কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

দক্ষিণাঞ্চলে অভিযোজিত টেকসই কৃষি প্রযুক্তি

নদীমাতৃক কৃষি প্রধান বাংলাদেশের মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার যার মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ উপকূলীয় এলাকা এবং শতকরা ৩০ ভাগ নিট আবাদি এলাকা। ২.৮৫ মিলিয়ন হেক্টর উপকূলীয় এলাকার মধ্যে প্রায় ০.৮৩ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় উপকূলীয় জনসংখ্যার ঘনত্ব (৭৫০ জন/কিলোমিটার) কম। দেশে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ০.৩১ হেক্টর হলেও উপকূলে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ০.২৯ হেক্টর (বিবিএস, ২০১০)। এছাড়া বসতবাড়িতে জায়গার পরিমাণও জাতীয় পর্যায়ের (০.০৩২ হেক্টর) চেয়ে উপকূলে (০.০২৮ হেক্টর) কম। উপকূলের জীবনযাত্রা প্রধানত কৃষি নির্ভর। বর্তমানে বাংলাদেশে ফসলের নিবিড়তা ১৯১ শতাংশ সে তুলনায় উপকূলে ফসলের নিবিড়তা ১৩৩ শতাংশ যা তুলনামূলকভাবে কম। তবে উপকূলীয় অঞ্চলে যথাযথ পরিকল্পনা ও উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অন্যান্য ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও কৃষিক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অঞ্চল। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় জেলাগুলো কৃষি পরিবেশ অঞ্চল ১৩, ১৮, ২৩ এর আওতাভুক্ত প্রধানত লবণাক্তপ্রবণ এলাকা। এ এলাকার প্রায় ১০.৫৬ লাখ হেক্টর জমি কম বেশি লবণাক্ততা আক্রান্ত। দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উজানে পানি প্রত্যাহার, উচ্চ তাপমাত্রা, ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের কারণে ক্রমাগতভাবে লবণাক্ততা বাড়ছে। উপকূলীয় এলাকায় বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫-৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বৃষ্টিপাতের বেশিরভাগই মে-সেপ্টেম্বর মাসে আমন মৌসুমে হয়ে থাকে, নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি মাসে তেমন বৃষ্টিপাত হয় না ফলে মাটির লবণাক্ততা বাড়ে এবং শুকনো মৌসুমে মিষ্টি পানির অভাবে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। এসআরডিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী নদীর পানির লবণের মাত্রা ০.১৬ থেকে ৩৬ ডেসিসিমেন-মিটার, মাটির লবণাক্ততা ডিসেম্বর-মে মাস ২-৯ ডেসিসিমেন-মিটার, জুন-ডিসেম্বর ২ বা তারও কম থাকে। শীতকাল সংক্ষিপ্ত হওয়ায় রবি শস্যের ফলনও কম হয়। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন এবং জনজীবনে নেমে আসছে বিপর্যয়। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে বাড়াতে হবে মানুষের সচেতনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজিত কৃষি প্রযুক্তিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রধান প্রধান সমস্যা
বর্তমানে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের কৃষি চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চলের কৃষি ও কৃষিজীবী মানুষের জীবন জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। মাটি ও পানির লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দুর্বল পোল্ডার ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, ঘন ঘন প্রলয়ংকারী প্রাকৃতিক দুর্যোগ  সিডর, রেশমী, নার্গিস, আইলা, মহাসেন, কোমেন, রোয়ানু, উচ্চ জোয়ারের প্রভাবে বেড়িবাঁধ ভেঙে কৃষি জমিতে লবণাক্ত পানির প্রবেশ, কৃষি পণ্যের বাজারজাত করার অসুবিধা, সেচ ও নিষ্কাশনের অপ্রতুলতা মানসম্মত কৃষি উপকরণের অভাব, কৃষি শ্রমিকের অভাব, অপরিকল্পিতভাবে খাল দখল, খাল পুনঃখনন-সংস্কার, নদী ভরাট সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা দূরীকরণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে কৃষকের আয় ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব। শুকনো মৌসুমে মাটি ও পানির লবণাক্ততার কারণে বেশিরভাগ জমি পতিত থাকে। দেরিতে আমন ধান কাটা ও মাটি এঁটেল প্রকৃতির হওয়ায় জো আসতে দেরি হওয়া, আমন রোপণের সময় পানির গভীরতা বেশি থাকার কারণে কৃষক স্থানীয় জাতের রোপা আমন চাষ করেন। ফলে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত কৃষক আমন ধান কাটেন। শীতকালের স্থায়িত্ব কম হওয়ার জন্য গম, মসুর, সরিষার মতো রবি ফসল বপনের উপযুক্ত সময় থাকে না, সেচের পানির অভাবে কৃষক জমি পতিত রাখে। উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে  এ অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য ও সার্বিক আর্থসামাজিক অবস্থায় ব্যাপক অবনতি হচ্ছে। এ অঞ্চলের জন্য টেকসই কৃষিপ্রযুক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাময় গবেষণার ফলাফল, আবহাওয়া, মাটি পানির লবণাক্ততা, লবণ সহনশীল ফসল-জাত ব্যবহার সমন্বয় করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর অভিযোজন কৌশলগুলো সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
প্রধান প্রধান সম্ভাবনা
চুক্তিবদ্ধ চাষিদের মাধ্যমে লবণাক্ত সহনশীল ফসলের জাতগুলোর বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণের কার্যক্রম গ্রহণ, ঘেরের আইলে ও বসতবাড়ির আঙিনায় ফল ও সবজি চাষ সম্প্রসারণ, স্বল্প পানির চাহিদা সম্পন্ন ফসলের আবাদ বাড়ানো, এলাকা উপযোগী খাটো জাতের নারিকেল, পেয়ারা, সফেদা, আমড়া, কুল, ডেউয়া, শরিফা পরিকল্পিত বাগান প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চ মূল্যের ফসলের চাষাবাদ সম্প্রসারণ, স্থানীয় ফসলের জাতগুলোর উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি করা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রায়োগিক কার্যক্রম গ্রহণ করা, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন, পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহার ও ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, আউশ ধানের আবাদ বৃদ্ধি, ডাল ও তেল, মসলা ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ উপকূলীয় এলাকার কৃষি ব্যবস্থায় উন্নয়নের সম্ভাব্য সুযোগ রয়েছে। যার ফলে পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহারসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজিত কৃষি প্রযুক্তিগুলো সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব।   
প্রধান প্রধান শস্যবিন্যাস
প্রধান প্রধান শস্যবিন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বোরো-পতিত-রোপাআমন, পতিত-পতিত-রোপাআমন, পতিত-রোপাআউশ-রোপাআমন, বোরো-পতিত-পতিত, পতিত-মিশ্র বোনাআউশ + বোনাআমন, রিলে ফেলন/মুগ-রোপাআউশ-রোপাআমন, পতিত-ডিবলিংআউশ-রোপাআমন, রিলেখেসারি/মুগ/ফেলন/মরিচ/গম/-ডিবলিংআউশ রোপাআমন, রিলেখেসারি/মুগ/মরিচ/গম/মিষ্টি আলু/আলুু/মসুর/ছোলা/ভুট্টা-/মরিচ/পালংশাক/ ডাঁটা/মিষ্টিকুমড়া/ঢেঁড়শ/বেগুন/বাঁধাকপি/ ফুলকপি/তরমুজ/-পতিত-রোপাআমন।
উপকূলীয় অঞ্চল উপযোগী ফসল ও জাত
বোরো ধানের উপযোগী জাতগুলো-উফশী জাত : ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৫ ব্রি ধান৬১, বিনাধান-৮, বিনাধান-১০; স্থানীয় জাত : ভোজন, কাজলা, চৈতা, কালি বোরো, সলই, খাট ভোজন চাষ করতে হবে। আউশ মৌসুমে উফশী ধান বিআর-২৬, ব্রিধান-২৭, ব্রি ধান৫৫; স্থানীয় জাতের ক্ষেত্রে ভোজন, সলই, কালিবোরো, সাইট্যা, ধলিসাইট্যা, রাতুল, গরিসাইট্যা, হাসিকলমি, কালোসাইট্যা আবাদ করা যায়। আবার আমন মৌসুমে উফশী জাত বিআর-২৩, ব্রি ধান৪০, ব্রিধান৪১, ব্রিধান৪৪ (অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা), ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৬১, ব্রি ধান৬৭ এবং স্থানীয় জাতের লাল মোটা, সাদা মোটা, কালা মোটা, দুধ মোটা, শাইল গিরমি, রাজাশাইল, লালচিকন, সাদাচিকন, দুধকলম, জয়না, ডিংগা মানিক, কার্তিক বালাম, চাষ করা; লবণাক্ততাসহিষ্ণু বারি গম-২৫; চীনা, কাউন, জোয়ার, যব- বারি বার্লি-১, বারি বার্লি-২, সরগম চাষ সম্প্রসারণ করা যায়। তেল ফসলের ক্ষেত্রে সরিষা, সয়াবিন, বাদাম- বারি চিনাবাদাম-৮, বিনা চিনাবাদাম-৪, বিনা চিনাবাদাম-৫, সূর্যমুখী, তিল, তিসি; ডাল ফসল মুগ-বারিমুগ-৫, বারিমুগ-৬, ফেলন, খেসারি, মাসকালাই; মসলা জাতীয় মরিচ, রসুন, হলুদ; সবজি হিসেবে করলা, লাউ, বেগুন, টমেটো, শসা, মটরশুঁটি, ঢেঁড়শ, মিষ্টিকুমড়া, সজিনার চাষ; ফল চাষ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে খাটো জাতের নারিকেল, মাল্টা, আমড়া, স্বরূপকাঠি পেয়ারা, কাউফল, ডেউয়া, তাল, কুল, সফেদা, খেজুর, আমলকী, আম, কদবেল, জাম, বাতাবিলেবু, তরমুজ, বাঙ্গি লাগানো যায়। তাছাড়া অন্যান্য ফসল চুই ঝাল, গাছ আলু, দুধ মান কচুর চাষ বেশ উপযোগী। বন্যা ও জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকার জন্য ধাপে সবজি চাষ; পুকুর ও ঘেরের উঁচু ও চওড়া আইলে শাকসবজি চাষ করে একদিকে যেমন বাড়তি আয় হবে অন্যদিকে ভূমিক্ষয় রোধ হবে। এক্ষেত্রে শিম, বরবটি, করলা, কলমিশাক, টমেটো, বেগুন, পুঁইশাক, ওলকপি, সজিনা, লাউ, শশা, চালকুমড়া, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, বাঁধাকপি, পালংশাক, ফুলকপি ডিবলিং পদ্ধতিতে রোপণ করা। জোয়ার-ভাটা এলাকার জন্য সর্জান পদ্ধতিতে ঢেঁড়শ, করলা, ঝিঙা, ডাটা, গিমাকলমি, লালশাক সবজির চাষ করা যায়।
উপযোগী প্রযুক্তি
এ এলাকার জন্য উপযোগী প্রযুক্তিগুলো হচ্ছে বস্তা পদ্ধতিতে ফল ও সবজি চাষ, সর্জান পদ্ধতিতে সবজি ও ফল চাষ, বসতবাড়িতে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধ এলাকার জন্য ভাসমান সবজি চাষ, শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির জন্য মিনি পুকুর, মালচিং এর মাধ্যমে ফসল চাষ, বিনাচাষে ফসল উৎপাদন, আন্তঃফসল হিসেবে হলুদ, আদার চাষ; আমন ধানের সাথে খেসারি রিলে শস্য চাষ, ভার্মিকম্পোস্ট, সবুজ সার, খামারজাত সার, সেক্স ফেরোমেন ট্র্যাপ, বারিড পাইপ ও ফিতা পাইপ পদ্ধতিতে সেচ, স্প্রিংকলার পদ্ধতিতে সেচ প্রদান এসব।
উপযোগী কৃষি যন্ত্রপাতি
এলাকা উপযোগী কৃষি যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে পাওয়ার টিলার, রিপার, রেইজড বেড প্লান্টার, পাওয়ার থ্রেসার, প্যাডেল থ্রেসার, ফুট পাম্প, স্প্রেয়ার। তাছাড়া লবণাক্ততার পরিমাপের জন্য ইসি মিটার, আবহাওয়াগত তথ্য প্রপ্তির জন্য আবহাওয়া ডিসপ্লেবোর্ড, আপেক্ষিক আর্দ্রতামাপক যন্ত্র, বীজ সংরক্ষণের জন্য ড্রামের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
পতিত জমির ব্যবহার
ডিসেম্বরের মধ্যে পানি সরে যায় এমন জমিতে উপযোগী জাতের রোপা আমনের আবাদ করে জমির জো অবস্থার আগে আমন ফসল কর্তন করে বিভিন্ন রবি ফসল আলু, গম, চিনাবাদাম, মরিচ, বেগুন, শাকসবজি আবাদ করা সম্ভব। উচ্চফলনশীল এবং লবণাক্ততা সহনশীল বোরো ধানের জাত ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪ এবং বিনাধান-৮, বিনাধান-১০ এর আবাদ সম্প্রসারণ করা যায়। রোপা আমনের সাথে রিলে সরিষা (বারি সরিষা-১১, ১৪, ১৫) অথবা রিলে খেসারি (স্থানীয়) চাষের মাধ্যমে আবাদ ও ফলন বাড়ানো সম্ভব। বেড তৈরি (মিষ্টিকুমড়া ও তরমুজ) ও মালচ (আলু) ব্যবহার করে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আবাদ বাড়ানো সম্ভব। সর্জান পদ্ধতিতে সবজি চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব, ঘেরের বেড়িবাঁধে বছরব্যাপী সবজি আবাদ করা যায়। রোপা আউশ ধানের রোপণের সময় সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা ও উন্নতমানের বীজ সঠিক সময়ে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে খরিফ-১ মৌসুমে আবাদি জমির পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। সর্জান পদ্ধতিতে বেডের ওপরের অংশে বছরব্যাপী শাকসবজি যেমন- লালশাক, পালংশাক, মুলা, ওলকপি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, বেগুন : দুই বেডের মধ্যবর্তী স্থানে মাচানে করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, শসা, শিম, বরবটি এবং ঢালের নিচু অংশে পানি কচুর চাষ করা যায়।
লবণসহনশীল জাতের ধান চাষ : আমন মৌসুমে বিআর-২৩, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, এর  মতো লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত চাষ করা। বোরো মৌসুমে ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৬১, বিনাধান-৮  ও বিনাধান-১০ লবণাক্ততা সহনশীল জাতের চাষ করা।
লবণসহনশীল  অন্যান্য ফসল চাষ : বারি গম ২৫, তরমুজ, বারিমুগ-৬, তিল, সরিষা (বিনা সরিষা-৫ ও বিনা সরিষা-৬), সূর্যমুখী, সয়াবিন, তরমুজ চাষ করা; বিভিন্ন লবণাক্ততার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন সবজি বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ, শিম, মুলা, গাজর, পেঁয়াজ; পুঁইশাক, শালগম, টমেটো, বাঁটিশাক, পালংশাক, বিট চাষ করা; বিনা চাষে-কচুরিপানা দিয়ে মালচিং পদ্ধতিতে আলু চাষ, ধানের সাথে মাছের চাষ, সাথী ফসল হিসেবে খেসারি ও মিষ্টিকুমড়ার চাষ করা।
উচ্চমূল্যের ফসলের চাষ : উচ্চমূল্যের ফসল সারা বছর চাষ করা যায় এবং বছরব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এটি ফসল জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং দারিদ্রতা দূর করে। লবণাক্তপ্রবণ এলাকায় উচ্চমূল্যের ফসল হিসেবে গ্রীষ্মকালীন টমেটো, দেশি শিম, গ্রীষ্মকালীন শিম, মরিচ, কলা, কুল, পেয়ারা, পেঁপে, নারিকেল, ভুট্টার সাথে আলু বা মুগের চাষ, মাশরুম চাষ করা যায়।  
মিনি পুকুরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ : উপকূলীয় এলাকায় ফসল উৎপাদনে প্রধান সমস্যা সেচের পানি। ধানের জমির এক কোণে ১২ী১২ী৩ ঘন মিটার আকারের পুকুর স্থাপন করা গেলে সেচকার্যের সুবিধা, সাথে সাথে আইলে সবজি চাষ এবং পুকুরে মাছ চাষ করা যাবে। এ রকম একটি পুকুরের পানি দিয়ে প্রায় ১ হেক্টর জমির শীতকালীন ফসলে সেচ দেয়া সম্ভব।
ঘেরের আইলে বছরব্যাপী সবজি চাষ : একটি সুনির্দিষ্ট জলাশয়ের চারিদিকে ১-১.৫ মিটার চওড়া আইলে (স্থানীয়ভাবে ভেড়ি বলে) সবজি চাষ এবং ঘেরে মাছ চাষ করা যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘেরের আইল বিভিন্ন সবজি ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনাময় উৎস। বিশেষ করে খরিফ-২ এবং রবি মৌসুমে প্রচুর সবজি উৎপাদন করা যায়।
ঘেরের আইলে আপেলকুল ও নারিকেল চাষ : লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় আপেল কুল ও নারিকেল চাষ করা যায়।  তাছাড়া  ঘেরে ধান ও মাছ চাষের পাশাপাশি অন্যান্য মৌসুমি সবজি ফসল উৎপাদন করা যায়।
সর্জান পদ্ধতিতে সবজি ও ফল চাষ : সাধারণত যে জমি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয় বা বছরের বেশির ভাগ সময় পানি জমে থাকে সে জমিতে সর্জান পদ্ধতিতে সবজি ও ফলের চাষ করা যায়। পাশাপাশি ২টি বেডের মাঝের মাটি কেটে উঁচু বেড তৈরি করে ফসল চাষ করাই সর্জান পদ্ধতি। মাঘ-ফাল্গুন (মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ) মাসে সর্জান বেড তৈরি করা হয়। প্রায় ২৮ মিটার লম্বা এবং ১১ মিটার চওড়া একখ- জমিতে ১০ী২ বর্গমিটার আকারের ৫টি বেড তৈরি করা যায়। বেডের উচ্চতা কমপক্ষে ১ মিটার হলে ভালো হয়।                                          
কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য কর্মসূচিভিত্তিক সুপারিশ : লবণাক্ততা সহনশীল বিভিন্ন ফসলের (ধান, গম, মুগ, তিল, সরিষা) বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ;
*    ঘেরের আইলে ও বসতবাড়িতে ফল ও সবজি চাষ সম্প্রসারণ;
*     অপ্রচলিত ফলের (কাউফল, ডেউয়া, লটকন, বাতাবিলেবু, শরিফা) আবাদ সম্প্রসারণ;
*     খাটো জাতের নারিকেল, আমড়া, পেয়ারা, মাল্টা, সফেদার বাগান সৃজন;
*     উচ্চমূল্যের ফসলের (গ্রীষ্মকালীন টমেটো ও শিম, কুল, কলা, পেপে, সয়াবিন, নারিকেল, সূর্যমুখী) আবাদ সম্প্রসারণ;
*     সর্জান পদ্ধতির মাধ্যমে সবজি ও ফল উৎপাদন;
*     বিনা চাষ, মাদা ও মালচিং পদ্ধতির মাধ্যমে ফসল উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ;
*     রাস্তার দুই ধারে তাল, খেজুর, সজিনা বাগান সৃজন;
*     আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদন;
*    বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ওয়াটার রিজার্ভার/খাস পুকুরসহ অন্যান্য জলাশয় পুনঃখননের মাধ্যমে আপদকালীন সেচের চাহিদা মেটানো;
*    সোলার সেচ পাম্প স্থাপনের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি;
*     
AWD, SRI, Raised bed প্রদর্শনী স্থাপন;
*   
Burried Pipe স্থাপনের মাধ্যমে সেচের পানির অপচয় রোধ ও সেচ খরচ কমানো;
*     ফল বাগানে
Drip Irrigation প্রদর্শনী স্থাপন;
*     কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার, পাওয়ার থ্রেসার কৃষকের ভর্তুকি মূল্যে বিতরণ কর্মসূচি;
*     ফসল/ফল/সবজি সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ সহায়ক কার্যক্রম এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার সংযোগ সৃষ্টিকরণ;
*     মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রায়োগিক কার্যক্রম গ্রহণ করা;
*     উপকূলীয় এলাকায় পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো;
*     উপকরণ সরবরাহ ও ঋণ প্রাপ্তি সহজলভ্যকরণ;
*     সেচের জন্য ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার এসব।

ড. আবু ওয়ালী রাগিব হাসান*
ড. মো. রফিকুল ইসলাম**

*প্রকল্প পরিচালক, আইএফএমসি প্রকল্প, ডিএই; **অতিরিক্ত পরিচালক, এনএটিপি-২ প্রকল্প, ডিএই

বিস্তারিত
উপকূলীয় অঞ্চল কৃষির অপার সম্ভাবনা

বাংলাদেশের শস্যগোলা ধরা হয় উত্তরবঙ্গকে। কিন্তু উত্তরবঙ্গ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিপর্যস্ত। পানি সংকটে সেখানে এখন শস্য উৎপাদন সংকটাপন্ন। খরা ও শৈত্যপ্রবাহ এখন শস্যহানির এক অনিবার্য নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এরই মধ্যে এ উত্তরাঞ্চলের অনেক জমি উৎপাদনের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। অথচ উপকূলীয় অঞ্চলে অনেক ফসলের ফলন এখনও নি¤œ পর্যায়ে রয়েছে। সেখানেও আছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। তথাপি সে অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির এক চমৎকার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাগুলোতে এরই মধ্যে এ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির এসব সম্ভাবনাকে বিবেচনা করে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির এক মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। সে মহাপরিকল্পনাতেও দক্ষিণাঞ্চলে উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা ও বিশেষ কিছু কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন ফসলের ফলন পার্থক্য কমিয়ে বর্তমান উৎপাদনকে বৃদ্ধি করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদি উপকূলের এ কৃষি সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে কৃষি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে তা দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনের চিত্রকে বদলে দেবে।
উত্তরাঞ্চলে পানির যেখানে সংকট, সেখানে এত পানি ব্যবহার করে ধান বা সেচবিলাসী ফসল চাষের দরকার কি? বরং পানি যেখানে সস্তা ও সুলভ সেখানে পানি ব্যবহার করে ধান উৎপাদনে জোর দেয়া উচিত। দক্ষিণাঞ্চলের মতো এত সস্তায় আবাদ দেশের আর কোথাও সম্ভব না। সেচের পানি এখানে ফ্রি। লবণাক্ততা আছে, কিন্তু তা একটি নির্দ্দিষ্ট সময়ের জন্য এবং তা সব জায়গায় নয়। এখনও উপকূলের বিপুল পরিমাণ জমি লবণাক্ততামুক্ত বা স্বল্প লবণাক্ততাযুক্ত। সেসব জমিতে অনেক রকমের ফসলের আবাদ হতে পারে। লবণাক্তপ্রবণ জমির জন্য বিশেষ ফসল ও ফসলের লবণসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন ও ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া যায়।
দেশের পাঁচ ভাগের একভাগ মানুষ বাস করে উপকূলীয় ১৪টি জেলায়। এ অঞ্চলের মানুষ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দারিদ্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিবেচনায় কিছুটা সুবিধাবঞ্চিত। বাংলাদেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৩০ শতাংশ জমি রয়েছে এ অঞ্চলে যার পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ হেক্টর। তাই উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে বর্তমান সরকার বিশেষ জোর দিচ্ছে। এ অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা বাংলাদেশের গড় শস্য নিবিড়তার চেয়ে বেশ কম। এ পরিপ্রেক্ষিতে উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও শস্য নিবিড়তা বাড়ানোর জন্য প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত উপকূলীয় অঞ্চলের উপযোগী বিভিন্ন ফসল ও ফসলের জাত সম্প্রসারণ। পরে লক্ষ্য হওয়া উচিত উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব ফসলের ফলন পার্থক্য কমিয়ে আনা। শুধু এটুকু কাজ করতে পারলেই উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন প্রায় দেড় থেকে দ্বিগুণ করা সম্ভব। উপকূলীয় অঞ্চলের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শুধু ফসল নয়, কৃষির বৈচিত্র্যকরণ করে মাঠ ফসল, উদ্যান ফসল, অর্থকরী ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ প্রভৃতির উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা উন্নয়ন করে একটি সুসমন্বিত ও সুসংহত টেকসই কৃষি উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়। মোট কথা হলো, উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকের যার যত ধরনের কৃষি সম্পদ আছে তার প্রত্যেকটি সম্পদের সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা বিবেচনা করে বর্তমান উৎপাদনকে বৃদ্ধি করতে যা যা করা দরকার তা করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা হলো।
ধান চাষ
উপকূলীয় অঞ্চলের প্রধান ফসল আমন ধান। এ অঞ্চলে আমন ধানের চালের বর্তমান গড় ফলন প্রায় ২.৩ মেট্রিক টন/হেক্টর। হেক্টরপ্রতি এ ফলনকে ২ মেট্রিক টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। অনুরূপভাবে আউশ ও বোরো ধানের বর্তমান গড় ফলনকেও হেক্টরপ্রতি প্রায় ১.৮-২.৮ মেট্রিক টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এটা সম্ভব করতে হলে স্থানীয় পরিবেশ ও অবস্থার সাথে খাপ খায় এ রকম কিছু উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করতে হবে, এরই মধ্য উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাত সম্প্রসারণ করতে হবে, সার ও পানি ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনা উত্তমভাবে করতে হবে। এ অঞ্চলে আমন মৌসুমে পানির কোনো অভাব নেই, লবণাক্ততাও থাকে না। বোরো মৌসুমের শেষ দিকে কিছুটা লবণাক্ততার প্রভাব পড়ে। আউশ মৌসুমে লবণাক্ততার প্রভাব বেশি দেখা যায়। তাই এ অঞ্চলে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে রোপা আমন ধান চাষের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। সুলভ পানি, অনেক এলাকায় লবণাক্ততার সীমা ফসলের ক্ষতি সীমার অনেক নিচে থাকে। এসব এলাকায়  পরিকল্পিতভাবে ভূউপরিস্থ পানি দিয়ে সেচের এলাকা বাড়িয়ে ধানের চাষ এলাকা বাড়ানোর সুযোগ আছে। এক জরিপে দেখা গেছে, এ অঞ্চলে এভাবে প্রায় ৭ লাখ হেক্টর জমি ভূউপরিস্থ পানি দিয়ে সেচের আওতায় আনা সম্ভব। মহাপরিকল্পনাতে এ অঞ্চলে ধানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য যেসব সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো হলো-
জোয়ার-ভাটা বিধৌত ও জোয়ারবিহীন এলাকায় রোপা আমন ধান চাষ সম্প্রসারণে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ; বিশেষত আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে।
রোপা আউশ ধানের চাষ বৃদ্ধি করতে স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট জাত (৮৫-৯০ দিন) উদ্ভাবন; এ ধরনের জাতের জন্য ভিয়েতনামে খুঁজে দেখা যেতে পারে।
বোরো ধান চাষের এলাকা সম্প্রসারণ; বিশেষ করে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে।
ডাল, তেলবীজ ও নতুন কোনো ফসলের চাষ
উপকূলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যের কিছু ফসল, ডাল ও তেলবীজ ফসল চাষেরও সুযোগ আছে। তবে তা সব এলাকায় নয়। বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী জেলার বেশ কিছু জমিতে এ প্রচেষ্টা করা যেতে পারে। এসব এলাকায় ডাল ফসল হিসেবে মুগ, খেসারি, ছোলা, ফেলন চাষ সম্প্রসারণ করা যায়। তেলবীজ ফসল হিসেবে তিল, সূর্যমুখী, চিনাবাদামের চাষ করা যায়। নতুন ফসল হিসেবে ভুট্টা, সুগার বিট, মরিচ, সয়াবিন, পাট, আখ ও মাশরুম চাষ করা যায়। এরই মধ্যে সাতক্ষীরাতে পাটের পরীক্ষামূলক চাষ করে সফলতা পাওয়া গেছে। তবে এ অঞ্চলে চাষের জন্য বিশেষ জাত উদ্ভাবন করা দরকার। তুলা লবণাক্ততা সইতে পারে, তবে জলাবদ্ধতা সইতে পারে না। সুনিষ্কাশিত উঁচু জমি থাকলে সেখানে তুলা চাষ করা যায়। গম চাষের  চেষ্টা করা যায়। এসব ফসলের উৎপাদন বাড়াতে হলে অধিক ফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও তার চাষ সম্প্রসারণ, উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদের ওপর জোর দিতে হবে।
শাকসবজি চাষ
উপকূলীয় অঞ্চল সম্পর্কে এতদিন অনেকেরই ধারণা ছিল ওইখানে ভালো শাকসবজি হয় না। কিন্তু বর্তমানে এ ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে অনেক জমির পাশে এখন ট্রাকে করে শাকসবজি দেশের অন্যত্র যাচ্ছে। গ্রীষ্মকালটাই এখানে শাকসবজি চাষের সম্ভাবনাময় মৌসুম। এ মৌসুমে সেখানে কুমড়াগোত্রীয় সবজিই বেশি চাষ করা হয়। এর মধ্যে চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, শসা, করলা, ঢেঁড়শ, বরবটি, অমৌসুমের লাউ, পুঁইশাক অন্যতম। বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে প্রায় ২৫,৩০০ হেক্টর জমিতে ৩,২১৮৫০ মেট্রিক টন শাকসবজি উৎপাদিত হচ্ছে। নানা কৌশলে এ চাষ এলাকা ৮৬,৫০০ হেক্টরে বাড়ানো যায়। আর তা করতে পারলে ওখান থেকে গ্রীষ্মকালেই প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন শাকসবজি উৎপাদিত হবে। তবে এই অঞ্চল শীতকালে শাকসবজি উৎপাদনের জন্য খুব উপযুক্ত না। সেচ সংকট ও লবণাক্ততাসহ নানা প্রতিকূলতা রয়েছে এ মৌসুমে। তথাপি বর্তমানে এ অঞ্চলে শীতকালে প্রায় ২৬,০০০ হেক্টর জমিতে ৫ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন শাকসবজি উৎপাদিত হচ্ছে। শীতকালেও সবজি চাষের জমি ৮০,০০০ হেক্টরে উন্নীত করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে উপযুক্ত সবজি নির্বাচন, লবণাক্ততা সহনশীল জাত উদ্ভাবন, বেশি করে জৈব সারের ব্যবহার, সেচ ব্যস্থাপনার উন্নয়ন, কৃষক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত হাইব্রিড বীজের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, ভ্যালু চেইন ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এসব করতে পারলে শীতকালেও এ অঞ্চলে প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন শাকসবজি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলে বর্তমানে ব্যাপকভাবে হাইব্রিড জাতের সবজি বীজের ব্যবহার বেড়ে