কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

ইঁদুর নিধন অভিযান
কৃষি আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে কৃষি খাত থেকে। বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব সরকার। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো কৃষি  ও কৃষকের উন্নয়ন এবং সব প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে এ দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত বিভিন্ন রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে ফসল ঘরে তোলাই কৃষকের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু দেখা যায় কৃষকের উৎপাদিত ফসলের একটা বড় অংশ ইঁদুর দ্বারা নষ্ট হয়। ইঁদুর যে পরিমাণ খাবার খায় তার  চেয়ে বেশি কেটেকুটে নষ্ট করে। ক্রমবর্ধমান হারে বর্ধনশীল জনসংখ্যার খাদ্যের প্রয়োজন মেটাতে মাঠে একাধিক ফসলের চাষ হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে প্রতি বছর ইঁদুরের কারণে ১০-১২ লক্ষ টন খাদ্যশস্য নষ্ট হয়ে থাকে। কারণ ইঁদুর প্রতিদিন তার শরীরের ওজনের ১০ গুণ পর্যন্ত খাবার নষ্ট করতে পারে। এ ছাড়া মলমূত্র ও লোম আমাদের খাদ্যদ্রব্যের সাথে মিশে টাইফয়েড, জন্ডিস, চর্মরোগ, কৃমিরোগসহ ৩৩ প্রকারের রোগ ছড়ায়। মারাত্মক প্লেগ রোগের বাহকও এই ইঁঁদুর। ইঁদুর মাঠের ও ঘরের ফসল নষ্ট করা ছাড়াও বৈদ্যুতিক তার কেটে অগ্নিকা- ঘটায়, টেলিফোনের তার কেটে টেলিফোন অচল করে দেয়, কম্পিউটারসহ ঘরের কাপড়-চোপড়, কাগজপত্র কেটে নষ্ট করে। এ ছাড়া রাস্তা, বাঁধ, রেললাইনে গর্ত করার ফলে বন্যার সময় পানি ঢুকে রাস্তা, বাঁধ ও রেললাইন ভেঙে যায়। ইঁদুর ঘরে ও মাঠে উভয় স্থানে ক্ষতি করলেও মাঠে এর ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এক জরিপ অনুযায়ী আমন ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ, গমের শতকরা ৪-১২ ভাগ, গোল আলুর শতকরা ৫-৭ ভাগ, আনারসে শতকরা ৬ - ৯ ভাগ এবং সেচ নালার ৭-১০ভাগ পানি ইঁদুরের কারণে নষ্ট হয়ে থাকে। এজন্য কৃষকদের ফসলের মাঠে সময়মতো ইঁদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রতি বছরই ইঁদুর নিধন কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে।
 
ইঁদুর দ্রুত বংশবিস্তারকারী প্রাণী। কোন স্থানে এক জোড়া ইঁদুর থাকলেই এক বছরে ৩০০০টি বংশধরের সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য ইঁদুর নিধন করা হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ক্ষতি হবে না। কিন্তু ইঁদুর নিধন না হলে ফসল ও সম্পদের ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশে ইঁদুর নিধন অভিযান ১৯৮৩ সন থেকে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি অভিযানের কার্যক্রম বাস্তবায়ন বিশেষজ্ঞ দ্বারা মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে এবং এর ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী অভিযানের কার্যক্রম কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়ে থাকে।
 
ইঁদুর নিধন অভিযান পরিচালনার ফলে প্রতি বছর ইঁদুরের আক্রমণের হাত থেকে ফসল রক্ষার পরিমাণ বেড়েছে। ইঁদুর নিধন কার্যক্রমকে জোরদার করার ফলে ইঁদুরের আক্রমণের হাত থেকে ফসলের একটা বড় অংশ রক্ষা পাবে বলে আশা করা যায়।
 
ইঁদুর নিধন অভিযানের  উদ্দেশ্য
কৃষক, কৃষাণী, ছাত্রছাত্রী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আইপিএম/আইসিএম ক্লাবের সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসহ সর্বস্তরের জনগণকে ইদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করা।
 
ইঁদুর দমনের লাগসই প্রযুক্তি কৃষিকর্মীগণের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো।
ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিল্পকারখানা ও হাঁস-মুরগির খামার ইঁদুরমুক্ত রাখার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ  করা।
 
আমন ফসল ও অন্যান্য মাঠ ফসলে ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ কম রাখা।
গভীর ও অগভীর নলকূপের সেচের নালার ইঁদুর মেরে পানির অপচয় রোধ করা।
রাস্তাঘাট ও বাঁধের ইঁদুর নিধনের জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা।
ইঁদুরবাহিত রোগের বিস্তার রোধ করা এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা।
 
উপসংহার : ইঁদুরের সমস্যা দীর্ঘদিনের । এ সমস্যা পূর্বে যেমন ছিল, বর্তমানেও রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং অংশীদারিত্ব। কারণ ইঁদুর দমন পদ্ধতি পোকা ও রোগবালাই দমন পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বিষটোপ ও ফাঁদ লাজুকতার সমস্যা রয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতি ও সঠিক  স্থানে দমন পদ্ধতি গ্রহণ না করা হলে দমন ব্যবস্থা ততটা কার্যকর হয় না। সেজন্য একা ইঁদুর মারলে দমন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ ইঁদুর সর্বদা খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য স্থান পরিবর্তন করে থাকে।  এ জন্য পাড়া প্রতিবেশীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একই দিনে ও একই সময়ে ইুঁদর নিধন করা প্রয়োজন। ইঁদুর নিধন অভিযানের সফলতা নির্ভর করে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণের ওপর। ইঁদুরকে একটা সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর সমাধান সামাজিকভাবেই করতে হবে, যাতে ইঁদুর দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ধারায় কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।
 
মো. আখতারুজ্জামান*
* পরিচালক, উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫
বিস্তারিত
পরিবেশবান্ধব ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা
ইঁদুর জাতীয় প্রাণী সম্পর্কে ধারণা
পৃথিবীর সব স্তন্যপায়ী প্রজাতির মধ্যে শতকরা ৪২ ভাগ ইঁদুর জাতীয় প্রাণী। ইঁদুর জাতীয় প্রাণী রোডেন্টসিয়া বর্গের ও মিউরিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। সারা পৃথিবীতে ২৭০০টির অধিক ইঁদুর জাতীয় প্রজাতি আছে। এ প্রাণীদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের দাঁতের বিশেষ গঠন ও তার বিন্যাস। ১৬টি দাঁত থাকে। মাংসাশী ও পেষণ পূর্ব দাঁত নেই। তবে উভয় পাটিতে সামনে একজোড়া করে ছেদন দাঁত যা অত্যন্ত তীক্ষè ও ধারালো বাটালির মতো। ছেদন দাঁত গজানোর পর হতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রতিনিয়ত বাড়ে। কাটাকাটি না করতে পারলে দাঁত বেড়ে চুয়াল দিয়ে বেড় হয়ে যায় এবং ইঁদুরের খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। দাঁত ঠিক রাখার জন্য শক্ত জিনিস সর্বদা কাটাকাটি করে থাকে। ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, সজারু ইঁদুর জাতীয় প্রাণী। চিকা ইঁদুর জাতীয় প্রাণী নহে। ইঁদুর সর্বভূক, নিশাচর এবং স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম সফল প্রাণী। এদের উপকারী ও অপকারী উভয় ভূমিকা রয়েছে। তবে ক্ষতিকারক ভূমিকাই বেশি ।

ইঁদুর দমনের প্রয়োজনীয়তা
১. ইঁদুর মাঠের সব প্রকার খাদ্য শস্যের ক্ষতি করে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ইঁদুর ১২ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টনের অধিক খাদ্যশস্য প্রতি বছর ক্ষতি করে (ডিএই, ২০১৩)। দশমিনা বীজ বর্ধন খামার এলাকায় চরে বসবাসকারী কৃষকদের মতে আমন ধানের ৭৫ থেকে ৮০% ইঁদুর দ্বারা বিগত ৭-৮ বছর ধরে ক্ষতি হয়ে আসছে, অর্থাৎ কৃষক শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগ আমন ধান ঘরে তুলতে পারত। বাংলাদেশে আমন ফসলে গড়ে ১০ থেকে ১৫ ভাগ ইঁদুর দ্বারা প্রতি বছর ক্ষতি হয়ে থাকে।

২. দক্ষিণ অঞ্চলে প্রতিটি নারিকেল গাছের ১০ থেকে ১২টি কচি নারিকেল প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা নষ্ট হয়। সুপারি ও শাকসবজি (গোল আলু), ডাল এবং তৈল ফসলের ক্ষতি করে।

৩। রাস্তাঘাট, বাঁধ, সেচ নালা, বসতবাড়ি, দালানকোঠা ইত্যাদি অবকাঠামোতে গর্ত খননের ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় এবং ১০% সেচের পানির অপচয় হয়।

৪. ইঁদুর ৬০টির বেশি রোগের জীবাণু বহন ও বিস্তার করে থাকে। এদের মাধমে অনেক ধরনের জুনোটিক রোগ যেমন-

প্লেগ, অ্যাইরোসিস। এছাড়া, নানা প্রকার চর্মরোগ, কৃমিরোগ, হানটাভাইরাস মিউরিন টাইফাস, স্পটেড জ্বর, লেপটোস্পাইরোসিস, ইঁদুরের কামরানো জ্বর, জন্ডিস রোগের জীবাণু ইঁদুর দ্বারা বিস্তার ঘটে। এসব রোগের জীবাণু ইঁদুরের মল-মূত্র, লোমের মাধ্যমে  বিস্তার ঘটে।

৫. ইঁদুর খাদ্যের বিষক্রিয়া ও পরিবেশের দূষণ ঘটিয়ে থাকে।

ইঁদুরের ক্ষতিকারক প্রজাতি
বাংলাদেশে ১৩ প্রজাতির ক্ষতিকারক ইঁদুরের প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। তিনটি ইঁদুরের প্রজাতি দশমিনা বীজ বর্ধন খামারে পাওয়া গেছে। প্রজাতিগুলো হচ্ছে- ক. মাঠের বড় কালো ইঁদুর (Bandicota bengalensis), খ. মাঠের কালো ইঁদুর (Bandicota indica), গ. গেছু ইঁদুর ( Rattus rattus)। এদের মধ্যে মাঠের বড় কালো ইঁদুরের সংখ্যা ৯৮%। সামদ্রিক অঞ্চলে ও নিচু ভূমি এলাকায় এদের উপস্থিতি রয়েছে। মাঠের কালো ইঁদুর (Black Field rat) বাংলাদেশে কৃষি ফসল, গুদাম, গ্রাম ও শহর এলাকাসহ সর্বত্র একটি প্রধান ক্ষতিকারক বালাই।
 
মাঠের কালো ইঁদুর বাংলাদেশে কৃষি ফসল, গুদাম, গ্রাম ও শহর এলাকাসহ সর্বত্র একটি প্রধান ক্ষতিকারক বালাই। ঘরের ইঁদুর/গেছু ইঁদুর বাংলাদেশের সর্বত্র এ দলের উপস্থিতি রয়েছে। সেন্টমাটিন দ্বীপে এদের সংখ্যাই বেশি। বহু দেশের গেছো ইঁদুরের (Rattus rattus) যৌগিক সদস্যরা গ্রাম অথবা শহরের আবাসভূমিতে সীমাবদ্ধ থাকে। দানাদার শস্যসহ নানা রকমের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে।   
                                                       
ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ
ইঁদুর দ্বারা ফসল ও সম্পদের প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়। সব ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সঠিকভাবে নির্ণয় করা বাস্তবে সম্ভব হয় না। পৃথিবীতে প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তার পরিমাণ ২৫ টি গরিব দেশের মোট জিডিপি এর সমান হবে। ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করে উপস্থিত ইঁদুরের সংখ্যার নিবিড়তার ওপর। প্রতিটি ইঁদুর তার দেহের ওজনের ১০% খাদ্য প্রতিদিন গ্রহণ করে থাকে। সাধারণত বড় ইঁদুর প্রতিদিন ২৩ থেকে ৫৮ গ্রাম এবং ছোট ইঁদুর ৩ থেকে ৫ গ্রাম খেয়ে থাকে।

শস্য কর্তন পূর্ব ক্ষতি নির্ণয়
ইঁদুরের দ্বারা ক্ষতি অন্যবালাই হতে তফাৎ হচ্ছে ইঁদুর কুশির গোড়ার দিকে মাটি হতে একটু উপরে ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে কাটে। দানাদার শস্যের ( যেমন-ধান, গম) ইঁদুর দ্বারা ক্ষতি বিভিন্ন স্তরে করতে হবে। কুশি স্তরে ইঁদুরের ক্ষতি নির্ণয়ের মাধ্যমে ইঁদুরের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ধানের কুশি স্তরের ইঁদুর দ্বারা ক্ষতি অনেকাংশে পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু থোড় হতে পাকা স্তরে ক্ষতি গাছ পূরণ করতে পারে না । এজন্য পাকা স্তরে ক্ষতির জরিপ করা হয়। দুইটি পদ্ধতিতে ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি জরিপ করা হয়, যথা- ১. কর্তিত ও অকর্তিত কুশি গণনা পদ্ধতি ও ২। সক্রিয় গর্ত গণনা পদ্ধতি     
   
পরিবেশবান্ধব ইঁদুর জাতীয় বালাই ব্যবস্থাপনা কৌশল
ইঁদুর জাতীয় প্রাণী দমনের ক্ষেত্রে কোন ম্যাজিক বুলেট নেই কারণ এদের ২০০ এর উপরে বালাই প্রজাতি রয়েছে যাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র আচরণ, নিবাসন ও খাদ্যাভ্যাসে ভিন্নতা বিদ্যমান। এজন্য একটি পদ্ধতি দ্বারা এদের দমন বা ক্ষতির পরিমাণ কমানো বাস্তবে সম্ভব নয়। প্রত্যেক ইঁদুরজাতীয় বালাই প্রজাতির ভিন্ন ইকোলজি রয়েছে। এ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করার সময় এ বিষয়টি সবসময় বিবেচনায় রাখতে হবে। ইঁদুর দমনের বিষয়টি সার প্রয়োগের মতো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ফসলে অত্যধিক বেশি বা কম এবং অসময়ে সার প্রয়োগ করা হলে অর্থনৈতিক অপচয় ও পরিশ্রম বিফলে যায়। যে কোনো ইঁদুর দমনের ক্ষেত্রে একই রকম ঘটনা ঘটে থাকে।

অর্থনৈতিক প্রান্তসীমা
পোকামাকড়, রোগবালাই ও আগাছা দমনের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু ইঁদুর জাতীয় বালাই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্ব নেই, কারণ একটি মাঠে একটি ইঁদুর দ্বারা শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। এজন্য একটি ইঁদুরের উপস্থিতি দেখামাত্র দমনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাই ইঁদুরের অর্থনৈতিক প্রান্তসীমা হচ্ছে শূন্য।

অনুসন্ধানকারী দল
দশমিনা ১০৪৪ একর বীজবর্ধন খামারের ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি কম রাখার জন্য ৫ থেকে ৮ সদস্যের অনুসন্ধানকারী দল থাকা প্রয়োজন। এ দলের কাজ হবে কোথায় ইঁদুরের উপস্থিতি হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করে দমন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ দলের সদস্যরা মাঠে, আইলে, খালের পাড়ে, পতিত ভূমি, ফলের বাগানে ইঁদুরের গর্ত বা মাটি, ক্ষতিগ্রস্ত শস্য, চলাচলের পথ, মল ইত্যাদি দেখে উপস্থিতি নির্ণয়ন করবে। এ পর্যবেক্ষণ সারা বছর ধরে করতে হবে। এখানে বন হতে যে কোন সময় কিছুসংখ্যক ইঁদুরের আগমন ঘটার সম্ভাবনা আছে এবং তাদের দ্বারা অল্প সময়ে মাঠের পপুলেশন বেড়ে যেতে পারে।

নিবাসন ব্যবস্থাপনা
এ ব্যবস্থার মূল বিষয় হচ্ছে ইঁদুরের নিবাসনের সুযোগ কমানো। এসব নিবাসনগুলো হচ্ছে : হুগলাপাতার বন, কচুরিপানা, ঢোলকমলি, করচা, কচুগাছ ও অন্যান্য আগাছা। এছাড়া মাঠে অনেক স্থানে আগাছা পূর্ণ ছোট, মাঝারি এবং বড় উঁচু পতিত ভূমি যেখানে জোয়ারের সময় ইঁদুর আশ্রয় নিয়ে থাকে। এখানে তিনটি প্রদক্ষেপ প্রহণ করা প্রয়োজন।

ক. হুগলাপাতার বন, কচুরিপানা, ঢোলকলমি জমির পাশে ও খালে, অপ্রয়োজনীয় আগাছা, শস্যের অশিষ্টাংশ কেটে ধ্বংস করতে হবে।

খ. ফসলের মাঠের আইলের প্রস্থ কমিয়ে ৩০ সেন্টিমিটার করা হলে ইঁদুরের বাসা করতে অসুবিধা হবে এবং আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। ফসলের মাঠের পাশে অল্প জায়গা আগাছাযুক্ত পতিত আছে সে স্থানগুলো ফসল চাষের ব্যবস্থা করতে হবে। ফসলের মাঠেও অনেক আগাছা রয়েছে যা ইঁদুরের বাসস্থানের সুবিধা হচ্ছে।  

ইঁদুর দমনের উপযুক্ত সময় ও কলাকৌশল
১. যে কোনো ফসল রোপণ বা বপনের সময় মাঠের ও আইলের ইঁদুর মারতে হবে।
২. জুলাই হতে সেপ্টম্বর মাস পর্যন্ত জোয়ারের পানিতে বীজ বর্ধন খামারের প্রায় সব মাঠ পানিতে ডুবে যায়।

দিনের বেলায় বেশি জোয়ারের সময় মাঠের ইঁদুরগুলো হুগলাপাতা, ঢোলকলমি, কচুরিপানার দলে উঁচু ভূমি এবং গাছে আশ্রয় নিয়ে থাকে। এ সময় নৌকায় দলবেঁধে গিয়ে ওইসব স্থানের ইঁদুর  টেঁটা ও লাঠি দিয়ে মারতে হবে। মাঠের বড় কালো ইঁদুর ডোব দিয়ে ও সাঁতার কেটে অনেক দূর যেতে পারে। এজন্য দল বেঁধে মাঠের ইঁদুরের সম্ভাব্য সকল আশ্রয় স্থানগুলোর ইঁদুর মারতে হবে। এতে পরবর্তীতে ইঁদুরের সংখ্যা কম থাকবে।

৩. জুলাই-আগস্ট মাসে বোনা আমন ধানের ক্ষেতে (বিশেষত স্থানীয় জাতে) ইঁদুর টেঁটা বা অন্যভাবে মারা হলে ক্ষয়ক্ষতি হতে রক্ষা পাবে। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে বেশি ইঁদুর দ্বারা কুশি ক্ষতিকরার পর মারা হলে আমন ধান কিছুটা কম ক্ষতি পূরণ করতে পারে।

৪. জোয়ারের সময় সব রাস্তাঘাট, খালের পাড় ও উঁচু পতিত ভূমির ইঁদুর বিষটোপ প্রয়োগ করে মারতে হবে ।

৫. ফসলের থোড় স্তরে ইঁদুরের প্রজনন কার্যকারিতা আরম্ভ হয়। দশমিনা বীজ বর্ধন খামারে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে ৯৫% এর বেশি স্ত্রী ইঁদুর গর্ভধারণ অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাই সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বেশি ইঁদুর মারা হলে পরবর্তীতে ইঁদুরের সংখ্যা

কম থাকবে। এ সময় একটি স্ত্রী ইঁদুর মারতে পারলে পরবর্তীতে ৩৫টি ইঁদুর মারার সমান উপকার হবে।
গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর নিধন উঁচু ভূমি ও রাস্তাঘাটের, খালের পাড়ে ইঁদুর গর্তর্ খুঁড়ে বেড় করা খুব কঠিন। যেখানে ইঁদুরের গর্তের পরিধি কম সেখানে গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর নিধন করা যায়। দশমিনা বীজ বর্ধন খামারে জোয়ারের পানির কারণে ইঁদুরের গর্তের পরিধি খুব বেশি বড় হয়না। এজন্য গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর দমন করা যায়। গতর্ খুঁড়ার সময় গর্তের চারদিক জাল দ্বারা ঘিরে নিলে ইঁদুর সহজে পালাতে পারে না।

ফাঁদ পেতে ইঁদুর দমন
নানা রকমের ফাঁদ বাজারের পাওয়া যায় যেমন জীবন্ত ইঁদুর ধরার ফাঁদ (তারের খাঁচা ফাঁদ ও কাঠে তৈরি ফাঁদ) এবং কেচি কল (Snap trap) এবং বাঁশের তৈরি ফাঁদ। কেচিকল ব্যবহার করা যেতে পারে। ফাঁদে টোপ হিসেবে নারিকেল ও শুঁটকি মাছ ব্যবহার করা যেতে পারে। কেচি কল দ্বারা ছোট-বড় সব রকমের ইঁদুর জাতীয় প্রাণী নিধন করা যায়। তবে এক বা দুইটির পরিবর্তে ১০ থেকে ২০টি ফাঁদ একই স্থানে তিন রাত ব্যবহার করা হলে বেশি কার্যকর হবে।

রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে ইঁদুর দমনের জন্য তীব্র বিষ বা একমাত্রা বিষ (যেমন-জিংক ফসফাইড), দীর্ঘস্থায়ী বিষ (যেমন-ল্যানির‌্যাট, ব্রমাপয়েন্ট, ক্লেরাট) এবং গ্যাস বড়ি (অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড) ব্যবহার হয়। দশমিনা বীজ বর্ধন খামারের ২% জিংক ফসফাইড বিষটোপ ব্যবহার করা হয়েছে।এ বিষটোপ ব্যবহারের ক্ষেত্র সমস্যা হচ্ছে ইঁদুরের বিষটোপ লাজুকতা সমস্যা রয়েছে। এখানে টোপ হিসেবে শামুক, চিংড়ি, চাল বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব টোপের মধ্যে চিংড়ি মাছ ও শামুকের তৈরি বিষটোপ ইঁদুর বেশি খেয়েছে। এ বিষটোপ আমন ধানের থোড় আসার পূর্ব পর্যন্ত সময়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে।       
            
গ্যাসবড়ি দ্বারা ইঁদুর দমন
গ্যাসবড়ি ইঁদুরের প্রজনন সময়ে ও ফসলের থোড় হতে পাকা স্তরে প্রতিটি নতুন গর্তে একটি গ্যাস বড়ি প্রয়োগ করতে হবে। এতে ইঁদুরের বাচ্চাসহ মারা যায় বলে ইঁদুরের পপুলেশন বাড়তে পারেনা। ইঁদুরের গর্ত পদ্ধতিতে অনেকগুলো নতুন মুখ থাকে। সব গর্তের মুখ নরম বা কাদামাটি দিয়ে ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। গ্যাস বড়ি প্রয়োগকৃত গর্তের মুখ পর দিন খোলা পেলে একইভাবে একটি গ্যাসবড়ি প্রয়োগ করতে হবে। গর্তের ইঁদুর দমনের ক্ষেত্রে গ্যাসবড়ি অত্যন্তÍ কার্যকর একটি পদ্ধতি।

সাবধানতা
যে কোন বিষ মানুষ ও অন্য প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। এজন্য বিষটোপ বা গ্যাস বড়ি প্রয়োগের সময় ধূমপান ও খাদ্য গ্রহণ করা যাবে না। বিষটোপ তৈরি ও প্রয়োগের পর হাতমুখ ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

ধাতব প্রতিরোধক
টিনের পাত লাগানোর পূর্বে গাছকে ইঁদুর মুক্ত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় মরা ডাল পালা কেটে পরিষ্কার করতে হবে এবং অন্য গাছের সঙ্গে লেগে থাকা ডালপালা ছেটে দিতে হবে যাতে অন্য গাছ হতে ইঁদুর আসতে না পারে। নারিকেল, সুপারি গাছসহ ফল উৎপাদনকারী গাছের গোড়া গতে ২ মিটার উপরে গাছের খাড়া কাণ্ডের চারিদিকে ৫০ সেমি. প্রশস্থ টিনের পাত শক্তভাবে আটকিয়ে দিতে হবে। এতে ইঁদুর নিচ হতে গাছের উপরে উঠতে পারে না। 
                     
ইঁদুরভোজী প্রাণী : অনেক বন্যপ্রাণী (যেমন-বন বিড়াল, শিয়াল) এবং নিশাচর পাখি (যেমন-পেঁচা) ও সাপ (যেমন-গুইসাপ) এদের প্রধান খাদ্য হচ্ছে ইঁদুর। এসব প্রাণীদের বংশ বিস্তার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

উপসংহার
ইঁদুর একটি সামাজিক সমস্যা। এ সমস্যা সামাজিকভাবে করতে হবে। দলগতভাবে ফসলের মাঠে ইঁদুরের উপস্থিতি যাচাই ও মারতে হবে। খালের পাড়ের ও রাস্তার ধারের ইঁদুর সর্বদা মারতে হবে। একটি পদ্ধতি দ্বারা সফল বা কার্যকরভাবে ইঁদুর দমন করা সম্ভব হবে না। একাধিক দমন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা সারা বছর ফসরের মাঠে, ঘরবাড়িতে, অফিস আদালতে, ফলের বাগানে, সেচের নালায় কোন সময়ের জন্য বন্ধ করা যাবে না।
 
ড. সন্তোষ কুমার সরকার*
* মুখ্য প্রশিক্ষক (অব:), ডিএই; মোবাইল : ০১৭১৪২২২১৫৭
বিস্তারিত
কৃষিতে ইঁদুর : সমস্যা ও সমাধান
বাংলাদেশে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অনিষ্টকর মেরুদণ্ডী প্রাণী দমন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিষ্টকর প্রাণীর মধ্যে ইঁদুর মাঠ ফসল উৎপাদন ও গুদামজাত শস্য সংরক্ষণের  ক্ষেত্রে একটি প্রধান সমস্যা। ইঁদুর গম ফসলে শতকরা ৩-১২ ভাগ, ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ ফসল নষ্ট করে। এরা বছরে ধান ও গমের প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন পর্যন্ত ক্ষতি করে থাকে যার মূল্য আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকার ও বেশি। তাছাড়া ইঁদুর মুরগির খামারে গর্ত করে, খাবার খেয়ে ডিম ও ছোট মুরগি খেয়ে প্রতি বছর খামারপ্রতি প্রায় ১৮ হাজার টাকা ক্ষতি করে থাকে। প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন গুদামজাত শস্য ইঁদুর দ্বারা ক্ষতি হয়ে থাকে। ইঁদুর মাঠের দানাজাতীয়, শাকসবজি, মূল জাতীয়, ফল জাতীয় ফসলের ক্ষতি করে থাকে। আবার গুদামঘরে সংরক্ষিত ফসলেরও  মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে (প্রায় শতকরা ২০ ভাগ)। এরা যে শুধু ফসলেরই ক্ষতি করে তা নয়। বই খাতা, কাপড়, আসবাবপত্র, বিছানাপত্র ইত্যাদি কেটে নষ্ট করে। ইঁদুর প্রায় ৩০ প্রকার রোগ ছড়ায়। এছাড়া এরা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সেচ নালায় গর্ত করে নষ্ট করে, অনেক সময় বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি কেটে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটায়। এজন্য ইঁদুর দমন অত্যন্ত জরুরি।

ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি : এদের বংশবৃদ্ধির হার অত্যন্ত বেশি। সুষ্ঠু পরিবেশ এক জোড়া ইঁদুর থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার ইঁদুর জন্মলাভ করতে পারে। ইঁদুর বছরে প্রায় প্রতি মাসেই বাচ্চা দিতে পারে এবং প্রতি বারে ৬-৮টি পর্যন্ত বাচ্চা দিতে পারে। জন্মদানের ২ দিনের মধ্যেই এরা পুনরায় গর্ভধারণে সক্ষম হয়। জন্মানোর তিন মাসের মধ্যে বাচ্চা দিতে সক্ষম হয়। ইঁদুরের জীবনকাল ২ থেকে ৩ বছর।
ইঁদুরের আচরণ বা স্বভাব : সব সময় কাটাকাটি করে। কারণ এদের দুই জোড়া কর্তন দন্ত যা অনবরত বৃদ্ধি পায়। এ দাঁতগুলোর আকার  স্বাভাবিক রাখার জন্য এদের সব সময় কাটাকাটি করতে হয়।
নতুন জিনিসের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে। যেমন- ফাঁদ বা বিষটোপের প্রতি লাজুকতা।
যে কোন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে চলতে ও বংশবিস্তার করতে পারে।
সাধারণত সূর্যাস্তের পরপরই এবং সূর্য উদয়ের আগে বেশি তৎপর থাকে।
ইঁদুর রাতে চলাচল করে এবং দিনে লুকিয়ে থাকে।
কিছু প্রজাতি আরোহণ এবং সাঁতারে পটু।
ইঁদুরের ঘ্রাণ শক্তি প্রবল এবং এরা খাদ্যের স্বাদ বুঝতে পারে তবে এরা রঙ নির্ণয় করতে পারে না।

ইঁদুরের প্রজাতিগুলো : বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১৮ প্রজাতির ইঁদুর দেখতে পাওয়া যায়। এদের  ক্ষতির ধরন ও তীব্রতা ভিন্নরূপ।
মাঠের কালো ইঁদুর : মাঝারি আকৃতির। পূর্ণ বয়স্কের ওজন প্রায় ১৫০-২৫০ গ্রাম। মাথাসহ দৈর্ঘ্যরে চেয়ে লেজ খাটো হয়। পিঠের পশম কালচে ধূসর এবং পেটের পশম ফ্যাকাশে ধূসর বর্ণের হয়। এরা মাঠ এবং ঘর উভয় স্থানেই গর্ত করে এবং ব্যাপক ক্ষতি করে।
মাঠের বড় কালো ইঁদুর : বড় আকৃতির। পূর্ণ বয়স্কের ওজন প্রায় ৫০০-১০০০ গ্রাম। মাথাসহ দেহের দৈর্ঘ্যের চেয়ে লেজ খাটো হয়। পিঠের পশম কালচে ধূসর এবং পেটের পশম ফ্যাকাশে ধূসর বর্ণের হয়। এরা মাঠ এবং সাধারণত নিচু স্থানে ব্যাপক ক্ষতি করে। এরা গর্ত করে বসবাস করে। মুরগির খামারেও এরা ক্ষতি করে থাকে।

গেছো ইঁদুর বা ঘরের ইঁদুর : মাঝারি আকৃতির। পূর্ণ বয়স্কের ওজন প্রায় ১২০-২০০ গ্রাম। মাথাসহ দেহের দৈর্ঘ্যরে চেয়ে লেজ বড় হয়। পিঠের কালচে বাদামি এবং পেটের পশম সাদা হয। এরা ঘরে এবং ফলফলাদির গাছে বাসা বাঁধে এবং ব্যাপক ক্ষতি করে। মুরগির খামারেও এরা ক্ষতি করে থাকে।

খাটো লেজযুক্ত ইঁদুর : মাঝারি আকৃতির। পূর্ণ বয়স্কের ওজন প্রায় ১০০-২০০ গ্রাম। মাথাসহ দেহের  দৈর্ঘ্যরে তুলনায় লেজ অর্ধেক বা তার চেয়ে খাটো। পিঠের পশম ধূসর বাদামি এবং পেটের পশম কালচে ধূসর হয়। এরা মাঠে গর্ত করে বসবাস করে এবং ব্যাপক ক্ষতি করে।

নেংটি ইঁদুর : ছোট আকৃতির। পূর্ণ বয়সের ওজন প্রায় ১৫-২০ গ্রাম। পিঠের পেটের পশম হালকা বাদামি বর্ণের হয়। মাথাসহ দেহের দৈর্ঘ্যরে তুলনায় লেজ বড় হয়। এরা ঘরের মধ্যে বাসা বেঁধে বাস করে এবং বিছানাপত্রসহ ঘরের বিভিন্ন  আসবাব কেটে ব্যাপক ক্ষতি করে।

ইঁদুর দ্বারা ফসলের ক্ষতির ধরন
ইঁদুর বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য যেমন- ধান, গম, ভুট্টা, বাদাম, ফলমূল বিশেষ করে শাকসবজি  নারিকেল, পেয়ারা, সফেদা, লিচু, আম, লাউ, মিষ্টি আলু ইত্যাদি কৃষিজ ফসল খেয়ে ক্ষতি করে।

ইঁদুর ধান বা গমের শিষ আসার  সময় ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে তেছরা করে কেটে গর্তের ভেতর নিয়ে বাসা তৈরি করে এবং খায়। এরা যা খায় তার চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি নষ্ট করে।

খাদ্যদ্রব্যে মলমূত্র, পশম এবং রোগ জীবাণু সংক্রমিত করার মাধ্যমে ইঁদুর ক্ষতি করে।
গর্ত করে ঘরের কাঠামো নষ্ট করে এবং খাদ্যদ্রব্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট করে।

মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখির জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন রোগের জীবাণু বহন ও বিস্তার করে।

গর্ত করে সেচ নালা, রাস্তাঘাট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নষ্ট করে।
বিছানাপত্র, আসবাবপত্র, বইপত্রসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কাটাকাটি করে।

ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা
ইঁদুর দমন পদ্ধতিগুলোকে আমরা সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করতে পারি।  ক. পরিবেশসম্মতভাবে ইঁদুর দমন  খ. বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে ইঁদুর দমন বা রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুুর দমন ।

ক. পরিবেশসম্মত ভাবে দমন : কোনো রকম বিষ ব্যবহার না করে অর্থাৎ পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে ইঁদুর দমনই হলো পরিবেশ সম্মতভাবে ইঁদুর দমন । বিভিন্নভাবে এটা করা যায়। যেমন-

১. পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা : বিভিন্ন পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইঁদুরের ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।

ক. ইঁদুর নোংরা স্থান পছন্দ করে বিধায় বাড়িঘর, ক্ষেত খামার, পুকুরপাড়, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, নদীর পাড় ইত্যাদি পরিষ্কার পরিছন্ন রাখতে হবে।

খ. খাদ্য গুদাম এবং খড়ের গাদা মাটির সাথে তৈরি না করে, প্রায় ৬০-৭৫ সেমি. উঁচু মাচা তৈরি করে তার ওপর করতে হবে এতে ইঁদুরের উপদ্রব কম হবে। ক্ষেতের আইল মোটা হলে ইঁদুর গর্ত করে, তাই আইল ছেঁটে চিকন করতে হবে যাতে আইলের প্রস্থ ২০-২৫ সেমি. এর বেশি না থাকে।

গ. বিভিন্ন রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বাড়ি বা গুদাম ঘরে ইঁদুর যাতে প্রবেশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। অনুরূপভাবে নারিকেল বা সুপারি গাছে মাটি থেকে ৫-৬ ফুট উুঁচতে ও ২.৫ ফুট চওড়া মসৃণ টিনের পাত লাগিয়ে ইঁদুর প্রতিরোধ করা যায়। মানুষের  মাথার চুল নেটের মাধ্যমে নারিকেল গাছে ব্যান্ডেজ করে রাখলে ইঁদুর ও কাঁঠবিড়ালি কম ক্ষতি করে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

২. নিবিড়ভাবে ফাঁদ পাতা : বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে ইঁদুর দমন করা যায়। যেমন বাঁশ, কাঠের, টিন ও লোহার তার দ্বারা তৈরি ফাঁদ ব্যবহার করা যেতে পারে। ফাঁদ সাধারণত ২ প্রকার, জীবিত অবস্থায় ধরা ফাঁদ এবং মৃত্যু ফাঁদ। মৃত্যু ফাঁদে সরাসরি ইঁদুর যাঁতাকলে আটকিয়ে মারা যায়। জীবিত ফাঁদে মারা যায় না। ফাঁদে স্ত্রী বা পুরুষ ইঁদুরের মলমূত্র, গায়ের গন্ধযুক্ত টোপ ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তাছাড়া ফাঁদে ব্যবহৃত দ্রব্য যেমন বিস্কুট, নারিকেল, শুঁটকি মাছ এর সাথে যদি কার্বন-ডাই সালফাইড মিশ্রিত করা যায় তবে দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যায় (শতকরা ৫০-৬০ ভাগ বেশি)। আঠা (Rat glue) দ্বারা বাসাবাড়িতে ও মাঠে ইঁদুর দমন করা যায়। নতুন গর্তের মুখে ইঁদুর চলাচলের রাস্তায়, ক্ষেতের আইলে বা ঘরের দেয়াল ঘেঁষে ফাঁদ ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। লক্ষ রাখতে হবে যেন ফাঁদ প্রতিদিন পরিষ্কার করা হয় এবং নতুন খাবার/টোপ দেয়া হয়। ফাঁদে টোপ হিসাবে শুঁটকি মাছ, নারিকেলে পারুটি বেশি কার্যকর।। বেড প্লান্টিং করে গম চাষ করলে ইঁদুরের আক্রমণ কম হয়।

৩. পরভোজী প্রাণী সংরক্ষণ : পেঁচা, গুইসাপ, বেজি, শিয়াল, বিড়াল ইত্যাদি প্রাণীর প্রধান খাদ্য ইঁদুর। এ প্রাণীগুলোকে সংরক্ষণ করলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ ইঁদুর সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে।

খ. রাসায়নিক পদ্ধতি : বিভিন্ন ধরনের বিষ ব্যবহার করে ইঁদুর দমনকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর দমন বলে। দুই ধরনের বিষ সাধারণত পাওয়া যায়। তীব্র বা তাৎক্ষণিক বিষ এবং দীর্ঘস্থায়ী বিষ।

* তাৎক্ষণিক বিষ খাওয়ার ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই ইঁদুর মারা যায়। কিন্তু কয়েক দিন ব্যবহার করার পর বাদ বাকি ইঁদুরেরা বিষটোপ তেমন আর খেতে চায় না। একে বলে বিষটোপ লাজুকতা। এই বিষটোপ ব্যবহারের পূর্বে ১ থেকে ২ দিন বিষহীন টোপ ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিক বিষ হিসাবে জিংক ফসফাইড বিষটোপ ব্যবহƒত হয়, যা বিভিন্ন নামে বাজারে বিক্রি হয়। জিংক ফসফাইড মিশ্রিত গম বিষটোপ গর্তের ভেতর প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

* দীর্ঘস্থায়ী বিষটোপ খাওয়ার ৬-৭ দিন পর ইঁদুর মারা যায়। তাই অন্যান্য জীবিত ইঁদুর বুঝতেই পারে না যে, এই বিষটোপই তাদের সঙ্গীদের মৃত্যুর কারণ।

ফলে ইঁদুর দমনের সফলতা বেশি আসে। অবশ্যই সরকার অনুমোদিত পেস্টিসাইড ডিলারের নিকট থেকে বিষটোপ কিনতে হবে। বাড়িঘর, ক্ষেত খামার যেখানেই ইঁদুরের আক্রমণ হোক না কেন, এক স্থানে অনেকগুলো বিষটোপ না রেখে ৪-৫ স্থানে বিষটোপ ইঁদুরের গর্ত ও চলাচলের রাস্তার আশেপাশে রাখা উচিত।  

বিষটোপ প্রস্তুত বা ব্যবহারের সময় খুব সতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত দরকার। বিষটোপ ছোট ছেলেমেয়েদের ও গৃহপালিত পশুপাখির নাগালের বাইরে রাখতে হবে। মৃত ইঁদুরগুলো একত্র করে গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে। বিষটোপ ছাড়া এক প্রকার গ্যাস বড়ি অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড দিয়েও ইঁদুর দমন করা যায়। প্রতিটি সতেজ গর্তে একটি ট্যাবলেট দিয়ে গর্তের সব মুখ ভালোভাবে বন্ধ করতে হবে। গর্তের মুখ খোলা থাকলে বা মাটিতে ফাটল থাকলে গ্যাস বেরিয়ে যাবে এবং ইঁদুর মারা যাবে না।

ইঁদুর দমনের সফলতা নির্ভর করে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর। অতএব, সম্মিলিতভাবে ইঁদুর দমন করলেই ইঁদুরের উপদ্রব কমানো সম্ভব। ঘরে বা ফসলের মাঠে ইঁদুর দমনের পাশাপাশি উঁচু রাস্তা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সব স্থানেই একটি সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ইঁদুর দমন করতে হবে।

ড. গোবিন্দ চন্দ্র বিশ্বাস*
ড. মো. শাহ আলম**
* প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ** ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, অনিষ্টকারী মেরুদণ্ডী প্রাণী বিভাগ, বিএআরআই, গাজীপুর
বিস্তারিত
মানসম্মত সারের বৈশিষ্ট্য ও ফসল উৎপাদনে এর প্রভাব
মানসম্পন্ন বা গুণগত সার কী?
গুণগত সার বলতে আমরা সেসব সারকে বুঝি যা সরকার কর্তৃক জারিকৃত নির্দেশের শর্তাবলি পূরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরিয়া সারকে ধরা যাক এ সারে মোট নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ ৪৬.০% এবং সর্বোচ্চ বাইউরেটের পরিমাণ ১.৫% ও মোট আর্দ্রতা ১.০% নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি কোন ইউরিয়া সারের নমুনায় নাইট্রোজেনের পরিমাণ ৪৬% এর কম হয়, বাইউরেটের পরিমাণ ১.৫% এর বেশি হয় এবং আর্দ্রতার পরিমাণ ১.০% এর বেশি থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সারটি মানসম্মত নয়।
 
বাংলাদেশের কৃষিতে সাধারণত  ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বরিক এসিড ব্যবহার করা হয়। এ সারগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং ফসল উৎপাদনে তাদের প্রভাব নিম্নে বর্ণনা করা হল। পরিশেষে ভৌতিক উপায়ে এসব সারের মান নির্ধারণ করার সহজ উপায়গুলোও বর্ণনা করা হয়েছে।
 
ইউরিয়া সার
ইউরিয়া বহুল ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সংবলিত একটি রাসায়নিক সার। এটি  প্রিল্ড, গ্রানুলার, পেলেট, পাউডার এবং ক্ষুদ্র স্ফটিক হিসেবে উৎপাদিত হয়। সহজে পানিতে গলে যায় বা দ্রবীভূত হয়।  দেখতে সাদা ধবধবে বা অনেক ক্ষেত্রেই রঙবিহীন। এ সারের কোনো গন্ধ নেই। এটি অম্লীয় বা ক্ষারীয় নয়।
 
ব্যবহারের সুবিধার্থে  ইউরিয়া প্রিল্ড (ক্ষুদ্র দানা<২মিমি.) এবং দানাদার(২-৫মিমি.) হিসেবে বাজারজাত করা হয়। আইএফডিসি  ক্ষুদ্র  উদ্যোক্তাদের  মাধ্যমে গুটি ইউরিয়া বা ইউএসজি বাজারজাত করার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে আসছে। বর্তমানে ২২ জেলায় (ময়মনসিংহ, শেরপুর এবং দক্ষিণ অঞ্চলের ২০টি জেলার ১২২টি উপজেলায়) কৃষি উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ প্রকল্পের (আপি) মাধ্যমে ১.৮-২.৭ গ্রাম ওজনের গুটি ইউরিয়ার ৬০০০টি প্রদর্শনী স্থাপনের ব্যবস্থা নিয়েছে। আউশ ও আমন ধানে প্রতি চার গোছার কেন্দ্রে ১.৮ গ্রাম ওজনের ১টি এবং বোরো ধানে ২.৭ গ্রাম ওজনের ১টি গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
 
ইউরিয়া পুষ্টি উপাদানের চাবিকাঠি নাইট্রোজেন সরবরাহ করে থাকে যা শিকড়ের বৃদ্ধি বিস্তার উৎসাহিত করে। শাকসবজির পর্যাপ্ত পাতা উৎপাদনে সহায়তা করে। আমিষ ও নিউক্লিক এসিড উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল উৎপাদনের মাধ্যমে গাছকে সবুজ বর্ণ দান করে। শর্করা উৎপাদন বাড়ায়। ফলের আকার বড় করতে সাহায্য করে। অন্যান্য সব আবশ্যক উপাদানের পরিশোষণ হার বাড়ায়। কুশি উৎপাদনে সহায়তা করে।
 
মাটিতে নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের  ঘাটতি হলে ক্লোরোফিল সংশ্লেষণের হার কমে যায়। ফলে গাছ স্বাভাবিক সবুজ বর্ণ হারিয়ে ফেলে। পাতার আকার ছোট হয় এবং শাখা প্রশাখার বৃদ্ধি হ্রাস পায়, ফলে গাছ খর্বাকার হয়। গাছের পাতা হালকা সবুজ থেকে হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে এবং অকালেই ঝরে পড়ে। পাতার অগ্রভাগ হতে বিবর্ণতা শুরু হয়। বৃন্ত এবং শাখা প্রশাখা সরু হয়। গোলাপি অথবা হালকা লাল রঙের অস্বাভাবিক বৃন্ত হয়। পুরাতন পাতার মধ্যশিরার শীর্ষভাগ হলুদাভ-বাদামি বর্ণ ধারণ করে।  ফুল ও ফলের আকার ছোট হয়। ফলন কমে যায়।
 
নাইট্রোজেনের প্রয়োগ মাত্রা বেশি হলে গাছের কাঠামো ও গঠন দুর্বল হয়। ফুল ও ফল উৎপাদনে বিলম্বিত হয়। পোকামাকড় ও রোগ আক্রমণ বেড়ে যায়। পাতার অংশ ভারি হলে গাছ হেলে যায়। অতিরিক্ত নাইট্রোজেনে অনেক ফল পানসে হয়।
 
টিএসপি ও ডিএপি সার
টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) ও ডিএপি(ডাইএ্যামোনিয়াম ফসফেট)-এ দুটোই ফসফেট সমৃদ্ধ রাসায়নিক সার। বাংলাদেশে এ সার দুটোর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দানাদার  দ্রব্য হিসেবে এ   সার দুটো বাজারজাত করা হয়। এ সার দুটোতেই  শতকরা ২০ ভাগ ফসফরাস থাকে।  টিএসপিতে  শতকরা ১৩ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং ১.৩ ভাগ গন্ধকও বিদ্যমান থাকে। ডিএপিতে ফসফেট ছাড়াও ১৮% নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকে যার কারণে ইহা চুনযুক্ত পলি মাটির জন্য একটি উত্তম সার।
 
রক ফসফেট নামক খনিজ পদার্থের সঙ্গে ফসফরিক এসিডের বিক্রিয়ার মাধ্যেমে টিএসপি সার প্রস্তুত করা হয়। টিএসপি সারের রঙ ধূসর থেকে গাঢ় ধূসর হয়ে থাকে। এ সারে অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সার পানিতে সহজেই গলে যায়।
 
ডিএপি সার এ্যামোনিয়া এবং ফসফরিক  এসিডের  মধ্যে বিক্রিয়া ঘটিয়ে উৎপাদন করা হয় । এ সার সহজেই পানিতে দ্রবণীয়। এ সারের রঙ সাধারণত সাদাটে থেকে গাঢ় ধূসর হয়ে থাকে। ডিএপিতেও  অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে।
 
ফসফরাস কোষ বিভাজনে অংশগ্রহণ করে। শর্করা উৎপাদন ও আত্তীকরণে সাহায্য করে। শিকড়ের বৃদ্ধি বিস্তার উৎসাহিত করে। গাছের কাঠামো শক্ত করে এবং নেতিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করে। রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ রোধ করে। ফুল, ফল ও বীজে গুণগতমান বাড়ায়।
 
মাটিতে ফসফরাসের ঘাটতি হলে কাণ্ড এবং মূলের বৃদ্ধি হ্রাস পায়। গাছের বৃদ্ধি কু-লিকৃত বা পাকানো হয়। পুরাতন পাতা অকালে ঝরে যায়। পার্শ্বীয় কাণ্ড এবং কুড়ির বৃদ্ধি কমে যায়। ফুলের উৎপাদন কমে যায়। পাতার গোড়া রক্তবর্ণ অথবা ব্রোনজ রঙ ধারণ করে। পাতার পৃষ্ঠভাগ নীলাভ সবুজ বর্ণ ধারণ করে। পাতার কিনারে বাদামি বিবর্ণতা দেখা যায় এবং শুকিয়ে যায়। রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কমে যায়
 
ফসফরাসের পরিমাণ অধিক হলে ফলন কমে যায়। গাছে অকাল পরিপক্বতা আসে।  গাছের বৃদ্ধি কমে যায়।
 
এমওপি সার
এমওপি বা মিউরেট অব পটাশ সর্বাধিক ব্যবহৃত একটি পটাশ সার। এসারে শতকরা ৫০ ভাগ পটাশ থাকে। এসার সহজে পানিতে গলে যায় বা দ্রবীভূত হয়। এ সারের রঙ সাধারণত সাদা থেকে হালকা বা গাঢ় লালচে রঙের এবং এর আকৃতি ছোট থেকে মাঝারি আকারের স্ফটিকাকৃতির হয়ে থাকে।
 
পটাশিয়াম উদ্ভিদ কোষের ভেদ্যতা রক্ষা করে। উদ্ভিদে শ্বেতসার দ্রব্য স্থানান্তরে বা পরিবহনে সহায়তা করে।  লৌহ ও ম্যাংগানিজের কার্যকারিতা বাড়ায়। আমিষ উৎপাদনে সাহায্য করে। উদ্ভিদে পানি পরিশোষণ, আত্তীকরণ ও চলাচল তথা সার্বিক নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়ায়। গাছের কাঠামো শক্ত করে। নাইট্রোজেন ও ফসফরাস পরিশোষণে সমতা বিধান করে।
পটাশের ঘাটতি হলে পুরাতন পাতার কিনরা হতে বিবর্ণতা শুরু হয়। গাঢ় নীল বর্ণের পাতা দেখা যায়। পাতার আন্তঃশিরায় বাদামি বর্ণের টিস্যু হতে দেখা যায়। পাতার উপরিভাগে কুঞ্চিত হতে বা ভাঁজ পড়তে দেখা যায়। গাছ বিকৃত আকার ধারণ করে। ছোট আন্তঃপর্বসহ গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং প্রধান কা-টি মাটির দিকে নুয়ে পড়ে। অনুপযোগী আবহাওয়ায় গাছ খুব সংবেদনশীল হয়।  পোকামাকড় ও রোগবালাই এর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়।

 
পটাশের সরবরাহ বেশি হলে ক্যালসিয়াম ও বোরনের শোষণ হার কমে যায়। বোরনের অভাবজনিত লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠে। পানি-নিঃসরণের হার কমে যায়। গাছের বৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
 
জিপসাম সার
দেশের একমাত্র টিএসপি সারের কারখানায় প্রায় ৬৫ হাজার মে. টন জিপসাম উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। এ সারে শতকরা ১৭ ভাাগ গন্ধক এবং ২৩ ভাগ ক্যালসিয়াম বিদ্যমান থাকে। এ সারের নমুনায় আর্দ্রতা বেশি থাকায় তা বেশি দিন বস্তায় সংরক্ষণ করা যায় না। প্রকৃত জিপসাম সার আলোতে কিছুটা চিক চিক করে এবং এ সারের হস্তানুভূতি কোমল প্রকৃতির। এ সার সাদাটে বা ধূসর বর্ণের পাউডারের  মতো।
 
গন্ধক আমিষ উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল গঠনে সাহায্য করে। গাছের বর্ণ সবুজ রাখে। বীজ উৎপাদনে সাহায্য করে। ফসলের গুণগতমান বাড়ায়।
 
মাটিতে গন্ধকের অভাব হলে গাছের সবুজ বর্ণ বিনষ্ট হয়, কাণ্ড সবুজ ও চিকণ হয়। পাতা ফ্যাকাশে সবুজ বা হলুদ আকার ধারণ করে। গাছে শর্করা এবং নাইট্রোজেন বৃদ্ধি পায়।
 
জিপসাম প্রয়োগের মাত্রা বেশি হলে শিকড়ের বৃদ্ধি কমে যায়। শারীরিক বৃদ্ধি হ্রাস পায়।
 
জিংক সালফেট সার
বাংলাদেশের জিংক বা দস্তা ঘাটতি মাটিতে দুই ধরনের দন্তা সার ব্যবহার হয়ে আসছে। একটি জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট এবং অপরটি জিংক সালফেট হেপটাহাইড্রেট। সামান্য পরিমাণ অন্য একটি দস্তা সার চিলেটেড জিংক প্রে করে সরাসরি গাছে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। জিংক সালফেট মনোহাইড্রেটে শতকরা ৩৬.০ ভাগ দস্তা ও  ১৭.৬ ভাগ গন্ধক থাকে। অপরদিকে জিংক সালফেট হেপটাহাইড্রেটে দস্তা ও গন্ধকের পরিমাণ যথাক্রমে শতকরা  ২১.০ এবং ১০.৫ ভাগ বিদ্যমান থাকে। চিলেটেড জিংকে শতকরা ১০ ভাগ দস্তা বিদ্যমান থাকে।
জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট সারটি আসলে ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকারে উৎপাদিত হয়। ফসলে প্রয়োগের সুবিধার্থে ইহাকে দানাদার করে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। এ সার রঙবিহীন থেকে সাদাটে এবং অনেকটা সাগু দানার মতো দেখা যায়। পানিতে সহজে গলে যায়।

 
জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সারটি দেখতে স্ফটিকাকৃতি চিনির দানার মতো এবং ঝুরঝুরে। প্রকৃত হেপটাহাইড্রেট দস্তা সার পানিতে সহজেই গলে গিয়ে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরি করে।
 
জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) এর তুলনায় অধিক হারে মাটিতে ব্যবহার করা হয়। স্প্রে করেও কোনো কোনো ফসলে প্রয়োগ করা হয়।
 
দস্তা গাছে বিভিন্ন ধরনের হরমোন তৈরিতে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল উৎপাদনে সহায়তা করে। ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফসলের ফসফরাস পুষ্টি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শিম জাতীয় সবজির উল্লেখযোগ্যভাবে ফলন বাড়ায়।
 
মাটিতে দস্তার ঘাটতি হলে গাছের পাতায় তামাটে অথবা দাগের আকারে বিবর্ণতা দেখা যায়। ক্ষুদে পাতা বা রোজেট  লক্ষণের সৃষ্টি হয়। নতুন পাতার গোড়ার দিক থেকে বিবর্ণতা শুরু হয়। আন্তঃশিরার স্থানে বিবর্ণতা প্রকটভাবে দেখা দেয়।
 
জিংকের পরিমাণ বেশি হলে গাছে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত দস্তা আমিষ উৎপাদন অসুবিধার সৃষ্টি করে।
 
বোরণ সার
বরিক এসিড ও সলুবর সার বোরণ ঘাটতি এলাকায় বহুল ব্যবহৃত বোরণ সার। বরিক এসিডের রঙ সাদা। ইহা অনিয়তিকার এবং স্ফটিকাকৃতির। গরম পানিতে সম্পূর্ণ গলে যায়।
সলুবর সার বোরণ ঘাটতি এলাকায় জন্য একটি উৎকৃষ্ট বোরণ সার। এটি দেখতে ধবধবে সাদা, হালকা, মিশি পাউডারের মতো, ঠাণ্ডা পানিতে সল্যুবর সম্পূর্ণ গলে যায় এবং পাত্রে কোনো ধরনের তলানি পড়ে না। 
বোরণ পুষ্টি উপাদান গাছের কোষ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। পাতা ও ফুলের রঙ আকর্ষণীয় করে। পরাগরেণু সবল ও সুস্থ রাখে। বীজ উৎপাদনে সহায়তা করে এবং চিটা রোধ করে।  

 
বোরণের ঘাটতিতে গাছের অগ্রভাগ মরে যায়, কাণ্ড কালো বর্ণ ধারণ করে।  শিকড় বৃদ্ধি হ্রাস পায়। কোষ প্রাচীর ভেঙে যায়। গাছ মচ মচ ভাব ধারণ করে।
 
বোরণের প্রয়োগ মাত্রা বেশি হলে কচি পাতা এবং ডগা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলন অনেক কমে যায়।
 
মাঠ পর্যায়ে গুণগত সার চেনার উপায়
রাসায়নিক সারের ব্যাপক চাহিদা ধাকার কারণে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা লাভের  জন্য ভেজাল সার উৎপাদন এবং আমদানিকৃত সারে ভেজাল মিশ্রিত করে তা বাজারজাত করে থাকে। এর ফলে কৃষক ভাইয়েরা প্রতারিত হয়ে আসছেন। সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহার করেও কাক্সিক্ষত ফলন পান না। ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে জমির উর্বতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমান্নয়ে হ্রাস পাচ্ছে। তাই কৃষক ভাইয়েরা যদি গুণগত সার চেনার বা শনাক্ত করার কৌশল জানতে পারেন, তাহলে ভেজাল সারের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে পারেন। নিচে ভোজাল সার চেনার কিছু কৌশল বর্ণনা করা হল।
 
ইউরিয়া
দেশে উৎপাদিত এবং আমদানি  করা ইউরিয়া সারে সাধারণত ভেজাল পরিলক্ষিত হয় না। তবে ডোলোমায়িট বা সস্তা রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে ছোট দানা তৈরি করে ইউরিয়ার দানার সঙ্গে ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত করলে রঙ দেখে তা শনাক্ত করা যাবে।
 
আসল ইউরিয়া সার কোনো অবস্থাতেই স্ফটিক আকৃতির হবে না। ইহা দানাদার বা প্রিল্ড (ক্ষুদ দানাদার) হিসেবে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। ইহা সহজেই পানিতে গলে যায়।
 
এক চা চামুচ ইউরিয়া আধা গ্লাস পানিতে ঢেলে চামিচ দিয়ে নাড়াচাড়া করলে তাৎক্ষণিকভাবে গলে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরি হবে। এ দ্রবণে হাত দিলে বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হবে।
 
আর একটি সহজ পরীক্ষা হলো কিছু ইউরিয়া খোলা পাত্রে রাখলে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠবে। এতে প্রমাণিত হবে যে ইউরিয়ার নমুনাটিতে কোনো ভেজাল নেই।
 
টিএসপি
টিএসপিতে অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সার পানিতে সহজেই দ্রবণীয়।  এক চা চামুচ টিএসপি পানিতে মিশালে  তাৎক্ষণিকভাবে গলে ডাবের পানির মতো দ্রবণ তৈরি হবে, পক্ষান্তরে ভেজাল টিএসপি পানিতে মিশালে ঘোলা দ্রবণ তেরি হবে। এফএমপি দানা এবং কাঁদা মাটি, জিপসাম ও ডলোমাইট দিয়ে তৈরি দানা যদি ভেজাল হিসাবে টিএসপিতৈ মিশানে হয় তা তলানি আকারে গ্লাসের নিচে জমা হবে।    
                                                                                       
প্রকৃত টিএসপি অধিক শক্ত বিধায় দুটো বুড়ো নখের মাঝে রেখে চাপ দিলে সহজে ভেঙ্গে যাবে না, কিন্তু ভেজাল  টিএসপি অপেক্ষাকৃত নরম হওয়ায় সহজে ভেঙে যাবে। ভেজাল  টিএসপি সারের ভাঙার ভেতরের অংশের রঙ বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এফএমপির দানা যদি ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত তা সহজে ভাঙবে না এবং পানিতেও গলবে না।
 
ডিএপি
ডিএপি সারেও টিএসপি সারের মতো অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সারও সহজেই পানিতে গলে যায়।
 
প্রকৃত ডিএপি সারে নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকায় বাহিরে একটি কাগজে খোলা অবস্থায় কিছু দানা রাখলে তা বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠবে।
 
এক চা চামুচ ডিএপি সারের সঙ্গে খাবার চুন মিশিয়ে কষা দিলে এমোনিয়ার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ বের হলে বুঝা যাবে সারটি প্রকৃত ডিএপি।
 
আর একটি সহজ পরীক্ষা হলো এক চা চামুচ ডিএপি সার আধা গ্লাস পানিতে মিশালে তাৎক্ষণিকভাবে গলে গিয়ে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈয়ার হবে, পক্ষান্তরে গন্ধক জাতীয় কোনো পদার্থ ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত থাকলে ঘোলা দ্রবণ তৈরি হবে।
 
এমওপি
এমওপি সারে ঝাঁঝালো গন্ধ নেই, তবে জিবে দিলে ঝাঁঝালো স্বাদ পাওয়া যায়। বর্ষা কালে খোলা অবস্থায় রেখে দিলে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে ভিজে উঠবে এবং ক্রমান্বয়ে সারে আর্দ্রতার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
আধা চা চামচ এমওপি সার গ্লাসের পানিতে মিশালে তাৎক্ষণিকভাবে গলে পরিষ্কার দ্রবণ তৈরি হবে, পক্ষান্তরে ভেজাল এমওপি পানিতে মিশালে অদ্রবণীয় বস্তু যেমন বালি, কাচের গুঁড়া, ক্ষুদ্র সাধা পাথর, ইটের গুঁড়া ইত্যাদি  তলানি আকারে নিচে জমা হবে। আসল এমওপি সারের ক্ষেত্রে  গ্লাসে হাত দিলে ঠাণ্ডা অনুভূত হবে, নকল সারে কম ঠাণ্ডা অনুভূত হবে। সারে যদি ভেজাল হিসেবে লাল বা অন্য কোনো রঙ মিশ্রিত থাকে, পানির রঙ সেই অনুযায়ী হবে এবং রঙ ভেসে উঠবে। এছাড়া দ্রবণে হাত দিলে রঙ লেগে যাবে।

 
জিপসাম
একটি কাচের বা চীনা মাটির পাত্রে এক চা চামচ জিপসাম সারের উপর ১০ ফোঁটা পাতলা (১০%) হাইড্রোক্লোরিক এসিড মিশালে যদি বুঁদ বুঁদ দেখা যায় তবে ধরে নেয়া যাবে যে জিপসাম সারটি ভেজাল।
কখনও কখনও চুনের গুঁড়া ও মাটির গুঁড়া মিশিয়ে ভেজাল জিপসাম তৈরি করা হয়।
 
জিংক সালফেট সার
প্রকৃত জিংক সালফেট (মনোহাইড্রেট) সার দেখতে রঙবিহীন ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকৃতির। ইহা দানাদার হিসেবেও বাজারজাত করা হয়।
সহজ পরীক্ষার জন্য এক চা চামচ সার আধা গ্লাস পানিতে দ্রবীভূত করলে তা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং দ্রবণটি ঘোলাটে হবে। যদি নমুনাটি সঠিক জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) হয়, তাহলে গাঢ় ঘোলা দ্রবণটি ধীরে ধীরে গ্লাসের নিচ থেকে উপরের দিকে পরিষ্কার হতে থাকবে। যদি নমুনাটি ভেজাল জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) হয়, তাহলে কিছুক্ষণ পর গাঢ় ঘোলাটে দ্রবণটির উপরের অংশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গ্লাসের নিচের দিকে নামতে থাকবে। আসল জিংক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার দেখতে সাদা ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকৃতির । এক চা চামচ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) আধা গ্লাস পানিতে মিশালে সারটি সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং পাত্রে কোনরূপ তলানি পড়বে না।  

 
একই পরিমাণ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট সারের তুলনায় ওজনে অনেক হালকা হয়।
 
একই পরিমাণ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট সারের তুলনায় ওজনে অনেক হালকা হয়।
 
বোরন সার
বরিক এসিডের রঙ সাদা। ইহা অনিয়তিকার এবং স্ফটিক আকৃতির হয়।  হাতে কিছু পরিমাণ বরিক এসিড নিয়ে আঙুল দিয়ে ঘষা দিতে থাকলে এক পর্যায়ে পিচ্ছিল তেলতেলে ভাব অনুভূত হবে। কিন্তু ভেজাল বরিক এসিডে পিচ্ছিল তেলতেলে ভাব অনুভূত হবে না। এক চা চামচ বরিক এসিড এক গ্লাস গরম পানিতে মিশালে উহা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং গ্লাসের তলায় কোনো প্রকার তলানি পড়বে না।
 
সল্যুবর বোরন দেখতে ধবধবে সাদা, হালকা, মিহি পাউডারের মতো। এক চা চামচ সল্যুবর  গ্লাসে ঠাণ্ডা পানিতে দ্রবীভূত করলে প্রকৃত সল্যুবর বোরন সার সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং পাত্রে কোনো প্রকার তলানি পড়বে না। এ দ্রবণে এক চিমটি বেরিয়াম ক্লোরাইড মেশালে দ্রবণে কোনো অধঃক্ষেপ পড়বে না। যদি নমুনাটিতে সোডিয়াম সালফেট ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত থাকে তাহলে বেরিয়াম সালফেটে অধঃক্ষেপ পড়বে এবং দ্রবণটি তাৎক্ষণিকভাবে দুধের মতো সাদা হয়ে যাবে।
 
 
ড. মো. শহিদুল ইসলাম*
* মৃত্তিকা বিজ্ঞানী এবং সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট
বিস্তারিত
মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল দেশি ও তোষা পাট
মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল দেশি ও তোষা পাটের দুইটি নতুন জাতের বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদন পদ্ধতি
পাট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশবান্ধব আঁশ ফসল। বাংলাদেশে সাধারণত দুই প্রজাতির পাট চাষ করা হয়। যেমন- দেশি ও তোষা। সব অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে পাটের অবস্থান এখনও ভালো। পৃথিবীর অন্য পাট উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পাটের মান ভালো এবং বর্তমানে উৎপাদনের বিবেচনায় ভারতের পরে দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশের পাটের অবস্থান। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫.৯ লাখ টন পাট আঁশ উৎপন্ন হয় যার শতকরা ৫১ ভাগ ভারি পাটকলগুলোতে ব্যবহৃত হয়, ৪৪ ভাগ কাঁচা পাট বিদেশে রপ্তানি হয় ও মাত্র ৫ ভাগ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে কাজে লাগে। গত ৭০ বা ৮০ দশকের তুলনায় বাংলাদেশে পাটের আবাদের জমি কমে গেলেও গত ৩ থেকে ৪ বছরে এর একটি বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে পরিবেশগত কারণে পাটের চাহিদার বৃদ্ধি ও সাথে সাথে উৎপাদন বৃদ্ধির একটা সম্ভাবনা প্রায়ই লক্ষ করা যায়। পাট  গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি ধবধবে সাদাসহ এ পর্যন্ত ৪৩টি উচ্চফলনশীল পাট, কেনাফ ও মেস্তা ফসলের জাতের উদ্ভাবন ঘটানো সম্ভব হয়েছে। দেশি ও তোষা পাটের জীবন রহস্য আবিষ্কার এবং পাটের কা- পচা রোগ প্রতিরোধী পাটজাত উদ্ভাবনের নিমিত্তে পাটসহ বিশ্বের পাঁচ  শতাধিক উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকারক ছত্রাক Macrophomina phaseolina এর জীবন রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত এ তথ্যকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে কা-পচা রোগ প্রতিরোধী পাটজাত উদ্ভাবনের গবেষণা এগিয়ে চলছে। সম্প্রতি মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল, কম সময়ে উৎপাদন সক্ষম ও উচ্চফলনশীল পাটের পৃথক দুইটি নতুন দেশি ও তোষা জাতের উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। এ জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য ও উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নিম্নে স্বল্পপরিসরে বর্ণনা দেয়া হলো-

দেশি পাটের নতুন জাত
বিজেআরআই দেশি পাট-৮ (দ্রুতি) (বিজেসি-২১৯৭)
বিজেআরআই কর্তৃক এ উন্নত দেশি পাটের জাতটি অকাল ফুল মুক্ত দীর্ঘ বপনকাল সম্পন্ন দেশি জাত সিসি-৪৫ এর সাথে দ্রুতবর্ধনশীল লাইন ফরমোজা ডিপ রেডের (এফডিআর) সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয় এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০১৩ সালে অনুমোদন পায়। বিজেআরআই দেশি পাট-৮ যা মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল, আগাম পরিপক্ব (দ্রুতবর্ধনশীল), মোজাইক রোগ সহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল। এর কা- হালকা লাল এবং আঁশের মান খুবই ভালো। এ জাতটি দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় সফলভাবে চাষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়, ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনক্ষম জমির সাথে প্রতিযোগিতা কমিয়ে নতুন নতুন এলাকায় পাটকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। তাছাড়া এ জাতটি বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলে চাষ উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। পাতা দীর্ঘ বল্লমাকৃতির। স্বল্পমেয়াদি জাত, কা- হাল্কা লাল, পাতার বোঁটার উপরিভাগ উজ্জ্বল তামাটে লাল রঙ, নিম্ন ভাগে বোঁটা ও ফলকের সংযোগ স্থানে আংটির মতো গাঢ় লাল রঙের গোল দাগ আছে।  তাছাড়া জাতটিতে রোগবালাই কম, সে কারণে চাষিদের খরচও কম হবে। তিন ফসলি শস্যক্রমের জন্য খুব উপযোগী। সঠিক সময়ে বপন করা হলে গাছের উচ্চতা ৩.২ থেকে ৩.৮ মিটার এবং গোড়ার ব্যাস ১৮ মিমি. পর্যন্ত হয়ে থাকে। চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে বৈশাখের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত এর বপন সময়। বীজ হার ৭-৮ কেজি/হেক্টর। এ জাতের পাট ১১৫ দিনে কাটা যায়। সর্বোচ্চ ফলন ক্ষতমা ৪.৫০ টন/হেক্টর। কৃষকের জমিতে  গড়ে ৩.০০ টন/হেক্টর ফলন পাওয়া যায়।

তোষা বা বগী পাটের নতুন জাত
বিজেআরআই তোষা পাট-৬ (ও-৩৮২০)  
বিজেআরআই কর্তৃক এ উন্নত তোষা পাটের জাতটি এনাটমিক্যালি বাছাইকৃত উন্নত লাইনগুলো থেকে বিশুদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ লাইনটি উদ্ভাবন করা হয় এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০১৩ সালে অনুমোদন পায়। এ জাতটি বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলে চাষ উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ জাতটির ছালে পুরুত্ব বেশি এবং পাটকাঠি তুলনামূলক শক্ত। গাছ লম্বা, কাণ্ড গাঢ় সবুজ মসৃণ এবং দ্রুতবর্ধনশীল। বীজের রঙ নীলাভ সবুজ। পাতা লম্বা ও লেনসিওলেট টাইপ। পাতার দৈর্ঘ্য প্রস্থের অনুপাত ২.৬৬:১ যা অন্যাান্য তোষা জাত অপেক্ষা বেশি। সঠিক সময়ে বপন করা হলে গাছের উচ্চতা ৩.৭ থেকে ৪.০ মিটার এবং গোড়ার ব্যাস ২২ মিমি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বপনের উপযুক্ত সময় চৈত্র এর ২য় সপ্তাহ- বৈশাখ এর ২য় সপ্তাহ (এপ্রিল ১ম সপ্তাহ থেকে এপ্রিল শেষ সপ্তাহ)। বীজ হার ৫-৬ কেজি/হেক্টর। এ জাতটিও আগাম পরিপক্ব (দ্রুতবর্ধনশীল) ও উচ্চফলনশীল। আঁশের মান ভালো এবং রঙ উজ্জ্বল সোনালি। এ জাতটি নাবীতে বা দেরিতে বপন করেও মাত্র ১০০-১১০ দিন বয়সে কাটা যাবে। এটি আগাগোড়া প্রায় একই রকম এবং লম্বায় ৪-৫ মিটার হয়ে থাকে। আগের প্রচলিত জাত ও-৪ বা ভারতীয় যে কোনো জাতের তুলনায় ৭-৮ শতাংশ ফলন বেশি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাছাড়া জাতটিতে রোগবালাই কম, সে কারণে চাষিদের খরচও কম হবে। প্রতি হেক্টর জমিতে এ জাতের ফলন প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন টন অর্থাৎ বিঘাতে প্রায় সাড়ে ১২ মন। যেহেতু মাত্র ১০০ থেকে ১১০ দিনে তোষা জাতটি কাটা যাবে সে হিসেবে একই জমিতে তিনটি ফসল ফলানো যাবে অতি সহজে। সর্বোচ্চ ফলন ক্ষমতা ৫.০০ টন/হেক্টর। হেক্টরপ্রতি গাছের সংখ্যা ৩.৫ থেকে ৪.০ লক্ষ রাখা গেলে কৃষকের জমিতে  গড়ে ৩.০০ টন/হেক্টর ফলন পাওয়া যায়। এ জাত দু’টির বীজ উৎপাদনে বিএডিসি ইতোমধ্যেই কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আমরা আশা করি আগামী বছর থেকেই কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদ সম্ভব হবে।

পাট (দেশি /তোষা) উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
বীজ নির্বাচন
উফশী জাতের বীজ নামে হলেই হবে না, বীজের মান ঠিক থাকতে হবে। ভালো এবং অধিক ফসল পেতে হলে রোগমুক্ত, পরিষ্কার ও পরিপুষ্ট বীজ ব্যবহার করা উচিত। বীজের অংকুরোদগম হার (৮০%) এবং মান ঠিক না থাকলে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার আলোকে কেউ কেউ অধিক পরিমাণ বীজ বপন করে ওই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার না করে অধিক নিম্নমানের বীজ বপন করেও পর্যাপ্ত গাছ পাওয়া যায় না। অধিকন্তু নিম্নমানের বীজ থেকে রোগ সহজেই অন্য চারাগাছ আক্রমণ করে ফসলের ক্ষতি করতে পারে।

জমি নির্বাচন
দো-আঁশ এবং বেলে দো-আঁশ ধরনের মাটি বিশিষ্ট যে কোনো জমিতে পাট ভালো হয়। যেসব জমি ঋতুর প্রথমে বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় না এবং বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে এমন জমি নির্বাচন করতে হয়। তাছাড়া বাগানের আশপাশে বা বসতবাড়ির পাশের জমিতে পাট ভালো হয় না। তাই পাটের জন্য একটু উঁচু বা মধ্যম উঁচু জমি নির্বাচন করা প্রয়োজন।

জমি তৈরি
পাটের বীজ খুব ছোট বলে পাট ফসলের জমি মিহি করে চাষ দিতে হয়। পাট গাছ চারমাস ব্যাপী বৃদ্ধি পায় এবং ৩ থেকে ৫ মিটার উঁচু হয় বলে এব জন্য জমি গভীর করে চাষ দেয়া প্রয়োজন। পাট চোষের জন্য খরচ কমাতে হলে যেসব জমিতে আলু বা সবজি করা হয় সেসব জমিতে একবার চাষ করে মই দিয়ে পাট বীজ বপন করেও ভালো ফসল পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

সার প্রয়োগ
যে কোনো ফসলের মতো পাট ফসলেও যথোপযুক্ত সার পরিমিত মাত্রায় উপযুক্ত সময়ে প্রয়োগ করে আঁশের ফলন ও মান যথেষ্ট বাড়ানো সম্ভব। পাট গাছের দৈহিক বৃদ্ধি এবং অাঁশফলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌল। ফসফরাস ও পটাসিয়ামের ভূমিকা নাইট্রোজেনের মতো নাটকীয় না হলেও এদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফসফরাস ভূশয়ান অবস্থাকে প্রতিরোধ করে, আঁশের মান উন্নত করে এবং নাইট্রোজেন সদ্ব্যবহারের উপযুক্ততাকে বাড়িয়ে দেয়। আরও লক্ষ করা গেছে যে, ফসফেট (টিএসপি হিসেবে) এবং পটাশ (মিউরেট অব পটাশ হিসেবে) সারের একবার প্রয়োগ এবং নাইট্রোজেন দুইবার পৃথক প্রয়োগ পাট চাষের জন্য যথেষ্ট অর্থকরী এবং সাফল্যজনক। বাংলাদেশের অনেক পাট চাষের জমি সালফার এবং জিঙ্ক ন্যূনতায় রয়েছে। সেসব জমিতে সালফার ও জিঙ্ক প্রয়োগ করে ফল পাওয়া যায়।

প্রকৃত পক্ষে স্থান ভিত্তিক জমির উবর্বতা শক্তি এবং কোনো কোনো মৌলের অধিক প্রয়োজন তা বিশ্লেষণ করে সার ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করাটা বিজ্ঞান সম্মত। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে অথবা আঞ্চলিক কেন্দ্র সমূহ পর্যায়ে কোন মাটি বিশ্লেষণকারী সুযোগ-সুবিধাদি না থাকায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি পরীক্ষা করে এবং আঞ্চলিক কেন্দ্র সমূহে পরীক্ষণ স্থাপন করে, বিশ্লেষণের মাধ্যমে