কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

উইল্ট প্রতিরোধী জাত দ্বারা জোড় কলমের মাধ্যমে উইল্ট প্রতিরোধক পেয়ারার গাছ উৎপাদন

মানুষের খাদ্য, পুষ্টি, খনিজ পদার্থ ও ভিটামিনের চাহিদা পূরণ, শারীরিক বাড়তি, মেধার বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, পশু-পাখির খাবার, খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং রফতানি আয় বৃদ্ধিসহ নানাবিধ সুবিধা আমরা ফল থেকে পেয়ে থাকি। প্রতিদিন এ দেশের প্রতিজন লোকের ফল খাওয়া দরকার ১০০-১১৫ গ্রাম। আর আমরা খাচ্ছি মাত্র ৩৫-৪০ গ্রাম। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকের ও কম। শুধু আমাদের মানসিক দৈন্যতা, অভ্যাস আর পরিকল্পনার অভাবে আমাদের ফলভিত্তিক পুষ্টি দৈন্যতা এতটা প্রকট। পেয়ারাকে অনেকে ‘গরিবের আপেল’ বলে থাকেন। পেয়ারার গুণাগুণ আপেলের থেকে কোন অংশেই কম নয়। পেয়ারাতে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে যা মানবদেহের গঠন ও বৃদ্ধিতে অত্যন্ত  প্রয়োজনীয়। পেয়ারার গুণ এখানেই শেষ নয়- শিকড়, গাছের বাকল, পাতা এবং অপরিপক্ব ফল কলেরা, আমাশয় ও অন্যান্য পেটের পীড়া নিরাময়ে ভালো কাজ করে। ক্ষত বা ঘাঁতে থেঁতলানো অংশে পাতার প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। পেয়ারা পাতা চিবালে দাঁতের ব্যথা উপশম হয়। পেয়ারা পেকটিনের একটি অন্যতম উৎস। পেয়ারাতে প্রচুর পরিমাণে পেকটিন থাকায় জ্যাম, জেলি তৈরিতে অদ্বিতীয়। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে পেয়ারা থেকে তৈরি হয় সুস্বাদু শরবত, আচার, আইসক্রিম প্রভৃতি। জাপানে পেয়ারার পাতা থেকে চা তৈরি করা হচ্ছে এবং তা ব্যাপক জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। টাটকা অবস্থায় পরিপক্ব ফল থেকে সালাদ, পুডিং প্রভৃতি তৈরি করা যায়। রহিম (২০০৮) এর মতে, পেয়ারায় ৮০-৮৩% পানি, ২.৪৫% অম্ল, ৩.৫০-৪.৪৫% বিজারিত চিনি, ৩.৯৭-৫.২৩% অবিজারিত চিনি, ৯.৭৩% মোট দ্রবনীয় শুষ্ক পদার্থ, ০.৪৮% পটাশিয়াম, ২৬০ মি. গ্রাম/১০০ গ্রাম ভিটামিন সি. থাকে। মৌসুম, পরিপক্বতা ও জাতভেদে এর তারতম্য হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বাউ পেয়ারা ১-৯, কাজী, স্বরূপকাঠি, মুকুন্দপুরী, ইপসা, ইত্যাদি পেয়ারার চাষ হয়। তবে কাজী ও স্বরূপকাঠি পেয়ারা ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে এই কাজী ও স্বরূপকাঠি পেয়ারাসহ অন্যান্য জাত উইল্টিং’ বা ‘নেতিয়ে পড়া’ রোগ দ্বারা ভীষণভাবে আক্রান্ত হচ্ছে যার কার্যকরী তেমন কোন চিকিৎসা পদ্ধতি নাই। তাই একমাত্র উইল্ট প্রতিরোধী জাত দ্বারা অঙ্গজ উপায়ে জোড়কলমের মাধ্যমে ‘উইল্টিং’ বা ‘নেতিয়ে পড়া’ রোগ প্রতিরোধী গাছ তৈরি করে আমরা অধিক পেয়ারা উৎপাদন করতে পারি, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পুষ্টি সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

 

উইল্ট (Wilt) রোগের কারণ, লক্ষণ ও প্রকৃতি : এই রোগটি ছত্রাক দ্বারা সংঘটিত হয়। রোগাক্রান্ত গাছের একটি ডগা প্রথমে শুকিয়ে যায়, এরপর একটি ডালের সমস্ত পাতা এবং ডগা উপর থেকে প্রথমে হলুদ হয়ে শুকিয়ে মারা যায়,আস্তে আস্তে গাছের একটি পাশ এবং ১০-১৫ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ গাছ ঢলে পড়ে। অম্ল­ীয় মাটিতে এই রোগের আক্রমণ বেশি হতে দেখা যায়।

 

জোড় কলম কি? : সাধারণত যৌন ও অযৌন এই দুই পদ্ধতিতে গাছের বংশ বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। প্রথমটি বীজ এর মাধ্যমে এবং এতে মাতৃগাছের গুণাগুণ বজায় থাকে না। দ্বিতীয়টি অঙ্গজ উপায়ে এবং এই পদ্ধতিতে তৈরি করা গাছ মাতৃগাছের গুণাগুণ হুবহু বজায় রাখতে পারে এবং এতে রোগ প্রতিরোধী গাছ উদ্ভাবন সম্ভব। কারণ জোড় কলমের মাধ্যমে অনাকাক্সিক্ষত কিন্তু পরিবেশ সহনশীল এমন একটি চারাগাছ (রুটস্টক) এর উপরে কাক্সিক্ষত গাছের কাণ্ডের অংশ (সায়ন) জোড়া লাগানোর মাধ্যমে হুবহু মাতৃগাছের গুণাগুণ সম্পন্ন গাছ পাওয়া যায়, যা কাক্সিক্ষত ফলদানে সক্ষম। জোড় কলমের বিভিন্ন পদ্ধতি আছে, যেমন-কনটাকট (সংস্পর্শ), ভিনিয়ার, ক্লেফট, ইত্যাদি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টারে গবেষণায় দেখা গেছে যে, পেয়ারায় সংস্পর্শ, ভিনিয়ার, ক্লেফট, সবরকম জোড় কলমেই উল্লেখযোগ্য সফলতা পাওয়া যায়। তবে এর মধ্যে সংস্পর্শ জোড় কলমই সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি।

 

পেয়ারা গাছে জোড় কলম কেন করব? : পেয়ারা একটি অতি পরিচিত ফল হওয়া সত্ত্বেও আমরা এর উৎপাদনে খুব একটা বেশি যতœবান নই। বীজ থেকে উৎপাদিত চারা দ্বারাই সাধারণত আমরা যেন তেন ভাবে পেয়ারা চাষ করে থাকি। যার ফলে দিন দিন ফলের গুণগতমান কমে যাচ্ছে এবং নানা রকম রোগ জীবাণু দ্বারা ফল গাছ আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ‘উইল্টিং’ বা ‘নেতিয়ে পড়া’ রোগ দ্বারা বিভিন্ন জাতের পেয়ারা খুব বেশি আক্রান্ত হয়ে পড়েছে যা পেয়ারার মোট উৎপাদনের উপর একটি বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাই জোড় কলমের মাধ্যমে ‘উইল্টিং’ প্রতিরোধী গাছ তৈরি করে পেয়ারার সফল উৎপাদন সম্ভব।

বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টারে, একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, পলি পেয়ারা, আঙ্গুর পেয়ারা ও স্ট্রবেরি পেয়ারার জাতের চারাকে আদিজোড় হিসাবে ব্যবহার করে পেয়ারার উইল্ট রোগ এড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে আঙ্গুর পেয়ারার বীজের চারা অনেক চিকন হয় বলে জোড় কলমের ক্ষেত্রে পলি পেয়ারা ও স্ট্রবেরি পেয়ারার বীজের চারাকে আদিজোড় হিসাবে ব্যবহার করা উত্তম। বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টারে অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, উইল্টিং সংবেধনশীল জাত কাজী ও স্বরূপকাঠি এবং প্রতিরোধি জাত পলি পেয়ারাতে উইল্টিং রোগের বাহক ঋঁংধৎরঁস ড়ীুংঢ়ড়ৎঁস দেয়া হয়। এতে দেখা যায় যে ঋঁংধৎরঁস ড়ীুংঢ়ড়ৎঁস  এর কারণে কাজী

 

ও স্বরূপকাঠি আক্রন্ত হয় কিন্তু পলি পেয়ারা ঋঁংধৎরঁস ড়ীুংঢ়ড়ৎঁস সহ্য করতে পারে যা চিত্রে দেখানো হলো।

চিত্রে- ক. কাজী পেয়ারা খ. স্বরূপকাঠি পেয়ারা গ. পলি পেয়ারার উপর কাজী ও স্বরূপকাঠি পেয়ারা জোড় কলম এবং ঘ. পলি পেয়ারার মূলে উইল্টিং রোগের জন্য দায়ী ছত্রাক ঋঁংধৎরঁস ড়ীুংঢ়ড়ৎঁস প্রয়োগের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ক, খ, ও গ এর সকল ক্ষেত্রে ডান দিকের চারাটি পলি পেয়ারার চারা।

 

পেয়ারা গাছের বাকল-ছাল খুবই পাতলা এবং শুষ্ক যার ফলে ভিনিয়ার ও ক্লেফট জোড় কলমের ক্ষেত্রে জোড়া লাগার আগেই সায়ন শুকিয়ে মারা যেতে পারে এবং যে জন্য সফলতার হার কম। কিন্তু সংস্পর্শ জোড় কলমের ক্ষেত্রে যেহেতু সায়ন ভালোভাবে জোড়া লাগার পূর্ব পর্যন্ত মাতৃগাছের সাথেই থাকে সে কারণে সায়ন শুকিয়ে মারা যাওয়ার ভয় থাকে না এবং গ্রাফট সফলতার হার অনেক বেশি।

 

সংস্পর্শ জোড় কলম করার পদ্ধতি : উপযুক্ত সময় মে থেকে আগস্ট মাস। কারণ এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা এবং গাছের কোষের কার্যকারিতা বেশি থাকে।

 

স্টক তৈরি : পলি পেয়ারা, আঙ্গুর পেয়ারা ও স্ট্রবেরি পেয়ারার মধ্যে থেকে যে কোন একটির বীজ হতে চারা তৈরি করতে হবে যার উপর কাক্সিক্ষত অংশ জোড়া লাগানো সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে পরিণত গাছের ফল হতে সুস্থ ও সবল বীজ, চারা তৈরি করার জন্য ব্যবহার করতে হবে। বীজ সরাসরি পলিব্যাগে অথবা বীজ বেডে বপন করে চারা তৈরি করা যেতে পারে। ৯-১২ মাস বয়সের চারা আদিজোড় হিসাবে ব্যবহার করা ভালো তবে রোগজীবাণু মুক্ত সবল ও সতেজ চারা নির্বাচন করতে হবে।

 

সায়ন নির্বাচন : উৎকৃষ্ট ও কাক্সিক্ষত গাছ হতে আদিজোড় এর সম ব্যাস বা আকৃতির পরিণত (সেমি হার্ড) সায়ন বা ডাল নির্বাচন করতে হবে। সায়ন পেনসিলের মতো হলে ভালো হয়। সায়নের বয়স অবশ্যই পরিণত হতে হবে। সায়নের জন্য নির্বাচিত ডালের পাতাগুলো গাঢ় সবুজ হতে হবে। চলতি মৌসুমের ডাল অর্থাৎ বর্ধিঞ্চু ডাল হতে হবে। নতুন গজানো অল্প বয়স্ক সবুজাভ কুশি সায়ন হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না। সংস্পর্শ জোড় কলমের জন্য নির্বাচিত সায়ন শাখাটি লম্বায় ১২-১৮ ইঞ্চি হতে হবে। সায়ন অবশ্যই রোগবালাই ও পোকামাকড় মুক্ত হতে হবে।

সংস্পর্শ জোড় লাগানোর পদ্ধতি : কাক্সিক্ষত গাছে উপযুক্ত সায়ন ডাল নির্বাচন করে স্টক গাছকে তার কাছাকাছি আনতে হবে।

এরপর স্টক গাছে এবং কাক্সিক্ষত সায়ন ডালের ৪-৫ সেমি. স্থানের বাকল কিছু কাঠসহ উঠিয়ে উভয়কে যথাসম্ভব নিকটতম সংস্পর্শে আনতে হবে যাতে সায়ন এবং আদিজোড়ের কর্তিত অংশের বাকল পরস্পর মিলে যায়।

এরপর পলিথিন ফিতা দিয়ে জোড়া লাগানো অংশ এমনভাবে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি ওই অংশে প্রবেশ করতে না পারে। (চিত্র-ক-চ)

 

পরবর্তী পরিচর্যা : আদিজোড় (স্টক চারা) এর গোড়ায় পলিব্যাগে প্রয়োজন অনুসারে পানি দিয়ে মাটির রস ঠিক রাখতে হবে; ভালোভাবে জোড়া লাগার পর আদিজোড়ের উপরের অংশ কেটে ফেলতে হবে; ৩-৪ মাস পর সায়নের নিচের অংশ ২ বারে কাটতে হবে অর্থাৎ অর্ধেক অংশ কাটার এক সপ্তাহ পর বাকি অর্ধেক কাটতে হবে; গ্রাফট কে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে; আদিজোড় (স্টক চারা) থেকে বের হওয়া অনাকাক্সিক্ষত কুঁড়ি দেখামাত্র ভেঙে দিতে হবে; জোড়ার নিচের সায়ন অংশ থেকে বের হওয়া কুঁড়িও দেখামাত্র ভেঙে ফেলতে হবে।

 

এছাড়া ভিনিয়ার কলমের মাধ্যমে (এ কলম তৈরি করার সময় আদিজোড়ের একপাশে ও উপ-জোড়-কে ঠ-এর মতো করে বাকলসহ পাতলা কাঠ তুলে সংযুক্ত করে এ কলম করা হয়) এবং ক্লেফট গ্রাফটিং এর মাধ্যমেও (এক্ষেত্রে আদি জোড়-কে লম্বা-লম্বিভাবে ৫-৭.৫ সেমি. গভীর করে ফাটায়ে উপজোড়কেও উভয় পাশে তীর্যকভাবে কাঠ দিয়ে আদি জোড়ের মধ্যে প্রবিষ্ঠ করে সংযুক্ত করে এ কলম করা হয়) উইল্ট প্রতিরোধী পেয়ারার গ্রাফট উৎপাদন করা যেতে পারে।

 

প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম*  ড. মো. শামছুল আলম মিঠু**

*উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বা.কৃ.বি এবং পরিচালক, বাউ-জার্মপ্ল­াজম সেন্টার, বা.কৃ.বি., ময়মনসিংহ মোবাইল : ০১৭১১৮৫৪৪৭১, ই-মেইল : সধৎধযরস১৯৫৬@নধঁ.বফঁ.নফ **সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট, বাউ-জার্মপ্ল­াজম সেন্টার, বা.কৃ.বি. মোবাইল : ০১৭১১১২৪৭২২ ই-মেইল: marahim1956@bau.edu.bd

 

বিস্তারিত
ছাগল পালনে মাচা ব্যবহারের গুরুত্ব ও পাকস্থলীর পাতাকৃমি

ছাগলকে গরিবের গাভী বলা হয়। গরিব-অসহায় মানুষ ছাগল পালন করে বাড়তি আয় করে থাকেন। ছাগল গরিবের আপদ-বিপদের বন্ধু। ছাগল পালন করতে তেমন খাদ্য খরচ নেই।
দেশে দুধ, ডিম ও পোলট্রির উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে ছাগলের উৎপাদন তেমন বৃদ্ধি পায়নি। মাচার ওপর ছাগল পালন বিষয়ে চাষিদের যথেষ্ট জ্ঞান থাকা দরকার। ছাগল পালনের বিশেষ দিকগুলো হচ্ছে- উপযুক্ত বাসস্থান, উপযুক্ত খাদ্য, প্রজনন, স্বাস্থ্য ও বাজার ব্যবস্থাপনা।


বাসস্থান : ছাগল সাধারণত পরিষ্কার শুষ্ক, দুর্গন্ধমুক্ত উষ্ণ, পর্যাপ্ত আলো ও বায়ু চলাচলকারী পরিবেশ বেশি পছন্দ করে। অপরিষ্কার, স্যাঁতস্যঁতে, বদ্ধ, অন্ধকার ও পুঁতিগন্ধময় পরিবেশে ছাগল বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন- নিউমোনিয়া, একথিওমা, পিপিআর, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, উকুন ইত্যাদি, অপর দিকে ছাগলের উৎপাদন কমে যায়।


পূর্ব-পশ্চিম লম্বালম্বী দক্ষিণ দিকে খোলা স্থানে ঘর তৈরি করতে হবে। খামারের তিন দিকে ঘেরা পরিবেশ বিশেষ করে উত্তর দিকে গাছপালা লাগাতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাঁঠাল, ইপিল ইপিল, কসভা, ডেউয়া ইত্যাদি গাছ লাগানো যেতে পারে, যার পাতা ছাগল খায়। 
সেমি-ইন্টেনসিভ পদ্ধতিতে ছাগলকে সাধারণত ১৪-১৬ ঘণ্টা সময় ঘরে আবদ্ধ রাখা হয়। এ জন্য প্রতিটি ছাগলের জন্য গড়ে প্রায় ৮-৯ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন, অর্থাৎ ১৬ ফুটত্র১২ ফুট ঘরে ২০টি ছাগল পালন করা যায়।

 

মাচা তৈরি : ছাগলের ঘর যে ধরনের হোক না কেন ঘরের ভেতরে বাঁশ বা কাঠের মাচা তৈরি করে তার ওপর ছাগল রাখতে হবে। একটি মাচা তৈরি করতে ১৫০-২০০ টাকা খরচ হয়। বিভিন্নভাবে ছাগলের মাচা তৈরি করা যায়। বাঁশের বাতা দিয়ে চকির মতো করে করা যায়। আবার বাঁশের বাতা মোটা সুতা দিয়ে বুনিয়ে ফোল্ডিং (Folding) মাচা তৈরি করা যায়, যা রাতে ছাগলের জন্য ব্যবহার করে  সকালে মুড়িয়ে/গুটিয়ে উঠিয়ে রাখা যায়। কম জায়গায় ফোল্ডিং মাচা ব্যবহার করা সুবিধাজনক। কাঠের চকিও মাচার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মাচার উচ্চতা ১.৫ মিটার (৫ ফুট) এবং মাচা থেকে ছাদের উচ্চতা ৬-৮ ফুট হতে হবে। গোবর ও প্রস্রাব পড়ার সুবিধার্থে বাঁশের চটা বা কাঠকে ১ ইঞ্চি ফাঁকা রাখতে হবে। মাচার নিচে থেকে সহজে গোবর ও প্রস্রাব সরানোর জন্য ঘরের মেঝে বরাবর উঁচু করে দুই পাশে ঢালু (২%) রাখতে হবে। মেঝে মাটির হলে সেখানে পর্যাপ্ত বালু মাটি দিতে হবে। ছাগলের ঘরের দেয়াল, মাচার নিচের অংশ ফাঁকা এবং মাচার ওপরের অংশ এম এম ফ্ল্যাক্সিবল নেট হতে হবে। শীতকালে রাতে মাচার ওপর দেয়াল চট দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। শীতের সময় মাচার ওপর ৪-৫ ইঞ্চি পুরু খড়ের বেডিং বিছিয়ে দিতে হবে।
প্রতিদিন মাচা পরিষ্কার করতে হবে। সপ্তাহে ১ দিন জীবাণুনাশক ওষুধ স্প্রে করতে হবে। ভেঙে গেলে সাথে সাথে মেরামত করতে হবে। মাচা শক্ত ও মজবুত হতে হবে।

মাচায় ছাগল পালনের সুবিধাসমূহ : ১. সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া রোগ হবে না, ২. কৃমি, উকুন, চর্মরোগ কম হবে। ৩. প্রস্রাব, গোবর সাথে সাথে নিচে পড়ে যায়। ফলে শরীর পরিষ্কার থাকে। ৪. শীতকালে ঠাণ্ডা কম লাগে, ৫. মাচার ওপর ও নিচ দিয়ে বাতাস চলাচল করে বিধায় মাচা শুকনো থাকে,যা ছাগলের জন্য আরামদায়ক। ৬. সর্বোপরি ছাগলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।


ছাগলকে পরিমাণ মতো দানাদার খাদ্য ও ঘাস, লতা-পাতা দিতে হবে। উকুন, মেঞ্জ নিধন করতে হবে। ৪ মাস পরপর কৃমিনাশক সেবন করাতে হবে। ৬ মাস পরপর PPR রোগের টিকা প্রয়োগ করতে হবে। ওলান পাকা রোগ প্রতিরোধ করতে হবে। প্রজনন করানোর জন্য একটি পাঠা এক এলাকায় ২ বছরের বেশি ব্যবহার করা যাবে না।
তথ্য সূত্র : ১. দেশি ছাগল পালন- BLRI, সাভার, ঢাকা।

পাকস্থলীর পাতাকৃমি (Paramphistomes, Rumen fluckes, Conical fluckes) : বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রজাতির পাকস্থলীর পাতাকৃমি দ্বারা গবাদিপ্রাণি আক্রান্ত হয়ে থাকে। প্রাপ্ত বয়স্ক এ কৃমি দেখতে গোলাপী-লাল বর্ণের এবং আকার নাশপাতির মতো। ১৫ এমএম পর্যন্ত লম্বা হয়, যা রুমেন ও রেটিকুলামের দেয়ালে লেগে থাকে।


অপ্রাপ্ত বয়স্ক কৃমি ১-৩ এমএম পর্যন্ত লম্বা হয়, যা ডিউডেনামে অবস্থান করে। ইলিয়ামের (ileal musosal) দেয়ালে কৃমি শোষক দ্বারা আটকিয়ে থাকার কারণে মারাত্মক অন্ত্রপ্রদাহ এবং রক্তপাত ঘটিয়ে থাকে।
প্রাপ্ত বয়স্ক কৃমি স্পষ্টত তেমন রোগ লক্ষণ তৈরি করে না, কিন্তু খুব বেশি পরিমাণে কৃমির অবস্থান অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে। সাধারণত গরু বেশি আক্রান্ত হয়। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর হার ৯০%। অতিরিক্ত মৃত্যুর হার দেখে এ রোগ নির্ণয় করা যায়। পাকস্থলীর পাতাকৃমির নাম চধৎধসঢ়যরংঃড়সঁস ঈবৎার গ্রীষ্ম, শরৎ ও শীতকালের আগের সময়ে এই কৃমি আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। ওই সময়গুলোতে ঈবৎপধৎরধব দ্বারা ঘাস সংক্রামিত হয়ে থাকে।


সব বয়সে গরু, ছাগল, ভেড়া এবং অন্য রোমন্থনকারী প্রাণী আক্রান্ত হয়। তবে ১ বছরের কম বয়সের প্রাণী কম আক্রান্ত হয়। ট্রপিক্যাল ও সাবট্রপিক্যাল দেশে এ কৃমি সংক্রমণ বেশি হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৭০-৯০% গরুর দেহে পাকস্থলীর পাতাকৃমি পাওয়া যায়।


জীবন চক্র : আক্রান্ত পশুর মলের সাথে কৃমির ডিম বেরিয়ে আসে। মাটিতে ডিম থেকে মিরাসিডিয়াম বের হয়। এ মিরাসিডিয়াম কয়েক প্রকার শামুকে প্রবেশ করে। শামুকের মধ্যে স্পোরোসিস্ট রেডিয়া এবং পরে সারকারিয়ায় পরিণত হয়। এ সারকারিয়ার সম্মুখে ও পেছনে একটি করে সাকার থাকায় একে এম্ফিস্টোমও বলে। এ সারকারিয়া শামুক থেকে বের হয়ে জলজ উদ্ভিদ, ঘাস ইত্যাদিতে লেগে যায় এবং মেটাসারকারিয়ায় পরিণত হয়।


সংক্রামিত ঘাস খাওয়ার মাধ্যমে এ মেটাসারকারিয়া অন্ত্রে চলে যায় এবং সেখানে পুনরায় সারকারিয়া বের হয়। সারকারিয়া অন্ত্রের ক্ষুদ্রান্তে ৩-৫ সপ্তাহ অবস্থান করার পর রোটকুলাম হয়ে রুমেনে পৌঁছে ও সেখানেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করে। ৭-১৪ সপ্তাহ বয়সে তারা ডিম পাড়ে।


লক্ষণ : আক্রান্ত প্রাণীর ক্ষুধামন্দা, ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাস, পানিশূন্যতা, উদাসীনভাব, চলাফেরায় দুর্বলতা, মারাত্মক পাতলা পায়খানা দেখা দেয়। থুতলির নিচে পানি জমা হতে পারে। মিউকোজা ফ্যাকাশে দেখাবে। ছোট বাছুর ও ভেড়া আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে ও বিশেষ করে লক্ষণ দেখা দেয়ার ১৫-২০ দিন পর মারা যায়।
প্রাপ্ত বয়স্ক কৃমি আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে।


দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের ক্ষেত্রে পশুর ওজন কমে যায়, রক্তশূন্যতা চামড়া শুকিয়ে যায়, উৎপাদন কমে যায়, পশুর থুতনির নিচে পানি জমা হয়। এভাবে রোগ ভোগের কিছু দিন পর আক্রান্ত পশুর মৃত্যু ঘটতে পারে অথবা ধীরে ধীরে সেরে ওঠতে পারে।


রোগ নির্ণয় : রোগ লক্ষণ ও অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পশুর মল পরীক্ষা করলে বড় আকারের পরিষ্কার, স্বচ্ছ, অপারকুলামযুক্ত ডিম দেখা যাবে। কিন্তু মারাত্মক আকারের ক্ষেত্রে মল পরীক্ষা করে ডিম নাও পাওয়া যেতে পারে। Fluid feces পরীক্ষা করলে অপ্রাপ্ত কৃমি পাওয়া যাবে। মৃত প্রাণীকে ময়নাতদন্ত করে রোগ নিশ্চিত হওয়া যায়।
 

চিকিৎসা : ১. Niclosamid = ১০ mg/kg, Bithional = ২৫ mg/kg - শুধুমাত্র ভেড়ার ক্ষেত্রে কার্যকর।
২. গরুর ক্ষেত্রে -
Resorantul = ৬৫ mg/kg Oxyclozanid দিয়ে চিকিৎসায় প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক কৃমিতে ৯০% কার্যকরি।
৩. Carbontetrachlorid এবং Hexachlorlethane -শুধু প্রাপ্ত বয়স্ক কৃমির বিরুদ্ধে কার্যকর।
৪. ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করানো উচিত।

 

প্রতিরোধ : ১. যেসব এলাকায় প্রতি বছর পাকস্থলীর কৃমি সংক্রমণ ঘটে, সে এলাকায় নিয়মিত চিকিৎসা দিতে হবে, যাতে করে প্রাপ্ত বয়স্ক কৃমি ধ্বংস হয়ে যায়।
২. নিচু জলা ভূমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শামুক নিধনের ব্যবস্থা করতে হবে (Molluscicides).
Refer  তথ্য সূত্র :

1. The Merck net. Manual.
2. The Veterinary Medicine - Dc. Blood

 

কৃষিবিদ ডা: মনোজিৎ কুমার সরকার

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা; মোবাইল : ০১৭১৫২৭১০২৬

বিস্তারিত
কবিতা ( শ্রাবণ ১৪২৫)

ফিরে যেতে ইচ্ছে করে

অ্যাডভোকেট মনিন্দ্র নাথ সিংহ*

আমার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই কৈশোর-শৈশবে,
পাখি-ডাকা ভোরে উঠা আম কুড়াতে যবে।
ছুটির দিনে দুপুর বেলা পাখির বাসা হাতে,
বেত কাটাতে রক্ত ঝড়া ফলের ঝোপা নিতে।

*ফিরে যেতে ইচ্ছে করে নিয়ে সেই সব সাথী,
মাছ ধরতে ছোট্ট খাদে কাদার বাঁধন গাঁথী।
ঘুড়ি উড়ান সাঁতার কাটা যাত্রা দেখতে যাওয়া,
কুল-নারিকেল কলার কাঁদি চুরি করে খাওয়া।

*ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই বিকেলের দিনে,
কানামাছি গোল্লাছুট আর মার্বেল গুনে গুনে।
শীতের দিনে সকাল বেলা মিষ্টি রোদে বসে,
পাটিসাপটা পুলি পিঠা খেতে খেজুর রসে।

*ফিরে যেতে ইচ্ছে করে চাঁদনী রাতে বসে,
জুজু বুড়ির গল্প শুনি মায়ের আঁচল ঘেঁষে।
মেঠো পথে শিশির ভেজা সবুজ ঘাসে পা,
 ডেকে বলছে খেলার সাথী একটু খেলে যা।

*ইচ্ছে করে বায়না ধরে বাবার বকুনি খাওয়া,
মায়ের আদর সোহাগ পেয়ে সকল ভুলে যাওয়া।
ভর দুপুরে ঘুঘু ডাকে দোয়েল নাচে ডালে,
শালিক চড়–ইর কিচিরমিচির কুহু রব কোকিলে।

*ফিরে ইচ্ছে করে শ্যামল মাটির গাঁয়
 নৌকা ¯্রােতে ভাসিয়ে মাঝি ভাটিয়ালী গায়।
পাকা ধানে বয়ে যাওয়া মৃদু মন্দ হাওয়া
সোনার কোমল পরশ পেয়ে সুখে নিদ্রা যাওয়া।

 

বৃক্ষকুলের ও কৃষকের স্বগতোক্তি

কৃষিবিদ আবু হেনা ইকবাল আহমেদ**
বৃক্ষকুলের স্বগতোক্তি


তোমার অনেক আগে এসছি ধরায়
আমার অনেক ঋণ পৃথিবী গড়ায়
সূর্যের রশ্মিকে রোজ খাবার বানাই
প্রাণিরে যোগাই খাদ্য আর নিজে খাই।

ধরণি শীতল রাখি শ্যামল সবুজ
করি না এমন কাজ, যা করো অবুজ
তোমার বায়ু দূষণ করে দেই সাফ
আমারে ধ্বংসে তোমার নাই মনোস্তাপ।

মেহিনী শ্যামল রূপে সাজাই  ভুবন
বাহারি ফসলে ভরি তোমার অঙ্গন
তোমার হাজার কাজ নীরবে মিটাই
পারি না থামাতে তবু অফুরন্ত খাঁই।

কৃতকর্মে আমাদের  চাই  এ স্বীকৃতি
আয়ুটারে দীর্ঘ করে বাঁচাও প্রকৃতি।

 

কৃষকের স্বগতোক্তি
খেতে হয় ভাত খাই যতটুকু চাই
ক্যালরি মাপি না ওর, স্বাদে যতো খাই।
পেটভরা খানা চাই করি না বিচার
কতোটুকু খেয়েছি যে মূল্য কতো তার।

জমিতে লাঙ্গল দেই ফলাই ফসল
তৃষ্ণাতে ফাটলে জমি ছেনে দেই জল।
যখন ফসল হাসে বুক ভরে যায়
কিনে আনি কত কিছু সংসার যা চায়।

মূল্যমান যেচে নিয়ে করি না আবাদ
কিছু তার বেচে ঘরে আনি দু’টা টাকা।
টানাপোড়েনের মাঝে দেই শখ বাদ
যার জন্য খাটি; সেতো সুখ ধরে রাখা।

টাকার মূল্যের বুঝ করিনি কখনো
লাভ ক্ষতি মেনে নেই, ভাবি না তা কোনো ॥

*১৪৭/কে, পূর্ব রাজাবাজার, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, মোবা. ০১৮২২২০৪৪০৫; **পরিচালক (অব.), বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী, কৃষি মন্ত্রণালয়। সেল ০১৬১৪৪৪৬১১১,  <ahiqbal.ahmed@yahoo.com>

বিস্তারিত
মাছের মিশ্র চাষ পদ্ধতি

রুই, কাতলা, মৃগেল, রাজপুঁটি, নাইলোটিকা, সিলভার কার্প ইত্যাদি চাষ লাভজনক। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এগুলো চাষ করলে ঝুঁকি কম ও খরচ কম। এজন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছের মিশ্র চাষ করলে ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।


১. পুকুর নির্বাচন: পুকুর নির্বাচন ও পুকুর প্রস্তুতি এবং ব্যবস্থাপনার উপর মাছ চাষের সফলতা বহুলাংশে নির্ভরশীল। সারা বছর পানি থাকে অথবা মৌসুমি পুকুর এই দুই ধরনের পুকুরেই চাষ করা যায়। পুকুরের আয়তন ১-৩ বিঘা এর মধ্যে হলেই ভালো হয়। তবে এর চেয়ে বড় বা ছোট আকারের পুকুরেও মাছ চাষ করা যায়। পুকুরটি আগাছামুক্ত ও খোলামেলা এবং বন্যামুক্ত স্থানে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। পুকুরের গভীরতা ৩-৫ ফুট হওয়াই সমীচীন। বছরে ৫-৬ মাস পানি থাকে এমন পুকুর নির্বাচন করতে হবে। পুকুর পাড়ে বড় ধরনের গাছপালা এবং গাছের পাতা পানিতে পড়তে পারে এ জাতীয় গাছ না থাকাই ভালো। পুকুরের উপর গাছের ছায়া পড়লে পুকুরে মাছের প্রাকৃতিক খাবার প্রচুর পরিমাণে জন্মাতে পারে না। তদুপরি গাছের পাতা পানিতে পচে পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করাসহ উৎপানদশীলতা কমিয়ে দেয়। সাধারণত দো-আঁশ ও কাদাযুক্ত দো-আঁশ মাটি পুকুরের জন্য উত্তম। মাছ চাষ ব্যবস্থাপনার জন্য পুকুরটি আয়তাকার হওয়া উচিত। সার্বিক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে পুকুরের অবস্থান বসতবাড়ির নিকটে হওয়াই ভালো।


২. পুকুর প্রস্তুতি: পুকুরে পোনা মজুদের আগে অবশ্যই পুকুর ভালোভাবে প্রস্তুত করে নিতে হবে। মাছের শারীরিক বৃদ্ধির স্বার্থে পুকুরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রাকৃতিক খাবার তৈরি নিশ্চিত করতে হবে। পুকুর প্রস্তুতিকালে বিভিন্ন পর্যায়গুলো হলো- জলজ আগাছা নিয়ন্ত্রণ, রাক্ষুসে মাছ ও অবাঞ্ছিত প্রাণী দমন, চুন ও সার প্রয়োগ ইত্যাদি।


জলজ আগাছা নিয়ন্ত্রণ : পুকুরে অপ্রয়োজনীয় আগাছার উপস্থিতিতে মাছ চাষ বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। মাছের চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করে ও মৎস্যভুক প্রাণীর শিকারের সুযোগ করে দেয়। জলজ আগাছা মাটির, পানির মৌল উপাদান বা পুষ্টি গ্রহণ করে মাটি ও পানি অনুর্বর করে ফেলে। ক্ষেত্র বিশেষে পানিতে অক্সিজেনের স্বল্পতা ঘটায়। বিভিন্ন প্রকার সার প্রয়োগের ফলে সৃষ্ট পানির পুষ্টিগুলো জলজ আগাছা বহুলাংশে গ্রহণ করে নেয়। ফলশ্রুতিতে পুকুরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মাছের খাদ্য জন্মে না। তাই পুকুরে শেওলাজাতীয় উদ্ভিদ, ভাসমান উদ্ভিদ, লতানো উদ্ভিদ ও নিমজ্জমান উদ্ভিদজাতীয় জলজ আগাছা জন্মাতে ও বৃদ্ধি ঘটতে দেয়া উচিত নয়। জলজ আগাছার মধ্যে সাধারণত কচুরিপানা, কলমিলতা, হেলেঞ্চা, ঝাউ ইত্যাদি লক্ষ করা যায়; যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সূর্যের আলো পুকুরের পানিতে খাদ্য তৈরিতে সহায়ক এবং আগাছা পুকুরের পানিতে সূর্যকিরণ প্রবেশ করতে বাধার সৃষ্টি করে। সুতরাং সকল প্রকারের জলজ আগাছা শিকড়সহ দমন করা অপরিহার্য। তন্তুজাতীয় শেওলা পুকুরে থাকলে তা পরিমিত পরিমাণে (প্রতি শতাংশে ৮ গ্রাম) তুঁত ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। অন্যান্য আগাছা কেটে পুকুর থেকে টেনে উঠাতে হবে।


রাক্ষুসে মাছ ও ক্ষতিকারক প্রাণী অপসারণ : পুকুর শুকানোর মাধ্যমে রাক্ষুসে মাছ যেমন- বোয়াল, চিতল, শোল, গজার, আইর, টাকি ইত্যাদি এবং চাষের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় মাছ যেমন- মলা, চান্দা, চেলা, পুঁটি, দারকিনা ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলতে হবে। মাছের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য প্রাণী যেমন- সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ইত্যাদি মেরে ফেলার ব্যবস্থা নিতে হবে। পুকুর শুকানোর কাজ শুকনা মৌসুমেই করা উচিত। পানি নিষ্কাশনের পর পুকুরের তলার মাটি ন্যূনতম সাতদিন ধরে রৌদ্রে শুকাতে হবে। এর পরেও যদি অতিরিক্ত কাদা থাকে তাহলে কিছু কাদা তুলে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর মাটি শুকানোর পর পুকুরের তলায় চাষ দেওয়ার অন্তত ২/৩ দিন পর প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি সরবরাহ করতে হবে (যদি সম্ভব হয়) নতুবা বৃষ্টির পানির অপেক্ষায় থাকতে হবে।


কোনো কারণে পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে জাল টেনে অথবা বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ এবং ক্ষতিকর প্রাণী দমন করতে হবে।


৩. চুন প্রয়োগ: পুকুরে মাটি ও পানি অম্ল ও দূষণমুক্ত করা, মাছের রোগ জীবাণু ও পরজীবী ধ্বংস করতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও পানিতে ক্যালসিয়াম বাড়াতে তথা পুকুরের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য চুন প্রয়োগ অত্যাবশ্যক। পুকুরের মাটি ও পানির গুণাগুণের ওপর চুনের সঠিক মাত্রা নির্ভরশীল। সাধারণত পুকুরের তলদেশে শুকনা অবস্থায় পাথুরে চুন গুঁড়া করে শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে সারা পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। তবে অম্ল­মান ৪ হলে ১০ কেজি, ৪.৫ হলে ৫ কেজি, ৫.৫ হলে ৩ কেজি, ৬.৫ হলে ২ কেজি প্রতি শতাংশে প্রয়োগ করতে হয়। চুন প্রয়োগের ২-৩ দিন পর পুকুরে পানি সরবরাহ করতে হবে। পানি শুকানো না হলে পানি ভর্তি পুকুরে একই হারে চুন পানিতে গুলে সারা পুকুরে ঢালু পাড়সহ ছিটিয়ে দিতে হবে।


৪. সার প্রয়োগ: পুকুরে মাছের জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী জাতীয় প্রাকৃতিক খাদ্য বা প্ল­াঙ্কটন জন্মানোর জন্য পুকুরে জৈব ও অজৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। চুন প্রয়োগের অন্তত ৪-৫ দিন পর নিম্নলিখিত হারে সার প্রয়োগ করা যেতে পারে :    
৫. বিষক্রিয়া পরীক্ষা: পানিতে বিষক্রিয়া থাকলে পোনা মারা যাবে বিধায় সঠিক ফলাফল পাওয়া যাবে না। পোনা ছাড়ার আগে পানির বিষক্রিয়া পরীক্ষা করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে যে কোনো পাত্রে পোনা রেখে অথবা পুকুরের পানিতে হাঁপা স্থাপন করে কিছু পোনা ছেড়ে অন্তত ২৪ ঘণ্টা রাখার পর পোনা মারা না গেলে পোনা ছাড়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। পোনা ছাড়ার আগের দিন পুকুরে ২-৩ বার হররা বা জাল টেনে নেয়া যেতে পারে।


৬. পোনা মজুদ: পানি ও মাটির গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে সঠিক মাত্রায় উন্নতমানের পোনা মজুদের ওপরই মাছ চাষের সফলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। একক চাষের ক্ষেত্রে ৩-৫ ইঞ্চি আকারের (৫-১০ গ্রাম ওজনের) পোনা নির্বাচন করাই উত্তম। ছোট আকারের পোনা মজুদে পোনা মৃত্যুর হার বেশি হবে এবং আশানুরূপ ফলন লাভের সম্ভাবনা কম থাকে। সার প্রয়োগের ৮-১০ দিন পর প্রাকৃতিক খাদ্য পরিমিত পরিমাণে পুকুরের পানিতে বিদ্যমান থাকলে প্রতি শতাংশ পুকুরে মোট ৩০-৩৫টি চারা পোনা মজুদ করা যাবে। এর মধ্যে রুই ১০-১৫টি, কাতলা ৮-১০টি, মৃগেল ৮-১০টি, রাজপুটি ৫-৬টি, নাইলোটিকা ৫-৬টি পোনা প্রতি শতাংশে ছাড়তে হবে।


পোনা মাছ সকালে বা বিকেলে পাড়ের কাছাকাছি ঠাণ্ডা পরিবেশে ছাড়াই উত্তম। অতি বৃষ্টিতে বা কড়া রোদের সময় পোনা ছাড়া উচিত নয়। পুকুরে পোনা বেঁচে থাকার হার বাড়ানোর জন্য পোনা ছাড়ার কারিগরি পদ্ধতি অবশ্যই অনুসরণ করে পোনা ছাড়তে হবে। নিকটবর্তী স্থানের জন্য পোনা পরিবহনের ক্ষেত্রে মাটির হাঁড়ি বা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে পোনা পরিবহন করা যেতে পারে। তবে দূরবর্তী স্থানের জন্য অক্সিজেন ভর্তি পলিথিন ব্যাগে পোনা পরিবহন করা অধিকতর নিরাপদ। পুকুরে পোনা ছাড়ার সময় পোনা ভর্তি ব্যাগ বা পাত্রের অর্ধাংশ পুকুরের পানিতে ১০-১৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। এরপর ব্যাগ বা পাত্রের মুখ খুলে দিতে হবে। অতঃপর পাত্র বা ব্যাগের কিছু পানি বের করে এবং পুকুরের পানি ভেতরে ঢুকিয়ে উভয় পানির তাপমাত্রা সমতায় আনতে হবে। যখন পাত্রের ভেতরের এবং পুকুরের পানির তাপমাত্রা সমান হয়েছে বলে প্রতীয়মান হবে তখন ব্যাগ বা পাত্রটিকে কাত করলে পোনাগুলো আপনা আপনি পুকুরে চলে যাবে।


৭. পোনা মজুদ পরবর্তী সার প্রয়োগ : পুকুরে পোনা মাছ মজুদের পর সাপ্তাহিক ভিত্তিতে নিয়মিতভাবে সার প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে জৈবসার যেমন- গোবর প্রতি ১৫ দিন অন্তর ১ কেজি অথবা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ৫০০ গ্রাম হারে পুকুরে ছিটিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ছাড়া প্রতি শতাংশে ইউরিয়া ৪০ গ্রাম ও টিএসপি ২০ গ্রাম হারে একটি পাত্রে ৩০ গুণ পানির সাথে মিশিয়ে অন্তত ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে রোদের সময় গোলানো সার সারা পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য, পুকুরের পানি যদি অত্যধিক সবুজ রঙ ধারণ করে তাহলে সার প্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। মেঘলা ও বৃষ্টির দিনে সার প্রয়োগ করা যাবে না।


৮. মাছের খাদ্য : মাছের খাদ্য প্রধানত দুই রকম- ক. প্রাকৃতিক খাদ্য খ. সম্পূরক খাদ্য।


ক. প্রাকৃতিক খাদ্য দুই রকম-
১. উদ্ভিদ কণা (
Phytoplancton) : জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সবুজ কণা তৈরি হয়, যা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- শেওলা, ফেকাস, নষ্টক, ডায়াটম, ভলবক্স, এনাবিনা ইত্যাদি।
২. প্রাণী কণা (
Zooplanton) : জলাশয়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমনÑ ময়না, ড্যাফনিয়া, বসমিনা, কেরাটেলা, ফিলিনিয়া, সাইক্লপস, প্রোটোজোয়া, রটিফার ইত্যাদি।


এসব প্রাকৃতিক খাদ্য জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। তবে বেশি পরিমাণে জন্মানোর জন্য জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়। প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়া মাছ দ্রুত বড় হয় ও মাছ খেতে সুস্বাদু। পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য আছে কি-না বোঝার পদ্ধতি হচ্ছে কাচের গ্লাসে পুকুরের স্বচ্ছ পানি নিয়ে সূর্যের আলোর দিকে ধরলে যদি গ্লাসে ৮-১০টি কণা দেখা যায় তবে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য আছে। সেক্কিডিস্ক বা হাত পুকুরের পানিতে ডুবালে যদি হাতের তালু বা ডিস্ক দেখা যায় তবে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য নাই। পুকুরের পানির রঙ হালকা সবুজ বা বাদামি দেখা গেলে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য আছে। প্রাকৃতিক খাদ্য যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও মজুদ মাছের মোট ওজনের ২-৫% সম্পূরক খাদ্য দিতে হয়।


খ. সম্পূরক খাদ্য : পুকুরে উৎপাদিত প্রাকৃতিক খাদ্যের অভাব হলে মাছের দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধির নিমিত্তে প্রাকৃতিক খাবারের পাশাপাশি সম্পূরক খাবার সরবরাহ করা একান্ত প্রয়োজন। মাছ ছাড়ার পরের দিন হতে প্রতিদিন সকালে ও বিকেল মজুদকৃত মাছের মোট শরীরের ওজনের শতকরা ৫-৬ ভাগ হারে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে। উল্লে­খ্য, প্রতি ২০ কেজি মাছের জন্য অন্ততপক্ষে ১ কেজি খাবার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি ১৫ দিন বা ১ মাস অন্তর একবার জাল টেনে কিছু মাছ ধরে ওজনের গড় বের করে নিয়ে মোট ওজনের উপর আনুপাতিক হারে খাবার দিতে হবে।

সরিষার খৈল ৩০% ও গমের ভুসি বা চালের কুঁড়া ৭০% অনুপাতে পানিতে ভিজিয়ে রেখে দুটি খাবারের মিশ্রণ পুকুরের বিভিন্ন স্থানে অথবা ৩-৪টি নির্দিষ্ট স্থানে প্রয়োগ করা যেতে পারে। উল্লে­খ্য, ভাসানো খাবার হিসাবে গমের ভুসি বা কুঁড়া পানির উপরে শুকনা অবস্থায় সপ্তাহে অন্তত ২-৩ দিন সরবরাহ করা ভালো। সহজ ব্যবস্থাপনায় অল্প খরচে শুধুমাত্র গমের ভুসি বা চালের কুঁড়া শতাংশ প্রতি ১ম মাসে ৫০ গ্রাম, ২য় মাসে ১০০ গ্রাম, ৩য় মাসে ১৮০ গ্রাম, ৪র্থ মাসে ২২০ গ্রাম, ৫ম মাসে ২৬০ গ্রাম ও ৬ষ্ঠ মাসে ৩০০ গ্রাম দিতে হবে।


সম্পূরক খাদ্য তৈরির নিয়ম : ফিশমিল ১০%, চালের কুঁড়া ৫৩%, সরিষার খৈল ৩০.৫০%, ভিটামিন ও খনিজ মিশ্রণ ০.৫% ও চিটাগুড় ৬% মেপে নিতে হয়। এগুলো গুঁড়ো করে মিশাতে হবে। এরপর পানি দিয়ে ম- তৈরি করে পিলেট মেশিনে দিয়ে ছোট ছোট বড়ি তৈরি করতে হবে। এগুলো শুকিয়ে মাছকে খেতে দেয়া যাবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট সময়ে সম্পূরক খাদ্য দিতে হয়। খাদ্যগুলো পুকুরে পানির নিচে নির্দিষ্ট গভীরতায় দিতে হয়। ভাসমান খাদ্য দিলে খাদ্যের অপচয় কম হয়। সম্পূরক খাদ্য দিলে মাছের খাদ্যের অভাব দূর হয়। মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়াও টোপাপানা, ক্ষুদিপানা, কলাপাতা, নেপিয়ার বা প্যারা জাতীয় নরম ঘাস, পাতা ইত্যাদি প্রতিদিন লবণ-পানিতে ধুয়ে সকাল-বিকেল পুকুরে আয়তাকার বেষ্টনীর মধ্যে সরবরাহ করা যেতে পারে।


৯. অন্যান্য পরিচর্যা: পুকুরের পানি ও মাটির বিভিন্ন ভৌত ও রাসায়নিক গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে পুকুরে সার ও খাবার প্রয়োগ করা সমীচীন হবে। মাছের শারীরিক বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও রোগবালাই পরীক্ষা করার জন্য প্রতি মাসে অন্তত একবার জাল টেনে নমুনা দেখা তথা সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা উচিত। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন, পিএইচ, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও প্ল­াঙ্কটনের পরিমাণ নিয়মিতভাবে পরিমাপ করা প্রয়োজন। মাছ ধরে পুনরায় পুকুরে ছাড়ার আগে ২০ লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম পটাশ (পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট) অথবা ২০ লিটার পানিতে ১ মুঠো লবণ-পানি দ্রবণে ১-২ মিনিট গোসল করানো উচিত। কোনো রোগবালাই দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুকুরের পানির ওপর ঘন লাল স্তর পড়লে তা কলাগাছের পাতা পেঁচিয়ে পানির ওপর দিয়ে ভাসমান অবস্থায় টেনে নিয়ে এক জায়গায় জমা করে ঘন ফাঁসের জাল বা কাপড় দিয়ে তুলে ফেলতে হবে। সকালের দিকে বা দিনের অন্য সময়ে যদি অত্যধিক পরিমাণে মাছ পানির ওপর ভেসে উঠে খাবি খেতে দেখা যায় তাহলে ধরে নিতে হবে যে পানিতে অক্সিজেনের অভাব রয়েছে। এ অবস্থায় পুকুরে জাল টেনে, বাঁশ পিটিয়ে বা সাঁতার কেটে পানিতে ঢেউ এর সৃষ্টি করে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। কয়েক দিনব্যাপী মেঘলা আকাশ থাকলে মাছের এ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। পুকুরে মাছ খাবি খাওয়া অবস্থায় সাময়িকভাবে সার ও খাদ্য প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। বাইরের বিষাক্ত পানি যেন পুকুরে কোনো অবস্থাতেই না ঢুকে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। পুকুরে তন্তুজাতীয় শেওলা ও অন্যান্য আগাছার পরিমাণ বেড়ে গেলে পুকুরের পানিতে অক্সিজেন ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে মাছ মারা যেতে পারে। তাই তন্তুজাতীয় শেওলা ও জলজ আগাছা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।


১০. মাছ আহরণ ও ফলন : সময়মতো মাছ ধরা ও বিক্রয় করা মাছ চাষের ক্ষেত্রে একটি উল্লে­খযোগ্য পদক্ষেপ। অপেক্ষাকৃত বড় আকারের বিক্রয়যোগ্য মাছ ধরে বাজারজাত করা উচিত। আংশিক আহরণ পদ্ধতিতে মাছ ধরে নেয়ার পর আহরণকৃত মাছের সংখ্যা পূরণ করার জন্য বড় আকারের সমপরিমাণ পোনা পুকুরে ছাড়তে হবে। উপোরল্লি­খিত পদ্ধতিতে মাছ চাষ করলে এবং আংশিক পদ্ধতিতে মাছ আহরণ করা হলে অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব।

 

কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ
কৃষি প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল। বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত লেখক। মোবাইল: ০১৭১১-৯৫৪১৪৩

বিস্তারিত
ভাদ্র মাসের কৃষি (শ্রাবণ ১৪২৫)

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের সবার জন্য শুভকামনা। এ সময় বর্ষার পানিতে সারাদেশ টইটুম্বুর থাকে, সাথে ঝরে অঝোর বৃষ্টি। সেজন্য কৃষিতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি। কৃষির এ ক্ষতি মোকাবেলায় আমাদের নিতে হবে বিশেষ ব্যবস্থাপনা। কৃষির ক্ষতিটাকে পুষিয়ে নেয়া এবং প্রয়োজনীয় কাজগুলো যথাযথভাবে শেষ করার জন্য ভাদ্র মাসে কৃষিতে করণীয় বিষয়গুলো জেনে নেবো সংক্ষিপ্তভাবে ।


আমন ধান : আমন ধান ক্ষেতের অন্তর্বর্তীকালীন যত্ন নিতে হবে। ক্ষেতে আগাছা জন্মালে তা পরিষ্কার করে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। আমন ধানের জন্য প্রতি একর জমিতে ৮০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োজন হয়। এ সার তিন ভাগ করে প্রথম ভাগ চারা লাগানোর ১৫-২০ দিন পর, দ্বিতীয় ভাগ ৩০-৪০ দিন পর এবং তৃতীয় ভাগ ৫০-৬০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে। নিচু জমি থেকে পানি নেমে গেলে এসব জমিতে এখনো আমন ধান রোপণ করা যাবে। দেরিতে রোপণের জন্য বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান৪৬, বিনাশাইল, নাইজারশাইল বা স্থানীয় উন্নত ধান বেশ উপযোগী। দেরিতে চারা রোপণের ক্ষেত্রে প্রতি গুছিতে ৫-৭টি চারা দিয়ে ঘন করে রোপণ করতে হবে। আমন মৌসুমে মাজরা, পামরি, চুঙ্গী, গলমাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। এছাড়া খোলপড়া, পাতায় দাগ পরা রোগ দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে, জমিতে খুঁটি দিয়ে, আলোর ফাঁদ পেতে, হাতজাল দিয়ে পোকা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাছাড়া সঠিক বালাইনাশক সঠিক মাত্রায়, সঠিক নিয়মে, সঠিক সময় শেষ কৌশল হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।


পাট : বন্যায় তোষা পাটের বেশ ক্ষতি হয়। এতে ফলনের সাথে সাথে বীজ উৎপাদনেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। বীজ উৎপাদনের জন্য ভাদ্রের শেষ পর্যন্ত দেশি পাট এবং আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত তোষা পাটের বীজ বোনা যায়। বন্যার পানি উঠেনা এমন সুনিষ্কাশিত উঁচু জমিতে জো বুঝে প্রতি শতাংশে লাইনে বুনলে ১০ গ্রাম আর ছিটিয়ে বুনলে ১৬ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। জমি তৈরির সময় শেষ চাষে শতকপ্রতি ২৭০ গ্রাম ইউরিয়া, ৪০০ গ্রাম টিএসপি, ১৬০ গ্রাম এমওপি সার দিতে হবে। পরবর্তীতে শতাংশপ্রতি ইউরিয়া ২৭০ গ্রাম করে দুই কিস্তিতে বীজ বপনের ২০-২৫ দিন এবং ৪০-৪৫ দিন পর জমিতে দিতে হবে।


আখ: এসময় আখ ফসলে লালপচা রোগ দেখা দিতে পারে। লালপচা রোগের আক্রমণ হলে আখের কা- পচে যায় এবং হলদে হয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে। এজন্য আক্রান্ত আখ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং জমিতে যাতে পানি না জমে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া রোগমুক্ত বীজ বা শোধন করা বীজ ব্যবহার করলে অথবা রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করলে লালপচা রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। লালপচা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন কয়েকটি আখের জাত হচ্ছে ঈশ্বরদী ১৬, ২০, ২১।


তুলা : ভাদ্র মাসের প্রথম দিকেই তুলার বীজ বপন কাজ শেষ করতে হবে। বৃষ্টির ফাঁকে জমির জো অবস্থা বুঝে ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করে বিঘা প্রতি প্রায় ২ কেজি তুলা বীজ বপন করতে হয়। লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার এবং বীজ থেকে বীজের দূরত্ব ৩০ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার বজায় রাখতে হয়। তুলার বীজ বপনের সময় খুব সীমিত। হাতে সময় না থাকলে জমি চাষ না দিয়ে নিড়ানি বা আগাছানাশক প্রয়োগ করে ডিবলিং পদ্ধতিতে বীজ বপন করা যায়। বীজ গজানোর পর কোদাল দিয়ে সারির মাঝখানের মাটি আলগা করে দিতে হবে। সমতল এলাকার জন্য সিবি-৯, সিবি-১২, হীরা হাইব্রিড রূপালী-১, ডিএম-২, ডিএম-৩ অথবা শুভ্র জাতের চাষ করতে পারেন। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ি তুলা-১ এবং পাহাড়ি তুলা-২ নামে উচ্চফলনশীল জাতের তুলা চাষ করতে পারেন।


শাকসবজি : ভাদ্র মাসে লাউ ও শিমের বীজ বপন করা যায়। এজন্য ৪-৫ মিটার দূরে দূরে ৭৫ সে.মি চওড়া এবং ৬০ সে.মি গভীর করে মাদা বা গর্ত তৈরি করতে হবে। এরপর প্রতি মাদায় ২০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম টিএসপি এবং ৭৫ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। মাদা তৈরি হলে প্রতি মাদায় ৪-৫টি বীজ বুনে দিতে হবে এবং চারা গজানোর ২-৩ সপ্তাহ পর দুই-তিন কিস্তিতে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৭৫ গ্রাম এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। এ সময় আগাম শীতকালীন সবজি চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করা যেতে পারে। সবজি চারা উৎপাদনের জন্য উচু এবং আলো বাতাস লাগে এমন জায়গা নির্বাচন করতে হবে। এক মিটার চওড়া এবং জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে লম্বা করে বীজতলা করে সেখানে উন্নত জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টমেটো এসবের বীজ বুনতে পারেন।


গাছপালা : ভাদ্র মাসেও ফলদবৃক্ষ এবং ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা যায়। বন্যায় বা বৃষ্টিতে মৌসুমের রোপিত চারা নষ্ট হয়ে থাকলে সেখানে নতুন চারা লাগিয়ে শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে হবে। এছাড়া এবছর রোপণ করা চারার গোড়ায় মাটি দেয়া, চারার আতিরিক্ত এবং রোগাক্রান্ত ডাল ছেটে দেয়া, বেড়া ও খুঁটি দেয়া, মরা চারা তুলে নতুন চারা রোপণসহ অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে। ভাদ্র মাসে আম, কাঠাল, লিচু গাছ ছেটে দিতে হয়। ফলের বোঁটা, গাছের ছোট ডালপালা, রোগাক্রান্ত অংশ ছেটে দিলে পরের বছর বেশি করে ফল ধরে এবং ফলগাছে রোগও কম হয়।


প্রাণিসম্পদ : ভাদ্র মাসের গরমে পোল্ট্রি শেডে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করতে হবে। টিনশেডে চটের ছালা রেখে মাঝে মাঝে পানি দ্বারা ভিজিয়ে দিতে হবে। যাতে করে অধিক গরমে মুরগিগুলো মারা না যায় এবং নানা রোগের বিস্তার না ঘটে। ভেজা আবহাওয়া ও মাঝে মাঝে গরম পোল্ট্রির ক্ষেত্রে গামবোরো রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি করে। এ রোগে  মুরগির পালক নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। গা গরম ও কাঁপুনি দেখা দেয়। সাদা পানির মতো পাতলা পায়খানা দেখা যায়। মুরগি সহজে নড়ে না। এমনিতে ভাইরাসজনিত এ রোগের কোন চিকিৎসা নেই। এ জন্য আগে থেকেই সর্তক থাকতে হবে ও রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে।


বাংলাদেশে গোখাদ্যের সমস্যা এখনও বিরাজমান। সে কারণে পতিত জমিতে নেপিয়ার, বাজরা, খেসারি, মটর, ইপিল ইপিল, গিনি ঘাস লাগানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা দুধবতী গাভী পালন এবং যারা গরু মোটাতাজাকরণ করবেন, তাদের অবশ্যই গবাদি পশুকে সুষম খাবার সরবরাহ করতে হবে। কোন জায়গায় যদি পানি জমে থাকে সে এলাকায় জন্মানো ঘাস গবাদি পশুকে খাওয়ানো যাবে না। কারণ এতে গাভী বা গরুর রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। গরু ও ছাগলকে নিয়মিত গোসল করার ব্যবস্থা করতে হবে। গোয়াল ঘরের গোবর চনা নিয়মিত পরিষ্কার করা দরকার। আর গরুর গায়ের আঠালি, মাছি, জোঁক পোকামাকড় বেছে দিতে হবে। তড়কা, বাদলা, গলাফুলা রোগ যাতে না হয় সেজন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারি সার্জনের সাথে যোগাযোগ রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।


মৎস্যসম্পদ : পুকুরে সার ব্যবহারের মাত্রা আস্তে আস্তে কমিয়ে ফেলতে হবে। জৈব সার ব্যবহার না করাই ভালো। খাদ্য ঘাটতির জন্য পরিমাণ মতো অজৈব সার ব্যবহার করা দরকার। পুকুরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। পুকুরে নতুন মাছ ছাড়ার সময় এখন। মাছ ছাড়ার আগে পুকুরের জলজ আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। পুকুর জীবাণুমুক্ত করে সঠিক সংখ্যক সুস্থ সবল পোনা মজুদ করতে হবে। যেসব পুকুরে মাছ আছে সেসব পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি-পুকুরে পাঙ্গাশ মাছের চাষ, ধান ক্ষেতে মাছ চাষ, প্লাবিত এলাকায় ঘেরের মাধ্যমে রাজপুটি ও চিংড়ির চাষ, পুকুরে রুই জাতীয় ও চিংড়ির মিশ্র চাষ এবং প্লাবিত এলাকায় খাঁচায় মাছ চাষ করা যেতে পারে। বন্যার কারণে ভেসে যাওয়া পুকুরের মাছ পুকুরে রাখতে ভেসে যাওয়া পুকুরগুলোর ১৫ থেকে ২০ মিটার দূরত্বে একটি চটের ব্যাগে ৫ থেকে ৭ কেজি ধানের কুড়া বা গমের ভুসি ৫০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পানির নিচে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। তবে ব্যাগটিতে অবশ্যই ছোট ছোট ছিদ্র করে দিতে হবে। খাবার পেয়ে মাছ পুকুরেই অবস্থান করবে। কোন কারণে পুকুরের পানি যদি দূষিত হয় তবে ভাইরাস, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে মাছের ক্ষত রোগ দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেহের ভারসাম্যহীনতা, শরীরে লাল দাগ দেখা যায়। পরে মাছ ক্ষতরোগে মারা যায়। এ রোগ প্রতিকারে অধিক আক্রান্ত মাছ উঠিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। প্রতি শতক পুকরে ১ কেজি চুন ও ১ কেজি লবণ প্রয়োগ করতে হবে। ছোট ও ব্রুড মাছের জন্য প্রতি কেজি খাদ্যের সাথে ৬০ থেকে ১০০ মিলি গ্রাম টেরামাইসিন মিশিয়ে মাছকে খাওয়ানো যেতে পারে।


সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি এখন সবুজ শ্যামলীমায় ভরপুর। সে সাথে বন্যা, প্লাবন আমাদের নিত্য সহচর। তাই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে সব সময়। সকল কৃষক ভাইয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমাদের কৃষিকে নিয়ে যাবে সাফল্যের দারপ্রান্তে। সবার জন্য নিশ্চিত সফল কৃষি উৎপাদন কামনা করে এ মাসের কৃষি এখানেই শেষ করলাম।


তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫; মোবাইল: ০১৯১১০১৯৬১০ ই-মেইল : ioag@ais.gov.bd

বিস্তারিত
বেল চাষাবাদের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা (শ্রাবণ ১৪২৫)

বেল (Aegle marmelos) ফলটি Rutaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। বেলের আদি নিবাস হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশকে ধরা হয়। তবে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশে বেল জন্মায় ও ভালো ফলন দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। পছন্দের এই ফলটি ভারত ও বাংলাদেশে বেল নামে পরিচিত হলেও ইন্দোনেশিয়ায় মাঝা ও থাইল্যান্ডে মাতুন নামে পরিচিত। এই বেলকে আরবিতে সাফারজাল এবং হিন্দি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় বেল নামেই ডাকা হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ফলটির চাষাবাদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত।


বেল বাংলাদেশে চাষযোগ্য একটি অপ্রধান দীর্ঘমেয়াদি ফল। তবে অপ্রধান ফল বলে বিবেচিত হলেও এর বহুবিধ ব্যবহার, পুষ্টিগুণ কোনো অংশে কম নয়। ছোট বড় সবাই এই ফলটি পছন্দ করে থাকেন। এদেশের প্রায় সব জেলাতেই বেলের গাছ জন্মাতে ও ফলন দিতে দেখা যায়। বেলের গাছ মূলত বাড়ির আশপাশে, পুকুর পাড়ে, রাস্তার পার্শ্বে অযত্ন অবহেলায় জন্মে থাকে এবং বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এদেশে কোনো বাণিজ্যিকভাবে বেলের বাগান করতে দেখা যায়নি। কারণ হিসেবে দেখা যায়, বীজের গাছ থেকে বেল পেতে সময় লাগে ৮-১২ বছর। আসলে এত দীর্ঘ সময় কেউ ফলের জন্য অপেক্ষা করতে চায় না। যে জেলাগুলোতে বেল উৎপাদিত হয় তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অন্যতম। ফল বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্ঠা সারা বছর দেশীয় ফলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে ২০০৬ সালে কয়েকটি অপ্রধান ফল বাছাই করে এই ফলগুলোর ওপর প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। অত্র কেন্দ্রে বেল ও ডালিমের ওপর বেশ গুরুত্ব দিয়ে ২০০৭ সালে জার্মপ্ল­াজম শনাক্তকরণ ও সংগ্রহ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বেলের ২২টি ভালোমানের জার্মপ্ল­াজম সংগ্রহ ও কলম করা হয়। সংগ্রহকৃত জার্মপ্ল­াজম হতে দীর্ঘ ৯ বছর গবেষণা করার পর বারি বেল-১ নামের একটি জাত মুক্তায়ন করা হয়েছে। এই জাতটি বাংলাদেশের সব জেলাতেই জন্মাতে ও ফলন দিতে সক্ষম। আশা করা যায় বেলের এই জাতটি চাষাবাদ করে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং অসময়ে দেশীয় ফলের চাহিদা মেটাতে অনেকটাই সক্ষম হবে। এছাড়াও আরো কয়েকটি জার্মপ্লাজম সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা দিয়েছে। আরও কয়েকটি জার্মপ্ল­াজমকে সম্ভাবনাময় হিসেবে পাওয়া গেছে। চলতি মৌসুমে আরো একটি জার্মপ্ল­াজম মূল্যায়নের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এই বেলটি ৩-৪ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। সুতরাং নতুন নতুন বেলের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত আছে।


গত বছর থেকে বারি বেল-১ এর কলম চাষিদের মাঝে বিতরণ শুরু হয়েছে। এই জাতটি কলমের মাধ্যমে জন্মানো যাবে, যার ফলে মাতৃগাছের গুণাগুণ হুবহু অক্ষুণœ থাকবে এবং ফল আসতে সময় লাগবে মাত্র ৪-৫ বছর। ফলে অন্যান্য ফলের মতো বেলও চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে পারবে। বেলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ প্রথম শুরু করছেন পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার চাষি আলহাজ মো. শাহজাহান আলী যিনি পেঁপে বাদশা নামেও পরিচিত। তিনি এই কেন্দ্র হতে কয়েকটি জার্মপ্ল­াজম সংগ্রহ করেছেন এবং তার জমিতে রোপণ করেছেন। তার বর্তমানে বেল গাছের সংখ্যা ৩৫০টি।


বারি বেল-১ জাতটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য : ফল মাঝারি আকারের, নিয়মিত ফলদানকারী; প্রতিটি ফলের গড় ওজন ৯০০ গ্রাম, কাঁচা বেলের রঙ সবুজ। তবে পাকা ফল দেখতে হালকা সবুজ হতে হালকা হলুদ বর্ণের এবং টিএসএস ৩৫%। ফলের খাদ্যোপযোগী অংশ ৭৮ ভাগ। সাত বছর বয়সী গাছপ্রতি গড় ফলের সংখ্যা ৩৮টি এবং গড় ফলন ৩৪ কেজি/গাছ/বছর। অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ১৪ টনের মতো। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলনও বাড়বে। এটি বেলের মধ্যম সময়ের জাত। এই জাতটির সংগ্রহের সময় মার্চ মাসের শেষ হতে এপ্রিল মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত। বাংলাদেশের সব জেলাতেই এই জাতটি চাষাবাদ করা যাবে।


বেলের ব্যবহার ও পুষ্টিগুণ : কাঁচা ও পাকা বেলের রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার। পাকা বেলের শাঁস গাছ থেকে পেড়ে সরাসরি খাওয়া যায়। এছাড়াও পাকা বেলের শাঁস সরবত, জ্যাম, জেলি, চাটনি, স্কোয়াস, বেভারেজ ও বিভিন্ন ধরনের আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বেলের পাতা ও ডগা সালাদ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। বেল পুষ্টিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা বেলের শাঁসে থাকে আর্দ্রতা ৬৬.৮৯ ভাগ, কার্বোহাইড্রেট ৩০.৮৬ ভাগ, প্রোটিন ১.৭৬ ভাগ, ভিটামিন সি ৮.৬৪ মিলিগ্রাম, ভিটমিন এ (বেটাকেরোটিন) ৫২৮৭ মাইক্রোগ্রাম, শর্করা ৩০.৮৬ ভাগ, ফসফরাস ২০.৯৮ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১২.৪৩ মিলিগ্রাম এবং লৌহ ০.৩২ মিলিগ্রাম। এমনকি বেল গাছের কা- হতে যে আঠা পাওয়া যায় তা গাম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বেলের রয়েছে বহুবিধ ঔষধি গুণাগুণ। পাকা বেলের  সরবত কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে থাকে। অন্য একটি গবেষণার ফল হতে দেখা গেছে, বেল হতে প্রাপ্ত তেল ২১ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে।


যেভাবে পাওয়া যাবে বেলের কাক্সিক্ষত কলম : প্রথম কাজটি হবে ভালো গুণগতমানসম্পন্ন মাতৃগাছ নির্বাচন করা অর্থাৎ যে গাছ হতে পরবর্তীতে সায়ন সংগ্রহ করা হবে। দ্বিতীয় কাজটি হলো যে কোনো বেলের বীজ হতে পলিব্যাগে চারা উৎপন্ন করা যা পরে রুটস্টক হিসেবে ব্যবহার করা হবে অথবা নিকটস্থ নার্সারি হতে বেলের চারা সংগ্রহ করা যায় এবং শেষ কাজটি হলো উপযুক্ত সময়ে (এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি) কাক্সিক্ষত বয়সের (৩-৬ মাস) রুটস্টকে কাক্সিক্ষত সায়নটি ক্লেফট গ্রাফটিং বা ফাটল কলমের মাধ্যমে জোড়া লাগানো। আসলে অন্যান্য ফলের বেলায় যেভাবে ক্লেফট গ্রাফটিং বা ফাটল কলম করা হয়, বেলের ক্ষেত্রে একইভাবে করা হয় তবে এক্ষেত্রে সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্থানভেদে সময় ৭ দিন কম-বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলো মাতৃগাছের নতুন কচিপাতা বের হওয়ার আগেই ডগা সংগ্রহ করে কলম বাধার কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। আরেকটি মজার বিষয় হলো অন্যান্য ফলের বেলায় শুধু ডগাটি সায়ন হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিন্তু বেলের বেলায় একটি ডগা হতে ২-৪টি পর্যন্ত সায়ন পাওয়া যায়। একটি সায়নে ২-৩টি কুড়িই যথেষ্ঠ। তবে ডগার শীর্ষ হতে একটু কেঁটে ফেলা উত্তম। মাতৃগাছে কচিপাতা বের হওয়ার পর কলম করলে কলমের সফলতা অনেক কমে যাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ ভাগে নেমে আসতে পারে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে কলম করা হলে সফলতা প্রায় ৯০-৯৫ ভাগ। গ্রাফটিং করার দুই সপ্তাহের মধ্যেই নতুন কুশি বের হবে। তবে কলম করার সপ্তাহখানেক পর হতে দিনে কমপক্ষে একবার পরিদর্শন করা ভালো। সায়ন হতে নতুন কুশি বের হলে ওপরের পলিথিন কভারটি সরিয়ে ফেলতে হবে এবং রুটস্টক হতে কোন কুশি বের হলে তা ভেঙে ফেলতে হবে। এইভাবেই পাওয়া যাবে কাক্সিক্ষত বেলের কলম।


চাষাবাদ পদ্ধতি : জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দ্বারা তৈরি করে নিতে হবে। লাইন থেকে লাইন এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৫ মিটার। কলমের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে। নির্ধারিত গর্তে গোবর সার বা জৈব সার প্রয়োগ করা ভালো। জুন-জুলাই মাসে নির্ধারিত গর্তে কলমের চারাটি রোপণ করতে হবে। লাগানোর পর অন্যান্য পরিচর্যা সমূহ করতে হবে। রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ তেমন লক্ষ্য করা যায় না। তবে একটি লেপিডোপটেরান পোকার লার্ভা বেলের কপি পাতা খায়। নতুন পাতাবের হলে সাইপারমেথ্রিন, কার্বারিল অথবা ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের যে কোনো একটি কীটনাশক নির্দেশিত মাত্রায় মাত্র একবার ব্যবহার করলে পোকাটির আক্রমণ থেকে বেলের পাতাকে রক্ষা করা যাবে। এদেশে বর্তমানে যতগুলো ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় তার মধ্যে বেলে সবচেয়ে কম বালাইনাশকের ব্যবহার হয় এবং সবচেয়ে বেশি সময় গাছে থাকে। বেলের ফুল আসা থেকে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ১১ মাস। ফলে এই দেশীয় ফলটি সবচেয়ে নিরাপদও বটে।


পরিশেষে, ফলটির গুরুত্ব বিবেচনায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে উৎসাহিত করতে হবে ফল চাষিদের। অসময়ে দেশীয় ফলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে আমদানি নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে এমনটিই প্রত্যাশা ফল গবেষকদের।

 

কৃষিবিদ ড. মো. শরফ উদ্দিন
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (শ্রাবণ-১৪২৫)

হাজেরা বেগম, গ্রাম: দক্ষিণ মামগ্রাম, উপজেলা: বাঘা,
জেলা: রাজশাহী
প্রশ্ন: চিচিঙ্গা গাছের পাতায় সাদা গুঁড়া গুঁড়া দেখা যাচ্ছে। এছাড়া পাতার দাগগুলো শুকিয়ে বাদামি হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কি করণীয়?  

উত্তর: চিচিঙ্গা গাছের পাতায় এ ধরনের সমস্যাকে পাউডারি মিলডিউ নামক রোগ বলে। এতে গাছ বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি ফলন কমে যায়। এজন্য প্রপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক ০.৫ মিলি ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর পর ২/৩ বার সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যাবে।   


মো. আলমগীর হোসেন, গ্রাম: চরকেশবপুর, উপজেলা: শিবচর, জেলা: মাদারীপুর
প্রশ্ন: মুখীকচুর পাতায় এক ধরনের দাগ পড়ছে। সব দাগ মিলে পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে। কি করলে এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাব?

উত্তর: মুখীকচুর পাতায় এ ধরনের সমস্যা কে পাতার দাগ রোগ বলে। এ রোগ দমনের জন্য কার্বেনডাজিম গ্রুপের ১ গ্রাম ছত্রাকনাশক ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। আর যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে সেটি হলো রোগমুক্ত গাছ থেকে চারা সংগ্রহ করা। আশা করি এসব নিয়ম মেনে চললে ভবিষ্যতে আর এ ধরনের সমস্যা থাকবে না।

 

চন্দন রায় গ্রাম: লাউযুথি, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন:  পেয়ারা ফল কাটলে পেয়ারার মাঝে কীড়া দেখা যায়। আক্রান্ত ফলও পচে যায়। কি করণীয়?

উত্তর: পেয়ারা ফলে ফলের মাছি পোকা আক্রমণ করলে এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়। সেক্ষেত্রে পোকাযুক্ত ফলগুলো মাটিতে গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হয়। এছাড়া বিষফাঁদ ব্যবহার করলেও উপকার পাওয়া যায়। এমনকি জৈব কীটনাশকও ব্যবহার করা যায়। গাছের গোড়া পরিষ্কার করে মাটি কুপিয়ে দিলেও সুফল পাওয়া যায়। আর যদি আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে তবে ১ মিলি ইমিডাক্লোরপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে ২/৩ বার স্প্রে করলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

 

সুপর্ণা রায়, গ্রাম: মৌতলা, উপজেলা: কালিগঞ্জ, জেলা: সাতক্ষীরা
প্রশ্ন: লেবু গাছের ফল ঝরে যাচ্ছে। এর কারণ ও প্রতিকার কি?  

উত্তর: লেবু গাছের ফল ঝরে হরমোনের অভাব, রসের অভাব, ত্রুটিপূর্ণ সেচ, রোগ ও পোকার আক্রমণ, ঠা-া ও গরম আবহাওয়ার তারতম্য এবং সুষম সারে অভাব হলে। আর এসব সমস্যা দূর করতে হলে সঠিক মাত্রায় সুষম সার প্রয়োগের পাশাপাশি জিংক সার প্রয়োগ করা। এছাড়া গ্রোথ হরমোন ১ গ্রাম ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ফুল আসার আগে ও ফল গুটি আকার ধারণ করার পর সঠিক নিয়মে স্প্রে করা। আর লেবু গাছের গেড়ায় যাতে কোনোভাবেই পানি না জমে সে ব্যবস্থা করা। আবার লেবু গাছের গোড়ায় যেন পানির অভাব না হয় সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। এসব ব্যবস্থাপনা মেনে চললে আশা করি আপনার লেবু গাছের ফল ঝরে যাওয়ার সমস্যা দূর হবে। 

ফজলুর রহমান, গ্রাম: সরফরাজপুর, উপজেলা:  চৌগাছা, জেলা: যশোর
প্রশ্ন: পেঁপে ফলের পরিপক্বতা কিভাবে বুঝা যায় এবং পেঁপের ফল পাতলাকরণের পদ্ধতি কি?

উত্তর: পেঁপে যখন পুষ্ট বা পরিপক্ব হয় তখন ফলের গায়ে আঁচড় কাটলে সাদা কষ বের হয় সেটির ঘনত্ব পানির মতো হয় এবং রঙ এ বেশ স্বচ্ছতা দেখা যায়। অন্যদিকে অপরিপক্ব ফলের কষ বেশ আাঠালো, ঘন এবং দুধ সাদা রঙের হয়। আর পেঁপে ফল পাতলাকরণ করতে হলে এ কাজটি ফল আসার ২ মাসের মধ্যে করতে হয়। কা-ের প্রতি পর্বে ১-২টি ফল রেখে অন্য গুলো ধারালো চাকু দিয়ে অপসারণ করতে হয়। আর এসব পেঁপে সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। এ ফল পাতলাকরণ করলে বাকি পেঁপেগুলো আকারে বড় হয় ও বাজারমূল্যও বেশি পাওয়া যায়।  

 

রহিম শেখ, গ্রাম: কেরাদারি, উপজেলা: রাজারহাট, জেলা: কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন: ঢেঁড়শ গাছের শিকড়ে প্রচুর গিট দেখা যাচ্ছে এবং গাছের পাতা ছোট আকারের হয়ে যাচ্ছে। এ সমস্যা কিভাবে সমাধান করব?

উত্তর: ঢেঁড়শ গাছের এ সমস্যাটি কৃমিজনিত রোগ। এ রোগ হলে গাছের পাতা ছোট ও শিকড়ে প্রচুর গিট দেখা যায়। এজন্য এ রোগ দেখা দিলে আক্রান্ত গাছ দেখলেই তা তুলে ধ্বংস করতে হবে। একই জমিতে বারবার চাষ না করা। জমি গভীরভাবে চাষ করা। শেষ চাষের সময় কার্বোফুরান জাতীয় দানাদার কীটনাশক জমিতে প্রয়োগ করা। এসব নিয়ম অনুসরণ করলে আপনার সমস্যার কাক্সিক্ষত সমাধান পাবেন।    


জাহিদ হাসান, গ্রাম: বিষকা, উপজেলা: তারাকান্দা, জেলা: ময়মনসিংহ
প্রশ্ন: মাছের শরীরে জোঁক দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় কি করব?  

উত্তর: এ রোগের লক্ষণ ও কারণগুলো হলো- স্বল্প পিএইচ বা অম্ল পানিতে পুকুরের তলায় বিচরণকারী মাছ সমূহের গায়ে জোঁকের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। জোঁকগুলো মাছের ত্বক থেকে দেহের রস শোষণ করতে গিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে যাতে পরবর্তীতে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। আর এ রোগের কারণ হলো হেমিক্লেপসিস মার্জিনেটা। এ রোগ প্রতিকারে যেসব করণীয় তা হলো- মাছের গা থেকে চিমটের সাহায্যে উকুন বেছে ফেলা, প্রতি শতক জলাশয়ে এক কেজি হারে চুন প্রয়োগ করা, পটাশিয়াম প্যারম্যাঙ্গানেট বিঘা প্রতি ২.৫ কেজি হারে জলে গুলে উকুন মাছের দেহ থেকে ছেড়ে যাবে। আর যদি অতিরিক্ত উকুন হলে হেক্টর প্রতি ৭৫ মিলি নুভান জলে গুলে দিলে মাছকে উকুনের হাত থেকে বাঁচানো যায়। নুভান একটি বিষ এজন্য নুভান ব্যবহারে সর্তক হতে হবে। এ কারণে প্রতি ৫ লিটার জলে ০.৫ মিলি নুভান গুলে আক্রান্ত মাছ ধরে নুনমিশ্রিত পানিতে ৫ মিনিট রেখে চিকিৎসা করা দরকার। এ নিয়ম মেনে কাজ করলে ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।  


আলমগীর কবির, গ্রাম: হরিহরপুর, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও, জেলা: ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন: মাছের কৃমি রোগ হয়েছে কি করব?

উত্তর: এ রোগ সাধারণত দুই প্রকার কৃমির আক্রমণে হয়ে থাকে। সেগুলো হলো গাইরোড্যাক্টাইলাস ও ড্যাক্টাইলোগাইরাস বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বর্ষায় এই দুই কৃমিতে চারা মাছ আক্রান্ত হয়ে থাকে। এরা ফুলকার সঙ্গে লেগে থাকে এবং রক্ত শোষণ করে। ফলে ফুলকা থেকে বেশি পরিমাণ শ্লেষ্মা ক্ষরিত হয়। মাছ নিস্তেজ হয়ে যায়। পরে মাছ মারা যায়। এই কৃমি মাছের চামড়ায়ও আক্রমণ করে। এ সমস্যার জন্য ২৫০ পিপিএম ফরমালিন দ্রবণে মাছকে গোসল করাতে হবে। এই পরজীবীগুলো সম্পূর্ণ অপসারণ সম্ভব না হলেও অনুকূল ব্যবস্থাপনায় পরজীবীর সংখ্যা কমিয়ে আনলে সাময়িক উপশম সম্ভব।   

 

হুমায়ন কবির, গ্রাম: বিরলি, উপজেলা: ফেনী সদর, জেলা:  ফেনী
প্রশ্ন: আমার ১০টি হাঁস আছে। এর মধ্যে কয়েকটা হাঁস পাতলা পায়খানা করছে, মুখ দিয়ে পানি ঝরছে। পালকগুলো এলেমেলো হয়ে এক জায়গায় বসে থাকছে। এমতাবস্থায় কি করণীয়?

উত্তর: হাঁসগুলোকে সিপ্রোফ্লক্সাসিন গ্রুপের ওষুধ সিপ্রো এ ভেট খাওয়াতে হবে। সাথে ইলেকট্রোমিন পাউডার খাওয়াতে হবে। আর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে হাঁসকে ফাউল কলেরার টিকা দিতে হবে। তবেই উপকার পাবেন।

 

নূরে আলম তালুকদার, গ্রাম: ব্রাহ্মণগাঁ, উপজেলা:  গৌরনদী, জেলা: বরিশাল
প্রশ্ন: আমার গরুর বয়স ২ বছর। গরুর নিচের মাড়ির হাড়ে ঘা হয়েছে এবং পুঁজ বের হচ্ছে। কিছু খাচ্ছে না। কি ব্যবস্থা নিলে প্রতিকার হবে, সমাধান চাই।

উত্তর:  গরুকে পেনিসিলিন গ্রুপের ইনজেকশন দিতে হবে, সাথে এন্টিহিস্টামিনিক ইনজেকশন দিতে হবে। এছাড়া কাঁটাযুক্ত ঘাস অথবা ঘাসের সাথে কোন ধাতব পদার্থ খাদ্য হিসেবে কখনো দেয়া যাবে না।  তাহলে আপনার গরুর সমস্যা দূর হবে।


কৃষির যে কোন প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে  কোন জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ এ নাম্বারে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত যে কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে। তাছাড়া কৃষিকথার গ্রাহক হতে বার্ষিক ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকা মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ এ ঠিকানায় পাঠিয়ে ১ বছরের জন্য গ্রাহক হতে পারেন। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিকে কৃষিকথা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।

 

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন

উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল : ০১৭১১১১৬০৩২, ঃ taufiquedae25@gmail.com  

বিস্তারিত
দেশের উন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফল চাষ (শ্রাবণ)

ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ-২০১৮ উপলক্ষ্যে কৃষি তথ্য সার্ভিস কর্তৃক
আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় ‘খ’ গ্রুপে প্রথম স্থান অধিকারী

ভূমিকা :
    ‘ফল দেহ সুস্থ রাখে
        তাই তা দরকার আছে
    সব ঋতুর সব ফলই
        প্রিয় হোক সবার কাছে।’
                    -কবি রফিকুল আলম
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ফলের গুরুত্ব ও অবদান অপরিসীম। খাদ্য, পুষ্টি, বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের চাহিদা পূরণ, শারীরিক বৃদ্ধি ও দেহের ক্ষয় রোধ, মেধার বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, সর্বোপরি দেশের জনগণের দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধিসহ নানাবিধ সুবিধা আমরা ফল থেকে পাই। এছাড়া জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন সরবরাহ, পরিবেশ দূষণ কমানো, প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে ফলদ বৃক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই দেশের উন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফল চাষের বিকল্প নেই।


বাংলাদেশে ফল চাষের পরিস্থিতি : ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ফল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ২১ লাখ টন,১ যা বিগত বছরগুলোর উৎপাদন মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে।
শুধু উৎপাদনই নয়, ফল রফতানিতেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব মতে, গত ৫ বছরে ফল রফতানিতে আয় বেড়েছে আড়াই গুণেরও বেশি। ২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৮৮ কোটি টাকার ফল রফতানি করেছে। ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ এই দুই অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮০ কোটি টাকা।২


আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ফল চাষের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘দেশ ইতোমধ্যে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। তাই আমাদেরকে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে’।৩


খাদ্য পুষ্টি নিরাপত্তায় ফল চাষ : খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ফল চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফল খাদ্য চাহিদা পূরণ করে, পুষ্টির উন্নয়ন ঘটায়, মেধার বিকাশ ঘটায় এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। শুধু তাই  নয়, ভাতের বিকল্প খাদ্য হিসেবেও ফলের গুরুত্ব অপরিসীম।

ক. খাদ্য চাহিদা পূরণ : বর্তমান বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি যা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় দেশে আবাদী জমির পরিমাণ অনেক কম। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফল চাষের বিকল্প নেই। কারণ দানাদার শস্যের চেয়ে ফল চাষ অনেক বেশি লাভজনক। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক হেক্টর জমিতে ধানের ফলন যেখানে তিন থেকে চার টন, সেখানে একই পরিমাণ জমিতে আমের উৎপাদন হয় ২০ থেকে ২৫ টন।৪


অধিকন্তু আমাদের দেশে মাথাপিছু ফলের উৎপাদন প্রায় ৭০-৭৫ গ্রাম,৫ যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। আর এ চাহিদা পূরণ করার জন্য প্রয়োজন-আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বেশি বেশি ফল উৎপাদন। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ফল চাষ করতে পারলে দেশের মানুষের প্রতিদিনের ফলের চাহিদা মেটানো সম্ভব’।৬


খ. পুষ্টি নিরাপত্তা : পুষ্টি নিরাপত্তা বলতে সুষম খাদ্য হিসেবে পর্যাপ্ত আমিষ, ভিটামিন, খনিজ উপাদান এবং নিরাপদ পানীয় এর সরবরাহকে বোঝায়।৭ পুষ্টিবিদদের মতে, একজন সুস্থ মানুষের দৈনিক ১৫৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন, কিন্তু আমরা খাই মাত্র ৩৪ গ্রাম।৮ ফলে আমাদের দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।


বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্য ঘাটতির চেয়ে পুষ্টি ঘাটতি সমস্যা অনেক বড় আকারে দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন এখন একটা চ্যালেঞ্জ। দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত ফলমূলের যোগান পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারে’।৯


ইংরেজিতে একটি কথা আছে, Fruits are food cooked by the sun.’১০ অর্থাৎ ফল হলো এমন একটি খাদ্য যা রান্না করা হয়েছে সূর্যের আলোয়। কৃত্রিম পদ্ধতিতে রান্না করা হয়নি বলে এর মধ্যে সব ধরনের খাদ্যগুণ বজায় আছে। তাছাড়া আমাদের দেশে ফলের সংখ্যা ৭০ এর অধিক এবং এ সমস্ত ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ।১১ তাই এই পুষ্টি সমস্যা সমাধানে ফলই হতে পারে একমাত্র হাতিয়ার।


গ. মেধা বিকাশ : ফলকে বলা হয় পুষ্টির আঁধার। আর পুষ্টি ও মেধা বিকাশের মধ্যে রয়েছে দারুণ সম্পর্ক। গবেষাণায় দেখা গেছে, মাতৃগর্ভেই মানুষের মেধা বিকাশ হয় শতকরা ৪০ ভাগ এবং অবশিষ্ট ৬০ ভাগ মেধা বিকাশ হয় জন্মের ৫ বছরের মধ্যে।১২ এই সময়ে যদি শিশুদের সঠিক পরিমাণে ফলমূল-শাকসবজিসহ বিভিন্ন সুষম খাবার না খাওয়ানো হয় তাহলে তাদের পুষ্টি ঘাটতির ফলে কম মেধা নিয়ে বেড়ে ওঠে। ফলে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এদের অবদান রাখার ক্ষমতা কমে যায়। মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয় দেশ ও জাতি। এমতাবস্থায় দেশকে এই ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে এবং উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে ফল চাষ ও গ্রহণের বিকল্প নেই।


ঘ. রোগ প্রতিরোধ : শর্করা, আমিষ, তেল, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের অভাবে মানুষ্যের মধ্যে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৮৮ ভাগ মানুষ ভিটামিন-এ, ৯০ ভাগ মানুষ ভিটামিন-সি এবং ৯৩ ভাগ মানুষ ক্যালসিয়ামের অভাবে ভোগে।১৩ শুধু তাই নয়, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ লোক রক্ত স্বল্পতায় ভুগছে এবং অপুষ্টি সমস্যার প্রধান শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা।১৪ আর এসব সমস্যার উৎকৃষ্ট সমাধান দিতে পারে ফল। কারণ ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ইত্যাদি রয়েছে যা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।


ফলকে আহার ও ওষুধ দুই বলা যেতে পারে। কারণ ফল হলো রোগ প্রতিরোধক খাদ্য এবং এতে রয়েছে নানারকম রোগ সারাবার গুণ। তাই ফল খেয়ে শরীর নীরোগ রাখলে আর ওষুধ খেয়ে  রোগ সারাবার দরকার হবে না।

ঙ. বিকল্প খাদ্য হিসেবে : ভাত আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য। অন্য যেকোন দেশের তুলনায় আমরা বাংলাদেশের অধিবাসিরা ভাত বেশি খাই।১৫ ভাত একটি চমৎকার শক্তিপ্রদানকারী খাদ্য, কিন্তু এতে দেহের জন্য প্রয়োজনীয় সবগুলো উপাদান নেই। বর্তমানে দানাদার শস্যের ওপর চাপ কমানোর জন্য খাদ্যাভাস পরিবর্তন একান্ত জরুরি। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে একজন ব্যক্তি বছরে গড়ে ১৮৩ কেজি চাল খায় যেখানে শ্রীলঙ্কায় খায় মাত্র ৮৩ কেজি এবং চীনে খায় মাত্র ৪৫-৫০ কেজি।১৬ এমতাবস্তায়, যদি দানাদার খাদ্য কমানো যায় এবং ফলমূল দিয়ে তা পূরণ করা হয় তাহলে একদিকে যেমন পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ টন উদ্বৃত্ত খাদ্য বিদেশে রফতানি করা যাবে।


এজন্য থালায় শুধু ভাত নয়, এর সাথে রাখতে হবে টাটকা ফলমূল। শিশুদের টিফিনে ফাস্ট ফুড দেওয়ার পরিবর্তে ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তবেই আমরা দেশকে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও মেধাবী জাতি উপহার দিতে পারব।
দেশের উন্নয়নে ফল চাষ : ফল চাষের মাধ্যমে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব। দেশে পরিকল্পিতভাবে ফলের শিল্পায়ন করতে পারলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, যা দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করবে। এছাড়া ফলদ বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা সহজতর হবে।


ক. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফল উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। দেশের মোট চাষভুক্ত জমির মধ্যে ফলের আওতায় রয়েছে মাত্র ২% জমি অথচ জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ের ১০% আসে ফল থেকেই।১৭ তাই বাংলাদেশের জনগণের খাদ্য পুষ্টির চাহিদা পূরণসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম।

ফল ও ফলজাত দ্রব্যাদি রফতানি করে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। ডিএই এর তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে  বিদেশে ৫,৭৯৭ মে. টন ফল রফতানি করা হয়েছে,১৮ যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। ফলে সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

ফল চাষকে কেন্দ্র করে দেশে হাজার হাজার নার্সারি গড়ে উঠছে। বর্তমানে এসব নার্সারি থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার চারা ও কলম বিক্রি হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফল চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘ফলের চাষ বাড়িয়ে পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিশ্ব বাজারে সুস্বাদু বৈচিত্র্যময় ফল রফতানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব’।১৯

খ. ফলের শিল্পায়ন : দেশে শত শত শিল্পকারখানা গড়ে উঠলেও ফলের ওপর তেমন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। তাই ফলভিত্তিক অর্থনীতিতে অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ। দেশি ফল বিশেষ করে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, কুল ইত্যাদি ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি করলে ফল ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদিত ফলের মাত্র ৫% দেশের শিল্পকারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়।২০


এমতাবস্থায়, আমরা ফলকে উৎপাদন, সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে জ্যাম, জেলি, আচার, চাটনি, মোরব্বা ইত্যাদি সুস্বাদু আইটেম তৈরি করতে পারি। তাহলে একদিকে যেমন দেশে ফলের বাজার তৈরি করা সম্ভব হবে তেমনি বিশ্ব ফল বাজারেও আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারব।


তাছাড়া আমাদের দেশের শিল্প উপকরণ ও শ্রমিকের মূল্য অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। তাই ফল শিল্পে সর্বনিম্ন বিনিয়োগ করে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। এজন্য ফলের উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং রফতানিতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।

গ. কর্মসংস্থানের সুযোগ : বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সত্ত্বেও মানুষ খাদ্য ও পুষ্টিহীনতার শিকার হয়। এর কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অভাব। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ২৪.৪৭ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে,২১ যাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় পুষ্টিবিদ Sachin e‡jb, Producing enough food is not itself enough, but that food must be harvested, Processed and distributed and the poor must be in a position to have Purchasing in order to access that food resource. ২২ বর্তমানে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ।২৩ এই বেকার যুবকদের ফলের প্রক্রিয়াজাতিরণের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে ফলদ শিল্পকারখানায় চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ফলে তাদের অয়ের সুযোগ বাড়বে এবং তারা তাদের পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে পারবে। এছাড়া তরুণ যুবকদের সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা করলে তাদের মধ্যে নতুন নতুন ফল চাষি উদ্যোক্তা তৈরি হবে। ফলে তারা স্বনির্ভর হয়ে উপার্জন করতে পারবে।

ঘ. দারিদ্র্য বিমোচন : ফল চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও আয় বৃদ্ধি করা যায়। পরিবারে খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ফল বাজারে বিক্রি করে পারিবারিক চাহিদা মেটানো যায়। পারিবারিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ জনপ্রিয় করা গেলে পারিবারিক উপার্জন বৃদ্ধি পাবে।


বাংলাদেশের নারীরা সমাজে অবহেলিত এবং অর্থনৈতিক সূচকে অনেকটাই পিছিয়ে। নারীদের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ দিতে পারলে তারা  সহজেই ফল থেকে আচার, জ্যাম, জেলি, জুস ইত্যাদি তৈরি করতে পারবে। সেগুলো বাজারে বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের দরিদ্রতা দূর করতে পারবে। এভাবে নারীদের স্বাবলম্বী করার মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ সমাজের দারিদ্র্য বিমোচন করা সম্ভব।


দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতা বিমোচন করে পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতি বছর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেটের ১০-১২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়।২৪ বর্তমানে এই বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ফল উৎপাদনে দারিদ্র্য কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। তাহলে দেশ থেকে দারিদ্র্যের হার কমে যাবে এবং মানুষ স্বাবলম্বী হবে।


ঙ. পরিবেশের ভারসাম্যতা রক্ষা : পরিবেশের ভারসাম্যতা রক্ষায় ফলদ উদ্ভিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একটি ফলদ উদ্ভিদ থেকে আমরা একাধারে পাই খাদ্য, পুষ্টি, অর্থ ও সুন্দর পরিবেশ। Indian Forest Research Institute এর গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি ফলদ বৃক্ষ বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা করে ১০ লাখ টাকা, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয় ৫ লাখ টাকার, বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে বাঁচায় ৫ লাখ টাকা, মাটির ক্ষয়রোধ ও উর্বরা শক্তি বাড়িয়ে বাঁচায় ৫ লাখ টাকা, গাছে বসবাসকারী প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচায় ৫ লাখ টাকা, আসবাবপত্র ও জ্বালানি কাঠসহ ফল সরবরাহ করে ৫ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন জীবজন্তুর খাদ্য জোগান দিয়ে বাঁচায় ৪০ হাজার টাকা।২৫
ফলদ গাছপালা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও রক্ষা করে। তাল, নারিকেলের মতো ফলদ বৃক্ষ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমিয়ে জীবন ও সমপদ রক্ষা করে। ভূমিক্ষয় প্রতিরোধ করে এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ বসতবাড়ি রয়েছে। এসব বসতবাড়িতে আছে ৫ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর ফল চাষ উপযোগী জমি।২৬ তাই এসব বসতবাড়িতে যদি ফলের চাষ করা যায়, তবে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্যতা রক্ষা হবে, অন্যদিকে দরিদ্রতা দূরীকরণসহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে।


উপসংহার : ফল একটি আদর্শ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার। তাই অধিক ফল চাষের মাধ্যমে দেশের মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তবেই আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে পারব।

তথ্যসূত্র :
১. দৈনিক যুগান্তর, ২৯ এপ্রিল, ২০১৮
২. দৈনিক সংগ্রাম, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৭
৩. দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ জুন, ২০১৭
৪. দৈনিক বণিকবার্তা, ৩০ জুন, ২০১৪
৫. ড. মো: দেলোয়ার হোসেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তায়              
   ফল’, কৃষিবার্তা।
৬. সময় টিভি, ১৭ জুন,২০১৭
৭. সৈয়দা শারমিন আক্তার, ‘পুষ্টিনামা’, অন্যপ্রকাশ,
   ২০১৩, পৃষ্ঠা-১১।
৮. মু. ফজলুল হক রিকাবদার, ‘বাংলাদেশের ফল,’  
   সূচিপত্র প্রকাশনি, ২০১২, পৃষ্ঠা ৫-৬।
৯. দৈনিক অমৃতবাজার, ১৫ জুন, ২০১৭
১০.‘শিশুর বিকাশে ফল তবে পুষ্টিগুণ জানা
    প্রয়োজন’, বিজ্ঞান একাডেমি, ২০০৫, পৃষ্ঠা ১২।
১১. মো: জামিউল ইসলাম, ‘বাণিজ্যিক ফল বাগান’,
     ফজিলাতুন নেছা প্রকাশনি, ২০০৭, পৃষ্ঠা ১-৩।
১২. কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ,‘ফল বৃক্ষের সামর্থ্য :
     খাদ্য, পুষ্টি ও অর্থ’, হালচাষ।
১৩. ঐ (রনরফ)
১৪. দৈনিক বণিক বার্তা, ৩০ জুন, ২০১৪
১৫. জাহিরুল ইসলাম, ‘দেশি ফলে বেশি মজা’, দি
     ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০৫, পৃষ্ঠা. ৩-৪।
১৬. ড. মো: দেলোয়ার হোসেন মজুমদার, ‘খাদ্য ও
   পুষ্টি নিরাপত্তায় দেশি ফলের অবদান’, কৃষি সংবাদ।
১৭. মো: আলী আশরাফ খান, ‘ফল পরিচিতি ও
    পুষ্টিগুণ’, গতিধারা প্রকাশনি, ২০১৩, পৃষ্ঠা.১।
১৮. ‘বাংলাদেশের ফল ও এর উন্নয়ন’, কৃষিকথা, শ্রাবণ সংখ্যা, ১৪২৪।
১৯. দৈনিক কালেরকণ্ঠ, ২২ এপ্রিল, ২০১৭
২০. ‘ফলের গুরুত্ব’, কৃষিকথা, ভাদ্র সংখ্যা, ১৪২৩।
২১. দৈনিক ভোরের কাগজ, ১৪ অক্টোবর, ২০১৬।
২২. Sachin Tyagi, ‘Fruits for Health and
      Nutritional Security’, 2017, PP.88 2017, PP.88

২৩. দৈনিক প্রথম আলো, ২৮ মে,২০১৭
২৪. কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ, ‘রোগ প্রতিরোধে
     খাদ্য ও পুষ্টি দি রয়েল পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা.১১।
২৫. দৈনিক যুগান্তর, ২৪ জুন, ২০১৫
২৬. দৈনিক বণিক বার্তা, ৩০ জুন, ২০১৪

 

 মো: তৌফিক আহমেদ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ডিপার্টমেন্ট : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বর্ষ : ৩য়, মোবা: ০১৭৬১১০৬৯২১, ইমেইল :toufikahmed56@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
আমন ধানের ফলন বৃদ্ধিতে করণীয়

আমন শব্দটির উৎপত্তি আরবি শব্দ ‘আমান’ থেকে যার অর্থ আমানত। অর্থাৎ আমন কৃষকের কাছে একটি নিশ্চিত ফসল (Sure Crop) বা আমানত হিসেবে পরিচিত ছিল। আবহমান কাল থেকে এ ধানেই কৃষকের গোলা ভরে, যা দিয়ে কৃষক তার পরিবারের ভরণপোষণ, পিঠাপুলি, আতিথেয়তাসহ সংসারের অন্যান্য খরচ মিটিয়ে থাকে। ২০১৬-১৭ আমন মৌসুমে দেশে ৫.৫-৫.৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়, এর মধ্যে ০.৩২৮ মিলিয়ন হেক্টর বোনা, ১.০৮৩ মিলিয়ন হে. স্থানীয় জাতের এবং ৪.১৭২ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে উফশী রোপা আমন চাষ হয়। ২০১৭-১৮ মৌসুমে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণে আমন আবাদ এরিয়া ২% বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে ০.৩৬৫ মিলিয়ন হেক্টর বোনা, ০.৯৪৫ মিলিয়ন হে. স্থানীয় জাতের এবং ৪.৩৯৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে উফশী রোপা আমন চাষ হয়। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতি বছর আমনের উৎপাদন বাড়ছে এবং গত বছর আমনের উৎপাদন ১ কোটি ৪০ লক্ষ টনে পৌঁছায়। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে নতুন নতুন উদ্ভাবিত জাত, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও সরকারের সঠিক নীতি।


আমন ধান মূলত দুই প্রকার; রোপা আমন ও বোনা আমন। রোপা আমন অন্য জমিতে চারা প্রস্তুত করে, সেই চারা ক্ষেতে রোপণ করে ধান উৎপন্ন হয় বলে এর এরূপ নাম। রোপা আমন আষাঢ় মাসে বীজতলায় বীজ বোনা হয়, শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে মূল জমিতে রোপণ করা হয় এবং কার্তিক-অগ্রহায়ণ-পৌষ (এলাকাভেদে) মাসে ধান কাটা হয়।


বোনা আমন ছিটিয়ে বোনা হয়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে মাঠে বোনা আমনের বীজ বপন করা হয় এবং অগ্রহায়ণ মাসে পাকা ধান কাটা হয়। একে আছড়া আমন, বাওয়া আমন বা গভীর পানির আমনও বলা হয়। আমন মৌসুমে যেহেতু আবাদ এলাকা সম্প্রসারণের তেমন সুযোগ নেই তাই ফলন বাড়ানোর জন্য নতুন জাত চাষাবাদের সঙ্গে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। আমন ধানের ফলন বৃদ্ধিতে করণীয় বিষয় যেমন- ভালো বীজ নির্বাচন, জমি তৈরি, সঠিক সময়ে বপন বা রোপণ, আগাছা দূরীকরণ, সার ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবস্থাপনা ও সম্পূরক সেচ ফলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


জাত নির্বাচন
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমন মৌসুম ও এর পরিবেশ উপযোগী ৪১টি (৩৯টি ইনব্রিড ও ২টি হাইব্রিড) উফশী ধানের জাত ও ধান উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নানা রকম কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করেছে। অনুকূল ও প্রতিকূল পরিবেশে চাষযোগ্য আমন জাতগুলো
নিম্নে উল্লেখ করা হলো।


অনুকূল পরিবেশ উপযোগী জাতসমূহ : বিআর৪, বিআর৫, বিআর১০, বিআর১১, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮৭।


প্রতিকূল পরিবেশে চাষযোগ্য জাত : খরাপ্রবণ এলাকায় ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭ ও ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১ বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য উপযোগী জাতগুলো হলো- ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৯। এছাড়া বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪৬ জাতগুলোর নাবি গুণ থাকার জন্য এদের বীজ ২০-৩০ শ্রাবণে বপন করে ৩০-৪০ দিনের চারা সর্বশেষ ৩১ ভাদ্র পর্যন্ত বন্যা প্রবণ এলাকায় রোপণ করা যায়।


লবণাক্ত এলাকায় বিআর২৩, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৭৩, ব্রি ধান৭৮।
জোয়ার-ভাটা প্রবণ অলবণাক্ত এলাকার উপযোগী জাতগুলো হলো- ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৬,ব্রি ধান৭৭ জলাবদ্ধ এলাকার জন্য উপযোগী জাত- বিআর১০, বিআর২৩, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৮ বরেন্দ্র এলাকার জন্য জাতগুলো হলো- ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫, ও ব্রি ধান৮০। এছাড়া সুগন্ধি ব্রি ধান৩৪ সহ সমতল বরেন্দ্র অঞ্চলে অনুকূল পরিবেশের  জন্য সুপারিশকৃত সব জাতই চাষ করা সম্ভব।


পাহাড়ি এলাকার জন্য উপযোগী জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫, এবং ব্রি ধান৮০।
প্রিমিয়াম কোয়ালিটি জাত : দিনাজপুর, নওগাঁসহ যেসব এলাকায় সরু বা সুগন্ধি ধানের চাষ হয় সেখানে বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫ ও ব্রি ধান৮০ চাষ করা যায়।
ব্রি উদ্ভাবিত হাইব্রিড জাত : আমন মৌসুমের জন্য ব্রি উদ্ভাবিত হাইব্রিড জাতগুলো হলো ব্রি হাইব্রিড ধান৪ ও ৬। এ জাতগুলো বন্যামুক্ত এলাকায় রোপা আমনে অনুকূল পরিবেশে চাষযোগ্য। এ জাতগুলোর চাল মাঝারি চিকন, স্বচ্ছ ও সাদা এবং লম্বা, ভাত ঝরঝরে হওয়ায় কৃষকের কাছে পছন্দনীয়।


নতুন উদ্ভাবিত আমনের জাত ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৮০ এবং ব্রি ধান৮৭ জাতগুলো চাষ করে প্রতিনিয়ত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
আবার জীবনকাল অনুসারে জাতগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যম মেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি জাত হিসেবে ভাগ করা যায়।
দীর্ঘমেয়াদি জাত (জীবনকাল ১৩৫ দিনের বেশি), যেমন- বিআর১০, বিআর১১, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৫১।
মধ্যম মেয়াদি জাত (জীবনকাল ১২০-১৩৫ দিন), যেমন- বিআর২৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮৭।
স্বল্পমেয়াদি জাত (জীবনকাল ১২০ দিনের কম), রবি ফসল এলাকায় স্বল্পমেয়াদি জাত যেমন- ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫ চাষ করে সহজেই ধান কাটার পর রবি ফসল করা যাবে।


বীজতলা তৈরি ও বীজ বপনের সময় : উঁচু এবং উর্বর জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে যেখানে বন্যার পানি উঠার সম্ভাবনা নেই। যেসব এলাকায় উঁচু জমি নেই সেসব এলাকায় ভাসমান বীজতলা তৈরি করার জন্য পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। দীর্ঘ, মধ্যম ও স্বল্প জীবনকালের জাতের জন্য আলাদা আলাদা স্থান ও সময়ে বীজতলায় বপন করতে হবে। পরিমিত ও মধ্যম মাত্রার উর্বর মাটিতে বীজতলার জন্য কোনো সার প্রয়োগ করতে হয় না। তবে নিম্ন, অতি নিম্ন অথবা অনুর্বর মাটির ক্ষেত্রে গোবর অথবা খামারজাত সার প্রতি শতকে ২ মণ হিসাবে প্রয়োগ করতে হবে। ভালো চারা পাওয়ার জন্য ভালো বীজের বিকল্প নেই। তাই বিএডিসি, স্থানীয় কৃষি বিভাগ বা ব্রি কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করে ভালো বীজ সংগ্রহ করে বীজতলায় বপন করতে হবে।


আমন বীজতলায় রোগ ব্যবস্থাপনা : আমন বীজতলায় বাকানি রোগ দেখা দিতে পারে। বাকানি রোগাক্রান্ত ধানের চারা হালকা সবুজ, লিকলিকে ও স্বাভাবিক চারার চেয়ে অনেকটা লম্বা হয়ে অন্য চারার ওপরে ঢলে পড়ে। আক্রান্ত চারাগুলো  ক্রমান্বয়ে মারা যায়। আক্রান্ত চারার নিচের গিট থেকে অস্থানিক শিকড়ও দেখা যেতে পারে।


দমন ব্যবস্থাপনা : বাকানি রোগ দমনের জন্য অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউপি বা নোইন দ্বারা বীজ অথবা চারা শোধন করতে (১ লিটার পানিতে ৩ গ্রাম অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউপি বা নোইন মিশিয়ে তাতে ধানের বীজ অথবা চারা ১০-১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা) হবে। আক্রান্ত গাছ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।  বীজতলা হিসেবে একই জমি ব্যবহার না করা।


চারা রোপণ : লাইন বা সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ আলো ও বাতাস চলাচলের জন্য উত্তর-দক্ষিণ বরাবর সারি করে লাগালে ভালো। সাধারণত সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫ সে.মি. (৮ ইঞ্চি) ও গুছি থেকে গুছির দূরত্ব ১৫ সে.মি. (৬ ইঞ্চি) রাখলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে। তবে জমি উর্বর হলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২৫ সে.মি. (১০ ইঞ্চি) ও গুছি থেকে গুছির দূরত্ব ১৫ সে.মি. (৬ ইঞ্চি) রাখা যেতে পারে।


চারার বয়স : আলোক-অসংবেদনশীল দীর্ঘ ও মধ্যম মেয়াদি জাতগুলোর চারার বয়স হবে ২০-২৫ দিন।
আলোক-অসংবেদনশীল স্বল্পমেয়াদি জাতগুলোর চারার বয়স হবে ১৫-২০ দিন।
ধান৪১, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৭৩ চারার বয়স হবে ৩০-৩৫দিন।


আলোক-সংবেদনশীল জাতগুলোর (যেমন : বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪৬, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭) নাবিতে রোপণের ক্ষেত্রে চারার বয়স হবে ৩৫-৪০দিন।
 

রোপণ সময় : রোপা আমনের আলোক-অসংবেদনশীল দীর্ঘ ও মধ্যম মেয়াদি জাতগুলোর উপযুক্ত রোপণ সময় হচ্ছে ১৫ জুলাই-১৫ আগস্ট। তাছাড়া প্রতিদিন বিলম্বের জন্য ফলন কমে যাবে।
আলোক-অসংবেদনশীল স্বল্পমেয়াদি জাতগুলোর উপযুক্ত রোপণ সময় হচ্ছে ২৫জুলাই-২৫আগস্ট। এই সময়ের আগে লাগালে ইঁদুর ও পাখি আক্রমণ করে।


আলোক-সংবেদনশীল জাতগুলোর (বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪৬, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৫৪, নাইজারশাইল) বপন সময় হলো ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এবং রোপণ সময় হচ্ছে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
সকল সুগন্ধি এবং স্থানীয় জাত ১-২০ভাদ্র (মধ্য আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ) সময়ের মধ্যে রোপণ করতে হবে।

 

সম্পূরক সেচ : আমন চাষাবাদ পুরোটাই বৃষ্টি নির্ভর। তবে প্রতি বছর সকল স্থানে বৃষ্টিপাত এক রকম হয় না। এমনকি একই বৎসরের একই স্থানে সবসময় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। আমন মৌসুমে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৮০% হয়ে থাকে, যা আমন আবাদের জন্য যথেষ্ট। তবে আমনের বৃষ্টিপাত সময়মতো না হলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে। বৃষ্টি-নির্ভর ধানের জমিতে যে কোন পর্যায়ে সাময়িকভাবে বৃষ্টির অভাবে খরা হলে অবশ্যই সম্পূরক সেচ দিতে হবে। প্রয়োজনে সম্পূরক সেচের সংখ্যা একাধিক হতে পারে। তা না হলে ফলনে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।


সার ব্যবস্থাপনা : আবহাওয়া ও মাটির উর্বরতার মান যাচাই এবং ধানের জাত, জীবনকাল ও ফলন মাত্রার উপর ভিত্তি করে সারের মাত্রা ঠিক করা হয়। আলোক-অসংবেদনশীল দীর্ঘ ও মধ্যম মেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া-ডিএপি/টিএসপি-এমওপি-জিপসাম যথাক্রমে ২৬-৮-১৪-৯ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষে সমস্ত-এমওপি-ডিএপি/টিএসপি-জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সমান ভাগে তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তি চারা রোপণের ৭-১০ দিন পর, ২য় কিস্তি চারা রোপণের ২৫-৩০ দিন পর এবং ৩য় কিস্তি কাইচ থোড় আসার ৫-৭ দিন পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে।


আলোক-অসংবেদনশীল স্বল্পমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া-ডিএপি/টিএসপি-এমওপি-জিপসাম যথাক্রমে ২০-৭-১১-৮ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষে ১/৩ অংশ ইউরিয়া এবং সমস্ত ডিএপি/টিএসপি-এমওপি-জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে। বাকি ইউরিয়া সমানভাগে দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তি চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর এবং ২য় কিস্তি কাইচ থোড় আসার ৫-৭ দিন পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে।
নাবিতে রোপণকৃত আলোক-সংবেদনশীল জাতের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া-ডিএপি/টিএসপি-এমওপি-জিপসাম যথাক্রমে ২৩-৯-১৩-৮ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষে ২/৩ অংশ ইউরিয়া এবং সমস্ত ডিএপি-এমওপি-জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে। বাকি ইউরিয়া কাইচ থোড় আসার ৫-৭ দিন পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে। ব্রি ধান৩২ এবং স্বল্প আলোক-সংবেদনশীল সুগন্ধিজাত যেমন- বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭ ও ব্রি ধান৩৮ ধানের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া-ডিএপি/টিএসপি-এমওপি-জিপসাম যথাক্রমে ১২-৭-৮-৬ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে।


* ডিএপি সার ব্যবহার করলে সবক্ষেত্রেই প্রতি কেজি ডিএপি সারের জন্য ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া কম ব্যবহার করলেই হবে এতে গাছ শক্ত হয়, রোগবালাই, পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়।


সাশ্রয়ী সার ব্যবহারে কয়েকটি প্রযুক্তি : আমরা জানি, উদ্ভিদের নাইট্রোজেন এর অভাব পূরণে জমিতে ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের জৈব সার (যেমন-সবুজ সার, আবর্জনা পচা সার, পচা গোবর), নাইট্রোজেন ফিক্সিং ব্যাকটেরিয়াল ইনোকুলাম প্রয়োগ এবং অ্যাজোলার চাষ বাড়ানো যেতে পারে। ব্রি’র তথ্য মতে, দুই সেমি পর্যন্ত পানিযুক্ত কাদা মাটিতে গুটি ইউরিয়া ও প্রিল্ড ইউরিয়া প্রয়োগের মাধ্যমে শতকরা ২৫-৩০ ভাগ ইউরিয়া সাশ্রয় হয়। তবে জোয়ার-ভাটা অঞ্চলে গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়া যায়। অন্যদিকে ডাই এমোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি ব্যবহার করলে একই সঙ্গে ইউরিয়া ও ফসফরাসের অভাব পূরণ করা সম্ভব। জিংক সালফেট (মনো বা হেপ্টা) সার ফসফরাস জাতীয় সারের সঙ্গে একত্রে ব্যবহার করা যায় না। এ সমস্যা সমাধানে জিংক সারের সর্বশেষ প্রযুক্তি চিলেটেড জিংক প্রয়োগ করা যেতে পারে। মূল জমিতে ধানের চারা রোপণের ২০-২২ দিন পর প্রথমবার এবং ৪০-৪৫ দিন পর দ্বিতীয়বার ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম লিবরেল জিংক স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যাবে। রোপা আমন ধানের জমি তৈরির সময় বিঘাপ্রতি (৩৩ শতক) ৩০০ কেজি জৈব সার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার শতকরা ৩০ ভাগ কমানো সম্ভব।


আগাছা ব্যবস্থাপনা : ধানক্ষেত ৩৫-৪০ দিন পর্যন্ত আগাছামুক্ত রাখতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। হাত দিয়ে, নিড়ানি যন্ত্র দিয়ে এবং আগাছানাশক ব্যবহার করে আগছা দমন করা যায়। রোপা আমন ধানে সর্বোচ্চ দু’বার হাত দিয়ে আগাছা দমন করতে হয়। প্রথম বার ধান রোপণের ১৫ দিন পর এবং পরের বার ৩০-৩৫ দিন পর। নিড়ানি যন্ত্র দিয়ে ধানের দু’সারির মাঝের আগাছা দমন হয় কিন্তু দু’গুছির ফাঁকে যে আগাছা থাকে তা হাত দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। যান্ত্রিক দমনে অবশ্যই সারিতে ধান রোপণ করতে হবে। আগাছানাশক ব্যবহারে কম পরিশ্রমে ও কম খরচে বেশি পরিমাণ জমির আগাছা দমন করা যায়। প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক ধান রোপণের ৩-৬ দিনের মধ্যে (আগাছা জন্মানোর আগে) এবং পোস্ট ইমারজেন্স আগাছানাশক ধান রোপণের ৭-২০ দিনের মধ্যে (আগাছা জন্মানোর পর) ব্যবহার করতে হবে। আগাছানাশক প্রয়োগের সময় জমিতে ১-৩ সেন্টিমিটার পানি থাকলে ভালো। আমন মৌসুমে আগাছানাশক প্রয়োগের পর সাধারণত হাত নিড়ানির প্রয়োজন হয় না। তবে  আগাছার ঘনত্ব যদি বেশি থাকে তবে আগাছানাশক প্রয়োগের ৩০-৪৫ দিন পর হাত নিড়ানি প্রয়োজন হয়।


পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা : নিবিড় চাষাবাদ ও আবহাওয়াজনিত কারণে আমনে পোকামাকড়ের প্রাদুর্ভাব ও আক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে ক্ষতিকর পোকা দমন এবং ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। এলাকাভেদে আমনের মুখ্য পোকাগুলো হলো- মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা,  চুংগি পোকা, সবুজ পাতা ফড়িং, বাদামি গাছ ফড়িং, সাদা পিঠ গাছ ফড়িং, গান্ধি পোকা, শীষকাটা লেদা পোকা ইত্যাদি। পোকার ক্ষতির মাত্রা পোকার প্রজাতি, পোকার সংখ্যা, এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ, জমি বা তার আশপাশের অবস্থা, ধানের জাত, ধানগাছের বয়স, উপকারী পরভোজী ও পরজীবী পোকামাকড়ের সংখ্যা ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। ধান ক্ষেতে ক্ষতিকারক পোকা দেখা গেলে এর সাথে বন্ধু পোকা, যেমন- মাকড়সা, লেডি-বার্ড বিটল, ক্যারাবিড বিটলসহ অনেক পরজীবী ও পরভোজী পোকামাকড় কি পরিমাণে আছে তা দেখতে হবে এবং শুধুমাত্র প্রয়োজনে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। প্রধান প্রধান ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ দমন করলে রোপা আমন মৌসুমে শতকরা ১৮ ভাগ ফলন বেশি হতে পারে। ধানক্ষেতে ডালপালা পুঁতে দিয়ে মাজরা পোকা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমানো যায়। আলোক ফাঁদ/সোলার লাইট ট্রাপের সাহায্যে মাজরা পোকা ও পাতা মোড়ানো পোকা, সবুজ পাতা ফড়িং ও গান্ধি পোকার আক্রমণ কমানো যায়। জমি থেকে পানি বের করে দিয়ে চুংগি পোকা, বাদামি গাছ ফড়িং এবং সাদা পিঠ গাছ ফড়িং পোকার আক্রমণ কমানো যায়। উল্লেখিত ব্যবস্থা গ্রহণের পরও পোকার আক্রমণ বেশি পরিলক্ষিত হলে মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা ও  চুংগি পোকা দমনের জন্য সানটাপ ৫০ পাউডার প্রতি বিঘায় ১৮০-১৯০ গ্রাম হারে ব্যবহার করতে হবে। মাজরা পোকা ও পাতা মোড়ানো পোকা দমনের জন্য ভিরতাকো ৪০ ডব্লিউজি  প্রতি বিঘায় ১০ গ্রাম হারে ব্যবহার করতে হবে। বাদামি গাছ ফড়িং ও সাদা পিঠ গাছ ফড়িং দমনের জন্য মিপসিন ৭৫ পাউডার প্রতি বিঘায় ১৭৫ গ্রাম, পাইমেট্রোজিন ৪০ ডব্লিউজি ৬৭ গ্রাম, ডার্সবান ২০ ইসি ১৩৪ মিলি হারে ব্যবহার করতে হবে। পাতা মোড়ানো পোকা, চুংগি পোকা ও শীষকাটা লেদা পোকা দমনের জন্য কার্বারিল ৮৫ পাউডার অথবা সেভিন পাউডার প্রতি বিঘায় ২২৮ গ্রাম হারে ব্যবহার করতে হবে।


রোগ ব্যবস্থাপনা : আমন মৌসুমে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া, খোলপোড়া, ব্লাস্ট, বাদামি দাগ, খোল পচা, টুংরো, বাকানি এবং লক্ষ্মীরগু (ঋধষংব ঝসধৎঃ) সচরাচর দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ রোগগুলি হল খোলপোড়া, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া, ব্লাস্ট, টুংরো, বাকানি  এবং লক্ষীরগু রোগ। খোলপোড়া রোগ দমনের জন্য পটাশ সার সমান দুই কিস্তিতে ভাগ করে এক ভাগ জমি তৈরির শেষ চাষে এবং অন্য ভাগ শেষ কিস্তি ইউরিয়া সারের সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে ভেজা ও শুকনা পদ্ধতিতে সেচ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এছাড়া ফলিকুর, নেটিভো, এবং স্কোর ইত্যাদি ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করে সফলভাবে দমন করা যায়। ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া রোগের প্রাথমিক অবস্থায় ৬০ গ্রাম এমওপি, ৬০ গ্রাম থিওভিট ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। থোড় বের হওয়ার আগে রোগ দেখা দিলে বিঘাপ্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।


এ মৌসুমে সকল সুগন্ধি ধানে নেক ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ দেখা যেতে পারে।  এক্ষেত্রে ধানে থোড়ের শেষ পর্যায় অথবা শীষের মাথা অল্প একটু বের হওয়ার সাথে সাথে প্রতিরোধমূলক ছত্রাকনাশক যেমন ট্রপার অথবা  ন্যাটিভো ইত্যাদি অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। বিক্ষিপ্তভাবে দু’একটি গাছে টুংরো রোগের লক্ষণ দেখা দিলে, আক্রান্ত গাছ তুলে পুঁতে ফেলতে হবে। রোগের বাহক পোকা সবুজ পাতা ফড়িং উপস্থিতি থাকলে, হাতজালের সাহায্যে অথবা আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে সবুজ পাতা ফড়িং মেরে ফেলতে হবে। হাত জালের প্রতি টানে যদি একটি সবুজ পাতা ফড়িং পাওয়া যায় তাহলে বীজতলায় বা জমিতে কীটনাশক, যেমন মিপসিন, সেভিন অথবা ম্যালাথিয়ন অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। লক্ষীরগু দমনের জন্য (বিশেষ করে ব্রি ধান৪৯ জাতে) ফুল আসা পর্যায়ে বিকাল বেলা প্রোপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন- টিল্ট (১৩২ গ্রাম/বিঘা) সাত দিন ব্যবধানে দুই বার প্রয়োগ করতে হবে।
 

ফসল কাটা, মাড়াই ও সংরক্ষণ : শীষে ধান পেকে গেলেই ফসল কাটতে হবে। অধিক পাকা অবস্থায় ফসল কাটলে অনেক ধান ঝরে পড়ে, শীষ ভেঙে যায়, শীষকাটা লেদাপোকা এবং পাখির আক্রমণ হতে পারে। তাই মাঠে গিয়ে ফসল পাকা পরীক্ষা করতে হবে। শীষের অগ্রভাগের শতকরা ৮০ ভাগ ধানের চাল শক্ত হলে ধান ঠিকমতো পেকেছে বলে বিবেচিত হবে। এ সময়ে ফসল কেটে মাঠেই বা উঠানে এনে মাড়াই করতে হবে। তাড়াতাড়ি মাড়াইয়ের জন্য ব্রি উদ্ভাবিত মাড়াই যন্ত্র যেমন- রিপার, হেড ফিড কম্ভাইন হার্ভেস্টার ও মিনি  কম্বাইন হার্ভেস্টার ব্যবহার করতে হবে। ধান মাড়াই করার জন্য পরিচ্ছন্ন জায়গা বেছে নিতে হবে। কাঁচা খলায় সরাসরি ধান মাড়াই করার সময় চাটাই, চট বা পলিথিন বিছিয়ে নেয়া উচিত। এভাবে ধান মাড়াই করলে ধানের রঙ উজ্জ্বল ও পরিষ্কার থাকে। মাড়াই করার পর অন্তত ৪-৫ বার রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। ভালোভাবে শুকানোর পর ঝেড়ে নিয়ে গোলাজাত বা সংরক্ষণ করতে হবে।


ধানের বীজ সংরক্ষণ : ভালো ফলন পেতে হলে ভালো বীজের প্রয়োজন। আমন মৌসুমে নিজের বীজ নিজে রেখে ব্যবহার করাই উত্তম। এ কথা মনে রেখেই কৃষকভাইদের ঠিক করতে হবে কোন জমির ধান বীজ হিসেবে রাখবেন। যে জমির ধান ভালোভাব পেকেছে, রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ হয়নি এবং আগাছামুক্ত সে জমির ধান বীজ হিসেবে রাখতে হবে। ধান কাটার আগেই বিজাতীয় গাছ সরিয়ে ফেলতে হবে। মনে রাখতে হবে গাছের আকার-আকৃতি ও রঙ, ফুল ফোটার সময় ও শীষের ধরন, ধানের আকার আকৃতি, রঙ ও শুঙ এবং সর্বশেষ ধান পাকার সময় আগে-পিছে হলেই তা বিজাতীয় গাছ। সব রোগাক্রান্ত গাছ অপসারণ করতে হবে। এরপর বীজ হিসেবে ফসল কেটে এবং আলাদা মাড়াই, ঝাড়াই, বাছাই করে ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে মজুদ করতে হবে।

 

*মহাপরিচালক, মোবাইল : ০১৭১২২৮০০৮৩ **পরিচালক (প্রশাসন ও সাধারণ পরিচর্যা), মোবাইল : ০১৯২৫০৫৩৫৮২ ***পিএসও ও প্রধান, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ ****এসএসও, কীটতত্ত্ব বিভাগ ও *****সিনিয়র লিয়াজোঁ অফিসার, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ইমেইল-smmomin80@gmail.com

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook