে দুইবার প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে পাতাপোড়া রোগ হলে অতিরিক্ত ১.৫ কেজি/শতাংশ হারে পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে এবং জমির পানি শুকিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর আবার সেচ দিতে হবে। আর টুংরো রোগ দমনের জন্য এর বাহক পোকা সবুজ পাতা ফড়িং দমন করতে হবে।
 
গম
চৈত্র মাসের প্রথম থেকে মধ্য চৈত্র পর্যন্ত গম সংগ্রহ করতে হয়। গম সংগ্রহের কাজটি করতে হবে সকাল বেলা রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে। গম কাটার পর ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে মাড়াই যন্ত্রের সাহায্যে গম মাড়াই করা উত্তম। শুকনো বীজ ছায়ায় ঠা-া করে প্লাস্টিকের ড্রাম, বিস্কুটের টিন, মাটির কলসি ইত্যাদিতে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। তবে যারা দেরিতে গম বপন করেছেন তাদের বপন করা গম সঠিকভাবে পেকে যাওয়ার পর কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে এবং সংরক্ষণ করতে হবে।
 
ভুট্টা (রবি)
জমিতে শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে এবং পাতার রঙ কিছুটা হলদে হলে মোচা সংগ্রহ করতে হবে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে শুকনো আবহাওয়ায় মোচা সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহ করা মোচা ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। মোচা সংগ্রহের পর উঠানে পাট বিছিয়ে তার ওপর শুকানো যায় অথবা জোড়া জোড়া বেঁধে দড়ি বা বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে আবার অনেকে টিনের চালে বা ঘরের বারান্দায় ঝুলিয়ে শুকানোর কাজটি করে থাকেন। তবে যেভাবেই শুকানো হোক না কেন বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। ভুট্টার দানা মোচা থেকে ছাড়ানো অনেক কষ্টের কাজ। অনেকে এ কাজটি হাত দিয়ে করে থাকেন। খুব অল্প খরচে ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র কিনে অনায়াসে মোচা থেকে ভুট্টা ছাড়াতে পারেন।
 
ভুট্টা (খরিফ)
গ্রীষ্মকালীন ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এখনই বীজ বপন করতে হবে। এজন্য শতাংশপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ গ্রাম বীজ লাগবে। আর প্রতি শতাংশ জমিতে সার লাগবে ইউরিয়া ৩৬৫ গ্রাম, টিএসপি ২২২ গ্রাম, এমওপি ১২০ গ্রাম, জিপসাম ১৬০ গ্রাম এবং দস্তা সার ১৬ গ্রাম।
 
পাট
এ মাসের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপন করা যায়। পাটের ভালো জাতগুলো হলো ও-৯৮৯৭, ওএম-১, সিসি-৪৫, বিজেসি-৭৩৭০, সিভিএল-১, এইচসি-৯৫, এইচ এস-২৪। স্থানীয় বীজ ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাতগুলো সংগ্রহ করতে পারেন। পাট চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করে আড়াআড়িভাবে ৫/৬টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশে ১৭ থেকে ২০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। তবে ছিটিয়ে বুনলে আরেকটু বেশি অর্থাৎ ২৫-৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। পাটের জমিতে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৭-১০ সেন্টিমিটার রাখা ভালো। ভালো ফলনের জন্য শতাংশপ্রতি ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৬০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমওপি সার শেষ চাষের সময় মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। জমিতে সালফার ও জিংকের অভাব থাকলে জমিতে সার দেয়ার সময় ৪০০ গ্রাম জিপসার ও ২০ গ্রাম দস্তা সার দিতে হবে। চারা গজানোর ১৫ থেকে ২০ দিন পর শতাংশপ্রতি ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। এর ৩০ থেকে ৪০ দিন পর দ্বিতীয়বারের মতো শতাংশপ্রতি ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
 
অন্যান্য মাঠ ফসল
রবি ফসলের মধ্যে চিনা, কাউন, আলু, মিষ্টি আলু, চিনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন যদি এখনও মাঠে থাকে তবে দেরি না করে সাবধানে তুলে ফেলতে হবে। কাটা/তোলা, বাছাই, মাড়াই, পরিষ্কার, শুকানো এবং সংরক্ষণসহ প্রতিটি ধাপে লাগসই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করলে খরচ কমে যাবে, লাভ বেশি হবে। খেয়াল রাখতে হবে এ সময়ে বা সামান্য পরে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পচনশীল ফসল সেজন্য তাড়াতাড়ি কেটে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।
 
শাকসবজি
গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি চাষ করতে চাইলে এখনই বীজ বপন বা চারা রোপণ শুরু করতে হবে। সবজি চাষে পর্যাপ্ত জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে জৈবসার ব্যবহার করলে সবজি ক্ষেতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির জন্য জমি তৈরি, মাদা তৈরি, সার প্রয়োগের কাজ করতে হবে এখনই। এ সময় গ্রীষ্মকালীন টমেটো, ঢেঁড়স, বেগুন, করলা, ঝিঙ্গা, ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, শসা, ওলকচু, পটোল, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, লালশাক, পুঁইশাক এসব সবজি চাষ করতে পারেন।
 
গাছপালা
এ সময় বৃষ্টির অভাবে মাটিতে রসের পরিমাণ কমে আসে। এ অবস্থায় আপনার গাছের গোড়ায় পানি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আম গাছে হপার পোকার আক্রমণ হলে অনুমোদিত কীটনাশক যেমন- সিমবুস/ফেনম/ডেসিস ২.৫ ইসি প্রভৃতি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সময় প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার নিম্ফ দেখা যায়। আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার আগেই একবার এবং এর একমাস পর আর একবার প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ১.০ মিলি সিমবুস/ফেনম/ডেসিস ২.৫ ইসি মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপাল ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। তাছাড়া এ সময় আমে পাউডারি মিলডিউ ও অ্যান্থাকনোজ রোগ দেখা দিতে পারে। টিল্ট, রিডোমিল গোল্ড বা ডায়থেন এম ৪৫ অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। কলা বাগানের পার্শ্ব চারা, মরা পাতা কেটে দিন। এখন পেঁপের চারা রোপণ করতে পারেন। তাছাড়া নার্সারিতে চারা উৎপাদনের জন্য বনজ গাছের বীজ বপন করতে পারেন। যাদের বাঁশ ঝাড় আছে তারা বাঁশ ঝাড়ের গোড়ায় মাটি ও জৈব সার প্রয়োগ করতে পারেন।
 
প্রাণিসম্পদ
শীতকাল শেষ হয়ে এখন গরম পড়ছে। এ সময়টা পোলট্রি খামারি ভাইদের বেশ সতর্ক থাকতে হবে। কারণ শীতকালে মোরগ-মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। সে কারণে রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। তাছাড়া ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই এর অভাব ও দেখা দিতে পারে। তাপমাত্রার বৃদ্ধি ও কমে যাওয়ার কারণে বিরূপ আবহাওয়ায় মোরগ- মুরগির খাবার গ্রহণেও অনীহা দেখা দেয়। এসব সমস্যা সমাধানে টিকা প্রদান, ভিটামিন সরবরাহ করতে হবে। খোলা শেডে বায়ু চলাচলের মাত্রা বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর লেয়ার হাউস ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শেডের চাল বা ছাদে তাপ বিকিরণ করতে পারে এমন সাদা, অ্যালুমিনিয়াম রঙ দেয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত গরমে পাইপ বা ঝর্ণার মাধ্যমে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র খামারের ক্ষেত্রে চালের উপরে পাটের চট দিয়ে পানি ছিটাতে হবে। প্রচণ্ড গরমে খাবারের পানির সঙ্গে বরফ মেশানো দরকার। সঙ্গে ইলেকট্রোলাইট ও ভিটামিন সি দিলে ভালো হয়।
 
চৈত্র মাসে বেশ গরম পড়ে, তাই গবাদিপশুর এ সময় বিশ্রামের প্রয়োজন। আপনার গবাদিপশুকে ছায়ায় রাখতে হবে এবং বেশি বেশি পানি খাওয়াতে হবে, সেই সঙ্গে নিয়মিত গোসল করাতে হবে। আর গবাদিপশুর গলাফুলা, তড়কা, বাদলা রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
মৎস্য সম্পদ
এ সময় রুই জাতীয় মাছের পোনা আঁতুড় পুকুরে ছাড়ার উপযুক্ত সময়। আর তাই এখনও আঁতুড় পুকুর তৈরি না হয়ে থাকলে তা করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে নিচ থেকে পচা কাদা তুলে ফেলতে হবে শতাংশপ্রতি এবং শতাংশপ্রতি ১ কেজি চুন প্রয়োগ করতে হবে। চুন দেয়ার ১০ থেকে ১৫ দিন পর পুকুরে শতাংশপ্রতি ১০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার সার দিতে হবে। রেণু পোনা ছাড়ার অন্তত ১৫ দিন আগে আঁতুড় পুকুরে ১ থেকে ১.৫ মিটার পানি জমিয়ে রাখতে হবে। আঁতুড় পুকুর তৈরি হলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে আঁতুড় পুকুরে ঘন মশারির জাল টেনে কেরোসিন ও ডিজেল পরিমাণ মতো ব্যবহার করে ব্যাঙাচি ও অন্যান্য জলজ পোকা মেরে ফেলতে হবে। পানি ভর্তি পুকুরে প্রতি শতাংশে ৬ ফুট পানির জন্য ১ কেজি চুন গুলে ঠাণ্ডা করে দিতে হবে। রেণু পোনা মাটির পাত্রে বহন না করে পলিথিন ব্যাগে অক্সিজেন গ্যাস দিয়ে বহন করতে হবে। রেণু পানা আঁতুড় পুকুরে সরাসরি না ছেড়ে সংগৃহীত রেণু পোনাগুলোকে পুকুরের পানির নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা দরকার। রেণু ছাড়ার তৃতীয় দিন থেকে আঁতুড় পুকুরে পরিপূরক খাবার সরবরাহ করা প্রয়োজন।
 
সুপ্রিয় পাঠক পাঠিকা প্রতি বাংলা মাসেই কৃষিকথায় কৃষি কাজের জন্য অনুসরণীয় শিরোনামে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়ে থাকে। এগুলোর বিস্তারিত ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণের জন্য আপনার কাছের কৃষি বিশেষজ্ঞ, মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে জেনে নিতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত প্রয়াসে, আন্তরিকতায়, শ্রমে, যথার্থ বিনিয়োগে উন্মোচিত হবে একটি সুখী, স্থায়ী সমৃদ্ধ কৃষি ভুবন। কৃষির সমৃদ্ধিতে আমরা সবাই গর্বিত অংশীদার। আপনাদের সবাইকে নববর্ষের অগ্রিম শুভেচ্ছা।
 
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন
* সহকারী তথ্য অফিসার (শস্য উৎপাদন), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫
বিস্তারিত
সম্পাদকীয় ফাল্গুন-১৪২১
ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি।  রবি ফসলের সমারোহ আর শিমুল-পলাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুলকিত করে গ্রামবাংলার কৃষক-কৃষাণির হৃদয়-মন। এ মৌসুমে একদিকে যেমন বিভিন্ন শাকসবজি উৎপাদিত হয় অন্যদিকে বোরো মৌসুমের ধান উৎপাদনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধানের ওপরই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বহুলাংশে নির্ভরশীল। এজন্য কৃষির সার্বিক উন্নয়নে সুপরিকল্পিতভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এ দেশের সরকার, কৃষি গবেষক, সম্প্রসারণবিদ, কৃষিকর্মী, কৃষক-কৃষাণি  সবাই।  বোরো মৌসুমে ধানের ফলন কিভাবে বাড়ানো যায় সে প্রচেষ্টা আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে অব্যাহত রাখতে হবে। পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে তালমিলিয়ে ধানের চারা রোপণ, সার ও সেচ প্রয়োগ, রোগবালাই, পোকামাকড় দমন প্রভৃতি কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। বোরোর বাম্পার ফলনের প্রত্যাশায় কৃষক, সম্প্রসারণকর্মী সবাই ব্যস্ত থাকেন ক্ষেতখামারে। সবাই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবার আশা-আকাক্সক্ষা-প্রত্যাশা পূর্ণতা লাভ করুক এটাই আমরা আশা করি।

সুপ্রিয় পাঠক ও চাষি ভাইয়েরা আপনারা জানেন, আলু এ দেশের একটি অন্যতম প্রধান কন্দালজাতীয় সবজি ফসল। বর্তমানে দেশে ৪.৭২ লাখ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হচ্ছে এবং প্রায় ৮৫ লাখ টন ফলন পাওয়া যাচ্ছে। আলু সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে সারা বছর খেতে পারলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পুষ্টি উপাদানের দিক থেকে আলু ভাতের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া আলু দিয়ে রকমারি মুখরোচক খাবারও তৈরি করা যায়। বর্তমান সরকার আলুর গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রফতানি করছে। অদূর ভবিষ্যতে আলুর ব্যবহার ও রফতানি আরও সম্প্রসারিত হোক এটাই আমরা কামনা করি।

চাষি ভাইয়েরা, আপনারা জানেন, ব্রিটিশ বেনিয়াদের অত্যাচার নির্যাতনের ইতিহাসসমৃদ্ধ নীল চাষ দেশের উত্তরাঞ্চলে আবার চালু হয়েছে। তবে এবারের নীল চাষে কাউকে বাধ্য করা নয়; দেশের প্রয়োজনে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে করা হচ্ছে। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি বিশেষ করে ক্ষতিকর ফসল তামাকের পরিবর্তে নীল চাষ করে দেশ সমৃদ্ধ হোক এটা সবারই কাম্য।
 
কৃষির আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হোক এ কামনা করে সবাইকে নিরন্তর শুভেচ্ছা।
বিস্তারিত

Share with :