কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

পুষ্টি নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সবজি চাষ

খাদ্য গ্রহণের দুটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। এক আমাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করা, দুই দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির সরবরাহ নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সুস্থ সবল দেহের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করা খাদ্য গ্রহণের অন্যতম লক্ষ্য। খাদ্য হিসেবে সবজির ব্যবহার আমাদের ছয়টি খাদ্য উপাদানের মধ্যে মূল্যবান দুটি উপাদান ভিটামিন ও খনিজ লবণ সরবরাহ করে থাকে। পরিমাণে কম লাগলেও দেহের নানা রকম জৈবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, দেহের বৃদ্ধি ও বিকাশ এবং বুদ্ধি বিকাশে এ দুটি উপাদান অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রঙিন শাকসবজিতে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট, তাছাড়া সবজির খাদ্য আঁশও দেহের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেহের ওজনের সাথে মিল রেখে খাদ্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সবজি গ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে নানা রকম সবজি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে। আর সেজন্য প্রয়োজন রয়েছে সারা বছর ধরে বৈচিত্র্যময় সব সবজি উৎপাদন নিশ্চিত করা। সবজি উৎপাদন পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন এক দিকে যেমন আমাদের পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে ভূমিকা রাখতে পারে অন্যদিকে তা আমাদের দারিদ্র্য দূরীকরণেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।


সবজি চাষের চালচিত্র
বড় উর্বর আমাদের মাটি। সুস্থ সবল বীজ আর একটুখানি যত্ন পেলে এদেশের প্রায় সব ধরনের মাটিতেই নানা রকম সবজি ফলানো যায়। এদেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ মোট ৮.৫ মিলিয়ন হেক্টর। সবজি আবাদের জন্য ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ২০১৪-১৫ সনের হিসেব অনুযায়ী ০.৭৯৮ মিলিয়ন হেক্টর আর এ সময় কালে সবজির উৎপাদন হয়েছে ১৪.২৩ মিলিয়ন মে.টন। আমরা সবজি চাষের ব্যবহার করছি দেশের মাত্র শতকরা ৯.৩৮ ভাগ জমি আর এতে আমাদের মাথাপিছু সবজি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে মাত্র ৭০ গ্রাম। যদিও একজন সুস্থ সবল মানুষের জন্য প্রতিদিন ২২০ গ্রাম সবজি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সবজির এ বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে হলে আমাদের সবজির চাষ বাড়াতে হবে এবং বছরব্যাপী কী কী ধরনের সবজি কখন লাগানো যায় সেটি জানতে হবে। জানতে হবে সবজি চাষের নিয়ম কানুন আর নিশ্চিত করতে হবে সবজি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রাপ্তিও।


সবজি চাষের জমি
মাথাপিছু আমাদের আবাদি জমির পরিমাণ কমতে কমতে ০.০৪ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। সহজ হিসেবে এটি মাথা পিছু মাত্র ৪০০ বর্গমিটার। এর মধ্য থেকেই আমাদের চাল, ডাল, তেল, ফলমূল, শাকসবজিসহ নানা রকম ফসল ফলাতে হয়। ফলে কোন ফসলের জন্য কতটুকু জমি আমরা ছাড়তে পারি তার একটি জটিল হিসেব রয়েছে বটে। তবে অল্প দিনে বৈচিত্র্যময় সবজি উৎপাদন করে অধিক লাভবান হওয়ার যে সুযোগ রয়েছে সেটি আমাদের বুঝতে হবে। বৈচিত্র্যময় সবজির জোগান বৃদ্ধি করতে হলে বাড়াতে হবে সবজির চাষ। এর জন্য আমাদের চারপাশে বিদ্যমান জমি বা ফাঁকা স্থানকে সবজি চাষে ব্যবহার করতে হবে। মাঠে মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষের পাশাপাশি সবজি চাষের জন্য নানা রকম স্থান বাছাই করে নিতে হবে। এগুলো হলো-


- সমভূমি চাষের জমিতে সবজি চাষ
- বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ
- বাড়ির ছাদে সবজি চাষ
- পানিতে মাচায় সবজি চাষ
- ঘরের চালে সবজি চাষ
- চর ভূমিতে সবজি চাষ
- উপকূলীয় অঞ্চলে সবজি চাষ
- ভাসমান সবজি চাষ
- হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ।

 

মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ
সাধারণভাবে আমাদের দেশে তিনটি মৌসুমে ফসল উৎপাদন করা হয়। সে হিসেবে সবজির মৌসুমকেও তিন ভাগে ভাগ করা যায়-
১. শীতকালীন সবজি চাষ
২. গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ
৩. সারা বছর আবাদযোগ্য সবজি চাষ

 

সারণি-১ : বিভিন্ন মৌসুমে চাষ উপযোগী হরেক রকম সবজির তালিকা

প্রকার    

                                        মৌসুমভিত্তিক আবাদ উপযোগী

 শীতকালীন    

গ্রীষ্মকালীন    

সারাবছর

শাক/পাতা জাতীয়  

 

 

 

পালং, ধনেপাতা, বথুয়া, লাফা, চায়না বাঁধাকপি, লেটুস,      টক পালং, মটরশুটিশাক, ছোলাশাক, খেশারি শাক, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ পাতা     

গিমাকলমি, পুঁই, কচুশাক, মিষ্টি আলুশাক, হেলেঞ্চা, চুকুর, পাটশাক, মেস্তাশাক, বিলাতি ধনে        

লালশাক, ডাঁটাশাক, থানকুনি, পুদিনা, মুলাশাক, লাউ-কুমড়াশাক    

 

ফুল ও ফল জাতীয়    

 

ফুলকপি, ব্রোকলি, বকফুল, টমেটো, ক্যাপসিকাম, শিম, ঝাড় শিম, মটরশুটি      

কচুফুল, বারোমাসি সজিনা, ঝিঙ্গা, ধুন্দল, কাঁঠাল, পটোল, কাঁকরোল  

বেগুন, লাউ-কুমড়া ফুল, বরবটি, পেঁপে, বেবিকর্ন/ভুট্টা, কাঁচকলা

মূল/কাণ্ড জাতীয়

 

 

   

গাজর, মুলা, আলু, শালগম, ওলকপি, বিট

 

 

            

গাছ আলু, পেস্তা আলু, ক্যাসাবা, কচুলতি, পানিকচু, কালোকচু, মৌলবি কচু, লাউ, মুখিকচু, মিষ্টিআলু, মাদ্রাজি ওল, শাপলা

ডাটা, মুলা

 

 

 

 

আগের দিনে কেবল মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ করা হতো। এখন নতুন নতুন সবজি জাত উদ্ভাবন ও সবজি জাত প্রবর্তনের ফলে প্রায় সারা বছরই সবজি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।


বছরব্যাপী সবজি চাষ
আমাদের সবজির প্রজাতি ও জাত বৈচিত্র্য একেবারে কম নয়। তাছাড়া প্রতি বছর সরকারি ও বেসরকারিভাবে বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন রকম সবজির জাত, সবজির ব্রিডিং লাইন এবং নানা রকম সবজি জিন সম্পদ দেশে প্রবর্তন করা হচ্ছে। ফলে সারা বছরব্যাপী সবজি চাষ করার মতো দেশি বিদেশি জাত আমাদের হাতে রয়েছে। এমনকি বছরব্যাপী কী ধরনের সবজি কোন মাসে জন্মানো যায় তার নানা প্রস্তাবনাও সবজি বিশেষজ্ঞগণ দিয়েছেন (সারণি-১)। তবে বছরব্যাপী সবজি উৎপাদন করার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্থানাভাব। কৃষক সাধারণত এক  জমিতে বছরে নানা রকম ফসল করে থাকেন। সেটি মাঠে ফসলাবর্তন করার স্বার্থেই তাঁকে করতে হয়। ফলে বাড়ির আঙিনার জমি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হলেই কেবল বছরব্যাপী সবজি উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। তাছাড়া সারা দেশে সবজি উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে বাড়ির আঙিনার পাশাপাশি বাড়ির ছাদে, উপকূলীয় অঞ্চলে, চরভূমিতে, পানিতে ভাসমান বেডে, পানিতে মাচা করে, হাইড্রোপোনিক কৌশল অবলম্বন করে সবজি চাষকে বিস্তৃত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে সারা বছর নানা রকম সবজির বীজ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। প্রয়োজন হবে সবজির জাত উদ্ভাবন ও বাছাই কার্যক্রম জোরদার করা এবং কৃষককে প্রযুক্তি বিষয়ক পরামর্শ প্রদান ও সবজি চাষে উৎসাহিত করা।


আমাদের বিভিন্ন রকম ফসল চাষের জন্য জমির প্রাপ্যতার একটি প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে খুব বেশি নতুন জমি সবজি চাষের আওতায় আনা সহজ কাজ নয়। সারা দেশের মানুষের বছরব্যাপী সবজি চাহিদা মেটাতে হলে আমাদের সবজি আবাদের যেমন খানিকটা বিস্তৃতি ঘটাতে হবে তেমনি নির্দিষ্ট জমিতে পরিকল্পনা মাফিক নিবিড় সবজি চাষ করতে হবে।


বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ
প্রতিটি চাষির বাড়িতে পরিকল্পিত সবজি বাগান তৈরি করে পুষ্টি ও আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। এখনও বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনাতে নানা রকম শাকসবজি আবাদ করা হচ্ছে বটে, তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ততটা পরিকল্পিত নয়। বিএআরআই বিজ্ঞানীগণ অঞ্চল ভিত্তিক সবজি চাষের আটটি মডেল সুপারিশ করছেন যা নিম্নরূপ- 

ক. গয়েশপুর মডেল, পাবনা (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১১, ১২)
খ. সৈয়দপুর মডেল, রংপুর (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-২, ৩ ও ২৭)
গ. আটকপালিয়া মডেল, টাঙ্গাইল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৮, ৯)
ঘ. পালিমা মডেল, টাঙ্গাইল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৮, ৯)
ঙ. নারিকেল মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৯)
চ. লেবুখালী মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১৩)
ছ. ঈশান গোপালপুর মডেল, ফরিদপুর (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১১, ১২)
জ. বরেন্দ্র মডেল, রাজশাহী  (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-৫, ৬  ও   ২৬)
ঝ. গোপালপুর মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-২০)
ঞ. খাগড়াছড়ি মডেল (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-২৯)
এসব মডেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়ে থাকলে প্রযুক্তি আকারে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে এদের বিস্তার ঘটানো উচিত। এ বিষয়ে বিএআরআই এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ একযোগে কাজ করতে পারে।


দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় সবজি চাষের বিস্তার
দিন দিন লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে সবজি চাষ বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের সবজি গ্রহণের মাত্রা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এবং পুষ্টি ঘাটতিও বাড়ছে। একদিকে সবজির চাহিদা থাকায় দাম বাড়ছে আর অন্যদিকে দূর থেকে সবজি সে এলাকায় সরবরাহ করতে হয় বলে এদের গুণগতমান রক্ষা করাও কঠিন হচ্ছে। তাছাড়া এ এলাকার অধিকাংশ জনগণকে লবণমুক্ত পানি পান করতে হয় বলে এদের খনিজ লবণের ঘাটতিও রয়েছে। কয়রাতে একদল কৃষক পাটের বস্তায়, কনক্রিটের পাত্রে বা কর্কের বাক্সে মাটি ও জৈবসার মিশিয়ে খানিকটা লবণাক্ততাসহিষ্ণু সবজি জাতের আবাদ করে সাফল্য লাভ করেছেন। এভাবে গ্রীষ্মকালে লাউ, চালকুমড়া, ঢেঁড়শ, ধুন্দল, কলমিশাক, পুঁইশাক চাষ করতে সক্ষম হয়েছেন। শীতকালে মরিচ, করলা, টমেটো, ডাটা, ওলকপি, বীট, ধনে এসব শাকসবজি আবাদ করা যায়।


বাড়ির ছাদে সবজি চাষের বিস্তৃতি ঘটানো

ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ১ কোটিরও বেশি। আর এখানকার মানুষের আয়ও সারাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করার মতো সচেতন লোকও ঢাকা শহরেই বেশি। তাছাড়া এখানে জন বসতির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি বলে শাকসবজির চাহিদাও এখানেই সবচেয়ে বেশি। এখন অবশ্য দূষণমুক্ত তাজা শাকসবজি লাভের আশায়  বেশ কিছু বাড়ির ছাদে শাকসবজি চাষ একটু একটু করে শুরু হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ছাদে বাগান করার উপযোগী পাত্র, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং ছাদে বাগান করার উপযোগী নানা রকম সবজি বীজ সরবরাহ করা গেলে বাড়ির ছাদে সবজি বাগানের বিস্তৃতি ঘটানোর সুযোগ কিন্তু রয়েছে (সারণি-৩)। এতে তাজা শাকসবজি গ্রহণ করা সম্ভব হবে, বাড়তি আয় হবে, কর্মসংস্থান হবে, অবসর সময় কাটানো যাবে এবং শহরের পরিবেশেরও উন্নতি ঘটবে।

 

শীতকালীন 

   বর্ষাকালীন

টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাল বাঁধাকপি, দেশি শিম, ওলকপি, ব্রোকলি, লেটুস, শালগম, গাজর, লাউ, মরিচ, বাংলা ধনিয়া, বিলাতি ধনিয়া, স্কোয়াশ, লালশাক, পালংশাক, মূলাশাক, পুদিনা ইত্যাদি    

শসা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, চালকুমড়া, বেগুন, বরবটি, ঢেঁড়শ, পুঁইশাক, লালশাক, ডাঁটা, পাটশাক, গিমা কলমি, করলা ইত্যাদি।

 

 

ভাসমান বেডে সবজি চাষের বিস্তৃতি
বাংলাদেশে ভাসমান বেডে শাকসবজি চাষের ঐতিহ্য কয়েকশ বছরের পুরনো। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বৃহত্তর বরিশাল-ফরিদপুর জেলার মানুষ স্থায়ী জলাভূমি বা বিস্তীর্ণ বিল অঞ্চলে ভাসমান বেডে সবজি চাষ কৌশল অবলম্বন করে আসছেন দীর্ঘ সময় ধরে। সে কারণেই এই কৌশলটি এখন বেশ লাভজনক ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ চাষ পদ্ধতির বিস্তৃতি ঘটানোর সুযোগ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জলাশয়ে রয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রসারণ কর্মকা- জোরদার করে সবজি চাষ খানিকটা বাড়ানো যায়।


চরভূমিতে সবজি চাষ
বাংলাদেশে চরভূমির পরিমাণ প্রায় ০.৮২ মিলিয়ন হেক্টর। বিশাল এ চরভূমিতে সবজি চাষের  বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কোন কোন এনজিও-এর সহায়তায় চরভূমিতে কোন কোন স্থানে এখন মিষ্টিকুমড়া, স্কোয়াশ, গাজর, মূলা, ওলকপি ইত্যাদি সবজি চাষ করা শুরু হয়েছে। এসব স্থানে নানা রকম পাতা জাতীয় সবজিরও আবাদ শুরু হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রণোদনা এবং সম্প্রসারণ কর্ম চালিয়ে গেলে চরভূমিতে একই জমিতে একাধিক সবজি চাষ করাও সম্ভব। সে ক্ষেত্রে একটি দ্রুতবর্ধনশীল পাতা সবজির সাথে একটি মধ্যমেয়াদি সবজির আবর্তনের প্রয়োজন হবে। চরভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে একানকার ফসলাবর্তন নিয়েও আমাদের গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে।


পানিতে মাচায় সবজি
বাংলাদেশে অনেক এলাকায় পুকুর, নদীনালা, বিল বা খালের পাড়ে মাচা তৈরি করে সবজির চারা রোপণ করে পানিতে মাচার ওপর লতানো সবজি গাছ তুলে দিয়েও সবজির চাষ করা হচ্ছে। এ ধরনের মাচায় লাউ, কুমড়া, চিচিঙ্গা, শিম, বরবটি ইত্যাদি লতানো সবজি জন্মানো যায়। এদেশে এরকম পানিতে মাচায় সবজি চাষের সুযোগ অনেক রয়েছে।


হাইড্রোপোনিক পদ্ধতি অবলম্বন
বাংলাদেশে হাউড্রোপোনিক পদ্ধতি নতুন হলেও পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। আমাদের দেশেও বিএআরআইতে এ কৌশল নিয়ে নানামুখী গবেষণা হচ্ছে। মাটিবিহীন বড় স্টিলের বা প্লাস্টিকের ট্রেতে পানির মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে কোনো কোনো সবজি (সারণি-৪) চাষ করা যায়। এ পদ্ধতি অবলম্বন করে বাড়ির ছাদে, আঙিনায়, বারান্দায় কিংবা চাষের অযোগ্য পতিত জমিতে সবজি চাষ করা সম্ভব।

সারণি-৪ : হাইড্রোপোনিক পদ্ধতিতে উৎপাদনযোগ্য সবজি

ফসলের ধরন                   ফসলের নাম
পাতা জাতীয় সবজি         লেটুস, গীমাকলমি, বিলাতি ধনিয়া, বাঁধাকপি
ফল জাতীয় সবজি           টমেটো, বেগুন, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, শসা, খিরা, স্কোয়াস প্রভৃতি

 

নিরাপদ সবজি উৎপাদন
কোনো খাদ্যই খাদ্য বলে বিবেচিত হয় না যদি তা নিরাপদ না হয়। সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সবজি চাষে রাসায়নিক সারসহ সবজিকে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নান রকম বালাইনাশকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তদুপরি এখন যুক্ত হয়েছে সবজি চাষে নানা রকম হরমোন প্রয়োগের কর্মকা-। সঠিক মাত্রা না মেনে এবং সঠিক বালাইনাশক না ব্যবহার করার কারণে সবজি যে অধিক মাত্রায় বিষাক্ত হয়ে পড়ছে সাম্প্রতিক দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদন সে সাক্ষ্যই বহন করে। তাছাড়া এসব বিষাক্ত সবজি একদিকে যেমন পুষ্টির বদলে নানা রকম রোগের সৃষ্টি করছে অন্যদিকে এসব সবজি বিদেশে রপ্তানি করার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাই আইপিএম বা জৈব কৃষিকে উৎসাহিত করে এবং প্রয়োজনে সঠিক মাত্রায় সঠিক বালাইনাশক সঠিক সময়ে প্রয়োগ করার বিষয়ে জোর দিতে হবে।

 

সবজি বিপণন
বাংলাদেশে সবজি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা খুব একটা আধুনিক নয় এবং এটি খুব কার্যকরও নয়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সবজি উৎপাদনকারী তিন চার মাসের জন্য ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে ৩০-৪০ টাকা মুনাফা করতে পারে। অথচ আড়তদার ও বেপারীগণ অতি অল্প সময়ে ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে ১৪-১৭ টাকা মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়। সবজি দ্রুতপচনশীল বলে বাজার মূল্য খারাপ হলেও তা কৃষক বিক্রয় করতে বাধ্য হন। সারা বছর সবজির আবাদ উৎসাহিত করতে হলে সবজি চাষের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার বিষয়টিকেও আমলে নিতে হবে। তাছাড়া উৎপাদিত সবজির বাজার মূল্য খারাপ হলে তা এক দুই দিনের জন্য সংরক্ষণ করার ব্যবস্থাও আমাদের নেই। সবজির উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সবজি বিপণনের বিষয়টিকে সবজি চাষিদের অনুকূলে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করাও একান্ত  আবশ্যক।

 

সবজি বীজের চাহিদা ও মূল্য
বাংলাদেশে সবজি বীজের চাহিদা ৪৫০০ টন যার সিংহ ভাগই প্রাইভেট বীজ কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে। এসব বীজের মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড জাতের বীজ, ইনব্রেড ও মুক্ত পরাগী জাতের বীজ। বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় হাইব্রিড সবজির অধিকাংশ বীজই। প্লান্ট কোয়ারেন্টাইন উইংয়ের হিসেব মতে,  জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত আমাদের সবজি বীজ আমদানি করা হয় ৫১৮ টন। তবে বাস্তবে বাংলাদেশে এর চেয়ে বেশি পরিমাণ সবজি বীজ প্রতি বছর বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিএডিসি এবং বিএআরআই সবজি গবেষণা কেন্দ্র থেকেও কিছু পরিমাণ ওপি বীজ সরবরাহ করা হয়।

 

বাংলাদেশে সবজি গবেষণা ও নতুন জাত উদ্ভাব
বাংলাদেশে সবজি গবেষণা শুরু হয় ১৯৮০ সনে বিএআরআই এবং এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ ডেভেলপম্যান্ট সেন্টারের (যা এখন ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টার) পারস্পরিক সহযোগিতায়। AVRDC বিএআরআইসহ এদেশে বেশ কটি সরকারি ও প্রাইভেট বীজ কোম্পানিকে ৫৯টি ফসলের ৩৪৫৪টি বিভিন্ন প্রকার জাত সরবরাহ করেছে। এসব জাত যাচাই বাছাই করে এদেশে বেশ কিছু সবজি জাত অবমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।


বাংলাদেশে ৮০ রকমের সবজি রয়েছে। এদের মধ্যে প্রধান প্রধান সবজির সংখ্যা ২০-২৫টি, অপ্রধান  সবজির সংখ্যা ৩০-৩৫টি আর বাকিগুলো স্বল্প পরিচিত সবজি। আর ২০১৫ পর্যন্ত এদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অবমুক্ত সবজি জাতের সংখ্যা ১১৮টি। এর মধ্যে বিএআরআই অবমুক্ত করেছে ১০০টি জাত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অবমুক্ত করেছে ৮টি সবজি জাত আর বিআইএনএ করেছে ১০টি টমেটোর জাত। বাংলাদেশে বিদ্যমান সবজি জাত উদ্ভাবনের কর্মকাণ্ড নিম্নরূপ-
১. দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সবজি জাত সংগ্রহ করে মূল্যায়ন করতে তা নতুন জাত হিসেবে অবমুক্তকরণ।
২. বিদেশ থেকে ব্রিডিং লাইন প্রবর্তন করে তা থেকে যাচাই বাছাই করত জাত অবমুক্তকরণ।
৩.  সবজি জার্মপ্লাজমকে কাজে লাগিয়ে সংকরায় করা এবং তা থেকে উত্তম জাত বাছাই করা।
৪. সবজিতে মিউটেশন ঘটিয়ে সবজি জাত  উন্নয়ন।
৫.  ট্রান্সজেনিক সবজি জাত অবমুক্তকরণ।

 

দেশে বিদ্যমান সবজির জাত সংগ্রহ ও তা সংরক্ষণ করার কাজ খুব সন্তোষজনক নয়। তাছাড়া ঐজঈ তে সংগৃহীত জার্মপ্লাজম চএজঈ তে সংরক্ষিত নয় বলে এসব মূল্যবান সম্পদ হারানোর ভয়ও প্রচুর। বলাবাহুল্য শেষোক্ত তিনটি কৌশল এদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে খুব ভালোভাবে এখনও শুরুই হয়নি। দেশে সবজি গবেষণায় প্রাইভেট বীজ কোম্পানিগুলো ভালোই এগোচ্ছে। বীজ কোম্পানিতে দক্ষ প্রজননবিদ থাকায় এ কাজে তারা সফল হচ্ছে।
দেশে সবজি গবেষণার বিস্তার ঘটানোর কোন বিকল্প নেই। এর জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।

 

সবজি চাষের মাধ্যমে পুষ্টি নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                        

দানা শস্যে আমরা এখন স্বনির্ভর হতে পেরেছি। এখন খাদ্যের গুণগতমান বৃদ্ধি তথা পুষ্টিমান সমৃদ্ধ খাদ্যের প্রতি আমাদের মনযোগ দিতে হবে। এবারকার প্রথম সবজি মেলা পুষ্টির বিষয়ে সরকারের অধিক গুরুত্ব আরোপের একটি প্রমাণ। অল্প পয়সায় অল্প শ্রমে অল্প সময়ে একদিকে যেমন সবজি ফলানো যায় তেমনি অন্যদিকে আমাদের পুষ্টির ঘাটতি নিরসনে সবজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভাবলে অবাক হতে হয় মাত্র ১০০ গ্রাম ফুলকপি পাতা, কালো কচুশাক, ডাঁটা, কচি শিম গ্রহণ করে যথাক্রমে  ৬২৬, ৪৬০, ২৬০ ও ২১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া সম্ভব। কচু, ডাঁটাশাক, কাঁচাকলায় যথেষ্ট পরিমাণ আয়রন রয়েছে। সব ধরনের শাকজাতীয় সবজিতে প্রচুর ক্যারোটিন রয়েছে। অন্যান্য ভিটামিন সবজিতে মন্দ নয়। ফলে অল্প পয়সায় প্রতিদিন বৈচিত্র্যময় সবজি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।


পুষ্টির বিবেচনায় এদেশের কৃষক সবজি চাষ করেন বিষয়টি এখনও সে পর্যায়ে যায়নি। তবে সারা বছর সবজি চাষ করতে হলে আমাদের বছরব্যাপী সবজি চাষের পরিকল্পনায় বৈচিত্র্যময় সবজির সমাবেশ ঘটাতেই হবে। অর্থাৎ সবজি চাষের জন্য নানা রকম সবজি প্রজাতি ও সবজির জাত ব্যবহার করতেই হবে। এর ফলে কৃষকের হাতে নানা রকম সবজি থাকবে বলে তাঁদের খাদ্যে নানা রকম সবজি গ্রহণের সুযোগ নিঃসন্দেহে বাড়বে। তদুপরি এর মাধ্যমে বাজারে বৈচিত্র্যময় সবজির সরবরাহও বৃদ্ধি পাবে বলে ভোক্তাগণও বৈচিত্র্যময় সবজি সারা বছর ধরে পাবে এবং এতে সবজি জাত পুষ্টি গ্রহণের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে এবং আমরা ক্রমশ প্রতিদিন সবজি গ্রহণের অনুমোদিত মাত্রার দিকে ধাবিত হতে থাকব।


বছরব্যাপী সবজি চাষ যে চাষিদের দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কৃষক সাশ্রয়ী মূল্যে সবজি বীজ ও সবজি চাষের জন্য আনুষঙ্গিক পরামর্শ ও উপকরণ পেলে আর বছরব্যাপী সবজি চাষে চাষিকে উৎসাহিত করা গেলে এটি একদিকে যেমন তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে তেমনি তাদের হাতে বাড়তি আয়ের সুযোগও এনে দেবে। মোট কথা বছরব্যাপী হরেক রকম সবজি চাষ করে কৃষক ও ভোক্তাগণ পুষ্টি গ্রহণের সুযোগ লাভ করতে পারবেন এবং এর মাধ্যমে দরিদ্র চাষিদের দরিদ্রতারও খানিক লাঘব হবে।


[এ নিবন্ধটি জাতীয় সবজি মেলা ২০১৬ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে লেখক কর্তৃক উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত রূপ।]

 

ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া*

* প্রফেসর, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ ও প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭

 

বিস্তারিত
বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে জৈবিক বালাইব্যবস্থাপনা

বেগুন আমাদের দেশে অতি জনপ্রিয় এবং নিত্যআবশ্যকীয় সবজি, যা সারাবছর উৎপাদিত হয়। বেগুনের শতাধিক জাত আছে পুরো বাংলাদেশে এলাকাভেদে আবাদ হয়। বেগুনের সবচেয়ে ক্ষতিকারক বালাইয়ের মধ্যে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা অন্যতম। ক্ষতিকর পোকা ব্যবস্থাপনার জন্য অতীতে শুধু রাসায়নিক ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তাই বালাইনাশকের উপর্যুপরি ব্যবহারের ফলে অনেক অপ্রধান ক্ষতিকর পোকা প্রধান ক্ষতিকর পোকায় পরিণত হচ্ছে এবং প্রধান ক্ষতিকর পোকার দেহে কীটনাশকের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদন খরচ বাড়ছে, মাটির উর্বরতা ও ফলন কমছে। জৈবিক দমনের মাধ্যমে শুধু নির্বাচিত ক্ষতিকর পোকা ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয় এবং কোনো পোকার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতাও উৎপন্ন করে না। জৈবিক বালাইব্যবস্থাপনা পদ্ধতি একটি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পদ্ধতি। ইতোমধ্যে আমাদের বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ফসলের কার্যকর জৈবিক দমনব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করেছেন এবং কাজে লাগিয়ে সফলতাও পেয়েছেন। ফসলের মারাত্মক সমস্যার মধ্যে বেগুনের ডগা ও ফলছিদ্রকারী পোকা একটি। এটি দমনে জৈবিক বালাইব্যবস্থাপনার কথা থাকছে আজকের বিশ্লেষণ জুড়ে।


ক. সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বা গন্ধফাঁদের ব্যবহার
সেক্স ফেরোমন হচ্ছে এক ধরনের প্রাকৃতিক রাসায়নিক পদার্থ, যা কোনো প্রজাতির স্ত্রী পোকা কর্তৃক একই প্রজাতির পুরুষ পোকাকে প্রজনন কাজে আকৃষ্ট করার জন্য প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হয়। সাধারণত ২ থেকে ৪ ধরনের রাসায়নিক উপাদানসমূহের সংমিশ্রণে সেক্স ফেরোমন গঠিত। সেক্স ফেরোমন ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এটি প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত, যা মানুষ বা পরিবেশের কোনোরূপ ক্ষতি করে না। সুতরাং পরিবেশবান্ধব। অন্যান্য মথ জাতীয় পোকার মতো বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার সেক্স ফেরোমন দুটি যৌগিক পদার্থ যেমন- ই-১১-হেক্সডেসিনাইল এসিটেট এবং ই-১১-হেক্সডিসেন-১ ওএল সমন্বয়ে গঠিত। এ যৌগ দুটির ১০০ঃ১ অনুপাতে মিশ্রণ সর্বাধিক সংখ্যক পুরুষ মথ আকৃষ্ট করতে সক্ষম। ক্ষতিকারক পোকা ব্যবস্থাপনার জন্য সাধারণত ৩টি উপাদানের প্রয়োজন হয় যেমন- সেক্স ফেরোমন টোপ, একটি ফাঁদ এবং ফাঁদটি মাঠে স্থাপনের জন্য ১-২ খুঁটি। সাধারণত ৩টি উদ্দেশ্যে এ ফাঁদ ব্যবহার হয় যথা-


০১. পোকার উপস্থিতি মনিটরিং বা পর্যবেক্ষণ করা;
০২. অধিক হারে পোকা আটকানো এবং;
০৩. পোকার প্রজনন কাজে বাধার সৃষ্টি করা।

 

ফেরোমন ফাঁদ বা পানি ফাঁদ বা জাদুর ফাঁদ তৈরির পদ্ধতি
প্রথমত. প্রায় ৩ লিটার পানি ধারণক্ষমতাযুক্ত ২২ সেন্টিমিটার লম্বা গোলাকার বা চার কোণ বিশিষ্ট প্লাস্টিকের পাত্র বা বৈয়ামের উভয় পাশে পাত্রের নিচ বা তলা হতে ৪-৫ সেন্টিমিটার উঁচুতে ত্রিভূজাকারে কেটে ফেলতে হবে। ত্রিভূজের নিচের বাহু সাধারণত ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার এবং উচ্চতা ১১-১২ সেন্টিমিটার হওয়া ভালো। দ্বিতীয়ত. সাবান মিশ্রিত পানি সব সময় পাত্রের তলা থেকে ওপরের দিকে কমপক্ষে ৩-৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত রাখা দরকার। পাত্রের ঢাকনার মাঝে কালো রঙের একটি ল্যুপ বসানো থাকে। ল্যুপের নিচের ছিদ্রে সরু তার বাধা হয়। তারের অপর মাথায় ফেরোমন সংবলিত টিউব বা লিউর এমনভাবে বাধতে হবে যেন লিউরটি সাবান মিশ্রিত পানি থেকে ২-৩ সেন্টিমিটার ওপরে থাকে। সতর্ক থাকতে হবে যেন পাত্রের তলায় রাখা সাবান পানি শুকিয়ে না যায় এবং লিউরটি কোনোভাবেই সাবান পানিতে ভিজে না যায়। যতেœর সাথে ব্যবহার করলে একটি পাত্র ২-৩ মৌসুম পর্যন্ত চলতে পারে। কাটা ফাঁকা অংশ উত্তরে-দক্ষিণে স্থাপন করতে হবে যেন বাতাস চলাচলে সুবিধা হয়। গাছ থেকে ফাঁদ ৬ ইঞ্চি ওপরে লাগাতে হবে। গাছ বাড়ার সাথে সাথে এ ৬ ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সাবান পানি ২-৩ দিন পরপর বদলাতে হবে। প্রতি ৩ মাস পরপর লিউর বদলাতে হবে। আর এ কাজটি চারা লাগানোর দেড় মাসের মধ্যে জমিতে স্থাপন করতে হবে। অনেকে অবশ্য পোকা আক্রমণ করার পর জমিতে স্থাপন করেন, যা ঠিক না।


জমিতে ফাঁদ স্থাপনের সময় ও কৌশল
বেগুন ফসলের জমিতে সাধারণত চারা রোপণের ৪-৫ সপ্তাহ পর  থেকেই বেগুনের কচি ডগায় ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ শুরু হয়। তাই ফসলের এ পর্যায় হতেই ফাঁদ স্থাপন করা আবশ্যক। সাধারণত অন্য বেগুনের জমি বা আশপাশের পুরনো শুকনা বেগুন গাছের স্তূপ থেকে পোকার মথ জমিতে আসে এবং পরে ডগা ও ফলে বংশবৃদ্ধি করে। সে কারণে পোকা সফলভাবে দমন করার জন্য শেষবার ফসল সংগ্রহ করা পর্যন্ত ফেরোমন ফাঁদ জমিতে রাখতে হবে। প্রতি ৩ শতকের জন্য একটি ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করতে হবে।


ফাঁদ ও টোপ পরিবর্তনের সময়
পানি ফাঁদ সহজে নষ্ট হয় না। সাবধানতা ও যত্নের সাথে ব্যবহার করলে এ ধরনের একটি ফাঁদ ২-৩ মৌসুম পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। অতিরিক্ত বৃষ্টি, রোদ বা বাতাসে ফাঁদ নষ্ট হতে পারে। সেক্ষেত্রে দেরি না করে জমিতে নতুন ফাঁদ স্থাপন করতে হবে। বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার জন্য ব্যবহৃত অধিকাংশ ফেরোমন টিউব/টোপ/ লিউর এ সাধারণত ৩ মিলিগ্রাম পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এসব টোপ দেড় থেকে ২-৩ মাস কার্যক্ষম থাকে, সেজন্য ২ থেকে ৩ মাস পর টোপ পরিবর্তন করা দরকার। একটি বেগুন মৌসুমে প্রায় ২টি টোপ প্রয়োজন হয়।


ফাঁদ জমিতে স্থাপনের পর করণীয়
প্রতিদিন ফাঁদ পর্যবেক্ষণ করতে হবে;
প্রতিদিন ফাঁদের পানি পরীক্ষা করে মরে থাকা পোকা ফাঁদের পানি থেকে আঙুল/কাঠি দিয়ে সরিয়ে ফেলতে হবে;
২-৩ দিন পর পর সাবানের পানি পাল্টে দিতে হবে;
সাবান পানির স্তর সব সময় ৩-৪ সেন্টিমিটার যাতে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে;
ফাটা বা ছিদ্রযুক্ত ফাঁদ পাল্টিয়ে নুতন ফাঁদ প্রতিস্থাপন করতে হবে;
গাছের বাড়বাড়তির সাথে তাল রেখে ফাঁদটিকেও ক্রমান্বয়ে ওপরের দিকে তুলতে হবে;
নির্দিষ্ট সময়ান্তে লিউর বা টোপ পরিবর্তন করতে হবে;
লিউর স্থাপনের সময় লিউরটির মুখ কোনোভাবেই খোলা যাবে না।

 

খ. বায়ো এজেন্টসমূহের জীবন স্তর ও অবমুক্তায়ন পদ্ধতি
০১.  ট্রাইকোগ্রামা বোলতা

ট্রাইকোগ্রামা বোলতা ট্রাইকোগ্রামটিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্র ঝালরওয়ালা পাখাবিশিষ্ট ছোট এ বোলতা লেপিডপটেরা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত (প্রজাপতি ও মথ) শত্রু পোকার ডিম পরজীবায়ন করে। এ পোকার কোনো কোনো প্রজাতি ওয়াটার বিটল, ওয়াটার বাগ এবং অন্যান্য পোকার ডিমের পরজীবী। এ প্রজাতির পোকা প্রয়োজনে এদের পাখা দিয়ে সাঁতার কেটে হোস্ট পোকার ডিম খুঁজে বের করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির এ পোকা বিভিন্ন হোস্ট প্রজাতির ওপর বংশ বৃদ্ধি করে এবং হরমোন ও অন্যান্য পদার্থের ওপর নির্ভর করে এদের শরীরের রঙ পরিবর্তন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি বা পরিবর্তন হতে দেখা যায়। হোস্ট পোকার ডিমে এরা ডিম পাড়ে এবং ডিমের মধ্যে বাড়তে থাকে, ফলে শত্রু পোকার ডিম থেকে আর কীড়া জন্মাতে পারে না। হোস্ট পোকার ডিমে ৭ থেকে ১০ দিন থাকার পর বোলতারা বের হয়ে আসে। এরা খুবই ছোট পোকা, সচরাচর থেকে ১ মিলিমিটার লম্বা হয়। বর্তমানে ভায়ালে এ পরজীবী পোকা পাওয়া যায়। ১ গ্রাম হোস্ট পোকার ডিমের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার পরজীবী ট্রাইকোগ্রামা থাকে, যা ১ হেক্টর জমিতে ব্যবহার করা যায়। বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার ডিমে কোনো আবরণ থাকে না, ফলে ট্রাইকোগ্রামা বোলতা সহজেই পরজীবায়ন ঘটাতে পারে। আক্রমণের শুরু থেকে শেষ ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর এ বোলতা অবমুক্ত করতে হবে।


ট্রাইকোগ্রামা অবমুক্তকরণের পদ্ধতি
ট্রাইকোগ্রামা অবমুক্তকরণের জন্য যেসব বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবেÑ
নিয়মিত জরিপের মাধ্যমে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আবির্ভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে;
পাতায়/ডগায়/ফুল/কুড়ি/ফলের বৃতিতে ডিম দেখামাত্র পরজীবী ট্রাইকোগ্রামা অবমুক্ত শুরু করতে হবে;
বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণের পুরো মৌসুম ধরে নিয়ম অনুযায়ী পরজীবী বোলতাটি অবমুক্তকরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে;
সাধারণত সকাল ৮টা থেকে ১০টা বা পড়ন্ত বিকাল ৪.৩০টা থেকে ৬টা পর্যন্ত পরজীবী বোলতা অবমুক্ত করা উত্তম। পরজীবায়নকৃত ডিম অথবা সদ্যজাত ট্রাইকোগ্রামা বোলতা ভায়াল এ করে মাঠে পরিবহন করা হয়;
পুরাতন খবরের কাগজ অথবা অন্য কাগজ সাধারণত ৬-৭ সেন্টিমিটার বর্গাকারে কাটা হয়। এরপর তা মাঝখানে ১টি ভাঁজ দিয়ে বৈয়মে রাখা হয় ঠিক যেভাবে চকোলেটের কাগজ যেভাবে ভাঁজ দেয়া থাকে সেভাবে। ২২ সেন্টিমিটার লম্বা একটি বৈয়মে সাধারণত ১২০ থেকে ১৩০ টি কাগজের টুকরা ধরে;
২২ সেন্টিমিটার উচ্চতা বিশিষ্ট বা ৩ লিটার পানি ধরে এমন বৈয়মে ১২০ থেকে ১৩০টি ভাঁজ করা কাগজের টুকরা রাখার পর সেখানে ১ গ্রাম ট্রাইকোগ্রামা ছাড়া হয়। কাগজের ভাঁজে পূর্ণবয়স্ক ট্রাইকোগ্রামা ঢুকে গেলে তা বেগুনের ২ ডালের মাঝে অথবা অন্য ভাঁজে স্থাপন করতে হয়;
শুরুতে আইলের থেকে ২ লাইন বাদ দিয়ে মাঠের এক কোণ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। অতঃপর ৫-৬ ধাপ যাওয়ার পর একটি ভাজ করা কাগজের টুকরা বেগুন গাছের ডালের ভাজে স্থাপন করতে হবে। লাইন শেষ হওয়ার আগেই বাঁক নিয়ে ২ লাইন বাদ দিয়ে আবার লাইন বরাবর হাঁটতে হবে;
এভাবে ক্রমে একই নিয়মে পুরো জমিতে ট্রাইকোগ্রামা অবমুক্ত করতে হবে। স্ট্রিপ বা কার্ডে ট্রাইকোগ্রামা রাখা থাকলে সেক্ষেত্রে অবমুক্ত শেষ হলে প্রতিটি স্ট্রিপকার্ড বেগুন গাছের পাতা বা ডালের খাঁজে গেঁথে বা জাংলায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে যা থেকে পরে আরও ট্রাইকোগ্রামা বের হয়ে পরজীবায়ন ঘটাতে পারে।

 

০২. ব্রাকন
ব্রাকন জাতীয় পরজীবী পোকা ব্রাকোনিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। মাঝারি আকারের এ বোলতা অনেক পোকার কীড়া পরজীবায়ন করতে পারে। এদের স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই পাখাওয়ালা বা পাখাবিহীন হতে পারে। এদের এ্যাবডোমেন লোমবিহীন বা অল্প লোমবিশিষ্ট হয়। ক্ষতিকর পোকার একটি কীড়া ক্যাটারপিলারের মধ্যে অনেক সংখ্যক এ পোকার কীড়া থাকতে পারে। এ কীড়ার শরীরের সাদা, হলুদ রঙের রেশমি কোকনের মধ্যে পুত্তলি জন্মায়। কোনো কোনো প্রজাতির শত্রু পোকার কীড়ার মধ্যে ও পুত্তলি অবস্থায় থাকে ব্রাকনের কীড়া খুবই আক্রমণ প্রবণ একটি বহিঃপরজীবী। স্ত্রী ব্রাকন প্রথমে ভেনম বা বিষ হোস্ট পোকার কীড়ার শরীরে ঢুকিয়ে দেয়, ফলে কীড়া অবস হয়ে যায়। একটি স্ত্রী বাকন ৫০০ থেকে ১ হাজার হোস্ট পোকার কীড়া পরজীবায়ন করতে পারে। পরজীবায়নকৃত কীড়া দুর্বল হয়ে যায় এবং আর বাঁচতে পারে না। পরজীবায়নকৃত কীড়ার ওপরে স্ত্রী ব্রাকন ডিম দেয় এবং পরে কীড়ার শরীরের ভেতরে খেয়ে বাড়তে থাকে। ফলশ্রুতিতে শত্রুপোকা ধ্বংস হয়।
এ প্রজাতির পূর্ণ বয়স্ক পোকা কাচের/প্লাস্টিকের পাত্রে/বৈয়মে রাখা এবং এর মাধ্যমে মাঠে সরবরাহ করা হয়। এ বৈয়মকে বাংকার বলে। একটি বাংকারে ৮০০ থেকে ১ হাজার জীবন্ত পূর্ণ বয়স্ক ব্রাকন রাখা যায়। বাংকারে অথবা মাঠে ৬০:৪০ অনুপাতে স্ত্রী ও পুরুষ পোকা অবমুক্তকরণ করা আবশ্যক। একটি শস্য মৌসুমে ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর ৫-৬ বার পূর্ণ বয়স্ক ব্রাকন অবমুক্ত করতে হবে।


মাঠে ব্রাকন অবমুক্তকরণ পদ্ধতি
বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার কীড়ার আক্রমণের শুরু থেকে শেষ ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর পূর্ণ বয়স্ক এ পোকা অবমুক্ত করতে হবে। পূর্ণবয়স্ক ব্রাকন অবমুক্তকরণের সময় যেসব বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।
ক. নিয়মিত জরিপের মাধ্যমে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী কিংবা জাতীয় ফসলের মাছি পোকার আবির্ভাব নিশ্চিত হতে হবে;
খ. ডগায় বা ফলে হোস্ট পোকার কীড়া দেখামাত্র পরজীবী ব্রাকন অবমুক্ত করতে হবে এবং আক্রমণের পুরো মৌসুম ধরে নিয়ম অনুযায়ী পরজীবী ব্রাকন অবমুক্তকরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে;
গ. সাধারণত সকাল ৮টা থেকে ১০টা অথবা পড়ন্ত বিকালে ৪.৩০টা থেকে ৬টা পর্যন্ত পরজীবী এ বোলতা অবমুক্ত করা উত্তম। পরজীবায়নকৃত ডিম অথবা সদ্যজাত ব্রাকন বৈয়ম বা ব্যাংকারে করে মাঠে পরিবহন করা হয়;
ঘ. সাধারণত ২২ সেন্টিমিটার একটি বৈয়ম বা বাংকারে ৮০০ থেকে ১ হাজার পূর্ণ বয়স্ক ব্রাকন থাকে। এ পোকা অবমুক্তকরণের শুরুতেই আইলের পাশ থেকে ২ লাইন বাদ দিয়ে মাঠের এক কোনো দিয়ে ভেতরে গিয়ে ৫-৬ ধাপ যাওয়ার পর বাংকারের মুখের ঢাকনা একটু খুলে কয়েকটি ব্রাকন বের করে দিতে হবে। এভাবে এক লাইনে ছাড়া শেষ হলে ২ লাইন বা ৬-৭ ধাপ বাদ দিয়ে পরের লাইনে আবার সোজা হাঁটতে হবে এবং ৫-৬ ধাপ পর পর পোকা ছাড়তে হবে;
ঙ. এভাবে একই নিয়মে পুরো জমিতে ব্রাকন অবমুক্ত শেষ হলে বাংকার আওতামুক্ত করে রেখে দিতে হবে। পরের দিন বয়স্ক ব্রাকন ডিম থেকে বের হলে তা আবার অবমুক্ত করতে হবে এবং ব্রাকন বের শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে;
চ. সবশেষে স্ট্রিপ/কার্ড বেগুন গাছের ডালে বা জাংলায় বেঁধে রাখতে হবে যাতে পরে আরও ব্রাকন বের হয়ে পরজীবায়ন ঘটাতে পারে।

 

ট্রাইকোগ্রামা ও ব্রাকনকে কৃত্রিমভাবে খাওয়ানোর পদ্ধতি
প্রখর রোদ বা অতিবৃষ্টির কারণে ট্রাইকোগ্রামা ও ব্রাকন মাঠে অবমুক্তকরণ সম্ভব না হলে এদের জন্য মধু বা চিনির শরবত সরবরাহ করতে হবে। ছোট পরিষ্কার এক টুকরো তুলাতে মধু বা মিষ্টির সিরা বা শরবত ভিজিয়ে ভায়ালের বা বাংকারের মুখের কাপড়ের ওপর রাখতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে যেন মধু বা শরবত কাপড় চুইয়ে বা ফোঁটা আকারে ভায়ালের বা বাংকারের ভেতরে প্রবেশ না করে এবং কোনোভাবেই পিঁপড়ার আক্রমণ না ঘটে। তুলার টুকরা শুকিয়ে গেলে সেটি আবার মধু বা শরবত দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। প্রখর রোদ বা বৃষ্টির সময় ট্রাইকোগ্রামা ও ব্রাকন বোলতা অবমুক্ত করা উচিত হবে না। কোনো কারণে অবমুক্ত করতে না পারলে এদের এমনভাবে রাখতে হবে যেন পিঁপড়া ধরতে না পারে। এজন্য টেবিলের অথবা চৌকির পায়ার নিচে পানির পাত্র দিয়ে তার ওপর রাখা যেতে পারে। আলো বাতাস চলাচল করতে পারে এমন স্থানে ভায়াল সংরক্ষণ করতে হবে।


জৈব বালাইনাশক প্রয়োগ
সবজির জাবপোকা, পাতাকাটা, পাতাভোজী, পাতা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের জন্য বাইকাও জাতীয় জৈব বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে। এগুলো পরিবেশবান্ধব বালাইনাশক। নিম, থুজা, নয়নতারাসহ বিভিন্ন লতাপাতার নির্যাস থেকে  বাইকাওয়ের মূল উপাদান নেয়া হয়। এতে রয়েছে ০.৩৬% মেট্রিন একুয়া দ্রবণ ও প্রাকৃতিক অনুখাদ্য, যার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। ব্যবহারের ২৪ ঘণ্টা পরেই ফসল খাওয়া যায়। পোকার স্নায়ুতন্ত্রকে প্রথমে বিকল করে দেয়। স্পর্শ বালাইনাশক হিসেবে কাজ করলেও পরে পোকার স্নায়ুতন্ত্রকে অকেজো করে দেয়, ফলে পোকা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। প্রতি ১ মিলিলিটার বাইকাও ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে অথবা প্রতি হেক্টর জমিতে ১ লিটার বাইকাও ১ হাজার লিটার পানিতে ভালোভাবে মিশিয়ে পাতায় এবং কা-ে স্প্রে করতে হবে। অথবা প্রতি শতাংশ জমিতে ৪ মিলিলিটার ৪ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।


 বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী আরও অনেক পদ্ধতি কৌশল আছে। বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি এখানে বিশ্লেষণ দেয়া হলো। স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞ বা কৃষি অফিসারদের সাথে এ কৌশলগুলো কাজে লাগাতে পারলে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে কার্যকর উপকার পাওয়া যায়।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*

* উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

 

বিস্তারিত
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য

আমাদের দেহটাকে একটি ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। ইঞ্জিন জ্বালানি পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করে। সেই শক্তি দিয়েই চলে। আমাদের দেহের সব ধরনের কাজের জন্যই শক্তি দরকার হয়, আর এ শক্তি আসে আমাদের খাওয়া খাদ্য থেকে। আমাদের দেহের সব অঙ্গ-প্রতঙ্গ  যেসব উপাদান দ্বারা গঠিত, ওই উপাদানগুলো প্রতিনিয়িত কিছু না কিছু পরিবর্তিত হয়। একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে- হাড়ে যে ক্যালসিয়াম আছে তা থেকে প্রতিদিন ৭০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম বের হয়ে আসে এবং খাবার থেকে ঐ ক্যালসিয়াম হাড়ে যায়। এভাবে অন্যান্য অনেক উপাদান দেহ থেকে বেরিয়ে যায় এবং খাবার থেকে ওইসব উপাদান এসে সে স্থান দখল করে। তাহলে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে, খাবারের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যাবতীয় কাজকর্মের জন্যই খাদ্য প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের শরীরের জন্য যে খাবার দরকার তা আমরা খাচ্ছি কি-না? না কি রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো বিষ খাচ্ছি?


পৃথিবীতে বহুরোগ সৃষ্টির জন্য খাদ্য উপাদান দায়ী। বাংলাদেশে অধিকাংশ খাদ্যসামগ্রী অনিরাপদ বা বিভিন্ন মাত্রায় ভেজালযুক্ত। এ সমস্যা খাদ্য প্রস্তুত করা থেকে ভক্ষণ পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে বিদ্যমান। খাদ্য প্রস্তুতকারক, প্রক্রিয়াজাতকারক, রেস্তোরাঁ, ফাস্ট ফুডের দোকান প্রত্যেকেই এ ভেজালীকরণ প্রক্রিয়ায় জড়িত। এ প্রক্রিয়া জনস্বার্থের জন্য মারাত্মক হুমকি, যা নানাবিধ রোগব্যাধীর জন্য দায়ী। বিগত কয়েক দশকে এদেশে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ১৯৮০ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য ইনস্টিটিউটের একটি জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশের শতকরা ৬৩ ভাগ অপুষ্টির জন্য অপার্যপ্ত খাদ্যাভ্যাস ও ভেজাল খাদ্য গ্রহণ দায়ী। ২০০৩ সনে একটি গবেষণায় দেখা যায় পূর্ববতী দশকের প্রায় ৫০% খাদ্য সামগ্রীই ভেজালপূর্ণ যা ঢাকার জনস্বাস্থ্য বিভাগ (IPH) দ্বারা পরিচালিত ছিল। একইভাবে সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২০০১-২০০৯ সন পর্যন্ত গৃহীত প্রায় অর্ধেকের বেশি খাদ্যসামগ্রীই ভেজালপূর্ণ। এ সরকারি পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, বিগত ১০ বছরে এদেশে খাদ্যে ভেজাল দেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভেজাল খাদ্যে নানাবিধ প্রাণঘাতী প্রভাব রয়েছে। জাতীয় টাস্কফোর্স NTFS-এর মতে, ভেজাল খাদ্যসামগ্রী প্রতি বছর বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগসহ ডায়রিয়া ও অপুষ্টির জন্য দায়ী। এক্ষেত্রে বয়স্কদের তুলনায় শিশুরা বেশি আক্রান্ত, যা শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী। বেশিরভাগ ভেজাল খাদ্য কঠিন ও জটিল রোগের জন্য দায়ী। সম্প্রতি সময়ে এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার শিশু মৃত্যুর এক ভয়ানক চিত্র তুলে ধরেছে যাতে প্রতি ১৯ জন শিশুর অন্তত ১ জন শিশু ৫ বছরের পূবেই মৃত্যুবরণ করে। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থ্যা সমূহকে যে কোনো মূল্যে আরো শক্তিশালী ও বেগবান হতে হবে।


বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয় ও জনস্বাস্থ্যে তাদের প্রভাব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে এদেশে বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগসহ ডায়রিয়া, ক্যান্সার, হৃদরোগ, বিভিন্ন জন্মগত সমস্যার জন্য ভেজাল খাদ্য গ্রহণই দায়ী। নিম্নোক্ত আলোচনায় খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব সংক্রান্ত বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-


১. অস্বাস্থ্যকর উপায়ে খাদ্য সামগ্রী আনা নেয়া
বাংলাদেশে খাদ্য শিল্পে অস্বাস্থ্যকর উপায়ে খাদ্যসামগ্রী আনা নেয়া একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অগনিত রেস্তোরাঁ, কনফেকশনারি, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিদ্যমান। অস্বাস্থ্যকর খাবারই মূলত ডায়রিয়া ও অপুষ্টির জন্য দায়ী। ICDDRB এর তথ্যানুসারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের সমীক্ষায় প্রমাণ পেয়েছে প্রায় প্রতিদিন ৫০১ জন মানুষ ডায়রিয়াজনিত রোগাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসে যার পেছনে ভেজাল খাদ্য গ্রহণ দায়ী। এ সংস্থার তথ্যানুসারে NTFS প্রমাণ পেয়েছে শুধুমাত্র ১৯৯৮ সালেই একমাত্র বাংলাদেশেই ১,৬৫৭৩৮১ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর ২০৬৪ জন মারা যায় ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য রপ্তানি শিল্পের গুরুতর প্রভাব ফেলে যেমন ১৯৯৭ সালে EU এদেশ থেকে চিংড়ি রপ্তানি নিষিদ্ধ করে অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে।


২. খাদ্যে ফরমালিন ও DDT-এর ব্যবহার
ফরমালিনের ব্যবহার

ফরমালিন একটি বর্ণহীন তীব্র গন্ধযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ যা টেক্সটাইল, কাগজ, রঞ্জক, অবকাঠামো শিল্প এবং মানুষের মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য সুপরিচিত। এটি পানিতে দ্রবীভূত ফরমালডিহাইড ও গ্যাস থেকে সৃষ্টি। এটা মাছ, ফল, বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য সংরক্ষণে ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয় যা জনস্বাস্থের জন্য চরম হুমকি। পানিতে মিশ্রিত ফরমালিন মাছ এবং ফল সতেজ রাখতে ব্যবহৃত হয়। এটা সাধারণত মৃত জিনিস পচাতে বাধা দেয় যা বর্তমানে বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য সংরক্ষণের ব্যবহৃত হচ্ছে। ফরমালিনের ব্যবহার নাক ও শ্বাসনালির জ্বালাপোড়ার জন্য দায়ী। এছাড়া সর্দি, গলার ঘা, স্বরযন্ত্রের প্রদাহ, ব্রংকাইটিস, ও নিউমোনিয়া রোগের জন্য দায়ী। তাছাড়া এটা ত্বকে প্রভাব ফেলে এবং বিভিন্ন চর্মরোগ যেমন ডার্মাটাইটিস, চুলকানি, সৃষ্টি করে। মাত্রারিরিক্ত ফরমালিন গ্রহণে তীব্র ব্যথা ও পেটের জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে। আবার আলসার, মিউকাস পর্দার ক্ষয়সহ, অভ্যন্তরীণ অন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করে। এটি মাথাঘুরা রক্তবমি, রক্তসহ ডায়রিয়া, রক্তসহ প্রস্রাব, অম্লতা, ঝিমঝিমভাব, রক্ত প্রবাহে সমস্যা এমনকি মৃত্যুর জন্যও দায়ী হতে পারে।


DDT-এর ব্যবহার
পৃথিবীতে ৪৯টি দেশে DDT-এর ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং ২৩টি দেশে সীমাবদ্ধ পরিসীমায় DDT ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশেও DDT-এর ব্যবহার নিষিদ্ধ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটির যথেচ্ছ ব্যবহার এখনও বিদ্যমান রয়েছে, বিশেষ করে শুঁটকি শিল্পে। DDT-এর ব্যবহার বিভিন্ন ক্যান্সার যেমন- স্তন ক্যান্সার, যকৃৎ ক্যান্সার, অগ্নাশয়ের ক্যান্সার প্রভৃতির জন্য দায়ী। DDT-এর ব্যবহার প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে যেমন- যৌন অক্ষমতা, গর্ভপাত, অগ্রিম মেনোপেজ, জন্মত্রুটি, কম ওজনবিশিষ্ট শিশু জন্ম ইত্যাদি।


৩. খাদ্যে ক্ষতিকর রঙ ব্যবহার
বাংলাদেশে শিল্প রঞ্জক যেমন টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহৃত রঙ খাদ্যে ব্যবহৃত হয় যেমন মিষ্টি বিপণিতে মিষ্টির রঙ উজ্জ্বল করতে কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের মানুষ মিষ্টি খেতে ভালোবাসে এবং বিভিন্ন উৎসবে মিষ্টি একটি অপরিহার্য উপাদান। এছাড়াও বেগুনি, পেঁয়াজু প্রভৃতি ইফতারসামগ্রীতে কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হয়।


শিল্প রঞ্জক ও রঙ সমৃদ্ধ খাদ্য সামগ্রি চুলকানি, জন্ডিস প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া শ্বাসক্রিয়া হাঁপানি যকৃত, বৃক্ক, অস্থি প্রভৃতির ওপর ক্ষতিসাধন করে থাকে।
ক্ষতিকারক রঞ্জক মিশ্রিত ফল হাঁপানির জন্য দায়ী
কানাডিয়ান ফুড ইন্সপেকশন এজেন্সি (CFIA) ‘হেরিটে ব্রান্ড পাম তেল’ খেতে জনসাধারণকে সতর্ক করে দিয়েছে কারণ এতে অভক্ষণযোগ্য রঙ ব্যবহার করা হয়। এটা ল্যাবরেটরি পশুদের ক্যান্সার তৈরি করে এবং মানব স্বাস্থ্যে বিশেষ করে মানসিক সমস্যা, মাথা ব্যাথা, অ্যালার্জি প্রভৃতির জন্য দায়ী। গবেষণায় দেখা যায় কৃত্রিম রঙ বদহজম, অ্যালার্জি, এমনকি ক্যান্সারও সৃষ্টির জন্য দায়ী। এছাড়া অনিদ্রা, বমিবমিভাব, ডায়রিয়া, হৃদরোগ ও বিভিন্ন রকমের স্নায়ুরোগের জন্য কৃত্রিম রঙ দায়ী।


৪. খাদ্যে অন্যান্য ভেজালসমূহ
উপরোল্লিখিত বিষয় ছাড়াও নিত্যনৈমিত্তিক অন্যান্য খাদ্যে ভেজাল প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে-
মুড়িতে ইউরিয়া মেশানো যা মুড়িকে সাদা ও বড় আকারের করে। ইউরিয়া মানব স্বাস্থ্যের জন্য
 ক্ষতিকর। এটি আলসার সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিককালে একটি চিকিৎসা জরিপে দেখা যায় যে, মুড়িতে ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ সাধারণত চালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, যা ইউরিয়া ব্যবহারের কারণে বলে প্রতীয়মান হয়। চিকিৎসকরা বৃক্ক বা কিডনি রোগের জন্য ক্যাডমিয়াম দায়ী বলে সর্তক করেন।
বাংলাদেশীদের খাদ্য তালিকায় বিশেষ করে শিশুদের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান যা খাঁটি দুধ থেকে তৈরি করা হয়। কিন্তু বর্তমানে নানাভাবে ভেজালপূর্ণ যা আলুর পেস্ট, পামতেল, সয়াবিন তেল, পশু বা উদ্ভিজ্জ চর্বি প্রভৃতির সাথে কৃত্রিম ফ্লেভার মিশায়ে তৈরি করা হয়।


৫. আইনগত অবকাঠামো
বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বিদ্যমান, যারা প্রচলিত আইনের বাইরে শুধু খাদ্য নিরাপত্তায় বিশুদ্ধ আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করে থাকে।
পেনাল কোড-১৮৬০
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আইন-১৯৫৭, ১৯৫৮, ১৯৬৪
খাদ্য বা বিশেষ আদালত আইন-১৯৬৫
ভেজালমুক্ত খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯ এবং ভেজালমুক্ত খাদ্য নীতিমালা-১৯৬৭
বালাইনাশক অধ্যাদেশ-১৯৭১ এবং বালাইনাশক নীতিমালা-১৯৮৫
বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪
বি.এস.টি.আই অধ্যাদেশ-১৯৮৫ যা BSTI আইন-২০০৩ হিসেবে সংশোধিত
আয়োডিন স্বল্পতা রোধ আইন-১৯৮৯
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯
ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন-২০০৯
পশু জবাই (নিষেধাজ্ঞা) ও মাংস নিয়ন্ত্রণ (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-১৯৮৩
কৃষি পণ্য বাজার আইন-১৯৬৪ (সংশোধন- ১৯৮৫)
মাৎস্য নিরাপত্তা এবং সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ (সর্বশেষ সংশোধন-১৯৯৫)
সামুদ্রিক মাৎস অধ্যাদেশ-১৯৮৩ এবং নীতিমালা- ১৯৮৩
 মাছ ও মাংস দ্রব্যাদি (পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-১৯৮৩) মাৎস ও মাংস দ্রব্যাদি পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ     নীতিমালা- ১৯৯৭
দানাদার খাদ্য সরবরাহ (কুসংস্কার নিরোধ) অধ্যাদেশ-১৯৫৬
উল্লিখিত আইনগুলো সাধারণত সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রভৃতি দ্বারা কার্যকর করা হয়।

 

৫. খাদ্যে ভেজালরোধে আইন কাঠামোর দুর্বলতা
বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল প্রয়োগ একটি সাধারণ ব্যাপার। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অবহেলা এজন্য অনেকখানি দায়ী। অন্যদিকে, আইনের ব্যর্থতা, খাদ্য মূল্য, তথ্য অপ্রতুলতা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব প্রভৃতি বাংলাদেশ খাদ্যে ভেজাল প্রক্রিয়ায় সমভাবে দায়ী। এ পরিপ্রেক্ষিতে নিচে কিছু বিষয় আলোচনা করা হলো-

 

ক. আইনের বহুমুখিতা
খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ বাংলাদেশে প্রায় ২০-৩০টি আইন বিদ্যমান। একটি বিষয়ে এতগুলো আইন অপ্রয়োজনীয়। নিচে দুটি উদাহরণ দেয়া হলো-
পেনাল কোন ১৯৬০ এর ২৭২ ও ২৭৩নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক খাদ্যে ভেজাল দেয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আবার PFO-১৯৫৯ এর অনুচ্ছেদ ৬(১) (ক) অনুসারে অনুচ্ছেদ ১৬ অনুসারে SPA-১৯৭৪ এর অনুচ্ছেদ ২৫ (গ) অনুসারেও এটি একটি অপরাধ। একইভাবে সরকার CRRP-২০০৯ এর অনুচ্ছেদ ৮১ একই ধরনের অপরাধ ও শাস্তির কথা উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে DDT-এর ব্যবহার PO–১৯৭১ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কিন্তু DDT-এর ব্যবহারে অপরাধীকে PC-১৯৬০। PFO-১৯৫৯, SPA-১৯৭৪ এবং CRRP-২০০৯ মোতাবেক শাস্তি প্রদান করা যাবে।
আইনে এ ধরনের বহুমুখিতা, খাদ্যসামাগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। কোন অপরাধে কোন আইন প্রযোজ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্রের হম্পিটর রিভিউ-২০০৯ একটি গবেষণায় দেখে যে, প্রায় ৬২ ভাগ খাদ্য সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। খাদ্যে ভেজালরোধে এসব আইন বোঝে না। এতে দেখা যায় অনেক খাদ্য বিক্রেতা না জেনেই আইন অমান্য করে। এজন্য খাদ্য নিরাপত্তা বা ভেজাল প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে একটি মাত্র আইন প্রনয়ন করা জরুরি।


খ. আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের মাঝে সমন্বয়হীনতা
যদিও খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে অনেক আইন বিদ্যমান যা ইতঃপূর্বে আলোচিত হয়েছে কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের মাঝে কিন্তু সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান আছে। এজন্য সরকার ২০০৫ সালে PFO-১৯৫৯ এর সংশোধন করে এতে ৪(ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে, যার মাধ্যমে জাতীয় খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ উপদেষ্টা পরিষদ (NFSAC) গঠন করা হয়, যা সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কার্যকর আছে। কিন্তু NFSAC-এর অনেক দুর্বলতা আছে যেমন- এতে জনবলের অভাব রয়েছে তাছাড়া এটি কোনো স্বাধীন সংস্থা নয়। এছাড়া সরকারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় খাদ্যে ভেজাল সংক্রান্ত বিষয়ে তদারকি করে যা সংশ্লিষ্টদের মাঝে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। এ প্রেক্ষিতে একটি উচ্চ পর্যায়ের স্বাধীন সংস্থা তৈরি করা দরকার যেমন-UK, USA & Australia-তে বিদ্যমান আছে।


গ. স্বচ্ছতা, স্বায়ত্তশাসন ও আমলাতান্ত্রিকতা
এটা সর্বজনগ্রাহ্য যে, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ একটি কার্যকর আইন অবকাঠামো থাকা দরকার যা হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিতামূলক। কারণ এসবই সামগ্রিক সরকারি অবকাঠামোতে অত্যন্ত জরুরি। একটি নিয়ামক সংস্থাকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। পরিতাপের বিষয় যে, এসব নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সরকারি আমলা, মন্ত্রী প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত, যেমন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের NFSAC অনুচ্ছেদ ৪ (ক) (১) অনুসারে ১৫ জন সদস্য দ্বারা গঠিত যার ১২ জনই সরকারি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও মন্ত্রীবর্গ। উন্নত বিশ্বে যেমন কানাডায় একটি বাহ্যিক এবং দক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিদ্যমান যারা স্বচ্ছতার সঙ্গে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তদারকি করে। অধিকন্তু, PFO-১৯৫৯ এর সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো স্বাধীনতা রাখা হয়নি যার কারণে এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব প্রকটভাবে বিদ্যমান যা বিগত দশকে বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল ইস্যুটি জটিল আকার ধারণ করেছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত নয়। মারাত্মকভাবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাপূর্ণ। যেমন- CRRP-২০০৯ এর ১৮ অনুচ্ছেদ গঠিত হয়েছে CNDRP প্রশাসনের তদারকিতে। কিন্তু অনুচ্ছেদ ৭১-এ বলা হয়েছে ভুক্তভোগী অপরাধী শাস্তি প্রদানে মামলা করতে পারবে CNDRP-এর অনুমতি সাপেক্ষে। এ ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনকে অকার্যকর করে ফেলে।


ঘ. দণ্ড বিধানে অপর্যাপ্ততা
অপরাধ নিরোধকল্পে দ- বিধানে যথেষ্ট ঘাটতি বিরাজমান, যার ফলে প্রশ্ন উঠেছে প্রচলিত দ-বিধি কি যথেষ্ট? উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে-পেনাল কোড-১৮৬০ এর ২৭২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক খাদ্যে ও পানীয়তে ভেজাল দিলে সর্বোচ্চ শাস্তি ৬ মাসের কারাদ- অথবা সর্বোচ্চ জরিমানা ১০০০ টাকা মাত্র, যা এই শতকে শাস্তি হিসেবে অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ PFO ১৯৫৯ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন কিন্তু এতে পর্যাপ্ত শাস্তি ব্যবস্থা নেই। এ আইনটি ২০০৫ সালে সংশোধন করা হয় যা এখন অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে প্রথমবার খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল মেশানোর জন্য শাস্তির বিধান সর্বোচ্চ ১ বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। পুনরায় একই ধরনের অপরাধ করলে এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ বছরের জেল অথবা ২ লাখ টাকা জরিমানা। সংশোধিত আইন মোতাবেক খাদ্য দ্রব্যে প্রথমবার কোনো শিল্পকারখানা ফরমালিন, কৃত্রিম রঙ প্রভৃতি মেশানো অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ১ বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং পুনরায় একই ধরনের অপরাধ করলে এ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ বছরের জেল অথবা ২ লাখ টাকা জরিমানা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ পরিমাণ শাস্তি যথেষ্ট নয় যেখানে খাদ্যের বিষক্রিয়া বা ভেজালের কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। অপরদিকে CRRP-২০০৯ এর দণ্ডবিধি কিছুটা উচ্চ পর্যায়ের কিন্তু তবুও পর্যাপ্ত নয়। উক্ত আইনে ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো ব্যক্তি খাবার দ্রব্যে মোড়কজাত না রাখলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ১ বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা। এ আইনে কোনো ব্যক্তি খাদ্য দ্রব্যে নিষিদ্ধ রাসায়নিক মেশালে সর্বোচ্চ শাস্তি বিধান হলো ৩ বছরের জেল অথবা ২ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা শাস্তি দ্বিগুণ হয়ে যাবে যদি কোনো ব্যক্তি একাধিকবার বা বারবার এই ধরনের অপরাধ করে থাকে।


উপরোল্লিখিত আইনগুলোর তুলনায় SPA-১৯৭৪ আইন যথেষ্ট কঠিন যেখানে খাদ্যে ভেজাল প্রদানের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এমনকি মৃত্যুদণ্ড। তবে এ ধরনের দণ্ডবিধি অমানবিক ও অনাকাক্ষিত।


ঙ. আইন প্রয়োগজনিত সমস্যা
বাংলাদেশে আইনের শাসনের ঘাটতি রয়েছে। আবার ট্রেনিং সতর্কীকরণ নোটিশ, উন্নয়ন নোটিশ প্রচলিত নেই বললেই চলে। আবার প্রশাসনিক আইনি প্রক্রিয়া সংগঠিত নয়। এতে কোনো সুষ্ঠু তদারকি ব্যবস্থা নেই। এজন্য আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুতও স্বচ্ছ করা জরুরি। প্রকৃতপক্ষে আইন প্রয়োগে কোনো নির্দিষ্ট সংস্থা নেই বা কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেই। সাধারণত বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। যেখানে একজন স্যানিটারি পরিদর্শক অধিকাংশ সময় নানা কাজে ব্যস্ত থাকে যার জন্য খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ গঠন গৌন হয়ে পড়ে। অপরপক্ষে নিযুক্ত কর্মকর্তা আবার নির্বাহী ম্যাজিট্রেটের অনুমতি ছাড়া বাস্তবায়ন করতে পারেন না। এজন্য সমগ্র প্রক্রিয়া মন্থরভাবে চলে।


খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কিছু পরামর্শ
আঞ্চলিক স্বদেশ বিধানে আইন সংশোধন, অবকাঠামো বিনির্মাণ এবং কর্মকৌশল নির্ধারণ যা খাদ্য নিরাপত্তায় সাদৃশ্য প্রয়াগিক সহায়তা প্রদানে সক্ষম।
আন্তর্জাতিক মান অর্জনে প্রচলিত মানদ- ও নিবন্ধীকরণ প্রক্রিয়া সংশোধন।
প্রযুক্তিজাত সহায়তার জন্য ১০ বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ-সচেতনতা মূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়া।
ঝুঁকি নিরূপণ অবকাঠামো নিমার্ণে সহায়তা প্রদান এবং ভেজাল ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ।
খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক প্রকাশনা প্রকাশ করা যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট তথ্য, উপাত্ত ঘটনা প্রভৃতি ঠাঁই পাবে।
SAARC সচিবালয়গুলোর মাঝে খাদ্য নিরাপত্তা বলয়, কমিশন বা কাউন্সিল গঠনে সহায়তা প্রদান।
খাদ্যবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে এশিয়ার দেশ সমূহের অগ্রাধিকার প্রদান।
SAARC দেশসমূহের মাঝে আঞ্চলিক এপিডেমিওলজিক নেটওয়ার্ক স্থাপন যাতে খাদ্যবাহিত রোগ সংক্রমণ বিশেষ করে সম্ভাব্য দূষণ ঝুঁকি এড়ানো যাবে।
দীর্ঘ ও স্থায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন- যাতে সম্পদ, প্রক্রিয়া ও পথ বাতলানো থাকবে, যার মাধ্যমে খাদ্যবাহিত অসুস্থতার সাথে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ প্রতিযোগিতা করতে পারবে।


উপসংহার
খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ একটি যুগোপযোগী নিয়ন্ত্রক সংস্থা একান্ত জরুরি। বাংলাদেশে এরকম সংস্থার অভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকির মুখে পতিত। যাহোক উদ্ভূত পরিস্থিতিতে FSRRB-এ একটি একক উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন মতো খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে স্বয়ংসম্পন্ন থাকবে। ওই ধরনে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে এবং সব ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মুক্ত হতে হবে। বিদ্যমান আইনসমূহকে সংশোধন করে যুগোপযোগী করতে হবে।

* উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল: ০১৭১১-৮৫৪৪৭১। ** সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল: ০১৭১১-১২৪৭২২

 

প্রফেসর ড. এম. এ রহিম*
ড. মো. শামছুল আলম (মিঠু)**

বিস্তারিত
জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষির ওপর প্রভাব

জলবায়ু কী?
জলবায়ু হচ্ছে কোনো এলাকা বা ভৌগোলিক অঞ্চলের ৩০-৩৫ বছরের গড় আবহাওয়া। বর্তমান বিশ্বে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশিক উষ্ণতা নামে অধিক পরিচিত। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে গ্রিন হাউস প্রভাব বলা হয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নানা প্রকারের দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে যেমনÑ অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি। যার ফলশ্রুতিতে জ্ঞান ও মালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণে প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।


বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমগ্র বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আবহাওয়ার মৌসুমি ধারাবাহিকতা বিঘিœত হচ্ছে। এ কারণে বিশ্বের যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থসামাজিক অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্র্ভরশীলতাই এর মূল কারণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সব খাত বিশেষ করে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কৃষি উৎপাদন, প্রাকৃতিক পরিবেশসহ জনকল্যানমূলক সব সেবাখাত এবং খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যা ব্যাহত করবে আমাদের ধারাবাহিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ও অর্থনৈতিক কর্মকা-কে।


জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
 জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কৃষি ক্ষেত্রে। কৃষি নির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোতে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। গত শতাব্দীতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে ২৩%, নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে ১৯% এবং মিথেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০০% ( ওচঈঈ চতুর্থ প্রতিবেদন ২০০৭)। বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে নানা রকম প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতা বা হুমকি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এই পরিবর্তনে জনসংখ্যার যে অংশটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন, তারা হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। সমুদ্র তীরবর্তী ভৌগোলিক অবস্থান, মাত্রাতিরক্ত জনসংখ্যা, অপ্রতুল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং এর ওপর অধিক নির্ভরশীলতা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের বিপন্নতা খুবই ভয়াবহ। জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য সর্ব স্তরের জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা একান্ত প্রয়োজন।


জলবায়ু পরিবর্তন একটি নিয়মিত প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু মানুষের কর্মকা- দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। মানুষের বিভিন্ন কর্মকা- জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। বিশ্ব উষ্ণায়িত হচ্ছে এবং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশসমূহ বিশ্ব উষ্ণায়ন পাল্টে দিচ্ছে আবহাওয়ার ধরন এবং ঋতু বৈচিত্র্য। ওচঈঈ সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী-
বাংলাদেশের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা গত ১৪ বছরে (১৯৮৫-১৯৯৮) মে মাসে ১ সে. এবং নভেম্বর মাসে ০.৫ সে. বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি বর্তমানে প্রায় ১০,৫০০০০ হে. (৮৩০,০০০ হেক্টর, ২০০৯-১০)
বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেয়েছে, ভয়াবহ বন্যার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, গত ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৩, ২০০৪, ২০০৭ সনে।
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বেড়েছে (সিডর, আইলা, নার্গিস)
গ্রীষ্মকালে সমুদ্রের লোনাপানি দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীতে প্রবেশ করেছে।

 

বাংলাদেশের জলবায়ুর পরিবর্তন ইতোমধ্যেই শুরু করেছে। ২০০০ সনে প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে কক্সবাজার উপকূলে বছরে ৭.৮ মিমি. হারে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। গত চার দশকে ভোলা দ্বীপের প্রায় তিন হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ২১০০ সন নাগাদ সাগর পৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মি. উঁচু হতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের মোট আয়তনের ১৮.৩ অংশ নিমজ্জিত হতে পারে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সূত্র মতে রাজশাহীর উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় ১৯৯১ সনে পানির স্তর ছিল ৪৮ ফুট, ২০০০ সনে তা নেমে ৬২ ফুট এবং ২০০৭ সনে তা নেমে যায় ৯৩.৩৪ ফুটে। স্বাভাবিক বন্যায় দেশের মোট আয়তনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। বর্তমানে বন্যার সংখ্যা ও তীব্রতা দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৭ সনের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন সিডর আক্রমণ করার মাত্র দুই বছরের মধ্যে শক্তিশালী সাইক্লোন নার্গিস ও আইলা এবং ২০১৩ সনে মে মাসে মহাসেন (আংশিক) আঘাত হেনে কৃষিকে বিপর্যস্ত করে তোলে।


জলবায়ুর এ বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিশেষ করে বিভিন্ন অভিযোজন কলাকৌশল রপ্ত করতে হবে, যাতে করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কৃষিকে মুক্ত রাখা বা ঝুঁকি কমানো যায়। এছাড়া দুর্যোগমুক্ত সময়ে শস্য বহুমুখীকরণ ও ফসলের নিবিড়তা বাড়িয়ে দুর্যোগের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়।
 জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ
প্রাকৃতিক কারণসমূহ
ক. মহাদেশীয় ড্রিফট খ. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত গ. পৃথিবীর গতি পরিবর্তন ঘ. সামুদ্রিক স্রোত ঙ. ঘূর্ণিঝড়
মনুষ্য সৃষ্ট কারণসমূহ
ক. কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি /কার্বন নিঃসরণ খ. খনিজ জ্বালানি ব্যবহার গ. বাতাসে নাইট্রাস অক্সাইড বৃদ্ধি ঘ. পাহাড় নিধন ঙ. বন্যভূমি উজাড়
 কৃষিতে বন্যার প্রভাব
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা এ ধরনের আকস্মিক বন্যার শিকার। মৌসুমি বন্যা উপকূলীয় এলাকায় সমস্যার সৃষ্টি করে না। কিন্তু বন্যাপ্রবণ এলাকায় এর প্রভাব খুব বেশি। ফসল ছাড়াও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে। জোয়ারজনিত বন্যা উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি করে। জমিতে লবণাক্ত পানির জলাদ্ধতার সৃষ্টি করে, যা ফসল চাষের জন্য অনুপযোগী। সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, নীলফামারী ইত্যাদি জেলা আকস্মিক বন্যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ-ায়মান পরিপক্ব ফসল কর্তনের আগেই প্রতি বছর হাজার হাজার একর পাকা বোরো ধান আকস্মিক বন্যায় আক্রান্ত হয় ফলে চাষি হয় ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা এ ধরনের আকস্মিক বন্যার শিকার। বাংলাদেশে পানিসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রকোপ ক্রমাগত বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি প্রতি বছর বন্যাকবলিত হয়। বাংলাদেশের গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৩০০ মিমি এবং অঞ্চল ভেদে তা ১২০০ মিমি (দক্ষিণ-পশ্চিম) থেকে ৫০০০ মিমি (উত্তর-পূর্বাঞ্চল) পর্যন্ত হয়ে থাকে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে এবং ২০৩০ সনে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০-১৫ শতাংশ এবং ২০৭৫ সনে প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষিতে খরার প্রভাব
কোন এলাকায় বৃষ্টিপাতের তুলনায় বাষ্পীকরণের মাত্রা বেশি হলে সেখানে খরা দেখা দেয়। কৃষি খরা বলতে আবহাওয়ার নিয়ামকগুলো যেমনÑ বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা, বাষ্পীভবন ইত্যাদির হ্রাস বৃদ্ধিজনিত কারণে ফসলের জীবন চক্রের যে কোনো অবস্থায় পানির অভাবে জৈবিক কর্মকা- ব্যাহত হওয়াকে বোঝায়। এপ্রিল থেকে মধ্য নভেম্বরের মধ্যে পর পর ১৫ দিন বৃষ্টি না হলে খরার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
কৃষিতে খরা একটি বহুল প্রচলিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার খরায় আক্রান্ত হয়। গাছের বৃদ্ধি পর্যায়ে গড় বৃষ্টিপাতের অভাবে মাটিতে পানিশূন্যতা সৃষ্টি হয়, যা গাছের ক্ষতি করে। দেশে বিভিন্ন মাত্রার খরায় আক্রান্ত ৮৩ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য জমির শতকরা ৬০ ভাগ জমিতে আমন ধান চাষ করা হয়। এ ছাড়াও খরা আউশ ও বোরো ধান, পাট, ডাল ও তেল ফসল, আলু,  শীতকালীন সবজি এবং আখ চাষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মার্চ-এপ্রিলের খরা চাষের জন্য জমি প্রস্তুতিতে অসুবিধার সৃষ্টি করে ফলে বোনা আমন, আউশ এবং পাট চাষ যথাসময়ে করা যায় না।
মে-জুন মাসের খরা মাঠে দ-ায়মান বোনা আমন, আউশ ও বোরো ধান, পাট, ডাল ও তেল ফসল, আলু, শীতকালীলন সবজি এবং আখ চাষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মার্চ-এপ্রিলের খরা চাষের জন্য জমি প্রস্তুতিতে অসুবিধার সৃষ্টি করেÑ ফলে বোনা আমন, আউশ এবং পাট চাষ যথাসময়ে করা যায় না। মে-জুন মাসের খরা মাঠে দ-ায়মান বোনা আমন, আউশ এবং পাট ফসলের ক্ষতি করে। আগস্ট মাসের অপরিমিত বৃষ্টি রোপা আমন চাষকে বাধাগ্রস্ত করে। সেপ্টেম্বর- অক্টোবর মাসের কম বৃষ্টিপাত বোনা ও রোপা আমন ধানের উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং ডাল ও আলু ফসলের চাষকে দেরি করিয়ে দেয়। কাঁঠাল, লিচু, কলা ইত্যাদি ফলের গাছ অতিরিক্ত খরায় মারা যায়। এছাড়াও শুষ্ক মৌসুমে নদী-নালার নাব্য হ্রাস এবং গাছের প্রস্বেদনের হার বেড়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে।
 কৃষিতে তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে উফশী ধানের ফলন কমে যাবে এবং গমের রোগের আক্রমণ বাড়বে। বাংলাদেশে বর্তমানের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে গম চাষ সম্ভব হবে না। ধান গাছের কচি থেকে ফুল ফোটার সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি হলে এবং অতি নিম্ন তাপে (২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে) শিষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে। ফুল ফোটা বা পরাগায়নের সময় যদি অতি উষ্ণ তাপ থাকে তাহলে চিটার সংখ্যা থোড় অবস্থার চেয়ে বেশি হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ার কারণে ধান গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ধান গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করে, ধানের চারা দুর্বল হয় এবং ফসলের জীবনকাল বেড়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকামাকড় এবং বিভিন্ন উদ্ভিদ রোগের আক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। দানা শস্যেসহ বিভিন্ন ফসলে মিলিবাগ, এফিড (শোষক পোকা) ও ব্যাকটেরিয়া (জীবাণু গঠিত রোগ) ও ছত্রাকজনিত রোগ এর আক্রমণ বেশি বেশি দেখা যাচ্ছে।
অতিরিক্ত তাপ এবং আর্দ্রতা গাছের ছত্রাক রোগ বাড়ানোয় সহায়ক ভূমিকা পালন করে এবং একইভাবে পোকামাকড় ও বিভিন্ন রোগের বাহক পোকার সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। বোরো মৌসুমে যদি রাতে ঠা-া ও কুয়াশা পড়ে ও ধানের পাতায় পানি জমে থাকে এবং দিনে গরম পড়ে অর্থাৎ তাপমাত্রা বেড়ে যায় তবে ব্লাইট রোগের আক্রমণ বেড়ে যায়। অধিক আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার কারণে শীথ ব্লাইট রোগের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
কৃষিতে উষ্ণতা বৃদ্ধি, উষ্ণ ও শৈত্যপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব
বিগত ২৫ বছরের আবহাওয়ার উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের গড় উষ্ণতা তেমন বাড়েনি। তবে আশঙ্কা করা হয় যে, ২০৩০ সন নাগাদ গড় তাপমাত্রা ১.০ ডিগ্রি, ২০৫০ সনে ১.৪ ডিগ্রি এবং ২১০০ সনে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিককালে তাপমাত্রা না বাড়লেও উষ্ণ ও শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা বেড়েছে। বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে শীতকালের ব্যাপ্তি ও শীতের তীব্রতা দুইই কমে আসছে।
বেশির ভাগ রবি ফসলেরই স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে ফলনের ওপর তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে। এ ছাড়া শীত মৌসুমে উষ্ণ প্রবাহ দেখা দিলে বেশি সংবেদনশীল ফসল যেমন গমের ফলন খুব কমে যায় এবং গম উৎপাদন অলাভজনক হয়। হঠাৎ তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হলে সরিষা, মসুর, ছোলা ইত্যাদি ফসলের ওপর তার বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং এসব ফসলের পরাগায়ন ব্যাহত হয়ে ফলন খুব কমে যায়। শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে অনেক ফসল বিশেষ করে গমের পরাগায়ন (পলিনেশন) ও গর্ভধারণ (ফার্টিলাইজেশন) না হওয়ায় আংশিক বা সম্পূর্ণ ফসল চিটা হয়ে যায় এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। উষ্ণতা বাড়ার ফলে গাছের প্রস্বেদন বা পানি বের হওয়া বেড়ে যায়। ফলে সেচের পানির অভাব হয়। শৈত্যপ্রবাহের ফলে আমের মুকুল নষ্ট হয় ও নারিকেলের ফলধারণ ব্যাহত হয়। বদ্ধ জলাশয়ে কৃত্রিম প্রজনন সমস্যা হতে পারে ফলে সময়মতো পুকুরে ছাড়ার জন্য পোনা মাছ পাওয়া যাবে না। তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়ামের ওপরে হলে কিশোর চিংড়ির মৃত্যু হার বাড়বে। উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের প্রজাতি মাইগ্রেট করতে পারে। প্রজনন ও মাইগ্রেশনের সময় পরিবর্তন হতে পারে। এ বছর (এপ্রিল ২০১৫) হালদা নদীতে যথাসময়ে মাছ ডিম ছাড়েনি, প্রজাতি বৈচিত্র্য কমতে পারে, প্রজননে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। ফিশিং গ্রাউন্ডের পরিবর্তন হতে পারে, সার্বিকভাবে মাছের উৎপাদন কমতে পারে। সামুদ্রিক জলাশয়ে মাছ ও চিংড়ির প্রজাতি বৈচিত্র্য ও পরিমাণে পরিবর্তন হতে পারে। মাছ ও চিংড়ি প্রজননে ব্যাঘাত ঘটতে পারে বা মাইগ্রেশন ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
কৃষিতে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ও লবণাক্ততা বৃদ্ধিও ক্ষতিকর প্রভাব
লোনা পানির অনুপ্রবেশ বাংলাদেশের একটি মারাত্মক সমস্যা। ১৯৭৩ সনে ১৫ লাখ হেক্টর জমি মৃদু লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়, যা ১৯৯৭ সনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ হেক্টেরে। বর্তমানে এর পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর। উজান থেকে পানিপ্রবাহ বাধা ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিমিত বৃষ্টিপাতের অভাবে আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের মোট উপকূলীয় এলাকা প্রায় ২৫ লাখ হেক্টর, যার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১০.৫০ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত।
কৃষিতে নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয়ের ক্ষতিকর প্রভাব
বাংলাদেশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপে এ পর্যন্ত ১,২০০ কিমি. নদীতীর ভেঙে গেছে এবং আরও ৫০০ কিমি. ভাঙনের সম্মুখীন। স্যাটেলাইট চিত্র থেকে দেখা যায়, ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সন পর্যন্ত ১,০৬,৩০০ হেক্টর নদী তীরের ভাঙনের বিপরীতে মাত্র ১৯,০০ হেক্টর নতুন ভূমি গঠন হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে ভাঙা গড়ার এ ভারসাম্য আরও প্রকট হবে।

 

ড. মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার*
*উপপরিচালক (কৃষি সম্প্র: ও গ্রামীণ অর্থনীতি), জাতীয় প্রশিক্ষণ একাডেমি, গাজীপুর

 

বিস্তারিত
উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ফসলধারা অনুসরণ

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে ১১০০ জন। প্রতি বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৪২% (বিবিএস ২০১২)। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৮৫.২ লাখ হেক্টর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর জমির পরিমাণ কমছে প্রায় ১% হারে। এক ফসলি জমির পরিমাণ ২৪.২ লাখ হেক্টর, দুই ফসলি জমির পরিমাণ ৩৮.৪১ লাখ হেক্টর, তিন ফসলি জমির পরিমাণ ১৬.৪২ লাখ হেক্টর এবং শস্যের নিবিড়তা হলো ১৯১% (বিবিএস-২০১২)। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি। আর এ বর্ধিত খাদ্য উৎপাদন করার জন্য প্রয়োজন উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং একক জমিতে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা। ফসলের নিবিড়তা ১৯১% থেকে ৪০০% পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব একমাত্র উন্নত ফসল ধারার প্রবর্তনের মাধ্যমে। ধান ভিত্তিক ফসল ধারায় স্বল্পমেয়াদি অন্য ফসল সমন্বয় করে ফসলের নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।


একজন মানুষকে সুস্থ জীবন-যাপন করার জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্যের। তাই কার্বহাইড্রেটের পাশাপাশি তেল ও আমিষ জাতীয় খাবারের প্রয়োজন। সরিষা, মসুরি, ছোলা, খেসারি ও আলু খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফসল যা শুধু রবি মৌসুমে চাষ করা হয়। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে যেসব জমিতে সরিষা, ডাল ও আলু চাষ হতো সেসব জমিতে এখন বোরো ধান সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে দিন দিন ডাল, সরিষা ও আলু ফসলের জন্য আবাদ যোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাই জমির পরিমাণ বাড়িয়ে এসব ফসলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভাবনা খুবই কম। একমাত্র ফসল বিন্যাসের মাধ্যমে সমন্বয় করে এসব ফসলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। অতি সম্প্রতি বারি কর্তৃক কিছু স্বল্প মেয়াদি সরিষা, আলু ও ডালের জাত এবং ব্রি ও বিনা কতৃক স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে যা দিয়ে শস্য বিন্যাস উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন ফসল ধারা প্রবর্তন করা সম্ভব।


বিনা কর্তৃক স্বল্পমেয়াদি আগাম কর্তনযোগ্য আমন ধানের জাত বিনা ধান-৭ উদ্ভাবিত হয়েছে যার জীবনকাল মাত্র ১২০ দিন। বারি মুগ-৬ স্বল্পমেয়াদি জাত যা ডাল গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক উদ্ভাবন হয়েছে যার জীবনকাল ৬০-৬৫ দিন। রোপা আউশের স্থানীয় জাত পারিজা যার জীবন কাল ৯০ দিন। রোপা আউশের একটি জাত পারিজা যা চারা রোপণের ৭০-৭৫ দিনের মধ্যে কর্তন করা সম্ভব।


আমন ধান (নাবি)- আলু (নাবি)- বোরো ধান (নাবি) শস্য ধারায় বোরো ধান চাষে প্রচুর পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করতে হয়। উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলায় ২০১২ এবং ২০১৩ সনে বোরো ধানের জন্য পানির উত্তোলন লক্ষ করলে দেখা যায় যে, কৃষকরা গড়ে হেক্টরপ্রতি ১৩.৯০ মিলিয়ন লিটার পানি উত্তোলন করে থাকে। পক্ষান্তরে, বিকল্প শস্য হিসেবে স্বল্প পানি নির্ভরশীল মুগডাল চাষ করলে ভবিষ্যতের জন্য অনেক পানি (হেক্টরপ্রতি ১২.৬৯ মিলিয়ন লিটার ) সংরক্ষিত থাকবে।


বাংলাদেশে মুগডাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমিষ সমৃদ্ধ সুস্বাদু সুপ্রাপ্য খাদ্য উপাদান। চাহিদার তুলনায় দেশে ডালের উৎপাদন অনেক কম। দেশে খাদ্য চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে কিন্তু জমির পরিমাণ বাড়ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুুষ্টি স্বল্পতা দূর করতে, মাটির হারানো উর্বরা শক্তি ফিরে পেতে, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে, সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ডালের আবাদ বৃদ্ধি অপরিহার্য। ডাল চাষে ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ৭.৩ লাখ হেক্টর যা মোট জমির শতকরা মাত্র ৫.৩ ভাগ এবং উৎপাদিত ডালের পরিমাণ ৫.৩৫ লাখ মেট্রিক টন। একই হারে বাড়তি জনগোষ্ঠীর ডালের চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বাড়াতে হবে ১.১৬ মেট্রিক টন। ডালের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ডাল চাষের আওতায় অতিরিক্ত জমি বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। তবে উচ্চফলনশীল সরিষা কর্তনের পর মুগডালের চাষ করার সুযোগ রয়েছে। সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডাল গবেষণা কেন্দ্র বারি মুগ-৬ নামে স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে যার জীবনকাল ৫৫-৬০ দিন। উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত ফসলধারা এবং একই জমিতে বছরে চার ফসল চাষ করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট রোপাআমন ধান-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ ধান চার ফসলের শস্য বিন্যাসটি সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। এ ফসল ধারা দ্বারা অনেক মৌসুমে পতিত জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব।


টেবিল-১ : রোপা আমন-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ ফসলধারায় ২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪ তিন বছরের গড় ফলন, আয়, ব্যয় ও লাভ খরচের অনুপাত
ফসল ধারা    ফলন     (টন/হে.)    মোট আয় (টাকা/হে.)    মোট ব্যয় (টাকা/হে.)    প্রান্তিক আয় (টাকা/হে.)
রোপা আমন-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ    ২১.১৭    ৩,১২,৪৪৪    ১,০৭,৯৯২    ২,০৫,৫২৭    ২.৮৯ঃ১.০
কৃষকের ফসলধারায় ২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪ তিন বছরের গড় ফলন, আয়, ব্যয় ও লাভ খরচের অনুপাত
রোপা আমন - পতিত - বোরো ধান- পতিত    ১৪.৩০    ১,৯৬,৮৭৫    ১,১০,৬৫৫    ৮৬,২২০    ১.৭৮ঃ১.০
টেবিল-২ : রোপা আমন-সরিষা-মুগ ডাল-রোপা আউশ ধান ফসলধারা

 

ফসলের নাম (ফসলধারা)
ফসল চাষের সময় (বীজতলার সময় ছাড়া)    রোপা আমন    (বিন ধান-৭)     সরিষা     (বারি সরিষা-১৫)
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে চারা রোপণ- অক্টেবরের ৩য় সপ্তাহে ফসল কর্তন (৯০ দিন)    অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ (৮৫ দিন)    ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ (৬৫ দিন)    মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ (৭০ দিন)

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তেলবীজ গবেষণা কেন্দ্রের আওতায় তিন বছরব্যাপী (২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪) রোপাআমন-সরিষা-মুগডাল-রোপাআউশ ধান পরীক্ষাটি গাজীপুরে কৃতকার্যের সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। রোপা আমন-সরিষা মুগডাল-রোপাআউশ ফসলধারাটি রোপা আমন-পতিত-বোরো-পতিত ফসল ধারার সঙ্গে তুলনামূলক পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ২০১১-১২ থেকে ২০১৩-১৪ সনে উন্নত পদ্ধতিতে এ ফসল ধারায় ধানের সাদৃশ্য ফলন (জরপব বয়ঁরাধষবহঃ ুরবষফ) ২১.১৭ টন/হেক্টর এবং কৃষকের ফসল ধারায় সাদৃশ্য ফলন ১৪.৩০ টন/হেক্টর। এ ফসল ধারায় প্রতি হেক্টরপ্রতি বছর মোট আয় ৩,১২,৪৪৪/- টাকা, মোট ব্যয় ১,০৭,৯৯২/-। টাকা। মোট প্রান্তিক আয় ২,০৫,৫২৭/- টাকা এবং মোট লাভ এবং খরচের অনুপাত ১:২.৮৯ । কিন্তু কৃষকের ধারায় প্রতি হেক্টরে আয় ১,৯৬,৮৭৫ টাকা, খরচ ১,১০,৬৫৫ টাকা, প্রান্তিক আয় ৮৬,২২০ টাকা এবং লাভ খরচের অনুপাত ১:১.৭৮। রোপা আমন-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ ফসল ধারাটি কৃষকের ফসল ধারা (রোপা আমন-পতিত-বোরো ধান-পতিত) থেকে অতিরিক্ত আয় পাওয়া গেছে ১,১৯,৩০৭/-।টাকা।


সুতরাং উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে যেসব এলাকায় রোপাআমন ধান-পতিত-বোরো ধান- পতিত ফসল ধারা রয়েছে সেই সব এলাকায় রোপা আমন-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ ফসল ধারা প্রচলন করা সম্ভব অর্থাৎ চার ফসল ভিত্তিক ফসল ধারাসমূহ কৃষিতাত্ত্বিক ভাবে চাষ করা সম্ভব, এতে করে শস্য নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে আমাদের দেশে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। ফলে আগামী দিন ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমি থেকে বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদনের একটি অন্যতম প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করবে।

 

ড. মো. রফিকুল ইসলাম মল্ডল*
ড. ফেরদৌসী বেগম**
ড. মো. আব্দুল আজিজ***
মো. মাহমুদুল হাসান খান****

*মহাপরিচালক, বিএআরআই, গাজীপুর; **পিএসও, বিএআরআই, গাজীপুর; ***সিএসও, বিএআরআই, গাজীপুর; ****এসও; বিএআরআই, গাজীপুর

বিস্তারিত
গ্রীষ্মকালীন সবজির গুরুত্ব ও চাষাবাদ কৌশল

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় দামি বা সস্তা যে ধরনের খাবারই খাই না কেন, তার মধ্যে শাকসবজির গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি খেয়ে থাকি। কেননা শাকসবজিতে সব ধরনের খাদ্য উপাদানই রয়েছে। তার মধ্যে ভিটামিন ও খনিজ লবণ উল্লেখযোগ্য যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেহে ভিটামিন ও খনিজ লবণের যে চাহিদা তার সবটুকুই প্রায় শাকসবজি থেকেই পূরণ হয়। আজকাল হৃদরোগ, চর্মরোগ ও বহুমূত্র রোগের মতো নানা ধরনের রোগীকে ওষুধের পরিবর্তে পথ্য হিসেবে বেশি করে শাকসবজি খাবার পরামর্শ দিচ্ছেন ডাক্তাররা। আবার চোখের সমস্যার জন্য সবুজ বা রঙিন শাকসবজি অত্যন্ত উপকারী। তাহলে শুধু খাবার হিসেবেই নয়, ওষুধ, পথ্য, পুষ্টি ও সুষম খাদ্যের জন্য আমাদের প্রতিদিনই হরেক রকম শাকসবজি খেতে হলে কিছু না কিছু শাকসবজি উৎপাদন করা একান্ত প্রয়োজন। আমাদের দৈহিক চাহিদা পূরণের জন্য বেশি করে শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে অপুষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশপাশি দানা জাতীয় খাদ্যের ওপর বাড়তি চাপও কিছুটা কমে যাবে। এজন্য আমরা যদি আমাদের যার যতটুকু সুযোগ আছে সে অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করতে পারি, তাহলে আমাদের পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারব।
কৃষক ভাইয়েরা, আজকাল শাকসবজি চাষ করা বেশ লাভজনক। শাকসবজি চাষের সুবিধে হলো ফসলি জমিতে যেমন উন্নত পদ্ধতিতে শাকসবজি চাষ করা যায়, তেমনি আইল বা রাস্তার ধারে, বসতবাড়ির আনাচে-কানাচে, পুকুর পাড়ে এমনকি বাড়ির আঙিনায়, রান্নাঘরের চালে, দালানের ছাদে, বারান্দার টবে, টিন বা মাটির পাত্রেও অনেক রকমের সবজি  ফলানো সম্ভব। বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এবং গৃহিনীরা বসতবাড়ির সবজি বাগানের সামান্য যতœ নিলে পরিবারের চাহিদা মিটিয়েও বাজারে বিক্রি করলে বাড়তি করলে বাড়তি আয় আসতে পারে। এভাবে ব্যক্তিগত চাহিদাই শুধু পূরণ হবে না বরঞ্চ দেশের সার্বিক চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে।
সামনে আসছে গ্রীষ্মকাল। এ সময়ে বাজারে কিছুটা শাকসবজির ঘাটতি দেখা যায়। তাই আমরা যদি একটু পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ধরনের গ্রীষ্মকালীন সবজির চাষ করি তাহলে সবজির ঘাটতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।


শীতকাল বিভিন্ন শাকসবজি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ সময় নানা ধরনের শাক সবজির চাষ হয়। আর এর উৎপাদন অনেক বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মকালীন সয়ে শাকসবজির চাষ করা একটু কষ্টসাধ্য। কারণ এ সময় রোদ, বৃষ্টি, খরা, শিলাবৃষ্টিসহ নানান ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। সেজন্য একটু সতর্কতার সাথে এ সময় বিভিন্ন সবজির চাষ করতে হয়।


এ মৌসুমে আমরা কী কী সবজির চাষ করতে পারবো সে বিষয়ে আলোচনা করছি। এ সময় গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি, গ্রীষ্মকালীন টমেটো, বরবটি, পটোল, শসা, ঝিঙ্গা, করলা, কাঁকরোল, চিচিংগা, গীমাকলমি, পুঁইশাক, মুখিকচু, মানকচু, মৌলভীকচু, পানিকচু, সজিনা, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া এসবের চাষ করা যায়।
গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি ফাল্গুন-চৈত্র মাস থেকে শুরু করে আশ্বিন মাস পর্যন্ত চাষ করা যায়। তবে আগাম চাষ করতে পারলে বাজারমূল্য বেশি পাওয়া যায়।
শাকসবজি চাষে প্রধান কাজটি হলো জমি নির্বাচন ও জমি তৈরি তা জেনে নিই-
আলো বাতাস চলাচলের সুবিধা, সেচের সুবিধা, অতি বৃষ্টির সময় জমি থেকে পানি বের করার সুবিধে আছে এরকম উর্বর দো-আঁশ মাটি সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত ভালো।
শাকসবজি অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির ফসল। সেজন্য একটু যতেœর সাথে এর চাষ করতে হয়। সবজির জমি খুব মিহি ও ঝুরঝুরেভাবে তৈরি করতে হয়। জমি সমতলভাবে তৈরি করবেন। এজন্য প্রতিটা চাষের পর পরই ভালোভাবে মই দিলে জমিতে বড় কোনো ঢেলা থাকবে না। বেড় করে শাকসবজি চাষের ব্যবস্থা নিলে সেচ ও পরিচর্যার সুবিধা হয়, আর ফলনও বেশি হয়। জমি তৈরির সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব বা আবর্জনা পচা সার দিতে হবে। জমিতে রসের অভাব থাকলে  সেচ দিয়ে ‘জো’ এলে তারপর চাষ মই দিয়ে জমি তৈরি করে বীজ বুনবেন। আবার অনেক রকমের সবজি মাদাতে লাগাতে হয় যেমন- শসা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া এসব। এগুলোর প্যাকেটে চারা তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে মাদা তৈরি করে চারা লাগাতে হয়। চারা লাগানোর পর গাছগুলো বড় হতে থাকলে বাউনি বা মাচা তৈরি করে দিতে হয়। আর হ্যাঁ, মাদাতে চারা লাগানোর আগে পরিমাণমতো সুষম হারে রাসায়নিক সারও দিতে হবে।
শাকসবজি চাষে সারের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে আসুন এবার আমরা সার প্রয়োগ সম্বন্ধে জেনে নেই-
পরিমাণমতো গোবর, টিএসপি, এমপি সার শেষ চাষের সময় ভালোভাবে জমিতে মিশিয়ে দিতে হয়। ইউরিয়া সার চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর প্রথম উপরিপ্রয়োগ করতে হয়। দ্বিতীয় বার উপরিপ্রয়োগ করতে হয় আরও ১৫ দিন পর। লাউ বা কুমড়া জাতীয় অন্যান্য সবজির বেলায় মাদা তৈরি করে প্রতি মাদায় গোবর ১৫ কেজি, সরিষার খেল ৫০০ গ্রাম, ইউরিয়া ২৫০ গ্রাম, টিএপি ২৫০ গ্রাম এবং এমপি ২৫০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়।
শুধু জৈব সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে জৈব সার সঠিকভাবে তৈরি করতে হবে। গোবর বা কম্পোস্ট জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
শাকসবজি চাষে যে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো বীজ বপন/চারা রোপণ-
আধুনিক জাতের ফসলের ভালো বীজ জমিতে উপযুক্ত ‘জো’ অবস্থায় বপন করতে হয়। বীজ বপন বা চারা রোপনের কাজ বিকালে করা ভালো।
এখন আমরা জানব বীজতলায় কী ধরনের যতœ নিতে হবে- গাছের গোড়ায় আগাছা হলেই তা সাথে সাথে তুলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বীজ বপনের পর পরই পিঁপড়া বীজ নিয়ে যেতে না পারে সেজন্য সেভিন পাউডার বীজতলার চারদিকে লাইন করে ছিটিয়ে দিতে হয়।
ফল জাতীয় সবজি যেমন বেগুন, মিষ্টিকুমড়া  এসব গাছে বা থোকায় অতিরিক্ত ফল থাকলে সেগুলো পুষ্টির অভাবে ঠিকমতো বাড়তে পারে না। এতে ফল আকারে ছোট, বিকৃত ও নিম্নমানের হয়। ফল ছোট থাকেই ফল পাতলাকরণের কাজ সম্পন্ন করলে গাছের ফল ধারণ ক্ষমতা বাড়ে।
এখন শুকনো মৌসুম। আমরা জানি বেশিরভাগ সবজির প্রায় ৯০ ভাগই পানি। সেজন্য সবজি ফসলের ভালো বৃদ্ধির জন্যে পানি অপরিহার্য। চারা লাগানোর পর মাঝে মাঝে পানি সেচ দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে মাঝে মধ্যেই বৃষ্টি হয়ে থাকে। ফসলে খুব ভোরে অথবা সন্ধ্যায় সেচ দেয়া উচিত। দুপুর বেলা প্রখর রোদে সেচ দিলে গাছ ঝলসে যায়। তাছাড়া এ সময় পানি বাষ্পীয় হয়ে উড়ে যায় বলে পানির অপচয় বেশি হয়। বসতবাড়ির সবজি বাগানে অল্প পরিমাণ পানি ঘন ঘন প্রয়োগ করতে হয় বলে ঝর্ণা দিয়ে পানি সেচ দেয়া ভালো। সবজি ফসল ২-৩ দিনের বেশি সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। সেচ দেয়ার পর জমিতে পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাাখবেন। প্রতিবার বৃষ্টিপাত বা সেচের পর মাটি শুকিয়ে গেলে উপরের মাটিতে আস্তরণ পড়ে। ‘জো’ আসার সাথে সাথে হাত আঁচড়া, কোদাল বা নিড়ানির সাহায্যে ১-২ ইঞ্চি গভীর করে মাটির স্তর ভেঙে দিতে হবে।
গাছের গোড়ায় আগাছা হলেই তা সাথে সাথে তুলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সবজি চাষের পর মাঝে মাঝে একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন কোন সবজির কী ধরনের যত্ন পরিচর্যার প্রয়োজন।
ঢলে পড়া ও গোড়া পচা রোগ থেকে চারাকে রক্ষার জন্য আগেই মাটি শোধন করা ভালো। চারা গজানোর পর ‘গোড়া পচা’ রোগ দেখা দিলে বীজতলায় পানির পরিমাণ কমাতে হবে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন করে অথবা শুকনো বালি বা ছাই ছিটিয়ে দিয়ে আর্দ্রতা অর্থাৎ পানির পরিমাণ কমানো যেতে পারে। একই সাথে ডাইথেন এম-৪৫ অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড প্রয়োগ করে রোগের বৃদ্ধি রোধ করা যায়।
তাই আসুন কৃষক ভাইয়েরা আমরা একটু চিন্তা-ভাবনা করে বুদ্ধি খাটিয়ে হরেক রকম সবজি চাষে মনোযোগী হই। নিজে লাভবান হই। সে সাথে দেশের সার্বিক পুষ্টি ঘাটতি পূরণে সহায়তা করি।

 

মো. সাহারুজ্জামান*

* এআইসিও, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক অফিস, রাজশাহী

 

বিস্তারিত
গাভীর এনাপ্লাজমোসিস রোগ ও প্রতিকার

এনাপ্লাজমোসিস গরুর একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ। এটি রক্তবাহিত রোগ। এ রোগে রক্তশূন্যতা জন্ডিস ও জ্বরের লক্ষণ দেখা যায়।
 এনাপ্লাজমোসিস বিশেষ করে উষ্ণম-লীয় অঞ্চল, অব-উষ্ণম-লীয় অঞ্চল, আমেরিকা ও আফ্রিকায়
Endemic আকারে দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াতেও এ রোগের সংক্রমণ ঘটে থাকে।  এ রোগে আক্রান্ত গরুর মৃত্যুর হার ৫০% পর্যন্ত হয়ে থাকে। তাছাড়া চিকিৎসা খরচও খুব বেশি। বাংলাদেশে প্রতি বছর এ রোগে আক্রান্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা মূল্যের গাভীর মৃত্যু হয়ে থাকে এবং খামারিরা   অর্থনৈতিকভাবে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। তাই এ রোগের গুরুত্ব অধিক।
 

রোগতত্ত্ব : এ রোগ Anaplasma marginale নামক এক প্রকার রিকেটশিয়া দ্বারা হয়ে থাকে। এই জীবাণু আকারে খুবই ছোট, Spherical আকৃতির কিন্তু সাইটোপ্লাজম নেই। এই জীবাণু লোহিত কণিকার (RBC)  স্ট্রোমা অবস্থান করে। লোহিত কণিকায় প্রবেশের সময় জীবাণুর ডায়ামিটার থাকে ০.২-০.৫/ঁস.বাইওনারি ফিসনের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে Inclusions body- এর ডায়ামিটার ১/ঁস পর্যন্ত হয়ে থাকে। Anaplasma Centrale লোহিত কণিকার কেন্দ্রে অবস্থান করে।
রোগ পরিবহন : এনাপ্লাজমা রোগের জীবাণু সাধারণত ২০ প্রজাতির আঠালি (
Ticks) দ্বারা অসুস্থ গরু থেকে সুস্থ গরুতে পরিবাহিত হয়ে থাকে। তবে বিশেষ করে Boophilus Spp এবং Dermacentor Spp খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরিবাহক।
এনাপ্লাজমা জীবাণু জৈবিকভাবে আঠালির দ্বারা পরিবাহিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে পুরুষ আঠালি এনাপ্লাজমা জীবাণু ছড়িয়ে থাকে। স্ত্রী আঠালি খুব কম পরিমাণে পরিবহন করে থাকে।

Horse flies (Tabanus spp) এবং Stable flies (stomoxys spp) সমভাবে এনাপ্লাজমা রোগের জীবাণু যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ছড়ায়। এই মাছিগুলো যান্ত্রিক বাহক। এ রোগে সংক্রামিত গরুর রক্ত দ্বারা সহজেই যান্ত্রিকভাবে সুস্থ গরুকে বিভিন্ন প্রকার অপারেশন, কাটাছেঁড়া, রক্তপাত, শিংকাটা, খাসি করানো, কানে ট্যাগ করানো  এবং টিকা প্রদানের মাধ্যমে সংক্রামিত হয়ে থাকে।


বাংলাদেশে গরমকালে (মার্চ-নভেম্বর) এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি ঘটে থাকে।
লক্ষণ : এ রোগের তীব্রতা/ মারাত্মকতা গরুর বয়সের ওপর নির্ভর করে। বাছুর গরু খুব মৃদুভাবে আক্রান্ত হয় এবং খুব একটা মারা যায় না। এমনকি ১ বছর বয়সের গরু আক্রান্ত হলে বা লক্ষণ তীব্র হলেও চিকিৎসা দিলে সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক গরুতে এনাপ্লাজমা খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করে। তীব্র রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং মৃত্যুর হার ২০-৫০%। সব প্রজাতির গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়।                                   
আক্রান্ত গরু ঝিমাবে, মনমরা হয়ে থাকবে, ক্ষুধামন্দা, গায়ে জ্বর সাধারণত ১০৪-১০৬ ফারেন হাইট, দুধ উৎপাদন দ্রুত কমে যাবে। রোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে রক্তশূন্যতা দেখা দেবে, উল্লেখযোগ্যভাবে ওজন কমে যাবে, শরীর একদম ভেঙে যাবে, পানিশূন্যতা তীব্রভাবে লক্ষণীয়, জন্ডিস দেখা দিতে পারে, আক্রান্ত গরুকে হাঁটাহাঁটি করালে শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা যাবে, যদি চিকিৎসার পর গরু বেঁচে যায় তবে ধীরে ধীরে সবল হয়ে থাকে। বেঁচে যাওয়া গরু কখনও এ রোগের সারা জীবন বাহক হিসেবে কাজ করে।
রোগ নির্ণয় : আক্রান্ত এলাকায় এ রোগে আক্রান্ত সন্দেহজনক গরুর রক্ত প্রস্রাব ছাড়াই রক্তশূন্যতা দেখা যাবে। কখনও জন্ডিসে লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
রক্ত কাঁচ
Giemsa Stained করলে জীবাণু শনাক্ত করা যাবে, ৫০-৬০% লোহিত কণিকা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। Complement fixation এবং  Indirect FA এবং DNA Probe test করেও রোগ নির্ণয় করা যায়।
আক্রান্ত গরুর লোহিত কণিকা ভেঙে ধ্বংস হয়ে যায়, রক্ত পাতলা পানির মতো দেখায়। প্লিহা ও কলিজা আকারে বড় হয়ে যায়। পিত্তথলি  ফুলে যায়। রক্তশূন্যতা ও জন্ডিস ছাড়াই যদি গরু দ্রুত মারা যায়, সে ক্ষেত্রে তড়কার মতো মৃত গরুর প্লিহা ফোলা/বড় দেখা যাবে।
চিকিৎসা : খুব ফলপ্রসূ চিকিৎসা হলো- টেট্রাসাইক্লিন বিশেষ করে এনাপ্লাজমা জীবাণু রক্তে
(২৬ পৃষ্ঠায় দেখুন)

ডা. মনোজিৎ কুমার সরকার*

* উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, কাউনিয়া, রংপুর

 

বিস্তারিত
অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ

অ্যাকোয়াপনিক্স মূলত মাছ ও সবজি চাষের একটি সমন্বিত পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে মাছের ময়লা তথা দূষিত পানি গাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং স্বচ্ছ পরিষ্কার পানি পুনরায় মাছের ট্যাংকে ফিরে আসে। এ পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী একটি বহুল প্রচলিত বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা যার ক্ষুদ্র ও বৃহৎ যে কোনো পরিসরে বাস্তবায়ন সম্ভব। এতে মাছে ব্যাকটেরিয়া ও গাছ পুনঃসঞ্চালন প্রক্রিয়া তথা পদ্ধতিতে কাজ করে। এখানে লক্ষণীয় যে, এ পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই সবজি উৎপাদন করা যায় এবং আরও উল্লেখ্য যে, এ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া পানির সমুদয় বর্জ্য ময়লা ইত্যাদি তাৎক্ষণিকভাবে দূরীভূত করে, যেভাবে প্রাণীর কিডনি ও লিভার এ কাজটি সম্পন্ন করে থাকে।


একটি পাত্রে কিছু নুড়ি পাথর নিয়ে তাতে প্রয়োজনমতো সবজির চারা রোপণ করা যেতে পারে। অতঃপর উক্ত পাত্রের মধ্যে অ্যাকোরিয়ামের পানি প্রবাহ সৃষ্টি করতে হবে, এটি ক্ষুদ্রায়তনের অ্যাকোয়াপনিক্সের উদাহরণ হিসেবে গৃহীত হতে পারে। অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরও বড় পরিসরের অ্যাকোয়াপনিক্স তৈরি করা সম্ভব। এ প্রক্রিয়ায় মাছের খাদ্য, বিদ্যুৎ খরচও শ্রম  তুলনামূলকভাবে খুবই কম লাগে। এ পদ্ধতিতে অধিক ঘনত্বের মাছের পুকুরের পানি একটি পাম্পের সাহায্যে সামান্য উঁচুতে অবস্থিত ট্যাংকে উত্তোলন করা হয় এবং সেই পানিই সবজি চাষের ট্রের আকারে পুকুরে ফিরে আসে। এর ফলে সবজি প্রাপ্তির পাশাপাশি চাষকৃত পুকুরের পানি পরিশোধিত হয় এবং যথানিয়মে অক্সিজেনের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়।


অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতির সুবিধাগুলো-
১. প্রযুক্তিটি অতি সহজ হওয়ায় বা সামান্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব।
২. অ্যাকোয়াপনিক্স একটি জৈব খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতি। এর মাধ্যমে সুলভ উপাদান ব্যবহার করে উপাদেয় তথা পুষ্টিকর খাদ্য উৎপন্ন করা যেতে পারে।
৩. কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সবজি উৎপাদন সম্ভব।
৪. সবজি উৎপাদনে স্বল্প পরিমাণ পানি দরকার হয়। এতে শুধু বাষ্পীভূত পানিটুকুই ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
৫. পলিথিন দিয়ে ঘর তৈরি করে তাতে সারা বছরই মাছ ও সবজি চাষ করা যায়।
৬. এ পদ্ধতির জন্য তেলাপিয়া মাছই সর্বাধিক উপযোগী। কেননা, এ মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া, অধিক ঘনত্বেও চাষ করা সম্ভব।
উপরন্তু, পানির গুণাগুণে কিছুটা হেরফের হলেও তেলাপিয়ার বৃদ্ধিতে কোনো তারতম্য হয় না। লক্ষ করা গেছে, ২০০০ লিটারের ট্যাংক থেকে ৮ মাসে ১০০-১২০ কেজি তেলাপিয়া উৎপাদন সম্ভব। এর সাথে বছরব্যাপী উল্লেখযোগ্য পরিমাণে টমেটো, লেটুস, কচু ও পুদিনা ইত্যাদি উৎপন্ন করা যায়।
অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষে মাটি ছাড়া স্বল্প পরিমাণ পানি ও জায়গার দরকার হয়। এতে শাকসবজি ফলানোর জন্য অতিরিক্ত সারের কোনো আবশ্যকতা নেই। এ পদ্ধতিতে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষে খরা ও উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চল যথার্থই সহায়ক। এ ক্ষেত্রে মাছের ট্যাংকের অ্যামোনিয়াসমৃদ্ধ পানি গাছের শিকড়ে অবস্থিত ব্যাকটেরিয়া ভেঙে গাছের খাদ্য উপযোগী নাইট্রেটে পরিণত করে এবং পানি দূষণমুক্ত করে পুনরায় মাছের ব্যবহার উপযোগী করে তোলে। এ পদ্ধতিতে বাড়ির আঙিনা, ভবনের ছাদ ও বারান্দা থেকে অতি সহজেই টাটকা শাকসবজি ও মাছ উৎপাদন সম্ভব।
অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিগুলো-


১. পুকুরে মাচা পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে বাঁশের চটি দিয়ে মাচা তৈরি করা হয়। মাচাটি প্রতিটি আধা লিটার পানি ভর্তি চল্লিশটি বোতল দিয়ে ভাসিয়ে রাখতে হয়। অতঃপর বোতলের তলায় অনেক ছিদ্র করে তার মধ্যে নারিকেলের ছোবড়া ও নুড়ি পাথর স্তরে স্তরে সাজিয়ে তাতে সবজির চারা লাগিয়ে মাছের পুকুরে স্থাপন করতে হয়। প্রতিটি মাচায় চারটি করে কচু, পুদিনা, কলমিশাক, ঢেঁড়স ও টমেটোর সর্বমোট ২০টি চারা ব্যবহার করা যায়।
 

২. প্লাস্টিকের ড্রামে পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে প্লাস্টিকের ড্রাম লম্বালম্বিভাবে কেটে অর্ধেক করে নুড়ি পাথর ও মাটি স্তরে স্তরে সাজিয়ে কচু, পেঁপে ও বেগুনের চারা রোপণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে মাছের ট্যাংকের ময়লা পানি পাম্প করে প্রতিদিন দুইবার ড্রামের নুড়ি পাথরের মাঝে সরবরাহ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় গাছের শেকড় প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করে এবং পরিষ্কার পানি পুনরায় মাছের ট্যাংকে ফিরে আসে। এ পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন অন্য যে কোনো পদ্ধতির চেয়ে ফলপ্রসূ ও আশাব্যঞ্জক প্রতীয়মান হয়েছে।


বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) উদ্ভাবিত এ পদ্ধতিতে সবজি চাষের জন্য মাটি ও সারের দরকার না হলেও মাছকে যথানিয়মে খাদ্য সরবরাহ করতে হয়।
এ পদ্ধতিতে খুবই স্বল্প খরচে বাড়ির আঙিনায় মাছ ও শাকসবজি চাষ করে পারিবারিক চাহিদা মেটানো যেতে পারে। লক্ষণীয় যে, মাছ ও সবজি চাষের এ সমন্বিত পদ্ধতি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এতে অধিক ঘনত্বে মজুদকৃত মাছের পুকুরের পানিদূষণ হ্রাস করে মাছের উৎপাদন সন্তোষজনকভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব।


৩. আলনা পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল ভবনের ছাদে আলনায় স্থাপন করা হয়। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি কাঠের আলনায় আনুভূমিকভাবে ৬টি, উপরে নিচে তিন সারিতে ১৮টি এবং উভয় পাশে মোট ৩৬টি বোতল সাজিয়ে রাখা হয়। বোতলগুলোর ছিপির  ভেতরে এক টুকরো স্পঞ্জ দিয়ে তার ওপর নুড়ি পাথর বসিয়ে প্রতি বোতলে দুটি করে সবজির চারা রোপণ করতে হয়। এতে একটি আলনায় ৩৬টি বোতলে ৭২টি চারা লাগানো যায়। এভাবে ৫০০ লিটার পানির ট্যাংকে ৩৫০ লিটার পানি দিয়ে তাতে ৬০টি তেলাপিয়া মাছ মজুদ করা যায়।


৪. গ্যালভানাইজড পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে গ্যালভানাইজড পাত দ্বারা ৫''x২".৫''x১০" আকারের ট্রে তৈরি করে সেখানে পানি নির্গমনের জন্য একটি ৪ ইঞ্চি লম্বা পাইপ স্থাপন করা হয়। অতঃপর পানিভর্তি একটি ট্রের সাহায্যে ভাসমান মাচা পদ্ধতিতে এবং অপর একটিতে নুড়ি পাথর সাজিয়ে সবজি চাষ করা হয়। ট্রেগুলোকে একটি ভাসমান বাঁশের মাচার ওপর রাখা হয়। ভাসমান মাচা পদ্ধতিতে চারটি করে টমেটো, লেটুস ও পুদিনার চারা একটি শোলার পাতের মাঝে রোপণ করা হয়। অপর পক্ষে, নুড়ি পাথরের ট্রেতে কচু, টমাটো, লেটুস ও কলমিশাক রোপণ করে যথানিয়মে মাছের ট্যাংকের পানি সরবরাহ করা হয়। এভাবে আরও কিছু পরিচর্যার পরে লক্ষ করা গেছে, উভয় পদ্ধতিতেই সবজির চারা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়।


দেখা গেছে, মাটিতে উৎপাদিত কচুর তুলনায় বাকৃবি উদ্ভাবিত অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে জন্মানো কচুর বৃদ্ধি প্রায় দশ গুণ বেশি।
স্মর্তব্য যে, ক্রমবর্ধমান গতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের তথা আপামর জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে। সর্বত্র ভেজাল তথা অনিরাপদে খাদ্যের ছড়াছড়ি। এসব খাদ্য খেয়ে নানা রোগব্যাধির কবলে পড়ে মানুষের জীবন সংকটাপন্ন। এছাড়া, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে শাকসবজির উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতির সাহায্যে শাকসবজি ও মাছ উৎপন্ন করে স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকাংশেই হ্রাস করা সম্ভব।

গাভীর এনাপ্লাজমোসিস রোগ ও প্রতিকার
(২৪ পৃষ্ঠার পর)
বংশবিস্তারের আগেই প্রয়োগ করা।
Longacting tetracyclin-200 mg/ml
20 mg/kg body weight- ১/স হিসেবে ৩ দিন পর পর ৪ মাত্রা হিসেবে প্রয়োগ করেও সফলতা পাওয়া গেছে।
Imidocarb dipropionate - এনাপ্লাজমা চিকিৎসায় প্রচুর ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
০ লক্ষণ অনুযায়ী ও সহযোগী চিকিৎসা প্রটোকল দেয়া খুবই জরুরি।
০ ৪-১২ লিটার রক্ত পরিবহন করালে ভালো হয়।
০ শিরা পথে (১/ঠ)
Dexlrose সেলাইন প্রয়োগ করা খুবই উপকারী।
০ কোনো প্রকার কষ্ট, ধকল বা উৎপাত করা যাবে না- এতে গরু শ্বাসকষ্টে মারা যেতে পারে।
০ গরুর আরামের জন্য শরীরে পতঙ্গ বিতাড়ক ওষুধ মাখানো যেতে পারে।
০ পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য দিতে হবে।
নিয়ন্ত্রণ : ১. আঠালি নিধন বা বিতাড়ন করে এ রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো যেতে পারে। এ জন্য
Chemical dusts Ges Spray ব্যবহার করা যেতে পারে।
২. আঠালির বংশবিস্তারের সময়ে/ঋতুতে বিশেষ করে গরম কালে (মার্চ-নভেম্বর) নিয়মিত আঠালিনাশক ওষুধে
dipped, Sprayed বা   inection প্রয়োগ করা যেতে পারে।
৩. অনেক দেশে
attenuated vaccine ব্যবহার করা হয়। আমেরিকাতে Killed vaccine ব্যবহার করে।

 

দলিল উদ্দিন আহমদ*
* প্রাবন্ধিক ও অবসরপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা, প্রযত্নে- মুন ফার্মেসী, ফতুল্লা রেল স্টেশন, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মোবাইল : ০১৭২৪০৫০৪০৩

বিস্তারিত
কবিতা (ফাল্গুন ১৪২২ কৃষিকথা)

দেখতে যদি চাও
মো. ফরহাদ হোসেন*


আমার বাড়ি, খামার বাড়ি, দেখতে যদি চাও
আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে, চরলক্ষ্মীপুর যাও।
দেখবে হেথা পথের ধারে, নামটি হাজী বাড়ি
দখিন পাশে ফুল বাগিচা, থুজা সারি-সারি।
পুকুর পাড়ে কলা-পেঁপে, কচু কলের পাশে
জলের মাঝে সাঁতার কাটে, রুই কাতলা মাছে।
গোয়াল ঘরে গরু আছে, আরও মুরগি-হাঁস
শিমুল, জারুল, মেহগনি, পশ্চিমে তার বাঁশ।
পুবে আছে আমড়া-ডালিম, আম-চালতা ও লিচু
বছরজুড়ে সব সময়ই, সবজি থাকে কিছু।
বাঁশের ছায়ে আদা-হলুদ, রোদে সবজি-ফল
সার হিসেবে লাগাই কাজে, মুরগি গরুর মল।
আমার বাড়ি, খামার বাড়ি, গাছ-গাছালি যত
ডাকছে তোমায় আপন করে, ডাকছে অবিরত॥


শেষ সম্বল কৃষি
মো. জুন্নুন আলী প্রামানিক**

বেকার আসে কৃষির কাছে চাকরি যখন নাই,
খুঁজিয়ে ফেরে বয়স বাড়ে গন্তব্য কৃষিতে তাই।
কৃষির পাশে দাঁড়িয়ে শেষে হতাশ জীবন কাটে,
আয়ের পথ কঠিন শ্রমে ভাবনা সজীব মাঠে।
নতুন সব লোকের দেখা প্রচুর পাখির গানে,
স্বাগত দিতে কুণ্ঠিত নয় সোহাগ জানায় কানে।
কলম ছেড়ে লাঙল ধরে মাটিকে সালাম দেয়,
শীতল মাটি পরম যত্নে জড়িয়ে কোলায় লয়।
আদর করে সবুজ ঘেরা তরুণ ধানের চারা,
ভুলিয়ে দিতে দুঃখ কষ্ট বিশুদ্ধ বায়ুর সাড়া।
ছুটিয়ে আসে গুছিয়ে দিতে মাথার আউলা চুল,
চলার পথে সহসি হতে থাকে না সন্দেহ ভুল।
হঠাৎ কাজে আদুরে সোনা বাবার মায়ের ধন,
চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে ভীষণ বেজার মন।
আগের দিন এখন নেই খাটুনি বাড়ায় কাবু,
সম্বল কৃষি উদ্বিগ্ন বেশি বিপাকে শিক্ষিত বাবু।
আয়ের পথ খুঁজতে বাড়ে বয়স বহুত গুণে,
বিবাহ করে সন্তান পায় ঝামেলা দ্বিগুণ প্রাণে।
সঠিকভাবে চলতে বাধা বাঁচার উপায় কৃষি,
সীমিত আয়ে মেটে না ব্যয় নীরব মুখের হাসি।
বিপুল আশা থামিয়ে যায় জমিও অনেক কম,
পিতাও জব্দ মাতাও ক্ষুব্ধ কেউই দেয় না দাম।
বাঁচার জন্য লড়াই চলে বিচিত্র ফসল চাষে,
বইতে পড়া সুপথ গুলে সহায় জানায় এসে।
অজান্তে যে সকল শস্য ফলিয়ে তাহাকে ডাকে,
সকল ব্যথা ঘুঁচিয়ে যায় সময় যাবার ফাঁকে॥

 

আদর্শ চাষি
মোহাম্মদ নূর আলম গন্ধী***

আদর্শ চাষি আদর্শ জ্ঞানের হয়
ফসল আবাদের সব, তার জানা রয়।
আদর্শ পদ্ধতিতে করে জমি চাষ
ফলায় মাঠে দানা শস্য, সবজি, আদা, হলুদ, মাস।
আদর্শ পদ্ধতিতে করে বীজতলা
চারা হয় সুস্থ সবল,
মাঠে করে সুষম সার ব্যবহার
ফলে ফসলের ফলন বাম্পার।     
ধানের জমিতে দেয় পুঁতে পার্চিং
ফিঙ্গে শালিক পাখি ধরে খায় মাঠের পোকা,
কীটনাশক ব্যবহার করে না অযথা।
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি করে গ্রহণ
কীটনাশকের অযথা ব্যবহার নেই প্রয়োজন।
সবজি জমিতে দেয় ঝুলিয়ে সেক্স ফেরোমন
বিষমুক্ত সবজি খেয়ে সুস্থ দেহ ও মন।
এ ডব্লিউ ডি পদ্ধতিতে বোরো জমিতে দেয় সেচের পানি
জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করে, সমৃদ্ধি আনি।
ক্ষেতের আইলে করে সবজি চাষ
গড়ে তোলে বন্ধু পোকার আশ্রয় ও নিবাস।
জৈব সার সঠিক পদ্ধতিতে করে সংরক্ষণ
পুষ্টি গুণে ভরা মাটির স্বাস্থ্য,
ফসলের অধিক ফলন।
মাঠের ফসল নিয়মিত করে পর্যবেক্ষণ
রোগ পোকার আক্রমণ, হয় না যখন তখন।
আদর্শ চাষি আদর্শ জ্ঞানের হয়
ফসল আবাদের আধুনিক কলাকৌশল,
তার জানা রয়॥


*উপজেলা কৃষি অফিসার, কাউখালী, পিরোজপুর; **শিক্ষক (বিএবিএড), গ্রামÑ বিদ্যাবাগিশ, ডাকঘর ও উপজেলাÑ ফুলবাড়ী, জেলাÑ কুড়িগ্রাম; ***উপসহকারী কৃষি অফিসার, উপজেলা কৃষি অফিস, কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (ফাল্গুন ১৪২২ কৃষিকথা)

মো. ফিরোজ
রংপুর

প্রশ্ন : স্ট্রবেরি চাষের জন্য কোন ধরনের মাটি উপযোগী।
উত্তর : স্ট্রবেরি মূলত শীতপ্রধান অঞ্চলের ফসল। ফুল ও ফল আসার সময় শুকনো আবহাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় রবি মৌসুম স্ট্রবেরি চাষের উপযোগী। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় সব মাটিতেই স্ট্রবেরি চাষ করা যায়। পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন উর্বর দো-আঁশ থেকে বেলে দো-আঁশ মাটি স্ট্রবেরির জন্য বেশি উপযুক্ত। মাটির অম্লমান ৫.৬-৬.৫ স্ট্রবেরি চাষের জন্য উত্তম এবং জৈব পদার্থ কমপক্ষে ৩% থাকা উচিত।


মো. জমির শাহ
দিনাজপুর

প্রশ্ন : পটোল গাছের কাণ্ড ও পাতায় কালো বা বাদামি রঙের ক্ষত হয় এবং পরে কাণ্ড ও পাতা শুকিয়ে যায়। প্রতিকার জানাবেন।
উত্তর : এ রোগটি পটোল গাছের ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগ দ্বারা আক্রান্ত গাছ নষ্ট বা পুড়ে ফেলতে হবে। রোগমুক্ত গাছ থেকে শাখা কলম (কাটিং) সংগ্রহ করা। শাখা কলম কার্বেনডাজিম (ব্যাভিস্টিন) ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে শোধন করা। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে টপাসন এম ২ গ্রাম ০.৫ মিলি প্রোপিকোনাজল (টিল্ট) বা ২ গ্রাম ডাইথেন এম ৪৫ স্প্রে করতে হবে।


রুবেল ইসলাম
দিনাজপুর

প্রশ্ন : কচি লাউয়ের নিচের দিকে পচন হয়। ধীরে ধীরে পুরো লাউটা পচে যায়। কী করণীয়?
উত্তর : সাধারণত অম্লীয় মাটিতে ক্যালসিয়াম এর অভাবে এ জাতীয় রোগ দেখা যায়। এজন্য যা করণীয় তা হলোÑ
০ পরিমিত সেচ প্রদান করা,
০ প্রতি গর্ত বা পিট এ ৫০ থেকে ৮০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করা,
০ পরবর্তীতে জমি প্রস্তুতের সময় মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার ব্যবহার করা,
০ অম্লীয় মাটিতে শতাংশ প্রতি চার কেজি ডলোচুন প্রয়োগ করা,
০ একই জমিতে বার বার একই জাতীয় সবজি আবাদ না করা।

 

দেবেশ রায়
ঠাকুরগাঁও

প্রশ্ন : আম গাছে ছোট ছোট পোকা দেখা যায় এবং মুকুল ঝরে যায়। কী করণীয়?
উত্তর : সাধারণত আমগাছে হপার পোকার আক্রমণ বেশি হয়, যা মুকুলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ছোট ছোট হপার পোকা এবং অ্যানথ্রাকনোজ রোগের আক্রমণে মুকুল ঝরে যায়। এর জন্য যা করণীয় তা হলো-
০ মুকুল আসার পর এবং ফুল ফোটার আগে অর্থাৎ পুষ্পমঞ্জরির দৈর্ঘ্য যখন ৫-১০ সেমি. হয় তখন প্রতি লিটার পানিতে সাইপারমেথ্রিন ১০ ইসি (রিপকর্ড/সিমবুশ/ফেনম) ১ মিলি. এবং টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলি. হারে একবার এবং তার একমাস পর আরেক বার গাছের পাতা, ডালপালা মুকুল ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করা।

 

আইয়ুব আলী
ফুলবাড়ি, কুড়িগ্রাম

প্রশ্ন : বেগুন গাছে পোকার আক্রমণের কারণে গাছের ডগা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিকার জানাবেন।
উত্তর : ১. বিষাক্ত কীটনাশকের প্রয়োগ বন্ধ করে সীমিত ব্যবহার করতে হবে।
২. আক্রান্ত ডাল নষ্ট করতে হবে।
৩. সবিক্রন ২৫০ ইসি ২ মিলি. লিটার পানিতে মিশিয়ে অথবা রিপকর্ড ১ মিলি. লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

 

কামাল
নীলফামারী

প্রশ্ন : আমার ক্ষেতের ভুট্টা গাছের বয়স ১.৫ (দেড়) মাস কিন্তু গাছের বাড়-বাড়তি তেমন নেই। করণীয় কী?
উত্তর : ১. আগাছা ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
২. জমি ও মাটির প্রকারভেদ ৩টি বার সেচ দেয়া প্রয়োজন। বীজ গজানোর ৩০-৩৫ দিন পর প্রথম সেচ এবং দ্বিতীয় সেচ ৬০-৬৫ দিন (ফুল আসার আগে) পর দিতে হবে। জমিতে রসের পরিমাণ কম হলে তৃতীয় সেচ ৮৫-৯০ দিন পর (দানা বাঁধতে শুরু হলে) দিতে হবে।
৩. প্রতি বিঘায় ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংকসালফেট, বোরিক এসিড এবং গোবর সার উপযুক্ত পরিমাণে প্রয়োগ করলে গাছের বাড়-বাড়তি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

 

মো. ওবাইদুল
বগুড়া

প্রশ্ন : গবাদিপশুর কৃমি দমনে কী করণীয়?
উত্তর : গবাদিপশু যেমন গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার বিভিন্ন ধরনের রোগের মধ্যে পরজীবী একটি ক্ষতিকর রোগ। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু পরজীবীর বংশ বিস্তারে সহায়ক বলে বাংলাদেশের গবাদিপশুতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি এবং এ রোগের কারণে প্রতি বছর প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। গবাদিপশুতে পরজীবীর ডিম বা লার্ভা খাদ্যের সাথে বা দেহ ত্বক ভেদ করে দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করে।


অনেক সময় মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় পশু পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। পরজীবী গবাদিপশুর জন্য সর্বদাই ক্ষতিকর। এরা পশুর দেহের রক্ত শুষে খায় এবং খাদ্য ও পুষ্টির মধ্যে ভাগ বসায়। এছাড়া, পরোক্ষভাবেও এসব পরজীবী বিভিন্ন পরিপাকযোগ্য খনিজ শুষে নেয়। এর ফলে পশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কৃমিনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রের অন্যান্য উপকারী অনুজীব ধ্বংস না করে পরজীবীর ধ্বংস সাধনই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।


কৃমিনাশক প্রয়োগ পদ্ধতি
ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরজীবীনাশক যে কোনো উৎকৃষ্টমানের ওষুধ বাজার থেকে সংগ্রহ করতে হবে। কৃমিনাশক প্রয়োগের জন্য বছরে দুইটি  কৌশলগত মাত্রা প্রত্যেকটি পশুর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। একটি মাত্রা শরতের শেষে (নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে) অন্যটি বর্ষার শুরুতে (মে-জুন মাসে) প্রয়োগ করতে হবে।


কৃমিরোগ প্রতিরোধের কর্মপন্থাগুলো :
০ পরজীবী বহুল এলাকায় প্রথমে সব গবাদিপশুকে পরজীবীর জন্য সর্বাত্মক চিকিৎসা (
Mass treatment) দিতে হবে।
০ এর পর নিয়মিতভাবে বছরে অন্তত দুইবার বর্ষার প্রারম্ভে (মে-জুন) এবং শরতের শেষে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) গবাদি পশুতে কৃমিনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
০ জলজ স্যাঁতসেঁতে এলাকায় গবাদিপশু চরানোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
০ সংক্রমণক্ষম পরজীবীর লার্ভা দূরীকরণে কাটা ঘাস বা জলজ উদ্ভিদ ভালোভাবে ধৌত করতে হবে। খড় বা সাইলেজ তৈরি করে খাওয়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়।
০ রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে মাঠে বা অন্য এলাকায় এক সাথে গবাদিপশু চরানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
০ বাংলাদেশের সেসব এলাকায় ব্যাপক পরজীবী আক্রমণের আশংকা আছে সেখানে গবাদিপশুর জন্য আবদ্ধ পালন (
Stall-Feeding) পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
০ গবাদিপশুর গোবর স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ব্যবহার করতে হবে।
০ গবাদিপশুর খামারের পাশে বা গ্রামে যে সব জলাবদ্ধ এলাকা রয়েছে সেখানে শামুক নিধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা বা সেসব এলাকায় গবাদিপশু চরানো বন্ধ রাখার জন্য বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়া যেতে পারে।
০ গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য খাবারের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করতে হবে।

 

উপকারিতা
বেশিরভাগ কৃমিনাশকই ব্যয়বহুল নয়। পশুতে কৃমিনাশক প্রয়োগ করলে তা পশুপালনকারীর জন্য খুবই সুফল বয়ে আনে। দেখা গেছে ব্যয়ের তুলনায় লাভের আনুপাতিক হার ১:১০ অর্থাৎ কোনো কৃষক যদি কৃমিনাশকের জন্য ১ টাকা ব্যয় করে তবে সে দুধ ও মাংস বাবদ ১০ টাকা আয় করবে। পরিবেশের ওপর কোনো প্রকার বিরূপ প্রভাব নেই বরং কৃমিনাশক পরিবেশকে পরজীবীর ডিম ও লার্ভা মুক্ত রেখে পশু ও মানুষকে পরজীবী মুক্ত রাখতে সহায়তা করে।


সংরক্ষণ ও সতর্কতা
সঠিক মাত্রায় কৃমিনাশক প্রয়োগ করা হলে এর দ্বারা কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। এটা মানুষের জন্য একটি বিষাক্ত ওষুধ। সুতরাং অবশ্যই শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।


কাক্ষিত ফলাফল
পরজীবী মুক্তকরণের এ কৌশলটি নিয়মিতভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে পশুকে পরজীবী মুক্ত রাখলে এদের উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যায়, যা কৃষকের প্রান্তিক আয়কে বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। ফলে কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার মাধ্যমে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় হয়।


ইসমাইল হোসেন
পাবনা

প্রশ্ন : পুকুর তৈরির সময় এবং মাছ থাকা অবস্থায় সার প্রয়োগের মাত্রা কেমন হবে?
উত্তর : পুকুরে মাছের প্রাকৃতিক খাবার উৎপাদনের জন্য সাধারণত সার ব্যবহার করতে হয়। তাছাড়া পানির গুণাগুণ রক্ষায় প্রয়োজনমতো সার ব্যবহার করতে হয়।
পুকুর তৈরির সময় : প্রতি শতাংশে ইউরিয়া ১৫০ গ্রাম, টিএসপি ১০০ গ্রাম, এমপি ২৫ গ্রাম, গোবর ৮-১০ কেজি অথবা কম্পোস্ট সার ১০-১৫ কেজি।
মাছ থাকা অবস্থায় : প্রতি শতাংশে ইউরিয়া ১০-২০ গ্রাম, টিএসপি ৫-১০ গ্রাম, গোবর ৪-৫ কেজি অথবা কম্পোস্ট সার ৮-১০ কেজি।
মজুদপূর্ব অবস্থায় : প্রতি শতাংশে ইউরিয়া ১০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০ গ্রাম, গোবর ৮-১০ কেজি।
মজুদ পরবর্তী অবস্থায় : প্রতি শতাংশে ইউরিয়া ১০ গ্রাম, টিএসপি ৬ গ্রাম, গোবর ১০০-১৫০ গ্রাম হারে ২ দিন পর পর পানির রঙের ওপর  নির্ভর করে প্রয়োগ করতে হবে।

 

মো. মিনহাজ
ময়মনসিংহ

প্রশ্ন : মাছ চাষের আদর্শ পুকুরের গভীরতা এবং আয়তন কত হওয়া বাঞ্ছনীয়?
উত্তর : বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষে পুকুরের আয়তন ১০ শতক থেকে ১০০ শতক (এক একর) হলে ভালো হয়। একটি অত্যধিক বড় আয়তনের পুকুরের চেয়ে এক সঙ্গে কয়েকটি ছোট পুকুর হলে বেশি ভালো হয়। এতে সার্বিক ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। পুকুরে পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধা থাকতে হবে। পানির গভীরতা সাধারণত ৫-৭ ফুট হতে হবে। পানি শুকিয়ে গেলে পুনরায় পানি সরবরাহ করতে হবে। দুই বা ততোধিক প্রজাতির মাছের চাষ করা উত্তম।


আতিকুল আলম
রাজশাহী

প্রশ্ন : ঘের এর প্রস্তুত প্রণালি সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : ঘের শুকিয়ে তলদেশের পচা কাদা অপসারণ এবং তলদেশ সমান করতে হবে। পাড় উঁচু করে বাঁধতে হবে। ঘেরের পাড়সহ তলায় চুন ভালোভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে প্রতি শতকে ১ কেজি হারে। ঘেরের তলদেশ চাষ দিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। ছোট মেসসাইজের লাইন জাল দিয়ে ঘেরের চারপাশে বেড়া (৩ ফুট উঁচু) দিতে হবে। পানি প্রবেশ পথ ও জরুরি পানি নির্গমন পথ করতে হবে এবং তাতে স্ক্রিন বা বানা (বাঁশের পাটা ও নাইলনের জাল দিয়ে তৈরি) দিতে হবে। চুন প্রয়োগের ৫-৭ দিন পরে প্রয়োজনমতো পানি প্রবেশ করিয়ে সার প্রয়োগ করতে হবে ইউরিয়া ১৫০-২০০ গ্রাম/ শতক, টিএসপি ৭৫-১০০ গ্রাম/শতক হারে। এরপর ব্লিচিং পাউডার সমস্ত ঘেরে ছিটিয়ে দিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে হবে। অনেক সময় ঘেরের এককোণায় বাঁশের ফ্রেমের সাথে একটি নার্সারি তৈরি করতে বলা হয়। হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা বা গোবর ব্যবহার করা যাবে না।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ*
*সহকারী তথ্য অফিসার (শস্য উৎপাদন), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
চৈত্র মাসের কৃষি (ফাল্গুন ১৪২২ কৃষিকথা)

চৈত্র বাংলা বছরের শেষ মাস। কিন্তু কৃষির শেষ বলে কিছু নেই। এ মাসে রবি ফসল ও গ্রীষ্মকালীন ফসলের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এক সঙ্গে করতে হয় বলে বেড়ে যায় কৃষকের ব্যস্ততা। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, কৃষিতে আপনাদের শুভ কামনাসহ সংক্ষিপ্ত শিরোনামে এ মাসে কৃষিতে কী কী গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করতে হবে আসুন তা জেনে নেই।
বোরো ধান

  • যারা শীতের কারণে দেরিতে চারা রোপণ করেছেন তাদের ধানের চারার বয়স ৫০-৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। ক্ষেতে গুটি ইউরিয়া দিয়ে থাকলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে না।
  • সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে।
  • এলাকার জমিতে যদি সালফার ও দস্তা সারের অভাব থাকে এবং জমি তৈরির সময় এ সারগুলো না দেয়া হয়ে থাকে তবে ফসলে পুষ্টির অভাবজনিত লক্ষণ পরীক্ষা করে শতাংশপ্রতি ২৫০ গ্রাম সালফার ও ৪০ গ্রাম দস্তা সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
  • ধানের কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত ক্ষেতে ৩-৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে।
  • পোকা দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আলোর ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে, উপকারী পোকা সংরক্ষণ করে, ক্ষেতে ডাল-পালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে ধানক্ষেত বালাইমুক্ত করতে পারেন।
  • এসব পন্থায় রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে শেষ উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
  • এ সময় ধান ক্ষেতে উফরা, ব্লাস্ট, পাতাপোড়া ও টুংরো রোগ দেখা দেয়।
  • জমিতে উফরা রোগ দেখা দিলে যে কোনো কৃমিনাশক যেমন ফুরাডান ৫ জি বা কিউরেটার ৫ জি প্রয়োগ করতে হবে।
  • ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে এবং শতাংশপ্রতি ১.৬ গ্রাম ট্রপার বা জিল বা নেটিভ ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে দুইবার প্রয়োগ করতে হবে।
  • জমিতে পাতা পোড়া রোগ হলে অতিরিক্ত ১.৫ কেজি/শতাংশ হারে পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে এবং জমির পানি শুকিয়ে ৭-১০ দিন পর আবার সেচ দিতে হবে।
  • টুংরো রোগ দমনের জন্য এর বাহক পোকা সবুজ পাতা ফড়িং দমন করতে হবে।

গম

  • দেরিতে বপন করা গম পেকে গেলে কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে।
  • শুকনো বীজ ছায়ায় ঠাণ্ডা করে প্লাস্টিকের ড্রাম, বিস্কুটের টিন, মাটির কলসি ইত্যাদিতে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।

ভুট্টা (রবি)

  • জমিতে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে এবং পাতার রঙ কিছুটা হলদে হলে মোচা সংগ্রহ করতে হবে।
  • বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে শুকনো আবহাওয়ায় মোচা সংগ্রহ করতে হবে।
  • সংগ্রহ করা মোচা ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।
  • ভুট্টার দানা মোচা থেকে ছাড়ানো অনেক কষ্টের কাজ। অনেকে এ কাজটি হাত দিয়ে করে থাকেন। খুব অল্প খরচে ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র কিনে অনায়াসে মোচা থেকে ভুট্টা ছাড়াতে পারেন।

ভুট্টা (খরিফ)

  • গ্রীষ্মকালীন ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এখনই বীজ বপন করতে হবে।
  • শতাংশপ্রতি ১০০-১২০ গ্রাম বীজ লাগবে।
  • প্রতি শতাংশ জমিতে ইউরিয়া ৩৬৫ গ্রাম, টিএসপি ২২২ গ্রাম, এমওপি ১২০ গ্রাম, জিপসাম ১৬০ গ্রাম এবং দস্তা সার ১৬ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে ।

পাট

  • চৈত্র মাসের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপন করা যায়। পাটের ভালো জাতগুলো হলো ও-৯৮৯৭, ওএম-১, সিসি-৪৫, বিজেসি-৭৩৭০, সিভিএল-১, এইচসি-৯৫, এইচ এস-২৪। স্থানীয় বীজ ডিলারদের সাথে যোগাযোগ করে জাতগুলো সংগ্রহ করতে পারেন।
  • পাট চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করে আড়াআড়িভাবে ৫-৬টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে।
  • সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশে ১৭ থেকে ২০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। তবে ছিটিয়ে বুনলে ২৫-৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়।
  • পাটের জমিতে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৭-১০ সেন্টিমিটার রাখা ভালো।
  • ভালো ফলনের জন্য শতাংশপ্রতি ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৬০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমওপি সার শেষ চাষের সময় মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। জমিতে সালফার ও জিংকের অভাব থাকলে জমিতে সার দেয়ার সময় ৪০০ গ্রাম জিপসার ও ২০ গ্রাম দস্তা সার দিতে হবে।
  • চারা গজানোর ১৫ থেকে ২০ দিন পর শতাংশপ্রতি ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করেত হবে। এর ৩০ থেকে ৪০ দিন পর দ্বিতীয়বারের মতো শতাংশপ্রতি ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করেত হবে।

অন্যান্য মাঠ ফসল

  • রবি ফসলের মধ্যে চিনা, কাউন, আলু, মিষ্টিআলু, চীনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন যদি এখনো মাঠে থাকে তবে দেরি না করে সাবধানে তুলে ফেলতে হবে।
  • কাটা/তোলা, বাছাই, মাড়াই, পরিষ্কার, শুকানো এবং সংরক্ষণসহ প্রতিটি ধাপে লাগসই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করলে খরচ কমে যাবে, লাভ বেশি হবে।
  • এ সময়ে বা সামান্য পরে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পচনশীল ফসল সেজন্য তাড়াতাড়ি কেটে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।

শাকসবজি

  • গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি চাষ করতে চাইলে এ মাসেই বীজ বপন বা চারা রোপণ শুরু করতে হবে।
  • সবজি চাষে পর্যাপ্ত জৈবসার ব্যবহার করতে হবে।
  • এসময় গ্রীষ্মকালীন টমেটো, ঢেঁড়স, বেগুন, করলা, ঝিঙা, ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, শসা, ওলকচু, পটোল, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, লালশাক, পুঁইশাক এসব চাষ করতে পারেন।

গাছপালা

  • এ সময় বৃষ্টির অভাবে মাটিতে রসের পরিমাণ কমে আসে। এ অবস্থায় গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • আম গাছে হপার পোকার আক্রমণ হলে অনুমোদিত কীটনাশক যেমন-সিমবুস/ফেনম/ ডেসিস ২.৫ ইসি প্রভৃতি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার পূর্বেই একবার এবং এর একমাস পর আর একবার প্রতি লিটার পানির সাথে ১.০ মিলি সিমবুস/ফেনম/ডেসিস ২.৫ ইসি মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।
  • এ সময় আমে পাউডারি মিলডিউ ও অ্যান্থাকনোজ রোগ দেখা দিতে পারে। টিল্ট, রিডোমিল গোল্ড বা ডায়থেন এম ৪৫ অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
  • কলা বাগানের পার্শ্ব চারা, মরা পাতা কেটে দিতে হবে।
  • পেঁপের চারা রোপণ করতে পারেন এ মাসে।
  • নার্সারিতে চারা উৎপাদনের জন্য বনজ গাছের বীজ বপন করতে পারেন।
  • যাদের বাঁশ ঝাড় আছে তারা বাঁশ ঝাড়ের গোড়ায় মাটি ও জৈব সার প্রয়োগ করতে পারেন।

প্রাণিসম্পদ

  • শীতকাল শেষ হয়ে গরম পড়ার সময়টিতে পোলট্রি খামারি ভাইদের বেশ সর্তক থাকতে হবে। কারণ শীতকালে মোরগ-মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। সে কারণে রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। তাই আগ থেকেই টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই এর অভাব দেখা দিতে পারে। সেজন্য খাবারের সাথে ভিটামিন সরবরাহ করতে হবে।
  • তাপমাত্রার বৃদ্ধি ও কমে যাওয়ার কারণে বিরূপ আবহাওয়ায় মোরগ-মুরগীর খাবার গ্রহণেও অনীহা দেখা দেয়।
  • চৈত্র মাসে বেশ গরম পড়ে, তাই গবাদিপশুর এ সময় বিশ্রামের প্রয়োজন। আপনার গবাদিপশুকে ছায়ায় রাখতে হবে এবং বেশি বেশি পানি খাওয়াতে হবে, সেই সাথে নিয়মিত গোসল করাতে হবে।
  • গবাদিপশুর গলাফুলা, তড়কা, বাদলা রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

মৎস্যসম্পদ

  • মাছের আঁতুড় পুকুর তৈরির কাজ এ মাসে শেষ করতে হবে।
  • পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে নিচ থেকে পচা কাদা তুলে ফেলতে হবে এবং শতাংশপ্রতি ১ কেজি চুন ও ১০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করতে হবে।
  • পানি ভর্তি পুকুরে প্রতি শতাংশে ৬ ফুট পানির জন্য ১ কেজি চুন গুলে ঠাণ্ডা করে দিতে হবে।

সুপ্রিয় পাঠক প্রতি বাংলা মাসেই কৃষিকথায় কৃষি কাজের জন্য অনুসরণীয় শিরোনামে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়ে থাকে। এগুলোর বিস্তারিত ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণের জন্য আপনার কাছের কৃষি বিশেষজ্ঞ, মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে জেনে নিতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত প্রয়াসে, আন্তরিকতায়, শ্রমে, যথার্থ বিনিয়োগে উন্মোচিত হবে একটি স্থায়ী সমৃদ্ধ কৃষি ভুবন। আপনাদের সবাইকে নববর্ষের অগ্রিম শুভেচ্ছা। য়
 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*

* তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত

Share with :
Facebook Facebook