কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

ইঁদুর নিধন অভিযান ২০১৭

বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে কৃষি। বাংলাদেশ উইকিপিডিয়া ২০১৬ তথ্য মতে মোট কর্মসংস্থানের শতকরা ৪৭ শতাংশ এ খাতে নিয়োজিত এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে এককভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ অবদান রাখছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় এ খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রায় সাত কোটি জনসংখ্যা নিয়ে একসময় বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে ১৬ কোটির অধিক জনসংখ্যার বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে খাদ্য উদ্বৃত্তে দেশ হিসেবে স্বীকৃত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার সফল অভিযোজনের ফলে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। প্রতি বছর ফসলের বালাই ও ইঁদুরের আক্রমণের ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে যা অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে অন্তরায়।


ইঁদুর একটি চতুর ও নীরব ধ্বংসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণী। ইঁদুর প্রাণীটি ছোট হলেও ক্ষতির ব্যাপকতা অনেক। এরা যে কোনো খাদ্য খেয়ে বাঁচতে পারে। যে কোনো পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে। অল্প বয়সে বাচ্চা দিতে পারে। ইঁদুরের বিচরণ ক্ষেত্র ফসলের ক্ষেত থেকে শুরু করে বাড়ির শোয়ার ঘর পর্যন্ত সর্বত্র। আর তাই এদের ক্ষতির দিকটি অনেক বিস্তৃত। এরা মাঠের ফসল, গুদামজাত শস্য, ফল, শাকসবজি, সংরক্ষিত বীজ, কাপড়-চোপড়, কাগজ, লেপ-তোষক এসব কাটাকুটি করে আমাদের প্রচুর ক্ষতি সাধন করে। ২০১৩ সালের এক গবেষণা মতে, এশিয়ায় ইঁদুর বছরে যা ধান-চাল খেয়ে নষ্ট করে তা ১৮ কোটি মানুষের এক বছরের খাবারের সমান। আর শুধু বাংলাদেশে ইঁদুর ৫০-৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার নষ্ট করে। এরা যে শুধুই কাটাকুটি করে আমাদের ক্ষতি করে তাই নয়, এরা মানুষ ও পশুপাখির মধ্যে প্লে­গ, জন্ডিস, টাইফয়েড, চর্মরোগ, আমাশয়, জ্বর, কৃমিসহ প্রায় ৬০ প্রকার রোগ জীবাণুর বাহক ও বিস্তারকারী। একটি ইঁদুর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭ গ্রাম খাদ্য খেয়ে থাকে। ইঁদুর যা খায় তার ৪/৫ গুণ নষ্ট করে।

ইঁদুর স্তন্যপায়ী, সর্বভুক ও নিশাচর প্রাণী। ইঁদুরের ওপরের ও নিচের চোয়ালের সামনের জোড়া দাঁত চোয়ালের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায় এবং এ জোড়া দাঁতের কোনো রুট ক্যানেল না থাকায় সামনের কর্তন দন্তগুলো অনবরত সারাজীবন বাড়তে থাকে।  আর এ সদা বর্ধিষ্ণু দাঁতকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখার জন্য ইঁদুর সর্বদা কাটাকুটি করতে থাকে। তাই ইঁদুরের ক্ষতি এত ভয়াবহ। সারা পৃথিবীতে প্রায় ৪১০০টির মতো স্তন্যপায়ী প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে যার মধ্যে ১৭০০টির মতো ইঁদুরের প্রজাতি পাওয়া গেছে। প্রজাতি ভেদে ইঁদুর ১৫-৪১ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ওজনে ১৫-৩২৬ গ্রাম হয়ে থাকে। আমাদের দেশে যেসব প্রজাতির ইঁদুর দেখা যায় সেগুলো মধ্যে নরওয়ে বা বাদামি ইঁদুর, বাতি বা সোলাই ইঁদুর, মাঠের কালো ইঁদুর, মাঠের বড় কালো ইঁদুর, মাঠের নেংটি ইঁদুর, নরম পশমযুক্ত ইঁদুর এবং প্যাসিফিক ইঁদুর উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে নরওয়ে বা বাদামি ইঁদুর ঘরের ও গুদামজাত শস্যের ক্ষতি করে থাকে, ঘরের ইঁদুর বা গেছো ইঁদুর গুদামজাত শস্য, ফলজাতীয় ফসল এবং আসবাবপত্রের ক্ষতি করে, বাতি বা সোলাই ইঁদুর ঘরের বই-পত্র, কাপড়-চোপড় এবং শস্যদানা নষ্ট করে থাকে, মাঠের কালো ইঁদুর সব ধরনের মাঠ ফসল ও গুদামজাত ফসলের ক্ষতি করে থাকে, মাঠের বড় কালো ইঁদুর বোনা আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি করে, মাঠের নেংটি ইঁদুর মাঠের দানা জাতীয় ফসল পাকার পর ফসলের ক্ষতি করে থাকে, নরম পশমযুক্ত ইঁদুর ধান গম বার্লির ক্ষতি করে থাকে এবং প্যাসিফিক ইঁদুর ফলদ গাছ বিশেষ করে নারিকেল গাছের ক্ষতি করে থাকে।

 

বছর

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষক, ছাত্রছাত্রী ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারীর সংখ্যা

নিধনকৃত ইঁদুরের সংখ্যা

ইঁদুরের আক্রমণ থেকে রক্ষাকৃত ফসলের পরিমাণ (মে. টন)

২০১২

৫৫,০৩,৪৬১

১,৩৬,২২,০৯৫

১,০২,১৬৯

২০১৩

৮৩,৮৭,৮৭২

১,৩৯,৩৯,৯৮৬

১,০৪,৫৪৯.৮৯৫

২০১৪

৬৪,৩৯,৫৮৯

১,২৮,৯২,৯৩৩

৯৬,৬৯৬.৯৯

২০১৫

৭২,১০,৭৫০

১,২৫,৮৫,১৮১

৯৪৩৮৮.৮৫৭৫

২০১৬

৬০,২৬,৬৯১

১,১৮,৪৫,৯০৪

৮৮৮৪৪.২৮

সূত্র : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

বিশ্বে পোলট্রি শিল্প ইঁদুর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে এবং পোলট্রি উৎপাদনকারীদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। পোলট্রি শিল্পে ইঁদুর দ্বারা অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকে লক্ষ্য রেখে মুরগির খামারিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যাতে সমন্বিতভাবে ইঁদুর দমন এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অর্জিত হয়। ইঁদুর বর্তমানে পোলট্রি ফার্মে ছোট বাচ্চা ও ডিম খেয়ে ফার্মের মালিকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতির ধরন এর ব্যাপকতা ও দমন প্রক্রিয়া অন্যান্য বালাই থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও কৌশলগত। তাই স্থান কাল পাত্রভেদে কৌশলের সঠিক ও সমন্বিত দমন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে ইঁদুর দমন করতে হবে। এতে করে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, ইঁদুর বাহিত রোগ ও পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমানো সম্ভব হবে।


ইঁদুর নিধন অভিযান ২০১৭ এর উদ্দেশ্য
*    কৃষক, কৃষানী, ছাত্রছাত্রী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আইপিএম/আইসিএম ক্লাবের সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোসহ

      সর্বস্তরের জনগণকে ইঁদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করা;
*    ইঁদুর দমনের জৈবিক ব্যবস্থাসহ লাগসই প্রযুক্তি কৃষি কর্মীগণের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো;
*   ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিল্প কারখানা ও হাঁস মুরগির খামার ইঁদুরমুক্ত রাখার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা;
*    আমন ফসল ও অন্যান্য মাঠ ফসলে ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ কম রাখা;
*    গভীর ও অগভীর নলকূপের সেচের নালার ইঁদুর মেরে পানির অপচয় রোধ করা;
*    রাস্তাঘাট ও বাঁধের ইঁদুর নিধনের জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা;
*    ইঁদুর বাহিত রোগের বিস্তার রোধ করা এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা।

 

কর্মসূচির সময়
এক মাসব্যাপী ইঁদুর নিধন অভিযান সারা দেশে একযোগে পরিচালনা করা হবে। জাতীয় পর্যায়ে ইঁদুর নিধন অভিযান-২০১৭ এর উদ্বোধনের পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অঞ্চল, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উদ্বোধন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের দিনে বিগত অভিযানের জাতীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ সংখ্যক ইঁদুর নিধনকারীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হবে। অঞ্চল, জেলা পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট জেলার সংসদ সদস্য/জেলা পরিষদ প্রশাসক/উপজেলা চেয়ারম্যান/ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ/পৌরসভার চেয়ারম্যান/মেয়র অথবা তার মনোনীত ব্যক্তি দ্বারা করাতে হবে। উপজেলা পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য/জেলা পরিষদ প্রশাসক/উপজেলা চেয়ারম্যান/সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অথবা তার মনোনীত প্রতিনিধি দ্বারা করাতে হবে।


ইঁদুর নিধনে পুরস্কার প্রদান
যারা পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন তাদের ক্রমানুসারে ১টি ক্রেস্ট, ১টি সনদপত্র ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। বিগত বছরের অভিযান বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ে পুরস্কার দেয়া হয়ে থাকে। পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রাথমিকভাবে অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক যাচাই করার পর জাতীয় পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে যাচাইপূর্বক চূড়ান্ত করে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।


ইঁদুর দমন পদ্ধতি পোকা ও রোগবালাই দমন পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ ইঁদুর চালাক প্রাণী এবং এখানে বিষটোপ ও ফাঁদ লাজুকতার সমস্যা রয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতি ও সঠিক স্থানে দমন পদ্ধতি গ্রহণ না করা হলে দমন ব্যবস্থা ততটা কার্যকর হয় না। একা ইঁদুর মারলে দমন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ ইঁদুর সর্বদা খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য স্থান পরিবর্তন করে থাকে। এজন্য পাড়া প্রতিবেশীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একই দিনে ও একই সময়ে ইঁদুর নিধন করা প্রয়োজন (মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও গণচীনে নির্দিষ্ট দিনে ও নির্দিষ্ট সময়ে এভাবে ইঁদুর নিধন করা হয়)। ইঁদুর দমনের কলাকৌশল অধিক সংখ্যক কৃষকের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রত্যেক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তার ব্লকের ৬০০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন। এ বছর ১৫,০০০ কর্মসূচি পুস্তিকা ও ১০০০০ পোস্টার মুদ্রণ করে অঞ্চল, জেলা ও উপজেলায় পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কর্মসূচি পুস্তিকায় ইঁদুর দমন প্রযুক্তি সংক্ষিপ্ত আকারে সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়া সরকার অনুমোদিত ব্রমাডিওলোন ও জিংক ফসফাইড গ্রুপের ইঁদুরনাশক (যেমন-ল্যানির‌্যাট, ব্রমাপয়েন্ট , রেটক্স, জিংক ফসফাইড ইত্যাদি) বিষটোপ যথেষ্ট পরিমাণে বালাইনাশক ডিলারের দোকানে মজুদ রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইঁদুরের সমস্যা দীর্ঘদিনের, এ সমস্যা আগে যেমন ছিল, বর্তমানেও রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন সবার সম্মলিত প্রচেষ্টা এবং অংশীদারিত্ব। একা ইঁদুর নিধন করার সাথে সাথে অন্যদের ইঁদুর নিধনের উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। একা ইঁদুর নিধন করলে সাময়িকভাবে এ সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে, তবে অল্প কিছুদিন পরই আবার অন্য স্থানের ইঁদুর এসে সমস্যার সৃষ্টি করবে। ঘরবাড়ি, গুদাম, হাঁস-মুরগির খামার, অফিস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিনিয়ত ইঁদুরের উপস্থিতি যাচাই করে ইঁদুর নিধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

কৃষিবিদ অমিতাভ দাস*
* পরিচালক, উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা

বিস্তারিত
স্মার্ট ইঁদুর প্রাণী ও দমন ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের কৃষকের মতে ইঁদুর হচ্ছে দুই নম্বর ক্ষতিকারক গুরুত্বপূর্ণ বালাই। পোকামাকড় হচ্ছে এক নম্বর ক্ষতিকারক বালাই। ইঁদুর জাতীয় প্রাণী প্রাকৃতিক পরিবেশে বৃহৎ এলাকা দখল করে আছে। বনজ ও আগাছা, ভূমি, মানুষের কৃষি জমি, গ্রাম ও শহর, রাস্তাঘাট, বাঁধ, সেচের নালা, হাঁস-মুরগির খামার এবং যেখানে মানুষ বাস করে সেখানে ইঁদুরের বিচরণ রয়েছে। সারা পৃথিবীতে ২৭০০টির অধিক অপকারী ও উপকারী ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর প্রজাতি আছে। বাস্তবে পৃথিবীর সব স্তন্যপায়ী প্রজাতির শতকরা ৪২ ভাগ ইঁদুর জাতীয় প্রাণী। বেশিরভাগ ইঁদুরের প্রজাতি অধিক পরিমাণে বংশ বিস্তার করতে পারে। এজন্য এদের মারা হলে পরিবেশের ভারসাম্যের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং দমন না করা হলে মাঠের ফসল, বাসা-বাড়ির জিনিসপত্র, অফিসের যন্ত্রপাতি ও মূল্যবান কাগজপত্র, রাস্তাঘাটের ক্ষতি এবং পরিবেশের দূষণ এবং ৬০ প্রকারের অধিক মারাত্মক রোগজীবাণুর বিস্তার ও ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যাবে।


একজন আদর্শ কৃষক বলেছেন ‘ইঁদুর স্মার্ট প্রাণী, এদের মারতে হলে বৃদ্ধি ও দমন কৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্মার্ট বা প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ হতে হবে।’ কারণ ইঁদুরের স্মরণশক্তি, ঘ্রাণশক্তি, প্রতিনিয়ত নিজের পরিবেশ যাচাই করার অভ্যাস, সন্দেহ প্রবণতা প্রখর, যে কোনো খাদ্য জিহ্বা বা ঘ্রাণ নিয়ে যাচাই করার পর গ্রহণ করে। বাচ্চাদের খাবার ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা না পেলে স্ত্রী ইঁদুর গর্ভধারণ করে না। বাচ্চার সংখ্যা বাড়ানোর ও কমানোর ক্ষমতা রয়েছে। ইঁদুর মারতে হলে সঠিক দমন কৌশল নির্বাচন করতে হবে। প্রতিটি ইঁদুরের প্রজাতির আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।


বন্যা বা বর্ষার পানি বেশি হলে মাঠের ইঁদুর রাস্তাঘাট, বাঁধ, উঁচু স্থানের অল্প জায়গায় আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। সিলেট অঞ্চলে এবার বন্যার পানিতে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় কারণ হিসেবে অতিবৃষ্টি ও ইঁদুরকে দায়ী করেছেন। বাস্তবে বাঁধ সহজে ভেঙে যাওয়ার জন্য ইঁদুরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইঁদুরের গর্তের কারণে সহজে বাঁধের ভেতর পানি ঢুকে গেছে। বন্যার পানি ফসলের জমিতে আসার সাথে সাথে মাঠের কালো ইঁদুর ও মাঠের বড় কালো ইঁদুর বাঁধের দুইধারে গর্ত খুঁড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। এ সময়  এতো বেশি মাঠের ইঁদুর বাঁধে জড়ো হয় যা বাঁধ এলাকায় ইঁদুর বন্যার সৃষ্টি হয়। বাঁধ ও সড়কে বর্ষার সময় প্রতি কিলোমিটারে ৩০০-৫০০টির বেশি ইঁদুরের গর্ত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এক কিলোমিটারে বাঁধে বা রাস্তায় ৫০০টির বেশি ইঁদুর জড় হয়। বাঁধে বা রাস্তাঘাটে ইঁদুর দমনের কোনো ব্যবস্থা নেই। কাজেই এটি ইঁদুরের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বর্ষার শুরু হতে বাঁধে ইঁদুর নিধন করা হলে বাঁধের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যাবে। এছাড়া পরবর্তীতে আমন ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কম হবে। বর্ষার প্রারম্ভে প্রতিটি ইঁদুরের গর্তে একটি গ্যাস বড়ি (Phostoxin Tablet) প্রয়োগ করে সহজেই ইঁদুর দমন করা যায়। এছাড়াও চিংড়ি মাছ অথবা শামুকে জিংক ফসফাইড বিষ দিয়ে প্রতিটি সতেজ গর্তে প্রয়োগ করে ইঁদুর নিধন করা যাবে। দুঃখজনক যে বাঁধ উঁচু রাস্তাঘাট, মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থা আগেও ছিল না, বর্তমানেও নেই এবং ভবিষ্যতে হবে বলে মনে হয় না। ইঁদুরের গর্তে শুধু  মাটি দিয়ে মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা রয়েছে। এতে কোনো কাজ হয় না। বাঁধ, মহাসড়ক বিভাগে বর্ষার সময় ইঁদুর দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে কোটি কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পাবে।


দেশের প্রতিটি শহরে ইঁদুরের কারণে কোটি কোটি টাকার রাস্তাঘাটের ক্ষতি, পানির অপচয়, ড্রেনে ইঁদুরের মাটি ভরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ইঁদুর দ্বারা নানা প্রকার রোগের বিস্তার ঘটে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা বা শহরে মশা নিধনের কার্যক্রম থাকলেও ইঁদুর দমনের কোনো কর্মসূচি নেই। সিঙ্গাপুরে ইঁদুরবাহিত রোগ (যেমন- প্লেগ) বিস্তার রোধে আইন রয়েছে কারও বাসাবাড়ির আঙিনায় ইঁদুরের উপস্থিতি থাকা আইনত দ-নীয় অপরাধ এবং জরিমানা দিতে হয়। আমাদের দেশে আইন নেই এবং ইঁদুর মারার ব্যবস্থাও নেই। কাজেই এখন শহরে যেমন  মানুষের সংখ্যা বেশি তেমনি গ্রামের চেয়ে শহরের ইঁদুরের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।


বাংলাদেশের কৃষক নানাভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইঁদুর নিধন করে থাকে। সবাই মরা ইঁদুর দেখতে পছন্দ করে। তাই অধিকাংশ কৃষক (৬০%) বিষটোপ দ্বারা ফসলের মাঠে ও ঘরবাড়িতে ইঁদুর নিধন করে। কৃষকের অভিমত ইঁদুরের বিষে কাজ হয় না, খায় না এবং মরে না। প্রধান কারণ সঠিক স্থানে, সময়ে ও সঠিকভাবে বিষটোপ ব্যবহার করেন না। তাদের বিষটোপ ব্যবহারে জ্ঞানের অভাব। বর্তমানে ৬-৭% বেশি কৃষক ইঁদুর নিধনে গ্যাস বড়ি প্রয়োগ করে থাকে। গ্যাস বড়ি ব্যবহারে কৃষকের প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। অপরদিকে ৩৯% কৃষক নানা রকম ফাঁদ ব্যবহার করে যা বেশি কার্যকর। জরিপের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার ফাঁদ সংগ্রহ করে কার্যকারিতা পরীক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিএআরআই এ কাজটি ডিএইর সাথে যৌথভাবে করতে পারে। শহরে বা বাসাবাড়িতে ইঁদুর নিধনের গ্লুবোর্ড ব্যবহার করা ভালো।


দেশের অধিকাংশ কৃষক (৬১%) মনে করেন ইঁদুর নিধনের দায়িত্ব সরকার ও কৃষকের। এটি একটি সামাজিক সমস্যা। কিন্তু সামাজিকভাবে ইঁদুর দমনের সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ বা প্রকল্প নেই। অধিকাংশ কৃষক ইঁদুর নিধনে ক্যানভাসার বা কীটনাশক ডিলারের পরামর্শ গ্রহণ করে থাকে। কৃষকের মতে ইঁদুর দমনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়ে থাকে যথা-ক্যানভাসার>টেলিভিশন>কৃষিকথা> উপজেলা কৃষি অফিস। টেলিভিশনে ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যবস্থাপনার কলাকৌশল বেশি প্রচারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।


এক জরিপের তথ্যে দেখা গেছে, ৮৬% কৃষক ইঁদুর নিধন অভিযানের পুরস্কার বা নগদ অর্থের পরিবর্তে বাজারে কার্যকর বিষটোপ পাওয়ার নিশ্চয়তা চেয়েছেন। অভিযানের পুরস্কারের মাধ্যমে অল্পসংখ্যক কৃষক বা ব্যক্তি উপকৃত হন। পুরস্কারের পরিবর্তে বিষটোপ/ গ্যাসবড়ি/ফাঁদ প্রতিটি উপজেলার এক/দুইটি গ্রামের কৃষককে প্রদান করে একযোগে ইঁদুর নিধন করা হলে বেশি ইঁদুর মারা পড়বে, জনগণের কর্মোদ্দ্যোগ বৃদ্ধি পাবে ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষতা লাভ করবে।


এতে ইঁদুর নিধন অভিযানের সফলতা বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি গ্রাম ২ জন কৃষক নিয়ে ইউনিয়নে ইঁদুর দমন দল গঠন করা যেতে পারে।  এদের ডিএই/বিএআরআই যৌথভাবে একদিনের প্রশিক্ষণ প্রদান করলে দমন প্রযুক্তির প্রসার ঘটবে। ফসল ও সম্পদের ইঁদুরজনিত ক্ষয়ক্ষতি কম থাকবে।

 

ড. সন্তোষ কুমার সরকার*

 *মুখ্য প্রশিক্ষখ (অব.), মোবাইল : ০১৭১৪২২২১৫৭

 

বিস্তারিত
ধানে ইঁদুর সমস্যা : ক্ষতি ও ব্যবস্থাপনা

ইঁদুর সবার কাছে পরিচিত স্তন্যপায়ী মেরুদণ্ডী বালাই যা মানুষের সাথে নিবিঢ়ভাবে সহাবস্থান করে। এ প্রাণী প্রতিনিয়তই কৃষকের কষ্টার্জিত ফসলের ক্ষতিসাধন করছে যেমন- মাঠের শস্য কেটেকুটে নষ্ট করে, খায় এবং গর্তে জমা করে।


গুদামজাত শস্যে মলমূত্র ও লোম সংমিশ্রণ করে।


মানুষ ও গবাদিপশুতে রোগবালাই ছড়ায়।


মাঠের ফসল উৎপাদন ও গুদামজাত শস্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ইঁদুর এক বিরাট সমস্যা। প্রজাতিভেদে এদের ওজন ৭০-৪৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। ইঁদুর আকারে ছোট হলেও বছরে সব ধরনের ক্ষতি মিলিয়ে প্রায় ১০-১২শ’ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য নষ্ট করে থাকে, যার বাজারমূল্য ৭শ’ কোটি টাকারও বেশি। ইঁদুর বেড়িবাঁধ ও বিভিন্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে গর্ত করে এবং মাটি সরিয়ে বাঁধ দুর্বল করে ফেলে। ফলে বাঁধ ভেঙে পানি দ্বারা প্লাবিত হয়ে বাড়িঘর, ফসলাদি ও গবাদিপশুর যে ক্ষতি সাধন করে তার আর্থিক মূল্য বিবেচনা করলে ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে। ইঁদুর দ্বারা প্রাথমিক ক্ষতি হয় ধান, গম, বাদাম ও নারিকেল ফসলে। বিভিন্ন ধরনের ইঁদুরের মধ্যে কালো ইঁদুর, মাঠের বড় কালো ইঁদুর, নরম পশমযুক্ত মাঠের ইঁদুর ও ছোট লেজযুক্ত ইঁদুর ধানের ক্ষতি করে। এদের মধ্যে কালো ইঁদুর মাঠে ও গুদামে এবং মাঠের বড় কালো ইঁদুর নিচু ভূমির জমিতে বেশি আক্রমণ করে। ইঁদুর যে কোনো পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে দ্রুত বংশ বিস্তার করতে পারে। উপযুক্ত এবং অনুকূল পরিবেশে একজোড়া প্রাপ্ত বয়স্ক ইঁদুর বছরে প্রায় ২০০০টি বংশধর সৃষ্টি করতে পারে। বাচ্চা প্রসবের পর ২ দিনের মধ্যেই স্ত্রী ইঁদুর পুনরায় গর্ভধারণ করতে পারে। এদের গর্ভধারণকাল প্রজাতিভেদে ১৮-২২ দিন হয়। সারা বছরই বাচ্চা দিতে পারে। মাঠ ফসলের শতকরা  ৫ থেকে ৭ ভাগ এবং গুদামজাত শস্যের ৩ থেকে ৫ ভাগ ইঁদুরের দ্বারা ক্ষতি হয়। ইঁদুর শুধু আমাদের খাদ্য শস্য খেয়ে  নষ্ট করে তাই নয় বরং এদের মলমূত্র, লোম খাদ্যদ্রব্যের সাথে মিশে টাইফয়েড জন্ডিস, প্লেগ, চর্মরোগ ও ক্রিমিরোগসহ প্রায় ৬০ ধরনের রোগ ছড়াতে পারে।


ইঁদুর কোথায় থাকে এবং ধান ক্ষেতে কি ক্ষতি করে?
মাঠের কালো ইঁদুর ও মাঠের বড় কালো ইঁদুর গর্তে থাকে। গর্তের মুখ বন্ধ রাখে এবং মাটি স্তূপ করে রাখে। একটি গর্তে একটি মাত্র ইঁদুর থাকে। সাধারণত আগাম পরিপক্ব ধানের জমিতে ইঁদুরের আক্রমণ বেশি হয়। ইঁদুর ধান গাছের কুশি তেরছা কোণে (৪৫ ডিগ্রি) কেটে দেয়। গাছের শীষ বের হলে শীষ বাঁকিয়ে নিয়ে কচি ও পাকা শীষগুলো কেটে দেয়। ইঁদুর ধান ফসলে তিন মৌসুমেই আক্রমণ করতে পারে। তবে আমন মৌসুমে নিরাপদ আশ্রয়স্থল, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং পানি সহজলভ্য হওয়া এবং মৌসুমের শেষভাগে বৃষ্টিপাত কম ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ সময়ে ইঁদুরের প্রজনন খুব বেশি হয়। ফলে ইঁদুরের সংখ্যা অন্যান্য মৌসুমের তুলনায় বেড়ে যায়। তাই ইঁদুরের প্রজনন শুরুর আগেই ইঁদুর নিধন অভিযান কার্যক্রম শুরু করা দরকার।


ইঁদুর কেন কাটাকাটি করে?
ইঁদুর বা ইঁদুর জাতীয় প্রাণীদের অনবরত কাটাকাটির অভ্যাস বিদ্যমান। কারণ এসব প্রাণীর মুখের ওপরের ও নিচের চোয়ালের সামনের জোড়া দাঁত চোয়ালের সাথে সরাসরি যুক্ত থ