কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

প্রশ্নোত্তর (আষাঢ়-১৪২৫)

আবদুর রশিদ, গ্রাম: দক্ষিণ মামগ্রাম, উপজেলা: বাগমারা, জেলা: রাজশাহী
প্রশ্ন: বেগুন গাছের গোড়া পচে যাচ্ছে এবং গাছ মারা যাচ্ছে। এ অবস্থায় কি করণীয়?  

উত্তর: স্কেলোরোসিয়াম রফসি নামক ছত্রাকের আক্রমণ হলে বেগুন গাছে এ ধরনের রোগ হয়ে থাকে। বেগুন গাছের যে কোন বয়সে এ রোগটি হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আক্রান্ত গাছ দেখা গেলে সাথে সাথে উঠিয়ে দূরবর্তী স্থানে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা দরকার। আর অন্য বেগুন গাছগুলোতে মেনকোজেব ও কার্বেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম সঠিক নিয়মে মিশিয়ে আক্রান্ত বেগুন গাছে স্প্রে করলে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

 

মো. মামুন, গ্রাম: দিয়ানা, উপজেলা: গোমস্তাপুর, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রশ্ন: মিষ্টিকুমড়ার পাতার সবুজ অংশ পোকায় খেয়ে ফেলছে। কি করলে প্রতিকার পাবো?

উত্তর: এ ধরনের সমস্যা কাটালে পোকা বা এপিল্যাকনা বিটল এর আক্রমণে হয়ে থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় হাত দিয়ে কীড়া ও ডিম সংগ্রহ করে ধ্বংস করা যেতে পারে। আক্রমণ অধিক হলে ম্যালাথিয়ন গ্রুপের ২ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে এ পোকা দমন করা যায়।

 

মো. মাহবুব উল্লাহ, গ্রাম: বাকতা, উপজেলা: ফুলবাড়িয়া, জেলা: ময়মনসিংহ
প্রশ্ন: নারকেলে এক ধরনের পোকার আক্রমণে নারকেলের খোসাতে বেশ শক্ত দাগ এবং ফাটাফাটা দাগ দেখা যায়। কি করণীয়?

উত্তর: এ সমস্যাটি মাকড়ের আক্রমণে হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে নারকেল বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি গাছে সুষম সার প্রয়োগ করা দরকার। এসবের পাশাপাশি এবামেকটিন গ্রুপের ১.২৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করলে এ ধরনের মাকড়ের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।

 

মো. রবিন, গ্রাম: পীড়ানচর, উপজেলা: শিবগঞ্জ, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রশ্ন:  পটল গাছে এক ধরনের পোকার আক্রমণের কারণে পটলে ছিদ্র দেখা যাচ্ছে। আবার পটল পচেও ঝরে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কি করবো?

উত্তর: জমিতে পড়ে থাকা পচা পটলগুলো সংগ্রহ করে দূরে সরিয়ে ফেলার পাশাপাশি জমিকে পরিষ্কার রাখতে হবে। ক্ষেতের মাঝে ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করা যেতে পারে। সেজন্য প্রতি ২.৫ শতক জমিতে ১টি করে ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করতে হবে। এছাড়া ডেল্টামেথ্রিন গ্রপের যে কোন কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১মিলি মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে সুফল পাবেন।

 

নূরন্নবী হাওলাদার, গ্রাম: পদ্মনগর, উপজেলা: কুষ্টিয়া সদর, জেলা: কুষ্টিয়া
প্রশ্ন: লেবু গাছের পাতা সাদা হয়ে যাচ্ছে। পাতায় আঁকাবাকা গর্তের মতো দাগ দেখা যায়। কি করবো?

উত্তর: লেবু গাছে লিফ মাইনার নামক পোকার আক্রমণে এ ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। অল্প পরিমাণ পাতা আক্রান্ত হলে পাতাগুলো ছাঁটাই করে দূরবর্তী জায়গায় মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। এ পোকার আক্রমণ শরৎকাল ও গ্রীষ্মকালে বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া ইমডাক্লোরপ্রিড গ্রুপের ০.২৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১৫ দিন পর পর লেবু গাছের কচি পাতায় ৩-৪ বার স্প্রে করলে এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।   

 

শারমিন, গ্রাম: মৌতলা, উপজেলা: কালিগঞ্জ, জেলা: সাতক্ষীরা
প্রশ্ন: কামরাঙ্গা গাছের বাকল ও ডালে ছিদ্র দেখা যাচ্ছে এবং ছিদ্র থেকে ডালের গায়ে ঝুলে থাকা কাঠের গুড়া মতো দেখা যাচ্ছে। করণীয় কি?  

উত্তর: এ সমস্যা মোকাবেলায় ডালে ঝুলে থাকা গুড়া মিশ্রিত মল পরিষ্কার করতে হবে। গর্তের মধ্যে কেরোসিন বা ন্যাপথেলিন দিয়ে ছিদ্রের মুখ বন্ধ করতে হবে। আর পোকায় খাওয়া বাকল চেছে কপারজাতীয় ছত্রাকনাশকের প্রলেপ দিতে হবে। এছাড়া কার্বোসালফানজাতীয় কীটনাশক ১০-১২ দিন পরপর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে। তবেই উপকার পাবেন।

 

রহিম শেখ, গ্রাম: কেরাদারি, উপজেলা: রাজারহাট, জেলা: কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন: পানিকচুর পাতায় কালো ও হলুদ দাগ পড়ছে এবং কচুর কা- পচে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কি করবো?

উত্তর: ফাইটোফথোরা কলোকোসিয়া নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। এ রোগ দমনের জন্য রোগমুক্ত এলাকা থেকে সুস্থ বীজ সংগ্রহ করতে হবে। জমিতে রোগ দেখা গেলে  ফেনামিডন ও মেনকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে। এসবের সাথে সাথে ফসল সংগ্রহরে জমিতে পড়ে থাকা কচুর কা- ও পাতা ধ্বংস করে ফেলতে হবে।  আর উল্লিখিত ছত্রাকনাশক ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করলে এ রোগ দমন করা যায়।    

 

আখতারুজ্জামান রুবেল, গ্রাম: লখাইডাঙ্গা, উপজেলা: মনিরামপুর, জেলা: যশোর
প্রশ্ন: মাছের ছত্রাকজনিত রোগের ক্ষেত্রে কি করণীয়?  

উত্তর: রুইজাতীয় ও অন্যান্য চাষযোগ্য মাছে এবং মাছের ডিম আক্রান্ত হয়। ছত্রাকজনিত রোগের লক্ষণগুলো হলো-পুচ্ছ পাখনা, ময়লাবর্ণ তুলার ন্যায় ছত্রাক দেখা যায়। চামড়ায়, মাছের ডিম আক্রান্ত হয়ে সাদাটে হয়ে যায়। পানির ¯্রােত যখন স্থির হয় কিংবা বদ্ধ জলায় অথবা হ্যাচারি ট্যাংকে যেখানে অনিষিক্ত ডিমের ব্যাপক সমাগম ঘটে সেখানে ছত্রাক রোগ দ্রুত ছড়ায়। এছাড়া প্রাকৃতিক জলাশয়ের প্রায় শতকরা ৯৮ ভাগ ডিম এ রোগ দ্বারা আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সমস্যা রোধে-হ্যাচারির প্রতিটি যন্ত্রপাতি ও ট্যাংক সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার করার পর শতকরা ১০ ভাগ ফরমালিন পানি দিয়ে ধৌত করতে হবে। অনিষিক্ত ও মৃত ডিমগুলোকে দ্রুত হ্যাচারি থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। হ্যাচারিতে অধিক খাদ্য প্রয়োগ না করা। এসবের পাশাপাশি হ্যাচারিতে পালনকৃত ডিমগুলো ২৫০ পিপিএম ফরমালিন দিয়ে ধৌত করা। খাঁচা ও পেনে চাষকৃত আক্রান্ত মাছগুলোকে শতকরা ৩-৫ ভাগ ফরমালিন দিয়ে ২-৩ মিনিটের মতো গোসল করানো। আর বিকল্প হিসেবে শতকরা ৫ ভাগ লবণ পানিতে আক্রান্ত মাছগুলোকে গোসল করানো।

 

মো. মকবুল হোসেন, গ্রাম: যাদপপুর, উপজেলা: আলমডাঙ্গা, জেলা: চুয়াডাঙ্গা
প্রশ্ন: মাছের আইশ উঠে যাচ্ছে কি করবো?

উত্তর: এ সমস্যাটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। এ রোগের লক্ষণগুলো হচ্ছে- মাছের আইশের গোড়ায় রস জমে আইশ ঢিলা হয়ে যায়। চামড়া উজ্জ্বলতা হারায় এবং মাছ অলসভাবে চলাফেরা করে। এ সমস্যার প্রতিকারে-চুন বা ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পুকুর শোধন করতে হবে। এক কেজি ওজনের মাছে ১০ মিলিগ্রাম হারে সপ্তাহে ২ বার ক্লোরোমাইসন ইনজেকশন দিতে হবে। আর ১ লিটার পানিতে ২০ মিলিগ্রাম ক্লোরোমাইসন মিশিয়ে প্রতি ৪ দিন পর পর ২৪ ঘণ্টা মাছকে রাখতে হবে। তবেই মাছের ব্যাকটেরিয়াজনিত এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।   

 

আবদুল্লাহ সরকার, গ্রাম: সারানপুর, উপজেলা:  গোদাগাড়ী, জেলা: রাজশাহী
প্রশ্ন: বাছুরের বয়স ২৫ দিন। দুর্গন্ধযুক্ত ও সাদা পাতালা পায়খানা হচ্ছে। এ অবস্থায় আমি কি করবো? পরামর্শ চাই।

উত্তর: বাছুরের সাদা উদরাময় রোগ হয়েছে। বাছুরকে সালফাডিন এস ভেট অথবা কট্টিম ভেট বোলাস খাওয়াতে হবে। এর সাথে ইলেকট্রোমিন অথবা রেনালাইট পাউডার খাওয়াতে হবে। এছাড়া বাছুরের খাবার পাত্র, পানির পাত্র প্রতিবার ব্যবহারের পর পরিষ্কার করতে হবে।  তাহলে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।

 

নূরে আলম তালুকদার, গ্রাম: ব্রাহ্মণগাঁ, উপজেলা:  গৌরনদী, জেলা: বরিশাল

প্রশ্ন: আমার ব্রয়লার মুরগি আছে ৫০০টি। হঠাৎ করে স্ট্রোক করে মারা যাচ্ছে। এর সমাধান কি?
উত্তর:  শেডে ফ্যান দিতে হবে। টিনের উপর বস্তা বা চট দিয়ে ঢেকে দিতে হবে এবং ১ ঘণ্টা পর পর পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। পানির সাথে সিভিট ভেট ও ইলেকট্রোমিন পাউডার দিতে হবে। এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে আপনি উপকার পাবেন।
কৃষির যে কোন প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে  কোন জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ এ নাম্বারে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত যে কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে। তাছাড়া কৃষিকথার গ্রাহক হতে বার্ষিক ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকা মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ এ ঠিকানায় পাঠিয়ে ১ বছরের জন্য গ্রাহক হতে পারেন। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিকে কৃষিকথা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।

 

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন*

*উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫ : taufiquedae25@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
ছাদ বাগানে ফল চাষ

ছাদে বাগান সৃষ্টি করে তা থেকে সুফল আহরণ করার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিরাপদ ফল সবজি প্রাপ্তি সুবিধা নিশ্চিত করণে অনেকেই ছাদে বাগান তৈরি অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। বয়স্ক নর-নারী অবসর বিনোদনের প্রয়োজনে ছাদ বাগান সৃষ্টিতে অনেকে আগ্রহী হয়। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ছাদ বাগান করে গাছপালার সংস্পর্শে এসে বিচিত্র আনন্দের স্বাদ গ্রহণ করে। অনেক বৃক্ষ প্রেমিক পরিকল্পিতভাবে নিজ হাতে ছাদে বাগান করে সৃষ্টির আনন্দ ও গাছপালার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন। একটা সুন্দর ছাদ বাগান দিতে পারে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সারা বছর ধরে পরিবারের চাহিদামতো নিরাপদ ফল-সবজি।


ছাদের আকার ও অবস্থান : ছাদের আকার ছোট, মাঝারি বা বড় হতে পারে। এ আকার বিবেচনায় ছাদের কোন অংশে, কি কি, কত সংখ্যক বিভিন্ন ফল, সবজি, মসলা ও ঔষধি গাছ চাষ করা যাবে তা শুরুতেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নির্ধারিত ছাদ কত তলা বিশিষ্ট, আশপাশে কত তলা বিশিষ্ট বিল্ডিং বা বড় আকারের গাছপালা আছে, সারা দিনে সেখানে আলো-বাতাস বা রোদ পাওয়ার সুবিধা বিবেচনায় বাগান সৃষ্টি করতে হয়। ছাদের অবস্থান অতি উঁচু হলে ঝড়-বাতাসের প্রভাব বেশি পড়ে। এজন্য বেশি লম্বা আকারের ফল গাছ ছাদে রোপণ করা ঠিক হবে না। এমন অবস্থানে গাছ হেলে পড়া, ডাল ভেঙে যাওয়া, ফল ঝরে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এজন্য এক্ষেত্রে গাছকে ছেঁটে রেখে বেশি ওপরের দিকে বাড়তে না দেয়া ভালো।


এছাড়া যেসব গাছ কম উচ্চতা বিশিষ্ট ও পাশের্^ বেশি বাড়ে তা দিয়ে ছাদ বাগান সাজানো প্রাধান্য দেয়া উচিত। একই কারণে কলা, পেঁপে এ ধরনের লম্বা আকারের গাছ অতি উঁচু ছাদে রোপণ না করাই উত্তম। ছাদে রোদের তাপ বা প্রচ-তা সরেজমিনের তুলনায় বেশি। সরাসরি রোদ পড়া এবং তার প্রতিবিম্ব প্রতিফলনের কারণে এমনটা হয়। এ জন্য ছাদ বাগান সৃষ্টিতে ৫০-৭০% রোদ প্রতিরোধী ঘন নেট ৭-৮ ফুট ওপরে ফিট করে ছাদের গাছের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা যেতে পারে।


ছাদে বাগান স্থাপন উপযোগী করা : প্রথমে অনেকেই ছোট বড় নানা প্রকার টবে গাছ লাগিয়ে ছাদ বাগান শুরু করে। তবে এ ব্যবস্থায় খুব একটা সফলতা আনা সম্ভব হয় না। এ জন্য ছাদে রোপিত গাছের শিকড় যেন বেশি ছড়াতে পারে এবং বেশি সংখ্যক গাছ রোপণ করা যায় অথচ ছাদের কোনো ক্ষতি হয় না এ ব্যবস্থা শুরুতেই নেয়া দরকার।


বক্স তৈরি করা : বেশির ভাগ ছাদ বাগানি ছাদের কিনারগুলো ২-৩ ফুট চওড়া ও ২-৩ ফুট উঁচু করে বক্স তৈরি করে নিয়ে সেগুলো পটিং মিডিয়া দিয়ে ভরাট করে তাতে গাছ রোপণ করে থাকে। অনেকে নিচে ৮-১২ ইঞ্চি ফাঁক রেখে ঢালাই করে নিয়ে মজবুত করে এ বক্স বানিয়ে নেয়। কেউবা বক্সের নিচের অংশ ২-৩ ইঞ্চি উঁচু করে এ অংশ ঢালাই করে তার ওপর সরাসরি ইটের পাতলা গাঁথনি দিয়ে কম খরচে অনুরূপ লম্বা বক্স বানিয়ে নেয়। বিকল্প ব্যবস্থায় টিনের/প্লাস্টিকের স্টাকচার তৈরি করে অথবা জাহাজ ভাঙা বাথটবের আকারের পাত্র সংগ্রহ করে তা বক্স/টবের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে।


পটিং মিডিয়া দিয়ে বক্স/টব ভরাট করা : সাধারণত নার্সারি থেকে গোবর মেশানো ভিটে মাটি সংগ্রহ করে তা গাছ রোপণের কাজে ব্যবহার করা হয়। যেহেতু ফসলি জমির মতো ছাদ বাগানে লাগানো গাছের শিকড় ছড়ানোর সুযোগ কম, এ জন্য ভালো মানের পটিং মিডিয়া দিয়ে এবং এ নিচের অংশে পানি নিষ্কাশন ও সহজভাবে গাছের শিকড় ছড়ানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বক্সের বিভিন্ন স্তর যেভাবে উপযোগী করা যেতে পারে তা নি¤œরূপ :
ক. তলার প্রথম অংশ : তৃতীয় গ্রেডের ইটের কম দামি ছোট আকারের খোয়া/টুকরা দিয়ে ৩-৪ ইঞ্চি ভরাট করা;


খ. তার ওপরের স্তরে ২-৩ ইঞ্চি পুরু করে কাঠ কয়লা দিয়ে এ দ্বিতীয় স্তর ভরাট করা;
গ. ৩য় স্তর ২-৩ ইঞ্চি পুরু করে নারিকেলের ছোবড়ার টুকরা অথবা নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে সাজানো;
ঘ. ৪র্থ স্তর ২-৩ ইঞ্চি পুরু মোটা বালু (সিলেট স্যান্ড) বা ক্ষুদ্র পাথর কুচি/ইটের চিপস দিয়ে ভরাট করা;

 

ঙ. শেষের বা ওপরের অংশ ২-২.৫ ফুট ভালো মানের পটিং মিডিয়া দিয়ে ভরাট করা হলে ছাদ বাগানের গাছের জন্য বেশি উপযোগী হবে।


পটিং মিডিয়া তৈরির পদ্ধতি : বিদেশে প্রধানত পিটমস, পিটসয়েল ও জৈব পদার্থ (কম্পোস্ট) দিয়ে তৈরি রেডিমেড পটিং মিডিয়া বিভিন্ন স্থানীয় নার্সারিতে পাওয়া যায়। এমন কি কোন ধরনের গাছ রোপণ করা হবে তার জন্য ভিন্নতর মিডিয়া পাওয়া যায়। ভালো মানের মিডিয়া তৈরিতে এ দেশে যা পাওয়া যায় তার একটা আনুপাতিক হার নিম্নে দেয়া হলো :


ক. কোকোডাস্ট বা নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া - ২৫%
খ. মোটা বালু (সিলেট স্যান্ড)                   - ১০%
গ. ভিটে মাটি (যা নার্সারিতে পাওয়া যায়)    - ২৫%
ঘ. আর্বজনা পচা/পচা গোবর                   - ৩০%
ঙ. তৃতীয় গ্রেডের ইটের ক্ষুদ্র চিপস/খোয়া    - ১০%

 

এগুলো ভালোভাবে মিশিয়ে বক্স/টবের অবশিষ্ট অংশ ভরাট করে তাতে গাছ লাগানো হলে গাছ দ্রুত বাড়বে, বেশি ফলন পাওয়া যাবে। মিডিয়ার সাথে কিছু পরিমাণ করাত কলের গুঁড়া, ভার্মি কম্পোস্ট অথবা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত কম্পোস্ট ব্যবহার করা এবং তার সাথে কিছু হাড়ের গুঁড়া ও খৈল মেশানো ভালো।


ছাদে গাছ রোপণ : ছাদে বাগান তৈরিতে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে উন্নত জাতের সুস্থ-সবল চারা/কলম সংগ্রহের গুরুত্ব অপরিসীম। এ বাগানে যেসব দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্য মেয়াদি ফল গাছ রোপণ করা হবে তা বারোমাসী জাতের হলে ভালো হয়। অন্যথায় ৫-৬ মাস একাধারে ফল পাওয়া যায় এমন জাতের গাছ রোপণ করা উচিত। খুব কম সময় ধরে ফল পাওয়া যায় (লিচু) এমন গাছ ছাদের জন্য নির্বাচন করা ঠিক না। বাগানকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন তা সব সময় কোনো না কোনো গাছে ফুল ফল ধরা অবস্থা বিরাজ করে।


ছাদ বাগানের জন্য উপযোগী ফল গাছের মধ্যে : আম, বিদেশি কাঁঠাল (আঠা, ভোতাবিহীন রঙ্গিন জাত যা রোপণের দুই বছর পর ফল দেয়), পেয়ারা, বারোমাসী লেবু (কাগজি, সিডলেস, এলাচি), মাল্টা, কমলা, থাই বাতাবি, কুল (টক ও মিষ্টি), ডালিম, শরিফা, সফেদা, আমলকী, বারোমাসী আমড়া, জামরুল, অরবরই, বিলিম্বি, করমচা, ড্রাগন অন্যতম।


শাকসবজির : বেগুন, টমেটো, ঢেঁড়স, চুকুর, ক্যাপসিকাম, শিম, বরবটি, শসা, করলা, লাউ, ধুন্দল, বারোমাসী সজিনা, লালশাক, ডাঁটাশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক, ব্রোকলি, মুলা।


মসলা জাতীয় : মরিচ, ধনেপাতা, বিলাতি ধনিয়া, পুদিনা, কারিপাতা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, গোলমরিচ, পাম।


ঔষধিগুণ বিশিষ্ট : অ্যালোভেরা, তুলসী, থানকুনি, চিরতা, স্টিভিয়া, গাইনোরা।


ফুল জাতীয় : গোলাপ, বেলী, টগর, জুঁই, গন্ধরাজ, জবা, টিকোমা, জারবেরা, শিউলি, এলামন্ডা, বগুনভিলা ও বিভিন্ন মৌসুমি ফুল।
 

গাছের রোপণ ও পরিচর্যা : উন্নত কাঙিক্ষত জাতের কলম করা গাছ রোপণ করে গাছে কাঠি বা খুঁটি দিয়ে সোজা করে রাখতে হবে। তাতে গাছ হেলে পড়া বা নড়ে গিয়ে দুর্বল হওয়া রোধ হবে। প্রয়োজনে গাছের অপ্রয়োজনীয় কিছু ডাল বিশেষ করে ওপরের দিকে বেশি বাড়ন্ত ডাল কমিয়ে গাছকে বেশি উঁচু না করে পাশে বাড়তে সহায়তা দিতে হবে। গাছের আকার বেশি ছোট হলে অপেক্ষাকৃত ছোট টবে বা সিমেন্টের পরিত্যক্ত তৈরি ব্যাগে কিছু সময় সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে বড় হলে তা পর্যায়ক্রমে বক্স/বড় টবে রোপণ করা ভালো। টবে সংরক্ষিত গাছ সরাসরি ছাদে না রেখে নিচে এক সারি ইটের ওপর বসানো দরকার। তাতে টবের অতিরিক্ত পানি সহজে বের হবে, ছাদের জন্য ভালো হবে। ড্রামে সংরক্ষিত গাছে রোদের তাপে বেশি গরম হয়। এজন্য চট/ছালা দিয়ে ড্রামের চারধার ঢেকে দিলে তা অনেকটা রোধ হবে। গাছে পানি সেচ দেয়ার ফলে উপরিভাগের মাটি শক্ত হয়ে চট ধরে। মাঝে মাঝে নিড়ানি দিয়ে ওপরের স্তর ভেঙে দেয়া হলে তা রোধ হবে। এ ব্যবস্থায় আগাছা দমন করা যাবে ও ভেতরে বায়ু চলাচল সুবিধা হবে। খরা মৌসুমে দীর্ঘমেয়াদি বড় গাছের গোড়ার চার ধারে শুকনা কচুরিপানা বা খড়কুটা, শুকনো পাতা দিয়ে মালচিং দেয়া হলে রস সংরক্ষিত থাকবে, ঘাস গজানো রোধ হবে এবং পরে এগুলো পচে খাদ্য হিসেবে কাজে লাগবে।


গাছের অবস্থান নির্ণয় : কোন কোন গাছ বেশি রোদ পছন্দ করে (কাগজি লেবু, ড্রাগন ফল) কোন গাছ আধা ছায়ায় ভালো হয় (এলাচি লেবু, জামরুল), আবার কোনো গাছ ছায়া পছন্দ করে (লটকন, রামবুটান)। এজন্য ছাদ বাগান থেকে বেশি সুফল পেতে ছাদে রোদের/আলো-বাতাস প্রাপ্তি অবস্থা বুঝে গাছের অবস্থান চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।


পানি সেচ : অতিরিক্ত পানি দেয়া এবং অতি কম দেয়া উভয়ই গাছের জন্য ক্ষতিকর। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বেশি পানি দেয়ার ফলে বিভিন্ন রোগে গাছ আক্রান্ত হয়, এমনকি মারা যায়। এ জন্য গাছের গোড়া শুকালেই কেবল পানি দেয়া যাবে, গোড়া ভেজা থাকলে কোনো মতেই তাতে পানি দেয়া যাবে না। কিছু গাছ বেশি পানি গ্রহণ করে (ড্রাগন, নারিকেল) অনেক গাছে পানি কম লাগে (শিম, মরিচ, বেগুন)। বৃষ্টি বা নালায় জমে থাকা পানি গাছ বেশি পছন্দ করে, বিশুদ্ধ পানি নহে। তবে সকাল বেলা গাছে পানি সেচ দেয়া উত্তম।


পোকা ও মাকড় দমন : প্রাথমিক অবস্থায় শুরুতে সীমিত সংখ্যক পোকা বা তার ডিমের গুচ্ছ দেখা যায়। নিয়মিত ছাদ বাগান পরীক্ষা করে দেখা মাত্র পোকা বা পোকার ডিমগুলো সংগ্রহ করে মেরে ফেলা ভালো। পাতার নিচে ভাগে পোকামাকড় অবস্থান করে। অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক পাতায় পোকামাকড় বেশি দিন আশ্রয় নেয়। এ জন্য পাতা হলুদ হওয়া মাত্র পাতার বোটা রেখে তা ছেঁটে দিতে হয়। অতি ঝাল ২-৩ গ্রাম মরিচের গুড়া এক লিটার পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরের দিন ছেঁকে নিয়ে তাতে ২ গ্রাম ডিটারজেন্ট পাউডার ও এক চা চামচ পিয়াজের রস একত্রে মিশিয়ে ৮-১০ দিনের ব্যবধানে স্প্রে করলে জৈব পদ্ধতি অবলম্বনে গাছকে পোকার হাত থেকে নিরাপদ রাখা যায়। মাইট বা ক্ষুদ্র মাকড় খালি চোখে দেখা যায় না। লিচু, মরিচ, বেগুন, গাঁদা ফুলে মাইটের উপদ্রব বেশি দেখা যায়। মরিচের গুড়া পদ্ধতিতেও এ মাকড় দমন করা যায়। যেহেতু পোকামাকড়ের অবস্থান পাতার নিচে এ জন্য এ অংশ ভালোভাবে স্প্রে করে পোকা দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কীটনাশক ব্যবহার কালে খেয়াল রাখতে হবে যেন তার টকসিসিটি কম সময় থাকে (ডেকামেথ্রিন দলীয় হতে পারে তবে ইমিডাক্লোরোপ্রিড দলীয় নয়)।


সার প্রয়োগ : মাছ, মাংস ও তরকারি ধোয়া পানি গাছে ব্যবহার করলে গাছের খাবারের অভাব কিছুটা পূরণ হয়। এছাড়াও মিশ্র সার, হাড়ের গুড়া মাঝে মাঝে এবং অনুখাদ্য (দস্তা, বোরন, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ) বছরে একবার প্রয়োগ করা ভালো। মাছের কাঁটা, হাড়ের টুকরা, ডিমের খোসা, তরিতরকারির পরিত্যক্ত অংশ, পাতা, একটা ড্রামে পঁচিয়ে নিয়ে ছাদ বাগানে ব্যবহার করা ভালো। কয়েক বছরের বয়স্ক গাছের গোড়ার চারধারে সাবধানে কিছু মাটি উঠিয়ে ফেলে নতুন ভাবে পটিং মিডিয়া দিয়ে ভরাট করা হলে গাছের স্বাস্থ্য ফেরানো সহজ হয়। সম্ভব হলে গাছকে ছাঁটাই করে কিছু মাটিসহ উঠিয়ে নিয়ে সার মিশ্রিত মাটি পরিবর্তন করার ব্যবস্থা নেয়া যায়। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ছাড়া আগানো উচিত হবে না। জেনে শুনে তা করা যেতে পারে। অপেক্ষাকৃত ছোট টব থেকে বড় টবে গাছ অপসারণ করার মাধ্যমে গাছকে স্বাস্থ্যবান করা যায়। যারা ছাদ বাগানে অভিজ্ঞ তাদের বাগান পরিদর্শন করে ও সফলতার দিকগুলো জেনে বা দেখে শিখে তা নিজ বাগানে প্রয়োগ করা উত্তম। ফুল-ফল ঝরা রোধে ও ফল ধরা বাড়াতে নানা প্রকার অনুখাদ্য/হরমোন (সিলভামিক্স, লিটোসেন, ফ্লোরা প্রয়োগ করে অনেকে সুফল আহরণ করে থাকে।


একটা সুন্দর ছাদ বাগান দিতে পারে পরিবারের সুস্থ পরিবেশ ও নিরাপদ চাহিদামতো প্রতিদিনের তাজা খাবার। এক তথ্য মতে যাদের ছাদ বাগান আছে তাদের পরিবারে শান্তি, যাদের নেই তাদের তুলনায় বেশি। আসুন আমরা যার যতটুকু সুবিধা আছে তথায় ভালোবাসার পরশে পরিচর্যায় প্রতি ছাদ বাগানকে সুন্দর সফলভাবে গড়ে তুলি ও তা থেকে নির্মল সুফল আহরণ করি।

 

এম. এনামুল হক

সাবেক মহাপরিচালক, ডিএই এবং সদস্য বিশেষজ্ঞ পুল (APA), কৃষি মন্ত্রণালয়, মোবাইল নং-০১৯১৭০৫৫২০৫

বিস্তারিত
পুষ্টি চাহিদা পূরণে বাংলাদেশে অপ্রচলিত ফল

খাদ্য গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হলো সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম হয়ে বেঁচে থাকা। যে কোনো খাবার খেয়ে পেট ভরানো যায়, কিন্তু তাতে দেহের চাহিদা মিটিয়ে সুস্থ থাকা যায় না। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ঘাটতি পূরণ হলেও পুষ্টি সমস্যা অনেক বড় আকারে বিরাজিত রয়েছে। ফলে এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ পুষ্টিহীনতার কারণে নানা ধরনের রোগের শিকার হয়ে অহরহ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মা ও শিশুরাই এর শিকার বেশি। পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম। অধিকাংশ ফলই সুস্বাদু, পুষ্টিকর, মুখরোচক এবং তৃপ্তিদায়ক। অতি জরুরি খাবারের অভাব কেবল দানাদার খাদ্য দিয়ে পূরণ হয় না। পুষ্টিকর খাবারের ওপর নির্ভরও করছে আমাদের জীবনের অস্তিত্ব, কর্মক্ষমতা, মেধাবৃদ্ধি, উন্নতি ও সমৃদ্ধি। পুষ্টি সচেতনতা ও জ্ঞানের অভাবে সুষম খাদ্য গ্রহণের প্রতি আমরা মোটেও সজাগ নই। ফলে যারা পেট ভরে দুইবেলা খেতে পায় না তারাই যে শুধু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে তা নয়; সে সঙ্গে ধনীরাও অপুষ্টির শিকার থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে না।


ফল বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ও উপকারী উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল। রঙ, গন্ধ, স্বাদ ও পুষ্টির বিবেচনায় আমাদের দেশীয় ফলসমূহ খুবই অর্থবহ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। ফলে সব ধরনের খাদ্যোপাদানই পাওয়া যায়। মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থেরও অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে দেশীয় ফল। বিভিন্ন ধরনের খাবারের মধ্যে ভিটামিন ও মিনারেলকে রোগ প্রতিরোধ খাদ্য উপাদান হিসেবে ধরা হয়। এ ধরনের পুষ্টি উপাদান তথা হরেক রকম ফল ভক্ষণে রোগ প্রতিরোধ ছাড়াও হজম, পরিপাক, বিপাক, রুচি, বৃদ্ধি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফল আমরা কাঁচা বা পাকা অবস্থায় সরাসরি খেয়ে থাকি। ফল রান্না ব্যতীত সরাসরি খাওয়া সম্ভব বিধায় এতে বিদ্যমান সবটুকু পুষ্টি পাওয়া যায়। বিভিন্ন ফলে ক্যান্সার প্রতিরোধকারী উপাদান অ্যান্থোসায়ানিন, লাইকোপেন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপস্থিত থাকায় মরণনাশক রোগব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে।
সুষম খাদ্য বিবেচনায় এনে আমরা মূলত ৬ ধরনের খাবার প্রতিদিন আহার করে থাকি। এগুলো হলো (১) শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট (২) আমিষ বা প্রোটিন (৩)
স্নেহ বা তেল/চর্বি এবং (৪) ভিটামিনস (৫) খনিজ লবণ (মিনারেলস) ও পানি। ফলে সব ধরনের খাদ্যোপাদানই পাওয়া যায়। তবে ভিটামিন ও খনিজ লবণের পরিমাণ খুব বেশি। এ ছাড়া ফল থেকে পাওয়া স্বেতসার, প্রোটিন ও স্নেহ জাতীয় উপাদানগুলো সহজেই হজম করা যায়।


ফল বলতে আমরা নিষিক্ত ও পরিপক্ব ডিম্বককেই বুঝি। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কলা, আনারস, পেঁপে, নারকেল, লেবু ও কুল- এ ১০টি আমাদের দেশের প্রধান ও প্রচলিত ফল; এগুলোকে আমরা সবাই চিনি। কেননা, চোখের সামনে এদের প্রায় সব সময় দেখি, হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। এসব ফল দেশের প্রায় সব এলাকাতে জন্মে। এসব ফলকে তাই আমরা বলি প্রচলিত ফল। এসব ফলের বাইরেও অনেক ফল পাওয়া যায়। এসব ফলকে বলা হয় অপ্রচলিত বা স্বল্প পরিচিত ফল। অপ্রচলিত শব্দটির অর্থ হচ্ছে যার প্রচলন নেই অর্থাৎ এসব ফলের অস্তিত্ব আছে, খুঁজলে পাওয়া যায় কিন্তু যখন তখন চোখে পড়ে না, দেশের সব এলাকায় জন্মে না, গাছের দেখা মেলে খুব অল্প। চাহিদা কম, প্রাপ্যতা কম, এদের অনেকে বনে-জঙ্গলে নিতান্ত অনাদরে অবহেলায়  বেড়ে ওঠে। প্রগতির ধারায় কেউ এদেরকে পরিকল্পনায় আনে না। চাষাবাদ দূরে থাক-প্রয়োজনীয় খাবার কিংবা পানিও ভাগ্যে জোটে না। কোনো কোনোটার ঔষধিগুণ ও মানুষের জন্য উপকারী নিয়ামক, ধাতব ও অত্যন্ত প্রাণ রাসায়নিক দ্রব্যাদিতে সমৃদ্ধ হলেও মানুষের রসনাকে তৃপ্ত করতে পারছে না বলে এরা অপ্রচলিত।


আবার কিছু কিছু ফল আছে যেগুলোর স্বাদ অনেকের কাছে ভালো লাগে আবার অনেকের কাছে ভালো লাগে নাÑ যেমন ডেউয়া। কলা বা আমের মতো সর্বজনীন আবেদন নিয়ে টেবিলে আসতে পারছে না বলে এরা অচ্ছুত হয়ে পড়েছে। তাই এরা অপ্রচলিত।


প্রাপ্যতার নিরিখে বিচার করেও কিন্তু ফলের প্রচলনের সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়। যদি যথেষ্ট পাওয়া যেত, তা হলে মানুষ হয়তো খেতেও পারত প্রচুর আর তখনই কোন একটা ফল তার অপ্রচলিয়তার গ্ল­ানি মুছে ফেলে প্রচলিত ফলের কোঠায় উঠে এসে কৌলিন্য লাভে সক্ষম হতো। এমনটা হয়েছে কুলে ও পেয়ারার ক্ষেত্রে। এ ফলগুলো ১০ বছর আগেও ব্যাপক হারে আবাদ হতো না। কিন্তু নিকট অতীতে, ভালো কিছু জাত এসেছে বলে (যেমন আপেল কুল, বাউকুল, কাজী পেয়ারা, বাউ-৫ পেয়ারা, থাই পেয়ারা ইত্যাদি। এগুলো কৌলিন্যের বিভা পেতে শুরু করেছে। এখন এদের পরিকল্পিত চাষ হচ্ছে। বাগান হচ্ছে, যত্ন আত্তি করা হচ্ছে-অধিক পরিমাণে বাজারে আসছে, বড় বড় মানুষের রসনা তৃপ্ত করতে সক্ষম  হচ্ছে। আর অপ্রচলিত থেকে প্রচলিত হওয়ার পথ পেয়েছে। লটকন এ ধরনের ফলের একটি উদাহরণ। চালতা, করমচা, লুকলুকি, ফলসা ও তেঁতুলের মতো ফলগুলো কিন্তু সবারই পরিচিত। কিন্তু টক বলেই বোধ হয় এদের চাহিদা বাড়ছে না, আর তাই অপ্রচলিত। এ ছাড়া আরো কিছু অপ্রচলিত ফল যেমন- টাকিটুকি, পানকি, চুনকি, লুকলুকি, উড়িআম, বৈঁচি, চামফল, নোয়াল, রক্তগোটা, মাখনা, আমঝুম, মুড়মুড়ি, তিনকরা, সাতকরা, তৈকর, আদা জামির, ডেফল, কাউফল, বনলেবু, চালতা ইত্যাদি।


অপ্রচলিত ফলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এসব ফল এক রকম বিনা যত্নেই এ দেশের মাটিতে ভালো জন্মে। সাধারণত এসব ফলের গাছে তেমন কোনো সার দেয়া হয় না। এ দেশের মাটি ও জলবায়ুতে খুব ভালোভাবে এসব ফলের গাছ মানিয়ে গেছে। ঝড়-বাতাস কিংবা বন্যা খরাতেও এ ফলের গাছকে মারতে পারে না। এই ফলের ব্যাপকভাবে খাপখাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা বা ওয়াইড অ্যাডাপ্টিবিলিটি, কিন্তু অনেক বিদেশি ফলেরই নেই। এ ফলের আর একটা সুবিধে হলো, বিদেশি ফলের বা উন্নত জাতের ফল গাছের মতো এসব ফল বা ফল গাছে অত বেশি রোগ-পোকারও আক্রমণ হয় না। তবে এ ফলে সবচেয়ে বেশি মেলে পুষ্টি। এ ফলের মতো এত বেশি পুষ্টি কখনো বিদেশি ফলে মেলে না। একটা ছোট্ট আমলকীতে যে পরিমাণ ভিটামিন সি আছে তা পাঁচটা বড় কমলাতে পাওয়া যাবে না। এমনকি কোনো কোনো অপ্রচলিত ফল ফলনের দিক দিয়ে প্রচলিত অনেক ফলের চেয়ে ভালো। ডেউয়া, কদবেল, আমলকী অনেকেই খেতে চায় না। কিন্তু এর মধ্যে যে পরিমাণ ভিটামিন সি আছে তা আপেল, কমলা বা আম, কাঁঠাল থেকে পাওয়া যাবে না। অপ্রচলিত ফলের অধিকাংশই সাধারণত টক স্বাদের। তাই এসব ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। আর এ ভিটামিনটি দেহে জমা রাখার কোনো নিয়ম নেই। তাই প্রতিদিনের ভিটামিন সি প্রতিদিনই কাঁচা ফল খেয়ে সংগ্রহ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে অপ্রচলিত ফল, এর যোগান বেশ ভালোভাবেই দিতে পারে। কাঁঠালের চেয়ে ডেউয়ার মধ্যে আমিষের সাথে মিলছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। অন্যান্য পুষ্টি তো আছেই। সেই সাথে আছে এসব ফলের বিভিন্ন রোগ সারানোর অদ্ভুত ক্ষমতা। আমলকী, হরীতকী, বহেড়ার মতো কবিরাজি ফল প্রচলিত কোন ফলের মধ্যে কি আছে? তাছাড়া আমাদের দেশে কলা, কুল, নারিকেল ছাড়া প্রায় সব ফলই জন্মে গ্রীষ্ম -বর্ষায়। কিন্তু  অপ্রচলিত অনেক ফল আছে যেগুলো অন্য মৌসুমেও জন্মে। তাই সারা বছর ধরেই বলতে গেলে ফল খাওয়ার একটা সুবিধে মেলে। শুধু পুষ্টি বা প্রাপ্যতার দিক দিয়ে নয়, এখন অনেক অপ্রচলিত ফলের দাম বিদেশি ফলের চেয়ে কম নয়। এজন্য একদিকে প্রধান ফলের চাষ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে এ কথা যেমন সত্য তেমনি আমাদের বৈচিত্র্যময় ফলের ভাণ্ডারকেও ধরে রাখতে হবে। এটাও লক্ষ রাখতে হবে, আজকের একটি অপ্রচলিত ফল আবার আগামী দিনের প্রচলিত ফল হিসেবে গণ্য হয়ে উঠতে পারে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য জনপ্রতি প্রতিদিন গড়ে ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন হলেও বর্তমানে এ দেশের মানুষ দৈনিক মাত্র ৭৬ গ্রাম ফল খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। প্রয়োজন ও প্রাপ্তির এ ব্যবধানের কারণ একদিকে যেমন সচেতনতার অভাব অন্যদিকে রয়েছে উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা। তাই খাদ্য পুষ্টি চাহিদা পূরণসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্বাদে, গন্ধে, পুষ্টিতে শ্রেয়তর আমাদের অপ্রচলিত ফলগুলোর উৎপাদন দেশব্যাপী সারা বছর যৌক্তিকভাবে এবং পরিকল্পিত উপায়ে বাড়িয়ে তুলতে হবে।


এজন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহকে বিবেচনা করা যেতে পারে-


অপ্রচলিত ফলের জার্মপ্ল­াজম সংগ্রহ, সংরক্ষণ, মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণ করা।
প্রচলিত চাষব্যবস্থা পরিবর্তন করে পরিকল্পনা মতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্দিষ্ট ফলের জন্য নির্দিষ্ট উৎপাদন এলাকা গড়ে তুলতে হবে। যেমন- বরিশালে আমড়া, সাতক্ষীরায় ক্ষীরনী, সিলেটে লেবু, বাগেরহাটে কাউফল ইত্যাদি। সেসব অঞ্চলেই এসব ফলভিত্তিক শিল্প কারখানা ও প্রক্রিয়াজতকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোর আধুনিকীরণ করতে হবে। অপ্রচলিত ফলের প্রতি গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

 

প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম* ড. মো: শামছুল আলম মিঠু**

*পরিচালক, বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বাকৃবি, ময়মনসিংহ, মোবাইল : ০১৭১১৮৫৪৪৭১; **ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্যান তত্ত্ব বিভাগ, বিনা, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭১১১২৪৭২২

বিস্তারিত
দেশীয় ফলের জাত উন্নয়ন ও গবেষণা

বাংলাদেশে হরেক রকম ফলের আবাদ করা হচ্ছে এখন। এর মধ্যে যেমন দেশীয় ফল রয়েছে তেমনি আবার বিদেশি ফলও রয়েছে। দেশীয় ফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফল হলো আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, কুল, পেয়ারা, বেল, জলপাই, তাল, লুকলুকি, আমলকী, জাম আর নানা রকম লেবু। আমাদের দেশে কলা আর পেয়ারা ছাড়া কোনো ফলই সারা বছর পাওয়া যায় না। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে এসব ফলের প্রাপ্তি। বিশেষ করে বৈশাখ থেকে বড় জোর শ্রাবণ মাস পর্যন্ত আমাদের এসব ফলের উৎপাদন হয়ে থাকে। যে কারণে প্রায় সারা বছরই বিদেশ থেকে প্রচুর ফল আমাদের আমদানি করতে হয়। এসব ফল আবার চড়া দামে কিনতে হয়। আমাদের দেশীয় ফলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করতে পারলে একদিকে যেমন উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে অন্যদিকে কেবল মৌসুমে নয় অমৌসুমেও এর কোনো কোনোটা আবাদ উপযোগী হতে পারে।


সত্যি কথা বলতে গেলে আমাদের ফল গবেষণা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বেশ কিছু ফলের জাত অবশ্য গত দশ বছরে অবমুক্ত করা হয়েছে যার বেশির ভাগই দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা উত্তম জাত। ফলের বিভিন্ন জাতের মধ্যে সঙ্করায়ন করা কিংবা ফলে মিউটেশন ঘটিয়ে নতুন জাত উদ্ভাবন করার ঘটনা এ দেশে বেশ বিরল। কেবলমাত্র আমের দু’চারটি জাত উদ্ভাবন ছাড়া অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে আমাদের জাত উন্নয়ন গবেষণা বড় দুর্বল।


ফল গবেষণার কিছু বাড়তি অসুবিধা রয়েছে। এক, ফল গাছ আধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘ দেহী হওয়ায় এদের মধ্যে সঙ্করায়ন করার কাজটি খানিকটা কঠিন। দুই, অধিকাংশ ফল গাছে ফল ধরতে সময় লাগে বলে ফলের জাত উদ্ভাবন করার জন্য সঙ্করায়ন পদ্ধতির দিকে গবেষকগণ কম আগ্রহী হন। আমাদের দেশে ফলের জাত উন্নয়ন গবেষণার আরো কিছু বাড়তি অসুবিধা রয়েছে। এক, ফল গবেষণার সাথে জড়িত গবেষকদের উদ্ভিদ প্রজনন ও আনুষঙ্গিক বিষয় সম্পর্কিত জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। দুই, যাদের এ বিষয়ক জ্ঞান বেশি রয়েছে পেশাগত প্রতিযোগিতার নেতিবাচক মনোভাবের কারণে তাদের এ বিষয়ক গবেষণা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সজাগ হলে এবং গোষ্ঠীগত পেশার চেয়ে জাতীয় উন্নয়নকে গুরুত্ব দিলে শেষোক্ত সমস্যা ঘটিয়ে ওঠা সম্ভব। আর তা পারলে ফল গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জনের দ্বারও উন্মোচিত হতে পারে। আম আমাদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফল ফসল। স্বাদে, গন্ধে, বর্ণে আমের বৈচিত্র্যও আমাদের কম নয়। তাছাড়া আমের নানান আকৃতি ও পাকার সময় কালেও বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে। এসব বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন আম জাতে বিদ্যমান উত্তম বৈশিষ্ট্য দেওয়া নেওয়া করার জন্য আমে সঙ্করায়ন করার পদ্ধতি ইতোমধ্যে আমাদের দেশে চালু হয়েছে। আম অঙ্গজ প্রজননক্ষম একটি ফসল বলে সঠিক দু’টি পেরেন্ট জাতের মধ্যে সঙ্করায়ন করে পাওয়া হাইব্রিড গাছের মধ্য থেকে উত্তম হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন খুব কঠিন কাজ নয়। আর একটি- দু’টি উত্তম হাইব্রিড জাত পেলে অঙ্গজ বংশ বিস্তার করে এর গুণাগুণ ধরে রাখা সম্ভব দিনের পর দিন।


হাইব্রিড আম যে উত্তম হতে পারে তার  প্রমাণ আম্রপালি, জাতটি। এটি ভারতে উদ্ভাবিত একটি হাইব্রিড আম। এই আম জাতটির আমাদের দেশেও বিস্তার ঘটানো হয়েছে। হাইব্রিড হলেও একেও পেরেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের একাধিক জাতের সাথে সঙ্করায়ন করে নেয়া যেতে পারে। অতঃপর তা থেকে সৃষ্ট ভিন্ন রকম আম গাছের মধ্য থেকে উত্তম গাছকে অঙ্গজ বংশ বিস্তার করে রক্ষা করা সম্ভব। আর এর মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে  উত্তম আম জাত। এভাবে পাওয়া সম্ভব নানা আকার আকৃতি, বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদের আম। কাঁঠাল নিয়ে আমাদের বহুমাত্রিক গবেষণার সুযোগ রয়েছে। কাঁঠালের বিভিন্ন জাতের মধ্যে গুণগত মানের দিক থেকে নানা রকম বৈচিত্র্য রয়েছে।  কাঁঠালের আকার আকৃতি, এর বর্ণ এবং দেহের কাঁটার আকার আকৃতি এদের তীক্ষèতায় বেশ পার্থক্য রয়েছে। কোয়ার আকার আকৃতি, এর পেলবতা, স্বাদ, গন্ধ, মিষ্টতার দিক থেকেও কাঁঠালে বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে।


এসব ছাড়া পরিপক্বতার দিক থেকে আগাম, মাঝারি ও নাবি বৈশিষ্ট্যের জন্যও এদের মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলে এই বিশাল বৈচিত্র্য থেকে মানুষের চাহিদামাফিক গুণগত মানসম্পন্ন কয়েক রকমের কাঁঠালের জাত বাছাই করে এর চাষ বৃদ্ধি করার দিকে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ ও প্রয়োজন দুটোই রয়েছে। এর জন্য উত্তম জাত বাছাই এবং এর বংশ বিস্তারের জন্য চারা উৎপাদন করার বিষয়ে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


কাঁঠালের টিস্যু কালচার করে চারা উৎপাদনকে আরো সহজতর করতে হবে। কাঁঠাল পর পরাগী ফসল। আশপাশের গাছের পরাগ রেণু উড়ে এসে ফুলের গর্ভমু-ে পতিত হয় বলে এর বীজ থেকে উৎপাদিত কাঁঠাল গাছের কাঁঠালের গুণাগুণ অক্ষত রাখা সম্ভব হয় না। সে কারণে টিস্যু কালচার থেকে কাঁঠালের চারা উৎপাদন সম্ভব হলেও এর উৎপাদন কৌশলকে আরো সহজতর করার গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।


পেয়ারারও বেশ কিছু বৈচিত্র্যময় জাত রয়েছে আমাদের। পেয়ারার আকার আকৃতি এর বহিরাবরণ, এর ভেতরকার বীজের পরিমাণ, এর পেলবতা, স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। আমাদের বাজারে দু-তিন রকম জাতের পেয়ারার আধিক্য রয়েছে। তবে দিন দিন বর্ণিল মাংসল পেয়ারা কেবল হ্রাস পাচ্ছে বললে ভুল হবে বরং বিলুপ্তির মুখে পড়েছে বললে সঠিক হবে। বর্ণিল পেয়ারা এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এবং এদের মানবিক বাড়তি আয়রনও রয়েছে। ফলে এসব পেয়ারার জাত সংগ্রহ করে ফিল্ড জিন ব্যাংকে সংরক্ষণ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া এখন আমরা পুষ্টির বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি বলে বর্ণিল মাংসল পেয়ারার উৎপাদন কৌশল এবং এদের ব্যাপক বংশ বিস্তার  ঘটানোর কাজটি করা খুব প্রয়োজন। তাছাড়া বর্ণিল পেয়ারার সাথে আমাদের বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা সাধারণ পেয়ারার সঙ্করায়ন করা যেতে পারে। এতে ভিন্ন বর্ণের ও মানের পেয়ারার জাত উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।


কলা ফসলের জাত উদ্ভাবনে আমাদের গবেষণা হয়েছে সবচেয়ে কম। এর জেনোমিক গবেষণা হয়নি বললেই চলে। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে নানা রকম পরিপ্লয়েড কলার জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে আন্তঃজাত সঙ্কয়ায়নের মাধ্যমে। এর ফলে কেবল যে নানা আকৃতির ও গুণমান বিশিষ্ট ফল উৎপাদিত হচ্ছে তাই নয় বরং রোগসহিষ্ণু জাতও পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। আমাদের পাহাড়ের কোনো কোনো কলা প্রজাতি রোগ ও কীটপতঙ্গ সহনশীল। এর অন্য বৈশিষ্ট্য উত্তম না হলেও এসব বৈশিষ্ট্য আমাদের আবাদি কলা জাতে স্থানান্তর করা যেতে পারে। সারা বছর ভিন্নতর স্বাদ বিশিষ্ট কলার জাত পেতে হলে কলার প্রজনন বিষয়ক গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এক বছর দু’বছরেই ফল ধরে বলে কলা প্রজনন করাই যেতে পারে।


লেবুর ভালো বৈচিত্র্য রয়েছে আমাদের। নরসিংদী এলাকায় কলম্বো লেবু তো বিদেশেও রপ্তানি হয়। উত্তম চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারলে এর উৎপাদন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। লেবুতে আমাদের পাহাড়ে দু-একটি বীজহীন লেবুর সন্ধান পাওয়া গেছে। দু’ভাবে এই লেবুকে কাজে লাগানো যায়। এক, অঙ্গজ বংশবিস্তারক্ষম এই লেবু জাতের অঙ্গজ উপায়ে চারা উৎপাদনকে উৎসাহিত করে বীজহীন লেবুর উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় যেমন পাহাড়ে তেমনি সমতল ভূমিতেও। দুই, বীজহীন লেবুর এই বৈশিষ্ট্যটি আমাদের অন্য লেবুতে স্থানান্তর করে গবেষণা চালানো যায় অবশ্যই। এর জন্য অবশ্যই প্রজননবিদের কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে ফল গবেষণা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির মাধ্যমে। প্রকৃত প্রজনন বিদদেরকে কাজ করার পরিবেশ দিতে পারলে বাংলাদেশেও তৈরি হতে পারে বৈচিত্র্যময় সব লেবুর জাত। তাছাড়া লেবুর কিছু রোগ বালাই বা কীট পতঙ্গ ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবনের জন্যও গবেষণা চলতে পারে।


বেল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফল। গুণেমানে এর তুলনা হয় না। বেল ফসলের জাতের মধ্যেও আমাদের বেল মানবিক জীববৈচিত্র্য এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। গাজীপুরের বেল তো এ দেশের এক বিখ্যাত সম্পদ। বিশালকৃতি, কম বীজ ও চমৎকার স্বাদ গন্ধসমৃদ্ধ এই বেলজাত আমাদের বেল উন্নয়নের পেরেন্ট স্টক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আমাদের দেশে অনেক ছোট বেল জাতও রয়েছে যাদের আঁশ কম আবার স্বাদ ও গন্ধও উত্তম। যদিও অধিকাংশ স্থানীয় বেল জাতগুলোর মান সন্তোষজনক নয়। বেলের বংশ বিস্তারের জন্য টিস্যু কালচার প্রণীত প্রটোকল উদ্ভাবন করা গেলে দেশে এ বেলের ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব। এর টিস্যু কালচার কঠিন হবে তবে গবেষণা চালিয়ে গেলে তা অসম্ভব হওয়ার কোনো কারণ নেই।


আমাদের পানি ফলেরও অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলের আকারে এরা ছোট, বড় ও মাঝারি তিন রকম রয়েছে। রয়েছে এদের ফলে বীজ ঘনত্বের তারতম্যও। কোনো কোনো জাতের বীজের গন্ধ এবং স্বাদ বেশ মন কাড়ে। ভীষণ আয়রন সমৃদ্ধ এই ফল। সরাসরি বড় জাতের বংশ বিস্তার করে এবং বড় জাতের বৈশিষ্ট্য অন্য জাতে স্থানান্তর করে পানিফলের চাষ বৃদ্ধি করা সম্ভব।


তালের ক্ষেত্রে আমাদের কোন গবেষণাই বাস্তবে হয়নি। তালেরও স্বাদে গন্ধে বেশ পার্থক্য রয়েছে। তাল এক লম্বা সময়ের ফলন। তালগাছ পুরুষ না স্ত্রী হবে এটি জানতেও অপেক্ষা করতে হয় কত বছর। আনবিক কৌশল ব্যবহার করে আগাম তালগাছের লিঙ্গ নির্ধারণ করার গবেষণা চালানো দরকার। তাহলে স্ত্রী লিঙ্গিক চারা লাগিয়ে লাভবান হওয়ার বিস্তর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।


ফল ফসলের জাত উদ্ভাবন গবেষণার পাশাপাশি উদ্ভাবিত জাতসমূহের আবাদ প্রযুক্তি সম্পর্কিত গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন উদ্ভাবিত জাতের চাষাবাদ পদ্ধতি, এদের রোগ ও পোকামাকড় দমনসহ ফলের সংগ্রহ পরবর্তী ব্যবস্থাপনাজনিত গবেষণা নতুন জাতের সফলতা অর্জন করার জন্যই আবশ্যক। তাছাড়া ফল ফসলের চারা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনও এক জরুরি বিষয়। কম দামে অল্প স্থানে উত্তম চারা উৎপাদন ফলের জাত প্রসারের জন্য এক আবশ্যক বিষয়। ফলের উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন ও এদের আধুনিকায়নের গবেষণা দেশে চলছে। অধিকাংশ ফল যেহেতু কোনো রকম প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াই সরাসরি বপন করা হয় বলে রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে ফল চাষকে উৎসাহিত করার জন্যও গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে সমন্বিত বালাইনাশক এবং বীজ বালাইনাশক ব্যবহার উৎসাহিত করার জন্য গবেষণা কর্মকাণ্ডের জোর দেয়া দরকার।

 

ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া

প্রফেসর জেনিটিকস অ্যান্ড প্লান্ট ব্রিডিং বিভাগ,  শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা। রঢ়নংপঋপ২০০৯@মসধরষ.পড়স  ০১৭৫৮৯৩৫২৬৪

বিস্তারিত
দেশীয় ফলের জাত উন্নয়ন ও গবেষণা (আষাঢ় ১৪২৫)

বাংলাদেশে হরেক রকম ফলের আবাদ করা হচ্ছে এখন। এর মধ্যে যেমন দেশীয় ফল রয়েছে তেমনি আবার বিদেশী ফলও রয়েছে। দেশীয় ফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফল হলো আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, কুল, পেয়ারা, বেল, জলপাই, তাল, লুকলুকি, আমলকী, জাম আর নানা রকম লেবু। আমাদের দেশে উৎপাদিত ফলের বেশিরভাগ আসে কয়টি ফল থেকে। এদের মধ্যে কলা আর পেয়ারা ছাড়া কোনো ফলই সারা বছর পাওয়া যায় না। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে এসব ফলের প্রাপ্তি। বিশেষ করে বৈশাখ থেকে বড় জোর শ্রাবণ মাস পর্যন্ত আমাদের এসব ফলের উৎপাদন হয়ে থাকে। যে কারণে প্রায় সারা বছরই বিদেশ থেকে প্রচুর ফল আমাদের আমদানি করতে হয়। এসব ফল আবার চড়া দামে কিনতে হয়। আমাদের দেশীয় ফলের নতুন নতুন উদ্ভাবন করতে পারলে একদিকে যেমন উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে অন্যদিকে কেবল মৌসুমে নয় অমৌসুমেও এর কোনো কোনোটা আবাদ উপযোগী হতে পারে।


সত্যি কথা বলতে গেলে আমাদের ফল গবেষণা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বেশ কিছু ফলের জাত অবশ্য গত দশ বছরে অবমুক্ত করা হয়েছে যার বেশির ভাগই দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা উত্তম জাত। ফলের বিভিন্ন জাতের মধ্যে সঙ্করায়ন করা কিংবা ফলে মিউটেশন ঘটিয়ে নতুন জাত উদ্ভাবন করার ঘটনা এ দেশে বেশ বিরল। কেবলমাত্র আমের দু’চারটি জাত উদ্ভাবন ছাড়া অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে আমাদের জাত উন্নয়ন গবেষণা বড় দুর্বল।


ফল গবেষণার কিছু বাড়তি অসুবিধা রয়েছে। এক, ফল গাছ আধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘ দেহী হওয়ায় এদের মধ্যে সঙ্করায়ন করার কাজটি খানিকটা কঠিন। দুই, অধিকাংশ ফল গাছে ফল ধরতে সময় লাগে বলে ফলের জাত উদ্ভাবন করার জন্য সঙ্করায়ন পদ্ধতির দিকে গবেষকগণ কম আগ্রহী হন। আমাদের দেশে ফলের জাত উন্নয়ন গবেষণার আরো কিছু বাড়তি অসুবিধা রয়েছে। এক, ফল গবেষণার সাথে জড়িত গবেষকদের উদ্ভিদ প্রজনন ও আনুষঙ্গিক বিষয় সম্পর্কিত জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। দুই, যাদের এ বিষয়ক জ্ঞান বেশি রয়েছে পেশাগত প্রতিযোগিতার নেতিবাচক মনোভাবের কারণে তাদের এ বিষয়ক গবেষণা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সজাগ হলে এবং গোষ্ঠীগত পেশার চেয়ে জাতীয় উন্নয়নকে গুরুত্ব দিলে শেষোক্ত সমস্যা ঘটিয়ে ওঠা সম্ভব। আর তা পারলে ফল গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জনের দ্বারও উন্মোচিত হতে পারে। আম আমাদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফল ফসল। স্বাদে, গন্ধে, বর্ণে আমের বৈচিত্র্যও আমাদের কম নয়। তাছাড়া আমের নানান আকৃতি ও পাকার সময় কালেও বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে। এসব বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন আম জাতে বিদ্যমান উত্তম বৈশিষ্ট্য দেওয়া নেওয়া করার জন্য আমে সঙ্করায়ন করার পদ্ধতি ইতোমধ্যে আমাদের দেশে চালু হয়েছে। আম অঙ্গজ জনমক্ষম একটি ফসল বলে সঠিক দু’টি পেরেন্ট জাতের মধ্যে সঙ্করায়ন করে পাওয়া হাইব্রিড গাছের মধ্য থেকে উত্তম হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন খুব কঠিন কাজ নয়। আর একটি- দু’টি উত্তম হাইব্রিড জাত পেলে অঙ্গজ বংশ বিস্তার করে এর গুণাগুণ ধরে রাখা সম্ভব দিনের পর দিন।


হাইব্রিড আম যে উত্তম হতে পারে তার  প্রমাণ আম্রপালি, আম জাতটি। এটি ভারতে উদ্ভাবিত একটি হাইব্রিড আম। এই আম জাতটির আমাদের দেশেও বিস্তার ঘটানো হয়েছে। হাইব্রিড হলেও একেও পেরেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের একাধিক জাতের সাথে সঙ্করায়ন করে নেয়া যেতে পারে। অতপর তা থেকে সৃষ্ট ভিন্ন রকম আম গাছের মধ্য থেকে উত্তম গাছকে অঙ্গজ বংশ বিস্তার করে রক্ষা করা সম্ভব। আর এর মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে  উত্তম আম জাত। এভাবে পাওয়া সম্ভব নানা আকার আকৃতি, বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদের আম। কাঁঠাল নিয়ে আমাদের বহুমাত্রিক গবেষণার সুযোগ রয়েছে। কাঁঠালের বিভিন্ন জাতের মধ্যে গুণগত মানের দিক থেকে নানা রকম বৈচিত্র্য রয়েছে।  কাঁঠালের আকার আকৃতি, এর বর্ণ এবং দেহের কাঁটার আকার আকৃতি এদের তীক্ষèতায় বেশ পার্থক্য রয়েছে। কোয়ার আকার আকৃতি, এর পেলবতা, স্বাদ, গন্ধ, মিষ্টতার দিক থেকেও কাঁঠালে বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে।
এসব ছাড়া পরিপক্বতার দিক থেকে আগাম, মাঝারি ও নাবি বৈশিষ্ট্যের জন্যও এদের মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলে এই বিশাল বৈচিত্র্য থেকে মানুষের চাহিদামাফিক গুণগত মানসম্পন্ন কয়েক রকমের কাঁঠালের জাত বাছাই করে এর চাষ বৃদ্ধি করার দিকে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ ও প্রয়োজন দুটোই রয়েছে। এর জন্য উত্তম জাত বাছাই এবং এর বংশ বিস্তারের জন্য চারা উৎপাদন করার বিষয়ে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কাঁঠালের টিস্যু কালচার করে চারা উৎপাদনকে আরো সহজতর করতে হবে। কাঁঠাল পর পরাগী ফসল। আশপাশের গাছের পরাগ রেণু উড়ে এসে ফুলের গর্ভমু-ে পতিত হয় বলে এর বীজ থেকে উৎপাদিত কাঁঠাল গাছের কাঁঠালের গুণাগুণ অক্ষত রাখা সম্ভব হয় না। সে কারণে টিস্যু কালচার থেকে কাঁঠালের চারা উৎপাদন সম্ভব হলেও এর উৎপাদন কৌশলকে আরো সহজতর করার গবেষণা চালিয়ে যায়ার প্রয়োজন রয়েছে।
পেয়ারারও বেশ কিছু বৈচিত্র্যময় জাত রয়েছে আমাদের। পেয়ারার আকার আকৃতি এর বহিরাবরণ, এর ভেতরকার বীজের পরিমাণ, এর পেলবতা, স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। আমাদের বাজারে দু-তিন রকম জাতের পেয়ারার আধিক্য রয়েছে। তবে দিন দিন বর্ণিল মাংসল পেয়ারা কেবল হ্রাস পাচ্ছে বললে ভুল হবে বরং বিলুপ্তির মুখে পড়েছে বললে সঠিক হবে। বর্ণিল পেয়ারা এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এবং এদের যবনিক বাড়তি আয়রনও রয়েছে। ফলে এসব পেয়ারার জাত সংগ্রহ করে ফিল্ড জিন ব্যাংকে সংরক্ষণ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া এখন আমরা পুষ্টির বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি বলে বর্ণিল মাংসল পেয়ারার উৎপাদন কৌশল এবং এদের ব্যাপক বংশ বিস্তার  ঘটানোর কাজটি করা খুব প্রয়োজন। তাছাড়া বর্ণিল পেয়ারার সাথে আমাদের বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা সাধারণ পেয়ারার সঙ্করায়ন করা যেতে পারে। এতে ভিন্ন বর্ণেরও মানের পেয়ারার জাত উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।


কলা ফসলের জাত উদ্ভাবনে আমাদের গবেষণা হয়েছে সবচেয়ে কম। এর জেনোমিক গবেষণা হয়নি বললেই চলে। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে নানা রকম পরিপ্লয়েড কলার জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে আন্তঃজাত সঙ্কয়ায়নের মাধ্যমে। এর ফলে কেবল যে নানা আকৃতির ও গুণমান বিশিষ্ট ফল উৎপাদিত হচ্ছে তাই নয় বরং রোগসহিষ্ণু জাতও পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। আমাদের পাহাড়ের কোনো কোনো কলা প্রজাতি ভষণ রকম রোগ ও কীটপতঙ্গ সহনশীল। এর অন্য বৈশিষ্ট্য উত্তম না হলেও এসব বৈশিষ্ট্য আমাদের আবাদি কলা জাতে স্থানান্তর করা যেতে পারে। সারা বছর ভিন্নতর স্বাদ বিশিষ্ট কলার জাত পেতে হলে কলার প্রজনন বিষয়ক গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এক বছর দু’বছরেই ফল ধরে বলে কলা প্রজনন করাই যেতে পারে।


লেবুর ভালো বৈচিত্র্য রয়েছে আমাদের। নরসিংদী এলাকায় কলম্বো লেবু তো বিদেশেও রপ্তানি হয়। উত্তম চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারলে এর উৎপাদন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। লেবুতে আমাদের পাহাড়ে দু-একটি বীজহীন লেবুর সন্ধান পাওয়া গেছে। দু’ভাবে এই লেবুকে কাজে লাগানো যায়। এক, অঙ্গজ বংশবিস্তারক্ষম এই লেবু জাতের অঙ্গজ উপায়ে চারা উৎপাদনকে উৎসাহিত করে বীজহীন লেবুর উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় যেমন পাহাড়ে তেমনি সমতল ভূমিতেও। দুই, বীজহীন লেবুর এই বৈশিষ্ট্যটি আমাদের অন্য লেবুতে স্থানান্তর করায় গবেষণা চালানো যায় অবশ্যই। এর জন্য অবশ্যই প্রজননবিদের কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে ফল গবেষণা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির মাধ্যমে। প্রকৃত প্রজনন বিদদেরকে কাজ করার পরিবেশ দিতে পারলে বাংলাদেশেও তৈরি হতে পারে বৈচিত্র্যময় সব লেবুর জাত। তাছাড়া লেবুর কিছু রোগ বালাই বা কীট পতঙ্গ ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবনের জন্যও গবেষণা চলতে পারে।


বেল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফল। গুণেমানে এর তুলনা হয় না। বেল ফসলের জাতের মধ্যেও আমাদের বেল যানিক জীববৈচিত্র্য এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। গাজীপুরের বেল তো এ দেশের এক বিখ্যাত সম্পদ। বিশালকৃতি, কম বীজ ও চমৎকার স্বাদ গন্ধসমৃদ্ধ এই বেলজাত আমাদের বেল উন্নয়নের পেরেন্ট স্টক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আমাদের দেশে অনেক ছোট বেল জাতও রয়েছে যাদের আঁশ কম আবার স্বাদ ও গন্ধও উত্তম। যদিও অধিকাংশ স্থানীয় বেল জাতগুলোর মান সন্তোষজনক নয়। বেলের বংশ বিস্তারের জন্য টিস্যু কালচার প্রণিত প্রটোকল উদ্ভাবন করা গেলে দেশে এ বেলের ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব। এর টিস্যু কালচার কঠিন হবে তবে গবেষণা চালিয়ে গেলে তা অসম্ভব হওয়ার কোনো কারণ নেই।


আমাদের পানি ফলেরও যানিক বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলের আকারে এরা ছোট, বড় ও মাঝারি তিন রকম রয়েছে। রয়েছে এদের ফলে বীজ ঘনত্বের তারতম্যও। কোনো কোনো জাতের বীজের গন্ধ এবং স্বাদ বেশ মন কাড়ে। ভীষণ আয়রন সমৃদ্ধ এই ফল। সরাসরি বড় জাতের বংশ বিস্তার করে এবং বড় জাতের বৈশিষ্ট্য অন্য জাতে স্থানান্তর করে পানিফলের চাষ বৃদ্ধি করা সম্ভব। তালের ক্ষেত্রে আমাদের কোন গবেষণাই বাস্তবে হয়নি। তালেরও স্বাদে গন্ধে বেশ পার্থক্য রয়েছে। তাল এক লম্বা সময়ের ফলন। তালগাছ পুরুষ না স্ত্রী হবে এটি জানতেও অপেক্ষা করতে হয় কত বছর। আনবিক কৌশল ব্যবহার করে আগাম তালগাছের লিঙ্গ নির্ধারণ করার গবেষণা চালানো দরকার। তাহলে স্ত্রী লিঙ্গিক চারা লাগিয়ে লাভবান হওয়ার বিস্তর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।


ফল ফসলের জাত উদ্ভাবন গবেষণার পাশাপাশি উদ্ভাবিত জাতসমূহের আবাদ প্রযুক্তি সম্পর্কিত গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন উদ্ভাবিত জাতের চাষাবাদ পদ্ধতি, এদের রোগ ও পোকামাকড় দমনসহ ফলের সংগ্রহ পরবর্তী ব্যবস্থাপনাজনিত গবেষণা নতুন জাতের সফলতা অর্জন করার জন্যই আবশ্যক। তাছাড়া ফল ফসলের চারা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনও এক জরুরি বিষয়। কম দামে অল্প স্থানে উত্তম চারা উৎপাদন ফলের জাত প্রসারের জন্য এক আবশ্যক বিষয়। ফলের উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন ও এদের আধুনিকায়নের গবেষণা দেশে চলছে। অধিকাংশ ফল যেহেতু কোনো রকম প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াই সরাসরি বপন করা হয় বলে রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে ফল চাষকে উৎসাহিত করার জন্যও গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে সমন্বিত বালাইনাশক এবং বীজ বালাইনাশক ব্যবহার উৎসাহিত করার জন্য  গবেষণা কর্মকাণ্ডে জোর দেয়া দরকার।

ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া*

*প্রফেসর জেনিটিকস অ্যান্ড প্লান্ট ব্রিডিং বিভাগ,  শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলানগর, ঢাকা

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook