কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা (আশ্বিন ১৪২৩)

পৃথিবীর সব স্তন্যপায়ী প্রজাতির মধ্যে শতকরা ৪২ ভাগ ইঁদুরজাতীয় প্রাণী। ইঁদুরজাতীয় প্রাণী রোডেন্টসিয়া (Rodentia) বর্গের  ও মিউরিডি (Muridae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। সারা পৃথিবীতে ২৭০০টির অধিক ইঁদুরজাতীয় প্রজাতি আছে। এ প্রাণীদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের দাঁতের বিশেষ গঠন ও তার বিন্যাস। ১৬টি দাঁত থাকে। মাংসাশী ও প্রেষণ পূর্ব দাঁত নেই। তবে উভয় পাটিতে সামনে একজোড়া করে ছেদন দাঁত যা অত্যন্ত তীক্ষè ও ধারালো বাটালির মতো। ছেদন দাঁত গজানোর পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত বাড়ে। কাটাকাটি না করতে পারলে দাঁত বেড়ে চোয়াল দিয়ে বেড় হয়ে যায় এবং ইঁদুরের খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। দাঁত ঠিক রাখার জন্য শক্ত জিনিস সর্বদা কাটাকাটি করে। ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, সজারু ইঁদুরজাতীয় প্রাণী। চিকা ইঁদুরজাতীয় প্রাণী নয়। ইঁদুর সর্বভুক, নিশাচর এবং স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম প্রাণী। এর উপকারী ও অপকারী  উভয় ভূমিকা রয়েছে। তবে ক্ষতিকারক ভূমিকাই বেশি ।
ইঁদুরের আচরণের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যাবলি
যে কোনো পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে; খাদ্য, পানি ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা পেলে বাচ্চার সংখ্যা বাড়ানো ও কমানোর ক্ষমতা আছে; গর্ভধারণকাল প্রজাতিভেদে ১৮-২২ দিন, বাচ্চা প্রসবের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আবার গর্ভধারণ করে; সার্বক্ষণিক কৌতূহলি এবং অনুসন্ধানকারী স্বভাব থাকে। সবাইকে শত্রুভাবে; খাদ্য, পানি ও বাসস্থানের একটির অভাব হলে স্থান পরিবর্তন করে; ইঁদুরের স্মরণশক্তি (৬০ দিন মনে থাকে), ঘ্রাণশক্তি প্রখর, জিহ্বার স্বাদ মানুষের মতো (তিতা, মিষ্টি) এবং রঙ শনাক্ত করতে পারে না; ইঁদুরের খাদ্যভ্যাস প্রজাতি ও একই গোত্রভেদে ভিন্ন হয়; বাচ্চাদের অসুবিধা বা বিপদ অনুভব করলে নিজের বাচ্চা খেয়ে ফেলে; ইঁদুর সন্ধ্যা ও ভোর রাতে খাদ্য গ্রহণ ও সংগ্রহ এবং প্রজননে বেশি সক্রিয় হয়; খাদ্য, বাসস্থান ও পানির প্রাপ্যতার ওপর বংশবিস্তার নির্ভর করে।
 ইঁদুরের পপুলেশন বেশি হওয়ার কারণ
যেখানে  সারা বছর খাদ্য, বাসস্থান ও পানির নিশ্চয়তা  প্রদানের  স্থায়ী পরিবেশ রয়েছে  সেখানে ইঁদুরের সংখ্যা বেশি। যেমন শহরে গ্রামের চেয়ে ইঁদুরের সংখ্যা বেশি। শহরের ডাস্টবিন ইঁদুরকে সারা বছর খাদ্য ও বাসস্থানের স্থায়ী নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। ড্রেন ও ছিদ্র পাইপ ইঁদুরকে পানির নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। অনেক পতিত উঁচু ভূমি রয়েছে যেখানে বেশি জোয়ারের সময় ইঁদুর আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে। এখানে রয়েছে নারিকেল, সুপারি,  খেজুর, কলাগাছ, বরই, আম, মান্দারসহ ইত্যাদি গাছ  যা ইঁদুর জোয়ারের সময় আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। হোগলাপাতা, কচুরিপানা, কচুগাছ, ঢোলকলমি রয়েছে যেখানে ইঁদুর আশ্রয় নিতে পারে। এছাড়া এর আগে এখানে কোনো রকম দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ধান ফসলের থোড় থেকে পাকা পর্যন্ত সময়ে প্রজনন করে। প্রজননের সময়ে একটি স্ত্রী ইঁদুর নিধন করতে পারলে ৩৫টি ইঁদুর নিধনের সমান ফল পাওয়া যাবে। গম, ভুট্টা, গোলআলু, নানা রকম ডাল ও তেলজাতীয় ফসলের চাষ হয়, যা ইঁদুরের বংশবিস্তারের সহায়ক।  
বিস্তৃতি (Distribution) : বাংলাদেশে নিচু এলাকায় জলাভূমিতে এদের উপস্থিতি আছে। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল এলাকায় যেমন মনপুরা দ্বীপ ও নিঝুম দ্বীপে এদের উপস্থিতি রয়েছে।
 ইঁদুরের নিবাস : বর্ষা মৌসুমে মাঠের ফসল সম্পূর্ণভাবে ডুবে যায়। এ সময় ইঁদুর উঁচু স্থানগুলো আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
১. ছোট-বড় অধিক উঁচু পতিত ভূমি ও ভিটাবাড়ি রয়েছে, সেখানে বর্ষাকালে আশ্রয় গ্রহণ করে। এসব পতিত উঁচু ভূমিতে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ৪০-৫০টির বেশি নতুন ইঁদুরের গর্ত পাওয়া গেছে।
২. মাঠে ও বসতবাড়ির পাশে হোগলাপাতার বাগানে আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে;
৩. পুকুর ও খালে প্রচুর কচুরিপানা রয়েছে । এ সব স্থান ইঁদুরের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে;
৪.  খালের পাড়, উঁচু রাস্তায় বর্ষার সময় গর্ত খুঁড়ে বাস করে থাকে;
৫.  ঢোলকলমি, কচুগাছ, ছন ও অন্যান্য আগাছা প্রচুর পরিমাণে আছে যে স্থানগুলো ইঁদুর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে;
৬. খামারের নারিকেল, সুপারি, আম, জাম, মান্দারগাছ, কলা, খেজুর গাছ, বনজ বৃক্ষগুলো ইঁদুর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে;
৭.  বন্যা হলে কচুরিপানা ও কাঠের সাথে এক স্থান হতে অন্য স্থানে ইঁদুরের বিস্তার ঘটে।
ইঁদুর দমনের প্রয়োজনীয়তা
১. বাংলাদেশে প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা ১২-১৫ লাখ মেট্রিক টনের অধিক খাদ্যশস্য ক্ষতি করে;
২. প্রতিটি নারিকেল গাছের ১০-১২টি কচি নারিকেল প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা নষ্ট হয়। সুপারি ও শাকসবজি (গোলআলু), ডাল এবং    তেল ফসলের অনেক ক্ষতি করে;
৩. রাস্তাঘাট, বাঁধ, সেচ নালা, বসতবাড়ি, দালানকোঠা এসব অবকাঠামোর গর্ত খননের ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় এবং ১৫ শতাংশ সেচের পানির অপচয় হয়;
৪. ইঁদুর ৬০টির বেশি রোগের জীবাণু বহন ও বিস্তারকারী। এদের মাধমে অনেক ধরনের জুনোটিক রোগ যেমন- প্লেগ, অ্যাইরোসিস। এছাড়া নানা প্রকার চর্মরোগ, কৃমিরোগ, হানটাভাইরাস,  মিউরিন টাইফাস, স্পটেড জ্বর, লেপটোস্পাইরোসিস, ইঁদুরের  কামড়ানো জ্বর, জ-িস রোগের জীবাণু ইঁদুর দ্বারা বিস্তার ঘটে। এসব রোগের জীবাণু ইঁদুরের মলমূত্র, লোমের মাধ্যমে বিস্তার ঘটে;  
৫.ইঁদুর খাদ্যের বিষক্রিয়া ও পরিবেশের দূষণ ঘটিয়ে থাকে;
৬.হাঁস-মুরগির খামারে ইঁদুর মুরগির বাচ্চা ও খাদ্য খেয়ে ক্ষতি করে। এছাড়া হাঁস-মুরগির বিভিন্ন রোগের বিস্তার ঘটিয়ে থাকে। বাংলাদেশে হাঁস-মুরগি খামারে ইঁদুর একটি প্রধান সমস্যা;
৭. ইঁদুরের উপস্থিতি স্থানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পদ এবং জিনিসপত্রের কমবেশি ক্ষতি হবেই। এজন্য ইঁদুরের উপস্থিতি দেখামাত্র মারার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

গর্ত পদ্ধতি (Burrow system) : গর্ত পদ্ধতিতে অনেক মুখ (৩-৫টি) থাকে। গর্ত পদ্ধতি সাধারণত খোলা রাখে এবং আবার অনেক বন্ধ করে রাখে। গর্তের মুখে ধানের শীষ বা খাদ্যের আবর্জনা  রাখতে দেখা গেছে। গর্তে খাদ্য মজুদ করে না। একটি গবেষণার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাত্রিকালীন গতিবিধি প্রায় ২৫০ মিটার দূরে গিয়ে খাদ্য গ্রহণ করে ফেরত আসে। গর্ত থেকে অনেক দূর পর্যন্ত ইঁদুর চলাচলের রাস্তা সহজেই চোখে পড়ে। একটি গর্তে একত্রে পুরুষ ও স্ত্রী দুইটি ইঁদুর পাওয়া যায়।  

শস্যের ক্ষতি (Damage to crops) বাংলাদেশে মাঠের কালো ইঁদুর সব প্রকার মাঠ ফসলের ও গুদামজাত শস্যের এক নম্বর ক্ষতিকারক প্রজতি। একটি ইঁদুর প্রতি রাতে ১০০-২০০টি কুশি কাটতে পারে। আমনধানের শতকরা ১০-১৫ ভাগ এবং গম ফসলের ১৫-২০ ভাগ বা তারও বেশি ক্ষতি করে থাকে। বাংলাদেশে গুদামজাত খাদ্যশস্যের ১২-১৫ শতাংশ বেশি মাঠের কালো ইঁদুর দ্বারা প্রতি বছর ক্ষতি হয়। বাংলাদেশে যখন ফসলের মাঠ পানিতে ডুবে যায় তখন বেড়িবাঁধ, রাস্তাঘাটে গর্ত করে আশ্রয় নিয়ে থাকে, এর ফলে কোটি কোটি টাকার রাস্তাঘাটের  প্রতি বছর ক্ষতি হয়। সেচের নালায় গর্ত খননের ফলে ১০-১ শতাংশ পানির অপচয় হয়।
ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি (Estimate rat damage)
ইঁদুর দ্বারা ফসল ও সম্পদের প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়। সব ফসল ও সম্পদের ক্ষতি সঠিকভাবে নির্ণয় করা বাস্তবে সম্ভব হয় না। পৃথিবীতে প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা যে  পরিমাণ ক্ষতি হয়  তার পরিমাণ ২৫টি গরিব দেশের মোট জিডিপির সমান হবে। ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করে উপস্থিত ইঁদুরের সংখ্যার নিবিড়তার ওপর। বেশি ইঁদুরের উপস্থিতি মানে ফসল ও সম্পদের ক্ষতি বেড়ে যাবে। কারণ প্রতিটি ইঁদুর তার দেহের ওজনের ১০ শতাংশ খাদ্য প্রতিদিন গ্রহণ করে। সাধারণত বড় ইঁদুর প্রতিদিন ২৩-৫৮ গ্রাম এবং ছোট ইঁদুর ৩-৫ গ্রাম খেয়ে থাকে। এছাড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে ৭-৮ গুণ নষ্ট করে।
ইঁদুরের উপদ্রবের তীব্রতা তিন প্রকারের হয়। যথা-
ক. অল্প (Few) : ঘরে বা গুদামে ছোট অথবা বড় ইঁদুরের মল চোখে পড়বে। জীবন্ত ইঁদুর চোখে পড়বে না। ফসলের মাঠে ক্ষতির লক্ষণ বা ইঁদুরের গর্ত কদাচিৎ চোখে ধরা পড়বে।
খ. মধ্যম (Medium) : খাদ্যশস্যের মধ্যে ইঁদুরের মল, লোম পাওয়া যাবে। জিনিসে ক্ষতির চিহ্ন, জীবন্ত ইঁদুর দেখা যাবে এবং অল্প গর্ত দেখা যাবে। মাঠের ফসলে ইঁদুরের ক্ষতি ও গর্ত চোখে পড়বে।
গ. ব্যাপক (Severe) : অনেক মল যত্রতত্র দেখা যাবে। জীবন্ত ইঁদুর চোখে পড়বে। ইঁদুরের গর্ত দেখা যাবে । ইঁদুর দ্বারা ক্ষতির চিহ্ন দেখা যাবে।
পরিবেশবান্ধব ইঁদুর ব্যবস্থাপনা
ইঁদুরজাতীয় প্রাণী দমনের ক্ষেত্রে কোনো ম্যাজিক বুলেট নেই কারণ এদের ২০০ এর ওপরে ক্ষতিকারক প্রজাতি রয়েছে যাদের প্রত্যেকের আলাদা আচরণ, নিবাসন ও খাদ্যাভাসে ভিন্নতা বিদ্যমান। এজন্য একটি পদ্ধতি দ্বারা এদের দমন বা ক্ষতির পরিমাণ কমানো বাস্তবে সম্ভব নয়। প্রত্যেক ইঁদুরজাতীয় প্রজাতির ভিন্ন ইকোলজি রয়েছে । এ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করার সময় এ বিষয়টি সবসময় বিবেচনায় রাখতে হবে। ইঁদুর দমনের বিষয়টি সার প্রয়োগের মতো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ফসলে অত্যধিক বেশি বা কম এবং অসময়ে সার প্রয়োগ করা হলে অর্থনৈতিক অপচয় ও পরিশ্রম বিফলে যায়। যে কোনো ইঁদুর দমনের ক্ষেত্রে একই রকম ঘটনা ঘটে থাকে।
ইঁদুর দমনের উপযুক্ত সময় ও কলাকৌশল
১. যে কোনো ফসল রোপণ বা বপনের সময় মাঠের ও আইলের ইঁদুর মারতে হবে;
২. জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত জোয়ারের পানিতে  সব মাঠ পানিতে ডুবে যায়। দিনে বেশি জোয়ারের সময় মাঠের ইঁদুরগুলো হোগলাপাতা, ঢোলকলমি, কচুরিপানার দলে, উঁচু ভূমি এবং গাছে  আশ্রয় নিয়ে থাকে। এ সময় নৌকায় দলবেঁধে গিয়ে ওই সব স্থানের ইঁদুর টেঁটা ও লাঠি দিয়ে মারতে হবে। মাঠের বড় কালো ইঁদুর ডুব দিয়ে ও সাঁতার কেটে অনেক দূর যেতে পারে। এজন্য দলবেঁধে মাঠের ইঁদুরের সম্ভাব্য সব আশ্রয়স্থান ধ্বংস হবে। এতে পরবর্তীতে আমন ফসলে ইঁদুরের সংখ্যা ও ক্ষতি কম হবে;
৩. বর্ষাকালে সব রাস্তাঘাট, খালের পাড় ও উঁচু পতিত ভূমির ইঁদুর বিষটোপ প্রয়োগ করে মারতে হবে;
৪. ফসলের থোড় স্তরে ইঁদুরের প্রজনন কার্যকারিতা আরম্ভ হয়। অক্টোবর মাসের  প্রথম সপ্তাহে ৯৫ শতাংশ বেশি স্ত্রী ইঁদুর গর্ভধারণ অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাই, সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বেশি ইঁদুর মারা হলে পরে ইঁদুরের সংখ্যা কম থাকবে। এ সময় একটি স্ত্রী ইঁদুর মারতে পারলে পরবর্তীতে ৩৫টি  ইঁদুর মারার সমান উপকার হবে।
গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর নিধন
 উঁচু ভূমি ও রাস্তাঘাটের, খালের পাড়ে ইঁদুর গর্ত খুঁড়ে বের করা খুব কঠিন। যেখানে ইঁদুরের গর্তের পরিধি কম সেখানে গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর নিধন করা যায়। গর্ত খোঁড়ার সময় গর্তের চারদিক জাল দ্বারা ঘিরে নিলে ইঁদুর সহজে পালাতে পারে না।
ফাঁদ পেতে ইঁদুর দমন  
নানা রকমের ফাঁদ বাজারের পাওয়া যায় যেমন জীবন্ত ইঁদুর ধরার ফাঁদ (তারের খাঁচা ফাঁদ ও কাঠে তৈরি ফাঁদ) এবং কেচিকল (Snap trap) এবং বাঁশের তৈরি ফাঁদ । স্থান কাল পাত্রভেদে এসব ফাঁদ ব্যবহার করা যেতে পারে। ফাঁদে টোপ হিসেবে নারিকেল ও শুঁটকি মাছ ব্যবহার করা যেতে পারে।
গর্তে পানি ঢেলে ইঁদুর নিধন : গর্তে পানি ঢেলে ইঁদুর দমন করা বাস্তবে অনেক কঠিন। কারণ মাঠের বড় কালো ইঁদুর  ও মাঠের কালো ইঁদুরের গর্তের দৈর্ঘ্য ও গভীরতা অনেক বেশি। ফসল কাটার পর গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর মারা যায়। এতে কোনো লাভ হয় না।  প্রজাতি শনাক্তকরণের জন্য ফসল কাটার পর কিছুসংখ্যক গর্ত খুড়ে ইঁদুর সংগ্রহ করা যেতে পারে, যা ইঁদুর দমনের পরিকল্পনায় কাজে লাগবে।
গ্লুবোর্ড ব্যবহার : বাজারে তৈরি ইঁদুর নিধনের গ্লুবোর্ড পাওয়া যায়। বাসাবাড়ি ও অফিসে গ্লুবোর্ড ব্যবহার করে ছোট-বড় ইঁদুর নিধন করা যায়। ইঁদুর গ্লুবোর্ডে আটকা পড়ার পর তাড়াতাড়ি সরিয়ে ফেলতে হবে, কারণ অন্য ইঁদুর আটকানো  ইঁদুরকে দেখতে পেলে গ্লুবোর্ডের কাছে যাবে না।
রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে ইঁদুর দমনের জন্য তীব্র বিষ বা একমাত্রা বিষ (যেমন-জিংক ফসফাইড), দীর্ঘস্থায়ী বিষ (যেমন-ল্যানির‌্যাট, ব্রমাপয়েন্ট, ক্লেরাট) এবং গ্যাসবড়ি (অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড) ব্যবহার হয়। এ বিষটোপ  ব্যবহারের ক্ষেত্র সমস্যা হচ্ছে  ইঁদুরের বিষটোপ লাজুকতা সমস্যা রয়েছে। এখানে টোপ হিসেবে শামুক, চিংড়ি, চাল বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব টোপের মধ্যে চিংড়ি মাছ ও শামুকের তৈরি বিষটোপ ইঁদুর বেশি খেয়েছে। এ বিষটোপ আমন ধানের থোড় আসার আগ পর্যন্ত প্রয়োগ করা হয়েছে।
গ্যাসবড়ি ইঁদুরের প্রজনন সময়ে ও ফসলের থোড় হতে পাকা স্তরে প্রতিটি নতুন গর্তে একটি গ্যাসবড়ি প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে ইঁদুরের বাচ্চাসহ মারা যায় বলে ইঁদুরের পপুলেশন বাড়তে পারে না। গর্ত পদ্ধতিতে দমনে অনেক নতুন মুখ থাকে। সব গর্তের মুখ নরম বা কাদামাটি দিয়ে ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। গ্যাসবড়ি প্রয়োগকৃত গর্তের মুখ পর দিন খোলা পেলে একইভাবে একটি গ্যাসবড়ি প্রয়োগ করতে হবে।
ধাতব প্রতিরোধক (Metal Proofed) : টিনের পাত লাগানোর আগে গাছকে ইঁদুরমুক্ত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় মরা ডালপালা কেটে পরিষ্কার করতে হবে এবং অন্য গাছের সাথে লেগে থাকা ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে যাতে অন্য গাছ হতে ইঁদুর আসতে না পারে। নারিকেল, সুপারি গাছসহ ফল উৎপাদনকারী গাছের গোড়া গর্তে ২ মিটার ওপরে গাছের খাঁড়া কাণ্ডের চারদিকে ৫০ সেমি. প্রশস্ত টিনের পাত শক্তভাবে কাণ্ডের সাথে আটকিয়ে দিতে হবে। এতে ইঁদুর নিচ থেকে গাছের ওপরে উঠতে পারে না।
ইঁদুরভোজী প্রাণী : অনেক বন্যপ্রাণী (যেমন-বনবিড়াল, শিয়াল) এবং নিশাচর পাখি (যেমন- পেঁচা) ও সাপ (যেমন-গুঁইসাপ) এদের প্রধান খাদ্য হচ্ছে ইঁদুর। এদের বংশবিস্তারের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ইঁদুর নিধনে সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন করতে হবে।
ইঁদুর দমন প্রযুক্তি পোকামাকড়, আগাছা বা অন্য বালাই থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ইঁদুর দমন অভিযানের কর্মসূচি সফল করতে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে এক ফসলের পরিবর্তে বহু ফসলের চাষ হচ্ছে। তাই ইঁদুর সারা বছর প্রজনন করার সুযোগ পাচ্ছে। ইঁদুর দমনের জন্য লাগসই প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে মশা নিধনের কর্মসূচি রয়েছে, কিন্তু ইঁদুর নিধনের কোনো কর্মসূচি নেই। শহরের ইঁদুর দ্বারা পানি ও গর্ত খুঁড়ে ও ড্রেনে মাটি ফেলে প্রতিনিয়ত যে  পরিমাণ ক্ষতি করছে তা কয়েক শত কোটির কম হবে না। শহরের পরিবেশের দূষণ ও রোগ জীবাণু বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে মশা নিধনের মতো ইঁদুর দমন কর্মসূচি নেয়া প্রয়োজন।

ড. সন্তোষ কুমার সরকার*
* মুখ্য প্রশিক্ষক (অব.), ডিএই, মোবাইল : ০১৭১৪২২২১৫৭

বিস্তারিত
ইঁদুর নিধন অভিযান ২০১৬

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টর। আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ ও শ্রমশক্তির ৬০ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত। গ্রামের উন্নয়নের কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে কৃষি উন্নয়ন কৃষিভিত্তিক শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতের উন্নয়ন। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটির বেশি এবং এটি বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ এবং সে সাথে একটি সম্ভাবনাময় বড় বাজার। আর সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- বন্যা, খরা, সিডর, আইলা ইত্যাদি এবং সেই সাথে ফসলের বালাই ও ইঁদুরের আক্রমণের ফলে খাদ্য এবং অর্থকরী ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে অন্তরায়।
ইঁদুর নামক প্রাণীটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। অনেকেই এ প্রাণীটির ক্ষতিকর দিকটি গ্রাহ্য না করায় এর দমন ব্যবস্থার প্রতি সচেতনতা দেখান না। তবে যারা একবার প্রাণীটি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা এর দমন বা নিধনের ব্যাপারে সজাগ। প্রাণীটি ক্ষুদ্র হলেও এর ক্ষতিকর দিকটি বিশাল। ইঁদুরের বিচরণ ক্ষেত্র ফসলের ক্ষেত থেকে শুরু করে বাড়ির শোয়ার ঘর পর্যন্ত সর্বত্র। আর তাই এদের ক্ষতির ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। এরা মাঠের ফসল, গুদামজাত শস্য, ফল, শাকসবজি, সংরক্ষিত বীজ, কাপড়-চোপড়, কাগজ, লেপ-তোষক ইত্যাদি কাটাকুটি করে আমাদের প্রচুর ক্ষতি করে। এরা যে শুধুই কাটাকুটি করে আমাদের ক্ষতি করে তাই নয়, এরা মানুষ ও পশুপাখির মধ্যে প্লে­গ, জ-িস, টাইফয়েড, চর্মরোগ, আমাশয়, জ্বর, কৃমিসহ প্রায় ৬০ প্রকার রোগজীবাণুর বাহক ও বিস্তারকারী। একটি ইঁদুর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭ গ্রাম খাদ্য খেয়ে থাকে।
ইঁদুরের উভয় দন্তপাটিতে সামনে এক জোড়া করে খুব তীক্ষè দাঁত আছে, যা জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বাড়তেই থাকে। আর এ সদা বর্ধিষ্ণু দাঁতকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখার জন্য ইঁদুর সর্বদা কাটাকুটি করতে থাকে। ফলে ইঁদুর যা খায় তার চেয়ে চার-পাঁচগুণ খাবার নষ্ট করে থাকে। তাই ইঁদুরের ক্ষতি এত ভয়াবহ। সারা পৃথিবীতে প্রায় ৪১০০টির মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে যার মধ্যে ১৭০০টির মতো ইঁদুরের প্রজাতি পাওয়া গেছে। তবে এদের সবগুলোই মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। ২০টির মতো প্রজাতিকে ক্ষতিকারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রজাতিভেদে ইঁদুর ১৫-৪১ সেমি. লম্বা এবং ওজনে ১৫-৩২৬ গ্রাম হয়ে থাকে। আমাদের দেশে যেসব প্রজাতির ইঁদুর দেখা যায় সেগুলো মধ্যে নরওয়ে বা বাদামি ইঁদুর, বাতি বা সোলাই ইঁদুর, মাঠের কালো ইঁদুর, মাঠের বড় কালো ইঁদুর, মাঠের নেংটি ইঁদুর, নরম পশমযুক্ত ইঁদুর এবং প্যাসিফিক ইঁদুর উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে নরওয়ে বা বাদামি ইঁদুর ঘরের ও গুদামজাত শস্যের ক্ষতি করে থাকে, ঘরের ইঁদুর বা গেছো ইঁদুর গুদামজাত শস্য, ফলজাতীয় ফসল এবং আসবাবপত্রের ক্ষতি করে, বাতি বা সোলাই ইঁদুর ঘরের বইপত্র, কাপড়-চোপড় এবং শস্যদানা নষ্ট করে থাকে, মাঠের কালো ইঁদুর সব ধরনের মাঠ ফসল ও গুদামজাত ফসলের ক্ষতি করে থাকে, মাঠের বড় কালো ইঁদুর জলী আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি করে, মাঠের নেংটি ইঁদুর মাঠের দানা জাতীয় ফসল পাকার পর ফসলের ক্ষতি করে থাকে, নরম পশমযুক্ত ইঁদুর ধান গম বার্লির ক্ষতি করে থাকে এবং প্যাসিফিক ইঁদুর ফলজ গাছ বিশেষ করে নারিকেল গাছের ক্ষতি করে থাকে।
ইঁদুর প্রাণীটি অতি ক্ষুদ্র হলে কি হবে, এদের ঘ্রাণ, আস্বাদন ও শ্রবণ শক্তি অতি প্রবল। ইঁদুর বর্তমানে পোলট্রি ফার্মে ছোট বাচ্চা ও ডিম খেয়ে ফার্মের মালিকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠের ফসল ছাড়াও সেচের নালায় গর্ত করার মাধ্যমে সেচের পানির ব্যাপক অপচয় ঘটায়। শুধু তাই নয় সড়ক, মহাসড়ক, বাঁধ এসব স্থানেও গর্ত খোঁড়ার ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে থাকে। সুতরাং প্রাণীটি ক্ষুদ্র হলেও এর ক্ষতিকর দিকটি বিশাল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক গত ৫ বছরে ইঁদুর নিধন অভিযান কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে কী পরিমাণ আমন-বোরো ফসল রক্ষা পেয়েছে তার হিসাব হলো।
ইঁদুর নিধন অভিযান ২০১৬ এর উদ্দেশ্য
-কৃষক, কৃষাণী, ছাত্রছাত্রী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আইপিএম/আইসিএম এসব ক্লাবের সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোসহ সর্বস্তরের জনগণকে ইঁদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করা;
-ইঁদুর দমনের লাগসই প্রযুক্তি কৃষি কর্মীদের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো;
-ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিল্পকারখানা ও হাঁস মুরগির খামার ইঁদুরমুক্ত রাখার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা;
-আমন ফসল ও অন্যান্য মাঠ ফসলে ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে রাখা;
-গভীর ও অগভীর নলকূপের সেচের নালার ইঁদুর মেরে পানির অপচয় রোধ করা;
-রাস্তাঘাট ও বাঁধের ইঁদুর নিধনের জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা;
-ইঁদুরবাহিত রোগের বিস্তার রোধ করা এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা।
কর্মসূচির সময়
এক মাসব্যাপী ইঁদুর নিধন অভিযান সারা দেশে একযোগে পরিচালনা করা হবে। জাতীয় পর্যায়ে ইঁদুর নিধন অভিযান, ২০১৬ এর উদ্বোধনের পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অঞ্চল, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উদ্বোধন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের দিনে বিগত অভিযানের জাতীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ সংখ্যক ইঁদুর নিধনকারীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হবে। অঞ্চল, জেলা পর্যায়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট জেলার সংসদ সদস্য-উপজেলা চেয়ারম্যন- সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ-পৌরসভার চেয়ারম্যান-  মেয়র অথবা তার মনোনীত ব্যক্তি দ্বারা করাতে হবে। উপজেলা পর্যায়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য-উপজেলা চেয়ারম্যান-সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অথবা তার মনোনীত প্রতিনিধি দ্বারা করাতে হবে।
ইঁদুর দমন পদ্ধতি পোকা ও রোগবালাই দমন পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ এখানে বিষটোপ ও ফাঁদ লাজুকতার সমস্যা রয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতি ও সঠিক স্থানে দমন পদ্ধতি গ্রহণ না করা হলে দমন ব্যবস্থা ততটা কার্যকর হয় না। একা ইঁদুর মারলে দমন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ ইঁদুর সর্বদা খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য স্থান পরিবর্তন করে থাকে। এজন্য পাড়া-প্রতিবেশীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একই দিনে ও একই সময়ে ইঁদুর নিধন করা প্রয়োজন। ইঁদুর দমনের কলাকৌশল অধিক সংখ্যক কৃষকের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রত্যেক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তার ব্লকের ৬০০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন। এ বছর ১৫,০০০ কর্মসূচি পুস্তিকা ও ১০,০০০ পোস্টার মুদ্রণ করে অঞ্চল, জেলা ও উপজেলায় পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কর্মসূচি পুস্তিকায় ইঁদুর দমন প্রযুক্তি সংক্ষিপ্ত আকারে সংযোজিত করা হয়েছে। এছাড়া সরকার অনুমোদিত ব্রমাডিওলেন ও জিংক ফসফাইড গ্রুপর ইঁদুরনাশক (যেমন- ল্যানিরাট, ব্রমাপয়েন্ট  ল্যানির‌্যাট, রেটক্স, জিংক ফসফাইড এসব) বিষটোপ যথেষ্ট পরিমাণে বালাইনাশক ডিলারের দোকানে মজুদ রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
ইঁদুর সমস্যা দীর্ঘদিনের এ সমস্যা আগে যেমন ছিল বর্তমানেও রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং অংশীদারিত্ব। ঘরবাড়ি, গুদাম, হাঁস-মুরগির খামার, অফিস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিনিয়ত ইঁদুরের উপস্থিতি যাচাই করে ইঁদুর নিধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইঁদুর নিধন অভিযানের সফলতা নির্ভর করে সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ওপর। ইঁদুরকে একটা সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর সমাধান সামাজিকভাবেই করতে হবে, যাতে ইঁদুর দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ধারায় কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।

এ জেড এম ছাব্বির ইব্নে জাহান*
*পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
ইঁদুর দমনের কলাকৌশল

ইঁদুর একটি চতুর ও নীরব ধ্বংসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণী। ইঁদুর প্রাণীটি  ছোট  হলেও  ক্ষতির  ব্যাপকতা  অনেক। এরা  যে  কোনো  খাদ্য  খেয়ে  বাঁচতে  পারে।  যে  কোনো  পরিবেশে  মানিয়ে  নিতে  পারে। অল্প  বয়সে  বাচ্চা  দিতে  পারে। ১৭০০টি ইঁদুরজাতীয় প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে ২২টির অধিক ক্ষতিকারক ইঁদুরজাতীয় প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত  ইঁদুর  আমাদের  উৎপাদিত  ফসলকে  নষ্ট  করছে। ক্রমবর্ধমান হারে  খাদ্যের  প্রয়োজনে দেশে বর্তমানে  এক  ফসলের  পরিবর্তে  বহুবিধ  ফসলের  চাষাবাদ  হচ্ছে।  এর  ফলে  ইঁদুর  মাঠেই  খাদ্য  পাচ্ছে। বাংলাদেশে ইঁদুরের আক্রমণে বছরে আমন ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ, গম ৪-১২ ভাগ, আলু ৫-৭ ভাগ, আনারস ৬-৯ ভাগ নষ্ট করে। গড়ে মাঠ ফসলের ৫-৭ শতাংশ এবং গুদামজাত শস্য ৩-৫ শতাংশ ক্ষতি করে।  ইঁদুর শতকরা ৭ থেকে ১০ ভাগ সেচ নালাও নষ্ট করে থাকে। সেটা ফসলের উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলে। ইরির ২০১৩ সালের এক গবেষণা  মতে, এশিয়ায় ইঁদুর বছরে যা ধান-চাল খেয়ে নষ্ট করে তা ১৮ কোটি মানুষের এক বছরের খাবারের সমান। আর শুধু বাংলাদেশে ইঁদুর ৫০-৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার নষ্ট করে।
ইঁদুর  শুধু  আমাদের  খাদ্যশস্য  খেয়ে  নষ্ট  করে  না  বরং  তা  কেটে কুটে  অনেক  ধ্বংস  করে।  এদের  মলমূত্র,  লোম  খাদ্য  দ্রব্যের  সাথে  মিশে  টাইফয়েড,  জন্ডিস,  চর্মরোগ  ও  ক্রিমিরোগসহ  ৬০  ধরনের  রোগ  ছড়ায়।  প্লেগ  নামক  মারাত্মক  রোগের  বাহক  হচ্ছে  ইঁদুর।  ইঁদুর  মাঠের  ও  ঘরের  শস্য  নষ্ট  ছাড়াও  বৈদ্যুতিক  তার, টেলিফোন  তার  ও  কম্পিউটার  যন্ত্র  কেটে  নষ্ট  করে। এছাড়া  বড় সড়ক  বাঁধ,  রেললাইনে  গর্ত  করে  তা  ক্ষতিগ্রস্ত করে।  বন্যার  পানি  ঢুকে  তা  নষ্ট  হয়।  এ জন্য এর ক্ষতির পরিমাণ পরিসংখ্যানগতভাবে নির্ণয় করা কঠিন। কাজেই ফসল ও সম্পদের ক্ষতি রোধ, জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও দূষণমুক্ত পরিবেশের স্বার্থে ইঁদুর সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ক্ষেত-খামার, বসতবাড়িসহ সর্বত্র ইঁদুরমুক্ত করার লক্ষ্যে ইঁদুর নিধনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে।
ইঁদুরের উপস্থিতির লক্ষণ
কর্তনের শব্দ, নখের দ্বারা আঁচড়ানো শব্দ, কোনো কিছু বেয়ে ওঠার অথবা নামার শব্দ, ক্ষণস্থায়ী চিচি শব্দ, চলাচলের  রাস্তায় মল, নোংরা দাগ, পায়ের ছাপ, ইঁদুর যাতায়াত পথের সৃষ্টি হওয়া ইত্যাদি দ্বারা ইঁদুরের উপস্থিতি বোঝা যায়। ইঁদুরের বাসা এবং তার আশপাশে ছড়ানো ছিটানো খাদ্যাংশ দেখে ইঁদুরের উপস্থিতি জানা যায়। ইঁদুরের গন্ধ এবং পোষা প্রাণির লাফঝাপ বা অদ্ভুত আচরণ বা উত্তেজনা ইঁদুরের উপস্থিতি নির্দেশ করে।
ইঁদুরের স্বভাবই হলো কাটাকুটি করা। কাঠের গুঁড়া, দরজা, জানালা, ফ্রেম, গুদামের জিনিসে ক্ষতির চিহ্ন দেখে এর আক্রমণের লক্ষণ বুঝা যায়।  এছাড়া আক্রান্ত আনারস, নারিকেল, আখ, ঘর বা গুদামে রক্ষিত ধান, চাল, গম রাখার বস্তা কাটা দেখে, ইঁদুরের খাওয়া ধানের তুষ দেখে এদের উপস্থিতি বোঝা যায়। ঘরে বা তার পাশে ইঁদুরের নতুন মাটি অথবা গর্ত, ফসলের মাঠে, আইলে ও জমিতে ছোট রাস্তা, বাঁধ, পুল প্রভৃতির পাশে গর্ত দেখে ইঁদুরের উপস্থিতি ও সংখ্যা নির্ণয় করা যায়।
ইঁদুর দমনের স্থান, সময় ও ফসলের স্তর
১. ধানের জন্য বীজতলায় এবং ধানের কুশি স্তর থেকে ধানের থোড় হওয়ার আগে পর্যন্ত।  এ সময় ইঁদুরের সংখ্যা কম থাকে এবং মাঠে খাদ্যও কম থাকে। আমন ফসলে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত;
২. গমের জন্য থোড় হওয়ার আগে, ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে;
৩. সবজি, বাদাম, আলু ফসলের ক্ষেত্রে ফসল লাগানোর সময় এবং ফসল ধরার আগে দমন ব্যবস্থাপনা নিতে হবে;
৪. আখের ক্ষেত্রে চারা রোপণের আগে মাটি ও আইলে দমন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে;
৫. নারিকেল, আম, জাম্বুরা, আনারস ও অন্যান্য ফলের বেলায় ফল ধরার আগ থেকে কর্তনের আগ পর্যন্ত গাছের চারপাশে ও আক্রান্ত ফলের পাশে দমন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে;
৬. গভীর ও অগভীর নলকূপের নালায়।
ইঁদুর  দমন  ব্যবস্থাপনা
ইঁদুর  একটি  অত্যন্ত  ক্ষতিকর  প্রাণী। একটি মাত্র  পদ্ধতি  দ্বারা  ইঁদুর  দমন  করা বাস্তবে  সম্ভব  নয়।  ইঁদুর  দমন  পদ্ধতি সঠিক  স্থানে,  সঠিক  সময়ে  ও  সঠিকভাবে  প্রয়োগ  করতে  হবে।
ইঁদুর মারার কলাকৌশল  
ইঁদুর সাধারণত দুইভাবে দমন করা যায়।
১. অরাসায়নিক দমন ব্যবস্থা ও ২. রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা।
অরাসায়নিক দমন ব্যবস্থা
১. ঘরবাড়ি ও ক্ষেতের আশপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা;
২. গুদামঘর পরিষ্কার রাখা এবং গুদামের দরজার ফাঁক দিয়ে যেন ইঁদুর ঢুকতে না পারে তেমন ব্যবস্থা করা। এছাড়া গুদামঘরের ছিদ্র বা ফাটল সিমেন্ট দিয়ে ভালোভাবে বন্ধ করে দেয়া;
৩. ধান, গম ইত্যাদির গোলা বা ডোল সরাসরি মাটিতে না রেখে মাচার ওপর ঘরে রাখা এবং মাচার প্রতিটি পিলার মসৃণ টিন দিয়ে এমনভাবে জড়িয়ে দেয়া যেন ইঁদুর তা বেয়ে উঠতে না পারে। গুদামের শস্য টিনের পাত্রে সংরক্ষণ করা;
০৪. নারিকেল গাছের গোড়ায় টিনের মসৃণ পাত এমনভাবে জড়িয়ে দেয়া যেন ইঁদুর তা বেয়ে উঠতে না পারে;
৫. ইঁদুর ভক্ষণকারী প্রাণীকে সংরক্ষণ করা;
৬. ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে, গর্তে পানি ঢেলে ইঁদুরকে  বের করে পিটিয়ে মারা;
৭. ইঁদুরের গর্তে মরিচ পোড়ার ধোঁয়া দিয়ে ইঁদুরকে মারার ব্যবস্থা করা;
৮.বিভিন্ন প্রকার ফাঁদ পেতে ইঁদুর মারার ব্যবস্থা নেয়া।
রাসায়নিক দমন পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে ইঁদুরকে দমনের জন্য দুই ধরনের ইঁদুরনাশক ব্যবহার করা হয়। যথাÑ
১. তীব্র বিষ (Acute poison) : তীব্র বিষ খাওয়ার সাথে সাথে ইঁদুর মারা যায়। তীব্র বিষ হচ্ছে জিংক ফসফাইড। তীব্র বিষ ব্যবহারের কিছু কিছু অসুবিধা আছে তা হচ্ছে, জিংক ফসফাইড দ্বারা তৈরিকৃত বিষটোপ ইঁদুর পরিমিত মাত্রায়  খাওয়ার আগে অল্প কিছুটা মুখে দিয়ে পরখ করে ও অসুস্থ হয়ে পড়ে কিন্তু মরে না। আবার পরিমিত মাত্রায় বিষটোপ খাওয়ার পর একসাথে অনেক ইঁদুর মারা যেতে দেখে বিষটোপের প্রতি অনীহা লক্ষ করা যায়।
২. দীর্ঘস্থায়ী বিষ (Chronic poison) দীর্ঘস্থায়ী বিষ খাওয়ার সাথে সাথে ইঁদুর মারা যায় না, ইঁদুর মারা যেতে ৫ থেকে ১৩ দিন সময় লাগে। দীর্ঘস্থায়ী বিষ দিয়ে তৈরিকৃত বিষটোপ ইঁদুর খাওয়ার পর ইঁদুরের রক্ত জমাট বাঁধার  ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়, ফলে ইঁদুরের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে ও ক্রমেই ইঁদুর দুর্বল হতে থাকে এবং ৫-১৩ দিনের মধ্যে ইঁদুর মারা যায়। দীর্ঘস্থায়ী বিষ প্রয়োগ করে অনেক ইঁদুর মারা সম্ভব। ৯০-১০০ শতাংশ ইঁদুর মারা যাবে (খুবই কার্যকর)। দমন খরচ বেশি। কারণ বেশি দিন বিষটোপ প্রয়োগ করতে হয়।
৩. ইঁদুরের গর্তে বিষবাষ্প প্রয়োগ করেও ইঁদুরকে মারা যায়। যথা- সাই