কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধন সনদ পেল চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম

আম এদেশের মানুষের সর্বাধিক পছন্দনীয় ও জনপ্রিয় ফল। বর্তমানে দেশের ২৩টি জেলায় আমের বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে। এদেশে জন্মানো জাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু এই জাতটি। রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে জানা গেছে বিদেশিদের কাছেও জাতটির চাহিদা প্রচুর।সবকিছু বিবেচনায় এনে ২০১৬ সালে এই জাতটিকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন) পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বিভিন্ন দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ‘The Geographical Indication (GI) Journal, No. 03’ এ জানুয়ারি ২০১৮ সালে প্রকাশ করা হয়। এরপর আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) সব শর্ত পূরণ করার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আমটিকে নিবন্ধন সনদ প্রদানের জন্য পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে এদেশ অনেক সমৃদ্ধশালী হলেও দীর্ঘ সময় ধরে জিআই আইন না থাকায় এ দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের মালিকানা সুরক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন ২০১৩ এবং ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) বিধিমালা ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়। এর পরই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য নিবন্ধনের পথ সুগম হয়। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হচ্ছে মেধাসম্পদের অন্যতম শাখা। কোন একটি দেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া, জলবায়ু, উৎপাদন পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি অনন্য গুণসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করে বা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তাহলে সেটিকে ওই দেশের জিআই হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
 

ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের বর্ণনা : চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম উৎকৃষ্ট জাতসমূহের মধ্যে একটি মধ্যম  মৌসুমি এবং খুবই জনপ্রিয় বাণিজ্যিক জাত। ফল  মাঝারি আকারের এবং অনেকটা ডিম্বাকৃতির। পরীক্ষায় দেখা  গেছে, এ ফল গড়ে লম্বায় ৮.৬ সেমি., পাশে  ৭.৫ সেমি., উচ্চতায় ৬.০ সেমি. এবং  গড়ে ওজন ২৬৩.৯ গ্রাম হয়। পাকা ফলের ত্বকের রঙ সামান্য  হলদে এবং শাঁসের রঙ হলুদাভ। শাঁস আঁশবিহীন, রসাল, গন্ধ আকর্ষণীয় ও বেশ মিষ্টি। গড় মিষ্টতা ২৩%। ফলের খোসা সামান্য মোটা ও শক্ত এবং  আঁটি  পাতলা। আঁটি গড়ে লম্বায় ৭.০ সেমি., পাশে ৪.০ সেমি., পুরুত্বে ২.০ সেমি. এবং গড় ওজনে ৪০.০ গ্রাম হয়ে থাকে।  ফলের গড় আহারোপযোগী  অংশ শতকরা ৬৭.২ ভাগ। জ্যৈষ্ঠ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ  থেকে আম পাকা শুরু করে। ফল পাড়ার  পর পাকতে  প্রায় ৫-৭ দিন সময় লাগে। ফলন  খুবই ভালো তবে অনিয়মিত। ফল পরিপক্ব হতে (ফুল আসা থেকে) প্রায় চার মাস সময় লাগে। এ জাতের আমের পুরুষ ও উভলিঙ্গ ফুলের আনুপাতিক হার যথাক্রমে শতকরা ৯১.০ ও ৯.০ ভাগ। এই জাতটি দেশের  সর্বত্র চাষাবাদ করা যেতে পারে।


অনন্য বৈশিষ্ট্য : চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আমের পাল্প দৃঢ় হওয়ায় পরিপক্ব আম বিভিন্ন ডিজাইন করে কেটে খাওয়া যায়। এ জাতের আমের আঁটিতে কোন আঁশ নেই এবং খেতে খুবই সুমিষ্ট। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাটি কৃষি পরিবেশিক অঞ্চল ১১ এর উঁচু গঙ্গা নদী প্লাবন ভূমির অন্তর্ভুক্ত। তাই ভালোমানের খিরসাপাত আম উৎপাদনকারী এলাকার জন্য মাটির পিএইচ ৬.৫-৭.৫ প্রয়োজন, যা উক্ত এলাকায় রয়েছে। এছাড়াও এই অঞ্চলের আবহাওয়া আমের গুণগতমানকে প্রভাবিত করে। সাধারণত দেখা যায়, আমগাছে মুকুল আসার সময়ে আবহাওয়া শুষ্ক ও ঠাণ্ডা এবং আমের বৃদ্ধি ও পরিপক্বতার সময়ে শুষ্ক ও গরম (২৮-৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) থাকে ফলে আমের ফলন ও মান উভয়েই ভালো হয়। আমের মুকুল আসার সময় বা মুকুল বের হওয়ার পর বৃষ্টিপাত হলে বিভিন্ন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ হতে পারে এবং আমের বৃদ্ধি ও পরিপক্বতার সময়ে বেশি বৃষ্টি হলে আমের গুণগতমান খারাপ হয়। এদেশের অন্য জেলাগুলোতে আম উৎপাদন হলেও মাটি ও আবহাওয়ার বিশেষ পার্থক্যের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জে অধিক পরিমাণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম উৎপাদন সম্ভব ।


উৎপাদনের পদ্ধতি : ভৌগোলিক বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়, ভারত ও মিয়ানমারের মাঝখানে। বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। এ দেশের বৃষ্টিপাতের মাত্রা ১৫০০-২০০০ মিলিমিটার। বাংলাদেশের গড় তাপমাত্র ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাংলাদেশের আবহাওয়া আম বাগান তৈরি ও আম উৎপাদনের উপযোগী। এ কারণে বাংলাদেশে আম বাগান গড়ে উঠেছে। আম বাগান তৈরির জন্য জমি প্রথমে চাষ দিয়ে ভালোভাবে তৈরি করে নিতে হয়। পরে নকশা অনুযায়ী জনপ্রিয়  বর্গাকার পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট জায়গায় আমের চারা রোপণ করা হয়। বর্ষার শুরুতে অর্থাৎ আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে আম গাছ রোপণের উপযুক্ত সময়। অতিরিক্ত বর্ষার সময় চারা রোপণ না করাই ভালো। রোপণের আগে ১ঢ১ঢ১ মিটার বিশিষ্ট গর্ত করে গর্তের ওপরের অর্ধেক মাটি এক পাশে এবং নিচের অর্ধেক মাটি অপর পাশে রাখতে হবে। গর্ত করার পর  ১০-১৫ দিন গর্ত রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। গর্ত ভর্তি করার সময় ওপরের মাটির সাথে ১০ কেজি গোবর সার, ৫০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমপি, ২৫০ গ্রাম জিপসাম ও ৫০ গ্রাম জিঙ্ক সালফেট ভালোভাবে মিশিয়ে, মিশ্রিত মাটি নিচে এবং নিচের মাটি ওপরে দিয়ে গর্ত ভর্তি করতে হবে। গর্ত ভর্তির ১০-১৫ দিন পর গর্তের মাঝখানে চারাটি সোজাভাবে লাগিয়ে চারিদিকে মাটি দিয়ে চাপ দিতে হবে। রোপণের পরে গাছে সেচ দিতে হবে এবং গাছটি একটি শক্ত খুঁটি দ্বারা বেঁধে দিতে হবে।  চারাটির বয়স ২-৩ বছর হলে এবং চারার গোড়া থেকে নতুন  ডালপালা গজালে তা কেটে ফেলতে হবে। গাছের দৈহিক বিকৃতি দেখা দিলে তা কেটে ফেলতে হবে।


পাতাকাটা উইভিল কচি পাতা কেটে ফেললে কার্বারিল গ্রুপের সেভিন ২ গ্রাম/লিটার অথবা সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের রিপকর্ড/কর্ট্ ১০ ইসি ১ মিলি/লিটার পানিতে দিয়ে স্প্রে দ্বারা আক্রমণ প্রতিহত করতে হবে। গাছটির বয়স ৪-৫ বছর হলে গাছে আম ধরাতে হবে। ফলন্ত গাছের পরগাছা, শুকনা ডাল, রোগাক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করতে হবে। বছরে দুইবার  আম গাছে সার প্রয়োগ করতে হবে। বর্ষার শুরুতে একবার এবং বর্ষার পরে আর একবার সার প্রয়োগের পরে প্রয়োজনীয় সেচ প্রদান করতে হবে। আম গাছে পুষ্পমঞ্জরি বের হয়েছে কিন্তু ফুল ফোটেনি এবং আম মটর দানার মতো হলে এই দুই অবস্থায় সেচ প্রদান করতে হবে। আম গাছে প্রধান পোকার মধ্যে আমের ফলছিদ্রকারী এবং মাছি পোকা অন্যতম। এগুলোকে অনুমোদিত মাত্রার কীটনাশক প্রয়োগ করে এবং ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে দমন করা যায়। আমের রোগের মধ্যে অ্যানথ্রাকনোজ ও বোঁটা পচা রোগ অন্যতম। এ রোগগুলোকে অনুমোদিত মাত্রার ছত্রাকনাশক এবং আম সংগ্রহের পর গরম পানিতে আম শোধনের মাধ্যমে দমন করা যায়।


খিরসাপাত আমের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অনেক বেশি। মোট উৎপাদনের  ২০-২৫ ভাগ আম এই জাতের এবং প্রতি বছরই বাড়ছে এই জাতের আমের বাগান। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে সুমিষ্ট এই জাতটি। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিমাণ চাষিকে উত্তম কৃষি প্রযুক্তির আলোকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিরাপদ, বিষমুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন বাড়াতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এমনটিই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

 

ড. মো. শরফ উদ্দিন
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আকবরপুর, মৌলভীবাজার, মোবা : ০১৭১২১৫৭৯৮৯, ই-মেইল :sorofu@yahoo.com

বিস্তারিত
চিভ (Chive) এর চাষ পদ্ধতি

চিভ (Allium tuberosum) একটি বহুবর্ষজীবী মসলা ফসল। এটি অ্যামারাইলিডেসি (Amaryllidaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর পাতা লিনিয়ার আকৃতির, ফ্ল্যাট, পাতার কিনারা মসৃণ, বাল্ব লম্বা আকৃতির। এর ফুলের রঙ সাদা-পার্পল বর্ণের। পুষ্পমঞ্জরি অম্বেল প্রকৃতির। এর উৎপত্তিস্থল সাইবেরিয়ান-মঙ্গোলিয়ান-নর্থ চাইনা অঞ্চল। আমাদের দেশে এটি পেঁয়াজ ও রসুনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি মসলা ফসল হিসেবে স্যুপ ও সালাত তৈরিসহ বিভিন্ন চাইনিজ ডিসে ব্যবহৃত হয়। এর পাতা, কন্দ ও অপরিপক্ব ফুল সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি হজমে সাহায্য করে এবং ক্যানসার প্রতিরোধী গুণাগুণ বিদ্যমান। আন্তঃফসল হিসেবে চাষ করার মাধ্যমে এটি কলার পানামা রোগ নিয়ন্ত্রণ সাহায্য করে। (Zhang et.al, 2013) । এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি-১, ভিটামিন বি-২, নায়াসিন, ক্যারোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও খনিজ পদার্থ বিদ্যমান। তুলনামূলকভাবে সিলেট অঞ্চলে এর চাষাবাদ বেশি হয়ে থাকে। তাছাড়া পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা যেমন- পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী (দুর্গাপুর ও তাহেরপুর), মাগুরা, বগুড়া, লালমনিরহাট ইত্যাদি অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। বিবিএস (২০১৭) এর তথ্য মতে, আমাদের দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ১৭.৩৫ লাখ মেট্রিক টন, চাহিদা প্রায় ২২ লাখ মেট্রিক টন। এখনো প্রায় ৪.৬৫ লাখ মেট্রিক টন ঘাটতি রয়েছে। চিভ পেঁয়াজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব এবং এটি সারা বছর চাষ করা যায়। কাজেই চিভ এর প্রসার ও পেঁয়াজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে পেঁয়াজের ঘাটতি অনেকটা মেটানো সম্ভব। চিভ এর উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীগণ চিভ এর বেশ কয়েকটি লাইনের ওপর গবেষণা চালিয়ে বারি চিভ-১ নামে একটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে যা সারা দেশে সারা বছর চাষ করা সম্ভব। জাতটি ২০১৭ সালে অবমুক্ত হয়। জাতটির বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদন প্রযুক্তি নিম্নে বর্ণনা করা হলো।


বারি চিভ-১ জাতের বৈশিষ্ট্য
এ জাতের গাছের উচ্চতা ৩০-৪০ সেমি.। পাতার দৈর্ঘ্য ২৩-৩০ সেমি.। বাল্ব লম্বাকৃতির, বাল্বের দৈর্ঘ্য ১.০-১.৪৫ সেমি.। চারা লাগানো থেকে ফসল উত্তোলন পর্যন্ত ৬৫-৭০ দিন সময় লাগে। এটি পোকামাকড় ও রোগ সহনশীল। ফলন হেক্টর প্রতি ১০-১২ টন (গাছ ও পাতাসহ)

 

উৎপাদন প্রযুক্তি
মাটি ও জলবায়ু : সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত ও জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ বেলে দোআঁশ মাটি চিভ চাষের জন্য উপযোগী। মাটির পিএইচ ৬.৩-৬.৮ হলে চিভ এর বৃদ্ধি ভালো হয়। চিভ এর চাষের জন্য বছরে ২৫০০-৩০০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। ১৩-২৫ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা চিভ চাষের জন্য উপযোগী।

 

জমি তৈরি : জমিতে ৬-৭টি গভীরভাবে (১৫-২০ সেমি.) চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে কারে ও পরে মই দিয়ে সমতল করতে হবে। জমির আগাছা বেছে ফেলতে হবে। মাটির ঢেলা ভেঙে ঝুরঝুরে ও সমান করে জমি তৈরি করতে হবে। চিভ চাষের জন্য ৩.০ মিটার x ১.৫ মিটার আকারেরর বেড তৈরি করতে হবে এবং বেডের উচ্চতা ১৫-২০ সেমি. হতে হবে। পানি সেচ ও নিষ্কাশনের সুবিধার জন্য দুই বেডের মাঝে ৫০-৬০ সেমি. প্রশস্থ নালা থাকতে হবে।


সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি : ফলন বেশি পেতে হলে সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে হবে। জৈব সার প্রয়োগ মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি পায় ও ফলন বেশি হয়। মাটিতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানের ওপর সারের মাত্রা নির্ভর করে। চিভ এর জন্য প্রতি হেক্টরে নিম্নোক্ত হারে সার প্রয়োগ করতে হবে। শেষ চাষের সময় সবটুকু গোবর/কম্পোস্ট, টিএসপি, অর্ধেক ইউরিয়া ও এমওপি সার জমিতে ছিটিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া এবং এমওপি সার সমান ভাগে ভাগ করে যথাক্রমে চারা রোপণের ২৫ এবং ৫০ দিন পর দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিবার সার প্রয়োগের পূর্বে জমি আগাছামুক্ত করতে হবে।


রোপণ সময় : বাংলাদেশে সারা বছর চিভ চাষ করা সম্ভব। তবে চিভ লাগানোর উপযোগী সময় এপ্রিল-মে মাস পর্যন্ত।
 

বীজ হার ও রোপণ দূরত্ব : প্রতি হেক্টরে ২০০০০০-৩০০০০০ চারা/ক্লাম্প ডিভিশন (Clump division) লাগে। প্রতিটি চারা ২০-২৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে ১৫-২০ সেমি. পরপর লাগাতে হবে।
 

আন্তঃপরিচর্যা : চিভ এর চারা রোপণের পর একটি প্লাবন সেচ দিতে হবে। চারা রোপণ এবং সেচের পর জমিতে প্রচুর আগাছা জন্মাতে পারে। আগাছা জমির রস ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান গ্রহণ করে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। এজন্য ২-৩ বার বা ততধিক নিড়ানি দিয়ে জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। জমির জোঁ অবস্থা দেখে ২০-২৫ দিন পরপর সেচ দিতে হবে।
 

ফসল সংগ্রহ : চারা লাগানোর ৬৫-৭০ দিন পর থেকে ফসল সংগ্রহ করা যায়। গাছের গোড়া থেকে ২-৩ ইঞ্চি ওপরে পাতা কেটে অথবা পুরো গাছ উঠিয়ে ফসল সংগ্রহ করা যায়। ফসল সংগ্রহের পর বাজারজাতকরণের জন্য পাতা/গাছ ভালোভাবে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে এবং গাছের শিকড় কেটে ফেলতে হবে। বছরে ৫-৬ বার ফসল সংগ্রহ করা যায়।
 

ফলন : পাতা ও গাছসহ প্রতি হেক্টরে ১০-১২ টন ফলন পাওয়া যায়।


রোগবালাই : চিভ এ রোগের আক্রমণ খুব কম হয়। তবে জমিতে আর্দ্রতা বেশি থাকলে স্ক্লেরোসিয়া জাতীয় ছত্রাকের আক্রমণ হয়। এছাড়া পার্পল লিফ ব্লচ (Purple leaf blotch) নামক রোগের আক্রমণ হতে পারে।
 

পার্পল লিফ ব্লচ (Purple leaf blotch) : অলটারনারিয়া পোরি (অষঃবৎহধৎরধ চড়ৎৎর) নামক ছত্রাক দ্বারা এই রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত বীজ, বায়ু ও গাছের পরিত্যক্ত অংশের মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে। এই রোগের আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে গাছের পাতা বা পুষ্পদণ্ডে ছোট ছোট পানি ভেজা দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে দাগগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়। অনুকূলে আবহাওয়ায় পাতা বা পুষ্পদণ্ডের এক বা একাধিক দাগ পড়ে এবং তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দাগের মধ্যবর্তী অংশ প্রথমে লালচে ও পরবর্তীতে কালো বর্ণ ধারণ করে এবং দাগের কিনারায় বেগুনি রঙ দেখা যায়। দাগের মধ্যস্থ গাঢ় অংশ ছত্রাকের বীজকনা দিয়ে পূর্ণ থাকে। সাধারণত আক্রান্ত পাতা ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে হলুদ হয়ে মরে যায়।
 

দমন পদ্ধতি :
১. সুস্থ, নীরোগ বীজ ও চারা ব্যবহার করতে হবে।
২. আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৩. রোভরাল বা ভিটাভেক্স ২০০ নামক ছত্রাকনাশক কেজি প্রতি ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
৪. রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম রোভরাল এবং ২ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর ৩-৪ বার গাছে স্প্রে করতে হবে।
৫. এছাড়া প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার এমিস্টারটপ মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর ৩-৪ বার গাছে স্প্রে করলে রোগের প্রকোপ কমে যায়।

 

পোকামাকড় : চিভ এ পোকামাকড়ের আক্রমণ খুব কম হয়। তবে মাঝে মধ্যে থ্রিপসের আক্রমণ লক্ষ্য করা যায়। আক্রান্ত পাতায় ক্ষুদ্রাকৃতির বাদামি দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে পাতা শুকিয়ে যায়।
 

দমন পদ্ধতি :
* সাবান মিশ্রিত পানি ৪ গ্রাম/লিটার হারে প্রয়োগ করতে হবে।
* কেরাটে/এডমেয়ার/গেইন প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে স্প্রে করে সহজেই এই পোকা দমন করা যায়।

 

ড. মো: নুর আলম চৌধুরী

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মসলা গবেষণা কেন্দ্র, শিবগঞ্জ, বগুড়া, মোবাইল : ০১৭১১২৪৬৩৫২, ই-মেইল : dmnalam@yahoo.com

বিস্তারিত
বাহারি রঙিন শাকসবজি ও অ্যান্থোসায়ানিন

জীবন বাঁচাতে আমরা অনেক ধরনের খাদ্য খাই। আমাদের খাদ্য তালিকার বিরাট অংশ জুড়ে আছে হরেক রকমের বাহারি রঙিন শাকসবজি। এ শাকসবজি মানব দেহের অপরিহার্য ভিটামিন, খনিজ ও সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটসের অন্যতম উৎস ও জোগানদাতা। বিশ্বে চীন ও ভারতের পরেই বাংলাদেশ এখন তৃতীয় সবজি উৎপাদনকারী দেশ। প্রতি বছর বিশ্বের ৫০টি দেশে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার সবজি রপ্তানি হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিনির্ভর উদ্যোক্তার সংখ্যাও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা একদিকে বেকারত্ব হ্রাসে ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে অর্থনীতির চাকাকেও সচল রাখতে সাহায্য করছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের কৃষিতে সবজি উৎপাদন একটি বড় অর্জন। কৃষি পণ্য রপ্তানি থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬৭৩.৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ বছরে (জুলাই-মে) সবজি রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৭১.২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।


রাজধানী ঢাকায় গত ২৪-২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ৪র্থ ‘জাতীয় সবজি মেলা-১৯’। মেলায় প্রায় ১১২ জাতের সবজি নিয়ে ৭১টি স্টল ও ৫টি প্যাভিলিয়ন ছিল। মানুষের মধ্যেও সবজি মেলা নিয়ে এত সাড়া দেখা যায়নি কখনো। দেশে সবজি উৎপাদনে যে বিপ্লব ঘটেছে এবারের সবজি মেলা তারই স্বাক্ষর বহন করছে। এখানেই শেষ নয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, গত ৪০ বছরে বাংলাদেশে সবজির উৎপাদন আগের তুলনায় পাঁচগুণ বেড়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি মৌসুমি সবজি ছাড়া প্রায় সারা বছরই সব ধরনের সবজি উৎপাদন হচ্ছে, যা আগে কখনো কল্পনাই করা যায়নি। বাংলাদেশের সার্বিক কৃষি ব্যবস্থা, প্রযুক্তির ব্যাপকতা, কৃষকের নিরলস শ্রম ও অদম্য আগ্রহ এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।


জীবনের প্রয়োজনে সবজি আমাদের বেশি করে খেতে হবে। বাহারি সবজি বলতে এখানে রঙিন সবজিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। রঙিন শাকসবজি হচ্ছে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রাকৃতিক উৎস। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে অ্যান্থোসায়ানিন কি? অ্যান্থোসায়ানিন মানব স্বাস্থ্যের কি উপকার করে? নি¤েœ ধারাবাহিকভাবে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা হচ্ছে।


অ্যান্থোসায়ানিন :
উদ্ভিদ দেহে ক্লোরোফিল ছাড়া অন্যান্য প্রধান উদ্ভিজ্জ রঞ্জকগুলো হলো ক্যারোটিনয়েড, ফ্লাভোনয়েড এবং বেটালিন। ফ্লাভোনয়েড হচ্ছে উদ্ভিজ্জ সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ গ্রুপ। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত প্রায় ৬০০০প্রকার ফ্লাভোনয়েড শনাক্ত করেছেন। আর অ্যান্থোসায়ানিন হলো ‘ফ্লাভোনয়েড’ গ্রুপের এক ধরনের উদ্ভিজ্জ বায়োঅ্যাক্টিভ যৌগ, যা উদ্ভিদের পাতা, ফুল, ফল ও মূলের বর্ণের প্রধান নিয়ামক।
 

১৮৩৫ সালে জার্মান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী লুড উইং মার্কাট অ্যান্থোসায়ানিনের নামকরণ করেন। এটি মূলত দুটি গ্রিক শব্দ অ্যান্থোস অর্থ ফুল এবং ক্যানস অর্থ নীল থেকে এসেছে। অ্যান্থোসায়ানিন সাধারণত কোষের সাইটোপ্লাজমে তৈরি হয়। এটি পানিতে দ্রবণীয় এবং কোষ গহ্বরে গিয়ে সঞ্চিত হয়। এটি উদ্ভিদের বিভিন্ন বর্ণ যেমন- কমলা, লাল, গোলাপি এবং নীল বর্ণের জন্য দায়ী। দৃশ্যমান উদ্ভিজ্জ রঞ্জকগুলোর মধ্যে ক্লোরোফিলের পরেই অ্যান্থোসায়ানিনের অবস্থান।


মানব দেহে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রভাব : অ্যান্থোসায়ানিন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং বর্তমানেও চলছে। গত দুইদশক ধরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ ফলাফলে অ্যান্থোসায়ানিনের নিম্নের বর্ণিত প্রভাব/উপকারিতা পরিলক্ষিত হয়েছে-
(১) অ্যান্থোসায়ানিন একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা মানব দেহে রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
(২) অ্যান্থোসায়ানিন মানব দেহে ক্যান্সার, হৃদরোগ, নিউরোডি জেনারেটিভ ব্যাধি, বার্ধক্যজনিত রোগের ঝুঁকি কমায়।
(৩) সিরামে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বৃদ্ধি, কোলস্টেরল বণ্টন, স্থূলতা হ্রাস, দৃষ্টি রোগ পুনঃস্থাপন ও লোহিত কণিকাকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।

 

প্রকৃতিতে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রভাব :
(১) অ্যান্থোসায়ানিন উদ্ভিদের পাতা, ফুল, ফলকে বর্ণিল করে বিভিন্ন কীটপতঙ্গ এবং প্রাণীকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে পরাগায়ন ও প্রাকৃতিকভাবে বীজ বিস্তারে সাহায্য করে।
(২) অ্যান্থোসায়ানিন আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উদ্ভিদ কুলকে রক্ষা করে।
যে সবজিগুলোতে অ্যান্থোসায়ানিন পাওয়া যাবে : অ্যান্থোসায়ানিনের প্রাকৃতিক উৎস হচ্ছে রঙিন শাকসবজি। যেমন- লালশাক, লালমুলা, লালবরবটি, লাল মিষ্টিআলু, লাল গোলআলু, লালশিম ও শিমের বীজ, লাল লেটুস, লাল বাঁধাকপি, লাল ফুলকপি, কালো বেগুন এবং লাল ও হলুদ রঙের ক্যাপসিকাম ইত্যাদি।


উন্নত বিশ্বে অ্যান্থোসায়ানিনের ব্যবহার : বিশ্বে চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড ও আমেরিকায় বহুপূর্ব থেকেই অ্যান্থোসায়ানিনের ব্যবহার শুরু করেছে। অ্যান্থোসায়ানিনের স্বাস্থ্য গুণাগুণ বিবেচনা করে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী উচ্চ মাত্রায় অ্যান্থোসায়ানিন সমৃদ্ধ ট্রান্সজেনিক আপেল উদ্ভাবন করেছেন। এ ফলগুলোর গায়ে ও ভেতরে সাধারণ আপেলের তুলনায় অনেকগুণ বেশি অ্যান্থোসায়ানিন তৈরি হওয়ায় এদের বর্ণ লাল। বর্তমানে এটি ক্যাপসুল আকারে বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে। সর্বপ্রথম ২০০১ সালে নরওয়েভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘বায়োলিংক গ্রুপ’ অ্যান্থোসায়ানিন ক্যাপসুল ‘ম্যাডক্স’ প্রস্তুত করেন এবং প্রাথমিকভাবে নরওয়েতে বাজারজাতকরণ করা হয়। পরে ২০০৭ এর প্রথম দিকে আমেরিকায় বাজারজাত করণের জন্য ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে।


বাংলাদেশের কৃষি সেক্টরে অ্যান্থোসায়ানিন নিয়ে করণীয় :
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সবজি বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার সেন্টার ও বিএডিসির বীজ উৎপাদন খামারগুলো এ বিষয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতে পারেন। এর মধ্যে দেশের কিছু এলাকায় অগ্রসর শিক্ষিত চাষিরা স্বল্প পরিসরে হলে  ও লালমুলা, লালবরবটি, লাল বাঁধাকপি ও ফুলকপি, লাল ও হলুদ রঙের ক্যাপসিকাম, কালো বেগুন ইত্যাদি উৎপাদন করে অভিজাত এলাকায় বিক্রি ও হোটেলে সরবরাহ করছে। উৎপাদনের বিরাট একটি অংশ বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন।


সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রঙিন সবজির অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন উপযোগিতা যাচাই করার কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেন। সাথে সাথে রঙিন সবজির উন্নত ও অধিক উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবন করার ব্রিডিং কর্মসূচি প্রণয়ন করতে পারেন। অ্যান্থোসায়ানিনের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রচলিত সবজির পরিবর্তে রঙিন সবজির আবাদ ও খাদ্য তালিকায় রঙিন সবজির অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা শুরু করা যেতে পারে।


গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অ্যান্থোসায়ানিনের উপকারিতা বিষয়ে কৃষকদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সহায়তা কাজে লাগানো যেতে পারে। অন্যান্য সবজি খাওয়ার সাথে সামান্য পরিমাণ হলেও রঙিন সবজি গ্রহণে ভোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এলাকাভিত্তিক চাহিদার আলোকে রঙিন সবজি উৎপাদন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও বাজারজাতকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


পূর্বে বলা হয়েছে, সবজি উৎপাদন ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটানোর প্রয়োজনে সবজির উৎপাদন আরো বাড়াতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, সবজির উৎপাদন হতে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতেই প্রতি বছর প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ সবজি নষ্ট হয়ে যায়। এটা কিভাবে কমিয়ে আনা যায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।


পুষ্টিবিদদের মতে, একজন মানুষের প্রতিদিন ২২০-২২৫ গ্রাম সবজি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশের লোকজনের খাদ্য তালিকায় এখনো সবজির পরিমাণ মাত্র ১২৫ গ্রাম (সূত্র : এফএও, ডিএই)। অর্থনৈতিক বিবেচনায় প্রচলিত সবজির চেয়ে রঙিন সবজির দাম ২-৩ গুণ বেশি। কাজেই রঙিন সবজি চাষাবাদ করে কৃষকদের আর্থিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং অ্যান্থোসায়ানিনের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা করা সম্ভব।

 

ড. মুহাম্মদ মহীউদ্দীন চৌধুরী
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সগবি, বিএআরআই, নোয়াখালী, মোবাইল-০১৮২৭-৮৬৫৮৬০, ই-মেইল -psoofrdbari@gmail.com

 

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook