কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

জামের নানান কথা

ফলের ভাণ্ডারে ভরা আমাদের এ প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। আমাদের দেশে অন্যান্য সব ফলের মধ্যে জাম অন্যতম। অন্য সব মৌসুমি ফলের তুলনায় জামের স্থায়ীকাল কম হলেও এটি পুষ্টিগুণে অতুলনীয়। কালো জাম একটি গ্রীষ্মকালীন ফল। গাছটির উদ্ভব দক্ষিণ এশিয়া, সিলন, আন্দামান ও ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে। বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ায় এ ফল ব্যাপকভাবে চাষ হয়। আমাদের দেশে কুমিল্লা, নোয়াখালী, গাজীপুর, সিলেট, ঢাকা, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর ও টাঙ্গাইল জেলায় জাম বেশি উৎপন্ন হয়। জাম সাধারণত তাজা ফল হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এ থেকে রস, স্কোয়াশ ও অন্যান্য সংরক্ষিত খাদ্য তৈরি করা যায়।


জামের ইংরেজি নাম Jambul, Malabar Plum, Jamun ; বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium cumini.; জাম Myrtaceae পরিবারভুক্ত একটি ফল। এটি বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। গাছ ১৪-৬০ ফুট বা এর বেশিও লম্বা হতে পারে। কা- সরল, শাখা-প্রশাখাযুক্ত, ছাল ধূসর বর্ণের। পাতা সরল, বৃন্তক,  প্রতিমুখ। মার্চ-এপ্রিলে ফুল আসে, ফুল সবুজাভ সাদা। ফল প্রথমে সবুজ থাকে যা পরে গোলাপি হয় এবং পাকলে কালচে বেগুনি রঙ ধারণ করে। স্বাদ মধুর ও কষভাবযুক্ত। ফলের মজ্জা হালকা গোলাপি ও রসালো। পুষ্টিকর ফল জাম দেখতে ১-২.৫ সেন্টিমিটার ডিম্বাকৃতির। জাম গাছের বাকল প্রায় ১ ইঞ্চি পুরু হয়। বাকলের রঙ ফিকে ধূসর এবং প্রায় মসৃণ। কাঠের রঙ লালচে বা ধূসর বর্ণের হয়। সার কাঠের লালচে ভাব গভীর হয়ে থাকে। কাঠ বেশ শক্ত হয়ে থাকে এবং আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। আমাদের দেশে জামের কোনো অনুমোদিত জাত নেই। ফলের আকার অনুযায়ী দুই জাতের জাম পাওয়া যায়। জাত দুটি হলো খুদি জাত- খুব ছোট এবং মহিষে জাত- বেশ বড় ও মিষ্টি।  


সব ধরনের মাটিতে জাম চাষ করা যায়। উচ্চফলনের জন্য সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ মাটি প্রয়োজন। লবণাক্ততা এবং জলমগ্ন জায়গায়ও জাম ভালোভাবে উৎপাদিত হয়। জাম রোপণ সময় মধ্য জ্যৈষ্ঠ-মধ্য ভাদ্র (জুন-আগস্ট)। বীজ এবং অঙ্গজ পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করা যায়। বীজে কোনো সুপ্তাবস্থা নেই। টাটকা বীজ বপন করতে হবে।  যা ১০-১৫ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়। গাছ থেকে গাছ ১০ মি. এবং সারি থেকে সারি ১০ মি. দূরত্বে রোপণ করতে হবে এবং গর্ত বা পিটের আকার হবে ১x১x১ মি.।


সার প্রয়োগের সুপারিশমালা 

গাছের বয়স (বছর)

গোবর (কেজি/গাছ)

ইউরিয়া (গ্রাম/গাছ)

টিএসপি (গ্রাম/গাছ)

এমওপি (গ্রাম/গাছ)

৫০

৫০

১০

২৫০

১০০

১০০

১৫

৩৭৫

১৫০

১৫০

২০

৫০০

২০০

২০০

২৫

৬২৫

২৫০

২৫০

৩০

৭৫০

৩০০

৩০০

৩৫

৮৭৫

৩৫০

৩৫০

৪০

১০০০

৪০০

৪০০

৪৫

১১২৫

৪৫০

৪৫০

১০

৫০

১২৫০

৫০০

৫০০

 

Source: Sanjay Singh, Singh, A.K., Singh, H.P., Bagle, B.C. and More, T.A. 2011. Jamun. ICAR, New Delhi. p. 30.


সেচ : জাম গাছের মূল মাটির গভীরে থাকে বিধায় মাটির গভীর হতে পানি শোষণ করতে পারে এবং বৃষ্টিহীন অবস্থায়ও ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য গাছের বৃদ্ধি ও ফুল আসা পর্যায়ে প্রতি বছর ৮-১০টি সেচ দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।


রোগ-পোকামাকড়
সাদা মাছি পোকা : এ পোকা গাছের চারা অবস্থা থেকে পূর্ণ বয়স্ক পর্যন্ত ডগার কচি পাতার রস চুষে খায় এবং আক্রান্ত পাতা কুঁকড়ে যায়। এ পোকা দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি ইমিডাক্লোরপ্রিড (এডমায়ার, টিডো), রগর/টাফগর ২ মিলি স্প্রে করতে হবে।

 

পাতা খাদক শুঁয়াপোকা : এ পোকা গাছের কচি পাতা খেয়ে পত্র শূন্য করে ফেলে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ এবং প্রতি লিটার পানিতে একতারা ০.২৫ গ্রাম, ডায়মেথোয়েট ৪০ ইসি ১ মিলি. ম্যালাথিয়ন বা এসাটাফ ০.৫-১ গ্রাম মিশিয়ে স্প্রের মাধ্যমে এ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।


অ্যানথ্রাকনোজ : পাতা, বোঁটা ও পুষ্পমঞ্জরি ও ফলে এ রোগ আক্রমণ করে। পাতায় বাদামি দাগ দেখা যায় এবং আক্রান্ত স্থান কালো হয়ে শুকিয়ে যায়। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি প্রোপিকোনাজল (টিল্ট) বা ১ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম (ব্যাভিস্টিন বা নোইন) বা ২ গ্রাম টপসিন এম বা ২ গ্রাম ডায়থেন এম-৪৫ মিশিয়ে ১০-১২ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।


ফলন : গাছ লাগানোর ৮ থেকে ১০ বছর পর ফল ধরা শুরু করে এবং ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত ফল দেয়। জুন-জুলাই মাসে ফল পাকে। একটি গাছে ৮০-১০০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। 


জামের পুষ্টিমান

জামফলের পুষ্টিমান (প্রতি ১০০ গ্রাম)

শক্তি               ২৫১ কিলোজুল (৬০ কিলোক্যালোরি)

শর্করা               ১৫.৫৬ গ্রাম

স্নেহ পদার্থ          ০.২৩ গ্রাম

প্রোটিন              ০.৭২ গ্রাম

ভিটামিন এ          ৩.০ আন্তর্জাতিক একক (ওট)

থায়ামিন বি১      ০.০০৬ মিলিগ্রাম           (১%)

রিবোফ্লাভিন বি২ ০.০১২ মিলিগ্রাম           (১%)

নায়াসিন বি৪      ০.২৬০ মিলিগ্রাম           (২%)

প্যানটোথেনিক অ্যাসিড বি৫ ০.১৬০ মিলিগ্রাম  (৩%)

ভিটামিন বি৬     ০.০৩৮ মিলিগ্রাম     (৩%)

ভিটামিন সি        ১৪.৩ মিলিগ্রাম       (১৭%)

ক্যালসিয়াম        ১৯ মিলিগ্রাম          (২%)

লোহা                ০.১৯ মিলিগ্রাম       (১%)

ম্যাগনেসিয়াম      ১৫ মিলিগ্রাম          (৪%)

ফসফরাস           ১৭ মিলিগ্রাম          (২%)

পটাসিয়াম          ৭৯ মিলিগ্রাম          (২%)

সোডিয়াম         ১৪ মিলিগ্রাম          (১%)

পানি                 ৮৩.১৩ গ্রাম      


Source: USDA Nutrient Database


জামের উপকারিতা
জামে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, জিংক, কপার, গ্লুকোজ, ডেক্সট্রোজ ও ফ্রুকটোজ, ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও স্যালিসাইলেটসহ অসংখ্য উপাদান। এছাড়াও জাম এর অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। জামের উপকারিতা সমূহ নিম্নেবর্ণিত হলো-


* মানসিকভাবে সতেজ রাখে : জামে গ্লুকোজ, ডেক্সট্রোজ ও ফ্রুকটোজ রয়েছে, যা মানুষকে জোগায় কাজ করার শক্তি। বয়স যত বাড়তে থাকে, মানুষ ততই হারাতে থাকে স্মৃতিশক্তি। জাম স্মৃতিশক্তি প্রখর রাখতে সাহায্য করে।
 

* ডায়াবেটিস নিরাময়ে সাহায্য করে : ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জাম ভীষণ উপকারী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত জাম খাওয়ার ফলে ৬.৫ শতাংশ মানুষের ডায়াবেটিক কমে গেছে। এটি রক্তে চিনির মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। জাম ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে শরীর সুস্থ রাখে। এক চা চামচ জামের বীচির গুঁড়া খালি পেটে প্রতিদিন সকালে খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
 

* ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ দূর করে : জামে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি। যার জন্য এটা দেহে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি পূরণ করে এবং একই সঙ্গে ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ করে। এ ছাড়া মুখের দুর্গন্ধ রোধ, দাঁত মজবুত, মাঢ়ি শক্ত এবং মাঢ়ির ক্ষয়রোধেও জামের জুড়ি নেই ।  এতে বিদ্যমান পানি, লবণ ও পটাসিয়ামের মতো উপাদান গরমে শরীর ঠা-া এবং শারীরিক দুর্বলতাকে দূর করতে সক্ষম। জামে দেখা মেলে বেশি পরিমাণের আয়রনেরও, যা রক্তস্বল্পতা দূর করে।
 

* হার্ট ভালো রাখে : জাম রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদপি- ভালো রাখে। এছাড়া শরীরের দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমিয়ে দেহের প্রতিটি প্রান্তে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।
 

* ওজন নিয়ন্ত্রণ করে : জামে কম পরিমাণে ক্যালোরি থাকে, যা ক্ষতিকর তো নয়ই বরং স্বাস্থ্যসম্মত। তাই যারা ওজন নিয়ে চিন্তায় আছেন এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, তাদের খাদ্য তালিকায় আসতে পারে জাম।
 

* উচ্চ রক্তচাপ : পুষ্টিবিদ এবং চিকিৎসকরা তাজা ফল এবং সবজি খাওয়ার সুপারিশ করে থাকেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জামে সেই সব উপাদান আছে যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে।
 

* ক্যান্সার প্রতিরোধে কালো জাম উপকারী : মানুষের মুখের লালার মধ্যে এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ উৎপাদিত হয়, যা হতে ব্যাকটেরিয়ার জন্ম নেয়। এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া হতে মুখে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর জাম মুখের ভেতর উৎপাদিত ক্যান্সারের সহায়ক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব থেকে দেহকে রক্ষা করে মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রঙিন ফলের ভেতর যে পরিমাণ যৌগিক উপাদান রয়েছে, এর মধ্যে জামে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ যৌগিক উপাদান রয়েছে যা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাহায্য করে। জাম লড়াই করে  জরায়ু, ডিম্বাশয় ও মলদ্বারের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে।
 

* সাদা বা রক্ত আমাশয় : জামের কচি পাতার রস ২-৩ চা-চামচ একটু গরম করে ছেঁকে নিয়ে খেলে ২-৩ দিনের মধ্যে সেরে যায়।
 

* পাতলা দাস্ত অরুচি ও বমিভাব : পাকা জাম সৈন্ধব লবণ মাখিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা রেখে, সেটা চটকে ন্যাকড়ার পুঁটলি বেঁধে টানিয়ে রাখলে যে রস ঝরে পড়বে, সেটা ২০-২৫ ফোঁটা প্রয়োজনবোধে এক চা চামচ পানি মিশিয়ে খেতে দিলে পাতলা দাস্ত, অরুচি ও বমিভাব কমে যায়।
 

* শয্যামূত্র : এ রোগে শিশু-বৃদ্ধ অনেকেই অসুবিধায় পড়েন এবং অনেক মা-কেও সন্তানের জন্য ভুগতে হয়। এক্ষেত্রে ২-৩ চা চামচ জাম পাতার রস (বয়স অনুপাতে মাত্রা) ১/২ চা চামচ গাওয়া ঘি মিশিয়ে প্রতিদিন একবার করে খাওয়ালে এক সপ্তাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপকার হবে।
 

* জ্বরের সঙ্গে পেটের দোষ : যাদের জ্বরের সঙ্গে পেটের দোষ থাকে, তারা এ পাতার রস ২-৩ চা-চামচ একটু গরম করে ছেঁকে খেলে উপকার হয়।
 

* পচা ঘা (ঘৃত) : জামের পাতাকে সিদ্ধ করে সেই কাত্থ দিয়ে ঘা ধুয়ে দিলে ২-৪ দিনের মধ্যে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়। এমনকি পশুপাখির ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ করা যেতে পারে। যে ঘা (ক্ষত) তাড়াতাড়ি পুরে উঠছে না, সেখানে জামছালের মিহি গুঁড়া ওই ঘায়ের ওপর ছড়িয়ে দিলে তাড়াতাড়ি পুরে যায়।
 

* রক্তদাসে : জামছালের রস ১-২ চা চামচ ছাগলের দুধে মিশিয়ে খেতে দিলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়।
দাঁতের মাঢ়ির ক্ষতে : যাদের মাঢ়ি আলগা হয়ে গিয়েছে, একটুতে রক্ত পড়ে, তারা জামছালের গুঁড়া দিয়ে দাঁত মাজলে, উপকার হবে।

 

* জামে ফাইটো কেমিক্যালস আর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বিদ্যমান : যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, সঙ্গে মৌসুমি সর্দি-কাশি থেকে মুক্তি দেয়। প্রতিরোধ করে ইনফেকশনের মতো সমস্যারও। জামে পাওয়া  গেছে অ্যালার্জিক নামে এক ধরনের এসিডের উপস্থিতি, যা ত্বককে করে শক্তিশালী। ক্ষতিকর আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক ও চুলকে রক্ষা করে। এ অ্যালার্জিক এসিড ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
 

* বৃদ্ধ বয়সে চোখের অঙ্গ ও স্নায়ুগুলোকে কর্মময় করতে সাহায্য করে। জাম চোখের ইনফেকশনজনিত সমস্যা ও সংক্রামক (ছোঁয়াচে) রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। রাতকানা রোগ এবং যাদের চোখের ছানি অপারেশন হয়েছে তাদের জন্য জাম ভীষণ উপকারী। আমাদের নাক, কান, মুখের ছিদ্র, চোখের কোনা দিয়ে বাতাসে ভাসমান রোগজীবাণু দেহের ভেতর প্রবেশ করে। জামের রস এ জীবাণুকে মেরে ফেলে।
 

* জৈব কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার : জাম পাতার রস শস্য বীজ শোধনে ব্যবহার করা যায়। পাতা পিসে রস করে ১:৪ অনুপাতে দ্রবণ তৈরি করে শস্য ও সবজি বীজ শোধন করা যায়।


সতর্কতা : আধাপাকা (ডাঁসা) জাম খাওয়া উচিত নয়। খালি পেটে জাম খাবেন না এবং জাম খাওয়ার পর দুধ খাবেন না। পাকা ফল ভরা পেটে খেলে অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি ও গ্যাস্ট্রিকভাব হতে পারে।


নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি ফল জাম। এ ফল এখন চলে গেছে দামি ফলের তালিকায়। এক সময় প্রচুর জাম গাছ চোখে পড়লেও এখন তেমন দেখা যায় না। অত্যন্ত ঔষধি গুণসম্পন্ন পাকা জামের মধুর রসে এখন আর মুখ আগের মতো রঙিন হয় না। পতিত জায়গাগুলোতে জামের চারা রোপণ করে একদিকে যেমন আমাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে সাথে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ গোলাম মাওলা*
* ফার্ম ব্রডকাস্টিং অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

 

বিস্তারিত
ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি এবং নিরাপদ ফল উৎপাদন
ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিটি বাংলাদেশে একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। যে সময়ে আমরা চিন্তিত ও আতঙ্কিত ফল বাগানে বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে। এ সময়েই সন্ধান পাওয়া গেল নতুন এ প্রযুক্তির, যা পরিবেশবান্ধবও বটে। এখন আমরা জানব এ প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে। ফ্রুট ব্যাগিং বলতে ফল গাছে থাকা অবস্থায় বিশেষ ধরনের ব্যাগ দ্বারা ফলকে আবৃত করাকে বুঝায় এবং এর পর থেকে ফল সংগ্রহ করা পর্যন্ত গাছেই লাগানো থাকে ব্যাগটি। এই ব্যাগ বিভিন্ন ফলের জন্য বিভিন্ন রঙ এবং আকারের হয়ে থাকে। তবে আমের জন্য দুই ধরনের ব্যাগ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। রঙিন আমের জন্য সাদা রঙের এবং সবুজ আমের জন্য দুই আস্তরের বাদামি ব্যাগ। আমাদের দেশে যেসব ফলগুলো সহজেই ব্যাগিংয়ে আওতায় এনে সুফল পাওয়া সম্ভব সেগুলো হলো আম, পেয়ারা, ডালিম, কলা, কাঁঠাল ইত্যাদি। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত ফল নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও রপ্তানি উপযোগী।
 
ফ্রুট ব্যাগিং কেন প্রয়োজন?
বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ফলে বালাইনাশকের ব্যবহার উদ্রেকজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্প্রে করার প্রকৃত কারণ ও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকার কারণে ফলচাষিরা এক মৌসুমে ফল বাগানে বহুবার স্প্রে করে থাকেন, যা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়। যদি আমের কথায় ধরা যায়, আমচাষিরা আম সংগ্রহ করার পর থেকে পরের মৌসুমে আম সংগ্রহ করা পর্যন্ত ১৫-৬২ বার বালাইনাশকের ব্যবহার করে থাকেন। যেখানে গবেষণার ফল থেকে দেখা গেছে ২-৫ বার ক্ষেত্র বিশেষে ¯েপ্র করলেই ভালো আম সংগ্রহ করা সম্ভব। মাত্রাতিরিক্ত স্প্রে যেমন জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনি আমের উৎপাদনকেও ব্যয়বহুল করে তোলে। শুধু তাই নয় অতিরিক্ত স্প্রে করার ফলে উপকারী ও বন্ধু পোকার সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
 
এখন মূলত ফলবাগানে স্প্রে করা হয় দেখাদেখি করে। প্রয়োজন থাকুক বা নাই থাকুক সেটি মুখ্য বিষয় নয়। অতীতেও ফল-ফসলে স্প্রে করা হতো কিন্তু বর্তমানে এর পরিমাণ অনেকগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জনজীবনে এর ক্ষতিকর প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে জানা-অজানা জটিল রোগে। এ অবস্থায় বিভিন্ন ফলে ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে বালাইনাশকের ব্যবহার অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হবে। পাওয়া যাবে বিষমুক্ত ফল, কমবে ফলের উৎপাদন খরচ, কমবে পরিবেশ দূষণের মাত্রা এবং বাড়বে ফলের গুণগতমান। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাগিং করা আম দীর্ঘদিন ঘরে রেখে খাওয়া যায়। আমকে সংরক্ষণ করতে প্রয়োজন হবে না ফরমালিন নামক বিষাক্ত রাসায়নিকের। এছাড়াও ফলকে বাইরের বিভিন্ন ধরনের আঘাত, পাখির আক্রমণ, প্রখর সূর্যালোক ও রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ হতে সহজেই রক্ষা করা সম্ভব। যেমন আমের ফল ছিদ্রকারী ও মাছি পোকা আমের বর্ধনশীল পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে। যদি নির্দিষ্ট সময়ে ব্যাগিং করা হয় তাহলে কোনো স্প্রে ছাড়াই এ ক্ষতিকর পোকা দুইটির হাত থেকে আম ফলকে রক্ষা করা সম্ভব।
 
ব্যাগিং কখন করা প্রয়োজন
গবেষণা করে দেখা গেছে, প্রত্যেক ফলের জন্য ব্যাগিং করার সময় ভিন্ন ধরনের। যেমন আমের ক্ষেত্রে ব্যাগিং করা হয় ৩৫-৪০ দিন বয়সের আমে। এ সময়ে আম জাতভেদে মটরদানা থেকে মার্বেল আকারের অথবা এর চেয়ে বড় আকারেরও হয়ে থাকে। পেয়ারার ক্ষেত্রে ব্যাগিং করা হয় ৫০-৫৫ দিন বয়সে এবং ডালিমের ক্ষেত্রে ২০-২৫ দিন বয়সে। ব্যাগিং করার আগে অবশ্যই কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। ভেজা অবস্থায় ব্যাগিং করা ঠিক নয়। আমের ক্ষেত্রে কমপক্ষে তিনটি স্প্রে দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। যেমন প্রথমবার আম গাছে মুকুল আসার আনুমানিক ১৫-২০ দিন পূর্বে, দ্বিতীয়বার মুকুল আসার পর অর্থাৎ আমের মুকুল যখন ১০-১৫ সেমি. লম্বা হবে তখন এবং আম যখন মটরদানার মতো হবে তখন তৃতীয়বার। সুতরাং এর পরপরই ব্যাগিং করার পরামর্শ দেয়া হয়। ব্যাগিং করার আগেই মরা মুকুল বা পুষ্পমঞ্জরির অংশবিশেষ, পত্র, উপপত্র অথবা এমন কিছু যা ফলের ক্ষতি করতে পারে সেগুলো ছিঁড়ে ফেলতে হবে।
 
বাংলাদেশে ফ্রুট ব্যাগিংয়ের সম্ভাবনা
বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন ফল ও সবজিতে ব্যাগিং প্রযুক্তিটি অনেক আগে থেকেই ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বিশেষ করে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে সফলতার মুখ দেখেনি। আমের ক্ষেত্রেও ২০০৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে দেশীয় বিভিন্ন প্রকারের ব্যাগ ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। কিন্তু আমের মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ব্যাগ কয়েকবার পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে ব্যাগগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলো বৃষ্টিতে নষ্ঠ হয় না। গত বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে সেই ধরনের ব্যাগ দিয়ে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিভিন্ন জাতের আমে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করে সুফল পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত এবং বাণিজ্যিকভাবে চাষকৃত যে কোনো আমের জাতেই ব্যাগটি ব্যবহার উপযোগী। আম ব্যবসায়ীরা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন ব্যাগটি চলতি মৌসুমে বাজারজাত করার জন্য। সুতরাং এ ধরনের ব্যাগ বাংলাদেশে পাওয়া গেলে নিঃসন্দেহে ফলচাষিরা উপকৃত হবেন। দেশের মানুষ পেতে পারেন বিষমুক্ত ভালোমানের দেশীয় ফল। তেমনিভাবে পেয়ারা ও ডালিম চাষিরাও ব্যবহার করতে পারবেন এ বিশেষ ধরনের ব্যাগটি।
 
 
কৃষিবিদ ড. মো. শরফ উদ্দিন*
* ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
বিস্তারিত
বাংলাদেশের আম শিল্প : সমস্যা ও সম্ভাবনা

আম মিষ্টি ও টক স্বাদের মিশ্রণযুক্ত একটি রসালো ফল, যা উদ্ভিদতত্ত্বে ড্রুপ (Drupe) নামে পরিচিত। আম বাংলাদেশ তথা বিশ্বের অন্যতম প্রধান সুমিষ্ট ও জনপ্রিয় ফল। পাক-ভারত উপমহাদেশে আমকে ফলের রাজা বলা হয়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অনেক আগে থেকেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতের আম চাষ হয়ে আসছে। বৃটিশ ভারতের বাঙালা প্রদেশে তথা বর্তমান বাংলাদেশে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হতো।  সে গৌরব বর্তমানে অতীত, আম আমাদের দেশে মৌসুমি অর্থকরী ফল হিসেবে গুরুত্ব পেলেও একে শিল্পজাত পণ্য হিসেবে প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যকর গবেষণা অদ্যাবধি নেয়া হয়নি। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে যেমন আমকে বিভিন্ন স্বাদে ভোগ করা যাচ্ছে না, ঠিক তেমনি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই ফলের অনুকূল সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে অব্যাহতভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। আমের জমির পরিমাণ ও উৎপাদনের মধ্যে তারতম্যের কারণ মূলত কার্যকর গবেষণার অভাব এবং জলবায়ু ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার কুফল। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের অভিশপ্ত প্রভাব বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের যে প্রভাব ফেলেছে, আমাদের আম ফলও কম বেশি তার কুপ্রভাবের শিকার। জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে পুষ্টির অভাব মেটানো, কর্মসংস্থান তথা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজারজাতকরণ এবং গুদামজাত করে দীর্ঘমেয়াদি বিপণন প্রক্রিয়া গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক, অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানসহ শিল্পোউদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে আম শিল্পের বিকাশ ঘটবে।


তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অধিক জনসংখ্যার ভারে আক্রান্ত। সাধারণ জনগণের অপুষ্টি দূরীকরণে, বেকারত্ব দূরীকরণ তথা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আম শিল্পের বিকাশ পুরোপুরি ঘটিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে আমদানি ও রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নার্সারি পর্যায়ে আম চারা উৎপাদন একটি ব্যবসায়, কৃষক পর্যায়ে আম চাষ লাভজনক কৃষি পণ্য, ব্যবসায়ী পর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায় হিসেবে বিবেচিত হলেও আমকে শিল্পের পর্যায়ে ভাবা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে যে পরিমাণ কোমল পানীয়, বিদেশি জুস, জ্যাম, জেলি ইত্যাদি আমদানি করা হয়; আমকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে তা পণ্যে রূপান্তর করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব। যদি দেশে এ জাতীয় পণ্য রপ্তানি করতে না হয় তাহলেই তো দেশের হাজার হাজার  কোটি টাকা দেশেই থাকবে; তদুপরি বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ফলে দেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তন ঘটতো; একথা নির্দ্ধিধায় বলা যেতে পারে। ১৯৮৫ সন হতে আমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে করণীয়, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হলেও আম শিল্পের বিকাশ অথবা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আম শিল্প হিসেবে বা ‘শিল্পজাত পণ্য’ হিসেবে কী ভূমিকা রাখতে পারে তা বিবেচিত হয়নি, আম উৎপাদনে প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী অন ইয়ারে বাম্পার ফলন, অফ ইয়ারে কম উৎপাদন, দুটোই সমস্যা তৈরি করে। কেননা, বেশি উৎপাদনের ফলে আমের ক্রেতা থাকে না, আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন আবার কম উৎপাদন হলে আমচাষিরা দাম বেশি পেলেও আমি উৎপাদনের ফলে লাভবান হন না; অপর দিকে ব্যাবসায়ীরা লাভবান হন। বাজারে ক্রেতা না থাকায় আম পানির দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। আম পচনশীল হওয়ার কারণে তা ধরে রাখাও সম্ভব হয় না। কিন্তু হিমাগারে আম রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে পারলে অথবা আম দিয়ে পাল্প তৈরি করে পরবর্র্তীতে বিভিন্ন রকম পণ্য উৎপাদিত হলে আম ‘শিল্প’ হিসেবেই বিবেচিত হতো।


আমকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কথা আমরা যখন ভাবছি, তখন ভারত, পাকিস্তান এমনকি সৌদি আরবও আমজাত পণ্যের অগ্রগতি ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের বাজার ওইসব দেশের আমজাত পণ্যে সয়লাব। শিল্প পণ্য হিসেবে আম দিয়ে নিম্নোক্ত খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা সম্ভব।
১. আমের রস।
২. আমের মোরব্বা।
৩. আমের স্কোয়াশ।
৪. আমের জেলি।
৫. আমের পাল্প।
৬. আমের টফি।
৭. আমের মধু।
৮. আমস্বত্ত্ব।
৯. আমের বরফি।
১০. আমের আচার।
১১. আমের জ্যাম।
১২. আমের পাউডার।
এসব শিল্পের জন্য যেসব উপাদান অপরিহার্য আম শিল্পের সম্ভাবনা হিসেবে সেগুলো আলোচনা করা হলো।

 

ক. মূলধন প্রাপ্যতা
শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু আম শিল্পের বিকাশের জন্য খুব বেশি মূলধনের প্রয়োজন নেই। বাণিজ্যিক ব্যাংক অথবা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় এই শিল্পকে দাঁড় করাতে পারেন, উন্মোচন করতে পারে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

 

খ. কাঁচামাল প্রাপ্যতা
যে কোনো শিল্পই কাঁচামালের সহজ প্রাপ্যতার ওপর টিকে থাকে। আম শিল্পের কাঁচামাল হিসাব খুব ভালোজাতের আমের প্রয়োজন নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, গুটি আমের ম্যাঙ্গো জুস বেশি ভালো হয়। আর ভালো জাতের আমের চেয়ে গুটি আম অনেক বেশি ফলে। তাছাড়াও ঝড়ে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝরে যাওয়া আম কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই বলা যায় যে, আম শিল্পের বিকাশে কাঁচামাল প্রাপ্যতা নিয়ে দুশ্চিন্তার অবকাশ নেই।

 

গ. জনশক্তির প্রাচুর্য
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সুলভে জনশক্তি পাওয়া যায়। শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারলে দক্ষ শ্রমিক/কর্মীর সমস্যা হবে না। তাই বলা যায়, আম শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলে আম চাষি ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশে কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।

 

ঘ. দেশীয় উৎপাদন প্রযুক্তি
বাংলাদেশে আম শিল্পের সম্ভাবনার একটি বড় দিক হলো দেশীয় প্রযুক্তিতে এমনকি ঘরে বসেও আমজাত পণ্য তৈরি করা যায়। ‘পণ্য’ কোম্পানিতে দেশীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদন করছে। ‘পণ্য’ এর মতো দেশি উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহার করেই আম শিল্পের বিকাশে পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।

 

ঙ. ক্রমবর্ধমান চাহিদা
চাহিদার ওপরই সাধারণত কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম নির্ভর করে। আশার কথা, বাংলাদেশে আমজাত পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ম্যাঙ্গো জুস এখন কোমল পানির চাইতে অনেক বেশি জনপ্রিয়। আম শিল্পের বিকাশ ঘটলে বাজারজাতকরণের সমস্যা তো হবেই না, উপরন্তু বাংলাদেশ এর মাধ্যমে গার্মেন্ট শিল্পের মতো প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।


বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আম শিল্পের সমস্যাসমূহ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
আমকে শিল্প মাধ্যমে নিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপণন করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে এটা লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া এমনকি মরুভূমির দেশ সৌদি আরবও আমকে শিল্পজাত পণ্যে রূপান্তরিত করেছে।

 

কাঁচামাল হিসেবে উৎপাদন হ্রাস : একটি শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশে সঠিক মানের ও সঠিক পরিমাণে কাঁচামাল অতিব জরুরি। এদিক থেকে আমের ফলন সন্তোষজনক নয়। সাধারণভাবে রাজশাহী অঞ্চলকে আম উৎপাদনের জোন মনে করা হয় এবং তা গোটা দেশের মোট উৎপাদনে ৮০-৯০% এর মতো। এই উৎপাদন জোনেই উৎপাদনের মাত্রা হতাশাজনক। অবশ্য আশার কথা এই যে, বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় বিশেষত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী নওগাঁ জেলায় ধানি জমিতে আম চাষ অনবরত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আম উৎপাদনের দিক থেকে এটি আশার কথা হলেও খাদ্য নিরাপত্তা প্রশ্নে তা বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


হিমাগার সমস্যা : পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে যে, কাঁচামাল দীর্ঘদিন রাখার জন্য হিমাগার অত্যাবশ্যক। আমাদের দেশে আম সংরক্ষণের জন্য কোন হিমাগার গড়ে ওঠেনি। অন ইয়ারে আমের বাম্পার ফলন এবং এর ফলে আম সংরক্ষণের অভাবে এবং পরিবহনের অনিয়মের জন্য প্রচুর আম নষ্ট হয় এবং কমদামে তা বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না। এ অবস্থার আমি চাষি ও ব্যবসায়ীদের নিকট হিমাগারের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হয়।


হিমাগার পরিবহনের অভাব : সাধারণ পরিবহন ও হিমাগার পরিবহন এক কথা নয়। সাধারণভাবে পরিবহনের ক্ষেত্রে আমাদের যোগাযোগের অসুবিধার জন্য প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে আম নষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম ও আমজাত পণ্য পরিবহনের জন্য হিমাগার পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে।
 

ঋণের অপ্রতুলতা : আম শিল্পতো দূরের কথা, আম চাষেও ব্যাংকসমূহ বা অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ ঋণ কার্যক্রম চালু করেনি। ফিলিপাইনে বছরের অধিকাংশ সময় আম ফলানো হচ্ছে এবং প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার আম রপ্তানি করা হচ্ছে। The Development Bank of Philippines (DBP) সে দেশে আম শিল্পে বিভিন্ন মেয়াদে নিয়মিত ঋণ সরবরাহ করে থাকে। যার পরিমাণ প্রতি হেক্টরে ৫০০ ফিলিপাইন মুদ্রা। এই ঋণ সাত বছর ও পনের বছর মেয়াদি। ‘সুদের হার ১২%’।
 

পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা : বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষত ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে গ্রীষ্মকালে ৪০-৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রা এবং শীতকালে ৪-৫ ডিগ্র্রি সে. তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর ৩৭% উর্বরা জমি মরুভূমি প্রায়। আমের মুকুল ধরার সময় কুয়াশা ভীষণ ক্ষতি করে এবং গরমে ছোট ছোট গুটি ঝরে যায়। আগে যে অফ ইয়ার এবং অন ইয়ার প্রচলিত কথা আমাদের জানা ছিল তা বর্তমানে নিশ্চিহ্ন প্রায়।
সরকারি উদ্যোগের অভাব : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ, আনুকূল্য ও কার্যকর পৃষ্টপোষকতা অপরিহার্য বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি আনুকূল্যই মুখ্য হয়ে উঠে। যেমন সম্ভাবনাময় আম ফলকে শিল্প হিসাবে গ্রহণ না করার ফলে একদিকে যেমন বহুমুখী উপযোগিতা হারাচ্ছে তেমনি স্বাভাবিকভাবে আমের উৎপাদনও কমে আসছে। আর এদিকে সুযোগ বুঝে বিদেশি ফল আমদানিতে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে, বিদেশ থেকে বৈধভাবে যে পরিমাণ ফল আমদানি করা হয়, রপ্তানি করা হয় তার ৬২ ভাগের ১ ভাগ। আমদানি করা আপেল, কমলা, আঙুর, বেদানা, নাশপাতি, মাল্টা কোনো ফলই আমের চেয়ে গুণে, মানে বেশি নয়। সরকার চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও আমকে শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। তাই বলা যায় যে, আম উৎপাদন ও শিল্পায়নে সরকারি উদ্যোগ অতীব জরুরি।


জ্বালানি সংকট : শুধু উত্তরবঙ্গে দুই কোটি লোক কাঠের জ্বালানি ব্যবহার করে থাকেন। যার মধ্যে আম গাছ অন্যতম। তাছাড়াও ইট ভাটা, আসবাবপত্র তৈরিতে আম গাছের যথেচ্ছ ব্যবহার আম গাছের সংখ্যা ও উৎপাদনের জন্য হুমকিস্বরূপ।


ক. বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আম শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা : আম ও কর্মসংস্থান
আম ফলের রাজা। একটি উৎকৃষ্ট সুস্বাদু ফল হিসেবে আমের বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রায় সব কটি জেলাতেই কমবেশি আম উৎপাদন হয়। সারা দেশে উল্লিখিত পরিমাণ আম উৎপন্ন হয় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার একর জমিতে। সুতরাং এত বিপুল পরিমাণ জমিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনশক্তি সম্পৃক্ত থাকে। বাগান চাষ ও পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক ছাড়াও শুধু ফলনের মৌসুমেই অর্থাৎ বছরের প্রায় ৪/৫ মাস প্রচুর লোক সারা দেশে আম সংক্রান্ত কর্মকা-ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে। নিম্নোক্তভাবে এক্ষেত্রে জনশক্তির কর্মসংস্থান হতে পারে।
১. আম চাষ ও পরিচর্যার মাধ্যমে
২. সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে
৩. আম ও আমজাত দ্রব্যাদি পরিবহনের মাধ্যমে
৪. আম ও আমজাত দ্রব্যাদি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে
৫. আম শিল্প

 

১. আম চাষ ও পরিচর্যার মাধ্যমে
ভালো ফলনের জন্য আম গাছে পরিকল্পনা- মাফিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। আমের মুকুল আসা থেকে শুরু করে পূর্ণতা অর্থাৎ আম গাছের সঠিক পরিচর্যা ঠিকমতো না হলে ফলনের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না। মুকুল আসার আগে ও পরে সার প্রয়োগ, সেচ এবং ‘স্মার্জিং স্প্রে’ আমের ফলনের জন্য নার্সারি পরিচর্যা হিসেবে পরিগণিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় প্রতি বছর কমপক্ষে ৪/৫ মাস আম বাগান পরিচর্যার জন্য প্রতি তিন একর আয়তন বিশিষ্ট আম বাগানে ৫ জন শ্রমিক কর্মরত থাকেন। সেই হিসাবে বর্তমানে দেশে ১,২০,০০০ একর জমিতে ৪/৫ মাসের জন্য ১.৬ লাখ থেকে ২ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আম চাষের ক্ষেত্রেই কেবল এটি ঘটে থাকে।

 

২. সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে
আম শিল্পে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য বিপুল লোক কর্মরত আছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আম বাগানগুলোতে প্রতি দশ একর জমিতে আমের পূর্ণতা প্রাপ্তির পর অর্থাৎ পাকার সময় গড়ে ৬/৭ জন লোক একমাস শ্রম দিয়ে থাকেন। এই হিসাবে প্রতিবছর ৭২-৮৪ হাজার লোকের এক মাসের কর্মসংস্থান হয়। সংরক্ষণের জন্য আমের হিমাগার নির্মাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলে আলুর হিমাগারের মতো অনেক লোকের কর্মসংস্থান ঘটবে।

 

৩. আম ও আমজাত দ্রব্যাদি পরিবহনের মাধ্যমে
সত্যিকার অর্থে, যে কোনো কাঁচামালের উপযুক্ত দাম এবং উপযোগ পেতে হলে পরিবহনের বিষয়টি সর্বাগ্রে গুরুত্বের দাবি রাখে। আম ফলের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না। সুতরাং কিছুসংখ্যক লোককে পরিবহনের কাজে সবসময়ই ব্যস্ত থাকতে হয়। আম উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে সারা দেশে তা বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে পরিবহন করতে হয়। যেমন- সড়ক পথে ট্রাক, রেল, ভ্যান গাড়ি, গরুর গাড়ি, ঘোড়া গাড়ি ইত্যাদি। পানি পথে নৌকা, স্টিমার, ফেরি, লঞ্চ ইত্যাদি এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিমান। এসব মাধ্যমে পরিবহনের জন্য উল্লেখযোগ্য জনশক্তি কর্মরত থাকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে আমের মৌসুমে (জুন-জুলাই) দুই মাস প্রতিদিন শত শত ট্রাকে হাজার হাজার টন আম রপ্তানি করা হয়ে থাকে। এভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে যে পরিমাণ আম পরিবাহিত হয়, তাতে সব মিলিয়ে সারাদেশে শুধু পরিবহনের জন্য কয়েক হাজার লোককে লাগাতার শ্রম দিতে হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, ক্ষুদ্র পরিসরেও আমজাত পণ্য পরিবহনে কিছু লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

 

৪. আম ও আমজাত পণ্য বাজারজাতকরণের মাধ্যমে
মৌসুমি ফল হিসেবে আমাদের দেশে যে পরিমাণ আম উৎপাদিত হয়, তা বাজারজাতকরণে যে পরিমাণ লোকের কর্মসংস্থান হয় সেটা নেহায়েত কম নয়। তবে বছরের সীমিত সময় দুই থেকে আড়াই মাস আমের বিপণন প্রক্রিয়া চলে বলে এতে খুব বেশি সংখ্যক জনশক্তি কমংসংস্থানের সুযোগ থাকে না। এক্ষেত্রে আমের প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে যদি সঠিকভাবে উচ্চমানের বাজারজাত করা সম্ভব হয় তাহলে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে।

 

৫. আম শিল্প
আম কৃষি পণ্য হলেও একে শিল্প পণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে তথা আম শিল্প গড়ে তোলার জন্য যেসব উপকরণের দরকার, তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হলো উদ্যোগের। প্রাণ কোম্পানির মতো আমজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে বিপুল সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান ঘটবে এই শিল্পে- তাতে সন্দেহ নেই।

 

খ. অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমের অবদান
অর্থনৈতিক দিক থেকে আমের অবদান কোনো অংশে কম নয়, আন্তর্জাতিক মানের এই ফলটি শুধু পুষ্টি ও স্বাদের জন্যই বিখ্যাত নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতোমধ্যে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ফিলিপাইন ও ভারতে। ফিলিপাইন ‘স্পার্জিং’ পদ্ধতিতে বছরের অধিকাংশ সময় আম উৎপাদন করে এবং নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে থাকে। ভারতও একইভাবে আমি রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের অবস্থা উল্টো। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত আমরা আমকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। আম ও আমজাত সামগ্রী বিভিন্নভাবে বাণিজ্যিক পণ্য হতে পারে।


১. রপ্তানি পণ্য হিসেবে আম বিদেশে রপ্তানি করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
 

২. আমকে প্রক্রিয়াজাত করে শিল্প পণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে বড় ধরনের বাজার সৃষ্টি করা যায়। দেশে-বিদেশে এসব পণ্যের চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে পারলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।
 

৩. আম গাছের কাঠ বড় ধরনের অর্থকরী সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। জ্বালানির ওপর উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি লোক নির্ভরশীল, বর্তমানে আম কাঠের জ্বালানি বিপুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সাথে সাথে দেশের জনগোষ্ঠীর আসবাবপত্রের চাহিদা পূরণে আম কাঠ বিরাট ভূমিকা রাখছে।
 

৪. আম অধিকাংশ ফলের চেয়ে অধিক মূল্যবান। প্রতিষ্ঠিত আম বাগান এক ধরনের স্থাবর  সম্পত্তির মতো। এ সম্পত্তি থেকে বছরে নিয়মিত আয় হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এক একর আম গাছ থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে এক লাখ টাকা উপার্জন করা সম্ভব। ফলের  রাজা ‘আম’ এবং আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবার প্রিয় ফল ‘আম’ এর অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে অন্যান্য শিল্পের মতো অগ্রাধিকার প্রদান করে সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে আম শিল্পের বিকাশে এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই শিল্পে নানাবিধ সমস্যা ও সম্ভাবনাকে গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
 

মো. আবদুল মানিক*

* ব্যবস্থাপক, সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বারপুর, ডাক ও জেলা-বগুড়া

বিস্তারিত
অপার সম্ভাবনার প্রতিশ্রুত দিগন্ত আমাদের হাওর

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। আবার ভাটির দেশও বালাদেশ। আমাদের দিগন্ত বিস্তৃত খণ্ড খণ্ড হাওরগুলো তাদের চৌহর্দি মিলে আমাদের ভাটির বাংলা বা ভাটি অঞ্চল গঠন করেছে। হাওর শব্দটির উৎপত্তিও সাগর থেকে সায়র; আর সায়র অপভ্রংশ হয়ে হাওর হয়েছে বলে ভাষা বিজ্ঞানীদের মতো। হাওরের আছে ব্যাঞ্জরিত নাম। টাঙুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, শনির হাওর, টগার হাওর, মাটিয়ান হাওর, দেখার হাওর, হালির হাওর, সানুয়াডাকুয়া হাওর, শৈলচকরা হাওর, বড় হাওর, হৈমান হাওর, কড়চা হাওর, ধলা পাকনা হাওর, আঙ্গরখালি হাওর, নখলা হাওর, চন্দ্রসোনার থাল হাওর, ডিঙ্গাপুতা হাওর আরও কত নাম। ছোট ছোট নদী খাল নালা ডোবা আর বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে সীমাহীন বিল মিলিয়ে এ হাওরাঞ্চল ভাটির বাংলাকে যেন পরম মমতায় অপরূপ রূপে সাজিয়েছে এ বাংলার রূপকে মাতিয়েছে প্রকৃতিকে। হাওরের অপরূপ প্রাকৃতিক শোভা ঋতুতে ঋতুতে পরিবর্তন হয় ভিন্ন অবয়বে। বর্ষায় দিগন্ত জোড়া অথৈ জল উদ্দাম ঢেউয়ের অবিরাম মাতামাতি আর মন উদাসি মাতাল করা হাওয়া পর্যটকদের মন উদাস করে দেয় অহরহ। বর্ষার জলকেলি যিনি জীবনে একবার দেখেছেন তিনি বারবার ফিরে যাবেন হাওরের টানে। বর্ষায় যৌবনবতী হাওর সাগরের মতো অনন্ত অসীম জলাধারে একাকার। দূরের আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমানোর মনোরম দৃশ্য হৃদয়কাড়া সৌন্দর্য বলে শেষ করার মতো নয়। হাওরে নৌকা ভ্রমণে চাঁদনি রাতের স্মৃতি জীবনে একবার গেঁথে নিলে আমৃত্যু তার তৃষ্ণা থেকে যাবে।


আর পাহাড়ের জলের তলে ভাটি বাংলার স্বর্ণগর্ভা সোনালি ফসলের দিগন্তজোড়া মাঠ ভেসে উঠে সুদিন শীতের প্রাক্কালে। বাংলার ষড়ঋতুর ঋতু বৈচিত্র্য আর বৈশিষ্ট্য, লীলাখেলা এত সুন্দর ও প্রাণ জুড়ানো মাধকতা হাওর ব্যতীরেকে দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। হাওর হচ্ছে ঋতু বৈচিত্র্যের চারণভূমি, লীলা নিকেতন। বাংলার আদি ও আসল রূপ অপরূপ হয়ে একমাত্র হাওরেই দেখা সম্ভব। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর, লোক সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের লালন, পালন, ধারণ ও বাহন করছে হাওর এলাকা। হাওরের দুটি রূপ। শুকনো মৌসুমের শীতকালে এবং বর্ষায় একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরিত রূপ ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করে জলে থৈ থৈ করা সীমাহীন জলাধারের হাওর হয়েছে রূপের রানী। হাওরের এ রূপ সাগরে অবগাহনের অপার সম্ভাবনা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে বারবার, এসো জলপুরীতে।


পৃথিবীর তাবৎ সুস্থ ও সুন্দর বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে পানিকে কেন্দ্র করে, পানির কিনারে কিংবা পানির মাঝে। পানিভিত্তিক আলো আঁধারের অপরূপ সৌন্দর্য আমাদের কল্পনা বিলাশে নিয়ে যায় আলতো করে। পানি আর পানি। আর সে পানি যদি হয় মিঠা পানি, তবে তো সোনায় সোহাগা। হাওর হচ্ছে মিঠা পানির প্রকৃতি প্রদত্ত এক অপার মহিমা উৎস ও অবারিত জলভাণ্ডার। পুরো পৃথিবীর মাঝে মিঠা পানির এত বড় একক ওয়াটার বডি আর দ্বিতীয়টি আছে কিনা জানা নেই। বর্ষার ৭ মাসে এর আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার বর্গমাইলের ওপরে। কোন কুল নাই কিনার নাই এমন অবস্থা। চারদিকে পানি শুধু অথৈ পানি কেবল থৈ থৈ করে। প্রায় ২ কোটি লোক এখানে বসবাস করে। হাওর হচ্ছে সাগরেরই অপর প্রতিরূপ। সাগরের সব রূপ বৈশিষ্ট্য হওরে রয়েছে শুধু সাগরের গহিন গভীরতা নেই।


দেশের পূর্ব-উত্তরাংশের কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, মৌলভীবাজার হবিগঞ্জ ও ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার ৫৭টি উপজেলা নিয়ে ভাটির বাংলার হাওর এলাকা গঠিত। হাওর হচ্ছে একটা বিশাল চ্যাপ্টা বাটির মতো, বেসিন বিশেষ, যাতে বর্ষায় পানি জমে সাগরের রূপ ধারণ করে। আর শুকনো মৌসুমে দিগন্ত জোড়া নয়নাভিরাম মাঠে সবুজ শ্যামলের সমারোহ। সবুজ ধান ক্ষেতের বুক চিড়ে বহমান সর্পিল মেঠো পথ বা  ডুবা সড়ক কিংবা কৃষকের ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ কার্যক্রম দেখার আকর্ষণ যে কাউকেই ঘুরে বেড়ানোর নেশায় মাতোয়ারা করবে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। সাগরের মতো বিশাল ও বড় বড় হাওরের মাঝে রয়েছে কচুরিপানার মতো ভাসমান দ্বীপ-গ্রাম। কাকের চোখের ন্যায় কালো ও স্বচ্ছ জলরাশির মাঝে  দ্বীপের মতো এক একটি গ্রামের প্রতিবিম্ব সেরা আঁকিয়ের সেরা ছবি হয়ে ভেসে উঠবে আমাদের মনোজগতে। দূরে বহু দূরে বিরাগী দুপুরে কিংবা নিশুতি রাতে পানিতে কুপি বাতির নিবু নিবু আলোর নাচন অথবা জোনাকি পোকার মতো সৌরবিদ্যুতের আলোর ছটা মনটাকে বিমোহিত করবে ছাত করে আলোর বর্তিকা জ্বালিয়ে আমাদের মনের আঁধারী দুয়ারকে আলোকিত করে। মন পবনের নাও কিংবা সাধের ডিঙি নাওয়ে চড়ে নিরবে স্রোতের অনুকূলে ভেসে ঘুরে বেড়াতে মন চাইবে। যদিও এত প্রাণ রসের মধ্যে হাওরের গ্রামীণ জীবনের কষ্ট জাগানিয়া সামান্য সময়ের জন্য হলেও আমাদের স্থবির করে দেয় ক্ষণিকের জন্য। এ স্থবিরতা বড়ই কষ্টের। প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল কষ্ট সহিষ্ণু হাওরবাসীর জীবন যাত্রা থেকেও জানা যায় অনেক অজানা কাহিনীর কাব্যগাঁথা গল্পগাঁথা যা আমাদের অনন্য সুন্দরকে আরও মহিমান্বিত করে।


প্রায় ৮ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের হাওর এলাকায় প্রায় ২০ মিলিয়ন লোক বসবাস করে। ভাটির বাংলায় রয়েছে মোট ৩৭৩টি হাওর। চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ০.৭৩ মিলিয়ন হেক্টর, বছরে ধান উৎপাদ হয় ৫.২৩ মিলিয়ন টন যা আমাদের শস্য ভাণ্ডারকেই টইটুম্বুর করে না বরং আমাদের মোট খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করছে পুষ্টিসম্মত করছে। হাওরে শস্য নিবিড়তা বা Crop intensity হচ্ছে ১৪৭%। জিডিপিতে হাওরের অবদান ০৩% এর ২৫% আসে কৃষি থেকে। হাওরে ৩% লোক ভূমিহীন (জাতীয় ১৪%)। ৮১% অকৃষিজীবীর কোনো কৃষি জমি নাই। হাওরে বছরে কৃষি জমি কমছে ০.৩৩% হারে। জাতীয়ভাবে যা ৭৪%। হাওর এলাকায় ৩৪% পরিবার প্রান্তিক কৃষক, ৫% পরিবার জাতীয় পর্যায়ের অনেক নিচে এবং  ৫১% পরিবার ছোট কৃষক (জাতীয় ৪৯.৫%)। ২৮% লোক অতি দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে।


হাওর আমাদের শস্যভাণ্ডার ও মৎস্যভাণ্ডার। হাওরের বিশাল জলরাশির মাতমে মাছের অবাধ প্রজনন বেড়ে উঠা, মৎস্য ঝিলিক এবং মাছভিত্তিক আমিষের অসীম জোগান নিশ্চিত মনে করিয়ে দেয় হাওর সাক্ষাৎ আমাদের মাতৃরূপী লক্ষ্মীদেবী মৎস্যদেবী। হাওরের মাছের খনি থেকে মণিকাঞ্চন আন মানি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মহামূল্যবান ভাণ্ডারের মূর্ত প্রতীক রূপে। বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের মাছ পাওয়া যায়। এসব মাছের মধ্যে আছে শিং, মাগুর, কৈ, পুঁটি, সরপুঁটি, তিতপুঁটি, খৈলসা, বাঁশপাতা, তাপসি, আইড়, বোয়াল, পাবদা, টেংরা, বাইম, চিতল, ফলি, ভেদা, গজার, শোল, মহাশোল, টাকি, চাপিলা, কাকিলা, রুই, কাতল, মৃগেল, কালো বাউশসহ ১৫০ রকমের বাহারি মাছের নিবিড়ভাণ্ডার। মাছ আর নবান্নের ধান কাটার উৎসব আগামী পুরো বছরের খোরাকি যোগানের মহাউৎসব দেখলে আনন্দাশ্রুতে চোখ ভিজে গাল বেয়ে টপ টপ করে গা শরীর ভিজে যায়। বছরের ৫ থেকে ৬ মাস আবাদি ফসল আবার ৬ থেকে ৭ মাস পানি থেকে রূপালি মাছ, হাঁসের মাংস আর ডিম আমাদের জাতীয় সমন্বিত পুষ্টি জোগানকে সচল রেখেছে হাওর। আমিষের ভাণ্ডার আরও শানিত করছে দিনের পর দিন। অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং নানা কারণে সোনালি ফসল নষ্ট হয়। বছরের একমাত্র ফসলের ওপর ভর করেই চলে হাওরবাসীর পুরো বছর। হাওরের ৯০ ভাগ মানুষ কৃষি কাজ করে ৫ ভাগ মৎস্য চাষি আর ৫ ভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরি অন্যান্য কাজে নিয়োজিত। হাওরের জলাবদ্ধ ভূমিকে জারুল হিজল তমাল করচের সাথে জন্মে নলখাগড়া, ইকরা, জিংলা, বাঁশ ও প্রচুর বন সম্পদ।


ভরা বর্ষা হচ্ছে হাওরের যৌবনকাল একই সাথে নিদানকাল। চারদিকে পানি, শুধু পানি, থৈ থৈ করছে। টলমল, উচ্ছ্বাস জলে জলকেলি খেলে প্রকৃতি, পানির মধ্যে দাপাদাপি বড়ই আনন্দের। সমুদ্রের সাথে হাওরের পার্থক্য হচ্ছে সমুদ্রের গভীরে সাঁতার কাটা, ডুব দেয়া, মাছ ধরা বা ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ খুব কম পাওয়া যায়। কিন্তু হাওরে এ সুযোগ অবারিত। ডুব সাঁতার দিয়ে কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলে পাতিহাঁসের সাথে পাল্লা দেয়ার কথা কি ভোলা যায়? একবার যারা হাওরের এ জলে অবগাহন করেছেন, বার বার তারা ফিরে আসে যেন কিসের এক অজানা আকর্ষণে। এখন আর রঙবেরঙের পালতোলা সারি সারি নৌকা হয়তো হাওরে আর দেখা যাবে না। কিন্তু সাদা কালো ধোঁয়া তুলে ভটভট শব্দ করে পানি ছিটিয়ে, হাওরের বুক চিড়ে ইঞ্জিন চালিত কঠিন শক্তিরপশরা দিয়ে গয়নানৌকার বা বেপারি নৌকার চলাচল নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। বিয়ের বা বরযাত্রার নৌকা কলাগাছ আর রঙিন কাগজে সাজানো, সানাই বা  বাদ্যযন্ত্র, মাইকের উচ্চ শব্দে, রাতে তা জেনারেটরের সাহায্যে আলোক সজ্জায় সজ্জ্বিত চলমান আলোর নাচন বলেই মনে  হবে। কচুরিপানা বা রাজহাঁস দলের ভেসে বেড়ানো অথবা প্রচণ্ড বড় ঢেউ এর বিপরীতে আনন্দময়ীর যুদ্ধ করে ভিজে একাকার হয়ে হাতে প্রাণ নিয়ে ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে আগুয়ান হওয়া তাদের সংগ্রামী জীবনের কথাই মনে করে দেবে।


জেলেদের টঙ বানিয়ে বান্দইরা জালসহ বিভিন্ন প্রকার জাল, বড়শি বা ডুব দিয়ে অথবা অমাবশ্যার রাতে হ্যাজাক লাইট কিংবা লণ্ঠনের আলোতে রাতভর কুঁচ-টোটা ডালা শিকারে মাছ ধরা বড় আনন্দের। কোথাও কোথাও জলিধান বা জলজ ঘাসে মাছের ঠোকরানোর ফলে নারার নাড়াচারা দেখে মাছের অবস্থান বুঝে কুঁচ দিয়ে নিরাগ মারার সুযোগও পেতে পারেন। হাওরের খোলা আকাশ, নির্মল মুক্ত বাতাস আপনাকে প্রশান্তি এনে দেবে। পলো দিয়ে মাছ ধরার মজাই আলাদা। লাফানো তাজা ফ্রেশ মাছ ভেজে খেতে পারেন। বিভিন্ন রকম নকশি আঁকা পিঠাপুলির জন্যও হাওর বিখ্যাত। বিখ্যাত নকশিকাঁথা ও কুটির শিল্পের বিকাশও সম্ভব। প্রাচীন গ্রন্থে পূর্ববঙ্গকে উড়াল পঙ্খির দ্যাশ বলে অভিহিত করা হতো। হাওর এলাকাকে উড়াল পঙ্খির দ্যাশ নামেও ডাকা হয়। পুঁটি মাছে ঠোকর দেবার আশায় এক টেঙ্গে দাঁড়ানো ধ্যান মগ্ন ঋষি বক, গাঙ চিলের মাছ নিয়ে কাড়াকাড়ি, পান কৌড়ির ডুব, চিলের ছোঁ মারা, বিচিত্র রঙের, বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কিচির মিচির, ডানা জাপ্টার কানফাটা শব্দ শুধু হাওরেই শোনা সম্ভব। সুদূর সাইবেরিয়ার প্রচণ্ড শীত হতে বাঁচতে, প্রজন্ম প্রসারিত করতে, ডিমে তা দিতে বা একটু উম তাপ নেয়ার আশায় উড়াল পঙ্খি অতিথি পাখিরা ছুটে আসে হাওরের প্রকৃতির অবারিত গীতবিতানে। মেঘমুক্ত নীলাকাশে, সাঁঝ বেলায়, মুক্তার মালার মতো দল বেঁধে জঙ্গলি পাখির উড়াউড়ি কেবল উড়াল পঙ্খির দ্যাশ নামে পরিচিত হাওরেই সম্ভব।


হাওরের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত  নৌকা বাইচের তলাতে বিভিন্ন আকার, আকৃতির, রঙের ‘দৌড়র নাও’ এ মাঝি মাল্লা সোয়ারিরা রঙ বেরঙের পোশাক পরে, ড্যামি বাঘ, ভাল্লুক, হাতি ঘোড়া, মুখে সারিগান ‘লাশারিক’ আল্লাহ বলে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতো। হাওরে পর্যটনকে কেন্দ্র করে এ ঐতিহ্যকে পুনঃজীবিত করার সুযোগ রয়েছে এখনও। আমাদের পার্বত্য এলাকা ও বিশ্বের অনেক স্থানে পেশাদার দল দিয়ে পর্যটকদের সামনে নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করে। ময়মনসিংহ গীতিকার চারণভূমি হচ্ছে হাওর এলাকা। হাওরের আলো বাতাস, জলীয় পরিবেশ বর্ষার অফুরন্ত অলস সময় এবং বৈচিত্র্যের প্রাণান্তর মানসিকতা হয়তো মানুষকে ভাবুক করে সৃষ্টি করেছে অনেক জগত বিখ্যাত মনীষিদের। ভাটি-বাংলার বীর হিসাবে খ্যাত বীর ঈশা খাঁর মতো স্বাধীন চেতা মানুষ বা বর্তমান যুগসাধক শাহ আবদুল করিম, হাছন রাজার মতো মনীষীদের জন্ম এ হাওর ভাটি এলাকায়। হাওর কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে এগুলোকে লালন, পালন থারণ করে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা নিলে কতই না ভালো হতো। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য উপজাতি কালচারাল একাডেমি হলেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ২ কোটি হাওরবাসীর জীবন, কৃষ্টি, কালচার ও ঐতিহ্য রক্ষায়  আবশ্যকীয়ভাবে কালচারাল একাডেমিসহ আরও সংশ্লিষ্ট কিছু হওয়া সময়ের দাবি। ড. দীনেশ সেন বা আর আমাদের প্রিয় লেখক ড. হুমায়ূন আহমেদ হাওরের কালচারাল খনি হতে কিছু মনি আহরণের চেষ্ঠা করেছিলেন। এতেই বিশ্ববাসী বিস্মিত, চমকিত এবং মাতোয়ারা। কিন্তু এর বিশাল ভাণ্ডার এখনও অনাহরিত রয়েছে অনেক কিছু। সংরক্ষণ না করলে, বর্তমান পরিস্থিতিতে না চর্চায় কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। পর্যটন বিনোদনের অন্যতম উপাদান হতে পারে এরা এদের সংস্কৃতি ও সুন্দরের আবাহন। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে হাওরের দিকে নজর ও গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে আসা দরকার জরুরিভাবে।


পানির মাঝে আকণ্ঠ নিমজ্জিত জারুল হিজল তমাল, জলজ বৃক্ষবাগ এবং জল পাখির উড়াউড়ি, আর মাছ নিয়ে কাড়াকাড়ি অবাক করে দেয় পর্যকদের। বর্ষায় পানির মধ্যে পূর্ণিমা রাতে চাঁদের ঝিকিমিকি আলোর নাচন, পানি ও চাঁদের মিতালি, চাঁদের টানে পানি ফুলে ফেঁপে উঠা আপনার মনের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলবে নিঃসন্দেহে। ভাবুক হয়ে গেয়ে উঠবেন, মন মাঝি তোর বৈঠানেরে, আমি আর বাইতে পারলাম না। বর্ষায় পানির চান কপাইল্ল্যা ঢেউ, আর শীতে সবুজ ধান ক্ষেতে বাতাসের ঢেউ ঢেউ খেলা বড়ই মনোমুগ্ধকর। চাঁদনী রাতে পালাগান, বাউলগান, ভাটিয়ালি, জারিগান, সারিগান, ঘাটুগান, যাত্রা দলের আসর, কীর্তন, লাঠি খেলা বা কিচ্ছার আসর, বাউলের বাহাস এক সময় ছিল বেকার অলস বর্ষায় হাওরে নিত্য নৈমিত্তিক আবশ্যকীয় ঘটনা। পানসি নৌকা হয়ত এখন আর পাওয়া যাবে না কিন্তু বড় বড় গয়না নাও, ট্রলার, লঞ্চ বা স্টিমার জলযানে ভরা বর্ষায় পূর্ণিমার রাতে পরিকল্পিত নৌভ্রমণ রোমাঞ্চকর ঘটনা হবে। এত হরেক রকমের আয়োজন থাকবে।


দ্বিমুখীরা বলে থাকেন, আমাদের বিপরিতমুখী রাজনীতিবিদদের ভরা বর্ষায় পূর্ণিমার রাতে হাওরে ভাসমান জলযান সোনার তরীর খোলা ছাদে ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দেখবেন, তাদের মাঝে ‘ভাব’ হয়ে গেছে। শূন্য এ বুকে চারদিকে শব্দ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতো। হাওর পুত্র ড. নিয়াজ পাশার ভাষায়... স্বপ্ন দেখছি, হাওরে সোনার তরী, স্বপ্নডিঙা, ভ্রমণ হবে বৈচিত্র্যপূর্ণ, চিত্তাকর্ষক, মনোমুগ্ধ ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় ভরপুর। নোঙর করবে এ স্বপ্নডিঙা, সমুদ্রের টিপ, সিংহল দ্বীপসম হাওরের কৃত্রিম ও পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সৃষ্ট  জলপুরীতে। পানিকে কেন্দ্র করে একে জলপুরী হিসেবে গড়ে বিনোদনের সব উপকরণ ও অবকাঠামো দিয়ে সাজানো হবে। জলপুরীর পাশে পাখি ও মাছের জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করে এগুলোর জীবন্ত চিড়িয়াখানায় রূপান্তর করা যায়। পর্যটকরা মন ভরে উপভোগ করবেন এর সৌন্দর্য, লীলা খেলা ও বিচরণ-আচরণ। পর্যটন বিনোদনের এত রসদ, রস, যশ, উপকরণ এক জায়গায় একত্রে একগুচ্ছে সহজে হাওর ছাড়া কি পাওয়া সম্ভব বাংলার কোথায়ও...?


সমুদ্রসম হাওরের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে গ্রাম বা উঁচু ভিটা সৃজন করে এ পুকুরে জলাশয়ে সারা বছর জল ও স্থলের বিভিন্ন স্তরে মাছ, হাঁস, মুক্তা, পাখি ও ফল-ফলাদি চাষের মাধ্যমে নতুন দিগন্তের নবযুগের শুভসূচনা হতে পারে অনায়াসে। হোটেল, মোটেল, আবাসিক জলযানসহ পর্যটনকে সামনে রেখে একে বিভিন্নভাবে সাজানো হবে। হাওর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক যুগোপযোগী করতে হবে। নৌভ্রমণ শেষে সপ্তডিঙা, স্বপ্নডিঙা, সোনারতরী, জলপুরী বিনোদন স্পটে নোঙর করবে। জমির সহজলভ্যতা, পলিউর্বর সোনারমাটি আর অবারিত মুক্ত পরিবেশের জন্য লোকজন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে হাওরে বসতি গড়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানে হাওর হতে অভিবাসনের উল্টো স্রোতকে এর মাধ্যমে রুখে দেয়া সম্ভব হবে।


ঢাকার বড় বড় হাউজিং এবং এন্টারটেইনন্টম্যান্ট সোসাইটিগুলো হাওরে সমন্বিত গ্রাম- জলপুরী নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। নিঃসন্দেহে এটি হবে একটা লাভজনক আনন্দআশ্রম যা সুখ ও সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে যা প্রকৃত বিনিয়োগ হিসাকে বহুগুণে সমৃদ্ধ হয়ে ফিরে আসবে। হাওরে এখনও কালের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধরে থাকা ঐতিহাসিক স্থাপনা ও অবকাঠামোগুলোকে নতুন সাজে সজ্জিত করে আকর্ষণীয় করে তোলা যেতে পারে। পর্যটন শিল্পের অপার সুযোগও এতে সৃষ্টি হবে।


পরিকল্পিতভাবে কম জীবনকাল উফশী ধানের চাষ, ভাসমান শাকসবজি আবাদ, নিয়ন্ত্রিতভাবে সেচ ব্যবস্থাপনা, মাছের অভয়আশ্রম গড়ে তোলা, জেলেদের আকাল সময়ে সাবসিডি প্রদান, পুরো হাওরকে পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তোলার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেয়া, পরিকল্পিতভাবে হাঁস চাষ আমাদের অনেক দূরের বাতিঘরে নিয়ে যাবে। শুকনা আর ভেজা বর্ষার হাওর অঞ্চলের অমিত সম্ভাবনাকে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগাতে পরিকল্পিত বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে খুলে যাবে অপার সম্ভাবনার দখিনা দুয়ার যেমন হাওরের উদ্দাম ঢেউয়ের মতো ফুলে ফেঁপে উঠবে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্রোতের আর পুষ্টিসমৃদ্ধ হবে বাংলার মানুষ বাংলার সোঁদা মাটির জমিন।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*

* উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা

বিস্তারিত
কৃষি তথ্য ও পরামর্শ সেবায় কৃষকের জানালা

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। সে অর্জনের সুফল যেন দেশের সকল কৃষক সমানভাবে পায় এবং তথ্যপ্রযুক্তির পাখায় ভর করে কৃষকদের জন্য দরকারি নানা তথ্য ও পরামর্শ যেন সহজেই কৃষকের কাছে পৌঁছতে পারে সে জন্য কৃষিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে অনেক আগেই। এ ক্ষেত্রে হাতের ছোঁয়ায় তথ্য সেবা, ই-বুক, কৃষি ডাক্তার, কৃষি কল সেন্টার, রাইস নলেজ ব্যাংক এবং কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ও ওয়েবসাইটের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগের ফলে কৃষি প্রযুক্তি সংক্রান্ত জ্ঞান ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি তথ্য ও পরামর্শ সেবায় গতিশীলতা এসেছে। এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ সে গতিশীলতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এরকম একটি উদ্যোগ হলো ‘কৃষকের জানালা’। কৃষকদের ফসলের নানা সমস্যার তথ্য ভাণ্ডার।


কৃষকের জানালা কী?
কৃষকের জানালা হলো কৃষকদের ফসলের বিভিন্ন সমস্যার (রোগ, পোকামাকড়, সারের ঘাটতিজনিত সমস্যা ইত্যাদি) একাধিক চিত্র ফসলভিত্তিক যৌক্তিকভাবে সাজিয়ে এবং তার সাথে সমস্যার সমাধান যুক্তকরে তৈরি করা একটি তথ্য ভাণ্ডার। এটি ভেক্সটর কম্পিউটার, ল্যাপটব, স্মার্টফোন ও অন্যান্য কম্পিউটার ডিভাইসে সহজেই ব্যবহার করা যায়। এখানে ব্যবহারকারী ছবি দেখে ফসলের যে কোনো সমস্যাকে সহজেই চিহ্নিত করতে পারেন এবং চিহ্নিত ছবিতে ক্লিক করলেই সমস্যার সমাধান দৃশ্যমান হয়। এক কথায়-কৃষকদের ফসলের মাঠকেই তুলে আনা হয়েছে কৃষকের জানালায়।


কৃষকের  জানালা কেন?
কৃষকের জানালা কৃষি তথ্য ও পরামর্শ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি নতুন সংযোজন। কৃষি সম্প্রসারণ সেবা প্রদানকারী সর্ববৃহৎ সরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নাগরিক সেবা সনদের বার (১২) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অতি দ্রুততার সাথে কার্যকরভাবে কৃষি বিষয়ক সকল তথ্য ও প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে দেশে ই-কৃষি সেবা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। কৃষকের জানালা এটি নিশ্চিত করার জন্য একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ। কৃষকের জানালা আসলে কৃষককে সেবা প্রদানের জন্য সম্প্রসারণ কর্মীকে তৈরি রাখে। এটি সেবা গ্রহীতা ও সেবা প্রদানকারী উভয়ের জন্যই সহায়ক। যা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে খরচ, সময় ও কৃষকের বার বার আসা-যাওয়াকে কমাতে সহায়তা করে এবং সেবার মান বৃদ্ধি করে।


কৃষকের জানালার সুবিধা
১. যে কোনো ফ্লাস ড্রাইকে সহজেই বহন করা যায়।
২. ইন্টারন্টে সংযোগের প্রয়োজন নেই।
৩. যে কোনো কম্পিউটার ডিভাইসে চলে।
৪. অ্যানড্রোয়েট মোবাইলেও চলে।
৫. অতিরিক্ত কোনো খরচ নেই।
৬. ব্যবহার করা সহজ।
৭. এটি ব্যবহার করার ফলে কৃষক ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীর মধ্যকার ‘কমিউনিকেশন  নয়েজ’ সর্বনিম্ন হয়।
৮. এটি পরিবেশবান্ধব
৯. অংশগ্রহণমূলক
১০. এটি ফসলের বালাইসংক্রান্ত তথ্যের একটি প্রমিত উৎস

 

কৃষকের জানালার ব্যবহারবিধি
১. কৃষকের জানালা ফোল্ডারটি আপনার কম্পিউটার/মোবাইলে কপি করুন।
২. এর ‘হোম’ ফাইলটি ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার/ এইচটিএমএল ভিউয়ার বা যে কোনো ব্রাউজার দ্বারা ওপেন করুন।
৩. মূল পাতায় প্রবেশ করুন এবং আপনার কাছে আগত কৃষককে তার ফসলের সমস্যার ছবিগুলো দেখান।
৪. কৃষকের চিহ্নিত ছবিতে ক্লিক করুন।
৫. সমাধানটি কৃষককে বুঝিয়ে দিন অথবা প্রিন্ট করে একটি কপি তাকে সরবরাহ করুন।
৬. ‘মূল পাতায় ফিরে চলুন’ ক্লিক করে হোম পেজে ফিরে আসুন।
৭. ব্রাউজারের উপরে বাম কোণে অবস্থিত ‘ফরওয়ার্ড’ ও ‘ব্যাক’ অ্যারোতে/ ‘আগের পাতায় ফিরে চলুন’ ক্লিক করেও আপনি সামনে পেছনে যেতে পারেন।
৮. সমস্যার কারিগরি দিক বুঝে উপযুক্ত সমাধান দেয়ার জন্য হোম পেজের ‘ব্যবহারবিধি’ অংশটুকু অবশ্যই ভালোভাবে পড়ে নিন।
৯. একইভাবে মোবাইলেও ‘কৃষকের জানালা’ ব্যবহার করা যায়।
১০. অপেশাদার ব্যবহারকারীরা ছবির সাথে সমস্যা সতর্কতার সাথে মিলিয়ে নিন।
১১. সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।


কৃষকের জানালার মাধ্যমে কৃষক যেখান থেকে সেবা পেতে পারেন।
    √ উপজেলা কৃষি অফিস
    √ কৃষক তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্র (ফিয়াক)
    √ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (তথ্য ও সেবা কেন্দ্র)
    √ উপসহকারী কৃষি অফিসার
    √ একজন অগ্রসর কৃষক নিজেও এটি  ব্যবহার করে তার ফসলের সমস্যার সমাধান পেতে পারেন।

 

পরিবেশবান্ধবতা ও জনস্বাস্থ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা
‘কৃষকের জানালা’য় ফসলের বালাইব্যবস্থাপনায় পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিসমূকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং কৃষকের আচরণগত পরিবর্তন যোগাযোগ বা ফারমার্স বিহ্যাভিয়রাল চেঞ্জ কমিউনিকেশন (এফবিসিসি) শিরোনামে এমন কিছু বার্তা কৃষককে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা পালন করলে ফসলে বালাই আক্রমণের ঘটনা কমে আসবে এবং রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহারও কমে আসবে। এছাড়া এতে সুনির্দিষ্ট বালাইনাশকের পরামর্শ দেয়া হয়েছে, যা এলোপাতাড়ি বালাইনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনবে। কৃষকের জানালা কৃষকের কাছে তাদের বিভিন্ন ফসলের সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কিত তথ্য সহজলভ্য করবে। এটি ফসল উৎপাদনে কৃষককে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে বলেও আশা করা যায়।

 

কৃষিবিদ মো. আবদুল মালেক*

* কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক, ডিজিটাল কমপ্লিশন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন অব প্লান্টস প্রবলেম আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম (ডিপিপিআইএস) প্রকল্প, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ

 

বিস্তারিত
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের ভূমিকা-১৪২২

(গত সংখ্যার পর)
তাছাড়া চিংড়ি চাষকে আরও লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব করার নিমিত্ত জলাশয় বা ঘেরের গভীরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চিংড়ির পিএল নার্সিং-এর মাধ্যমে ঘেরে জুভেনাইল মজুদের বিষয়ে চাষি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে ক্লাস্টার ফার্মিং পদ্ধতি প্রবর্তনের। বাংলাদেশে ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো হাওয়াই, আমেরিকা থেকে এসপিএফ বা রোগমুক্ত বাগদা চিংড়ি আমদানির মাধ্যমে চিংড়ির পিএল উৎপাদন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।  


৫. ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন : ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম কৌশল হচ্ছে জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম সুরক্ষা করা সম্ভব হলে সারা বছর ইলিশ প্রাপ্তি সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশের নিরাপদ প্রজননের জন্য প্রতি বছর আশ্বিন মাসের প্রথম উদিত চাঁদের পূর্ণিমার দিনসহ আগের তিন দিন ও পরের সাত দিন (মোট ১১ দিন) উপকূলীয় এলাকাসহ দেশব্যাপী ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, বিক্রয় ও মজুদ নিষিদ্ধ করে আইন সংশোধন করা হয়েছে।


২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৬টি জেলার ৮৮টি উপজেলায় ২,০৬,২২৯টি জাটকা জেলে পরিবারের মধ্যে পরিবার প্রতি মাসিক ৩০ কেজি হারে চার মাসের জন্য মোট প্রায় ২৪,৭৫০ টন খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়। তারই ক্রমধারায় আরও বর্ধিত কলেবরে ২০১৩-১৪ সনে জাটকা আহরণে বিরত জেলেদের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য জাটকা সমৃদ্ধ ১৫ জেলার ৮১টি উপজেলায় ২,২৪,১০২টি জাটকা জেলে পরিবারকে মাসিক ৪০ কেজি হারে ৪ মাসের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় মোট ৩৫,৮৫৬ টন চাল প্রদান করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বিগত ২০০৪-০৫ থেকে ২০০৭-০৮ সনে জেলেদের সহায়তা কর্মসূচিতে খাদ্যশস্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৬,৯০৬ টন। সেখানে ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত এ সরকারের বিগত ৬ বছরে এ সহায়তা দেয়া হয়েছে ১,২২,৯২৫ টন।


তাছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যক্রমের আওতায় ২০১৩-১৪ বছরে ১১৬৫ জনসহ বিগত পাঁচ বছরে সর্বমোট ২১,৯৫০ জন সুফলভোগীকে বিষয়ভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসা, হাঁস-মুরগি পালন, গরু-ছাগল পালন, ভ্যান-রিকশা চালানো, সেলাই মেশিন, ইলিশ ধরার জাল প্রদান, খাঁচায় মাছ চাষ ইত্যাদি আয় বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১০,৫৫৯ জন জাটকা জেলেকে এ সহায়তা প্রদান করা হবে। ইলিশ ও জাটকাবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম আরও বেগবান ও কার্যকর করার নিমিত্ত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক একটি অত্যাধুনিক জলযান ক্রয় করা হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ৩.৮৫ লাখ টন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ১৫ হাজার কোটি টাকার ওপর।


৬. মৎস্যজীবী-জেলেদের পরিচয়পত্র প্রদান : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উদ্যোগে সরকার প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করে নিবন্ধকরণ ও পরিচয়পত্র প্রদানের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। দেশব্যাপী প্রায় ২০ লাখ মৎস্যজীবী-জেলের মধ্যে ২০১৩-১৪ সনের মধ্যে সাড়ে আট লাখ মৎস্যজীবী-জেলেদের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। আশা করা যায়, ২০১৪-১৫ সনের মধ্যে প্রকল্পের আইডি কার্ড প্রদানের ইপ্সিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। এ কার্যক্রমের ফলে প্রকৃত জেলেদের জলমহাল ব্যবস্থাপনায় অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা প্রদান সহজতর হবে। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে (ঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি) জীবননাশ ঘটলে জেলে পরিবারকে এ প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হবে। তাছাড়া এ পরিচয়পত্র ইলিশ জেলেদের চিহ্নিতকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, যার ফলে চলমান ভিজিএফ ও বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যক্রম আরও ফলপ্রসূ হবে।


৭. মাছের আবাসস্থল উন্নয়ন : বিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুকুর-ডোবা, খাল-বিল, বরোপিট, হাওর-বাঁওড় ও নদী-নালা মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও অবাধ বিচরণের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ সব জলাশয় সংস্কার, পুনঃখনন ও খননের মাধ্যমে উন্নয়ন করে দেশীয় মাছের আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিগত ৫ বছরে ১০টি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর অবক্ষয়িত জলাশয় মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় খনন করা হয়েছে। এসব জলাশয় উন্নয়নের ফলে বার্ষিক গড়ে প্রায় ৩০০০ টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদিত হবে বলে আশা করা যায়। এছাড়া একটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গোপালগঞ্জ জেলাধীন মৎস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত মধুমতি বাঁওড়ের (দৈর্ঘ্য ৯.৩ কিমি.) আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিগত তিন বছরে এ বাঁওড়ে মোট প্রায় ৬.৭৮ হেক্টর মাটি খনন করা হয়। খননকৃত জলাশয়ে দরিদ্র সুফলভোগীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে সংশ্লিষ্ট সুফলভোগীদের আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া বর্নি বাঁওড়ের আবাস্থল উন্নয়নের লক্ষ্যে বিগত তিন বছরে প্রায় ১২৫ হেক্টর মাটি খনন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। উন্নয়নকৃত জলাশয়ে খাঁচায় মাছ চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। দেশব্যাপী অন্যান্য অবক্ষয়িত জলাশয়সহ ঐতিহ্যবাহী হুরা সাগর নদী পুনঃখননের মাধ্যমে মৎস্যচাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। উন্নয়নকৃত জলাশগুলোর সাথে সম্পৃক্ত সুফলভোগীর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার।


৮. সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা : বাংলাদেশে সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন মূলত আহরণ নির্ভর। উপকূলব্যাপী ৭১০ কিমি. দীর্ঘ তটরেখা থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত একান্ত অর্থনৈতিক এলাকায় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের বিশাল সুযোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদের ন্যায় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মৎস্যজীবীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মোট ৫২,৫১৪টি যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযানে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত প্রায় ২.৭০ লাখ মৎস্যজীবীর পরিবারের ন্যূনতম ১৩.৫০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে উপকূলীয় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের মাধ্যমে। মৎস্য আহরণে মোট ১৮৭টি ও চিংড়ি আহরণে মোট ৩৮টি ট্রলার অর্থাৎ সর্বমোট ২২৫টি বাণিজ্যিক ট্রলার বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে মৎস্যসম্পদ আহরণে নিয়োজিত রয়েছে।


সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারিত হওয়ায় ১,১১,৬৩১ বর্গ কিমি. এলাকায় মৎস্য আহরণে আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার ফলে নতুন নতুন মৎস্য আহরণক্ষেত্র চিহ্নিত করে তলদেশীয় ও ভাসমান মৎস্য আহরণের এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এ সম্পদ প্রত্যক্ষ জরিপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য ফিশিং গ্রাউন্ড চিহ্নিতকরণ, মৎস্যসম্পদের প্রজাতিভিত্তিক মজুদ নিরূপণ এবং সর্বোচ্চ সহনশীল মৎস্য আহরণমাত্রা নির্ণয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।


সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের উন্নয়নের লক্ষ্যে চলমান বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের মাধ্যমে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের মজুদ নির্ণয় করে সর্বোচ্চ সহনশীল আহরণমাত্রা নির্ধারণের নিমিত্ত পেলাজিক, ডিমারসেল এবং ল্যান্ডবেইজ্ড জরিপ পরিচালনা করার লক্ষ্যে একটি গবেষণা ও জরিপ জাহাজ ক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ওই প্রকল্প হতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পরিবীক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি কার্যক্রম জোরদারকরণের নিমিত্ত স্যাটেলাইট প্রযুক্তিনির্ভর Vessel Tracking and Monitoring System (VTMS) স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। তাছাড়া বর্তমান সরকারের সময়ে দেশের উপকূলীয় জেলেদের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী ও মাছ ধরার সরঞ্জামসহ মোট ১১৮টি Fiber Re-enforced Plastic (FRP) নৌকা বিতরণ করা হয়েছে। এসব আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নৌকার বিভিন্ন সুবিধা বিবেচনা করে পরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলীয় জেলেদের মধ্যে আরও অধিক সংখ্যায় নৌকা সরবরাহের বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। আইইউইউ (IUU- Illegal, Unreported and Unregulated) ফিশিংয়ের ক্ষেত্রেও মৎস্য অধিদপ্তর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে আইইউইউ ক্যাচ সার্টিফিকেটের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে সামুদ্রিক মাছ রপ্তানি করা হচ্ছে।


৯. মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি এবং স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ মাছ সরবরাহ : আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে তিনটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মৎস্য মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার। এসব পরীক্ষাগারে LC-MS/MS মেশিনসহ ELISA, AAS I PCR মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও ঢাকার সাভারে স্থাপিত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি অত্যাধুনিক রেফারেন্স ল্যাবরেটরি কয়েক মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করবে। মাছ ও চিংড়ির মাননিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান কার্যক্রমের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সনের মার্চ মাসে ইইউ মিশনের সুপারিশে মৎস্য পণ্য রপ্তানিতে আরোপিত ২০% বাধ্যতামূলক পরীক্ষা করার বিধান প্রত্যাহার করা হয়েছে। চিংড়ি সেক্টরে ট্রেসিবিলিটি সিস্টেম কার্যকর করার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই প্রায় ২.০৭ লাখ চিংড়ি খামার ও ৯,৬২৪টি রপ্তানিযোগ্য ফিনফিশের (প্রধানত পাঙ্গাস, কৈ, তেলাপিয়া ও শিং-মাগুর) খামার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে। অতি সম্প্রতি মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন একটি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ই-ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।  


বর্তমানে দেশে চিংড়ি উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সব স্তরে হ্যাসাপ ও ট্রেসিবিলিটি রেগুলেশন কার্যকর করার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে আর্থিক মন্দাবস্থা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ফলে ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রায় ৮৫ হাজার টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশ আয় করেছে ৪৩১২.৬১ কোটি টাকা। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০০৩-০৪ সালে প্রায় ৫৪ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে দেশ ২৩৬৩.৪৭ কোটি টাকা আয় করে। সেখানে ১০ বছরের ব্যবধানে ২০১২-১৩ সনে রপ্তানির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৮৫ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে এবং এ থেকে আয় প্রায় আড়াইগুণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় ৪৩১২.৬১ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ সনে ৭৭,৩২৮ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৪,৭৭৬.৯৩ কোটি টাকা আয় করেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত তিনটি মৎস্য মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি অ্যাক্রিডিটেশন সনদ অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে। অনেক বাধা পেরিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতি সম্প্রতি রাশিয়াতে মৎস্যপণ্য রপ্তানির কারিগরি প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর হওয়ায় নতুনভাবে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।


অভ্যন্তরীণ বাজারে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ মাছ সংরক্ষণ এবং বিপণনের বিষয়েও সরকার বিশেষভাবে সচেষ্ট রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর দেশের আপামর জনসাধারণের নিরাপদ মাছ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাছে ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। যার মাধ্যমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মৎস্যবাজার ও আড়তগুলোতে সচেতনতা সভা করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগ করছে। মৎস্য ব্যবসায়ী, মৎস্যজীবী ও মৎস্য আড়ত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ৮০টি ফরমালিন ডিটেকটিং ডিজিটাল কিট বিতরণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলায় এ ডিটেকটিং কিট সরবরাহ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।


১০. প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ : রুই-কাতলা জাতীয় মাছের অন্যতম প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী, লবণাক্ত ও আধা-লবণাক্ত মাছের অন্যতম চারণক্ষেত্র (nursery ground) সুন্দরবন এবং মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ বাঁওড় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে মৎস্য অধিদপ্তর নিবিড় কর্মকা- পরিচালনা করছে। সরকার প্রাকৃতিক পোনার উৎসস্থল হালদা নদীকে রক্ষায় নানামুখী কর্মকা- বাস্তবায়ন করছে। এর ফলে ২০১২ সনে বিগত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫৬৯ কেজি রেণু আহরিত হয়েছে। ২০১৩ সালে এক ধাপে ৬২৫.৫ কেজি রেণু সংগৃহীত হয়েছে। ২০১৪ সালে প্রথম ধাপে ইতোমধ্যেই ৫০৮.৩৮ কেজি রেণু সংগৃহীত হয়। আশা করা যায়, প্রতিবারের ন্যায় দ্বিতীয় ধাপেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেণু সংগৃহীত হবে। তাছাড়া মৎস্য অধিদপ্তর ৭টি জেলার হাওর অঞ্চল চিহ্নিত করে ডাটাবেইজ তৈরির মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে ২০ বছরের জন্য এক উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।   
১১. মানবসম্পদ উন্নয়ন : মৎস্য সেক্টরে নিয়োজিত সব উন্নয়ন কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবার দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৩-১৪ বছরে রাজস্ব ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২.৯৭ লাখ জন সুফলভোগীকে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরে জনবল সঙ্কট এবং মৎস্য সেবা কার্যক্রমের বর্ধিত চাহিদার প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের সময়ে দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৩০০৫ জন স্থানীয় মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মী বা লিফ উন্নয়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭৫ জন মহিলা। সর্বোপরি সরকারের রূপকল্প ২০২১-এর অর্জিতব্য লক্ষ্যসমূহ অর্জনের নিমিত্ত মৎস্য অধিদপ্তরে বিদ্যমান মোট ৪৮৪৬টি রাজস্ব খাতের পদের সাথে অতিরিক্ত আরও ২৪৫৭টি পদ রাজস্ব খাতে সৃজন করার প্রস্তাব ১৯ এপ্রিল ২০১২ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয় সর্বমোট ৯২৬টি পদের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছে। প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অর্থ মন্ত্রণালয় হতে চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে মৎস্য সেক্টরের কর্মকাণ্ডে ব্যাপক গতির সঞ্চার হবে।  

 
ডিপ্লোমা-ইন-ফিশারিজ কোর্স সম্পন্ন করার মাধ্যমে মৎস্য সেক্টরে মধ্যপর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মৎস্য হ্যাচারি, মৎস্য খামার, মৎস্য খাদ্য কারখানা, মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, এনজিও ইত্যাদিতে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে দক্ষ প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় চাঁদপুরে মৎস্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি বছর ২৫ জন করে ভর্তি করা হয় এবং বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠানে সর্বমোট ১১৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছে। ডিসেম্বর ২০১৩-এ প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ডিপ্লোমা-ইন-ফিশারিজ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ক্রমবর্ধিষ্ণু এ মৎস্য সেক্টরের মধ্যপর্যায়ে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের ব্যাপক চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় এনে বর্তমান সরকার গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং সিরাজগঞ্জ জেলায় আরও তিনটি মৎস্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট স্থাপন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী চারটি মৎস্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট-এ প্রতি বছর ৪০ জন করে মোট ১৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা সম্ভব হবে।


১২. তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রদান : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে মাছ ও চিংড়ি চাষিদের চাহিদাভিত্তিক প্রযুক্তি সেবা তাৎক্ষণিকভাবে প্রদানের লক্ষ্যে দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলার ১০টি গ্রামে ই-এক্সটেনশন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্পের মাধ্যমে ৭০০টি চাষি পরামর্শ কেন্দ্র (ফিয়াক) ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্মিত হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মহাসড়কে গ্রামীণ চাষিদের সম্পৃক্তকরণ বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দেশব্যাপী মৎস্যজীবী-জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদানের নিমিত্ত ডাটাবেজ তৈরির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করা যায়, এ কর্মসূচি দেশে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাক্সিক্ষত অবদান রাখার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে অধিকতর সামর্থ্যবান করে তুলবে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।


উপসংহার : চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, খাস জলাশয়গুলো জৈবিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে চাষ পদ্ধতি নিবিড়করণ ও বহুমুখীকরণ, সব ধরনের জলজ সম্পদ ও তথ্যপ্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন আগামী ২০১৪-১৫ সন নাগাদ ৩৭.০৩ লাখ টন এবং ২০২০-২১ সন নাগাদ ৪৫.৫২ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। এর ফলে মাছ ও চিংড়িসহ অন্যান্য জলজ সম্পদের দায়িত্বশীল উৎপাদন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় খাদ্য নিরাপত্তা বিধান, আপামর জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও অভীষ্ট জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। একটি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রযুক্তি নির্ভর, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতামুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে মৎস্য অধিদপ্তর তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

সৈয়দ আরিফ আজাদ*

* মহাপরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ভবন, রমনা, ঢাকা

বিস্তারিত
গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়ানোর উপায়

মানুষের খুব কাছাকাছি থেকে নানাভাবে উপকৃত করে এমন প্রাণীর মধ্যে গরু অন্যতম।  মহান আল্লাহর একটি সৃষ্টি যা মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে। এর গোশত ও দুধ মানবদেহের সব প্রয়োজন পূরণ করে। দুধ হলো আদর্শ খাদ্য। যা খাদ্যের প্রায় সব উপাদান বহন করে। সুস্থ সবল গাভী হতে পরিমিত দুধ পাওয়া যায়। আমাদের দেশের গাভীগুলোর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। এর পেছনে কিছু পরিবেশগত কারণ ও জাতগত কারণ রয়েছে। একেক জাতের গাভীর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা একেক রকম।
 আমাদেশে দেশে জাত ছাড়াও বিষয় আছে যা দুধ উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক। আগে জেনে নেয়া যাক, যে বিষয়গুলোর ওপর দুধ উৎপাদন নির্ভরশীল-


১. গাভীর আকার : গাভীর আকার এর ওপর উৎপাদন অনেকটা নির্ভর করে। সাধারণত বড় আকারের গাভী হতে বেশি দুধ পাওয়া যায়।
২. বাছুর প্রসবের সময় : বাছুর প্রসবের সময়ের ওপর দুধ উৎপাদন নির্ভর করে। শরৎকালে গাভীর বাচ্চা প্রসবে বসন্ত ঋতুতে প্রসব অপেক্ষা প্রায় ১০% অধিক দুধ উৎপাদিত হয়, এর কিছু আবহাওয়াগত কারণ রয়েছে।
৩. পুষ্টি : গাভীর পুষ্টির উপর অনেকাংশে দুধ উৎপাদন নির্ভর করে। দুধ নিঃসরণকারী কোষে দুধ সৃষ্টি করতে পারে যদি পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় আর গাভীর পুষ্টির উৎস দুইটি তার নিজের দেহ এবং যে খাদ্য সে খায়।
৪. বয়স : গাভীর বয়সের সাথে সম্পর্কিত দুধ উৎপাদন ক্ষমতা সাধারণত গাভী তার ৩ থেকে ৬ (বাছুর সংখ্যা) দুধকাল সর্বোচ্চ পরিমাণ দুধ দেয়।
৫. স্বাস্থ্য : গাভীর স্বাস্থ্য ভালো থাকলে দুধ উৎপাদন অনেকটা ভালো থাকে।
৬. আদর্শ ব্যবস্থাপনা : দুধ দোহনের উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা ও বাসগৃহ এবং সামগ্রীর পরিচালনায় দুধ উৎপাদন প্রভাব রয়েছে।


ফ্যাট                   ৩৫-৪৫%
প্রোটিন                 ৩.৫ - ৫%]
ল্যাকটোস              ৪-৫%    
অ্যাস (মিনারেল)     ৭০ - ৮০%।
টোটাল সলিড         ১৩-১৪%
পানি                    ৮৭ .৫%
কোসিন                ২.৬%
অ্যালবুমিন গ্লোবুলিন   ০.৫%

 

যে বিষয়গুলোর দিকে দৃষ্টি রাখলে উৎপাদন বাড়বে-
১. ড্রাই পিরিয়ড বৃদ্ধি : ড্রাই পিরিয়ড বলতে সেই সময়কে বোঝায় যখন গাভীর বাছুর বড় হওয়ার পর থেকে পুনরায় গর্ভবর্তী হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়কে। এ সময় সাধারণত ৫০-৬০ দিন হলে ভালো হয়। এ সময়ে গাভীর তার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে এবং পরবর্তী বাছুরের জন্য নিজের দেহকে সুষ্ঠুভাবে তৈরি করতে পারবে। আজ এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ড্রাই পিরিয়ড বৃদ্ধি পেলে দুধ উৎপাদন বাড়ে।

 

২. সুষম খাদ্যের সরবরাহ : গর্ভবতী গাভীর জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্য সরবরাহ। এ সময় প্রচুর পরিমাণ পুষ্টি প্রয়োজন। যা গাভীর নিজের জন্য ও বাছুরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গাভীর পুষ্টির উপর নির্ভর করে গাভীর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা ও বাচ্চার দেহ গঠন। তাই গর্ভবতী গাভীকে বিশেষভাবে সুষম খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।
 

৩. পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ : দেহের পরিপাক তন্ত্র সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুষম পানি  প্রয়োজন। পানি দেহের পরিমিত পানি দেহের মেটাবলিজম সঠিক রাখে।
 

৪. বাছুর প্রসব কালের গাভীর পরিচর্যা নিশ্চিত করা : গাভীর বাছুর প্রসবকালে নিতে হবে বাড়তি পরিচর্যা। এ সময় গাভীকে নরম বিছানার (খড় বিছিয়ে) ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণত বকনা গরুর ক্ষেত্রে প্রথম বাছুর প্রসবকালে সমস্যা একটু বেশি হয়। তাই বাছুর হওয়ার সাথে সাথে গাভীকে কিছু কুসুম গরম পানি ও তার সাথে ভিটামিন সি সদৃশ্য কিছু খাওয়াতে হবে। এতে করে গাভীর শরীর ঠিক থাকে।
 

৫. এই সময় মিল্ক ফিভার (দুস্থ জ্বর) যাতে না হয় সেজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম খাবারের সাথে দিতে হবে। বাছুর প্রসবের প্রায় ১ সপ্তাহ আগে ভিটামিন ডি খাওয়ালে গাভীর জন্য সহায়ক হয়।
 

৬ গাভীকে নিয়মিত পরিষ্কার রাখা : বাছুর প্রসবের পর গাভীকে সঠিকভাবে গোসল করাতে/ পরিষ্কার করতে হবে। শীতের দিন  হলে হালকা গরম পানি দিয়ে হলেও তা পরিষ্কার করতে হবে। যা দেহের বহিঃপরজীবী দূর করতে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে। আর তাপমাত্রার সাথে দুধ উৎপাদন এর একটা সম্পর্ক রয়েছে।
 

৭. বাছুর প্রসবের পর এমনিতেই দেহের দুর্বলতা ভাব প্রকাশ পায়। এই সুযোগ নিয়ে জীবাণু সহজে বংশ বিস্তার ও রোগ ছড়াতে পারে। আর জীবাণু পরজীবীর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ হলো অপরিচ্ছন্নতা। সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।


গরমকালে প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত ২ বার গোসল করানো ভালো। শীতকালে তেমন সম্ভব না হলে ব্রাশ দিয়ে শরীরের লোম পরিষ্কার করতে হবে।  এতে করে লোমের অর্থাৎ সারা শরীরে রক্ত প্রবাহ ঠিক থাকে। যা দুধ উৎপাদনে সহায়ক।  
 

৮. গাভীর বাসস্থান পরিচ্ছন্ন রাখা : যে স্থানে গাভীকে রাখা হয় তার উপর গাভীর স্বাস্থ্য ও দুধ অনেকটা নির্ভর করে। ভালো ভ্যান্টিলেশন শুকনো ও স্যাঁতসেঁতে মুক্ত পরিবেশে গাভীকে রাখতে হবে। এতে করে লোমের অর্থাৎ সারা শরীরে রক্ত প্রবাহ ঠিক থাকে। যা দুধ উৎপাদন সহায়ক।
 

৯. বাচ্চা প্রসবের আগে ও পরে কিছু দিন বাসস্থানকে আগে আরাম দায়ক করতে শুকনো খড় ব্যবহার করা উত্তম।
কোন রকম ময়লা আবর্জনা সেখানে রাখা উচিত নয়। এতে করে পরবর্তীতে কৃমি বৃদ্ধি পেতে পারে। সপ্তাহে অন্তত ২ বার ব্লিচিং পাউডার দ্বারা গাভীর স্থানের মেঝে পরিষ্কার করতে হবে। এতে করে জীবাণুর প্রাদুর্ভাব অনেকাংশে কমানো যায়।

 

১০. পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাসের সরবরাহ করা : গাভীর দুধ উৎপাদন  বাড়াতে কাঁচা ঘাসের কোনো বিকল্প নেই। সুষম খাদ্যের পাশাপাশি কাঁচা ঘাস দুধ উৎপাদন বাড়ায়। ঘাসের বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উপস্থিতিতে দুধ উৎপাদন বাড়ায়।
 

১১. নির্দিষ্ট সময়ে দোহন করা : প্রতিদিন একই সময়ে দুধ দোহন করলে এর উৎপাদন ভালো থাকে। গাভীর দেহের হরমোন তখন ভালো কাজ করতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে একই ব্যক্তি দ্বারা দুধ দোহন করলে দুধ উৎপাদনের মান ভালো থাকে বলে প্রমাণিত হয়েছে। অন্য ব্যক্তি বা পদ্ধতির পরিবর্তন হলে গাভী অনেকটা  বিরক্ত হয়। ফলে দুধ উৎপাদন কমে যায়।
 

১২. নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দোহন শেষ করা : দুধ নিঃসরনের  সাথে  জড়িত হরমোন অক্সিটোসিন মাত্র ৮ মিনিট কাজ করে । এজন্য ওই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ দুধ পেতে দোহন শেষ করতে হবে।
 

১৩. দুধ দোহনের সংখ্যা : দুধ উৎপাদনের পরিমাণের ওপর দুধ দোহন সংখ্যা নির্ভর করে। সাধারণত সকাল ও বিকালে  দুধ দোহন করা হয়। এতে দুধ উৎপাদন পরিমাণ বাড়ে।
 

১৪. ব্যায়াম করানো : দীর্ঘদিন পেটে বাছুর/ গর্ভবর্তী থাকায় প্রায় অনেকটা অলস হয়ে থাকে গাভীগুলো। তাই বাছুর হওয়ার পর থেকে গাভীকে একটু ব্যায়াম (হাঁটানো) এর ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে


১৫. বাছুরকে দুধের পাশাপাশি অন্য কিছু দেয়া : গাভীর দুদ্ধ প্রদান কালে বাছুরকে তার মায়ের দুধের পাশাপাশি অন্য কিছু খাওয়াতে হবে। এতে  করে দুধ এর চাহিদা কম হবে। যার ফলে বাছুর প্রয়োজনের অতিরিক্ত দুধ গাভী তার মালিককে প্রদান করবে। এ আলাদা খাদ্যকে বলা হয় কাফ স্টাটার (Calf Startar) যাতে পুষ্টিমান থাকবে ২০% উঈচ ধহফ ৭০% TDN এটা প্রোটিন, মিনারেল ও ভিটামিন ও অ্যান্টিবায়োটিকের  সমন্বয়ে তৈরি করা হয়।
 

১৬. উপযুক্ত পারিপার্শ্বিক অবস্থা : ঘরের পরিবেশ আরামদায়ক ও সন্তুষ্ট অবস্থায় দুধ দোহন করা উত্তম। এতে দুধ দোহন এর গতি ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। ঘরের পরিবেশ শান্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। উচ্চ শব্দ, কুকুর, আগন্তক অযথা চিৎকার ও অন্যান্য উদ্ভূত পরিস্থিতি অবশ্যই পরিহার করা।  এসব হলে দুধ নিঃসরনে ব্যঘাত ঘটে।
 

 ১৭. দোহন কালে খাওয়ানো : দৈনিক রেশনের দানাদার কিছু অংশ দোহনের সময় সরবরাহ করলে গাভীর মনোযোগ খাওয়ার দিকে থাকে। এ সময় হরমনের কাজ ভালো হয় ফলে দুধ নিঃসরন পর্যাপ্ত হয়। এ পদ্ধতি বদমেজাজি গাভী দোহনের সহায়ক হয়।
 

১৮. ভিটামিন ও মিনারেল প্রিমিক্স খাওয়ানো  : বর্তমানে বাজারে অনেক ধরনের মিক্সড পাউডার পাওয়া যায়। যা ভিটামিন, মিনারেলের ঘাটতি পূরণ করে দুধ উৎপাদন বাড়ায়। ভিটামিন ডি বি’সহ বিভিন্ন নামে বাজারে পাওয়া যায়। যা খাবারের সাথে সরবরাহ করতে হয়।
উপরোক্ত ব্যবস্থা ঠিকমতো গ্রহণ করলে দুধের উৎপাদন অনেকাংশে বাড়ানো সম্ভব। যা দেশের জাতীয় চাহিদা পূরণের একটি পদক্ষেপ বলে গণ্য হবে।

মো. মোস্তাফিজুর রহমান*

* শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, ভেটেরিনারি অনুষদ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর। মোবাইল : ০১৭২৩৭৮৬৮৭৭

বিস্তারিত
কুল চাষে নারায়ণ চন্দ্র হালদারের সাফল্য

বাগেরহাট সদর উপজেলার গোটাপাড়া গ্রামের সফল চাষি নারায়ণ চন্দ্র হালদার। যিনি কুল নারায়ণ হিসেবে পরিচিত। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চল যখন লবণাক্ততার গ্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত, সমদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হওয়ায় জোয়ার ভাটার প্রভাবে নিম্নাঞ্চল প্রায়শই ডুবে থাকে, সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি যখন বিপদগ্রস্ত সেসাথে কৃষিও হুমকির সম্মুখীন এমন অবস্থায় নারায়ণ বাবু নিজের প্রতিভায় বিকশিত হয়ে বাগেরহাটসহ আশপাশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন। নিজের ফসলি জমি বছরের প্রায় অর্ধেক সময় জলমগ্ন থাকায় যখন দিশেহারা অবস্থা ; তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘মাটি ও মানুষ’-এ প্রচারিত একজন সফল কুল চাষির সাক্ষাৎকার দেখে তিনি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হন। নিজের অনাবাদি জমিটুকুকে সদ্বব্যবহার করতে নানা পরিকল্পনা করতে থাকেন। এ সময় তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন উপজেলা কৃষি অফিস। সাফল্যের কাহিনী জানতে মুখোমুখি হয়েছিলাম নারায়ণ বাবুর সাথে-


প্রশ্ন : আপনার এ বাগান কত সালে তৈরি করেছেন?
উত্তর : ২০০৯ সালে মাত্র ১৮টি কুলের চারা রোপণ করে এ বাগান তৈরির কাজ শুরু করি।

প্রশ্ন : কি জাতের চারা কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন?
উত্তর : নারকেলি কুলের চারা সাতক্ষীরা নার্সারি থেকে সংগ্রহ করি।

প্রশ্ন : আপনার এ ডোবা নিম্নাঞ্চলে ফল বাগান করার প্রযুক্তি কোথায় পেলেন?
উত্তর : আমাদের সদর উপজেলা কৃষি অফিসার ও উপসহকারী কৃষি অফিসার আমাকে এ ফল বাগান তৈরিতে প্রযুক্তির সহায়তা করেছেন।

প্রশ্ন : কোন পদ্ধতিতে আপনি এ বাগান তৈরি করলেন?
উত্তর : আমার জমি নিচু হওয়ায় কৃষি অফিসের পরামর্শমতো সার্জন বা কান্দি বেড পদ্ধতিতে প্রথমে দুই পাশের মাটি উঁচু করে   বেড  তৈরি করি। গাছ লাগানোর এক মাস আগে ১ ফুট লম্বা, ১ ফুট চওড়া ও ১ ফুট গভীর করে ১৪ হাত দূরে দূরে গর্ত তৈরি করি। ওই গর্তের মাটির সাথে ১০ থেকে ১৫ কেজি গোবর সার ও আধা কেজি সরিষার খৈল মিশিয়ে রেখে দেই। তার ১৫ দিন পর ৫০ গ্রাম টিএসপি, ৫০ গ্রাম এমওপি, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম জিপসাম এবং অল্প পরিমাণে ডলো চুন ও বরিক এসিড মিশিয়ে রেখে দেই। এরপর গাছ লাগিয়ে খুঁটি দিয়ে বেঁধে দেই।

প্রশ্ন : বর্তমানে আপনার বাগানের জমির পরিমাণ কত?
উত্তর : আমি ৭৫ একর জমিতে মিশ্র ফল বাগান তৈরি করেছি এর মধ্যে ২০ একরে কুল চাষ করেছি। সার্জন পদ্ধতিতে ফল বাগান করায় বাগানের নালার জমিতে আমি কিছু চিংড়ি মাছও চাষ করে থাকি।

প্রশ্ন : আপনার বাগানে কি কি ফল গাছ রোপণ করেছেন?
উত্তর : আমাদের এলাকাটি লবণাক্ত হওয়ায় প্রথমে অন্যান্য দেশি ফলের চারা রোপণ করে ব্যর্থ হওয়ায় সফেদা ও কুল গাছ রোপণ করেছি।

প্রশ্ন : আপনার বাগানে কত প্রকারের কতটি গাছ রয়েছে?
উত্তর : আমার বাগানে আপেল কুল ও নারিকেলি কুলের ২ হাজার ৫০০টি গাছ  রয়েছে, এছাড়া ২শত ২৫০টি সফেদার গাছ রয়েছে।

প্রশ্ন : কুল গাছের কি কি পরিচর্যা করেন?
উত্তর : আমি কৃষি অফিসের পরামর্শমতো নিয়মিত ফল গাছের পরিচর্যা করে থাকি। বছরে ২ বার নির্দিষ্ট সময়ে জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বয়ে পরিমাণমতো সার প্রয়োগ করি। কুল সংগ্রহের পর ডাল ছাঁটাই করি এবং পোকামাকড়  রোগবালাইয়ের জন্য ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

প্রশ্ন : আপনার ফল বাগানে অন্য কোন ফসল আবাদ করেন?
উত্তর : কুল সংগ্রহ করে ডাল ছাঁটায়ের পর কাটা অংশে বোর্দপেস্ট প্রয়োগ করি। পরে কুলের বেডে গ্রীষ্মকালীন সবজি হিসেবে করলা, লাউ, কুমড়া এসব  চাষ করি ও উৎপাািদত পণ্য বাজারজাত করি।

প্রশ্ন : আপনার উৎপাদিত কুল কোথায় বিক্রি করেন?
উত্তর : আমি মূলত ঢাকায় বিক্রি করে থাকি এ ছাড়া বাগেরহাটসহ খুলনা, পিরোজপুর ও বরিশালে বিক্রয় করে থাকি।

প্রশ্ন : কুল চাষ করে কেমন আয় হয়েছে?
উত্তর : গত বছর প্রায় ৪৫ লাখ টাকার কুল বিক্রি করেছি, এ বছর এখন পর্যন্ত ৩০ লাখ টাকার কুল বেচেছি এবং বাগানে যে কুল রয়েছে তা আরও প্রায় ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারব আশা করছি।
‘পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রতিশ্রুতি’ মহাজ্ঞানীদের বানীটি সত্যিকার অর্থে ফলেছে নারায়ণ চন্দ্র হালদার এর ক্ষেত্রে। তিনি পূন্যভূমি বাগেরহাটের কৃতী সন্তান। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অন্য চাষিদের উদ্দেশ্যে প্রকল্প পরিচালক বললেন, পতিত জমিকে চাষের আওতায় আনার যে পদ্ধতি নারায়ণ বাবু দেখালেন তা আমাদের সকলকে অনুসরণ করতে হবে। উপপরিচালক বাগেরহাট বলেন, কৃষকদের সাহায্যের জন্য কৃষি বিভাগ রয়েছে। কৃষি কাজের যে কোনো প্রয়োজনে আমাদের সেবা গ্রহণ করুন। পরিশ্রমী নারায়ণ বাবুর আর্দশ অনুসরণ করে অন্যান্য কৃষিজীবী ভাইবোনেরা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।     
 সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ফেব্রুয়ারি-২০১৫।  
 

মো. রুহুল আমিন*

এম এম আবদুর রাজ্জাক**
*প্রকল্প পরিচালক, বাগেরহাট-পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন, **আরএফবিও, কৃতসা খুলনা
বিস্তারিত
কবিতা-১৪২২

আশা
নূর-ই-ফাতিমা*

সবুজ শ্যামল দেশটি আমার
সজীব পরিপাটি।
রৌদ্র তাপে, বৃষ্টি জলে- সতেজ সোঁদা মাটি।
নদী ধৌত পলিমাটি জাগায় চাষির আশ,
ধান, গম, ডাল ফলে নানান, নিত্য বারো মাস।
কোথাও দো-আঁশ, এঁটেল, বেলে-
কোথাও মিশ্র মাটি;
ফলায় চাষিরা ইচ্ছে, তাই ফলছে দারুণ খাঁটি।
মাঠে বাটে মৌসুমি ক্ষেত পান্না সবুজ রঙে,
লতিয়ে উঠে শাকসবজি দোলে নানান ঢঙে।
মাচায় ঝুলে লাউ কুমড়ো-
দোলায় সবার প্রাণ,
বরবটি, শিম, পুঁইয়ে ভরে আঙিনা বিতান।
শাখে শাখে আম, জাম, বেল, লিচু, কাঁঠাল, কুল;
কাঁধি কাঁধি কলা, তাল আর আনারস, জামরুল।
নাম না জানা ফুলে ফলে-
ভরা এ দেশ ভাই।
আমাদেরই স্বভাব দোষে আমরা ভালো নাই।
অধিক লাভের লোভে দিচ্ছি অন্যায়ভাবে চাষ,
কীটনাশক আর কেমিক্যালে করছি সর্বনাশ।
ফরমালিনের
তোড়ে ভেসে- দিক কুল,
ভয়ঙ্কর সব রোগ ব্যাধিতে গুনছি এর মাশুল।
মৎস্য খাবার, গো-খাবার আর খাবার সংরক্ষণে,
সততা আর নিষ্ঠা বজায় রাখব সচেতনে।
মুনাফা নয় অধিক সাথে থাকবে ভালোবাসা,
‘সুস্থ, সুন্দর থাকুক সবাই’ এই হোক সবার আশা।

 

দখিনের চাষি
কৃষিবিদ মো. ফরহাদ হোসেন*

আমরা চাষি দখিন বাসী, কৃষি কাজে শত
বাধা পেরোই হরহামেশ এবং অবিরত
জোয়ার ভাটা, বন্যা পানি, লবণ মাটিও আছে
উৎপাদনটা চ্যালেঞ্জ যেন, সদাই মোদের কাছে।
দখিন দিকের মাঠগুলো সব, নিচু যেন খুব
বর্ষা এলেই জলের নিচে, দেয় যে ধীরে ডুব।
আমন ধানের উফশী জাতে, পায় না তাতে ঠাঁই
তাইতো লাগাই দেশীয় জাত, বিকল্প আর নাই।
ডুবো পানি তাইতো মোরা, মুঠ ভরে রুই চারা
কোথায় গোছা কিংবা সারি, এসব হিসাব ছাড়া।
পানির নিচে লাইন থাকে না, এলোমেলো রোপণ
দূরের মানুষ কেউ জানে না, রহস্য রয় গোপন।
নিচু বলে সিক্ত মাটি, ধান পাকিতে দেরি
রবি ফসল যায় না করা, হাতে পায়ে বেড়ি।
যদিওবা হয় কিছু চাষ, আগাম জোয়ার এসে
নষ্ট হয়ে যায় যে সবই, যায় পানিতে ভেসে।
স্বল্প আয়ুর জাত যত সব, করতে হবে বার
খুলবে তবে এ অঞ্চলে, কৃষির নতুন দ্বার।

 

দূষণ সন্দেহে খাদ্য
মো. জুন্নুন আলী প্রামাণিক***

সুন্দর সুন্দর পাকা ফল বাজারে মন মত,
আকৃষ্ট হৃদয় তিক্ষ্ণ দৃষ্টি পাইতে চায় শত।
খাদ্যের কারণে শ্রম ব্যস্ত জীবনে কত কষ্ট,
ক্ষতির ভাবনা খাদ্যে হলে সকল রুচি নষ্ট।
নিকৃষ্ট বিষাক্ত দ্রব্য যদি মেশানো তাতে থাকে।
বিশুদ্ধি বিনাশ করে তাহা বিষাদ চোখে মুখে।
অন্তর ভুলানো মুগ্ধ করা আকৃষ্ট রূপে শোভে।
অনেক ক্রেতার ব্যস্ত মন নিকটে ছোটে লোভে।
অদৃশ্য আকারে মিশে খাদ্যে ছলনা করে রয়,
আনন্দে আহার করে শেষে ভীষণ রোগ ভয়।
ভক্ষণ যোগ্যতা সেই খাদ্য হারিয়ে ফেলে তাই,
ধুর্তামী করার ক্ষেত্র নয় আহার্য খাদ্য ভাই।
বিভিন্ন দূষণে রুগ্ণ দেহ উদ্বেগ ভরা খাদ্য,
পুষ্টির শীতল স্বস্তি নাশে দেয় না শক্তি সাধ্য।
ফাঁদের মতন খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল চুপে থাকে,
সৌন্দর্য ভরাট দৃশ্য গুলি নিকটে খেতে ডাকে।
অনীহা উদ্বিগ্ন ঘুরে ফিরে মনের আঁকে বাঁকে,
ভাবনা সাগরে চিন্তা মগ্ন দুচোখ শুধু দেখে।
আহার্য সকল খাদ্যে সেজে দোকান স্নিগ্ধ হয়,
রুচিকে বিনষ্ট করে শেষে সন্দেহ ঘূর্ণি ভয়।
অনেক ব্যয়ের ফলে কেনা উত্তম খাদ্য মাঝে,
দূষণ বিষের ক্ষেপা বিনা গোপনে সেথা বাজে।
ভেজাল বিহীন খাদ্য খেয়ে মানুষ শান্তি পায়,
দেহের মনের পুষ্টি মিটে ক্ষয়ের পূর্তি হয়।
সবল করার মূলমন্ত্র কেবলি খাদ্যে আছে,
মানুষ দূষিত করে খাদ্য করে না কোন গাছে॥

 

* ফ্ল্যাট ৮/এন, এ ২, সুরভি, লেকসিটি কনকর্ড, ঢাকা-১২২৯। **উপজেলা কৃষি অফিসার, ঝালকাঠি সদর, ঝালকাঠি। ***গ্রাম- বিদ্যাবাগীশ, ডাক ও উপজেলা- ফুলবাড়ী, জেলা- কুড়িগ্রাম

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর-১৪২২

মো. তারেক
আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা
প্রশ্ন : কাঁঠালের মুচি পচে ঝরে যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : কাঁঠাল পচা রোগের আক্রমণে কচি ফলের গায়ে বাদামি রঙের দাগ দেখা যায়। ফলে আক্রান্ত ফল গাছ থেকে ঝড়ে পড়ে যায়। প্রতিকার হিসেবে গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা ও ফল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। মুচিতে ১% বর্দোমিকচার  বা ২ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ বা রিডোমিল এম জেড প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১২ থেকে ১৫ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে।


আলাউদ্দিন
পীরগঞ্জ, রংপুর
প্রশ্ন : তরমুজ গাছের গোড়া পচে গাছ মারা যাচ্ছে। প্রতিকার কী?
উত্তর : ছত্রাকের আক্রমণে তরমুজ গাছের গোড়া পচে যায়।
প্রতিকার : ১. ক্ষেত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
২. রোগাক্রান্ত পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট বা পুড়ে ফেলা।
৩. বীজ বপনের আগে প্রোভেক্স ২.৫ গ্রাম বা ব্যাভিস্টিন ২ গ্রাম দ্বারা প্রতি কেজি বীজ শোধন করা।
৪. রোগের আক্রমণ দেখা দিলে কুপ্রাভিট ৪ গ্রাম ডাইথেন-এম ৪৫ ২.৫ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।

 

নজরুল ইসলাম
সাপাহার, নওগাঁ
প্রশ্ন : চীনাবাদামের পাতার ওপর হলদে রঙের গোলাকার দাম পড়ে এবং ধীরে ধীরে পাতা ঝরে যায়। উপায় কী?
উত্তর : এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে বাদামের পাতার ওপর হলদে রেখা বেষ্টিত বাদামী রঙের দাগ পড়ে। একে পাতার দাগ বা টিক্কা রোগ বলা হয়।
প্রতিকার : ১. আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
২. ফসল কাটার পর আগাছা পুড়িয়ে ফেলা।
৩. রোগ সহনশীল জাতের চাষ করা।
৪. রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম ব্যাভিস্টিন/নোইন বা ২ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ মিশিয়ে ১২ থেকে ১৫ দিন পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করা।

 

জোবায়ের উদ্দিন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রশ্ন : ধান গাছের পাতায় ছোট ছোট চোখের মতো ফোসকা পড়া দাগ দেখা যায় ও পরে পাতা আগা থেকে শুকিয়ে আসে। করণীয় কী?
উত্তর : এটা ধানের ব্লাস্ট রোগ এর লক্ষণ। এ রোগ ধান গাছের তিনটি অংশে আক্রমণ করে যথা-পাতা, কা- ও শিষে।
প্রতিকার : ১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জাত ব্যবহার করা। যথা- বি আর ১৫, ১৬, ২৩, ২৫ ও ব্রি ধান ২৮, ৩৩।
২. বীজতলা বা জমিতে পানি ধরে রাখা।
৩. সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করা। আক্রান্ত জমিতে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ বন্ধ রাখা।
৪. রোগমুক্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করা।
৫. রোগ দেখা দিলে ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা। যথা- প্রতি হেক্টরে ৪০০ গ্রাম ট্রুপার, জিল বা নেটিভো ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে দুইবার প্রয়োগ করা।

 

মো. মনিরুজ্জামান
সাঁথিয়া, পাবনা
প্রশ্ন : পুঁইশাকের পাতায় বাদামি বা লালচে রঙের ছোট ছোট দাগ দেখা যায়। কী করতে হবে?
উত্তর : আপনার পুঁইশাকের সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে হলে যা করতে হবে তাহলো-
● আক্রান্ত পাতাগুলো তুলে নষ্ট বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
● রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতের চাষ করা।
● সুষম সার ব্যবহার ও পরিমিত সেচ প্রদান করা।
● রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে কার্বন ডাজিম (ব্যাভিস্টিন বা নোইন) ১ গ্রাম মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

 

মো. রাজীব
যশোর
প্রশ্ন : ঘেরের প্রস্তুতপ্রণালি সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : ঘের শুকিয়ে তলদেশের পচা কাদা অপসারণ এবং তলদেশ সমান করতে হবে। পাড় উঁচু করে বাঁধতে হবে। সূর্যকে বাধাগ্রস্ত করে এমন ডালপালা রাখা যাবে না। ঘেরের পাড়সহ তলায় চুন ভালোভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে প্রতি শতকে ১ কেজি হারে। ঘেরের তলদেশ চাষ দিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। ছোট মেসসাইজের নাইলন জাল দিয়ে ঘেরের চারপাশে বেড়া (৩ ফুট উঁচু) দিতে হবে। পানি প্রবেশ পথ ও জরুরি পানি নির্গমন পথ করতে হবে এবং তাতে স্ক্রিন বা বানা (বাঁশের পাটা ও নাইলনের জাল দিয়ে তৈরি) দিতে হবে। চুন প্রয়োগের ৫ থেকে ৭ দিন পরে প্রয়োজনমতো পানি প্রবেশ করিয়ে ইউরিয়া ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম/শতক, টিএসপি ৭৫ থেকে ১০০ গ্রাম/শতক হারে প্রয়োগ করতে হবে। এরপর ব্লিচিং পাউডার সব ঘেরে ছিটিয়ে দিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে হবে। অনেক সময় ঘেরের এককোণায় বাঁশের ফ্রেমের সাথে একটি নার্সারি তৈরি করতে বলা হয়। হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা বা গোবর ব্যবহার করা যাবে না।


মো. জামাল হোসেন
নোয়াখালী
প্রশ্ন : পুকুরে রেণু ছেড়ে পোনা মাছের চাষ কীভাবে করব?
উত্তর : রেণু পোনা চাষের জন্য তুলনামূলক ছোট পুকুর শনাক্ত করতে হবে। ১০ থেকে ২০ শতকের সাইজের ৪ থেকে ৫ টি পুকুর করতে হবে। পুকুর উত্তমরূপে প্রস্তুত করে নিতে হবে। পুকুর ভালোভাবে পরিষ্কার করে এবং সম্ভব হলে পুকুর শুকিয়ে ফেলে প্রতি শতকে ১ কেজি চুন দিতে হবে। এরপর নতুন পানি দিতে হবে। রেণু ছাড়ার আসে কীটনাশক দিয়ে পুকুরের পানিতে বিভিন্ন রকম পোকামাকড় ও ব্যাঙাচি থাকলে মেরে ফেলতে হবে। প্রতি শতকে ২০ থেকে ৩০ গ্রাম হারে রেণু পোনা ছাড়তে হবে। নিয়মিত সুষম খাবার দিতে হবে।

 

সোহেল রানা
শেরপুর
প্রশ্ন : পুকুরে রেণু পোনা চাষের সমস্যাগুলো কী কি? তাদের প্রতিকার কী?
উত্তর : নার্সারি পুকুরে সার প্রয়োগের পর সাধারণত হাঁসপোকা, ব্যাঙাচি ও অন্যান্য প্রাণী জন্ম নেয়। এরা মাছের রেণু খেয়ে ফেলে। অনেক সময় পুকুরে গ্যাস সৃষ্টি হয়ে এবং বিভিন্ন রোগ জীবাণুর আক্রমণে রেণু মারা যেতে পারে।
এক বিঘা জমির পুকুরের জন্য সুমিথিয়ন ৫০ মিলি. বা ডিপটেরাস ১ কেজি পানিতে মিশ্রিত করে সব পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। পরিমাণমতো ডিজেল রেণু ছাড়ার আসে পুকুরে প্রয়োগ করলে হাঁসপোকা দমন করা যায়।

 

হোসেন মাহমুদ
দিনাজপুর
প্রশ্ন : গরুর গা খসখসে এবং ঘা হচ্ছে। কী করণীয়?
উত্তর : ইনজেকশন ভারমিক
(Vermic) প্রতি ২৫ কেজি গরুর দেহের ওজনের জন্য ১ সিসি. ১ বার চামড়ার নিচে পুশ করতে হবে। যদি বেশি হয় তাহলে ৭ দিন পর বুস্টার ডোজ আরও ১ বার দিতে হবে।
-ইনজেকশন অ্যাসটাভেট
(Astavet) ১০০ কেজি গরুর দেহের ওজনের জন্য ৫ সিসি. করে দৈনিক ১ বার ৩ থেকে ৫ দিন মাংসে পুশ করতে হবে।
-ইনজেকশন অ্যামক্সিভেট
(Amoxcyvet) ১ ভায়েল করে রোজ ১ বার ৩ দিন মাংসে পুশ করতে হবে।

আমানুল্লাহ
চট্টগ্রাম
প্রশ্ন : কবুতর ঝিমোচ্ছে, ঘুরে ঘুরে পড়ে যাচ্ছে, করণীয় কী?
উত্তর : ট্যাব. রেনামাইসিন ৫০০ মিলিগ্রাম
(Tab. Renamycin 500 mg.) অর্ধেক ট্যাবলেট গুঁড়া করে আধা লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে অসুস্থগুলোকে আলাদা করে খেতে দিতে হবে। বাকি দ্রবণ সুস্থগুলোকে খাওয়াতে হবে।
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ২ থেকে ৩ ফোঁটা খাওয়ার পানির সঙ্গে মিশিয়ে ৫ থেকে ৭ দিন খাওয়াতে হবে।

সাগর
ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : গরুর খাদ্য হিসেবে ইউ.এম.এস-এর অনুপাত কত?
উত্তর : খড় ৫ কেজি
মোলাসেস ১০৫ থেকে ১২০ গ্রাম
ইউরিয়া ১৫ গ্রাম
পানি ২.৫ থেকে ৩.৫ লিটার ভালোভাবে মিশিয়ে গরুকে খাওয়াতে হবে। অনুপাতের কম বেশি করা যাবে না।

 

সোহাগ
নওগাঁ
প্রশ্ন : বাছুরকে কত মাসে টিকা দিতে হয়?
উত্তর : বাছুরের বয়স অনুযায়ী যেসব টিকা দিতে হয় তাহলো-
৪৫ দিন                 ক্ষরারোগ
৪ মাস                  ক্ষুরারোগ
৬ মাস                  বাদলা
৬ মাস ২১ দিন        তড়কা
৭ মাস ১৪ দিন        গলাফুলা
৮ মাস ৭ দিন         প্লেগ
১০ মাস                ক্ষুরা রোগ।

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মারুফ*

* কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

 

বিস্তারিত
আষাঢ় মাসের কৃষি
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, গ্রীষ্মের তাপদাহে মানুষ, প্রকৃতি যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে তখন ধরণীকে শান্ত, শীতল ও শুদ্ধ করতে বর্ষা ঋতু আসে আমাদের মাঝে। খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, ডোবা ধীরে ধীরে ভরে ওঠে নতুন পানির জোয়ারে। গাছপালা ধুয়ে মুছে সবুজ হয়, কদমফুলের মনোহরি সুঘ্রাণ শোভা মাতিয়ে মন ভালো করে দেয় প্রতিটি বাঙালির। কৃষকের মনে দোলা দেয় এমন দিনে কী কী কাজ করা যায়। প্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন বর্ষার তন্ময়তার পর্দা সরিয়ে আসুন আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে নেই কৃষির করণীয় ভুবনের আবশ্যকীয় কাজগুলো।
 
আউশ ধান
আউশ ধানের বাড়ন্ত পর্যায় এখন। এ সময় ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য যত্ন নিতে হবে। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগ ও পোকামাকড় দমন করতে হবে। এ মাসে বন্যার সম্ভাবনা এবং প্রকোপ দুটোই বাড়ে। বন্যার আশঙ্কা হলে আগাম রোপণ করা আউশ ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলেই কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
 
আমন ধান
আমন ধানের বীজতলা তৈরির সময় এখন। পানিতে ডুবে না এমন উঁচু খোলা জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। বীজতলায় বীজ বপন করার আগে ভালো জাতের সুস্থ সবল বীজ নির্বাচন করতে হবে। রোপা আমনের উন্নত জাতগুলো হলো বিআর১০, বিআর২৫, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩১, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১। এছাড়া লবণাক্ত জমিতে ব্রি ধান৪৪ চাষ করতে পারেন। এসব মানসম্মত বীজ আপনার কাছে না থাকলে বিএডিসির বীজ বিক্রয় কেন্দ্র, বিশ্বস্ত ডিলার বা অভিজ্ঞ চাষিভাইদের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। ভালো চারা পেতে হলে প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি গোবর, ১০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে।
 
আষাঢ় মাসে রোপা আমন ধানের চারা রোপণ শুরু করা যায়। অধিক ফলন পেতে হলে শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ৯০ কেজি টিএসপি, ৭০ কেজি এমওপি, ১১ কেজি দস্তা এবং ৬০ কেজি জিপসাম দিতে হবে। জমিতে চারা সারি করে রোপণ করতে হবে। এতে ধানক্ষেতের পরবর্তী পরিচর্যা বিশেষ করে আগাছা দমন সহজ হবে।
 
পাট
পাট গাছের বয়স চার মাস হলে ক্ষেতের পাট গাছ কেটে নিতে হবে। পাট গাছ কাটার পর চিকণ ও মোটা পাট গাছ আলাদা করে আঁটি বেঁধে দুই/তিন দিন দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে। এত গাছের পাতা ঝরে যাবে। পাতা ঝরে গেলে ৩/৪দিন পাটগাছগুলোর গোড়া এক ফুট পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হবে। এরপর পরিষ্কার পানিতে জাগ দিতে হবে। জাগ দেয়ার পর জাগের উপর কচুরিপানা বা খড় বিছিয়ে দিলে ভালো হয়। জাগ দেয়ার পর নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখতে হবে যেন পাটের আঁশ খুব বেশি পচে না যায়। পাট পচে গেলে পানিতে আঁটি ভাসিয়ে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে পাটের আঁশের গুণাগুণ ভালো থাকবে। ছাড়ানো আঁশ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ে শুকাতে হবে।
 
যেসব জায়গায় জাগ দেয়ার পানির অভাব সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে পারেন। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচন সময় কমে যায়। তবে মনে রাখতে হবে পাট কাটার সাথে সাথে ছালকরণ করতে হবে, তা না হলে পরবর্তীতে রৌদ্রে পাট গাছ শুকিয়ে গেলে ছালকরণে সমস্যা হবে।
 
চাষিভাইরা ইচ্ছা করলে পাটের বীজ উৎপাদনের ব্যবস্থা নিতে পারেন। আষাঢ় মাসেই এ উদ্যোগ নেয়া দরকার। পাট গাছের বয়স ১০০ দিন হলে গাছের এক থেকে দেড় ফুট ডগা কেটে নিতে হবে। এসব ডগাকে আবার ৩/৪ টুকরা করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে প্রতি টুকরায় যেন দুটি গিঁট থাকে। এসব টুকরো ভেজা জমিতে দক্ষিণমুখী কাত করে রোপণ করতে হবে। রোপণ করা টুকরোগুলো থেকে ডালপালা বের হয়ে নতুন চারা হবে। পরবর্তীতে এসব চারায় প্রচুর ফল ধরবে এবং তা থেকে বীজ পাওয়া যাবে।
 
ভুট্টা
খরিফ ভুট্টার মোচা এখন সংগ্রহ করা যাবে। পরিপক্ব হওয়ার পর বৃষ্টিতে নষ্ট হবার আগে মোচা সংগ্রহ করে  ঘরের বারান্দায় সংগ্রহ করতে পারেন। রোদ হলে শুকিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর যদি মোচা পাকতে দেরি হয়, তবে মোচার আগা চাপ দিয়ে নিম্নমুখী করে দিলে বৃষ্টিতে মোচা নষ্ট হবে না।
 
শাকসবজি
এ সময়ে উৎপাদিত শাকসবজির মধ্যে আছে ডাঁটা, গিমাকলমি, পুঁইশাক, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, ঝিঙা, শসা, ঢেঁড়স, বেগুন। এসব সবজির গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনে মাটি তুলে দিতে হবে। সবজি ক্ষেতে পানি জমতে দেয়া যাবে না। পানি জমে গেলে সরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
লতানো সবজির দৈহিক বৃদ্ধি যত বেশি হবে তার ফুল ফল ধারণক্ষমতা তত কমে যায়। সেজন্য বেশি বৃদ্ধি সমৃদ্ধ লতার/গাছের ১৫-২০ শতাংশের পাতা লতা কেটে দিলে তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরবে। কুমড়া জাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন অধিক ফলনে দারুণভাবে সহায়তা করবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে।
 
আগাম জাতের শিম  এবং লাউয়ের জন্য প্রায় ৩ ফুট দূরে দূরে ১ ফুট চওড়া ও ১ ফুট গভীর করে মাদা তৈরি করতে হবে। মাদা তৈরির সময় গর্তপ্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম সরিষার খৈল, ২ কেজি ছাই, ১০০ গ্রাম টিএসপি ভালোভাবে মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।এরপর প্রতি গাদায় ৩/৪টি ভালো সবল বীজ রোপণ করতে হবে। বর্ষায় পানি যেন মাদার কোন ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সম্ভব হলে মাঁচার ব্যবস্থা করতে হবে।
 
গাছপালা
এ সময়টা গাছের চারা রোপণের জন্য খুবই  উপযুক্ত। বসতবাড়ির আশপাশে, খোলা জায়গায়, চাষাবাদের অনুপযোগী পতিত জমিতে, রাস্তাঘাটের পাশে, পুকুর পাড়ে, নদীর তীরে গাছের চারা বা কলম রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে। এ সময় বনজ গাছের চারা ছাড়াও ফল ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে পারেন। ফলের চারা রোপণের আগে গর্ত তৈরি করতে হবে। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী এক ফুট চওড়া ও এক ফুট গভীর গর্ত করে গর্তের মাটির সাথে ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার মিশিয়ে, দিন দশের পরে চারা বা কলম লাগাতে হবে। বৃক্ষ রোপণের ক্ষেত্রে উন্নত জাতের রোগমুক্ত সুস্থ-সবল চারা বা কলম রোপণ করতে হবে।  চারা শুধু রোপণ করলেই হবে না। এগুলোকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। চারা রোপণের পর শক্ত খুঁটির দিয়ে চারা বেঁধে দিতে হবে। এরপর বেড়া বা খাঁচা দিয়ে চারা রক্ষা করা, গোড়ায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, সেচনিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।
 
নার্সারি মালিক যারা তাদের মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুব জরুরি। সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, দুর্বল রোগাক্রান্ত ডালপালা কাটা বা ছেঁটে দেয়ার কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে হবে।
 
প্রাণিসম্পদ
বর্ষাকালে হাঁস-মুরগির ঘর যাতে জীবাণুমুক্ত ও আলো-বাতাসপূর্ণ থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এ মাসে হাঁস-মুরগির কৃমি, কলেরা, রক্ত আমাশা, পুলরাম রোগ, সংক্রমণ সর্দি দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। হাঁস-মুরগিকে ভেজা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় না রেখে শুকনো ঘরে রাখতে হবে এবং মাঝে মধ্যে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে।
 
বর্ষাকালে গবাদিপশুকে সংরক্ষণ করা খড়, শুকনো ঘাস, ভুসি, কুঁড়া খেতে দিতে হবে। সে সাথে কাঁচা ঘাস খাওয়াতে হবে। মাঠ থেকে সংগৃহীত সবুজ ঘাস ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খাওয়ানো যাবে না। বর্ষাকালে গবাদিপশুর গলাফোল, তড়কা, বাদলা, ক্ষুরা রোগ মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। এ জন্য প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে। কৃমির আক্রমণ রোধ করার জন্য কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে। হাল চাষের পর গরুকে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এছাড়া যে কোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
 
মৎস্য সম্পদ
বর্ষা মৌসুমে বন্যায় মাছ চাষের অনেক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য পুকুরের পাড় উঁচু করে দেয়া জরুরি। বন্যার সময় পুকুরে মাছ আটকানোর জন্য জাল, বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আষাঢ় মাস মাছের পোনা ছাড়ার উপযুক্ত সময়। মাছ চাষের জন্য মিশ্র পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন। পুকুরে তিন স্তরের উপযোগী মাছের পোনা ছাড়তে হবে। একই সাথে পুকুরে নিয়মিত খাবার দিতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। বড় পুকুরে, হাওরে, বিলে, নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করতে পারেন। মাছ চাষের যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
 
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের আগাম নিশ্চিত প্রস্তুতির জন্য আগামী মাসে বৃহত্তর কৃষির সমুদয় কাজের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়ে দেই। আমাদের বিশ্বাস সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম বাস্তবায়নে আপনাদের প্রাথমিক প্রস্তুতি নিতে এগুলো বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। এরপরও যদি আরও নতুন কোন তথ্য প্রযুক্তি বা কৌশল জানার থাকে অথবা কোন বিষয়ে বিস্তারিত জনতে চান তাহলে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি-মৎস্য-প্রাণী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিলে আরও বেশি লাভবান হবেন। সে সাথে দেখবেন কৃষির সফলতায় শুধু আপনিই উদ্ভাসিত নন, উদ্ভাসিত দেশের কৃষি এবং পুরো দেশ। আবার কথা হবে আগামী মাসের কৃষিকথায়। নববর্ষার প্রতিটি ফোঁটা বয়ে আনুক আমাদের কৃষির সুখ-সমৃদ্ধি। আপনাদের সবার জন্য নিরন্তন শুভ কামনা। কৃষির সমৃদ্ধিতে আমরা সবাই গর্বিত অংশীদার।
 
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*
* সহকারী তথ্য অফিসার (শস্য উৎপাদন), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫
বিস্তারিত
বই পরিচিতি (কৃষিকথা বলছি)
‘কৃষিকথা’ এ দেশের কৃষি আর কৃষকের কথা তুলে ধরছে মানুষের কাছে গত পঁচাত্তর বছর ধরে। কৃষি বিষয়ক এ পত্রিকাটি এদেশের কৃষি উন্নয়নের নানা পরিবর্তনের এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। এ দেশের কৃষির পরিবর্তন আর রূপান্তরের স্বাক্ষর এর প্রতিটি পাতায় পাতায়। ‘কৃষিকথা’ এ দেশের কৃষকের কাছে এক অতি জনপ্রিয় পত্রিকা। এ দেশের কৃষির সাথে অম্বিষ্ট হয়ে থাকা ‘কৃষিকথা’ পত্রিকা যখন নিজেই নিজের কথা বলতে শুরু করে তখন তা আকর্ষণীয় ঘটনা না হয়েই পারে না। কৃষিকথার নিজের জবানীতে কৃষিকথার জন্ম কথা, দেশের নানা ঘটনা পরম্পরাসহ জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃষি নিয়ে কিছু উক্তি, কৃষিকথার কিছু লেখকের স্মৃতি এবং কৃষিকথায় প্রকাশিত কিছু আকর্ষণীয় কবিতা অবলম্বনে কৃষিকথায় নানা প্রসঙ্গ তুলে এনেছেন কৃষিকথার সহকারী সম্পাদক মো. মতিয়ার রহমান। গত প্রায় এক দশক সময় ধরে মতিয়ার রহমান এই পত্রিকাটির সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার সুবাদে অনেক অজানা বিষয় চমৎকারভাবে ‘কৃষিকথা বলছি’ গ্রন্থটিতে তুলে এনেছেন। আশ্চর্য এক মমতায় লেখক এর মধ্য দিয়ে কৃষিকথার ইতিহাসকে সবার সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তিনি কৃষিকথার নানা বিবর্তনের পাশাপাশি তুলে এনেছেন কৃষিকথার দায়িত্ব পালনকারী সম্পাদকদের তালিকা, তুলে এনেছেন কৃষিকথার কয়েক জন বিশিষ্ট বন্ধুর পরিচিতি, কৃষি তথ্য সার্ভিসের অফিস প্রধানদের তালিকাসহ কৃষিকথা মুদ্রণ কাজের নানা ধাপগুলোও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ দেশের কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রযুক্তি প্রচার ও এর প্রসার ঘটাতে সদা দায়িত্ব পালন করে আসছে। কৃষিকথা তার জবানীতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গঠনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসসহ তুলে ধরেছে বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও। কৃষির নানা টুকিটাকি বিষয়ের সংজ্ঞা তিনি সবার জ্ঞাতার্থে উপস্থাপন করেছেন সহজ ভাষায়। এমনকি এ দেশে কৃষি নিয়ে যেসব পত্রিকা বের হচ্ছে সেসব পত্রিকার সম্পাদকসহ পত্রিকার তালিকাও রয়েছে এ গ্রন্থটিতে। জনাব রহমান তার সারা জীবনই মূলত কাটিয়েছেন কৃষিকথার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে। অত্যন্ত ধৈর্যশীল, অমায়িক এক নিরেট ভদ্রলোক মানুষ তিনি। কৃষিকথার সম্পাদকের সাথে এর লেখকদের কদাচিৎ দেখা হয়েছে বটে তবে জনাব রহমানের সাথে লেখকদের এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এর সাথে তার দীর্ঘ বন্ধনের কারণেই। ফলে এ ধরনের একটি গ্রন্থ রচনার অধিকার তার রয়েছে বলে আমাদের মানতেই হবে।
 
ফলে তিনি যে কৃষিকথার সুপার ফ্রেন্ড হয়ে উঠতে পেরেছেন সে কথা বলাইবাহুল্য। এ স্বীকৃতি কৃষিকথা যে দিয়েছে সেটিও যৌক্তিক কারণে সঠিক হয়েছে বলে মনে হয়। ‘কৃষিকথা বলছি’ গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করা হয়েছে অনেকগুলো কৃষিকথার কাভার পৃষ্ঠা দিয়ে। গ্রন্থটি যে কৃষিকথার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে লিখিত এর শুধু নাম নয় বরং এর প্রচ্ছদই সে কথা বলে দিচ্ছে। সুন্দর ঝকঝকে ছাপা ১২০ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে প্রান্ত প্রকাশন, ৩৬ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০। এর মূল্য ২০০ টাকা মাত্র। গ্রন্থটি কৃষিকথার ভক্ত পাঠক ছাড়াও দেশের কৃষি ও কৃষির রূপান্তর নিয়ে যারা ভাবেন তাদের জন্য একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে পরিগণিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। আমি বইটির বহুল প্রচার প্রত্যাশা করছি। বইটি কৃষি তথ্য সার্ভিসের বিক্রয় কেন্দ্র ও প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ করে (মোবাইল : ০১৭১৩৭৪৪৩৮০) সংগ্রহ করতে পারেন। 
 
ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া*
* প্রফেসর, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ এবং প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭
বিস্তারিত
সম্পাদকীয় জ্যৈষ্ঠ-১৪২২

জ্যৈষ্ঠ মাস। এ মাসে শহর কিংবা গ্রামের বাজারগুলোতে দেখা যায় নানা রকম ফলের সমাহার। ফলের সুমধুর ঘ্রাণ আর মৌমাছির গুঞ্জরণে মুখরিত হয় চারদিক। ফলের মিষ্টি রসে সিক্ত হয় শিশু-কিশোরদের মায়াবী মুখ। ‘পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ-কবির এ কথায় গ্রাম বাংলার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। জাম পুষ্টি ও ঔষধি গুণে ভরপুর। জামে রয়েছে ভিটামিন সি, জিঙ্ক, কপার, গ্লুকোজ, ডেক্সট্রোজ ও ফ্রুকটোজ, ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও স্যালিসাইলেটসহ অসংখ্য উপাদান। জাম স্মৃতিশক্তি প্রখর রাখতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে শরীর সুস্থ রাখে। জামে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি। যার জন্য এটা দেহে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি পূরণ করে এবং একই সঙ্গে ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ করে।


এছাড়া মুখের দুর্গন্ধ রোধ, দাঁত মজবুত, মাঢ়ি শক্ত এবং মাঢ়ির ক্ষয়রোধেও জামের জুড়ি নেই। এতে বিদ্যমান পানি, লবণ ও পটাসিয়ামের মতো উপাদান গরমে শরীর ঠাণ্ডা এবং শারীরিক দুর্বলতাকে দূর করে। জামে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে, যা রক্তস্বল্পতা দূর করে। জাম রক্তের কোলস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃৎপিন্ড ভালো রাখে। এছাড়া জামের বীচি, ছাল ও পাতার রস অনেক রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে। ফসলের বীজ শোধনে জাম পাতার রস ব্যবহৃত হয়। এক কথায় জাম বহুগুণে গুণান্বিত এক ফলের নাম। আমরা আশা করি অন্যান্য ফলের পাশাপাশি প্রত্যেকেই  অন্তত একটি জামের চারা রোপণ করবেন এবং তা থেকে ফল ভোগ করে উপকৃত হবেন।


সুপ্রিয় চাষি ভাইয়েরা, আপনারা জানেন জ্যৈষ্ঠ মাস এখন শুধু ফলের মাসই নয়, জ্যৈষ্ঠ মাস বোরো ধান সংগ্রহ ও সংরক্ষণেরও মাস। এ মাস ফলের সঙ্গে ফসলের প্রাপ্তিযোগের কারণে কৃষক-কৃষাণী ভাইবোনদের মন প্রাণও আনন্দরসে ভরপুর থাকার কথা। কারণ এখন দেশের মোট আবাদি জমির বেশির ভাগেই বোরো ধানের চাষ হয়ে থাকে এবং এ ধান জ্যৈষ্ঠ মাসেই ঘরে তোলা হয়। তাই নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দ ও পাকা ফলের রসে রসনাতৃপ্তি এ যেন এক স্বপ্নপুরি-শান্তির নীড়। আমরা চাই সারা বছর আপনারা মনে প্রাণে আনন্দে থাকুন, শান্তি-সুখের নীড়ে থাকুন, দেশের সমৃদ্ধিতে অবদান রাখুন।

 

বিস্তারিত

Share with :
Facebook Facebook