কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

আঁশফলের বাণিজ্যিক চাষ পদ্ধতি

আঁশফল বা কাঠ লিচু আমাদের দেশের স্থানীয় ফল হলেও গুণগতমান তেমন ভালো নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে আঁশফল বেশ কিছু উন্নতমানের জাত প্রবর্তনের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে। আঁশফল লিচু পরিবারের একটি সদস্য। ফলের উপরিভাগ মসৃণ, ফলের রঙ বাদামি, আকার গোল এবং লিচুর চেয়ে অনেক ছোট হলেও ফলের শাঁস অবিকল লিচুর মতো এবং ফল খেতে প্রায় লিচুর মতো বা লিচুর চেয়ে বেশি মিষ্টি। আঁশফলে প্রচুর পরিমাণে শর্করা ও ভিটামিন ‘সি’ থাকে।  এ ফলের শাঁস সাদা, কচকচে। আঁশফলের বীজ গোলাকার চকচকে কালো এবং শাঁস বীজকে আবৃত করে রাখে এবং সহজেই বীজ থেকে আলাদা করা যায়। সাধারণত আগস্ট মাসের শেষার্ধ থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত আঁশফল আহরণ করা হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে লিচুর স্বাদ গ্রহণ ও ফলের মৌসুম দীর্ঘায়িত করতে আঁশফল বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। আঁশফলের বৈজ্ঞানিক নাম Euphoria longana। আঁশফল স্যাপিন্ডেসি (Sapindaceae) পরিবারভুক্ত একটি বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। এ পরিবারের আরও একটি ফল আছে, তার নাম রাম্বুতান। সম্প্রতি আঁশফল, রাম্বুতান ফল দুটি বাংলাদেশে সাফল্যজনকভাবে প্রবর্তন করা সম্ভব হয়েছে।
পুষ্টিমান ও ঔষধিগুণ
আঁশফলে বিভিন্ন খনিজ উপাদান, শর্করা ও ভিটামিন সি এর প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য অংশে ৭২ ভাগ পানি, ১০৯ কিলোক্যালোরি শক্তি, ৮.০ মিগ্রা. ভিটামিন সি, ২৮০ আইইউ ভিটামিন এ, ২.০ মি.গ্রা. ক্যালসিয়াম, ৬.০ মি.গ্রা. ফসফরাস, ১.০ গ্রাম প্রোটিন ও ০.৫ গ্রাম ফ্যাট বিদ্যমান। আঁশফলের শুকানো শাঁস ভেষজ ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। যেমন- এটি পাকস্থলীর প্রদাহে, অনিদ্রা দূর করতে ও বিষের প্রতিষেধক (
antidote) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর পাতা অ্যালার্জি, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও কার্ডিওভাসকুলার রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা যায়।
জলবায়ু ও মাটি
আঁশফল প্রধানত অবগ্রীষ্মম-লের ফল। তবে এর বাণিজ্যিক চাষ গ্রীষ্মম-ল পর্যন্ত বিস্তৃত। আঁশফল উষ্ণ ও আর্দ্র গ্রীষ্মকাল এবং শুষ্ক শীতকাল পছন্দ করে। হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রায় গাছ মারা যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৫০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত স্থানে আঁশফল জন্মে। আঁশফলের জন্য বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২০-২৫০সে. সবচেয়ে উপযোগী। রাতের তাপমাত্রা ২৫০সে. এর উপরে হলে ফলের বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই আঁশফল চাষ করা যায়। তবে উর্বর সুনিষ্কাশিত গভীর দোঁ-আশ মাটি আঁশফল চাষের জন্য উত্তম। এ গাছ জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা একেবারে সহ্য করতে পারে না। ফল ধারণ থেকে ফলের পরিপক্বতা পর্যন্ত মাটিতে প্রচুর আর্দ্রতা প্রয়োজন।
জাত
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র স্থানীয় জার্মপ্লাজম থেকে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বারি আঁশফল-১ এবং ভিয়েতনাম থেকে প্রবর্তিত  জার্মপ্লাজম থেকে বারি আঁশফল-২ নামে আঁশফলের দুটি উন্নত জাত বাংলাদেশের সর্বত্র চাষের জন্য মুক্তায়ন করেছে। এ জাত দুটি প্রতি বছর নিয়মিত ফল দেয় এবং এদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ-

বারি আঁশফল-১    উচ্চফলনশীল নিয়মিত ফলদানকারী জাত। গাছ মাঝারি খাঁড়া প্রকৃতির ও মধ্যম ঝোপাল। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গাছে ফুল আসে এবং শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে ফল ফল আহরণ উপযোগী হয়। ফল ছোট (৩.৫ গ্রাম), গোলাকার, বাদামি রঙের, শাঁস সাদা, কচকচে এবং খুব মিষ্টি (ব্রিক্সামান ২০-২৫%)। খাদ্যোপযোগী অংশ ৫৫-৬০%। বাংলাদেশের সব এলাকায় চাষযোগ্য। হেক্টরপ্রতি ফলন ৩-৪ টন।
 

বারি আঁশফল-২    উচ্চফলনশীল নিয়মিত ফলদানকারী জাত। গাছ খাটো, ছড়ানো ও অত্যধিক ঝোপাল।  ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গাছে ফুল আসে এবং শ্রাবণ মাসের শেষার্ধে ফল আহরণ উপযোগী হয়। ফল তুলনামূলকভাবে বড় (৯.০ গ্রাম), বাদামি রঙের, শাঁস সাদা, কচকচে এবং খুব মিষ্টি (ব্রিক্সমান ২৫%)। বীজ খুব ছোট, খোসা পাতলা, খাদ্যোপযোগী অংশ ৭৩%। বাংলাদেশের সব এলাকায় চাষযোগ্য। হেক্টরপ্রতি ফলন ৮-১০ টন।
বংশবিস্তার
বীজ থেকে সহজেই চারা তৈরি করা যায়। বীজ থেকে উৎপাদিত গাছ হুবহু মাতৃ গুণাগুণ বহন করে না এবং ফল ধরতে দীর্ঘ সময় (৭-৮ বছর) লাগে। অঙ্গজ বংশবিস্তারই আঁশফলের জন্য অনুমোদিত বংশবিস্তার পদ্ধতি। গুটি কলম হচ্ছে অঙ্গজ বংশবিস্তারের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রচলিত পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে সফলতার হার বেশি (৮০-৯০%)। তবে গুটিকলমের মাধ্যমে তৈরি গাছের শিকড়ের বিস্তার কম থাকায় এবং প্রধান মূল নাথাকায় সহজেই বাতাসে উপড়ে যায়। অপরদিকে একটি গাছ হতে অল্প কয়েকটি গুটি কলম করা যায়। তাই গ্রাফটিংয়ের মাধ্যমে চারা তৈরি করা উত্তম। সাধারণত ৮-১২ মাস বয়সের আঁশফলের চারা রুটস্টক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মে-জুন মাসে কাক্সিক্ষত মাতৃগাছ হতে ৪-৫ মাস বয়স্ক সায়ন সংগ্রহ করে ফাটল (
Cleft grafting) পদ্ধতিতে জোড়া লাগানো হলে সফলতা ও কলমের বৃদ্ধি ভালো হয় এবং এ পদ্ধতিতে উৎপন্ন কলম হতে ৩-৪ বছরে ফল পাওয়া যায়।

 
উৎপাদন কলাকৌশল
জমি নির্বাচন ও তৈরি : আঁশফল চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি উত্তম। জমি নির্বাচন করে চাষ ও মই দিয়ে এবং দীর্ঘজীবী আগাছা সমূলে অপসারণ করে ভালোভাবে জমি তৈরি করতে হবে।
চারা-কলম নির্বাচন : রোপণের জন্য এক বছর বয়স্ক সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত কলমের চারা নির্বাচন করতে হয়।
রোপণ পদ্ধতি : সমতল ভূমিতে বর্গাকার বা আয়তকার বা ষড়ভূজি পদ্ধতিতে চারা রোপণ করা যেতে পারে। কিন্তু উঁচু নিচু পাহাড়ি এলাকায় কন্টুর রোপণ পদ্ধতিতে চারা রোপণ করা উত্তম।
রোপণের সময় : জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় এবং ভাদ্র-আশ্বিন মাস চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে পানি সেচের সুব্যবস্থা থাকলে সারা বছরই আঁশফলের চারা-কলম রোপণ করা চলে।
গর্ত তৈরি : চারা রোপণের ১৫-২০ পূর্বে ৫ মি. x ৫ মি. দূরত্বে  ১ মি. x১ মি. x১ মি. আকারের গর্ত করতে হবে। গর্তের উপরের মাটির সাথে ১৫-২০ কেজি জৈবসার, ২৫০ গ্রাম টিএসপি ও ২৫০ গ্রাম এমওপি সার ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে তাতে পানি দিতে হবে।
চারা-কলম রোপণ ও পরিচর্যা : গর্তে সার প্রয়োগের ১০-১৫ দিন পর গর্তের মাঝখানে নির্বাচিত চারাটি খাঁড়াভাবে রোপণ করে চারার চারদিকের মাটি হাত দিয়ে চেপে ভালোভাবে বসিয়ে দিতে হয়। চারা রোপণের পর শক্ত খুঁট পুঁতে খুঁটির সঙ্গে চারাটি বেঁধে দিতে হবে যাতে বাতাসে চারার কোনো ক্ষতি না হয়। প্রয়োজনবোধে বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। চারা রোপণের পরপরই পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
গাছে সার প্রয়োগ : গুণগতমানসম্পন্ন উচ্চফলন পেতে হলে আঁশফলে নিয়মিত সারপ্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। গাছের বয়স বাড়ার সঙ্গে সারের পরিমাণও বাড়াতে হবে। নিম্নের ছকে গাছের বয়সভিত্তিক সারের পরিমাণ দেয়া হলো। উল্লিখিত সার তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হয়। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে ফল সংগ্রহের পর ১ম বার, ফাল্গুন-চৈত্র মাসে মুকুল আসার সময় ২য় বার এবং জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে বীজের রঙ ধারণপর্যায়ে ৩য় বার সার প্রয়োগ করতে হয়।
পোকামাকড় ও রোগবালাই
আঁশফলে তেমন কোনো পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ হতে দেখা যায় না। তবে ফলের পরিপক্ব পর্যায়ে পাখি (ফিঙে, দোয়েল) ও বাদুড় ফল খেয়ে প্রচুর ফল নষ্ট করে ফেলে। তাই প্রত্যেক গাছ আলাদাভাবে বা সম্পূর্ণ বাগানে নাইলন নেট দিয়ে আবৃত করে ফল রক্ষা করা যায়।
কালো পিপড়া : এ ফল বেশি মিষ্টি বিধায় গাছে থাকা অবস্থায় কালো পিঁপড়া বীজ ও খোসা বাদ দিয়ে ফলের সব শাঁস খেয়ে ফেলে।
দমন ব্যবস্থা : বাগানের আশপাশে পিঁপড়ার বাসা থাকলে তা ধ্বংস করে ফেলতে হবে। সেজন্য মাটিতে ডারসবান ২০ ইসি @ ২ মিলিলিটার বা লরসবান ১৫ জি ৫ গ্রাম/লিটার হারে প্রয়োগ করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে গাছে ক্লোরপাইরিফস ২০ ইসি বা ডারসবান ২০ ইসি ১.৫ মিলিলিটার হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। ফল সংগ্রহের অন্তত ১৫ দিন পূর্বে অবশ্যই কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে।
ফল সংগ্রহ
ফাল্গুন-চৈত্র (মার্চ) মাসে ফুল আসে এবং শ্রাবণ-ভাদ্র (আগস্ট) মাসে ফল পাকে। সম্পূর্ণ পাকার পর ফল গাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। আবার ফল বেশি পেকে গেলে গাছ থেকে ঝরে পড়ে ও ফেটে যায়, যা গাছের ফলনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। তাই সময়মতো ফল সংগ্রহ আঁশফলের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

ড. মো. মসিউর রহমান*

*ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, গাজীপুর, মোবাইল : ০১৭১৬৮৩৮৫৮৬

বিস্তারিত
উদ্ভিজ্জ অ্যান্থোসায়ানিন : উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট

শাকসবজি ও ফলমূল হলো মানুষের খাদ্যের অন্যতম মৌলিক উপাদান। এগুলো মানবদেহের অপরিহার্য ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের অন্যতম জোগানদাতা। এ ছাড়াও এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটসের অন্যতম প্রধান উৎস।  রঙিন শাকসবজি, ফলমূল ও ফুলে উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন ও স্বাস্থ্য সহায়ক উদ্ভিদ রঞ্জক (প্লান্ট পিগমেন্ট) থাকায় এগুলোর প্রতি মানুষের চাহিদা ও সচেতনতা দিন দিন বেড়ে চলছে। ক্লোরোফিল ছাড়া অন্যান্য প্রধান উদ্ভিজ্জ রঞ্জকগুলো হলো-ক্যারোটিনয়েড, ফ্লাভোনয়েড এবং বেটালিন। ফ্লাভোনয়েড হচ্ছে উদ্ভিজ্জ সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ গ্রুপ। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত প্রায় ৬০০০ প্রকার ফ্লাভোনয়েড শনাক্ত করেছেন। আর অ্যান্থোসায়ানিন হলো ‘ফ্লাভোনয়েড’ গ্রুপের এক ধরনের উদ্ভিজ্জ বায়োঅ্যাক্টিভ যৌগ বা উদ্ভিদের পাতা, ফুল, ফল ও মূলের বর্ণের প্রধান নিয়ামক।
অ্যান্থোসায়ানিন সাধারণত কোষের সাইটোপ্লাজমে তৈরি হয়। এটি পানিতে দ্রবণীয় এবং কোষ গহ্বরে গিয়ে সঞ্চিত হয়। এটি উদ্ভিদের বিভিন্ন বর্ণ যেমন- কমলা, লাল, গোলাপি এবং নীল বর্ণের জন্য দায়ী। উদ্ভিদে এদের এ বর্ণ বিভিন্নতার কারণ হলো কোষে উপস্থিত বিভিন্ন ধরনের সহরঞ্জক, মেটাল আয়ন ও কোষ গহ্বরের পিএইচ। দৃশ্যমান উদ্ভিজ্জ রঞ্জকগুলোর মধ্যে ক্লোরোফিলের পরেই অ্যান্থোসায়ানিনের অবস্থান। অ্যান্থোসায়ানিন উদ্ভিদের পাতা, ফুল, ফলকে বর্ণিল করে বিভিন্ন কীটপতঙ্গ এবং প্রাণীকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে পরাগায়ন ও প্রাকৃতিকভাবে বীজ বিস্তারে সাহায্য করে। এছাড়াও এরা আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উদ্ভিদকুলকে রক্ষা করে। ১৮৩৫ সনে জার্মান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী লুডউইং মার্কাট অ্যান্থোসায়ানিনের নামকরণ করেন। এটি মূলত দুটি গ্রিক শব্দ অ্যান্থোস অর্থ ফুল এবং ক্যানস অর্থ নীল থেকে এসেছে।
অ্যান্থোসায়ানিনের প্রাকৃতিক উৎস হচ্ছে রঙিন শাকসবজি (লালশাক, লাল লেটুস, কালো বেগুন, লাল শিম ও শিমের বীজ, লাল গোলআলু, লাল মুলা, লাল বরবটি, লাল মিষ্টিআলু, লাল বাঁধাকপি ও লাল ফুলকপি), মসলা (লাল পেঁয়াজ ও কালো কাঁচামরিচ), দেশি ফল (কালোজাম, করমচা, লাল জামরুল, কলা, আপেল কুল, লটকন ও ডালিম), বিদেশি ফল (ব্লুবেরি, বিলবেরি, ব্ল্যাককারেন্ট, ব্ল্যাকবেরি, ক্রানবেরি, স্ট্রবেরি, রাস্পবেরি, গুজবেরি, কালো আঙুর, চেরি, পিচ ও নেকটারিন)।
একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা মানবদেহে রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। গত দু-দশক ধরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা গেছে যে, অ্যান্থোসায়ানিন মানবদেহে ক্যান্সার, হৃদরোগ, নিউরোডিজেনারেটিভ ব্যাধি, বার্ধক্যজনিত রোগের ঝুঁকি কমায়। এছাড়াও সিরামে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টর মাত্রা বৃদ্ধি, কোলস্টেরল বণ্টন, স্থূলতা হ্রাস, দৃষ্টিরোগ পুনঃস্থাপন ও লোহিত কণিকাকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
অ্যান্থোসায়ানিন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং বর্তমানেও চলছে। উদাহরণস্বরূপ বুতেল্লি এবং তার সহকর্মীদের ২০০৮ সনের এক গবেষণার কথা উল্লেখ করা যায়। তারা তাদের পরীক্ষায় ক্যান্সার সংবেদনশীল ইঁদুর ‘টিআরপি৫৩’কে উচ্চমাত্রার অ্যান্থোসায়ানিন সমৃদ্ধ ট্রান্সজেনিক টমেটো পাউডার এবং একই সঙ্গে কিছু ‘টিআরপি৫৩’ ইদুঁরকে সাধারণ খাবার খাওয়ান, পরে তারা দেখেন যে ইঁদুরগুলো অ্যান্থোসায়ানিন সমৃদ্ধ টমেটো পাউডার খেয়েছিল তাদের জীবনকাল অন্যগুলোর তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হ্যান ও তার সহকর্মীরা (২০০৭) দেখতে পান, যে ইঁদুরকে উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে অ্যান্থোসায়ানিন সমৃদ্ধ লাল আলু খাওয়ালে, এরা কোলস্টেরল খাবার দ্বারা সৃষ্ট অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।
অ্যান্থোসায়ানিনের স্বাস্থ্য গুণাগুণ বিবেচনা করে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী উচ্চমাত্রায় অ্যান্থোসায়ানিন সমৃদ্ধ ট্রান্সজেনিক আপেল উদ্ভাবন করেছেন। এ ফলগুলোর গায়ে ও ভেতরে সাধারণ আপেলের তুলনায় অনেকগুণ বেশি অ্যান্থোসায়ানিন তৈরি হওয়ায় এদের বর্ণ লাল।
অ্যান্থোসায়ানিনের এসব স্বাস্থ্য উপকারী গুণাগুণ বিবেচনা করে বর্তমানে এটি ক্যাপসুল হিসেবে বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে। সর্বপ্রথম ২০০১ সনে নরওয়েভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘বায়োলিংক গ্রুপ’ বিলবেরি ও ব্ল্যাক কারেন্টের নির্যাস থেকে ওষুধ হিসেবে অ্যান্থোসায়ানিন ক্যাপসুল ‘ম্যাডক্স’ প্রস্তুত করেন। প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র নরওয়েতে বাজারজাতকরণ করা হয়। পরে ২০০৭ এর প্রথমদিকে আমেরিকায় বাজারজাতকরণের জন্য ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে।
বাংলাদেশে এ রকম অ্যান্থোসায়ানিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ অনেক শাকসবজি, ফলমূল, দানাজাতীয় ও কন্দাল ফসল রয়েছে। যেগুলো দামে অত্যন্ত সস্তা ও সহজলভ্য। সুতরাং এসব ফসল শনাক্তকরণ করে জনসাধারণের মাঝে অ্যান্থোসায়ানিনের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা সম্ভব।

ড. মো. আব্দুর রহিম*
*সহযোগী অধ্যাপক ও অ্যান্থোসায়ানিন গবেষক, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭

 

বিস্তারিত
লেবুজাতীয় ফলের বাম্পার ফলন পেতে করণীয়

বিশ্বে সাইট্রাস (লেবুজাতীয় ফল) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফল। উৎপাদনের দিক থেকে পৃথিবীর ফলগুলোর মধ্যে এর স্থান দ্বিতীয় কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিক থেকে এ ফলের স্থান প্রথম (স্যামসন, ১৯৮৬)। বাংলাদেশের আবহাওয়া লেবুজাতীয় ফল (বিশেষ করে এলাচিলেবু, কাগজিলেবু, জাম্বুরা বেশি ভালো হয়) উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। এ দেশে লেবুজাতীয় ফলের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। এ দেশের লেবুজাতীয় ফলচাষিরা প্রতি বছর রোগবালাই ও পোকামাকড় দ্বারা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই যেসব রোগ ও পোকা বেশি আক্রমণ করে উহার লক্ষণ ও প্রতিকার দেয়া হলো-
(অ) রোগবালাই  
ডাই-ব্যাক (
Dic-back) : লেবু জাতীয় ফসলের এটা একটি মারাত্মক রোগ। এ রোগের কারণে প্রতি বছর লেবুর ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে। এ রোগ কোলিট্রোটিক্যাম গোলিওসপোরডিস (Colletotrichum gloesporiodes) নামক ছত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে।
লক্ষণ : ১. পাতার শিরাগুলো হলুদ হয়ে যায়। ২. সম্পূর্ণ পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে। ৩. শাখার অগ্রভাগ এবং ছোট ছোট প্রশাখাগুলো পুড়িয়ে যাওয়ার মতো দেখা যায় ও নিচের দিকে ঝুলতে থাকে। ৪. আক্রান্ত গাছের আকার ছোট দেখা যায়। ৫. কিছু দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ গাছ মরে যায়।
দমন : ১. উন্নত পরিচর্যা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ২. প্রয়োজনীয় পরিমাণ পটাশ ও দস্তা সার প্রয়োগ করতে হবে। ৩. ফল সংগ্রহের পর বাগানের আবর্জনা এবং যদি আক্রান্ত অংশ থাকে  পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ৪. ডাইথেন-এম-৪৫ পানিতে ০.৩ % হারে মিশে ১০-১২ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।
স্ক্যাব (
Scab) : লেবু গাছের সর্বত্রে এ রোগ দেখা যায়। এ রোগের কারণে ফলের উপরিভাগ অত্যন্ত বিশ্রী হয়ে যায় এবং বাজারমূল্য কমে যায়। ইলন্সিনও ফাউসেটি (Elsinoe fawcetti) নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।
লক্ষণ : ১. পাতা, কচি ডাল ও ফলের ওপর পানি ভেজা দাগ দেখা যায়। ২. অনিয়মিত দাগগুলো পাতা ও ফলের ওপর উঁচু এবং ফোস্কারমতো দাগ মনে হয়। ৩. ফলের ওপর প্রথমে হলুদ এবং কমলা বা লালচে চকচকে দাগ দেখা যায়। ৪. অনেক ছোট দাগ একত্র হয়ে খসখসে কর্কের মতো হয়ে যায় ও ফলের বাজারমূল্য কমে যায়।
দমন : ১. রোগাক্রান্ত পাতা, ডালপালা, ফল সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। ২. জিংক সালফেট ও ছাই বর্ষার আগে গাছের গোড়ার মাটি আলগা করে প্রয়োগ করতে হবে। ৩. বোর্দোমিক্সার এবং ফানজিসাইট (যেমন- কুপরাভিট ০.৩ % হারে ২-৩ বার প্রয়োগ করতে হবে) স্প্রে করতে হবে।  
ক্যাংকার (
Canker) : জেনথোমোনাস এক্সোনোপোডিস (Xanthomonas axonopodis pv. citri) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।
লক্ষণ : ১. ছোট ছোট পানি ভেজা দাগ পাতা ও ফলের ওপর দেখা যায়। ২. এ দাগগুলো সামান্য বিকৃত হয়ে বড় বাদামি বর্ণ ধারণ করে। ৩. দাগগুলো ফোস্কারমতো মনে হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফেটে যায়। ৪. ফলের ওপর ক্যাংকার হলে হলুদ রঙ বিদ্যমান বেষ্টনী দেখা যায়।
দমন : ১. সুস্থ সবল ও রোগমুক্ত চারা গাছ নতুন এলাকায় রোপণ করতে হবে। ২. রোগাক্রান্ত ডাল-পালা কেটে ফেলতে হবে। ৩. বাগান পরিষ্কার রাখতে হবে। ৪. নিমের পাতার রস ১ কেজি প্রতি ২০ লিটার পানিতে মিশে ¯েপ্র করতে হবে। ৫. ডাইথেন এম-৪৫ কীটনাশক ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশে ¯েপ্র করতে হবে।
অ্যানথ্রাকনোজ (
Anthracnose) : এ রোগ দুই প্রকার ছত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে।
লক্ষণ : ১. পুরনো পাতা বা কিছু বয়স্ক হয়েছে এমন পাতায় ঈষৎ সবুজ রঙের দাগ পড়ে। ২. দাগগুলো শিগগিরই বাদামি বর্ণ হয়ে যায়। ৩. আক্রান্ত পাতা ও ডাল আগা থেকে শুকিয়ে যায় বা মরে যায়। ৪. আক্রান্ত গাছে অসংখ্য পত্রবিহীন মৃত বা অর্ধমৃত অথবা রোগাটে ডাল পাওয়া যায়। ৫. গাছে ফল থাকলে ফলের বোঁটা সংক্রামিত হয়ে পড়ে। ৬. আক্রান্ত ফলের ওপর বাদামি বর্ণের দাগ পড়ে এবং গুদামে সংরক্ষণ করলে ফল পচে যায়।
দমন : ১. নীরোগ বীজতলা থেকে চারা উৎপাদন করে নীরোগ বাগানে রোপণ করতে হবে। ২. চারা রোগমুক্ত রাখতে ৪ ঃ ৪ ঃ ৫০ হারে রোজিন বোর্দোমিক্সচার জানুয়ারি ও সেপ্টেম্বর মাসে এক বার করে ¯েপ্র করতে হবে। ৩. সুষম সার ব্যবহার করলে এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ফল সংগ্রহ করে আবর্জনা পুড়ে ফেলতে হবে। ৪. ছত্রাকনাশক যেমন ডাইথেন এম-৪৫ পানিতে ০.৩ % হারে মিশে স্প্রে করতে হবে।
(আ) পোকা দমন
লেবুর প্রজাপতি (
Lemon butter fly)
ক্ষতির প্রকৃতি : এ পোকার কীড়া বা ক্যাটারপিলার পাতার ওপরে বসে পাতা খেতে থাকে। এরা অনেক সময় গাছকে নিষ্পত্র করে ফেলে। এজন্য ফল ও গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
প্রতিকার : ১. ডিমসহ পাতা সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। ২. ডাইমেক্রন ১০০ ইসি ১৫ মিলি অথবা সেবিন ৮৫ এসপি ১৪ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশে ¯েপ্র করতে হবে।
লেবুর পাতার ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ পোকা বা আঁকি পোকা (
Citrus leaf miner)
ক্ষতির প্রকৃতি : লেবু গাছে প্রায়ই এ পোকা দেখা যায়। মাঝে মাঝে এরা কচি কমলা গাছে ক্ষতি করে থাকে। পোকার কীড়াগুলো পাতার ওপরের এপিডার্মিসের ঠিক নিচে আঁকবাঁকা সুড়ঙ্গ করে খেতে থাকে। এতে পাতা কুঁকড়ে বা মুড়িয়ে যায়। অনেক সময় পত্রফলকটি মুড়ে যায়। ফুলধারণ অবস্থায় এ পোকা আক্রমণ করলে গাছে মারাত্মকভাবে ফলধারণ ব্যাহত হয়।
প্রতিকার : ১. আক্রান্ত পাতার সংখ্যা কম হলে সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। ২. আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি ১৭ মিলি ০.৩ % হারে অথবা ডাইমেক্রন ১০০ ইসি ১৫ মিলি অথবা ডায়াজিনন ৬০ ইসি ২০ মিলি ১০ লিটার পানিতে মিশে স্প্রে করতে হবে।
লেবুর পাতার ছাতরা পোকা (
Citrus mealy bug)
ক্ষতির প্রকৃতি : কাগজিলেবু, জাম্বুরা, এলাচিলেবু ইত্যাদি গাছে ছাতরা পোকা দেখা যায়। এ পোকার আক্রমণে পাতা ও শাখায় তুলার মতো সাদা স্তূপ দেখা যায়। এ পোকা প্রশাখা ও পাতা থেকে রস চুসে খায়। আক্রান্ত অংশে ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী থাকে।
প্রতিকার : খুব কম আক্রমণ হলে আক্রান্ত প্রশাখা কেটে পুড়ে ফেলতে হবে। ২. ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি ১২ মিলি প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশে স্প্রে করতে হবে।

কৃষিবিদ ড. এম এ মজিদ*

*পিএইচডি গবেষক, রাবি, প্রভাষক কৃষি শিক্ষা বিভাগ, নাটোর সিটি কলেজ, নাটোর, মোবাইল : ০১৭২২-৪০৩২২০

 

বিস্তারিত
ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ (কৃষিকথা ১৪২৩)

(গত সংখ্যার পর)
আচার : সাধারণত আচার তৈরিতে লবণ, এসিটিক এসিড বা ভিনেগার, সাইট্রাস ফলের জুস ও তেল, বিশেষ করে সরিষার তেল প্রধান সংরক্ষক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আচার গাঁজন ও অগাঁজন দুই পদ্ধতিতেই তৈরি করা সম্ভব। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গাঁজন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। আচারে লবণের পরিমাণ ৮-১০% হলে প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া আচারে বৃদ্ধি পেতে বা বংশবিস্তার ঘটাতে পারে এবং পরবর্তীকালে প্রয়োজনীয় ল্যাকটিক এসিড উৎপন্ন করে সংরক্ষক হিসেবে কাজ করে। আচার বোতলে ভরতে তেল বা অন্যান্য তরলে আচার যাতে ডুবে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ আচারের উপরে শুকনা থাকলে আচার বেশি দিন সংরক্ষিত থাকবে না, গন্ধ বা নষ্ট হয়ে যাবে।
আচারে ব্যবহৃত তেলের রেনসিডিটি ঘটলে আচার থেকে আপত্তিকর গন্ধ বের হবে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য আচারের উপরে তেল বোতলের মুখ পর্যন্ত ভরতে হবে। আচারের উপরিভাগে তরল যোগ করে অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবহার করেও তেলের রেনসিডিটি রোধ করা যায়। আচারে ব্যবহৃত ফলের টুকরাগুলো বেশি নরম হলে, আচার তৈরির প্রথমদিকেই লবণের সাথে ০.২০-০.২৫% ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড যোগ করে নিতে হবে। তেলে সংরক্ষিত আচারে খাবার লবণ ৮-১০%, তেল ১৮-২৫% ও এসিড ১.৯৫-২.৭৫% থাকলে ভালো হয়। ভিনেগারে সংরক্ষিত আচারে কমপক্ষে ৫% এসিড থাকা উচিত। খেয়াল রাখতে হবে, আচারে যাতে মাত্রাতিরিক্ত মসলা ব্যবহার করা না হয়, কারণ অতিরিক্ত মসলা ব্যবহারে আচারে তিক্তস্বাদ সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের দেশে আচার তৈরিতে সাধারণত সরিষার তেল ব্যবহার করা হয়। সরিষার তেলের পরিবর্তে সয়াবিন তেল, তিলের তেল অথবা সূর্যমুখী তেল আচার তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।
সস বা কেচাপ : সস এবং কেচাপ দুটি কাছাকাছি প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য পণ্য। কিছুটা পার্থক্য হলো কেচাপের টিএসএস ২৫% হওয়া বাঞ্ছনীয়, কিন্তু সসের টিএসএস সর্বনিম্ন ২৫% এবং সর্বোচ্চ সীমা ঐচ্ছিক। তবে আমাদের দেশে সসের টিএসএস সাধারণত ২৬-৩২% রাখা হয়। সসের তুলনায় কেচাপে মসলা কম পরিমাণে যোগ করা হয়, যাতে কেচাপে ফলের বৈশিষ্ট্যসূচক ঘ্রাণ ও স্বাদ বজায় থাকে। দুটি পণ্যের উৎপাদন কৌশল একই। মসলার নির্যাস নিতে মসলাগুলো কাপড়ের পুঁটলিতে বেঁধে উপকরণগুলোর সাথে শুরুতেই যোগ করা হয়। কখনো কখনো কিছু মসলা সরাসরি পেস্ট বা গুঁড়া অবস্থাতেও যোগ করা হয়। সস বা কেচাপের বৈশিষ্ট্যসূচক স্বাদ ও ঘ্রাণ আনতে এসিটিক এসিড বা ভিনেগার যোগ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এগুলোকে ঘন করতে ঘনীকারক দ্রব্য যেমনÑ স্টার্চ, সিএমসি, পেকটিন, জিলেটিন যোগ করা হয়। সস বা কেচাপ গরম অবস্থাতেই বোতলে কানায় কানায় ভরে দ্রুত বায়ুরোধী করে সিল করা হয়, যাতে ঠা-ায় বোতলের উপরিভাগে শূন্যাবস্থার সৃষ্টি হয়। উপযুক্তভাবে পাকা ফল ব্যবহার করলে কোনোরূপ রঙ যোগ করার প্রয়োজন হয় না।
স্কোয়াশ : স্কোয়াশ জুসের তুলনায় অনেকটাই ঘন পানীয়। চিনির পরিমাণ বেশি মাত্রায় থাকায় স্কোয়াশের আয়ুষ্কাল জুসের তুলনায় অনেক বেশি। ফলের পাল্প থেকে স্কোয়াশ তৈরি করলে তাকে নেকটার এবং পরিষ্কার জুস থেকে স্কোয়াশ তৈরি করলে তাকে কর্ডিয়াল বলা হয়।
আমাদের দেশে স্কোয়াশের টিএসএস রাখা হয়, সাধারণত ৪০-৪৫%। স্কোয়াশে ব্যবহৃত পাল্প বা জুসের সর্বনি¤œ পরিমাণ হবে ২৫%। স্কোয়াশ তৈরি প্রথমে ফলের এসিডিটি ও টিএসএস নির্ণয় করে নেয়া হয় এবং স্কোয়াশের উদ্দিষ্ট এসডিটি ও টিএসএস থেকে প্রাপ্ত এসডিটি ও টিএসএস বিয়োগ করে কত পরিমাণ চিনি ও এসিড (সাইট্রিক এসিড) যোগ করতে হবে তা নির্ণয় করা হয়। ফলের পাল্প বা জুস প্রথমেই পাস্তুরিত করে কক্ষ তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা হতে দেয়া হয়। চিনি এসিড ও পানির মিশ্রণে তাপ প্রয়োগে ফুটিয়ে ছেঁকে নেয়া হয় এবং ঠাণ্ডা হতে দেয়া হয়। এরপর সিরাপকে পাস্তুরিত পাল্প বা জুসের সাথে যোগ করে ভালোভাবে মিশিয়ে নেয়া হয়। প্রয়োজনে পরিমাণমতো সংরক্ষক যোগ করা যায়। জুস ও সিরাপ উত্তপ্ত অবস্থায় মেশানো হলে ফলের ফ্লেভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য এগুলোকে ঠাণ্ডা করে মেশানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। স্কোয়াশ ঘন করতে অনুমোদিত ঘনীকারক যেমন পেকটিন, সিএমসি এসব যোগ করা যায়।
জ্যাম বা জেলি : জ্যাম ও জেলির উৎপাদন কৌশল প্রায় একইরকম। জ্যামের ক্ষেত্রে ফলের পাল্প এবং জেলির ক্ষেত্রে ফলের পরিষ্কার রস যোগ করা হয়। এ জন্য জেলি জ্যামের তুলনায় স্বচ্ছ দেখায়, তবে পুষ্টিমান জ্যামে বেশি। জ্যাম বা জেলিতে ফলের পাল্প বা জুসের সাথে এমন পরিমাণে চিনি যোগ করা হয় যাতে চূড়ান্ত খাদ্যে টিএসএস থাকে ৬৫-৭০%। জ্যাম বা জেলি জমতে প্রধান ভূমিকা রাখে এসিড চিনি ও পেকটিন। সন্তোষজনক জেল গঠন নির্ভর করে মূলত পেকটিনের পরিমাণ ও শক্তির ওপর; চিনির পরিমাণের ওপর এবং পিএইচ মাত্রার ওপর। সন্তোষজনক জেল গঠনে ব্যবহৃত পেকটিনের জেলি গ্রেড হওয়া উচিত ১০০-১৫০ এবং চূড়ান্ত জ্যাম বা জেলিতে পেকটিনের পরিমাণ হয় সাধারণত ১%-১.২%। জেল গঠন করতে ৩.৫ এর নিচে থাকা উচিত। চূড়ান্ত জ্যামে টিএসএস ৬৭.৫% এবং জেলিতে টিএসএস সর্বনিম্ন ৬৫% টিএসএসকে বিপজ্জনক রেখা নামে অভিহিত করা হয়। কারণ ৬৫% এর নিচে টিএসএস থাকলে জ্যাম বা জেলি সহজে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত তাপ প্রয়োগে পেকটিনের জেল গঠন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। জ্যাম বা জেলি তৈরিতে অনেকেই অ্যাগার বা জিলেটিন ব্যবহার করে থাকে। এ ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যকে জ্যাম বা জেলি বলা ঠিক হবে না। এগুলো জ্যাম বা জেলির মতো পণ্য বলা যেতে পারে।
বিশুষ্কীকৃত খাদ্য : প্রাকৃতিকভাবে খাদ্যে বা কাঁচা কৃষিজ পণ্যে প্রচুর আর্দ্রতা থাকে। এ পানি বা আর্দ্রতা বিভিন্ন অনুজীব ও এনজাইমের ক্ষতিকর কার্যকলাপ চালানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। ফলে খাদ্য খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়। শুষ্কীকরণ পদ্ধতিতে খাদ্য থেকে পানি এমন পরিমাণে অপসারণ করা হয়, যাতে অনুজীব ও এনজাইম তাদের কার্যকলাপ চালাতে প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয় উত্তপ্ত বায়ু খাদ্যের সান্নিধ্যে এসে খাদ্য থেকে পানি বাষ্পাকারে বের করে নিয়ে আসে এব সে বাষ্প পারিপার্শ্বের বায়ু দিয়ে শোষিত হয়। মুক্তপানি তাড়াতাড়ি খাদ্য থেকে বাষ্পাকারে বের হয়ে আসে এবং বদ্ধপানি ধীরে ধীরে বাষ্পায়িত হয়। খাদ্যের আশপাশের বায়ু কতটুকু জলীয়বাষ্প ধারণ করবে তা নির্ভর করে বায়ুর আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার ওপর। বায়ু উত্তপ্ত হলে আপেক্ষিক আর্দ্রতা কমে যায় এবং বায়ু আরও জলীয়বাষ্প শোষণ করতে পারে। অনুজীবের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের অনুজীবের জন্য বিভিন্ন হয়। পানির এ চাহিদাকে পানির সক্রিয়তা বলে। শুষ্কীকরণের ফলে খাদ্যে ব্রাউনিং হতে পারে যা রাসায়নিক, জৈব রাসায়নিক অথবা অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগের কারণে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিনি ও প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়ায় ব্রাউনিং হতে পারে। এজন্য ভালোমানের বিশুষ্কীকৃত খাদ্য পেতে প্রয়োগকৃত বায়ুর তাপমাত্রা ৫০-৬০০ সে. বজায় রাখা উচিত। শুষ্কীকরণের আগে কোনো কোনো খাদ্যে সালফাইটিং ও ব্লাঞ্চিং করার প্রয়োজন পড়ে।
টিনজাতকৃত খাদ্য : সম্পূর্ণ বায়ুরোধী করে ঢাকনা লাগানো পাত্রে তাপপ্রয়োগ করলে ঢাকনা যদি খোলা না হয় অথবা ঢাকনা যদি ছিদ্রযুক্ত না হয় তবে পাত্রস্থিত খাদ্য অনেক দিন টিকে থাকবে। এ ঘটনাই ঘটে টিনজাতকরণ পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে টিনপাত্র এবং কখনও কখনও কাঁচপাত্র ব্যবহার করা হয়। একজেস্টিং ধাপে খাদ্য ও পাত্র থেকে বায়ু দূর করে পাত্রের ভেতরে শূন্যাবস্থার সৃষ্টি করা যায়। এ কারণে অনুজীব জন্মাতে বা বৃদ্ধি পেতে পারে না। খাদ্যে তাপসহিষ্ণু অনুজীব যেমন থাকতেও পারে, এ ধারণায় টিনজাতকরণের রিটটিং ধাপে ১২১০ সে. তাপমাত্রায় খাদ্যের ওপর ভিত্তি করে ০.৫-২ ঘণ্টা ধরে তাপ প্রয়োগ করা হয়। টিনজাতকৃত খাদ্যে তাপ প্রবেশ্য বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে- ক্যানের আকার, ক্যানের গঠনগত উপাদান, ক্যানে খাদ্য সাজানোর ধরন, কলয়েডের উপস্থিতি, চিনি বা লবণের উপস্থিতি, ঘূর্ণায়মান অবস্থা, খাদ্যের প্রাথমিক তাপমাত্রায় ও রিটর্টের তাপমাত্রার ওপর।
গাঁজনকৃত খাদ্য : গাঁজন হচ্ছে মোটাবলিক প্রক্রিয়া যেখানে কার্বহাইড্রেট ও সংশ্লিষ্ট খাদ্যকে কোনো বাহ্যিক ইলেকট্রন গ্রাহকের অনুপস্থিতিতে জারিত করা হয়। বিজ্ঞানী প্রিসকটের মতে, গাঁজন হচ্ছে একটি প্রক্রিয়া যেখানে অনুজৈবিক ও এনজাইমের ক্রিয়ায় জৈব পদার্থে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। গাঁজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ইস্ট, মোল্ড ও ব্যাকটেরিয়া দ্বারা অথবা এদের সমন্বিত ক্রিয়ায়। ফারমেন্টেটিভ অনুজীব কার্বহাইড্রেট ও সংশ্লিষ্ট খাদ্যকে আক্রমণ করে অ্যালকোহল, এসিড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন করে।
হিমায়িত খাদ্য : সদ্য সংগৃহীত ফল ও সবজি ৭৫-৯৫% আর্দ্রতা ও ৪-২৩% দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ বহন করে। বিস্তৃত এ কঠিন পদার্থের জন্য খাদ্য দ্রব্যের হিমায়ন শুরু হয় ০.৫০ সে -৪০ সে এর মধ্যে। যখন তাপমাত্রা ১৮০ সে. এ পৌঁছে তখন খুব সামান্য পরিমাণ পানিই জমা ব্যতিরেকে অবস্থান করে। যখন তাপমাত্রা আরও কমানো হয় তখন এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছে যখন অবশিষ্ট পানি ও দ্রবণীয় পদার্থ একত্রে কঠিনরূপ ধারণ করে। এ বিন্দুটি ইউটেকটিক বিন্দু হিসেবে পরিচিতি।
হিমায়িত ফলের গুণগতমান নির্ভর করে নির্বাচিত ফলের জাত, পরিপক্বতা, বর্ণ, ঘ্রাণ, ফল সংগ্রহ থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত ব্যবহৃত ব্যবস্থাপনা, ব্লাঞ্চিং, সংরক্ষণ পদ্ধতি এসবের ওপর। প্রমাণিত হয়েছে, ১৮০ সে. তাপমাত্রা সবচেয়ে নিরাপদ তাপমাত্রা। এ তাপমাত্রায় কোনো অনুজীব খাদ্যে জন্মাতে পারে না এবং এনজাইমের কার্যকলাপ সর্বনি¤œ পর্যায়ে থাকে। কিছু প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্য ও তার উপযোগী ফল হলো-
আচারে ব্যবহারের জন্য উপযোগী ফল হলো পরিপক্ব কাঁচা আম, জলপাই, আমড়া, চালতা;

  • সংরক্ষিত পাল্প উপযোগী ফল হলো আম, আনারস, টমেটো, পেঁপে, লিচু, কাঁঠাল, জাম, পেয়ারা;
  • চাটনি উপযোগী তেঁতুল, বরই, জলপাই, আমড়া, আম, চালতা, আনারস, টমেটো, বেল, কদবেল;
  • আচার উপযোগী ফল হলো আম, জলপাই, আমড়া, কামরাঙা, লেবু, চালতা, সাতকড়া, কাঁচা কাঁঠাল;
  • জুস-ড্রিংক উপযোগী ফল হলো আম, আনারস, কমলা, জাম্বুরা, লেবু, টমেটো;
  • নেকটার উপযোগী ফল হলো আম, লিচু, পেঁপে, আনারস, পেয়ারা, আপেল, কাঁঠাল;
  • কর্ডিয়াল উপযোগী ফল হলো আনারস, লেবু, কমলা;
  • জ্যাম উপযোগী ফল হলো আম, আনারস, পেঁপে, লিচু, কাঁঠাল, পেয়ারা, টমেটো, আপেল, তরমুজ, জাম, আঙুর, খেজুর, তাল বেল, কদবেল, কলা, কামরাঙা;
  • জেলি উপযোগী ফল হলো কমলা, লেবু, আনারস, টমেটো, আঙুর, জাম পেয়ারা লিচু, কাঁঠাল;
  • সস উপযোগী ফল হলো টমেটো, পেঁপে, তেঁতুল, চালতা;
  • ভিনেগার উপযোগী ফল হলো আনারস, আঙুর, তাল, খেজুর, কাঁঠাল;
  •  প্রিজার্ভ উপযোগী ফল হলো আনারস, আম, জলপাই, কামরাঙা, আমড়া, খেজুর, কাঁঠাল হরীতকী;
  • ক্যান্ডি উপযোগী আম, কাঁঠাল, আনারস, আপেল, কামরাঙা, আমড়া, কলা, লিচু, কমলা, লেবু;
  • চিপস উপযোগী কলা, কাঁঠাল, আনারস, আপেল, কামরাঙা, আমড়া, কলা, লিচু, কমলা লেবু;
  • ফলস্বত্ব : উপযোগী ফল হলো আম, কাঁঠাল, তাল, আনারস, পেয়ারা;
  • পাউডার : উপযোগী ফল হলো যে কোনো ফলে পাল্প;

তেল : উপযোগী ফল হলো জলপাই, নারকেল।
বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের উপযোগী। মানুষের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়ন বা সংরক্ষণের সাথে জড়িত পুষ্টি উপাদান বহুলাংশে আসে ফল থেকে। কাজেই ফলকে সরাসরি অথবা প্রক্রিয়াজাত আকৃতিতে সহজ প্রাপ্য করতে হলে ফল চাষের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে হবে। আমাদের আবাদ করার অধিকাংশ ফল মৌসুমি। সারা বছর তাদের প্রাপ্যতার নিশ্চয়তা দিতে প্রয়োজন উপযুক্ত বিজ্ঞাননির্ভর উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কলাকৌশল। তাই বিভিন্ন মাত্রায় ফলের বাগান প্রতিষ্ঠার সাথে আবশ্যকীয়ভাবে গড়ে তুলতে হবে আরও অনেক ফলভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান।

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
*উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
মধুবৃক্ষ খেজুর গাছ

খেজুর পরিবেশবান্ধব, স্থানসাশ্রয়ী একটি বৃক্ষ প্রজাতি। এ প্রজাতি দুর্যোগ প্রতিরোধী বিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে।  খেজুর রস ও গুড় বিক্রি করে খামারির আর্থিক লাভ ও স্বাবলম্বী হওয়ার দৃষ্টান্ত বেশ সুপ্রাচীন। গ্রামীণ অর্থনীতি এবং  মৌসুমি কর্মসংস্থানে খেজুর গাছের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে বাংলাদেশের সর্বত্রই খেজুর রস, খেজুর গুড় দারিদ্র্য বিমোচনসহ বাঙালি সাংস্কৃতিতে রসঘন আমেজ লক্ষ করা যায়।
১. বৃক্ষ পরিবেশ প্রকৃতি : বাংলাদেশের মাটি ও কোমল প্রকৃতি খেজুর গাছ বেড়ে ওঠার জন্য বেশ উপযোগী।  রাস্তা, বাঁধ, পুকুর পাড়, খেতের আইল এবং আবাদি জমিতে এ বৃক্ষ বেশ ভালো জন্মে। তবে নদীর তীর, আংশিক লবণাক্ত এলাকা, বরেন্দ্র এলাকাসহ চরাঞ্চলেও জন্মে। বাংলাদেশের সব জেলা বিশেষ করে বৃহত্তর যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও নাটোর অঞ্চলে খেজুর গাছ বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ করা হয়। যশোর ও ফরিদপুর দেশের সর্বাধিক খেজুর রস ও খেজুর গুড় উৎপন্ন অঞ্চল।
২. বৈজ্ঞানিক পরিচয় ও বিস্তৃৃতি : খেজুর বৃক্ষ একবীজপত্রী আবৃতবীজী উদ্ভিদ। ইংরেজি নাম
Wild Date Palm, Silver Date Palm, Indian Wild Palm আঞ্চলিক নাম খাজুর, খেজুর ও খাইজুর। উদ্ভিদ তাত্ত্বিক পরিচয়Phoenix sylvestris (Roxb.) এবং অ্যারাসি (Arecaceae) বা তালগোত্রের সদস্য। এ পরিবারের একটি গণ phoenix । এই গণের অন্য কয়েকটি চেনা গাছ খুদি খেজুর (Phoenix acaulis) ও হেতাল (Phoenix paludosa) ।
৩. খেজুর বৃক্ষস্বরূপ : শাখা-প্রশাখাবিহীন একক কা-যুক্ত ব্যতিক্রমধর্মী খেজুর গাছ। কাণ্ডটি সরল ও গোলাকার। একটি কাণ্ডই একাকি বেড়ে ওঠে এমন দৃশ্য বৃক্ষের ক্ষেত্রে খুব কম দেখা যায়। গাছের ট্রাংক বেশ মজবুত ও গোলগাল। কা-ের শীর্ষভাগ যা সদা পত্র শোভিত লাবনি মাথি বেশ দৃষ্টিনন্দন। রস আহরণের জন্য খেজুর গাছ বছরে ন্যূনতম একবার কাটা হয় এবং গোলগাল রাখা প্রয়োজন হয়। শীত ঋতুতে উদ্ভিদ জগতে এ নেমে আসে এক প্রাণহীন রসহীন বিবর্ণতার ছায়া তখন খেজুর গাছ রসের বারতা নিয়ে আসে। ফাগুনে প্রকৃতিতে খেজুর ফুল ফোটে। প্রকৃতির দান এর ফুল বিন্যাস যা মানুষকে আকৃষ্ট করে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা শীতঋতুতে খেজুুরমাথিতে মুচি (পুষ্পমঞ্জরি) আসে। খেজুর ফুল ভিন্নবাসী, পুষ্পমঞ্জরি দেখে পুরুষ ও স্ত্রী গাছ চিহ্নিত করা যায়। শুধু স্ত্রী গাছে ফুল ও ফল ধরে পুং গাছে নয়। পুং পুষ্পমঞ্জরি খাটো, স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরি লম্বা ও ফুলের বর্ণ সাদা। খেজুর ফুল শক্ত মোচা থেকে বের হয়।  মোচা থেকে ফুল ফোটা এক অপার মহিমা, মনে হয় কোথা থেকে কোন ফুলপরি কণ্টাকীর্ণ গাছের মাথিতে মন্ত্র দিয়ে ফুল ফুটিয়েছে। খেজুরের মুচিতে এক ধরনের সাদা উপাদান, যা পরাগরেণুর সুবাস।  
৪. বহু গুণে গুণী খেজুর বৃক্ষ : খেজুরের বহুল ব্যবহার নিয়ে বর্ণনার শেষ নেই। রস দিয়ে নানা রকম পিঠা, পায়েস, গুড়, কুটির শিল্প, আয় ও কর্মসংস্থান হয়। সার্বিক বিবেচনায় খেজুর সমধিক গুরুত্ববহ একটি প্রজাতি।
খেজুর ফলের পুষ্টি উপাদান :  এই উদ্ভিদ মানবদেহের জন্য উপকারী বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান সমৃদ্ধ। খেজুর ফল ফাইবার ও ভিটামিন সমৃদ্ধ। খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনা  খেজুর ফলের মধ্যে ১৮.০ গ্রাম জলীয় অংশ, মোট খনিজ পদার্থ ১.৭ গ্রাম, ৩.৯ গ্রাম আঁশ, ৩২৪ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ২.২ গ্রাম আমিষ, ০.৬ গ্রাম চর্বি, ৭৭.৫ গ্রাম শর্করা, ৬৩ মি. গ্রাম ক্যালসিয়াম, ৭.৩ মিলিগ্রাম লৌহ, ০.১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ এবং অল্প পরিমাণ ভিটামিন সি বিদ্যমান থাকে। প্রচলিত খাদ্য হিসেবে খেজুর রস বেশ সস্তা, পুষ্টিকর এবং উপাদেয়। খেজুর রসে অ্যাসপারটিক এসিড, নাইট্রিক এসিড এবং থায়ামিন বিদ্যমান।
খেজুর রস : শীত ঋতু এলেই গ্রামীণ সংস্কৃতিতে খেজুর রসের কথা মনে পড়ে। ফোঁটা ফোঁটা সঞ্চিত রস নির্গত হবে চোং দিয়ে। হাঁড়িতে জমে রসের ফোঁটা। এভাবে একটি গাছ দৈনিক গড়ে ৫-৬ লিটার রস দিয়ে থাক। কথিত আছে ‘খালি কলসি রেখে দিলে ভরে যায় রসে, সেই রসে দিয়ে জ্বাল মন ভরে সুবাসে’। আবার গাভীর সাথে তুলনায় বলা হয় ‘মাইট্যা গোয়াল কাঠের গাই-বাছুর ছাড়া দুধ পাই’। কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস, মন মাতানো ঘ্রাণ শহরে বিরল। শীতের সাকালে খেজুর রস, মিষ্টি রোদ, কৃষক-কৃষাণির হাসি দারুণ প্রাণশক্তি। কবির ভাষায়, ‘এমন শীতলমিষ্টি কোথা আছে নীর? পান মাত্র তৃষিতের জুড়ায় শরীর’। তাই এ গাছকে অনেকে শখের বসে ‘মধুবৃক্ষ’ বলে থাকে।
খেজুর রসের পায়েশ :  খেজুর রস দিয়ে  তৈরি নানা রকমের পায়েশ, ক্ষির খেতে খুবই মজা। খেজুরের রস ও পিঠার সাস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। রস দিয়ে হরেক রকম পিঠার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। খেজুর পিঠা ও রসের নানা রেসিপি শিরনি-পায়েস, ঘনরসে চিতৈ পিঠা, খেজুর গুড়-নারকেল মিশ্রণে বেশ সুখ্যাতি রয়েছে।
খেজুর রস থেকে গুড় : খেজুরের গুড় তৈরি করতে হলে এক ধরনের বিশেষ জ্ঞান থাকা চাই। খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরি করা একটি শিল্প।  রসের সাথে জ্বাল দেয়ার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। খেজুরের ঝোলা গুড়, পাটালি গুড়, নলেন গুড়,  ভেলি গুড়, বালুয়া গুড়, মিছরি গুড়, বেশ সুস্বাদু ও সুপরিচিত। গাছে নলি দেয়ার প্রথম দিকের রস থেকে তৈরি গুড়কে নলেন গুড় বলে। পাটালি গুড়ের কদর এখনও বিদ্যমান। গুড় বিক্রির অর্থনৈতিক উপযোগিতা রয়েছে। পরিকল্পিত উপায়ে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে খেজুর গুড় রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পাটালি গুড় ও কোচড় ভরা মুড়ি প্রচলিত ও পরিচিত দৃশ্য, খেতে ভারি মজা। দুপুরে খেজুরের ভিড় গুড় আজকালের প্রজন্মের কাছে অচেনা এ মধুর স্মৃতি। খেজুরের গুড়ের চিনি সুমিষ্ট ও সুস্বাদু। খেজুরের গুড় থেকে তৈরি বাদামি-চিনির স্বাদ ও ঘ্রাণ বেশ স¦াতন্ত্র্যম-িত।
খেজুর বৃক্ষ ও কুটির শিল্প : কুটির শিল্পে খেজুরের পাতার ব্যাপক ব্যবহার ও কদর রয়েছে। খেজুর পাতা দ্বারা তৈরি করা রকমারি হাত পাখা, লছমি, ঝাড়–, ঝুড়ি, থলে, ছিকা ও নানা রকম খেলনা এখনও অতি সমাদৃত। খেজুর পাতার পাটির কদর ঘরে ঘরে। খেজুর পাতা দিয়ে নকশি পিঠা করা হয়। কুমোড়দের শীত মৌসুমে খেজুরের রস ধারণ করার হাঁড়ি তৈরির হিড়িক বাড়ায়।
খেজুর বৃক্ষ ও ভেষজ গুণাগুণ : সর্দি-কাশি নিরাময়ে খেজুর ফল উপাদেয়। খেজুরের পাতা রোগ নিরাময়ে ব্যবহার হয়ে থাকে। হৃদরোগ, জ্বর ও উদরের সমস্যা সমাধানে বেশ কার্যকর। গাছের শিকড় দাঁত ও মাড়ির প্রদাহ নিবারণে ব্যবহৃত হয়। রস মুখে রুচি আনে।
খেজুর বৃক্ষ ও জ্বালানি কাঠ :  খেজুর গাছ গ্রামীণ পরিবারের জ্বালানি দেয়। গৃহের নানা কাজে যেমন তক্তা, আড়া, খুঁটি তৈরি ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয়। খেজুর কাঠ আঁশযুক্ত বলে এর দাহ্য ক্ষমতা অনেক বেশি। তাই গ্রামগঞ্জে খেজুর লাকড়ির সমাদর রয়েছে।
খেজুর বৃক্ষ ও উপজাতি সম্প্রদায় : খেজুর রস বাংলাদেশের উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রিয় পানীয়, বাড়তি শক্তির জোগান দেয়। শীতকাল তাদের কাছে বেশ স্মৃতিঘন। নতুন চাল আর গাঁজনকৃত খেজুর রস বিশেষ এক ধরনের আনন্দের আয়োজন, মানসিক তৃপ্তি। খেজুর গাছ খরা সহ্য করে বিধায় বরেন্দ্র অঞ্চলে খেজুর গাছের চাষ প্রচলন বেশ লক্ষণীয়।  
খেজুর বৃক্ষ ও গাছি সম্প্রদায় : ঠিলে ধুয়ে দে বউ গাছ কাটিতে যাবো, এই হলো খেজুর বৃক্ষকে কেন্দ্র করে তৈরি গাছি সম্প্রদায়ের বুলি। তাদের শিউলিও বলা হয়। এরা গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য। তাই শীতকালে গাছিদের কদর বেড়ে যায়, তারা দিনভর মহাব্যস্ত থাকেন। গাছিরা খেজুর গাছ তোলা-চাছার জন্য দা, চোং বা নলি, কাঠি, দড়ি, ভাঁড় ইত্যাদি  জোগাড় করার জন্য ব্যস্ত থাকেন। শীতকালে গাছিদের কর্মসংস্থান হয়। একজন গাছি দৈনিক ৫০টি গাছ কাটতে পারেন।  
খেজুর রস ও সামাজিক সম্পর্ক : এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে বেড়াতে গেলেও সাথে রস বা গুড় নিয়ে যেতে দেখা যায়। খেজুরের মুচিতে এক ধরনের সাদা পাউডার জাতীয় পদার্থ থাকে, যা মুখে মাখে, শিশুরা নানা খেলায় মেতে ওঠে।
৫. খেজুর কবিতা ও প্রবচনের ফল : বৃক্ষ প্রেমিক জীবনানন্দের ভাষায় সহসাই মূর্ত হয়েছে, বসেছে বালিকা খর্জ্জুরছায়ে নীল দরিয়ার কূলে। বাংলার রূপ কবিতায় সফিনাজ নূরুন্নাহারের ভাষায় মায়ের হাতের রসের পিঠা, মধুর মতো খেজুর মিঠা। তাই মনে পড়ে মায়ের কথা, মনে পড়ে মামা বাড়ি বেড়ানোর স্মৃতিকথা। আবার খেজুর গাছ নিয়ে নানা ধরনের প্রবচন, কবিতা গাঁথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটি খেজুর গাছ পাইয়া, লোভে কাটে বাঙালে আগা থুইয়া গোড়া কাটে রস নাহি মিলে। ও তার আগডালেতে থাকে রস রসিক বিনে কে জানে। নিত্যনতুন বেরোয় রস খেলে তা ফুরায় না, প্রেমের গাছের রসের হাঁড়ি পাতল যে জনা। সাধারণ গিরস্থ চাষা জ্বাল দেতে না পায় দিশা, হাইলাদের পাইলে তারে করে মিঠাই ম-া খানা। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের কথামালা, অলি-গাঁও বলি-গাঁও জলী ধান চষে, করে গুড় পাটালি খাজুরের রসে। মামুয়ে পাড়ৈন চিরল পাতা মামীয়ে রান্ধেন ভাত, কান্দিও না গো সোনামামী মামু তোমার বাপ। খেজুর গাছ নিয়ে ঘুমপাড়ানি ছড়া, ছুট ছুট (ছোট) খাজুর গাছ, এই নিয়ে খেজুরার বার দ্যাশ  (দেশ), এই খাজুর পাকিব, খেজুরার মা কাটিব, ও রসুন খালা গো, খেজুরার মায়েক বুজাও (বোঝাও) গো না কাটে না যেন। রাজশাহী অঞ্চলের লোকজ কথা, আমি ভাই একলা খেজুর গাছের বাকলা। খেজুর গাছ নড়ে চড়ে তীর ধনুকে বাড়ি পড়ে।
লোকজ জ্ঞান ও অপ্রচলিত ব্যবহার : কাঁচা খেজুরের বীজ পানের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্রামে নারীরা অপরিপক্ব খেজুর বিচি পানের সাথে সুপারির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে।  খেজুরের আঁটি দিয়ে শৈশবের গর্তখেলার কথা আজও মনে পড়ে। খেজুরতলায় ঝরে পড়া পাকা খেজুর কুড়াতে গিয়েছি শৈশবে কত গদ গদ। খেজুর কাঁটা বন্যপ্রাণীর হাত থেকে ফসল রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। নতুন বেয়াইর সাথে খেজুর কাঁটার ব্যবহার সম্পর্কিত ছড়া বেশ মজার হাসি তামাশার খোরাক দিত। বেয়াইরে বসতে দেবো কি? খেজুর কাঁটার মরা বুনাইছি, বেয়াইর বসতে লজ্জা কি? অমন মরায় বেয়াই বসেনি? খেজুরের মাথি খাওয়া একটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, নরম ও কোমল সুমিষ্ট খেজুর মাথি পুষ্টিজ্ঞান।
খেজুর ও সেরা স্থান : খেজুর গাছকে কেন্দ্র করে অনেক নান্দনিক নাম শহর-বন্দরে প্রচলিত যেমন খেজুরতলা, খেজুরবাগান, খেজুুরবাড়িয়া, শিবচরের খাজুর গ্রাম। ঢাকার খেজুরবাগান একটি প্রতিষ্ঠিত নাম।
খেজুর ও পাখির খাদ্যাবাস : শীতের সময় খেজুর গাছে পাখির কিচিরমিচির শব্দে প্রকৃতি প্রাণ পায়। খেজুর গাছ পাখির প্রিয় আবাস। পাখিরা এখানে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে ও নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করে। খেজুর গাছে বাবুই ও চড়–ই বাসা বানায়, বাচ্চা তুলে।  কাঠঠোকরা, ঘুঘু ও চড়–ই খেজুর গাছে গাছে ঘুরে বেড়ায়, সাদা গলা মুনিয়া খেজুর গাছের মাথায় বাসা করে। শালিক, ঘুঘু, কাক, কোকিল, ময়না, মৌটুসি নরম ফল খায়।
খেজুর গাছ কৃষি বন ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি : সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এ গাছ রেললাইন ও বসতবাড়ির ফটকে বেশ দৃষ্টিনন্দন। বরেন্দ্র অঞ্চলে খেজুর গাছ বেশ লক্ষণীয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। গ্রাম বাংলার মেঠো পথের দুইপাশে তাকালে চোখে পড়বে সারি সারি খেজুর গাছ। রাস্তার দুই ধারে, আবাদি জমিতে, ক্ষেতের আইলে সারিবদ্ধভাবে খেজুর গাছ জন্মেœ যা কৃষি বন বলে পরিচিত। দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষি জমিতে বাণিজ্যিক খেজুর গাছ আবাদ একটি উত্তম পেশা বলে প্রমাণিত হয়েছে। মাদারীপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহীতে কৃষি জমিতে খেজুর গাছ সফলতার দ্বার উন্মুক্ত করছে। এ গাছের সাথে সখ্য রয়েছে এমন সবজি প্রজাতি গাছআলু, লাউ, ধুন্দুল, লালশাক, সরিষা, বেগুন ইত্যাদি। একটি খেজুর গাছ ১০-১৫ বছরে ফল দেয়। প্রাকৃতিক অথবা চারা বা বীজ বপনের মাধ্যমে খেজুর গাছ জন্মে। বীজ থেকে চারা উৎপন্ন হয় এবং ১০-১৫ দিনে বীজ অংকুরিত হয়। প্রতি কেজিতে ১৩০০-১৫০০টি বীজ পাওয়া যায়। রস আহরণের জন্য গাছ ব্যবস্থাপনা গোছ-গাছ রাখা প্রয়োজন হয়। তাই কথায় বলা হয় খেজুর বাড়ে কোপে। খেজুর গাছের পাতা ও মাথি মাঝে মধ্যে কেটে-ছেঁটে গাছের গোল-গাল গড়ন ও বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হয়। গাছ বছরে ন্যূনতম একবার কাটা হয়, শোভিত ও বেশ দৃষ্টিনন্দন রূপ দেয়া হয়।
৬.  উৎপাদন, বাজার ও কর্মসংস্থান : প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের বাংলাদেশে ১২০০৬ হেক্টর জমিতে মোট ৮১৫৮৩ মে. টন খেজুর উৎপাদিত হয়েছে। খেজুর উৎপাদনের শীর্ষ জেলাগুলো হলোÑ যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী ও নাটোর। প্রচলিত খাদ্য হিসেবে খেজুর রস বেশ সস্তা ও পুষ্টিকর। একটি গাছ দৈনিক গড়ে ৫-৬ লিটার রস দেয়। একটি গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে গড়ে ২৫-৩০ কেজি গুড় তৈরি হয়। প্রতি কেজি গুড়ের মূল্য ৫০-৬০ টাকা। ২০০  খেজুর গাছ আছে এমন পরিবার পুরো বছরের সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী একবিঘা জমিতে প্রায় ১ থেকে ১৫০ গাছ রোপণ করা সম্ভব। ১টি প্রতিবেদনে দেখা যায় বাঘা উপজেলায় চাষিরা প্রতি বছর ৮-১০ কোটি টাকা আয় করেন খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে। খেজুর ফল বিক্রি করেও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়।
খেজুর গুড়ের বাজার : শীত মৌসুমে গুড় তৈরি বেশ বড় পেশা। সারা দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গুড় ব্যবসায়ী গুড় বিপণন ও পরিবহনের সাথে যুক্ত থাকে। এ সময় গুড় বিপণন নিয়ে রব-রব পরিস্থিতি তৈরি হয়। গ্রামীণ হাটবাজারে প্রান্তিক মানুষ নগদ কিছু অর্থ কামিয়ে নেয়। বাংলাদেশে যশোর ও ফরিদপুর অঞ্চলে সর্বাধিক খেজুর রস ও গুড় উৎপন্ন হয়। বৃহত্তর যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চল গুড় ও পাটালি করা হয়। বেনাপোল-শার্শা খেজুর গুড়ের জন্য বিখ্যাত। মাদারীপুরেও বৃহৎ বাজার বসে। কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার গাড়াবাড়িয়া গ্রামে বেশ রস উৎপন্ন হয়।
আরবের খেজুর : আরবের প্রধান ফল খেজুর। এ বৃক্ষ মহিমা নিয়ে সূরা আন্’আ-ম্, আয়াত-৯৯-১০০ নাজিল হয়েছে। যার অর্থÑ ‘এবং তিনি খেজুরের মোচা হতে ফলের থোকা থোকা বানাইয়াছেন, যাহা বোঝার ভরে নুইয়া পড়ে। এই গাছগুলো যখন ফলধারণ করে তখন উহাদের ফল বাহির হওয়া ও উহার পাকিয়া যাওয়ার আবস্থাটা একটু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাইয়া দেখিও। এই সব জিনিসের সুস্পষ্ট নিদর্শন সমূহ নিহীত রহিয়াছে তাহাদের জন্য যাহারা ঈমান আনে’। তাই আরবি খেজুরের প্রতি আমাদের দুর্বলতা প্রবল।
তবে আমাদের দেশের খেজুর এবং আরবের খেজুর ফলের মধ্যে বেশ তারতম্য রয়েছে। আমাদের খেজুর গাছ রস উৎপাদননির্ভর আর সৌদি আরবের খেজুর ফল উৎপাদননির্ভর। তাই আমাদের দেশে আরবি খেজুর তথা বেহেশতি ফল চাষের কথা বলা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে  মোতালেব মিয়ার সৌদি খেজুর চাষের সাফল্যের কথা বলা যায়। তিনি সৌদি খেজুর চাষে একটা অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেছেন কঠিন সাধনা ও পরিশ্রমের বিনিময়ে। দেশবাসীর জন্য মোতালেব মিয়া তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন।
৭. খেজুুর ও হারানো সংস্কৃতি : কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘ মাস রসের মাস। রস আহরণে গাছ তৈরি করার ধুম পড়ে এসময়। গাছিদের গ্রামীণ জনপদে এখন কম দেখা যায়, পেশা ছাড়ছেন অনেক গাছি সম্প্রদায়। খেজুর রস বিক্রির চিত্র এখন আর দেখা যায় না। গাছিদের স্বার্থ ও আগ্রহ ধরে রাখা দরকার। এই উদ্ভিদের উৎকর্ষ সাধন এবং সংরক্ষণের জন্য নানা ধরনের  মৌলিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

 

উপসংহার :  বৈরী জলবায়ু ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে এসব প্রজাতির ওপর প্রভাব পড়ছে। ভাটির দেশে এ উদ্ভিদ প্রজাতি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।  তবে এই উদ্ভিদ অত্যধিক লবণ পরিবেশে ও দীর্ঘ খরা পরিবেশে আশানুরূপ রস দিতে পারে না। নদীর পাড়, রাস্তার প্রান্তে প্রজাতি দেখা যায় না। বসতবাড়িতে খেজুর গাছের আধিক্য ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছ ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে আশার কথা, বন বিভাগ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খেজুর গাছ রোপণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে, এই উদ্ভিদের উৎকর্ষ সাধন এবং সংরক্ষণের জন্য নানা ধরনের মৌলিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বেশি রস দেয় এ রকম প্রজাতি শনাক্তকরণ ও তা কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা দরকার। বারি জার্মপ্লাজম সেন্টার এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। নার্সারিতে  খেজুর চারা উৎপাদন অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে করি। দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠিত নার্সারিতে খেজুর চারা উৎপাদন করে চাষ বৃদ্ধি করা যায়। বাঁধ, গ্রামীণ বন, পাকা সড়ক, রেললাইনের ধারে, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালতের ধারে খেজুর চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। নান্দনিক গাছের সমন্বয়ে ব্যাণিজ্যিকভিত্তিক উদ্ভিদ উদ্যান তৈরি হতে পারে, যা মানুষকে আকর্ষণ করবে। পরিকল্পিত উপায়ে পতিত ও প্রান্তিক জমিতে গাছ রোপণ করলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে গুড় রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

ড. এস এম আতিকুল্লাহ*
*এগ্রিকালচার স্পেশালিস্ট, জাতীয় ভূমি জোনিং প্রকল্প, ৩/১ এ নীলক্ষেত, বাবুপুরা, ঢাকা-১২০৫, মোবাইল : ০১৭১২৮৮৯৯২৭

 

বিস্তারিত
বর্তমান সরকারের কৃষিতে সাত বছরের সাফল্য

বাংলাদেশে আধুনিক কৃষি সম্প্রসারণ ব্যাপ্তি অর্ধ শতাব্দীর মতো হলেও এর পেছনে শতাধিক বর্ষের ঘটনাবহুল ইতিবৃত্ত রয়েছে। ১৮৬২-৬৫ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার জন্য দুর্ভিক্ষ কমিশন প্রথম কৃষি বিভাগ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে যার ফলশ্রুতিতে ১৮৭০ সালে রাজস্ব বিভাগের অংশ হিসেবে কৃষি বিভাগের জন্ম হয়। পরে ১৯০৬ সালে স্বতন্ত্র কৃষি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। একই সময়ে ঢাকায় মনিপুর (বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায়) কৃষি খামারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯০৯ সালে খামারের কৃষি গবেষণার জন্য একটা ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়। ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কৃষি ও শিল্প উন্নয়ন (ভিএআইডি) প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের সম্প্রসারণ শিক্ষা ও উন্নয়ন কর্মকা- শুরু হয়, পরে ১৯৫৬ সালে উদ্ভিদ সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ১৯৬১ সালে বিএডিসি, ১৯৬২ সালে এআইএস, ১৯৭০ সালে ডিএইএম এবং ডিএআরই সৃষ্টি হলেও কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে তেমন কোনো পরিকল্পিত সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ সালে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকা-কে জোরদার করার লক্ষ্যে তুলা উন্নয়ন বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড, হর্টিকালচার বোর্ড এবং ১৯৭৫ সালে কৃষি পরিদপ্তর (পাট উৎপাদন), কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা) নামে ফসলভিত্তিক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানসমূহ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু একই কৃষকের জন্য বিভিন্নমুখী/রকম সম্প্রসারণ বার্তা ও কর্মকা- মাঠপর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলশ্রুতিতে ১৯৮২ সালে ফসল প্রযুক্তি সম্প্রসারণে নিয়োজিত ছয়টি সংস্থা যথা ডিএ (ইএন্ডএম), ডিএ (জেপি), উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং সার্ডি একত্রভূত করে বর্তমান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সৃষ্টি করা হয়। কৃষি বিভাগ ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রবর্তিত প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শন (টিএন্ডভি) পদ্ধতির মাধ্যমে এবং ১৯৯০ সালের পর হতে অদ্যাবধি দলীয় সম্প্রসারণ পদ্ধতির মাধ্যমে দেশের কৃষি ও কৃষককে অত্যন্ত সফলতা ও সুনামের সাথে সেবা প্রদান করেছে। বর্তমানে ৮টি উইংয়ের সমন্বয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভাগীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভিশন
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও টেকসই উৎপাদনক্ষম উত্তম কৃষি কার্যক্রম প্রবর্তন যাতে প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষাসহ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মিশন
দক্ষ, ফলপ্রসূ, বিকেন্দ্রীকৃত, এলাকানির্ভর, চাহিদাভিত্তিক এবং সমন্বিত কৃষি সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের মাধ্যমে সব শ্রেণীর কৃষকদের প্রযুক্তি জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ, যাতে টেকসই ও লাভজনক ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণসহ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন সাধিত হয়।
খাদ্যশস্য উৎপাদনের বর্তমান চিত্র বর্তমান সরকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। ফলে ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০, ২০১০-১১, ২০১১-১২, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ সালে মোট খাদ্যশস্য (চাল, গম, ভুট্টা) উৎপাদন হয়েছিল যথাক্রমে ৩২৮.৯৫, ৩৪২.৪৬, ৩৬০.৬৫, ৩৬৮.৩৯, ৩৭২.৬৬, ৩৮১.৭৪ এবং ৩৮৪.১৯ লক্ষ মে. টন। এতে পরিলক্ষিত হয় যে, খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রতি বছরেই ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তা ছাড়া ২০০৮-০৯ সালের তুলনায় ২০১৪-১৫ সালে আলু ও সবজির উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে যেখানে আলু ও সবজি উৎপাদন হয়েছিল যথাক্রমে ৬৭.৪৬ ও ১০৬.২২ লক্ষ মে. টন। সেখানে ২০১৪-১৫ সালে আলু ও সবজি উৎপাদন হয় যথাক্রমে ৯৩.২৮ ও ১৪২.৩৭ লক্ষ মে. টন।
আউশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা
আউশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০-১১ আউশ মৌসুমে ৫১টি জেলার ৫,৩৭,৪৭৭ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে ১ বিঘা করে আউশ ধান আবাদের জন্য বিনামূল্যে রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়েছে। খরিফ-১/২০১২ মৌসুমে ৩০টি জেলার ৫৬,২৫০ জন কৃষককে নেরিকা আউশ ও  উফশী আউশ ধান চাষের জন্য ৫৬টি জেলার ৩,০৮.৯৫৬ জন কৃষককে চাষাবাদে প্রত্যেককে ১ বিঘা জমি আবাদের জন্য  বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়েছে। খরিফ-১/২০১৩ মৌসুমে প্রণোদনা হিসেবে বোনা আউশ (নেরিকা) আবাদে ১৮টি জেলার ৭,০০০ জন ও  উফশী আউশ ধান চাষাবাদে ৪৭টি জেলার ৩,২৫,৫০০ জন কৃষককে ১ বিঘা করে  জমি আবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও  রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়। এ কর্মসূচিতে সেচ ও আগাছা দমনে কৃষি উপকরণ কার্ডের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তাও প্রদান করা হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৪টি জেলার ২,৩৪,৬০০ জন কৃষককে ১ বিঘা করে উফশী জাতের আউশ ধান ও ৩৭টি জেলার ১০ হাজার জন কৃষককে ১ বিঘা করে নেরিকা জাতের আউশ আবাদের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়। খরিফ-১/২০১৫-১৬ মৌসুমে উফশী আউশ ধান ও বোনা আউশ ধান (নেরিকা) চাষে প্রণোদনার লক্ষ্যে উফশী আউশ ধান চাষাবাদে ৪৮টি জেলার ১ লাখ ৮০ হাজার জন কৃষককে ১ বিঘা করে মোট ১ লাখ ৮০ হাজার বিঘা উফশী আউশ ধান ও বোনা আউশ (নেরিকা) আবাদে ৩৭টি জেলার ৩০ হাজার জন কৃষককে ১ বিঘা করে মোট ৩০,০০০ বিঘা বোনা আউশ (নেরিকা) ধান আবাদের জন্য সর্বমোট ২ লাখ ১০ হাজার জন কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়েছে। এ কর্মসূচিতে সেচ ও আগাছা দমনে কৃষি উপকরণ কার্ডের মাধ্যমে নগদ  অর্থ সহায়তাও প্রদান করা হয়।
কৃষি পুনর্বাসন ও প্রণোদনা
এ কর্মসূচির আওতায় ২০০৮-০৯ সনে ২৭৪৬.৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে এবং ২০০৯-১০ সালে ৩২১৫.০৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়। বন্যাপ্রবণ এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে বিএডিসি, ডিএই, ব্রি ও বারি ফার্মে ২০০৮-২০০৯, ২০০৯-১০ ও ২০১০-২০১১ সালে ১০০ একর নাবী রোপা আমন ধানের বীজতলা তৈরি করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে রোপা আমনের চারা বিতরণ করা হয়েছে। খরিফ-২/২০১২-১৩ মৌসুমে দেশের ৬টি জেলায় (জামালপুর, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ) অতিবৃষ্টি / উজান খেকে নেমে আসা প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ৭৮ হাজার ১১ জন কৃষককে বিনামূল্যে সরিষা/গম/ভুট্টা বীজ ও সার বিতরণ করা হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রবি মৌসুমে শিলাবৃষ্টি/ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাসহ নেরিকা চাষের সম্ভাবনাময় জেলার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উফশী ও রোপা আমন চাষে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ৯৯৯.৭৬ লক্ষ টাকার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে উজানের ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাসমূহের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের গম, সরিষা, ভুট্টা ও বোরো ফসল উৎপাদনে সহায়তার জন্য ৮৪৮.৮৯২১৮ লাখ টাকার বীজ ও রাসায়নিক সার এবং দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহে  গম, ভূট্টা, ফেলন ও বারি খেসারি উৎপাদন বৃদ্ধির  লক্ষ্যে  ১৫৪৮.৯০ লাখ  টাকার বীজ ও সার বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত জেলাসমূহের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষি পুনর্বাসন এবং ফসলের উন্নত ও নতুন জাত সম্প্রসারণে প্রণোদনার (রবি/২০১৫-১৬ মৌসুমে)  জন্য মোট ৩ লাখ ১০ হাজার ৯১৯ জন (পুনর্বাসনের জন্য ২,১২,৬৭৯ এবং প্রণোদনার জন্য ৯৮,২৪০)  ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে গম, সরিষা, আলু, খেসারি, ফেলন ও গ্রীষ্মকালীন মুগ চাষের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার  বিতরণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে।
ভুট্টা প্রণোদনা
গত ২০১১-১২ রবি মৌসুমে ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৬.৫০ কোটি  টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের ১১টি জেলায় ৫০ হাজার কৃষকদের প্রত্যেককে বিনামূল্যে ৩ কেজি ভুট্টা বীজ, ২৫ কেজি ডিএপি ও ২৫ কেজি এমওপি সার সরবরাহ করা হয়েছে ।
কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ ও কৃষকের ব্যাংক হিসাব
কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য কৃষক পরিবারকে ২ কোটি ৫ লাখ ৮২ হাজার ৮২৪টি কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষাণীদের ১২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৪৭ টি এবং কৃষকদেরকে ১ কোটি ৯৩ লাখ ২৪ হাজার ১৭৭টি কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান করা হয়। ফসল উৎপাদনে ঋণ, উপকরণ সহায়তা প্রাপ্তিতে কৃষকরা এই কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন ও দশ টাকার বিনিময়ে কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কার্যক্রম চালু রেখে কৃষকদের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
হাওরাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বোরো চাষিদের সহায়তা কর্মসূচি
বিগত ২০০৯-১০ অর্থবছরে হাওরাঞ্চলের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলায় আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩ লাখ ৮৫ হাজার কৃষককে  রবি/২০১০-১১ মৌসুমে উফশী বা আধুনিক জাতের বোরো ফসল চাষাবাদে সহায়তার জন্য বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়। এ কার্যক্রমে ৪৮৪৯.০৮ লাখ টাকার সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের কারণে সহায়তা
ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত দেশের  ৪টি জেলায় (পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা ও বরিশাল) খরিফ-২/২০১৪ মৌসুমে উফশী আমন চাষাবাদে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক প্রতি কৃষক পরিবারকে সর্বোচ্চ ১ বিঘা জমির বীজ বিনামূল্যে সরবরাহ করার জন্য সর্বমোট ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯২৫ বিঘা জমির জন্য (বিঘাপ্রতি ৫ কেজি বীজ) বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণের নিমিত্ত ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯২৫টি কৃষক পরিবারকে ২৪৯০.৮০৫ লাখ টাকা ২০১২-১৩ অর্থবছরে ব্যয় করা হয়েছে।
পাট ও পাট বীজ উৎপাদন
পাট মৌসুমে (২০১০-১১) পাট আঁশের মান উন্নয়ন ও চাষিদের সহায়তার লক্ষ্যে ২৯টি জেলায় ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ৬ শত পাটচাষিকে ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক হিসাব খুলে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জনপ্রতি ২০০ টাকা হারে সহায়তাসহ প্রতি ১০০ জনের জন্য ১টি করে সর্বমোট ১৫ হাজার ৩৯৬টি রিবনার সরবরাহ এবং কৃষকদের রিবন রেটিং পদ্ধতির ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।  
ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গৃহীত অন্যান্য পদক্ষেপসমূহ
সারের ক্রয়মূল্য চার দফায় কমানোর ফলে সুষম সার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের বাজারমূল্য কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১৬ টাকা, ২২ টাকা, ১৫ টাকা এবং ২৫ টাকা নির্ধারণ এবং কৃষক পর্যায়ে সার প্রাপ্তি সহজলভ্য করার লক্ষ্যে প্রতি ইউনিয়নে একজন করে সার ডিলার এবং নয়জন করে খুচরা সার বিক্রেতা নিয়োগ করা হয়েছে;
কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বর্তমানে ৩০% ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কৃষক পর্যায়ে উন্নয়ন সহায়তা দেয়া হচ্ছে;
উপযুক্ত সেচব্যবস্থা/কার্যক্রম গ্রহণে কৃষকদের উৎসাহিত করতে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ দ্বারা সেচ প্রদানে স্মার্ট কার্ড প্রচলন করা হয়েছে;
ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষকদের উৎসাহিত করাসহ খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু বিভিন্ন ফসলের আধুনিক জাতের আবাদ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে;
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন বা খাপ খাওয়ানোর নিমিত্ত আধুনিক লাগসই কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে;
অব্যবহৃত চর, উপকূলীয় ও পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন ফসলের (মাশরুম, সয়াবিন, সুগারবিট, চিউয়িং আখ, তরমুজ, ভুট্টা, মরিচ, পাট এবং ডাল, তৈল ও মসলা জাতীয় ফসল) আবাদ সম্প্রসারণ করে পতিত জমি নিবিড় চাষাবাদের আওতায় (এলাকা উপযোগী ফসল) এনে শস্যের নিবিড়তা বাড়ানো হচ্ছে;
ন্যূনতম পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ধান ও সবজির উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে;
দেশব্যাপী বহিরাগত পোকামাকড় ও রোগবালাই প্রতিরোধের জন্য উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যক্রম শক্তিশালীকরণে উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন ২০১১ বাস্তবায়ন করা হয়েছে;
প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিভিন্ন সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ (প্রদর্শনী, মাঠ দিবস, চাষি র‌্যালি, উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণ, প্রযুক্তি মেলা, কর্মশালা ইত্যাদি) এবং প্রতিটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে শতকরা ৩০ ভাগ কৃষাণীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে;
সারাদেশে ৭২৭টি কৃষক তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্র (ফিয়াক) স্থাপন করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)
সূত্র : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

বিস্তারিত
হলুদ : রোগ নিরাময়ে প্রয়োগ ও ব্যবহার

মসলাজাতীয় ফসলের তালিকায় শীর্ষ ব্যবহারযোগ্য ফসলের মধ্যে হলুদ অন্যতম। কাঁচা হলুদ থেকে শুরু করে গুঁড়া হলুদের ব্যবহার ব্যাপক। নিত্য খাবার ব্যঞ্জনের রঙ করার উদ্দেশ্যেই প্রধানত এর ব্যবহার হয়ে থাকে তা নয়। শারীরিক প্রয়োজনেও হলুদের ব্যবহার হয়ে থাকে। শুধুমাত্র হলুদ দিয়েই রোগ নিরাময়ে বহুমাত্রিক ব্যবহার সম্ভব।
নিম্নে সংক্ষেপে হলুদের রোগ নিরাময়ে প্রয়োগ ও ব্যবহার তুলে ধরা হলো-
মুখের রঙ উজ্জ্বল্যে : হলুদের এক নাম ‘হরিদ্রা’; আর এক নাম ‘বর্ণ বিধারণী’। মুখের লালিত্য বজায় রাখার জন্য মসুর ডাল ও কাঁচা হলুদ বেটে দুধের সর মিশিয়ে মুখে ও হাতে মাখতে হবে। ২ ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলুন এবং ১ মাস ধরে ব্যবহার করুন।
ব্রণ নিরাময়ে : সকালে খালি পেটে ২ টুকরো কাঁচা হলুদ ও ২টা নিমপাতা একসঙ্গে (আখের গুড়সহ) মিশিয়ে খেলে ব্রণ সেরে যায় আবার দেহের রঙও উজ্জ্বল হয়।
পেটের ক্রিমিতে : হলুদের এক নাম ক্রিমিনাশকারী। বয়সের তারতম্য অনুযায়ী ১৫-২০ ফোঁটা কাঁচা হলুদের রস ছেঁকে নিয়ে তাতে অল্প লবণ মিশিয়ে সকালে খালিপেটে ৭ দিন খেতে হবে।
প্রমেহ রোগে : প্রস্রাবের জ্বালার সঙ্গে পুঁজের মতো লালা নির্গত হলে, কাঁচা হলুদের রস ১ চা-চামচ একটু মধু বা চিনি মিশিয়ে ২-৩ সপ্তাহ খেতে হবে। এমনকি এর দ্বারা অন্যান্য প্রকার প্রমেহ রোগেরও উপশম হয়ে থাকে।
গায়ের রঙ উজ্জ্বল করতে : কাঁচা হলুদ, কমলালেবুর খোসা ও নিমপাতা একসঙ্গে পানি দিয়ে বেটে গায়ে মেখে এক ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেললে গায়ের রঙ উজ্জ্বল হয় এবং চর্ম রোগ প্রতিরোধ হবে। এটা সপ্তাহে অন্তত ৩-৪ দিন লাগাতে হবে।
শরীরের দাগ উঠাতে : গায়ে হাম বসন্ত বা চুলকানির দাগ থাকলে কাঁচা হলুদ ও নিমপাতা একত্রে বেটে কয়েক দিন লাগালে দাগ উঠে যাবে ও চামড়া ফর্সা হবে।
স্বর ভঙে : কোনো সাধারণ কারণে গলা বসে স্বর রুদ্ধ হয়ে গেলে ২ গ্রাম পরিমাণ হলুদ গুঁড়ার শরবত চিনি মিশিয়ে একটু গরম করে ১ ঘণ্টা পরপর ৪-৫ বার খেলে চমৎকার উপকার হয়।
ফোঁড়া পাকাতে ও শুকাতে : হলুদ আগুনে পুড়িয়ে পোড়া ছাই সামান্য পানিতে গুলে ফোঁড়ায় লেপে দিতে হবে। এতে ফোঁড়া পেকে গিয়ে ফেটে যাবে। এরপর গুঁড়া হলুদ সামান্য পানিতে গুলে প্রলেপ দিলে ফোঁড়া শুকিয়ে যাবে। অথবা সামান্য হলুদের সঙ্গে সামান্য চুন মিশিয়ে গরম করে চিমটি পরিমাণ ফোঁড়ার মাথায় লাগালে ফোঁড়া ফেটে রক্ত ও পুঁজ বের হয়ে ব্যথা কমে যায়।
মচকে গেলে : দেহের কোনো অংশ মচকে গেলে ১ ভাগ লবণ, ২ ভাগ চুন ও ৪ ভাগ হলুদ বাটা একত্রে ভালো করে মিশিয়ে গরম করে চোটের জায়গায় ২-৩ দিন লাগাতে হবে।
লিভার বা যকৃতের দোষে : ১ চামচ কাঁচা হলুদের রস (শিশুদের জন্য ৫-৬ ফোঁটা) সামান্য চিনি অথবা মধুসহ খেতে হবে অন্তত ১ মাস।
গলা ধরে গেলে : চিৎকার, বক্তব্য বা গান যে কোনো কারণে গলা বসে গেলে ১ গ্লাস গরম পানিতে মাত্র ২ গ্রাম হলুদের গুঁড়া ও ২ চা-চামচ চিনি মিশিয়ে শরবত করে কয়েক বার খেতে হবে।
তোতলামিতে : ছোটবেলায় যাদের কথা আটকে যায়, অথবা তাড়াতাড়ি কথা বলার জন্য তোতলামি দেখা দিলে কাঁচা হলুদ ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে ১ চামচ পরিমাণ নিয়ে ১ চামচ ঘিয়ে ভেজে সারা দিনে ২-৩ বার খেতে হবে।
অ্যালার্জি বা আমবাতে : খাদ্য বিশেষে অনেকের দেহে চাকা চাকা হয়ে ফুলে উঠে, চুলকায়, লাল বা গোলাপি রঙ ধারণ করেÑ যাকে বলা হয় আর্টিকোরিয়া বা আমবাত। এ ক্ষেত্রে নিমপাতার গুঁড়া ১ ভাগ, কাঁচা হলুদ শুকানো গুঁড়া ২ ভাগ এবং শুষ্ক আমলকী গুঁড়া ৩ ভাগ একসঙ্গে মিশিয়ে ১ গ্রাম মাত্রায় সকালে খালি পেটে ২ সপ্তাহ খেলে শিগগিরই অসুবিধাগুলো নিরাময় হবে।
চোখ উঠলে : হলুদ থেঁতো পানিতে অর্থাৎ হলুদ গুঁড়া করে পানিতে ভিজিয়ে ছেঁকে নিয়ে ওই রসে চোখ ধুতে হবে এবং ওই রসে ছোপানো ন্যাকড়ায় চোখ মুছতে থাকলে চোখের লালাও কেটে যাবে এবং চোখ তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে।
 হাঁপানিতে : হলুদ গুঁড়া ১ চামচ, আখের (ইক্ষু) গুড় ১ চামচ ও খাঁটি সরিষার তেল ১ চামচ একত্রে ভালোভাবে মিশিয়ে জিহ্বা দিয়ে মাঝে মাঝে চেটে খেলে উপশম হয়ে কিছুটা আরাম হয়।
জোঁক ধরলে : কখনো জোঁকে ধরলে জোঁকের মুখে হলুদ গুঁড়া দিলে সঙ্গে সঙ্গে জোঁক পড়ে যাবে এবং রক্ত বন্ধ হবে। উল্লেখ্য, জোঁক কোনো প্রাণীর গায়ে কামড় বসানোর সময় হায়াসিন নামক হরমোন প্রয়োগ করে যাতে রক্ত বন্ধ না হয়।
অতিরিক্ত পানি পিপাসায় : অনেকের অতিরিক্ত পানি পিপাসা হয়। এক্ষেত্রে ৫-৭ গ্রাম কাঁচা হলুদ থেঁতো করে পরিমাণ মতো পানিতে ৫-১০ মিনিট সেদ্ধ করে, ছেঁকে নিয়ে সে পানিতে অল্প চিনি মিশিয়ে ১ চামচ করে মাঝে মাঝে খেলে এ সমস্যা চলে যাবে।
ফাইলোরিয়া বা গোদ রোগে : মশাবাহিত পরজীবী দ্বারা এ রোগ ছড়ায়। এক্ষেত্রে কাঁচা হলুদের রস ১ চামচ ও সমপরিমাণ আখের (ইক্ষু) গুড় মিশিয়ে প্রায় ১৫ দিন খেলে উপকার হবে।
চুলকানি নিরাময়ে : কাঁচা হলুদ বাটা ও নিমপাতা বাটার সঙ্গে কয়েক ফোঁটা সরিষার তেল মিশিয়ে গোসলের পূর্বে শরীরে লাগিয়ে একটু অপেক্ষা করে ৩-৪ দিন গোসল করলে চুলকানি চলে যাবে।
আথ্রাইটিস বা অস্থিসন্ধির প্রদাহ সারাতে : কাঁচা হলুদে আছে কারকামিন নামক রাসায়নিক পদার্থ। এ উপাদানটি প্রদাহ নিরোধক ক্ষমতার অধিকারী। প্রতিদিন সকাল বেলা আখের গুড়ের সঙ্গে কাঁচা হলুদ খেতে থাকলে ওই প্রদাহ সারতে সহায়তা করে।
ক্যান্সার প্রতিরোধে : আধুনিক গবেষণায় জানা গেছে, কাঁচা হলুদের কারকামিন নামক উপাদানের ক্যান্সারনিরোধী ক্ষমতা আছে। কারকামিন টিউমারের কোষকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে বাধা প্রদান করে থাকে। প্রতিদিন অন্তত ২ বা এক টুকরা কাঁচা হলুদ খেলে উপকার পাবেন।
 পেটের গোলমালে : ১ টেবিল-চামচ হলুদ গুঁড়া; ১ চা-চামচ সরিষার তেল, একটি মাঝারি আকারের পেঁয়াজ ও প্রয়োজনমতো লবণ একত্রে ভাজি করতে হবে। গরম ভাতের সঙ্গে তৃপ্তি সহকারে খেতে হবে। প্রয়োজনে আরও একবার খেতে হবে। অন্য কোনো তরকারি খাওয়া চলবে না। এতেই পেটের গোলমাল চলে যাবে।
যকৃত ও হৃৎপি-কে রক্ষা করতে : গবেষণায় জানা গেছে, হলুদের রয়েছে রক্ত জমাটবিরোধী উপাদান, যা রক্তনালির ভেতরের রক্ত জমাট বাধাদান করে। তাই হলুদ ব্যবহারে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
কোলস্টেরল কমাতে : হলুদ রক্তের কোলস্টেরলের মাত্রা কমাতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। যাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি তারা অবশ্যই প্রত্যহ সকালে দুই টুকরো কাঁচা হলুদ খাবেন।
ব্যাকটেরিয়া বিস্তারে বাধা সৃষ্টি : ত্বকের কোনো রকম ঘা বা ক্ষতে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করলে সেখানে হলুদের প্রলেপ দিলে হলুদ ব্যাকটেরিয়ার চারদিকে শক্ত আবরণ সৃষ্টি করে, যা এদের বৃদ্ধি ও বংশবিস্তার করতে বাধা দান করে। হলুদের ব্যাকটেরিয়া নিরোধী গুণাবলির জন্য ক্ষতস্থান ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হতে রক্ষা পেয়ে থাকে।
খাদ্য পরিপাক ও অন্ত্রের পরজীবী বিনাশ করে : হলুদ পিত্তকে সহজেই পিত্তরস নিসরণে উদ্দীপ্ত করে। পিত্তরস নিঃসরণে সহায়তা করার মাধ্যমে হলুদ খাদ্য পরিপাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, হলুদ প্রোটোজোয়া নামক এককোষী পরজীবীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
বাইরের আক্রমণ থেকে পচনশীল বস্তুকে রক্ষা করে : মাছ, মাংস ও শুঁটকি জাতীয় বস্তুকে প্রক্রিয়াজাত করার পূর্ব সময়ে হলুদ ও লবণ মিশিয়ে নিলে টাটকা ও বিশুদ্ধ রাখা যায়। বিশেষ করে মাছ ও  গোশত শুঁটকি করার প্রাক্কালে হলুদ ও লবণ মিশিয়ে রোদে শুকাতে দিলে মাছি ডিম পাড়ে না।
সুতরাং হলুদ বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবহার ও খেলে অনেক উপকার পাওয়া যাবে।
সাবধানতা : লিভারে যাদের সমস্যা আছে বা লিভারের রোগ হওয়ার ঝুঁকি আছে তারা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হলুদ খাবেন। বেশি হলুদ গ্রহণ তাদের জন্য ক্ষতিকর। ল্যাক্টোস ইনটলারেন্ট হলে দুধের সঙ্গে হলুদ মিশিয়ে খাওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে দুধ বাদ দিয়ে মধু, সয়া দুধ অথবা শুধু হলুদ অল্প পরিমাণে খাওয়া যাবে। দুরারোগ্য কোনো লিভারের অসুখ হলে হলুদ যতটা পারা যায় এড়িয়ে চলতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ত্বকে সহ্য না হলে হলুদের ব্যবহার বাদ দিন। একাধারে দীর্ঘদিন কাঁচা হলুদ না খেয়ে মাঝে মধ্যে বিরতি দিতে হবে। পরিমাণমতো হলুদ খেতে হবে। অতিরিক্ত হলুদ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।

 

কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম*
*রীতা হোমিও হল, পালপাড়া (জামে মসজিদ সংলগ্ন), বাজিতপুর বাজার, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ

 

বিস্তারিত
ডলোচুনের ব্যবহার- অধিক ফলনের সমাহার

ফসল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো মাটি। খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ, বায়ু ও পানি সমন্বয়ে গঠিত হয় মাটি। মাটির উপরিভাগের প্রায় ১ মিটার পর্যন্ত ফসল উৎপাদনের জন্য উপযোগী। মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও তার সুষ্ঠু ব্যবহারও অনেকাংশে মানুষের ওপরই নির্ভরশীল। মাটি আমাদের অমূল্য সম্পদ। মাটির ফসল উৎপাদন ক্ষমতাকে উর্বরতা বলা হয়। ফসলের ভালো ফলন মাটির উর্বরতার ওপর নির্ভরশীল। তাই উর্বর মাটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ মাটিকে উৎপাদনশীল রাখতে হলে এর উর্বরতা বজায় রাখা ও উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের বেশ যতœবান হতে হবে। মাটির অম্লমান বা পিএইচ দ্বারা মাটির অম্লত্বের তীব্রতা নির্ধারণ করা হয়। মাটির অম্লমান সর্বাধিক ১৪ পর্যন্ত হতে পারে। মাটির অম্লমান ৭ এর নিচে হলে তা অম্লীয় মাটি এবং ৭ এর ওপরে হলে তা ক্ষারীয় মাটি। অম্লমান ৭ থেকে যত কমতে থাকবে মাটি তত বেশি অম্লীয় হবে। মাটির অম্লমান ৫.৫ বা এর কম হলে তা তীব্র অম্লীয় মাটি।

বাংলাদেশ একটি কৃষিভিত্তিক জনবহুল দেশ। প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি কমে যাচ্ছে কৃষি জমি। বাড়তি জনমানুষের মুখে দু বেলা দু মুঠো খাবার তুলে দেয়ার জন্য কৃষকরা একই জমিতে বছরে দুটি, তিনটি এমনকি চারটি ফসলও চাষ করছে। পক্ষান্তরে কৃষকরা সুষম মাত্রায় সার ও জৈবসার সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন না। ফলে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার ব্যবহারের মাধ্যমে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাটির অম্লত্ব বা এসিডিটি। এসিডিটিক মাটি বা অম্লযুক্ত মাটিতে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, মলিবডেনামের সহজলভ্যতা হ্রাস পায় তাছাড়া মাটিতে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও আয়রনের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পায়। ফলে ফসলের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, ফলন হ্রাস পায় ও গুণগতমান নষ্ট হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর ফসলি মাটি তীব্র এসিড বা অম্ল মাটি যার পিএইচ মান ৫.৫ এর নিচে। এসব মাটিকে এসিডযুক্ত অসুস্থ মাটি বলে। বৃহত্তর রংপুর, বৃহত্তর দিনাজপুর, বৃহত্তর সিলেট, বৃহত্তর চট্টগ্রাম, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় তীব্র এসিডযুক্ত মাটি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় গম গবেষণা কেন্দ্র, বারি, নশিপুর, দিনাজপুরের দীর্ঘ ১০ বছর গবেষণার পর তীব্র অম্লযুক্ত মাটিকে সংশোধন করার জন্য ডলোচুন ব্যবহারের মাত্রা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়। গবেষণা ফলাফল অনুযায়ী আমাদের দেশের তীব্র অম্লীয় মাটিতে সুপারিশকৃত মাত্রায় ডলোচুন ব্যবহার করা হলে বছরে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৬৫ লাখ টন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
ডলোচুন
ডলোচুন হলো এক ধরনের সাদা পাউডার জাতীয় দ্রব্য। আমরা ভিন্ন ভিন্ন নামে যেমন ডলোচুন, ডলোঅক্সিচুন বা ডলোমাইট পাউডার হিসেবে পেয়ে থাকি। সুপারিশকৃত মাত্রায় ডলোচুন ব্যবহার করলে তীব্র অম্লীয় মাটিকে সংশোধন করা যায়। ডলোচুনে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম থাকে, যা তীব্র অম্লীয় মাটির অম্লত্ব হ্রাস করতে সাহায্য করে।
ডলোচুনের সুপারিশকৃত মাত্রা
অধিক ফসলের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশকৃত মাত্রা খুবই জরুরি। অধিক অম্লীয় মাটিতে সুপারিশকৃত মাত্রা হলো শতকে ০৪ কেজি বা একরে ৪০০ কেজি বা হেক্টরে ১০০০ কেজি। কোনোভাবেই এর মাত্রা কম বেশি করা যাবে না। কোনো জমিতে একবার ডলোচুন প্রয়োগ করলে পরে তিন বছর আর ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয় না।
ডলোচুন ব্যবহারের নিয়ম
কোনো জমিতে ডলোচুন প্রয়োগের আগে সুপারিশকৃত মাত্রানুযায়ী মোট ডলোচুনকে সমান দুইভাগে ভাগ করে নিতে হবে। জমির মাটিতে জো থাকা অবস্থায় উত্তর-দক্ষিণ বরাবরে অর্ধেক পরিমাণ ডলোচুন ছিটিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক পরিমাণ ডলোচুন পূর্ব-পশ্চিম বরাবর বা আড়াআড়িভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। ডলোচুন প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অতঃপর কমপক্ষে ৭ দিন পর জমিতে প্রয়োজনীয় চাষ ও মই দিয়ে ফসল বুনতে বা গাছ রোপণ করতে হবে। ডলোচুন প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে বীজ বপন করলে বীজের অঙ্কুরোদগমের হার কমে যেতে পারে বা অঙ্কুরিত গাছের মূল ও কাণ্ডের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। জমি যদি শুকনা হয় বা রস কম থাকে তাহলে ডলোচুন ব্যবহারের নিয়ম হলো ফাঁকা জমিতে প্রয়োজন মতো ডলোচুন আড়াআড়িভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এরপর চাষ দিতে হবে। মই দিয়ে সমান করতে হবে। সঙ্গে  হালকা সেচ দিতে হবে। অতঃপর কমপক্ষে ৭ দিন পর জমিতে প্রয়োজনীয় চাষ ও মই দিয়ে ফসল বুনতে বা গাছ রোপণ করতে হবে।
ডলোচুন প্রয়োগের মৌসুম ও কোন কোন ফসলি জমিতে ব্যবহার করা যায়
সাধারণত বছরের যে কোনো সময়ে ডলোচুন প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে আমন ধান কাটার পরে ফাঁকা জমিতে বা রবি মৌসুমে ডলোচুন প্রয়োগের উত্তম সময়। ডলোচুন যেহেতু মাটির এসিডিটি বা অম্লতা সংশোধন করে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করে, ফসল উৎপাদন উপযোগী করে তোলে তাই সব ধরনের ফসল গম, ভুট্টা, আলু, সরিষা, পাট, ডালজাতীয় ফসল, তেলজাতীয় ফসল, মসলাজাতীয় ফসল এবং শাকসবজি জাতীয় ফসলের ফলন বৃদ্ধি ও গুণগতমানের ফসল পাওয়ার জন্য অম্লীয় বা গ্যাস্ট্রিকযুক্ত মাটিতে ডলোচুন ব্যবহার করা যেতে পারে।
ডলোচুন প্রয়োগের সুবিধাগুলো
ডলোচুন প্রয়োগ করা সহজ, খরচ কম কৃষকের হাতের নাগালে।
গম, ভুট্টা, আলু, সরিষা, ডাল, মসলা ও সবজি জাতীয় ফসলের ফলন শতকরা ১০-৫০% বৃদ্ধি পায়।
ডলোচুন একবার প্রয়োগ করলে পরে তিন বছর প্রয়োগ করতে হয় না।
ডলোচুন একবার প্রয়োগ করলে ম্যাগনেসিয়াম সারের প্রয়োজন হয় না।
ফসলের গুণগতমান বৃদ্ধি পায় যেমন আলুর স্কেব রোগ কম হয়, সবজি ফসলের রঙ উজ্জ্বল হয়, পাটের কালো পট্টি রোগ কম হয়।
ফসলের বৃদ্ধি সমান হয়।
২০ টাকার মাধ্যমে মাটির অম্লত্ব পরীক্ষা
বাংলাদেশের সব এলাকার মাটিই অম্লীয় নয়। তাই তীব্র এসিডিটিক বা অম্লীয় আক্রান্ত জমি বাছাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য কৃষক নিজে ইচ্ছা করলে তার জমি তীব্র অম্লযুক্ত কিনা তা মাত্র ২০ টাকায় পরীক্ষা করে নিতে পারে। সেজন্য কৃষকের মূল জমির এককোণায় ফিতা দ্বারা মেপে মাত্র এক শতক জমি চিহ্নিত করতে হবে। অতঃপর চিহ্নিত এক শতক জমিতে মাত্র ২০ টাকা দিয়ে কেনা চার কেজি ডলোচুন নিয়ম মোতাবেক ব্যবহার করতে হবে। তারপর ফসল চাষ করবে এবং অন্যান্য সব ব্যবস্থাপনা একই হবে। পরবর্তীতে ফসলের বৃদ্ধি এবং ফলনে যদি তারতম্য হয় তাহলে বুঝতে হবে জমিতে গ্যাস্ট্রিক রোগ আছে অর্থাৎ জমির মাটি অম্লীয়। পরীক্ষণটি করতে মাত্র ২০ টাকা দরকার হয় বলে এর নাম দেয়া হয় ২০ টাকার পরীক্ষা।
ডলোচুন ব্যবহারে সাবধানতা
ডলোচুন ব্যবহারে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।
সুপারিশকৃত মাত্রার অধিক পরিমাণ ডলোচুন প্রয়োগ করা যাবে না।
ডলোচুন প্রয়োগের সঙ্গে  সঙ্গে  চাষ ও মই দিয়ে মাটির সঙ্গে  মিশিয়ে দিতে হবে।
মাঠে ফসল আছে এমন অবস্থায় ডলোচুন প্রয়োগ করা যাবে না।
বেশি বাতাসের সময় ডলোচুন মাটিতে ছিটানো যাবে না।
জমির দাঁড়ানো পানিতে বা কাদা অবস্থায় ডলোচুন প্রয়োগ করা যাবে না।
ফসল উৎপাদনে হাজারো সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো মাটির তীব্র অম্লতা বা এসিডিটি বা গ্যাস্টিক সমস্যা। এ সমস্যা সংশোধনের জন্য সঠিকভাবে সুপারিশকৃত মাত্রা ও পদ্ধতিতে ডলোচুনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে, এখনই। তাই তো, সম্মিলিত কণ্ঠে মুখরিত হোক-  
‘পান খাইতে লাগে চুন, তরকারিতে লাগে নুন
অধিক ফলন পেতে হলে, প্রয়োগ কর ডলোচুন’।

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ*

*আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক অফিস, সিলেট

বিস্তারিত
গুড অ্যাকোয়াকালচার প্র্যাকটিস : নিরাপদ মৎস্য ও চিংড়ি উৎপাদন

গুড অ্যাকোয়াকালচার প্র্যাকটিস (জিএপি) বা উত্তম মৎস্য চাষ অনুশীলন নামে ব্যাপকভাবে প্রচলিত মৎস্য চাষের এ পদ্ধতি মূলত আহরণ ও আহরণোত্তর পর্যায়ে আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত নিয়মাবলি অনুসরণ করে নিরাপদ ও দূষণমুক্ত মাছ ও চিংড়ি উৎপাদন করা। তবে লক্ষণীয় যে, মাছ চাষের এ প্র্যাকটিস অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সহনীয় ও সামাজিকদিক থেকে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামগ্রিক বিবেচনায় খামার ব্যবস্থাপনা, পোনার মান, খাদ্য ও পানির গুণাগুণ, মাছ ও চিংড়ি আহরণ ও আহরণোত্তর পরিচর্যা, পরিবহন ইত্যাদি সব কিছুই থাকবে জিএপির অন্তর্ভুক্ত।
জিএপি উদ্দেশ্য-
এক. ভোক্তার জন্য মানসম্পন্ন নিরাপদ মাছ ও চিংড়ি উৎপাদন করা।
দুই. মানবদেহে রোগ সৃষ্টি করতে পারে এমন জীবাণু দ্বারা মাছ ও চিংড়ি যাতে সংক্রমিত হতে না পারে। সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
তিন. চিংড়ি চাষের শুরু থেকে আহরণ ও আহরণোত্তর পরিচর্যা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে চিংড়িচাষি এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না, যাতে উৎপাদিত চিংড়ি মানব স্বাস্থ্যের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে।
চার. ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক বা রাসায়নিক দ্রব্যাদি অথবা কীটনাশক দ্বারা চিংড়ি দূষিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকবে না।
নিরাপদ চিংড়ি-
নিরাপদ চিংড়ি বলতে বুঝায় খামারে উৎপাদিত চিংড়ি বা সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত এবং যাতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর  কোনো উপাদানের উপস্থিতি নেই, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিংড়ি চাষিকে এ মর্মে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, তার চাষ পদ্ধতিতে কোনো ক্রটি ছিল না এবং এতে পণ্য দূষণের কোনো উপাদানের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়নি।
 যেসব কারণে ঘের বা খামারে নিরাপদ চিংড়ির উৎপাদন বিঘ্নিত হতে পারে-
এক. ঘের বা খামারে রোগ জীবাণুর সংক্রমণ ঘটতে পারে, এমন কোনো উপাদান যেমন মানুষের মলমূত্র, গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ইত্যাদির ব্যবহার।
দুই. চিংড়ি চাষে নিষিদ্ধ রাসায়নিক দ্রব্যাদি, কীটনাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদি ব্যবহার।
তিন. ঘের বা খামারে রোগাক্রান্ত পিএল মজুদ।
চার. রাসায়নিক দ্রব্যাদি বা অনুমোদিত ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।
পাঁচ. ঘের বা খামারে ব্যবহৃত চিংড়ি খাদ্যে ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি।
ছয়. ঘের বা খামারে জীবাণুবাহী অবাঞ্ছিত প্রাণীর প্রবেশ, বিচরণ এবং পার্শ্ববর্তী স্থানে গবাদিপশু পালন।
সাত. চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করা ইত্যাদি।
 ঘের বা খামারে অনিরাপদ চিংড়ি উৎপাদনের ক্ষতিকর দিকগুলো-
এক. প্রায়ই লক্ষ করা যায়, অনেক চাষি অননুমোদিত ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্যাদি চিংড়ি চাষে অবাধে ব্যবহার করে, এসব রাসায়নিক ও ওষুধের অবশেষ চিংড়ির দেহে লেগে থাকে, যা ভোক্তার স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
দুই. প্রক্রিয়াজাত চিংড়ি পণ্যে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রধানত ঘের বা খামার থেকেই হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কারণে খাদ্য হিসেবে চিংড়ি সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হয়।
তিন. চিংড়ির দেহে লেগে থাকা অননুমোদিত অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
 ঘের বা খামারে গুণগত মানসম্পন্ন নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদনে চাষিদের করণীয়-
এক. চিংড়ি চাষিকে ঘের বা খামারে সুস্থসবল ও রোগমুক্ত পিএল মজুদ করতে হবে যার কোনো বিকল্প নেই।
দুই. খাদ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুণগতমান নিশ্চিত হয়ে ঘের বা খামারে নিয়মিত যথাযথ পরিমাণে খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে।
তিন. দূষণ ও সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য জলাশয়ে অবাঞ্ছিত প্রাণীর প্রবেশ শক্ত হাতে বন্ধ করতে হবে।
চার. পচা, বাসি, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নি¤œমানের খাদ্য ব্যবহার করা যাবে না।
পাঁচ. খাদ্য সংরক্ষণের স্থান জীবাণুমুক্ত, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং অবাধে আলো বাতাস চলাচল করতে পারে, এমন পরিবেশবান্ধব হতে হবে।
ছয়. ছুঁচো, ইঁদুর, বেজি, ভোঁদড় ইত্যাদি প্রাণী যাতে খাদ্যগুদামে ঢুকতে না পারে, তার সুব্যবস্থা গ্রহণ হবে একান্তই জরুরি।
সাত. চিংড়ি চাষ ও চিংড়ি খাদ্যে অননুমোদিত এবং লেবেলবিহীন অ্যান্টিবায়োটিক কোনো অবস্থায়ই ব্যবহার করা যাবে না।
আট. দূষণ এড়ানোর জন্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে চিংড়ি সংরক্ষণ ও পরিবহন করতে হবে।
নয়. ঘের বা খামারে  ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি নিয়মিত পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত রাখা অতীব অপরিহার্য একটি বিষয়।
 ঘের বা খামারে চাষিদের অনুসরণযোগ্য প্রধান প্রধান গুড প্র্যাকটিস
 ঘের বা খামারের অবস্থান সম্পর্কিত গুড প্র্যাকটিস-
এক. গৃহপালিত পশুর খামার ও পার্শ্ববর্তী বাড়িঘরের আবর্জনা ইত্যাদি হতে ঘের বা খামার কিছুটা দূরত্বে স্থাপন করতে হবে। যাতে জলাশয়ের পানি দূষিত হতে না পারে।
দুই. ঘের বা খামার নির্মাণের সম্ভাব্য স্থানে এর আগে কোনো প্রকার কীটনাশক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে কিনা কিংবা বর্তমানে কোনো জীবাণুর অস্তিত্ব রয়েছে কিনা, তা ও পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
চিংড়ি খামারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত গুড প্র্যাকটিস
এক. খামার প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং খামারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।
দুই. এক খামারের যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত না করে অন্য খামারে ব্যবহার করা যাবে না। একবার ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পুনরায় ব্যবহারের আগে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।
তিন. গৃহপালিত পশুপাখির গোবর, বিষ্ঠা সার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
চার. খামারে কর্মচারী ও জনসাধারণের অবাধ তথা যথেচ্ছ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
চিংড়ির খাদ্য সম্পর্কিত গুড প্র্যাকটিস-
এক. এই ক্ষেত্রে একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস হতে প্রাপ্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য ব্যবহার করতে হবে।
দুই. খাদ্যে ব্যবহৃত উপকরণের গুণগতমান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
তিন. পুরনো, মেয়াদোত্তীর্ণ নি¤œমানের খাবার ব্যবহার করা যাবে না।
চার. খাদ্যগুদামে জীবাণুবাহী তেলাপোকা, ইঁদুর, বেজি, পাখি ইত্যাদির প্রবেশ বন্ধ করতে হবে।
পাঁচ. কাঁচা খাবার সাসরি ব্যবহার করা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।
ছয়. চিংড়ির দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধির লক্ষ্যে খাদ্যে হরমোনজাতীয় কোনো উপাদান ব্যবহার করা সমীচীন নয়।
চিংড়ি চাষে ব্যবহৃত পানি সম্পর্কিত গুড প্র্যাকটিস-
এক. পার্শ্ববর্তী নদী, খাল-বিল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে ঘেরে বা খামারে পানি দূষণের সম্ভাবনা আছে কি না যাচাই করে দেখতে হবে।
দুই. ঘের বা খামারের পানিতে ক্ষতিকর জীবাণু, কীটনাশক ইত্যাদি আছে কি না নিশ্চিত হতে হবে।
তিন. নর্দমা ও কল-কারখানার দূষিত পানি যাতে ঘেরে বা খামারে প্রবেশ করতে না পারে, তার সুব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
চিংড়ি আহরণ সংক্রান্ত গুড প্র্যাকটিস-
এক. চিংড়ি আহরণের ২-৩ দিন পূর্ব থেকেই খাদ্য প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।
দুই. ভোরে কিংবা ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় চিংড়ি আহরণ করা উত্তম।
তিন. চিংড়ি সংরক্ষণে সুপেয় পানি দিয়ে তৈরি বরফ ব্যবহার করাই শ্রেয়।
চার. আহরিত চিংড়ি বরফ ঠাণ্ডা পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিবে, অতঃপর প্রতি কেজি চিংড়ি এক কেজি বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করে যথাশিগগির পরিবহনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পাঁচ. বরফ পরিবহনে ব্যবহৃত যাবতীয় যন্ত্রপাতি সর্বদা জীবাণু মুক্ত রাখতে হবে।
ওষুধ ব্যবহারে গুড প্র্যাকটিস-
এক. কেবল অনুমোদিত ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে ।
দুই. ওষুধ সংরক্ষণে যথাযথ সতর্কতামূলত ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা অতীব জরুরি।
তিন. সঠিক বিধি-নিষেধ মেনে ওষুধ ব্যবহার করাই সর্বোত্তম।
চার. ওষুধ ব্যবহারের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ করা একান্তই অপরিহার্য।
চিংড়ি চাষের সামাজিক ও পরিবেশগত গুড প্র্যাকটিস-
এক. ঘেরের জমির বৈধ মালিকানা থাকা অত্যাবশ্যক।
দুই. উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক জলাভূমি ধ্বংস করে ঘের তৈরি করা যাবে না।
তিন. পার্শ্ববর্তী জনগোষ্ঠীর জীবনজীবিকার ক্ষতি হয়, এমন স্থানে ঘের তৈরি করে চিংড়ি চাষ করা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
চার. ঘেরের কারণে যাতে মাটি ও আশপাশের জলাশয়ের লবণাক্ততা বৃদ্ধি না পায় সে দিকে লক্ষ্য রেখে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বস্তুত, নিরাপদ মাছ ও চিংড়ি উৎপাদনের বিষয়টি এখন আর শুধু আহরণোত্তর পরিচর্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর আগে আমাদের দেশে মাননিয়ন্ত্রণের জন্য মাছ ও চিংড়ি চাষ পর্যায় অপেক্ষা আহরণোত্তর পরিচর্যাকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হতো। সময়ের পথ পরিক্রমায় বিশ্বব্যাপী নিরাপদ খাদ্যের মানদণ্ডে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এরই প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশেও নিরাপদ খাদ্যের মানদ- হিসেবে ঘের ও খামারে উৎপাদন পর্যায়ে  সর্ব প্রকার দূষণ রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে ও ফলপ্রসূ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আর এজন্য নিরাপদ মাছ ও চিংড়ি উৎপাদন সুনিশ্চিত করতে গুড অ্যাকোয়াকালচার প্র্যাকটিস (উত্তম মৎস্য চাষ অনুশীলন) একান্তই অপরিহার্য, যার কোনো বিকল্প নেই।

দলিল উদ্দিন আহমদ*
*মনি ফার্মেসি ফতুল্লা রেলস্টেশন রোড, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মোবা : ০১৭২৪০৫০৪০৩

 

বিস্তারিত
দুর্যোগকালে পশুপাখির জন্য করণীয়

বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের মানুষ, পশুপাখি, উদ্ভিদ প্রতিনিয়তই প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে থাকে, খরা, শীত, সিডর, আইলা, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া, অতি বৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খাদ্যের অভাব, মারাত্মক সংক্রামক রোগ ইত্যাদি নানাবিধ দুর্যোগ উল্লেখযোগ্য।
বছরের বেশির ভাগ সময় আর্দ্র জলবায়ুর প্রভাবে জীব জগতের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। দেশীয় (
Indigenous) জাতের পশুপাখি এ আবহাওয়ায় কিছু মানানসই কিন্তু উন্নত জাতের (Exotic) মুরগি, শংকর জাতের গবাদিপশু এ আবহাওয়া সহজে সহ্য করতে পারে না। শীতকালে প্রচণ্ড শীতে গ্রামের অসংখ্য হাঁস-মুরগি মারা যায়, দেশে প্রতি বছর বন্যার ফলেও বহু পশুপাখি বিভিন্ন কারণে মারা যায়। প্রাকৃতিক বৈরী আচরণে এসব অবলা প্রাণী সবার আগে আক্রান্ত হয়ে থাকে এবং কৃষক ভাইয়েরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন।
বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকার দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে মানুষের জন্য বিভিন্ন প্রকার ব্যবস্থা নেয়া হলেও পশুপাখির জন্য যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। বিভিন্ন প্রকার দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য নিম্নে কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হলো-
দুর্যোগকালে গবাদিপশুর জন্য করণীয়
১. খরা-অতিরিক্ত তাপমাত্রার সময় করণীয়  
* এ সময় গবাদিপশুকে শেড বা গাছের নিচে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে।
* তাপমাত্রা কমানোর জন্য শেডের চালের ওপর সম্ভব হলে পানি স্প্রে করতে হবে। পানির পাত্রে বেশিক্ষণ ‘পানি জমিয়ে রাখা যাবে না, পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করতে হবে এবং পানির পাত্রের সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে হবে। ট্যাংক থেকে পানি সরবরাহ করা হলে ট্যাংকটিকে কোনো কিছু দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে ট্যাংকের পানি গরম হতে না পারে।
* ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সিলিং ফ্যান স্থাপন করতে হবে। গরমের সময় পশুর ঘনত্ব কমিয়ে দিতে হবে।
* গরমে পশুর খাদ্য গ্রহণ কমে যায় তাই খাদ্যে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ করতে হবে। অত্যাধিক গরমের সময় সন্ধ্যা, রাতে ও সকালে খাবার সরবরাহ করতে হবে।
* গরমে গবাদি পশু হিটস্ট্রোক, ধকল,
Mastitis, Anaplasmosis, Thaileriosis, Babesissis, H.S (গলাফুলা), মশা-মাছি দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে তাই এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।
২. অতিরিক্ত ঠাণ্ডাকালে করণীয়
* শেডে বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে অথবা চারিদিকে চট-প্লাস্টিকের পর্দা ঝুলিয়ে দিতে হবে, যাতে বাতাস না লাগে, টিনের শেডের ওপর চট-খড় বিছিয়ে দিতে হবে। শেডে অবশ্যই সিলিং থাকতে হবে।
* প্রচ- ঠা-ায় সময় গবাদিপশুর গায়ে চট দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। সম্ভব হলে শেডের ভেতরের তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য ১০০-২০০ ওয়াটের বাল্ব, বৈদ্যুতিক হিটার সংযোজন বা আগুন জ্বালিয়ে রাখা যেতে পারে।
* সুষম খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। কুসুম গরম পানি খাবার দিতে হবে।
* ঠাণ্ডার সময় গর্ভবতী গাভী ও বাছুরের প্রতি বিশেষ যতœ নিতে হবে।
* ঠাণ্ডায় গবাদিপশু সর্দি কাশি ও নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হতে পারে তাই সাবধানে রাখতে হবে।
৩. ঝড়-বৃষ্টি-বন্যার সময় করণীয়
* ঝড় বৃষ্টিতে গবাদিপশুকে ভিজানো যাবে না,
* বন্যার, ঝড়ের অথবা জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস পাওয়ামাত্র পশুকে উঁচু স্থানে স্থানান্তর, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সম্ভব না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সড়কে বা আশ্রয় কেন্দ্রে নিতে হবে।
* বন্যা বা অতিবৃষ্টির আগে কিছু খড় ও দানাদার খাদ্য সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। বর্ষাকালে সাইলেজ তৈরি করে অথবা ইউরিয়া দ্বারা খড় প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
* বন্যার সময় খুব সমস্যা হলে উঁচু স্থান পাওয়া না গেলে নৌকায় অথবা মাচার উপরে গবাদিপশুকে রাখতে হবে।
* বন্যার  সময় পশু সাধারণত ডায়রিয়া, বাদলা, তড়কা, ক্ষুরারোগ, খাদ্যে বিষক্রিয়াতে আক্রান্ত হতে পারে তাই এ ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে।
দুর্যোগকালে হাঁস-মুরগির জন্য করণীয়
১. খরা/অত্যধিক গরমকালীন সময়ে করণীয়
* খামারের হাঁস-মুরগির ঘরে অবাধ বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্সজাস্ট ফ্যানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রয়োজনে সিলিং ফ্যানের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
* পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ ঠাণ্ডা পানি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পাত্রের পানি বার বার বদলাতে হবে। ঠাণ্ডা পানির সাথে ভিটামিন ‘সি’ ও ইলেকট্রোলাইট্স দিতে হবে।
* হাঁস-মুরগির ঘরের চালার ওপর চট বিছিয়ে তার ওপর বার বার ঠাণ্ডা পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
* দুপুরে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ রেখে ভোরে ও সন্ধ্যায় খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।
* লাইটিং প্রোগ্রামে রাত ২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে রাত ২টার পর থেকে খাদ্য ও পানি সরবরাহ করতে হবে।
* খামারে জায়গার সংস্থান থাকলে হাঁস-মুরগির ঘনত্ব কমিয়ে দিতে হবে অর্থাৎ ঘরে জায়গার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে। রুমের তাপমাত্রা জানার জন্য থার্মোমিটার ঝুলিয়ে রাখতে হবে।
* তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সে. -এ চলে গেলে ঠাণ্ডা পানি মুরগির ওপর স্প্রে করতে হবে। প্রয়োজনে ঘরের মেঝেতে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে।
* রাতে বা খুব ভোরে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হবে, অত্যাধিক গরমে নির্ধারিত শিডিউলের ২-৩ দিন পর ভ্যাকসিন দেয়া যেতে পারে।
২. অত্যধিক ঠাণ্ডাকালীন সময়ে করণীয়
* শেডের চারিদিকে চটের বস্তা দিয়ে দিতে হবে যাতে বাতাস প্রবেশ করতে না পারে। শেডের  ভেতরে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা রক্ষা করতে হবে।
* ব্রুডারে প্রয়োজনে বেশি ওয়াটের বাল্ব লাগাতে হবে এবং গ্যাস ব্রুডারে তাপমাত্রা বাড়াতে  হবে। বিদ্যুৎ চলে গেলে ঠা-ার সময় তাপমাত্রা বাড়াবার জন্য হারিকেন বা হ্যাজাকের ব্যবস্থা করতে হবে।
* অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় কুসুম কুসুম গরম পানি এবং পানিতে ভিটামিন ‘সি’ ও এ,ডি,ই সরবরাহ করতে  হবে।
* শেডের মেঝেতে ৪ ইঞ্চি পুরু করে লিটার দিতে হবে। যেন- স্যাঁতসেঁতে না হয়।
* বেশি প্রোটিন ও ক্যালরিযুক্ত খাবার দিতে হবে।
* শেডের চালের নিচ দিয়ে আলো বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা করতে হবে।
* ঠাণ্ডায় সর্দি-কাশি, সিআরডি, ব্রুডার নিউমোনিয়া ও আমাশয়ে আক্রান্ত হতে পারে তাই সজাগ থাকতে হবে।
৩. ঝড়, বৃষ্টি কালীন সময়ে করণীয়
* ঝড়, বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য ঘরে শক্ত খুঁটি দিতে হবে।
* আর্দ্রতামুক্ত পরিবেশে খাদ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
* ঘরের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। লিটার ভিজতে দেয়া যাবে না।
* উঁচু স্থানে গুদাম নির্মাণ করে খাদ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
* ঝড়, বৃষ্টির মৌসুম শুরুর আগেই মুরগি, ডিম বাজারজাত করার জন্য যোগাযোগ করতে হবে।
* প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মুরগি, ডিম বাজারজাতের ব্যবস্থা করতে হবে।
* ঝড়, বৃষ্টির পানি যাতে ঘরে না যায় সেজন্য চারিদিকে চটের বস্তা-রেকসিনের পর্দা দিতে হবে।
* মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই আপদকালীন সময়ের জন্য খাদ্য মজুদ রাখতে হবে।
* বর্ষাকালে বিশেষ করে রানীক্ষেত, পরজীবীজনিত ও ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমণ বৃদ্ধি পায় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
৪. বন্যাকবলিত এলাকায় হাঁস-মুরগির জন্য করণীয়
* হাঁস-মুরগিকে যথাসম্ভব উঁচু ও শুকনো জায়গায় রাখতে হবে।
* হাঁস-মুরগিকে বন্যার দূষিত পানি কিংবা পচা খাবার খাওয়ানো যাবে না।
* নিজেদের আহারের উদ্বৃত্ত খাদ্য নষ্ট না করে হাঁস-মুরগিকে খেতে দিতে হবে।
* হাঁস-মুরগিকে রানীক্ষেত, কলেরা, বসন্ত, ডাকপ্লেগ রোগের প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে এবং মৃত হাঁস-মুরগিকে মাটিতে পুঁতে অথবা পুড়ে ফেলতে হবে।
* শেডের মেঝেতে চুন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে ছাই, তুষ, কাঠের গুঁড়া বা বালু ছড়িয়ে দিতে হবে। নিয়মিতভাবে তা পরিবর্তন করতে হবে।
ঋতু পরিবর্তন ও দুর্যোগে গবাদিপশুর খাদ্য সংরক্ষণ ও করণীয়
* গাছের পাতা-বন্যার সময় অথবা শুষ্ক মৌসুমে গবাদিপশুর বিকল্প খাদ্য হিসাবে কলা, কাঁঠাল, তুঁত, ডুমুর, ডেউয়া, ইপিল-ইপিল, আম, জিগা, বাঁশ, বট, পাকুড় ইত্যাদি গাছের পাতা ব্যবহার করা যেতে পারে।
* সাইলেজ-সাইলেজ তৈরি করে দুর্যোগের সময় ব্যবহার করা যেতে পারে।
* বর্ষাকালে ইউরিয়া দ্বারা খড় সংরক্ষণ করতে হবে।
* বর্ষার শুরুতে গবাদিপশুকে সংক্রামক রোগের টিকা দিতে হবে।
* বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া ঘাস ও বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর গজানো নতুন ঘাস পশুকে খাওয়ানো যাবে না। যে কোনো সমস্যায় নিকটস্থ পশুসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নিতে হবে।

কৃষিবিদ ডা. মনোজিৎ কুমার সরকার*
*ভেটেরিনারি সার্জন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস, কাউনিয়া, রংপুর

বিস্তারিত
কবিতা (কৃষিকথা ১৪২৩)


কৃষি বিপ্লব
ড. মো. আলতাফ হোসেন*

কৃষিবিদরা বাংলাদেশের গর্বিত সন্তান
খাদ্য চাহিদা পূরণে তাদের রয়েছে ব্যাপক অবদান।

সাত কোটি জনসংখ্যা থেকে হয়েছে সতের কোটি
রয়েছে তবুও খাদ্য নিয়ে জনমনে অনেক সন্তুষ্টি।

উদ্ভাবন করেছেন উচ্চফলনশীল ধান, আলু, ভুট্টা ও গম
ডাল, তেল ও চিনি ফসলে গবেষণা হয়েছে কিছুটা কম।

উদ্ভাবিত হয়েছে অনেক উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের এটিই হচ্ছে প্রথম ধাপ।

উদ্ভাবিত হয়েছে জাত- খরা, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা প্রতিরোধী
আর ফসল বিন্যাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জাত স্বল্পমেয়াদি।

ধান, গম, ভুট্টা ও আলু ফসলে গবেষণার সাফল্য ঈর্ষান্বিত
আবার অন্যান্য ফসলের উদ্ভাবিত জাতগুলোও খুবই উন্নত।

উৎপাদিত হচ্ছে খাদ্যশস্য টনে লক্ষ-কোটি
উদ্ভাবিত আধুনিক প্রযুুক্তি জমিকে দিচ্ছে না ছুটি।

একক ফসল, মিশ্র ফসল আরও হচ্ছে চাষ-আন্তঃফসল
সাথী ফসল চাষ করে পূর্বেই করা হচ্ছে জমিকে দখল।

কৃষককুল রয়েছেন মাঠে রাত-দিন ফলাতে ফসল অবিরত
সম্প্রসারণবিদগণও সম্প্রসারিত করছেন প্রযুক্তি শত শত!

মৎস্য বিজ্ঞানীরা  উদ্ভাবন করেছেন পুকুরে মাছ চাষ ‘পাঙ্গাশ’
আরও উদ্ভাবিত হয়েছে প্রযুক্তি মিঠা পানিতে চিংড়ি চাষ।

মৎস্য চাষে রয়েছে বিজ্ঞানীদের আরও অনেক সাফল্য
তাদের অবদানের জন্য অবশ্যই তারা ধন্যবাদের যোগ্য।

প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানীরা করেছেন প্রযুক্তি পশু মোটাতাজাকরণ
মাংস ও দুগ্ধ উৎপাদনে তাদের অবদানকে রাখতেই হবে স্মরণ।

মাংস উৎপাদনে জুড়ি নেই প্রযুক্তি-মুরগির ব্রয়লার
ডিম উৎপাদনেও তুলনাহীন প্রযুক্তি-মুরগির লেয়ার।

কৃষি উন্নয়নে রয়েছে বিজ্ঞানীদের অবদান হাজারো হাজার
দেশবাসীকে তাদের অবদানের স্বীকৃতি দেয়া উচিত বারংবার।

ধন্য বাংলার কৃষিবিদ ও কৃষক, ধন্য তোমাদের অবদান
স্মৃতি হয়ে থাকবে তোমরা এই বাংলায়, হবে না কখনো অম্লান!

পুষ্টি
কৃষিবিদ ড. মো. শাহ কামাল খান**

পুষ্টি উপাদান ছয় প্রকারের
শর্করা, আমিষ, চর্বি
পানি, খনিজ ও ভিটামিন,
পুষ্টি উপাদানসমূহ অত্যাবশ্যকীয়
খাবারের ম্যানুতে সবার উপস্থিতি
থাকতে হবে প্রতিদিন।

নানা উপাদানের নানা কাজ
শর্করা ও চর্বি মিলে
দেহে শক্তি জোগায়,
আমিষ সাহায্য করে
শরীর গঠনে
পানি অপরিহার্য-হজম বাড়ায়।

ভিটামিন ও খনিজ উভয়ে
বিভিন্ন রোগ হতে
দেহকে রক্ষা করে,
প্রয়োজন হয় স্বল্প পরিমাণে
তবে খেতে হয় প্রতিদিন
চাই সচেতনতা ঘরে ঘরে॥
*প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত্ব), ডাল গবেষণা কেন্দ্র ও আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা। মোবাইল : ০১৭২৫০৩৪৫৯৫
**সিনিয়র মনিটরিং অ্যা- ইভ্যালুয়েশন অফিসার, সাইট্রাস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা

বিস্তারিত
ফল ও সবজি চাষে আবদুল লতিফের সাফল্য (মুখোমুখি)

পাবনা জেলা শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে জোয়ার্দাহ গ্রাম। সেই গ্রামের নিরীহ-আলবোলা হতদরিদ্র বেকার যুবক আবদুল লতিফ চাষাবাদের মাধ্যমে ভাগ্যকে জয় করে  জিতে নিয়েছে সমাজের মানসম্মান  আর বিত্ত বৈভব। আবদুল লতিফ এখন অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন নিয়ে। কথা হয় তার সঙ্গে জীবন পাল্টে ফেলার গল্প নিয়ে।
প্রশ্ন : আপনি কিভাবে কৃষির মতো একটি পরিশ্রমী এবং শক্ত পেশায় এলেন? এত পেশা থাকতে কৃষি কেন?
উত্তর : আমি ১৯৯৭ সালে বিএ পাসের পর চাকরি খুঁজতে থাকি। হতাশ হয়ে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করি একটি কর্মের আশায় যাতে সংসারে ডাল ভাতের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু বিধিবাম! নিরুপায় হয়ে একজন দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের মাধ্যমে ঢাকা গার্মেন্ট কোম্পানিতে চাকরি নেই, একটানা পরিশ্রম, স্বল্পবেতন, মেচের নিম্নমানের খাওয়া দাওয়া-অবশেষে জন্ডিসে আক্রান্ত। ছয় মাসের চাকরি জীবন ইতি করে ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে ফিরি বাড়িতে। আবার দুই চোখে অন্ধকার, সন্ধান করতে লাগলাম একটি কর্মের। ঘুরতে ঘুরতে সন্ধান পেলাম যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে কৃষি, হাঁস-মুরগি ও কম্পিউটার বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। সিদ্ধান্ত  নিলাম কৃষি, মৎস্য ও গবাদিপশুর ওপর তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেবো। সে মোতাবেক ভর্তি হয়ে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে নিয়মিত ক্লাস অনুসরণ করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে থাকলাম। প্রশিক্ষণ আর স্যারদের বক্তৃতায় আমার হতাশা আর ঘোর কেটে যেতে লাগল। নতুন আলোর স্পর্শে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। প্রশিক্ষণ শেষ করে বাবার রেখে যাওয়া মাত্র ২ বিঘা অনুর্বর জমিতে পেঁপে আর কলা চাষ শুরু করলাম। আমি কৃষি বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ এবং মৎস্য বিভাগসহ সর্বত্র যোগাযোগ করতে লাগলাম। উদ্দেশ্য হলো কিভাবে কোন ফসল চাষ করলে আরও লাভবান হওয়া যায়। ধূসর মাটির বুকে যে এত সোনা থাকে জানতাম না। তৈরি করলাম কম্পোস্ট হিপ, জৈবসারের ভা-ার। কৃষি তথ্য সার্ভিস হতে বিভিন্ন ফল সবজি আবাদের ফোল্ডার, বুকলেট জোগাড় করে আর কৃষি বিভাগের পরামর্শ মোতাবেক এবার শুরু করলাম ১০ বিঘা জমিতে কলা পেঁপে আর সবজি আবাদ। ঝড়ে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেবার প্রায় আট লাখ টাকা লাভ করি। সেই থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি আমার। অন্য পেশার কথা আর ভাবনায় আসেনি।
প্রশ্ন : আপনি বর্তমানে কত বিঘা জমিতে কী কী ফল, সবজি আবাদ করেছেন এবং উৎপাদিত ফল সবজি কোথায় বিক্রি করেন?
উত্তর : বর্তমানে আমার ১০ বিঘা জমিতে লিচুর বাগান আছে, ৫ বিঘা জমিতে পেঁপে, ৫ বিঘায় কলা, ৫ বিঘায় অন্যান্য সবজি, নিজের বসতবাড়ি ২ বিঘার ওপর, সেখানেও পরিকল্পিতভাবে আমি শাকসবজি আবাদ করি এবং গাছ আলু বাড়ির বেলগাছ, আমগাছ আর কদবেল গাছে তুলে দিয়ে ফলের পাশাপাশি বাড়তি আয় করি। ১০টি লিচু গাছও আছে বাড়িতে। আতা, শরিফা, লেবু, কাঁঠাল, আমড়া, কামরাঙা ফলের গাছও আছে বাড়িতে। ফল সবজি স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি করি। আমি বাড়িতে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেছি। নিজে রান্না করি এবং নিজের বাড়ির লাইন থেকে প্রতিবেশীর বাড়িতে লাইন দিয়ে সেখান থেকেও মাসিক ১ হাজার টাকা আয় করি। সব মিলে বছরে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকা আয় করছি।
প্রশ্ন : আচ্ছা আবদুল লতিফ সাহেব, আপনি নাকি লিচু গাছের মুকুল বৃদ্ধির নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। বলবেন কি?
উত্তর : হ্যাঁ, কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে লিচু গাছের চিকন  শাখা-প্রশাখা কেটে দিতে হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে লিচু গাছের কুশি ওই কাটা জায়গা থেকে বের হয়, ওইসব কুশিতে প্রচুর পরিমাণে মুকুল আসে। এটা নতুন পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে আমি ভালো ফল পাচ্ছি। আমার দেখাদেখি অন্যরাও করছে।
প্রশ্ন : আপনি কি শুধুই কৃষি কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন?
উত্তর : আমি আমার কাজের ফাঁকে বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করি। স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি, গ্রামের স্যানিটেশন পদ্ধতি উন্নত করা, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সাথে থেকে শিক্ষা বিস্তারের ব্যবস্থাসহ নানাবিধ কাজে জড়িত।
চেষ্টা, পরিশ্রম আর একাগ্রতার মাধ্যমে ভাগ্য বদলের এক সফল উপাখ্যানের নায়ক জোয়ার্দাহ গ্রামের আবদুল লতিফ। কঠোর পরিশ্রম আর সাধনার বিনিময়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন তার স্বপ্নের কৃষি খামার। তার সফলতায় কৃষিতে বিপ্লব ঘটেছে জোয়ার্দাহসহ আশপাশের সব গ্রামে।

 

এটিএম ফজলুল করিম*    
*সহকারী তথ্য অফিসার (অ. দা.), কৃষি তথ্য সার্ভিস, পাবনা

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (জ্যৈষ্ঠ-১৪২৩)

জাহিদুর রহমান
গ্রাম-চরপাকেরদহ, মাদারগঞ্জ, জামালপুর
প্রশ্ন : তরমুজের ক্ষেতে লালচে পোকা চারার পাতার রস চুষে খায়, কিভাবে এর দমন করব জানাবেন।
উত্তর : তরমুজের ক্ষেতে লালচে পোকাটি পামকিন বিটল। এটি নিয়ন্ত্রণে ক্ষেত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। গাছে বা পাতায় স্প্রে করে খুব একটা ফল পাওয়া যায় না। তবে গাছের গোড়া ও ছড়ানো ডালপালার (যদি মাটিতে থাকে) চারদিকে মাটিতে ২-৩ গ্রাম ক্লোরপাইরিফস বা কার্বোফুরান জাতীয় দানাদার কীটনাশক অনুমোদিত মাত্রায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হয়। এছাড়া এ পোকার ডিমপাড়া, কীড়া ও পুত্তলি অবস্থা মাটিতে কাটে বলে মাটি ওলট-পালট করে দিয়েও এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
মেহেদী হাসান
গ্রাম-গোরাই, মির্জাপুর, টাংগাইল
প্রশ্ন : পাট গাছের কচি পাতা কুঁকড়ে যায়। এ অবস্থায় করণীয় কী?
উত্তর : পাটক্ষেতে সাদা মাকড়ের আক্রমণ হয়েছে। এ মাকড় বৈশাখ মাস থেকে শুরু করে আশ্বিন পর্যন্ত (নাবি বীজ পাটে) পাট গাছের কচি পাতা আক্রমণ করে পাতার রস চুষে খায়, ফলে কচি পাতা কুঁকড়ে যায় এবং তামাটে রঙ ধারণ করে। আক্রমণের প্রকোপ বাড়লে পাতা ঝরেও যেতে পারে ও ডগা নষ্ট হয়ে যায়। এতে পরে শাখা-প্রশাখা বের হয়। আঁশের ফলন কমে যায় ও মানেরও অবনতি ঘটে। সাদা মাকড় নিয়ন্ত্রণে সালফার ৮০% পাউডার প্রতি লিটার পানিতে ৩ গ্রাম হারে ভালোভাবে মিশিয়ে আক্রান্ত ক্ষেতে ছিটাতে হয়। এছাড়া প্রতি লিটার পানিতে ৪ গ্রাম হারে থিওভিট ছত্রাকনাশক মিশিয়ে বিকেলে পাতার নিচের দিকে ভালোভাবে স্প্রে করেও সুফল পাওয়া যায়।
অনুকূল সরকার
গ্রাম-বদিয়াখালী, ফুলছড়ি, গাইবান্ধা
প্রশ্ন : লিচু ফলের উপরের ত্বক পুড়ে বাদামি রঙের হয়ে যায়। এর প্রতিকার জানতে চাই।
উত্তর : অতিরিক্ত তাপমাত্রায় লিচু ফলের উপরের ত্বক পুড়ে বাদামি রঙের হয়ে যায়। এর পর তা ভেতরের শাঁসকেও আক্রান্ত করে এবং শাঁসের মধ্যকার শর্করা ও ভিটামিন সি নষ্ট করে দেয়। ফলের শাঁসে পচন ধরে। আগাম জাতে (বোম্বাই, মোজাফফরপুরী, মাদ্রাজি) এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। তবে নাবি জাতে (চায়না-৩, বেদানা) সমস্যা কম হয়। তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি এবং বাতাসের আর্দ্রতা ৬০% এর কাছাকাছি বা কম হলে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। এ কারণে আক্রান্ত ফলের ত্বকে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে যায়। বাদামি দাগ দ্রুত পুরো ফলে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিকার :
১. প্রতিকার হিসেবে রোদ থেকে লিচু ফল কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখা যেতে পারে। এতে কৃত্রিমভাবে তাপ কমানো ও আর্দ্রতা বাড়ানো যায়, যা লিচু ফলে দাগ হতে দেয় না।
২. যখন তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং আর্দ্রতা কমে যায় তখন সেচ প্রদান করা যেতে পারে (বিকেলে বা সন্ধ্যার পরে গাছের গোড়ার চারদিকে এবং স্প্রে আকারে পাতায় ও ফলে)।
৩. ফলে প্রাথমিকভাবে ক্যালসিয়ামজাতীয় সার (প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০-২৫ গ্রাম ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড) স্প্রে করা যেতে পারে। তবে গাছে বার্ষিক সার প্রয়োগের সময় জিপসাম বিঘাপ্রতি ৬-৮ কেজি ব্যবহার করলে ভালো হয়।
আবদুল হান্নান
গ্রাম-বারবালা, মিঠাপুকুর, রংপুর
প্রশ্ন : নারকেল ফেটে যায়, গুটি আসার পর ঝরে যায়, পরিপক্ব হওয়ার পর পানি থাকে না।
উত্তর : বর্ষার শুরুতে ফল ধরে এমন গাছগুলোতে গাছপ্রতি ৭৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০০ গ্রাম টিএসপি, ৫০০ গ্রাম এমপি, ৬০ গ্রাম জিংক সালফেট এবং ৬০ গ্রাম বোরন সার প্রয়োগ করুন। পুনরায় বর্ষার শেষে আশ্বিন মাসে একই হারে সার প্রয়োগ করুন।
হাসান
গ্রাম-ধানগড়া, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ
প্রশ্ন : আমি একটি পেঁপের বাগান করতে চাই। কী ধরনের মাটিতে পেঁপের চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায় এবং ছোট অবস্থায় পেঁপে গাছ স্ত্রী হবে না পুরুষ হবে চেনার উপায় কী? জানালে উপকৃত হবো।
উত্তর : বন্যামুক্ত এবং বৃষ্টির পানি জমে না এ ধরনের সুনিষ্কাশিত উঁচু জমিতে পেঁপে চাষ করতে হবে। মাটি বেলে দো-আঁশ হলে সর্বোত্তম। ছোট অবস্থায় পেঁপে গাছের স্ত্রী-পুরুষ চেনার সঠিক পদ্ধতি নেই, তবে সাধারণত চারার বেডে যেসব চারা অতি দ্রুত বেড়ে ওঠে তা পুরুষ গাছ হয়ে থাকে। প্রতিটি মাদায় ৩টি করে চারা লাগানো উচিত এবং বড় হওয়ার পর পুরুষ গাছের ফুল দেখা দিলে তা উপড়ে ফেলে প্রতি মাদায় একটি করে স্ত্রী গাছ রেখে দিতে হবে।
মিথুন
গ্রাম-বরতুলা, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : আমার চায়না থ্রি লিচু গাছ আছে। প্রতি বছর প্রচুর ফুল আসে কিন্তু ফল হয় অল্প। কী করলে বেশি লিচু পেতে পারি। জানালে উপকৃত হব।
উত্তর : প্রতি বছর গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, ৬০ গ্রাম নাফকো বোরন সার গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে। কার্তিক মাস থেকে শুরু করে পৌষ-মাস পর্যন্ত গাছে পানি ও সার দেয়া বন্ধ রাখতে হবে। মটরের দানা আকারের লিচুর গুটি হওয়া থেকে শুরু করে আশ্বিন মাস পর্যন্ত প্রতি ৩ দিন অন্তর গাছের চারদিকে বৃত্তাকার নালায় গাছপ্রতি ২০০ লিটার পানি সেচ দিতে হবে। লিচু ফল সংগ্রহ করার পর মাকড় আক্রান্ত বাদামি আবরণ পড়া সব পাতা ছাঁটাই করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তারপর প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলিলিটার টলস্টার ২.৫ ইসি অথবা ২.৫ গ্রাম হেসালফ ডি এফ ৮০% অথবা ২ গ্রাম ট্রাইসাল ৮০ ডব্লিউপি অথবা ২ গ্রাম সালফাভিট মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২ বার স্প্রে করতে হবে। লিচুর গুটি হলে আবার লিটোসেন স্প্রে করতে হবে। তার ২১ দিন পর আবার লিটোসেন স্প্রে করতে হবে। ফুল অবস্থায় লিটোসেন বা অন্য কোনো জৈব উজ্জীবক (হরমোন) স্প্রে করা যাবে না। ১৫ বছর বয়সে লিচু গাছের ফলধারণ বাণিজ্যিক হতে শুরু করে।
জনি
কাজিপাড়া, ডেমরা, ঢাকা
প্রশ্ন : আমাদের গাছে আম পাকার আগে বড় হয়ে ফেটে যায়। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?
উত্তর : বোরনের অভাবে, পানির পরিমাণের তারতম্যের কারণে বা নির্দিষ্ট জাতের গুণাগুণের কারণে সাধারণত আম ফেটে যায়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতি বছর আমগাছে সুষম মাত্রার সারের সাথে বোরন সার ব্যবহার করুন। নির্দিষ্ট মাত্রার বোরন সার মাটিতে বা পাতায় স্প্রে করে দেয়া যেতে পারে।
শামিম হোসেন
গ্রাম-মজিদপুর, পোরশা, নওগাঁ
প্রশ্ন : পুকুরের পানির ওপর সবুজ (রুম) বা বাদামি বর্ণের আস্তরণ দেখা যায়, কিভাবে সমাধান করা যায়?
উত্তর : কাপড় বা মশারি দিয়ে আস্তরণ তুলে ফেলতে পারলে ভালো। খড়ের দড়ি বেঁধে তা দিয়ে পুকুরের ওপরে টেনে এক কোণায় এনে তুলে ফেলা। অথবা রুম বা আস্তরণ একত্র করার পর তার ওপর ২০০-২৫০ গ্রাম ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিলে তা নষ্ট হয়ে যাবে। একরপ্রতি ২০-২৫টি ৫০ গ্রাম তুঁতের কাপড়ের পুঁটলি খুঁটিতে বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে পানিতে ডুবিয়ে রেখে সবুজ আস্তরণ বা ব্লুম দূর করা যায়। এছাড়া শতকপ্রতি ০.৫ কেজি চুন প্রয়োগেও ফল পাওয়া যায়।
জাহাঙ্গীর আলম
গ্রাম-বাউরা, পাটগ্রাম, লালমনিরহাট
প্রশ্ন : পুকুরের পানি খুবই স্বচ্ছ, কিভাবে সবুজ করা যায়?
উত্তর : শতকপ্রতি মাছ থাকা অবস্থায় ০.৫ কেজি চুন, মাছ না থাকা অবস্থায় ১ কেজি চুন গুলিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। এরপর ইউরিয়া শতক প্রতি ১০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০ গ্রাম সাথে ৫-৭ কেজি গোবর সার বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করতে হবে।
সাগর
গ্রাম-বরতুলা, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : কবুতর ঝিমোচ্ছে, ঘুরে ঘুরে পড়ে যাচ্ছে, করণীয় কী?
উত্তর : ট্যাব, রেনামাইসিন ৫০০ মিলিগ্রাম অর্ধেক ট্যাবলেট গুঁড়া করে আধা লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে অসুস্থগুলোকে আলাদা করে খেতে দিতে হবে। বাকি দ্রবণ সুস্থগুলোকে খাওয়াতে হবে। ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ২ থেকে ৩ ফোঁটা খাওয়ার পানির সাথে মিশিয়ে ৫ থেকে ৭ দিন খাওয়াতে হবে।
আমানুল্লাহ
গ্রাম-বাণিগ্রাম, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম
প্রশ্ন : বাছুরকে কত মাসে টিকা দিতে হয়?
উত্তর : বাছুরের বয়স অনুযায়ী যেসব টিকা দিতে হয় তাহলো-
৪৫ দিন              ক্ষুরারোগ
৪ মাস                ক্ষুরারোগ
৬ মাস                বাদলা
৬ মাস ২১ দিন     তড়কা
৭ মাস ১৪ দিন     গলাফুলা
৮ মাস ৭ দিন       প্লেগ
১০ মাস             ক্ষুরারোগ

 

রবিউল ইসলাম
গ্রাম- খুন্তি, হাতিয়া, নোয়াখালী
প্রশ্ন : গরুর আঠালি হয়েছে। কী করণীয়?
উত্তর : দুগ্ধবতী গাভী অথবা বকনাগাভীকে নিয়মিত জীবাণুনাশক দ্বারা গোসল করাতে হবে। গোসল শেষে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে যেন লেজের গোড়ায় পানি না জমে। এছাড়া দুগ্ধবতী গাভীকে আঠালি থেকে মুক্ত রাখার জন্য সকাল-বিকাল সব শরীর ভালোমতো চিরুনি বা ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে। ইঞ্জেকশন (আইভারমেকটিন) প্রতি ৫০ কেজি ওজনের জন্য ১ সিসি. চামড়ার নিচে প্রয়োগ করতে হবে।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ*
* সহকারী তথ্য অফিসার (শ. উ.), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
আষাঢ় মাসের কৃষি

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, যখন গ্রীষ্মের তাপদাহে মানুষ, প্রকৃতি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ঠিক সে সময় শীতল স্পর্শে ধরণীকে শান্ত, শীতল ও শুদ্ধ করতে বর্ষা ঋতু আসে আমাদের মাঝে। খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, ডোবা ভরে ওঠে নতুন পানির জোয়ারে। গাছপালা ধুয়ে মুছে সবুজ হয়, কদম ফুলের মনোহরি সুঘ্রাণ শোভা মাতিয়ে মন ভালো করে দেয় প্রতিটি বাঙালির। সঙ্গে আমাদের কৃষি কাজে নিয়ে আসে ব্যাপক ব্যস্ততা। প্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন আসুন আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে নেই এ বর্ষায় কৃষির করণীয় আবশ্যকীয় কাজগুলো।


আউশ ধান
* আউশ ধানের ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য যতœ নিতে হবে;
*  সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগ ও পোকামাকড় দমন করতে হবে;
*  বন্যার আশঙ্কা হলে আগাম রোপণ করা আউশ ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলেই কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

আমন ধান
*  আমন ধানের বীজতলা তৈরির সময় এখন। পানিতে ডুবে না এমন উঁচু খোলা জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। বন্যার কারণে রোপা আমনের বীজতলা করার মতো জায়গা না থাকলে ভাসমান বীজতলা বা দাপগ পদ্ধতিতে বীজতলা করে চারা উৎপাদন করতে হবে;
*  বীজতলায় বীজ বপন করার আগে ভালো জাতের সুস্থ সবল বীজ নির্বাচন করতে হবে। রোপা আমনের উন্নত জাত যেমন- বিআর১০, বিআর২৫, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩১, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১। এছাড়া লবণাক্ত জমিতে ব্রি ধান৪৪ চাষ করতে পারেন;
*  খরাপ্রবণ এলাকাতে নাবি রোপার পরিবর্তে যথাসম্ভব আগাম রোপা আমনের (ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান ৩৯ এসব) চাষ করতে হবে;
*  ভালো চারা পেতে প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি গোবর, ১০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে;
*  আষাঢ় মাসে রোপা আমন ধানের চারা রোপণ শুরু করা যায়;
*  মূল জমিতে শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ৯০ কেজি টিএসপি, ৭০ কেজি এমওপি, ১১ কেজি দস্তা এবং ৬০ কেজি জিপসাম দিতে হবে;
*  জমিতে চারা সারি করে রোপণ করতে হবে। এতে পরবর্তী পরিচর্যা বিশেষ করে আগাছা দমন সহজ হবে;
*  জমির এক কোণে মিনি পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন, যেন পরবর্তীতে সম্পূরক সেচ নিশ্চিত করা যায়।

 

পাট
*  পাট গাছের বয়স চারমাস হলে ক্ষেতের পাট গাছ কেটে নিতে হবে।
*  পাট গাছ কাটার পর চিকন ও মোটা পাট গাছ আলাদা করে আঁটি বেঁধে দুই-তিন দিন দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে।
*  পাতা ঝরে গেলে ৩-৪ দিন পাটগাছগুলোর গোড়া এক ফুট পানিতে ডুবিয়ে রাখার পর পরিষ্কার পানিতে জাগ দিতে হবে।
*  পাট পচে গেলে পানিতে আঁটি ভাসিয়ে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে পাটের আঁশের গুণাগুণ ভালো থাকবে। ছাড়ানো আঁশ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ে শুকাতে হবে।
*  যেসব জায়গায় জাগ দেয়ার পানির অভাব সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে পারেন। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচন সময় কমে যায়।    
*  পাটের বীজ উৎপাদনের জন্য ১০০ দিন বয়সের পাট গাছের এক থেকে দেড় ফুট ডগা কেটে নিয়ে দু’টি গিঁটসহ ৩-৪ টুকরা করে ভেজা জমিতে দক্ষিণমুখী কাঁত করে রোপণ করতে হবে। রোপণ করা টুকরোগুলো থেকে ডালপালা বের হয়ে নতুন চারা হবে। পরে এসব চারায় প্রচুর ফল ধরবে এবং তা থেকে বীজ পাওয়া যাবে।

 

ভুট্টা
*  পরিপক্ব হওয়ার পর বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার আগে মোচা সংগ্রহ করে  ঘরের বারান্দায় সংগ্রহ করতে পারেন। রোদ হলে শুকিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
*  মোচা পাকতে দেরি হলে মোচার আগা চাপ দিয়ে নি¤œমুখী করে দিতে হবে, এতে বৃষ্টিতে মোচা নষ্ট হবে না।

 

শাকসবজি
*  এ সময়ে উৎপাদিত শাকসবজির মধ্যে আছে ডাঁটা, গিমাকলমি, পুঁইশাক, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, ঝিঙা, শসা, ঢেঁড়স, বেগুন। এসব সবজির গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনে মাটি তুলে দিতে হবে। এছাড়া বন্যার পানি সহনশীল লতিরাজ কচুর আবাদ করতে পারেন;
*  উপকূলীয় অঞ্চলে ঘেরের পাড়ে গিমাকলমি ও অন্যান্য ফসল আবাদ করতে পারেন;
*  সবজি ক্ষেতে পানি জমতে দেয়া যাবে না। পানি জমে গেলে সরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে;
*  তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরার জন্য বেশি বৃদ্ধিসমৃদ্ধ লতাজাতীয় গাছের ১৫-২০ শতাংশের লতাপাতা কেটে দিতে হবে;
*  কুমড়াজাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে;
*  আগাম জাতের শিম ও লাউয়ের জন্য প্রায় ৩ ফুট দূরে দূরে ১ ফুট চওড়া ও ১ ফুট গভীর করে মাদা তৈরি করতে হবে। মাদা তৈরির সময় গর্তপ্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম সরিষার খৈল, ২ কেজি ছাই, ১০০ গ্রাম টিএসপি ভালোভাবে মাদার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর প্রতি গাদায় ৩-৪টি ভালো সবল বীজ রোপণ করতে হবে।

 

গাছপালা
*  এ সময়টা গাছের চারা রোপণের জন্য খুবই উপযুক্ত। বসতবাড়ির আশপাশে, খোলা জায়গায়, চাষাবাদের অনুপযোগী পতিত জমিতে, রাস্তাঘাটের পাশে, পুকুর পাড়ে, নদীর তীরে গাছের চারা বা কলম রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে;
*  এ সময় বনজ গাছের চারা ছাড়াও ফল ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে পারেন;
*  ফলের চারা রোপণের আগে গর্ত তৈরি করতে হবে;
*  সাধারণ হিসাব অনুযায়ী একফুট চওড়া ও একফুট গভীর গর্ত করে গর্তের মাটির সঙ্গে ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার মিশিয়ে, ১০ দিন পরে চারা বা কলম লাগাতে হবে;
*  বৃক্ষ রোপণের ক্ষেত্রে উন্নত জাতের রোগমুক্ত সুস্থসবল চারা বা কলম রোপণ করতে হবে;  
*  চারা শুধু রোপণ করলেই হবে না। এগুলোকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। চারা রোপণের পর শক্ত খুঁটির দিয়ে চারা বেঁধে দিতে হবে। এরপর বেড়া বা খাঁচা দিয়ে চারা রক্ষা করা, গোড়ায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, সেচ-নিকাশ নিশ্চিত করতে হবে;
*  নার্সারি মালিক যারা তাদের মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুব জরুরি। সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, দুর্বল রোগাক্রান্ত ডালপালা কাটা বা ছেঁটে দেয়ার কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে হবে।

 

প্রাণিসম্পদ
*  বর্ষাকালে হাঁস-মুরগির ঘর যাতে জীবাণুমুক্ত ও আলো-বাতাসপূর্ণ থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে;
*  এ মাসে হাঁস-মুরগির কৃমি, কলেরা, রক্ত আমাশা, পুলরাম রোগ, সংক্রমণ সর্দি দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে;
*  হাঁস-মুরগিকে ভেজা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় না রেখে শুকনো ঘরে রাখতে হবে এবং মাঝে মধ্যে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে;
*  বর্ষাকালে গবাদিপশুকে সংরক্ষণ করা খড়, শুকনো ঘাস, ভুসি, কুঁড়া খেতে দিতে হবে। সে সঙ্গে কাঁচা ঘাস খাওয়াতে হবে;
*  মাঠ থেকে সংগৃহীত সবুজ ঘাস ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খাওয়ানো যাবে না;
*  বর্ষাকালে গবাদিপশুর গলাফোলা, তড়কা, বাদলা, ক্ষুরা রোগ মহামারী আকারে দেখা দিতে পারে। এজন্য প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে;
*  কৃমির আক্রমণ রোধ করার জন্য কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে;
*  হাল চাষের পর গরুকে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে;
*  এ ছাড়া যে কোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

মৎস্য সম্পদ
*  বর্ষা মৌসুমে পুকুরের পাড় উঁচু করে দিতে হবে;
*  বন্যার সময় পুকুরে মাছ আটকানোর জন্য জাল, বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে;
*  আষাঢ় মাস মাছের পোনা ছাড়ার উপযুক্ত সময়। মাছ চাষের জন্য মিশ্র পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন;
*  পুকুরে নিয়মিত খাবার দিতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে;
*  বড় পুকুরে, হাওরে, বিলে, নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করতে পারেন;
*  মাছ চাষের যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।


সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের আগাম নিশ্চিত প্রস্তুতির জন্য আগামী মাসে উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়ে দেয়া হয়। আমাদের বিশ্বাস সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম বাস্তবায়নে আপনাদের প্রাথমিক প্রস্তুতি নিতে এগুলো বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। এরপরও যদি আরও নতুন কোনো তথ্যপ্রযুক্তি বা কৌশল জানার থাকে অথবা কোনো বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান তাহলে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি-মৎস্য-প্রাণী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিলে আরও বেশি লাভবান হবেন। আর একটি কথা এ সময় বীজ ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় কৃষি উপকরণগুলো বন্যামুক্ত উঁচু বা নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। আবার কথা হবে আগামী মাসের কৃষিকথায়। নববর্ষার প্রতিটি ফোঁটা বয়ে আনুক আমাদের কৃষির সুখ-সমৃদ্ধি। আপনাদের সবার জন্য নিরন্তন শুভ কামনা।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*
* তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

 

 

বিস্তারিত

Share with :
Facebook Facebook