কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

কৃষক পর্যায়ে শাকসবজির বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ

টেকসই ফসল উৎপাদনে গুণগত মানসম্পন্ন বীজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু গুণগত মানসম্পন্ন বীজই কেবল শতকরা ১৫-২০ ভাগ উৎপাদন বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি সবজিসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। ফসলের ফলন ও উৎপাদনের সাথে গুণগত মানসম্পন্ন বীজ নিবিড়ভাবে জড়িত। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ অনু বিভাগের তথ্য মতে, ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশে সবজি বীজের মোট কৃষি তাত্ত্বিক চাহিদা ছিল ২,২৯১ মে. টন (যদিও প্রকৃত চাহিদা ৪,৫০০ মে. টন); যার শতকরা ৩.২০ ভাগ (৭৩ মে. টন) সরকারি সংস্থা তথা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) বীজ বিতরণ করে, যেখানে বেসরকারি সংস্থাগুলো প্রায় শতকরা ৮০.৮০ ভাগ (১,৮৫৪ মে. টন) বীজ বিতরণ করে এবং বাকি শতকরা ১৬ ভাগ কৃষক তার নিজের সংরক্ষিত বীজ ব্যবহার করে। কৃষকের নিজের চাহিদামতো বীজ যদি নিজে সঠিকভাবে উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারে তাহলে একদিকে বীজের মান নিশ্চিত করা যায় অন্য দিকে অন্যের উপর নির্ভর করতে হয় না এবং খরচও কম হয়। এজন্য কৃষক পর্যায়ে সবজি বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হলো।


জাত ও বীজ নির্বাচন : যে কোনো ফসল চাষ করার আগে সে ফসলের সবচেয়ে ভালো জাতের বীজ সংগ্রহ করতে হবে। স্থানীয় চাহিদাও বিবেচনা রাখতে হবে। বীজের মধ্যে অন্য জাতের মিশ্রণ যেন না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শুধুমাত্র রোগ-জীবাণু মুক্ত, স্পষ্ট এবং চকচকে বীজই চাষের জন্য ব্যবহার করতে হবে। সরাসরি বীজ বপন করে চাষ করা হয় যেসব শাকসবজি তা হলো মুলা, লালশাক, ডাঁটা, ঢেঁড়স, পুঁইশাক, কুমড়া, শিম জাতীয় ইত্যাদি। অন্য দিকে চারা উৎপাদন করে যেসব সবজি চাষ করা হয় তার মধ্যে বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন ও টমেটো উল্লেখযোগ্য।


বীজতলার স্থান নির্বাচন : বীজতলার জমি অপেক্ষাকৃত উঁচু হওয়া প্রয়োজন যাতে বৃষ্টি বা বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা যায়। ছায়াবিহীন, পরিষ্কার এবং বাতাস চলাচলের উপযোগী স্থানে বীজতলা করা প্রয়োজন। পানির উৎসের কাছাকাছি হওয়া উচিত। বীজতলার মাটি বেলে দোআঁশ বা দোআঁশ এবং উর্বর হওয়া উচিত।


বীজতলা তৈরি : একক বীজতলা বা হাপোর বা বেড সাধারণত ১ মিটার চওড়া ও ৩ মিটার লম্বা হবে। জমির অবস্থা ভেদে দৈর্ঘ্য বাড়ানো কমানো যেতে পারে। পাশাপাশি দুটি বীজতলার মধ্যে কমপক্ষে ৬০ সেমি. গভীর করে ঝুরঝুরা ও ঢেলা মুক্ত করে তৈরি করতে হবে। বীজতলা সাধারণত ১০-১৫ সেমি. উঁচু করে তৈরি করতে হবে। মাটি, বালি ও পচা গোবর সার বা কম্পোস্ট মিশিয়ে বীজতলার মাটি তৈরি করতে হবে। মাটি উর্বর হলে রাসায়নিক সার না দেয়াই ভালো। উর্বরতা কম হলে প্রতি বেডে ১০০ গ্রাম টিএসপি সার বীজ বপনের অন্তত এক সপ্তাহ আগে মিশাতে হবে। যারা বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন করেন তাদের জন্য ইট-সিমেন্ট দিয়ে স্থায়ী বীজতলা তৈরিই শ্রেয়।
বীজতলার মাটি শোধন : বীজ বপনের পূর্বে বীজতলার মাটি বিভিন্ন পদ্ধতিতে শোধন করা যায়। এতে অনেক মাটিবাহিত রোগ, পোকামাকড় আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে দমন করা যায়। যেমন-সৌরতাপ ব্যবহার করে, জলীয়বাষ্প ব্যবহার করে, ধোঁয়া ব্যবহার করে, রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে, কাঠের গুঁড়া পুড়িয়ে বা পোলট্রি রিফিউজ ব্যবহার করে। তবে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী পদ্ধতি হলো সৌরতাপ ব্যবহার করে বীজতলার মাটি শোধন করা। এক্ষেত্রে বীজ বপনের ১২-১৫ দিন পূর্বে বীজতলার মাটি যথাযথভাবে তৈরি করে ভালোভাবে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। পরে স্বচ্ছ অথবা রঙিন পলিথিন দিয়ে বায়ু নিরোধক করে ঢেকে রাখতে হবে। এতে সারা দিনের সূর্যালোকে পলিথিনের ভেতরে বীজতলার মাটির তাপমাত্রা যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে ও অনেকাংশে মাটিবাহিত রোগজীবাণু দমন করবে। এছাড়াও অনেক ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও আগাছা দমন হয়।


বীজ শোধন : বীজতলায় বপনের পূর্বে সবজি বীজ কয়েকটি পদ্ধতিতে শোধন করা যায়। যেমন- এগুলোর মধ্যে গুঁড়া রাসায়নিক ওষুধ দ্বারা বীজ শোধন পদ্ধতি বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত ও কম ঝামেলাপূর্ণ। প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম ভিটাভেক্স-২০০ ব্যবহার করে ভালোভাবে ঝাকিয়ে বীজ শোধন করা যায়। বীজ শোধনের ফলে বিভিন্ন সবজির অ্যানথ্রাকনোজ, পাতায় দাগ, ব্লাইট ইত্যাদি রোগ ও বপন পরবর্তী সংক্রমণ রোধ সম্ভব হয়।


বীজের অঙ্কুরোদগম বা গজানো পরীক্ষা : শাকসবজির বীজ বপনের পূর্বে গজানো পরীক্ষা করে নেয়া প্রয়োজন। এজন্য ছোট থালা বা বাটি নিয়ে তার ওপর বালি পানি দিয়ে ভিজিয়ে ৫০-১০০টি বীজ কয়েক দিন রেখে অঙ্কুরোদগমের শতকরা হার বের করে নিতে হবে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মুলা, মিষ্টিকুমড়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে কমপক্ষে শতকরা ৭৫ ভাগ এবং গাজর, পালংশাক, ঢেঁড়স ইত্যাদির ক্ষেত্রে কমপক্ষে শতকরা ৫৫-৬০ ভাগ বীজ গজানোর ক্ষমতা থাকতে হবে। অঙ্কুরোদগম হার বের করার মাধ্যমে মূল্যবান বীজের সঠিক পরিমাণ, চারার সংখ্যা ইত্যাদি নির্ধারণ করা সহজ হয়।


বীজ বপন : বীজতলায় সারি করে বা ছিটিয়ে বীজ বপন করা যায়, তবে সারিতে বপন করা উত্তম। সারিতে বপনের জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট দূরত্বে (৪ সে.মি.) কাঠি দিয়ে ক্ষুদ্র নালা তৈরি করে তাতে বীজ ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ছোট বীজের বেলায় বীজের দ্বিগুণ পরিমাণ শুকনো ও পরিষ্কার বালু বা মিহি মাটি বীজের সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে মাটিতে বীজ বপন করতে হবে। শুকনা মাটিতে বীজ বপন করে সেচ দেয়া উচিত নয়, এতে মাটিতে চটা বেঁধে চারা গজাতে ও বাতাস চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সেচ দেয়া মটির ‘জো’ অবস্থা এলে বীজ বপন করতে হবে। যেসব বীজের আবরণ শক্ত, সহজে পানি প্রবেশ করে না, সেগুলোকে সাধারণত বোনার পূর্বে পরিষ্কার পানিতে ১৫-২০ ঘণ্টা অথবা শতকরা একভাগ পটাশিয়াম নাইট্রেট দ্রবণে এক রাত্রি ভিজিয়ে বপন করতে হয় (যেমন- লাউ, চিচিংগা, মিষ্টিকুমড়া, করলা, উচ্ছে ও ঝিঙ্গা)।


চারা উৎপাদনের বিকল্প পদ্ধতি : প্রতিকূল আবহাওয়ার বীজতলায় চারা উৎপাদনের জন্য বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে সবজির চারা কাঠের বা প্লাস্টিকের ট্রে, পলিথিনের ব্যাগে, মাটির টবে, গামলায়, থালায়, কলার খোলে উৎপাদন করা যায়। কোনো কোনো সময় কুমড়া, শিম জাতীয় সবজির চারা রোপণ করা প্রয়োজন দেখা যায়। কিন্তু এসব সবজি রোপণজনিত আঘাত সহজে কাটিয়ে উঠতে পারে না। ছোট আকারের পলিথিনের ব্যাগে বা উপরে উল্লিখিত অন্যান্য মাধ্যমে এদের চারা উৎপাদন করলে সহজে শেকড় ও মাটিসহ চারা রোপণ করা যায়। ইদানীংকাল মাটিবিহীন অবস্থান কেকোডাস্ট দিয়ে রোগমুক্ত চারা তৈরি করা হচ্ছে।


বীজতলায় আচ্ছাদন : আবহাওয়া এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বীজতলার ওপরে আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে হবে যেন বৃষ্টির পানি ও অতিরিক্ত সূর্যতাপ থেকে বীজতলাকে রক্ষা করা যায়। আচ্ছাদন বিভিন্নভাবে করা যায়। তবে কম খরচে বাঁশের ফালি করে বীজতলার প্রস্থ বরাবর ৫০ সেমি. পরপর পুঁতে নৌকার ছৈ এর আকার তৈরি করে বৃষ্টির সময় পলিথিন দিয়ে এবং প্রখর রোদে চাটাই দিয়ে বীজতলার চারা রক্ষা করা যায়।


চারার যত্ন : চারা গজানোর পর থেকে ১০-১২ দিন পর্যন্ত হালকা ছায়া দিয়ে অতিরিক্ত সূর্যতাপ থেকে চারা রক্ষা করা প্রয়োজন। পানি সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচর্যা। তবে বীজতলার মাটি দীর্ঘ সময় বেশি ভেজা থাকলে অঙ্কুরিত চারা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চারার শিকড় যথেষ্ট বৃদ্ধি পেলে রোদ কোনো ক্ষতি করতে পারে না তখন এটি বরং উপকারী। চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর বীজতলায় প্রয়োজনমতো দূরত্ব ও পরিমাণে চারা রেখে অতিরিক্ত চারাগুলো যত্ন সহকারে উঠিয়ে দ্বিতীয় বীজতলায় সারি করে রোপণ করলে মূল্যবান বীজের সাশ্রয় হবে।


দ্বিতীয় বীজতলায় চারা স্থানান্তরকরণ : জমিতে চারা লাগানোর পূর্বে মূল বীজতলা থেকে তুলে দ্বিতীয় বীজতলায় সবজি চারা রোপণের পদ্ধতি অনেক দেশেই চালু আছে। দেখা গেছে ১০-১২ দিনের চারা দ্বিতীয় বীজতলায় স্থানান্তরিত করা হলে কপি গোত্রের সবজি, বেগুন ও টমেটো চারার শিকড় বিস্তৃত ও শক্ত হয়, চারা অধিক সবল ও তেজী হয়। চারা উঠানোর আগে বীজতলায় পানি দিয়ে এরপর সূচালো কাঠি দিয়ে শিকড়সহ চারা উঠাতে হয়। উঠানো চারা সাথে সাথে দ্বিতীয় বীজতলায় লাগাতে হয়। বাঁশের সূচালো কাঠি বা কাঠের তৈরি সূচালো ফ্রেম দিয়ে সমান দূরত্বে সরু গর্ত করে চারা গাছ লাগানো হয়। লাগানোর পর হালকা পানি দিতে হবে এবং বৃষ্টির পানি ও প্রখর রোদ থেকে রক্ষার জন্য পলিথিন বা চাটাই দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।


বীজতলায় চারার রোগ দমন : অঙ্কুরোদগমরত বীজ আক্রান্ত হলে তা থেকে আদৌ চারা গজায় না। গজানোর পর রোগের আক্রমণ হলে চারার কাণ্ড মাটি সংলগ্ন স্থানে পচে গিয়ে নেতিয়ে পড়ে। একটু বড় হওয়ার পর আক্রান্ত হলে চারা সাধারণত মরে না কিন্তু এদের শিকড় দুর্বল হয়ে যায়। চারা এভাবে নষ্ট হওয়াকে ড্যাম্পিং অফ বলে। বিভিন্ন ছত্রাক এর জন্য দায়ী। বীজতলার মাটি সব সময় ভেজা থাকলে এবং মাটিতে বাতাস চলাচলের ব্যাঘাত হলে এ রোগ বেশি হয়। এজন্য বীজতলার মাটি সুনিষ্কাশিত রাখা রোগ দমনের প্রধান উপায়। প্রতিষেধক হিসেবে মাটিতে কপার অক্সিক্লোরাইড বা ডায়থেন এম-৪৫ দুই গ্রাম এক লিটার পানিতে মিশিয়ে বীজতলার মাটি ভালোকরে ভিজিয়ে কয়েক দিন পর বীজ বপন করতে হবে। এছাড়াও কাঠের গুঁড়া পুড়িয়ে, সৌরতার, পোলট্রি রিফিউজ ও খৈল ব্যবহার করেও ড্যাম্পিং অফ থেকে চারাকে রক্ষা করা যায়।


চারা কষ্টসহিষ্ণু করে তোলা : রোপণের পর মাঠের প্রতিকূল পরিবেশ যেমন ঠা-া আবহাওয়া বা উচ্চতাপমাত্রা, পানির স্বল্পতা, শুষ্ক বাতাস এবং রোপণের ধকল ও রোপণকালীন সময়ে চারায় সৃষ্ট ক্ষত ইত্যাদি যাতে সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারে সেজন্য বীজতলায় থাকাকালীন চারাকে কষ্ট সহিষ্ণু করে তোলা হয়। যেকোন উপায়ে চারার বৃদ্ধি সাময়িকভাবে কমিয়ে যেমন বীজতলায় ক্রমান্বয়ে পানি সেচের পরিমাণ কমিয়ে বা দুই সেচের মাঝে সময়ের ব্যবধান বাড়িয়ে চারাকে কষ্ট সহিষ্ণু করে তোলা যায়। কষ্ট সহিষ্ণুতা বর্ধনকালে চারার শে^তসার (কার্বোহাইড্রেট) জমা হয় এবং রোপণের পর এই স্বেতসার দ্রুত নতুন শিকড় উৎপাদনে সহায়তা করে। ফলে সহজেই চারা রোপণজনিত আঘাত সয়ে উঠতে পারে।


মূল জমিতে চারা রোপণ : বীজতলায় বীজ বপনের নির্দিষ্ট দিন পর চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হয়। সবজির প্রকারভেদে চারার বয়স ভিন্নতর হবে। কপি জাতীয় সবজি, টমেটো, বেগুন ইত্যাদির চারা ৩০-৪০ দিন বয়সে রোপণ করতে হয়। চারা উঠানোর পূর্বে বীজতলার মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে। যত্ন করে যতদূর সম্ভব শিকড় ও কিছু মাটিসহ চারা উঠাতে হবে। মূল জমিতে চারা লাগানোর পরপরই গোড়ায় পানি দিতে হবে এবং কয়েক দিন পর্যন্ত নিয়মিত সেচ দিতে হবে। চারা সাধারণত বিকাল বেলায় লাগানো উচিত।


রোপণ দূরত্ব ও পৃথকীকরণ : সঠিক রোপণ ও পৃথকীকরণ দূরত্ব বজায় না রাখলে বীজের কাক্সিক্ষত মান ও বিশুদ্ধতা রক্ষা হয় না। লাগানোর সময় এগিয়ে এনে বা পিছিয়ে নিয়েও বীজের জমি পৃথকীকরণ করা যায়। মনে রাখতে হবে স্বপরাগায়িত ফুলেরও শতকরা ৫ ভাগ পরপরাগায়ন হওয়ার সুযোগ রয়েছে, এমনকি শতকরা ৫০ ভাগ পর্যন্ত পরপরাগায়ন হয়ে যেতে পারে, ফলে বীজের বিশুদ্ধতা বজায় থাকে না। স্বপরাগায়িত সবজিগুলো হচ্ছে বেগুন, টমেটো, ঢেঁড়স, বরবটি, শিম ইত্যাদি। আর পরপরাগায়িত সবজির তালিকায় রয়েছে কুমড়া, কপি জাতীয়, লালশাক, ডাঁটা, মুলা, পুঁইশাক, পালংশাক ইত্যাদি।  

 
বিশেষ পরিচর্যা : কপি জাতীয় ফসলের বীজ উৎপাদনে গৌন পুষ্টি উপাদান যেমন- বোরন ও মলিবডেনামের প্রতি সংবেদনশীল। তাই পরিমাণ মত সার দিতে হবে।
মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপির বীজদ- প্রতিকূল আবহাওয়ায় যেন হেলে না পড়ে সেজন্য কাঠি বা ঠেকনা দিতে হবে।
টমেটো-বেগুনের ক্ষেত্রে ভালো গাছ দেখে ফুল ফোটার পূর্বেই এদের ফুল ব্যাগ দ্বারা ঢেকে দেয়া যেতে পারে যাতে পরপরাগায়ন ঘটে জাতের বিশুদ্ধতা নষ্ট না হয়।
ফুলকপির প্রপুষ্পমঞ্জুরিটি বা ভক্ষণ অংশ শক্ত আকারের হয় তখন প্রপুষ্পমঞ্জুরিটি মাঝের অংশটি কেটে তুলে নিলে তাড়াতাড়ি ফুল ফুটতে সাহায্য করে। বাঁধাকপির ক্ষেত্রেও ভক্ষণযোগ্য অংশের গ্রোয়িং পয়েন্ট রেখে আড়াআড়ি কেটে নিলে ফুল তাড়াতাড়ি ফুটে। মৌমাছি যাতে ভিড়তে পারে সে ব্যবস্থা নিতে হবে (মৌবাক্স স্থাপন করা যেতে পারে)।


মুলার বয়স ৪০-৪৫ দিন হলে জমি থেকে সমস্ত মুলা উঠিয়ে জাতের বিশুদ্ধতা, আকৃতি, রোগবালাই ইত্যাদি বিবেচনা করে মুলা বাছাই করতে হবে। বাছাইকৃত মুলার মূলের এক-তৃতীয়াংশ এবং পাতার দুই-তৃতীয়াংশ কেটে ফেলতে হবে। মূলের কাটা অংশ ডায়থেন এম-৪৫ (২ গ্রাম ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে) এর দ্রবণে ডুবিয়ে নিতে হবে। পরে সারি পদ্ধতিতে ৪০ী৩০ সেমি. দূরত্বে মুলা গর্তে স্থাপন করে পাতার নিচ পর্যন্ত মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এতে অধিক পরিমাণে উন্নতমানের বীজ পাওয়া যাবে।


কুমড়া জাতীয় সবজিতে একই গাছে ভিন্নভাবে স্ত্রী-পুরুষ ফুল বা স্ত্রী-পুরুষ আলাদা গাছ হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে কৃত্রিম বা হাত পরাগায়ন এক কার্যকর পদ্ধতি। ফুল ফোটার সময় জানা কৃত্রিম পরাগায়নের পূর্বশর্ত। সাদা ফুল যেমন- লাউ, চিচিঙ্গা সাধারণত বিকেল হতে সন্ধ্যার মধ্যে ফোটে, তবে ব্যতিক্রম- কাঁকরোল, পটোল সাদা ফুল হওয়ার পরও সকালে ফোটে। আবার রঙিন ফুল যেমন- চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, করলা, ধুন্দল সাধারণত ভোর হতে সকাল ৯ টার মধ্যে ফোটে তবে ব্যতিক্রম ঝিঙ্গা রঙিন ফুল হওয়ার পরও বিকেলে ফোটে। এক্ষেত্রে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ফোটার আগেই পেপার ব্যাগ দ্বারা বেঁধে রাখতে হবে যাতে অন্য জাতের পুরুষ ফুলের রেণু দ্বারা পরাগায়িত হতে না পারে এবং ফুল ফুটলে স্ত্রী ফুল পরাগায়িত করে আবার ব্যাগ দ্বারা স্ত্রী ফুল ৩-৪ দিন বেঁধে রাখা ভালো।


কাঁকরোল/করলার বীজ হতে প্রচুর পুরুষ গাছ পাওয়া যায়। তাই স্ত্রী-পুরুষ গাছের কন্দমূল (শিকড়) আলাদাভাবে চিহ্নিত করে রেখে পরবর্তী বছর চাষ করা যায়। বীজতলায় কিংবা সরাসরি জমিতে শাখা-কলম বা কাটিং লাগিয়েও চারা উৎপাদন করা যায়।
ডাঁটা-লালশাকের ক্ষেত কাটানটে আর পালংশাকের জমিতে বথুয়া আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।
বীজের জমি যেন রোগে আক্রান্ত না হয় সেজন্য কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সবজিতে ঢলে পড়া রোগ (ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া বা কৃমি ঘটিত), ভাইরাসজনিত রোগ, ক্ষুদেপাতা রোগ, ঢেঁড়সের জমিতে হলুদ শিরা রোগ, টমেটোর নাবি ধসাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত সব গাছই জমি থেকে তুলে ফেলতে হবে।
মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালংশাক ইত্যাদি বীজ হিসেবে রেখে দিলে জাব পোকার আক্রমণ দেখা যেতে পারে। কুমড়ার মাছি পোকা-পামকিন বিটল, বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা, ফুলকপি-বাঁধাকপির সরুই পোকা বা ডায়মন্ড ব্যাক মথ ইত্যাদি পোকা দমনে আইপিএম বা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার আলোকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বীজ উৎপাদনে রোগিং বা বিজাত বাছাই : বীজ ফসলের জাতের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার লক্ষ্যে বীজ উৎপাদন প্লট থেকে অন্য জাত, আগাছা, অস্বাভাবিক  খাটো বা লম্বা গাছ,  পোকা ও রোগাক্রান্ত গাছ চিহ্নিত করে শিকড়সহ তুলে ফেলার পদ্ধতিই হলো রোগিং বা বিজাত বাছাইকরণ। বাছাই ১ম বার গাছ বাড়ার সময় ও ফুল আসার আগে, ২য় বার বাছাই  ফসলে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ফুল আসলে এবং ৩য় বাছাই  বীজ ফসল কাটার পূর্বে করতে হবে।
বীজ ফসল/ফল চিহ্নিতকরণ, ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ ও সংগ্রহ : ভালো বীজের জন্য সুপরিপক্ব ও নিরোগ ফল দরকার। ক্ষেতের যেসব ফল সব দিক দিয়ে ভালো মনে হবে, সেসব ফলের বোঁটায় রঙিন ফিতে বা ফলে থলে বেঁধে চিহ্ন দিয়ে রাখতে হবে। যে বীজেই হোক না কেনো ভালোভাবে বীজফল পাকার পর তা সংগ্রহ করতে হবে। যথা সময়ে বীজ সংগ্রহ করতে না পারলে বীজের মান খারাপ হয়ে যায়। মুলা, কপি, পুঁইশাক, গিমাকলমি, ঢেঁড়স, লালশাক, ডাঁটা বা শিম ইত্যাদির ক্ষেত্রে বীজ বেশি পেকে গেলে গাছে শুকিয়ে ঝরে যায়। এ ধরনের শাকসবজির ক্ষেত্রে ফল পাকার সাথে সাথে গাছ কেটে শুকিয়ে বীজ বের করে নিতে হয়। সঠিক পরিপক্বতা দেখে সবজি ফল সংগ্রহ করতে হবে।
বেগুন ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ : সুস্থ ও স্বাভাবিক ফলের রঙ বাদামি বা বাদামি বর্ণ ধারণ করে ফলের ত্বক শক্ত হয়ে আসে তখনই ফল সংগ্রহের সময়।
টমেটো ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ : সুস্থ ও স্বাভাবিক ফল গাঢ় লাল রঙ হলে ফল সংগ্রহ করতে হবে।
শিম ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ- শিমের শুটির ত্বক শুকিয়ে কুঁচকে যাবে বীজগুলো স্পষ্ট হবে।
লাউ ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ- দুই উপায়ে বুঝা যায়- প্রথমত ফল নাড়ালে ভেতরে বীজের শব্দ পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত ফলের খোসা শুকিয়ে যাবে ও শক্ত হবে কিন্তু ফলের ভেতরে শুকাবে না।
শসা/খিরা ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ- ফল হলুদ বা বাদামি রঙ ধারণ করে। পরিপক্ব বীজ সহজে মাংস থেকে আলাদা হয়।
মিষ্টিকুমড়া ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ- ফল হলুুদ বা হলুদাভ-কমলা রঙ হয়। ফলের বোটা খড়ের রঙ ধারণ করে গাছ মরতে শুরু করে।
কাঁকরোল/করলা/উচ্ছে ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ- ফল হলুদ বা হলদে বাদামি রঙ ধারণ করে। পরিপক্ব বীজ সহজে মাংস থেকে আলাদা করা যায়।
ঝিঙ্গা ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ- ফল বাদামি রঙ ধারণ করে। ফল নাড়ালে ভেতরে বীজের শব্দ পাওয়া যায়।
চিচিঙ্গা ফলের পরিপক্বতার লক্ষণ- ফল পাকলে হলদে-কমলা রঙ ধারণ করে এবং ফলগুলো হাতে ধরলে নরম মনে হবে।


বীজ ফসল মাড়াই, ঝাড়াই ও বাছাই/গ্রেডিংকরণ : লাউ, ঝিঙ্গা, ধুন্দুল, বেগুন পরিপক্ব হলে সংগ্রহের পর বীজের সংগ্রহত্তোর পরিপক্বতার জন্য ফল ২-৩ সপ্তাহ, শসা, খিরা, করলা/উচ্ছে সংগ্রহের পর ৭-১০ দিন এবং কুমড়া ফল সংগ্রহের পর ৪-৭ সপ্তাহ ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দিতে হবে। এ সকল বীজ ফলগুলো লম্বালম্বিভাবে কেটে হাত দিয়ে বীজ বের করে নিতে হবে। বীজ বের করার সাথে সাথে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে প্রথমে হালকা রোদে বা ছায়ায় শুকাতে হবে। বেগুনের ক্ষেত্রে পাকা বেগুন ভালোভাবে ধুয়ে নিয়ে রোদে শুকাতে হবে। তারপর লাঠি দিয়ে বালিশের মতো নরম হওয়া পর্যন্ত আস্ত বেগুন পিটিয়ে ভেতরের বীজ আলগা করে নিতে হবে। তারপর বেগুন চিরে ভেতরের বীজগুলোকে পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে। টমেটোর বেলায় বাছাইকৃত ফলগুলো আড়াআড়িভাবে কেটে পাত্রের ওপর হাত দিয়ে চেপে বীজ বের করে নিয়ে ২০º-২১º সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ২৪-৩৬ ঘণ্টা ফারমেন্টেশনে রাখতে হবে। এ সময় মাঝে মাঝে নাড়তে হবে। পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে প্রথমে ছায়ায়, পরে ক্রমান্বয়ে প্রখর রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। বীজ হালকা শুকানোর পর কুলায় ঝেড়ে বেছে কুঁচকানো, বিকৃত, দাগযুক্ত, বিসদৃশ বীজগুলো থেকে ঝকঝকে পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন বীজ সংগ্রহ করতে হবে।


বীজ শুকানো : সবজি বীজ প্রাথমিকভাবে ছায়ায় শুকানোর পর ক্রমান্বয়ে তীব্র রোদে শুকাতে হবে। সবজি বীজে আর্দ্রতা বা জলীয় পদার্থের পরিমাণ যদি শতকরা ৮ ভাগের নিচে থাকে তাহলে কোনো পোকামাকড় ও রোগ জীবাণু সহজে ক্ষতি করতে পারে না। নিকটস্থ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সহযোগিতায় উপজেলা কৃষি অফিস হতে ময়েশ্চার মিটারেও বীজের আর্দ্রতা মাপা যেতে পারে। কম তাপমাত্রায় অনেক সময় ধরে বীজ শুকালে বীজের তেজ যেমন নষ্ট হয় তেমনি অধিক তাপমাত্রায় অল্প সময়ের মধ্যেই শুকালে সজীবতা নষ্ট হতে পারে। টমেটো বীজ মাঝারি গতিতে শুকায়, কপি ও মুলার বীজ ধীরে শুকায় আবার লাউয়ের বীজ তাড়তাড়ি শুকায়। কাজেই সব বীজেই একই ভাবে একই সময় ধরে শুকানো ঠিক নয়। তবে যে বীজেই হোক না কেন বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে কটকটে ও ঝনঝনে করে রাখতে হবে।


বীজ সংরক্ষণ : আর্দ্রতারোধক পাত্রে শুকনা বীজ সংরক্ষণ করা উত্তম। বীজ রাখার পাত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। সবজি বীজ রাখার জন্য মোটা পলিথিন ব্যাগ, বায়ুরোধী টিন বা অ্যালুমিনিয়াম পাত্র, রঙিন কাঁচের বোতল বা প্লাস্টিকের বয়ামে বীজ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পাত্রের নিচে এক খণ্ড কাঠ কয়লা বা নারিকেলের খোলের কয়লা রাখতে হবে। এসব কয়লা বাতাসের আর্দ্রতা শুষে নেয়। এতে মাপমতো কার্ড বোর্ড কেটে কয়েকটি ছিদ্র করে পাত্রের তলায় কয়লা খণ্ডের ওপর বসাতে হবে। এরপর বীজগুলো ছোট খামে ভরে প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে ওই বয়ামে রাখতে  হবে। এরপর ঢাকনা টেপ, গ্রিজ দিয়ে বায়ুরোধী করে পাত্রের মুখ বন্ধ করতে হবে। রোদে শুকানো বীজ ২/৩ ঘণ্টা ছায়ায় ঠাণ্ডা করে বীজ পাত্রে রাখতে হবে। বসতবাড়িতে নিম, বিষ কাটালি, নিশিন্দা বা ল্যান্টানার পাতা ছায়ায় শুকিয়ে শুকনো বীজের সাথে পাত্রে মিশিয়ে রাখলে গুদামের পোকামাকড় থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। পাত্র বায়ুরোধী করতে বীজ পলিব্যাগে নিয়ে এমনভাবে বন্ধ করতে হবে যাতে লুজ না থাকে। আর পলিব্যাগের মুখ আগুনে পুড়িয়ে বন্ধ করা যায়। বীজ রাখার পর পাত্রের গায়ে একটি ট্যাগে বীজের নাম, জাতের নাম, সংরক্ষণ তারিখ, সংরক্ষণকারীর নাম, বীজ অংকুরোদগমের হার লিখে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। বীজ পাত্র মাচায় রাখা ভালো, যাতে পাত্রের তলা মাটির সংস্পর্শে না আসে। গুদামে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সংরক্ষিত বীজ মাঝে মাঝে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বীজের আর্দ্রতা বেড়ে গেলে বীজ পুনরায় রোদে শুকিয়ে ঠা-া করে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

কৃষিবিদ মো. আবু সায়েম
অতিরিক্ত উপপরিচালক (এলআর), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা, মোবাইল নম্বর-০১৭১৯৫৪৭১৭৯। ইমেইল-sayemdae@yahoo.com

বিস্তারিত
তিতির পালন পদ্ধতি

তিতির শোভাবর্ধনকারী গৃহপালিত পাখি হলেও বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে পালনের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা আছে। এটাকে অনেকেই চীনা মুরগি বলে। প্রায় ৭০০ বছর আগে তিতির প্রথমে জন্মস্থান আফ্রিকায় গৃহপালিত পাখি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ৩০০ বছর আগে ব্রিটিশ শাসন আমলে ভারতবর্ষে আসে। তিতির খাদ্য ও উৎপাদন খরচ কম। তাই তিতির পালন লাভজনক। তিতিরের মাংস ও ডিম সুস্বাদু। ইহা খাওয়া হালাল। তিতির প্রায় বিপন্ন হচ্ছে। তিতির খুব শান্ত। তিতির পালন খুব সহজ।
 

পরিচিতি
বাংলাদেশের তিতির ধূসর পালক। পালকে সাদা ফোটা ফোটা দাগ থাকে। এ ছাড়াও হালকা ধূসর ও সাদা রঙের তিতির আছে। ডিমের রঙ ঘন বাদামি, ছোট ছোট দাগ থাকে, লাটিম আকৃতির ও ওজন ৩৮-৪৪ গ্রাম। পুরুষ তিতির মাথার মুকুট স্ত্রীর চেয়ে বড়। পায়ের রঙ কালচে। পূর্ণাঙ্গ পুরুষের ওজন ১.৫-২ কেজি, স্ত্রীর ওজন ১-১.৫ কেজি। ডিম প্রাকৃতিক ও কৃত্রিমভাবে ফুটানো যায়। শতকরা ৭০ ভাগ বাচ্চা ফুটে। ইনকিউবেটরে বাচ্চা ফুটানো ভালো। ডিম ফুটতে ২৭-২৮ দিন সময় লাগে। ডিম দেশি মুরগি দিয়েও ফুটানো যায়। ডিমের খোসা শক্ত। ডিম ছোট। প্রজনন মৌসুম হচ্ছে মার্চ-অক্টোবর মাস পর্যন্ত। তিতির অলস; নড়াচড়া ধীরে ধীরে করে।

 

সুবিধা
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। প্রাকৃতিক খাদ্য খায় বলে খাদ্য খরচ কম। উন্নতমানের ঘর দরকার হয় না। খুব বেশি জিনিসপত্র লাগে না। ডিম ভাঙার সম্ভাবনা কম থাকে। দৈহিক বৃদ্ধি দ্রুত হয়। ৬-৭ মাস বয়সে ডিম পাড়ে। বছরে ১০০-১২০টি ডিম দেয়। ৫-৬ মাসে খাওয়া (১-১.৫ কেজি হয়) ও বিক্রির উপযোগী হয়। দেশি মুরগির সাথে একত্রে পালন করা যায়। তিতির খোলামেলা পরিবেশে, আবদ্ধ ও অর্ধআবদ্ধ অবস্থায় পালন করা যায়। তিতির সারা বছর পালন করা যায়।

 

অসুবিধা
বাচ্চার মৃত্যুর হার খুব বেশি। ডিমে তাপ দেয়ার ক্ষেত্রে মা তিতির যতœশীল হলেও ১-২টি ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর অবশিষ্ট ৬-৭টি ডিম রেখে চলে যায়। অর্থাৎ ডিমে আর তাপ দেয় না। এরা ঝোপঝাড়, জঙ্গল পছন্দ করে বলে শিয়াল, কুকুর, চিল, বাজপাখি, বেজি, সজারু ইত্যাদি প্রাণী এদের ধরে খায়। লিটারে পালনের ক্ষেত্রে বাচ্চাগুলো লিটারের ময়লা খায়। ফলে পেটে সমস্যা হয়। বাচ্চাদের লাইসিন ও সালফারযুক্ত এমাইনো এসিড বেশি প্রয়োজন হয়। তবে মেঝেতে লিটার না দিয়ে পাটের বস্তা ব্যবহার করতে হয়।

 

পালন পদ্ধতি
তিতির মুক্ত, অর্ধমুক্ত ও আবদ্ধ অবস্থায় পালন করা যায়। আবদ্ধ অবস্থায় পালনের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়। তিতিরের ঘর বাঁশ, বেত, কাঠ, টিন, ছন, খড় ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা যায়। ২-৩ ফুট ওয়াল করে ওপরে নেট দিয়ে টিনের চালের ঘর তৈরি করলে দীর্ঘদিন টেকসই হয়। ঘর আলো বাতাস পূর্ণ স্থানে করতে হয়। ঘর প্রতিদিন পরিষ্কার রাখতে হয়। স্যাঁতসে্যঁতে যাতে না হয়।


০-৪ সপ্তাহের বয়সের তিতির জন্য ০.৫ বর্গফুট ও ৫-৮ সপ্তাহের বয়সের প্রতিটি তিতির জন্য ০.৭ বর্গফুট, ৯-১৩ সপ্তাহের তিতির জন্য ১ বর্গফুট, পূর্ণবয়স্কের জন্য ২-২.৫ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন। তিতির খাঁচায় পালন করা যায় না।
খাদ্য
দেশি মুরগির মতো সব খাবার তিতির খায়। মুক্ত পালনের ক্ষেত্রে বাইরে পড়ে থাকা খাদ্য খায়। দানাদার শস্য, ভাত, শাকসবজির উচ্ছিষ্টাংশ, ভুসি, কুঁড়া, ঘাস, লতাপাতা,
পোকামাকড় ইত্যাদি কুড়িয়ে খায়। আবদ্ধ ও অর্ধমুক্ত পালনের জন্য ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির ক্রয় করা খাদ্য বা ফিডার খাওয়াতে হয়। দৈনিক ১১৮-১২১ গ্রাম খাদ্য খায়। বাড়ন্ত তিতিরের সাপ্তাহিক খাদ্য ও পানি গ্রহণের পরিমাণ নিচের তালিকায় দেয়া হলো ঃ

 

খাদ্য প্রস্তুতকরণ
তিতির খাদ্যের স্টার্টার (০-৪ সপ্তাহ) মিশ্রণ হচ্ছে- গমচূর্ণ ৩০%, ভুট্টাচূর্ণ ১৮%, চালের কুঁড়া ১৪%, তিলের খৈল ৯%, ফিসমিল ১৮%, নারিকেলের খৈল ১১%, ঝিনুকচূর্ণ ১%, লবণ ০.৬% ও ভিটামিন ও মিনারেলস ০.৪%। দৈহিক ওজন, খাদ্য গ্রহণ ও খাদ্য রূপান্তর দক্ষতার (ঋঈজ) ভিত্তিতে তিতিরের উৎকর্ষতার বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ ঃ

 

তাপমাত্রা ব্যবস্থাপনা
তিতির বাচ্চা ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে না। এজন্য বাচ্চাকে ব্রুডিংয়ে প্রথম সপ্তাহে বেশি তাপ দিতে হয়। ১ম থেকে ৩য় সপ্তাহ পর্যন্ত ব্রুডিং তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৪র্থ থেকে ৫ম সপ্তাহ পর্যন্ত ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখতে হয়। এরপর স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা যায়। ব্রুডারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য হিটার বা বাল্ব ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্রুডার হাউজ মুরগির ব্রুডার হাউজের মতো তৈরি করতে হয়।


রোগবালাই
তিতিরের রোগবালাই কম হয়। গোলকৃমি হলে ডিম উৎপাদন কমে ও পাতলা মল ত্যাগ করে। রক্ত আমাশয় হলেÑ রক্ত মিশ্রিত মলত্যাগ করে, ওজন কমে, মুখম-ল ফ্যাকাশে হয়। ট্রাইকোমোনিয়াসিস হলেÑ ওজন কমে, ঝুঁটি কালো হয়, মুখ থেকে লালা ঝরে।

 

মুরগির খামারের সম্প্রসারণের কারণে ও খাওয়ার অভ্যাস কম থাকার জন্য তিতির পালন দেশে কমে যাচ্ছে। অথচ মুরগির চেয়ে এর রোগবালাই কম হয়, ডিম বেশি পাড়ে, ওজন বেশি হয়, উৎপাদন খরচ কম ও দেখতে সুন্দর। এজন্য তিতির পালন করা লাভজনক। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিতির নিয়ে গবেষণা হচ্ছে ও তিতিরের একটি খামার আছে। এখান থেকে বাচ্চা নিয়ে অনেকেই তিতির পালন করছে। তিতির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।


সহকারী অধ্যাপক, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল, মোবাইলঃ ০১৭১১-৯৫৪১৪৩

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (মাঘ ১৪২৫)

কৃষি বিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।

 

মো. সিরাজুল ইসলাম
গ্রাম: তাম্বুলখানা, উপজেলা: ফরিদপুর সদর, জেলা: ফরিদপুর
প্রশ্ন: সরিষার কাণ্ড পচা রোগ দমনে কি করণীয়?
উত্তর: সরিষার কাণ্ড পচা রোগটি বীজ ও মাটিবাহিত। সে কারণে জমিতে সরিষা বীজ বপনের আগে ভালো উৎস থেকে বীজ ক্রয় করা এবং জমির মাটি ভালোভাবে চাষ করা দরকার। যদি সরিষার আবাদকৃত জমিতে আগের বছরে এ রোগ হয়ে থাকে তবে জমি গভীরভাবে চাষ করা। তারপরও যদি জমিতে এ রোগ দেখা দেয় তবে ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের যেমন: রোভরাল ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করা। স্প্রে করতে হবে সরিষা গাছের বাড়ন্ত পর্যায়, ফুল ও পড ধরার পর্যায়ে তাহলে সরিষার কাণ্ড পচা রোগটি হবে না। আপনি লাভবান হবেন।  

 

আব্দুল আহাদ
গ্রাম: খাটুরিয়া, উপজেলা: গোবিন্দগঞ্জ, জেলা: গাইবান্ধা
প্রশ্ন: চীনাবাদাম গাছের পাতায় লোহার মরিচার মতো দাগ পড়া  রোগের প্রতিকার করব কিভাবে?  
উত্তর:  চীনাবাদামের এ রোগটিকে চীনাবাদামের মরিচা রোগ বলে। এ রোগটি পাকসিনিয়া এরাচিডিস নামক ছত্রাকের কারণে হয়ে থাকে। সাধারণত বয়স্ক বাদাম গাছে এ রোগটি বেশি হয়ে থাকে। আর এতে বাদামের ফলন প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ কমে যায়। এ রোগ দমনে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হয় সেগুলো হলো-পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জমিতে চাষাবাদ ও রোগ প্রতিরোধী বাদামের জাত যেমন: ঝিঙা বাদাম চাষ করা। তারপরও যদি এ রোগের আক্রমণ দেখা যায় তবে প্রপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক টিল্ট/কন্টাফ/ক্রিজল ০.৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। ১৫ দিন পরপর কমপক্ষে তিন বার ছত্রাকনাশক স্প্রে করলে এ রোগের প্রকোপ কমে যাবে। আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার সেটি হলো স্প্রের কাজটি অবশ্যই বিকেল বেলা করতে হবে নাহলে উপকারী পোকা মৌমাছি মারা যাবে এবং ফসলের পরাগায়ন ব্যাহত হবে।     

 

মো. আসাদুজ্জামান
গ্রাম: লাউযুতি, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন:  মিষ্টিআলুর পাতায় এক ধরনের দাগ পড়ে গাছের আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে। কী করব?
উত্তর: মিষ্টিআলুর পাতার এ রোগকে ফিদারি মোটল রোগ বলে। এ রোগটি ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। জাবপোকার মাধ্যমে এ ভাইরাসটি ছড়ায়। সে কারণে বাহক পোকা অর্থাৎ জাবপোকা দমন করতে ইমিডাক্লোরপ্রিড গ্রুপের যেমন এডমায়ার, ইমিটাফ প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি মিশিয়ে সঠিক নিয়মে বিকেলের দিকে প্রতি ১৫ দিন পর পর  তিন বার স্প্রে করতে হবে। তাহলে এ  রোগ নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হবে। এ রোগ হলে মিষ্টিআলুর ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়।    

 

ইছাহাক আলী
গ্রাম: সাকোয়া  উপজেলা: বোদা, জেলা: পঞ্চগড়
প্রশ্ন: পটোল গাছ থেকে কিভাবে শাখা কলম তৈরি করা যায়? জানাবেন।
উত্তর:  এক বছর বয়সী ভালো পটোল গাছের যেকোনো শাখার মাঝামাঝি অংশ থেকে শাখা কলম তৈরি করা যায়। সে ক্ষেত্রে এক মিটার বা দুইহাত লম্বা পরিমাণ শাখা পটোল গাছ থেকে সংগ্রহ করে রিং বা চুড়ি আকার তৈরি করে পিট বা মাদায় লাগানো হয়। পটোলের শাখা কলম ৫০ পিপিএম ইনডোল বিউটারিক এসিড বা আইবিএ দ্রবণে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে মাদায় বা পিটে লাগালে তাড়াতাড়ি বা বেশি সংখ্যক মূল গজায়। আর এভাবে পটলের উন্নতমানের শাখা কলম তৈরি করে ভালো ফলন পাওয়া যায়।

 

মো. রুবেল ইসলাম
গ্রাম: খাটুরিয়া, উপজেলা: ডোমার, জেলা: নীলফামারী
প্রশ্ন:  চন্দ্রমল্লিকা ফুলে সাধারণত কি কি ধরনের রোগ হয়ে থাকে? প্রতিকার কী?
উত্তর: চন্দ্রমল্লিকা ফুলে সাধারণত পাউডারি মিলডিউ ও পাতায় দাগ পড়া রোগ হয়ে থাকে। পাউডারি মিলডিউ রোগ হলে চন্দ্রমল্লিকার পাতার ওপরে সাদা থেকে ধূসর গুঁড়ার মতো আবরণ পড়ে। পাতা আস্তে আস্তে কুঁকড়িয়ে বিকৃত হয়ে যায়। আর বেশি আক্রমণ হলে গাছ শুকিয়ে মারা যায়। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এ রোগ বেশি হয়। সে জন্য সঠিক রোপণ দূরত্ব অনুসরণ করা দরকার এছাড়া রোগের আক্রমণ বেশি হলে কার্বেনডাজিম গ্রুপের ব্যভিস্টিন বা সালটাফ ১/২ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যায়। চন্দ্রমল্লিকা ফুল গাছের পাতায় দাগ পড়া  রোগের ক্ষেত্রে  নিচের পাতায় প্রথমে হলদে দাগ পড়ে। রোগের আক্রমণ বেশি হলে পাতার দাগগুলো বাদামি থেকে কালো দাগে পরিণত হয়। এ রোগ দমনেও কার্বেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন ব্যাভিস্টিন ১ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করা যায়।     

 

সুমন মজুমদার
গ্রাম: নারায়ণপুর, উপজেলা:  কেশবপুর, জেলা: যশোর
প্রশ্ন: লিচু গাছের পাতায় মাকড়ের আক্রমণ হলে কী করণীয়।
উত্তর: লিচু গাছের পাতা, ফুল ও ফলে মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়। মাকড় আক্রমণ করলে পাতা কুঁকড়িয়ে যায় এবং পাতার নিচের দিক লাল মখমলের মতো হয়ে যায়। পাতা দুর্বল হয়ে মারা যায়। আক্রান্ত ডালে ফুল, ফল ও পাতা হয় না। এমনকি আক্রান্ত ফুলে ফল হয় না। রোগ দমনে ফল সংগ্রহের সময় মাকড় আক্রান্ত পাতা ডালসহ ভেঙে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। মাকড় দমনে মাকড়নাশক এবামেকটিন গ্রুপের যেমন ভার্মিটেক/এবাটিন/এ্যামবুশ প্রতি লিটার পানিতে ১-২ মিলি মিশিয়ে সঠিক নিয়মে নতুন পাতায় ১৫ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

 

মৎস্য বিষয়ক
ইমতিয়াজ আহমেদ

গ্রাম: ধল্লাপাড়া, উপজেলা: ঘাটাইল, জেলা: টাঙ্গাইল
প্রশ্ন: চিংড়ি মাছের মাথা হলুদ হয়ে গেছে কি করব?  
উত্তর: ভাইরাসের আক্রমণে এ রোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ রোগে চিংড়ির মাথা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। চিংড়ির দেহ, ফুলকা, যকৃতও হলুদ হয়ে যায়। এ রোগের প্রকৃত কোনো চিকিৎসা নেই। এজন্য রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভালোভাবে মেনে চললে এ সমস্যার অনেকটুকু দূর করা যায়।

 

মো: সবুর আলী, গ্রাম: মাছহাড়ি, উপজেলা: কাউনিয়া, জেলা: রংপুর
প্রশ্ন: মাছের সেপরোলে গনিয়াসিস রোগ দেখা যাচ্ছে। এর প্রতিকার কী?
উত্তর: এটি ছত্রাকজনিত রোগ। সেপ্রোলেগনিয়া প্রজাতি এ রোগের কারণ। কার্পজাতীয় মাছে এ রোগটি বেশি হয়ে থাকে। আক্রান্ত মাছের ক্ষতস্থানে তুলার মতো ছত্রাক দেখা দেয় এবং পানির স্রোত যখন স্থির হয়ে যায় কিংবা বদ্ধ জলায় অথবা হ্যাচারি ট্যাংকে যেখানে অনিষিক্ত ডিমের ব্যাপক সমাগম ঘটে তাতে ছত্রাক রোগ দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করে। হ্যাচারিতে লালনকৃত ডিমগুলোকে ২৫০ পিপিএম ফরমালিন দিয়ে ধৌত করতে হবে। খাঁচা ও আক্রান্ত মাছগুলোকে শতকরা ৫ ভাগ লবণ পানিতে ১ মিনিট গোসল করাতে হবে।

 

প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
সুব্রত কুমার সরকার
গ্রাম: কেওয়াপূর্বখ-, উপজেলা: উল্লাপাড়া, জেলা: সিরাজগঞ্জ
প্রশ্ন: আমার ছাগলের বয়স আড়াই বছর। বিভিন্ন জায়গার মাংস শক্ত হয়ে গেছে। দাঁতে কপাট লাগে এবং খিচুনি দেখা দেয়। কোনো শব্দ শুনলে চমকে উঠে। এমতাবস্থায় কী করণীয়?
উত্তর: সাধারণত এ রোগের চিকিৎসায় তেমন ফল হয় না। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করতে পারলে ক্ষতস্থান অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে এবং মাংসে এটিএম ইনজেকশন দিতে হবে। এ ছাড়া উচ্চমাত্রায় পেনিসিলিন জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হবে। মাংসপেশি শিথিল করার জন্য ক্লোরাল হাইড্রেট ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ইনজেকশন দিতে হবে। খাসি করানো বা অন্য কোনো অস্ত্রোপচারের আগে ধনুষ্টংকার রোগের টিকা দিতে হবে। তাছাড়া যে কোনো অস্ত্রোপচার স্বাস্থ্যসম্মতভাবে করতে হবে।    

 

সহিদুল ইসলাম
গ্রাম: আলালিতাড়ি, উপজেলা: গাইবান্ধা সদর, জেলা: গাইবান্ধা
প্রশ্ন: আমার হাঁসের বাচ্চার বয়স ৮ সপ্তাহ। ডায়রিয়া হচ্ছে, শ্বসনতন্ত্রে গোলযোগ দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় কি করণীয়?
উত্তর: আপনার হাঁসের যে সমস্যার কথা লিখেছেন তার সমাধানের জন্য কট্টাভেট সাসপেনশন দিতে হবে সাথে ইলেকট্রোলাইট পাউডার অথবা স্যালাইন দিতে হবে।
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)

 

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন

উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল নং ০১৭১১১১৬০৩২,taufiquedae25@gmail.com

 

বিস্তারিত
ফাল্গুন মাসের কৃষি ১৪২৫ (কৃষিকথা)

নতুন পাতার বর্ণিল রঙে প্রকৃতিকে রাঙাতে ঋতুরাজ বসন্ত এসেছে আমাদের মাঝে। নতুন প্রাণের উদ্যমতা আর অনুপ্রেরণা প্রকৃতির সাথে আমাদের কৃষিকেও দোলা দিয়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন ফাল্গুনের শুরুতেই আসুন সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেই বৃহত্তর কৃষি ভুবনে করণীয় দিকগুলো।


বোরো ধান
ধানের চারার বয়স ৫০-৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরি প্রয়োগ করতে হবে। সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। ধানের কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত ক্ষেতে ৩/৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে। পোকা দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে (আলোর ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে, উপকারী পোকা সংরক্ষণ করে, ক্ষেতে ডাল-পালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করে) ধানক্ষেত বালাইমুক্ত রাখতে হবে। এ সময় ধান ক্ষেতে উফরা, ব্লাস্ট, পাতাপোড়া ও টুংরো রোগ দেখা দেয়। জমিতে উফরা রোগ দেখা দিলে যেকোন কৃমি নাশক যেমন ফুরাডান ৫ জি বা কিউরেটার ৫ জি প্রয়োগ করতে হবে। ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে এবং একরপ্রতি ১৬০ গ্রাম ট্রুপার বা জিল বা ন্যাটিভ বা ব্লাসটিন ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে দু’বার প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে পাতাপোড়া রোগ হলে অতিরিক্ত ৫ কেজি/বিঘা হারে পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে এবং জমির পানি শুকিয়ে ৭-১০ দিন পর আবার সেচ দিতে হবে। টুংরো রোগ দমনের জন্য এর বাহক পোকা সবুজ পাতা ফড়িং দমন করতে হবে।


গম
এ মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে গম পাকা শুরু হয়। গম শীষের শক্ত দানা দাঁত দিয়ে কাটলে যদি কট কট শব্দ হয় তবে বুঝতে হবে গম কাটার সময় হয়েছে। সকালে অথবা পড়ন্ত বিকেলে ফসল কাটা উচিত। বীজ ফসল কাটার পর রোদে শুকিয়ে খুবই তাড়াতাড়ি মাড়াই ঝাড়াই করে ফেলতে হবে। সংগ্রহ করা বীজ ভালো করে শুকানোর পর ঠা-া করে সংরক্ষণ করতে হবে।


ভুট্টা (রবি)
জমিতে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে এবং পাতার রঙ কিছুটা হলদে হলে মোচা সংগ্রহ করতে হবে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে শুকনো আবহাওয়ায় মোচা সংগ্রহ করাই উত্তম। সংগ্রহ করা মোচা ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। মোচা সংগ্রহের পর উঠানে পাট/পলিথিন বিছিয়ে তার উপর শুকানো যায় অথবা জোড়া জোড়া বেঁধে দড়ি বা বাঁশের সাথে অথবা টিনের চাল বা ঘরের বারান্দায় ঝুলিয়ে শুকানোর কাজটি করা যায়।

 

ভুট্টা (খরিপ)
খরিফ মৌসুমে ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এখনই বীজ বপন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় যতœ নিতে হবে। ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো বারি ভুট্টা-৬, বারি ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৩, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৫।

 

পাট
ফল্গুনের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। ফাল্গুন মাসে বপন উপযোগী পাটের ভালো জাতগুলো হলো সিসি-৪৫, বিজেআরআই দেশী পাট শাক-১ (বিজেসি-৩৯০), ফাল্গুনী তোষা  (ও-৯৮৯৭), বিজেআরআই তোষা পাট-৪ (ও-৭২)। পাট চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করে আড়াআড়িভাবে ৫/৬টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশে ২৫ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। তবে ছিটিয়ে বুনলে আরেকটু বেশি অর্থাৎ ৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। পাটের জমিতে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার (প্রায় ১ ফুট) এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৭ সেন্টিমিটার (প্রায় ৩ ইঞ্চি) রাখা ভালো। ভালো ফলনের জন্য প্রতি একরে ৭০ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১২ কেজি এমওপি, ১৮ কেজি জিপসাম এবং প্রায় ৪.৫ কেজি জিংক সালফেট সার প্রয়োগ করতে হবে।

 

শাকসবজি
এ মাসে বসতবাড়ির বাগানে আগাম গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি জমি তৈরি করে ডাঁটা, কমলিশাক, পুঁইশাক, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটোল চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। মাদা তৈরি করে চিচিঙ্গা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টিকুমড়া, চাল কুমড়ার বীজ বুনে দিতে পারেন। সবজি চাষে পর্যাপ্ত জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে জৈব সার ব্যবহার করলে সবজি ক্ষেতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না।

 

গাছপালা
আমের মুকুলে অ্যানথ্রাকনোজ রোগ এ সময় দেখা দেয়। এ রোগ দমনে গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার পূর্ব পর্যন্ত আক্রান্ত গাছে  প্রোপিকোনাজল অথবা মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক পরিমাণ পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২ বার স্প্রে করতে হবে। এছাড়া আমের আকার মটর দানার মতো হলে গাছে ২য় বার স্প্রে করতে হবে। এ সময় প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার নিম্ফ দেখা যায়। আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার পূর্বেই একবার এবং এর একমাস পর আর একবার সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক পানির সাথে মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপাল ভালোভাবে ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। কাঁঠালের ফল পচা বা মুচি ঝরা সমস্যা এখন দেখা দিতে পারে। কাঁঠাল গাছ এবং নিচের জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আক্রান্ত ফল ভেজা বস্তা জড়িয়ে তুলে মাটিতে পুঁতে ধ্বংস করতে হবে। মুচি ধরার আগে ও পরে ১০ দিন পর পর ২/৩ বার বোর্দ্রাে মিশ্রণ বা মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। বাডিং পদ্ধতিতে বরই গাছের কলম করতে পারেন। এজন্য প্রথমে বরই গাছ ছাঁটাই করতে হবে এবং পরে উন্নত বরই গাছের মুকুল ছাটাই করে দেশি জাতের গাছে সংযোজন করতে হবে।

 

প্রাণিসম্পদে করণীয়
এ সময় মুরগির রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। সে কারণে প্রয়োজনীয় টিকা প্রদান করতে হবে। খাবারের সাথে ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই সরবরাহ করতে হবে। গবাদিপশুকে প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন দিতে হবে এবং কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। গবাদিপশুকে উন্নত খাবার যেমন-সবুজ ঘাষ, ইউরিয় মোলাসেম স্ট্র, ইউরিয়া মোলাসেম ব্লক এসব খাওয়াতে হবে।

 

মৎস্যসম্পদে করণীয়
মাছ চাষের জন্য পুকুর তৈরি ও সংস্কার করার উপযুক্ত সময় এখন। পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে নিচ থেকে পচা কাদা তুলে ফেলতে হবে এবং শতাংশপ্রতি ১ কেজি চুন ও ১০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করতে হবে। পানি ভর্তি পুকুরে প্রতি শতাংশে ৬ ফুট পানির জন্য ১ কেজি চুন গুলে ঠাণ্ডা করে দিতে হবে। এছাড়া শতাংশপ্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম টিএসপি একসাথে মিশিয়ে পানি ভর্তি পুকুরে দিতে হবে। শীতের পর এ সময় মাছের বাড়বাড়তি দ্রুত হয়। তাই পুকুরে প্রয়োজনীয় খাবার দিতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।


সুপ্রিয় পাঠক, কৃষিকথায় প্রতি বাংলা মাসেই কৃষি কাজে অনুসরণীয় কাজগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়। এগুলোর বিস্তারিত ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণের জন্য আপনার কাছের কৃষি বিশেষজ্ঞ, মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে জেনে নিতে হবে। আমাদের সকলের আন্তরিক প্রচেষ্ঠা কৃষিকে নিয়ে যাবে সাফল্যের শীর্ষে। আবার কথা হবে আগামী মাসের কৃষিকথায়। আপনাদের সবার জন্য শুভ কামনা।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন

তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবা: ০১৯১১০১৯৬১০ ই-মেইল-ioag@ais.gov.bd

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook