কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

বাংলাদেশে অর্কিড চাষ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
পরিচিতি ও ব্যবহার
ফুলের রাজ্যে অর্কিড এক অনিন্দ সুন্দর ফুল। এর খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ফুল উৎপাদনোক্ষম উদ্ভিদ জগতে অর্কিড একটি বিশাল পরিবার যার প্রায় ৯০০ গণ এবং ৩০,০০০ এরও অধিক প্রজাতি রয়েছে। আকর্ষণীয় রঙ, বিভিন্ন ধরনের গড়ন, সুগন্ধ, ঔষধি গুণাগুণ, দীর্ঘ স্থায়িত্বকাল এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অর্কিড ফুলের গঠন বৈচিত্র্যে বিস্মিত হয়ে প্রাচীন চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস ‘একে সেরাফুল’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। দার্শনিক প্লেটো, এরিস্টোটল, থিওফ্রাসটাস আদর করে এ ফুলের নাম দিয়েছিলেন অর্কিস। কালক্রমে এ নামটিই বিবর্তিত হয়ে অর্কিড হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তর প্রজাতির অর্কিড জন্মাতে দেখা যায়। যে কারণে এর আদি বাসস্থানও এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। হিমালয়ের পূর্বাংশে ঘাসিয়া পাহাড়, বাংলাদেশের সিলেট জেলার উত্তরে পাহাড়ি অঞ্চল, থাইল্যান্ড, বার্মা, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, ফিলিপিনস, মেস্কিকো, দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার উষ্ণ অঞ্চলে অর্কিড পাওয়া যায়। এই ফুল অর্কিডেসি পরিবারের সদস্য। ফুলদানিতে দীর্ঘকাল সজীব থাকে বলে কাটফ্লাওয়ার হিসেবে এর ব্যবহার সর্বাধিক। এ ছাড়া ছোট অবস্থায় এর গাছও শোভা বৃদ্ধি করে।  

অর্কিডের শ্রেণী ও জাত
চাষ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে অর্কিড প্রধানত ২ প্রকার।
পার্থিব বা  Terrestrial

যেসব অর্কিড অন্যান্য ফুলের মতো মাটিতে জন্মায় এবং সেখান থেকে খাদ্য ও রস সংগ্রহ করে, তাদের পার্থিব অর্কিড বলে। এদের সুতার মতো সরু গুচ্ছ মূল থাকে। যেমন- ফায়াস, সিমবিডিয়াম, লেডি স্লিপার ইতাাদি।

পরাশ্রয়ী বা Epiphytic
যেসব অর্কিড অন্য কোন গাছের শাখা বা কাণ্ডের উপর আশ্রিত হয়ে জন্মে তাদের পরাশ্রয়ী অর্কিড বলে। এদের লম্বা, মোটা ও পুরু মূল থাকে, বাতাস থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। যেমন ডেনড্রোবিয়াম, ভ্যান্ডা, এরিডিস ইতাাদি।
Growth habit এর ওপর ভিত্তি করে অর্কিড আবার ২ প্রকার

সিমপোডিয়াল (Sympodial)
প্রতি বছর Pseudobulb হতে অথবা কাণ্ডের গোড়া হতে শাখা বের হয় এবং শাখার অগ্রভাগ থেকে ফুল উৎপাদিত হয়। যেমন- ফেলেনপসিস, ক্যাটেলিয়া, ডেনড্রোবিয়াম, অনসিডিয়াম, সিমপোডিয়াম উল্লিখিত প্রজাতি।

মনোপডিয়াল (Monopodial)
একটি লম্বা কাণ্ড থাকে যা প্রতি বছর প্রতি ঋতুতে বর্ধনশীল অংশ থেকে পাতা এবং পত্রাক্ষ থেকে ফুল উৎপাদনের মাধ্যমে লম্বায় বাড়তে থাকে। যেমন- ভ্যান্ডা, এরিডিস, রিনকোস্টাইলিস ইত্যাদি।

জলবায়ু ও মাটি
সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া অর্কিড চাষের জন্য উত্তম। প্রজাতি ভেদে ১০-৩০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় অর্কিড ভালো জন্মে। আধো আলোছায়া এরূপ স্থান ফুল চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত। Terrestrial বা পার্থিব শ্রেণীর জন্য দো-আঁশ মাটি ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া উপযুক্ত বায়ু চলাচল এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক।

বংশবিস্তার
যৌন ও অযৌন উভয় পদ্ধতিতেই অর্কিডের বংশবিস্তার করা যেতে পারে। যৌন পদ্ধতিতে বংশবিস্তার কষ্টসাধ্য বলে অযৌন উপায়েই সচরাচর এর বংশবিস্তার করা হয়ে থাকে। সাধারণত অফসেট, ডিভিশন, কেইকিস এবং কাটিংয়ের মাধ্যমে অংগজ বংশবিস্তার করা হয়ে থাকে। ডেনড্রোবিয়াম এবং এপ্রিডেনড্রাম শ্রেণীর অর্কিডে কেইকিসের মাধ্যমে বা অফসেট আলাদা করে ছোট পটে লাগিয়ে চারা তৈরি করা যায়। সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে যখন গাছের  বৃদ্ধি নতুন করে শুরু হয় তখনই অংগজ বংশবিস্তারের উপযুক্ত সময়। এছাড়া টিস্যু কালচারের মাধ্যমে সফলতার সঙ্গে ডেনড্রোবিয়াম, সিমবিডিয়াম, ফেলেনপসিস ও ক্যাটেলিয়ার অসংখ্য চারা উৎপাদন করা যায়। সংকরায়নের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন অথবা চারার বর্ধনশীল অঙ্গ বা নোড হতে চারা উৎপাদন প্রতিটি ক্ষেত্রেই টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরির মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হয়। উৎপাদিত চারাগুলোর মূল গজানোর পর ল্যাব হতে বের করে স্বল্পালোক ও অধিক আর্দ্রতায় চারাগুলোকে প্রায় দু’সপ্তাহ রেখে সহনশীল করতে হয়। পরবর্তীতে প্রায় ৬ মাস ‘থাম্ব পটে’ নারিকেলের ছোবড়ার মধ্যে রেখে পরিচর্যার মাধ্যমে একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়। ‘থাম্ব পটে’ চারাগুলো ৪-৬ ইঞ্চি বড় এবং প্রচুর শিকড় সমৃদ্ধ হয়ে কমিউনিটি পটে প্রয়োজনমাফিক নারিকেলের ছোবড়া (Hask) অথবা কাঠকয়লা দিয়ে স্থানান্তর করতে হয়।

চাষ পদ্ধতি
পার্থিব বা  Terrestrial  অর্কিড
টব, গামলা বা ঝুলন্ত বাস্কেটে চাষ করা যেতে পারে। এগুলোর যে কোনো একটির ভেতরের তলদেশে কয়লা, খোয়া অথবা ঝামার টুকরা স্থাপন করতে হয় এবং এর উপরে নারিকেলের ছোবড়ার টুকরা ছড়িয়ে দিতে হয়। এরপর প্রয়োজনমতো পানি সেচ দিতে হয়। অতিরিক্ত পানি প্রয়োগ সব সময় পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।

পরাশ্রয়ী  বা Epiphytic অর্কিড
বিশেষ ধরনের টব কাঠের বা মাটির টবে পাশে ও নিচে বড় বড় ছিদ্রসহ অথবা বাঁশের ঝুড়িতে চাষ করা যায়। মরা কাঠের ওপর জন্মানোর ক্ষেত্রে আম, জারুল বা কড়ই গাছে রশি দিয়ে সঙ্গে নারিকেলের ছোবড়াসহ বেঁধে দেয়া যেতে পারে।

ক্রমপ্রসারমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অথবা কাট ফ্লাওয়ারের উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে কমিউনিটি পটের পরিবর্তে বিছানা পদ্ধতিতে ডেনড্রোবিয়াম প্রজাতির চাষ এখন বাংলাদেশ উৎসাহিত হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে মাটি থেকে ৬০ সেমি. উঁচুতে ১ মি. চওড়া ও প্রয়োজনমাফিক লম্বায় কাঠ, বাঁশ অথবা অন্য কোন উপাদান দিয়ে মাচা তৈরি করা হয়। ওই মাচায় নারিকেলের ছোবড়া স্থাপনপূর্বক ৪টি সারিতে ডেনড্রোবিয়াম প্রজাতির অর্কিড গাছ প্রতি বর্গমিটার ৪০টি হারে স্থাপন করা হয়। এ পদ্ধতিতে প্রথম বছর ২০% গাছে একটি করে ফুল, দ্বিতীয় বছর ১০০% গাছে ৩-৪টি করে ফুল, তৃতীয় বছর ৪-৫টি করে ফুল উৎপাদিত হতে দেখা যায়। তৃতীয় বছর ফুল ছাড়াও অর্কিডের প্রচুর চারা উৎপাদিত হয় যা বিক্রয়যোগ্য।

সেচ ও সার
অর্কিডের চারদিকে বাতাস সব সময় আর্দ্র রাখতে হয়। অর্কিড গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য চা চামচের এক-চতুর্থাংশ (১/৪ অংশ) প্রতি সারের যেমন ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি এক লিটার পানির সাথে গুলিয়ে ১০-১২টি গাছে স্প্রে করা যায়। সার গুলানো পানি গাছের পাতা, ডগা ও শিকড়সহ (নারিকেলের ছোবড়া) সব জায়গায় স্প্রে করতে হবে। ইউরিয়া সার খুব সহজে পানিতে গুলে যায়। কিন্তু টিএসপি ও এমওপি পানিতে গুলতে বেশ সময় নেয়। এজন্য দানাদার টিএসপি ও এমওপি এক লিটার পানির জন্য পরিমাণমতো গুঁড়ো করে নিতে হবে। তারপরও সবগুলো সার পানিতে দেয়ার পর নিচে কিছু তলানি পাওয়া যাবে। এজন্য সারগুলো পানিতে গুলানোর পর, কিছু সময় অপেক্ষা করে আলতোভাবে ওপর থেকে পরিষ্কার পানিটুকু স্প্রে করার জন্য ঢেলে নিতে হবে। সাধারণভাবে অর্কিড গাছে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ফুল দেয়া আরম্ভ হয়। তখন থেকে সারের মাত্রায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়। ফুল দেয়ার সময় চা চামচের এক-দশমাংশ (১/১০) ইউরিয়া, এক চামচ টিএসপি ও এক-চতুর্থাংশ (১/৪) এমপি সার এক লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে ১০-১২টি গাছে স্প্রে করা যায়। বাজারে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক তরল সার যেমন Phostrogen, OhioW.P. দ্রবণ পাওয়া যায়। তবে লক্ষ রাখতে হবে যেন কোনো ক্রমেই অতিরিক্ত পানি সিঞ্চন করা না হয়। সাধারণত অর্কিডের শারীরিক বৃদ্ধির জন্য ২০-১০-১০ আনুপাতিক হারে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশের দ্রবণ প্রতি সপ্তাহে একবার করে স্প্রে করতে হয়। গাছের বৃদ্ধির প্রতি লক্ষ রেখে নাইট্রোজেনের পরিমাণের তারতম্য হতে পারে। পূর্ণবয়স্ক গাছে ফুল ফোটা ত্বরান্বিত করার জন্য ২০-২০-২০ হারে উল্লিখিত সারগুলো প্রয়োগের সুপারিশ করা যায়।

অর্কিডের রোগ-পোকা
টব, কন্দ, শিকড় সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা চাই। ১০-১৫ দিন পর পর গাছে-সেভিন পাউডার ছড়িয়ে দেয়া  উচিত। তাহলে পিঁপড়া, পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। আঁশ পোকা ও মাকড়সার উপদ্রব দেখলে সাবান পানি ছিটানো উচিত। থ্রিপস, মিলিবাগ ও এফিডের জন্য ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি ২ মিলি. হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-৮ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। ইঁদুরের উপদ্রব হলে বিষটোপ ব্যবহার করা যেতে পারে। পাতায় ও পেটালের ব¬াইট রোগ হলে আক্রান্ত পাতা ও পেটাল পচে যায়। রোগাক্রান্ত হলে প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ০.৫ মিলি. টিল্ট অথবা চা চামচের আধা চামচ ডাইথেন এম-৪৫ ভালোভাবে পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৭-১০ দিন পর পর গাছে স্প্রে করতে হবে। ০.৫ মিলি. টিল্ট মাপার জন্য অনেক সিরাপ জাতীয় ওষুধের সঙ্গে ড্রপার দেয়া থাকে, তার সাহায্যে মাপা যাবে। নেমাটোড আক্রান্ত গাছের চারপাশে ফুরাডান ছিটিয়ে দেয়া উচিত। চাষের যন্ত্রপাতি শোধন করে ব্যবহার করা ভালো।

ফুল সংগ্রহ
সারা বছর জাতভেদে অর্কিডের ফুল ফোটে তবে দেশীয় অর্কিড মার্চ-মে মাসে সর্বাধিক পাওয়া যায়। কিছু কিছু ডেনড্রোবিয়াম অর্কিড বছরে ২-৩ বার ফোটে। প্রতি গাছে জাতভেদে ২-৪টি স্টিক পাওয়া যায়। খুব সকালে অথবা বিকেলে ফুলের নিচের কুঁড়ি ২/১ টা ফোটা মাত্রই কাটা উচিত। ফুলের স্থায়িত্বকাল বাড়ানোর জন্য ২-৩% সুক্রোজ কার্যকরী। বৃষ্টির সময় অথবা ভেজা অবস্থায় ফুল চয়ন করা উচিত নয়। ফুল সংগ্রহের পর পরই এর ডাটার গোড়া পানিতে ডুবিয়ে রাখলে ফুল বেশি দিন সতেজ থাকে।

বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা
ফুলের বিশ্বব্যাপী চাহিদা ক্রমান¦য়ে বেড়েই চলেছে। এটা এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক উল্লেখযোগ্য পণ্য যার মূল্য হাজার হাজার কোটি ডলার। পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল উৎপাদিত হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফুলের উৎপাদন ও বিপণন ক্রমে ক্রমে শিল্পপণ্য উৎপাদনসম বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে, যাকে এখন ‘পুষ্পশিল্প’ বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এ শিল্পের সর্বাধিক বিকাশ ঘটেছে হল্যান্ডে। হল্যান্ড প্রতি বছর ফুল, বাহারি গাছ ও সংশ্লিষ্ট দ্রব্য রপ্তানি করে ৯০০০ মিলিয়ন ট$ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। হল্যান্ড নিজেদের উৎপাদিত এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত বাহারি গাছ অন্যান্য দেশে রপ্তানি করে। বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু নানা রকম অর্কিড ফুল উৎপাদনের উপযোগী। উল্যাহ এবং হেরেথ (২০০২) এর সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশ বিভিন্ন অর্কিড ফুল ও গাছ যেমন- ডেনড্রোবিয়াম, অনসিডিয়াম, মোকারা, ভ্যান্ডা, ক্যাটেলিয়া, এরিডিস, ফেলেনপসিস এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর দাবি রাখে। পুষ্পশিল্পের সর্বাধিক উন্নয়ন হয়েছে গত পঞ্চাশ বছরে এবং এতে কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, থাইল্যান্ড প্রতি বছর বিশ্বের ৫০টি দেশে কমপক্ষে চার কোটি ডলার মূল্যের অর্কিড রপ্তানি করে। ভারত, মালয়শিয়া, তাইওয়ান, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুরও অর্কিড ফুল রপ্তানিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ফুলচর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও কিছু কিছু অগ্রগতি হয়েছে। দেশের সব এলাকায় বহুসংখ্যক নার্সারি গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় এখন মানুষ নার্সারিতে গেলে ফলের চারা ক্রয়ের সাথে সাথে দু-একটি ফুলের চারাও ক্রয় করে নিয়ে আসে। দেরিতে হলেও ১৯৮২-৮৩ সন থেকে বাংলাদেশে অর্থকরী ফসল হিসেবে ফুল উৎপাদন ও ফুলের ব্যবসায় শুরু হয়েছে। এক সমীক্ষায় জানা গেছে, বাংলাদেশে এখন প্রায় ১০,০০০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়। প্রাপ্ত তথ্য মতে, শুধু মাত্র ঢাকা শহরেই ৫০-৫৫টি স্থায়ী এবং ২০০-২৫০টি অস্থায়ী দোকান রয়েছে যার প্রতিটি দোকানের প্রতিদিনের গড় বিক্রি ৪০০০-৫০০০ টাকা। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশে ২০০৮ সনে ফুলের রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩৭৬ কোটি টাকা এবং বছরে আনুমানিক ৪ কোটি টাকার ফুল বেচাকেনা হয়।

প্রাপ্ত সূত্র মতে, সবুজে ভরপুর আমাদের এ উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে প্রায় ৮০টির অধিক অর্কিড প্রজাতি রয়েছে। অধুনা অর্কিড সোসাইটি, কিছু এনজিও, প্রাইভেট নার্সারি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন- BRAC, PROSHIKA, SQUARE, Kingshuk Nursery, Dipta Orchid Ltd., Micro Orchid Ltd., Omni Orchid Ltd., Energypac Agro. Ltd., Duncan Brothers Bangladesh Ltd., Alpha Agro. Ltd., Wonderland Toys, Krishibid Orchid and Cactus Nursery, Krishibid Upakaran Nursery, Sabuj Nursery, Hortus Nursery, Kashbon Nursery, Ananda Nursery এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে দেশি-বিদেশি জাতের অকির্ড পাওয়া যায়, যা বিদেশে রপ্তানিযোগ্য। এছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে বৃক্ষমেলা, পুষ্পমেলা, অর্কিডশো এমনকি কৃষি মেলাতেও কিছুকিছু শৌখিন প্রদর্শনকারী তাদের স্টলে বাহারি জাতের কিছু অর্কিডের সমাবেশ ঘটান- যা সত্যিই প্রশংসনীয়।

এক সময় হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে কোন অর্কিডই ছিল না, সে দেশের প্রাচীন মানুষ কখনো অর্কিড দেখেনি। প্রথমে শখের বাগান, তারপর শুরু হয় অর্কিডের বাণিজ্যিক চাষ। এরপর ধীরে ধীরে হাওয়াই হয়ে ওঠে অর্কিডের স্বপ্নরাজ্য। আর ওদের পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তেমনি এখন পেছনে তাকানোর সময় নেই অর্কিডের রানী থাইল্যান্ড ও তাইওয়ানের। বিশ্বে এখন অর্কিডের সবচেয়ে বড় বাজার বসে তাইওয়ানে। তাইওয়ান এখন বিশ্বে সবচেয়ে বড় অর্কিড রপ্তানিকারক দেশ। প্রতি বছর মার্চে তাইওয়ানে তাইওয়ানিজ ইন্টারন্যাশনাল অর্কিড শো অনুষ্ঠিত হয়। সেটি বিশ্বের প্রধান তিনটি অর্কিড শোর একটি। সিঙ্গাপুরেও সম্প্রতি গড়ে তোলা হয়েছে সিঙ্গাপুর বোটানিক গার্ডেনের মধ্যে একটি ন্যাশনাল অর্কিড গার্ডেন। মালয়েশিয়ার ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে আছে অনেক অর্কিড গার্ডেন। তারা শুধু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই অনসিডিয়াম, ডেনড্রোবিয়াম, ফেলেনপসিস ইত্যাদি উৎপাদন করছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ডেনড্রোবিয়াম অর্কিড উৎপাদনকারী দেশ থাইল্যান্ড আমেরিকার প্রয়োজনের বৃহদাংশ (৯৭%) সরবরাহ করে থাকে। কোটি কোটি ডলার তারা শুধু অর্কিড বাণিজ্য করেই উপার্জন করছে। অর্কিড চাষ তাই থাইল্যান্ডে শিল্পের মর্যাদা লাভ করেছে। এসব দেখে ও জেনে মনে হয় আমাদের যে অর্কিড সম্পদ রয়েছে সেগুলো নিয়েও আমরা ওদের মতো অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে পারি। বৃহত্তর সিলেট, বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, যশোর, রাজশাহী অর্কিডের জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

রপ্তানিযোগ্য বাংলাদেশে অভিযোজনক্ষম অর্কিডগুলো : ফুলের ব্যবহার কোন দেশ বা জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর্থিক দিক থেকে যে জাতি যত সমৃদ্ধ, সে জাতির কাছে ফুলের কদরও তত বেশি। বর্তমানে অনেক দেশ শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্ডিয়ায় অর্কিডের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে এবং এ বিশেষ ক্ষেত্রটি দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বিশ্ব এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ফুলের চাহিদা অনুসারে সরবরাহ কম। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশে ফ্লোরিকালচার শিল্প গড়ে তুলতে পারলে লাখ লাখ লোক আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, অপরদিকে অভ্যন্তরীণ ফুলের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।
 
 
ড. কবিতা আনজু-মান-আরা*
খাইরুল কবির**
ড. এস এম শরিফুজ্জামান***
*ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফুল বিভাগ, উগকে, বারি, গাজীপুর **প্রভাষক, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ***প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফুল বিভাগ, উগকে, বারি, গাজীপুর
বিস্তারিত
বাংলাদেশের পরিবর্তিত জলবায়ু উপযোগী কৃষি

জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর ধারাবাহিক অসামঞ্জস্যতা বাংলাদেশের কৃষির সামনে একটি প্রধান সমস্যা হতে চলেছে। তাপমাত্রার ক্রমবৃদ্ধির ফলে অনেক ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে অন্য দিকে আগাছা, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে অঞ্চলভেদে সেচের মাধ্যমে আবাদকৃত ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাবে যার কারণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং মাটিতে পানির সহজলভ্যতার পরিবর্তন। ফসলের উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণভাবে কমে যাচ্ছে এর কারণ উৎপাদন মৌসুমের স্থায়ীকাল হ্রাস; যার ফলে ফসলের বংশবৃদ্ধি এবং দানা গঠনের ওপর প্রভাব ফেলে। পরিবর্তিত জলবায়ু উপযোগী কৃষি (climate resilient agriculture) বলতে অভিযোজন এবং ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং সর্বস্তরে উপযোগী জীববৈচিত্র্য আনায়ন ইত্যাদি বোঝায় যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে টেকসই কৃষির উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।


জলবায়ু সুসামঞ্জস্য কৃষি (climate smart agriculture) একটি ক্রিটিক্যাল প্রক্রিয়া, যা টেকসই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, ফসলের অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্রিন হাউস গ্যাসগুলো হ্রাসকরণ/নিয়ন্ত্রণ করে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন এবং উন্নয়নের লক্ষ্য নিশ্চিত বুঝায়। জলবায়ু সুসামঞ্জস্য কৃষি নিশ্চিত করতে হলে আমাদের কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে যার মধ্যে থাকবে উপযুক্ত নীতিমালা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং কৃষি কাজে নিয়োজিত তথ্যসমৃদ্ধ এবং প্রয়োজনীয় সম্পদশালী জনগোষ্ঠী ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের ওপর প্রভাব-

১. ধান
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিনির্ভর অঞ্চলে খরা ও অতিবৃষ্টি ধান উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। হিসাব করে দেখা  গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারতে ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বৃষ্টিনির্ভর ধান চাষে ফলন ৬% এবং একই সময়ে সেচনির্ভর ধান চাষে ফলন ৪% কমবে। বাংলাদেশের খরা এবং বৃষ্টি দিন (rainy day) সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার ফলে ধানের ফলনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

২. ভুট্টা
তাপমাত্রা পরিবর্তনের সাথে সাথে বপন তারিখ ভুট্টার বৃদ্ধি এবং ফলনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এ ক্ষেত্রে ভুট্টার প্রভাব লক্ষণীয়। এ অবস্থায় সেচনির্ভর ভুট্টা চাষে অভিযোজন কৌশল হিসেবে উন্নত এবং তাপসহিঞ্চু জাত নির্বাচনের পাশাপাশি অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করলে ফলন বৃদ্ধি পাবে।

৩. আলু
আলুর উৎপাদন মৌসুম সংক্ষিপ্ত এবং শীত কম তীব্রতর হওয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে আলুর ফলনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। প্রধান প্রধান আলু উৎপাদন অঞ্চলে আলু ও ভুট্টা মিশ্রচাষ অথবা রিলে ক্রপিং সিস্টেম এ ক্ষেত্রে কাম্য। বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে এনসিডিপির মাধ্যমে উদ্ভাবিত ভুট্টা-আলু/মুগ রিলে শস্য সিস্টেম সারা দেশে ব্যাপকভাবে অভিযোজিত করে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।

৪. ফুল
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ফুল উৎপাদনকারী উদ্ভিদ এবং ফসলে লক্ষণীয় হবে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অংশবিশেষ যশোরসহ প্রধান প্রধান ফুল উৎপাদনকারী অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি এবং তাপমাত্রার মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তনের ফলে ফুল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে বিশেষ করে যেখানে উন্মুক্ত মাঠে ফুল চাষ হয় সে ক্ষেত্রে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে গাছে ফুল সংখ্যা হ্রাস, অনুপোযুক্ত ফুল ধারণ, বর্ণ পরিবর্তনের পাশাপাশি ফুলের আকার ছোট হবে এবং ফুল ধারণকাল স্বল্পস্থায়ী হবে। অভিযোজন কৌশল হিসেবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল (উঁচু এলাকায়) নতুন এলাকা উৎপাদনের দ্বার উন্মোচন করে দিতে পারে। এভাবে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে ফুল চাষে যে ক্ষতি হচ্ছে সেটা পুষিয়ে নেয়ার জন্য নতুন এলাকা যেখানে শীত তুলনামূলকভাবে  বেশি সেসব স্থানে সার্থকভাবে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ শীতের ফুল প্রজাতি চাষ করা যেতে পারে। শরৎ থেকে শীতকালে গ্লাডিওলাস ফুলচাষ সোনাতলা (বগুড়া), সাদুল্লাপুর (গাইবান্দা), বাগাতিপাড়া (নাটোর), গোদাগাড়ী (রাজশাহী), পাবনা সদর প্রভৃতি স্থানে স্থানান্তর করা যেতে যারে। দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্প-এসসিডিপি এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রদর্শনী ও সমীক্ষা চালিয়ে বিষয়টি সুনিশ্চিত হয়েছে।

গোদাগাড়ী, রাজশাহীতে চাষ হচ্ছে গ্লাডিওলাস ফুল (মাঠ দিবসে সংশ্লিষ্ট এডি, ইউএওসহ এলাকার চাষিরা)

৫. নারিকেল
ভারতে নারিকেল উৎপাদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শীর্ষক একটি প্রতিবেদন সিমুলেশন স্টাডির মাধ্যমে করা হয়েছে। এটা ধারণা করা হয় যে, ভারতের পশ্চিম উপকূলবর্তী  অঞ্চলে (মহারাস্ট, কেরালা এবং তামিলনাড়–র অংশ বিশেষ) জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে কিন্তু পূর্ব উপকূলবর্তী অঞ্চলে (অন্ধপ্রদেশ, উড়িষ্যা এবং তামিলনাড়– ও পশ্চিমবঙ্গের অংশ বিশেষ) নারিকেল উৎপাদন কমে যাবে। ভারতের অধিকাংশ নারিকেল আবাদকৃত অঞ্চল এমনকি বাংলাদেশেও নারিকেলের মারাত্মক মাকড় আক্রমণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। খাটো ও লম্বা জাতের নারিকেল এক সঙ্গে চাষ এবং মাল্টি টায়ার ক্রপিং সিস্টেম অনুসরণ করে এ সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করা সম্ভব।

৬. লেবু জাতীয় ফল
ফুল আসার আগে হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি কমলা (ম্যান্ডরিন) এবং মাল্টার (মুসাম্বি) বৃদ্ধি এবং উৎপাদন এর প্রভাব ফেলে। ক্ষুদ্র সেচ ও মালচিং করে শরৎ-শীত মাসগুলোতে এ ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যাতে পারে। নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাসে অতি শুষ্কতা লেবুজাতীয় ফসলের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবে ফেলে। এ ক্ষেত্রে সম্পূরক সেচ প্রয়োগ করে এ ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

৭. পেয়ারা, লিচু ও পেঁপে
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনেক নতুন নতুন রোগ ও পোকামাকড় এখন দেখা যায়, যা আগে কখনও দেখা যেত না। পেয়ারাতে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ফ্রুট ফ্লাইয়ের সংক্রমণ দেখা যায়। কিছু কিছু এলাকায় পেঁপেতে মিলিবাগ একটি মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। শরৎ থেকে শীত পর্যন্ত আগাম বৃদ্ধি যদি ফুল ধারণের আগে হলে গাছে দৈহিক বর্ধন বৃদ্ধি পেলেও ফুল ধারণ কমে যায়। লিচুর জন্য ভালো কৃষি ব্যবস্থাপনা (good agriculture practices-GAP) ব্যবহারের জন্য প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা থেকে চাষিরা উপকৃত হতে পারেন।

জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষিতে সফলতা
বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির ফলে বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে ফসলে কার্বন রূপান্তরের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে যার ফলস্বরূপ ফসল বৃদ্ধির হার দ্রুততর, অধিক শুষ্ক পদার্থ তৈরি এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। কোন কোন ফসলের জন্য চাষাবাদ এলাকা স্থানান্তরিত হয়ে নতুন এলাকায় চলে যাবে এবং নুতন বাজার সৃষ্টি হবে। আম চাষ এখন অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রা সম্পন্ন এলাকায় স্থানান্তরিত হচ্ছে, যার ফলে বাজারে প্রাপ্যতা বৃদ্ধি অনেক দিন ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্য সম্ভাব্য ভালো লক্ষণটি হচ্ছে যে উদ্যানতাত্তিক অনেক ফসল নিয়ন্ত্রিত ও কাক্সিক্ষত পরিবেশে আবাদ করতে হচ্ছে ফলে মানসম্পন্ন ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ
অঞ্চল বিশেষে ব্যবহার উপযোগী বিজ্ঞানসম্মত অভিযোজন কৌশলই হবে জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষাকবজ। সময় উপযোগী কৃষি উপকরণ ব্যবহার এবং নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিং এ ক্ষেত্রে একান্ত কাম্য। রক্ষণশীল কৃষি (conservation agriculture) জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে সংগতিপূর্ণ কৃষিতে অবদান রাখতে সক্ষম। রক্ষণশীল কৃষি ব্যবস্থাপনায় ফসল খরার হাত থেকে রক্ষা পায় এবং স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার সুনিশ্চিত হয়। কৃষি বনায়নের মাধ্যমে পরিবেশগত এবং আর্থসামাজিক ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব। কৃষি বনায়ন মাটির ক্ষয়রোধ, মাটির জৈব পদার্থ এবং ভৌতিক গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ, মাটির গভীর স্তর থেকে খাদ্য পুষ্টি শোষণ এবং পুষ্টি চক্রকে উন্নয়নের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। বহুবর্ষজীবী ফলজ উদ্ভিদে মাল্টি টায়ার ক্রপিং সিস্টেম অথবা আন্তঃফসল ব্যবস্থাপনা একই রকমের উপকার পাওয়া যাবে।

জলবায়ু সুসামঞ্জস্য কৃষির (climate smart agriculture) কৌশল
কৃষি উপকরণ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোই এ কৌশলের মূলমন্ত্র। অতিরিক্ত পানি, সার এবং অন্যান্য এগ্রো কেমিক্যালস ইত্যাদির ব্যবহার কমিয়ে উপকরণাদি ব্যবহারের দক্ষতা অবশ্যই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ কম কৃষি উপকরণ ব্যবহার করে অধিক উৎপাদনের কৌশল নিতে হবে। টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থাপনার জন্য পানি সংরক্ষণ এবং সংগ্রহ উদ্যোগ, সেচ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও তার সঙ্গে যৌথভাবে সার ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিকভাবে উপকরণ ব্যবহারের দক্ষতার ওপর অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। স্বল্প সময়ের ফসলের (short duration crops) জাতগুলো যা খরা সহিষ্ণু এবং উদ্যান ফসলগুলো যাদের বিস্তৃত অভিযোজন ক্ষমতা রয়েছে, সেগুলো চাষের ওপর অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। উপযুক্ত আদিজোড় (root stalk) বহুবর্ষী ফলজাতীয় ফসলের অভিযোজন ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

ফসলের জন্য টেকনোলজি অ্যাসেসমন্টে মডিউল গুলো-
নিম্নেবর্ণিত টেকনোলজি অ্যাসেসমন্টে মডিউলগুলো (technology assessment modules) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য যুক্ত করা যেতে পারে।

ক. মডিউল-১ : প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা : মাটির স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো তথা ইনসিটো আর্দ্রতা সংরক্ষণ, পানি ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা এবং তা ব্যবহার, বন্যাপ্রবণ এলাকায় উন্নত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাপনা, প্রচলিত কর্ষণ ব্যবস্থাপনা (conservation tillage)। ড্রিপ ইরিগেশন শুধু পানি ও পুষ্টিই সাশ্রয় করে না বরং মাটির স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান করে।

খ. মডিউল-২ : শস্য উৎপাদন : খরা/তাপ সহিষ্ণু জাতগুলো, যেসব অঞ্চলে আগাম খরা/তাপ আসে সেখানে আগাম রবি ফসল আবাদ, পানি সাশ্রয়ী ধান চাষ পদ্ধতি যেমন-এসআরআই (system of rice intensification) ও সরাসরি বপন, উদ্যান ফসলে ফিউমিগেশনের মাধ্যমে কুয়াশা ব্যবস্থাপনা, নাবী মৌসুমের জন্য কমিউনিটি নার্সারি সিস্টেম, যথাসময়ে ফসল রোপণের জন্য কাস্টম হায়ারিং সিস্টেম (custom hiring centres), অঞ্চল বিশেষে বিশেষ বিশেষ আন্তঃফসল চাষ ইত্যাদিও ভালোভাবে পরীক্ষিত জলবায়ু পরিবর্তন উপযোগী কৃষি ব্যবস্থাপনা। কনজারভেশন কৃষি (conservation agriculture) পদ্ধতি ক্রমাগতভাবে টেকসই কৃষি এবং জলবায়ু পরিবর্তন উপযোগী কৃষি হিসেবে ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনটি প্রধান উপাদান দ্বারা গঠিত ১. ভূমি কর্ষণ হ্রাস, ২. শস্য পরিত্যক্ত অংশ মাটিতে সংযুক্ত করা এবং ৩. শস্য বহুমুখীকরণ (শস্যাবর্তন, আন্তঃফসল চাষ, রিলে ক্রপিং ইত্যাদি)। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার জন্য নাইট্রোজেন সার ব্যবহার দক্ষতা বাড়াতে হবে।

শুষ্কভূমির কৃষি, তথ্যাধিকার, জৈবপ্রযুক্তি এবং ঝুঁকি মোকাবেলা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস (মাঝারি সীমার আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ) এবং বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অন্যান্য তথ্যসমূহ যেমন খরা যার ফলে আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা নিতে পারি।

গ্রামীণ/খামার লেভেলে জলবায়ু সুসামঞ্জস্য কৃষি (climate smart agriculture) সিস্টেমের প্রধান উপাদানগুলো

ওয়াটার স্মার্ট : বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার, পানির সামাজিক ব্যবস্থাপনা, খামারে পানির ব্যবস্থাপনা।

কার্বন স্মার্ট : প্রচলিত কর্ষণ পদ্ধতি, ভূমি ব্যবহার পদ্ধতি, গবাদিপশু ব্যবস্থাপনা।

নাইট্রোজেন স্মার্ট : পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, যুক্তিসংগত সার ব্যবহার, আন্তঃফসল হিসেবে লিগিউম জাতীয় ফসল চাষ।

অ্যানারজি স্মার্ট : জৈব-জ্বালানি, জ্বালানি সাশ্রয়ী ইঞ্জিন, বর্জ ব্যবস্থাপনা, ন্যূনতম কর্ষণ।

নলেজ স্মার্ট: কৃষক-কৃষক শিক্ষাপদ্ধতি, অভিযোজন টেকনোলজির জন্য কৃষ নেটওয়ার্ক, বীজ ও গোখাদ্য ব্যাংক, কিচেন গার্ডেন/বসতবাড়ির বাগান।

বাংলাদেশে বাড়ছে জনসংখ্যা, বাড়ছে খাদ্য চাহিদা প্রকারান্তরে কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। এর সাথে যোগ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি। এমতাবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তন উপযোগী কৃষির জন্য সঠিক ব্যবস্থপনার কোনো বিকল্প নেই। তাই জলবায়ু পরিবর্তন উপযোগী কৃষির জন্য বাংলাদেশে কৃষকদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উপযোগী কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন, শস্য বহুমুখীকরণ ব্যবস্থাপনা এবং সাবধানতার সাথে আনুসঙ্গিক অন্যান্য শস্য ব্যবস্থাপনার ওপর অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।
 

ড. এসপি ঘোষ*

ড. অশোক কুমার রায়**
* টিম লিডার, টিএ টিম, এসসিডিপি, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। **মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অফিসার, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা।
বিস্তারিত
ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির চলমান উদ্যোগ
ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির চলমান উদ্যোগ বনাম ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা
পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষের প্রধান খাদ্য ‘ভাত’। বিশ্ব বাজারে চালের দামও অন্য সব শর্করা সমৃদ্ধ খাদ্য পণ্যের চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্বের চাল রপ্তানিকারক যে কোনো দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে চালের উৎপাদন কমে গেলে বিশ্ববাজারেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, চালের দাম যায় আশংকাজনক হারে বেড়ে। কাজেই চাল আমদানিকারক দেশের পক্ষে চাহিদা মাফিক চাল আমদানি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। প্রয়োজনের সময় অতি উচ্চমূল্যে চাল কিনে বাংলাদেশের মতো ভাত খেকো বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কখনও কখনও এমন পরিস্থিতিরও উদ্ভব হয় যে অতি উচ্চমূল্যের বিনিময়েও বিশ্ব বাজার থেকে চাল কেনা দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে চাল ঘাটতি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম যায় হু হু করে বেড়ে। তখন দেশের স্বল্প আয়ের মানুষদের পক্ষে চাহিদা অনুযায়ী চাল কেনা সম্ভব হয়ে ওঠে না বলে অর্ধভুক্ত এমনকি অভুক্ত থাকতে বাধ্য হয়। তখন এসব মানুষ ক্ষুধা মেটানোর জন্য ভাতের পাশাপাশি অথবা পরিবর্তে অন্য ভোজ্য যা কিছু পায় তা খেয়েই জীবন ধারণ করে। কিন্তু চালের দাম কমে ক্রয়ক্ষমতার মাঝে চলে এলেই ওইসব মানুষই আবার খাওয়ার উপযোগী সহজলভ্য ওই খাবারগুলো চালের সম্পূরক খাবার হিসেবে গ্রহণ করার কথা একেবারেই ভুলে যায়।

তবে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো পৃথিবীর সব ভাত খেকো দেশের অধিবাসীরা তিন বেলা ভাত খেলেও তাদের মাথাপিছু দৈনিক চালের প্রয়োজন বাংলাদেশীদের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি নয়। বাংলাদেশের মানুষদের যেখানে মাথাপিছু দৈনিক চালের প্রয়োজন প্রায় ৭৫০ গ্রাম, সেখানে অন্যান্য দেশের মানুষের মাথাপিছু দৈনিক প্রয়োজন ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রামের মতো।

এর মূল কারণ ওইসব দেশের মানুষরা প্রত্যেকেই ভাতের পাশাপাশি নানা ধরনের সহজলভ্য সম্পূরক খাদ্য প্রতিদিন কিছু কিছু করে কয়েকবার খেয়ে থাকে। এসব সস্তা সম্পূরক খাদ্য পণ্যের সরবরাহ সারা বছর ধরে যথেষ্ট পরিমাণে থাকে বলেই সবাই এগুলো খেতে পায়।

এ প্রসঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে এসব দেশের মানুষরা পুষ্টিহীনতার শিকার হয় অনেক কম। সম্ভবত এককভাবে ভাতের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে মিশ্র খাদ্যে অভ্যস্ত হওয়াতেই বিভিন্ন খাদ্য থেকে পাওয়া পুষ্টি উপাদানের মাধ্যমে তাদের দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয় অনেকটা সুষম খাদ্য গ্রহণের মতোই। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত প্রায় শতকরা ১০০ ভাগ মানুষই তাদের পুরো খাদ্য চাহিদা মেটায় ভাত দিয়েই।

নিঃসন্দেহে ভাত বাঙালির প্রধান খাদ্য এবং এটি প্রধান খাদ্যই থাকবে, হয়তো আরও বহুদিন। তবে এ দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের তাগিদে ভাতের পাশাপাশি সম্পূরক খাদ্য যুক্ত হওয়া অপরিহার্য। কারণ খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য একমাত্র চালের ওপর বর্তমান চাপ এবং ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানোর জন্য চালের ওপর যে বর্ধিত নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হবে তা একমাত্র চাল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে মেটানো কখনই সম্ভব হবে না।

যার যেমন খুশি চলমান কৃষিপণ্য উৎপাদন কর্মকাণ্ড দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে যা থেকে বেরিয়ে আসাও দুষ্কর হয়ে পড়বে। বিষয়গুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় সংক্ষিপ্ত আলোচনা এ নিবন্ধে অবশ্যই স্থান পাবে।

এর আগে বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে জনগণের খাদ্য চাহিদা মেটাতে গিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে নানা ধরনের জটিলতার মুখে পড়ায় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অনেককেই বলতে শুনেছি ভাতের ‘বিকল্প’ হিসেবে আলু খাওয়ার কথা বলতে। কিন্তু ভাতের ‘বিকল্প’ শব্দটির ব্যবহার বিভ্রান্তকর। আমাদের সবারই মনে রাখা প্রয়োজন যে এ দেশের ভোতো জনগণের কাছে ভাতের ‘বিকল্প’ বলে  কিছু নেই। তবে যেটা তাদের কাছে অপ্রিয় হবে না এবং অদূর ভবিষ্যতে যেটা ক্রমান্বয়ে পছন্দনীয় হয়ে উঠবে সেটি হলো ভাতের নানাবিধ সম্ভাব্য ‘সম্পূরক’ খাদ্যপণ্য। তবে তা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান সফলভাবে করতে হলে সুপরিকল্পিত ও বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে সব ধরনের সম্পূরক খাদ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করে সারা বছর সরবরাহ নিশ্চিত করা। এটা করলেই ধীরে ধীরে চালের সম্পূরক খাদ্য খেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে  এ দেশের সব স্তরের জনগণ এবং একমাত্র চালের ওপর নির্ভরশীলতাও কমে আসবে তবে অনিবার্য কারণেই চালের টেকসই বর্ধিত উৎপাদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতেই হবে তাতে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু তা একান্তভাবেই হতে হবে ‘বিজ্ঞানসম্মত’ ও ‘সুপরিকল্পিত’ উপায়ে যা অদ্যাবধি হয়ে ওঠেনি।

ধানের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি উদ্যোগের পটভূমি :  তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্য ঘাটতি কমানোর তাগিদে ধানের উৎপাদন বাড়ানোর কয়েকটি বাস্তব সম্মত সরকারি পদক্ষেপ নেয়া হয় সেই ১৯৫৪-৫৫ সালে। ধান একটি পানি-প্রিয় (হাইড্রোফিলিকি) ফসল। পানির ধারণক্ষমতাহীন অথবা দুর্বল ধারণক্ষমতা সম্পন্ন মাটির জমিতে ধানের আবাদ করলে (যা এখন হরহামেশাই করা হচ্ছে) এমন সব জমিতে ধানের উৎপাদন খরচ যায় যেমন বেড়ে, তেমনি ধানের কাক্সিক্ষত ফলনও পাওয়া যায় না। এমন সব জমিতে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে যেখানে পানির প্রয়োজন হয় ৪ থেকে ৫ হাজার লিটার পানি, সেখানে পানি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন মাটির জমিতে ধান আবাদ করলে সম পরিমাণ ধান উৎপাদনে পানির প্রয়োজন হয় ২০০০ থেকে ২৫০০ লিটার।

কাজেই ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অনিবার্য কারণেই পানি সেচ সুবিধা সৃষ্টি ও সম্প্রসারণের ব্যবস্থাটি প্রাধিকার পায় এবং এ জন্য অগভীর ও গভীর নলকূপের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারই প্রাধান্য পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে এ কাজটি শুরুও হয়ে যায়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দ্রব্যাদি আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থা গুরুত্ব পায়। ধান উৎপাদনকারীদের সুবিধার্থে হ্রাসকৃত মূল্যে সার এবং বিনামূল্যে কীটনাশক বিতরণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়।

অগভীর ও গভীর নলকূপের ব্যবহার উৎসাহিত করার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ প্রাপ্তির ব্যবস্থাও করা হয়। তবে এটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে কাক্সিক্ষত গতি পায়নি। তবু ধীরগতিতে হলেও পানি সেচ ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং ধানের আবাদ এলাকা ও উৎপাদন দুই-ই বাড়তে থাকে কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদার বিপরীতে ধানের বর্ধিত উৎপাদন তাল মেলাতে না পারায় চালের আমদানির পরিমাণে তেমন হেরফের হয়নি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্তও।

পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত ভাতখেকো সাড়ে সাত কোটি জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশকে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতির বোঝা মাথায় নিয়েই যাত্রা শুরু করতে হয়। স্বাধীনতা অর্জনের উষালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার আগেকার গৃহীত উদ্যোগকে বঙ্গবন্ধুর সরকার আরও সমন্বিত ও জোরদার করার সর্বাত্মক পরিকল্পিত প্রয়াশ নিয়েছিল। কিন্তু সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত দেশের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের সফল বাস্তবায়ন ঘটিয়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের পথে দ্রুত এগোন সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা, সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার তাগিদে ধানের উৎপাদন বাড়ানোর সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এসব উদ্যোগের মাঝে ছিল-

১. পানি সেচ সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় দ্রুত সেচ সুবিধা সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ করে সেসব এলাকায় ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল আধুনিক জাতের ধান বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি করা,
২.  উন্নত ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসার ঘটানো,
৩. প্রয়োজনীয় সব ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক সামগ্রী কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য আমদানি ও বিপণনের প্রচলিত ব্যবস্থার যথাযথ পুনর্বিন্যাস সাধন করা,
৪.  সময়মতো প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ বিতরণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংকে একাউন্ট খোলার সুবিধা প্রদান,
৫. কোল্যাটারাল ছাড়া বর্গা চাষিদের ঋণ দান কাজ শুরু করা,
৬. কৃষক ভাইদের উৎপাদিত চাল ন্যায্য মূল্যে ক্রয়ের ব্যবস্থা ইত্যাদি কায্যক্রম অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিচালনা করা।

চালের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লিখিত অনুঘটকগুলোর সফল প্রয়োগের ফলে ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালে চালের আমদানি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার অধিবাসীরা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতার চরম কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবন যাপন করে আসছিল। এ দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা ‘মঙ্গা’ নামে অবহিত করা হতো। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালে একটি বিশেষায়িত প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘ দিনের ওই অসহনীয় পরিস্থিতি  থেকে ওইঅঞ্চলের জনসাধারণ বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদন সক্ষম কৃষি পণ্যের বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া, বছরের শ্রম বিনিয়োগ সুযোগহীন সময়টাতে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বিনামূল্যে অথবা স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহ করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

২০০৮ সালে বর্তমান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর চালের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য তাদের ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এর চলমান কার্যক্রমগুলো আরও জোরালোভাবে কার্যকর করার পাশাপাশি কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি হলো-চালের এবং অন্যান্য কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় সুষম সার ব্যবহারে কৃষক ভাইদের উৎসাহিত করার জন্য পটাশ ও ফসফটিক ফারটিলাইজারের কেজিপ্রতি বিক্রির দাম যথাক্রমে ৬০ টাকা থেকে ১৫ টাকা এবং ৭২ টাকা থেকে ২২ টাকায় নামিয়ে আনা। এ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফলে কৃষকভাইরা ধানসহ অন্যান্য সব কৃষিপণ্য উৎপাদনে ইউরিয়া সারের পাশাপাশি পরিমিত পরিমাণ পটাশ ও ফসফেটিক সারের ব্যবহারে ব্যাপকভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

এ বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ফলেই ধানের এবং অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি আলুর ফলনও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যায়।
ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির সব কার্র্যক্রমকে সফলভাবে এগিয়ে নিতে কৃষক ভাইদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা বিধানে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার কৃষককে উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদানও করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের প্রায় এ কোটি কৃষক ভাইদের মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এ সুবিধা অনেক কৃষকভাইরাই গ্রহণ করতে পারেনি তাদের সুবিধামতো স্থানে ব্যাংকের শাখা না থাকায়।

ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণের কারণ এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় : আগেই উল্লেখ করেছি যে, ভাত বাঙালির সব চেয়ে প্রিয় খাদ্য, গ্রাম বাংলায় বসবাসকারী দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষই তিন বেলা পেট পুরে ভাত খেয়ে যে প্রশান্তি অনুভব করে অন্য কিছুতে তারা আর এতটা পরিতৃপ্ত হয় না। এছাড়াও গ্রামীণ মানুষের আনুষঙ্গিক সংসার খরচ মেটানোর মতো প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হয় প্রায় সবার বাড়ির আঙিনায় তরিতরকারি আবাদ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি গৃহপালিত পশুপালনের মাধ্যমে।

এ সত্ত্বেও চরম দুর্যোগপ্রবণ এ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে যদি ধানের উৎপাদন বিপর্যস্ত হয়, তাহলে কিনে খাওয়া মানুষের সংখ্যা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চালের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। তাতে স্বল্প আয়ের মানুষের পাশাপাশি শহরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীও অশান্ত হয়ে ওঠে এবং তা ক্রমান্বয়ে সামাজিক অস্থিরতায় রূপান্তরিত হয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব ঠেকাতে চাল আমদানি এবং একক ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বাত্মক উদ্যোগ অদ্যবধি গৃহীত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হয়ে এসেছে। তাই আজও দেশের পরিকল্পনাবিদরা তাদের পরিকল্পনা ভাবনায় আনতে পারেনি ভাতের সম্পূরক অন্যসব খাদ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা ও তা বাজারে বছরব্যাপী সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধানের কথাটি, যা ছিল একান্তভাবেই অপরিহার্য এ দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের জন্য।

এ কথাটিও সবারই একান্তভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ  অঞ্চল। বিগত কয়েক বছরের ধানের ক্রমবর্ধিত উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনুকূল পরিবেশ অর্থাৎ বিগত কয়েক বছর ধানের উৎপাদন প্রক্রিয়া বড় ধরনের তেমন কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়নি। ধানের এ বর্ধিত উৎপাদন দেখে সবাই সাময়িক স্বস্তি অনুভব করলেও কোনো ভিশন সমৃদ্ধ কৃষি বিজ্ঞানী এতে কখনই তৃপ্ত হতে পারবে না। কারণ এখানে আরও যে বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে লক্ষ করতে হবে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে হবে সেগুলো হলো-

১. পানি সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত জমিতে ধানের আবাদ ও দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে তা সে লাভজনক ধান চাষের উপযোগী হোক আর না-ই হোক এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একই জমিতে একের পর এক এককভাবে ধানের আবাদই চলতে থাকে। এ অপরিকল্পিত এবং বিজ্ঞান সম্মত নয় এমন ধান উৎপাদন প্রক্রিয়া সার্বিক কৃষিপণ্য উৎপাদন পরিবেশের ওপর যে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে তার বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে প্রতিবিধানের ব্যবস্থা না নিলে অদূর ভবিষ্যতে এমন এক জটিল অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাবে যেখান থেকে ফেরত আসা দুরূহ হয়ে পড়বে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমাদের নীতি নির্ধারক ও পরিকল্পনাবিদরা আজও এসব বিষয়ের উপলব্ধির বাইরেই রয়ে গেছেন।

তাই অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে চলমান কৃষিপণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া সার্বিক পরিবেশের ওপর যেসব কারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে তার কয়েকটি সংক্ষিপ্ত আকারে নিচে উপস্থাপন করা হলো, এ আশায় যে নীতিনির্ধারক এবং পরিকল্পনাবিদরা এগুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করে ভবিষ্যত পরিকল্পনায় এর প্রতিবিধানের পদক্ষেপগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে যথাযথভাবে।  

পানিপ্রিয় ফসল ধান লাভজনক উৎপাদন উপযোগী জমিতে শুধু না লাগিয়ে দুর্বল অথবা পানি ধারণক্ষমতাহীন জমিতেও লাগিয়ে মাত্রাতিরিক্ত পানি সেচের কারণে অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ বহনের পাশাপাশি কাক্সিক্ষত ফলন না পাওয়া এবং অন্যদিকে ধানের চেয়ে অধিকতর লাভজনক অন্য ফসল ওই জমিটিতে না লাগানোর ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্য একটি খাদ্যপণ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি।

আপতিত আলোকরশ্মির সময় কালের তারতম্যের প্রভাবমুক্ত অনেকগুলো ধানের উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত অধিকাংশ জমিতে কৃষকভাইরা একের পর এক কেবলমাত্র ধানের আবাদই করে চলেছেন। এতে ধানের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চলেছে তা অতি সংক্ষেপে নিচে উপস্থাপন করছি।

ক.     পৌনঃপৌনিকভাবে একই জমিতে সারা বছর ধরে একের পর এক শুধু ধানের আবাদ অব্যাহত রাখায় ধানের আক্রমণকারী অনিষ্টকারী কীটপতঙ্গ ও রোগবালাই নিরবচ্ছিন্ন বংশ বিস্তার ও ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাওয়ার অবাধ সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। তাদের  আর কোনো বিকল্প ‘হোস্টের’ প্রয়োজন হচ্ছে না। ক্রমবর্ধমান এ আক্রমণ ও ধ্বংসলীলা কমাতে কৃষকভাইদের পরিবেশ বিধ্বংসী নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক কীটপতঙ্গনাশক দ্রব্যাদির প্রয়োগও বাড়িয়ে দিতে হচ্ছে। ফলে সার্বিকভাবে ধানের উৎপাদন পরিবেশ বিনষ্ট হতে থাকে উৎপাদন খরচ বেড়ে চলে অথচ ধানের ফলনও ধীরে ধীরে কমে যায় ।

খ.    মাটির নিচের নির্দিষ্ট একটি স্তর (মাত্র ছয় ইঞ্চির মতো) থেকেই ধান গাছ প্রয়োজনীয় পুষ্টি আহোরণ করতে পারে। ফলে কেবল ওই স্তরে থাকা পুষ্টি উপাদানগুলোই ধান গাছ বারবার গ্রহণ করতে থাকায় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়ার জন্য কৃষকভাইদের প্রচলিত রাসায়নিক সারের ব্যবহার ও বাড়িয়েই চলতে হচ্ছে, তাতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে মাটির ফসল উৎপাদন ক্ষমতাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

গ.    একই জমিতে একর পর এক কেবল ধানের আবাদ চালিয়ে যেতে থাকলে মাটির অভ্যন্তরে ধানের শিকড় যতটা প্রবিষ্ট হতে পারে, তার কিছুটা নিচে দিয়ে একটি শক্ত মাটির স্তর (হার্ড প্লাউ প্ল্যান) সৃষ্টি হয়। তাতে ওই স্তরের নিচে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানগুলো সেখানেই রয়ে যায় বলে ধান গাছের নাগালে সেগুলো আর আসতে পারে না।

ঘ.    একই জমিতে একের পর এক কেবলমাত্র ধানের আবাদ করায় ওইসব জমিতে বর্ধিত মাত্রায় সার প্রয়োগ ও কীট ও বালাইনাশক বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যাদি প্রয়োগের ফলে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ভারসম্য চরমভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মাটির প্রধান জীবনীশক্তি মাটিতে অবস্থানরত অনুজীব (সয়েল মাইক্রোবস) এর সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। যার ফলে একই সঙ্গে প্রাকৃতিক ভারসম্য ও মাটির উৎপাদন ক্ষমতা দুই-ই বিনষ্ট হয়ে। চলমান অবস্থার প্রেক্ষিতে ধানের উৎপাদনশীলতা এবং উৎপাদন খরচের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব অনিবার্য উঠছে।  

ঙ.    একই জমিতে একের পর এক ধান চাষ অব্যাহত রাখায় একটি ধানের ফসল, ক্ষেত থেকে কেটে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অতি দ্রুত জমি তৈরি করতে হয় পরবর্তী ধানের চারা রোপণের জন্য। ফলে, কাটা ধানের ‘নাড়া’গুলো কেটে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠ থেকে তুলে নিয়ে অধিকাংশ সময় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যার ফলে মাটিতে পচে ওগুলো জমিতে জৈব পদার্থের মাত্রায় সংযোজিত হওয়ার কোনো সুযোগ পায় না, ফলে মাটির জৈব পদার্থের মাত্রা আর বাড়তে পারে না বরং ক্রমাগত কমেই যাচ্ছে।  

এছাড়াও নীতিনির্ধারক ও পরিকল্পনাবিদদের আরও যেসব বিষয়গুলো অবশ্যই ভাবনায় ধারণ করে এগুতে হবে সেগুলো হলো-
অনিবার্য কারণে প্রতি বছর কমপক্ষে এক শতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে তা যথাযথভাবে মোকাবিলার পথ ও পন্থা উদ্ভাবনের কথা।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কাক্সিক্ষত মাত্রায় কমে আসছে না। বিশেষ করে, দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত গতিতে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিটি অঙ্গনে সফল নেতৃত্বদান করতে সক্ষম উপযুক্ত জ্ঞান সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী যে পরিবেশে সৃষ্টি হওয়া সম্ভব সেই গণ্ডির বাইরের পরিবেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অপ্রতিহত গতিতে বেড়েই চলেছে। মনে রাখতে হবে সবাইকে যে এ অনিয়ন্ত্রিত ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর ভাতের চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে তালমিলিয়ে টেকসই ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি কখনই সম্ভব নয়।

চরম দুর্যোগপ্রবণ এ দেশে যে কোনো মাত্রার প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনে ধানসহ অন্যান্য সব কৃষিপণ্য বিনষ্ট করে দিতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। এমন আশংকার কথা সব সময় মনে রেখে আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদনের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তা সুষ্ঠু ও সফলভাবে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়গুলোও গভীরভাবে উপলব্ধি করা।

টেকসই বর্ধিত কৃষিপণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ মাত্রার সফলতায় এগিয়ে নেয়া নিশ্চিত করার জন্য কৃষি গবেষণা কার্যক্রমকে সমসাময়িক এবং সম্ভাব্য সব ‘আবায়োটিক’ ও ‘বায়োটিক’ সমস্যাকে সুষ্ঠু ও সফলভাবে মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তোলার তাগিদে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার সফল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়।

সর্বোপরি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে একমাত্র খাদ্য, ভাতের মাঝে আবদ্ধ করে রাখার চিন্তা ভাবনা পরিহার করে এবং এককভাবে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত  না রেখে ভাতের পাশাপাশি উৎপাদন সম্ভব সব শর্করা সমৃদ্ধ এবং অন্যান্য সম্পূরক কৃষিপণ্যের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি যথাযথ উপলব্ধিতে এনে এদের উৎপাদন ও সরবরাহ সব সময়ের জন্য নিশ্চিত করার যথাযথ সুপরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত যাবতীয় উদ্যোগ নেয়ার বিষয়টি।

এ আলোচনা দীর্ঘায়িত না করার স্বার্থে অধিকাংশ উপস্থাপিত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেয়া থেকে বিরত থেকেছি। সব জমিতে এককভাবে ধানের আবাদকে, তা সে লাভজনক হোক আর নাই হোক, তাকে নিরুৎসাহিত না করার ফলে অন্যান্য কৃষিপণ্যের আবাদ ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ছে এবং সার্বিকপণ্য উৎপাদন পরিবেশের ওপর যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তারও বিস্তারিত আলোচনা থেকে বিরত থাকছি। ভবিষ্যতে, প্রয়োজনবোধে বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাবে।
 
তবে এ পর্যন্ত এ প্রতিবেদনে সংক্ষেপে, যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছি তার ওপর ভিত্তি করে সৃষ্ট সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেছি সেগুলোই এখন উপস্থাপন করতে চাই এবং সেগুলো হলো-

বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপট গভীরভাবে অনুধাবন করে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারক ও পরিকল্পনাবিদদের প্রথমেই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে খাদ্য হিসেবে এককভাবে ভাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভাতের পাশাপাশি অন্যান্য সম্পূরক খাদ্য সামগ্রী খাওয়ায় এদেশের মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে এবং সেই অভ্যস্ততা সৃষ্টির জন্য সব ধরনের সম্পূরক খাদ্য সামগ্রীর (ভুট্টা, কাওন, মিষ্টি আলু, কাসাবা ইত্যাদি) পরিমিত উৎপাদন ও বছরব্যাপী প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সুপরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

চলমান চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের আবাদি ও আবাদযোগ্য জমির মাটির আকার, আকৃতি, প্রকৃতি, পানি ধারণক্ষমতা ভেদে ধানসহ অন্যান্য আবাদযোগ্য ফসলের ‘সবচেয়ে উপযোগী’ এবং ‘উপযোগী’ জমি চিহ্নিত করে ইউনিয়ন ভিত্তিক ‘শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডার’ তৈরি করতে হবে।

চিহ্নিত ধান চাষের ‘সবচেয়ে উপযোগী’ ও ‘উপযোগী’ জমিতে ধানের আবাদ করতে হবে।
তবে ধান চাষ উপযোগী জমির বাইরের জমিগুলো একাধিক ফসলের আবাদ উপযোগী বলে বিবেচিত হবে চিহ্নিত এসব জমিতে মৌসুমভেদে যে ফসল সব চেয়ে লাভজনক হবে শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডারে সুস্পষ্টভাবে তারও উল্লেখ করতে হবে।

শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডারের নির্দেশ মোতাবেক শস্য উৎপাদন প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে পরিচালনা করলে দেখা যাবে যে ধান চাষের উপযোগী নয় এমন জমিতে ধান চাষ করলে (যা এখন কৃষক ভায়েরা হরহামেশাই করছেন) ধানের উৎপাদন খরচ আশংকাজনক হারে বেড়ে যায় অন্যদিকে কাক্সিক্ষত ফলন থেকেও বঞ্চিত হয়। অথচ এসব জমিতে জমির উপযোগী ভুট্টা, গম, কাওন, কাসাবা ইত্যাদি ফসল অনেক কম করচে করা সম্ভব। ফলশ্রুতিতে ভাতের এসব সম্পূরক খাদ্য পণ্যের মোট উৎপাদন ও সরবরাহ ক্রমান্বয়ে একটা ইতিবাচক পর্যায়ে উপনীত হবে।  

প্রণীত ‘শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডার’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রথমেই যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে সেটি হলো সম্পূরক খাদ্য পণ্যগুলোর মান সম্পন্ন বীজের অভাব, বিশেষ করে ‘কাওন’ জাতীয় ফসলগুলোর উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত ও উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির অনুপস্থিতি।

এসব সমস্যা উত্তোরণের জন্য পরিকল্পিত বীজ বর্ধন কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে সম্পাদন করতে হবে। একই সঙ্গে যে শস্যের উচ্চফলনশীল উন্নত জাতের অভাব রয়েছে, সেই শস্যের উন্নত জাত উদ্ভাবনের জন্য সংশ্লিষ্ট কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘ক্রাশ প্রোগ্রামের’ ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

ধানের উৎপাদন লাভজনক নয় এমন সব জমিতে ধানের পরিবর্তে ‘ফসল উৎপাদন ক্যালেন্ডারে’ উল্লিখিত যে কোনো ফসল উৎপাদন করলে কৃষক ভাইদের বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের পাশাপাশি ধানের উৎপাদন অনুপযোগী জমিতে ধানের আবাদ করলে সব রকমের ভর্তুকি প্রদান বন্ধ করে দিতে হবে। তাতে কৃষক ভাইরা একদিকে যেমন ধানের সম্পূরক কৃষিপণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন, অন্যদিকে অনুপযোগী জমিতে ধানের আবাদে নিরুৎসাহিত করাও সম্ভব হবে।

অতি প্রয়োজনীয় ইউনিয়নভিত্তিক শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডার তৈরির কাজ সুষ্ঠুভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে স্থানীয় কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদেরই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে এ কাজের শুরুতেই স্থানীয় জমির পর্চা ছাড়াও জমির মাটির প্রকারভেদে যে যে ফসল আবাদ হয় তার তথ্যাদিও সংগ্রহ করতে হবে। তবে ধান চাষের অনুপযোগী জমিতে যেসব ফসল আবাদ করা সম্ভব তা চিহ্নিত করার পর কোন এলাকায় কোন মৌসুমে, কোন ফসলটি সবচেয়ে লাভজনকভাবে উৎপাদন করা যাবে সেটি নিশ্চিত করতে কৃষি গবেষকদের সহায়তা নিতে হবে।  

আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণ ছাড়াও নির্ধারিত একটি ফসলের আবাদ সর্বোচ্চ মাত্রায় লাভজনক নাও থাকতে পারে। ফলে অবস্থার প্রেক্ষিতে অন্য যে ফসলটি অধিকতর লাভজনক বলে বিবেচিত সেটিই আবাদে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটা জমি, তা ধান চাষের উপযোগী অথবা অনুপযোগী যাই হোক না কেন তার উর্বরতা শক্তি শুধু সংরক্ষণই নয়, বৃদ্ধির সর্বাত্মক বিজ্ঞানসম্মত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষ করে, মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় উন্নীত করে তা স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ প্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে।

সর্বোপরি চলমান নিয়ন্ত্রণহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যে কোনো মূল্যে সর্বাত্মক সমন্বিত উদ্যোগে স্থিতিশীল লক্ষ্যমাত্রায় নামিয়ে আনতেই হবে এবং সেই লক্ষ্যমাত্রা ০.৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি এটা করতে ব্যর্থ হলে এ দেশের ভবিষ্যৎ জনগোষ্ঠীর টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের সব প্রচেষ্টায়ই চরম বেদনাদায়ক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে-তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। ইউনিয়নভিত্তিক উৎপাদন ক্যালেন্ডারকে কার্যকরীভাবে বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় কৃষকভাইদের অবহিত ও উদ্বুদ্ধ করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। এ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য প্রতি মাসে অন্তত একবার আলোচনা সভা করার প্রয়োজন হবে। কাজেই প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে আলোচনা অনুষ্ঠানের উপযুক্ত স্থান ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। যে ইউনিয়নে এটি নেই, সেটি অবশ্যই সেখানে তৈর করতে হবে।
 
ড. মো. আমীরুল ইসলাম
* অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭৪৭৫৭০৫৪৪

 

বিস্তারিত
ভাত খাবো না কেন? অবশ্যই খাবো-১৪২১
ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। আমাদের মধ্যে অনেকেরই ধারণা কিংবা প্রায় সবাই শুনি, ভাত খেলে মানুষের ওজন বেড়ে যায়, মোটা হয়ে যায়, আবার বহুমূত্র (Diabetics) রোগ হওয়ার প্রবণতাও থাকে। কেউ কেউ বলেন, ভাত রসালো খাবার, এটা খেলে শরীর ফুলে যায় মোটা হয়ে যায়। চালে পানি দিয়ে সিদ্ধ করার পর হয় ভাত, আর ভাত খেলে মানুষের শরীর ফুলে যাওয়ার বিষয়টি একেবারেই বোধগম্য নয়। এ দেশের বিশাল কৃষকসমাজ কেউ পুরো জীবন পানি আর পান্তা খেলে ফুলে গেছে এসব তথ্য জানা নেই। কোনো কোনো অণুজীব বিজ্ঞানী (Microbiologists) বা রোগতত্ত্ববিদরা (Pathologists) মনে করেন পান্তা ভাত খেলে উদারাময় বা ডায়রিয়া রোগ হয়। বিজ্ঞব্যক্তিদের এসব তথ্য যদি সত্য হতো তাহলে এ অঞ্চলে মানুষ পাওয়া তো দূরের কথা জীবাশ্মও পাওয়া যেত না। উদারাময় রোগের জন্য দায়ী ভাত নয়, অণুজীব এ বিষয়টি জানাটা জরুরি।

চিকিৎসকেরা রোগীদের পরামর্শ দেন ওজন কমানোর জন্য, কারণ ওজন বাড়লে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাদের মতে, ওজন কমাতে হলে প্রতিদিন দু’বার আটার রুটি, একবার নাকি ভাত খেতে হয়। আমাদের মাঝে যারা চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে সকাল ও রাতে রুটি খান, তাদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন কিংবা বহুমূত্র রোগীর সংখ্যা খুব বেশি না হলেও একেবারে কম নয়। অন্য দিকে যারা যথাযথভাবে দৈহিক পরিশ্রম করেন, তারা আমাদের তুলনায় বেশি ভাত খান, অথচ তাদেরই অতিরিক্ত ওজন রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড কিংবা বহুমূত্রসহ অন্য কোনো সমস্যায়ই সাধারণত আক্রান্ত হতে শোনা যায়নি, দেখি না। তারা কখনো বলেন না মেদভুঁড়ি কি যে করি? বরং আমরাই মহাবিপদে আমাদের জন্যই অশনি সঙ্কেত আর কি? মোটা হওয়ার জন্য যেমন আলাদা কারণ আছে আবার মেদভুঁড়ি মোটা কমানোর জন্য আলাদা অনেক কারণ আছে।

তা ছাড়াও যেসব দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য গম, তাদের মোটা হওয়ার প্রবণতা কিংবা বহুমূত্র রোগীর সংখ্যা আমাদের চেয়ে কি কোনো অংশেই কম? আবার কোনো মানুষ মোটা হওয়া না হওয়া ওজন বাড়া না বাড়া কিংবা বহুমূত্রের রোগী হওয়া না হওয়ার সাথে ভাত কিংবা গমের রুটি খাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কিত নয়। এ ব্যাপারগুলো কিছুটা হলেও বংশগত। বাকি পুরোটাই জীবন যাপনের সাথে সম্পর্কিত। স্বাভাবিক জীবন যাপন বলতে কি বুঝায় তা কেউ বুঝেন না, এমন ব্যক্তি কেউ কি আছেন? জীবনের স্বাভাবিক চাল চলন, খাবার দাবার পরিবর্তন করলে রক্তে মাংসে গড়া শরীরে তো কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন হবেই, আর এটার জন্য ভাতের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়াটা কি ঠিক?

ভাত বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এ দেশের মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৪৬০ গ্রাম চালের ভাত খান। আমাদের কর্মসম্পাদনের জন্য প্রয়োজন শক্তি, শক্তির মূল উৎস হলো শ্বেতসার। শ্বেতসারের গুণগত মানের কথা আমরা কখনো ভাবিনি। আমরা ভাবছি শুধু আমিষ নিয়েই, আর হতাশ হচ্ছি আমিষের অভাব তো পূরণ করতে পারছি না, জানিও না বুঝিও না আমিষ কি ও কত প্রকার, কি কাজে লাগে। আমার বয়স ও পেশারভিত্তিতে কতটুকু আমিষ দরকার তাতো পরের কথা। পূর্ণ বয়স্ক একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য শূন্য দশমিক আট গ্রাম আমিষের প্রয়োজন। আর এ হিসাব অনুযায়ী আমরা যারা ভাত খাই, তারা গড়ে আমাদের জন্য Recommendate Dietary Allowance (RDA) এর শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি আমিষ পাওয়া যায় ভাত থেকেই। গমে আমিষের পরিমাণ বেশি থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন অর্থাৎ আমাদের আমিষের জউঅ এর পরিমাণ চালের তুলনায় গম থেকে অনেক কম পাওয়া যায়।

তাহলে ভাত খেতে সমস্যা কি? আসল ঘটনা হলো ভাত খেতে কোনো সমস্যা নেই, বরং সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। আর তা হলো আমরা যারা ভাত কিংবা গমের রুটি যা-ই খাই না কেন প্রায় সবাই জেনে না জেনে না বুঝেই বলি ভাতে তো কোনো আমিষই নেই, যা রয়েছে সবই তো শ্বেতসার। চালের রাসায়নিক উপাদান না জেনে শ্বেতসারের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মানুষকে বিভ্রান্তির ধুভ্রজালে ফেলে দেই। অনেকে আবার আতঙ্কে ভোগেন। আবার অনেকেই শ্বেতসার সম্পর্কে গবেষণাগারে কোনো কাজ না করে কিছু প্রবন্ধ পড়েই মন্তব্য করেন, যেসব খাবারে উচ্চমাত্রার অ্যামাইলোজ থাকে সেগুলোর জিআই ভ্যালু কম হবে। এ মন্তব্যটি সব জাতের ধানের ক্ষেত্রে সব সময় ঠিক হবে না, কারণ উচ্চমাত্রার অ্যামাইলোজ হলেই জিআই ভ্যালু কম হবে এমন নয়। এ ক্ষেত্রে আরো অনেক কারণ দায়ী তা মনে রাখতে হবে। শস্যদানার (Cereal Crop) শ্বেতসার জাতীয় খাবারের জিআই ভ্যালু নির্ভর করে SDS (Slowly Digestible Starch), RDS (Rapidly Digestible Starch) এবং RS (Resistance Starch) এর অনুপাতের/পরিমাণের ওপর।

শস্যদানায় অ্যামাইলোজ, অ্যামাইলোপ্যাকটিন (Amylopectine) কম বেশি যা-ই হোক না কেন, আলফা অ্যামাইলোজ ইনহিবিটর (a-Amylase Inhibitor) বেশি হলে রক্তে গ্লুকোজ (Blood Sugar) কম হবেই, কারণ এ আলফা অ্যামাইলোজ ইনহিবিটর আলফা এমাইলোজ এনজাইমকে (Enzyme) নিষ্ক্রিয় (Inhibit) করায় শ্বেতসারে উপস্থিত অ্যামাইলোজের আলফা অবস্থান (a- Position) এর বন্ধন (Bond) ভেঙ্গে গ্লুকোজ রূপান্তরিত করতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। এসব কথা থেকে এটাই সুস্পষ্ট হলো যে, জিআই ভ্যালু কম বেশি হওয়াটা শুধু অ্যামাইলোজ ইনহিবিটরের পরিমাণ ও এরই ওপর। জিআই ভ্যালু আরো নির্ভর করে খাদ্যশস্যের কার্যকারিতার জাতের ওপর, প্রক্রিয়াজাতকরণ (Processing) এমনকি রান্না পদ্ধতির (Cooking System) ওপরও। আর যারা শুধু কিছু লতাপাতা/মরিচ বাটা দিয়ে আমার/আপনার চেয়ে বেশি ভাত খান, তারা ভাত খেয়েও আত্মতৃপ্ত হতে পারেন না। বরং পুষ্টিগুণের বিবেচনায় তাদের হতাশাই বাড়তে থাকে, শুধু আমাদের কিছু চিকিৎসক/পুষ্টিবিদদের কারণেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের সবারই উচিত, শুধু ভাত সম্পর্কেই না, যে কোনো ব্যাপারেই সঠিক তথ্য প্রদান করা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (BRRI) শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের (Granin Quality & Nutrition  Division) গবেষণাগারের ফলাফলই নয় বরং বিশ্বের বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ ফলাফলেরভিত্তিতে চালের পুষ্টিমানের দিক বিবেচনায় গম কখনোই চালের সমকক্ষ হতে পারেনি। কারণ চালের Biological Value BV, True digestibility TD, Net Protein Utilization NPU, Utilizable Nitrogen UN সব কিছুই গমের চেয়ে বেশি।

বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ বরং ধান চাষের উপযোগী। অথচ গম শীত প্রধান অঞ্চলের খাদ্যশস্য অর্থাৎ এ দেশ গম চাষাবাদের ততটা উপযোগী নয়, যতটা ধান চাষে। পুষ্টিগুণের বিবেচনায় ভাত অন্য যে কোনো শস্যদানা থেকে পিছিয়ে নেই বরং কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে। আমরা তো তিন বেলা শুধু ভাতেই অভ্যস্থ, তাহলে কেন খাদ্যভ্যাস পরিবর্তন করে ভাত না খেয়ে বিকল্প খাবারের চিন্তা করব?

বিশ্ববিখ্যাত অনেক নির্ভরযোগ্য গবেষণার ফলাফল হলো কম জিআই খাবার বহুমূত্র টাইপ-২ (Type-II) রোগীদের রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক। কিছু প্রচলিত দেশি ও উচ্চফলনশীল জাতের ধান (বিআর-১৬, বিআর-২৫, ব্রিধান-২৮, ব্রিধান ২৯ নাইজারশাইল এবং চিনিগুড়া) ছাড়া আমাদের বাজারগুলোতে যেসব চাল পাওয়া যায় এগুলোর  জিআই ভ্যালু কত তা আমাদের একেবারেই অজানা। বাংলাদেশে বর্তমানে বহুজাতিক ওষুধ উৎপাদনকারী রেনেটা লিমিটেড (Renata Ltd) এরই অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রেনেটা এগ্রোইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (Agro Industries) ব্রির সহযোগিতায় ধান/ধানজাত (Rice Based Diet) পণ্য তৈরি করছে। ব্রি উদ্ভাবিত একটি উচ্চফলনশীল জাতের ধান ব্রির আধুনিক ধানের চাষাবাদের পদ্ধতি অনুসরণেই চাষাবাদ করেছে। তাদেরই একটি পণ্য পূর্ণ (PURNO) কম জিআই চাল (BIRDEM) নামে বাজারজাত করার জন্য ২০১২ সনের এপ্রিল মাসের ৬ তারিখে বারডেম হাসপাতাল মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন।

ব্রি (BRRI) বারডেম রেনেটা ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে বারডেমের গবেষকরা প্রত্যক্ষভাবে স্বেচ্ছাসেবক নির্বাচন করে তাদেরই গবেষণালব্ধ ফলাফলে উল্লেখ করেছেন, পূর্ণ (PURNO) একটি লো জিআই চাল যদিও ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও দেশি জাতের ধানের মধ্যে আরো কম জিআই চাল রয়েছে। পূর্ণ চালে সিল্ক পলিশ (Silk Polish) মোম (Wax) পলিশ/অতিরিক্ত পলিশ না করার কারণে বাজারের অন্যগুলোর তুলনায় আঁশের পরিমাণ বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। এ দেশের Auto Rice Mill গুলোতে ভোক্তাদের চাহিদানুযায়ী (Consumers Demand) ৩ ধাপে যথাক্রমে অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে পলিশ করা হয়। দেশের এ অবস্থায় ব্রির পরামর্শ হলো পূর্ণ কম জিআই চাল মাত্র ১০% পলিশ করার। অতিরিক্ত পলিশ না করাতে পূর্ণ চালে অন্য চালের তুলনায় Bran Oil এর পরিমাণ থাকে বেশি। Rice Bran oil আমাদের শরীরের  HDL-C (High Density Lipoprotein Cholesterol এর কোন সমস্যা/ক্ষতি না করেই LDL-C (Low Density  Lipoprotein) Cholesterol কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।  

বাংলাদেশের ধান আবাদযোগ্য জমি ৮০% জমিতে চাষ করা হয় ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাতের ধান অথচ বাজারে নাইজারশাইল (Nizersail)  কিংবা আরো কত কী  ব্র্যান্ড নামে চাল বিক্রি হচ্ছে। এ দেশে নাইজারশাইল জাতের ধানের আবাদ না হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে নাইজারশাইল ধানের চাল। বাজারে নাইজারশাইল ধান পাওয়া যায় না পাওয়া যায় চাল। কি এক অদ্ভুত ব্যাপার এ দেশে। ফলন কম, তাই কৃষকের জমিতে দেশি জাতের ধান নাইজারশাইল আর চাষ হচ্ছে না হচ্ছে ব্রির উচ্চফলনশীল জাতের ধানেরই চাষ। অথচ আমাদের অসাধু ব্যবসায়ীরা মিথ্যা কৌশল খাঁটিয়ে নাইজারশাইল চাল বলে বেশি দামে বিক্রি করেন। এরা শুধু ক্রেতাকেই ঠকায় না নিজেদের বিবেককে ঠকায় দেশ মাতৃকাকে ঠকায়। ময়মনসিংহের বিরই চাল নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। সাধারণ চালকে কয়েকবার মিলিং করে চিকন করা হয়। পরে কুঁড়া বা অন্য কিছুর লাল পলিশ করে খুব বেশি দামে বিরই চাল হিসেবে বিক্রি করে। রান্না করতে গিয়ে এক ধোয়ার পরেই কৃত্রিম বিরই সাদা হয়ে যায়। এত প্রতারণা করে কেমন করে জীবন চালায়। ক্রেতা ভোক্তারা কতভাবে প্রতারিত হন, তাদের প্রতারিত করা হয়। দেখার কেউ নেই বিচার করার কেউ নেই।

  প্রতিদিন ৩ বেলা ভাত খেতে অভ্যস্থ এ দেশের মানুষের রুচির সাথে মিল রেখে উপযুক্ত গুণাগুণে নিশ্চয়তা যারা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তারা সত্যিই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। ১৯৭০ সন থেকে ব্রি এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাতের সমস্যা সমাধানের জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এ দেশে রয়েছে ধান উৎপাদনের জন্য ব্রির মতো একটি প্রতিষ্ঠান তা ছাড়া আরো আছে ধান চাষের উপযোগী পরিবেশ ও আবহাওয়াসহ ৮ হাজারেরও বেশি দেশি ধানের জাত। আর এসব জাতের ধানে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট(Antioxidant), যা আমাদের শুধু বার্ধক্য রোধই নয় বরং অনেক রোগেরও প্রতিরোধ করতে দারুণভাবে সহায়ক হবে। সার্বিক বিবেচনায় ধান উৎপাদনের উপযোগী পরিবেশ প্রাচুর্যতা ধানের পুষ্টিগুণ এবং একই সাথে রেনেটা এগ্রোইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মতো যদি আরো একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্রি কর্তৃক উদ্ভাবিত শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগে গুণগতমান নিয়ন্ত্রিত উন্নতমানের (High Protein সমৃদ্ধ কম জিআইসম্পন্ন চাল) শনাক্তকরণ (Screening) ও প্রক্রিয়াজাতকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং আমরা যদি Processed Food, Food বাদ দিয়ে ভাত/ধানজাত (Rice Based Diet) খৈ, চিঁড়া এবং বাদামি চাল (Brown Rice) খাওয়া শুরু করি তা হলে খাদ্য পুষ্টির মানও বাড়বে এবং ফলনের পর ক্ষতিও (Post Harvest Loss) কমবে। এসব কারণেই এ দেশের মানুষ/আমরা ভাত/ধানজাত খাবার খাওয়ার উপযোগী পরিবেশ ধরে রাখতে সক্ষম হবো। আর তাই এ অঞ্চলের ভেতো বাঙালি ভাতের  বিকল্প খাবারের চিন্তা করবেন না বরং ভাতই খাবেন।

এ লেখাটি ব্রির বিশিষ্ট ধান পুষ্টি বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর তথ্য, বিশ্লেষণ, লেখা আর গবেষণা ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তার কাছে সর্বাংশে কৃতজ্ঞ। এ প্রসঙ্গে কারোর কোনো জিজ্ঞাসা প্রশ্ন থাকলে তার সাথে যোগাযোগ করে সমাধান নিতে পারেন। তিনি যৌক্তিক বিশ্লেষিত গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে পারবেন। শৃঙ্খলাই জীবন। এ কথা যেমন ঠিক। তার চেয়ে বেশি ঠিক নিয়মিত পরিমিতভাবে চিকিৎসক, গবেষক, বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞের কথা পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলে আমরা আরো বেশি ভালো থাকব। বিশেষ করে আমাদের শরীর স্বাস্থ্য আরো সুস্থ থাকবে। সুতরাং ভাত আতঙ্কের চেয়ে ভাতনির্ভর যুক্তিতে প্রমাণে বিশ্বাসী হয়ে আমরা সাহসী হই বোঝার চেষ্টা করি এবং সেমতে সুন্দর শৃঙ্খলভাবে আমাদের জীবনকে পরিচালিত করি। ধানই জীবন এ কথাটিকে সুন্দরভাবে যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করি।
 
কৃষিবিদ ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম*
* উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫
বিস্তারিত
কৃষক পর্যায়ে আউশ ধান বীজ সংরক্ষণ কৌশল

আউশ ধানের চাষ বাংলাদেশের প্রাচীনতম চাষের অন্যতম। বর্তমানে দেশে মোট উৎপাদিত চালের মাত্র ৭% আসে আউশ ফসল থেকে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে  মোট ১০.৫১ লাখ হে. জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়েছে এবং তা থেকে ২৩.২৬ লাখ মেটন চাল পাওয়া গিয়েছে। বর্তমান ২০১৪-১৫ মৌসুমে ১১.৬০ লাখ হেক্টর জমিতে  আউশ ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা থেকে ২৪.২৮ লক্ষ মেটন চাল পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

ফসল উৎপাদনের যে কোনো প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়নের মূলভিত্তিই হলো মানসম্মত বীজ। ভালো স্বাস্থ্য ও সতেজ বীজ ব্যবহার করেই ফসলের ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধান চাষের প্রতিটি স্তরে আধুনিক প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং সর্বোচ্চ ফলন পেতে হলে সঠিক জাত নির্বাচন, মানসম্মত বীজ ব্যবহার, বীজ বাছাই ও অন্যান্য পরিচর্যা, সঠিক সময়ে ও সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ, পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈবসার ব্যবহার, পরিমিত সেচ, যথা সময়ে ফসল কর্তন ও উন্নত পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণ করা জরুরি প্রয়োজন। আর তাই সব কৃষি উপকরণের মধ্যে গুণগত মানসম্পন্ন বীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অন্য দিকে ভালো বীজ না হলে কৃষিক্ষেত্রে অন্যান্য বিনিয়োগ ফলপ্রসূ হবে না

সরকারিপর্যায়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করে আসছে। সম্প্রতি বেশ কিছু বেসরকারি বীজ প্রতিষ্ঠান বীজ সরবরাহ করায় আগের তুলনায় ভালো বীজের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে অধিকাংশ বীজই কৃষক নিজে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করে থাকে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে বীজ সংরক্ষণ না করাই বীজের গুণগতমান ঠিক থাকে না। তাই উন্নত পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণ করা হলে বীজের গুণগতমান সঠিক থাকবে। বীজ সংরক্ষণে কৃষকদের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যায়ন কৌশল বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জেলা, উপজেলাপর্যায়ে চাষিদের ধান বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে।  

আউশ বীজ সংরক্ষণ বিষয়ে চাষি ভাইদের করণীয় : ফসল কাটা, মাড়াই এবং ধান বা বীজ ধান সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অধিক পাকা অবস্থায় ফসল কাটলে অনেক ধান ঝরে পড়ে, শিষ ভেঙে যায়, শিষ কাটা লেদা পোকা এবং পাখির আক্রমণ হতে পারে। তাই মাঠে গিয়ে ধান পেকেছে কিনা তা দেখতে হবে। বীজ ফসল সঠিক সময়ে কর্তন না করা হলে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়; যেমন অপরিপক্ব ফসল থেকে সংগৃহীত সব দানা বীজ হিসেবে উপযুক্ত নাও হতে পারে। অপরপক্ষে ফসল দেরিতে কর্তনের ফলে দানা ঝরে গিয়ে উৎপাদিত বীজের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং বীজ নিম্নমানের হতে পারে। এমনকি বীজের স্বাভাবিক রঙ নষ্ট হতে পারে, সেই সাথে বাজারমূল্যও কমে যেতে পারে। শিষের অগ্রভাগ থেকে ধান পাকা শুরু হয়। শিষের অগ্রভাগের ৮০% ধানের চাল শক্ত ও স্বচ্ছ এবং শিষের নিচের অংশ ২০% ধানের চাল আংশিক শক্ত ও স্বচ্ছ হলে ধান ঠিক মতো পেকেছে বলে বিবেচিত হবে। বীজ ধানের জন্য নির্বাচিত জমির আইলের পাশের ৬ ফুট বাদ দিয়ে ভেতরের অংশ হতে আলাদাভাবে ধান সংগ্রহ করা উচিত। রোগা ও পোকা আক্রান্ত জমি থেকে কোনোক্রমেই বীজ সংগ্রহ করা উচিত নয়। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে ধান কাটা উচিত। ফসল কর্তন ও পরিবহনে যাতে সংমিশ্রণ না ঘটে সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

কাটার পর ধান মাঠে ফেলে না রেখে যত সম্ভব মাড়াই করা উচিত। মাটি থেকে বীজ যাতে আর্দ্রতা শুষে নিতে না পারে তার জন্য  কাঁচা খলার ওপর ধানমাড়াই করার সময় চাটাই, মোটা চট, ত্রিপল বা পলিথিন বিছিয়ে দিতে হবে। আধুনিক বীজ মাড়াই যন্ত্রের সাহায্যে বীজ মাড়াই করলে বীজের গুণাগুণ ভালো থাকে। এভাবে ধান মাড়াই করলে ধানের রঙ উজ্জ্বল ও পরিষ্কার থাকে। ধান মাড়াইয়ের সময় যাতে অন্য জাতের বীজ মিশ্রিত না হয় সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে এবং সে জন্য মেঝে বা খলা থেকে অন্য জাতের ধান যতদূর সম্ভব দূরে রাখতে হবে।

মেঘলা দিন থাকলে ধান মাড়াই করা ও শুকানো কষ্টকর হয়। সে ক্ষেত্রে শিষ কেটে ছোট ছোট আঁটি বেঁধে ঘরের ভেতর ঝুলিয়ে রেখে শুকানো যায়। তা না হলে ধান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মাড়াই করা ধান অন্তত ৪ থেকে ৫ দিন রোদে ভালোভাবে  শুকানোর পর ঝেড়ে গোলাজাত করতে হবে।
  সব উপকরণ ঠিক রেখে কেবল মানসম্মত বীজ ব্যবহার করলে ধানের গড় ফলন ১৫ থেকে ২০% বৃদ্ধি করা সম্ভব। সুতরাং অধিক ফলন পেতে হলে ভালো বীজের প্রয়োজন। এজন্য যে জমির ধান ভালোভাবে পেকেছে, রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ হয়নি এবং আগাছামুক্ত সেসব জমির ধান বীজ হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ধান কাটার আগেই বিজাতীয় গাছ সরিয়ে ফেলতে হবে।  বীজ রাখার ধান কেটে আনার পর আঁটি পালা দিয়ে না রেখে বাতাসে ছড়িয়ে রাখা প্রয়োজন। বীজ ধান ঠিকমতো সংরক্ষণ না করলে এক দিকে কীটপতঙ্গ ও ইঁদুর নষ্ট করে, অপর দিকে গজানোর ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বীজ ধান থেকে আশানুরূপসংখ্যক চারা পাওয়া যায় না। বীজ ধান কাটা ও মাড়াইয়ের পর ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।  বীজ ধান কর্তন হতে পরবর্তী মৌসুমে বপনের পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে বীজ সংরক্ষণ করতে না পারলে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা এবং চারা গজানোর শক্তি কোনোটাই ঠিক থাকে না। এজন্য নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন-

সংগৃহীত বীজ ভালোভাবে  ঝাড়াই করে অপরিপক্ব বীজ, রোগাক্রান্ত বীজ, খড়কুটা, ধুলাবালু ভালোভাবে পরিষ্কার করে বড় বড় পুষ্ট দানা বাছাই করে নিতে হবে। বীজ সংরক্ষণের আগে পর পর কয়েকবার রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে যেন বীজের আর্দ্রতা শতকরা ১২ ভাগের নিচে থাকে। দাঁত দিয়ে কাটলে যদি কট করে শব্দ হয় তাহলে বুঝতে হবে বীজ ঠিকমতো শুকিয়েছে।

যে পাত্রে বীজ রাখা হবে তাতে যেন কোনো ছিদ্র না থাকে।  অল্প পরিমাণ বীজ রাখার জন্য  তেলের ড্রাম কিংবা বিস্কুট বা কেরোসিনের টিন প্রভৃতি ধাতব পাত্র ব্যবহার করা ভালো।

ধাতব পাত্র ব্যবহার করা সম্ভব না হলে, মাটির মটকা, কলস বা পলিথিন যুক্ত চটের বস্তা অথবা চটের বস্তায় পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক ড্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে। মাটির পাত্র হলে পাত্রের বাহিরের গায়ে আলকাতরার প্রলেপ দিতে হবে। পাত্রে বীজ রাখার আগে পাত্রগুলো আর্দ্রতামুক্ত করার জন্য ভালো করে রোদে শুকিয়ে নেয়া প্রয়োজন। রোদে শুকানো বীজ ঠাণ্ডা করে পাত্রে ভরতে হবে। পাত্রটি সম্পূর্ণ বীজ দিয়ে ভরাট করে রাখতে হবে। যদি বীজের পরিমাণ কম হয় তবে বীজের ওপর কাগজ বিছিয়ে তার ওপর শুকনো বালি দিয়ে পাত্র পরিপূর্ণ করতে হবে। এবার পাত্রের মুখ ভালোভাবে বন্ধ করতে হবে যাতে পাত্রের মধ্যে বাতাস ঢুকতে না পারে।

বীজ পাত্র মাচায় রাখা ভালো, যাতে পাত্রের তলা মাটির সংস্পর্শে না আসে। গুদামে বায়ু চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। বীজ কখনো স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রাখা ঠিক নয়।

সংরক্ষণ করা বীজ মাঝে মধ্যে পরীক্ষা করা দরকার যাতে কোনো প্রকার পোকামাকড় বা ইঁদুর ক্ষতি করতে না পারে। দরকার হলে মাঝে বীজ শুকিয়ে নিতে হবে। এতে বীজের আর্দ্রতা সঠিক থাকবে। প্রতি টন গুদামজাত বীজে ৩টি ফসটক্সিন ট্যাবলেট সর্বনিম্ন ৭২ ঘণ্টা ব্যবহারে গুদামের সব ধরনের পোকামাকড় মারা যায়। তবে জৈব বালাই ব্যবস্থাপনাই শ্রেয়।

টন প্রতি ধানে ৩.২৫ কেজি নিম, নিশিন্দা বা বিষকাটালি পাতার গুঁড়া, শুকনা তামাক দিয়ে গোলাজাত করলে পোকার আক্রমণ হয় না। এসব পাতা পোকামাকড় প্রতিরোধক।

আমাদের দেশে আউশ ধানের ভালো জাত  বেশি ছিল না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত কয়েকটি আউশ ধানের জাত যেমন ব্রিধান-৪২, ব্রিধান-৪৩, ব্রিধান-৪৮, ব্রিধান-৫৫  মাঠপর্যায়ে ভালো ফলন দিচ্ছে। এসব জাত কৃষকপর্যায়ে উল্লিখিত পদ্ধতিতে সংগ্রহ ও সংরক্ষিত করা হলে মানসম্মত বীজের সহজলভ্যতা হবে, ফলে আউশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
 
কৃষিবিদ মো. রফিকুল হাসান*
* উপপরিচালক (মনিটরিং), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫
বিস্তারিত
এশিয়ার বৃহত্তম হাওরাঞ্চল ও উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা
বেহুলা লক্ষিান্দরের পৌরাণিক কাহিনীতে উল্লেখ্য, চাঁদ সওদাগর বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে লৌহিত্য সাগর পাড়ি দিয়ে চম্পক নগর থেকে উজানি নগর যেত। পণ্ডিতগণ মনে করেন প্রায় ৪ হাজার বছর আগে হাওরাঞ্চলেই ছিল লৌহিত্য সাগরের বিশাল জলরাশি। দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে আছড়িয়ে পড়ত লৌহিত্য সাগরের উত্তাল ঊর্মীমালা।

সাগর সংস্কৃত শব্দ, বিবর্তিত শব্দ সায়র। সায়র থেকে কালের বিবর্তনে হাওর শব্দের উৎপত্তি হয়। আক্ষরিক অর্থে হাওর হচ্ছে এক বিস্তৃত জলমগ্ন কিংবা জলশূন্য ভূমি কিংবা নিম্ন জলাভূমি। যা মৌসুমে সাগরের মতো মনে হয় এবং কোন মৌসুমে শুধু ফসলের মাঠ। বড় বড় হাওরে সূর্য উঠে ও অস্ত যায়। শুকনা মৌসুমে যখন সূর্য উদয় হয় তখন দেখা যায় মাটি ভেদ করে অগ্নিদগ্ধ সূর্যটি উদিত হচ্ছে। ইহা কী যে অপরূপ দৃশ্য নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। হাওরাঞ্চলের নয়নাভিরাম দৃশ্য ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে নানা রূপ ধারণ করে। বর্ষাকালে সাগরের মতো চারদিকে পানি আর পানি। জনপদগুলোকে ছোট ছোট দ্বীপের মতো মনে হয়। লোকজন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে নৌকায় পারাপার হয়। ভরা বর্ষায় গ্রামগুলো ডুবু ডুবু। দক্ষিণা বাতাস শন শন শব্দ করে ছুটে চলে হিমালয়ের দিকে, তার প্রিয়তমা মালতির দেশে। তখন সঙ্গে বড় বড় ঢেউ মাথায় সাদা পাগড়ি পরে পাগলা হাতির মতো ছুটে চলে নৃত্যের তালে তালে। আর সামনে যা কিছু পায় ভেঙে চুরমার করে ভাসিয়ে নেয়।

চিক চিকে ইলিশের পিট, শান্ত, সুবোধ রাজকন্যার মতো কুয়াশার চাদর পরে শুয়ে থাকে শরতের সকাল। পূর্ণিমার রাতে ফুটন্ত শাপলা ফুল কথা বলে চাঁদের সনে। সকাল সন্ধ্যায় সাদা বক দল বেঁধে উড়ে যায় নীল নিলীমায়। শরৎ হেমন্তে, সাইবেরিয়া থেকে আগত অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয় হাওরাঞ্চল। মালার মতো দলবেঁধে দৃষ্টি সীমায় উড়ে চলে বলাকার দল। আহাঃ কী অপরূপ দৃশ্য! খলিসা মাছ নায়র যায় রঙিন শাড়ি পরে। ধবধবে সাদা কাশফুল কত যে চমৎকার। চারদিকে শুধু মাঠ, আকাঁবাঁকা সরুপথ চলেছে, দেশ দেশান্তর। গরুগুলো দুর্বা ঘাস চিবুচ্ছে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে। কৃষকের কলরবে সারা মাঠ মুখরিত হয়ে উঠে। পৌষ, মাঘ মাসে শীতের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায় কৃষকের ঘরে। মাঠগুলো তখন সরিষা ফুলের হলুদ রঙে রঙিন হয়ে উঠে। উপরে আকাশ নীল, নিচে হলুদের ছড়াছড়ি। বসন্তে সবুজ হতে শুরু করে বৃক্ষরাজি ও তরুলতা। তখন কোকিলের ডাকে জাগিয়ে তুলে বসন্তের আগমনীর বার্তা। কী যে অপরূপ দৃশ্য তা লিখে প্রকাশ করা যায় না।

বৈশাখ মাসে পাকা ধানের সোনালি রঙে সারা মাঠ সোনালি আকার ধারণ করে কৃষাণ কৃষানিরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে শুধু কাজ আর কাজ করে চলে দিন ভর। শুধু এক দুইবার হাওরাঞ্চল দেখে কিছুতেই হাওরের সৌন্দর্য বোঝা যাবে না। যারা হাওরবাসী শুধু তারাই জানে হাওর যে কত সুন্দর।

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলা নিয়ে হাওরাঞ্চলের অবস্থান। এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ হাওরাঞ্চল নামে এই এলাকাটি পরিচিত। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নিয়ে এ হাওরাঞ্চলের অবস্থান। এ ৭টি জেলায় ছোট বড় অসংখ্যা হাওর আছে। এর মধ্যে ৩৭৩টি আকারে অনেক বড়। তাছাড়া অসংখ্য নদ-নদী ডোবা ও জলাশয় রয়েছে। হাওরের মাটি পলিগঠিত বিধায় খুবই উর্বর এবং প্রচুর ধান জন্মে। ধানই অত্র এলাকায় একমাত্র ফসল। প্রচুর জলাশয় থাকার ফলে অনেক মাছ উৎপন্ন হয়। অত্র এলাকাকে বাংলাদেশের খাদ্য গুদাম বলা হয়। জলাশয় বেশি থাকার কারণে প্রচুর শামুক ঝিনুক উৎপন্ন হয়। যা প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ।

ভৌগোলিক অবস্থান অনুসারে হাওরাঞ্চলকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। ১. পাহাড় নিকটবর্তী অঞ্চল। যেমন সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার হাওরগুলো। ২. প্লাবন ভূমির হাওর। যেমন- নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওরসমূহ। ৩. গভীর পানিতে নিমজ্জিত হাওর। যেমন- সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলার কয়েকটি হাওর, কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার সব হাওর গভীর পানিতে নিমজ্জিত হাওর। হাওরাঞ্চলে সুনামগঞ্জ জেলাকে হাওরের ‘মা’ বলা হয়। জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি এবং ৭০% কৃষিজীবী। উপজেলাভিত্তিক হাওরের সংখ্যা এখানে তুলে ধরা হলো।

সুনামগঞ্জ জেলা : সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, ছাতক, দিরাই, ধর্মপাশা, দোয়ারাবাজার জগনাথপুর, টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, শাললা এলাকায় মোট হাওর সংখ্যা ৯৫টি ।

সিলেট জেলা : সিলেট সদর, বিয়ানিবাজার, বিশ্বনাথ, কোম্পানিগঞ্জ, কেচুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, কোতোয়ালি, জকিগঞ্জ, বালাগঞ্জ এ ১২টি উপজেলায় মোট হাওর ১০৫টি।

হবিগঞ্জ জেলা : আজমিরিগঞ্জ, বাহুবল, বানিয়াচং, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ সদর, লাখাই, মাধবপুর, নবীগঞ্জ, ৮টি উপজেলা। উল্লেখযোগ্য হাওরের সংখ্যা ১৪টি।
মৌলভীবাজার : বড়লেখা, জুড়ী, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল এ ৭টি উপজেলা। উল্লেখযোগ্য হাওরের সংখ্যা ৩টি।
নেত্রকোনা জেলা : আটপাড়া, বারহাট্টা, দুর্গাপুর, খালিয়াজুরি, কলমাকান্দা, কেন্দুয়া, মদন, মহোনগঞ্জ, নেত্রকোনা সদর, পূর্বধলা মোট ১০টি উপজেলা এবং হাওর আছে ৫২টি।

কিশোরগঞ্জ জেলা : ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ভৈরব, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, কটিয়াদি, নিকলী, কিশোরগঞ্জ সদর, পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর, করিমগঞ্জ, তাড়াইল মোট ১৩টি উপজেলা হাওরের সংখ্যা ৯৭টি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা : আখাউরা, আশুগঞ্জ, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, কসবা, নবীনগর, নাসিরনগর, সরাইল মোট ৮টি উপজেলায় হাওর রয়েছে ৭টি।

উপরে উল্লিখিত ৭০টি উপজেলার ৩৭০টি হাওর ছাড়াও এশিয়ার বৃহত্তম কয়েকটি হাওরের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। যেমন মৌলভী বাজার ও সিলেট জেলার হাকালুকি হাওর অবস্থিত ধর্মপাশা রুইবিল, হাকালুকি, শনির হাওর, সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত ইহা দ্বিতীয় বৃহত্তম হাওর। কিশোরগঞ্জ জেলায় বড় হাওর তৃতীয় বৃহত্তম হাওর। চলতি হাওর সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। তাছাড়া কিশোরগঞ্জ ধুপিবিল হাওর নেত্রকোনা পুটিয়ার হাওর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দ-খোলা আকাশী বিল। আগেই বলা হয়েছে ছোট বড় আরও অসংখ্যা হাওর রয়েছে। হাতিমারা হাওর এলংজুরী, ছিলানী, শাপলা, নূরপুর, কাতিয়ারকোন বাঘমারা, বনপুর, চিমনি, জয়সিদ্ধির হাওর প্রভৃতি। এ উর্বর হাওরাঞ্চল ও জলাভূমি ঘিরে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও হাওরাঞ্চল জাতীয় উন্নয়নের মূল ধারা থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। সম্প্রতি সরকার হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকার বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড ইঐডঙই মাধ্যমে এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এগুলোর মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ, কৃষি উন্নয়ন, মৎস্য উন্নয়ন, বিদ্যুৎ শক্তি, বন, খনিজসম্পদ, স্বাস্থ্য, পানিসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং জলাভূমি ব্যবস্থাপনা নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, পশুসম্পদ উন্নয়ন শিল্প শিক্ষার, সামাজিক সুবিধাদি, মুক্তা চাষ, আবাসন, পর্যটন ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা দ্বারা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে এবং জরুরিভিত্তিতে কার্যক্রম শুরু করা হবে। ৫ বছর, ১০ বছর ও ২০ বছরমেয়াদি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের এ পরিকল্পনাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

কিন্তু এ মহাপরিকল্পনা যেন কোন অবস্থাতেই মহাসঙ্কটে পরে ভেস্তে না যায় সে বিষয়ে অতি সাবধানে বুঝে শুনে পা বাড়াতে হবে। উল্লিখিত বিষয়ে হাওরবাসীর পক্ষে কতগুলো সুপারিশও পেশ করা হলো-

১. হাওর এলাকার মানুষ যাদের হাওরে জন্ম এবং হাওরে বসবাস করে তাদের কী সুবিধা-অসুবিধা আছে কী করলে কী সুবিধা হবে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যারা হাওরকে চিনে জানে এ ধরনের লোককে হাওর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।

২. কৃষি খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নই কৃষকের ভাগ্য উন্ময়নে সহায়ক হবে।

৩. বিনামূল্যে কীটনাশক প্রদান, ভর্তুকি মূল্যে সার, তেল ও উন্মত মানের বীজ প্রদান করা এবং কৃষি যন্ত্র পাতির মূল্য হ্রাস করা।

৪. আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, জমিতে সুষম সারের ব্যবহার, সেচের পানির অপচয় রোধ ইত্যাদি বিষয়ে কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা।

৫. অকাল বন্যার ক্ষতি থেকে ফসল রক্ষার জন্য নদী খনন ও নদীর বাঁক কেটে সোজাকরণ ও স্থান বিশেষে স্লুইস গেটসহ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা।
৬. বীজবোনা থেকে শুরু করে হাওরে ধান পাকা পর্যন্ত কৃষকের মোটা অংকের টাকা খরচ হয়। কিন্তু রাস্তাঘাটের অভাবে পাকা ধান কেটে বাড়ি আনতে পারে না। অতি বৃষ্টিতে বা বন্যা হলে জমির পাকা ফসল জমিতে নষ্ট হয়।

সে মর্মে হাওর অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে ডুবুরাস্তা (সাব মার্সেবল) নির্মাণ করা যা একটি হাওরকে কয়েক ভাগে ভাগ করে নিতে হবে। এ অবস্থায় যাতায়াত সুবিধাসহ ফসল ঘরে তোলা সহজ হবে।

৭. বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে অতি বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে না পারায় ভিজা ধান অঙ্কুরিত হয়ে ৬০-৭০% ক্ষতি হয়ে যায়। এ ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য প্রতি ওয়ার্ডে সমবায় ভিত্তিতে সরকারি খরচে একটি করে অটো রাইসমিল স্থাপন করলে অতি বৃষ্টির ক্ষতি থেকে ধান রক্ষা পাবে।

৮. পরিবহন ও যোগাযোগ উন্নয়নের চালিকাশক্তি কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের দিকটি বিবেচনায় রেখে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ফসল রক্ষার জন্য বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলে হাওর এলাকায় উন্নতি হতে পারে কিন্তু বেড়িবাঁধ নির্মাণে প্রচুর ফসলের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ঢেউয়ের আঘাতে ব্যাপক ক্ষতি হবে। এছাড়া উজানের স্রোত বন্ধ হয়ে জমির উর্বরতা হ্রাস পাবে। ফলে ফসলহানি ঘটে উন্নয়ন ব্যাহত হাতে পারে।

এক্ষেত্রে উড়াল সেতু নির্মাণ করে এক উপজেলার সঙ্গে অন্য উপজেলার যোগাযোগ ও শহর থেকে উড়াল সেতুর মধ্যে যোগযোগ করলে পরিবহন ও যোগাযোগে ব্যাপক উন্নতি হবে।

৯. মৎস্যসম্পদ : মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের জন্য জাল যার জলা তার- এ উপপাদ্যানুসারে প্রকৃত জেলেদের মধ্যে জলমহাল ইজারা দিতে হবে। মৎস্য সমবায় সমিতিগুলোতে প্রতীকী নাম ব্যবহার করে এক শ্রেণির লোক জলমহাল ইজারা নিয়ে ফুলবাবু সেজে জলমহালের সুবিধা ভোগ করে। এ লোকগুলো অতিশয় চালাক। অর্থ প্রদান করে জলমহালের মালিক বনে যায়। এতে প্রকৃত জেলেরা লভাংশ থেকে বঞ্চিত হন।

১০. বিল বা জলাশয় শুকিয়ে মাছধরা বন্ধ করতে হবে এবং বিষয়টি আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থা নিতে হবে। মাছের পোনা এবং মা মাছ নিধন বন্ধ করতে হবে ।

১১. বৈশাখ মাস থেকে আষাঢ় মাস এই তিন মাস প্রতি বছর মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে এতে অনেকাংশে মাছের বংশবিস্তার বৃদ্ধি পাবে।

১২. বেশি করে মাছের অভয়ারণ্য স্থাপন করতে হবে। আমাদের দেশের মৎস্য আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই, এটি জোরদার করতে হবে।

১৩. মৎস্য উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ শামুক ঝিনুক রক্ষা করতে হবে। মুরগির খামারের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

১৪. প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার জন্য যখন তখন বৃক্ষনিধন বন্ধ করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি নির্মাণকরণে ফসলের জমি তথা বৃক্ষের নিধনের প্রয়োজন হয়, সুতরাং জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করতে হবে।

১৫. বাড়ির আঙিনায় এবং রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণ করতে হবে এবং খাসজমি বাছাই করে মিঠাপানি সহনশীল গাছ যেমন- বট, হিজল, রেন্ট্রি নল, করুই, মেড়া, আম, জাম, নলখাগরা, মটকা ছাইল্লেয়া ইত্যাদি অনেক প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করতে হবে।

১৬. ঘরবাড়ি, স্কুল, কলেজ ইত্যাদি জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আশঙ্কজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ফসলি জমির পরিমাণ কমে আসছে। এ বিষয়ে আইন পাশ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

১৭. বর্তমান সরকার সব গ্র্রামকে নগরায়ন করার কথা ভাবছে। গ্রামের অবকাঠামো পরিবর্তন করে পরিকল্পিতভাবে ৪র্থতলা করে শহরের সব সুবিধা গ্রামে পোঁছে দেবেন। এটি একটি মহৎ উদ্যোগ। দ্রুত এর বাস্তবায়ন করতে হবে।
 
শেখ অলিনেওয়াজ (অলিউল্লাহ)
* সাংবাদিক, পুরান থানা, কিশোরগঞ্জ
বিস্তারিত
ভেটকি চাষে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

ভেটকি মাছ এশিয়া অঞ্চলে Sea bass এবং অস্ট্রেলিয়ায় বারামুণ্ডি নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এ মাছ কোরাল এবং ভেটকি এই দুই নামে পরিচিত। ভেটকি লম্বাটে ও চাপা ধরনের। এদের নিচের চোয়াল উপরের চোয়ালের চেয়ে কিছুটা বড়, পিঠের দিক সবুজমতো এবং পেটের দিক রুপালি রঙের। এ মাছ উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল বিশেষত পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেখা যায়। তাছাড়া এশিয়ার উত্তরাঞ্চল, কুইন্সল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল এবং পূর্ব আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলেও এদের দেখা যায়।


ভেটকি মাছ পুষ্টি, স্বাদ ও উচ্চমূল্যের জন্য মাছ চাষিদের কাছে আকর্ষণীয়। আনুমানিক ৪০ বছর আগে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, হংকং, অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানের উপকূলীয় অঞ্চলে এবং স্বাদুপানির পুকুরে, নদীতে ও নদীর মোহনায় ভেটকির চাষাবাদ খাঁচার মাধ্যমে শুরু হয়। বাংলাদেশে সাধারণ বেড়জাল, ফাঁদজাল ও তলদেশে ট্রলনেট ব্যবহার করে বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকার চট্টগ্রাম, বরিশাল,খুলনা, পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর মোহনায় নদীতে এবং চিংড়ির ঘেরে ভেটকি পাওয়া যায়।

এ মাছে উন্নতমানের আমিষ  ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড থাকে। এটা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং রক্তের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ভেটকিতে ভিটামিন এ, বি এবং ডি, খনিজ পদার্থ ক্যালসিয়াম, জিংক, লৌহ, পটাসিয়াম, ম্যাগনিসিয়াম এবং সিলেনিয়াম যথেষ্ট পরিমাণে থাকে। এগুলো শরীর গঠন ও বৃদ্ধির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভেটকির প্রজনন ক্ষমতা বেশি, এরা বছরে ৬০ থেকে ৭০ লাখ ডিম দেয়। এরা দ্রুত চলাচল করে এবং বেশি লবণাক্ততা সহিষ্ণু প্রজাতির মাছ, ভেটকি মাছের স্বাদ তো আছেই আবার কাঁটা কম থাকায় দেশে-বিদেশে এর চাহিদা প্রচুর উপকূলীয় অঞ্চলে ভেটকি চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে স্বাদুপানি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের আধা-লবণাক্ত ও লবণাক্ত পানিতে ভেটকি চাষ করা যায় বলে বাংলাদেশে এর চাষাবাদ এলাকা অনেক বড়। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের নদনদীতে ভেটকি চাষের পরিবেশ রয়েছে। আবার দেশে  এবং বাইরে এ মাছের প্রচুর চাহিদা থাকায় ভেটকি মাছ উৎপাদন ও রফতানির সুযোগ বেড়েই যাচ্ছে।

ভেটকি চাষের কতগুলো অসাধারণ সুবিধার মধ্যে রয়েছে : লবণাক্ততা সহিষ্ণু হওয়ায় নদী, নদীর মোহনা এবং উপকূলীয় এলাকার জলাভূমিতে সহজে চাষ করা যায়। সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং এদের বেশি ঘনত্বে চাষ করা যায়। ভেটকির বৃদ্ধির হার বেশি এবং প্রতি ৬ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে এদের প্রতিটির ওজন ৩৫০ গ্রাম থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত হয়। প্রজনন ক্ষমতা বেশি হওয়ায় মাঝারি আকৃতির একটি হ্যাচারি পরিচালনার জন্য কমসংখ্যক ব্রুড মাছই যথেষ্ট। উল্লেখ্য ব্রুভ মাছ হচ্ছে প্রজনন কাজে ব্যবহৃত বয়োপ্রাপ্ত স্ত্রী ও পুরুষ মাছ। ভেটকির পোনা ও প্রাপ্ত বয়স্ক মাছগুলো সহজে বিভিন্ন ধরনের তৈরি খাবারে অভ্যস্ত হয়ে  যায়। তাছাড়া দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে  ভেটকির মূল্য বেশি হওয়ায় এই মাছ চাষ অধিক লাভজনক। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ৭০০ থেকে ১২০০ গ্রাম ফজনের ভেটকির চাহিদা বেশি।

 ভেটকি সারা বছর ডিম দিয়ে থাকে। তবে এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস এদের মূল প্রজননকাল হিসেবে বিবেচিত। এ সময় এক সেন্টিমিটার আকারের অনেক পোনা ধরা পড়ে। বর্ষার শুরুতে পুরুষ ভেটকি স্ত্রী ভেটকির সঙ্গে মিলেনের জন্য নদ-নদীর নিন্ম অববাহিকায় আসে। ভরা পূর্ণিমা এবং অসাবস্যার শুরুতে জোয়ারের পানি আসার সময় ৫ থেকে ১০ কেজি ওজনের প্রতিটি স্ত্রী ভেটকি ২১ লাখ থেকে ৭১ লাখ পর্যন্ত ডিম পাড়ে। তারপর জোয়ারের পানিতে ভেসে ডিম এবং রেণু পোনা নদীর মোহনায় চলে আসে। রেণু পোনা মোহনা হতে নদীর উচ্চ অববাহিকার দিকে আসে। পরে পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় ডিম পাড়ার জন্য আবার সাগরের দিকে ফিরে যায়। এই মাছের একটা অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো বেশির ভাগ মাছ প্রুুষ মাছ হিসেবে প্রাপ্ত বয়স্ক হলেও স্ত্রী মাছের প্রাপ্যতা কম হলে একটি প্রজনন ঋতুর পর তারা লিঙ্গ পরিবর্তন করে স্ত্রী মাছ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ভেটকির পোনা প্রাকৃতিক উৎস সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল এবং নদীর মোহনায় সংগ্রহ করা গেলেও বছরের বিভিন্ন সময় এর একই পরিমাণ পাওয়া যায় না। তাই ভেটকি চাষাবাদ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তা ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে পোনা কম পাওয়া গেলে এ মাছের চাষ ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে। এ প্রেক্ষিতে কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদন একান্ত জরুরি। থাইল্যান্ডে ১৯৭১ সালে ভেটকি মাছের কৃত্রিম প্রজনন শুরু হয়। তারপর ১৯৭৩ সালে বদ্ধ পরিবেশে হরমোন ব্যবহারের মাধ্যমে এ মাছের কৃত্রিম প্রজননে সাফল্য অর্জিত হয়। ১৯৮১ সালে বিজ্ঞানী Kunguankij কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদনে সফল হন।

সংক্ষেপে বলা যায় ভেটকি মাছের কৃত্রিম প্রজনন প্রধানত দুভাগে  সম্পন্ন করা যায়। একটা হচ্ছে হরমোন ব্যবহার করে এবং দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে পরিবেশের নিয়ামক পরিবর্তনের মাধ্যমে।

ভেটকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই মৃদু ঘোলা পানি, স্বাদুপানি এবং সমুদ্রের পানিতে খাঁচায়ও চাষ করা হচ্ছে। ভেটকি মাংসাশী হওয়ায় সকালে এবং বিকালে কম দামি মাছ ট্রাস ফিশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে স্বভোজী স্বভাবের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে মৃত্যুহার বেড়ে যায়। সে কারণে ছোট বড় মাছ আলাদা করে ভেটকি চাষ করা বাঞ্ছনীয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে পুকুরে ভেটকি চাষ হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে পুকুরে বিশেষ লবণাক্ত পানিতে ভেটকি চাষ শুরু হয়ে গেছে। পুকুরে ৬ মাসে প্রতিটি ভেটকি গড়ে ৩৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে। তবে চাষ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন মাছ উৎপাদন সম্ভব এবং বিনিয়োগের দেড় থেকে দুইগুণ লাভ করা যায়।

 ভেটকি পুকুরে দুইভাবে চাষ করা যায় : একক চাষ পদ্ধতিতে এবং মিশ্র চাষ পদ্ধতিতে। প্রথম ক্ষেত্রে চাষ সম্পূর্ণভাবে সম্পূরক খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে এবং সম্পূরক খাদ্য তাজা মাছের মূল্য বেশি হওয়ায় মুনাফা অনেক কম হওয়ার আশংকা এক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়। তবে মিশ্রচাষ পদ্ধতিতে ভেটকি মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এমন দ্রুতবর্ধনশীল ও প্রজননক্ষম মাছ চাষ করে সফলতা অর্জন করা যায়। ভেটকির সঙ্গে খাদ্যের প্রতিযোগিতা করে এমন মাছ হলে চলবে না। তবে তেলাপিয়া এবং নাইলোটিকা মিশ্রচাষের ক্ষেত্রে নির্বাচিত করা যেতে পারে।

ভেটকি চাষে সমস্যার মধ্যে রয়েছে : প্রাকৃতিক উৎসে পোনার স্বল্পতা এবং এই মাছের কৃত্রিম প্রজননে সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা, রাক্ষুসে এবং স্বজাতিভোজী বৈশিষ্ট্যের কারণে ভেটকি চাষের ক্ষেত্রে মৃত্যুহারের আধিক্য। তা ছাড়া রয়েছে ট্রাস ফিশ সরবরাহের সমস্যা এবং তা ব্যয়বহুলও বটে।

তবে কোনো কোনো দেশ ভেটকি চাষে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ইতোমধ্যে সাফল্য অর্জন করেছে। যেমন- থাইল্যান্ডে হ্যাচারিতে উৎপাদিত ভেটকির পোনার মান প্রাকৃতিক উৎসে উৎপাদিত পোনার সমতুল্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ভেটকি চাষের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে। তবে আমরা এখনও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনে কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। এ ব্যাপারে দুইবছর আগেও গবেষণা হয়েছে। তারপর গত দুই বছর ধরে নিয়মিত গবেষণা চলছে। তাছাড়া লবণাক্ত পানির স্বল্পতাও রয়েছে। ভেটকি মাছের প্রজনন এবং দ্রুত বৃদ্ধির জন্য লবণাক্ত পানি অত্যাবশ্যক। এ মাছের খাদ্যের সমস্যা যে থাকবেই না সেটাও এখনো নিশ্চিত করে বলার  মতো সময় বোধ হয় হয়নি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৎস্য বিজ্ঞানীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। সেখানে এ ব্যাপারে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।

    পরিশেষে আশা করব : থাইল্যান্ডের মতো পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা ও অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ভেটকির কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং ট্রাস ফিশের পরিবর্তে তৈরি খাবার পদ্ধতিও উদ্ভাবন হবে।  উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডের মৎস্য বিজ্ঞানীরা হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে চার দশক আগেই সাফল্য অর্জন করেছেন। তাদের উৎপাদিত পোনার মান প্রাকৃতিক উৎসের পোনার মানের সমতুল্য বলেও প্রমাণিত হয়েছে। অনুরূপভাবে সফল হতে পারলে ভেটকি চাষে আমাদেরও অসাধারণ উন্নতি হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ে ভেটকি চাষের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তবে মাছ চাষে আমাদের উন্নয়ন লক্ষণীয় হওয়া সত্ত্বেও আত্মতৃপ্তির অবকাশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মাছ চাষে সাফল্যের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ আমাদের আছে পুকুর, হাওর, চিংড়ি খামার ও মৌসুমি জলাশয়সহ বিশাল বদ্ধ জলাশয়, নদনদী-মোহনা, সুন্দরবন, বিল, কাপ্তাই লেক ও প্লাবন ভূমিসহ উন্মুক্ত জলাশয় এবং সমুদ্রসীমা তটরেখা হতে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত, একান্ত অর্থনৈতিক এলাকা তটরেখা হতে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ও উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্মৃতিসহ সামুদ্রিক জলায়তন। এ বিশাল এলাকায় নিয়োজিত রয়েছেন আমাদের প্রায় ১৩৯ লাখ কর্মজীবী মৎস চাষি এবং প্রায় গড়ে ৮ লাখ চিংড়ি চাষি। এখন প্রয়োজন এদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও সহায়তা দিয়ে যথাযথভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
 
কাজী শফিকুর রহমান*
* আইনজীবী, সাংবাদিক। বাসা-২৩, রোড-৩০, ব্লক ডি, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬। মোবাইল : ০১৫৫২৪৫৭৬৬৩।
বিস্তারিত
গৃহপালিত প্রাণীর বাহ্য পরজীবী ও নিধনের উপায়

যেসব জীব পশুপাখির শরীরের বাইরে বাস করে ও পুষ্টি শোষণ করে জীবন ধারণ করে সেগুলোকে বাহ্য পরজীবী বলে। এর মধ্যে উকুন, আটালি, মাইট, মেঞ্চ, মশা-মাছি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, শূকর ও মুরগির খামারে অর্থনৈতিক ক্ষতির জন্য বাহ্য পরজীবী একটি অন্যতম কারণ। বাহ্য পরজীবী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রাণীর ক্ষতি করে থাকে।

প্রত্যক্ষ ক্ষতিগুলো
সরাসরি রক্ত চুষে খায়, ফলে প্রাণী রক্তশূন্য হয়ে পড়ে ও সব ধরনের উৎপাদন কমে যায়।
উকুন, আটালি, মশা-মাছি দংশন করার সময় প্রাণী অস্থির ও অশ^স্তি বোধ করে ফলে পেট ভরে খেতে পারে না এতে করে উৎপাদন কমে যায়।

পরজীবীর কামড়ের কারণে প্রাণীটির শরীর ঘষা-ঘষি করে ফলে চামড়া ও লোম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরজীবীর কামড়ের কারণে প্রাণীর চামড়ায় pruritis Allergic ক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে।

শীতকালে নবজাত বাছুর, ছাগলছানা অতিরিক্ত উকুন, আটালি দ্বারা আক্রান্ত হলে রক্তশূন্য হয়ে মারাও যেতে পারে।

বিশেষ প্রজাতির আটালির লালাগ্রন্থি থেকে এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা পোষক প্রাণীটিকে প্যারালাইসিস করে ফেলে।

বাহ্য পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত খামারে একসঙ্গে সব প্রাণীকেই চিকিৎসা pruritis Allergic দিতে হয়। ফলে চিকিৎসা খরচ বেড়ে যায়।

পরোক্ষ ক্ষতিগুলো
কতকগুলো বাহ্য পরজীবী অসুস্থ প্রাণী থেকে সুস্থ প্রাণীতে রোগ ছড়াতে সাহায্য করে। যেমন-

ক. আটালি : বেবিসিওসিস, এনাপ্লাজমোসিস, Dermatophilosis,,  থেইলেরিওসিস, Heart water diease.
খ. ফ্লি/ মাছি : ওলান প্রদাহ, KeratoconJnuctivitis, Trypanosomiasis ও অন্যান্য রোগ।
গ. Midges : Blutongve, African horse sicknes অন্যান্য রোগ।
ঘ. Culicoides midges : Blutongue, কিছু বাহ্য পরজীবী ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে (Vector of viruses),   যেমন-
ক. Blurongue
খ. Africon horse sickrum
গ. Epigootic Hemorrhagic diease
ঘ. Akabune
ঙ. Bovine ephimeral fever.

কতকগুলো বাহ্য পরজীবী অন্তঃপরজীবীর বাহক হিসেবে কাজ করে যেমনÑ
ক. Haemoprotevs
খ. Leucocy togoon
গ. Onchocerca
ঘ. Mansonella ইত্যাদি।

উকুন
আমাদের দেশে গরু, ছাগল ভেড়া, মুরগি শীত কালের শেষের দিকে উকুন দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে, প্রাণীর তলপেট, কান গল কঙ্খল, লেজের মাথ, থুতনির নিচে, পায়ের কুচকির মধ্যে বেশি হতে দেখা যায়। বয়স্ক প্রাণী অপেক্ষা অল্প বয়স্ক প্রাণীকে বেশি আক্রান্ত করে।

প্রতিটি প্রজাতি প্রাণীয় উকুন আলাদা আলাদা, অর্থাৎ গরুর উকুন কখনই মুরগিকে ধরবে না।
উকুন ২ প্রকার

ক. শোষক উকুন : কামড়ায় ও রক্ত শোষণ করে।
খ. দংশনকারী উকুন : শুধু কামড়ায়।

আটালি
আমাদের দেশের গবাদিপ্রাণী গরমকালে আটালি দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। আটালির আকার কতগুলো খুব বড় আবার কতগুলো খুব ছোট। আটালি প্রাণীর কানে, ওলানে, পায়ে, তলপেটে, পায়ের কুচকির মধ্যে, মলদারের চারপাশে ও লেজের মাথায় বেশি দেখা যায়। আটালি সব সময় পোষকের দেহে লেগে থাকে না। রক্ত খেয়ে দিনে গোশলার বিভিন্ন জায়গা যেমন- ছোট গর্ত, ফাটা স্থান, বেড়ার ফাঁক ও বিভিন্ন আবর্জনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে।

একটি প্রাপ্ত বয়স্ক আটালি না খেয়ে (পোষক ছাড়া) ২ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, আটালির শক্ত বহিরাবরণের কারণে কীটনাশক প্রয়োগে নিধন করা সম্ভব হয় না। আটালি বিশ্বে বিরাজমান     

আটালি ২ প্রকার
ক. Ixodids- hard tick  
খ. Argadis – Soft tick
আবার পোষক (Host)  সংখ্যার ওপর ভিত্তি করেও আটালিকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
যথা- ১. একক পোষক (Monohost)  আটালি।
      ২.  বহু পোষক (Multi host)   আটালি।

আটালির জীবন চক্র :
ডিম      লার্ভা    নিম্ফ    প্রাপ্ত বয়স্ক আটালি।

মাইট ও মেঞ্চ
প্রাণি দেহে মাইটি সংক্রমণের ফলে মারাত্মক চুলকানির ও অশ্বস্তি বোধ তৈরি করে। খাদ্য গ্রহণ খুব কমে যায়। চামড়া ও লোমের মারাত্মক ক্ষতি করে। মানুষসহ সব প্রাণীর চর্মরোগকে মেঞ্চ বলে। মাইটগুলো প্রাণির শরীরের লোমের ফলিকুল এবং ত্বকের সিবাসিয়াম গ্রন্থিকে আক্রান্ত করে। মাইট খালি চোখে দেখা যায় নাা। চামড়া থেকে Scrapping  নিয়ে স্লাইডে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায়।

 মেঞ্চ শরীরের যে কোনো অংশে বা সমস্ত শরীরে হতে পারে। চামড়া চাকা চাকা ও পুরু হয়ে ফুলে যায় বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নডুল হয়। মেঞ্চ আক্রান্ত স্থানের লোম কমে যায়। চর্ম প্রদাহ বেশি এলাকাজুড়ে হলে প্রাণীর স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায় ও উৎপাদন কমে যায়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংস্পর্শে সংক্রামিত হয়।

ছাগল, ভেড়ার চামড়া পুরু হয়ে লোমশূন্য হয়ে পড়ে। গরুর লেজে, উরুতে ও ওলানে, ঘোড়া পায়ে হতে দেখা যায়। মাইট চামড়ায় ক্ষত সৃষ্টি করে ফলে খুব চুলকায় ও জ্বালাপোড়া হয়। ক্ষতের উপায় সিরাম ক্ষরিত রস জমে মাসড়ি পড়ে। কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের কানে আক্রান্ত করে ফলে পা দিয়ে কান চুলকায়।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
১. InJ Ivertin/ Ivermactin- : ১/৫০  কেজি ওজন S/C অথবা, Ivermectin pour on - প্রাণীর মেরুদণ্ডের ওপর দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে প্রয়োগ করতে হবে।

Cypermelthrin/ pyremethrin/ Bifenthrin/ Carbaryl/Negutox প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা, মাত্রা, নিরাপত্তা বিষয়ে পড়ে ব্যবহার করতে হবে।

শেডের ভেতরে ও বাইরে পরিষ্কার রাখতে হবে। ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করতে হবে।
গরমকালে মশা, মাছি, উকুন ও আটালির আক্রমণ বেশি হয়, তাই এ সময় নজরদারি বাড়াতে হবে। আক্রমণ  দেখা মাত্র নিধনের ব্যবস্থা করতে হবে।

গভীর শেড থেকে দূরে গোবরের স্তূপ স্থাপন করতে হবে।

প্রয়োজনে গাভীর শেডে Acaricide জাতীয় ওষুধ স্প্রে করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
পরামর্শের জন্য ভেটেরিনারিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

গবাদিপ্রাণী বাহ্য পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হওয়া মাত্রই ওষুধ প্রয়োগ করে নিধন করে বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
সূত্র : ১. Internate\
       ২. ভেটেরিনারি ক্লিনিশিয়ান গাইড
       - ড. এমএ সামাদ (BAU)


 
কৃষিবিদ ডা. মনোজিৎ কুমার সরকার
* উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর। মোবাইল : ০১৭১৫২৭১০২৬
বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর ভাদ্র-১৪২১
আল-আমিন
গাইবান্ধা

প্রশ্ন : পুকুর প্রস্তুতি কীভাবে করব?
উত্তর : পুকুর শুকিয়ে তলদেশের পচা কাদা অপসারণ এবং তলদেশ সমান করতে হবে। পাড় উঁচু করে বাঁধতে হবে। পুকুরের পাড়সহ তলায় চুন ভালোভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে প্রতি শতকে ১ কেজি হারে। পুকুরের তলদেশ চাষ দিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। ছোট ছিদ্র বিশিষ্ট নাইলন জাল দিয়ে পুকুরের চারপাশে বেড়া (৩ ফুট উঁচু) দিতে হবে। পানি প্রবেশ পথ ও জরুরি পানি নির্গমন পথ করতে হবে এবং তাতে স্ক্রিন বা বানা (বাঁশের পাটা ও নাইলনের জাল) দিতে হবে। চুন প্রয়োগের ৫-৭ দিন পরে প্রয়োজনমতো পানি প্রবেশ করিয়ে সার প্রয়োগ করতে হবে ইউরিয়া ১৫০-২০০ গ্রাম/শতক, টিএসপি ৭৫-১০০ গ্রাম/শতক হারে। এরপর ব্লিচিং পাউডার  পুকুরে ছিটিয়ে দিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে হবে। অনেক সময় ঘেরের এককোণায় বাঁশের ফ্রেমের সাথে একটি নার্সারি তৈরি করতে বলা হয়। হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা বা গোবর ব্যবহার করা যাবে না।

মো. গুলজার হোসেন
নাটোর

প্রশ্ন : পুকুরে মাছ খাবি খাচ্ছে কী করা যায়?
উত্তর : মাছের ঘনত্ব বেশি থাকলে কমিয়ে দিতে হবে। শতক প্রতি ৪০-৫০টি মাছ। পুকুরের পাড়ের গাছপালা থাকলে ছেটে দিতে হবে। যেন আলো বাতাস বেশি থাকে এবং গাছের পাতা পড়ে পানিতে পচন তৈরি করতে না পারে। পানিতে বুদবুদ উঠতে দেখা গেলে বা পুকুরের তলদেশে গ্যাস হলে হররা টেনে গ্যাস বের করতে হবে। পানিতে অক্সিজেন মেশানোর জন্য বাঁশ, কাঠের ঝাপটা বা পাতিলের সাহায্যে ঢেউ সৃষ্টি করতে হবে। পানি ঢুকানোর সুযোগ থাকলে পানি ঢুকিয়ে পুকুরের পানি বদল করে দিতে হবে।

মো. বেলাল হোসেন
দিনাজপুর

প্রশ্ন : স্ট্রবেরি চাষের জন্য কী ধরনের মাটি সবচেয়ে ভালো।
উত্তর : পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন যে কোনো বেলে দো-আঁশ মাটিই স্ট্রবেরি চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। মাটির অম্লমান ৫.৬-৬.৫ স্ট্রবেরি চাষের জন্য উত্তম। স্ট্রবেরি চাষের জন্য মাটিতে জৈব পদার্থ কমপক্ষে ৩% থাকা উচিত। মাটির অম্লমান ৭ এর উপরে হলে শিকড়ের বৃদ্ধি কমে যায়।

মো. আলমগীর হোসেন
পাবনা

প্রশ্ন :     পেয়ারার ছাতরা পোকা (মিলিবাগ) আক্রমণ হলে করণীয় কী?
উত্তর :  ছাতরা পোকা পেয়ারার একটি অন্যতম ক্ষতিকর পোকা। বিভিন্ন প্রজাতির ছাতরা পোকা পেয়ারা গাছের কচি পাতা, ডগা ও নতুন শাখা-প্রশাখার ক্ষতি করে থাকে। আক্রান্ত গাছে ছাতরা পোকার মধু রস খাওয়ার জন্য পিঁপড়ারা আসে। ছাতরা পোকার বিস্তার ঠেকাতে পিঁপড়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

১. পোকা দেখামাত্র হাত দ্বারা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে।
২. প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলতে হবে।
৩. আক্রমণের মাত্রা বেড়ে গেলে অনুমোদিত কীটনাশক যেমন- ডায়াজিনন ৬০ ইসি, ডারসবান ২০ ইসি, পাইরিফস ২০ ইসি স্প্রে করতে হবে।  

রফিকুল ইসলাম
রংপুর

প্রশ্ন : মরিচ গাছের পাতা সরু ও ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। পাতা মোচড়ানো ও নিচের দিকে বেঁকিয়ে যায়। এর কারণ ও প্রতিকার চাই।
উত্তর : মরিচ গাছ বিভিন্ন প্রকার পোকামাকড় দ্বারা বিভিন্ন সময় আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে মাইট একটি ক্ষতিকর পোকা। এ পোকা গাছ থেকে রস শোষণ করে মরিচের উৎপাদন ও গুণগতমান কমিয়ে দেয়।

প্রতিকার :  ১.  মরিচ উৎপাদনের জন্য ছায়াযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে।

২. সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে এর আক্রমণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
৩. আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে মাকড়নাশক (যেমন-ওসাইট) স্প্রে করতে হবে। মাইটগুলো সাধারণত পাতার নিচের দিকে থাকে। তাই স্প্রে করার সময় অবশ্যই পাতার নিচে স্প্রে করতে হবে।

নীলমনী দেব
নওগাঁ

প্রশ্ন :  ধানের জমিতে আগাছানাশক ব্যবহারের সময় কতটুকু পানি থাকা দরকার।
উত্তর :  আগাছানাশকের সাহায্যে আগাছা দমন অধিক সাশ্রয়ী পদ্ধতি। তরল, দানাদার ও পাউডার এ তিন ধরনের আগাছানাশক পাওয়া যায়। তরল ও পাউডার জাতীয় আগাছানাশক পরিমাণমতো পানির সঙ্গে মিশিয়ে এবং দানাদার আগাছানাশক ছিটিয়ে জমিতে প্রয়োগ করা যায়। দানাদার ও তরল আগাছানাশক দেয়ার সময় জমিতে ২-৩ সেমি. পানি থাকতে হবে। পানির পরিমাণ যদি এক সপ্তাহ রাখা যায় তাহলে সর্বোচ্চ ভালো ফল পাওয়া যাবে।

আল আমিন
গাইবান্ধা

প্রশ্ন : গরু বা ছাগলের ডায়রিয়া হলে কী করব।
উত্তর : এসটিনজেন্ট মিক্সার উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে সংগ্রহ করে খাওয়ানো। তাছাড়া ডায়াভেট, ইস্ট্রিনেক্স, ইস্ট্রিনা বা এস্টোভেট ১৫০ গ্রাম পাউডার ১০০ কেজি ওজনের গরু বা ছাগলকে খাওয়ানো যাবে। তিন দিন খাওয়াতে হবে। ছাগল বা গরুর ওজন কম হলে ওষুধের মাত্রাও আনুপাতিক হারে কমিয়ে খাওয়াতে হবে।

মমিনুল ইসলাম
ময়মনসিংহ

প্রশ্ন : গরু ছাগলের নিউমোনিয়ায় কী করণীয়?
উত্তর : এন্টিবায়োটিক স্ট্রেপ্টোপি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ২.৫ গ্রাম ৩-৪ দিন এবং মক্সিলিন, ভেট এল এ ১০০  কেজি ওজনের জন্য ১০ মিলি. করে ৩-৪ দিন দিতে হবে।

আক্রান্ত ছাগল অতিদ্রুত অন্যান্য ছাগল হতে আলাদা করে নিতে হবে। আক্রান্ত ছাগলকে স্যাঁতসেঁঁতে স্থান থেকে দূরে রাখতে হবে।

মো. হিরা
দিনাজপুর

প্রশ্ন : পানির রঙ গাঢ় সবুজ, মাছ মরে যাচ্ছে, কী করব?
উত্তর : অতিরিক্ত প্ল্যাংকটন তৈরি হওয়ার কারণে এবং অক্সিজেনের অভাব হলে এমন হয়।
চুন ১ কেজি/শতক হারে গ্রয়োগ করতে হবে। খাবার ও রাসায়নিক সার সাময়িক বন্ধ রাখতে হবে এবং পানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। তুঁতে ১২-১৪ গ্রাম/শতক হারে  ছোট  পোঁটলায়  বেঁধে ওপর  থেকে ১০-১৫  সেমি. নিচে বাঁশের খুঁটিতে  বেঁধে রাখলে ভালো হয়। সিলভার কার্প মাছ ছাড়তে হবে।

রুহুল ইমাম
লালমনিরহাট

প্রশ্ন : ভিয়েতনাম কই মাছ চাষের গুরুত্ব ও পোনা মজুদ সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : আমাদের দেশে আবহাওয়া ও জলবায়ু এ মাছ চাষের জন্য উপযোগী। এ মাছ দ্রুত বর্ধনশীল। মাত্র চার মাসে ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম ওজন হয়। দেশি কৈ মাছের মতো আকর্ষণীয় সবুজাভ-সোনালি বর্ণের জন্য এ মাছের বাজারমূল্য ও চাহিদা থাই কৈ মাছের চেয়ে অনেক বেশি। এর চাষ ব্যবস্থাপনা সহজ এবং অন্য মাছ চাষের চেয়ে তুলনামূলক লাভ বেশি। থাই কৈ মাছের সঙ্গে শিং ও মাগুর মাছের মিশ্র চাষ করে এর সঙ্গে বাজারজাত করা যায়।

পোনা মজুদ :  ০.১৫ থেকে ০.২০ গ্রাম আকারের সুস্থ ও সবল পোনা এককভাবে চাষে প্রতি শতক আয়তনের পুকুরের জন্য ৬০০  থেকে ৮০০টি হারে মজুদ করা  যেতে পারে। মজুদের সময়  পোনা পুকুরের পানির সঙ্গে খাপ খাইয়ে ছাড়তে হবে।

এছাড়া শিং, মাগুর, রুই, সিলভার কার্প, মৃগেল ও সরপুঁটির সঙ্গে মিশ্র চাষের  বেলায় শতাংশপ্রতি কৈ মাছের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম হবে। এক শতক আয়তনের একটি পুকুরে শিং, মাগুর, রুই ও সিলভার কার্পের মিশ্র চাষে ভিয়েতনাম কৈ ৫০০ থেকে ৬০০, শিং-মাগুর ১০০, রুই ২ ও ৩টি সিলভারকার্পের পোনা থাকতে পারে। পোনা মজুদের সময় কিছু  পোনা মারা যায়; তাই ১৫  থেকে ২০ শতাংশ  পোনা  বেশি মজুদ করা উচিত।
 
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ
* কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল : ০১৫৫২৪৩৫৬৯১
বিস্তারিত
আশ্বিন মাসের কৃষি-১৪২১
নদীর ধারে কাশফুলের শুভ্রতা আর দিগন্ত জোড়া সবুজ, সেসঙ্গে আকাশে ভেসে বেড়ানো চিলতে সাদা মেঘ আমাদের মনে করিয়ে দেয় বর্ষার শেষে আনন্দের বার্তা নিয়ে শরৎ এসেছে। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের সবার জন্য শুভকামনা। বর্ষা মৌসুমের সবটুকু ক্ষতি পুষিয়ে চলতি মৌসুমের পুরো পাওনা আদায় করতে কার্যকরী প্রস্তুতি নেয়ার এখনই সময়। এ প্রেক্ষিতে আসুন সংক্ষেপে জেনে নেই আশ্বিন মাসের বৃহত্তর কৃষি ভুবনের  করণীয় বিষয়গুলো।
 
ফসল        অবস্থা/বিবরণ     করণীয়  

আমন ধান / পরিচর্যা    
আমন ধানের বাড়ন্ত পর্যায় এখন। ধান গাছের বয়স ৪০-৫০ দিন হলে ইউরিয়ার শেষ কিস্তি প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং জমিতে ছিপছিপে পানি রাখতে হবে। এ সময় বৃষ্টির অভাবে খরা দেখা দিতে পারে। সেজন্য সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।

সম্পূরক সেচ    
এ সময় বৃষ্টির অভাবে খরা দেখা দিতে পারে। খরায় ফলন অনেক কমে যায়। সুতরাং খরা দেখা দিলে সম্পূরক সেচ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নদী, পুকুর, খাল-বিল, ডোবা যেখানেই পানি পাওয়া যাবে সেখান থেকে পাম্প, নলকূপ, দোন, সেওতি দিয়ে সেচ দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে সম্পূরক সেচ আমনের ফলন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।    

রোগ ও পোকামাকড়
শিষ কাটা লেদা পোকা ধানের জমি আক্রমণ করতে পারে। প্রতি বর্গমিটার আমন জমিতে ২-৫টি লেদা পোকার উপস্থিতি মারাত্মক ক্ষতির পূর্বাভাস। তাই সতর্ক থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সময় মাজরা, পামরি, চুঙ্গি, গলমাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। এছাড়া খোলপড়া, পাতায় দাগ পড়া রোগ দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে, জমিতে খুঁটি দিয়ে, আলোর ফাঁদ পেতে, হাতজাল দিয়ে পোকা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাছাড়া সঠিক বালাইনাশক সঠিক মাত্রায়, সঠিক নিয়মে, সঠিক সময় শেষ কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

নাবি আমন
রোপণ নিচু এলাকায় অথবা কোনো কারণে আমন সময় মতো চাষ করতে না পারলে আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিআর ২২, বিআর ২৩, বিনাশাইল বা স্থানীয় জাতের চারা রোপণ করা যায়। এক্ষেত্রে গুছিতে ৫-৭টি চারা রোপণ করতে হবে। সেসঙ্গে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি ইউরিয়া প্রয়োগ ও অতিরিক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায় এবং দেরির ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়।

আখ /  চারা উৎপাদন    
আখের চারা উৎপাদন করার উপযুক্ত সময় এখন। সাধারণত বীজতলা পদ্ধতি এবং পলিব্যাগ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা যায়। তবে পলিব্যাগে চারা উৎপাদন করা হলে বীজ আখ কম লাগে এবং চারার মৃত্যুহার কম হয়।  চারা তৈরি করে বাড়ির আঙিনায় সুবিধাজনক স্থানে সারি করে রেখে খড় বা শুকনো আখের পাতা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। চারার বয়স ১-২ মাস হলে মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। কাটুই বা অন্য পোকা যেন চারার ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।  
 
বিনা চাষে ফসল / আবাদ  জমি তৈরি ও বীজ বপন    
মাঠ থেকে বন্যার পানি নেমে গেলে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় বিনা চাষে অনেক ফসল আবাদ করা যায়। এ সময় ভুট্টা, গম, আলু, সরিষা, মাসকালাই বা অন্যান্য ডাল ফসল বিনা চাষে লাভজনকভাবে অনায়াসে আবাদ করা যায়। সঠিক পরিমাণ বীজ, সামান্য পরিমাণ সার এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে লাভ হবে অনেক। জমির জো বুঝে এবং আবহাওয়ার কথা খেয়াল রেখে বিনা চাষে ফসল করলে খরচ খুব কম হয় এবং দ্রুত একটি ফসল পাওয়া যায়।

শাকসবজি/ আগাম জাতের শীতকালীন সবজি চাষ
জমির মাটি এখনও ভেজা এবং স্যাঁতসেঁতে। আগাম শীতের সবজি উৎপাদনের জন্য উঁচু জয়গা কুপিয়ে পরিমাণ মতো জৈব ও রাসায়নিক সার বিশেষ করে ইউরিয়া দিয়ে শাক উৎপাদন করা যায়। শাকের মধ্যে মুলা, লালশাক, পালংশাক, চিনাশাক, সরিষাশাক অনায়াসে করা যায়। তাছাড়া সবজির মধ্যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, টমেটো, বেগুন, ব্রোকলি বা সবুজ ফুলকপিসহ অন্যান্য শীতকালীন সবজির চারা তৈরি করে মূল জমিতে বিশেষ যতেœ আবাদ করা যায়।

কলা/ চারা রোপণ    
অন্যান্য সময়ের থেকে আশ্বিন মাসে কলার চারা রোপণ করা সবচেয়ে বেশি লাভজনক। এতে ১০-১১ মাসে কলার ছড়া কাটা যায়। ভালো উৎস বা বিশ্বস্ত চাষি ভাইয়ের কাছ থেকে কলার অসি চারা সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে। কলার চারা রোপণের জন্য ২-২.৫ মিটার দূরত্বে ৬০ সেমি. চওড়া এবং ৬০ সেমি. গভীর গর্ত করে রোপণ করতে হবে। গর্তপ্রতি ৫-৭ কেজি গোবর, ১২৫ গ্রাম করে ইউরিয়, টিএসপি ও এওপি সার এবং ৫ গ্রাম বরিক এসিড ভালোভাবে মিশিয়ে ৫-৭ দিন পর অসি চারা রোপণ করতে হবে। কলা বাগানে সাথি ফসল হিসেবে ধান, গম, ভুট্টা ছাড়া যে কোনো রবি ফসল চাষ করা যায়। এতে একটি অতিরিক্ত ফসলের এবং সে সঙ্গে অর্থও পাওয়া যায়।

গাছপালা/নতুন চারার যত্ন ও সার প্রয়োগ    
গাছের চারা রোপণের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। তবে রোপণ করা চারা কোনো কারণে মরে গেলে সেখানে নতুন চারা রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে। রোপণ করা চারার যত্ন নিতে হবে এখন। যেমন- বড় হয়ে যাওয়া চারার সঙ্গে বাঁধা খুঁটি সরিয়ে দিতে হবে এবং চারার চারদিকের বেড়া প্রয়োজনে সরিয়ে বড় করে দিতে হবে। মরা বা রোগাক্রান্ত ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে। চারা গাছসহ অন্যান্য গাছে সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় এখন। গাছের গোড়ার মাটি ভালো করে কুপিয়ে সার প্রয়োগ করতে হবে। দুপুর বেলা গাছের ছায়া যতটুকু স্থানে পড়ে ঠিক ততটুকু স্থান কোপাতে হবে। পরে কোপানো স্থানে জৈব ও রাসায়নিক সার ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে । গাছের জাত ও বয়সের কারণে সারের মাত্রাও বিভিন্ন হয়।

প্রাণিসম্পদ/হাঁস-মুরগির যত্ন 
হাঁস-মুরগির কলেরা, ককসিডিয়া, রানীক্ষেত রোগের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। প্রাথমিকভাবে টিকা প্রদান, প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়ানোসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক। এ মাসে হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফুটানোর ব্যবস্থা নিতে পারেন। বাচ্চা ফুটানোর জন্য অতিরিক্ত ডিম দেবেন না। তাছাড়া ডিম ফুটানো মুরগির জন্য অতিরিক্ত বিশেষ খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

গরু-বাছুরের যত্ন   
আশ্বিন মাসে গবাদিপশুকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো দরকার। গবাদিপশুকে খোলা জায়গায় না রেখে রাতে ঘরের ভেতরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পানিতে জন্মানো পশু খাদ্য এককভাবে না খাইয়ে শুকিয়ে খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। এ সময় ভুট্টা, মাসকলাই, খেসারি বুনো ঘাস উৎপাদন করে গবাদিপশুকে খাওয়াতে পারেন। গর্ভবতী গাভীকে, সদ্য ভূূমিষ্ঠ বাছুর ও দুধালো গাভীর বিশেষ যত্ন নিতে হবে। এ সময় গবাদি প্রাণীর মড়ক দেখা দিতে পারে। তাই গবাদিপশুকে তড়কা, গলাফুলা, ওলান ফুলা রোগের জন্য প্রতিষেধক, প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চত করতে হবে।

মৎস্যসম্পদ / মাছের যত্ন   
বর্ষায় পুকুরে জন্মানো আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং পুকুরের পাড় ভালো করে বেঁধে দিতে হবে। পুকুরের মাছকে নিয়মিত পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার সরবরাহ করতে হবে। এ সময় পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রোগ সারাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে । এ সময় সরকারি ও বেসরকারি মাছের খামার থেকে জিওল মাছের পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা নিতে পারেন। 
   
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আশ্বিন মাসে দেশজুড়ে ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু হয়। আমন ধান রক্ষাসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতির মাত্রা কমানোর জন্য এ অভিযান চলে। এককভাবে বা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ইঁদুর দমন করলে কোনো লাভ হবে না। ইঁদুর দমন কাজটি করতে হবে দেশের সব মানুষকে একসঙ্গে মিলে এবং ইঁদুর দমনের সব পদ্ধতি ব্যবহার করে। ইঁদুর নিধনের ক্ষেত্রে যেসব পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় সেগুলো হলো- পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক চাষাবাদ, গর্তে ধোঁয়া দেয়া, ফাঁদ পাতা, উপকারী প্রাণী যেমন- পেঁচা, গুইসাপ, বিড়াল দ্বারা ইঁদুর দমন, বিষটোপ এবং গ্যাস বড়ি ব্যবহার  করা। আসুন সবাই একসঙ্গে অতিচালাক আমাদের এ শত্রুটিকে দমন করি। সবার জন্য নিশ্চিত সফল কৃষি উৎপাদন কামনা করে এ মাসের কৃষি এখানেই শেষ করলাম। সবাই খুব ভালো থাকবেন। কৃষির সমৃদ্ধিতে আমরা সবাই গর্বিত অংশীদার।

 
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন
* সহকারী তথ্য অফিসার (শস্য উৎপাদন), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫
বিস্তারিত

Share with :