কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

কৃষিকথা : অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

চাষের কথা চাষির কথা
পাবেন পড়লে কৃষিকথা

 স্লোগানটির মর্মার্থ উপলব্ধি করলেই বুঝতে পারি ‘কৃষিকথা’ তার জন্মলগ্ন থেকেই কৃষির আধুনিক কলাকৌশলকে কৃষকের জীবনের সাথে যোগসূত্র স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। কৃষিকথা কৃষি গবেষণালব্ধ ফলাফল চাষিভাইদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সেতুবন্ধনের কাজ করছে। কৃষিকথা কৃষক সমাজের কাছে অতি সুপরিচিত একটি নাম। এটি সুদীর্ঘ ৭৪ বছরের ঐতিহ্যবাহী ম্যাগাজিন। বৈশাখ-১৪২২ কৃষিকথা ৭৫ বছরে পদার্পণ করল। কৃষিকথা শুধু কৃষি তথ্য সার্ভিসই নয় কৃষি জগতের একটি গর্বিত পত্রিকা।
 

কৃষিকথার প্রাক ইতিহাস
এখন আমরা যে কৃষিকথা দেখছি তার পূর্বসূরি হলো ‘কৃষি সমাচার’। তৎকালীন বঙ্গীয় কৃষি বিভাগ ১৯২১ সনের মার্চ মাসে কৃষি সমাচার নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে। তখন এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৩৩। নিবন্ধ, গল্প, খবর, ব্যক্তিগত সংবাদ, হাঁস-মুরগি পালন ও কৃষি তথ্যাদিতে পরিপূর্ণ থাকত পত্রিকাটি।


কৃষিকথার জন্ম
কৃষি সমাচার ১৯৩৯ সনে রূপ নেয় কৃষিকথা হিসেবে। তখন দ্বিমাসিক ভিত্তিতে প্রকাশ করা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অধিক খাদ্য ফলাও অভিযান শুরু হলে কৃষিসংক্রান্ত প্রচার, প্রপাগাণ্ডা জোরদার করা হয়। ফলে ১৯৪১ সন থেকে কৃষিকথা মাসিকে রূপান্তরিত হয়। সে হিসাবে কৃষিকথার জন্ম সন ধরা হয় ১৯৪১। এ জন্ম সন ধরেই কৃষিকথার প্রকাশকাল গণনা করা হচ্ছে। সে অনুযায়ী কৃষিকথা এখন ৭৫ বছর বয়সে পদার্পণ করেছে।


বিনামূল্যে কৃষিকথা
বঙ্গীয় কৃষি বিভাগের সরকারি প্রেস আলীপুর কলকাতা থেকে কৃষিকথা ছাপা হতো। এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন এস এন ব্যানার্জি (১৯৪১-৪৩)। তখন কৃষিকথায় নিবন্ধ, কবিতা, নাটিকা, চিঠিপত্র, জেলার কথা, কৃষিপঞ্জি এসব লেখা স্থান পেত। তখন কৃষিকথার কোন মূল্য ধরা হয়নি। ১৯৪৪-৪৫ সন থেকে মূল্য ধরা হয়। ওই সময় বার্ষিক চাঁদার হার ছিল মাত্র এক টাকা।


কৃষিকথা নিয়ে বিতর্ক
১৯৪৭ সনে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর কৃষিকথা ভাগাভাগি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ডাইরেক্টরেট অব বেঙ্গল কর্তৃক কলকাতা রাইটার্স বিল্ডিং থেকে কৃষিকথা প্রকাশ হয়ে আসছিল। স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গ কৃষিকথা ধরে রাখতে চায়। অপরদিকে পূর্ববঙ্গও কৃষিকথা পাওয়ার দাবি করে বসে। এ প্রসঙ্গে একটা সুন্দর নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। তাহলো  যে বঙ্গে গ্রাহক সংখ্যা বেশি হবে সে বঙ্গই এটা পাবে। সৌভাগ্যবশত পূর্ববঙ্গে গ্রাহক সংখ্যা বেশি বলে প্রমাণিত হয়। সেই সুবাদে কৃষিকথা পূর্ববঙ্গের ভাগে পড়ে। আজ ৭৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সম্মানিত গ্রাহক ভাইদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।


পাক আমলে কৃষিকথা
দেশ ভাগের পর কৃষিকথা পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে পড়লে সরকারের ডাইরেক্টরেট অব এক্সটেনশন অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপম্যান্ট, ইস্ট পাকিস্তান, ইডেন বিল্ডিং ঢাকা থেকে পাবলিক রিলেশন অফিসার কর্তৃক প্রকাশিত হতে থাকে। তখন দ্য স্টার প্রেস শেখ সাহেব বাজার লেন ঢাকা থেকে ছাপা হতো। ১৯৪৮ সনে কৃষিকথার সম্পাদক ছিলেন আ. হামিদ ও ১৯৫০ সনে মো. মোস্তফা আলী। তখন চাঁদার পরিমাণ ছিল বার্ষিক ২ টাকা।


কৃষি তথ্য সার্ভিসের জন্ম ও কৃষিকথা
কৃষি তথ্য সংস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার ভার পড়ে মোস্তফা আলীর ওপর। পরিকল্পনাটি ২১ বার রিভাইজ করা হয়। সবচেয়ে বড় বাধা আসে জনসংযোগ বিভাগ থেকে। তাদের বক্তব্য হলো- ‘প্রচার কাজ তো আমরাই করছি।’ পরে এক মজার ঘটনা ঘটে এবং জাদুর মতো পরিকল্পনা পাস হয়ে যায়। ওই সময়  আলী আজগর ছিলেন অতিরিক্ত চিফ সেক্রেটারি (প্ল্যানিং)। তিনি আলী সাহেবকে প্রশ্ন করেন
Why are you here? উত্তরে আলী সাহেব বললেন, I have a scheme। পরে প্রশ্ন করলেন What’s that ? আলী সাহেব উত্তর দিলেন Agriculture Information Service, আজগর সাহেব বলেন, ‘Publicity is there’। আলী সাহেব তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন- publicity deals with the public in the city and Agricultural Information Service will deal with the people in the village. আজগর সাহেব সাথে সাথে বলে দিলেন ‘Your Scheme is approved, You go. মিটিংয়ে সবাইকে অবাক করে আলী সাহেব হাসিখুশি ভরা মনে ফিরে আসলেন।


১৯৬১ সনের আগস্ট মাসে কৃষি তথ্য সংস্থার জন্ম হয়। সদর দপ্তর ছিল ৩, আর কে মিশন রোড ঢাকা। ওই সময় কৃষিকথা কৃষি তথ্য সংস্থায় হস্তান্তর করা হয়। ১৯৬১ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত মো. মোস্তফা আলী ছিলেন প্রধান কারিগরি তথ্য কর্মকর্তা এবং কৃষিকথার প্রধান সম্পাদক। ১৯৬১ সনে ১৯, রমাকান্ত নন্দী লেন থেকে এবং ১৯৬২ সনে জিনাত প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপা হয়। জুলাই ১৯৬৪ থেকে বিজি প্রেসে কৃষিকথা ছাপা হতো এবং খামারবাড়িতে নিজস্ব প্রেস স্থাপনের পূর্ব পর্যন্ত ওখান থেকেই ছাপার কাজ চলে। জুলাই ১৯৭৮ (শ্রাবণ/১৩৮৫) থেকে কৃষি তথ্য সংস্থা খামারবাড়ি ফার্মগেট, ঢাকায় স্থাপিত নিজস্ব প্রেসে মুদ্রণ কাজ শুরু হয়। বর্তমানে দুটি সিঙ্গেল কালার ও একটি বাইকালার মেশিনের সাহায্যে কৃষিকথা, বুকলেট, পোস্টার, লিফলেট, ফোল্ডার ছাপা হচ্ছে।

 

কৃষি তথ্য সার্ভিস ও কৃষিকথা
১৯৮৮ সনে সরকার কর্তৃক কৃষি তথ্য সংস্থাকে কৃষি তথ্য সার্ভিস নামে নতুনভাবে নামকরণ করে। ওই সময় কৃষিকথার সম্পাদক ছিলেন সিরাজ উদ্দিন আহমেদ। সম্পাদকের পদটি পূরণ না হওয়ায় কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালকরাই সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

 

কৃষিকথা মুদ্রণ সংখ্যার চালচিত্র

(প্রতি ৫ বছর পর পর বৈশাখ সংখ্যার ভিত্তিতে)
সন                     সংখ্যা            মন্তব্য
১৩৮৫/১৯৭৮    ৮,০০০          ১৩৮৫ সনের
১৩৯০/১৯৮৩    ৭,৮৫০          পূর্বে কৃষিকথায়
১৩৯৫/১৯৮৮    ৫,২০০          সংখ্যা উল্লেখ
১৪০০/১৯৯৩    ১০,০০০          থাকত না
১৪০৫/১৯৯৮    ৮,৩৭০    
১৪১০/২০০৩    ২৮,০০০
১৪১৫/২০০৮    ৪৪,৯০০
১৪২০/২০১৩    ২৬,০০০
১৪২১/২০১৪     ৪৪,৯০০

 

 সেকাল

একাল

১. কৃষিকথার সাইজ ছিল বড়। পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল সাধারণত ৪০-৫২

১. এখনকার সাইজ তুলনামূলকভাবে কিছুটা ছোট। পৃষ্ঠা সংখ্যা সাধারণত ৩২-৪০।

২. প্রচ্ছদ ছিল বাইকালার

২. প্রচ্ছদ এখন মাল্টিকালার

৩. আঙ্গিক সাদামাটা প্রযুক্তিভিত্তিক সচিত্র প্রতিবেদন অনুপস্থিত

৩. আঙ্গিক সুন্দর, আকর্ষণীয়। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রযুক্তিভিত্তিক ছবিবিশিষ্ট।

৪. প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষক-বিজ্ঞানীদের লেখার অভাব ছিল।

৪. প্রযুক্তিভিত্তিক লেখার প্রাচুর্য। বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের লেখা সমৃদ্ধ।

৫. নামিদামি লেখক-কবিদের লেখা ছাপা হতো। যেমন প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, বিজ্ঞানী আব্দুল্লাহ্ আল মুতী শরফুদ্দিন, কবি ফররুখ আহমদ, কবি বন্দে আলী মিয়া, কেএম শমশের আলী (বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত) তাদের লেখা কৃষিকথাকে ধন্য করেছে।

৫. জাতীয় পর্যায়ের লেখক-কবিদের লেখার অভাব। কৃষিকথায় যারা লেখেন তারা সাধারণ লেখক-কবি।

৬. ভিভিআইপি যেমন গভর্নর-গভর্নর জেনারেলের বাণী ছাপা হতো।

৬. সাধারণত ভিআইপিদের বাণী ছাপা হয় না। তবে ফলদ বৃক্ষরোপণ-২০১৪ বিশেষ সংখ্যায় মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী-কৃষি মন্ত্রীদের বাণী ছাপা হয়েছে।

৭. কবিতা, নিবন্ধ, গল্প, প্রশ্ন-উত্তর, খনার বচন, গ্রাহকের চিঠি, বিশ্ব সংবাদ এমনকি নিবন্ধের ওপর প্রতিবাদ ছাপা হতো।

৭. নিবন্ধ, কবিতা, গল্প, নাটিকা, মুখোমুখি, পুস্তক পরিচিতি, প্রশ্নোত্তর, আগামী মাসের কৃষি স্থান পাচ্ছে।

৮. ফসল, পশুপালন, পোলট্রি, নার্সারি, জেলার কথা- এসব ছিল মুখ্য বিষয়।

৮. ফসল, প্রাণিসম্পদ, উদ্ভিদ সংরক্ষণ, মৃত্তিকা, বন, পরিবেশ, কৃষি বাজার, বায়োগ্যাস, কৃষি কল সেন্টার- এসব এখন মুখ্য বিষয়।

কৃষিকথার বর্তমান অবস্থা
বর্তমান কৃষিকথার আঙ্গিক শ্রী বৃদ্ধি পেয়েছে। রঙিন আকর্ষণীয় প্রচ্ছদে ছাপা হচ্ছে। লেখার গুণগতমানও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের সচিত্র লেখা পাঠকদের কাছে সহজবোধ্য করে তুলছে। মাঠ ফসল, উদ্যান ফসল, ফুল, উদ্ভিদ সংরক্ষণ, মৃত্তিকা, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বন, পরিবেশ, পুষ্টিবিষয়ক নিবন্ধ, নাটিকা কবিতা-গান, প্রশ্নোত্তর, আগামী মাসের কৃষি নতুন আঙ্গিকে প্রকাশ করা হচ্ছে। সেই সাথে কৃষি তথ্য সেবায় কৃষি কল সেন্টার, ই-কৃষি সংক্রান্ত তথ্যাবলি কৃষিকথাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলছে।


কৃষিকথার গ্রাহক সংখ্যা কখনো স্থিতিশীল ছিল না। কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে মুদ্রণ সংখ্যাও বেড়ে যায়। ১৪২১ বৈশাখ (২০১৪) সংখ্যায় ৪৪,৯০০ কপি ছাপা  হয়। সর্বশেষ ১৪২১ চৈত্র (২০১৫) সংখ্যায় ৪৩,১০০ কপি ছাপা হয়। এর মধ্যে উপসহকারী কৃষি অফিসারসহ সৌজন্য সংখ্যা প্রায় ১৪০০০ কপি। উপসহকারী কৃষি অফিসারসহ সৌজন্য সংখ্যা বাদ দিলে গ্রাহকসংখ্যা হচ্ছে মাত্র ২৯০৫২। ১৬ কোটি মানুষের দেশে প্রায় দেড় কোটি কৃষক পরিবারের জন্য বর্তমানের কৃষিকথা মুদ্রণ বা গ্রাহকসংখ্যা একেবারেই নৈরাশ্যজনক। কৃষিকথার ৪০ বছরপূর্তি সংখ্যার তথ্যে প্রকাশ ১৯৭২ সনের আগে কৃষিকথার গ্রাহকসংখ্যা ৩৫ হাজারে উন্নীত হয়। এরই মধ্যে জনসংখ্যা দ্বিগুণের চেয়েও বেশি হয়েছে। চাষির সংখ্যাও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই কৃষিকথার গ্রাহক সংখ্যাও সে হারে বাড়ানো দরকার। ২০০৫ সনে একবার কৃষিকথার মুদ্রণ কপি দাঁড়ায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি। এখন কৃষিকথার নগদ মূল্য প্রতি কপি ৫  টাকা। বার্ষিক চাঁদা ডাক মাশুলসহ মাত্র ৫০  টাকা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩২-৪০ পর্যন্ত ওঠানামা করছে। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনা করলে কৃষিকথার মূল্য বেশি নয় বরং সরকার থেকে চাষিভাইদের ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।


বর্তমানে কৃষি তথ্য সার্ভিস কৃষিকথা অগ্রিম ছাপাচ্ছে এবং সময়ের আগেই কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জোর উদ্যোগ চালাচ্ছে। সুখের কথা এরই মধ্যে গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বৈশাখ ১৪২২ সংখ্যায় সাড়ে ৪ হাজার নতুন গ্রাহক বৃদ্ধি পাচ্ছে। উত্তরোত্তর গ্রাহক সংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।


ভবিষ্যৎ করণীয়
কৃষিকথার আঙ্গিক শ্রীবৃদ্ধি করা
* কৃষিকথার বাহ্যিক রূপ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একে আরও আকর্ষণীয় করে ছাপা দরকার। কৃষিবিদ গ্রুপ কর্তৃক প্রকাশিত মাসিক ‘কৃষি বার্তার’ মতো ভেতর-বাইর রঙিন করে আরও আকর্ষণীয় করে প্রকাশ করা যেতে পারে।
* কৃষিকথা আকার আগের মতো ২০
x ৩০ ইঞ্চি সাইজ অর্থাৎ একটু বড় করা উচিত। কলেবর বড় করা দরকার অর্থাৎ পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়ানো দরকার।
 

গুণগতমান বৃদ্ধি করা
* অতীতের মতো নামিদামি লেখক, সাহিত্যিক, কৃষি সাহিত্যিকদের লেখা, নামকরা বা খ্যাতনামা কবিদের কবিতা-গান ছাপালে কৃষিকথার গুণগতমান বৃদ্ধি পাবে। দেশের বরেণ্য কৃষিবিদ, কৃষি বিশেষজ্ঞ-কৃষি বিজ্ঞানীদের সচিত্র লেখা কৃষিকথাকে আরও প্রাণবন্ত ও সমৃদ্ধ করবে।
* নামিদামি লেখক বা কবিদের যথাযথ সম্মানীত দেয়া দরকার। বর্তমান সর্বোচ্চ সম্মানী  ১ হাজার টাকা থেকে অন্তত ২ হাজারে উন্নীত করার প্রয়াস চালানো জরুরি।

 

সময়মতো কৃষিকথা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা
কৃষিকথা পাই না- গ্রাহক যেন এ কথা বলতে না পারে। কৃষির প্রতিটি মাঠ কর্মকা- সময়ের ছকে বাঁধা। সময়মতো গ্রাহক কৃষিকথা না পেলে পরে আর কোনো কাজে আসে না। পরবর্তী এক বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তাই যে মাসের কৃষিকথা তা মাস শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ আগেই অভিযোগ বিহীনভাবে গ্রাহকের হাতে পৌঁছাতে হবে।


গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি করা
বাংলাদেশে মোট গ্রামের সংখ্যা ৮৭,২২৩টি। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি সমিতি বা ক্লাবে কৃষিকথা পৌঁছাতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সৌজন্য সংখ্যা ছাড়াই অন্তত ১ লাখ গ্রাহক করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।


সবশেষে বলতে হয়, ঐতিহ্যবাহী কৃষিকথাকে এমন আকর্ষণীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে প্রকাশ করতে হবে এবং ওয়েবসাইটে ও গণমাধ্যমে প্রচারণা করতে হবে যাতে কৃষক ভাইয়েরা নিজেরাই কৃষিকথা খুঁজে বের করেন। আর পাগলপারা হয়ে  কৃষিকথার গ্রাহক হন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখেন। কৃষি তথ্য সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীরা নিবেদিত প্রাণ নিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে কৃষিকথা পৌঁছে দিয়ে এটিকে শতাব্দীর গৌরবময় পত্রিকায় সমাসীন করবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখীসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠুক- এটাই একান্ত কামনা।

 

লেখক:

মু. ফজলুল হক রিকাবদার*
* সাবেক পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

বিস্তারিত
কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বর্তমান সরকার

কৃষি এ দেশের অর্থনীতির এক অতি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বর্তমানে দেশে জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অর্জিত হয় কৃষি খাত থেকে। তার চেয়েও বড় কথা কৃষি এ দেশের জনমানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা প্রদানের প্রধানতম এবং অন্যতম উৎস। এখনও এ দেশের বিপুল জনসংখ্যার কর্মসংস্থানও হয়ে থাকে কৃষিকে অবলম্বন করেই। ফলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, জীবনযাত্রায় মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে কৃষিক্ষেত্রে যে অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে শুরুতেই ২০০৯ সনে নির্বাচিত হয়ে মহাজোট সরকার সেটি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। গত অর্ধযুগ ধরে কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে তা বর্তমান সরকারের কৃষি ভাবনার এক বাস্তব প্রতিফলন।


শুরুতেই খাদ্যশস্য উৎপাদনে গত অর্ধযুগের ধারাবাহিক সাফল্যের কথা তুলে আনা যুক্তিসঙ্গত হবে। ২০০৮-২০০৯ সনে আমাদের চাল, গম ও ভুট্টার মোট উৎপাদন ছিল ৩৩৩.০৩ লাখ টন। এরপর থেকে প্রতি বছর খাদ্যশস্যের উৎপাদন বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধবনীতি ও কর্মকাণ্ডের ফলশ্রুতিতে ক্রমে বেড়েছে। গত ২০০৯-১০, ২০১০-১১, ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ সনে যথাক্রমে ৩৪৫.৯৬, ৩৬০.৬৫, ৩৬৮.৩৩৯ ও ৩৭২.৬৬ লাখ টনে উন্নীত হয়। আলু উৎপাদনের কথা যদি ধরা হয় তাহলে দেখা যায় যে, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১২-১৩ সনে এর উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭.৪৬ লাখ টন থেকে ৮৬.০৩ লাখ টনে। এ সময়কালে পেঁয়াজ, গম ও সবজির উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে।


মূলত চারটি প্রধান কারণে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে গত অর্ধযুগ ধরে। এক, অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় ফসল আবাদের জন্য কৃষক এখন বেশি পরিমাণ গুণগতমান সম্পন্ন ফসলের বীজ পাচ্ছেন। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বিএডিসি থেকে বিভিন্ন ফসলের বীজ সরবরাহ করা হয় ২ লাখ ৬১ হাজার ৫৯ টন যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান সরকারের আমলে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৩ টনে। এ বৃদ্ধি চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত হলেও তা আড়াই গুণের বেশি। দুই, অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় এ সময়কালে অনেক বেশি সংখ্যক জাত উদ্ভিদ প্রজননবিদরা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন আর অনেক বীজ এরই মধ্যে কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন ফসলের মোট ১৪৫টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। তিন, সারের মূল্য হ্রাস ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় কৃষক স্বল্প মূল্যে সুষম সার প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়েছেন। ২০০৯ সনে মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে সরকার নন-ইউরিয়া সারের মূল্য তিনবার হ্রাস করেছে। ২০০৯ সনে যেখানে টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি এর কেজি প্রতি মূল্য ছিল যথাক্রমে ৮৭, ৭০ ও ৯০ টাকা, ২০১০ সনের অক্টোবরে এসে তা যথাক্রমে হ্রাস করা হয়েছে ২২, ১৫ ও ২৭ টাকায়। অন্যদিকে, ২০১৩ সনের আগস্ট মাসে এসে ইউরিয়া সারের মূল্য কৃষক পর্যায়ে কেজিপ্রতি ১৬ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বর্তমান সরকারের আমলে দেশে একটি টেকসই সার বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে যার মাধ্যমে কৃষকের কাছে সব ধরনের সার সময়মতো পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। চার, বেসরকারি বীজ আমদানিকে উৎসাহিত করায় দেশে ভুট্টা, সবজি, গোলআলু এবং পাট বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বীজ ব্যবস্থাকে বিশেষ সুযোগ প্রদান করায় প্রাইভেট সেক্টর দেশে প্রচুর সবজি বীজ আমদানির মধ্য দিয়ে কৃষকের কাছে সবজি বীজের জোগান বৃদ্ধি করতে পেরেছে। ফলে দেশে মুক্ত পরাগী বীজের পাশাপাশি হাইব্রিড সবজি বীজের সরবরাহও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সবজি উৎপাদন বেড়েছে।
মহাজোট সরকারের আরেকটি বড় সাফল্য হলো কৃষি গবেষণাকে অগ্রাধিকার প্রদান। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ঘঅচঞ-এর আওতায় পরিচালিত ঝঢ়ড়হংড়ৎবফ চঁনষরপ এড়ড়ফং জবংবধৎপয (ঝচএজ) এর মাধ্যমে প্রতিটি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে ল্যাব উন্নয়নসহ নানামুখী গবেষণা পরিচালনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে দেশে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে আণবিক জীববিদ্যা সম্পর্কিত আধুনিক গবেষণাগার গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে পাটের নানা রকম প্রতিকূলতাসহিষ্ণু পাট জাত উদ্ভাবনের গবেষণা চলছে।


দেশে ফসল কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্তমান সরকার আরও যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-


বর্তমান সরকারের আমলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আরও গতিশীল হয়েছে। ‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের মাধ্যমে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে ২৫% কম মূল্যে ৩৫টি জেলায় ৩৮ হাজার ৩২৪টি বিভিন্ন প্রকার কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে। তাছাড়া বিএআরআই এবং বিআরআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতি মোট মূল্যের ৬০% পর্যন্ত ভর্তুকি মূল্যে কৃষকের নিকট সরবরাহ করে যাচ্ছে।


কৃষকের উৎপাদন খরচ হ্রাস করার জন্য সরকার বিদ্যুতের রিবেট প্রদান করেছে এবং বীজ, সারসহ ইক্ষু চাষিদের সহায়তা ভর্তুকি বছর বছর বৃদ্ধি করেছে। ২০০৮-০৯ সনে এ রকম ভর্তুকি যেখানে ছিল ৫১৭৮.২৬৯১ কোটি টাকা ২০১২-১৩ সনে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৯৯৯.৯৯৩৮ কোটি টাকায়।
সরকার বন্যা, আইলা, সিডর, মহাসেনসহ নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ফসল উৎপাদনে প্রণোদনা প্রদান করেছে ও কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।


ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে ভূ-অভ্যন্তরস্থ পানি উত্তোলন হ্রাস করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রম জোরদার করেছে। দেশের জলাবদ্ধ এলাকা, হাওর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন ক্ষুদ্র সেচ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারকে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে। সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য সেচের আওতা বাড়ানো হয়েছে। ড্যাম, পাহাড়ে ঝিরি বাঁধ, রাবার ড্যাম ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে।


কৃষি পণ্যের বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন বর্তমান সরকারের আরেকটি সাফল্য। পাইকারি বাজার সৃষ্টি, গ্রোয়ার্স মার্কেট, কুল চেম্বার স্থাপন, রিফার ভ্যান পণ্য বিপণন, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপণন ব্যবস্থায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে।


সরকার অঞ্চলভিত্তিক ১৭টি সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকা উপযোগী ফসলের জাত উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করে সেচের আওতা বৃদ্ধি করা, কৃষিজাত পণ্যের বাজার সুবিধা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।


কৃষি জমি ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে বলে বৃহত্তর বরিশাল, খুলনা ও সিলেট জেলার পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার কৃষির সার্বিক উন্নয়ন সাধনের জন্য ২০১৩ সনে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ মহাপরিকল্পনার আওতায় দক্ষিণাঞ্চলের ১৪টি জেলায় সামগ্রিকভাবে ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতসহ ১০টি প্রধান ক্ষেত্রে কর্মকা- শুরু হয়েছে।


দেশে বর্তমান সরকারের আমলে ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের ১০টি কৃষি অঞ্চলে ২৪৫টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র (এআইসিসি) স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষক ফসল উৎপাদন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন।
দেশে মাটির উর্বরতা অনুযায়ী অনলাইন সুষম সার সুপারিশ করার জন্য ২০০টি উপজেলায় ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। তাছাড়া দেশে এওঝ ভিত্তিক মডেলিংয়ের মাধ্যমে ১৭টি শস্য উপযোগিতা বিষয়ক ম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি অঞ্চলভিত্তিক শস্য উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করবে।


মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে পৃথিবীর পাঁচটি সর্বাধিক মৎস চাষকারী দেশের একটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ সনে আমাদের দেশে প্রায় ৩.৪৬ মিলিয়ন টন মাছ উৎপাদন করা হয়েছে যার প্রায় ২ মিলিয়ন টনই মৎস্য আবাদ থেকে পাওয়া গেছে। মৎস্য গবেষণার মাধ্যমে দেশে মাছের নতুন জাত উদ্ভাবন এবং এসব জাতের মাছের পোনা ব্যবহার করার কারণে মৎস্য উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্ধযুগ ধরে মৎস্য উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং এদের প্রয়োগ নিশ্চিতকরণের কারণেও মৎস্য উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছে। মৎস্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের আমলে যেসব কৌশল উদ্ভাবন ও এদের প্রসার ঘটানো হয়েছে সেগুলো হলো-
সুপার জাতের মনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা উৎপাদন এবং এর আবাদ করা,
থাই পাঙ্গাশের কৃত্রিম প্রজনন এবং পোনা উৎপাদন,
পুকুরে পাঙ্গাশ উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন,
পুকুরে রুই মাছের প্রজাতির মিশ্র আবাদ করা,
মৌসুমি পুকুরে রাজপুঁটি উৎপাদন,
উন্নত রুই জাতীয় মাছের রেণু উৎপাদন এবং নার্সারি ব্যবস্থাপনা।


প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে বর্তমান মহাজোট সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে ২০০৭-০৮ সনের তুলনায় ২০১২-১৩ সনে দেশের দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন যথাক্রমে শতকরা ৪৬, ৫৫ এবং ৪.২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১২-১৩ সনে কৃত্রিম প্রজননের ক্ষেত্রে শতকরা ৭.৪ ভাগ বৃদ্ধি ঘটেছে। এ সময়ে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে মুরগির মৃত্যু হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। দেশে এ সময়ে ২৪টি লাইভস্টক কোয়ারেনটাইন স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। প্রাণীর ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং হাইব্রিড গবাদিপশু পালন কর্মকা-কে ত্বরান্বিত করা হয়েছে। গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগি পালনে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বেকার যুবক, দুঃস্থ মহিলা, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ২০১১-১২ সনে দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলায় ইনটিগ্রেটেড এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টিভিটি প্রজেক্ট ত্বরান্বিত করা হয়েছে। দেশি মুরগির ব্রিড সংরক্ষণ করা এবং এদের বাড়তি খাদ্য সরবরাহ করে উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।


বর্তমান সরকারের কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে আজ কৃষির প্রত্যেকটি খাতে ধনাত্মক পরিবর্তন হয়েছে। ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রত্যেকটি খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হওয়ায় এখন এ দেশের কৃষক কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নয় বরং পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে দেশ ক্রমে এগোচ্ছে। খাদ্যশস্য, গোলআলু, ভুট্টা এবং সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে দেশ আজ এক নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জমি হ্রাসের প্রেক্ষাপটে জনমানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের জন্য সরকার নানামুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করে চলেছে। কৃষিবান্ধব বর্তমান সরকার সত্যিকার অর্থেই খাদ্য ঘাটতির দেশকে এক খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত করার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

 

লেখক:

ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া*
* প্রফেসর, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ এবং প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলানগর, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল : ০১৫৫২৪৬৭৯৪৫

 

বিস্তারিত
কৃষি কথা : কিছু কথা

কৃষিকথা রাইটার্স বিল্ডিং কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো সাতচল্লিশের আগে, সেটা পুরানো কথা, আমরা অনেকেই জানি। পূর্ব বাংলায় এর পাঠক সংখ্যা বেশি ছিল বলে দেশ বিভাগের পর পশ্চিম বাংলার পাঠকদের মায়া কাটিয়ে রাইটার্স বিল্ডিং ছেড়ে ঢাকায় ইডেন বিল্ডিং এ পাড়ি জমায় কৃষিকথা, এবং এদিক সেদিক ঘুরে রামকৃষ্ণ মিশন রোডের কৃষি তথ্য সংস্থায় স্থায়ীভাবে আসন গাড়ে- সেটাও নতুন নয়, প্রবীণ পাঠকদের অনেকেই জানেন। আর আশির দশক থেকে খামারবাড়ি, ঢাকায় কৃষি তথ্য সার্ভিসের অত্যাধুনিক প্রিন্টিং প্রেসের কল্যাণে কৃষিকথার আটপৌড় চেহারায় লাগে আধুনিকতার ছোঁয়া, এবং চলমান এ প্রক্রিয়াটি আজও বহমান সময়ের স্রোতে। এটিও নতুন কিছু নয়, এ সময়ের পাঠকদের খুবই জানা। তবে এসব পুরানো কথার ভিড়ে কৃষিকথার পাঠকদের জন্য নতুন খবর হলো মেঘে মেঘে যেমন বেলা বাড়ে, তেমনি কৃষিকথার বয়সও বেড়ে এখন হয়েছে ৭৫ বছর। পরিণত বয়সই বলা যায়। যা হোক, অনেকের মতো আমারও সুযোগ হয়েছিল কৃষিকথার টিমের সঙ্গে বেশ কিছু দিন কাজ করার। তাই কৃষিকথার ৭৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে আমাদের সময়কার বর্ণাঢ্য কর্মকা-ের উপভোগ্য কিছু খ-চিত্র এখনকার পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করা বা বলতে পারেন ফিরে দেখার বিষয়টিই হলো- কৃষি কথা : কিছু কথা।


কৃষিকথা পরিবারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিগত ’৬৯-’৭০ সন থেকে। বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট (বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) এর ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন লেখালেখি নিয়ে নিয়মিত মুখোমুখি হতাম রামকৃষ্ণ মিশন রোডে কৃষি তথ্য সংস্থার প্রধান কারিগরি তথ্য অফিসার মুহাম্মদ মোস্তফা আলী, উপ প্রধান কারিগরি তথ্য অফিসার কলিম উদ্দীন আহমদ এবং হোসনে আরা রহমানের সঙ্গে। তারা তিনজনই লেখক ছিলেন। এছাড়া, একুশের সংকলন ও কলেজ বার্ষিকীর কভার ডিজাইন নিয়ে আলাপচারিতা চলতো শিল্পী প্রাণেশ কুমার ম-লের সঙ্গে। শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীর সঙ্গেও দেখা হয়েছে। দেখা হতো কবি আবদুল হাই মাশরেকী, লেখক ছমিরউদ্দিন খাঁ, বেতার শিল্পী মনু দে এবং ফজলে রাব্বীর সঙ্গেও। যদিও সে সময়কার কৃষিকথার সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আমার আলাপের সুযোগ হয়নি, তবে তার লেখালেখির সঙ্গে পরিচয় ছিল। পত্রিকায় প্রকাশিত তার ছোট গল্পগুলো ভালো লাগত। ঠিক এভাবেই কৃষি তথ্য সংস্থার কর্মকা- ভালোলাগা এবং ভবিষ্যতে গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে কৃষি তথ্য সংস্থায় যোগ দেয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।


সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটল ’৯৩তে, ততদিনে কৃষি তথ্য সংস্থার নাম সামান্য পালটে গিয়ে হয়েছে কৃষি তথ্য সার্ভিস। তবে যোগদানটা মোটেও সুখকর ছিল না। শ্রদ্ধেয় কৃষিবিদ আ, কা, মু, গিয়াস উদ্দীন মিল্কী ও কৃষিবিদ তফসীর সিদ্দিকীর সহযোগিতায় যদিওবা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, গাজীপুর থেকে বদলি হয়ে কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অফিসার (কৃষি) পদে যোগদানের জন্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ পেলাম, কিন্তু বিধি বাম। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তৎকালীন পরিচালক আমাকে সহজে গ্রহণ করতে রাজি হলেন না। কারণ হিসেবে তিনি মন্ত্রণালয়কে জানালেন বর্ণিত পদের অফিসারকে লেখালেখি জানতে হবে, লেখা সম্পাদনায় অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, বেতার ও টেলিভিশনের স্ক্রিপ্ট লেখার ধারণা থাকতে হবে, ইত্যদি... ইত্যাদি... এবং আরও অনেক কথা। যদিও আমি তাকে জানিয়েছিলাম যে, তার চাহিদা অনুযায়ী সব অভিজ্ঞতাই আমার আছে। তবুও তিনি আমার পরিবর্তে অন্য একজন অফিসারের নাম প্রস্তাব করে মন্ত্রণালয়ে পাঠালেন। তবে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ জয় আমারই হলো। আমি কৃষি তথ্য সার্ভিসে যোগদান করলাম ১৯৯৩ এর জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। কিন্তু তখনও বিপদ কাটেনি, বরং বেড়েছে। কৃষিকথা দূরে থাকুক, কোনো কাজই আমাকে দেয়া হচ্ছে না। কারণটা পরিষ্কার, কর্তৃপক্ষ আমাকে চায়নি, অথচ আমি এসে গেছি। অতএব, বসে বসে অন্য অফিসারদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া এবং জাতীয় দৈনিকের জন্য লেখা তৈরি করা ছিল আমার তখনকার নিত্যদিনের কাজ। ফলে সে সময় আমার বেশ কিছু লেখা ইংরেজি ও বাংলা জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। তারপর এলো সেই টার্নিং পয়েন্ট অক্টোবর মাস, বিশ্ব খাদ্য দিবস। জাতীয় দৈনিকে বিশ্ব খাদ্য দিবসের ক্রোড়পত্র প্রকাশ ও সেমিনারে মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর ভাষণের খসড়া তৈরির দায়িত্ব পড়েছে কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওপর। এ বিষয়ে পরিচালক মহোদয়ের কক্ষে সভা বসেছে। আমিও উপস্থিত সেখানে। আলোচনা হচ্ছে ক্রোড়পত্রের জন্য মহমান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় কৃষিমন্ত্রী, মাননীয় খাদ্যমন্ত্রী, মাননীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ও কৃষি সচিব মহোদয়ের বাণীর খসড়া দরকার, কে কোনটা লিখবে? উপস্থিত অফিসারদের মধ্যে মুখচাওয়াচায়ি চলছে। এ সুযোগটা হাতে নিয়ে নিলাম। বললাম, মহমান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাণীর খসড়া এবং মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর ভাষণের খসড়া আমি তৈরি করে দিবো। চশমার ওপর দিয়ে আড়চোখে তাকালেন পরিচালক মহোদয়, বললেন, পারবে? বললাম- পারব। সময় বেঁধে দেয়া হলো খসড়া জমা দেয়ার। নির্ধারিত সময়ে শুধু আমার তৈরি খসড়া কয়টি জমা পড়ল, অন্যরা কের লেখা তৈরি করেননি। পরিচালকের কক্ষে আবার ডাক পড়ল, এবার পরিচালক মহোদয় তাকালেন, চশমার উপর দিয়ে নয়, চশমার গ্লাস ভেদ করে, বললেন ড্রাফ্ট ভালো হয়েছে, কৃষিকথার জন্য বিশ্ব খাদ্য দিবসের থিমের ওপর মূল লেখাটিও তুমি লিখবে, আর কৃষিকথার লেখা সিলেকশন ও টেকনিক্যাল এডিটিংয়ের কাজ এখন থেকে তুমিই করবে। .... সেখান থেকেই শুরু, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, এভাবে চলেছে কৃষি তথ্য সার্ভিসে বিভিন্ন পদে চাকরি করা ২০০৭ পর্যন্ত।


মনে হচ্ছে এতক্ষণ ধান বানতে শিবের গিত গাইলাম। যা হোক, এবার কৃষিকথায় আসি। সেসময় লেখা নির্বাচন ও সম্পাদনার কাজে যে টিম কাজ করত, সে টিম মেম্বারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কৃষিবিদ মানজুমুল হক। এছাড়া কৃষিবিদ আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল, কৃষিবিদ রাগিব হাসান, কৃষিবিদ রেজাউল হক এবং ড. জাহাঙ্গীর আলম বিভিন্ন সময়ে আমার সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, সহসম্পাদক তাজুল ইসলাম ও পরবর্তিতে মো. মতিয়ার রহমান বরাবরই আমাদের সাথে ছিলেন এবং তারা গল্প ও কবিতাগুলো সম্পাদনা করতেন। আমি আর মানজুমুল একই রুমে পাশাপাশি বসে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি। মানজুমুলকে দেখতাম অসম্ভব ধৈর্য ধরে সম্পাদনার কাজটি করতেন। গবেষকদের তথ্য উপাত্তে ঠাসা এবং কঠিন কঠিন শব্দ চয়ন ও বাক্য গঠনে সমৃদ্ধ কারিগরি লেখাগুলোকে এভরি ডে ভোকাবলারি দিয়ে তিনি পপুলার আর্টিকেলে রূপান্তরিত করতেন। সম্পাদনায় মনোসংযোগ ও প্রুফ দেখার বিষয়টি শিখেছি মানজুমুলের কাছ থেকে। ইকবাল, রাগিব, রেজাউল ও জাহাঙ্গীর এরা সবাই বিভিন্ন সময়ে আমার সহকর্মী ছিলেন, তারা লেখা নির্বাচনে সহায়তা করতেন, নিয়মিত কলাম চিঠিপত্রের জবাব ও আগামী মাসের কৃষি লিখতেন এবং স্ট্যান্ড বাই বা ফিলার লেখক হিসেবে বিশেষ সংখ্যার কোন লেখা পাওয়া না গেলে সেটি লিখে দিতেন। আহমেদ সিরাজ নামে সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ নিয়মিত কৃষি বিচিত্রা লিখতেন। তাজুল ইসলাম ও মতিউর রহমান লিখতেন কৃষি সংবাদ ও আমাদের কথা। কৃষিকথায় আমার প্রথম লেখাটি ছাপা হয়েছিল ৫৩তম বর্ষ : ৭ম সংখ্যা, কার্তিক ১৪০০, অক্টোবর ১৯৯৩ তে বিশ্ব খাদ্য দিবসের থিম Harvesting Nature’s Diversity এর ওপর ভিত্তি করে - বিশ্ব খাদ্য দিবস ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা শিরোনামে।


কৃষিকথার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে অনেক গুণী লেখকদের সাথে পরিচয় হয়েছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন ছিলেন- ব্রির ড. হাসানুজ্জমান ও ড. ফরহাদ জামিল, বিএআরসির ড. কামাল এবং বাংলাদেশ সুগারকেন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ওসমান গনি। তারা সবাই গবেষক ছিলেন, অথচ লিখতেন কৃষক ও কৃষি কর্মীদের উপযোগী করে। বিশেষ কোন লেখা চাওয়া মাত্র ড. হাসানুজ্জমান ও ড. ফরহাদ জামিল লেখা পাঠিয়ে দিতেন। ড. জামিলের লেখা ধান উৎপাদন প্রযুক্তির ছড়া এখনও মনে পড়ে। ড. কামাল লেখা নিয়ে নিজেই চলে আসতেন। শেষ বয়সে তিনি আমেরিকা চলে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই তিনি পরপারে চলে যান। তবে প্রবাস জীবনে দেশে ফিরেই আসতেন আমাদের অফিসে। আড্ডা দিতেন, নতুন লেখালিখি নিয়ে কথা হতো। চাকরির শেষের দিকে এসে তিনি পিএইচডি করেছিলেন। পিএইচডি ডিগ্রি নেবার পর একদিন আমাদের রুমে আসার পর তিনি কেমন আছেন জানতে চাইলে তাৎক্ষণিক জবাব দিয়েছিলেন, বুড়ো বয়সে তরুণী বিয়ে করার মতো অবস্থা, লজ্জা পাচ্ছি। অপর দিকে ওসমান গনির লেখার সঙ্গে পরিচয় থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ছিল না। পাণ্ডুলিপি পড়ে বুঝা যেত সাহিত্য চর্চা আছে, তাই লিখেন ভালো। কিন্তু তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল অনেক পরে, ঈশ্বরদীতে। দেখলাম তিনি লেখক হিসেবে যেমন ভালো, তেমনি লোক হিসেবেও।


কৃষিকথার ডিজাইন ও অঙ্গসজ্জা প্রসঙ্গে শিল্পী প্রাণেশ কুমার ম-লকে মনে পড়ে। প্রাণেশ বাবুর ইলাস্ট্রেশন বা একটি তুলির আঁচড়ে গ্রামবাংলার কৃষক বা কিষাণ বধূর যে ছবি ফুটে উঠতো কৃষিকথায়, তার অবসর গ্রহণের পর আর কখনও সেটি খুঁজে পাইনি। শিল্পী সরদার শামসুল ইসলাম একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে গ্রাফিক্সের কাজ করতেন। তার হাতের লেখা টাইটেল টেলিভিশনের স্ক্রিনে দেখতাম। কৃষিকথায়ও তিনি আর্টিকেলের শিরোনাম অর্থাৎ টাইটেল করে দিতেন। তবে কম্পিউটার গ্রাফিক্স চালু হওয়ার পর হাতের লেখা বন্ধ হয়ে যায়। কম্পিউটার গ্রাফিক্সের কাজ করতো শিল্পী মেজবাহ ও শিল্পী নূর, এখনও তারা আছেন। মেজবাহ ও নূর কিন্তু কেবল চারু কলার শিল্পীই নন, একজন নাট্যশিল্পী অন্যজন যাদুশিল্পীও। আমাদের সম্পাদনা টিমে এ শিল্পী দলটিও কাজ করত, কভার ডিজাইন, ভেতরের ছবি ও ফটোশপ নিয়ে আমাদের মধ্যে মতামত বিনিময় হতো। আমরা সবাই চেষ্টা করতাম একটি ভালো প্রোডাকশন করার জন্য।


মুদ্রণ প্রসঙ্গে তৎকালীন প্রেস ম্যানেজার বেলাল উদ্দিন আহমেদকে তো ভুলা যাবে না। একটু পাগলাটে টাইপের ছিলেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার কৃষিকথা বের করা চাই, সেটা যেভাবেই হোক। অনেক দিন সকালে অফিসে যেয়ে তাকে দেখেছি সারা রাত জেগে কৃষিকথা ছাপানোর কাজ শেষ করে প্রেসের ভেতর দুই টেবিল জোড়া লাগিয়ে তার ওপর ঘুমিয়ে আছেন। রণজিৎ দত্ত, মাস্কিংম্যান তাকেও দেখতাম রাত জেগে কাজ করত, হাতের কাজ শেষ না করে বাড়ি যেত না। এভাবে ম্যানেজার থেকে লোডার পর্যন্ত প্রেসের প্রতিটি কর্মীর রাত জাগা শ্রম ও আন্তারিকতায় বের হতো প্রতি বাংলা মাসের প্রথম সপ্তাহে মাসিক কৃষিকথার প্রতিটি সংখ্যা।


এবার কৃষিকথার লেখালেখি নিয়ে মজার কিছু প্রসঙ্গ। অনেক সময় বাধ্য হয়ে কিছু ফরমায়েশি লেখা লিখতে হতো এবং ছাপাতে হতো কৃষিকথায়। এমনি একটি লেখা ছাপানোর পর চার দিকে বেশ হৈ চৈ। প্রচুর টেলিফোন আসতে লাগলো। লেখাটি ছিল ডিএইর ডিজি সাহেবকে নিয়ে। যারা ডিজি সাহেবকে পছন্দ করতেন তারা আমার লেখাটির উচ্ছ্বসিত প্রসংশা করলেন। অন্য দিকে যারা তাকে পছন্দ করতেন না, তারা আমার সমালোচনা করলেন এবং ধরে নিলেন আমার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এ বিষয়ে সমালোচনার তুঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন এডিশনাল ডিরেক্টর। তার সঙ্গে চট্টগ্রামে একটি ট্রেনিং প্রোগ্রামে দেখা হলে তিনি যথারীতি রেগে গেলেন। তারপর একটু থেমে বললেন, ফ্লাস ফ্লাডের ওপর বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্র থেকে তোমার একটি লাইভ প্রোগ্রাম শুনেছি। তোমার সঙ্গে মোতাহার চৌধুরী ও নাজমুল ছিল, অনুষ্ঠানটি চমৎকার লেগেছে, তাই তোমার ওপর যত রাগ সব এখন পানি হয়ে গেল। তার পরেও বললেন- আচ্ছা তোমার বাড়ি কী চাঁপাইনবাবগঞ্জ?


আর একবার হয়েছে কী, কাজী নজরুল সরকারি কলেজের এক ছাত্র অফিসে এসে হাজির। এসেই বলল ওর বাড়ি কসবা উপজেলায়। বাড়িতে কৃষিকথায় আমার একটি লেখা পড়েছে, লেখাটি ভালো লেগেছে, তাই দেখা করতে এসেছে। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম। সে বলল, শুধু ধন্যবাদে হবে না, একটা উপকার করতে হবে। জানতে চাইলাম কী উপকার? সে বলল পারিবারিক শত্রুপক্ষ রাতের বেলায় তাদের জমির ধান কেটে নিয়ে গেছে এবং ধান যেহেতু কৃষি ফসল, তাই থানা পুলিশ যা করতে হবে, তা কৃষি বিভাগেরই করা উচিত। সুতরাং এ ব্যাপারে আমার হেলপ দরকার। অনেক বুঝিয়ে তারপর তাকে বিদায় করেছিলাম।


অন্য একদিনের ঘটনা। বিকেল ৩টা হবে হয়তো। লেখা এডিট করছি। মানজুমুল ইপসাতে। একজন তরুণী রুমে এসে বসল। তাকাতেই বলল- আমি শিল্পী, শামসুন্নাহার হলে থাকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে মার্স্টাস করছি। বললাম, কী হেলপ করতে পাড়ি তোমাকে? আচ্ছা, কৃষি গ্রাজুয়েট যারা বিসিএস করে উপজেলা কৃষি অফিসে চাকরিতে ঢুকে, তাদের পদমর্যাদা কী? সরাসরি প্রশ্ন তার। জবাবে বললাম, অন্য বিসিএস ক্যাডার অফিসারদের মতোই প্রথম শ্রেণির গেজেটেড অফিসার। তরুণীটি একটু ভাবলো। আমি জানতে চাইলাম বিয়ের ব্যাপার কী? বললো- হ্যাঁ। জিজ্ঞাসা করলাম- পাত্রীটি কে? আমি নিজেই, এবারও সরাসরি জবাব তার। ভালোভাবে তাকালাম তার দিকে। সে বলতে শুরু করলো- কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম নামে একজন বিসিএস (কৃষি) ক্যাডার অফিসারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। সাইফুল এসএমও হিসেবে একটি উপজেলায় জয়েন্ট করেছে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে পোস্টগ্রাজুয়েশন করছে। কাল বাদে পরশু তাদের বিয়ে। সুতরাং পাত্র হিসেবে সাইফুল কেমন, তা আজকের মধ্যেই তাকে জানতে হবে এবং বিয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পৌঁছাতে হবে। এ ব্যাপারে সাহায্য দরকার। ওর কথা শুনে প্রশ্ন করলাম তো, এখানে কেন? জবাবে বলল- এটাতো কৃষি তথ্য সার্ভিস এবং আপনি তথ্য অফিসার (কৃষি) তাই। আমি বললাম সাইফুল নামে তো কাউকে চিনি না, তবে বিকেল ৫টার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা টিম, যারা ডেপুটেশনে পড়াশোনা করছে, তারা এখানে আসবে। তাদের কাছ থেকে যদি জানতে পারি তবে অবশ্যই তোমাকে জানাবো, বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ফোন করতে পার, এ বলে তাকে বিদায় দিলাম। ৫টায় মিয়া আবদুর রশিদ এলো, ও হর্টিকালচারে এমএস করছে। ওর কাছ থেকে জানলাম সাইফুল সম্পর্কে। রশিদের মতে, সাইফুল পাত্র হিসেবে যেমন ভালো, তেমনি একাডেমিক ক্যারিয়ারও ভালো। বিকেল ঠিক সাড়ে পাঁচটায় টেলিফোন এলো। হ্যালো বলতেই শিল্পী বলল- তথ্য পেয়েছেন? জবাবে শুধু বললামÑ তথ্য পজেটিভ, ঝুলে পড়তে পারো। এখানে এ প্রসঙ্গটি শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু হয়নি। বেশ কিছু দিন পরে কৃষিকথার কাজ করছি। রুমে ঢুকল একজন তরুণ, বলল- স্যার আমি সাইফুল, বিয়ের পর সস্ত্রীক এসেছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু আপনি ছিলেন না। আমার স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে আজ একাই এসেছি। আমার স্ত্রীর নাম শিল্পী। পরে অবশ্য ওদের দু’জনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।


যার প্রসঙ্গ টেনে শেষ করব বলে ভেবে রেখেছিলাম, এবার তার কথা বলি। তিনি কৃষিবিদ ফজলুল হক রিকাবদার। আমি কৃষিকথা টিমের সঙ্গে কাজ করেছি ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত। সেসময় কৃষি তথ্য সার্ভিসে পরিচালক হিসেবে পেয়েছিলাম কৃষিবিদ এমএ করিম, কৃষিবিদ দিলীপ চক্রবর্তী, কৃষিবিদ ফজলুল হক রিকাবদার এবং ড. শহিদুল ইসলামকে। এদের মধ্যে কৃষিবিদ রিকাবদারের সময়কালটা আমার চাকরি জীবনের একটা মাইলস্টোন। সেসময় কৃষিকথার সার্কুলেশন যেমন বেড়েছিল, তেমনি কৃষিকথার আঙ্গিকেও আনা হয়েছিল অনেক পরিবর্তন। কৃষিকথার লেখকদের লেখার মান উন্নয়নের জন্য ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন নামে একটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছিলাম, চারুকলার ছেলেমেয়েদের দিয়ে কৃষিকথায় কার্টুন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি, এ ধরনের আরো অনেক কিছু কাজ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। তখন চাকরি করিনি, কাজ করেছি এবং কাজকে এনজয় করেছি। আর এসব সম্ভব হয়েছিল কৃষিবিদ রিকাবদারের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য। সুতরাং রিকাবদার স্যারকে কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে অকৃতজ্ঞ থাকা কী ঠিক হবে?

 

লেখক:

কৃষিবিদ মঈন উদ্দিন আহমেদ*
* এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, ইনফোটেইনমেন্ট, বাড়ি-৫৫ (তিনতলা), রোড-৬, ব্লক-সি, বনানী, ঢাকা-১২১৩

বিস্তারিত
খামারবাড়ির কথা

কৃষি তথ্য সার্ভিস আমার চাকরিকালের একটি উজ্জ্বল নাম, যা চাকরি থেকে চলে আসার পরও এখনো আমি মনে করি। আমি আমার চাকরি জীবনে প্রায় সম্পূর্ণ সময়েই এ সংস্থায় কাটিয়েছি। বিগত ১৯৭৭ সনে চাকরিতে এসে পেনশন পর্যন্ত মাত্র কয়েক বছর ঢাকার বাইরে কাটালেও পুরো সময়ই এ সংস্থায় কাজ করেছি। এখানে আসার জন্য যার অবদান সবচেয়ে বেশি প্রথমেই যার কথা বলতে হয় তিনি হলেন কৃষিবিদ মরহুম আ কা মু গিয়াস উদ্দীন মিল্কী স্যার। তিনি তখন এ সংস্থার প্রধান হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি শুধু আমাকে এখানে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়েই আসেননি সাথে সাথে এ সংস্থার কাজের ধরন, নিয়মপদ্ধতি যাবতীয় সর্বাধুনিক তথ্য প্রচার বিষয়ে আমাকে জ্ঞান দিয়েছেন, যা কৃষির বিভিন্ন সম্প্রসারণবিষয়ক কাজকর্মের সাথে সম্পৃক্ত।


এ বিভাগের কাজকর্ম ছিল কৃষিবিষয়ক বিশাল কর্মকা-গুলো হাতে-কলমে কৃষক ভাইদের কাছে পৌঁছে দেয়া। এজন্য এ সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে ব্যবহার্য ছিল যেসব তা হলো কৃষির ওপর প্রকাশিত বিভিন্ন ধরনের কৃষিবিষয়ক প্রকাশনাসামগ্রী, বেতারের মাধ্যমে কৃষিবিষয়ক তথ্য প্রচারণা ও চলচ্চিত্র, টেলিভিশন প্রভৃতি শ্রবণ-দর্শনসামগ্রীর মাধ্যমে এ সংস্থার কৃষি তথ্য প্রচার করা।


এসব তথ্য প্রচার কার্যক্রমের ব্যাপারে ওই সময় আমার জ্ঞান যদিও অতি সামান্য ছিল। তারপরও মিল্কী স্যারসহ অন্যান্য জ্ঞানী কৃষিবিদের সাহচর্যে আমি ক্রমে এসব বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠি। এজন্য প্রথমেই যে তথ্যসামগ্রীর বিষয়ে মনে আসে তা হলো প্রচার ও প্রকাশনাসামগ্রী। এর মধ্যে ছিল মাসিক কৃষিকথা, মাসিক সম্প্রসারণ বার্তা ও অন্যান্য কৃষিবিষয়ক লিফলেট, বুকলেট, পুস্তিকা এসব। এছাড়া বার্ষিক কৃষি ডায়রি, ক্যালেন্ডার ও কৃষি পঞ্জিকার কাজও নিয়মিত হয়ে আসছে। মাসিক কৃষিকথায় লিখেছে দেশের বিশিষ্ট কৃষি লেখক, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট কৃষি শিক্ষকরা। এছাড়া কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষির বিভিন্ন পেশায় চাকরিরত অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কৃষিবিদদের বিভিন্ন রচনাও এ পুস্তকে স্থান পেয়েছে। এ পত্রিকায় সদ্য আবিষ্কৃত বিভিন্ন ধরনের গবেষণালব্ধ বিষয়ের ওপর রচনারও সমাহার রয়েছে। কৃষিকথা একটি কারিগরি জার্নাল এবং এ পত্রিকা গ্রাহকের মাধ্যমে বিক্রয় ও বিতরণ করা হয়। গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত এ অর্থ সরকারি রাজস্ব খাত হিসেবে সরকারি তহবিলে জমা হয়। এর জন্য প্রচুর সৌজন্য কপিও ছাপা হতো। এত প্রচুরসংখ্যক কৃষিকথা কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাধ্যমে এর আগে বেসরকারি প্রেস ও সরকারি প্রেসগুলো থেকে ছাপা হতো। এছাড়া অন্যান্য কৃষিবিষয়ক সরকারি প্রকাশনাও এ সংস্থা থেকে প্রকাশ করা হতো। এসব কার্যাবলির প্রকাশিত কার্যক্রমের বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে এ সার্ভিসে একটি অফসেট প্রেস মেশিন ও এর অন্যান্য ছাপাবিষয়ক যন্ত্রপাতি এখানে স্থাপন করা হয়। পরে বিদেশি সাহায্য-সহায়তায় এ সংস্থায় সর্বাধুনিক মেশিনাদিও স্থাপন করে। ফলে এখানে ছাপার পরিমাণ প্রচুর বৃদ্ধি পায়। এসব কারণে ফার্মগেটে এ সংস্থার একটি প্রেস ভবন তৈরি এবং বিভিন্ন ধরনের আধুনিক মেশিন নিয়ে এখানে কাজ শুরু করে। এ ছাপাখানায় তখন রাত দিন কাজ চলত। পরে এ এলাকায় খামারবাড়ি নামে কৃষির জাতীয়পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হয়। কারণ এখানেই কৃষির কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলো নিয়ে বিশাল ভবন তৈরি হয়। এতক্ষণ আমার প্রতিষ্ঠানের কাজের কথা বললাম। এবার আমার নিজের কথা বলি। আমাকে আমাদের অফিস প্রধান মিল্কী স্যার এ সংস্থায় নিয়ে আসেন ১৯৮০ সনে। তখন আমাদের প্রধান কার্যালয় ছিল পুরান ঢাকায় রামকৃষ্ণ মিশন রোডে। আমি এখানে আরও ২ থেকে ৩ জন তথ্য কর্মকর্তার সাথে কাজ করতাম। যদিও আমি ছিলাম তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ কর্মকর্তা তবুও আমি বড় ভাইদের আদরে এখানে কাজ করেছি। তখন আমাদের কাজের সময় ছিল সকাল ৭.৩০ মি. থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। এভাবে কয়েক দিন আসা-যাওয়া করে সময় কাটালাম। পরে এক দিন মিল্কী স্যার আমাকে ডাকলেন তার কক্ষে, তিনি ছিলেন অফিসের প্রধান। তিনি বললেন, মানজুমুল তুমি বিকেলে বাসায় গিয়ে কী করো? আমি বললাম গল্পগুজব করি। কোথায়? আমি উত্তর দিলাম স্যার বিভিন্ন স্থানে বন্ধুদের সাথে। বললেন, আমি বিকেলে গল্পগুজব করার সুন্দর একটি জায়গা করে দেব। তুমি সেখানে যাও ভালো লাগবে। বললেন, খুব সুন্দর জায়গা, প্রাকৃতিক পরিবেশ সুন্দর। এছাড়া সেখানে চা, মুড়ি, বিভিন্ন ধরনের ভাজা খেতে পারবে। আমি তার কথায় রাজি হলাম ও ওই দিন গল্পগুজব করার জন্য তিনি সেখানে নিয়ে গেলেন। সে জায়গা ছিল ফার্মগেটের আমাদের প্রেস ভবন এলাকায়। তিনি বললেন, আমরা এ সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এখানে বিকেলে এসে গল্পগুজব করব চা, মুড়ি খাবো। এখানে এসেই দেখলাম স্যার আমাকে একটি ভালো জায়গাতেই গল্পগুজব করার জন্য এনেছেন। এখানে প্রচুর কর্মচারী-কর্মকর্তা ছাপার কাজ করছেন। তারা বিভিন্ন ধরনের কৃষিবিষয়ক ম্যাগাজিন ও অন্যান্য জার্নাল প্রকাশনাসহ নিয়মিত পুস্তক-পুস্তিকা প্রকাশের কাজ করছে। আমি বুঝতে পারলাম মিল্কী স্যার আসলে আমাকে প্রেসের কাজের তদারকির ভারই আমার ওপর দিয়েছেন। তবে আমার বর্তমান গল্পগুজবের জায়গাও খুবই সুন্দর। আমি প্রতিদিনই বিকেলে এখানে এসে চা, মুড়ি খাই। এখানে কর্মকর্তাদের সাথে নতুন ধরনের কাজ করতে বেশ ভালোই লাগছে। পরে ঢাকার আশপাশে ও ঢাকার বন্ধু কর্মকর্তাদের জন্যও জায়গাটি আস্তে আস্তে বড় একটি গল্পগুজবের জায়গায় পরিণত হয়ে যায়। ঢাকার বাইরে কর্মরত বন্ধুরা যারা মাঝে মধ্যেই ঢাকায় আসেন তারাও এখানে বিকালে আসেন বসে সময় কাটিয়ে যান। বেশ ভালোই সময় যাচ্ছিল।


তাছাড়াও কৃষি তথ্য সার্ভিস পরিচালিত বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার অনেক প্রশিক্ষণে আমি অংশগ্রহণ করি। এগুলো ছিল কৃষি সম্প্রসারণ, আধুনিক মুদ্রণ, চলচ্চিত্র তৈরি ও এর মাধ্যমে তথ্য প্রচার, শ্রবণ মাধ্যমে ও শ্রবণদর্শনের মাধ্যমে কৃষি তথ্য তৈরি এবং কৃষি সম্প্রসারণ প্রচার বিষয়ে কাজ করা ফলে এসব বিষয়েও আমি দক্ষ হয়ে ওঠি। এ অবস্থায় একদিন প্রেস বিল্ডিং এলাকায় আমাদের আরও একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমার কাছে চা, মুড়ি খেতে এলেন। যার কথা না বললেই হয় না তিনি হলেন কৃষিবিদ ফজলুর রহমান স্যার। তিনি কৃষির সব ধরনের তথ্য বেতার, টিভি, চলচ্চিত্র প্রভৃতির মাধ্যমে প্রচারের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, তুমি তো প্রচুর শ্রবণ, শ্রবণদর্শন, চলচ্চিত্র প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছ। তুমি তো আরও একটি কাজ করতে পার। অমি বললাম, কী স্যার? স্যার বললেন, বেতারে কৃষিবিষয়ক সময়োপযোগী তথ্য প্রচারের জন্য কথিকা তৈরি করা। তা হলো দুপুরে বেতারে জাতীয়ভাবে ও আঞ্চলিকভাবে এবং সকালে আঞ্চলিকভাবে এসব কথিকা ও নাটিকা হিসেবে প্রচার করা। আমি তার কথায় রাজি হলাম এবং এরপর থেকে বেতারে এসব কথিকা লেখতে শুরু করলাম। এরপর আমরা কৃষি তথ্য সার্ভিসের বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কুশলীদের সহায়তায় আমি সকালে বেতার নাটিকা প্রচারের উদ্যোগ নেই। এজন্য আমি প্রতিদিন সমসাময়িক নাটিকা রচনা করি ও তা কর্মকর্তা-কুশলীদের সহায়তায় প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। এখানে আরও নাটিকার জন্য প্রচুর নতুন উৎসাহী কুশলীদের সমাহার হতে থাকে। প্রতিদিন নতুন কথিকা প্রচারের ব্যবস্থাও গ্রহণ করি। আমাদের এসব কার্যক্রম আমার দপ্তর এবং কৃষিবিষয়ক অন্যান্য দপ্তরের কাছে খুবই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। ফলে কৃষি তথ্য সার্ভিসের বিভিন্ন নতুন নতুন কার্যক্রম এবং এ বিষয়ক কর্মকর্তাদের সাথে আমার পরিচিতি ঘটে। আমার দিন বেশ সুন্দরভাবেই যাচ্ছিল। এসব কাজের মধ্যে আমাদের প্রেস বিল্ডিংয়ের পাশের ফাঁকা জায়গায় কৃষি কমপ্লেক্স ভবন নামে একটি বিশাল ভবনের গোড়াপত্তন হয় এবং শিগগিরই এ ভবন তৈরি হয়। প্রচুরসংখ্যক প্রকৌশলী ও কারিগরি জনবলের সহায়তায় এ ভবনটি তৈরি হয়ে দেখার মতো হিসেবে পরিণত হয়। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই এ ভবনে কৃষি সম্প্রসারণ ও প্রচারের অন্যান্য দপ্তরগুলোর জাতীয়পর্যায়ের কার্যালয়গুলো স্থান পায়। এ ভবনে আমাদের কৃষি তথ্য সার্ভিসের মূল ভবন স্থান পায় সবার সম্মুখে। কেননা এ কৃষি কমপ্লেক্স ভবন তৈরির গোড়াপত্তনই হয়েছে কৃষি তথ্য সার্ভিসের প্রদত্ত অর্থে।


অন্য দপ্তরগুলো এ ভবনে চলে আসার পরে প্রচুর লোকজনের সমাগম হয়। আমরা এ ভবনে বেসরকারি একটি শিল্পগোষ্ঠী গঠন করি। এতে সদস্য ছিলেন জনাব আফতাব, জনাব নাছির উদ্দীন ভূঞা, জনাব নূর হোসেন, জনাব শরীফ উল্লাহ্ এবং আরও অসংখ্য কৃষিবিদ ও বন্ধুরা। আমি এ শিল্পগোষ্ঠীর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেই। আমাদের সময় কৃষি সচিব হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মরহুম এজেডএম ওবায়দুল্লাহ্ খান। তিনি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তার লেখা অসংখ্য কাব্যগ্রন্থও রয়েছে ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তার আলাদা আকর্ষণ ছিল। তাছাড়াও দেশের অসংখ্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথেও তার দীর্ঘ দিনের যোগাযোগ ছিল। এসব বিষয় বিবেচনা করে আমাদের এ শিল্পগোষ্ঠীর বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে এ ভবনে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করার উদ্যোগ নেই। আমাদের তৎকালীন কৃষি সচিব মহোদয়কে এ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হতে অনুরোধ জানাই। তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। আমরা এজন্য একটি ছোট পুস্তিকাও প্রকাশ করি। আমরা এ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করি ফার্মগেটের খেজুরবাগানে কৃষি কমপ্লেক্স ভবন এলাকায়। এ ব্যাপারে সে সময়ের কৃষিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের আর্থিক ও সার্বিকভাবে বিশেষ সহায়তা করেছিল। তবে সর্বাধিক যে প্রতিষ্ঠানটি আমাদের সাহায্য ও সহায়তা দিয়েছিল তাহলো কৃষি তথ্য সংস্থা। আমরা আমাদের জনবল নিয়ে এখানে একটি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আয়োজন করি। ১৯৮২ সনের ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মি. আমরা আমাদের এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। এ উপলক্ষে আমাদের অনুষ্ঠিত কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কৃষি সচিব মহোদয় খুবই আন্তরিকভাবে উপভোগ করেছিলেন। কারণ আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি খুবই দৃশ্যমান হয়েছিল। এছাড়া এ কাজের জন্য আমাদের সংগৃহীত অল্প কিছু অর্থ দিয়ে আমাদের প্রকাশিত ম্যাগাজিনও সুন্দর মনঃপূত হয়েছিল। এ পত্রিকায় আমাদের কৃষিবিষয়ক সামগ্রিক তথ্যাবলি ও দেশব্যাপী কৃষিকার্যক্রমের সার্বিক কার্যক্রম বিস্তারের ব্যাপারে কৃষিবিষয়ক দপ্তর প্রধানরা সুন্দর ও সমসাময়িক  লেখনি দিয়ে এ পুস্তিকাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। এছাড়া আমাদের কিছু বন্ধু কৃষিবিদ ও অন্যান্য কার্যক্রমে চাকরিরত বন্ধুরা বেশ কিছু গল্প, কবিতাসহ অন্যান্য রচনা দিয়েও একে আকর্ষণীয় করেছিলেন। তবে যে কথা না বললেই নয় তাহলো পুস্তিকার জন্য আমার কিছু বন্ধু কৃষিবিদ ও অন্যান্য বন্ধুরা মিলে আমরা এ পুস্তিকার একটি নতুন নাম নির্বাচন করি আর তা হলো ‘খামারবাড়ি’।


এ ব্যাপারে আমাদের কৃষি তথ্য সংস্থার কলাকুশলীরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছিল। কিন্তু আমাদের তৎকালীন কৃষি কমপ্লেক্স ভবনের বেশ কিছু দপ্তর প্রধানের কাছে নামটি মনঃপূত হয়নি। এতে তাদের সাথে আমাদের কিছুটা মতভেদ প্রকাশ পায়। তারা আমাদের উৎসাহ দেখে আমরা যাতে এ নামে প্রকাশ  করতে না পারি সে চেষ্টা করে। সেজন্য তারা বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মন্ত্রণালয়সহ আমাদের অন্যান্য কাজে বাধা দেয়ার জন্য দপ্তরের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন গুপ্তচর নিয়োগ করেন। যাতে আমরা এ পুস্তিকাটি খামারবাড়ি নামে প্রকাশ করতে না পারি। আমাদের এ পুস্তিকায় আমার বন্ধু কৃষিবিদ সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের খামারবাড়ি নামে একটি সুন্দর ও আকর্ষণীয় চতুর্দশপদী কবিতা প্রকাশ পায়। কবিতাটি লিখিত হয়েছিল রবার্ট ফ্রস্ট নামে এক মার্কিন চারণ কবির  লেখা ফার্মহাউস কবিতার ছায়া অবলম্বনে। যেহেতু আমাদের অনুষ্ঠানটি ছিল বিজয় দিবস অনুষ্ঠানের স্মরণে তাই আমাদের স্বাধীনতার জন্য বিজয়ের আনন্দ ও সে সাথে তখন গ্রামের কৃষকের বাড়িঘর, মাঠের বিভিন্ন ফসল ক্ষেত, গাছপালা ও অন্য সবকিছুর কথা এ কবিতায় বলা হয়েছে। আমাদের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জনাব ওবায়দুল্লাহ খানের কাছে কবিতাটি খুবই ভালো লেগেছিল। তিনি একজন কবি মানুষ এবং কবিতাটির বিষয়বস্তু, আলোচনা প্রভৃতি তিনি খুবই গভীরভাবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কবিতাটির প্রতিটি কথা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। এছাড়া খামারবাড়ি কথাটিও এ ভবনের সব কর্মকাণ্ডের সাথে এক করে অনুধাবন করেছিলেন। এভাবেই আমাদের কৃষি সচিব মহোদয় এ ভবনের নামকরণ খামারবাড়ি নামেই প্রতিষ্ঠিত করবেন বলে পরে আশা ব্যক্ত করেন। যদিও আমাদের কৃষি বিভাগের সব দপ্তর প্রধান ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ইচ্ছা ছিল এটি কৃষি কমপ্লেক্স ভবন নামে প্রতিষ্ঠিত হবে। সে হিসেবে কৃষি সচিব মহোদয়কে তারা বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সচিব মহোদয় তার ইচ্ছাই তাদের কাছে জ্ঞাপন করেন এবং সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান। পরে এ ভবনটি খামারবাড়ি নামেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এগ্রিকমপ্লেক্স ভবনটি খামারবাড়ি নামেই সবার কাছে পরিচিতি পায়। ফলে আমরা যে কয়েকজন বন্ধু কৃষিবিদ, খামারবাড়ি নামটির প্রতি আমাদের মনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম তা প্রথমে কিছু বাধা পেলেও পরে এ নামেই ভবনটি পরিচিতি পায়। এজন্য আমাদের বন্ধু কৃষিবিদ ও বন্ধুদের মধ্যে আনন্দের ফোয়ারা বয়ে যায়।


পরে শুধু ঢাকা মহানগরীর কেন্দ্রীয় কৃষি কার্যালয়টিই নয় সারা দেশে জেলা, আঞ্চলিক ও উপজেলাপর্যায়ের কৃষিবিষয়ক দপ্তরগুলো ‘খামারবাড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এখন এসব দেখে আমরা খুবই আনন্দিত ও পুলোকিত হই। আমাদের কৃষি বিভাগের ছোট ছোট কৃষিবিদ ও চাকরিরত ভাইবোনেরা অনেকেই এ বিষয়টির ব্যাপারে জানেন না। তাই আমি এ ব্যাপারে কথাগুলো বললাম ও আমি আমার কথাগুলো জানিয়েও আনন্দিত হলাম। সে সাথে কৃষিকথার ৭৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগকেও সাধুবাদ জানাই।

 

লেখক:

কৃষিবিদ মানজুমুল হক*

* সাবেক উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
কৃষি উন্নয়নে কৃষিকথা

কৃষিকথার ৭৫ বছর পদার্পণে বিনম্রচিত্তে স্মরণ করছি যিনি যারা এর নামকরণ করেছেন, এর প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোগী হয়েছেন ইতিহাস সৃষ্টিকারী মানুষ হিসেবে নাম লিখিয়েছে সেসব বিশুদ্ধ মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অভিনন্দন আর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমার জীবনে কৃষিকথা অন্যরকম প্রেরণা আর মাইলস্টোনের মতো কাজ করছে আজ অবধি। যতটুকু মনে পড়ে আমার জীবনে প্রথম স্পর্শ করা কৃষিকথার প্রথম সংখ্যা ছিল পৌষ ১৩৮৭ সনের সংখ্যাটি। আমি ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরের দিন রাজনৈতিক সমস্যা ও জটিলতার জন্য ১১ মাস ভার্সিটি বন্ধ থাকে। ভার্সিটি খোলার পর একদিন পড়ন্ত বিকেলে নতুন বন্ধুদের নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইউনিভার্সিটির পুরাতন বিল্ডিংয়ের পাশে নদীর ধারে ঘুরতে গেলাম। নদীর কিনারে সাইনবোর্ড কৃষি তথ্য সার্ভিস লেখা একটি অফিস দেখলাম। দুরু দুরু পায়ে অফিসের ভেতরে গেলাম। যে মানুষটির সাথে প্রথম পরিচয় তার নাম জমশেদ আলী (মরহুম)। কথা বললাম। একখান কৃষিকথা কেনার জন্য বলে পুরো বছরের গ্রাহক হওয়ার কথা জানালাম। জমশেদ সাহেব খুব আগ্রহ করে আমার কাছ থেকে ১০ টাকা নিয়ে আমার আবাসিক ঠিকানা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪১ শহীদ শামসুল হক হলের নামে গ্রাহক ঠিকানায় রসিদ কেটে দিলেন। সে যে কৃষিকথার সাথে আত্মীক বন্ধনের যাত্রা হলো। আমি খুব গর্ব করে বলতে পারি যে আমিই একজন বিশেষ মানুষ যে কৃষিকথার ভালো লাগা থেকে গ্রাহক। পাঠক থেকে লেখক এবং লেখক থেকে জিম্মাদারি মানে কৃষিকথা প্রকাশের আহ্বায়কের দায়িত্বে নিয়োজিত আছি। আমি গর্ব করে বলতে পারি আমার জীবনে কৃষিকথার সময়কালে অন্তত ১০০টির বেশি লেখা কৃষিকথায় স্থান পেয়েছে। এখন কৃষিকথা কার লেখা কি লেখা, কেমন লেখা কখন যাবে তা নির্ধারণ করার মূল দায়িত্ব নিয়ে খুব গর্ববোধ করি। আর ৭৫ বছরের উদ্বোধনী সংখ্যাও আমার সংশ্লিষ্টতায় প্রকাশিত হচ্ছে এটি আরো বেশি সুখকর বিষয়।


কৃষিকথা আমার জীবনে এ অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। একনিষ্ঠ পাঠক, সুলেখক এবং কৃষিকথা প্রকাশের অভিজ্ঞতা দিয়ে মুনশিয়ানা শিখিয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই কৃষিতে সাহিত্য কিংবা সাহিত্যে কৃষির বিগলিত হওয়া কৃষিকথাই আমাকে শিখিয়েছে। আমিও কৃষিকথাকে ধারণ করে লালন করে এসেছি অন্তত ৩৫ বছর ধরে। কৃষিকথার যে সংখ্যা আমার জীবনে সুন্দরের উপমা হিসেবে এসেছে সেটির আঙ্গিক বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়- সেটি ছিল ৪১তম বর্ষের ৯ম সংখ্যা। ডিসেম্বর-জানুয়ারি ১৯৮১ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত। সে সংখ্যার প্রধান সম্পাদক ছিলেন আ.কা.মু গিয়াস উদ্দীন মিলকী (মরহুম)। যুগ্ম সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, সহযোগিতায় মু. ছমিরুদ্দীন খাঁ (মরহুম) এবং কেবিএম মাহফুজ এলাহী। প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন প্রাণের মানুষ প্রাণেশ কুমার মণ্ডল (প্রয়াত)।  সংখ্যাটির মূল্য ছিল ১ টাকা। তখন কৃষিকথার সডাক মাশুল ছিল ১০ টাকা। গ্রাহক হয়েছি বলে জমশেদ সাহেব আমাকে পৌষ সংখ্যাটি বিনে পয়সায় দিয়েছিলেন। আমি তো খুশিতে আটখানা। সে সংখ্যায় যে লেখাগুলো প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো ছিল ০১. স্বনির্ভরতা অর্জনে আলু চাষ-কামাল উদ্দীন আহমদ (মরহুম), ০২. বীজ বাছাই ও বীজতলায় বীজ বপন- মো. ওয়াজি উল্লাহ, ০৩. শস্যের পর্যায়ক্রম চাষ-মনোয়ার হোসেন, ০৪. গমের রোগ ও তার প্রতিকার-হীরালাল দেবনাথ, ০৫. প্রেষণা- মো. হোসেন ভূঞা, ০৬. এই মন এই মাটি-মীজানুর রহমান শমশেরী, ০৭. ধানের দেশে প্রাণের চাষি-অনীক মাহমুদ, ০৮. বাংলাদেশের মাটি- মো. ইকবাল হোসেন, সমিতি-ওসমান গণি, ০৯. ভেষজ উদ্ভিদ-হোসনে আরা, ১০. বাংলাদেশে ব্যাঙ চাষের সম্ভাবনা-গোলাম কিবরিয়া (মরহুম), ১১. কৃষি প্রশিক্ষায়তন পরিচিতি তাজহাট-একেএম আনোয়ারুল কিবরিয়া (মরহুম), ১২. পচা ডিম পচা মন- মোহাম্মদ মোস্তফা আলী (মরহুম), ১৩. প্রশ্নোত্তর মু. ছমিরুদ্দীন খাঁ (মরহুম), ১৪. লেখক পরিচিতি এবং ১৫. আমাদের কথা। ৩৫৭ থেকে ৪০৪=৪৮ পৃষ্ঠাব্যাপী কৃষিকথাটি আমার জীবনে পড়া এবং লেখা দুটোই অমৃতের মতো স্বাদ পাইয়ে দিয়েছিল। সংখ্যাটি আজো আমি যতন করে রেখে দিয়েছি। শুধু তাই না বলতেই হয় নিজের সখে এবং নেশায় ১৯৫০ সনের কাছাকাছি সময় থেকে এ যাবৎকালের সব সংখ্যা কৃষিকথা আমার সংরক্ষণে আমার ব্যক্তিগত ভুবনের লাইব্রেরিতে জমা আছে খুব সযতনে।


এরপর থেকে কোনো দিন কৃষিকথা থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি। পুরোদস্তুর কৃষিকথার লেখক হিসেবে সম্পৃক্ত হই ১৪০৫ সনের ভাদ্র সংখ্যা থেকে বৃক্ষ ও বন্ধু আমার শিরোনামে। সিলেটে চাকরির সুবাদে কৃষি তথ্য সার্ভিসের আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার হিসেবে লিখেছিলাম সিলেটের বৃক্ষপ্রেমিক আফতাব চৌধুরীকে নিয়ে। এরপর কত লেখা কত বিশ্লেষণ। মনে পড়ে বিশেষ কারণে কোনো এক কার্তিকের সংখ্যা কৃষিকথায় একসাথে আমার ৩টি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এ মাসের কৃষি নির্দিষ্ট লেখা, বিশেষ লেখা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ফরমায়েশি লেখা মিলে মোট ৩টি। কৃষিকথার ১৪১১ সনের একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ধান সংখ্যা হিসেবে। কত শত সহস্রর প্রশংসা যে পেয়েছি সে সংখ্যা ছাপানোর জন্য, তার গল্প বলে শেষ করা যাবে না। এত বছর পরেও সে সংখ্যাটি অতি মূল্যবান ধানের তথ্যবহুল সংখ্যা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। পুরো কৃষিকথা গ্লসি পেপারে সম্পূর্ণ রঙিন ছিল ইরি পেট্রার আর্থিক সহযোগিতায়। মানজুমুল হক, মতিয়ার রহমান, মেজবাহ উদ্দিন এবং আমি এ চারজন মিলে এক সপ্তাহের মধ্যে অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে সংখ্যাটি আলোর মুখ দেখে। সে সংখ্যাটি আজো হাতে নিলে অনন্য সংখ্যা হিসেবে গর্ব অনুভব করি।


কৃষিকথার রিদমই আলাদা। এখানে বৈজ্ঞানিক লেখা যেমন থাকে, গবেষকদের লেখাও থাকে, থাকে সম্প্রসারণবিদদের লেখাও। তাছাড়া যাদের আমরা সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে গণ্য করি তারাও লেখেন। ছাত্র শিক্ষক আমলা এদের লেখাও সম্মানের সাথে ছাপানো হয়। অনেক প্রথিতযশা লেখক কৃষিকথায় লিখে ধন্য করেছেন কৃষিকথাকে। কৃষিকথা অনেকে স্বনামে ধন্য লেখকের লেখা যেমন ছাপিয়েছে তেমনি নবীন আনকোরা লেখককে সুলেখকে পরিণত করেছে। এখানে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক লেখা, সফলতার কাহিনী, সাক্ষাৎকার, প্রশ্নোত্তর, রম্য রচনা, কবিতা, গান, গল্প, কার্টুন, ভ্রমণকাহিনী কিনা ছাপানো হয়েছে পরতে পরতে। অনেকেই অপবাদ দেন কৃষিকথার কোনো মাত্রিক পরিবর্তন হলো না। আসলেই কি তাই? বিনয়ের সাথে বলি সময়, সুযোগ, ক্ষমতা, অজস্র সীমাবদ্ধতা নিয়ে কৃষিকথা আজ ৭৫ বছরে পদার্পণ করেছে। সুবর্ণজয়ন্তী, রজতজয়ন্তী পেরিয়ে হীরকজয়ন্তী পালন করছি। এটি অনেক বড় প্রাপ্তি আর গর্বের বিষয়। এটি আমাদের জন্য কম পাওনার কথা নয়। সে কবেকার কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং থেকে ঢাকার ইডেন বিল্ডিং হয়ে ফার্মগেটের খামারবাড়ি ৭৫ বছরের জার্নি সুন্দর সুশীলন নিখুঁত গাঁথা আর হৃদ্দিক বুননের ইতিহাস। আগামী ২০৪০ সালে কোনো একদিন শতবর্ষও পালিত হবে। তখন এখনকার অনেকেই থাকব না। কিন্তু কৃষিকথা থেকে যাবে অনন্তকাল ধরে। প্রকাশিত হবে বহুমাত্রিক ভিন্ন আঙ্গিকে। কৃষিকথা শতায়ু হোক সার্বিকতায় সুন্দরে মোহনীয় আর আকর্ষণীয় লেখালেখিতে মনে প্রাণে এ কামনা থাকল ।


উন্নয়নের ধারাবাহিকতা কি? দেখতে হবে বুঝতে হবে শিখতে হবে কাজে লাগিয়ে প্রমাণ করতে হবে। কৃষিকথা তো তাই করছে। খুব সাধারণ সহজ সরলভাবে কঠিনতম বিষয়কে ঝরনার মতো কলকল ধ্বনীতে, মাছের উছলানো শব্দের রিদমে বিলিয়ে দেয় উচ্ছ্বাসে সবার অনুধাবনের জন্য। শত সহস্র মানুষ কৃষিকথার লেখা পড়ে জেনেছে উদ্বুদ্ধ হয়েছে এবং নিজের আঙিনায় বাস্তবায়ন করেছে। নিজে সমৃদ্ধ হয়েছে পাশের জনকে অনুপ্রাণিত করেছে। চূড়ান্তভাবে কৃষির সমৃদ্ধি সফলতা সুনিশ্চিত করেছে। কৃষিকথার প্রতিটি আঙ্গিকের লেখা মোহনীয় আকর্ষণীয় জাদুকরী। কেউ লেখা পড়ে কেউবা গল্প পড়ে আবার কেউবা কবিতা পড়ে নিজের ভুবনে বাস্তবায়ন করে সফলতা পেয়েছে। কৃষিকথার মূল গর্বিত অংশ কৃষি তথ্য ও প্রযুক্তি। নতুন পুরনো মিলিয়ে বারবার লেখকের মনকে উদ্যোমী করে তোলে।


আমরা বলি চাষের কথা চাষির কথা পাবেন পড়লে কৃষিকথা। কৃষিকথায় আছে রে ভাই হরেক রকম তথ্য, শস্য, মাছ, হাঁস মুরগি সমন্বিত সত্য। কৃষিকথা কৃষকের কাজের কথা বলে, কৃষকের সফলতার কথা বলে। কৃষকের জন্য আবিষ্কার উদ্ভাবনীর কথা বলে। মোট কথা আপামর কৃষকের চাহিদার কথা ভেবে মৌসুম উপযোগী করণীয় সম্পর্কে তথ্য ও প্রযুক্তি সম্প্রচারের জন্য কৃষিকথা বিভিন্ন আঙ্গিকে তথ্যপ্রযুক্তি সরবরাহ করে। কৃষকদের সুখ দুঃখ বেদনা হাসি কান্না সব কিছুই কোনো না কোনোভাবে কৃষিকথায় স্থান পায়। আর এজন্য ৭৫ বছর ধরে কৃষিকথা কৃষক ও কৃষির প্রধান মুখপত্র হিসেবে কাজ করছে। কৃষিকথা বিভিন্ন গবেষক বিজ্ঞানী সার্ভিস প্রোভাইডার এবং উদ্যোগী কৃষকদের আসল চাহিদা আবিষ্কার উদ্ভাবনের প্রতি তীক্ষ্ম নজর রাখে। আর সময় উপযোগী করে সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে ছাপার অক্ষরে বিলিয়ে দেয়। ৭৫ বছরের ইতিহাসে কৃষিকথা কৃষি ও কৃষকদের চাহিদা উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির বাইরে যায়নি কখনো। বরং অনেক সমস্যা বাধা পেরিয়ে উন্নয়ন সমৃদ্ধির কথাই বলে গেছে। এক বিন্দুও বিচ্যুৎ হয়নি।


কৃষিকথার বর্তমান গ্রাহকসংখ্যা ৫০ হাজারের মতো। আমাদের জরিপ বলে ১টি কৃষিকথা অন্তত ১০ জন পাঠক পড়ে। সে হিসাবে কৃষিকথার পাঠক সংখ্যা ৫ লাখের ওপরে। এ ৫ লাখের ১০% যদি কৃষিকথা ছাপানো তথ্যপ্রযুক্তি নিজের আঙিনায় বাস্তবায়ন করে তাহলে হাজার লাখো কৃষকের আঙিনা ফুলে ফলে মসলা আর সবুজ শ্যামলিমায় সুশোভিত হয়ে ভরে উঠে আমাদের বিশ্বাসের শস্যভা-ার। কৃষিকথায় ছাপানো লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে কতশত পাঠক ছুটে এসেছেন ঢাকার খামারবাড়িতে কৃষিকথার সদর দপ্তরে। লেখকের সাথে আরো নিবিড় বিস্তারিত আলাপ আলোচনার জন্য। আমরা হৃদ্দিক সেতুবন্ধনের কাজ করেছি। দুই পক্ষ মিলে নতুনের সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেছে এর পরই এবং আপন ভুবনে তার প্রমাণ রেখেছে। কৃষিকথার লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে এক যুবক বস্তা ভরে শাকসবজি নিয়ে খামারবাড়িতে এসেছে, আমাকে ও আমদের দেয়ার জন্য। যুবকের কথা... কৃষিকথার লেখা আর কৌশল মতো আমি চাষ করেছি এবং লাভবান হয়েছি। এগুলো আপনাদের জন্য তোহফা আমার অন্তর থেকে...। ফিরাতে পারিনি যুবককে। একবার আমার একটা গল্প সুবর্ণ গ্রাম পড়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে এক যুবক ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এসেছেন সে আমার সাথে সুবর্ণ গ্রাম দেখতে যাবে বলে...। আরেকবার হলিসিটি সিলেট থেকে এক যুবক এসেছেন আমার লেখা রকমারি মনোহরি পড়ে রকমারি ফার্মিং কমপ্লেক্সের প্রধান আহসান হাবিব সাজুর সাথে কথা বলতে। কৃষিকথা কথা পড়ে কতজন জিরো থেকে হিরো হয়েছেন তার হিসাব নেই। আমরা তখন খুব গর্ব করি যে কৃষিকথার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে তারা আলোকিত সমৃদ্ধ কৃষি ভুবনের গর্বিত বাসিন্দা হয়েছেন। কৃষিকথা এভাবেই কৃষি উন্নয়নের মূলমন্ত্র বিলিয়ে দিয়ে আপামর সবাইকে মানসিকভাবে পারিপার্শ্বিকভাবে উদ্বুদ্ধ করে কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তোলে অনেক দূরের বাতি ঘরে নিয়ে যায়।


অনেকেই জিজ্ঞেস করেন কৃষিকথা কারা পড়েন? বিনয়ের সাথে বলি সবাই পড়েন। কৃষক যেমন পড়ে ছাত্র, শিক্ষক, উদ্যোগী ব্যবসায়ী, গৃহবধূ কিষাণ বধূ উন্নয়ন কর্মী গবেষক, বিজ্ঞানী, চাকরিজীবী ও বেকার সবাই পড়েন। কৃষি কাজ যদি কৃষি উন্নয়নের ধারাবাহিকতা হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে বলব কৃষিকথা কৃষি কাজের এক ধারাবাহিক সময়োপযোগী গাইড লাইন, মাইলস্টোন। চলমান বাজারে অনেক ফার্ম ম্যাগাজিন আসে বুক ফুলিয়ে রঙিন হয়ে আবার হারিয়ে যায় মাথা নিচু করে অন্ধকারের অমানিশায়। কৃষিকথা সে যে ৭৪ বছর আগে ১০৪১ সালে যাত্রা করেছিল। হারিয়ে যায়নি থেমে থাকেনি। চলছে আপন মহিমায়। চলবেও আরো বহু দিন ধরে।


ধান উৎপাদনের ট্রেন্ডে সে যে ১ কোটি ১০ লাখ টন থেকে এখন পৌনে ৪ কোটি টনে পৌঁছলে এতে কৃষিকথার কোনো অবদান নেই? ধানের উৎপাদন ৩ গুণেরও বেশি, গম ২ গুণ, সবজি ৫ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুণ গম ভুট্টাসহ এর পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি টন হয়েছে, এখানে কৃষিকথার কোনো ভূমিকা নেই? বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১১ লাখ টন বীজ ব্যবহার হয় তার মধ্যে বিএডিসি সরবরাহ করে মাত্র ধানের ৩৫-৪০ ভাগ এবং অন্যান্য ফসলের ১০-১২ ভাগ এ খানে কৃষিকথার কি কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই? মাছ উৎপাদনে আমরা যে চতুর্থ স্থান দখল করেছি এতে কৃষিকথার কোনো বিনিয়োগ নেই ডিম দুধ পোলট্রি খামার ব্রয়লার মাংসের যে অভাবনীয় অগ্রগতি এতে কৃষিকথার কোনো অবদান নেই? ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কৃষি খামার স্থাপন, সমন্বিত খামার প্রতিষ্ঠা, খামার যান্ত্রিকীকরণ ও সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ এবং এলসিসি, এডব্লিওডি, গুটি ইউরিয়া, মিশ্র সার, হাত পরাগায়ন, আইপিএম, আইসিএম, আইএফএম, ...প্রযুক্তির বহুল ব্যবহার এখানে কৃষিকথা কী করছে একটু ভাবলেই উত্তর পাওয়া যাবে। আছে আছে অনেক আছে। গ্রামীণ চাষি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র, ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা তাদের জিজ্ঞেস করুন কৃষিকথা কী করছে কৃষি উন্নয়নের মূল স্রোতধারায়?। হিসাব কষে দেখলে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। কৃষিকথা ধীরে নীরবে নিভৃতে কৃষি উন্নয়নে কৃষি শিক্ষায় কৃষি দক্ষতা অর্জনে অসামান্য অবদান রেখে চলছে।


কৃষিকথা কৃষি উন্নয়নের কোন শাখা বা অংশকে কভার করছে তা তো আমরা সবাই জানি। মাছ ফসল, উদ্যান ফসল, মসলা, ফুল, ফল, বাহারি, মাছ, গবাদিপশু, পশুপাখি, পরিবেশ, পুষ্টি, জলবায়ু আবহাওয়া, এ সময়ের কৃষি, সমসাময়িক কৃষি, কৃষির সমস্যা ও সমাধান সব থাকছে পরতে পরতে। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের সব ক’টি সেক্টরে এমন অভাবনীয় নিরবচ্ছিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি সেবা কে-ইবা দিচ্ছে। বিজ্ঞান গবেষণা জরিপ আর সৃষ্টিশীল ভাবনার ফলাফলগুলোকে সহজ সরল বোধগম্য করে প্রকাশ করা হয় আমাদের মূল অভীষ্ট দলের জন্য। তারা পড়ে বুঝে কাজে লাগায় নিজ আঙিনায় আপন ভুবনে। এ তথ্যপ্রযুক্তি বাস্তবায়নের কারণে কিংবা ফলশ্রুতিতে আশার আলোগুলো শাখা-প্রশাখা ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে সবুজ শ্যামল বাংলার সমৃদ্ধিতে অসামান্য অবদান রাখছে। এ কথা অস্বীকার করব কেমন করে। কৃষিকথা কৃষি উন্নয়নের গাইড লাইন মাইলস্টোন।


কৃষি প্রধান বাংলাদেশের কৃষিতে সাফল্য ঈর্ষণীয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রতিনিয়ত কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অনুসরণীয় উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ ঊর্ধ্বগতিতে। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে অষ্টম, আম উৎপাদনে নবম... আর মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, খনিজসমৃদ্ধ ও দুর্যোগ সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও উল্লিখিত নামের শীর্ষে বাংলাদেশের নাম। মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরে প্রায় ৭ কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হয়েছে দেশকে। তখন আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হতো। অথচ এখন দেশের লোকসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি, পাশাপাশি আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। আমন, আউশ ও বোরো ধানের বাম্পার ফলনে বছরে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি  টনের বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদনের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। দানাদার ফসলের সাফল্যের সাথে গম ভুট্টা তো আছেই। কৃষির এ সাফল্য সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বে ধানের গড় উৎপাদনশীলতা প্রায় ৩ টন, আর বাংলাদেশে তা ৪ দশমিক ১৫ টন। তা ছাড়া ৮৫-৯০ লাখ টন আলু উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায়। সাড়ে ১০ লাখ টন আম উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্বে নবম স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তাছাড়া হেক্টরপ্রতি ভুট্টা উৎপাদনে বৈশ্বিক গড় ৫ দশমিক ১২ টন। বাংলাদেশে এ হার ৬ দশমিক ৯৮ টন। খাদ্যশস্যে প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৩৪ টন উৎপাদন করে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পরে রয়েছে আর্জেন্টিনা, চীন ও ব্রাজিল। বাংলাদেশ এখন চাল, আলু ও ভুট্টা রফতানি করছে। গত ২৬ ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কায় প্রথমবারের মতো চাল রফতানি শুরু করে সরকার। এসব ক্ষেত্রে কৃষিকথা কোনো অবদান নেই। আছে আছে অনেক আছে। আমাদের কিছু কঠিন সীমাবদ্ধতার জন্য কৃষিকথা আরো মোহনীয় কার্যকর করতে পারছি না। প্রতিশ্রুতি থাকল আমাদের সাধ্যের সীমানা অতিক্রম করেও আমরা পাঠক কৃষি ও কৃষকের চাহিদার ষোলোকলা পূর্ণ করা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছবই। আর বিশুদ্ধভাবে বলি প্রিয়পাঠক এবং সম্মানিত উন্নয়নের মহানায়ক কৃষক আপনারা আমাদের উচ্ছ্বসিত প্রাণের উচ্ছ্বাসের উৎস গর্বের মূলমন্ত্র।

 

লেখক:

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*

* উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, subornoml@gmail.com

বিস্তারিত
কৃষি ও কৃষিকথার জন্য শুভাশিস

সুপেয় পানি  আর সুফলা মাটির আকর্ষণে যাপিত যাযাবর জীবন সঙ্গে করে বসতি স্থাপন করে মানুষ। সূচনা করে কৃষি, আর তাই কৃষি আদৃত হয় সব কৃষ্টি আর সভ্যতার জননীরূপে। মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপন করতে পারলেও তৈরি করতে পারবে না একটি শস্যদানা বা এক ফোঁটা দুধ, দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্য। আদি থেকে অনন্তকাল অবধি প্রকৃতির কাছে করজোড়ে উদ্বাহু হয়ে প্রার্থনা করতে হবে ফল-ফসলের জন্য। প্রকৃতিও একদিনে ধরিত্রীকে পুষ্পপল্লবকুঞ্জে ভরপুর করেনি। আজকের কৃষির অর্জন যুগ যুগান্তরের ঘাত-প্রতিঘাত, ভাঙ্গা-গড়া জোয়ার-ভাটার অবধারিত ফল-ফসল। প্রকৃতির বিরূপতার চেয়েও কর্মজীবী জনগোষ্ঠীকে অধিক আহত করেছে রাজা আর রাজনৈতিক উত্থান-পতন।


ফিরে দেখা : প্রাচীন বাংলার সম্রাট অশোক থেকে হর্ষবর্ধন এমনকি পাল ও সেন শাসনামলে কৃষি, কুটির শিল্প, স্বর্ণ রৌপ্যের গয়না, মসলিন ও বাণিজ্যে উন্নত ছিল। চার হাজার বছর পূর্বেও ঢাকার মসলিন দ্বারা মিসরের মমি আবৃত হতো। প্রধান খাদ্য শস্য ধান ছাড়াও গুড়, চিনি, তুলা, সরিষা, আম, কাঁঠাল, ডালিম, নারিকেল, কলা ইত্যাদির প্রাচুর্য ছিল। মধ্যযুগে মুসলিম শাসন, সুলতান ও নবাবি আমলেও দুঃসময়ে খাজনা মওকুফ, কৃষি ঋণ, খাল খনন, ধর্মগোলায় খাদ্য সংরক্ষণ করে দুর্ভিক্ষের সময় বিতরণের মতো রাষ্ট্রীয় অনুকূল্য, সুশাসন ও কৃষিবান্ধব নীতির ফলে রেশমি বস্ত্র, স্বর্ণ-রৌপ্য বাণিজ্য সর্বোপরি কৃষি পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে সত্যিকার সোনার বাংলায় পরিণত হয়েছিল (নওয়াজ, আ: ১৯৮৯)। কৃষকের ‘গোলা ভরা ধান গোয়াল ভরা গরু পুকুর ভরা মাছ’ সমকালীন সময়ের বাস্তবতার প্রতিধ্বনি। দুর্ভাগ্যক্রমে ইংরেজ শাসন আমলের দীর্ঘসময় ধরে দুঃশাসন, শোষণ, নির্যাতন, অবাধে সম্পদ পাচারের ফলে নেমে আসে বার বার দুর্ভিক্ষ। কৃষক ও কুটির শিল্প সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। কৃষককূল পরিণত হয় ‘চলমান নরকঙ্কালে’। পাকিস্তান আমলেও চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে কৃষির ন্যূনতম উন্নতি হয়নি।


অর্জন : স্বোপার্জিত স্বাধীনতা পরবর্তী চার দশকে কৃষির অর্জন গৌরবের তবে আত্মতৃপ্তির নয়। দেশ খাদ্যে স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে। দানা শস্যের উৎপাদন বেড়েছে চার গুণ, সেচায়িত হচ্ছে ৬০% জমি। বিগত দুই দশকে সারের ব্যবহার বেড়েছে দ্বিগুণেরও অধিক। এ মাটির নিবেদিত প্রাণ বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন বৈরী জলবায়ুসহিষ্ণুসহ ৬০টিরও অধিক ধান জাত, ১৩৪টি ফল, ৭৬টি সবজি, ১৩টি মসলাসহ বিভিন্ন প্রাণী সম্পদের প্রায় চার শতাধিক জাত। পাটের জিনোমসিকোয়েন্স নির্ণয় যুগান্তকারী প্রাপ্তি। জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বল্প সময়ে অধিক চারা উৎপাদন ও বাণিজ্যিক ব্যবহার।  প্রান্তিক কৃষিকে প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় অর্জিত সাফল্যের দাবিদার সংশ্লি­ষ্ট নিবেদিত জনগোষ্ঠী। গ্রিন সুপার রাইসকে স্বাগত জানাতে তৈরি রয়েছি আমরা। ১৯৫২ সনে প্রণীত আইনে কৃষি ছাড়া অন্য কোনো কাজে কৃষি জমি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলেও তার বাস্তবায়ন আজ আকাশ কুসুম কল্পনা। নদী, বন, জলা, আবাদি জমি দখল কৃষিকে ঠেলে দিচ্ছে প্রান্তিকে প্রতিদিন বেদখল হচ্ছে ২২০ হেক্টর আবাদি জমি বছরে কমছে ১% হারে। Hybrid এর মালিকানা Unstable Hybrid এর বদলে Perpetual Hybrid  বীজ উৎপন্ন করতে হবে যেন বার বার সংকর বীজ না কিনতে হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাধ্যমে কৃষিকথা, সম্প্রসারণ বার্তা, কৃষি ডাইরি, ফোল্ডার, পোস্টার ছাড়াও রেডিও সম্প্রচার, টেলিভিশনে সম্প্রচার, মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার, ই-কৃষি, ই-গভর্নেন্স, ই-কমার্সের মাধ্যমে সচেতনতা, দক্ষতা বৃদ্ধির অব্যাহত প্রয়াস প্রশংসনীয়। ডিজিটাল এক্সটেনশন কর্মসূচির আওতায় ই-কৃষি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে।


প্রতি কৃষি অঞ্চলে কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষিসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ও সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আগামী ৫ বছরে প্রতিটি গ্রামে এই সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। উৎপাদন, বিতরণ, ব্যবহার, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ এর মতো সম্ভাবনাময় প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়িই হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ, হবে বসতবাড়ির বাগান স্বনির্ভরতার সোপান। কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের ফলাফল-প্রযুক্তি সংবলিত ওয়েবসাইট বিশেষভাবে কৃষি তথ্য সার্ভিসের হাল নাগাদকৃত ওয়েবসাইট, প্রযুক্তি, প্রয়োগ সংক্রান্ত, জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়াস কৃষকের হাতের মুঠোয়। যন্ত্রের যন্ত্রণা প্রশমন করে প্রযুক্তির যৌক্তিক অংশকে ধারণ করে রোটারি টিলার, বীজ বপন, চারা রোপণ, ইউরিয়া প্রয়োগ, ধান, গম কর্তন, মাড়াই যন্ত্র, সর্বক্ষেত্রে সঠিক ও দক্ষ প্রয়োগ কাজ সহজীকরণ, সময় সাশ্রয়, গুণগতমান বৃদ্ধি, সর্বোপরি শিক্ষিত যুবকদের আকর্ষণ করেছে। ‘চাষা ভুসার পেশা নয়’ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর গর্বিত পেশার রূপ লাভ করেছে কৃষি।


অন্তরায় : জ্ঞানেই শক্তি-যুক্তিতেই মুক্তি। দুর্ভাগ্য মাঠে কর্মরত কৃষকের ৮৫% এর শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণির নিচে, ১০% দশম শ্রেণিরও কম।  দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি, প্রতি বছর যোগ হচ্ছে ২০ লাখ। হতদরিদ্র চরম দরিদ্র প্রায় ৪ কোটি লোক গতিময় কোনো আর্থিক কর্মকাণ্ডে শামিল হতে পারছে না ফলে তাদের আয়ের ৮৭% ব্যয় হয় শুধুমাত্র খাদ্য ক্রয়ে। কৃষি জমি প্রতি বছর ১ লাখ হেক্টর হ্রাস পাচ্ছে। আবাদি জমি জৈব পদার্থ ১% এর চেয়েও কম, এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের সঙ্গে বিষফোড়া হয়ে দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান শিকার বাংলাদেশ। তবু ২০২০ সালে মধ্যে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে ৪ কোটি টনেরও অধিক। সবজি, ফল, মাছ, মাংস, ডাল, তেলের উৎপাদন বাড়াতে হবে ২-৩ গুণ, সবচেয়ে দুর্দমনীয় আকার ধারণ করেছে কৃষি জমি, নদী, খাল-বিল, পাহাড় ও বনভূক মানুষ নামের দানবের তা-ব, এদের থাবার বাইরে কি ফসলি জমি আদৌ কৃষকের হাতে থাকবে? ‘বাংলাদেশে দেবী লক্ষ্মী নন্দী ভৃঙ্গীদের কব্জায়, দেবী সরস্বতি অধবোদনে চিন্তান্বিতা ‘(রহমান, হা-২০১০)’


করণীয় : পবিত্র কুরআন দৃষ্টান্ত, উদাহরণ, প্রতীক, উপমা, তুলনা ও রূপক হিসেবে ন্যূনতম ৬০টি সূরায় এবং ২৫০টিরও অধিক আয়াতে কৃষি ও এর বিভিন্ন শাখার উল্লেখ ও পুনরুল্লেখ করা হয়েছে মানুষের উপলব্ধি শাণিত করার প্রয়াসে এবং তদানুসারে অনুসন্ধান ও গবেষণা করে কৃষিকে অগ্রগতির চরম শিখরে উত্তীর্ণ করতে। আদি পিতা আদমকে (আ.) নাকি মাটি বার্ধক্যজনিত কারণে তার সন্তানদের খাদ্য জোগান দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছিল। তারপর পেরিয়েছে কত শত সহস্র যুগ। কিন্তু আমাদের মাতৃসম মাটির বার্ধক্যরোধে, ক্ষয়পূরণে, উৎপাদনক্ষম রাখতে ক্রমবর্ধমান অবহেলা, পীড়াদায়ক, আত্মঘাতী। ‘ফসলদানা কৃষকের আর বাকি অংশ মাটির পাওনা’ এ নীতির বাস্তবায়ন জরুরি।


বর্ধিত জনসংখ্যার ক্ষুণ্নিবৃত্তির তাগিদে সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, লাগসই পরিকল্পনা, উৎকৃষিত প্রযুক্তি প্রয়োগে নিবেদিত কর্মী বাহিনী নিরবচ্ছিন্ন তদারকি ও সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে বর্ণিত কর্মকা- সম্পাদন অত্যাবশ্যক। নিবেদিত প্রাণ বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণবিদ ছাড়াও আমাদের রয়েছে প্রত্যয়ী কৃষকের বলিষ্ঠ হাত। পরিকল্পিত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কৌশল, অকৃষি কাজে ফসলি জমি ব্যবহার রোধ, ভূমিহীনদের মাঝে খাস জমি জলা বরাদ্দ, ক্ষুদ্র বর্গাচাষিদের উপকরণ ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা, দক্ষ বাজারব্যবস্থা, সমর্থন মূল্য নিশ্চিত করা, পরিকল্পিত শিল্প স্থাপন নগরায়ণ, অবাধ তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, মহার্ঘ পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ জলাধার নির্মাণ, শস্য, প্রাণী উৎপাদনে রাসায়নিকের ব্যবহার সীমিতকরণ, শস্যবীমা, কৃষকের স্বাস্থ্য বীমা, নিরন্তর গবেষণা, উপকারভোগীদের গবেষণায় সম্পৃক্তকরণ, ঘাতসহিষ্ণুশস্য প্রাণিজাত উদ্ভাবন, জৈব প্রযুক্তি উদ্ভাবিত শস্যের প্রসার ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি তথা নিরাপত্তার সহায়ক হবে। আগামীর কৃষি হবে ‘বীজ বপন, কালক্ষেপণ, সৌরশক্তি আহরণ, যার সম্ভাবনা অফুরন্ত। পৃথিবী পৃষ্ঠে পতিত সূর্য শক্তির এক ভাগেরও কম সবুজ বৃক্ষলতা কর্তৃক আহরিত হয়। সি-৪ জাতীয় শস্যের আধিক্য, খাড়া পুরু পাতাযুক্ত শস্যজাত উদ্ভাবন, বহুস্তর বিশিষ্ট ফলবাগান, সাথী ফসল, আন্তঃফসল, রিলে ফসলের মাধ্যমে মাঠ ফসলে অধিক হারে সৌরশক্তি ব্যবহারের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। সেই সঙ্গে সম্ভাব্য সব স্থানে ফলজ ও বনজ বৃক্ষরোপণ করে সবুজের সমারোহে ভরিয়ে দিতে হবে। দেশের সব নাগরিকের খাদ্য উৎপাদনে মৌলিক ধারণা থাকা অপরিহার্য, তাই নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে কৃষি বিজ্ঞান আবশ্যিক বিষয়রূপে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। স্বল্প পরিমাণ জমিতে স্থাপনযোগ্য বিধায় ছোট আকারে গো-খামার, মুরগি খামারের মাধ্যমে প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধির অমিত সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ জলাশয়, নদী, সমুদ্র এলাকায় পরিকল্পিত মৎস্য চাষের সুযোগ নিতে হবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আলোকে। স্বোপার্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে মৌলিক চাহিদার সর্বাগ্রগণ্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্রতী হতে হবে।   


কৃষিকথা : ‘চাষের কথা-চাষির কথা/ পাবেন পড়লে কৃষি কথা’ এ স্লোগানটিই অতি সহজ সাবলীল ভাষায় কৃষিকথার স্বকীয় পরিচয়ে পাঠকের নিকট আদৃত। সে আজকের অবস্থানে এসেছে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে। তার চলার দীর্ঘপথ পরিক্রমা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কৃষি কথা আমার চেয়ে ৫ বছরের জ্যেষ্ঠ। তার মূল্যায়নের গুরুভার নেয়ার যোগ্যতার ঘাটতি অকপটে স্বীকার করে বলছি এটা আমার জন্য সমীচীনও নয়। কৃষকের, কৃষিকর্মীর, উৎসাহী পাঠকের, শিক্ষার্থীর সমসাময়িক লাগসই প্রযুক্তির অকপট উপস্থাপনের মাধ্যমে কৃষকের সচেতনতা বৃদ্ধিতে যে অনন্য অবদান রেখে চলেছে তার দৃষ্টান্ত নজিরবিহীন। শুরুতে শুধুমাত্র ফসলের উৎপাদন, পরিচর্যার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও কালক্রমে বিভিন্ন শাখার লেখা অন্তর্ভুক্ত করে এর বলয় বহুধা বিস্তৃতি লাভ করেছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের চিহ্নিত সমস্যার আলোকে সহজ সরল বাংলার সমধানের নির্দেশনা দিয়েছে। একই সঙ্গে গল্প কবিতা প্রবন্ধ অনুসন্ধিৎসু পাঠক/গবেষকদের জন্য চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। এ সম্পর্কে শ্রদ্ধেয় ড. কামাল উদ্দীন আহমদের উপলব্ধি প্রণিধানযোগ্য। ‘মাসিক কৃষিকথা অবশ্যই একটি উচ্চমানের সাময়িকী যার প্রধান অংশজুড়ে থাকে কৃষি সম্পর্কিত নানাবিধ টেকনিক্যাল বিষয়বস্তু, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য। এতে কোনো প্রবন্ধ পাঠাতে হলে সেটা যেন তেন প্রকারে লিখে দিলেই হয় না। তা যেন হয় লেখকের যথাসম্ভব পড়া, শোনা ও অভিজ্ঞতা প্রস্তুত; তা যেন হয় পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য, ব্যবহার উপযোগী, তা যেন বেশ কিছু পাঠকের সত্যিকার জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।’ বিদ্রোহী কবির ‘গাহি তাদের গান, ধরনীর হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান’ সুগভীর অনুভূতি থেকে উৎসারিত পঙ্ক্তির যথার্থ অনুধাবন করে হৃদয়ঙ্গম করে কৃষিকথার মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশের যে ব্রত পালন করে যাচ্ছে, কৃষকের মলিন মুখে হাসি ফোটাবার যে নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে তা যেন উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হয়, হয় দীর্ঘায়ু এই হোক কামনা। কবিগুরু ‘আমাদের জমির উপর জ্ঞানের আলো ফেলিবার সময় আসিয়াছে’ বলে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তারই অনুসরণে জ্ঞানের আলো অবহেলিত জনগোষ্ঠীর দ্বারে পৌঁছে দেয়ার ‘কৃষিকথার’ উদ্যোগ প্রশংসিত ও বিকশিত। স্ব-স্ব অবস্থান থেকে একাত্ম হয়ে সভ্যতার কারিগর অন্নদাতা দধীচি কর্ষণজীবী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সমতলে দাঁড়িয়ে সমস্বরে উচ্চারণ করি ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদের লোক।’


অন্তঃকথন : সময় এসেছে ৭০ শতাংশ ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষির সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা বিবেচনায় গৃহীত কর্মসূচি আন্তরিকতা, সক্ষমতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অন্যথায় কষ্টার্জিত স্বোপার্জিত, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব হবে প্রহসন, অর্থহীন, অন্তঃসার শূন্য। অস্তিত্বের তাগিদে পূর্বসূরি কিষাণের কথা স্মরণ করে সমস্বরে সশ্রদ্ধচিত্তে উচ্চারণ করতে হবে, ‘আমার ধমনীতে কৃষাণের রক্ত, বন্যা খরা অথবা শৈত্যপ্রবাহে পরাভব মানে না। .... এগিয়ে যায় উন্নতশীরে জলন্ত চোখে বজ্রমুষ্ঠীতে অস্ত্র হাতে সিংহ গর্জনে।’

 

লেখক:

মো. ওসমান গণী*

* বিভাগীয় প্রধান (অব.), প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বিভাগ, বিএসআরআই, ঈশ্বরদী, পাবনা। লাবণী, ৬-এস,এ/১, লেকসিটি কনকর্ড, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯। মোবাইল : ০১৭১৮-৮২২২৫৫

বিস্তারিত
ই-কৃষির বিস্তারে কৃষিকথার অবদান

সভ্যতা পরিবর্তনের শক্তিশালী উপাদান হলো তথ্য। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে উদগ্রীব ছিল। কাগজ ও কালির আবিষ্কার এবং পরবর্তীতে ছাপাখানার উদ্ভব মানুষের তথ্য বিস্তারের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রূপায়িত করে। তবে মানুষের তথ্য প্রসারের তীব্র বাসনাকে গতিময়তা দেয় টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, বেতার, টেলিভিশন এসবের আবিষ্কার। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে কম্পিউটার ও পরবর্তীতে তারবিহীন নানা প্রযুক্তি তথ্য সংরক্ষণ ও বিস্তারে বিপ্লবের সূচনা করে। আজকের এই ডট কমের যুগে আক্ষরিক অর্থেই সারা বিশ্ব একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ এ পরিণত হয়েছে। আইসিটি বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তাই দিন বদলের হাতিয়ার হিসেবে বিশ্বব্যাপী আদৃত হয়েছে।


কিছুটা দেরি করে হলেও তথ্যপ্রযুক্তির ঢেউ আমাদের দেশকেও স্পর্শ করেছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের রূপকল্পকে বাস্তবে রূপায়িত করতে গৃহীত উদ্যোগের সুফল পাচ্ছেন প্রায় ১৬ কোটি মানুষ। নাগরিক সেবার প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের নিত্যদিনের কাজগুলো হয়েছে আরো সহজ, জীবনকে দিয়েছে গতিময়তা। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষির অবদান শুধু জিডিপি বা গাণিতিক হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের শিকড়।  বেশিরভাগ মানুষের জীবনজীবিকার এই সেক্টরটিকে বাদ রেখে তাই কোনভাবেই ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রয়োজন ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনার। আর সে কারণেই কৃষি সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিস্তারে আইসিটির বহুমাত্রিক ব্যবহারে মনোযোগী হয়েছেন, উদ্ভাবন করেছেন অনেক লাগসই তথ্য বিস্তারের উপাদান।


কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে একটি শব্দ, তা হলো- ই-কৃষি। ই-কৃষিকে অনেক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এ সবগুলোকে একত্রিত করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ নির্ভরযোগ্যভাবে কৃষক, কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসায়ী, সংশ্লিষ্ট গবেষক ও বিজ্ঞানী, পরিকল্পনাবিদ, ভোক্তা ইত্যাদি গোষ্ঠীর কাছে দ্রুততার সাথে পৌঁছে দিতে ইলেকট্রনিক মাধ্যমের (ইন্টারনেট, ইন্ট্রানেট, রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ইত্যাদি) ব্যবহারকেই ই-কৃষি বলা হয়ে থাকে। মোদ্দাকথা, ইলেক্ট্রনিক প্রবাহের মধ্য দিয়ে কৃষি তথ্য সরবরাহের প্রক্রিয়াকেই একবাক্যে ই-কৃষি বলা যায়।


কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তির ভূমিকা আজ অনস্বীকার্য। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ই-কৃষির অবদান স্বীকৃত হয়েছে ইনফরমেশন সোসাইটির বিশ্ব সম্মেলনে (২০০৩-২০০৫)। কৃষি উৎপাদনের প্রতিটি স্তরেই ই-কৃষির অবদান রয়েছে। এই অবদানগুলোকে পরিমাণগত (যেমন-বর্ধিত আয়, অধিক উৎপাদন ইত্যাদি) এবং গুণগত (যেমন-সামাজিক প্রভাব, উন্নত যোগাযোগ ইত্যাদি) উভয়ভাবেই চিহ্নিত করা যায়। ই-কৃষির ব্যবহার উৎপাদনকারী কৃষক ভাইদের বিভিন্ন অনুসন্ধান ব্যয় কমিয়ে সঠিক বাজার চিহ্নিত করতে সহায়তা করে, অপচয় কমায় এবং সর্বোপরি পণ্য বিক্রিতে একটি দরকষাকষির সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।


আমাদের কৃষক ভাইয়েরা কৃষি তথ্য প্রাপ্তির জন্য অনেকগুলো মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে থাকেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এ কাশেম (২০০৯) এর গবেষণায় দেখা যায়, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন, কৃষি উপকরণ ব্যবসায়ীসহ কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করা ছাড়াও মাসিক কৃষিকথা পত্রিকার ওপর নির্ভর করে থাকেন প্রায় ১২.৫% কৃষক। বেতারের ওপর নির্ভরতার এই হার ১০.৫%, মোবাইল ফোনে ৬৯.৯% এবং টেলিভিশনে প্রায় ৭৮.৯%। ভারতেও এক গবেষণায় অনুরূপ ফলাফল দেখা যায়। সুতরাং এটি স্পষ্ট, তথ্যপ্রযুক্তির এই হাতিয়ারগুলোর ওপর আমাদের কৃষক ভাইয়েরা যথেষ্ট পরিমাণে নির্ভরশীল। সেজন্য প্রয়োজন কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক কৃষিবিষয়ক তথ্য বা কনটেন্টগুলোকে সহজ সাবলীল ভাষায় এসব মাধ্যমে সহজলভ্য করা।


আইসিটি উপকরণ ব্যবহারের সাথে বেড়ে চলেছে আইসিটির অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা। সরকারের সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও পদক্ষেপের কারণে প্রসারিত হচ্ছে এ ক্ষেত্রটি। বিগত কয়েক বছরে বিস্ময়করভাবে বেড়েছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বর্তমানে প্রায় ১২ কোটি ১৮ লাখ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। ১৯৯৭ সনে মাত্র ৩টি জেলায় নেটওয়ার্ক থাকলেও এখন সবগুলো জেলা নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার। ১৯৯৫ সনে সারাদেশে যেখানে মাত্র ৬০০ জন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন বর্তমানে সেখানে প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ১৩ লাখ মানুষ মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন (বিটিআরসি: জানুয়ারি, ২০১৫)। আমাদের কৃষক ভাইয়েরা প্রযুক্তি করেছেন আপন। সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, শতকরা ৮৪.১ ভাগ কৃষকের নিজস্ব মোবাইল ফোন  রয়েছে, ৩৪.৭% কৃষক মোবাইলে খুদে বার্তা বা এসএমএসে উত্তর দেন এবং ২৬.৩% কৃষক আইভিআর বা ইন্টারেক্টিভ ভয়েস রেসপন্স ব্যবহার করে থাকেন। স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। ২০১২ সনে যেখানে মাত্র ১% মানুষ স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতেন, ২০১৩ সনে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭%। সুতরাং এটি স্পষ্ট সামনের দিনগুলোতে তথ্য বিস্তারে স্মার্ট ফোন একটি অত্যাবশ্যকীয় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে। মোবাইল নামক ক্ষুদ্র এই যন্ত্রটির ক্ষমতা যে কী অসীম তার প্রমাণ মেলে বিশ্বব্যাংকের দেয়া একটি তথ্যে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, কোনো দেশে যদি ১০% মোবাইল ফোন ব্যবহার বৃদ্ধি পায় সে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পায় ১% হারে এবং একইভাবে কোনো দেশে যদি ২জি থেকে ৩জি তে ১০% মোবাইল ব্যবহারকারী বৃদ্ধি পায় সেদেশের জিডিপি বৃদ্ধি পায় শতকরা ০.১৫ ভাগ। তাই প্রযুক্তির প্রসারে ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের কোনো বিকল্পই আজ নেই।


আমাদের প্রথাগত সম্প্রসারণ ব্যবস্থাপনায় একজন মাঠ কর্মীর পক্ষে বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে কার্যকর সম্প্রসারণ সেবা পৌঁছে দেয়া রীতিমতো অসম্ভব। ফলে কৃষকের চাহিদামাফিক, ফলপ্রসূ তথ্য সেবা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তি তথা ই-কৃষি সবচেয়ে উপযুক্ত ও কার্যকর মাধ্যম। এটি খুবই আশাব্যঞ্জক যে, বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার ফলে কৃষি সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানই ই-কৃষির বিস্তারে বেশ কিছু সফলতা অর্জন করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর মধ্যে কৃষি তথ্য সার্ভিস ই-কৃষির বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে।


প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও আইসিটি মাধ্যমে কৃষি সংশ্লিষ্টদের কাছে সময়োপযোগী কৃষি তথ্য পৌঁছানোই কৃষি তথ্য সার্ভিসের মূল দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে কৃষি তথ্য সার্ভিস থেকে পরিচালিত ‘কৃষি কল সেন্টার’-এ যেকোন অপারেটর থেকে টোল ফ্রি শর্ট কোড (১৬১২৩) নম্বরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ফোন করে কৃষি/মৎস্য/প্রাণিসম্পদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সমাধান নিতে পারেন। শুক্রবার ও সরকারি বন্ধের দিন ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ সেবাটি দেয়া হচ্ছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইট (www.ais.gov.bd) -এ কৃষিবিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্যের পাশাপাশি অনলাইনে প্রশ্ন করে স্বল্পতম সময়ে সেই প্রশ্নের সমাধান জানতে পারেন। তৃণমূল পর্যায়ে তথ্য বিস্তারের লক্ষ্যে কৃষি তথ্য সার্ভিস দেশব্যাপী ২৪৫টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র (এআইসিসি) প্রতিষ্ঠা করেছে। এআইসিসি থেকে কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তথ্য সেবা গ্রহণ করছেন। কৃষি তথ্য সার্ভিস থেকে নির্মিত ‘মাল্টিমিডিয়া ই-বুক’ এর মাধ্যমে বিভিন্ন ফসল ও প্রযুক্তি সম্পর্কে সহজে তথ্য নেয়া যায়। এ ই-বুকগুলো কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইটে আপলোড করা আছে। প্রতিদিনের কৃষিবিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শ/তথ্যের জন্য এআইএসের সহায়তায় প্রতিদিন সকাল ৭-২৫ মিনিটে বিটিভিতে সম্প্রচারিত হচ্ছে ‘বাংলার কৃষি’ অনুষ্ঠান। বরগুনা জেলার আমতলীতে এআইএস প্রতিষ্ঠা করেছে কমিউনিটি রেডিও ‘কৃষি রেডিও’ যা সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসাধারণের তথ্যসেবা পূরণে সচেষ্ট রয়েছে।  


কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ অন্যান্য সরকারি দপ্তর/সংস্থাগুলো তাদের সেবাগুলো আইসিটি মাধ্যমে সম্প্রসারিত করছে যা রীতিমতো আশাজাগানিয়া। প্রত্যেকটি সংস্থার রয়েছে কার্যকর ওয়েবসাইট এবং পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ওয়েবভিত্তিক সেবা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (www.moa.gov.bd) থেকে কৃষিনীতি, আদেশসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়াও কৃষি মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক গ্রুপ পেজ ‘কৃষি ভাবনা’ থেকেও কৃষি কার্র্যক্রমের বিভিন্ন তথ্য, সাফল্য ইত্যাদি জানা যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এর ওয়েবসাইট (www.dae.gov.bd) থেকে মাঠ ফসলের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত, যোগাযোগ ঠিকানা, পরামর্শ, প্রশাসনিক বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি ‘কৃষকের জানালা’ ও ‘কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা’ নামের দুইটি অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য সেবা নিতে পারবেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) ওয়েবসাইট (www.barc.gov.bd) ছাড়াও ফসলের সর্বোচ্চ ফলন পাওয়ার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট ফসল উৎপাদন উপযোগী অঞ্চল নিরূপণের উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করেছে ‘ভূমির উপযোগীতাভিত্তিক ফসল অঞ্চল’ ওয়েব www.barcapps.gov.bd/cropzoning) এছাড়াও রয়েছে ‘জলবায়ু তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম’ অ্যাপ্লিকেশন (www.barcapps.gov.bd/climate) পাশাপাশি www.barcapps.gov.bd/cropcalender লিংক থেকে পাওয়া যাবে ‘ফসল পঞ্জিকা’।


বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের রয়েছে নিজস্ব ওয়েবসাইট (www.badc.gov.bd) যেখান থেকে বিএডিসির বিভিন্ন বীজ, সার, সেচ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়াও বিএডিসির রয়েছে ‘গ্রাউন্ড ওয়াটার জোনিং ম্যাপ’ যা ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি ডিজিটাল ম্যাপ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এর ওয়েবসাইট (www.bari.gov.bd) থেকে বারি উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তির তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি ‘বারি প্রযুক্তি ভাণ্ডার’ (baritechnology.org/m) মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন থেকেও  প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এর ‘বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংক’ (www.knowledgebank-brri.org) এর মাধ্যমে ব্রি উদ্ভাবিত ধানের সব তথ্য পাওয়া যায়। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) এর ওয়েবসাইট www.srdi.gov.bd) থেকে ‘অনলাইন ফার্টিলাইজার রিকমেন্ডেশন সিস্টেম’ বা ওএফআরএস নামক সফটওয়্যারের সাহায্যে সহজেই বাংলাদেশের যেকোন স্থানের জমির জন্য সার সুপারিশ সেবা গ্রহণ করা যায়। এছাড়াও ‘লবণাক্ততা তথ্য সেবা’ ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনটির মাধ্যমে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার নদীর পানিতে কোথায়, কখন এবং কি মাত্রায় লবণাক্ততা থাকে তা জেনে সেচ পরিকল্পনা নেয়া সম্ভব। বাজার বিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্য সেবা পেতে রয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট (www.dam.gov.bd) বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সেচ কাজে সূত্রপাত করেছে প্রি-পেইড মিটার যার ফলে সেচের ব্যয় কমেছে, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং কৃষকদের আর্থিকভাবে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা বন্ধ হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই কর্মসূচি থেকে নির্মিত জাতীয় ই-তথ্য কোষ (www.infokosh.gov.bd) থেকে কৃষি ও জীবন জীবিকার বিভিন্ন ক্ষেত্রের তথ্য পাওয়া যায়।


সরকারি বিভিন্ন সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু ওয়েবসাইট রয়েছে যেগুলো কৃষি তথ্য ও প্রযুক্তি প্রসারে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-রুরাল ইনফো বিডি (www.ruralinfobd.com), এগ্রিনিউজ বিডি (www.agrinewsbd.com), এগ্রোবাংলা (www.agrobangla.com), কৃষি বাংলা (www.krishibangla.com), সিনজেন্টা (www.syngenta.com) এছাড়াও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য কিছু আইসিটিভিত্তিক উদ্যোগ রয়েছে যা ইতোমধ্যে যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছে। এসবের মধ্যে বিআইআইডি প্রতিষ্ঠানের ই-কৃষক (www.ekrishok.com) ও বাতিঘর, উইন ইনকর্পোরেটের রুরাল ইনফো (www.ruralinfobd.com), মোবাইল অপারেটর বাংলালিংকের কল সেন্টার ‘কৃষি জিজ্ঞাসা ৭৬৭৬’, গ্রামীণফোনের ‘কমিউনিটি ইনফরমেশন সার্ভিস’ ডি নেট প্রতিষ্ঠানের ‘ইনফো লেডি’ এবং এমপাওয়ার সোস্যাল লি. এর  ‘এগ্রো নলেজ ব্যাংক’ ও ‘ফার্মারস কোয়্যারি’ উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।


সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই কৃষি তথ্য সার্ভিস থেকে প্রকাশিত ‘কৃষিকথা’ ম্যাগাজিনটি কৃষির নিত্য নতুন তথ্য, প্রযুক্তি কৃষক ও কৃষিজীবী মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। ‘চাষের কথা, চাষির কথা/পাবেন পড়লে কৃষিকথা’ এ স্লোগানকে ধারণ করে ম্যাগাজিনটি আজ ৭৫ বছরের মহীরুহতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ এ পথপরিক্রমায় ই-কৃষিসহ কৃষির চমকপ্রদ সব তথ্যের ডানা মেলে কৃষি উৎপাদনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে। কৃষিকথার বিগত বিভিন্ন সংখ্যায় ওয়েবসাইট, কৃষি কল সেন্টার, কমিউনিটি রেডিও, বেতার ও টেলিভিশনে কৃষিসহ ই-কৃষির বিভিন্ন বিষয়ে নানা অজানা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে পাঠককে করেছে সমৃদ্ধ ও আলোকিত। কৃষক, কৃষিকর্মীসহ আপামর পাঠকের চাহিদা বিবেচনা করে যথাসময়ে কৃষিকথা  মুদ্রণের সাথে সাথে কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হচ্ছে, যার ফলে বিশ্বের যে কোন প্রান্তের মানুষ ম্যাগাজিনটি ঘরে বসে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।


‘লাঙল হাতে ল্যাপটপ মানিয়েছে বেশ/কৃষকই গড়বে ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এটি যেন আজ আর কোন আশার বাণী নয়। ই-কৃষির স্পর্শে বাংলাদেশের কৃষি আরো সমৃদ্ধ হোক; কৃষিকথার সোনালি আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাংলার প্রতিটি প্রান্তর-এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।

 

লেখক:

কৃষিবিদ মোহাম্মদ জাকির হাসনাৎ
* তথ্য অফিসার (উদ্ভিদ সংরক্ষণ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা E-mail : zhasnat@yahoo.com

 

বিস্তারিত
কৃষিকথার আত্মকথা

আমার নাম কৃষিকথা। আমাকে এক সময় ডাকা হতো কৃষি-কথা বলে। আমার পূর্বসূরি ‘কৃষি সমাচার’ নামে তৎকালীন বঙ্গীয় কৃষি বিভাগ ঢাকা থেকে ১৯২১ সনে ত্রৈমাসিক সাময়িকী হিসেবে প্রকাশ করা হয়। ‘কৃষি সমাচার’ ১৯৩৯ সনে ‘কৃষিকথা’ নামে দ্বিমাসিক ভিত্তিতে প্রকাশিত হতে থাকে। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অধিক খাদ্য ফলাও অভিযান শুরু হলে কৃষি সংক্রান্ত প্রচার কাজ কিছুটা জোরদার করা হয়। ফলে কৃষিকথা দ্বিমাসিক  থেকে মাসিকে রূপান্তরিত হয়। প্রথমদিকে কৃষিকথা প্রকাশিত হতো বঙ্গীয় কৃষি বিভাগ, রমনা, ঢাকা থেকে এবং ছাপা হতো বঙ্গীয় সরকারি প্রেস, আলীপুর, কলিকাতা থেকে। উল্লেখ্য, ওই সময়ের পাবলিক রিলেশন অফিসারের ঠিকানা ছিল ডিরেক্টরেট অব এগ্রিকালচার, বেঙ্গল, রাইটার্স বিল্ডিংস, কলিকাতা। তবে সব সময় একই প্রেস থেকে ছাপানো হতো না। বিভিন্ন সময় যেসব প্রেস থেকে ছাপানো হতো তার মধ্যে ইন্ডিয়ান ফটো এনগ্রেভিং কো. লিমিটেড, নিউ হিলাল প্রেস, কলিকাতা, কারিমিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস লি., ঢাকা, দি স্টার প্রেস, ২১/১, শেখ সাহেব বাজার লেন, ঢাকা, জিনাত প্রিন্টিং ওয়ার্কস, ১৯, রমাকান্ত নন্দী লেন, ঢাকা, ইস্ট পাকিস্তান গভর্নমেন্ট প্রেস উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইস্ট পাকিস্তান গভর্নমেন্ট প্রেসের নাম হয় বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট প্রেস বা বিজি প্রেস। এরপর ১৯৭৮ সনে খামারবাড়িতে নিজস্ব প্রেস প্রতিষ্ঠিত হলে এখান থেকেই ছাপার কাজ সম্পন্ন হতে থাকে।  আমার জন্মলগ্নে আমার নগদ  বিক্রয় মূল্য ছিল মাত্র দুই আনা এবং বার্ষিক চাঁদা ছিল ডাকমাশুলসহ মাত্র এক টাকা। কৃষিকথা, আগস্ট, ১৯৪৬ সংখ্যাটিকে যেহেতু ষষ্ঠ বর্ষ-পঞ্চম সংখ্যা হিসেবে দেখান হয়েছে সেহেতু কৃষিকথার জন্ম সন ধরা যায় ১৯৪১। কৃষিকথার জন্মসন ১৯৪১ ধরেই অদ্যবধি প্রকাশকালের হিসাব করা হচ্ছে।  সে অনুযায়ী আমি এ মাসেই ৭৫ বছরে পদার্পণ করছি।


ইংরেজি এপ্রিল মাসকে প্রথম মাস বা প্রথম সংখ্যা ধরে তখন বছর হিসেব করা হতো যা পরে ইংরেজি জানুয়ারি মাসকে এবং এরপর বাংলা সনের বৈশাখ মাসকে বছরের প্রথম মাস বা প্রথম সংখ্যা হিসেবে ধরে গননা করা হয়।  দীর্ঘ ১৯ বছর পর ১৯৬১ সনে কৃষি তথ্য সংস্থার জন্মের পর কৃষি বিভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘কৃষিকথা’ অর্থাৎ আমি চলে আসি ‘কৃষি তথ্য সংস্থা’র অধীনে। ১৯৭০ সনের দিকে ইডেন বিল্ডিং, রমনা থেকে ৩, রামকৃষ্ণ মিশন রোড, ঢাকায় স্থানান্তরিত হই। এরপর ১৯৮২ সনে ঢাকা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র জাতীয় সংসদ ভবনের পূর্ব পাশে নিজের বাড়ি ‘খামারবাড়ি’তে উঠি এবং আশা করি বাকি জীবন এ বাড়িতেই কেটে যাবে। খামারবাড়ির সম্মুখ ভবনের ১ম ও ২য় তলায় আমার অবস্থান। এখন আমার নগদ মূল্য ৫ টাকা এবং বার্ষিক চাঁদা ডাকমাশুলসহ মাত্র ৫০ টাকা। বছরের যে কোনো সময় আমার গ্রাহক হওয়া যায়। একসঙ্গে ২০ কপি বা তার অধিক সংখ্যা নিলে ৫০ টাকার স্থলে ৪২ টাকা হারে নেয়া হয়। আমার জানা মতে, এত কম দামে আর কোনো ম্যাগাজিন এ দেশে পাওয়া যায় না। দেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের কথা ভেবেই সরকার ভর্তুকি দিয়ে আমার মূল্য এ কম নির্ধারণ করেছে। মূল্য কম বলে আমার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব কিন্তু মোটেও কম নয়। অবশ্য আমার কোনো পাঠক, গ্রাহক কিংবা শুভানুধ্যায়ী কেউই আমাকে ছোট করে দেখে না। এজন্য আমি নিজেকে গর্বিত ও ধন্য মনে করি। কৃষির আধুনিক ও লাগসই প্রযুক্তি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্য গবেষণার জন্য গবেষকদের বা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচি গ্রহণের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছে দেয়াই আমার প্রধান কাজ। কৃষিবিষয়ক নিবন্ধ, গল্প, কবিতা, জীবন্তিকা, নাটিকা, সাক্ষাৎকার, প্রশ্নোত্তর, কার্টুন, রম্য রচনা প্রভৃতি যুগ যুগ ধরে আমার পাতায় ছাপা হয়ে আসছে। এতে আমার পাঠকরা, চাষিভাইয়েরা অনেক উপকৃত হচ্ছে। একটি কথা তোমাদের মনে রাখা উচিত, কৃষি সাহিত্যের হাতে খড়ি কিন্তু আমার মাধ্যমেই সূচিত হয়েছে। আর আমার এক প্রবীণ বন্ধু মোহাম্মদ মোস্তফা আলীকে কৃষি সাহিত্যের জনক বলা যায়। তিনি আমাকে নিয়ে একটি স্লোগান লিখেছেন যা আজও আমি বুকে ধারণ করে চলেছি। স্লোগানটি হলো-


‘চাষের কথা
         চাষির কথা
পাবেন পড়লে কৃষিকথা।


ধান, পাট, গম, ভুট্টা, আলু, আদা, হলুদ,  পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া, শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন সম্পর্কিত বিষয়ের তথ্য ও প্রযুক্তি যেমন আমি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেই তেমনি মৎস্য চাষ এবং হাঁস-মুরগি ও পশুপালন সম্পর্কিত তথ্য ও প্রযুক্তিও কৃষকের কাছে পৌঁছে দিয়ে তোমাদের সেবা করে চলেছি। এক সময় আমি শুধু ছাপার অক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলাম। এখন কিন্তু সে অবস্থা নেই। এখন ওয়েবসাইট, ই-মেইলযোগেও আমাকে পাওয়া যায়, পড়া যায়। শুধু কি তাই- সিডি, পেনড্রাইভ, ডিভিডি প্রভৃতি মাধ্যমেও আমাকে বহন করে দেশ-বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।


আমার নাম কৃষিকথা হলেও আমি কিন্তু কৃষকের ফসলের জন্য ‘প্রেসক্রিপশন’ হিসেবে  কাজ করি। তোমাদের অসুখ-বিসুখ হলে কিংবা শরীর স্বাস্থ্যের উন্নতি না হলে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন মতো ওষুধ খেয়ে সুস্থ হও তেমনি তোমাদের ফসলের রোগবালাই হলে কৃষি বিশেষজ্ঞের দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সার, সেচ, ভালো বীজ, রোগবালাই দমন পদ্ধতি ব্যবহার করে ফসলকে সুস্থ-সবল করে তোল। এতে ভালো ফলন পেয়ে খুশি হও। তবে এ উভয় ক্ষেত্রে সঠিক প্রেসক্রিপশন খুবই প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায় ভুল প্রেসক্রিপশনের কারণে তোমরা নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হও আবার তোমাদের ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য লেখক, লেখা যাচাইকারক, সম্পাদক, প্রুফ রিডার সবাইকে সদা সতর্ক থাকতে হয়।
আমার পাতায় তোমাদের অনেকের কিছু কিছু লেখা ছাপা না হওয়াতে কষ্ট পেয়ে থাকো। এর অন্তর্নিহীত কারণ উপলব্ধি করলে হয়তো কষ্ট পেতে না। তোমাদের জ্ঞাতার্থে কয়েকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি।


কৃষি তথ্য সার্ভিস আঞ্চলিক অফিস, সিলেটের জনৈক কর্মকর্তার একটি লেখা ছাপানোর জন্য প্রাথমিক বাছাই করার পর এডিট করতে গিয়ে দেখা গেল লেখাটিতে এমন কিছু কথা বা বিষয় রয়েছে যা সরকারের পলিসির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় অর্থাৎ সাংঘর্ষিক। তখন লেখাটি আর ছাপানো হলো না।


ঝিনাইদহ জেলার আশাননগর গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক হরিপদ কাপালী অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি দিয়ে বিআর-১১ জাতের ধানক্ষেত থেকে কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্যের গোছা থেকে ধান সংগ্রহপূর্বক চাষাবাদ করে তার এলাকায় সাফল্য পান এবং এলাকায় ওই ধানের নামকরণ করা হয় ‘হরিধান’ বলে। এ ধান সম্পর্কিত কৃষিবিদ মো. কামাল উদ্দিনের একটি লেখা যা আমার পাতায় ছাপানো সম্ভব হয়নি কারণ হরিধান নিয়ে মিডিয়ায় পক্ষে বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এছাড়া জাতীয় বীজ বোর্ডের কোনো অনুমোদন তখন নেয়া হয়নি।


কৃষিবিদ মো. আরিফ হোসেন খান উদ্ভাবিত  ধান চাষে ম্যাজিক গ্রোথ প্রযুক্তি বিষয়ক একটি লেখা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন না থাকার কারণে ছাপানো সম্ভব হচ্ছে না। লেখক যদিও তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সাফল্যের কথা জোর দিয়ে প্রচার করছেন।


দুই পৃষ্ঠায় হাতে লেখা, দুই লাইনের মধ্যে পর্যাপ্ত ফাঁক না রাখা, হাতের লেখা অস্পষ্ট, লেখায় লেখক পরিচিতি বা নাম ঠিকানা না থাকা এ রকম বহুবিধ কারণে একটি উপযুক্ত লেখাও অনেক সময় ছাপানো সম্ভব হয় না।


স্থান সংকুলান না হওয়া অর্থাৎ অনেক সময় দেখা যায় অনেকগুলো সময়োপযোগী লেখা যা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায়ই কেবল ছাপারযোগ্য তা স্থান সংকুলান করতে না পারার কারণে ছাপানো যায় না। কারণ ইচ্ছা করলেই তো ফর্মা বাড়ানো যায় না। তাই বেছে বেছে সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত বলে বিবেচিত লেখাগুলোই শুধু ছাপা হয় আর বাকিগুলো পরবর্তী বছরের জন্য রেখে দেয়া হয় অথবা একেবারেই বাদ পড়ে যায়।  


উপরে বর্ণিত বিষয়গুলোর আলোকে একথা বলা যায়, আমার বুকে স্থান পেতে অবশ্যই বিতর্কমুক্ত, সময়োপযোগী, প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যবহুল, সুন্দর হাতের লেখা, একপৃষ্ঠায় লেখা, নাম পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা বাঞ্ছনীয়। লেখকদের জন্য একটি সুখবর হলো এখন একটি প্রকাশিত লেখার জন্য সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা সম্মানী দেয়া হয়।


একটি বিষয়ে আমার পাঠক বন্ধুরা অভিযোগ করে থাকে আর তা হলো তারা আমাকে সময়মতো পায় না। অনেকে বার্ষিক চাঁদা পাঠিয়েও আমাকে একেবারেই পায় না। এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো দায়ী তাহলো- সঠিক পদ্ধতিতে, সঠিক ঠিকানায় চাঁদা পাঠানো হয় না। আবার, চাঁদা প্রেরকের নাম ঠিকানা সঠিকভাবে লেখা হয় না। এছাড়া ডাক বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয় না। তবে অনিবার্যকারণবশত সময়মতো ছাপানো সম্ভব না হলে তখন পাঠকের হাতে পৌঁছতে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। আমি আশা করি, আমার খামারবাড়ির সেবক বন্ধুরা গ্রাহক, পাঠক, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে সচেতন থাকবে, সবাইকে হাসিখুশি থাকতে সাহায্য করবে।


শেষ কথা
আমার প্রিয় সেবক ও শুভানুধ্যায়ী বন্ধুরা, আমি শুরুতেই বলেছি এখন আমার বয়স ৭৫। আমি আমার বক্তব্যের প্রায় পুরোটাতেই তোমাদের  ও আমার সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এর উদ্দেশ্য হলো আমার জীবন ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চিরস্মরণীয় করে রাখা। এখানে একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, তোমরা মানুষরা মরণশীল কিন্তু আমি কাগজের পাতায় ছাপা অমোছনীয় এক নাম যা চিরঞ্জীব। আমার ৭৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে তোমরা আমাকে নিয়ে অনেক লেখাসমৃদ্ধ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছো এজন্য আমি অত্যন্ত খুশি ও আনন্দিত। তবে আমার পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্বে নিয়োজিত কৃষি তথ্য সার্ভিস ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে নিবেদন এখন আমি আর সাদা-কালো থাকতে চাই না। রঙিন হতে চাই।


আশা করি আমার এ নিবেদন সংশ্লিষ্ট সবাই ভেবে দেখবে। সবাই ভালো থাকো, সুখে থাক, দেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে অবদান রাখ, দেশকে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তোল- এটাই আমার একমাত্র কামনা। সবাইকে নিরন্তর শুভেচ্ছা। আল্লাহ হাফেজ।

 

লেখক:

মো. মতিয়ার রহমান*
* সহকারী সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
ব্রি উদ্ভাবিত নতুন জাত ও প্রযুক্তি

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং মৌসুমের উপযোগী চারটি হাইব্রিডসহ ৭২টি উচ্চফলনশীল ধানের জাত এবং মাটি, পানি, সার, পোকা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষি যন্ত্র ও ধানভিত্তিক শস্য বিন্যাস বিষয়ে শতাধিক উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। দেশের শতকরা ৮০ ভাগ ধানি জমিতে ব্রি  ধানের চাষ হয় এবং এর থেকে আসছে দেশের মোট ধান উৎপাদনের শতকরা ৯১ ভাগ ।


 অতীতের খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন চাল রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর পেছনে ব্রি উদ্ভাবিত উফশী ধানের জাতগুলোর একটা বড় অবদান রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্রি গত চার দশকের বেশি সময়ে অবিরাম কাজ করে যাওয়ার ফলে এদেশে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে একটা নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। এখন এর মূল্যায়ন হওয়াটা খুব জরুরি।


ব্রির মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, অতিরিক্ত জনসংখ্যার একটা ছোট্ট দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ভিক্ষের মতো  বিপর্যয় এড়ানোর মাধ্যমে যে সফলতা অর্জিত হয়েছে তার যথাযথ মূল্যায়ন যদি কখনও হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানটি নোবেল পুরস্কার বা সমমানের স্বীকৃতি পেতে পারে। এর চেয়েও বড় কথা, ধান গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে সহযোগিতার টেকসই সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত  যে কোনো এলাকার কৃষক এর উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলো সম্পর্কে জানেন। এগুলোর চাষাবাদ করেন। বছরের পর বছর ধরে তারা পরম যতেœ এসব বীজ সংরক্ষণ করেন। দেশের সব স্তরের ভোক্তারা ব্রি উদ্ভাবিত চালের ভাত নিয়মিত খান। ব্রি তার কাজের জন্য এ পর্যন্ত মোট ১৭টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছে যার মধ্যে স্বাধীনতা দিবস ও বঙ্গবন্ধু পুরস্কারও রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বা প্রতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির চেয়ে গণমানুষের ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে পৌঁছাতে পারাটাও নিঃসন্দেহে একটা বড় প্রাপ্তি।

 
খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই করার লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত সহনশীল প্রযুক্তি উদ্ভাবন, শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শস্যবিন্যাসে ধানের আগাম জাতের সংযোজন, লবণাক্ত, অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা এলাকা ও বন্যাপরবর্তী সময়ের উপযোগী ধানের জাত ছাড়াও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী ও সহনশীল জাতের উদ্ভাবনে এ প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ধানের জাতের মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততা সহনশীল সাতটি, আকস্মকি বন্যা মোকাবিলার দুটি, খরা সহনশীল তিনটি, জিঙ্কসমৃদ্ধ দুটি, সর্বাধিক ফলনের চারটি এবং সুগন্ধি ও রপ্তানি উপযোগী তিনটি জাত। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক ধান চাষের জন্য মাটি, পানি ও সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ৫০টির বেশি উন্নত প্রযুক্তি, ৩৯টি লাভজনক ধানভিত্তিক শস্যক্রম, ৩২টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নসহ ধানের ৩২টি রোগ ও ২৬৬টি ক্ষতিকর পোকা শনাক্তকরণ প্রধান প্রধান রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করেছে।


এ প্রতিষ্ঠান মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান, সেমিনার, কর্মশালা, মাঠ দিবস আয়োজনের মাধ্যমে এসব প্রযুক্তি সারা দেশে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থায় সহায়তা করেছে।


সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে  ব্রি ক্রমাগত তার উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে চলছে। বোরো মৌসুমের উফশী জাত ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ এবং আমন মৌসুমের বিআর১১ দেশজুড়ে কৃষক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়। অতীতের এ অর্জনের নবায়ন করে  বিগত বছরগুলোতে ব্রি ধান২৯ এর চেয়ে তুলনামূলক ভালো ব্রি ধান৫৮ এবং বিআর১১ এর চেয়ে তুলনামূলক ভালো ব্রি ধান৪৯ উদ্ভাবন করা হয়েছে। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির জন্য জলমগ্নতা সহনশীল ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২, খরা সহনশীল ব্রি ধান৫৬ ও ব্রি ধান৫৭ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ যেমন খরা, বন্যা, লবণাক্ততা সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।  জনগণের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সম্প্রতি জিঙ্ক সমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২ এবং ব্রি ধান৬৪ উদ্ভাবন করা হয়েছে।


গত ২০১৩-১৪ সনে ব্রির গবেষণা কার্যক্রমে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য পাওয়া গেছে। এ বছর সাতটি উন্নত ধানের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে বোরো মৌসুমের জন্য পাঁচটি এবং আউশ ও আমনের মৌসুমের জন্য একটি করে জাত।


বোরোর জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে, উন্নত প্রিমিয়াম কোয়ালিটি জাত ব্রি ধান৬৩, জিঙ্ক সমৃদ্ধজাত ব্রি ধান৬৪, লবণসহিষ্ণু জাত ব্রি ধান৬৭ এবং অনুকূল পরিবেশের জন্য ব্রি ধান৬৮ ও ব্রি ধান৬৯। আউশ মৌসুমের জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছে খরাসহিষ্ণু আগাম জাত ব্রি ধান৬৫ যা সরাসরি বপনযোগ্য এবং আমন মৌসুমের জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছে খরাসহিষ্ণু জাত ব্রি ধান৬৬।


দেশের ঐতিহ্যবাহী বালাম ধানের অনুরূপ গুণ সম্পন্ন  ব্রি ধান৬৩ জাতটিকে সরু বালাম নামে অভিহিত করা যায়। বাসমতি টাইপ এ জাতের জীবনকাল ১৪৮ দিন এবং ফলন হেক্টরে ৬.৫-৭.০ টন। ব্রি ধান৬৪ এর চালে ২৪ মিলিগ্রাম/কেজি জিঙ্ক আছে। এর জীবনকাল ১৫২ দিন এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৬.০-৬.৫ টন। বোনা আউশের নতুন জাত ব্রি ধান৬৫ এর জীবনকাল ৯৯ দিন এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৩.৫-৪.০ টন। ব্রি ধান৬৬ জাতটির জীবনকাল ১১০-১১৩ দিন। এর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, আমন মৌসুমে ফুল আসার সময় যদি মাটির আর্দ্রতা শতকরা ২০ ভাগের নিচে বিশ দিন পর্যন্ত থাকে তবু এটি হেক্টরপ্রতি ফলন ৪.০-৪.৫ টন ফলন দিতে সক্ষম। ব্রি ধান৬৭ এর জীবনকাল ১৪০-১৪৩ দিন এবং লবণাক্ততাভেদে এর হেক্টরপ্রতি ফলন ৩.৮-৬.০ টন। এটি ব্রি ধান৪৭ এর মতো লবণসহিষ্ণু কিন্তু চাল মাঝারি চিকন ও ভাত সাদা এবং ঝরঝরে। ব্রি ধান৬৮ অনুকূল পরিবেশে ১৪৯ দিনে ৭.৩ টন/হেক্টর ফলন দিতে সক্ষম। ব্রি ধান৬৯ জাতে শতকরা ২০ ভাগ কম ইউরিয়া সার প্রয়োজন হয়। নতুন এ জাতের জীবনকাল ১৪৫-১৫৩ দিন এবং হেক্টরে ফলন ৭.৩ টন।


বিগত ২০১৩-১৪ সালের গবেষণায় অনেকগুলো প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। জোয়ার-ভাটা অঞ্চলের জন্য লম্বা চারার জাতের কৌলিক সারি উদ্ভাবন, অধিকতর জিঙ্ক সমৃদ্ধ জাতের কৌলিক সারি উদ্ভাবন, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৪৪ ও ব্রি ধান৪৯ জাতে সাব-১ জিনের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে। এছাড়া  এনথার কালচারের মাধ্যমে ব্রি ধান২৮ জাতের উন্নয়ন এবং ব্রি ধান২৯ জাতের লবণাক্ততা সহনশীল ট্রানজেনিক কৌলিক সারি উদ্ভাবন করা হয়েছে।


গত বছর ১৫১ টন ব্রিডার বীজ উৎপাদন করা হয়েছে। ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ জাত দুটিকে উচ্চতাপমাত্রাসহিষ্ণু করার জন্য গবেষণা এগিয়ে নেয়া হয়েছে। উদ্ভিদ শারীরতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, দুটি নেরিকা জাতের ধানের ফলন ব্রি ধান৫৬ এর চেয়ে বেশি। জলমগ্নতা সহনশীল হাইব্রিড ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের গবেষণায় অধিকতর অগ্রগতি হয়েছে। আগামী ২/১ বছরের মধ্যে চমকপ্রদ হাইব্রিড ধানের নতুন জাত আলোর মুখ দেখতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা আশা করছেন। ব্রি জিন ব্যাংক সংশ্লিষ্ট  বিজ্ঞানীরা পাহাড়ি ও সমুদ্র উপকূল এলাকা  থেকে আরো ৫১টি দেশি ধানের জাত সংগ্রহ করতে পেরেছেন।


গাজীপুরের মাটিতে ব্রি ধান২৯ জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ১২ দিনের চারা ৩০ দ্ধ ২৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে রোপণ করে এবং উপযুক্ত সার-গোবর ও সেচ প্রয়োগ করে হেক্টর প্রতি ৯.৮৩ টন ফলন পাওয়া যায়। বিভিন্ন কৃষিতাত্ত্বিক গবেষণায় ব্রির বিজ্ঞানীরা এটি প্রমাণ করেছেন। জোয়ার-ভাটা এলাকায় দেশি আমন (লাল মোটা, সাদা মোটা, প্রভৃতি) ধানে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রতি চারগোছার মাঝে একটি করে ১.৮ গ্রাম পরিমাণ গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করে হেক্টরপ্রতি ১ টন ধানের ফলন বৃদ্ধি করা যায়। জাতভেদে আমন মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ৬০-৭৫ কেজি নাইট্রোজেন (১৩৩-১৬৭ কেজি ইউরিয়া) এবং বোরো মৌসুমে ১৪৪-১৬৩ কেজি নাইট্রোজেন (৩২০-৩৬২ কেজি ইউরিয়া) প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। ব্রির বিজ্ঞানীরা ঠা-া আবহাওয়ায় চারা উৎপাদনের জন্য একটি যন্ত্র ‘অঙ্কুুরি’ উদ্ভাবন করেছেন। অঙ্কুরিতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে বীজ কিছুটা তাড়াড়াড়ি গজায় এবং মেশিনে রোপণ উপযোগী করে চারা উৎপাদন করা যায়। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় যথোপযুক্ত ব্যবস্থাপনা এবং ধানক্ষেত  থেকে পরিবেশ দূষণকারী গ্যাসগুলোর নির্গমণ রোধের জন্য ব্রির মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে যাচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় তারা দেখিয়েছেন, যুগ যুগ ধরে সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে রোপা ধানের মাটিতে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় না।


 সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিজ্ঞানীরা সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন। তারা স্বল্পমূল্যের পিভিসি সেচ পাইপের ব্যবহার উদ্ভাবন করেছেন। পিভিসি সেচ পাইপ ব্যবহারের ফলে হেক্টরপ্রতি সেচ খরচ প্রায় ৩০০০ টাকা কমে যায়। অন্য গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অগভীর নলকূপের নাগালের ৫-১৫ ফুট নিচে নেমে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। গাজীপুরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১৯৯৮ সনের ১১.৬৮ মিটার থেকে ২০১৪ সালে ৩৩.৬১ মিটার গভীরে চলে গেছে। এ চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয় ভাঙ্গা, বরিশাল ও সাতক্ষীরার ভূ-গর্ভস্থ পানিতে মাত্রারিক্ত বোরন ও সোডিয়াম দেখা গেছে।


ধানভিত্তিক শস্য বিন্যাস গবেষণায় দেখা গেছে, নিচু এলাকার জমিতে যেখানে গম-পেঁয়াজ-পাট-পতিত বিন্যাসের পরিবর্তে গম-পেঁয়াজ-পাট-রিলে আমন ধান চাষ করা ২৫-৫২% লাভজনক। লবণাক্ত জমিতে যেখানে শুধু আমন ধান চাষ করা হয় সেখানে আমনের পর সূর্যমুখীর চাষ করলে কৃষকরা হেক্টরে ৫৭,০০০-৫৯,০০০ টাকা বাড়তি লাভ করতে পারেন।


উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা ধানের ব্লাস্টরোগ প্রতিরোধী পাঁচটি জিনের সন্ধান পেয়েছেন যা অদূর ভবিষ্যতে ব্লাস্টরোগ প্রতিরোধী ধানের জাত উদ্ভাবনে সহায়ক হবে। বাকানি রোগের কারণ ও প্রতিকার গবেষণা আনেকটা এগিয়ে গেছে। ধানের লক্ষ্মীরগু রোগ বিষয়ক গবেষণায় বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। কীটতত্ত্ব বিভাগের বিজ্ঞানীরা ধানক্ষেতের আলে গাঁদাজাতীয় ফুল গাছ রোপণ করে বোরো ধানের পোকা দমনের এক অভিনব কৌশলের বিবরণ দিয়েছেন। গাঁদাজাতীয় ফুলে যে পোকা আসে সেগুলো ধানের পোকার শত্রু হিসেবে কাজ করে। ফলে কীটনাশক ছাড়াই বোরো ধানের পোকা দমন সম্ভব। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ দু’এক বছরের মধ্যে আশা করা হচ্ছে। শত শত ধানের কৌলিকসারি নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা ২৭টি সারি বাদামি গাছ ফড়িং প্রতিরোধী, আটটি সাদা-পিঠ গাছ ফড়িং প্রতিরোধী এবং পাঁচটি গলমাছি প্রতিরোধী বলে সনাক্ত করেছেন।


ব্রির কৃষি প্রকৌশলীরা এয়ার ব্লো টাইপ এঙ্গেলবার্গ চাল কলের পরিবর্তন সাধন করে এর কার্যকারিতা বাড়িয়েছেন। পরিবর্তিত এয়ার ব্লো টাইপ এঙ্গেলবার্গ চাল কলে ঘণ্টায় ২৫০-৩০০ কেজি বেশি চাল উৎপাদন করা যায় এবং ১-১.৫% অপচয় কম হয়। রোপা ধানের ক্ষেতে মাটির গভীরে সাধারণ ইউরিয়া প্রয়োগ কৌশল ব্রির কৃষি প্রকৌশলীরা উদ্ভাবন করেছেন। এ যন্ত্রের মাধ্যমে সাধারণ ইউরিয়া প্রয়োগ করে গুটি ইউরিয়ার মতো ফলাফল পাওয়া গেছে। এছাড়া স্ব-চালিত ধান কাটা যন্ত্র, কৃষি কাজে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার ও ধান ঝাড়াই কাজে পাওয়ার টিলার ইঞ্জিন ব্যবহারের উপায় তারা উদ্ভাবন করেছেন।


আর্থসামাজিক সমীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, দেশের ধান উৎপাদনের শতকরা প্রায় ৯১ ভাগ ধান আসে ব্রি উদ্ভাবিত জাত থেকে। বোরো ধান চাষে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৯৪৯ কেজি ধানের সমমূল্য খরচ হয় সার, বালাইনাশক ও চারা উৎপাদনে; ২,২৫৭ কেজি ধানের সমমূল্য খরচ হয় শ্রমিক বাবদ; ৪৫৯ কেজি ধানের সমমূল্য খরচ হয় জমি তৈরিতে; ১,১৬৩ কেজি ধানের সমমূল্য খরচ হয় জমির ভাড়া বাবদ এবং ৯৬৮ কেজি ধান কৃষকের লাভ থাকে। কৃষকের লাভের পরিমাণ আমনে কিঞ্চিত কম এবং আউশে কৃষক হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩৩৩ কেজি ধানের সমমূল্য ক্ষতির সম্মুখীন হন।


ফলিত গবেষণা বিভাগের বিজ্ঞানীরা গত অর্থবছরে ২১৯ জন কৃষকের মাঠে উন্নত জাত প্রদর্শন করেছেন। তারা ৬১ জন কৃষকের মাঠ পর্যায়ে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ প্রদর্শন করেছেন। তাছাড়া ৮৩টি মাঠ দিবস ও ৬১টি কৃষক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে। এ বিভাগের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ৪০,৩৩৬ কৃষক-কৃষাণি ব্রির বিভিন্ন প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হয়েছেন। ব্রির প্রশিক্ষণ বিভাগ গত বছর ১৪,৬৩৭ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। এর মধ্যে ১২,৩৯০ জন কৃষক, ২,০৩০ জন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, ১৮০ জন বিজ্ঞানী ও ৩৭ জন এনজিওর কৃষি কর্মকর্তা ছিলেন।


এই ধারাবাহিক সফলতার নবায়নের জন্য এখন যা আরও জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন তাহলো, ব্রি প্রযুক্তি দ্রততম সময়ের মধ্যে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া। একইসঙ্গে ব্রির কাছে গণমানুষের প্রত্যাশা হলো, তারা যেন হেক্টরে ১২ থেকে ১৪ টন ফলনের হাইব্রিড ধানের জাত এবং ১০ থেকে ১২ টন ফলনের উফশী জাত উদ্ভাবন করার জন্য তাদের গবেষণা কর্যক্রমকে আরও জোরদার করেন। লবণাক্ত এলাকাসহ প্রতিকূল পরিবেশে ধানের আবাদ বাড়িয়ে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার আরও সচেষ্ট হওয়াটাও সমান জরুরি। এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এককভাবে কখনও সাফল্যের শীর্ষে চলে যেতে পারে না।


খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বর্তমানে আমরা যে স্বস্তিকর অবস্থানে আছি তার নেপথ্যে আরও অনেকে কাজ করছেন । এদিক থেকে সর্বাগ্রে আসে আমাদের কৃষকভাইদের কথা যারা হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কষ্টকর ফসল ফলানোর কাজটা অব্যাহত রেখেছেন। আর সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকসহ অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যারা ভালো বীজসহ অন্যান্য লাগসই প্রযুক্তি যথাসময়ে কৃষকের দোরগোরায় পৌঁছে দেয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেন তাদের অবদানও এখানে প্রণিধানযোগ্য।

 

লেখক:
এম এ কাসেম*

* প্রযুক্তি সম্পাদক ও প্রধান, প্রকাশনা ও জনসংযোগ বিভাগ, ব্রি, গাজীপুর-১৭০১,  ই-মেইল: mkashem1@yahoo.com  মোবাইল : ০১৭১২৮৪১৯৭০

বিস্তারিত
কৃষিকথার ৭৫ বছর এবং প্রাণিসম্পদ তথ্য সেবা

এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে, ‘কৃষিকথা’  হাঁটিহাঁটি পাপা করে ৭৫ বছরে পদার্পণ করছে। একটি পত্রিকার মাধ্যমে জাতিকে ৭৫ বছর তথ্য সেবা দেয়া চাট্টেখানি কথা নয়। ৭৫ বছর নানাভাবে যারা এ পত্রিকার সঙ্গে কাজ করেছেন আজকের এ সংখ্যাটি তাদের সবার জন্যই অত্যন্ত স্মৃতিময় এবং আনন্দের। ভাবতে অবাক লাগে আমিও এ পত্রিকার সঙ্গে সমানতালে পথ চলেছি ২৩ বছর।  আমার ২৩ বছরের চাকরি জীবনের সাত বছর আমি সরাসরি প্রাণিসম্পদ তথ্য সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেছি। বলা যায়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এ শাখাটিকে চালিয়েছি আমরা দুজন মাত্র মানুষ, একজন কৃষিবিদ ডা. সুলতান মহিউদ্দিন এবং অন্যজন আমি। প্রাণিসম্পদ তথ্য সম্পর্কিত কাজে তখন কৃষি তথ্য সার্ভিসের সাথে আমাদের আন্তঃযোগাযোগটি অত্যন্ত নিবিড় ছিল। বাংলাদেশ বেতারের ‘দেশ আমার মাটি আমার’ এবং ‘সোনালী ফসল’ এবং বিটিভির বহুল প্রচারিত কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘মাটি ও মানুষ’ এর পরিকল্পনা ও অনুষ্ঠান পরিচালনার নানা কাজে আমাকে ১৯৯২ সনের মে মাস থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম শাখা  ‘কৃষি তথ্য সার্ভিসে’  যাতায়াত করতে হতো। এ যাতায়াতের মাধ্যমেই কৃষিকথার সঙ্গে আমার পরিচয়। পত্রিকাটি  সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নের নানা রকম তথ্য অত্যন্ত সহজ ভাষায় পাঠযোগ্য করে প্রকাশ করে। সেই অর্থে কৃষিকথা  একটি সামগ্রিক কৃষির নানাবিধ তথ্যের  বহুল প্রচারিত একটি মুখপত্র। কৃষিবিষয়ক নানা প্রযুক্তি, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিবিষয়ক নানা তথ্য ও প্রযুক্তি, মাৎস্য সম্পর্কিত প্রযুক্তি এমনকি পরিবেশ বিষয়ক  নানা রকম লেখার একটি সমৃদ্ধ প্রকাশনার নাম কৃষিকথা। কৃষিকথায় লিখবার জন্য শ্রদ্ধেয় কৃষিবিদ মানজুমুল হক আমাকে উৎসাহিত করেন। লিখতে শুরু করি। লিখতে লিখতে কবে যে শ্রদ্ধেয় মানজুমুল হক স্যার আমার কাছে  মানজুমুল ভাই হয়ে গেছেন এ blending টা নির্ণয় করা কঠিন। লেখকদের তিনি এত ভালোবাসতেন যা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। কৃষিকথার  লেখকরা ছিলেন তার অপার বন্ধু। প্রাণ খোলা হাসি, কাপের পর কাপ চা, লেখার বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা, নতুন লেখার আহ্বান এবং সাম্প্রতিক প্রাণিসম্পদের  যে কোনো emerging issue তে তাকে দু-চার পাতা instant লিখে দিয়ে আসা এসবই আমাকে করতে হয়েছে কৃষিকথার পাগল কৃষিবিদ মানজুমুল হক ভায়ের চেম্বারে বসে। শুধু আমাকে নয়, আমার মতো অন্য যারা কৃষিকথায় লিখতেন-তাদেরও ঠিক আমার মতো লিখে দিতে হয়েছে মানজুমুল ভাইয়ের  দাবির কারণে। চাকরির পাশাপাশি লেখালেখির জন্য কৃষি তথ্য সার্ভিসের বর্তমান দিকপাল ডক্টর জাহাঙ্গীর আলম আমার দ্বিতীয় বন্ধু। কৃষি তথ্যের সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে কৃষিবিদ ডক্টর জাহাঙ্গীর আলম পাগলের মতোই কাজ করেন; মিডিয়াতে কৃষির প্রেজেন্টেশনের ব্যাপারে তিনি নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ।  তার উদাত্ত আহ্বানে বেতার এবং টেলিভিশনে কৃষিবিষয়ক নানা কার্যক্রমের সঙ্গে আমি আরও বেশি সম্পৃক্ত হয়েছি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, একজন লেখকের লেখা নিপুণ হাতে সম্পাদনা করে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে সম্পাদকের ভূমিকা অপরিসীম।     


৭৫ বছরের স্বর্ণোজ্জ্বল পথ চলায় কৃষিকথা  কতটুকু প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে অবদান রেখেছে সে প্রসঙ্গে অবশ্যই আসতে হয়।  একটি বিষয়ভিত্তিক তথ্যমূলক ম্যাগাজিন সেই বিষয়ের নানা শাখা-প্রশাখাকে কতভাবে তথ্যের মাধ্যমে তুলে ধরতে পারে তা কেবল কৃষিকথার পাঠক এবং লেখক সমাজই অনুধাবন করতে পারেন। প্রাণিসম্পদের ক্ষেত্রে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, ছাগল-ভেড়ার নানাবিধ রোগব্যাধি এসবের পরিচর্যা, স্বাস্থসেবা, রোগ-প্রতিরোধ, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় এদের সংরক্ষণ, খাদ্য ও রোগ দমন, নতুন নতুন রোগ যেমন বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু-ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক তথ্য তুলে ধরে মানুষকে আতঙ্কের হাত থেকে বাঁচানো ইত্যাদি সার্বিক বিষয় কলমের ভাষায় জানাবার জন্য কৃষিকথার সমতুল্য অন্য কোনো পত্রিকা ৭৫ বছর আগেও ছিল না এবং আজও নেই।


তবে কৃষিকথায়  লিখবার জন্য একজন লেখককে সব সময় তথ্যে সমৃদ্ধ থাকতে হয়। যেমন বলা যায়, বার্ড ফ্লু অথবা সোয়াইন ফ্লু এসব emerging pandemic threats এর ক্ষেত্রে পেশাজীবীদের জ্ঞান থাকতে হয় পরিষ্কার এবং updated. মানুষকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করা হচ্ছে একজন পেশাভিত্তিক লেখকের কাজ। সুতরাং দুনিয়াতে কখন কোন রোগের আবির্ভাব ঘটছে এবং কীভাবে সেটা মোকাবিলা করা হচ্ছে এবং আমাদের কী  করণীয় ইত্যাদি নানা বিষয়েই পেশাভিত্তিক লেখকদের  সর্বদা জানা শোনার মধ্যে থাকতে হয়। শুধু রোগব্যাধি কেন? প্রযুক্তির নানা ডালপালা  কিভাবে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নকে সার্বিক কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখে সে বিষয়েও লেখকের জ্ঞান থাকতে হয় পরিষ্কার এবং updated. যেমন ধরা যাক, একজন কৃষকের জমি আছে, সেখানে ধান, গম, সবজি চাষ করেন। কিন্তু ওই কৃষকের যদি কয়েকটি গরু না থাকে তবে তিনি নানাভাবে বহুমাত্রিক উপকার থেকে বঞ্চিত হন। কারণ কৃষকের জমির পাশাপশি যদি কিছু গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগি থাকে তবে সেখান থেকে তিনি বায়োগ্যাস পেতে পারেন, জৈবসার পেতে পারেন। আজকের কৃষিতে জৈবসারের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দীর্ঘদিনের রাসায়নিক সার প্রয়োগ মাটিকে অধিক সার নির্ভর করছে এবং মাটির উর্বরতাও নষ্ট করছে। এজন্যই পৃথিবীতে আজ অর্গানিক ফার্মিং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্গানিক ফার্মিংয়ের মাধ্যমে আজ শুধুমাত্র মাটির উর্বরতা রক্ষা করাই সম্ভব হচ্ছে না, জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণেও অর্গানিক ফার্মিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষিকথায় তাই প্রাণিসম্পদ, মাৎস্য সম্পদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানকে সমন্বিত করে প্রচার করার মাধ্যমে কৃষকের বহুমাত্রিক সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। আজকে খাদ্য বলতে শুধু ভাত আর ডালকে বুঝায় না, আজকে খাদ্য বলতে ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, সবজি এবং ফলমূলকে বুঝায়। সুতরাং কৃষিকথায় শুধু প্রাণিসম্পদ অথবা মৎস্য সম্পদ নয়-প্রযুক্তির নানা ডালপালা নিয়ে লিখবার জন্য কৃষিকথা আদিকাল থেকেই সবার আঁধার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা পেশাভিত্তিক লেখার জন্য প্রস্তুত কিনা? যদি নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা যায় লিখবার জন্য তবে কৃষিকথা স্থান রেখেছে অবারিত। খুব দুঃখজনকভাবে উল্লেখ করতে হয় প্রাণিসম্পদের মতো একটি বিশাল ক্যাডারে টিপিক্যাল চাকরিজীবী  ছাড়া পেশাভিত্তিক লেখকের বেশ অভাব রয়েছে। এ অভাব যদি ঘোচানো যায় তবেই তথ্যের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব।


এখানে প্রশ্ন আসে তথ্যমূলক লেখার মাধ্যমে জনগণ কীভাবে উপকৃত হতে পারে? ধরা যাক,  পোলট্রি পালনে রানীক্ষেত অথবা কলেরা অথবা সালমোনেলা অথবা ই-কোলাই এসব রোগ দমন করতে পারলেই পোলট্রি পালন লাভজনক হয়, নইলে না। এসব রোগের যে কোন একটি প্রসঙ্গে একটি নিবন্ধ রচনা করা সম্ভব হলে মাত্র একটি লেখার মাধ্যমে ৪৫-৫০ হাজার খামারি সেখান থেকে তথ্য পেয়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে পারেন।  একজন টিপিক্যাল  পেশাজীবীকে ৫০ হাজার লোকের ঘরে গিয়ে তথ্য সেবা পৌঁছে দিতে ৪-৫ বছর সময় লেগে যাবে। কিন্তু মিডিয়াকে সেবা প্রদানের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করলে মাত্র একটি নিবন্ধই যথেষ্ট।  সুতরাং মিডিয়ার এ শক্তিটাকে যত বেশি কাজে লাগানো যায় ততই গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষকে তথ্য সেবা প্রদান করা যায় এবং এ তথ্য সেবা প্রদানের জন্য কেবলমাত্র একটি কৃষিকথার মতো পত্রিকাই যথেষ্ট এবং এ শ্রেণীর সেবার জন্য ব্যয় অত্যন্ত সীমিত। সুতরাং তথ্য সেবা যত বেশি এবং যত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় তত বেশি এবং তত দ্রুত  উন্নয়ন ঘটে। এ বিচারে কৃষি তথ্য সার্ভিস স্বয়ংসম্পূর্ণ তথ্য সেবা প্রতিষ্ঠান। কারণ শুধু কৃষিকথা নয়, ‘ electronic information system (video wing)’ এবং ‘কৃষি রেডিও’ ইত্যাদি সবকিছুই আজ কৃষি তথ্য সার্ভিসের নিজস্ব কর্মকা-ের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত। ফলে আজকের কৃষি তথ্য সার্ভিস একটি বহুমাত্রিক তথ্য সেবাদানের স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত।


আজকে বিশ্বায়নের যুগের সূচনা ঘটেছে মূলত অবাধ তথ্য প্রবাহের কারণে। তথ্য যখন অধিক দ্রুত এবং অবশ্যম্ভাবিকভাবে পৃথিবীতে বিচরণ করতে শুরু করে তখন কিন্তু পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলো বিচ্ছিন্ন থাকে না। রাষ্ট্রগুলো তখন একীভূত বিশ্বের গ্রামে রূপান্তরিত হয়। সেজন্যই বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রগুলোকে বলা হয় global village. সুতরাং তথ্যের বদৌলতে বিশ্বায়ন এবং বিশ্বায়নের মাধ্যমে প্রযুক্তি, বাণিজ্য, উন্নয়ন, বিনিয়োগ, বিনিময়, প্রশাসন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক  ইত্যাদি হাজারো পথ উন্মুক্ত সমগ্র বিশ্বব্যাপী। ‘বিশ্বায়নের যুগে আমাদের প্রাণের কৃষিকথা কৃষকের জন্য কথা বলুক শত শত বছর এ স্বপ্ন দেখি এবং এই প্রত্যাশা করি কৃষিকথার ৭৫ বছরে পদার্পণকালে।’
 

লেখক:

কৃষিবিদ ডা. এম এ সবুর*

* ইউএলও, প্রাণিসম্পদ দপ্তর, মহাদেবপুর, নওগাঁ, মোবাইল :০১৬৮১১২৫৯১২

বিস্তারিত
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের ভূমিকা

সুস্থ-সবল ও মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনে মৎস্য খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় অর্থনীতিতে এ সম্ভাবনাময় সেক্টরের ভূমিকা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। বলা যায়, এ দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১২-১৩ সনে মাছের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪.১০ লাখ টনে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৩-এর তথ্যমতে, এ দেশের মোট দেশজ উৎপাদ বা জিডিপির ৪.৩৭ শতাংশ এবং মোট কৃষিজ জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৩.৩৭ শতাংশ) মৎস্য খাতের অবদান। সাম্প্রতিক সময়ে মৎস্য খাতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কৃষির অন্যান্য উপ খাত যেমন- শস্য, প্রাণিসম্পদ ও বনের তুলনায় অনেক বেশি। এ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধানেও মৎস্য খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় প্রায় ৬০% প্রাণিজ আমিষের জোগান দেয় মাছ। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের অধিক লোক এ সেক্টরের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়োজিত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। বিগত পাঁচ বছরে এ খাতে বার্ষিক অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষাধিক লোকের। দেশের রপ্তানি আয়ের ২ শতাংশের অধিক আসে মৎস্য খাত থেকে। গত পাঁচ বছরে মৎস্য উৎপাদনে গড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৫.৮৮ শতাংশ।


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রূপকল্প ২০২১-এ উল্লিখিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে মৎস্য অধিদপ্তর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মৎস্য সেক্টরে অর্জিত হয়েছে দৃশ্যমান সাফল্য। আশা করা যায় ২০১৪-১৫ সনের মধ্যে ইপ্সিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকাংশেই সম্ভব হবে।

 

২০১৪-১৫ সনের মধ্যে অর্জিতব্য লক্ষ্যমাত্রা
মাছের উৎপাদন ২০০৮-০৯ (২৭.০১ লাখ টন)-এর চেয়ে ২৫% বৃদ্ধিকরণ,
(২০১২-১৩ সনের মধ্যেই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্থাৎ ২৬.২৫% বৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে)
জনপ্রতি ৫৬ গ্রাম আমিষের চাহিদা পূরণ,
(২০১২-১৩ সালের মধ্যে জনপ্রতি আমিষের প্রাপ্তি ৫২ গ্রামে উন্নীত হয়েছে)
চিংড়ি ও মংস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক আয় ১ বিলিয়ন ইউএস ডলারে উন্নীতকরণ,
বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা,
(বিগত ৫ বছরে বার্ষিক অতিরিক্ত কর্মসংস্থান প্রায় ৬ লাখ)
মৎস্যচাষি/মৎস্যজীবীদের আয় ২০% বৃদ্ধিকরণ,
মৎস্যচাষে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ,
(মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে গড়ে ২০ শতাংশ মহিলার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে)
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ।
বাজারে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ।


মৎস্য খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য ও উন্নয়ন সম্ভাবনা
১. মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান : দেশের মৎস্যসম্পদের কাক্সিক্ষত উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির বিভিন্ন সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ২৭.০১ লাখ টন, সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ তথা মৎস্যবান্ধব কার্যক্রম এবং চাষি-উদ্যোক্তা পর্যায়ে চাহিদামাফিক কারিগরি পরিসেবা প্রদানের ফলে ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৪.১০ লাখ টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মৎস্য উৎপাদনের ইপ্সিত লক্ষ্যমাত্রা ৩৫.৫৫ লাখ টন অর্জিত হবে বলে প্রাথমিক তথ্যে প্রতীয়মাণ হয়। প্রবৃদ্ধির এ ক্রমধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২০-২১ সনের মধ্যে দেশে মৎস্য উৎপাদন ৪৫.৫২ লাখ টন অর্জিত হবে বলে আশা করা যায়। ফলে ২০২০-২১ সনে দেশের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর জন্য প্রক্ষেপিত মৎস্য চাহিদা (৪৫.২৮ লাখ টন) পূরণ করা সম্ভব হবে। গত ১০ বছরের মৎস্য উৎপাদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বেশ উৎসাহব্যঞ্জক (গড় প্রবৃদ্ধি ৫.৪৯ শতাংশ) এবং এ ক্ষেত্রে প্রায় স্থিতিশীলতা বিরাজমান।


দেশে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে দরিদ্র মৎস্যজীবীদের আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে দেশের ১১ শতাংশের অধিক বা প্রায় ১৭১ লাখ লোক তাদের জীবন-জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য উপ খাতের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্য সেক্টরে সংশ্লিষ্ট এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ নারী, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ। এছাড়াও বিগত পাঁচ বছরে এ সেক্টরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত বার্ষিক ৬ লক্ষাধিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, বর্তমানে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে নিয়োজিত শ্রমিকের ৮০ শতাংশের অধিক নারী।


বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের (নদী, সুন্দরবন, কাপ্তাই লেক, বিল ও প্লাবনভূমি) পরিমাণ প্রায় ৩৯ লাখ ২০ হাজার হেক্টর, বদ্ধ জলাশয়ের (পুকুর, মৌসুমি চাষকৃত জলাশয়, বাঁওড় ও চিংড়ি ঘের) পরিমাণ ৭ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টর, সামুদ্রিক পানিসীমার পরিমাণ ১ লাখ ৬৬ হাজার বর্গ কিমি. এবং সমুদ্র উপকূল রয়েছে ৭১০ কিমি.। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৮৩-৮৪ সনে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ৭.৫৪ লাখ টন, সেখানে তিন দশকের ব্যবধানে এ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৪.১০ লাখ টন। বিগত প্রায় তিন দশকের খাতওয়ারি উৎপাদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৩-৮৪ সনে উন্মুক্ত জলাশয়ের অবদান ৬৩ শতাংশ হলেও ২০১২-১৩ সালে এ খাতের অংশ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশে। অন্যদিকে প্রায় তিন দশকের ব্যবধানে বদ্ধ জলাশয়ের অবদান সাড়ে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য উৎপাদন হ্রাস না পেলেও প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি মূলত বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার কারণেই।


২. পোনা অবমুক্তি কার্যক্রম ও বিল নার্সারি স্থাপন : উন্মুক্ত জলাশয়ে পোনা অবমুক্তি কার্যক্রমের আওতায় ২০১৩-১৪ বছরে রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় দেশব্যাপী প্রায় ৪৯০ টন গুণগতমানসম্পন্ন ও বিপন্ন প্রায় প্রজাতির পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। বিগত পাঁচ বছরে মোট পোনামাছ অবমুক্তির পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন। এ পোনামাছ অবমুক্তি কার্যক্রমের ফলে বার্ষিক প্রায় ৭,৫০০ টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদিত হচ্ছে এবং এরই মধ্যে অনেক বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছের আবির্ভাব ঘটেছে। তাছাড়া এ সরকারের আমলেই মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় দেশে প্রথমবারের মতো বিল নার্সারি কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত পাঁচ বছরে রাজস্ব বাজেটে মোট ৭১৫টি বিল নার্সারি স্থাপিত হয়েছে। ২০১৩-১৪ বছরে বিল নার্সারি স্থাপন করা হয়েছে ২০৬টি। প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, এ কার্যক্রম পরিচালনার ফলে দেশের উন্মুক্ত জলাশয়ে বার্ষিক প্রায় দুই হাজার টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদিত হচ্ছে এবং জলমহালের ওপর নির্ভরশীল জেলে/ সুফলভোগীদের আয় বৃদ্ধিসহ স্থানীয় পর্যায়ে প্রাণিজ আমিষের সরবরাহ বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশব্যাপী বিল নার্সারি কার্যক্রম আরো স্থায়িত্বশীল করার লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি ১১৮ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে উন্মুক্ত জলাশয়ে বিল নার্সারি স্থাপন ও পোনা অবমুক্তকরণ শীর্ষক একটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করেছে।


৩. সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা ও মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন : জলাশয় সংশ্লিষ্ট মৎস্যজীবী-জেলেসহ সংশ্লিষ্ট সুফলভোগীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জলাশয়ের জৈবিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকার এরই মধ্যে সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি ২০০৯ প্রণয়ন করেছে। এ নীতির আওতায় অভ্যন্তরীণ জলসম্পদের স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য জলাশয় সংশ্লিষ্ট সুফলভোগী/জেলেদের সমন্বয়ে সমাজভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিপন্ন প্রায় মৎস্য প্রজাতির সংরক্ষণ, প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য অভয়াশ্রম স্থাপন একটি অন্যতম কারিগরি কৌশল। বিগত পাঁচ বছরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৫৩৪টি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পাঁচ বছরে স্থাপিত ৫৩৪টি অভয়াশ্রমসহ বর্তমানে দেশব্যাপী প্রায় ৫৫০টি অভয়াশ্রম স্থানীয় সুফলভোগী কর্তৃক সফলতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভয়াশ্রম স্থাপনের ফলে বিপন্ন প্রায় মৎস্য প্রজাতি যথা-চিতল, ফলি, বামোস, কালিবাউস, আইড়, টেংরা, মেনি, রানী, সরপুঁটি, মধু পাবদা, রিটা, কাজলী, চাকা, গজার, তারা বাইম ইত্যাদি মাছের প্রাপ্যতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।


৪. পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ : চিংড়ি বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি খামারে উত্তম চাষ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। এসব খামারে পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সমন্বিত চিংড়ি-শস্য/সবজি চাষ ব্যবস্থাও প্রবর্তিত হচ্ছে। জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা ২০১৪ অনুমোদিত হয়েছে। আশা করা যায়, এ নীতিমালা মোতাবেক পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও লাগসই সম্প্রসারণ সেবা প্রদান, চাষি প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী খামার পরিচালনা ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে চিংড়ি খামার থেকে কাক্সিক্ষত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি একটি স্থায়িত্বশীল চিংড়ি চাষ ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন সম্ভব হবে। নানাবিধ অপপ্রচার ও নেতিবাচক কার্যক্রমকে মোকাবিলা করে এ ক্রমবর্ধনশীল শিল্পকে অধিক স্থায়িত্বশীল করার লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর সরকারি-বেসরকারি  সুফলভোগীদের নিয়ে নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।


চাষিপর্যায়ে রোগমুক্ত ও গুণগতমানসম্পন্ন চিংড়ি পোনার সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৬টি জীবাণু শনাক্তকরণের জন্য মৎস্য অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ড ফিশের যৌথ উদ্যোগে পিসিআর প্রটোকল তৈরির পাশাপাশি পিসিআর পরীক্ষিত পোনা মজুদের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাছাড়া চিংড়ি চাষকে আরো লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব করার নিমিত্ত জলাশয় বা ঘেরের গভীরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চিংড়ির পিএল নার্সিং-এর মাধ্যমে ঘেরে জুভেনাইল মজুদের বিষয়ে চাষি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। (চলবে)।

 

লেখক:

সৈয়দ আরিফ আজাদ*
* মহাপরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ভবন, রমনা, ঢাকা

বিস্তারিত
কৃষিকথার ৭৫ বর্ষে নিবেদিত

চতুর্দশপদী পঙ্ক্তিমালা          

   (১)
ফসল যা সব  মন্বন্তরে গিলে খেল
হাজার মানুষ  মরণের কোলে গেল।
মড়ার উপর  ঝাঁকে ঝাঁকে কাকে চিলে
পড়ল ঝাঁপিয়ে  মহানন্দে নিল ছিলে।

চৈতী ধান গেল  নীল আবাদের ফেড়ে
বেনিয়ারা সব  ধানী জমি নিল কেড়ে।
নীল চাষে হলো  গোলাঘর শস্য হারা
খাদ্যাভাবে বঙ্গে  বহুলোক গেল মারা।

নড়ল টনক   রাজ্যজুড়ে এ খবরে
সাম্রাজ্য থাকে কী  গেলে কৃষক কবরে !
খাবার জন্মাতে  কৃষিতে নজর চাই
একটি পত্রিকা  জন্ম দিতে হলো তাই।

কৃষিকথা জন্ম  থেকে যাচ্ছে দিয়ে দিশে
তার পঁচাত্তর  জয়ন্তী ভরি আশীষে।।

                  (২)

ভাদুই ধান কি চৈতী ধানে ভরা  মাঠ
পয়লা বৃষ্টির আগে বুনে কেউ পাট।
শাকসবজির শাখা  দোলে ডাঙ্গাজুড়ে
বাথানে চড়ছে পশু  রাখালিয়া সুরে।

নীরবে বেনিয়া ঢুকে কুক্ষণে এ দেশে
লুটে নেয় ধন জন  শাসকের বেশে।
সোনা ফলা দেশ ছেয়ে গেল তমাশায়
মন্বন্তর গ্রাস করে তামাম বাংলায়।

আবার স্বদেশে এল  প্রাণের উচ্ছ্বাস
নতুন ধারায় হয় কৃষির বিকাশ।
গোলা ভরা ধান আর জলাশয়ে মাছ
গোয়ালে গরুর পাল আর ফুল চাষ।
চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা ভরে
ফসল- ভূষণ যায় দেশ দেশান্তরে।।

                (৩)
ধান ছিল পাট ছিল   ছিল মসলিন
ধন ছিল মান ছিল   ছিল শুভদিন।
ক্রমে এলো বর্গি  আর বেনিয়া এ দেশে
ধন জন নাশ করে  তলানির শেষে।

মন্বন্তরে  গ্রাম ডুবে   পত্তন নগরে
নীল চাষে কড়ি জমে  বণিকের ঘরে।
রেল এলো ব্রিজ হলো   বাড়াল ব্যবসায়
 জনতার ত্রাহি ত্রাহি  নামাল তমাশা।

এর পর মৎস্য ন্যায়  চলেছে স্বদেশে
বেঁচে থাকে চাষাভূষা  নিদারুণ ক্লেশে।
ধর্মের বাঁধনে দেশ ভাগ হলে পরে
 ভাষা আর আশা গেল  আরেক খপ্পরে।

অতঃপর রক্ত ঝরে   এলো স্বাধীনতা
গোলা ভরা ধান আজ  সাথী কৃষিকথা।।

                 (৪)

রাখালের বাঁশি আর  জ্যোৎস্না মাখা কিচ্ছা
ঝলমলে  ওই দিনে  ফিরে যেতে ইচ্ছা।
যেখানে নোলক পড়া  গাঁয়ের মেয়েরা
পায়ে মল কটিবন্ধে  করে চলা ফেরা।

ঢেঁকিতে পা আর কণ্ঠে  সোনাভানি গান
আঁচলে মায়ের স্নেহ  মুখ ভরা পান।
পালতোলা নাও ভাসে  নদী ও বন্দরে
নাইয়োরি যায়   কোন  দূর তেপান্তরে।।

এখনো সরিষা ফোটে  সোঁদা গন্ধমাখা
ফসলি জমিন হাসে  যেন পটে আঁকা ।
গেলাঘর পূর্ণ ধানে  কৃষকেরা  সুখী
মঙ্গা আজ ইতিহাসে  পড়ে খোকা-খুকি।

সুজলা সুফলা  দেশ  এত মনোহর
স্বপ্ন আর বাস্তবের  যেন সহোদর।।

 

লেখক:
কৃষিবিদ এ এইচ ইকবাল আহমেদ*

* পরিচালক (অব.), বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী, সেল:01558301908/ahiqbal.ahmed@yahoo.com

বিস্তারিত
সম্পাদকীয়-১৪২২

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আমাদের জীবন ও জীবিকার অন্যতম মাধ্যম হলো কৃষি। কৃষি আমাদের সংস্কৃতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই কৃষির উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন, জনমানুষের জীবন ও সংস্কৃতির উন্নয়ন। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে দেশে অনেক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া কাজ করে যাচ্ছে। প্রিন্ট মিডিয়াগুলোর মধ্যে অতি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনার নাম মাসিক ‘কৃষিকথা’। ১৯৪১ সনে তৎকালীন বঙ্গীয় কৃষি বিভাগ হতে মাসিক ম্যাগাজিন হিসেবে প্রথম কৃষিকথার যাত্রা শুরু হয়। কৃষিকথায় দেশের খ্যাতনামা কৃষিবিদ, কৃষি বিজ্ঞানী, গবেষক, কৃষিকর্মী, সমাজকর্মী, কবি, সাহিত্যিকদের তথ্যবহুল ও প্রযুক্তিভিত্তিক লেখা ছাপা হয়ে থাকে। এ ম্যাগাজিনটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্যতম মুখপত্র হিসেবে ৭৪ বছর ধরে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। কৃষিকথা কৃষি গবেষণার ফলাফল, গবেষকদের জ্ঞানলব্ধ কারিগরি তথ্য, চাষি ভাইদের অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়ে সেতু বন্ধনের কাজ করছে। শুধু তাই নয়, সরেজমিন অভাব অভিযোগ ও সমস্যাদি সমাধানের ব্যাপারে কৃষিকথা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কলাকৌশল প্রয়োগে কৃষিকর্মী ও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা অর্থাৎ কৃষির গতিশীলতায় উৎসাহ জোগানোই কৃষিকথার প্রধান কাজ। কৃষিকথা একদিকে যেমন কৃষি সাহিত্য, অন্যদিকে তেমনি কৃষি বিজ্ঞানও বটে। সাহিত্য ও বিজ্ঞান-এ দুইয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমেই কৃষিকথা তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে কালের গতিপথ- যুগ যুগ ধরে রেখে যাচ্ছে সাফল্যের স্বাক্ষর। আজকের কৃষিকথা চলমান কৃষি সাহিত্য কিংবা কৃষি বিজ্ঞান হিসেবে অল্প ব্যয়ে নব নব আবিষ্কারের তত্ত্ব, তথ্য ও প্রযুক্তি কৃষিকর্মী ও কৃষকের কাছে পৌঁছে দিয়ে কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতেও সক্ষম হয়েছে।


হাঁটিহাঁটি পা পা করে এ মাসেই কৃষিকথা ৭৫ বছরে পদার্পণ করল। দেশের কৃষি, কৃষক তথা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়নে কৃষিকথার অবদান ও গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে কৃষিকথা, বৈশাখ-১৪২২ সংখ্যাটিকে স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে বিশেষ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ সংখ্যাটিতে স্মৃতিচারণমূলক এমন কিছু লেখা স্থান পেয়েছে যাতে রয়েছে কৃষিকথার জন্ম ইতিহাস, কৃষি তথ্য সার্ভিস গঠনের ইতিহাস, রয়েছে লেখক, গবেষক, পাঠক তথা কৃষকের মধ্যে যোগসূত্রতার ইতিহাস। এসব লেখার মাধ্যমে কৃষিকথাকে, কৃষিকথার ইতিহাসকে, কৃষি তথ্য সার্ভিসকে নবরূপে নব আঙ্গিকে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা আশা করি আমাদের এ প্রচেষ্টাকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবেন, সার্থক করবেন। সংখ্যাটিতে লেখা দিয়ে যারা আমাদের উদ্দেশ্য সাধনে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি রইল আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

বিস্তারিত

Share with :