কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

কুড়িগ্রামের চরে মসুর-মুগডাল-আমন ধান শস্যবিন্যাস : সমস্যা ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশে প্রায় এক মিলিয়ন হেক্টর চর জমি আছে। চরের কৃষি ব্যবস্থাপনা সমতল ভূমির চেয়ে বাস্তবিক কারণেই ভিন্ন হয়। যেহেতু প্রতি বছরই চর এলাকা বর্ষায় ডুবে যায় সেহেতু ফি বছরই এতে কিছু না কিছু পলি-বালু জমা হয়। অনেক সময়ই ঘূর্ণায়মান স্রোতের সঙ্গে বালুর স্তূপ পড়ে। ফলে একই জমিতে ফসলের খাদ্যোপাদানের মাত্রার ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ করা যায়। চরের বয়সের ওপর নির্ভর করে মাটির উর্বরতা। কারণ পুরনো চরগুলোতে দীর্ঘদিন চাষাবাদের ফলে মাটির  জৈবপদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
 
বিগত ২০১১ সাল থেকে KGF-World Bank এর আর্থিক সহায়তায় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কুড়িগ্রামের সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এসব চরে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তি সুপারিশ করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মধ্যে মসুর-মুগডাল-স্বল্পমেয়াদি আমন ধান শস্যবিন্যাস কুড়িগ্রামের চরে বিশেষভাবে উপযোগী বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বিশেষ করে যেসব চরের মাটিতে বালুর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি সেসব চরের জন্য এ শস্য বিন্যাসটি খুবই উপযোগী। সে আলোকে কুড়িগ্রাম সদর, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার আটটি চরের ১০০০ কৃষককে সম্পৃক্ত করে ১০০০ বিঘা জমিতে এ শস্য বিন্যাসের ব্যাপকভিত্তিক চাষের সফলতা বিশ্লেষণ করা হয়।

কুড়িগ্রামের চরে মসুর-মুগডাল-স্বল্পমেয়াদি আমন ধান চাষে করণীয়
মসুরের চাষ
শীতকালে মসুরের চাষ করতে হয় বিধায় ভালো ফলনের জন্য নভেম্বর মাসের প্রথম দিকেই বীজ বপন করতে হবে। এজন্য মসুর চাষের পূর্বে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ করাই বাঞ্ছনীয়। কারণ চর এলাকার দীর্ঘ জীবনকাল বিশিষ্ট স্থানীয় ধানের জাত চাষ করা হলে মসুরের বীজ বপন করতে বিলম্ব হয়। বিলম্বে বীজ বপন করলে মসুরের শুটি ধরা পর্যায়েই বাতাসের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে বীজ পুষ্ট কম হয় এবং ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। তাছাড়া মাটির আর্দ্রতাও ক্রমে ক্রমে কমতে থাকায় খরার প্রাদুর্ভাবে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
 
বীজ বপন ও ফসল ব্যবস্থাপনা
বীজ বপনের পূর্বে ভালোভাবে জমি চাষ করে নিতে হয়। জমিতে জোঁ থাকার সময়ই বিঘাপ্রতি ৬ কেজি ইউরিয়া, ১১.৫০ কেজি টিএসপি, ৫.০ কেজি এমপি এবং ০.৫ কেজি বোরন মাটিতে মিশিয়ে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেমি. বজায় রেখে বীজ বপন করতে হবে। বিঘাপ্রতি ৫.৫০ কেজি বীজ নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই বপন করতে হবে। প্রতি কেজি বীজে ২-২.৫ গ্রাম ভিটাভেক্স মিশিয়ে বীজ শোধন করা উচিত। বীজ বপনের পর কমপক্ষে ২০-২৫ দিন জমিকে আগাছামুক্ত রাখতে হবে। মাটির আর্দ্রতা কমে গেলে সেচের প্রয়োজন হবে।

ফসল সংগ্রহ
বপন করার ১১০-১১৫ দিনের মধ্যেই মসুর পেকে যায়। নাগেশ্বরী উপজেলার চর বেরুবাড়ী ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চর নিধিরামে বারি মসুর-৬ চাষ করে কৃষক পর্যায়ে ৬০০-৭০০ কেজি ফলন পাওয়া গেছে।

মুগডালের চাষ
মুগডাল খরিফ-১ মৌসুম বিশেষ করে মসুর/গম/আলু/অন্যান্য রবিশষ্য কাটার পর বপন করা হয়। বীজ বপনের ৬০-৬৫ দিনের মধ্যেই ফসল তোলা যায়। ফলে মুগডাল সংগ্রহের পর একই জমিতে আমন ধান চাষ করতে কোনো অসুবিধা হয় না।
 
বীজ বপন ও ফসল ব্যবস্থাপনা
বিগত ২০১১ সাল থেকেই বিভিন্ন চরে মুগডালের চাষ করে দেখা গেছে যে, মার্চ মাসের ২০-৩০ তারিখের মধ্যে বীজ বপন করতে পারলে বর্ষার পানির হঠাৎ বৃদ্ধির হাত থেকে ফসল রক্ষা করা সহজ হয়। জমি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে। প্রতি কেজি বীজে ২.০-২.৫ গ্রাম ভিটাভেক্স মিশিয়ে বীজ শোধন করার পর বিঘাপ্রতি ৪.০ কেজি বীজ বপন করতে হবে। বীজ বপন করার পূর্বেই বিঘাপ্রতি ৫.০ কেজি ইউরিয়া, ১০.০ কেজি টিএসপি, ৫.০ কেজি এমপি ও ০.৫ কেজি বোরন মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। বীজ বপনের সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকতে হবে। প্রয়োজনে হালকা সেচ দিয়ে জমিতে জোঁ অবস্থা তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে।
বীজ বপনের পর ২০-২৫ দিন পর্যন্ত জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। খরিফ-১ মৌসুমে পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হয়। জাবপোকা দেখা দিলে প্রতিরোধক হিসেবে প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি. এজোড্রিন কিংবা ক্যারাটে মিশিয়ে প্রতি সপ্তাহে একবার স্প্রে করা যেতে পারে। লেদাপোকা বা ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধে সিমবুশ বা রিপকর্ড একই হারে স্প্রে করা যেতে পারে।

 
গম-আলু চাষের পর মুগডাল উৎপাদনে করণীয়
গম কিংবা আলু চাষের পর মুগডাল চাষ করলে ৪.০ কেজি বীজের পরিবর্তে ২.৫-৩.০ কেজি বীজ বপন করলেই চলবে এবং কোন সার প্রয়োগের প্রয়োজন হবে না। কারণ গম বা আলু চাষের সময় যে সার প্রয়োগ করা হয় তার কিছুটা প্রভাব মাটিতে থেকে যায়। মুগডালের সারের মাত্রা দানাদার শস্যের তুলনায় অনেক কম। সারের মাত্রা বেশি হলে গাছে পাতার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেড়ে গিয়ে কার্বন-নাইট্রোজেনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে শুটি বা ফল কম ধরে।
 
খরার সময় করণীয়
মুগডাল খারিফ-১ মৌসুমের ফসল হওয়ার কারণে খরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মাটির রস কমে গেলে বিকেল বেলা রৌদ্রের প্রখর কমার পর সেচ দিতে হবে। কোনোভাবেই সকালে বা দিনের বেলায় সেচ দেয়া ঠিক হবে না।
 
এপ্রিল মাসে হঠাৎ তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে দ্রুত গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে। এরূপ ক্ষেত্রে গাছ তুলে পাতলা করে দিতে হবে এবং প্রতি বর্গমিটারে ৩০টি গাছের বেশি রাখা ঠিক হবে না।
 
ফসল সংগ্রহ
বিইউ মুগ-৪ বা বারি মুগ-৬ জাত দুটি ৬০-৬৫ দিনেই পরিপক্ব হয়। এর পাকা শুঁটি দুইবার সংগ্রহ করতে হয়। শুটি সংগ্রহ করার পর গাছ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে করে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। বিভিন্ন চরে উল্লিখিত জাত দুটির প্রতি হেক্টরে ফলন ১.০-১.৫ টন হয়ে থাকে।
 
স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ
চর এলাকায় তিনটি ফসল চাষ করতে হলে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ করতে হবে। কারণ স্থানীয় দীর্ঘজীবী ধানের জাত, যেমন মালশিরা, গানজিয়া, জলঢেপা, শাইল কিংবা গুটি স্বর্ণার চাষ করা হলে শীতকালীন ফসল চাষ বিলম্বিত হবে। বিইউ ধান-১ ও ব্রি ধান-৫৬ জাত দুটি ২০১৩ সালে চর নিধিরাম ও চর বেরুবাড়ীতে চাষ করা হয়েছিল। চারা রোপণের পর ৯০-৯৫ দিনের মধ্যেই ধান পেকে যায় এবং ফসল সংগ্রহ করার পর শীতকালীন ফসল যেমন মসুর, গম, সরিষা কিংবা আলু যথাসময়ে চাষ করা সম্ভব হয়।
চারা রোপণ ও ফসল ব্যবস্থাপনা
বিঘা প্রতি ৩ কেজি ধানের বীজ বীজতলায় ফেলতে হবে। চারার বয়স ২০-২৫ দিন হলেই তা রোপণ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি হওয়ার কারণে কোনোভাবেই ৩০ দিনের বেশি বয়সের চারা রোপণ করা সমীচীন হবেনা। রোপণের সময় সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সেমি. এবং গুছি থেকে গুছির দূরত্ব ১৫ সেমি. বজায় রাখতে হবে। প্রতি গোছাতে একটি বা দুটি চারা মাটির ২-৩ সেমি. গভীরে রোপণ করতে হবে। চরের মাটির উর্বরতা কম হওয়ায় সারের মাত্রা কিছুটা বেশি প্রয়োগ করা উচিত। তাছাড়া মাটিতে বালুর পরিমাণ বেশি থাকায় নাইট্রোজেনের অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফলে কিস্তিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে।
 
সাধারণত বিঘাপ্রতি ১৭-২০ কেজি ইউরিয়া, ১০-১৪ কেজি টিএসপি, ১৩-১৬ কেজি এমওপি, ১০-১৩ কেজি জিপসাম ও ০.৫ কেজি বোরণ প্রয়োগ করতে হয়। ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার শেষ চাষের সময় মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সার চারা রোপণের ৭-১০ দিন পর প্রথম কিস্তি, ২০-২৫ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি এবং ৪০-৪৫ দিন পর তৃতীয় কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য জমিতে প্রচুর রস থাকা প্রয়োজন। চারা রোপণের পর ২০-২৫ দিন পর্যন্ত জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
 
বিইউ ধান-১ ও ব্রি ধান-৫৬ জাত দুটি মাজরা, গান্ধি ও লেদা পোকায় আক্রান্ত হতে পারে। মাজরা পোকা দমনের জন্য ডায়াজিনন এবং লেদা ও গান্ধি পোকা দমনের জন্য ম্যালাথিয়নসহ একই গোত্রের অন্যান্য কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। কা- পচা বা পাতা ঝলসানো রোগ দেখা দিলে বেভিস্টিন প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
 
বন্যা পরবর্তী ফসলের পরিচর্যা
প্রায় প্রতি বছরই কুড়িগ্রামের চর এলাকা বন্যায় ডুবে যায়। ধানের কুশি গজানো পর্যায়ে বা তৎপরবর্তীতে ধানগাছ বন্যায় কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিইউ ধান-১ ও ব্রি ধান-৫৬ জাত দুটি ১০-১২ দিন পানিতে সম্পূর্ণ ডুবে থাকার পরও ভালো ফলন দিয়ে থাকে। তবে চারা রোপণের পর পরই বন্যায় ডুবে গেলে এবং তা ৮-১০ দিনের বেশি স্থায়ী হলে ফসল সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর কয়েক দিন জমিতে হাঁটা চলা না করাই ভালো। গাছের পাতায় পলি জমে থাকলে তা বৃষ্টিতে কিংবা বাতাসে ঝরে পরবে। পানি সরে যাওয়ার পর বিঘা প্রতি ২ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। বন্যায় গাছ ডুবে গেলে ধান পাকতে ৭-১০ দিন বিলম্ব হবে।
 
বন্যার সময় ‘ব্যাকআপ বা বীমা’ বীজতলা
কুড়িগ্রামের চরে সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে বন্যা দেখা দেয়। লক্ষ করা গেছে যে, বিইউ ধান ১ ও ব্রি ধান-৫৬ জাত দুটি কুশি গজানো পর্যায়ে বা তৎপরবর্তীতে দুই সপ্তাহেরও বেশি সম্পূর্ণ ডুবে থাকলেও গাছের তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু চারা রোপণের পর থেকে কুশি গজানোর আগে ৮-১০ দিনের বন্যায়ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে ফেলে। এরূপ ক্ষেত্রে বন্যার পানি ১০ দিনের বেশি দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন করে বীজতলায় চারা ফেলতে হবে। যদি বীজতলা তৈরি করার মত জমি পাওয়া না যায় তবে ‘দাপোগ’ বা ‘ভাসমান’ পদ্বতিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। বাড়ির উঠানে কিংবা কলার ভেলা/ বাশের মাচার ওপর চাটাই বিছিয়ে তার ওপর মাটির স্তর দিয়ে পানির উপর ভাসমান বীজতলা তৈরি করা যায়। বীজ অঙ্কুরোধগমের জন্য বপনের দুই দিন পূর্বে বীজ ভিজিয়ে ঢেকে রাখতে হবে এরং অঙ্কুরিত বীজ ছিটিয়ে বপন করতে হবে। দাপোগ বা ভাসমান পদ্ধতিতে গজানো চারা ১৫ দিনের মধ্যেই রোপন করতে হবে।
 
ফসল সংগ্রহ
ব্রি ধান৫৬ ও বিইউ ধান১ জাত দুটি চারা রোপণের পর ৯০-৯৫ দিনের মধ্যেই পরিপক্ব হয়। চর এলাকায় বিইউ ধান১ ও ব্রি ধান৫৬ এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৩.৫-৪.০ টন পর্যন্ত পাওয়া যাবে।
 
ফসলের নাম   উৎপাদন খরচ (টাকা/হে.)  মোট আয় (টাকা/হে.)   নিটি আয়
মসুর                   ৪৫,৫০০/                              ৬৩,০০০/                  ১৭,৫০০/
মুগডাল                ৪৯,৫০০/                              ৭০,০০০/                   ২০,৫০০/
আমন ধান            ৫২,০০০/                               ৭০,০০০/                   ১৮,০০০/
মোট                    ১৪৭,০০০/                            ২০৩,০০০/                 ৫৬,০০০/
 
চরে মসুর-মুগডাল-আমন ধান শস্যবিন্যাসের আর্থিক বিশ্লেষণ
 
চরে মসুর-মুগডাল-আমন ধান শস্যবিন্যাস চাষ করে চরের কৃষকরা বছরে প্রতি হেক্টরে ৫৬,০০০ টাকা নিট আয় করতে পারেন। তবে যদি খরা দেখা দেয় কিংবা বন্যার সময় ব্যাকআপ-বীমা বীজতলা তৈরি করতে হয় তাহলে খরচ কিছুটা বেড়ে যাবে।
 
লেখক:
প্রফেসর ড. এম. আব্দুল করিম*
* কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৬
বিস্তারিত
ঢেমশি নতুন নয় ঐতিহ্যবাহী বহুমাত্রিক ফসল
ঢেমশি নামটি নতুন মনে হলেও এটি কিন্তু আমাদের ঐতিহ্যবাহী আদি ফসলের মধ্যে একটি। এক সময় এটির জনপ্রিয়তা গ্রহণযোগ্যতা অনেক ছিল। কালের ঢামাঢোলের মাঝে হারিয়ে যেতে বসেছিল। আবার কিছু মানুষের আন্তরিকতা প্রচেষ্টায় এবং ঢেমশির বৈশিষ্ট্যের কারণে আবারও আস্তে আস্তে জায়গা করে নিচ্ছে কৃষি ভুবনে। ঢেমশি আদি শীতকালের ফসল। ঢেমশির ইরেজি নাম বাকহুইট (Buckwheat)। এটির বৈজ্ঞানিক নাম Fagopyrum esculentum । আর পরিবার হলো Poaccae। যদিও গমের নামের সাথে মিল আছে কিন্তু গম পরিবারের এটি নয়। উদ্ভিদতাত্ত্বিক দিক দিয়ে গমের সাথে কোনো মিল নেই। বরং সরিষার সাথে বেশ মিল আছে। আসলে ঢেমশি বীজ বপন থেকে পাকা পর্যন্ত সরিষার সাথে মিল কাটার পর ধানের সাথে বেশি মিল আছে। তাহলে মোটামুটিভাবে সরিষা ও ধান দুটো ফসলের বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে ঢেমশি ফসল। এটির আদিবাস বৃহত্তর রাশিয়ার ইউক্রেনে। কালক্রমে দক্ষিণ এশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আবাদ হচ্ছে ব্যবহার হচ্ছে। বলা হয় পৃথিবীর ৫টি সেরা খাদ্যের মধ্যে ঢেমশি অন্যতম একটি। অথচ আমাদের দেশে এটি সবচেয়ে অবহেলিত ফসল। উন্নত দেশগুলোতে ঢেমশি খায় জ্ঞানী, বিজ্ঞ, বড়লোকরা। আর আমাদের দেশে খেত গরিব এবং তথাকথিত অশিক্ষিতরা। এটি শুধু খাদ্য নয় অনেক রোগের মহৌষধ হিসেবে কাজ করে ম্যাগনেটের মতো।
 
৬০ এর দশকে শুরু হওয়া ঢেমশি ৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমাদের দেশের বিভিন্ন জেলায় চাষ হতো মোটামুটি পরিসরে। কিছু মানুষের অজ্ঞতা আর অবহেলার কারণে মহাউপকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ এ ফসলটি হারিয়ে গেছে এবং প্রতিস্থাপিত হয়েছে জীবন ধ্বংসকারী আরও কত ফসল। বাংলাদেশ অর্গানিক প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন গুরুত্বপূর্ণ এ ফসলটি পুনরুদ্ধারে চেষ্টা করছে এবং পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী জেলায় ইতোমধ্যে চাষ শুরু করেছে। আস্তে আস্তে চাষের এলাকা, আবাদ ফলন উৎপাদন বাড়ছে।
 
এটি একটি অলৌকিক ফসল যাতে রয়েছে মানবদেহের জন্য অতিজরুরি অনেক পুষ্টি উপাদান। এতে রয়েছে ভাত, রুটি, মাছ, গোশত, দুধ, ডিম, সবজি এবং ফলের প্রায় সব পুষ্টি উপাদান, সে সাথে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ, অ্যামাইনো এসিড এবং ইলেকট্রলাইটস। এ ফসলটি চাষ করতে কোনো সার, পানি, বালাইনাশক এবং যত্ন লাগে না। ১ কেজি ধান ফলাতে শুধু পানিই লাগে প্রায় ৪ হাজার লিটার। আর এ কারণেই বাংলাদেশের মাটির নিচের পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে এবং যাচ্ছে। আধুনিক উন্নত ফসল ফলাতে গিয়ে অযাচিতভাবে ক্ষতিকারক রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করে মাটি, পানি, বাতাস এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। আর এ কারণেই পুকুর, খালবিল, নদীনালায় মাছ কমে যাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে, লাখ লাখ মানুষ অহরহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ।
 
পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট এবং সবচেয়ে দামি মধু এ ঢেমশির ফুল থেকেই উৎপাদন হয়। বিদেশের কোনো বাসায় বেড়াতে গেলে কেউ যখন ঢেমশির মধু নিয়ে যান তখন বাড়িওয়ালারা বেশ খুশি হন। ঢেমশি চাল, আটা, ছাতু, মধু এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্য রফতানি করে বছরে শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। অপর দিকে, অতি সহজে ঢেমশিই পারে এ দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং নিরাপদ খাদ্য প্রতিষ্ঠা করতে। মাটি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশের উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য ফিরে আনা যাবে খুব সহজেই যদি আমরা আবার অবহেলিত ফসল ঢেমশি চাষ করি।
 
ঢেমশি স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন একটি বিশেষ ফসল। অবহেলিত ফসলটি আমাদের ফসলের তালিকায় উল্লেখযোগ্য প্রধান ফসল হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারে শুধু এর বহুমাত্রিক যোগ্যতাও সাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্যের জন্য। বছরের যে সময় জমি মোটামুটি পতিত থাকে বা ধান আবাদ করা যায় না সেসব জমিতে সে সময়ে সাথী বা মিশ্র ফসল হিসেবে সমন্বয় করতে পারে ঢেমশি। অন্যান্য ফসল যেখানে হয় না বা হতে সমস্যা সেখানে খুব অনায়াসে ঢেমশি ফলানো যায় । বীজ বপনের ৮০-৯০ দিনের মধ্যেই ফসল কাটা যায়। উৎপাদন খরচ নেই বললেই চলে। কেননা কোনো রাসায়নিক সারের প্রয়োজন নেই। পোকামাকড়ের আক্রমণ হয় না বলে বালাইনাশকের খরচ থেকে পুরোপুরি বেঁচে যাওয়া যায়। সেচের তেমন প্রয়োজন নেই। চরাঞ্চলের মাটি এবং বেলে দোআঁশ মাটিতে ভালো হয়। আগাছা দমনের প্রয়োজন পড়ে না কেননা এরা নিজেরাই আগাছা নষ্ট করে দেয়। সাধারণভাবে জৈবসার ব্যবহার করে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায়। ঢেমশি সাধারণ খাদ্যে, রোগীদের খাদ্য এবং শিশুদের খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয় করার সব ধরনের সুযোগ ও যোগ্যতা আছে। বর্তমানে উত্তরবঙ্গের ৭ হাজার একর জমিতে ঢেমশির আবাদ হচ্ছে। এটি দিন দিন আরো জনপ্রিয় হচ্ছে পরিধি পরিসর বাড়ছে।
ঢেমশি ঠিক ভাতের মতোই বরং পুষ্টিগুণ ভাতের চেয়ে অনেক বেশি। ঢেমশি খেলে যেসব উপকার পাওয়া যাবে তাহলো-
কম পরিমাণ শর্করা এবং অধিক পরিমাণ ফাইবার থাকায় রক্তে সুগারের পরিমাণ (ডায়াবেটিস) নিয়ন্ত্রণ করে;

হৃদরোগী এবং ডায়াবেটিস রোগীর জন্য একমাত্র আদর্শ এবং নিরাপদ খাদ্য;
প্রাকৃতিকভাবেই অধিক পরিমাণ আমিষ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক সমৃদ্ধ
বিভিন্ন খাদ্যোপাদান আছে বলে শিশুর ওজন, উচ্চতা, মেধাশক্তি, পেশি শক্তি, হিমোগ্লোবিন লেভেল বৃদ্ধি করে;

০৪. বেশি পরিমাণ আমিষ থাকায় গর্ভবতী এবং দুগ্ধদানকারী মায়ের জন্য অতি জরুরি (শিশু প্রচুর দুধ পাবে); 
০৫. অধিক পরিমাণ ফাইবার থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং মন ও দেহ সুস্থ সুন্দর থাকে;
০৬. হাঁড়ের ক্ষয়রোধ করে, মজবুত করে এবং হাঁড়ের স্বাস্থ্যের গঠন উন্নয়ন করে বলেই শরীরে কোনো ব্যথা থাকে না;
০৭. বিভিন্ন প্রকার ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং নিরাময়ে সহায়তা করে;
০৮. সব বয়সীদের অ্যাজমা হাড়ক্ষয় রোগ কমাতে সাহায্য করে; হাড় মজবুত করে;
০৯. মেয়েলি রোগের একটি মহৌষধও বটে...।
পুষ্টির দৃষ্টিকোণ থেকেও ঢেমশি বেশ মূল্যবান ফসল। এতে আছে- শক্তি ৩৪৩ কিলোক্যালরি; শর্করা ৫৫%; আমিষ ২৪%; টোটাল ফ্যাট ১৭%; কোলস্টেরল ০ মিলিগ্রাম; ডায়টেরি ফাইবার ২৬%; সোডিয়াম ১ গ্রাম, পটাসিয়াম ৪৬০ মিলিগ্রাম (১০%), ক্যালসিয়াম ১৮ মিলিগ্রাম (২%), কপার ১.১, লৌহ ২.২০ (২৭.৫%) ম্যাঙ্গানিজ ১.৩, ফসফরাস ৩৪৭ মিলিগ্রাম, দস্তা ২.৪ মিলিগ্রাম (২২%)। উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নিয়াসিন ৪৪%, পেনটোথেনিক এসিড, রাইবোফ্লেবিন ২২%, থায়ামিন বি১, ভিটামিন এসহ আরও অনেক পুষ্টি উপাদান।
ঢেমশির বীজ বোনার সময় হলো কার্তিক অগ্রহায়ণ মাস। ১০-১৫ দিন এদিক-সেদিক হলেও কোনো সমস্যা হয় না। কাটা হয় মাঘ-ফাল্গুন মাসে। বীজের হার প্রতি একরে ১২ কেজি। এক চাষ দিয়ে ছিটিয়ে বা লাইনে বুনা যায়। আবাদে উৎপাদনে তেমন কোনো সারের প্রয়োজন হয় না। শুধু পরিমাণ মতো জৈবসার জমিতে দিলেই চলবে। জীবনকাল ৮০ থেকে ৯০ দিন। দুই ফসলে মধ্য ফসল হিসেবে আবাদ করা যায়। সাধারণভাবে উৎপাদন একরপ্রতি ১ টন। ভালো ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে ফলন ২ মেট্রিক টন পর্যন্ত হতে পারে। কাটার পর গাছ জ্বালানি হিসেবে যতটুক ব্যবহার করা যায় তার চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গোখাদ্য হিসেবে। কেননা গাছে এবং বীজের তুষে বেশ পুষ্টি আছে সে কারণে গোখাদ্য হিসেবে অনেক পুষ্টিকর লাভবান। কোনো পোকামাকড়ের আক্রমণ নেই বলতে গেলে। উৎপাদন মৌসুমে সাধারণত কোনো সেচ লাগে না। লাগানোর ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে ফুল আসে। ফুল আসার আগ পর্যন্ত ঢেমশি পুষ্টিকর শাক হিসেবে খাওয়া যায়। শাক একটু টকস্বাদযুক্ত। ফুল আসার ১ দেড় মাসের মধ্যে পরিপক্ব হয় ফসল কাটা যায়। সাধারণত ভাত হিসেবে খাওয়া হয়। আর চালের মতো ভেজেও খাওয়া যায়।

 
জমি তৈরি করে শেষ চাষের আগে একরে ১২ কেজি বীজ ছিটিয়ে দিয়ে চাষ ও মই দিতে হয়। বপনের আগে পর্যাপ্ত পরিমাণ মতো শুধু গোবর সার দিতে হবে। কোনো রাসায়নিক সারের প্রয়োজন নেই। জমিতে রস না থাক