কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

ইঁদুর নিধন অভিযান
কৃষি আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে কৃষি খাত থেকে। বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব সরকার। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো কৃষি  ও কৃষকের উন্নয়ন এবং সব প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে এ দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত বিভিন্ন রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে ফসল ঘরে তোলাই কৃষকের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু দেখা যায় কৃষকের উৎপাদিত ফসলের একটা বড় অংশ ইঁদুর দ্বারা নষ্ট হয়। ইঁদুর যে পরিমাণ খাবার খায় তার  চেয়ে বেশি কেটেকুটে নষ্ট করে। ক্রমবর্ধমান হারে বর্ধনশীল জনসংখ্যার খাদ্যের প্রয়োজন মেটাতে মাঠে একাধিক ফসলের চাষ হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে প্রতি বছর ইঁদুরের কারণে ১০-১২ লক্ষ টন খাদ্যশস্য নষ্ট হয়ে থাকে। কারণ ইঁদুর প্রতিদিন তার শরীরের ওজনের ১০ গুণ পর্যন্ত খাবার নষ্ট করতে পারে। এ ছাড়া মলমূত্র ও লোম আমাদের খাদ্যদ্রব্যের সাথে মিশে টাইফয়েড, জন্ডিস, চর্মরোগ, কৃমিরোগসহ ৩৩ প্রকারের রোগ ছড়ায়। মারাত্মক প্লেগ রোগের বাহকও এই ইঁঁদুর। ইঁদুর মাঠের ও ঘরের ফসল নষ্ট করা ছাড়াও বৈদ্যুতিক তার কেটে অগ্নিকা- ঘটায়, টেলিফোনের তার কেটে টেলিফোন অচল করে দেয়, কম্পিউটারসহ ঘরের কাপড়-চোপড়, কাগজপত্র কেটে নষ্ট করে। এ ছাড়া রাস্তা, বাঁধ, রেললাইনে গর্ত করার ফলে বন্যার সময় পানি ঢুকে রাস্তা, বাঁধ ও রেললাইন ভেঙে যায়। ইঁদুর ঘরে ও মাঠে উভয় স্থানে ক্ষতি করলেও মাঠে এর ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এক জরিপ অনুযায়ী আমন ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ, গমের শতকরা ৪-১২ ভাগ, গোল আলুর শতকরা ৫-৭ ভাগ, আনারসে শতকরা ৬ - ৯ ভাগ এবং সেচ নালার ৭-১০ভাগ পানি ইঁদুরের কারণে নষ্ট হয়ে থাকে। এজন্য কৃষকদের ফসলের মাঠে সময়মতো ইঁদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রতি বছরই ইঁদুর নিধন কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে।
 
ইঁদুর দ্রুত বংশবিস্তারকারী প্রাণী। কোন স্থানে এক জোড়া ইঁদুর থাকলেই এক বছরে ৩০০০টি বংশধরের সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য ইঁদুর নিধন করা হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ক্ষতি হবে না। কিন্তু ইঁদুর নিধন না হলে ফসল ও সম্পদের ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশে ইঁদুর নিধন অভিযান ১৯৮৩ সন থেকে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি অভিযানের কার্যক্রম বাস্তবায়ন বিশেষজ্ঞ দ্বারা মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে এবং এর ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী অভিযানের কার্যক্রম কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়ে থাকে।
 
ইঁদুর নিধন অভিযান পরিচালনার ফলে প্রতি বছর ইঁদুরের আক্রমণের হাত থেকে ফসল রক্ষার পরিমাণ বেড়েছে। ইঁদুর নিধন কার্যক্রমকে জোরদার করার ফলে ইঁদুরের আক্রমণের হাত থেকে ফসলের একটা বড় অংশ রক্ষা পাবে বলে আশা করা যায়।
 
ইঁদুর নিধন অভিযানের  উদ্দেশ্য
কৃষক, কৃষাণী, ছাত্রছাত্রী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আইপিএম/আইসিএম ক্লাবের সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসহ সর্বস্তরের জনগণকে ইদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করা।
 
ইঁদুর দমনের লাগসই প্রযুক্তি কৃষিকর্মীগণের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো।
ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিল্পকারখানা ও হাঁস-মুরগির খামার ইঁদুরমুক্ত রাখার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ  করা।
 
আমন ফসল ও অন্যান্য মাঠ ফসলে ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ কম রাখা।
গভীর ও অগভীর নলকূপের সেচের নালার ইঁদুর মেরে পানির অপচয় রোধ করা।
রাস্তাঘাট ও বাঁধের ইঁদুর নিধনের জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা।
ইঁদুরবাহিত রোগের বিস্তার রোধ করা এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা।
 
উপসংহার : ইঁদুরের সমস্যা দীর্ঘদিনের । এ সমস্যা পূর্বে যেমন ছিল, বর্তমানেও রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং অংশীদারিত্ব। কারণ ইঁদুর দমন পদ্ধতি পোকা ও রোগবালাই দমন পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বিষটোপ ও ফাঁদ লাজুকতার সমস্যা রয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতি ও সঠিক  স্থানে দমন পদ্ধতি গ্রহণ না করা হলে দমন ব্যবস্থা ততটা কার্যকর হয় না। সেজন্য একা ইঁদুর মারলে দমন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ ইঁদুর সর্বদা খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য স্থান পরিবর্তন করে থাকে।  এ জন্য পাড়া প্রতিবেশীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একই দিনে ও একই সময়ে ইুঁদর নিধন করা প্রয়োজন। ইঁদুর নিধন অভিযানের সফলতা নির্ভর করে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণের ওপর। ইঁদুরকে একটা সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর সমাধান সামাজিকভাবেই করতে হবে, যাতে ইঁদুর দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ধারায় কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।
 
মো. আখতারুজ্জামান*
* পরিচালক, উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫
বিস্তারিত
পরিবেশবান্ধব ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা
ইঁদুর জাতীয় প্রাণী সম্পর্কে ধারণা
পৃথিবীর সব স্তন্যপায়ী প্রজাতির মধ্যে শতকরা ৪২ ভাগ ইঁদুর জাতীয় প্রাণী। ইঁদুর জাতীয় প্রাণী রোডেন্টসিয়া বর্গের ও মিউরিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। সারা পৃথিবীতে ২৭০০টির অধিক ইঁদুর জাতীয় প্রজাতি আছে। এ প্রাণীদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের দাঁতের বিশেষ গঠন ও তার বিন্যাস। ১৬টি দাঁত থাকে। মাংসাশী ও পেষণ পূর্ব দাঁত নেই। তবে উভয় পাটিতে সামনে একজোড়া করে ছেদন দাঁত যা অত্যন্ত তীক্ষè ও ধারালো বাটালির মতো। ছেদন দাঁত গজানোর পর হতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রতিনিয়ত বাড়ে। কাটাকাটি না করতে পারলে দাঁত বেড়ে চুয়াল দিয়ে বেড় হয়ে যায় এবং ইঁদুরের খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। দাঁত ঠিক রাখার জন্য শক্ত জিনিস সর্বদা কাটাকাটি করে থাকে। ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, সজারু ইঁদুর জাতীয় প্রাণী। চিকা ইঁদুর জাতীয় প্রাণী নহে। ইঁদুর সর্বভূক, নিশাচর এবং স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম সফল প্রাণী। এদের উপকারী ও অপকারী উভয় ভূমিকা রয়েছে। তবে ক্ষতিকারক ভূমিকাই বেশি ।

ইঁদুর দমনের প্রয়োজনীয়তা
১. ইঁদুর মাঠের সব প্রকার খাদ্য শস্যের ক্ষতি করে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ইঁদুর ১২ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টনের অধিক খাদ্যশস্য প্রতি বছর ক্ষতি করে (ডিএই, ২০১৩)। দশমিনা বীজ বর্ধন খামার এলাকায় চরে বসবাসকারী কৃষকদের মতে আমন ধানের ৭৫ থেকে ৮০% ইঁদুর দ্বারা বিগত ৭-৮ বছর ধরে ক্ষতি হয়ে আসছে, অর্থাৎ কৃষক শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগ আমন ধান ঘরে তুলতে পারত। বাংলাদেশে আমন ফসলে গড়ে ১০ থেকে ১৫ ভাগ ইঁদুর দ্বারা প্রতি বছর ক্ষতি হয়ে থাকে।

২. দক্ষিণ অঞ্চলে প্রতিটি নারিকেল গাছের ১০ থেকে ১২টি কচি নারিকেল প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা নষ্ট হয়। সুপারি ও শাকসবজি (গোল আলু), ডাল এবং তৈল ফসলের ক্ষতি করে।

৩। রাস্তাঘাট, বাঁধ, সেচ নালা, বসতবাড়ি, দালানকোঠা ইত্যাদি অবকাঠামোতে গর্ত খননের ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় এবং ১০% সেচের পানির অপচয় হয়।

৪. ইঁদুর ৬০টির বেশি রোগের জীবাণু বহন ও বিস্তার করে থাকে। এদের মাধমে অনেক ধরনের জুনোটিক রোগ যেমন-

প্লেগ, অ্যাইরোসিস। এছাড়া, নানা প্রকার চর্মরোগ, কৃমিরোগ, হানটাভাইরাস মিউরিন টাইফাস, স্পটেড জ্বর, লেপটোস্পাইরোসিস, ইঁদুরের কামরানো জ্বর, জন্ডিস রোগের জীবাণু ইঁদুর দ্বারা বিস্তার ঘটে। এসব রোগের জীবাণু ইঁদুরের মল-মূত্র, লোমের মাধ্যমে  বিস্তার ঘটে।

৫. ইঁদুর খাদ্যের বিষক্রিয়া ও পরিবেশের দূষণ ঘটিয়ে থাকে।

ইঁদুরের ক্ষতিকারক প্রজাতি
বাংলাদেশে ১৩ প্রজাতির ক্ষতিকারক ইঁদুরের প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। তিনটি ইঁদুরের প্রজাতি দশমিনা বীজ বর্ধন খামারে পাওয়া গেছে। প্রজাতিগুলো হচ্ছে- ক. মাঠের বড় কালো ইঁদুর (Bandicota bengalensis), খ. মাঠের কালো ইঁদুর (Bandicota indica), গ. গেছু ইঁদুর ( Rattus rattus)। এদের মধ্যে মাঠের বড় কালো ইঁদুরের সংখ্যা ৯৮%। সামদ্রিক অঞ্চলে ও নিচু ভূমি এলাকায় এদের উপস্থিতি রয়েছে। মাঠের কালো ইঁদুর (Black Field rat) বাংলাদেশে কৃষি ফসল, গুদাম, গ্রাম ও শহর এলাকাসহ সর্বত্র একটি প্রধান ক্ষতিকারক বালাই।
 
মাঠের কালো ইঁদুর বাংলাদেশে কৃষি ফসল, গুদাম, গ্রাম ও শহর এলাকাসহ সর্বত্র একটি প্রধান ক্ষতিকারক বালাই। ঘরের ইঁদুর/গেছু ইঁদুর বাংলাদেশের সর্বত্র এ দলের উপস্থিতি রয়েছে। সেন্টমাটিন দ্বীপে এদের সংখ্যাই বেশি। বহু দেশের গেছো ইঁদুরের (Rattus rattus) যৌগিক সদস্যরা গ্রাম অথবা শহরের আবাসভূমিতে সীমাবদ্ধ থাকে। দানাদার শস্যসহ নানা রকমের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে।   
                                                       
ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ
ইঁদুর দ্বারা ফসল ও সম্পদের প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়। সব ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সঠিকভাবে নির্ণয় করা বাস্তবে সম্ভব হয় না। পৃথিবীতে প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তার পরিমাণ ২৫ টি গরিব দেশের মোট জিডিপি এর সমান হবে। ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করে উপস্থিত ইঁদুরের সংখ্যার নিবিড়তার ওপর। প্রতিটি ইঁদুর তার দেহের ওজনের ১০% খাদ্য প্রতিদিন গ্রহণ করে থাকে। সাধারণত বড় ইঁদুর প্রতিদিন ২৩ থেকে ৫৮ গ্রাম এবং ছোট ইঁদুর ৩ থেকে ৫ গ্রাম খেয়ে থাকে।

শস্য কর্তন পূর্ব ক্ষতি নির্ণয়
ইঁদুরের দ্বারা ক্ষতি অন্যবালাই হতে তফাৎ হচ্ছে ইঁদুর কুশির গোড়ার দিকে মাটি হতে একটু উপরে ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে কাটে। দানাদার শস্যের ( যেমন-ধান, গম) ইঁদুর দ্বারা ক্ষতি বিভিন্ন স্তরে করতে হবে। কুশি স্তরে ইঁদুরের ক্ষতি নির্ণয়ের মাধ্যমে ইঁদুরের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ধানের কুশি স্তরের ইঁদুর দ্বারা ক্ষতি অনেকাংশে পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু থোড় হতে পাকা স্তরে ক্ষতি গাছ পূরণ করতে পারে না । এজন্য পাকা স্তরে ক্ষতির জরিপ করা হয়। দুইটি পদ্ধতিতে ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি জরিপ করা হয়, যথা- ১. কর্তিত ও অকর্তিত কুশি গণনা পদ্ধতি ও ২। সক্রিয় গর্ত গণনা পদ্ধতি     
   
পরিবেশবান্ধব ইঁদুর জাতীয় বালাই ব্যবস্থাপনা কৌশল
ইঁদুর জাতীয় প্রাণী দমনের ক্ষেত্রে কোন ম্যাজিক বুলেট নেই কারণ এদের ২০০ এর উপরে বালাই প্রজাতি রয়েছে যাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র আচরণ, নিবাসন ও খাদ্যাভ্যাসে ভিন্নতা বিদ্যমান। এজন্য একটি পদ্ধতি দ্বারা এদের দমন বা ক্ষতির পরিমাণ কমানো বাস্তবে সম্ভব নয়। প্রত্যেক ইঁদুরজাতীয় বালাই প্রজাতির ভিন্ন ইকোলজি রয়েছে। এ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করার সময় এ বিষয়টি সবসময় বিবেচনায় রাখতে হবে। ইঁদুর দমনের বিষয়টি সার প্রয়োগের মতো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ফসলে অত্যধিক বেশি বা কম এবং অসময়ে সার প্রয়োগ করা হলে অর্থনৈতিক অপচয় ও পরিশ্রম বিফলে যায়। যে কোনো ইঁদুর দমনের ক্ষেত্রে একই রকম ঘটনা ঘটে থাকে।

অর্থনৈতিক প্রান্তসীমা
পোকামাকড়, রোগবালাই ও আগাছা দমনের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু ইঁদুর জাতীয় বালাই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্ব নেই, কারণ একটি মাঠে একটি ইঁদুর দ্বারা শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। এজন্য একটি ইঁদুরের উপস্থিতি দেখামাত্র দমনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাই ইঁদুরের অর্থনৈতিক প্রান্তসীমা হচ্ছে শূন্য।

অনুসন্ধানকারী দল
দশমিনা ১০৪৪ একর বীজবর্ধন খামারের ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি কম রাখার জন্য ৫ থেকে ৮ সদস্যের অনুসন্ধানকারী দল থাকা প্রয়োজন। এ দলের কাজ হবে কোথায় ইঁদুরের উপস্থিতি হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করে দমন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ দলের সদস্যরা মাঠে, আইলে, খালের পাড়ে, পতিত ভূমি, ফলের বাগানে ইঁদুরের গর্ত বা মাটি, ক্ষতিগ্রস্ত শস্য, চলাচলের পথ, মল ইত্যাদি দেখে উপস্থিতি নির্ণয়ন করবে। এ পর্যবেক্ষণ সারা বছর ধরে করতে হবে। এখানে বন হতে যে কোন সময় কিছুসংখ্যক ইঁদুরের আগমন ঘটার সম্ভাবনা আছে এবং তাদের দ্বারা অল্প সময়ে মাঠের পপুলেশন বেড়ে যেতে পারে।

নিবাসন ব্যবস্থাপনা
এ ব্যবস্থার মূল বিষয় হচ্ছে ইঁদুরের নিবাসনের সুযোগ কমানো। এসব নিবাসনগুলো হচ্ছে : হুগলাপাতার বন, কচুরিপানা, ঢোলকমলি, করচা, কচুগাছ ও অন্যান্য আগাছা। এছাড়া মাঠে অনেক স্থানে আগাছা পূর্ণ ছোট, মাঝারি এবং বড় উঁচু পতিত ভূমি যেখানে জোয়ারের সময় ইঁদুর আশ্রয় নিয়ে থাকে। এখানে তিনটি প্রদক্ষেপ প্রহণ করা প্রয়োজন।

ক. হুগলাপাতার বন, কচুরিপানা, ঢোলকলমি জমির পাশে ও খালে, অপ্রয়োজনীয় আগাছা, শস্যের অশিষ্টাংশ কেটে ধ্বংস করতে হবে।

খ. ফসলের মাঠের আইলের প্রস্থ কমিয়ে ৩০ সেন্টিমিটার করা হলে ইঁদুরের বাসা করতে অসুবিধা হবে এবং আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। ফসলের মাঠের পাশে অল্প জায়গা আগাছাযুক্ত পতিত আছে সে স্থানগুলো ফসল চাষের ব্যবস্থা করতে হবে। ফসলের মাঠেও অনেক আগাছা রয়েছে যা ইঁদুরের বাসস্থানের সুবিধা হচ্ছে।  

ইঁদুর দমনের উপযুক্ত সময় ও কলাকৌশল
১. যে কোনো ফসল রোপণ বা বপনের সময় মাঠের ও আইলের ইঁদুর মারতে হবে।
২. জুলাই হতে সেপ্টম্বর মাস পর্যন্ত জোয়ারের পানিতে বীজ বর্ধন খামারের প্রায় সব মাঠ পানিতে ডুবে যায়।

দিনের বেলায় বেশি জোয়ারের সময় মাঠের ইঁদুরগুলো হুগলাপাতা, ঢোলকলমি, কচুরিপানার দলে উঁচু ভূমি এবং গাছে আশ্রয় নিয়ে থাকে। এ সময় নৌকায় দলবেঁধে গিয়ে ওইসব স্থানের ইঁদুর  টেঁটা ও লাঠি দিয়ে মারতে হবে। মাঠের বড় কালো ইঁদুর ডোব দিয়ে ও সাঁতার কেটে অনেক দূর যেতে পারে। এজন্য দল বেঁধে মাঠের ইঁদুরের সম্ভাব্য সকল আশ্রয় স্থানগুলোর ইঁদুর মারতে হবে। এতে পরবর্তীতে ইঁদুরের সংখ্যা কম থাকবে।

৩. জুলাই-আগস্ট মাসে বোনা আমন ধানের ক্ষেতে (বিশেষত স্থানীয় জাতে) ইঁদুর টেঁটা বা অন্যভাবে মারা হলে ক্ষয়ক্ষতি হতে রক্ষা পাবে। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে বেশি ইঁদুর দ্বারা কুশি ক্ষতিকরার পর মারা হলে আমন ধান কিছুটা কম ক্ষতি পূরণ করতে পারে।

৪. জোয়ারের সময় সব রাস্তাঘাট, খালের পাড় ও উঁচু পতিত ভূমির ইঁদুর বিষটোপ প্রয়োগ করে মারতে হবে ।

৫. ফসলের থোড় স্তরে ইঁদুরের প্রজনন কার্যকারিতা আরম্ভ হয়। দশমিনা বীজ বর্ধন খামারে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে ৯৫% এর বেশি স্ত্রী ইঁদুর গর্ভধারণ অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাই সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বেশি ইঁদুর মারা হলে পরবর্তীতে ইঁদুরের সংখ্যা

কম থাকবে। এ সময় একটি স্ত্রী ইঁদুর মারতে পারলে পরবর্তীতে ৩৫টি ইঁদুর মারার সমান উপকার হবে।
গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর নিধন উঁচু ভূমি ও রাস্তাঘাটের, খালের পাড়ে ইঁদুর গর্তর্ খুঁড়ে বেড় করা খুব কঠিন। যেখানে ইঁদুরের গর্তের পরিধি কম সেখানে গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর নিধন করা যায়। দশমিনা বীজ বর্ধন খামারে জোয়ারের পানির কারণে ইঁদুরের গর্তের পরিধি খুব বেশি বড় হয়না। এজন্য গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর দমন করা যায়। গতর্ খুঁড়ার সময় গর্তের চারদিক জাল দ্বারা ঘিরে নিলে ইঁদুর সহজে পালাতে পারে না।

ফাঁদ পেতে ইঁদুর দমন
নানা রকমের ফাঁদ বাজারের পাওয়া যায় যেমন জীবন্ত ইঁদুর ধরার ফাঁদ (তারের খাঁচা ফাঁদ ও কাঠে তৈরি ফাঁদ) এবং কেচি কল (Snap trap) এবং বাঁশের তৈরি ফাঁদ। কেচিকল ব্যবহার করা যেতে পারে। ফাঁদে টোপ হিসেবে নারিকেল ও শুঁটকি মাছ ব্যবহার করা যেতে পারে। কেচি কল দ্বারা ছোট-বড় সব রকমের ইঁদুর জাতীয় প্রাণী নিধন করা যায়। তবে এক বা দুইটির পরিবর্তে ১০ থেকে ২০টি ফাঁদ একই স্থানে তিন রাত ব্যবহার করা হলে বেশি কার্যকর হবে।

রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে ইঁদুর দমনের জন্য তীব্র বিষ বা একমাত্রা বিষ (যেমন-জিংক ফসফাইড), দীর্ঘস্থায়ী বিষ (যেমন-ল্যানির‌্যাট, ব্রমাপয়েন্ট, ক্লেরাট) এবং গ্যাস বড়ি (অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড) ব্যবহার হয়। দশমিনা বীজ বর্ধন খামারের ২% জিংক ফসফাইড বিষটোপ ব্যবহার করা হয়েছে।এ বিষটোপ ব্যবহারের ক্ষেত্র সমস্যা হচ্ছে ইঁদুরের বিষটোপ লাজুকতা সমস্যা রয়েছে। এখানে টোপ হিসেবে শামুক, চিংড়ি, চাল বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব টোপের মধ্যে চিংড়ি মাছ ও শামুকের তৈরি বিষটোপ ইঁদুর বেশি খেয়েছে। এ বিষটোপ আমন ধানের থোড় আসার পূর্ব পর্যন্ত সময়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে।       
            
গ্যাসবড়ি দ্বারা ইঁদুর দমন
গ্যাসবড়ি ইঁদুরের প্রজনন সময়ে ও ফসলের থোড় হতে পাকা স্তরে প্রতিটি নতুন গর্তে একটি গ্যাস বড়ি প্রয়োগ করতে হবে। এতে ইঁদুরের বাচ্চাসহ মারা যায় বলে ইঁদুরের পপুলেশন বাড়তে পারেনা। ইঁদুরের গর্ত পদ্ধতিতে অনেকগুলো নতুন মুখ থাকে। সব গর্তের মুখ নরম বা কাদামাটি দিয়ে ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। গ্যাস বড়ি প্রয়োগকৃত গর্তের মুখ পর দিন খোলা পেলে একইভাবে একটি গ্যাসবড়ি প্রয়োগ করতে হবে। গর্তের ইঁদুর দমনের ক্ষেত্রে গ্যাসবড়ি অত্যন্তÍ কার্যকর একটি পদ্ধতি।

সাবধানতা
যে কোন বিষ মানুষ ও অন্য প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। এজন্য বিষটোপ বা গ্যাস বড়ি প্রয়োগের সময় ধূমপান ও খাদ্য গ্রহণ করা যাবে না। বিষটোপ তৈরি ও প্রয়োগের পর হাতমুখ ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

ধাতব প্রতিরোধক
টিনের পাত লাগানোর পূর্বে গাছকে ইঁদুর মুক্ত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় মরা ডাল পালা কেটে পরিষ্কার করতে হবে এবং অন্য গাছের সঙ্গে লেগে থাকা ডালপালা ছেটে দিতে হবে যাতে অন্য গাছ হতে ইঁদুর আসতে না পারে। নারিকেল, সুপারি গাছসহ ফল উৎপাদনকারী গাছের গোড়া গতে ২ মিটার উপরে গাছের খাড়া কাণ্ডের চারিদিকে ৫০ সেমি. প্রশস্থ টিনের পাত শক্তভাবে আটকিয়ে দিতে হবে। এতে ইঁদুর নিচ হতে গাছের উপরে উঠতে পারে না। 
                     
ইঁদুরভোজী প্রাণী : অনেক বন্যপ্রাণী (যেমন-বন বিড়াল, শিয়াল) এবং নিশাচর পাখি (যেমন-পেঁচা) ও সাপ (যেমন-গুইসাপ) এদের প্রধান খাদ্য হচ্ছে ইঁদুর। এসব প্রাণীদের বংশ বিস্তার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

উপসংহার
ইঁদুর একটি সামাজিক সমস্যা। এ সমস্যা সামাজিকভাবে করতে হবে। দলগতভাবে ফসলের মাঠে ইঁদুরের উপস্থিতি যাচাই ও মারতে হবে। খালের পাড়ের ও রাস্তার ধারের ইঁদুর সর্বদা মারতে হবে। একটি পদ্ধতি দ্বারা সফল বা কার্যকরভাবে ইঁদুর দমন করা সম্ভব হবে না। একাধিক দমন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা সারা বছর ফসরের মাঠে, ঘরবাড়িতে, অফিস আদালতে, ফলের বাগানে, সেচের নালায় কোন সময়ের জন্য বন্ধ করা যাবে না।
 
ড. সন্তোষ কুমার সরকার*
* মুখ্য প্রশিক্ষক (অব:), ডিএই; মোবাইল : ০১৭১৪২২২১৫৭
বিস্তারিত
কৃষিতে ইঁদুর : সমস্যা ও সমাধান
বাংলাদেশে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অনিষ্টকর মেরুদণ্ডী প্রাণী দমন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিষ্টকর প্রাণীর মধ্যে ইঁদুর মাঠ ফসল উৎপাদন ও গুদামজাত শস্য সংরক্ষণের  ক্ষেত্রে একটি প্রধান সমস্যা। ইঁদুর গম ফসলে শতকরা ৩-১২ ভাগ, ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ ফসল নষ্ট করে। এরা বছরে ধান ও গমের প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন পর্যন্ত ক্ষতি করে থাকে যার মূল্য আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকার ও বেশি। তাছাড়া ইঁদুর মুরগির খামারে গর্ত করে, খাবার খেয়ে ডিম ও ছোট মুরগি খেয়ে প্রতি বছর খামারপ্রতি প্রায় ১৮ হাজার টাকা ক্ষতি করে থাকে। প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন গুদামজাত শস্য ইঁদুর দ্বারা ক্ষতি হয়ে থাকে। ইঁদুর মাঠের দানাজাতীয়, শাকসবজি, মূল জাতীয়, ফল জাতীয় ফসলের ক্ষতি করে থাকে। আবার গুদামঘরে সংরক্ষিত ফসলেরও  মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে (প্রায় শতকরা ২০ ভাগ)। এরা যে শুধু ফসলেরই ক্ষতি করে তা নয়। বই খাতা, কাপড়, আসবাবপত্র, বিছানাপত্র ইত্যাদি কেটে নষ্ট করে। ইঁদুর প্রায় ৩০ প্রকার রোগ ছড়ায়। এছাড়া এরা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সেচ নালায় গর্ত করে নষ্ট করে, অনেক সময় বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি কেটে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটায়। এজন্য ইঁদুর দমন অত্যন্ত জরুরি।

ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি : এদের বংশবৃদ্ধির হার অত্যন্ত বেশি। সুষ্ঠু পরিবেশ এক জোড়া ইঁদুর থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার ইঁদুর জন্মলাভ করতে পারে। ইঁদুর বছরে প্রায় প্রতি মাসেই বাচ্চা দিতে পারে এবং প্রতি বারে ৬-৮টি পর্যন্ত বাচ্চা দিতে পারে। জন্মদানের ২ দিনের মধ্যেই এরা পুনরায় গর্ভধারণে সক্ষম হয়। জন্মানোর তিন মাসের মধ্যে বাচ্চা দিতে সক্ষম হয়। ইঁদুরের জীবনকাল ২ থেকে ৩ বছর।
ইঁদুরের আচরণ বা স্বভাব : সব সময় কাটাকাটি করে। কারণ এদের দুই জোড়া কর্তন দন্ত যা অনবরত বৃদ্ধি পায়। এ দাঁতগুলোর আকার  স্বাভাবিক রাখার জন্য এদের সব সময় কাটাকাটি করতে হয়।
নতুন জিনিসের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে। যেমন- ফাঁদ বা বিষটোপের প্রতি লাজুকতা।
যে কোন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে চলতে ও বংশবিস্তার করতে পারে।
সাধারণত সূর্যাস্তের পরপরই এবং সূর্য উদয়ের আগে বেশি তৎপর থাকে।
ইঁদুর রাতে চলাচল করে এবং দিনে লুকিয়ে থাকে।
কিছু প্রজাতি আরোহণ এবং সাঁতারে পটু।
ইঁদুরের ঘ্রাণ শক্তি প্রবল এবং এরা খাদ্যের স্বাদ বুঝতে পারে তবে এরা রঙ নির্ণয় করতে পারে না।

ইঁদুরের প্রজাতিগুলো : বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১৮ প্রজাতির ইঁদুর দেখতে পাওয়া যায়। এদের  ক্ষতির ধরন ও তীব্রতা ভিন্নরূপ।
মাঠের কালো ইঁদুর : মাঝারি আকৃতির। পূর্ণ বয়স্কের ওজন প্রায় ১৫০-২৫০ গ্রাম। মাথাসহ দৈর্ঘ্যরে চেয়ে লেজ খাটো হয়। পিঠের পশম কালচে ধূসর এবং পেটের পশম ফ্যাকাশে ধূসর বর্ণের হয়। এরা মাঠ এবং ঘর উভয় স্থানেই গর্ত করে এবং ব্যাপক ক্ষতি করে।
মাঠের বড় কালো ইঁদুর : বড় আকৃতির। পূর্ণ বয়স্কের ওজন প্রায় ৫০০-১০০০ গ্রাম। মাথাসহ দেহের দৈর্ঘ্যের চেয়ে লেজ খাটো হয়। পিঠের পশম কালচে ধূসর এবং পেটের পশম ফ্যাকাশে ধূসর বর্ণের হয়। এরা মাঠ এবং সাধারণত নিচু স্থানে ব্যাপক ক্ষতি করে। এরা গর্ত করে বসবাস করে। মুরগির খামারেও এরা ক্ষতি করে থাকে।

গেছো ইঁদুর বা ঘরের ইঁদুর : মাঝারি আকৃতির। পূর্ণ বয়স্কের ওজন প্রায় ১২০-২০০ গ্রাম। মাথাসহ দেহের দৈর্ঘ্যরে চেয়ে লেজ বড় হয়। পিঠের কালচে বাদামি এবং পেটের পশম সাদা হয। এরা ঘরে এবং ফলফলাদির গাছে বাসা বাঁধে এবং ব্যাপক ক্ষতি করে। মুরগির খামারেও এরা ক্ষতি করে থাকে।

খাটো লেজযুক্ত ইঁদুর : মাঝারি আকৃতির। পূর্ণ বয়স্কের ওজন প্রায় ১০০-২০০ গ্রাম। মাথাসহ দেহের  দৈর্ঘ্যরে তুলনায় লেজ অর্ধেক বা তার চেয়ে খাটো। পিঠের পশম ধূসর বাদামি এবং পেটের পশম কালচে ধূসর হয়। এরা মাঠে গর্ত করে বসবাস করে এবং ব্যাপক ক্ষতি করে।

নেংটি ইঁদুর : ছোট আকৃতির। পূর্ণ বয়সের ওজন প্রায় ১৫-২০ গ্রাম। পিঠের পেটের পশম হালকা বাদামি বর্ণের হয়। মাথাসহ দেহের দৈর্ঘ্যরে তুলনায় লেজ বড় হয়। এরা ঘরের মধ্যে বাসা বেঁধে বাস করে এবং বিছানাপত্রসহ ঘরের বিভিন্ন  আসবাব কেটে ব্যাপক ক্ষতি করে।

ইঁদুর দ্বারা ফসলের ক্ষতির ধরন
ইঁদুর বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য যেমন- ধান, গম, ভুট্টা, বাদাম, ফলমূল বিশেষ করে শাকসবজি  নারিকেল, পেয়ারা, সফেদা, লিচু, আম, লাউ, মিষ্টি আলু ইত্যাদি কৃষিজ ফসল খেয়ে ক্ষতি করে।

ইঁদুর ধান বা গমের শিষ আসার  সময় ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে তেছরা করে কেটে গর্তের ভেতর নিয়ে বাসা তৈরি করে এবং খায়। এরা যা খায় তার চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি নষ্ট করে।

খাদ্যদ্রব্যে মলমূত্র, পশম এবং রোগ জীবাণু সংক্রমিত করার মাধ্যমে ইঁদুর ক্ষতি করে।
গর্ত করে ঘরের কাঠামো নষ্ট করে এবং খাদ্যদ্রব্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট করে।

মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখির জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন রোগের জীবাণু বহন ও বিস্তার করে।

গর্ত করে সেচ নালা, রাস্তাঘাট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নষ্ট করে।
বিছানাপত্র, আসবাবপত্র, বইপত্রসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কাটাকাটি করে।

ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা
ইঁদুর দমন পদ্ধতিগুলোকে আমরা সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করতে পারি।  ক. পরিবেশসম্মতভাবে ইঁদুর দমন  খ. বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে ইঁদুর দমন বা রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুুর দমন ।

ক. পরিবেশসম্মত ভাবে দমন : কোনো রকম বিষ ব্যবহার না করে অর্থাৎ পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে ইঁদুর দমনই হলো পরিবেশ সম্মতভাবে ইঁদুর দমন । বিভিন্নভাবে এটা করা যায়। যেমন-

১. পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা : বিভিন্ন পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইঁদুরের ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।

ক. ইঁদুর নোংরা স্থান পছন্দ করে বিধায় বাড়িঘর, ক্ষেত খামার, পুকুরপাড়, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, নদীর পাড় ইত্যাদি পরিষ্কার পরিছন্ন রাখতে হবে।

খ. খাদ্য গুদাম এবং খড়ের গাদা মাটির সাথে তৈরি না করে, প্রায় ৬০-৭৫ সেমি. উঁচু মাচা তৈরি করে তার ওপর করতে হবে এতে ইঁদুরের উপদ্রব কম হবে। ক্ষেতের আইল মোটা হলে ইঁদুর গর্ত করে, তাই আইল ছেঁটে চিকন করতে হবে যাতে আইলের প্রস্থ ২০-২৫ সেমি. এর বেশি না থাকে।

গ. বিভিন্ন রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বাড়ি বা গুদাম ঘরে ইঁদুর যাতে প্রবেশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। অনুরূপভাবে নারিকেল বা সুপারি গাছে মাটি থেকে ৫-৬ ফুট উুঁচতে ও ২.৫ ফুট চওড়া মসৃণ টিনের পাত লাগিয়ে ইঁদুর প্রতিরোধ করা যায়। মানুষের  মাথার চুল নেটের মাধ্যমে নারিকেল গাছে ব্যান্ডেজ করে রাখলে ইঁদুর ও কাঁঠবিড়ালি কম ক্ষতি করে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

২. নিবিড়ভাবে ফাঁদ পাতা : বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে ইঁদুর দমন করা যায়। যেমন বাঁশ, কাঠের, টিন ও লোহার তার দ্বারা তৈরি ফাঁদ ব্যবহার করা যেতে পারে। ফাঁদ সাধারণত ২ প্রকার, জীবিত অবস্থায় ধরা ফাঁদ এবং মৃত্যু ফাঁদ। মৃত্যু ফাঁদে সরাসরি ইঁদুর যাঁতাকলে আটকিয়ে মারা যায়। জীবিত ফাঁদে মারা যায় না। ফাঁদে স্ত্রী বা পুরুষ ইঁদুরের মলমূত্র, গায়ের গন্ধযুক্ত টোপ ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তাছাড়া ফাঁদে ব্যবহৃত দ্রব্য যেমন বিস্কুট, নারিকেল, শুঁটকি মাছ এর সাথে যদি কার্বন-ডাই সালফাইড মিশ্রিত করা যায় তবে দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যায় (শতকরা ৫০-৬০ ভাগ বেশি)। আঠা (Rat glue) দ্বারা বাসাবাড়িতে ও মাঠে ইঁদুর দমন করা যায়। নতুন গর্তের মুখে ইঁদুর চলাচলের রাস্তায়, ক্ষেতের আইলে বা ঘরের দেয়াল ঘেঁষে ফাঁদ ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। লক্ষ রাখতে হবে যেন ফাঁদ প্রতিদিন পরিষ্কার করা হয় এবং নতুন খাবার/টোপ দেয়া হয়। ফাঁদে টোপ হিসাবে শুঁটকি মাছ, নারিকেলে পারুটি বেশি কার্যকর।। বেড প্লান্টিং করে গম চাষ করলে ইঁদুরের আক্রমণ কম হয়।

৩. পরভোজী প্রাণী সংরক্ষণ : পেঁচা, গুইসাপ, বেজি, শিয়াল, বিড়াল ইত্যাদি প্রাণীর প্রধান খাদ্য ইঁদুর। এ প্রাণীগুলোকে সংরক্ষণ করলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ ইঁদুর সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে।

খ. রাসায়নিক পদ্ধতি : বিভিন্ন ধরনের বিষ ব্যবহার করে ইঁদুর দমনকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর দমন বলে। দুই ধরনের বিষ সাধারণত পাওয়া যায়। তীব্র বা তাৎক্ষণিক বিষ এবং দীর্ঘস্থায়ী বিষ।

* তাৎক্ষণিক বিষ খাওয়ার ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই ইঁদুর মারা যায়। কিন্তু কয়েক দিন ব্যবহার করার পর বাদ বাকি ইঁদুরেরা বিষটোপ তেমন আর খেতে চায় না। একে বলে বিষটোপ লাজুকতা। এই বিষটোপ ব্যবহারের পূর্বে ১ থেকে ২ দিন বিষহীন টোপ ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিক বিষ হিসাবে জিংক ফসফাইড বিষটোপ ব্যবহƒত হয়, যা বিভিন্ন নামে বাজারে বিক্রি হয়। জিংক ফসফাইড মিশ্রিত গম বিষটোপ গর্তের ভেতর প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

* দীর্ঘস্থায়ী বিষটোপ খাওয়ার ৬-৭ দিন পর ইঁদুর মারা যায়। তাই অন্যান্য জীবিত ইঁদুর বুঝতেই পারে না যে, এই বিষটোপই তাদের সঙ্গীদের মৃত্যুর কারণ।

ফলে ইঁদুর দমনের সফলতা বেশি আসে। অবশ্যই সরকার অনুমোদিত পেস্টিসাইড ডিলারের নিকট থেকে বিষটোপ কিনতে হবে। বাড়িঘর, ক্ষেত খামার যেখানেই ইঁদুরের আক্রমণ হোক না কেন, এক স্থানে অনেকগুলো বিষটোপ না রেখে ৪-৫ স্থানে বিষটোপ ইঁদুরের গর্ত ও চলাচলের রাস্তার আশেপাশে রাখা উচিত।  

বিষটোপ প্রস্তুত বা ব্যবহারের সময় খুব সতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত দরকার। বিষটোপ ছোট ছেলেমেয়েদের ও গৃহপালিত পশুপাখির নাগালের বাইরে রাখতে হবে। মৃত ইঁদুরগুলো একত্র করে গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে। বিষটোপ ছাড়া এক প্রকার গ্যাস বড়ি অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড দিয়েও ইঁদুর দমন করা যায়। প্রতিটি সতেজ গর্তে একটি ট্যাবলেট দিয়ে গর্তের সব মুখ ভালোভাবে বন্ধ করতে হবে। গর্তের মুখ খোলা থাকলে বা মাটিতে ফাটল থাকলে গ্যাস বেরিয়ে যাবে এবং ইঁদুর মারা যাবে না।

ইঁদুর দমনের সফলতা নির্ভর করে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর। অতএব, সম্মিলিতভাবে ইঁদুর দমন করলেই ইঁদুরের উপদ্রব কমানো সম্ভব। ঘরে বা ফসলের মাঠে ইঁদুর দমনের পাশাপাশি উঁচু রাস্তা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সব স্থানেই একটি সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ইঁদুর দমন করতে হবে।

ড. গোবিন্দ চন্দ্র বিশ্বাস*
ড. মো. শাহ আলম**
* প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ** ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, অনিষ্টকারী মেরুদণ্ডী প্রাণী বিভাগ, বিএআরআই, গাজীপুর
বিস্তারিত
মানসম্মত সারের বৈশিষ্ট্য ও ফসল উৎপাদনে এর প্রভাব
মানসম্পন্ন বা গুণগত সার কী?
গুণগত সার বলতে আমরা সেসব সারকে বুঝি যা সরকার কর্তৃক জারিকৃত নির্দেশের শর্তাবলি পূরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরিয়া সারকে ধরা যাক এ সারে মোট নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ ৪৬.০% এবং সর্বোচ্চ বাইউরেটের পরিমাণ ১.৫% ও মোট আর্দ্রতা ১.০% নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি কোন ইউরিয়া সারের নমুনায় নাইট্রোজেনের পরিমাণ ৪৬% এর কম হয়, বাইউরেটের পরিমাণ ১.৫% এর বেশি হয় এবং আর্দ্রতার পরিমাণ ১.০% এর বেশি থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সারটি মানসম্মত নয়।
 
বাংলাদেশের কৃষিতে সাধারণত  ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বরিক এসিড ব্যবহার করা হয়। এ সারগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং ফসল উৎপাদনে তাদের প্রভাব নিম্নে বর্ণনা করা হল। পরিশেষে ভৌতিক উপায়ে এসব সারের মান নির্ধারণ করার সহজ উপায়গুলোও বর্ণনা করা হয়েছে।
 
ইউরিয়া সার
ইউরিয়া বহুল ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সংবলিত একটি রাসায়নিক সার। এটি  প্রিল্ড, গ্রানুলার, পেলেট, পাউডার এবং ক্ষুদ্র স্ফটিক হিসেবে উৎপাদিত হয়। সহজে পানিতে গলে যায় বা দ্রবীভূত হয়।  দেখতে সাদা ধবধবে বা অনেক ক্ষেত্রেই রঙবিহীন। এ সারের কোনো গন্ধ নেই। এটি অম্লীয় বা ক্ষারীয় নয়।
 
ব্যবহারের সুবিধার্থে  ইউরিয়া প্রিল্ড (ক্ষুদ্র দানা<২মিমি.) এবং দানাদার(২-৫মিমি.) হিসেবে বাজারজাত করা হয়। আইএফডিসি  ক্ষুদ্র  উদ্যোক্তাদের  মাধ্যমে গুটি ইউরিয়া বা ইউএসজি বাজারজাত করার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে আসছে। বর্তমানে ২২ জেলায় (ময়মনসিংহ, শেরপুর এবং দক্ষিণ অঞ্চলের ২০টি জেলার ১২২টি উপজেলায়) কৃষি উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ প্রকল্পের (আপি) মাধ্যমে ১.৮-২.৭ গ্রাম ওজনের গুটি ইউরিয়ার ৬০০০টি প্রদর্শনী স্থাপনের ব্যবস্থা নিয়েছে। আউশ ও আমন ধানে প্রতি চার গোছার কেন্দ্রে ১.৮ গ্রাম ওজনের ১টি এবং বোরো ধানে ২.৭ গ্রাম ওজনের ১টি গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
 
ইউরিয়া পুষ্টি উপাদানের চাবিকাঠি নাইট্রোজেন সরবরাহ করে থাকে যা শিকড়ের বৃদ্ধি বিস্তার উৎসাহিত করে। শাকসবজির পর্যাপ্ত পাতা উৎপাদনে সহায়তা করে। আমিষ ও নিউক্লিক এসিড উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল উৎপাদনের মাধ্যমে গাছকে সবুজ বর্ণ দান করে। শর্করা উৎপাদন বাড়ায়। ফলের আকার বড় করতে সাহায্য করে। অন্যান্য সব আবশ্যক উপাদানের পরিশোষণ হার বাড়ায়। কুশি উৎপাদনে সহায়তা করে।
 
মাটিতে নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের  ঘাটতি হলে ক্লোরোফিল সংশ্লেষণের হার কমে যায়। ফলে গাছ স্বাভাবিক সবুজ বর্ণ হারিয়ে ফেলে। পাতার আকার ছোট হয় এবং শাখা প্রশাখার বৃদ্ধি হ্রাস পায়, ফলে গাছ খর্বাকার হয়। গাছের পাতা হালকা সবুজ থেকে হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে এবং অকালেই ঝরে পড়ে। পাতার অগ্রভাগ হতে বিবর্ণতা শুরু হয়। বৃন্ত এবং শাখা প্রশাখা সরু হয়। গোলাপি অথবা হালকা লাল রঙের অস্বাভাবিক বৃন্ত হয়। পুরাতন পাতার মধ্যশিরার শীর্ষভাগ হলুদাভ-বাদামি বর্ণ ধারণ করে।  ফুল ও ফলের আকার ছোট হয়। ফলন কমে যায়।
 
নাইট্রোজেনের প্রয়োগ মাত্রা বেশি হলে গাছের কাঠামো ও গঠন দুর্বল হয়। ফুল ও ফল উৎপাদনে বিলম্বিত হয়। পোকামাকড় ও রোগ আক্রমণ বেড়ে যায়। পাতার অংশ ভারি হলে গাছ হেলে যায়। অতিরিক্ত নাইট্রোজেনে অনেক ফল পানসে হয়।
 
টিএসপি ও ডিএপি সার
টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) ও ডিএপি(ডাইএ্যামোনিয়াম ফসফেট)-এ দুটোই ফসফেট সমৃদ্ধ রাসায়নিক সার। বাংলাদেশে এ সার দুটোর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দানাদার  দ্রব্য হিসেবে এ   সার দুটো বাজারজাত করা হয়। এ সার দুটোতেই  শতকরা ২০ ভাগ ফসফরাস থাকে।  টিএসপিতে  শতকরা ১৩ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং ১.৩ ভাগ গন্ধকও বিদ্যমান থাকে। ডিএপিতে ফসফেট ছাড়াও ১৮% নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকে যার কারণে ইহা চুনযুক্ত পলি মাটির জন্য একটি উত্তম সার।
 
রক ফসফেট নামক খনিজ পদার্থের সঙ্গে ফসফরিক এসিডের বিক্রিয়ার মাধ্যেমে টিএসপি সার প্রস্তুত করা হয়। টিএসপি সারের রঙ ধূসর থেকে গাঢ় ধূসর হয়ে থাকে। এ সারে অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সার পানিতে সহজেই গলে যায়।
 
ডিএপি সার এ্যামোনিয়া এবং ফসফরিক  এসিডের  মধ্যে বিক্রিয়া ঘটিয়ে উৎপাদন করা হয় । এ সার সহজেই পানিতে দ্রবণীয়। এ সারের রঙ সাধারণত সাদাটে থেকে গাঢ় ধূসর হয়ে থাকে। ডিএপিতেও  অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে।
 
ফসফরাস কোষ বিভাজনে অংশগ্রহণ করে। শর্করা উৎপাদন ও আত্তীকরণে সাহায্য করে। শিকড়ের বৃদ্ধি বিস্তার উৎসাহিত করে। গাছের কাঠামো শক্ত করে এবং নেতিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করে। রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ রোধ করে। ফুল, ফল ও বীজে গুণগতমান বাড়ায়।
 
মাটিতে ফসফরাসের ঘাটতি হলে কাণ্ড এবং মূলের বৃদ্ধি হ্রাস পায়। গাছের বৃদ্ধি কু-লিকৃত বা পাকানো হয়। পুরাতন পাতা অকালে ঝরে যায়। পার্শ্বীয় কাণ্ড এবং কুড়ির বৃদ্ধি কমে যায়। ফুলের উৎপাদন কমে যায়। পাতার গোড়া রক্তবর্ণ অথবা ব্রোনজ রঙ ধারণ করে। পাতার পৃষ্ঠভাগ নীলাভ সবুজ বর্ণ ধারণ করে। পাতার কিনারে বাদামি বিবর্ণতা দেখা যায় এবং শুকিয়ে যায়। রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কমে যায়
 
ফসফরাসের পরিমাণ অধিক হলে ফলন কমে যায়। গাছে অকাল পরিপক্বতা আসে।  গাছের বৃদ্ধি কমে যায়।
 
এমওপি সার
এমওপি বা মিউরেট অব পটাশ সর্বাধিক ব্যবহৃত একটি পটাশ সার। এসারে শতকরা ৫০ ভাগ পটাশ থাকে। এসার সহজে পানিতে গলে যায় বা দ্রবীভূত হয়। এ সারের রঙ সাধারণত সাদা থেকে হালকা বা গাঢ় লালচে রঙের এবং এর আকৃতি ছোট থেকে মাঝারি আকারের স্ফটিকাকৃতির হয়ে থাকে।
 
পটাশিয়াম উদ্ভিদ কোষের ভেদ্যতা রক্ষা করে। উদ্ভিদে শ্বেতসার দ্রব্য স্থানান্তরে বা পরিবহনে সহায়তা করে।  লৌহ ও ম্যাংগানিজের কার্যকারিতা বাড়ায়। আমিষ উৎপাদনে সাহায্য করে। উদ্ভিদে পানি পরিশোষণ, আত্তীকরণ ও চলাচল তথা সার্বিক নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়ায়। গাছের কাঠামো শক্ত করে। নাইট্রোজেন ও ফসফরাস পরিশোষণে সমতা বিধান করে।
পটাশের ঘাটতি হলে পুরাতন পাতার কিনরা হতে বিবর্ণতা শুরু হয়। গাঢ় নীল বর্ণের পাতা দেখা যায়। পাতার আন্তঃশিরায় বাদামি বর্ণের টিস্যু হতে দেখা যায়। পাতার উপরিভাগে কুঞ্চিত হতে বা ভাঁজ পড়তে দেখা যায়। গাছ বিকৃত আকার ধারণ করে। ছোট আন্তঃপর্বসহ গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং প্রধান কা-টি মাটির দিকে নুয়ে পড়ে। অনুপযোগী আবহাওয়ায় গাছ খুব সংবেদনশীল হয়।  পোকামাকড় ও রোগবালাই এর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়।

 
পটাশের সরবরাহ বেশি হলে ক্যালসিয়াম ও বোরনের শোষণ হার কমে যায়। বোরনের অভাবজনিত লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠে। পানি-নিঃসরণের হার কমে যায়। গাছের বৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
 
জিপসাম সার
দেশের একমাত্র টিএসপি সারের কারখানায় প্রায় ৬৫ হাজার মে. টন জিপসাম উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। এ সারে শতকরা ১৭ ভাাগ গন্ধক এবং ২৩ ভাগ ক্যালসিয়াম বিদ্যমান থাকে। এ সারের নমুনায় আর্দ্রতা বেশি থাকায় তা বেশি দিন বস্তায় সংরক্ষণ করা যায় না। প্রকৃত জিপসাম সার আলোতে কিছুটা চিক চিক করে এবং এ সারের হস্তানুভূতি কোমল প্রকৃতির। এ সার সাদাটে বা ধূসর বর্ণের পাউডারের  মতো।
 
গন্ধক আমিষ উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল গঠনে সাহায্য করে। গাছের বর্ণ সবুজ রাখে। বীজ উৎপাদনে সাহায্য করে। ফসলের গুণগতমান বাড়ায়।
 
মাটিতে গন্ধকের অভাব হলে গাছের সবুজ বর্ণ বিনষ্ট হয়, কাণ্ড সবুজ ও চিকণ হয়। পাতা ফ্যাকাশে সবুজ বা হলুদ আকার ধারণ করে। গাছে শর্করা এবং নাইট্রোজেন বৃদ্ধি পায়।
 
জিপসাম প্রয়োগের মাত্রা বেশি হলে শিকড়ের বৃদ্ধি কমে যায়। শারীরিক বৃদ্ধি হ্রাস পায়।
 
জিংক সালফেট সার
বাংলাদেশের জিংক বা দস্তা ঘাটতি মাটিতে দুই ধরনের দন্তা সার ব্যবহার হয়ে আসছে। একটি জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট এবং অপরটি জিংক সালফেট হেপটাহাইড্রেট। সামান্য পরিমাণ অন্য একটি দস্তা সার চিলেটেড জিংক প্রে করে সরাসরি গাছে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। জিংক সালফেট মনোহাইড্রেটে শতকরা ৩৬.০ ভাগ দস্তা ও  ১৭.৬ ভাগ গন্ধক থাকে। অপরদিকে জিংক সালফেট হেপটাহাইড্রেটে দস্তা ও গন্ধকের পরিমাণ যথাক্রমে শতকরা  ২১.০ এবং ১০.৫ ভাগ বিদ্যমান থাকে। চিলেটেড জিংকে শতকরা ১০ ভাগ দস্তা বিদ্যমান থাকে।
জিংক সালফেট মনোহাইড্রেট সারটি আসলে ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকারে উৎপাদিত হয়। ফসলে প্রয়োগের সুবিধার্থে ইহাকে দানাদার করে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। এ সার রঙবিহীন থেকে সাদাটে এবং অনেকটা সাগু দানার মতো দেখা যায়। পানিতে সহজে গলে যায়।

 
জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সারটি দেখতে স্ফটিকাকৃতি চিনির দানার মতো এবং ঝুরঝুরে। প্রকৃত হেপটাহাইড্রেট দস্তা সার পানিতে সহজেই গলে গিয়ে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরি করে।
 
জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) এর তুলনায় অধিক হারে মাটিতে ব্যবহার করা হয়। স্প্রে করেও কোনো কোনো ফসলে প্রয়োগ করা হয়।
 
দস্তা গাছে বিভিন্ন ধরনের হরমোন তৈরিতে অংশগ্রহণ করে। ক্লোরোফিল উৎপাদনে সহায়তা করে। ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফসলের ফসফরাস পুষ্টি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শিম জাতীয় সবজির উল্লেখযোগ্যভাবে ফলন বাড়ায়।
 
মাটিতে দস্তার ঘাটতি হলে গাছের পাতায় তামাটে অথবা দাগের আকারে বিবর্ণতা দেখা যায়। ক্ষুদে পাতা বা রোজেট  লক্ষণের সৃষ্টি হয়। নতুন পাতার গোড়ার দিক থেকে বিবর্ণতা শুরু হয়। আন্তঃশিরার স্থানে বিবর্ণতা প্রকটভাবে দেখা দেয়।
 
জিংকের পরিমাণ বেশি হলে গাছে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত দস্তা আমিষ উৎপাদন অসুবিধার সৃষ্টি করে।
 
বোরণ সার
বরিক এসিড ও সলুবর সার বোরণ ঘাটতি এলাকায় বহুল ব্যবহৃত বোরণ সার। বরিক এসিডের রঙ সাদা। ইহা অনিয়তিকার এবং স্ফটিকাকৃতির। গরম পানিতে সম্পূর্ণ গলে যায়।
সলুবর সার বোরণ ঘাটতি এলাকায় জন্য একটি উৎকৃষ্ট বোরণ সার। এটি দেখতে ধবধবে সাদা, হালকা, মিশি পাউডারের মতো, ঠাণ্ডা পানিতে সল্যুবর সম্পূর্ণ গলে যায় এবং পাত্রে কোনো ধরনের তলানি পড়ে না। 
বোরণ পুষ্টি উপাদান গাছের কোষ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। পাতা ও ফুলের রঙ আকর্ষণীয় করে। পরাগরেণু সবল ও সুস্থ রাখে। বীজ উৎপাদনে সহায়তা করে এবং চিটা রোধ করে।  

 
বোরণের ঘাটতিতে গাছের অগ্রভাগ মরে যায়, কাণ্ড কালো বর্ণ ধারণ করে।  শিকড় বৃদ্ধি হ্রাস পায়। কোষ প্রাচীর ভেঙে যায়। গাছ মচ মচ ভাব ধারণ করে।
 
বোরণের প্রয়োগ মাত্রা বেশি হলে কচি পাতা এবং ডগা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলন অনেক কমে যায়।
 
মাঠ পর্যায়ে গুণগত সার চেনার উপায়
রাসায়নিক সারের ব্যাপক চাহিদা ধাকার কারণে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা লাভের  জন্য ভেজাল সার উৎপাদন এবং আমদানিকৃত সারে ভেজাল মিশ্রিত করে তা বাজারজাত করে থাকে। এর ফলে কৃষক ভাইয়েরা প্রতারিত হয়ে আসছেন। সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহার করেও কাক্সিক্ষত ফলন পান না। ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে জমির উর্বতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমান্নয়ে হ্রাস পাচ্ছে। তাই কৃষক ভাইয়েরা যদি গুণগত সার চেনার বা শনাক্ত করার কৌশল জানতে পারেন, তাহলে ভেজাল সারের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে পারেন। নিচে ভোজাল সার চেনার কিছু কৌশল বর্ণনা করা হল।
 
ইউরিয়া
দেশে উৎপাদিত এবং আমদানি  করা ইউরিয়া সারে সাধারণত ভেজাল পরিলক্ষিত হয় না। তবে ডোলোমায়িট বা সস্তা রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে ছোট দানা তৈরি করে ইউরিয়ার দানার সঙ্গে ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত করলে রঙ দেখে তা শনাক্ত করা যাবে।
 
আসল ইউরিয়া সার কোনো অবস্থাতেই স্ফটিক আকৃতির হবে না। ইহা দানাদার বা প্রিল্ড (ক্ষুদ দানাদার) হিসেবে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। ইহা সহজেই পানিতে গলে যায়।
 
এক চা চামুচ ইউরিয়া আধা গ্লাস পানিতে ঢেলে চামিচ দিয়ে নাড়াচাড়া করলে তাৎক্ষণিকভাবে গলে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরি হবে। এ দ্রবণে হাত দিলে বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হবে।
 
আর একটি সহজ পরীক্ষা হলো কিছু ইউরিয়া খোলা পাত্রে রাখলে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠবে। এতে প্রমাণিত হবে যে ইউরিয়ার নমুনাটিতে কোনো ভেজাল নেই।
 
টিএসপি
টিএসপিতে অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সার পানিতে সহজেই দ্রবণীয়।  এক চা চামুচ টিএসপি পানিতে মিশালে  তাৎক্ষণিকভাবে গলে ডাবের পানির মতো দ্রবণ তৈরি হবে, পক্ষান্তরে ভেজাল টিএসপি পানিতে মিশালে ঘোলা দ্রবণ তেরি হবে। এফএমপি দানা এবং কাঁদা মাটি, জিপসাম ও ডলোমাইট দিয়ে তৈরি দানা যদি ভেজাল হিসাবে টিএসপিতৈ মিশানে হয় তা তলানি আকারে গ্লাসের নিচে জমা হবে।    
                                                                                       
প্রকৃত টিএসপি অধিক শক্ত বিধায় দুটো বুড়ো নখের মাঝে রেখে চাপ দিলে সহজে ভেঙ্গে যাবে না, কিন্তু ভেজাল  টিএসপি অপেক্ষাকৃত নরম হওয়ায় সহজে ভেঙে যাবে। ভেজাল  টিএসপি সারের ভাঙার ভেতরের অংশের রঙ বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এফএমপির দানা যদি ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত তা সহজে ভাঙবে না এবং পানিতেও গলবে না।
 
ডিএপি
ডিএপি সারেও টিএসপি সারের মতো অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সারও সহজেই পানিতে গলে যায়।
 
প্রকৃত ডিএপি সারে নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকায় বাহিরে একটি কাগজে খোলা অবস্থায় কিছু দানা রাখলে তা বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠবে।
 
এক চা চামুচ ডিএপি সারের সঙ্গে খাবার চুন মিশিয়ে কষা দিলে এমোনিয়ার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ বের হলে বুঝা যাবে সারটি প্রকৃত ডিএপি।
 
আর একটি সহজ পরীক্ষা হলো এক চা চামুচ ডিএপি সার আধা গ্লাস পানিতে মিশালে তাৎক্ষণিকভাবে গলে গিয়ে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈয়ার হবে, পক্ষান্তরে গন্ধক জাতীয় কোনো পদার্থ ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত থাকলে ঘোলা দ্রবণ তৈরি হবে।
 
এমওপি
এমওপি সারে ঝাঁঝালো গন্ধ নেই, তবে জিবে দিলে ঝাঁঝালো স্বাদ পাওয়া যায়। বর্ষা কালে খোলা অবস্থায় রেখে দিলে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে ভিজে উঠবে এবং ক্রমান্বয়ে সারে আর্দ্রতার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
আধা চা চামচ এমওপি সার গ্লাসের পানিতে মিশালে তাৎক্ষণিকভাবে গলে পরিষ্কার দ্রবণ তৈরি হবে, পক্ষান্তরে ভেজাল এমওপি পানিতে মিশালে অদ্রবণীয় বস্তু যেমন বালি, কাচের গুঁড়া, ক্ষুদ্র সাধা পাথর, ইটের গুঁড়া ইত্যাদি  তলানি আকারে নিচে জমা হবে। আসল এমওপি সারের ক্ষেত্রে  গ্লাসে হাত দিলে ঠাণ্ডা অনুভূত হবে, নকল সারে কম ঠাণ্ডা অনুভূত হবে। সারে যদি ভেজাল হিসেবে লাল বা অন্য কোনো রঙ মিশ্রিত থাকে, পানির রঙ সেই অনুযায়ী হবে এবং রঙ ভেসে উঠবে। এছাড়া দ্রবণে হাত দিলে রঙ লেগে যাবে।

 
জিপসাম
একটি কাচের বা চীনা মাটির পাত্রে এক চা চামচ জিপসাম সারের উপর ১০ ফোঁটা পাতলা (১০%) হাইড্রোক্লোরিক এসিড মিশালে যদি বুঁদ বুঁদ দেখা যায় তবে ধরে নেয়া যাবে যে জিপসাম সারটি ভেজাল।
কখনও কখনও চুনের গুঁড়া ও মাটির গুঁড়া মিশিয়ে ভেজাল জিপসাম তৈরি করা হয়।
 
জিংক সালফেট সার
প্রকৃত জিংক সালফেট (মনোহাইড্রেট) সার দেখতে রঙবিহীন ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকৃতির। ইহা দানাদার হিসেবেও বাজারজাত করা হয়।
সহজ পরীক্ষার জন্য এক চা চামচ সার আধা গ্লাস পানিতে দ্রবীভূত করলে তা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং দ্রবণটি ঘোলাটে হবে। যদি নমুনাটি সঠিক জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) হয়, তাহলে গাঢ় ঘোলা দ্রবণটি ধীরে ধীরে গ্লাসের নিচ থেকে উপরের দিকে পরিষ্কার হতে থাকবে। যদি নমুনাটি ভেজাল জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) হয়, তাহলে কিছুক্ষণ পর গাঢ় ঘোলাটে দ্রবণটির উপরের অংশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গ্লাসের নিচের দিকে নামতে থাকবে। আসল জিংক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার দেখতে সাদা ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকৃতির । এক চা চামচ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) আধা গ্লাস পানিতে মিশালে সারটি সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং পাত্রে কোনরূপ তলানি পড়বে না।  

 
একই পরিমাণ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট সারের তুলনায় ওজনে অনেক হালকা হয়।
 
একই পরিমাণ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট সারের তুলনায় ওজনে অনেক হালকা হয়।
 
বোরন সার
বরিক এসিডের রঙ সাদা। ইহা অনিয়তিকার এবং স্ফটিক আকৃতির হয়।  হাতে কিছু পরিমাণ বরিক এসিড নিয়ে আঙুল দিয়ে ঘষা দিতে থাকলে এক পর্যায়ে পিচ্ছিল তেলতেলে ভাব অনুভূত হবে। কিন্তু ভেজাল বরিক এসিডে পিচ্ছিল তেলতেলে ভাব অনুভূত হবে না। এক চা চামচ বরিক এসিড এক গ্লাস গরম পানিতে মিশালে উহা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং গ্লাসের তলায় কোনো প্রকার তলানি পড়বে না।
 
সল্যুবর বোরন দেখতে ধবধবে সাদা, হালকা, মিহি পাউডারের মতো। এক চা চামচ সল্যুবর  গ্লাসে ঠাণ্ডা পানিতে দ্রবীভূত করলে প্রকৃত সল্যুবর বোরন সার সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং পাত্রে কোনো প্রকার তলানি পড়বে না। এ দ্রবণে এক চিমটি বেরিয়াম ক্লোরাইড মেশালে দ্রবণে কোনো অধঃক্ষেপ পড়বে না। যদি নমুনাটিতে সোডিয়াম সালফেট ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত থাকে তাহলে বেরিয়াম সালফেটে অধঃক্ষেপ পড়বে এবং দ্রবণটি তাৎক্ষণিকভাবে দুধের মতো সাদা হয়ে যাবে।
 
 
ড. মো. শহিদুল ইসলাম*
* মৃত্তিকা বিজ্ঞানী এবং সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট
বিস্তারিত
মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল দেশি ও তোষা পাট
মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল দেশি ও তোষা পাটের দুইটি নতুন জাতের বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদন পদ্ধতি
পাট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশবান্ধব আঁশ ফসল। বাংলাদেশে সাধারণত দুই প্রজাতির পাট চাষ করা হয়। যেমন- দেশি ও তোষা। সব অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে পাটের অবস্থান এখনও ভালো। পৃথিবীর অন্য পাট উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পাটের মান ভালো এবং বর্তমানে উৎপাদনের বিবেচনায় ভারতের পরে দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশের পাটের অবস্থান। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫.৯ লাখ টন পাট আঁশ উৎপন্ন হয় যার শতকরা ৫১ ভাগ ভারি পাটকলগুলোতে ব্যবহৃত হয়, ৪৪ ভাগ কাঁচা পাট বিদেশে রপ্তানি হয় ও মাত্র ৫ ভাগ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে কাজে লাগে। গত ৭০ বা ৮০ দশকের তুলনায় বাংলাদেশে পাটের আবাদের জমি কমে গেলেও গত ৩ থেকে ৪ বছরে এর একটি বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে পরিবেশগত কারণে পাটের চাহিদার বৃদ্ধি ও সাথে সাথে উৎপাদন বৃদ্ধির একটা সম্ভাবনা প্রায়ই লক্ষ করা যায়। পাট  গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি ধবধবে সাদাসহ এ পর্যন্ত ৪৩টি উচ্চফলনশীল পাট, কেনাফ ও মেস্তা ফসলের জাতের উদ্ভাবন ঘটানো সম্ভব হয়েছে। দেশি ও তোষা পাটের জীবন রহস্য আবিষ্কার এবং পাটের কা- পচা রোগ প্রতিরোধী পাটজাত উদ্ভাবনের নিমিত্তে পাটসহ বিশ্বের পাঁচ  শতাধিক উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকারক ছত্রাক Macrophomina phaseolina এর জীবন রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত এ তথ্যকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে কা-পচা রোগ প্রতিরোধী পাটজাত উদ্ভাবনের গবেষণা এগিয়ে চলছে। সম্প্রতি মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল, কম সময়ে উৎপাদন সক্ষম ও উচ্চফলনশীল পাটের পৃথক দুইটি নতুন দেশি ও তোষা জাতের উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। এ জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য ও উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নিম্নে স্বল্পপরিসরে বর্ণনা দেয়া হলো-

দেশি পাটের নতুন জাত
বিজেআরআই দেশি পাট-৮ (দ্রুতি) (বিজেসি-২১৯৭)
বিজেআরআই কর্তৃক এ উন্নত দেশি পাটের জাতটি অকাল ফুল মুক্ত দীর্ঘ বপনকাল সম্পন্ন দেশি জাত সিসি-৪৫ এর সাথে দ্রুতবর্ধনশীল লাইন ফরমোজা ডিপ রেডের (এফডিআর) সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয় এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০১৩ সালে অনুমোদন পায়। বিজেআরআই দেশি পাট-৮ যা মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল, আগাম পরিপক্ব (দ্রুতবর্ধনশীল), মোজাইক রোগ সহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল। এর কা- হালকা লাল এবং আঁশের মান খুবই ভালো। এ জাতটি দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় সফলভাবে চাষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়, ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনক্ষম জমির সাথে প্রতিযোগিতা কমিয়ে নতুন নতুন এলাকায় পাটকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। তাছাড়া এ জাতটি বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলে চাষ উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। পাতা দীর্ঘ বল্লমাকৃতির। স্বল্পমেয়াদি জাত, কা- হাল্কা লাল, পাতার বোঁটার উপরিভাগ উজ্জ্বল তামাটে লাল রঙ, নিম্ন ভাগে বোঁটা ও ফলকের সংযোগ স্থানে আংটির মতো গাঢ় লাল রঙের গোল দাগ আছে।  তাছাড়া জাতটিতে রোগবালাই কম, সে কারণে চাষিদের খরচও কম হবে। তিন ফসলি শস্যক্রমের জন্য খুব উপযোগী। সঠিক সময়ে বপন করা হলে গাছের উচ্চতা ৩.২ থেকে ৩.৮ মিটার এবং গোড়ার ব্যাস ১৮ মিমি. পর্যন্ত হয়ে থাকে। চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে বৈশাখের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত এর বপন সময়। বীজ হার ৭-৮ কেজি/হেক্টর। এ জাতের পাট ১১৫ দিনে কাটা যায়। সর্বোচ্চ ফলন ক্ষতমা ৪.৫০ টন/হেক্টর। কৃষকের জমিতে  গড়ে ৩.০০ টন/হেক্টর ফলন পাওয়া যায়।

তোষা বা বগী পাটের নতুন জাত
বিজেআরআই তোষা পাট-৬ (ও-৩৮২০)  
বিজেআরআই কর্তৃক এ উন্নত তোষা পাটের জাতটি এনাটমিক্যালি বাছাইকৃত উন্নত লাইনগুলো থেকে বিশুদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ লাইনটি উদ্ভাবন করা হয় এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০১৩ সালে অনুমোদন পায়। এ জাতটি বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলে চাষ উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ জাতটির ছালে পুরুত্ব বেশি এবং পাটকাঠি তুলনামূলক শক্ত। গাছ লম্বা, কাণ্ড গাঢ় সবুজ মসৃণ এবং দ্রুতবর্ধনশীল। বীজের রঙ নীলাভ সবুজ। পাতা লম্বা ও লেনসিওলেট টাইপ। পাতার দৈর্ঘ্য প্রস্থের অনুপাত ২.৬৬:১ যা অন্যাান্য তোষা জাত অপেক্ষা বেশি। সঠিক সময়ে বপন করা হলে গাছের উচ্চতা ৩.৭ থেকে ৪.০ মিটার এবং গোড়ার ব্যাস ২২ মিমি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বপনের উপযুক্ত সময় চৈত্র এর ২য় সপ্তাহ- বৈশাখ এর ২য় সপ্তাহ (এপ্রিল ১ম সপ্তাহ থেকে এপ্রিল শেষ সপ্তাহ)। বীজ হার ৫-৬ কেজি/হেক্টর। এ জাতটিও আগাম পরিপক্ব (দ্রুতবর্ধনশীল) ও উচ্চফলনশীল। আঁশের মান ভালো এবং রঙ উজ্জ্বল সোনালি। এ জাতটি নাবীতে বা দেরিতে বপন করেও মাত্র ১০০-১১০ দিন বয়সে কাটা যাবে। এটি আগাগোড়া প্রায় একই রকম এবং লম্বায় ৪-৫ মিটার হয়ে থাকে। আগের প্রচলিত জাত ও-৪ বা ভারতীয় যে কোনো জাতের তুলনায় ৭-৮ শতাংশ ফলন বেশি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাছাড়া জাতটিতে রোগবালাই কম, সে কারণে চাষিদের খরচও কম হবে। প্রতি হেক্টর জমিতে এ জাতের ফলন প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন টন অর্থাৎ বিঘাতে প্রায় সাড়ে ১২ মন। যেহেতু মাত্র ১০০ থেকে ১১০ দিনে তোষা জাতটি কাটা যাবে সে হিসেবে একই জমিতে তিনটি ফসল ফলানো যাবে অতি সহজে। সর্বোচ্চ ফলন ক্ষমতা ৫.০০ টন/হেক্টর। হেক্টরপ্রতি গাছের সংখ্যা ৩.৫ থেকে ৪.০ লক্ষ রাখা গেলে কৃষকের জমিতে  গড়ে ৩.০০ টন/হেক্টর ফলন পাওয়া যায়। এ জাত দু’টির বীজ উৎপাদনে বিএডিসি ইতোমধ্যেই কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আমরা আশা করি আগামী বছর থেকেই কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদ সম্ভব হবে।

পাট (দেশি /তোষা) উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
বীজ নির্বাচন
উফশী জাতের বীজ নামে হলেই হবে না, বীজের মান ঠিক থাকতে হবে। ভালো এবং অধিক ফসল পেতে হলে রোগমুক্ত, পরিষ্কার ও পরিপুষ্ট বীজ ব্যবহার করা উচিত। বীজের অংকুরোদগম হার (৮০%) এবং মান ঠিক না থাকলে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার আলোকে কেউ কেউ অধিক পরিমাণ বীজ বপন করে ওই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার না করে অধিক নিম্নমানের বীজ বপন করেও পর্যাপ্ত গাছ পাওয়া যায় না। অধিকন্তু নিম্নমানের বীজ থেকে রোগ সহজেই অন্য চারাগাছ আক্রমণ করে ফসলের ক্ষতি করতে পারে।

জমি নির্বাচন
দো-আঁশ এবং বেলে দো-আঁশ ধরনের মাটি বিশিষ্ট যে কোনো জমিতে পাট ভালো হয়। যেসব জমি ঋতুর প্রথমে বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় না এবং বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে এমন জমি নির্বাচন করতে হয়। তাছাড়া বাগানের আশপাশে বা বসতবাড়ির পাশের জমিতে পাট ভালো হয় না। তাই পাটের জন্য একটু উঁচু বা মধ্যম উঁচু জমি নির্বাচন করা প্রয়োজন।

জমি তৈরি
পাটের বীজ খুব ছোট বলে পাট ফসলের জমি মিহি করে চাষ দিতে হয়। পাট গাছ চারমাস ব্যাপী বৃদ্ধি পায় এবং ৩ থেকে ৫ মিটার উঁচু হয় বলে এব জন্য জমি গভীর করে চাষ দেয়া প্রয়োজন। পাট চোষের জন্য খরচ কমাতে হলে যেসব জমিতে আলু বা সবজি করা হয় সেসব জমিতে একবার চাষ করে মই দিয়ে পাট বীজ বপন করেও ভালো ফসল পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

সার প্রয়োগ
যে কোনো ফসলের মতো পাট ফসলেও যথোপযুক্ত সার পরিমিত মাত্রায় উপযুক্ত সময়ে প্রয়োগ করে আঁশের ফলন ও মান যথেষ্ট বাড়ানো সম্ভব। পাট গাছের দৈহিক বৃদ্ধি এবং অাঁশফলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌল। ফসফরাস ও পটাসিয়ামের ভূমিকা নাইট্রোজেনের মতো নাটকীয় না হলেও এদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফসফরাস ভূশয়ান অবস্থাকে প্রতিরোধ করে, আঁশের মান উন্নত করে এবং নাইট্রোজেন সদ্ব্যবহারের উপযুক্ততাকে বাড়িয়ে দেয়। আরও লক্ষ করা গেছে যে, ফসফেট (টিএসপি হিসেবে) এবং পটাশ (মিউরেট অব পটাশ হিসেবে) সারের একবার প্রয়োগ এবং নাইট্রোজেন দুইবার পৃথক প্রয়োগ পাট চাষের জন্য যথেষ্ট অর্থকরী এবং সাফল্যজনক। বাংলাদেশের অনেক পাট চাষের জমি সালফার এবং জিঙ্ক ন্যূনতায় রয়েছে। সেসব জমিতে সালফার ও জিঙ্ক প্রয়োগ করে ফল পাওয়া যায়।

প্রকৃত পক্ষে স্থান ভিত্তিক জমির উবর্বতা শক্তি এবং কোনো কোনো মৌলের অধিক প্রয়োজন তা বিশ্লেষণ করে সার ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করাটা বিজ্ঞান সম্মত। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে অথবা আঞ্চলিক কেন্দ্র সমূহ পর্যায়ে কোন মাটি বিশ্লেষণকারী সুযোগ-সুবিধাদি না থাকায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি পরীক্ষা করে এবং আঞ্চলিক কেন্দ্র সমূহে পরীক্ষণ স্থাপন করে, বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাট চাষের জমির জন্য একটি সাধারণ সার মাত্রা অনুমোদন করেছে (সারণি-১)।

সার প্রয়োগ পদ্ধতি
গোবর সার অবশ্যই বীজ বপনের ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পূর্বে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে
প্রয়োগকৃত গোবর সার চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে।

বীজ বপনের দিন প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি, জিপসাম এবং জিংক সালফেট সার জমিতে শেষ চাষে প্রয়োগ করে মই দিয়ে মাটির সাথে ভাব করে মিশিয়ে দিতে হবে।

দ্বিতীয় কিস্তি (৪৫ দিনে) ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যপ্ত পরিমাণ রস থাকে।

দ্বিতীয় কিস্তি প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া সার কিছু শুকনা মাটির সাথে মিশিয়েজমিতে প্রয়োগ করা ভালো।

প্রয়োগকৃত ইউরিয়া সার হো যন্ত্রের সাহায্যে অথবা প্রচলিত নিড়ানির সাহাযো ভালো করে জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে।

ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ রাখতে হবে যেন প্রয়োগকৃত সার গাছের কচি পাতায় এবং ডগায় না লাগে।

বীজের পরিমাণ ও গাছের ঘনত্ব  
প্রচলিত এবং জনপ্রিয় পদ্ধতি হচেছ ছিটিয়ে বপন করা। বীজের অভাব না হলে অধিক পরিমাণে বীজ বপন করা একটা অভ্যাসের ফল। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট-এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অধিক (প্রায় ১০০%) জীয়তা— এবং সতেজতা সম্পন্ন বীজ সরবরাহ করার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা যায়।

পাটের অধিকাংশ জমি এখনও ছিটিয়ে বপন করা হয়। এতে জমিজুড়ে গাছের ঘনত্ব সর্বত্র সমান থাকে না, ফলে কোন গাছ মোটা, কোন গাছ সরু ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। পাট কাটার আগে একরে ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ বা হেক্টরে ১,৯০,০০০ থেকে ২,৪০,০০০টি গাছ রাখা নির্ধারিত থাকলেও একরে ৭৫,০০০ বা হেক্টরে ১,৮০,০০০ এর অধিক গাছ থাকে না। ফলে ফলনও আশানুরূপ হয় না। সারিতে বপন করা আপাতদৃষ্টে কষ্টসাধ্য মনে হলেও এর উপকারিতা সম্পর্কে অনেকেই জ্ঞাত নন। প্রথমত এর ফলে জমির সর্বত্র গাছের বিস্তৃত সমভাবে থাকে। ফলে সরু/মোটা গাছের সমস্যা কম হয়। দ্বিতীয়ত পরিচর্যার সুবিধা হয়। সারিতে বপন করা হলে বীজের পরিমাণ কম লাগে এবং গজায়ও ভালো। এর ফলে নির্ধারিত সংখ্যক গাছ থাকে। সারি থেকে সারির দূরত্ব নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ৩০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে সারি করে বীজ বপন করলে সবচেয়ে ভালো হয়। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব সব সময় ঠিক রাখা না গেলেও পরিমিত অবস্থায় তা ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার ধরা হয়। সারিতে বীজ বপন করার জন্য বীজ বপন যন্ত্র বা সিডার ব্যবহার লাভজনক।

নিড়ানি ও পাতলাকরণ
বাংলাদেশের পাট ক্ষেতে ৩৯টি গোত্রের অন্তর্গত ৯৯টি গণ এর ১২৯টি প্রজাতির উদ্ভিদ আগাছা হিসেবে জন্মে। এদের মধ্যে ২৭টি প্রজাতি আগাছা হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং এক বীজপত্রী মাত্র ৭টি প্রজাতি ফসলের সর্বোচচ ক্ষতিসাধন করে। এদের ঘনত্ব প্রতি ৩ বর্গ ফুটে ৫ থেকে ১০২টি আগাছা হতে পারে। পাটের আবাদে যে খরচ হয় তার একটা বড় অংশই নিড়ানি ও পরিচর্যার জন্য হয়ে থাকে। সেদিক দিয়ে জমি নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফসলক্রম করেও আগাছা অনেক দমন করা যায় যেমন, আলু ক্ষেতে পাট বপন করা হলে চাষাবাদ এবং নিড়ানি দুটোর খরচই প্রায় বেঁচে যায়।  চারা গজানোর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে চারা পাতলা করা প্রয়োজন। কেননা তা না হলে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার চাপে কোন চারাই বৃদ্ধি পেতে পারে না। সারিতে বপন করা হলে হাত দিয়ে বা ছিটিয়ে বপন করা হয়ে থাকলে আঁচড়া দিয়ে প্রাথমিকভাবে চারা পাতলা করা যায়। পাট গাছের বয়সের ৪০ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে একবার নিড়ানি দেয়ার সময় কৃষকগণ কোন কোন ক্ষেতে চারা ও পাতলা করে থাকেন। তবে বয়সের ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যে যে চারা পাতলা করা হয় তা টানা বাছ নামে এবং বয়সের ৮৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে চারার গোড়া কেটে যে পাতলা করা হয় তা কাটা বাছ নামে পরিচিত। এ কচি গাছ না ফেলে পচিয়ে খুব উন্নত মানের পাট পাওয়া যায়, যা সূক্ষ্ম সুতা তৈরি করায় ব্যবহ্নত হতে পারে। এই দু বা তিনটি বাছ বা নিড়ানি দেয়ার জন্য কিন্তু অতিরিক্ত চারা রাখার দরকার নেই। কারণ কম হারে বীজ বপন করা হলে চারা কম গজাবে এবং পাতলাকরণের সময় কম চারা উঠালেই চলে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, পাট গাছের প্রতিটি দিন বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিড়ানির ও পাতলাকরণে অবহেলা করলে গাছের বৃদ্ধির যে ক্ষতি হয় তা কোনভাবেই পূরণ হয় না। ফলে ফলন কমে যায়।

পানি নিষ্কাশন
পাটের জমিতে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন অত্যন্ত জরুরি। জমিতে পানি জমলে মাটির ভিতর বাতাস প্রবেশ করতে পারে না ফলে গাছের শিকড়ের শ্বাস-প্রশ্বাস বিঘ্নিত হয়, গাছ স্বাভাবিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না, ফলে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে না এবং শেষ পর্যন্ত গাছ মারা যেতে পারে। দেশি পাটের জাত চারা অবস্থায় পানি সহ্য ক্ষমতা থাকে না । তবে এ জাতের গাছের বয়স ও উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। কিন্তু তোষা পাট চারা অবস্থায় পানি সহ্য করতে পারে না, এমনকি বড় হলেও দাঁড়ান পানি বা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।

ফসল কর্তন
বপনের ৬০ থেকে ১৪০ দিনের মধ্যে পাট ফসল কর্তন করা যায়, তবে আঁশের ফলন এবং মানের মধ্যে সমতা পেতে হলে ১০০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যেই যে কোন জাতের পাট কাটার প্রকৃত সময়। সাধারণত পাট গাছে যখন ফুল আসা শুরু হয় তখন বা তার আগে প্রয়োজন মতো সুবিধাজনক সময় পাট ক্ষেত কাটা হয়। কৃষকগণ অনেক সময় ফলন বেশী  পাবার জন্য দেরীতে পাট গাছ কাটেন। পরীক্ষণের মাধ্যমে দেখা গিয়েছে যে, বপনের ৬০ থেকে ১০৫ দিনের মধ্যে কর্তনসূচক কম বেশি স্থিতিশীল  থাকে এবং ১২০ দিনের দিকে তা হঠাৎ অধিক বৃদ্ধি পায়। এ থেকে ধারণা করা যায় যে অধিকাংশ জাতেরই ১২০ দিনের পরও আঁশ ফলন বাড়ানোর প্রেক্ষিতে প্রয়োগকৃত পুষ্টি দ্রব্য সদ্ব্যবহারের সুযোগ আছে। কিন্তু গাছের বয়সের ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে সার প্রয়োগ করা হলে তা বৃদ্ধি এবং কর্তন সূচককে বাড়িয়ে ১২০ দিনে প্রমিত ফলন পেতে সহায়তা করে।
 
 
কৃষিবিদ ড. মো. মাহবুবুল ইসলাম*
* মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা-১২০৭ মোবাইল: ০১৫৫২-৪১৬৫৩৭, (Email: mahbub_agronomy@yahoo.com)
বিস্তারিত
লবণাক্ত এলাকায় মিনিপুকুরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ

মাত্রাতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে অস্বাভাবিক মাত্রায় জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটনের হারকে দ্রুততর করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, লবণাক্ততা প্রভৃতি কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত, বিপন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফসল উৎপাদনে পানি প্রভাবক হিসেবে সালোকসংশ্লেষণ, প্রস্বেদন ও গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ফসল উৎপাদনে সেচের পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। অত্র এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত বিধায় তা সেচ কাজে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ফসল উৎপাদনে প্রধান ভরসা হলো বৃষ্টির পানি। নিয়মিত বৃষ্টিপাত ভালো ফসল উৎপাদনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে নিয়মিত বৃষ্টিপাত আশা করা সম্ভব নয়। বৃষ্টি মৌসুমে কৃষকরা বৃষ্টির পানির সহায়তায় আমন ধান ও অন্যান্য খরিফ ফসল উৎপাদনে সফল হলেও শুকনো মৌসুমে সেচের পানির অভাবে প্রধান ফসল বোরো ও অন্যান্য রবি ফসল উৎপাদন করতে হিমশিম খায়। এ পরিস্থিতিতে উপকূলীয় জেলাগুলোতে কিছু কিছু কৃষক বাড়ির আশপাশে এবং ফসলি জমির এক কোণে ছোট আকারের গর্ত কেটে তাতে বৃষ্টির পানি জমা রেখে তার মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে মাদা ও অন্যান্য রবি ফসল উৎপাদন করে থাকে। জমির কোণে খুবই ছোট আকারের এ গর্তকে স্থানীয় ভাষায় ‘কুনি’ বলে। এর বাইরে হাজার হাজার হেক্টর জমি সেচের পানির অভাবে মৌসুমি পতিত জমিতে পরিণত হয়।


বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৮.৫ লাখ হেক্টর উপকূলীয় এলাকার মধ্যে প্রায় ১০.৫৬ লাখ হেক্টর এলাকা  বিভিন্ন মাত্রার লবণকবলিত। এ লবণাক্ততার কারণে শুকনো মৌসুমে বিশেষ করে রবি ও খরিফ-১ মৌসুমে ফসল চাষ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ সময়ে মাটির লবণাক্ততা ৮.০ ডিএস/মি. এর উপরে চলে যায়। এছাড়া এ সময়ে নদীর পানির লবণাক্ততা ২৫.০-৩০.০ ডিএস/মি. পর্যন্ত লক্ষ করা যায়। আবার এ এলাকার খালগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে ফসল চাষের নিরাপদ পানির সংস্থান কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই শুধু মাটি ও পানির লবণাক্ততার কারণে এ এলাকায় বোরো ধান চাষসহ অন্যান্য সবজি চাষ সম্ভব হয় না। লবণাক্ততার পাশাপাশি এ এলাকার আরেকটি প্রধান সমস্যা হলো জমিতে সময়মতো ‘জো’ আসে না। লবণাক্ত মাটিতে যদি নিরাপদ (মিষ্টি) পানি সেচের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ওই মাটির লবণাক্ততা কমে যায়, ফলে সেখানে সহজেই ফসল চাষ করা সম্ভব হয়। এছাড়া কোন এ পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে জমির মাটি উঁচু  করা যায় তবে সেখানে সময়মতো ‘জো’ আসবে ফলে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি পাবে অর্থাৎ এক ফসলের পরিবর্তে দুই বা তিন ফসল চাষ করা সম্ভব হবে।

জলবায়ুর এরূপ বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিভিন্ন কলাকৌশল রপ্ত করতে হবে যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কৃষিকে মুক্ত রাখা বা ঝুঁকি কমানো যায়। অন্যান্য অভিযোজন কৌশলের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে মাদা ও অন্যান্য ফসলে সেচ প্রদানের জন্য মিনিপুকুরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় খাপ খাওয়ানোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ  অভিযোজন কৌশল। এই পদ্ধতিতে একই সাথে জমিতে ধান, পুকুরে মাছ এবং পাড়ে সবজি চাষ করা যায়। ফলে শস্যের নিবিড়তা বাড়ে। ফসলি জমির এক-পঞ্চমাংশে কমপক্ষে তিন মিটার গভীরতা এবং একটি পুকুর ওই জমির মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সক্ষম। এক্ষেত্রে মৌসুমি সবজি চাষের সুবিধার্থে পুকুর পাড় চওড়া (কমপক্ষে ১ মিটার) হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। অন্যান্য অভিযোজন কৌশল বাস্তবায়নের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে মাদা ও অন্যান্য ফসলে সেচ প্রদানের জন্য মিনিপুকুরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পুকুর খনন করা যায়।

মিনিপুকুর (খামার পুকুর) প্রযুক্তি
মিনিপুকুর এমন একটি প্রযুক্তি যাতে উপকূলীয় এলাকায় ফসলি জমির মধ্যে পুকুর কেটে ওই পুকুরে বর্ষাকালের বৃষ্টির পানি জমিয়ে রেখে সেই পানি দিয়ে শুকনো (রবি ও খরিফ-১) মৌসুমে বিভিন্ন প্রকার মাদা ফসল চাষ করা যায়। এ প্রযুক্তিকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিও বলা হয়।

মিনিপুকুর প্রবর্তন পদ্ধতি
কোন একটি জমির পাঁচ ভাগের একভাগ জমিতে (মোট জমির শতকরা ২০ ভাগ) মোটামুটি ৬ থেকে ৭ হাত গভীরতার একটি পুকুর  খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে হবে।
জমির যে অংশটা অপেক্ষাকৃত নিচু সে অংশে পুকুরটি খনন হবে।
পুকুরের চারদিকে বাঁধ  দিয়ে আটকে রাখতে হবে, যাতে পানি আগমন ও নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
বাঁধের  উচ্চতা হবে দুই থেকে আড়াই হাত ও প্রস্থ হবে  তিন থেকে চার হাত।

খননকৃত অতিরিক্ত মাটি দিয়ে ওই জমির বাকি চার ভাগ ভরাট করতে হবে। এতে জমিটা  প্রায় ১ হাত উঁচু হবে । ফলে ওই  জমির নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং রবি মৌসুমে সময়মতো জো আসবে এবং সঠিক সময়ে বীজ বপন করা সম্ভব  হবে। সাধারণত যেটা উপকূলীয় এলাকায়  সম্ভবপর নয়।

খননকৃত মাটির উপরিস্তর বাকি জমিতে এমনভাবে ফেলতে হবে যাতে উপরের মাটি উপরে থাকে। কারণ উপরের মাটিতে পুষ্টি উপাদান বেশি থাকে। কোনোভাবেই নিচের মাটি যেন উপরে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু কিছু জায়গায় কষ মাটির উপস্থিতি আছে। এরূপ ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল পাওয়ার জন্য ফসল আবাদ-মাছ চাষ উভয় ক্ষেত্রেই চুন প্রয়োগ করা যেতে পারে ।

এছাড়াও মাঠের চারিদিকে পাড়-বাঁধ দিতে হবে যাতে বর্ষাকালে মাঠের অতিরিক্ত পানি সহজে পুকুরে এসে জমা হতে পারে।

ভূমি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য জমিটিকে ভালোভাবে সমতল করতে হবে। এতে করে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যাবে। যাতে করে সর্বত্র উদ্ভিদের পানি ও পুষ্টি উপাদানের নিয়ন্ত্রণ রক্ষা হবে।
এছাড়াও ওই জমির লবণ নিচে চুইয়ে যাবে।

মিনিপুকুর প্রযুক্তির সুবিধা
লবণাক্ত এলাকায় শুকনো মৌসুমে নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে মিনিপুকুরের বিকল্প নেই।
এছাড়া মিনিপুকুর এলাকার পানি দ্রুত নিষ্কাশন হওয়ার ফলে সঠিক সময়ে রবি ফসল চাষ করা সম্ভব।
বাঁধের উপর/পাশে শাকসবজি/ফলদ/বনজ /ঔষধি গাছ লাগানো যেতে পারে ।
পুকুরে মাছ চাষ/হাঁস পালন এবং উপরিভাগে মুরগির খামার করা যেতে পারে ।

যেহেতু শুকনো মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা সম্ভব হয়, তাই একটি টেকসই ফসল বিন্যাসের মাধ্যমে শস্য নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব।

সতর্কতা
প্রতি মাসে অন্তত একবার পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা করতে পারলে ভালো হয় ।

ফসল
রবি মৌসুমে কম সেচ লাগে এমন শস্য যেমন- তরমুজ, সূর্যমুখী, লালশাক, পালং, ওলকপি, মুলা, বরবটি, বিভিন্ন প্রকার মাদা ফসল (মিষ্টিকুমড়া, লাউ, ইত্যাদি) এবং সামান্য পরিমাণের বোরো ধান চাষ করা যায়।
 
কৃষিবিদ এমএম আবদুর রাজ্জাক*
কৃষিবিদ মো. শফিউল আলম**
* আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃতসা, খুলনা। ** মনিটরিং কর্মকর্তা ডিজাস্টার অ্যান্ড ক্লাইমেট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইন এগ্রিকালচার প্রকল্প (সিডিএমপি-২/ডিএই অংশ), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, খুলনা
বিস্তারিত
কাপ্তাই লেকে মৎস্য উৎপাদন - ১৪২১

কাপ্তাই লেকে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহনশীল ব্যবস্থাপনা কৌশল

প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ কাপ্তাই লেক দেশের অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ের মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় কৃত্রিমভাবে তৈরি লেকগুলোর মধ্যে অন্যতম। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৬৮,৮০০ হেক্টর আয়তনের এ লেকটি মূলত তৈরি হলেও মৎস্য উৎপাদন, কৃষিজ উৎপাদন, জলপথে যাতায়াত, ফলজ ও বনজ দ্রব্য দুর্গম পথে পরিবহন, জেলে, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও জীবন-জীবিকা থেকে শুরু করে মৎস্য সেক্টরে কাপ্তাই লেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এ  লেকের উৎপাদনশীলতা, মৎস্য প্রজাতি বিন্যাস, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ এবং লেকে মৎস্য চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ৮০’র দশকের শেষার্ধ্ব থেকে গবেষণা পরিচালনা করে আসছে। গবেষণালব্ধ ফলাফল ও তথ্যাদির ভিত্তিতে কাপ্তাই লেকের মৎস্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সহনশীল ব্যবস্থাপনা কৌশল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে দেয়া  হলো।


মৎস্য জীববৈচিত্র্য
কাপ্তাই লেক দেশীয় মৎস্য প্রজাতির এক বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধশীল জলভাণ্ডার। গবেষণার সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক এ লেকে ২ প্রজাতির চিংড়ি, ১ প্রজাতির ডলফিন, ২ প্রজাতির কচ্ছপ ও ৭৮ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ রয়েছে। এর মধ্যে ৬৮ প্রজাতির মাছ হচ্ছে দেশীয়, আর বাকি ১০টি বিদেশি।

কাপ্তাই লেকে বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন মৎস্য প্রজাতি
লেকের মৎস্যকুলের প্রজাতি বিন্যাস বিগত চার দশকের ব্যবধানে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। লেক সৃষ্টির ফলে আগের খরস্রোত নদীগুলোর পানি প্রবাহমান বৈশিষ্ট্য থেকে অনেকাংশে স্থির পানির বৈশিষ্ট্যে রূপান্তরিত হয়েছে। পানির এ বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তনের ফলে গোটা জলজ পরিবেশেরও পরিবর্তন হয়েছে। ফলশ্রুতিতে মৎস্যকুলের প্রজাতি বিন্যাসেও স্বাভাবিকভাবে এর  প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। বিগত চার দশকে লেকের জলজ পরিবেশের পরিবর্তন, বিশেষ করে প্রধান প্রধান নদীগুলোর উপরের এলাকায় পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া, কোন কোন  এলাকায় পানি দূষণ, জলজ আগাছার প্রকোপ বৃদ্ধি, মৎস্যকুলের  ওপর মনুষ্য সৃষ্ট চাপ ও প্রতিবন্ধকতা এবং সর্বোপরি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে অসম্পূর্ণতা এ লেকের মৎস্যকুলের প্রজাতি বিন্যাস ব্যাপকভাবে চলেছে। বর্তমানে ৪২টি প্রজাতির মাছ এ লেক থেকে বাণিজ্যিকভাবে আহরিত হচ্ছে । এদের মধ্যে চাপিলা, তেলাপিয়া, কেচকি, মলা, কাটা মইল্যা, বাটা, ফলি, আইড়, গজার, শোল ইত্যাদি অন্যতম। অবশিষ্টি প্রজাতিগুলোর বাণিজ্যিক গুরুত্ব না থাকলেও জীবতাত্ত্বিক গুণাগুণ ও অন্যান্য দিক বিবেচনায় লেকে সামগ্রিক মৎস্যকুলের অবস্থানে এদেরও ভূমিকা রয়েছে।

কাপ্তাই লেকের মৎস্য জীববৈচিত্র্য পরিবর্তনের ক্রমধারা
মনুষ্য সৃষ্ট চাপ এবং প্রবাহমান পানি থেকে স্থির পানিতে পরিবর্তনের কারণে কাপ্তাই লেক থেকে কিছু দেশীয় প্রজাতির মাছ যেমন বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অন্যদিকে আবার কিছু বিদেশি প্রজাতির মাছ যেমন- সিলভার কার্প, গ্রাসকার্প, কার্পিও, রাজপুঁটি ও থাই পাঙ্গাশ বিগত দুই দশকে মজুদ করা হয়েছে। বিদেশি প্রজাতির মাছের মধ্যে আফ্রিকান মাগুর ও তেলাপিয়া দুর্ঘটনাক্রমে লেকে সংযোজিত হয়েছে (সারণি-১)। লেকে তেলাপিয়া এরই মধ্যে বেশ বিস্তার লাভ করেছে এবং বিগত কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে আহরিত হচ্ছে।    
     
মৎস্য প্রজাতিগুলোর গ্রুপভিত্তিক পরিবর্তনের ক্রমধারা
বিগত ৪ দশকে  লেকের মৎস্য আহরণের বৃদ্ধি উৎসাহব্যঞ্জক। তবে আশংকাজনক দিকে হচ্ছে মূল্যবান রুই জাতীয় মাছের ক্রমাবনতি। ১৯৬৫-৬৬ সালে রুই, কাতল, মৃগেল, কালিবাউস ও মহাশোলসহ সামগ্রিকভাবে মেজর কার্প ছিল মোট মৎস্য অবতরণের প্রায় ৮১.৩৫%; যা ক্রমশ হ্রাস পেয়ে ২০০৪-০৫ সালে ৪% এর নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ছোট মাছ বিশেষ করে চাপিলা, কাচকি, মলা ইত্যাদির পরিমাণ ১৯৬৫-৬৬ সালের রেকর্ডকৃত ৩% থেকে বিগত ৪ দশকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৯০% এর কাছাকাছি পৌঁছেছে যা উদ্বেগের বিষয়। রাক্ষুসে প্রজাতির মাছের সামগ্রিকভাবে ব্যাপক কোনো পরিবর্তন না হলেও এদের মধ্যে কিছু মূল্যবান প্রজাতির বড় আকারের মাছ যেমনÑ চিতল, বোয়াল, আইড়, গজার  ইত্যাদি সস্প্রতি আগের মতো বড় আকারের পাওয়া যায় না। ছোট মাছের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রুই জাতীয় মাছের আশংকাজনক হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কম বৃষ্টিপাত, লেকের সঙ্গে সংযুক্ত নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস, লেকের পানির গভীরতা কমে যাওয়া এবং রুই জাতীয় মাছের প্রধান চারটি প্রজননস্থল (কাসালং চ্যানেল, মাইনিমুখ; বরকল চ্যানেল, জগন্নাথছড়ি; চেংগী চ্যানেল, নানিয়ারচর; রিংকং চ্যানেল, বিলাইছড়ি) নষ্ট হয়ে যাওয়া, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে পোনা মাছ ও মা মাছ নিধন, শুষ্ক মৌসুমে অধিক মাছ আহরণ ইত্যাদি কারণে লেকের জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে।

কাপ্তাই লেকের হারানো অতীত ফিরে পেতে এবং লেককে বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন  মাছে ভরপুর করতে এরই মধ্যে সরকার নানা স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কাপ্তাই লেকের মাছকে সুরক্ষার জন্য মাছ আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়ে জেলেদের জন্য ডিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য বিতরণ করা হচ্ছে। এটি একটি প্রশংসনীয়  উদ্যোগ। তাছাড়া, লেকের সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্মলিত উদ্যোগে কিভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও মৎস্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
১. মৎস্য প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা

রুই জাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ও প্রজনন অভিপ্রয়াণ (migratory) চ্যানেলগুলো এরই মধ্যে পলি ভরাট হয়েছে এবং কোথাও কোথাও প্রজননক্ষেত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। লেকে রুই জাতীয়  মাছের মজুদ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ করার জন্য প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রগুলো যেমন-কাসালং চ্যানেলে মাইনিমুখ এবং তদূর্ধ্ব এলাকা; কর্ণফুলী চ্যানেলে জগন্নাথছড়ি এবং তদূর্ধ্ব এলাকা; চেংগী চ্যানেলে নানিয়ারচর এবং তদূর্ধ্ব এলাকা এবং রিংকং চ্যানেলে বিলাইছড়ি এবং তদূর্ধ্ব এলাকা পুনঃখননের মাধ্যমে সংরক্ষণের পাশাপাশি লেকের অভয়াশ্রম ঘোষণা করে যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।

২. অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা
লেকের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার জন্য লেকের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে এরই মধ্যে অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এলাকাগুলো হচ্ছে রাঙ্গামাটি ডিসি বাংলো সংলগ্ন লেক এলাকা, বিএফডিসি রাঙ্গামাটি সদর অফিস সংলগ্ন এলাকা, লংগদু উপজেলা কমপ্লেক্স এলাকা, ছয়কুড়ি বিল, নানিয়ারচর এলাকা, রাঙ্গামাটি রাজবন বিহার এলাকা, কাপ্তাই উপজেলার নৌবাহিনী ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা এবং বিলাইছড়ি রিংকং চ্যানেল সংলগ্ন লেক এলাকা। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) বাংলদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ওই স্থানগুলোতে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করে মাছকে নির্বিঘ্নে প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করার মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কাপ্তাই হ্রদে রুই জাতীয় মাছের প্রধান প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র রয়েছে ৪টি। এছাড়া, ঝর্ণা ও ছড়ার মুখে রুই জাতীয় ছোট মাছের (Major Carps) প্রজনন হয়ে থাকে এ ধরনের প্রজনন ক্ষেত্র রয়েছে আরও প্রায় ৩৪৬টি। হ্রদের জলায়তন  প্রায় ৭০০ বর্গ কিমি.। সংখ্যা ও আয়তন উভয় বিবেচনাই অভয়াশ্রম অপ্রতুল। অভয়াশ্রমের সংখ্যা ও আয়তন বৃদ্ধির পাশাপাশি সারা বছর পানির থাকে এমন স্থানে অভয়াশ্রম ঘোষণা ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে করে গুরুত্বপূর্ণ  মৎস্য প্রজাতির উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও বৃদ্ধি পাবে।

৩. পাহাড়ি ঘোনায় নার্সারি স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা
গবেষণায় দেখা গেছে যে, লেকে পোনা অবমুক্তির চেয়ে লেকের বিভিন্ন ঘোনায়-ক্রিকে নার্সারি স্থাপন করে কম সময়ে কম খরচে বেশি পোনা উৎপাদন করা যায় এবং অবমুক্তিজনিত মৃত্যু হার অনেক কম হয়। তাছাড়া, এ পদ্ধতিতে উৎপন্ন পোনা বর্ষার পানিতে-পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়ে স্বাভাবিকভাবে লেকে ছড়িয়ে পড়বে। ইনস্টিটিউটের রাঙ্গামাটির নদী উপকেন্দ্র থেকে কাপ্তাই লেকের পাহাড়ি ঘোনায় মাছের নার্সারি স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা কৌশল এরই মধ্যেউদ্ভাবন করেছে। ফলে পাহাড়ি এলাকায় কার্প জাতীয় মাছের রেণু পোনা থেকে ৬০ দিনে গুণগতমানসম্পন্ন আঙ্গুলি পোনার প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়েছে। ইনস্টিউটের উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ফলে পাহাড়ি এলাকায় রুই জাতীয় মাছের নার্সারি ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভবানার দ্বার  উন্মোচিত হয়েছে।

৪. বড় পোনা মজুদ ও ব্যবস্থাপনা
সহনশীল মৎস্য আহরণ অব্যাহত রাখার নিমিত্ত প্রতি বছর লেক থেকে যে পরিমাণ মাছ ধরা হয়ে থাকে তা পূরণের লক্ষ্যে প্রতি মৌসুমে বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন প্রজাতিগুলোর বিশেষ করে রুই জাতীয় মাছের ছোট-বড় বিভিন্ন সাইজের পোনা মজুদ করা হয়। পোনা মজুদ কর্মসূচি আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে বাংলদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সুপারিশ মোতাবেক কমপক্ষে ২৫% পোনা প্রাকৃতিক প্রজননের (হালদা বা যমুনা নদীর) পোনা হতে হবে। তাছাড়া, বিএফডিসির নিজস্ব পোনা উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে হবে এবং লেকের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে এমন  সুস্থ, সবল ও নির্ধারিত আকারে বড় পোনা (৯ সেমি. থেকে ১৫ সেমি. সাইজের) মজুদ করতে হবে।

৫. ক্ষতিকর মৎস্য শিকার প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা
সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা যায় যে, লেকের মোট আহরিত মাছের প্রায় ২৬% আসে জাঁক থেকে। জাঁকে আকার ও প্রজাতি নির্বিশেষে প্রায় সব ধরনের মাছ ধরা পড়ে। ফলে পোনা মাছ বিশেষ করে রুই জাতীয় মাছের পোনা নিধন হয়ে থাকে। অন্যদিকে জাঁকের মাছ সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে আহরণ করা হয় বিধায় সর্বশেষ আশ্রয়স্থল মনে করে জাঁকের ভেতরে গিয়ে একত্রিত হয়ে থাকা ডিমওয়ালা মাছও ব্যাপক হারে নিধন হয়ে থাকে। গবেষণার এসব বিষয় উদ্ঘাটিত হওয়ার পর প্রদত্ত সুপারিশ মোতাবেক হ্রদে জাঁক পদ্ধতিতে মৎস্য শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু আইন বা বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে জাঁকের মাধ্যমে মাছ ধরার একটি প্রবণতা কোন কোন জাঁক মালিকদের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। কাপ্তাই লেকে সহনশীল মৎস্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে জাঁক পদ্ধতিতে মৎস্য শিকার প্রতিরোধকল্পে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

৬. লেকে মৎস্য চাষ
লেকের বর্তমান মৎস্য উৎপাদন মূলত গতানুগতিক আহরণভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নির্ভর, চাষ নির্ভর নয়। লেকের বর্তমান মৎস্য উৎপাদন আরও বৃদ্ধির নিমিত্ত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন সম্পর্কীয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। কাপ্তাই লেকে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ (বিএফআরআই অংশ) শীর্ষক একটি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট হতে লেকে খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া ও থাই কৈ চাষের প্রযুক্তি উদ্বাবন করেছে।  ফলে লেকে মাছ ধরা বন্ধকালীন ওই চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

৭. গবেষণা জোরদারকরণ
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাঙ্গামাটির নদী উপকেন্দ্রটি আশির দশকে স্থাপিত হলেও উপকেন্দ্রে গবেষণাগার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাপাতির অভাব ছিল। সম্প্রতি একটি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে উপকেন্দ্রের অফিস-কাম-গবেষণাগার নির্মাণসহ গবেষণার সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করা সম্ভব হয়েছে। এতে গবেষণালব্ধ ফলাফল ব্যবহারের মাধ্যমে কাপ্তাই লেককে মৎস্য ভাণ্ডারে রূপন্তরিত করা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী সম্প্রতি ওই গবেষণা উপকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন এবং চাহিদার নিরীখে গবেষণা পরিচালানা করার জন্য গবেষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
 

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ*
* বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী
বিস্তারিত
কবিতা আশ্বিন-১৪২১
দুষ্টু ইঁদুর
মো. মাজেদুল ইসলাম*
 
দুষ্টু ইঁদুরের আছে এগারটি বংশ,
তারা মাঠের ফসল কেটে করে ধ্বংস।
ইঁদুরের সামনের দাঁত জন্ম থেকে বাড়ে,
কাটাকাটি ছেড়ে তাই থাকতে না পারে।
জন্ম হতে যৌবন পায় মাস তিন পর,
তারপর জোড়ায় জোড়ায় বাঁধে তারা ঘর।
গর্ভধারণ হয় প্রসবের পর দুই দিন,
প্রতিবারে বাচ্চা দেয় কমপক্ষে তিন।
ইঁদুরের শ্রবণশক্তি প্রখর যেমন,
ঘ্রাণশক্তি আছে তার প্রকট তেমন।
খায় যত, নষ্ট করে দশ গুণ তার,
প্রাণিকুলে নেই তার কোন উপকার।
সব জাতের ইঁদুর সাঁতরাতে পারে,
নেংটি ইঁদুর ঘরে ছুটাছুটি করে।
ইঁদুর খুব চালাক, নিশাচর কৃষ্টি,
দিনের বেলায় তাদের ক্ষীণ দৃষ্টি।

ইঁদুর মারার উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল,
যখন পানিতে ভরে মাঠ-ঘাট আর খাল।
বিদ্যুতের তার কাটে, বাঁধ ভেঙে দেয়,
দুরারোগ্য রোগব্যাধি সমাজে ছড়ায়।
ফসল, ফল-মূল আর নষ্ট করে সবজি,
মারার জন্য শক্ত করি দু’হাতের কব্জি।

আমাদের ক্ষতি করে সর্ব অবস্থায়,
দুষ্টু ইঁদুর মারি আমরা মিলে সবায়।


উপকারী পান
মো. ফরিদুল ইসলাম*

নেশাজাতীয় দ্রব্য পরিচিত পান
ক্ষতিকর প্রভাব নেই আছে পুষ্টিমান।
ভিটামিনে ভরপুরে আছে পুষ্টি
তাজাপাতায় আছে উপাদান ২১টি।
‘এ’ আছে ‘সি’ আছে, আছে রাইবোফ্লেবিন
পানি আছে, চর্বি আছে, আছে থায়ামিন।
মিনারেল, ফাইবার আছে প্রোটিন
পাওয়া যায় লৌহ, শক্তি আর আয়োডিন।

তেল পাবো, ট্যানিন পাবো, পাবো ক্যালসিয়াম
পাবো নাইট্রোজেন, ফসফরাস আর পটাসিয়াম।
ক্লোরোফিল এবং আছে শর্করা
নিকোটনিক এসিডে পানপাতা ভরা।
পানের পাতায় আছে ঔষধি গুণ
পান খুব উপকারী তাই এবার জানুন।

পেট ফাঁপায় খাও যদি পান পাতার রস
খালি হবে পেট এ যে হজমের বস
রস করে পান পাতা কয়েকটি পিষে
খাও ১ চামচ মধু তার সাথে মিশে।
এভাবে খাও যদি পান পাতা
দূর হবে তোমার স্নায়ুবিক দুর্বলতা।
আঘাত পেয়ে যদি ক্ষত হয় তাতে
রস করে দিয়ে রাখো পান পাতা বেঁধে।
ক্ষতস্থানে কেউ যদি পান বেঁধে রয়
দুই দিনে তার উপশম হয়।

তামাক, মিষ্টি জর্দা, পানের মশলা অপকারী
সুপারি ও চুন দিয়ে পান খাওয়া তাই উপকারী।

* উপসহকারী কৃষি অফিসার, পাবনা সদর, পাবনা ** উপসহকারী কৃষি অফিসার, বরুড়া, কুমিল্লা।
বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর আশ্বিন-১৪২১

মহিদুল ইসলাম

চকোরিয়া


প্রশ্ন : নারকেল কচি অবস্থায় ঝরে যায় কেন?
উত্তর : বাগানের মাটিতে রসের অভাব, রোগ পোকার আক্রমণ, সময় উপযোগী পরিচর্যার অভাব, খাদ্য ও হরমোন ঘাটতির ফলে ফল ঝরে যায়। নারকেল ফল ঝরা রোধের জন্য গাছের গোড়ায় সুসম মাত্রায় জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। পূর্ণ বয়স্ক অর্থাৎ ১০ বছরের অধিক বয়সের নারকেল গাছে প্রতিবছর গোবর সার ২৫ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ২ কেজি, জিপসাম ৩৫০ গ্রাম, জিংক সালফেট ১০০ গ্রাম এবং বরিক এসিড ৩০ গ্রাম দিতে হবে।

সার দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তিতে অর্ধেক সার মধ্য বৈশাখ থেকে মধ্য জ্যৈষ্ঠ (মে) এবং দ্বিতীয় কিস্তিতে বাকি অর্ধেক সার মধ্য ভাদ্র হতে মধ্য আশ্বিন (সেপ্টেম্বর) মাসে গাছের গোড়ায় থেকে চারদিকে ১ মিটার জায়গা বাদ দিয়ে ১-২.৫ মি. দূর পর্যন্ত মাটিতে ২০-৩০ সেমি. গভীরে প্রয়োগ করতে হবে।

ফারুক হোসেন
যশোর

প্রশ্ন :    মরিচ গাছের গোড়া পচে যাচ্ছে করণীয় কী?
উত্তর : গোড়া পচা রোগে গাছের মাটি সংলগ্ন অংশ কালো হয়ে পচে যায় এবং গাছ মরে যায়।
প্রতিকার হিসাবে বীজ ভালো করে শোধন করে (ভিটাভেক্স ২০০ ঔষধ ২ গ্রাম দিয়ে প্রতি কেজি বীজ শোধন করে নিতে হবে) বুনতে হবে।

বাড়ন্ত গাছে এই রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন (কার্বনডাজিম গ্রুপ) গুলে আক্রান্ত জমির গাছের গোড়ার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম
গাইবান্ধা

প্রশ্ন :    মরিচের ক্ষেতে মাকড়ের আক্রমণ দেখা দিয়েছে প্রতিকার কী?
উত্তর : মরিচ উৎপাদনের জন্য ছায়ামুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে।
সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে মাকড়ের আক্রমণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
গুঁড়া সাবান মিশ্রিত পানি স্প্রে করে আক্রমণ প্রতিহত করা যায়।

আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে মাকড়নাশক (ও মাইট) প্রয়োগ করতে হবে। স্প্রে করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন পাতার নিচের অংশ ভিজে যায়। কারণ মাইটগুলো সাধারণত পাতার নিচের দিকে থাকে।

নূর মোহাম্মদ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ

প্রশ্ন :    শসার মোজাইক ভাইরাস রোগ দমন পদ্ধতি জানাবেন।
উত্তর : সুস্থ গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করে লাগাতে হবে।
রোগাক্রান্ত গাছ দেখামাত্র তুলে বিনষ্ট করতে হবে।
জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
ভাইরাসের বাহক জাবপোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য ম্যালাথিয়ন গ্রুপের কীটনাশক ১০-১২ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।

মো. নুরুজ্জামান
নওগাঁ

প্রশ্ন : ধানের মাজরা পোকা দমন পদ্ধতি জানালে খুশি হবো।
উত্তর : মাজরা পোকার আক্রমণ ফুল ফোটার আগে হলে মরা ডিগ এবং ফুল ফোটার পর হলে সাদা শিষ বের হয়।
ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে।
আলোক ফাঁদ-এর সাহায্যে পোকা সংগ্রহ করে দমন করা। ৮০ হেক্টর জমির জন্য ১টি আলোক ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে।
ধানের জমিতে ডালপালা পুঁতে পোকা খেকো পাখির সাহায্য নিয়ে দমন করা যায়।
জমিতে শতকরা ১০-১৫ ভাগ মরা ডিগ অথবা ৫ ভাগ সাদা শিষ দেখা দিলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

সাইফুল্লাহ খান
বাগেরহাট

প্রশ্ন : পুকুরের পানিতে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য কতটুকু আছে তা জানার উপায় কী?
উত্তর : হাতের তালু পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে বা সেক্কি ডিস্ক (Secchi disk) নামক যন্ত্রের সাহায্যে এই পরীক্ষা করা যায়। হাত কনুই পর্যন্ত ডুবিয়ে যদি হাতের তালু পরিষ্কার দেখা যায় তাহলে পুকুরে মাছের খাবার খুবই কম আছে বলে ধরে নিতে হবে। আর যদি না দেখা যায় এবং পানির রঙ সবুজ থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে পুকুরের পানিতে পর্যাপ্ত খাবার আছে। একইভাবে সেক্কি ডিস্ক যন্ত্রটি ১ থেকে ২ ফুট পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে এই পরীক্ষা করা যায়।

মো. সুমন
লালমনিরহাট

প্রশ্ন : পুঁটি মাছে ঘা রোগের সমস্যার প্রতিকার কী?
উত্তর : পুকুরের পানিতে শতকপ্রতি ১ কেজি চুন ও ০.৫ কেজি লবণ আলাদাভাবে পানিতে গুলে ছিটাতে হবে,
পুকুরের পানিতে শতকপ্রতি ১০ গ্রাম পটাশ সার ছিটাতে হবে,
অতি ক্ষতযুক্ত মাছ পুকুর থেকে তুলে ফেলতে হবে।

আতিকুল ইসলাম
রাজশাহী।

প্রশ্ন : রেণু পোনা প্রতিপালনে ঘনত্বজনিত কারণে পোনা ভাসমান বা দুর্বল, বৃদ্ধি কম হলে করণীয় কী?
উত্তর : পুকুরে সেচ দেয়া বা পানির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। সম্ভব হলে অন্য পুকুরে পোনা আংশিক স্থানান্তর করা যেতে পারে। সম্পূরক সুষম খাবারের সাথে ভিটামিক্স বা ভিটামিন প্রিমিক্স মিশিয়ে দিনে দুইবার খাবার দিতে হবে। সার হিসেবে প্রতি শতকে গোবর - ৫ কেজি, ইউরিয়া ১০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কর্তৃক পুকুর পরিদর্শন করিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেয়া যেতে পারে।

বিরেণ পাঠক
কুষ্টিয়া

প্রশ্ন : বন্যার পূর্ববর্তী সময়ে মাছ চাষে করণীয় কী?
উত্তর : পুকুরের পাড় শক্ত করে বেঁধে দেয়া এবং পাড়ে গাছ লাগানো।
মাছ চাষের বিভিন্ন উপকরণ যেমন- খাদ্য, সার, ওষুধ ইত্যাদি নিরাপদ স্থানে মজুদ রাখা।
বন্যা পূর্বাভাসের সাথে সাথে সম্ভব হলে নিরাপদ স্থানে মাছ সরিয়ে ফেলা।
চাষকৃত পুকুরের পাড় বন্যার পানি আসার আগেই উঁচু করতে হবে বা বাঁশের তৈরি বানা কিংবা নাইলনের  জালের ঘের দেয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বন্যার সময়ে পুকুরে গাছের ডালপালা ফেলে রাখতে হবে যাতে মাছ নিরাপদ অনুভব করে এবং আশ্রয় নিতে পারে।
বন্যায় পুকুরের পাড় ডুবে গেলে বন্যার পর মাছ ছাড়ার পূর্বে ঘন ফাঁসের জাল টেনে রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ তুলে ফেলতে হবে।
বন্যা/জলোচ্ছ্বাস কবলিত এলাকার পুকুরে পানি সরিয়ে সেখানে নতুনভাবে পানি দিতে হবে।
বন্যার আশঙ্কাপূর্ণ পুকুরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা করার সুযোগ না থাকলে সময় থাকতেই মাছ বিক্রির ব্যবস্থা নিতে হবে।

এনামুল হক
টাংগাইল

প্রশ্ন : বাছুরের পাতলা পায়খানা হয়েছে, কী খাওয়ানো যায় ?
উত্তর : ১। প্রথম দিন ট্রাইসালফন এস দুটি বোলাস মুখে খাওয়াবেন এবং পরবর্তী দুই দিন একটি করে খাওয়াবেন।
২। দুই প্যাকেট ডায়াভেট পাউডার একসাথে পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়াবেন।
৩। প্রতিদিন দুই প্যাক করে ওরস্যালাইন দুই দিন মুখে খাওয়াবেন।

রাজু আহমেদ
পাবনা

প্রশ্ন : গরুর পেট ফাঁপা হয়েছে, এর সমাধান কী?
উত্তর : ১। দুই প্যাক জাইমোভেট পাউডার একসাথে পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়াবেন।
২। ১০০ মিলি. নোব্লট সিরাপ একসাথে মুখে খাওয়াবেন।
 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ
* কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল : ০১৫৫২৪৩৫৬৯১
বিস্তারিত
কার্তিক মাসের কৃষি ১৪২১
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, সবাইকে হৈমন্তীয় শুভেচ্ছা। ঋতুচক্রে হেমন্ত বাংলার এক কাব্যিক উপাখ্যান। সোনালি ধানের সম্ভার সুঘ্রাণে ভরে থাকে বাংলার মাঠ প্রান্তর। কৃষক মেতে ওঠে ঘাম ঝরানো সোনালি ফসল কেটে মাড়াই ঝাড়াই করে শুকিয়ে গোলা ভরতে আর সঙ্গে সঙ্গে শীতকালীন ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো শুরু করতে। তাহলে আসুন আমরা জেনে নেই কার্তিক মাসে সমন্বিত কৃষির সীমানায় কোন কাজগুলো আমাদের করতে হবে।

ফসল   /  অবস্থা/বিবরণ / করণীয় 

আমন ধান
ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ    
এ মাসে অনেকের আমন ধান পেকে যাবে তাই রোদেলা দিন দেখে ধান কাটতে হবে। আগামী মৌসুমের জন্য বীজ রাখতে চাইলে প্রথমেই সুস্থ সবল ভালো ফলন দেখে ফসল নির্বাচন করতে হবে। এরপর কেটে, মাড়াই-ঝাড়াই করার পর রোদে ভালোমতো শুকাতে হবে। শুকানো গরম ধান আবার ঝেড়ে পরিষ্কার করতে হবে এবং ছায়ায় রেখে ঠাণ্ডা করতে হবে। পরিষ্কার ঠাণ্ডা ধান বায়ু রোধী পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ রাখার পাত্র টিকে মাটি বা মেঝের ওপর না রেখে পাটাতনের ওপর রাখতে হবে। পোকার উপদ্রব থেকে রেহাই পেতে হলে ধানের সঙ্গে নিম, নিসিন্দা, ল্যান্টানার পাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে মিশিয়ে দিতে হবে।

গম
বীজ বপন ও সার প্রয়োগ    
কার্তিক মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে গম বীজ বপনের প্রস্তুতি নিতে হয়। দো-আঁশ মাটিতে গম ভালো হয়। অধিক ফলনের জন্য গমের আধুনিত জাত যেমন- শতাব্দী, সুফী, বিজয়, প্রদীপ, বারি গম-২৫, বারি গম-২৬, আনন্দ, বরকত, কাঞ্চন, সৌরভ, গৌরব রোপণ করতে হবে। বীজ বপনের আগে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক দ্বারা বীজ শোধন করে নিতে হবে। সেচযুক্ত চাষের জন্য বিঘাপ্রতি ১৬ কেজি এবং সেচবিহীন চাষের জন্য বিঘা প্রতি ১৩ কেজি বীজ বপন করতে হবে। ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার জমি তৈরির শেষ চাষের সময় এবং ইউরিয়া তিন কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। বীজ বপনের ১৩ থেকে ২১ দিনের মধ্যে প্রথম সেচ প্রয়োজন এবং এরপর প্রতি ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর ২ বার সেচ দিলে খুব ভালো ফলন পাওয়া যায়।

আখ    
চারা রোপণ
এখন আখের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। ভালোভাবে জমি তৈরি করে আখের চারা রোপণ করা উচিত। আখ রোপণের জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ৯০ সে.মি থেকে ১২০ সে.মি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৬০ সে.মি। এভাবে চারা রোপণ করলে বিঘাপ্রতি ২২০০ থেকে ২৫০০ চারার প্রয়োজন হয়।    

ভুট্টা    
বীজ বপন    
ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে এবং জমি তৈরি করে  বীজ বপন করতে হবে। ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো বারি ভুট্টা-৬, বারি ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৬, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৮, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১১ এসব।

সরিষা ও অন্যান্য তেল ফসল    
বীজ বপন ও সার প্রয়োগ    
কার্তিক মাস সরিষা চাষেরও উপযুক্ত সময়। সরিষার প্রচলিত জাতগুলোর মধ্যে টরি-৭, রাই-৫, কল্যাণীয়া, সোনালি, সম্পদ, বারি সরিষা-৬, বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮, বারি সরিষা-৯, বারি সরিষা-১০, বারি সরিষা-১১, বারি সরিষা-১২, বারি সরিষা-১৩, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-১৬ উল্লেখযোগ্য। জাতভেদে সামান্য তারতম্য হলেও বিঘাপ্রতি গড়ে ১ থেকে ১.৫ কেজি সরিষার বীজ প্রয়োজন হয়। বিঘা প্রতি ৩৩ থেকে ৩৭ কেজি ইউরিয়া, ২২ থেকে ২৪ কেজি টিএসপি, ১১ থেকে ১৩ কেজি এমওপি, ২০ থেকে ২৪ কেজি জিপসার ও ১ কেজি দস্তা সারের প্রয়োজন হয়। সরিষা ছাড়াও অন্যান্য তেল ফসল যেমন- তিল, তিসি, চিনাবাদাম, সূর্যমুখী এ সময় চাষ করা যায়।

আলু    
জমি তৈরি ও বীজ বপন    
আলুর জন্য জমি তৈরি ও বীজ বপনের উপযুক্ত সময় এ মাসেই। হালকা প্রকৃতির মাটি অর্থাৎ বেলে দো-আঁশ মাটি আলু চাষের জন্য বেশ উপযোগী।

জাত ও বীজহার    
ভালো ফলনের জন্য বীজ আলু হিসেবে যে জাতগুলো উপযুক্ত তাহলো ডায়মন্ড, মুল্টা, কার্ডিনাল, প্যাট্রেনিজ, হীরা, মরিণ, অরিগো, আইলশা, ক্লিওপেট্রা, গ্রানোলা, বিনেলা, কুফরীসুন্দরী এসব। প্রতি হেক্টর জমি আবাদ করতে ১৫০০ থেকে ২০০০ কেজি বীজ আলুর দরকার হয়।

সার প্রয়োগ    
এক হেক্টর জমিতে আলু আবদ করতে ৩২৫ কেজি ইউরিয়া, ২২০ কেজি টিএসপি, ২৫০ কেজি এমওপি, ১৫০ কেজি জিপসাম এবং ১৪ কেজি দস্তা সার প্রয়োজন হয়। তবে এ সারের পরিমাণ জমির অবস্থাভেদে কম-বেশি হতে পারে। তাছাড়া হেক্টরপ্রতি ১০ থেকে ১২ টন জৈব সার ব্যবহার করলে ফলন অনেক বেশি পাওয়া যায়।

পরিচর্যা    
আলু উৎপাদনে আগাছা পরিষ্কার, সেচ, সারের উপরি প্রয়োগ, মাটি অলগাকরণ বা কেলিতে মাটি তুলে দেয়া, বালাই দমন, মালচিং করা আবশ্যকীয় কাজ। সময়মতো সবগুলো কাজ করতে পারলে খরচ কমে আসে, ফলন বেশি হয়।

মিষ্টি আলু    
জমি তৈরি ও  বপন    
নদীর ধারে পলি মাটিযুক্ত জমি এবং বেলে দো-আঁশ প্রকুতির মাটিতে মিষ্টি আলু ভালো ফলন দেয়। তৃপ্তি, কমলা সুন্দরী, দৌলতপুরী আধুনিক মিষ্টি আলুর জাত। প্রতি হেক্টরের জন্য তিন গিটযুক্ত ৫৬০০ থেকে ৬০০০ খ- লতা পর্যাপ্ত। হেক্টরপ্রতি ১০ থেকে ১২টন গোবর/জৈবসার, ৪০ কেজি ইউরিয়া, ১০০ কেজি টিএসপি, ১৫০ কেজি এমওপি সার দিতে হবে। আলুর মতো অন্যান্য পরিচর্যা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যাবে।

ডাল ফসল    
বপন    
ডাল হলো গরিবের আমিষ। আমিষের ঘাটতি পূরণ করতে ডাল ফসল চাষে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। মুসুর, মুগ, মাসকলাই, খেসারি, ফেলন, অড়হর, সয়াবিন, ছোলাসহ অন্যান্য ডাল এ সময় চাষ করতে পারেন। এজন্য উপযুক্ত জাত নির্বাচন, সময় মতো বীজ বপন, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, পরিচর্যা, সেচ, বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করতে হবে। সরকার ডাল ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২% হারে কৃষি ঋণ প্রদান করছেন।

শাকসবজি    
বীজ বপন, চারা রোপণ ও পরিচর্যা    
শীতকালীন শাকসবজি চাষের উপযুক্ত সময় এখন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বীজতলায় উন্নতজাতের দেশি-বিদেশি ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, বাটিশাক, টমাটো, বেগুন এসবের চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। আর গত মাসে চারা উৎপাদন করে থাকলে এখন মূল জমিতে চারা রোপণ করতে পারেন। রোপণের পর আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ, সেচ নিকাশসহ প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হবে। তাছাড়া লালশাক, মুলাশাক, গাজর, মটরশুঁটির বীজ এ সময় বপন করতে পারেন।    

অন্যান্য ফসল    
বীজ বপন    
অন্যান্য ফসলের মধ্যে এ সময় পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ধনিয়া, কুসুম, জোয়ার এসবের চাষ করা যায়। সাথী বা মিশ্র ফসল হিসেবেও এসবের চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে আধুনিক চাষাবাদ কৌশল অবলম্বন করতে হবে।

প্রাণিসম্পদ
হাঁস-মুরগির যত্ন
সামনে শীতকাল আসছে। শীতকালে পোলট্রিতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়ে যায় এবং রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড,  বসন্ত রোগ, কলেরা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। এসব রোগ থেকে হাঁস-মুরগিকে বাঁচাতে হলে এ মাসেই টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। গত মাসে ফুটানো মুরগির বাচ্চার ককসিডিয়া রোগ হতে পারে। রোগ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা করাতে হবে।

গরু-বাছুরের যত্ন  
গবাদিপ্রাণির আবাসস্থল মেরামত করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গবাদিপ্রাণীকে খরের সঙ্গে তাজা ঘাস খাওয়াবেন। ভুট্টা, মাসকালাই, খেসারি রাস্তার ধারে বা পতিত জায়গায় বপন করে গবাদিপ্রাণীকে খাওয়ালে স্বাস্থ্য ও দুধ দুটোই বাড়ে। রাতে অবশ্যই গবাদিপ্রাণীকে বাহিরে না রেখে ঘরের ভেতরে রাখতে হবে। তা নাহলে কুয়াশায় ক্ষতি হবে। গবাদিপ্রাণীকে এ সময় কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হবে। এছাড়া তড়কা, গলাফুলা রোগের বিষয়ে সচেতন থাকলে মারাত্মক সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

মৎস্যসম্পদ    
মাছের যত্ন  
এ সময় পুকুরে আগাছা পরিষ্কার, সম্পূরক খাবার ও সার প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া জাল টেনে মাছের স্বাস্থ পরীক্ষা করাও জরুরি। রোগ প্রতিরোধের জন্য একরপ্রতি ৪৫ থেকে ৬০ কেজি চুন প্রয়োগ করতে পারেন। অংশীদ্বারিত্বের জন্য যেখানে যৌথ মাছ চাষ সম্ভব নয় সেখানে খুব সহজে খাঁচায় বা প্যানে মাছ চাষ করতে পারেন। এছাড়া মাছ সংক্রান্ত যে কোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা মৎস অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, শীতকাল আমাদের কৃষির জন্য একটি নিশ্চিত মৌসুম। যতবেশি যৌক্তিক বিনিয়োগ করতে পারবেন লাভও পাবেন তত বেশি।

শুকনো মৌসুম বলে মাটিতে রস কম থাকে। তাই যদি প্রতি ফসলে চাহিদা মাফিক সেচ প্রদান নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে দেখবেন আপনার জমির ফলন কতখানি বাড়ে।

একমাত্র কৃষির মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারি। আপনাদের সবার জন্য নিরন্তন শুভ কামনা। কৃষির সমৃদ্ধিতে আমরা সবাই গর্বিত অংশীদার।
 
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন
* সহকারী তথ্য অফিসার (শস্য উৎপাদন), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫
বিস্তারিত

Share with :
Facebook Facebook