কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

বাংলাদেশের ফল ও এর উন্নয়ন

ফলের দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু ফল আবাদের জন্য খুবই উপযোগী। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৩০ রকমের ফলের সন্ধান রয়েছে। তার মধ্যে প্রচলিত ও অপ্রচলিত প্রায় ৭০টি ফলের চাষাবাদ হয়। বাংলাদেশের ফল স্বাদে, গন্ধে ও বর্ণে আকর্ষণীয় এবং বৈচিত্র্যময়। ফল শরীরের ভিটামিন ও খনিজ লবণের প্রধান উৎস এবং ভেষজ বা ঔষধিগুণ সমৃদ্ধ। নিয়মিত ফল খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সুস্থ সবল জীবন লাভ করা যায়। ফলদ গাছ অক্সিজেন দেয়, কাঠ দেয়, ছায়া দেয় ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ফল গাছ পাখি ও প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়স্থল। তাছাড়া সৌন্দর্যবর্ধন ও পর্যটন আকর্ষণে ফল বাগান অনন্য ভূমিকা পালন করে।  
 

এখন ফলের মৌসুম। উৎপাদিত ফলের প্রায় ৬০% বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবণ এ চার মাসেই পাওয়া যায়। এ সময়কে মধুমাস বলা হয়। বিভিন্ন রকম দেশীয় ফল যেমনÑ আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, বাঙ্গি, তরমুজ, ডালিম, আনারসের সমারোহ এ সময় লক্ষণীয়। এর সাথে আরও পাওয়া যায় আমলকী, আতা, করমচা, জামরুল, বেল, গাব, কাঁচা তাল ইত্যাদি। আর বাকি ৪০% ফল পাওয়া যায় অবশিষ্ট ৮ মাসে।
 

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, দেশে যে পরিমাণ ফল উৎপাদন হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক। অধিকন্তু মধুমাসের চার মাস অর্থাৎ জুন-সেপ্টেম্বর মাসে ফল বেশি উৎপন্ন হয়। শীত মৌসুমে ফল প্রাপ্তি তুলনামূলকভাবে কম। এফএও প্রকাশিত একটি Country Nutrition Paper (FAO 2014) এ দেখা যায়, ২০১০ সালে মাথাপিছু ফল গ্রহণের পরিমাণ দৈনিক ৪৪.৮ গ্রাম যেখানে দৈনিক কমপক্ষে প্রয়োজন ১০০ গ্রাম। যদিও ফল গ্রহণের পরিমাণ এখন অনেক বেড়েছে তবুও চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। চাহিদা অনুযায়ী ফলের জোগান নিশ্চিত করতে হলে  ফলের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করতে হবে।
 

বিবিএস কর্তৃক প্রকাশিত কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০১৫ অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩.২৩ লাখ একর জমিতে মোট ফল উৎপাদিত হয়েছে ৪৬.৯৭ লাখ মে. টন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে যা ৪৩.৬ লাখ মে. টন ছিল। এ তথ্য অনুযায়ী ফলের বার্ষিক উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৭.৭%।
 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর দূরদর্শী পরামর্শে সরকারিভাবে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র উষ্ণ ও অবউষ্ণ ম-লীয় ফলের ওপর নিবিড় গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে অদ্যাবধি ৩২টি বিভিন্ন ফলের ৭৬টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে এবং ৭১টি টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। ইতোমধ্যে বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত মাল্টা, আম, পেয়ারা, কুল, লিচু, কলা, পেঁপে, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল ইত্যাদি দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত ও কৃষক কর্তৃক সমাদৃত হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টার আম, পেয়ারা ও কুলের বেশ কয়েকটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে ।
 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) প্রতি বছর প্রায় এক কোটিরও বেশি ফলদ বৃক্ষ লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। শুধু গাছ লাগানোই নয়, গাছ লাগানোর পর তার পরিচর্যার মাধ্যমে কিভাবে মানসম্পন্ন ফল উৎপাদন, আহরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ করা যায় তার প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। ডিএইর আওতায় বাস্তবায়নাধীন ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’সহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ফল উৎপাদন ও পুষ্টি উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ডিএই’র আওতায় সারা দেশে ৭৩টি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে প্রতি বছর মানসম্পন্ন চারা/কলম উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়। এসব সেন্টার থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৭.৫২ লাখ ফলের চারা ও ৬.৬৩ লাখ ফলের কলম উৎপাদন করা হয়েছে।  
 

ফল উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিএডিসিও কাজ করে যাচ্ছে। বিএডিসির উদ্যান উন্নয়ন বিভাগ এবং এগ্রো সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে সারা দেশে ২৩টি প্রদর্শনী খামার এবং প্রদর্শনী খামার প্রকল্প এলাকার মাধ্যমে ফল উৎপাদন করে আসছে। এছাড়া বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বন বিভাগও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল গাছ রোপণ করছে।
সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ এবং কৃষি বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণবিদ ও ফল চাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশ আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। আর মোট ফল উৎপাদনে বিশ্বের ২৮তম স্থানে রয়েছে।

 

বাংলাদেশে ফল চাষে বৈচিত্র্য এসেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বিদেশি ফল বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী করে দেশে প্রবর্তন করছে।  ফলশ্রুতিতে বর্তমানে বাণিজ্যিক উপায়ে ড্রাগন ফ্রুট, স্ট্রবেরি, আঙুর, মাল্টা, কমলা ইত্যাদি ফল চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মাঠে অস্থায়ীভাবে খাটো জাতের আম এবং পেয়ারা চাষ করা হচ্ছে। মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশনায় ভিয়েতনাম থেকে খাটো জাতের নারিকেল গ্রাম অঞ্চলের জন্য এবং ভারতের কেরালা থেকে উচ্চফলনশীল নারিকেল শহর অঞ্চলের জন্য প্রবর্তন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের কারণে সারা বছর দেশে উৎপাদিত বিদেশি ফলসহ  হরেক রকম ফল বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
 

ফল সরাসরি খাওয়া যায় যা পুষ্টির উপাদানে ভরপুর এবং সুস্বাদু। অথচ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কর্তৃক ফলে ফরমালিন, কার্বাইড বা অন্য রাসায়নিক পদার্থ মিশানোর কারণে কয়েক বছর আগেও খাদ্য তালিকায় ফল রাখতে অনেকেই আগ্রহ হারিয়েছিল। ফলে ফরমালিন ও অন্যান্য রাসায়নিক ব্যবহার রোধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে। বর্তমান সরকার ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ এবং ‘ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫’ প্রণয়ন ও কার্যকর করেছে। ভোক্তা অধিকার আইনসহ এসব নতুন প্রণীত আইন ও তার সঠিক প্রয়োগের ফলে জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি থেকে জনগণ পরিত্রাণ পেতে শুরু করেছে।
 

সরকার ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও পুষ্টি সম্পর্কিত গবেষণার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ‘বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ (বারটান) প্রতিষ্ঠা করেছে। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে, যাতে জনগণ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে সুষম ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ‘নার্সারি গাইড লাইনস-২০০৮’ প্রণয়ন করে নার্সারি শিল্পের মানোন্নয়ন করা হয়েছে এবং নিয়মিত ফল মেলার আয়োজন করে ফল বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও বাজার সংযোগ স্থাপনের সহায়তা করা হচ্ছে।
 

শরীরের চাহিদামতো নিয়মিত পুষ্টি সরবরাহ করতে হলে ফল উৎপাদন, আহরণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদিত ফলের এক বিরাট অংশ সংগ্রহের পর বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির ২৫ থেকে ৪০ ভাগই সংগ্রহের পর বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়। আবার ভরা মৌসুমে অধিক সরবরাহের ফলে দাম অনেক কমে যায়, ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। ফল সংগ্রহের পর যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ করা হলে একদিকে অপচয় কমবে, অপরদিকে  উৎপাদনকারীর ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করে সবার জন্য বছরব্যাপী পুষ্টি নিশ্চিত করা যাবে। উন্নত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বেশি দিন ফল সংরক্ষণ, আকর্ষণীয় বাজার মূল্য প্রাপ্তি এবং বিদেশে রপ্তানি বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। ডিএই’র তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিদেশে ৫,৭৯৭ মে. টন ফল রপ্তানি হয়েছে। এ পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করার সুযোগ রয়েছে।
 

বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমনÑ প্রাণ, আকিজ, স্কয়ার, এসিআইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্যাকেটজাত ফল জাতীয় পণ্য বিদেশে রপ্তানি করছে। হর্টেক্স ফাউন্ডেশন উন্নত প্যাকেজিংয়ের লক্ষ্যে সরকারের সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছে। চেইন শপগুলোও ফল বিপণনে ভূমিকা রাখছে। এক্ষেত্রে আরও নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হলে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে, ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে এবং কৃষক ফলের ন্যায্যমূল্য পাবে। পারিবারিক পর্যায়ে ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ জনপ্রিয় করা গেলে পরিবারের উপার্জন বৃদ্ধি পাবে, পরিবারের নারীরা স্বাবলম্বী হবে। আবার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি মাধ্যমে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের পরিসর আরও বৃদ্ধি করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে।
 

ফলের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন এর চাষাবাদ সম্প্রসারণ। বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর পতিত জমি রয়েছে। যেখানে অনায়াসেই উন্নত জাতের দেশি ফলের আবাদ করা যেতে পারে। দেশে ফল চাষ উপযোগী রয়েছে প্রায় ২ কোটি বসতবাড়ির উঁচু জমি। এসব বসতবাড়িতে পরিকল্পিতভাবে ফল চাষ করা যায়। বসতবাড়ি ছাড়াও গ্রামীণ রাস্তা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, স্কুল, কলেজ, অফিস আদালতের অব্যবহৃত জায়গা ও রেললাইনের দুই ধারে এবং নগরের ভবনের ছাদে দেশি জাতের ফল গাছ রোপণ করে ফলের উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া উন্নত পদ্ধতিতে ফল চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্যবিমোচন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উৎপাদিত ফলের ওপর ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকারখানা গড়ে তোলারও রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। ফল চাষকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার নার্সারি। এসব নার্সারি থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার চারা ও কলম বিক্রি হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
 

বর্তমান সরকারের আমলে দেশে ফল চাষসহ কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়েছে এবং এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। আগামীতে বাংলাদেশের ফল দেশের চাহিদা পূরণ করে বিশ্বের বাজারে আরও বেশি স্থান করে নিতে পারে এজন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে সবার দৃষ্টি দিতে হবে। কৃষিক্ষেত্রে যে বিপ্লব সাধিত হয়েছে তা যাতে অব্যাহত থাকে সেজন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির নিমিত্ত প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণকে কৃষি মন্ত্রণালয় এখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অন্যদিকে যে কৃষক তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোদবৃষ্টির ধকল কাটিয়ে ফল উৎপাদনে ব্যস্ত থাকে সে যেন প্রয়োজনমতো সব কৃষি উপকরণ পাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত ফলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হয় তার যাবতীয় ব্যবস্থার জন্য আমাদের সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে।

 

মো. মোশারফ হোসেন*
*অতিরিক্ত সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয় ও নির্বাহী পরিচালক, বারটান, ঢাকা

 

 

বিস্তারিত
মুড়ি ধান (Ratoon Rice)

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- অকাল বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা পূরণে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির একটি উপায় হিসেবে মুড়ি ধান চাষের ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। কারণ খাদ্য নিরাপত্তায় মুড়ি ধান একটি গুরুত্বপূর্র্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বোরো-পতিত-রোপা আমন শস্য বিন্যাসে এ মুড়ি ধান চাষ করে মূল ফসলের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।
 

বোরো মৌসুমের আগাম জাতে জমির মূল ধান কাটার পর ধান গাছের নাড়া থেকে নতুন কুশি জন্মায়। এ কুশি থেকে আমরা যে ধান পাই তাকেই মুড়ি ধান বলে। আগাম জাত মুড়ি ধান চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মুড়ি ধান উৎপাদন নতুন কোনো ধারণা নয়। আবহমান কাল থেকে আমাদের দেশের মধ্যম উঁচু অঞ্চলের কৃষক জমিতে মুড়ি/নাড়া রেখে ধান উৎপাদন করত। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতির ব্যবহার রয়েছে।
 

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৮৭ সাল থেকে মুড়ি ধানের ওপর গবেষণা শুরু করে। মাঠ পরীক্ষণে দেখা গেছে, বিআর১৭ জাত চাষ করে মূল ফসলে প্রতি বিঘায় ০.৮০ টন এবং মুড়ি ধান থেকে প্রতি বিঘায় ০.২০ টন ফলন পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে মুড়ি ধান উৎপাদনের জন্য জমিতে মূল ফসল কাটার ২০ দিন আগে বিঘাপ্রতি ৫ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করা হয়। এ ছাড়া ২০০৪-০৫ এবং ২০০৫-০৬ সালে ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭ এবং ব্রি ধান৩৮ এ মুড়ি চাষ করে দেখা গেছে, হেক্টর প্রতি সর্বোচ্চ ২.২১ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া গেছে।
গত বোরো মৌসুমে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলায় মুড়ি ধানের চাষাবাদ পদ্ধতি এবং ফলন পর্যবেক্ষণ করে বিআর২৬ এবং ব্রি ধান২৮ এ মুড়ি ধানের ভালো ফলন পাওয়া গেছে। যেসব কৃষক ১২-১৮ ইঞ্চি নাড়া রেখে বোরো ধান কেটেছেন তাদের জমিতে মুড়ি ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে হেক্টরপ্রতি মুড়ি ধানের ফলন পেয়েছেন ১-১.৫ টন। কিছু কিছু কৃষক মুড়ি ধানের জন্য কীটনাশক ব্যবহার করেছেন এবং আগে থেকেই গরু, ছাগল এসবের ক্ষতি থেকে মুড়ি সংরক্ষণ করেছেন। বর্তমান বাজারদরে মুড়ি ধান মাড়াই-ঝাড়াই ও শুকানো বাবদ আনুমানিক খরচ একরপ্রতি ৪ হাজার-৫ হাজার টাকা এবং উৎপাদিত ধানের মূল্য প্রতি একরে ৮ হাজার-১০ হাজার টাকা, যা বেশ লাভজনক। অন্তত ৫ হাজার টাকা লাভ হয়।

 

চাষ পদ্ধতি
 বোরো মৌসুমের আগাম জাত বিআর২৬ ও ব্রি ধান২৮ মুড়ি ধান উৎপাদনের জন্য উপযোগী। এ পদ্ধতিতে ভালো ফলন পাওয়ার জন্য এ জাতগুলোর পাকা ধান কা- সবুজ থাকা অবস্থায় কাটতে হবে;
সাধারণত বোরো মৌসুমে মধ্যম উঁচু জমিতে মুড়ি ধান চাষ করা যায়;
মুড়ি ধান চাষের জন্য মূল ফসল কাটার সময় গাছের গোড়া থেকে ২০-৩৫ সেন্টিমিটার নাড়া বা ২-৩টি নোড বা পর্ব রেখে ফসল কাটতে হবে;
মূল ফসল কাটার ৫-৭ দিন পর বিঘাপ্রতি ৫ কেজি ইউরিয়া ও ৫ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করলে বিঘাপ্রতি ৫-৬ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়;
 বোরো-পতিত-রোপা আমন এ শস্য বিন্যাস মুড়ি ধান চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী;
মুড়ি ধান চাষে মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি রাখতে হবে যেন নাড়া থেকে কুশি জন্মাতে পারে এবং নতুন কুশি মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে;
মুড়ি ধান চাষের জন্য এমন জাতের ধান নির্বাচন করতে হবে যার কুশি উৎপাদন ক্ষমতা বেশি এবং বাতাসে সহজে ঢলে পড়ে না;
মুড়ি ধানে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রয়োজনে বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

 

মুড়ি ধান চাষের সুবিধা
এ পদ্ধতিতে একবার জমি চাষ করেই দুইবার ফসল পাওয়া যায় এবং মূল ফসলের অতিরিক্ত প্রায় ৫০ ভাগ পর্যন্ত ফলন হতে পারে;
এ পদ্ধতিতে বীজ ধান, বীজতলা ও জমি তৈরি এবং রোপণ খরচ লাগে না বিধায় এটি ব্যয় সাশ্রয়ী প্রযুক্তি;
মূল ফসলের চেয়ে মুড়ি ধান পাকতে ৬৫ ভাগ কম সময় লাগে;
মুড়ি ধানের জন্য জমি তৈরি ও চারা রোপণ করতে হয় না এবং সেচ, সার ও শ্রমিক খরচ ৫০-৬০ ভাগ কম লাগে;
একবার চাষ করে একই জমি থেকে দুইবার ফলন পাওয়ায় শস্যের নিবিড়তাও বাড়ে।

 

মুড়ি ধান চাষে সতর্কতা
মুড়ি ধান পোকামাকড়ের আশ্রয়স্থল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বিধায় পরবর্তী মৌসুমে পোকামাকড়ের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্লোরোপাইরিফস (২০ তরল) এবং ফেনিট্রোথিয়ন (৫০ তরল) হেক্টরপ্রতি ১ লিটার হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে;
মুড়ি ধান চাষের সফলতা মূল ফসলের আন্তঃপরিচর্যার ওপর নির্ভর করে;
মুড়ি ধান চাষে পরবর্তী মৌসুমের জমি তৈরি ও ফসল চাষে দেরি হতে পারে। আগাম জাত নির্বাচন মুড়ি ধান ফসলের জন্য ভালো।
মুড়ি ধান চাষের সময় জমিতে ১-১.৫ ইঞ্চি পানি রাখলে ফলন ভালো হয়।

 

ড. মো. শাহজাহান কবীর* ড. মো. আনছার আলী** ড. ভাগ্য রানী বণিক***
*পরিচালক (প্রশাসন ও সাধারণ পরিচর্যা); **পরিচালক (গবেষণা) এবং ***মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর

বিস্তারিত
পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ অর্থকরী ফসল বিলাতি ধনিয়া

বিলাতি ধনিয়া বিলাত থেকে এসেছে কিনা কেউ জানে না। হয়তো আসতে পারে সে কোন কালে। তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলের একটি অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার ওয়াগগা, বেতবুনিয়া, কাউখালী, খগড়া এলাকায় ব্যাপকভাবে এবং খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার কিছু কিছু এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে এ ফসলটির চাষ হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। সিলেটে ঢুলা নামে পরিচিত। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার বাহিরে এর পরিচিতি কম এবং ইংরেজি কোনো সুনির্দিষ্ট নামও নেই। তবে  কোথায়ও কোথাও এটাকে False Coriander নামে অভিহিত করা হয়। ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এটাকে Eryngium বলা হয়। শ্রীলংকায় এটি আগাছা হিসেবে বিবেচিত। বহুকাল পূর্ব থেকেই এদেশের দক্ষিণ পূর্ব  পার্বত্য অঞ্চলে এর চাষ করা যায়। এজন্য প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. মামুনুর রশিদ তাঁর  সবজির চাষ বইটিতে এটিকে বাংলা ধানিয়া নামে অভিহিত করছেন। এ ফসলটির উন্নয়ন ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য কৃষি গবেষণা  উপকেন্দ্র রাইখালীতে ব্যাপক গবেষণা চলছে।
 

উৎপত্তি ও বিস্তার : বিশ্বের অন্যান্য প্রধান ফসলের তুলনায় কম বিস্তৃত এবং এ ব্যাপারে তেমন অনুসন্ধান না হওয়ায় বিলাতি ধনিয়ার উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে  স্পষ্ট করে কিছু বলা কঠিন। প্রাপ্যতা ও বিস্তৃতির  ধরন দেখে আসাম, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের  পূর্বাঞ্চলই এ প্রজাতিটির উৎপত্তিস্থল বলে ধারণা করা হয়। কোনো কোনো বিজ্ঞানীর মতে, দক্ষিণ আমেরিকাই  এর উৎপত্তিস্থল যা ক্রমান্বয়ে  পাক-ভারত উপমহাদেশসহ গ্রীষ্মম-লীয় বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করেছে। ভিয়েতনাম এবং ওয়েস্টইন্ডিজের ত্রিনিদাদ ও টোবাগো থেকে কুলিনারি হার্ব বা সালাদ জাতীয় অর্থকরী ফসল হিসেবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা হয়। অবশ্য Eryngium yuccifolium নামে এর অন্য একটি প্রজাতি অল্প পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রে চাষ করা হয়। এছাড়াও আর্জেন্টিনাতে Eryngium paniculatum Cav তুরস্কে Eryngium giganteum এবং জর্ডানে Eryngium creticum নামক প্রজাতির চাষ হয়। শীতপ্রধান দেশের মধ্য জার্মানিতে গ্রীষ্মকালে  Eryngium maritimum প্রজাতির চাষ হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল ও ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও মিয়ানমারের কিয়দংশে এর চাষাবাদের সম্প্রসারণ বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।
 

উদ্ভিদতত্ত্ব : Eryngium, Apiaceae or Umbelliferae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এ উদ্ভিদটির  বৈজ্ঞানিক নাম ঊৎুহমরঁস ভড়বঃরফঁস এটি একটি  ক্ষুদ্রাকার দীর্ঘজীবী  বিরুৎ। কাণ্ড অস্পষ্ট ও ভূসংলগ্ন। কিন্তু  ফুল আসার সময় উপরদিকে  বাড়ে এবং কা- ফাঁপা হয়ে শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়। পাতা দৈর্ঘ্যে ১৫-২০ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ২-৩  সেন্টিমিটার  এবং পত্রফলকের কিনারা সামান্য খাঁজযুক্ত ও অগ্রভাগ ছোট ছোট সূক্ষ্ম কাঁটাযুক্ত হয়। এটি একটি ছায়াপ্রিয় উদ্ভিদ। ফুল ক্ষুদ্রাকৃতির বৃন্তবিহীন এবং মঞ্জুরি দণ্ডে ঘন সন্নিবেশিত থাকে। বীজ দ্বিবীজপত্রী, অমসৃণ, ক্ষুদ্রাকৃতির বৃন্তবিহীন এবং মঞ্জুরি দণ্ডে ঘন সন্নিবেশিত থাকে। এ উদ্ভিদটির পরাগায়ন বা অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় বিষয় সম্পর্কে তেমন গবেষণা না হওয়ায় এ সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। সাধারণত বীজ এবং পার্শ্ব সাকার থেকে এর বংশবিস্তার হয়ে থাকে। তবে বিএআরআই এ নিয়ে তাদের গবেষণা অব্যাহত রেখেছে।
 

আবহাওয়া ও মাটি : বিলাতি ধনিয়া প্রধানত খরিফ মৌসুমের ফসল। রবি মৌসুমে বাড়বাড়তি মোটেই সন্তোষজনক নয়। নাতিশীতোষ্ণ থেকে  উষ্ণ ও আর্র্দ্র আবহাওয়া  বিলাতি ধনিয়া চাষের জন্য উপযোগী। অত্যধিক শীতল আবহাওয়ায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বিলাতি ধনিয়ার বৃদ্ধি একেবারেই কমে যায়। বিলাতি ধনিয়া প্রখর সূর্যালোকের চেয়ে ছায়াতে বা হালকা বিক্ষিপ্ত আলোতে ভালো পাতা উৎপাদন করে। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই বিলাতি ধনিয়া জন্মে। বিলাতি ধনিয়া চাষের জন্য প্রচুর জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ থেকে এঁটেল দো-আঁশ মাটি বেশি উপযোগী। ভালো ফলনের জন্য মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকা প্রয়োজন আবার দাঁড়ানো পানিও সহ্য করতে পারে না। এজন্য প্লাবন সেচের চেয়ে ঝর্ণা সেচ ধনিয়া চাষের জন্য বেশি উপযোগী। পাহাড়ি অঞ্চলে সাধারণত পাহাড়ের পাদদেশীয় সমতলে এর চাষ এবং ঢালে ও সমতলে বীজ উৎপাদন করা হয়।  তবে এদেশের সমতল ভূমিতেও সাফল্যজনকভাবে এর চাষ করা যায়।  


জমি তৈরি : বিলাতি ধনিয়া চাষের জন্য খুব ভালোভাবে জমি প্রস্তুত করা প্রয়োজন। ৫/৬টি চাষ ও উপর্যুপরি মই দিয়ে মাটির ঢেলা ভেঙে ঝুরঝুরা করা প্রয়োজন। কেননা বিলাতি ধনিয়ার বীজ খুব ক্ষুদ্রাকৃতির বালির দানার মতো ছোট হওয়ায় বড় আকারের ঢেলার মধ্যে গজানো সম্ভব  নয়। এজন্য মটরদানা বা  মার্বেলের চেয়ে বড় আকারে ঢেলা থাকা ঠিক না। বীজ বপনের আগে মাটিতে প্রয়োজনীয় রস বা জো অবস্থা থাকা খুব প্রয়োজন। প্রয়োজনে বপনের আগে একবার হালকা সেচ দেয়া যেতে পারে। তবে নভেম্বর ডিসেম্বর মাসে অধিকাংশ মাটিতে প্রয়োজনীয় রস থাকে। এক মিটার চওড়া বেড, জমির সমান লম্বা এবং ৩০ সেন্টিমিটার চওড়া নালা  রাখা প্রয়োজন। এ নালার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরিচর্যা, পানি সেচ ও নিষ্কাশনের কাজ সহজ হয়।
 

বীজ বপন : নভেম্বর থেকে জানুয়ারি বা অগ্রহায়ণ-পৌষ  মাস বিলাতি ধনিয়ার বীজ বপনের উত্তম সময়। মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকলে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বপন করা যায়। তবে বীজ বপনের পরেও অন্তত ২০-২৫ দিন কম তাপমাত্রা থাকা প্রয়োজন। কেননা বিলাতি ধনিয়া বীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা হলো ১০-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে এর গজানো হার কমে আসে। বিলাতি ধনিয়ার বীজে এক মাসের বেশি সাধারণ অবস্থায় অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা থাকে না। এজন্য বীজ সংগ্রহের পর যত শিগগির সম্ভব হালকাভাবে ছায়াতে শুকিয়ে বপন করা উচিত। বিলাতি ধনিয়ার ক্ষুদ্রাকৃতির বীজ সমানভাবে বোনা বেশ কষ্টকর এবং বিশেষ দক্ষতারও প্রয়োজন। তাই বালির সাথে মিশিয়ে বীজ বোনা ভালো।  ১০-১৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারিতে অথবা ছিটিয়ে বীজ বপন করা য়ায় । গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি হেক্টরে ৩৫ থেকে ৪০ কেজি হারে বা প্রতি বর্গমিটারে ৪ গ্রাম অর্থাৎ প্রতি শতাংশ জমিতে ১৬০ গ্রাম বীজ বপন করে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়। ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে বীজ বপনের পর মাটি ওপরের স্তরের ১-১.৫ সেন্টিমিটার গভীরতা পর্যন্ত মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। লাইনে বপন করলে ১.৫-২.৫ সেন্টিমিটার গভীর নালা করে নালাতে লাইন করে বীজ ছিটিয়ে  দুই পাশে মাটি দিয়ে হালকাভাবে ঢেকে দিতে হবে। অতি ক্ষুদ্রাকৃতির বীজ হলেও প্রতি শতাংশে ১৫০ থেকে ১৬০ গ্রাম বীজ আপাত দৃষ্টিতে অনেক বেশি বলে মনে হয়। কিন্তু এর সব বীজ এক সাথে গজায় না। কয়েক মাস পর্যন্ত বীজ ক্রমান্বয়ে গজাতে থাকে। একই দিনে বোনা বীজ গজাতে ১৫-১২০ দিন পর্যন্ত সময় নেয়।  ফলে একবার বীজ বপন করেও কৃষক অনেক বার মানে অন্তত ৮-১২ বার ফসল তুলতে পারেন।
 

সার প্রয়োগ : বিলতি ধনিয়া পাতাজাতীয় ফসল হওয়ায় এর জন্য ইউরিয়া ও  পটাশ জাতীয় সার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বীজ বপনের আগে শতাংশপ্রতি ৮০ কেজি পচা গোবর বা আবর্জনা পচা সার কম্পোস্ট, ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৮০০ গ্রাম টিএসপি ও ৮০০-১০০০ গ্রাম এমওপি শেষ চাষের সময় বীজ বপনের ৩/৪ দিন পূর্বে জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে। চারা গজানো পর থেকে ১ মাস  পর অথবা প্রতি দুইবার ফসল সংগ্রহের পর প্রতি শতাংশে ২০০  গ্রাম হারে  ইউরিয়া উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। এভাবে প্রতি হেক্টর জমিতে মোট ২০ টন কম্পোস্ট, ৩০০-৪০০  কেজি ইউরিয়া ২০০ কেজি টিএসপি এবং ২০০-২৫০ কেজি এমওপি সারের প্রয়োজন হবে।
 

ছাউনি দেয়া : বিলাতি ধনিয়ার পাতা নরম, চওড়া ও মসৃণ হওয়ায় জন্য জমিতে ছাউনি দেয়া একান্ত প্রয়োজন। তা না হলে প্রখর সূর্যালোকে পাতা শক্ত হয়, কাঁটাযুক্ত হয়ে যায়, বাজার মূল্য একেবারে কমে যায়। আবার সম্পূর্ণ আলোক বিবর্জিত হলেও ফলন ভালো হয় না । কৃষি গবেষণায় দেখা গেছে, মাচায় ব্যবহৃত ছাউনির দ্রব্যের ওপর বিলাতি ধনিয়ার ফলন নির্ভর করে না। শুধু ছাউনির ঘনত্বের বা আলো প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর এর গুণাগুণ ও ফলন নির্ভর করে। মোট সূর্যালোকের শতকরা ২০-৪০ ভাগ বিক্ষিপ্ত আকারে পেলেই  বিলাতি ধনিয়ার জন্য যথেষ্ট। এজন্য যে বাঁশের  তৈরি মাচায় নারিকেল পাতা, ছন, ধৈঞ্চা, কলাপাতা দিয়ে ছাউনি তৈরি করা যায়। আবার হালকা মাচার ওপর কুমড়া বা লতাজাতীয়  গাছ তুলে দিয়ে তা থেকে বেশ কিছু বাড়তি ফলন পাওয়া যায়।  মাচার পাশ দিয়ে সরাসরি যাতে সূর্যালোক না পড়ে সেজন্য বেড়া দেয়ারও প্রয়োজন।
 

সেচ ও নিকাশ : বিলাতি ধনিয়ার জন্য সব সময় পর্যাপ্ত রস থাকতে হবে আবার গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেয়া যাবে না। এজন্য ঝর্ণা পদ্ধতিতে মাটির অবস্থা বুঝে ৪-৭ দিন পরপর হালকা সেচ দেয়া ভালো। বেডের পাশের নালা দিয়ে বৃষ্টি সময়ে অতিরক্ত পানি বের করে দেয়ার সুব্যবস্থা থাকতে হবে।
 

অন্যান্য পরিচর্যা : বিলাতি ধনিয়ার সবচেয়ে বড় শত্রু আগাছা। বীজ বপনের পরে চারা গজানো পূর্ব থেকে ফসল তোলা শেষ পর্যায় পর্যন্ত জমিকে সর্বদা আগাছামুক্ত রাখতে হবে। মাঝে মাঝে বিলাতি ধনিয়ার গাছে পুষ্পদ- দেখা দিলে তা গোড়া থেকে ভেঙে দিতে হবে। তা না হলে পাতা উৎপাদন ব্যহত হয় এবং ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। তবে আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসে গাছ পাতলা করে এগুলো রেখে দিলে পরবর্তী বছরের জন্য বীজ উৎপাদন করা সম্ভব হয়।
 

 রোগবালাই দমন : বিলাতি ধনিয়াতে রোগ বালাই খুব একটা বেশি হয় না। তবে গোড়ায় পানি জমলে বা মাটি বেশি স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেলে কচি চারা গাছের ক্ষেত্রে গোড়া পচা অথবা ড্যাম্পিং অফ রোগ ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। এজন্য জমিতে কোনোভাবেই যেন পানি  জমে না থাকে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে এবং জমি সব সময়  সুনিষ্কাশিত রাখতে হবে। তারপরও এ রোগ দেখা দিলে  প্রতি বর্গমিটারে ১ লিটার হারে ১% বোর্দোমিশ্রণ (১০০:১:১-পানি:তুতে:চুন) অথবা নোইন নামক ছত্রাকনাশকের ০.০৩% দ্রবণ একই হারে গাছের গোড়ায় ও মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলেন, এ সমস্যা সমাধানের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
 

ফসল তোলা : সাধারণত বিলাতি ধনিয়ার সম্পূর্ণ গাছ তুলে সংগ্রহ করা হয়। ১৫-২৫ সেন্টিমিটারের  মতো পাতাসহ লম্বা গাছগুলো তুলে নেয়া হয়। মরা বা পুরনো পাতা অপসারণ করে পানিতে ধুয়ে ১ কেজি বা আধা কেজির আঁটি বেঁধে বাজারজাত করা হয়। বড় চারাগুলো তুলে নেয়ার পর ইউরিয়া সার প্রয়োগ ও আগাছা বাছাই করার পর অবশিষ্ট গাছগুলো বড় হতে থাকে এবং ১৫-২০ দিনের মধ্যে পুনরায় আহরণযোগ্য হয়। এভাবে ৮-১২ বারে প্রতি হেক্টর জমি থকে সর্বমোট ৩০ থেকে ৫০ টন (প্রতি শতাংশে ১২০-২০০ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়ায় যায়। কিচেন গার্ডেনের ছোট প্লটে লাগানো গাছ থেকে গৃহিণীরা সরাসরি পাতা তুলে ও  ব্যবহার করতে পারেন। এভাবে একবার রোপণ করা গাছ থেকে বহুবছর পর্যন্ত পাতা সংগ্রহ করা যায়।


বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ : বিলাতি ধনিয়ার বীজ উৎপাদন এবং সংরক্ষণের বিজ্ঞানসম্মত উন্নত পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা চলছে। পার্বত্য এলাকার কৃষকগণ কখনও কখনও পাহাড়ের ঢালে বীজ বপন করে ছাউনিবিহীন ফসল আবাদ করে সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করেন। আবার পূর্ববর্তী ফসলে অবশিষ্টাংশ থেকে উৎপাদন পুষ্পদ- থেকেও  বীজ সংগ্রহ  করা হয়। সাধারণত ফুল ফোটা বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ : বিলাতি ধনিয়ার বীজ উৎপাদন এবং সংরক্ষণের বিজ্ঞানসম্মত উন্নত পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা চলছে। পার্বত্য এলাকার কৃষকগণ কখনও কখনও পাহাড়ের ঢালে বীজ বপন ব্যবহার :উপযোগিতা ও ভবিষ্যৎ : থেকে বীজ পরিপক্ব হতে দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগে। শতাংশপ্রতি ২-৪ কেজি বা হেক্টরপ্রতি ৫০০ থেকে ১০০০ কেজি পর্যন্ত বীজ পাওয়া  যায় বলে পাহাড়ি চাষিরা তথ্য দিয়েছেন। রিক্যালসিট্র্যান্ট স্বভাবের জন্য বিলাতি ধনিয়ার বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। ছায়াযুক্ত স্থানে হালকাভাবে বিছিয়ে শুকিয়ে সাধারণ তাপমাত্রায় বায়ু চলাচলযুক্ত মাটির পাত্রে বা ছিদ্রযুক্ত প্যাকেটে (কাগজ, ব্রাউন পেপার ব্যাগ, সুতি কাপড়, প্লাস্টিকের পাত্র) এক থেকে দুই মাস এবং রেফ্রিজারেটরে নিম্ন তাপমাত্রায় (২-৫ ডিগ্রি সে.) সংরক্ষণ করলে আরও বেশি দিন পর্যন্ত এর গ্রহণযোগ্য (৫০%) অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বজায় রাখা যায় । প্রখর রৌদ্রে বেশি শুকিয়ে গেলে এর তেজ এবং অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা কমে যায়। সেজন্য মোলায়েম রোদে শুকালে বেশি ভালো হয়।
 

ব্যবহার : বিলাতি ধনিয়ার পাতা ও কচি পুষ্পদণ্ড একাধারে সবজি, সালাদ এবং মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রান্নার কাজে তরকারিতে, ডাল, ভাজি ও নিরামিষে সুগন্ধি বাড়ায়। সালাদ হিসেবে অন্যান্য সালাদের সাথে মিশ্রণে সবজি হিসেবে এবং ভর্তা করেও খাওয়া যায়। এছাড়াও বেসন দিয়ে বিলাতি ধনিয়া পাতার বড়া তৈরিতে, পেঁয়াজুতে, সিঙ্গাড়ায় এবং ভেজিটেবল রোলে সুগন্ধি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এ ফসলটির পুষ্টি গুণাগুণ সম্পর্কিত তথ্যর জন্য জরুরি অনুসন্ধান প্রয়োজন। বিলাতি ধনিয়ার ঔষধি গুণাগুণ ও রয়েছে। এর পাতা, কাণ্ড ও ফুলে বিভিন্ন উদ্বায়ী সুগন্ধি তেলজাতীয় পদার্থ এবং ডোডেসিনোয়িক এসিড (১৫.৫%) এবং ই-২ ডোডেসিনোয়িক এসিড (৪৫.৫%) রয়েছে যা এ সুগন্ধির কারণ। এসব  উদ্বায়ী সুগন্ধি তেলজাতীয় পদার্থ এবং এসিড জাতীয় উপাদন এক্সট্রাক্ট করে উচ্চমূলের সুগন্ধি ও ভেষজ ওষধ তৈরি করা যায়। এর কোন কোন প্রজাতি যেমন Eryngium creticum জর্ডানে স্করপিওন ভেনমের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অন্য একটি প্রজাতি Eryngium maritimum জার্মানিতে ফ্লাভেনয়েড স্পেক্ট্রাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
 

উপযোগিতা ও ভবিষ্যৎ :  বেশি উৎপাদন খরচ হেক্টরপ্রতি ২-২.৫ লাখ টাকা  সত্ত্বেও দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, উচ্চ বাজার মূল্য এবং একক পরিমাণ জমিতে অধিক আয় প্রতি হেক্টরে ৬-১০ লাখ টাকা এ ফসলটিকে পার্বত্যাঞ্চলের কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তুলে দিয়েছে। আর তাই এ ফসলটিকে ঘিরে পাইকারি ক্রেতা, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের মাঝে আগ্রহ লক্ষ্য করার মতো। বিলাতি ধনিয়া চাষ করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানিরও যথেষ্ট সুযোগ  রয়েছে। বিশেষ করে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বাঙালি হোটেলগুলোতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এ ফসলটির উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধি জন্য ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে তেমনি গবেষণালব্ধ ফলাফলের ব্যাপক প্রচার, কৃষকদের  প্রশিক্ষণ প্রদান ও চাষবাদের জন্য মূলধনের ব্যবস্থা (ব্যাংক ঋণ) করা দরকার। অনেক সময় ফড়িয়া ও পাইকারি ক্রেতাদের কারসাজিতে বাজারে যথেষ্ট চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন এলাকায় এর দাম কমিয়ে দেয়। ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ এবং সঠিক মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণও অত্যন্ত প্রয়োজন।  তখন এ বিলাতি ধনিয়া দিয়ে কৃষির বিশেষ সমৃদ্ধি অনায়াসে আনা যাবে।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
*পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা;  dirais@ais.gov.bd

বিস্তারিত
পাট পচানোর রিবন রেটিং পদ্ধতি

বাংলাদেশে উৎপাদিত অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে পাটের স্থান শীর্ষে। পাটের ব্যবহারিক উপযোগিতা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ইত্যাদি বিবেচনা করে পাটকে সোনালি আঁশ বলে অভিহিত করা হয়। এক সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পাট রফতানি হতো, অর্জিত হতো মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। বর্তমান সরকার দেশের পরিবেশ বিপর্যয় ও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে পলিথিন উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত দ্রব্য ব্যবহারে দেশবাসীকে উৎসাহিত করায় পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে লাঘব হয়েছে। এ দেশে মূলত তোষা এবং দেশী এ দুই ধরনের পাট চাষ করা হয়ে থাকে। আট থেকে দশ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাট ও এ জাতীয় আঁশ ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এছাড়াও হাজার হাজার লোক পাট গবেষণা, প্রক্রিয়াকরণ, পাট পণ্য  উৎপাদন, পরিবহন ও ব্যবসার সাথে জড়িত। দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৫-৬% আসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে।
 

বাংলাদেশে ৯০ দশকে ১২ লাখ হেক্টর জমিতে পাট হতো। মাঝে প্রায় ৩০-৪০ বছর পাটের এলাকা কমতে কমতে ৪.০-৪.৫ লাখ হেক্টরে নেমে যায়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক আঁশের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির সাথে সাথে গত ২০১০-২০১৫ সাল পর্যন্ত এর বৃদ্ধি প্রায় ৭-৮ লাখ হেক্টরে পৌঁছে গেছে। শুধু তাই নয় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে পূর্বের ১২ লাখ হেক্টর এলাকা থেকে যে পরিমাণ পাট পাওয়া যেত এখন ৭-৮ লাখ হেক্টর জমি থেকেই তার চেয়ে বেশি ফলন পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখ্য তখন ১২ লাখ হেক্টর থেকে প্রায় ৬৫-৭০ লাখ বেল পাট পাওয়া যেতো আর সম্প্রতিকালে মাত্র ৭-৮ লাখ হেক্টর জমি থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৮২ লাখ বেল।
 

পাটের পচন বা রেটিং পাট উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাট আঁশের গুণাগুণ পাট পচনের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের সর্বত্র পাট পচন ব্যবস্থা ও সমস্যা এক রকম নয়। পাট পচন পানির প্রাপ্যতা ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক ব্যবস্থা/সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করে এলাকাভিত্তিক পাট পচন ব্যবস্থারও তারতম্য হয়। অভ্যন্তরীণ ও বিশ্ববাজারে পাটের মূল্য এর মানের ওপর নির্ভর করে। মান বিবেচনায় বিশ্ববাজারে সমাদৃত বাংলাদেশের পাট এক সময় সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু নানাবিধ কারণে ক্রমাগত পাট আঁশের মান খারাপ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয় পাট আঁশের মান নিম্ন হওয়ার কারণে কৃষকগণও এর আশানুরূপ মূল্য পাচ্ছেন না। যেহেতু জমির শস্যপর্যায়িক চাহিদা, কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা ও নানাবিধ প্রয়োজনে বাংলাদেশে পাট চাষ অব্যাহত থাকবে, তাই কৃষক ও দেশের সার্বিক স্বার্থেই উন্নত পাট পচন প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত মানের আঁশ উৎপাদন করে কৃষক  তথা দেশের আয় ও সুনাম বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশে সাধারণত দুইভাবে পাট পচানো হয়। প্রচুর পানি অঞ্চল ও স্বল্প পানি অঞ্চলে পাট পচানো। প্রচুর পানি অঞ্চলে প্রচলিত পদ্ধতিতে পাট পচানো সম্ভব। কিন্তু যেখানে পানির স্বল্পতা আছে সেসব অঞ্চলে রিবন রেটিং বা পাটের ছালকরণ ও পচন পদ্ধতির মাধ্যমে পাট পচাতে হয়। পদ্ধতিগুলোর বিবরন নিম্নে দেয়া হলো।
 

ক.  প্রচলিত পাট পচন ব্যবস্থাপনা
পাট গাছে যখন ফুলের কুঁড়ি আসে তার অগেই পাট কাটা উচিত। এ সময় পাট কাটলে আঁশের মান ও ফলন ভালো হয়, গোড়ায় তেমন কাটিংস বা শক্ত অংশ থাকে না। তবে আমাদের দেশের পাটের জাতগুলো মোটামুটি ১১০-১২০ দিন বয়সে কাটতে হবে। যেহেতু চিকন পাট পচতে সময় কম এবং মোটা পাট পচতে সময় বেশি লাগে, তাই চিকন ও মোটা পাট আলাদা ভাবে আঁটি বেঁধে  আলাদাভাবে জাগ দিতে হবে। পাটের জমি শুকনো থাকলে জমিতেই অথবা জমিতে সামান্য পানি থাকলে পাট কেটে আঁটিগুলো নিকটস্থ শুকনো জায়গায় সম্ভব মতো ৩-৪ দিন স্তূপ করে রেখে পাতা ঝরাতে হবে এবং এরপর পাটের  গোড়ার দেড় ফুট পরিমাণ অংশ ৩-৪ দিন পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হবে। এতে পাতা পচে পচন পানি তাড়াতাড়ি নষ্ট হয় না এবং গোড়ায় কাটিংসের পরিমাণ কম হয়। তবে পাটের জমিতে প্রচুর পানি থাকলে পাটের পাতা ঝরানো বা গোড়া ডুবানোর প্রয়োজন নেই। সে ক্ষেত্রে পাট কেটে সরাসরি জমিতেই জাগ দিতে হবে। যথাসম্ভব পরিষ্কার এবং অল্প স্রোতযুক্ত পানিতে পাট পচানো উচিত। পাটের আঁটিগুলো প্রথম সারিতে লম্বালম্বিভাবে, দ্বিতীয় সারিতে আড়াআড়িভাবে এবং পুনরায় লম্বালম্বিভাবে সাজাতে হবে। এতে জাগের মধ্যে পাট পচন জীবাণু সহজে চলাফেরা করতে পারে এবং পচন তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হয়। পাটের জাগে সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া সারগুলো পানিতে ছিটিয়ে দিলে পচন প্রক্রিয়া তাড়াতাড়ি হয়। জাগ ডুবানো/ঢাকার জন্য জলজ উদ্ভিদ, কংক্রিটের স্ল্যাব বা বাঁশ ব্যবহার করা উচিত। এ ক্ষেত্রে কখনও মাটি বা কলাগাছ ব্যবহার করা যাবে না। পচন সমাপ্তি নির্নয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কাজেই জাগ দেয়ার ১০-১২ দিন পর থেকে ২-১টা পচা পাট গাছ বের করে ধুয়ে দেখতে হবে যে, আঁশগুলো পচে পরস্পর পৃথক হয়েছে কিনা। পৃথক হলে বুঝতে হবে, পচন শেষ হয়েছে এবং সাথে সাথে সব পাটের আঁশ ছাড়িয়ে ফেলতে হবে। পাট একটু বেশি পচানোর চেয়ে একটু কম পচানো ভালো। আঁশ ছাড়ানোর পূর্বে পাটের গোড়ার অংশ হাত দিয়ে চিপে টেনে ফেলে দিয়ে বা বাঁশ-কাঠের হাতুড়ি দিয়ে থেতলে নিয়ে আঁশ ছাড়ালে আঁশের গোড়ায় শক্ত অংশ বা কাটিংসের পরিমাণ কম হয়। যথাসম্ভব পরিষ্কার পানিতে আঁশ ধোয়া উচিত। আঁশ মাটিতে না শুকিয়ে বাঁশের আড়ায় বা ঘরের চালে বা গাছের ডালে বা ব্রিজের রেলিংয়ে বিছিয়ে দিয়ে ভালোভাবে শুকানো উচিত। লক্ষ্য রাখতে হবে আঁশে যেন ময়লা বা ধুলাবালি লেগে না থাকে। এভাবে পচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পাট আঁশ ভালোভাবে শুকিয়ে গুদামজাত করা হয়। ভিজা আঁশ কখনও গুদামজাত করা উচিত নয়। কারণ এতে আঁশের মান নষ্ট হয়ে যায়।

 

খ. স্বল্প পানি অঞ্চলে পাট পচন ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের অনেক অঞ্চেলে অনেক পাট জন্মে, কিন্তু পাট পচনের প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত পানির অভাবে ওইসব এলাকায় উৎপাদিত পাট আঁশের অধিকাংশই অত্যন্ত নিম্নমানের হয়। আমরা জানি যে, আঁশের গুণাগুণের ওপর পাটের মূল্য নির্ভর করে। কি কারণে পাট আঁশের গুণাগুণ খারাপ হয়, এ ব্যাপারে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। দেখা গেছে, বিশেষ করে পাট পচন পদ্ধতির তারতম্যের কারণেই পাট আঁশের গুণাগুণের তারতম্য হয়। যেহেতু পাট পচন প্রক্রিয়া পানিতে সম্পন্ন হয়, তাই পাট পচন ও আঁশের গুণাগুণ মূলত পচন পানির ওপর নির্ভরশীল। দেশের বিভিন্ন পাট উৎপাদনকারী এলাকার পাট পচন সমস্যা বিভিন্ন। তাই সেসব এলাকায় প্রচুর পাট উৎপন্ন হয়, অথচ প্রয়োজনীয় পচন পানির অভাবে চাষি ভাইয়েরা পাট সঠিকভাবে পচাতে পারছেন না, ফলে উৎপাদিত আঁশের মান অত্যন্ত নিম্নমানের হচ্ছে- সেসব এলাকার পাট পচন সমস্যার সমাধানকল্পে দীর্ঘদিন গবেষণার পর বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে ওইসব এলাকার চাষি ভাইদের জন্য বাঁশের হুকের সাহায্যে ‘পাটের ছালকরণ (রিবনিং) ও ছাল পচন (রিবন রেটিং) পদ্ধতি’ উদ্ভাবন করেছে। বিজেআরআই এ পাটের রিবনিং করার জন্য পরবর্তীকালে ১. ‘সিংগেল রোলার’, ২. ‘ডাবল রোলার রিবনার’ যন্ত্র উদ্ভাবন করা হয়েছে। কারিগরি দিক বিবেচনায় রিবনিংয়ের জন্য ‘ডাবল রোলার রিবনার’ অত্যন্ত সুবিধাজনক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ পদ্ধতিতে পুরো পাট গাছ না পচিয়ে কাঁচা গাছ থেকে ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে ছাল পচাতে হয়, ফলে পচানোর জন্য পানি কম লাগে, পচনের জায়গা ও সময় কম লাগে, বহন খরচ কম লাগে, আঁশে কোনো কাটিংস থাকে না এবং আঁশের মান অত্যন্ত ভালো হয়, ফলে আঁশের মূল্য বেশি পাওয়া যায়।

 

বাঁশের হুকের সাহায্যে ছাল ছাড়ানোর পদ্ধতি
প্রথমে ৫ ফুট বা প্রায় ১৫২ সেমি. লম্বা এক খণ্ড বোরাক বাঁশ নিয়ে একপ্রান্ত আড়াআড়িভাবে কাটতে হবে, যাতে বাঁশের প্রান্তটির দুইদিক ইংরেজি ইউ অক্ষরের মতো দেখায়। এটাকে বাঁশের হুক বলা হয়। এবার বাঁশ খ-টির অপর প্রান্ত আনুমানিক ১ হতে ১.৫ ফুট সুবিধা অনুযায়ী মাটির মধ্যে শক্ত করে পুঁতে দিতে হবে। পাশাপাশি ৩-৪ ফুট দূরে দূরে প্রয়োজনমতো এমন কয়েকটি বাঁশের হুক সারিবদ্ধভাবে মাটিতে বসাতে হবে। এখন ওই বাঁশের হুকগুলোর সঙ্গে একটি মুরুলি বাঁশ দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে আড়া বাঁধতে হবে যার ওপর পাট গাছ দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে। পাট গাছগুলো আড়ার ওপর দাঁড় করানোর পূর্র্বে যথা সম্ভব গাছের পাতা হাত দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে গাছির গোড়ার ৩-৪ ইঞ্চি (৮-১০ সেমি.) একটি শক্ত কাঠের/বাঁশের হাতুড়ি দিয়ে থেঁতলে নিতে হবে। এবার গাছের থেঁতলানো গোড়া বাঁশের হুকের মধ্যে রেখে ছালগুলোকে হাত দিয়ে হুকের দুইদিকে দুই ভাগ করে দুই হাতে নিজের দিকে সজোরে টান দিতে হবে। দেখা যাবে পাটের ছালগুলো সহজেই পাট খড়ি হতে আলাদা হয়ে গেছে এবং পাট খড়িগুলো সামনের দিকে চলে গেছে। এভাবে ৪-৫টি পাট গাছের ছাল একসঙ্গে বের করা সম্ভব। প্রাথমিকভাবে বোরাক বাঁশের যে কোনো প্রান্ত ধারালো দায়ের সাহায্যে কোনাকোনিভাবে কেটে বাঁশের হুক তৈরি করে পাট ছাল পৃথককরণ করা হলে এ ছালগুলোকে স্বল্প পানিতে বা পৃথক করা বাকলগুলাকে দুইভাবে পচানো যায়- ১. বড় মাটির চারিতে বাকল জাগ গোলাকার মোড়া বেঁধে সাজিয়ে রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে চারিটি ভরে দিতে হয়। একটি বড় চারিতে প্রায় ৩০ কেজি ছাল বা বাকল পচনো যায়। ২. যদি আশপাশে ছোট ডোবা বা পুকুর বা খাল কম গভীরতা সম্পন্ন জলাশয় থাকে তবে ছালগুলো গোলাকার মোড়া বেঁধে একটি লম্বা বাঁশের সাথে ঝুলিয়ে পানির মধ্যে ডুবিয়ে পচানো যায়। এভাবে অল্প পানিতে খুব কম সময়ে পচন প্রক্রিয়াসম্পন্ন হয়। পচন সময় কমানের জন্য ১০০০ কেজি কাঁচা ছালে জন্য ১ সের বা প্রায় ১ কেজি ইউরিয়া সার পচন পানিতে মিশিয়ে দিয়ে অথবা একটি ছোট বালতি বা হাঁড়িতে দুই একটি পাট গাছ ছোট ছোট টুকরা করে আগেই পচিয়ে নিয়ে পরে ছাল পচানোর সময় ওই পানি মিশিয়ে দিতে হয়। বাঁশের হুকের পরিবর্তে সিংগেল-ডাবল রোলার রিবনারের সাহায্যে একই ভাবে পাটের রিবনিং করা যায়। পরে ছালগুলোকে পরিমাণ সাইজের গোলাকার মোড়া বাঁধতে হবে এবং পাট খড়িগুলো শুকিয়ে নিতে হবে। তবে ‘ডাবল রোলার রিবনারের’ সাহায্যে ছাল ছাড়ানো বেশি সুবিধাজনক।