কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

দেশি ফলের জাত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রফেসর ড. এম এ রহিম*

ফল বলতে আমরা নিষিক্ত ও পরিপক্ব ডিম্বককেই বুঝি। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কলা, আনারস, পেঁপে, নারিকেল, লেবু ও কুল এ ১০টি আমাদের দেশের প্রধান ও প্রচলিত ফল; এগুলোকে আমরা সবাই চিনি। কেননা চোখের সামনে প্রায় সব সময় দেখি, হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। এসব ফল দেশের প্রায় সব এলাকাতে জন্মে। এসব ফলকে তাই আমরা বলি প্রচলিত ফল। অনেকেই হয়তো চিনি আরও কিছু অপ্রধান ও স্বল্পভাবে চাষকৃত ফল যেমন- সফেদা, কামরাঙা, লটকন, বিলাতি আমড়া, বাতাবিলেবু, কদবেল, বেল, জলপাই, তাল, পেয়ারা এসব ফলকে। এসব ফলের বাইরেও অনেক ফল পাওয়া যায়। এসব ফলকে বলা হয় অপ্রচলিত বা স্বল্প পরিচিত ফল। অপ্রচলিত শব্দটির অর্থ হচ্ছে যার প্রচলন নেই অর্থাৎ এসব ফলের অস্তিত্ব আছে, খুঁজলে পাওয়া যায় কিন্তু যখন তখন চোখে পড়ে না, দেশের সব এলাকায় জন্মে না, গাছের দেখা মেলে খুব অল্প। চাহিদা কম, প্রাপ্যতা কম,  এগুলো অনেকে বনে জঙ্গলে নিতান্ত অনাদরে অবহেলায়  বেড়ে ওঠে। প্রগতির ধারায় কেউ এগুলো পরিকল্পনায় আনে না। চাষাবাদ দূরে থাক প্রয়োজনীয় খাবার কিংবা পানিও অনেকের ভাগ্যে জোটে না। কোনো কোনোটার ঔষধিগুণ ও মানুষের জন্য উপকারী নিরামক, ধাতব ও অত্যন্ত প্রাণরাসায়নিক দ্রব্যাদিতে সমৃদ্ধ হলেও মানুষের রসনাকে তৃপ্ত করতে পারছে না বলে এগুলো অপ্রচলিত।


দেশি  ফলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এসব ফল এক রকম বিনা যত্নেই এ দেশের মাটিতে ভালো জন্মে। সাধারণত এসব ফলের গাছে তেমন কোনো সার দেয়া হয় না। এ দেশের মাটি ও জলবায়ুতে খুব ভালোভাবে এসব ফলের গাছ মানিয়ে গেছে। ঝড় বাতাস কিংবা বন্যা খরাতেও এ ফলের গাছকে মারতে পারে না। এ ফলের ব্যাপকভাবে খাপখাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা। এ ফলের আর একটা সুবিধা হলো, বিদেশি ফলের বা উন্নত জাতের ফলগাছের মতো এসব ফল বা ফলগাছে অত বেশি রোগপোকারও আক্রমণ হয় না। দেশি ফলের জাত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টার (বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট  (বারি) ও সম্প্রতি কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বারি ও বিনায় দেশি ফলের জাত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ নিয়ে কার্যক্রম নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
 

বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার
১৯৯১ সাল থেকে তরুণ, মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত গবেষকদের নিরলস গবেষণার  ফলে সর্বমোট ৬৮টি বিভিন্ন প্রজাতির ফলের জাত বের করা সম্ভব হয়েছে। এ জাতগুলোর মধ্যে আমের ২১টি, পেয়ারার ১০টি, কুলের ৩টি, লেবুর ৪টি, জাম্বুরার ৫টি, লিচুর ৪টি, তেঁতুুলর ১টি, কামরাঙা ৩টি, জলপাই, লটকন, আমলকী, মালটা, অরবরই, স্ট্রবেরি, কদবেল, কাঁঠাল, আমড়া, ও কাজুবাদাম এর ১টি করে জাত, জামরুলের ৩টি ও সফেদার ৩টি জাত।


বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশনের অর্থায়নে ইন্টার কোঅপারেশন এগ্রো ফরেস্ট্রি ইমপ্রুভমেন্ট পার্টনারশিপের ব্যবস্থাপনায় এ ফল সেন্টারটির গোড়াপত্তন হয় ১৯৯১ সালে। তখন প্রকল্পের নাম দেয়া হয় ফ্রুট ট্রি স্টাডিজ, পরবর্তীকালে এ প্রকল্পের নাম দেয়া হয়, ফলগাছ উন্নয়ন প্রকল্প, এখন এটাকে ফলদ বৃক্ষের জার্মপ্লাজম সেন্টার বলা হয়। ১৯৯১ সালে প্রকল্পটি মাত্র এক একর জায়গা নিয়ে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে কর্মমুখর হয়ে ওঠে, যার ফলাফল ক্রমেই ইতিহাস রচনা করতে যাচ্ছে। বর্তমানে এর আয়তন ৩২ একর। বনবাদাড়, পাহাড় পর্বত চষে বেড়ান এ প্রকল্পের কর্মীরা। শুরু হয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দেশের প্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় ফলের গাছ সংগ্রহ। দেশীয় আবহাওয়ায় উপযোগী ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ফলের জাত উদ্ভাবনে ব্রত হন।
ময়মনসিংহ শহরের দক্ষিণে আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে এ প্রকল্পের অবস্থান। ৩২ একর জমি নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে সেন্টারটি। এ সেন্টারটিতে রয়েছে ১৮১ প্রজাতির প্রায় ১৩ হাজার দেশি-বিদেশি বিরল ফলের মাতৃগাছ। এর মধ্যে ৩০১ রকমের আম, ৫৭ রকমের পেয়ারা, ২৩ রকমের লিচু, ৮৭ রকমের লেবু, ৯৪ রকমের কাঁঠাল, ৬৭ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় অপ্রধান ফল, ৬৮ প্রজাতির ফলদ ঔষধি গাছ। ৩২ একর রাজ্যে পুরোটা জুড়ে শুধু গাছ আর ফল, স্বপ্নমাখা সবুজের মধ্যে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ। মূল ফটক থেকে সেন্টারের ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখতে পাবেন রাস্তার দুই সারিতে বিভিন্ন রকমের জামরুল, জলপাই আর পেয়ারার সারি, রাস্তা ধরে ভেতরে প্রবেশ করলে ডান দিকে চোখে পড়বে আমের রাজ্য। এখানে খুব ছোট ছোট গাছে রঙ-বেরঙের ফুলফলে সাজানো গাছের দিকে তাকালে মন ভরে যাবে। একটু সামনে গেলে একটি সাদা রঙের ভবন চোখে পড়বে। এটাই এই সেন্টারের অফিস। এখান থেকেই সব কিছু মনিটরিং করা হয়। অফিস রুমের সামনে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়বে বিভিন্ন প্রজাতির ফল। যার কোনোটি টবে, কোনোটি অর্ধড্রামে আবার কোনোটি মাটিতে পোঁতা। জ্যৈষ্ঠ মাসে এ বামন গাছগুলোতে ঝুলে থাকে অসংখ্য কাঁচা-পাকা আম। ভবনের উত্তর পাশে স্থান পেয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির লেবু-পেয়ারা ও বারোমাসি আমড়া। বর্তমান সময়ে এ দেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাউকুল, আপেল কুল, তাইওয়ান কুল, ঢাকা-৯০, নারিকেলি কুল, বারিকুল, নাবিকুল, হাজারীকুল, চাইনিজ কুলসহ অনেক  দেশিকুল। আর পেয়ারা? বিচিত্র তার আকার, পাতা ও স্বাদ। কোনোটি মিষ্টি, কোনোটি টক, কোনোটি মচমচে আবার কোনোটি রঙিন, লাল শাঁস, সাদা শাঁস কোনোটিই বাদ যায়নি। বাগানে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে আদা লেবু, কাটা লেবু, শাঁসনি লেবু, সাতকড়া, দার্জিলিং, ভ্যালেন্সিয়া, মনিপুরী এবং মোসাম্বি কমলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির লেবু। আর সেই সঙ্গে বিভিন্ন আকারের এবং স্বাদের বাতাবিলেবু তো আছেই।


অফিসের ঠিক পূর্ব দিকে রয়েছে এ দেশের বিলুপ্তপ্রায় অপ্রধান ফল, সবুজপাতা ছাপিয়ে থোকায় ঝুলছে বেঁটে সফেদা, কালোপাতি সফেদা, বাদামি সফেদা, লাল টকটকে আপেল জামরুল, গোলাপি রঙের নাশপাতি জামরুল, সবুজ জামরুল, বামন জলপাই, মিষ্টি ও হাইব্রিড কামরাঙা, বৈচি, লুকলুকি, পানিয়ালা, খিরনি, হরীতকী, বহেড়া, বন কাঁঠাল,  ফলসা, স্টার আপেল, লোকাট, চেরি, করমচা, অরবরই, মহুয়া, আমলকী, বেল, কিন্তু অনেকেই চিনি না লুকলুকি, ডেউয়া, ডেফল, করমচা, জঙ্গিবাদাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, গোলাপজাম, পানিজাম, কালোজাম, তুঁত, তিনকরা, তাবা, ত্রিপত্রিক লেবু, জামির, মনফল, আঁশফল, তারকা ফল, দেশি গাব, বিলাতি গাব, আতা, শরিফা, কাউফল, তৈকর, গুটি জাম, খেজুর, জাম, জামরুল, চেস্টনাট, তরমুজ ডালিম, টক লেবু, চালতা, ডুমুর, টক আতা, তেঁতুল, পানি ফল, সিঙ্গাড়া ফল, দেশি আমড়া, বন্য ডুমুর, বাঙি, চাপালিশ, জিলাপি ফল, পদ্মফল, মাখনা, রুটি ফল, বকুল, ফলসা, ট্যাংফল, চুকুর, রাম কলা, কেন ফল, চিনার, রক্ত গোটা, চিকান, পানকি, চুনকি, টুকটুকি বা টাকিটাকি, আমরুল, পেয়ালাগোটা, চিনাডুলি, লতা ডুমুর, বুদুমচোরা, টমিটমি, কোয়াগোলা, গুটগুটি, বিলিম্বি, কেক ফল, অমৃত ফল, চাউর, আলুবোখড়া, চেরি, খিরনি, বকুল, মহুয়া ও আঁশ ফল যা হাজার বছরেরর ঐতিহ্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে । এ ফলগুলোর অধিকাংশই এখন বিপন্ন। বসতবাড়িতে দু-একটি গাছ রয়েছ, বনে জঙ্গলেও কিছু আছে। অথচ পুষ্টিগুণ এবং ভেষজ মূল্য একেক ফলে এক এক রকম। অথচ এক রকম অবহেলা করেই আমরা আমাদের এসব ফলকে হারাতে বসেছি। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে, এখনও অল্প স্বল্প হলেও এর অনেক ফলই দেশের মাটিতে টিকে আছে। এ ফলগুলো বিদেশি ফলের আগ্রাসনে এবং উদ্ভাবিত নতুন জাতের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছিল। বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার উপরোল্লিখিত বিলুপ্তপ্রায় সব ফলগুলো বন, জঙ্গল, পাহাড়, বসতভিটাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সন্ধানের মাধ্যমে সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে এবং এর ওপর নিবিড় গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এ জার্মপ্লাজম সেন্টার এ সব দেশীয় ফলকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছে। বর্তমানে এ জার্মপ্লাজম সেন্টারটি বাংলাদেশ তথা এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ ফলদ বৃক্ষের সংগ্রহশালা। এ যেন এক জীবন্ত ফলের জাদুঘর। সুজলা-সুফলা, শস্যশ্যামলা প্রকৃতির কন্যার অলংকার এ জার্মপ্লাজম সেন্টারটি। এটি বাংলাদেশ কৃষি  বিশ্ববিদ্যালয়ের অহংকার। অহংকার এ দেশের মানুষের। বেঁচে থাক এ সেন্টারটি । এগিয়ে যাক দুর্বার গতিতে।


 বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)
দেশি ফলের জাত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট  (বারি) । এ পর্যন্ত  এ ইনস্টিটিউট থেকে  আমের ১১টি, কাঁঠালের ৩টি, পেয়ারার ২টি, বাতাবিলেবুর ৩টি, লেবুর ৩টি, আমলকির ১টি, বিলাতিগাবের ১টি, সফেদার ১টি, কুলের ৪টি, আঁশ ফলের ১টি, কামরাঙ্গার ১টি, তেঁতুলের ১টি, লিচুর ৫টি, জামরুলের ২টি, মিষ্টিলেবুর ১টি, জলপাইয়ের ১টি ও কদবেলের ১টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এ ফলগুলোকে কৃষক পর্যায়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদের জন্য সম্প্রসারিত করা হয়েছে। অনেক ফলের জাত ভালো জনপ্রিয়তাও লাভ করেছে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুরে প্রধান কার্যালয় ছাড়াও জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন  হিসেবে দেশি ফলের জাত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ এবং গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য এ ইনস্টিটিউট জৈন্তাপুরে লেবুজাতীয় ফসল, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম গবেষণা কেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে যেমন- জামালপুর, ঈশ্বরদী, খয়েরতলা (যশোর), হাটহাজারী (চট্টগ্রাম), রহমতপুর (বরিশাল), আকবরপুর (মৌলভীবাজার) ও বুড়িহাট ফার্ম (রংপুর) আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। এ আঞ্চলিক ইনস্টিটিউটগুলোতে নিবিড় গবেষণাসহ দেশীয় ফলের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ করা হচ্ছে।


বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা (বিনা) পরমাণু শক্তিকে শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবহার করে দেশি ফলের জাত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, অচিরেই এ ইনস্টিটিউট  থেকে ভালো কিছু দেশি ফলের জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত করা সম্ভব হবে। এ ইনস্টিটিউট  অবশ্য অনেক দেশি ফলের জাত সংরক্ষণও করছে।

ড. মো. শামছুল আলম মিঠু**
*পরিচালক, **সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বাকৃবি, ময়মনসিংহ

 

বিস্তারিত
ফল উৎপাদন পরিস্থিতি এবং আবাদ বৃদ্ধিতে করণীয়

মানব দেহের পুষ্টির চাহিদা পূরণ, মেধার বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম। কথায় বলে ‘ফলই বল’, ফলে ভেজাল নেই, রান্নার ঝামেলা নেই। তাই পুষ্টিতে বিশেষ করে ভিটামিন ও খনিজ ভরপুর খাদ্য হিসেবে ফলের বিকল্প নেই। অন্য খাদ্যের মতো আহারে রান্নার প্রয়োজন না হওয়ায় ফলের সব খাদ্য উপাদান পুরোটাই দেহের প্রয়োজনে আসে, কোনো রকমেই অপচয় হয় না। পুষ্টিবিদদের মতে, পূর্ণ বয়স্কদের মাথাপিছু দৈনিক ২০০ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত। তবে বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ ফল উৎপাদন হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় তা বড় জোর ৫০%। অধিকন্তু, এ দেশে যে ফলগুলো উৎপাদন হয় তার প্রায় ৬০% পাওয়া যায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, মাত্র চার মাসে। শীত মৌসুমে ফল প্রাপ্তির সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম। কাজেই পুষ্টি ঘাটতির পরিমাণ শীত মৌসুমে বেশি হয়, বিশেষ করে গ্রামীণ মা ও শিশুদের অপুষ্টিজনিত রোগ এ সময় বেশি দেখা যায়। বিকল্প খাদ্য হিসেবে ও সুষম খাবার গ্রহণে ফলের অবদান অতুলনীয়। ফলের এসব গুরুত্বপূর্ণ দিকসহ বাড়তি খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি জনগণের টেকটসই পুষ্টি নিরাপত্তার লক্ষ্যে ফলের আবাদ ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রকল্পের আওতায় প্রচলিত অপ্রচলিত এবং অন্যান্য দেশি-বিদেশি সম্ভাবনাময় সব ধরনের ফলের চাষাবাদ বাড়িয়ে সারা বছর সমানভাবে চাহিদামাফিক ফলের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া অত্যাবশ্যক।


বিভিন্ন ফসল ও ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেক সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ধান উৎপাদনে এ দেশ বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয় ও পেয়ারা, আখ, আলু উৎপাদনে সপ্তম এবং আম উৎপাদনে অষ্টম স্থান অর্জন করেছে। এ দেশে উপকূলীয় ও হাওর এলাকায় ভাসমান সবজি উৎপাদন প্রযুক্তি জনপ্রিয় করার এ দেশের উদ্যোগটা বিশ্বে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেছে। বর্তমানে চর এলাকায়  যেভাবে বাঙি/চিনাইল, লালিমা এবং দক্ষিণাঞ্চলের এলাকা, বিশেষে করে পতিত জমিতে যে হারে উন্নত জাতের তরমুজ আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে এ দেশে মৌসুমি ফল উৎপাদনে সফলতার নতুন গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ হবে।


একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ, অন্যদিকে রাস্তাঘাট সম্প্রসারণ ও নগরায়নের প্রভাবে আবাদি জমি প্রতিনিয়তই কমে  যাচ্ছে। তথাপি নতুন ভাবে ফল চাষ সম্প্রসারণের সুবিধা এখনও প্রচুর রয়েছে। অন্য ফসলের তুলনায় ফল চাষ লাভজনক। এমনকি অভিজ্ঞ ফল চাষির কাছে এটি অতি লাভজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের জেলা বৃহত্তর রাজশাহী, দিনাজপুর  ও রংপুরের তিস্তা বেল্টে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে এসব এলাকায় শস্য বিন্যাস যথেষ্ট পরিবর্তন আসছে। এসব এলাকায় বোরো আবাদের পরিবর্তে আউশ ধান, ভুট্টা, তিল, ডাল, তেলবীজ জাতীয় ফসলের পাশাপাশি প্রচুর নতুন ফল বাগান  সৃষ্টির দিকে কৃষকের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ফল চাষে কিছুসংখ্যক সফল অভিজ্ঞ ফলচাষি দীর্ঘমেয়াদি (৫-১০ বছর) জমি লিজ নিয়ে ফল উৎপাদনে সফলতার অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছে। যেসব ফল সম্প্রসারণ তাদের কাছে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার পাচ্ছে তার মধ্যে বারোমাসি থাই পেয়ারা, আপেল কুল-থাইকুল, বারোমাসি কাগজিলেবু, মাল্টা, কমলা, ড্রাগন ফল, লিচু এবং আ¤্রপালি জাতের আম অন্যতম।


ফল চাষ সম্ভাবনাময় অঞ্চল
দেশের কিছু এলাকা ব্যাপক হারে ফল চাষ সম্প্রসারণ সম্ভাবনা খুব বেশি বিরাজ করছে। এগুলোর মধ্যে পার্বত্য জেলাগুলোসহ উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত নিচু ও কম খাঁড়া পাহাড়ি (মধুপুর, হালুয়াঘাট, ঝিনাইগাতী, গাজীপুর, নরসিংদী, সিলেট, হবিগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, সীতাকু-ু ইত্যাদি) ভাবাপন্ন অংশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পার্বত্য তিনটি জেলায় ফল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা বিরাজ করছে। ফল চাষে গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকার বড় জোর ১০% জমি এ পর্যন্ত ফল চাষ আওতায় এসেছে। অবশিষ্ট প্রায় ৯০% ফল চাষ সম্ভাবনার ‘সোনার খনি’ এখনও অব্যবহৃত (টহ-ঃড়ঁপযবফ) রয়ে গেছে। পাহাড় অঞ্চলের সম্ভাবনাময় এ অংশকে পরিকল্পিতভাবে ফল চাষের আওতায় আনা হলে দেশের ১৬ কোটি জনগোষ্ঠীর চাহিদা জোগানের সহায়ক হবে। পরিতাপের বিষয় কিছুসংখ্যক ভূমি লোভী/দখলকারী ব্যক্তি রাবার, পাম অয়েল, চা বাগান ও ফল বাগান সৃষ্টির নামে এ পার্বত্য জেলার যথেষ্ট পরিমাণ জমি সংগ্রহ/দখলে রেখেছে। তাদের সংগৃহীত গুরুত্বপূর্ণ জমির সুনির্দিষ্ট বাগান সৃষ্টিতে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।  


পাহাড়ি এলাকায় ফল চাষে প্রধান অন্তরায় পানি সেচ সংকট। একই কারণে পানি সংরক্ষণের বিভিন্ন উপায়ে (ক্রিক ড্যাম, বিভিন্ন প্রকার রিজারভার সৃষ্টি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ) কৌশল অবলম্বনে ন্যূনতম সেচের উৎস সৃষ্টি করা অতীব জরুরি। এছাড়া এ পানি  সংকট এলাকা ব্যবহারে মিতব্যয়ী বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক।


পাহাড়ি এলাকায় চাষ উপযোগী ফল  
পানি সংকটের কারণে এসব এলাকায় কেবল মাত্র যেসব ফলের কিছুটা খরা সহিষ্ণুতা গুণাগুণ আছে তা আবাদে  প্রধান্য দেয়া দরকার। মাটিতে রস কম থাকলেও প্রতিকূল অবস্থায় কিছু ফলগাছ ন্যূনতম ফল দানে সক্ষম। এ ধরনের উপযোগী ফল  গাছের মধ্যে পেঁপে, কলা (চম্পা, বাংলা, তরকারি কলা, বিচি কলা) আনারস, লেবু, কমলা, মাল্টা, বাতাবি, কাজু বাদাম, কুল,  লিচু, আম, কাঁঠাল অন্যতম। এসব ফল গাছ বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়।
প্রযুক্তি অবলম্বন : এলাকায় ফল গাছ রোপণে যেসব প্রযুক্তি অনুসরণ করা দরকার তা হলো-


ক. ঢালে বা স্লোপে ফল গাছের চারা-কলম লাগাতে হলে কন্টুর পদ্ধতি অবলম্বন করে নির্দিষ্ট সারিতে গাছ রোপণ করতে হবে। নির্দিষ্ট দূরত্বে গর্ত তৈরি করে তাতে প্রচুর জৈবসার ও পরিমাণমতো রাসায়নিক সার ব্যবহার করা প্রয়োজন হবে। জৈবসারের অভাব থাকলে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ কেবল মাত্র উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) দিয়ে গর্ত ভরাট করে তাতে গাছ রোপণ করতে হবে। সেচ সুবিধা না থাকলে জুন মাসে কিছুটা বড় আকারের ফলগাছ রোপণ করা উচিত হবে।
খ. গাছ রোপণকালে স্বাভাবিকের চেয়ে গাছের চারা/কলম ২০ থেকে ৩০ সে.মিটার গভীরে নিচু করে গাছ রোপণ করতে হবে। তাতে শিকড় মাটির  যেতে সহজ হবে। প্রতি গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত  জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে। তাতে প্রতিকূল অবস্থায় মাটিতে রসের অভাব থাকলেও গাছ বৃদ্ধিতে তা সহায়ক হবে।
-  রোপিত গাছের ঢালের নিচু অংশে ‘হাফমুন টেরাস’ পদ্ধতি অবলম্বনে গোড়া থেকে ৫০ থেকে ৬০ সেমি. দূরত্বে হালকা উঁচু করে বাঁধ দিয়ে পানি সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।  
- গাছ রোপণের সঙ্গে সঙ্গে শক্ত বাঁশের কাঠি দিয়ে গাছকে বেঁধে সোজা রাখার ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে।
- রোপিত গাছের পাতায় ও গোড়ায় সকাল-বিকেল দুই-তিনবার কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত হালকা পানি স