কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

আষাঢ় মাসের কৃষি কৃষিকথা ১৪২৬

আষাঢ় মাসেই নববর্ষার শীতল স্পর্শে ধরণীকে শান্ত ও শুদ্ধ করতে বর্ষা ঋতু আগমন। খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, ডোবা ভরে ওঠে নতুন পানির জোয়ারে। গাছপালা ধুয়ে মুছে সবুজ প্রকৃতি মন ভালো করে দেয় প্রতিটি বাঙালির। সাথে আমাদের কৃষিকাজে নিয়ে আসে ব্যাপক ব্যস্ততা। প্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন আসুন আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে নেই আষাঢ় মাসে কৃষির করণীয় আবশ্যকীয় কাজগুলো।
 

আউশ ধান
আউশ ধানের ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য যত্ন নিতে হবে;
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগ ও পোকামাকড় দমন করতে হবে;
বন্যার আশঙ্কা হলে আগাম রোপণ করা আউশ ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলেই কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

 

আমন ধান
আমন ধানের বীজতলা তৈরির সময় এখন। পানিতে ডুবে না এমন উঁচু খোলা জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। বন্যার কারণে রোপা আমনের বীজতলা করার মতো জায়গা না থাকলে ভাসমান বীজতলা বা দাপগ পদ্ধতিতে বীজতলা করে চারা উৎপাদন করা যায়;


বীজতলায় বীজ বপন করার আগে ভালো জাতের মানসম্পন্ন বীজ নির্বাচন করতে হবে। রোপা আমনের অনুকূল পরিবেশ উপযোগী উন্নত জাত, যেমন বিআর১০, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮৭ এবং প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী উন্নত জাত চাষ করতে পারেন;


খরাপ্রবণ এলাকাতে নাবি রোপার পরিবর্তে যথাসম্ভব আগাম রোপা আমনের (ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান ৩৯ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১ এসব) চাষ করতে হবে;


ভালো চারা পেতে প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি গোবর, ১০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে;
আষাঢ় মাসে রোপা আমন ধানের চারা রোপণ শুরু করা যায়;


মূল জমিতে শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ৯০ কেজি টিএসপি, ৭০ কেজি এমওপি, ১১ কেজি দস্তা এবং ৬০ কেজি জিপসাম দিতে হবে;
জমির এক কোণে মিনি পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন যেন পরবর্তীতে সম্পূরক সেচ নিশ্চিত করা যায়।


ভুট্টা
পরিপক্ব হওয়ার পর বৃষ্টিতে নষ্ট হবার আগে মোচা সংগ্রহ করে  ঘরের বারান্দায় সংগ্রহ করতে পারেন। রোদ হলে শুকিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মোচা পাকতে দেরি হলে মোচার আগা চাপ দিয়ে নি¤œমুখী করে দিতে হবে, এতে বৃষ্টিতে মোচা নষ্ট হবে না।

 

পাট
পাট গাছের বয়স চারমাস হলে ক্ষেতের পাট গাছ কেটে নিতে হবে।
পাট গাছ কাটার পর চিকন ও মোটা পাট গাছ আলাদা করে আঁটি বেঁধে দুই/তিন দিন দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে।
পাতা ঝরে গেলে ৩/৪দিন পাট গাছগুলোর গোড়া একফুট পানিতে ডুবিয়ে রাখার পর পরিষ্কার পানিতে জাগ দিতে হবে।
পাট পচে গেলে পানিতে আঁটি ভাসিয়ে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে পাটের আঁশের গুণাগুণ ভালো থাকবে। ছাড়ানো আঁশ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ে শুকাতে হবে।


যেসব জায়গায় জাগ দেয়ার পানির অভাব সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে পারেন। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচন সময় কমে যায়।  

 
পাটের বীজ উৎপাদনের জন্য ১০০ দিন বয়সের পাট গাছের এক থেকে দেড় ফুট ডগা কেটে নিয়ে দুটি গিটসহ ৩/৪ টুকরা করে ভেজা জমিতে দক্ষিণমুখী কাত করে রোপণ করতে হবে। রোপণ করা টুকরোগুলো থেকে ডালপালা বের হয়ে নতুন চারা হবে। পরবর্তীতে এসব চারায় প্রচুর ফল ধরবে এবং তা থেকে বীজ পাওয়া যাবে।


শাকসবজি
এ সময়ে উৎপাদিত শাকসবজির মধ্যে আছে ডাঁটা, গিমাকলমি, পুঁইশাক, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, ঝিঙা, শসা, ঢেঁড়স, বেগুন। এসব সবজির গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনে মাটি তুলে দিতে হবে। এছাড়া বন্যার পানি সহনশীল লতিরাজ কচুর আবাদ করতে পারেন;


উপকূলীয় অঞ্চলে ঘেরের পাড়ে গিমাকলমি ও অন্যান্য ফসল আবাদ করতে পারেন;
সবজি ক্ষেতে পানি জমতে দেয়া যাবে না। পানি জমে গেলে সরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে;
তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরার জন্য বেশি বৃদ্ধি সমৃদ্ধ লতা জাতীয় গাছের ১৫-২০ শতাংশের লতা পাতা কেটে দিতে হবে;
কুমড়া জাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে;


আগাম জাতের শিম এবং লাউয়ের জন্য প্রায় ৩ ফুট দূরে দূরে ১ ফুট চওড়া ও ১ ফুট গভীর করে মাদা তৈরি করতে হবে। মাদা তৈরির সময় গর্তপ্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম সরিষার খৈল, ২ কেজি ছাই, ১০০ গ্রাম টিএসপি ভালোভাবে মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর প্রতি গাদায় ৩/৪টি ভালো সবল বীজ রোপণ করতে হবে।


এছাড়াও আগাম শীতকালীন সবজি উৎপাদনে টানেল টেকনোলজি ব্যবহার করা যেতে পারে।
 

গাছপালা
এ সময়টা গাছের চারা রোপণের জন্য খুবই উপযুক্ত। বসতবাড়ির আশপাশে, খোলা জায়গায়, চাষাবাদের অনুপযোগী পতিত জমিতে, রাস্তাঘাটের পাশে, পুকুর পাড়ে, নদীর তীরে গাছের চারা বা কলম রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে;
এ সময় বনজ গাছের চারা ছাড়াও ফল ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে পারেন;
ফলের চারা রোপণের আগে গর্ত তৈরি করতে হবে;
সাধারণ হিসাব অনুযায়ী এক ফুট চওড়া ও এক ফুট গভীর গর্ত করে গর্তের মাটির সাথে ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার মিশিয়ে, দিন দশের পরে চারা বা কলম লাগাতে হবে;
বৃক্ষ রোপণের ক্ষেত্রে উন্নত জাতের রোগমুক্ত সুস্থ-সবল চারা বা কলম রোপণ করতে হবে;  
চারা শুধু রোপণ করলেই হবে না। এগুলোকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। চারা রোপণের পর শক্ত খুঁটি দিয়ে চারা বেঁধে দিতে হবে। এরপর বেড়া বা খাঁচা দিয়ে চারা রক্ষা করা, গোড়ায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, সেচনিকাশ নিশ্চিত করতে হবে;
নার্সারি মালিক যারা তাদের মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুব জরুরি। সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, দুর্বল রোগাক্রান্ত ডালপালা কাটা বা ছেটে দেয়ার কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে হবে।

 

প্রাণিসম্পদ
বর্ষাকালে হাঁসমুরগির ঘর যাতে জীবাণুমুক্ত ও আলো-বাতাসপূর্ণ থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে;
এ মাসে হাঁস-মুরগির কৃমি, কলেরা, রক্ত আমাশায়, পুলরাম রোগ, সংক্রমণ সর্দি দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে;
বর্ষাকালে গবাদিপশুকে সংরক্ষণ করা খড়, শুকনো ঘাস, ভুসি, কুঁড়া খেতে দিতে হবে। সে সাথে কাঁচা ঘাস খাওয়াতে হবে। মাঠ থেকে সংগৃহীত সবুজ ঘাস ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খাওয়ানো যাবে না;
বর্ষাকালে গবাদিপশুর গলাফোলা, তড়কা, বাদলা, ক্ষুরা রোগ মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। এ জন্য প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে;
এ সময় ডাইরিয়া এবং নিউমোনিয়া রোগে গবাদিপশুকে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। তাই গবাদিপশুকে ঠা-ামুক্ত ও শুষ্ক জায়গায় রাখতে হবে।  
হাল চাষের পর গরুকে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে;
এছাড়াও যেকোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

মৎস্য সম্পদ
বর্ষা মৌসুমে পুকুরের পাড় উঁচু করে দিতে হবে;
বন্যার সময় পুকুরে মাছ আটকানোর জন্য জাল, বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে;
আষাঢ় মাস মাছের পোনা ছাড়ার উপযুক্ত সময়। মাছ চাষের জন্য মিশ্র পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন;
পুকুরে নিয়মিত খাবার দিতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে;
বড় পুকুরে, হাওরে, বিলে, নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করতে পারেন;
মাছ চাষের যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের আগাম প্রস্তুতির জন্য আগামী মাসে উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়ে দেয়া হয়। বিস্তারিত জানার জন্য স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি-মৎস্য-প্রাণী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। আর একটি কথা এ সময় বীজ ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় কৃষি উপকরণগুলো বন্যামুক্ত উঁচু বা নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।

 

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম

সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা, টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪; ই-মেইল : fardousi30@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
আগাম সবজি উৎপাদনে টানেল টেকনোলজি

বাঙালির খাদ্য তালিকায় তিনবেলা যে খাবারটি থাকে তার নাম ভাত। আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাই সেটা যদি ঠিকঠাক হজম না হয় তাহলে তা শরীরের কোনো কাজেই আসে না। আপনি যে খাবারই খান সেটাকে পরিপাকের মাধ্যমে শরীরের গ্রহণ উপযোগী করে তোলার জন্য সবজির কোনো জুড়ি নেই। সবজি কেবল খাবার পরিপাক করতেই সাহায্য করে তা কিন্তু নয়। আমাদের শরীরের জন্য দরকারি অনেক পুষ্টি উপাদানও জোগান দিয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ তার অন্যতম। একজন সুস্থ সবল মানুষের জন্য প্রতিদিন ২২০ গ্রাম সবজি গ্রহণ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে দেশের মানুষ প্রতিদিন মাথাপিছু গ্রহণ করছেন মাত্র ৫০ গ্রাম সবজি। এ হিসেবে দৈনিক চাহিদার মাত্র চতুর্থাংশ সবজি খাচ্ছেন মানুষ। কৃষি ও পুষ্টিবিদরা বলছেন, বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবণ ও ভিটামিনের পর্যাপ্ত প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সবজি গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। খাদ্য জগতে বিভিন্ন ধরনের সবজিই একমাত্র খাদ্য শরীর গঠনে যার ইতিবাচক ছাড়া নেতিবাচক কোনো প্রভাব নেই। তাই খাদ্যাভাস পরিবর্তন করে খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্যময় পাতা ও ফলমূলজাতীয় সবজিকে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। নানা ধরনের সবজি উৎপাদনের জন্য আমাদের মাটি খুবই উপযোগী। শীত ও গ্রীষ্মকালীন চাষ করা যায় এমন সবজির তালিকাটাও বেশ বড়। কিন্তু নানা কারণে আমাদের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। সবজি চাষের জন্য বরাদ্দ থাকে রান্না বা গোয়াল ঘরের পেছনের এক চিলতে জমি। অথচ পুষ্টি চাহিদার কথা মাথায় রাখলে সবজি চাষের কথা ভাবতেই হবে। এজন্য সত্যি বলতে কি কম জমি কাজে লাগিয়ে পুষ্টির চাহিদা পূরণের একমাত্র উপায় সারা বছর সবজির নিবিড় চাষ। আমাদের দেশে বেশির ভাগ সবজি উৎপাদন হয় রবি মৌসুমে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মার্চ মাসে। খরিফ মৌসুম অর্থাৎ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় সবজি চাষ খুব কম হয়। ফলে বাজারে এ সময় সবজির দাম থাকে আকাশ ছোঁয়া। বিশেষ করে মে থেকে জুলাই মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও খরার কারণে সবজির উৎপাদন কম হওয়ার জন্য বাজার মূল্য বেশি থাকে।


মৌসুমে বাজারে সবজির সরবরাহ বেশি থাকায় চাষি ভাইয়েরা ন্যায্য মূল্য পান না। তাই মৌসুম শুরুর আগেই যদি আগাম সবজি উৎপাদন করে বাজারজাত করা যায়, তাহলে দ্বিগুণেরও বেশি দাম পাওয়া যায়। যে কৌশল অবলম্বন করে সারা বছর সবজি চাষ করা বা আগাম শীতকালীন সবজি উৎপাদন করা যায় তার নাম ‘টানেল টেকনোলজি’। সোজা কথায় নৌকার ছইয়ের মতো ছাউনি দিয়ে সবজি চাষ।


প্রকৃত মৌসুম ছেড়ে অন্য মৌসুমে সবজি চাষ করার জন্য এই কৌশলের কোনো জুড়ি নেই। তবে এই কৌশলের মাধ্যমে শীতকালীন সবজিকে গ্রীষ্মকালে চাষ করা কঠিন। কারণ শীতকালীন সবজি চাষের জন্য যে ধরনের তাপমাত্রা প্রয়োজন সেই ধরনের তাপমাত্রা কৃত্রিম পরিবেশে তৈরি করা বেশ ব্যয়বহুল। তবে এই কৌশলের মাধ্যমে কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে গ্রীষ্মকালীন সবজিকে শীতকালে চাষ করা খুবই সহজ। কারণ প্লাস্টিক ছাউনি ব্যবহারের মাধ্যমে শীতকালে খুব সহজেই সৌরশক্তি সঞ্চয় করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে নেয়া যায়, যা শীতকালে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষের জন্য যথেষ্ট।


টানেল টেকনোলজি বা ছাউনি পদ্ধতি ব্যবহার করে যেসব সবজি খুব সহজেই চাষ করা যায় সেগুলো হলো- শসাজাতীয় সবজি, টমেটো, পালংশাক, পাতাকপি, ফুলকপি, শিম ইত্যাদি। এই কৌশলে একজন চাষি আগাম সবজি চাষ করে প্রকৃত মৌসুমের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে আমাদের দেশের অনেক অঞ্চলের চাষি ভাইয়েরা সবজি চাষ করে আসছেন যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।


টানেলের ধরন ও আকার দুই রকমের হতে পারে। নিচু টানেল ও উঁচু টানেল। নিচু টানেল হয় অস্থায়ী এবং এ ধরনের টানেল তৈরিতে খরচ কম। কিন্তু যেসব এলাকায় খুব জোরে বাতাস প্রবাহিত হয় সেসব এলাকায় এ ধরনের টানেল উপযোগী নয়। তবে আমাদের দেশে প্রধানত যেসব এলাকায় সবজি চাষ হয় সেসব এলাকায় এ ধরনের বাতাস খুব একটা প্রবাহিত হয় না। এ ধরনের টানেল তৈরিতে বাঁশ এবং পলিথিন ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের টানেলের মাধ্যমে প্রকৃত মৌসুমের চেয়ে প্রায় এক মাস আগে সবজি উৎপাদন করা যায়।
উঁচু টানেল হলো স্থায়ী টানেল। এ ধরনের টানেল তৈরিতে খরচ বেশি। উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয় স্টিল ফ্রেম ও বাঁশ । এ ধরনের টানেল যেকোনো এলাকাতেই তৈরি করা যায়। টানেল সবজি চাষের জমি তৈরি করে বীজ বা চারা রোপণের আগেও করা যায়, পরেও করা যায়।


নিচু টানেল তৈরি
এ ধরনের টানেল তৈরির প্রধান উপকরণ বাঁশ। টানেলের দৈর্ঘ্য হতে হবে ৯৮.৪ ফুট এবং চওড়ায় হতে হবে ১৪.৭৬ ফুট। টানেলের ভেতরের মাঝ বরাবর উচ্চতা হবে ৭ ফুট এবং পাশের উচ্চতা হবে ৫ ফুট। সেচ ও পানি নিকাশের জন্য দুই বেড বা টানেলের মাঝখানে ৬ ইঞ্চি গভীরতার ২ ফুট চওড়া নালা রাখতে হয়। তারপর স্বচ্ছ কালো বা নীল রঙের পলিথিন দিয়ে টানেলটি নৌকার ছইয়ের মতো ঢেকে দিতে হয়।

 

উঁচু টানেল তৈরি
এ ধরনের টানেল তৈরির প্রধান উপকরণ স্টিল ফ্রেম বা বাঁশ। টানেলের দৈর্ঘ্য হতে হবে ১৩০ ফুট এবং চওড়ায় হতে হবে ৩২ ফুট। টানেলের ভেতরের মাঝ বরাবর উচ্চতা হবে ১২ ফুট এবং পাশের উচ্চতা হবে ১০ ফুট। সেচ ও পানি নিকাশের জন্য দুই বেড বা টানেলের মাঝখানে ৬ ইঞ্চি গভীরতার ৩ ফুট চওড়া নালা রাখতে হয়। চারা বা বীজ থেকে বীজের দূরত্ব রাখতে হয় ১.৫ ফুট। এরপর স্বচ্ছ কালো বা নীল রঙের পলিথিন দিয়ে টানেলটি নৌকার ছইয়ের মতো ঢেকে দিতে হয়।


এই পদ্ধতিতে সবজি চাষের জন্য যে জমিটি বাছাই করা হয় তা অবশ্যই উর্বর হতে হয়। মাটির পিএইচ থাকতে হয় ৫ থেকে ৭ এর মধ্যে। টানেল তৈরির পর জমি কোদাল দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে ভালোভাবে চাষ বা কর্ষণ করে প্রতি টানেলে পর্যাপ্ত জৈব সার, ২.৫ কেজি খৈল, ইউরিয়া ৮০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম এবং এমওপি ৭০০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়। ইউরিয়া ও পটাশ সারের অর্ধেক জমি তৈরির সময় এবং বাকি অর্ধেক চারা গজানোর দুই সপ্তাহ পরে উপরি প্রয়োগ করতে হয়। এগুলো সম্পন্ন হলে চারা বা বীজ রোপণের আগে বেড তৈরি করে নিতে হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুতে টানেলপ্রতি ২০০ গ্রাম পালংশাকের বীজ বুনলে ১ মাস পর অর্থাৎ আষাঢ় মাসে ফসল তোলা যায়।


পরবর্তীতে পালংশাক তোলার পর পুনরায় টানেলের জমি উত্তমরূপে কর্ষণ করে এবং উপরোল্লিখিত রাসায়নিক সার জমিতে প্রয়োগ করে জমি প্রস্তুত করতে হয়। কোনো কোনো সময় টানেলের মাটি জো থাকলে কর্ষণ ছাড়াই সবজি চারা রোপণ করা যায়। সবজি হিসেবে পাতাকপি, ফুলকপি ও টমেটো চারা আষাঢ় মাসের শুরুতেই রোপণ করা যায়। এক্ষেত্রে জ্যৈষ্ঠ মাসেই অন্য বীজতলায় চারা তৈরি করে নিতে হয়। ২০ থেকে ২৫ দিন বয়সের চারা টানেলের জমিতে লাইন করে রোপণ করতে হয়। বীজ বা চারা রোপণ করার আগে ভিটাভেক্স বা ব্যাভিস্টিন দিয়ে বীজ বা চারা শোধন করে নিতে হয়। প্রয়োজনমতো সেচ নিকাশ, আগাছা দমন, রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনা করলে সহজেই ভালো ফলন নিশ্চিত করা যায়।


টানেল পদ্ধতিতে অমৌসুমে সবজি চাষ করে পৃথিবীর অনেক দেশ বিশেষ করে ভারত প্রতি বছর নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে প্রচুর সবজি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে। আমাদের দেশের চাষিদের যদি সবজি চাষের এই কৌশল সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে তাহলে আমাদের দেশও নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা  আয় করতে পারে।

 

কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন

ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) মোবাইল : ০১৭১৬৫৪০৩৮০, ই-মেইল : smmomin80@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গিমাকলমি

গিমাকলমি গ্রাম বাংলার অতি পরিচিত একটি শাকের নাম। এটি সাধারণত জলাবদ্ধ জায়গায়, নলকূপের ধারে, খাল-বিল, ডোবা কিংবা পুকুরে অনায়াসেই জন্মে। এর কাণ্ড ফাঁকা থাকায় পানিতে ভাসে। ডাঁটাগুলো ২-৩ মিটার লম্বা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি হতে পারে। এর প্রতিটি গিঁট থেকে শেকড় বের হয়। কলমিশাক দুইরকম দেখা যায়। এক ধরনের কলমির ডাঁটা লাল আর অন্যটির ডাঁটা দেখতে সাদা-সুবজ। এর কাণ্ড নরম এবং রসালো। পাতা অনেকটা লম্বাটে-ত্রিকোণাবিশিষ্ট। বীজের আবরণ শক্ত। রঙ ধূসর। প্রতিটি ফলের মধ্যে চারটি করে বীজ থাকে। কলমির ফুল দেখতে সাদা। গোড়ার দিকে বেগুনি। এর আদি নিবাস কারো জানা নেই। তবে অনেকেই মনে করেন ক্রান্তীয় এবং উপ ক্রান্তীয় অঞ্চলের এর জন্ম।  সেখান থেকেই বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি গ্রীষ্মকালীন শাক। চাষের জন্য সেচ সুবিধা আছে এমন জমি নির্বাচন করতে হয়। পাতা জাতীয় এ সবজিটি খেতে সুস্বাদু। চায়নিজ খাবারে এর  ব্যবহার যথেষ্ট। আমাদের দেশেও  জনপ্রিয়তা কম নয়। কলমিশাক সাধারণত ভাজি হিসেবে খাওয়া হয়। তবে বড়া বানিয়ে কিংবা মাছের সাথে রান্না করে খেলে মজাই আলাদা। ভর্তা বানিয়েও খাওয়া যায়। চাষকৃত কলমিশাকের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। লাভ বেশি। একবার বীজ বপন করলে সারাবছর শাক সংগ্রহ করা যায়। জলাশয়ে এমনিতেই যেসব কলমি জন্মে, তার জন্য নেই কোনো পরিচর্যা। নেই কোনো খরচ। সবদিক বিবেচনায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। পারিবারিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গিমা কলমি রাখতে পারে অনন্য ভূমিকা।
 

পুষ্টি ও ভেষজগুণ
অনেক গুণের অধিকারী শাকের মধ্যে গিমাকলমি অন্যতম। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রতি ১০০ গ্রাম (আহারোপযোগী) শাকে ১০ হাজার ৭৪০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন আছে। অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের মধ্যে আমিষ ১ দশমিক ৮ গ্রাম, শর্করা ৫ দশমিক ৪ গ্রাম, চর্বি ০ দশমিক ১ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ১০৭ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ১১৩ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৫০ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৩১২ মিলিগ্রাম, লৌহ ৩ দশমিক ৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-বি ০ দশমিক ৫৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-সি ৪৯ মিলিগ্রাম এবং খাদ্যশক্তি রয়েছে ৩০ কিলোক্যালরি। ভিটামিন-এ’র অভাবে আমাদের দেশে প্রতি বছর ৫ লাখ শিশু রাতকানায় আক্রান্ত হচ্ছে। একই কারণে প্রতিদিন গড়ে ১০০ এবং বছরে ৩০ হাজার শিশু একেবারেই অন্ধ হয়ে যায়। অথচ ক্যারোটিনসমৃদ্ধ অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি কলমিশাক খেলে এ জাতীয় রোগ হওয়ার আশংকা থাকে না। আমাশয় হলে পাতার রসের সাথে আখের গুড় মিশিয়ে শরবত তৈরি করে সকাল-বিকাল নিয়মিত কয়েক দিন খেলে বেশ উপকার পাওয়া যায়। ফোঁড়া হলে আদাসহ কলমিশাকের পাতা সিলপাটায় বেটে এর মাঝখানের অংশ খালি রেখে চারপাশে প্রলেপ দিতে হবে। এভাবে ৩/৪ দিন লেপে দিলে ফোঁড়া গলে পুঁজ বেরিয়ে যাবে। শিশুরা যেন পর্যাপ্ত বুকের দুধ পেতে পারে এজন্য মায়েদের কলমিশাক খাওয়া দরকার। বোলতা, ভিমরুল বা মৌমাছিতে কামড়ালে কিংবা শিং, ট্যাংরা মাছের কাটা ফুটলে কলমিশাকের পাতা ও ডাঁটা বেটে  আক্রান্ত স্থানে প্রলেপ দিলে কিছুক্ষণ পরেই যন্ত্রণা কমে যায়। এছাড়া গনোরিয়া হলে আর সেই সাথে ব্যথা ও পুঁজ জমলে ৪/৫ চা-চামচ কলমিশাকের রসের সাথে পরিমাণমতো ঘি মিশিয়ে সকাল-বিকাল এক সপ্তাহ খেলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে আশা করি। হাত-পা জ্বালা করলে শাকের রসের সাথে সামান্য গরুর দুধ মিশিয়ে সকালে খালি পেটে ১ সপ্তাহ খেলে উপকার পাওয়া যায়। কলমিশাক দেহের হাড় মজবুত করে। চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট তৈরি করে। রক্তশূন্যতা, রাতকানা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অনিদ্রা এবং মাথার খুশকি দূরীকরণের পাশাপাশি নারীর ঋতুস্রাবজনিত এবং শরীরবৃত্তিয় সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখে বেশ। স্কাার্ভি ও বসন্ত রোগের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। তাই বহু গুণে গুণান্বিত এ শাক আমাদের না খেলেই নয়।

 

জাত
জলাশয়ে জন্মানো কলমিশাক স্থানীয় জাতের। এর উৎপাদন কম। তাই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৮৩ সালে একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। নাম গিমাকলমি-১। এর ফলন বেশ ভালো।

 

বপন সময়
গিমাকলমি সারা বছরই চাষ করা যায়। তবে চৈত্র (মধ্য মার্চ-মধ্য এপ্রিল) থেকে শুরু করে  শ্রাবণ (মধ্য জুলাই-মধ্য আগস্ট) পর্যন্ত বীজ বপনের উওম সময়।

 

জমি তৈরি এবং বীজ বপন
প্রথমে ৫-৬ টি চাষ এবং মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। লাইন করে এবং ছিটিয়ে উভয় পদ্ধতিতে বীজ বোনা যায়। তবে লাইনে বীজ বপন করলে যত্ন নিতে সহজ হয়। লাইন হতে লাইনের দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার (৮ইঞ্চি) এবং বীজ হতে বীজের দূরত্ব হবে ১৫ সেন্টিমিটার (৬ ইঞ্চি)। এক সাথে অন্তত ২টি বীজ বোনা ভালো। তবে একাধিক চারা জন্মালে ১টি রেখে বাকিগুলো কেটে দিতে হবে। শতাংশপ্রতি বীজ প্রয়োজন হবে প্রায় ৪০-৫০ গ্রাম।

 

সার ব্যবস্থাপনা
কাক্সিক্ষত ফলন পেতে প্রয়োজন সুষম সার ব্যবহার। মাটির উর্বরতা বিবেচনা করে সার দিতে হয়। এজন্য মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে সার দেয়া উওম। আর তা যদি সম্ভব হয় তাহলে স¦াভাবিক মাত্রায় দিতে হবে। শতাংশপ্রতি যে পরিমাণ সার প্রয়োজন তা হলো- ইউরিয়া ৫৬০- ৬৫০ গ্রাম, টিএসপি ৪০০-৪৯০ গ্রাম, এমওপি ৪০০-৪৯০ গ্রাম এবং জৈব সার ৩২-৪০ কেজি। ইউরিয়া বাদে বাকি জৈব ও অজৈব সার শেষ চাষের সময় মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। প্রতিবার পাতা সংগ্রহের পর ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে।

 

আগাছা দমন
অন্য যে কোনো ফসলের ন্যায় কলমিশাকের জমিতে আগাছা জন্মাতে দেয়া যাবে না। কারণ আগাছা খাবারের  সাথে ভাগ বসায়।  পাশাপাশি রোগ-পোকা আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। তাই আগাছা দেখা দেয়ার সাথে সাথে তুলে ফেলতে হবে।

 

সেচ
শুষ্ক মৌসুমে অবশ্যই সেচ দিতে হবে। বর্ষাকালে সাধারণত সেচের দরকার হয় তবে ওই সময় অনাবৃষ্টি হলে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

রোগ-পোকা দমন
কলমিশাকে রোগ-পোকা তেমন হয় না বললেই চলে। তবে কিছু পোকার আক্রমণ হতে পারে। যেমনÑ বিটল, বিছা পোকা, ঘোড়া পোকা। এসব পোকা দেখা দিলে হাত দিয়ে ধরে মেরে ফেলতে হবে। তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে দমন করতে হবে। জমি বেশি স্যাঁতসেঁতে থাকলে গোড়া পচে যেতে পারে।  ড্যাম্পিং অফ রোগের কারণে এমনটা হয়। অনুমোদিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।

 

শাক সংগ্রহ ও উৎপাদন
বীজ বপনের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে শাক সংগ্রহের উপর্যুক্ত হয়। প্রথম সংগ্রহের ৮-১০ দিন পরপর পাতা তোলা যাবে। শতাংশ প্রতি গড় ফলন প্রায় ১৬০-১৮০ কেজি।

 

বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
দিনের দৈর্ঘ্য কম এবং ঠাণ্ডা আবহাওয়ার সময় গিমাকলমি ফুল ফোটে। বীজ পরিপক্বের সময় হচ্ছে ফাল্গুন মাস (মধ্য ফেব্রুয়ারি- মধ্যচৈত্র)। গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে এরপর বীজ আলাদা করে নিতে হয়। এরপর হালকা রোদে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রেখে মুখ ভালোভাবে বন্ধ করতে হবে। ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে  বীজের পাত্রে নিম, নিশিন্দা, বিষকাটালির শুকনো পাতা দেয়া যেতে পারে।

 

নাহিদ বিন রফিক

টেকনিক্যাল পার্টিসিপেন্ট, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বরিশাল;  মোবাইল নম্বর :  ০১৭১৫৪৫২০২৬ ; ই-মেইল :tpnahid@gmail.com

 

বিস্তারিত
কবিতা ১৪২৬

 গ্রীন হাউস ইফেক্ট
পরিমল কুমার সাহা২

১. এখনো উর্বর
এখন শুকনো নদী খাল বিল জলা
জলকে যায় না নারী নদীর কিনারে
পানি আনে মাটি খুঁড়ে দাঁড়িয়ে কাতারে
জলছাড়া হলো হারা শৌল টাকি মলা।

নদীর এখন যেন মরণের বেলা
ভুলেছে গাঁয়ের বধূ কেমনে সাঁতারে
নিদাঘ দুপুরে ঢেউ নাচায় না তারে
বাতাস একান্তে করে বালুচরে খেলা।

কল্ কল্ করা ঢেউ হয়েছে নীরব
শ্যালো আর টিলারের শোনা যায় রব
বিশাল নদীর বুকে জেগে আছে চর

চরজুড়ে শস্য নাচে মহা ধুমধামে
ঘাটে নয় হাটে এসে বেনিয়ারা থামে
নারী আর নদীচর এখনো উর্বর।   

২. আমার রক্তের কণা
আমার রক্তের কণা মৃত্তিকা নিষিক্ত
মুখের জবানে পাই বজ্রের ওঙ্কার
হিয়ার হাপরে বাজে বায়ুর টঙ্কার
শ্রাবণের জলে মন অবিরাম সিক্ত।

আমি তাই কাবু নই দীর্ঘতর শ্রমে
সারাদিন মাটি ঘেঁটে করে যাই খেলা
ঘাটে নেমে স্নান করি রোজ সাঁজবেলা
রাতের আঁধার চুঁয়ে চোখে ঘুম জমে।

নদী আর সবুজের সাথে মিলেমিশে
বেড়ে ওঠে জীবনের সোনামাখা দিন
পাখি আর ফুলে ফলে করি তা রঙিন।
বৈশাখের খর তাপ বজ্রের আশিষে
শিরায় শোনিত নেচে করে প্রদক্ষিণ
যার কাছে ঝড় ভয়ে বহে তার পিছে।

 

যুগল চতুর্দশপদী
 আবু হেনা ইকবাল আহমেদ১

গ্রীন হাউস আক্ষরিক অর্থ হলো সবুজ ঘর
ফলাফল বিবেচনা করলে সবার গায়ে আসবে জ্বর।
আবহাওয়া গরম হলে করে তাপ বিকিরণ,
বিপন্ন হবে গাছপালা মানুষের জীবিকা জীবন।
সাগরের তলদেশের উচ্চতা এক মিটার বাড়ার ফলে,
বাংলাদেশ ডুবে যাবে দশ ফুট পানির তলে।
ধেয়ে আসবে বন্যা ঝড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ,
দিনে দিনে বাড়বে পৃথিবীতে মানুষের দুর্ভোগ।
অতি বৃষ্টি অনাবৃষ্টি হবে ফসল হবে হানি,
বরফ গলে নেমে আসবে বাড়বে নদীর পানি।
সময় থাকেতে করতে হবে যথাযথ প্রতিকার,
শোনেন শোনেন মন দিয়ে শোনেন সমাচার।
বৃক্ষকাটা বন্ধ কর, লাগাও বেশি গাছপালা,
পরিবেশ বিপন্ন হলে বাড়বে বেঁচে থাকার জ্বালা।
দেশের মানুষ ভাই বন্ধুরা যদি বাঁচতে চাও,
পতিত জমি বন বাদাড়ে বেশি বেশি গাছ লাগাও।
বাঁচা মরার প্রশ্ন এটা ভাবুন তো একবার,
অন্য দেশের অবহেলায় আমরা খাবো মার।
গাছ লাগিয়ে ভর্তি করা বিনার যত ভূমি,
দেশ বাঁচলে সবাই বাঁচবে বাঁচব আমি তুমি।
প্রকৃতির সাথে মোকাবেলায় জাগো সব একবার,
একাত্তরে গর্জে উঠেছিল যেমন সবার হাতিয়ার।
সবাই মিলে গাছ লাগাবো দেশটা হবে বন,
গাছের মতো নাইরে বন্ধু গাছ সবার প্রয়োজন।
বাঁচব আমরা সবাই মিলে বাঁচবে সোনার দেশ,
বদলে দেবো জলবায়ু, তথা বিশ্ব পরিবেশ।

১পরিচালক (অব.), বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী, কৃষি মন্ত্রণালয়। সেল : ০১৬১৪৪৪৬১১১। e-mail : ahiqbal.ahmed@yahoo.com  ২৪৪ সবুজ বাগলেন, মিস্ত্ররী পাড়া, খুলনা, মোবইল : ০১৭৩১৩৬৬৬২৫

বিস্তারিত
কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো আম ধ্বংস, বাস্তবতা ও করণীয়

মধু মাসের সবচেয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় ফল হচ্ছে আম। এ দেশে বর্তমানে যে ৭০টি ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে তার মধ্যে আম সবচেয়ে পছন্দনীয় ফল। সুমিষ্ট স্বাদ, মন মাতানো ঘ্রান ও পুষ্টিমান সব কিছু বিবেচনায় আম হচ্ছে সেরা। আবহাওয়াগত কারণে সারা বছর আম এ দেশের বাজারে পাওয়া যায় না। যদিও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্প্রতি বারি আম-১১ নামে আমের একটি বারোমাসী জাত উদ্ভাবন করেছে। এই উদ্ভাবিত জাতটি বছরে তিনবার ফলন দিচ্ছে। এই জাতটির চাষাবাদ যত দ্রুত মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে তত দ্রুত আম পছন্দকারী ভোক্তাগণ তাদের হাতের নাগালে আম পেতে পারেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা এই জাতের আম বাজারে ভালোভাবে আসতে আরও ৪-৫ বছর সময় লাগতে পারে। এ দেশে সাধারণত মে মাস হতে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত আম বাজারে সরবরাহ থাকে এবং ভোক্তাদের হাতের নাগালে থাকে। তবে বর্তমানের ব্যাগিং প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে আম প্রাপ্তির সময়কাল দীর্ঘায়িত হয়েছে। এখন নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসেও আশ্বিনা আম বাজারে পাওয়া যায়। বেশ ভালো দামেই কেনাবেচা হচ্ছে। প্রতি কেজি আমের দাম ৪০০-৭০০ টাকা যা আমচাষিরা কখনও চিন্তা করেননি বা স্বপ্নেও ভেবে দেখেননি। নাবী এই আশ্বিনা জাতের আমের দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাগণ না কিনে শুধুমাত্র দেখেই তৃপ্ত হন। এই আমগুলো বেশি দামে বিক্রি হয় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে।


একজন ক্রেতার বা ভোক্তার আম যতই পছন্দের হোক না কেন মে মাসের আগে নামিদামি জাতের আমগুলো খাওয়ার তেমন সুযোগ নেই বা পেলেও খাওয়া ঠিক হবে না। তবে গুটি জাতের আম বাজারে আসতে পারে যেমন বৈশাখী, রাজবৈশাখী ইত্যাদি। এ সময়ে কিছু ভারতের অপরিপক্ব এবং কম স্বাদযুক্ত রঙিন আম বাজারে দেখা যায় এবং এক শ্রেণির ক্রেতাগণ আগ্রহভরে কিনতে থাকেন এই আমগুলো। এই আমগুলোর দামও বেশি ১২০-১৫০ টাকা প্রতি কেজি কেনাবেচা হতে দেখা যায়। এই আমগুলো না খাওয়ায় উত্তম। এদেশের অনেকগুটি জাত আছে যেগুলো এপ্রিল মাসের শেষের দিকে পুষ্ট হয় এবং রাইপেনিং হরমোনের ব্যবহার করে ভারতের আমের সময়েই পাকানো যায়। উন্নত দেশে ৮০ ভাগ পরিপক্বতায় আম সংগ্রহ করে ইথিলিন চেম্বারে আম পাকানো হয়। কিন্তু স্বাদের ও পুষ্টিমানের কথা বিবেচনায় এখনও বাণিজ্যিকভাবে জোর করে আম পাকানোর বৈধতা দেওয়া হয় নাই। তবে ভারতের অপরিপক্ব আম আমদানির চেয়ে আমাদের দেশে  স্বল্প পরিসরে ইথাইলিন চেম্বার করে আম পাকানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই ইথিলিন চেম্বারে আম পাকালে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশি আমের প্রাপ্যতা আরও এক মাস বাড়তে পারে। এদেশের প্রথম বাজারে আসে সাতক্ষীরা জেলার আম। এই জেলার গোবিন্দভোগ আমটি মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পরিপক্বতা আসে। এরপর গোপালভোগ, খিরসাপাত/ হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি ও বারি আম-৩ (আ¤্রপালি) ও বারি আম-৪ জাতের আম বাজারে আসে। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ আম সাতক্ষীরা হতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমের পরিমাণ কম হওয়ায় চাহিদা অনেক বেশি থাকে। এই সুযোগটা ভালোভাবেই কাজে লাগান এই অঞ্চলের আমচাষিরা ও আম ব্যবসায়ীরা। ভালোভাবে হিমসাগর আম পরিপক্ব না হলেও একটু বেশি দাম পাওয়ার আশায় আগাম বাজারজাত করে থাকেন। এই অপরিপক্ব আমগুলো এমনিই পাকতে চায় না। তারপর ইথোফন/কার্বাইড ব্যবহার করে জোর করে পাকানোর চেষ্টা করেন বা করে চলেছেন। আর সমস্যাটির শুরু এখানেই। সাতক্ষীরা জেলার ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত কারণে আম পাকবে তুলনামূলক আগে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, হিমসাগর আম পাকবে মে মাসের ১০ তারিখ হতে। গবেষণায় দেখা গেছে, মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত হিমসাগর আমের আটিই ভালোভাবে শক্ত হয় না। তবে বিগত কয়েক বছর পর্যাপ্ত তথ্য না থাকার কারণে আম গবেষকরা এই বিষয়ে তেমন কোনো মতামত দেননি। তবে বর্তমানে গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন জাতের আম সংগ্রহের সময়ে তারতম্য হচ্ছে। যেমন ২০১৭ সাল পর্যন্ত ধারণা করা হতো, সাতক্ষীরা জেলার হিমসাগর আম মে মাসের ১০-১৫ তারিখের মধ্যে পরিপক্বতা আসে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেখা যাচ্ছে, এর চেয়ে আরও ১০ দিন পরে পরিপক্বতা আসছে। ফলে এই সময়ের আগে যেন এই জাতটি সংগ্রহ করা না হয় সেইদিকে স্থানীয় প্রশাসনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই তথ্যটি বের করতে বিজ্ঞানীরা সময় নিয়েছেন তিনটি বছর। এখন বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, কোনো জাতের আম পরিপক্ব হতে কত দিন সময় লাগে, জেলার অক্ষাংশ বিবেচনায় কোন জেলার কোন জাত কখন পাকবে ইত্যাদি। সেই ফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিজ্ঞানীরা সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আম উৎপাদনকারী জেলার বিভিন্ন জাতের আম পরিপক্বতার সম্ভাব্য সময়কাল নির্ধারণ করেছেন যা অনুসরণ করলে আমচাষি, আম ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবাই উপকৃত হবেন। মৌসুমের শুরুতে প্রতি বছর অনেক আম বিভিন্ন অজুহাতে নষ্ট বা ধ্বংস করা হয় যেটি কৃষি সংশ্লিষ্ট কারও কাম্য নয়। সুতরাং আগাম আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে আম সংগ্রহের সময় অনুসরণ করে নজরদারি বাড়ালে সুফল মিলবে এমনটিই মনে করেন আম বিজ্ঞানীরা।


ভোক্তাদের জন্য একটি সুখবর হলো ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত আমগুলো নিরাপদ, বিষমুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত ও রপ্তানিযোগ্য। সুতরাং এই প্রযুক্তিটির ব্যবহার মাঠ পর্যায়ে যতবেশি বাড়বে ততই ভোক্তাদের ঝুঁকি কমবে। কারণ এই প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে আম উৎপাদন করলে জাতভেদে বালাইনাশকের ব্যবহার কমে ৩০-৭০ ভাগ। ব্যাগিং প্রযুক্তির আম আমচাষিরা কখনও পরিপক্ব হওয়ার আগে সংগ্রহ করেন না এবং এখন পর্যন্ত এক কেজি ব্যাগিং আম বিভিন্ন কারণে নষ্টের কোনো নজির নেই।


এছাড়াও পরিপক্ব আম চেনার কয়েকটি সহজ উপায় আছে। যেমন- সকাল বেলায় ২/১টি পাকা আম গাছের নিচে পড়ে থাকবে এবং পরিপক্ব আম পানিতে সম্পূর্ণরূপে ডুবে যাবে, আধাপাকা আম পাখি ঠোকরাবে এবং গাছের নিচে পড়ে থাকতে দেখা যাবে।


আমচাষিদের সময়মতো আম সংগ্রহ উৎসাহিত করতে দুইটি স্লেোগান খুবই কার্যকরী..
“পরিপক্ব ফল খাই
 পরিপূর্ণ পুষ্টি পাই”
‘গাছ থেকে যদি ভাই পুষ্ঠ আম পাড়
স্বাদ পাবে, পুষ্টি পাবে, ফলন বাড়বে আরো’
আমচাষিরা যেভাবে উপকৃত হবেন

 

আমগাছে আম থাকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। কোনোভাবেই বা কোনো কিছু প্রয়োগের মাধ্যমে আম দীর্ঘদিন গাছে রাখার কোনো সুযোগ নেই। আমের গুটি বাঁধার পর ধারাবাহিকভাবে আম বড় হতে থাকে এবং আমের ওজন বাড়তে থাকে এবং শেষের সময়ে এই ওজন বৃদ্ধির হার পূর্বের চেয়ে বেশি। গড়ে প্রতিদিন একটি আমের প্রায় ৩-৫ গ্রাম করে ওজন বাড়তে থাকে। এটি একটু বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোধগম্য হবে। হিমসাগর আম ৪০ কেজি হতে প্রয়োজন হয় প্রায় ১৭০টি আমের। প্রতিদিন যদি ৩ গ্রাম ওজন বাড়ে তাহলে মোট ওজন বাড়বে প্রায় ৫০০ গ্রাম। আর যদি ৫ গ্রাম ওজন বাড়ে তাহলে মোট ওজন বাড়বে ৮৫০ গ্রাম। তাহলে একজন চাষি যদি ৭ দিন পর আম সংগ্রহ করেন তাহলে প্রায় প্রতি ৪০ কেজির (এক মণ) জায়গায় ৪৬ কেজি আম সংগ্রহ করবেন। এভাবে একটি গাছে যদি ১০ মণ আম ধরে এবং সঠিক সময়ে সংগ্রহ করলে ১১.৫ মণ আম সংগ্রহ করতে পারবেন। অর্থাৎ একটি মাঝারি আম গাছ হতে ৩-৪ হাজার টাকা বেশি পেতে পারেন।
ব্যবসায়ীরা যেভাবে উপকৃত হবেন

অপরিপক্ব আম কেনার পর পাকানোর জন্য অস্থির হয়ে থাকেন আম ব্যবসায়ীরা। ব্যবহার করেন ইথোফোন/কার্বাইডসহ বিভিন্ন রাইপেনিং হরমোন। এরপরও অনেক আম পচে নষ্ট হয়। ভোক্তারা আম খাওয়ার পর সন্তুষ্ট থাকেন না ফলে ব্যবসার সুনাম নষ্ট হয়। পরিপক্ব আম বাজারজাত করলে কোনো ঝুঁকি থাকে না। আমগুলো অনেক আস্তে পাকে এবং সংগ্রহোত্তর ক্ষতি অনেক কমে যায়। এই জাতীয় পরিপক্ব ও পুষ্ট আম কিনে ও খেয়ে ক্রেতারা সন্তুষ্ট থাকেন এবং ব্যবসার সুনাম বাড়তে থাকে। অর্থাৎ আমের ব্যবসা লাভজনক হয়।
ক্রেতা/ভোক্তারা যেভাবে উপকৃত হবেন

 

সময়মতো আম সংগ্রহ হলে ভোক্তাদের আম বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা থাকে না। প্রতিটি জাতের আম থেকে কাক্সিক্ষত স্বাদ পেয়ে থাকেন এবং আম খাওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। ক্রয়কৃত আম নষ্টের পরিমাণ অনেক কমে যায়।
 

পরিশেষে, আমচাষিদের কষ্টের আম যেন অযথা নষ্ট না হয় সে দিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। অপরিপক্ব আমে অবৈধ কোনো রাসায়নিকের ব্যবহার হলে ঢাকায় নয় উৎপাদনকারী এলাকাতেই নষ্টের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ইচ্ছে করলে খুব সহজেই এটি বন্ধ করতে পারেন। দেশের সব ক্রেতাদের জন্য সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য হোক দেশীয় এই জনপ্রিয় মৌসুমি ফলটি এমনটিই প্রত্যাশা ফল বিজ্ঞানীদের।

 

ড. মো. শরফ উদ্দিন


ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আকবরপুর, মৌলভীবাজার,  মোবা : ০১৭১২১৫৭৯৮৯, ই-মেইল :sorofu@yahoo.com

 

 

বিস্তারিত
ঢেঁড়সের রোগ ও তার প্রতিকার

ঢেঁড়স বাংলাদেশের অন্যতম গ্রীষ্মকালীন সবজি। সবজি হিসেবে এটি সবার নিকটই প্রিয়। এতে অধিক মাত্রায় ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম এবং খনিজ পদার্থ আছে। ঢেঁড়সের বীজে উচ্চমানের তেল ও আমিষ আছে। আমাশয়, কোষ্টকাঠিন্যসহ পেটের পীড়ায় ঢেঁড়স অত্যন্ত উপকারী। আবার ঢেঁড়স গাছের আঁশ দিয়ে রশি তৈরি হতে পারে। কিন্তু এই জনপ্রিয় সবজিটি বেশ কিছু ক্ষতিকারক রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। ওই রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ঢেঁড়সের ফলন অনেক বৃদ্ধি পাবে। নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ ও তার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করা হলো।  
 

১. রোগের নাম : ঢলে পড়া (Fusarial wilt) রোগ
রোগের কারণ : ফিজারিয়াম অক্সিসপোরাম এফএসপি ভ্যাজিনফেক্টাম (Fusarium oxysporum f.sp. vesinfectum) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তার : ছত্রাকগুলো প্রধানত মাটি বাহিত এবং অন্যান্য শস্য আক্রমণ করে। মাটিতে জৈব সার বেশি থাকলে এবং জমিতে ধানের খড়কুটা থাকলে জীবাণুর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। সাধারণত মাটির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে (২৮-৩০ ডিগ্রি সে.) ও যথেষ্ট পরিমাণ আর্দ্রতা থাকলে এ রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। পানি সেচের মাধ্যমে আক্রান্ত ফসলের জমি হতে সুস্থ ফসলের মাঠে বিস্তার লাভ করে।
রোগের লক্ষণ : এ রোগ ঢেঁড়স গাছের বৃদ্ধির যে কোনো পর্যায়ে হতে পারে। তবে চারা গাছগুলোতেই বেশি দেখা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় গাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। রোগের আক্রমণ বেশি হলে পাতা গুটিয়ে যায় এবং সর্বশেষে গাছটি মরে যায়।
আক্রান্ত গাছের কা- বা শিকড় লম্বালম্বিভাবে চিরলে এর পরিবহন কলাগুলোতে কালো দাগ দেখা যায়।         
প্রতিকার : শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে। বর্ষার আগে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের মধ্যে ঢেঁড়শের বীজ বপন করতে হবে। রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন-বারি ঢেঁড়স ১ চাষ করতে হবে।


ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়ে ফেলতে হবে। জমিতে চুন প্রয়োগ করতে হবে।
জমিতে উপযুক্ত পরিমাণে পটাশ সার প্রয়োগ করলে রোগ অনেক কম হয়। শিকড় গিট কৃমি দমন করতে হবে কারণ এটি ছত্রাকের অনুপ্রবেশে সাহায্য করে।  কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করতে হবে। কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর গাছের গোড়ায় ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।        

 

২.  রোগের নাম : গোড়া ও কাণ্ড পচা (Foot and stem rot) রোগ
রোগের কারণ : ম্যাক্রোফোমিনা ফেসিওলিনা  (Macrophomina phaseolina) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তার : রোগটি বীজ, মাটি ও বায়ু বাহিত। উষ্ম ও আর্দ্র আবহাওয়া, অতিরিক্ত নাইট্রোজন ও কম পটাশ সার ব্যবহার করলে এ রোগের প্রকোপ বেশি হয়। মাটির উষ্ণতা (৪০ ডিগ্রি সে.) বেশি হলেও রোগ বেশি হয়।
রোগের লক্ষণ : সাধারণত মে মাসের দিকে এই রোগ দেখা যায় এবং জুন-জুলাই মাসে মারাত্মক আকার ধারণ করে।
মাটি সংলগ্ন গাছের গোড়া নরম হয়ে পচে যায়। আক্রান্ত শিকড়ে ও কা-ে কালো বিন্দুর ন্যায় পিকনিডিয়া দেখা যায়। রোগ বিকাশের অনুকূল অবস্থায় ২-৩ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ গাছ শুকিয়ে যায়।        
প্রতিকার  : সুস্থ বীজ বপন করতে হবে। শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে। মৌসুমের শুরুতেই ক্ষেতের গাছ শিকড়সহ উঠিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে। বর্ষার আগে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের মধ্যে ঢেঁড়সের বীজ বপন করতে হবে। রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন-বারি ঢেঁড়স ১ চাষ করতে হবে।
কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন+থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করতে হবে।
মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক  (যেমন-ডাইথেন এম ৪৫) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-সানভিট ৫০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।        

 

৩. রোগের নাম : শিরা স্বচ্ছতা বা হলুদ শিরা মোজাইক (Vein clearing or yellow vein mosaic) রোগ
রোগের কারণ : ভাইরাস (ঠরৎঁং) দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তার : ভাইরাস আক্রান্ত ঢেঁড়স গাছের সংগৃহীত বীজ বপনের ফলে এ রোগ হয়ে থাকে। আর্দ্র আবহাওয়ায় রোগাক্রান্ত বিকল্প পোষক হতে সাদা মাছি দ্বারা এ রোগ ছড়ায়। পরাগায়নের মাধ্যমে ও কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে এ রোগ সুস্থ গাছে বিস্তার লাভ করে।
রোগের লক্ষণ : গাছের যে কোনো বয়সেই এ রোগ হতে পারে। ভাইরাস আক্রান্ত পাতার শিরাগুলো স্বচ্ছ হয়ে যায়। রোগ মারাত্মক হলে সম্পূর্ণ পাতাই হলুদ বর্ণ ধারণ করে, পাতা ছোট হয় ও গাছ খর্বাকৃতি হয়। রোগাক্রমণের ফলে গাছে ফুল কম হয়, ফল আকারে ছোট, শক্ত ও হলুদাভ সবুজ রঙের হয়।        
প্রতিকার : রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন-বারি ঢেঁড়স ১ চাষ করতে হবে। রোগাক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে পুড়ে ফেলতে হবে।
পরবর্তী বছর বপনের জন্য আক্রান্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করা যাবে না।
সাদা মাছি দমনের জন্য ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক  (যেমন-অ্যাডমায়ার বা ইমিটাফ) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

 

৪.  রোগের নাম : পাতায় দাগ (Leaf spot) রোগ
রোগের কারণ : অলটারনারিয়া ও সারকোসপোরা (Alternaria and Cercospora) প্রজাতির ছত্রাকদ্বয়ের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তার : গাছের পরিত্যক্ত অংশ হতে রোগের জীবাণু বায়ু, পানি প্রভৃতির মাধ্যমে এক জমি হতে অন্য জমি অথবা এক গাছ হতে অন্য গাছে ছড়ায়।
রোগের লক্ষণ : যে কোনো বয়সের গাছ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।


অলটারনারিয়া নামক ছত্রাক পাতায় বিভিন্ন আয়তনের গোলাকার, বাদামি ও চক্রাকার দাগ উৎপন্ন করে। সাধারণত দুর্বল গাছে এই রোগ বেশি হয়। সারকোসপোরা নামক ছত্রাক পাতার ওপরে কোনো দাগ সৃষ্টি করে না কিন্তু পাতার নিচের দিকে ঘন কালো গুঁড়ার আস্তরণের সৃষ্টি করে। রোগের প্রকোপ বেশি হলে পাতা মুচড়িয়ে যায় এবং পরে ঝলসে ঝড়ে পড়ে।                
প্রতিকার : ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়ে ফেলতে হবে।


রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে, যেমন-বারি ঢেঁড়স-১। পরিমিত সার ও সময়মতো সেচ প্রয়োগ করতে হবে। কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন+থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করতে হবে। অলটারনারিয়া পাতায় দাগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-রোভরাল ৫০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা ডাইফেনোকোনাজল+এ্যাজোক্সিস্ট্রবিন গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-এমিস্টার টপ ৩২৫ এসসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার গাছে স্প্রে করতে হবে। সারকোসপোরা পাতায় দাগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম অথবা প্রোপিকোনাজোল গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-টিল্ট ২৫০ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পরপর ২-৩ বার গাছে স্প্রের করতে হবে।
 

৫.  রোগের নাম : শিকড় গিট (Root knot) রোগ
রোগের কারণ : মেলোয়ডোগাইন (Meloidogyne spp.) প্রজাতির কৃমির আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তার : মেলোয়ডোজাইন প্রজাতির কৃমি মাটিতে বসবাস করে। আক্রান্ত মাটি, শিকড়ের অংশ, বৃষ্টি ও সেচের পানি এবং কৃষি যন্ত্রপাতির দ্বারা এ রোগ বিস্তার লাভ করে। সাধারণত ২৭-৩০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা, হালকা মাটি ও একই জমিতে বছরের পর বছর ঢেঁড়স চাষ করলে এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
রোগের লক্ষণ  : চারা অবস্থায় কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং গাছ খর্বাকৃতির হয়।
পাতা হলুদাভ সবুজ বা হলুদ রঙ ধারণ করে ও পাতা ঝড়ে পড়ে। গাছে ফুল ও ফলের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
আক্রান্ত গাছের মূলে ও মূলরোমে অসংখ্য গিট দেখা যায়।
এ গিটগুলো দেখতে সাদাটে রঙের হয়।    
প্রতিকার : ফসল সংগ্রহের পর অবশিষ্টাংশ পুড়ে ফেলতে হবে।


শুষ্ক মৌসুমে জমি পতিত রেখে ২/৩ বার চাষ দিয়ে মাটি ভালোভাবে শুকাতে হবে। এতে কৃমি মরে যায়। গম, ভুট্টা, বাদাম, সরিষা ইত্যাদি দ্বারা শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে। জমি প্লাবিত করে রাখলে এ রোগের কৃমি মারা যায়, তাই সুযোগ থাকলে বছরে একবার প্লাবিত করে রাখতে হবে।
হেক্টর প্রতি ৫ টন অর্ধ পচা মুরগির বিষ্ঠা জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োগের ২-৩ সপ্তাহ পর জমিতে বীজ বপন করতে হবে।

 

রোগের লক্ষণ দেখা গেলে হেক্টরপ্রতি ৪০ কেজি কার্বোফুরান গ্রুপের কীটনাশক (যেমন-ফুরাডান ৫জি) অথবা ইসাজোফস গ্রুপের কীটনাশক (যেমন-মিরাল ৩জি) মাটিতে ছিটিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে দিয়ে হালকা সেচ দিতে হবে।

 

বিজ্ঞানী ড. কে এম খালেকুজ্জামান
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব), মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই শিবগঞ্জ, বগুড়া। মোবাইল : ০১৯১১-৭৬২৯৭৮, ই-মেইল : zaman.path@gmail.com

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর ১৪২৬

কৃষি বিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।

 

নাজমুল সরকার, গ্রাম : মাধবপাশা, উপজেলা : বাবুগঞ্জ, জেলা : বরিশাল

প্রশ্ন :  আদা গাছের কা- হলুদ হয়ে যায় এবং আদা পচে যায়। এ অবস্থায় কী করণীয়?
উত্তর :  এ সমস্যা দূরীকরণে একই জমিতে বার বার আদা চাষ করা যাবে না। এ ছাড়া আদা পচে যাওয়া রোধ করতে জমিতে আদা লাগানোর আগে ধানের/কাঠের গুঁড়া ও খড় দিয়ে আগুন লাগিয়ে জমিকে শোধন করতে হবে এবং জমিতে নিমের খৈল ২ টন প্রতি হেক্টরে প্রয়োগ করলে সুফল পাওয়া যাবে।

 

কমল সরকার, গ্রাম : সুরগ্রাম, উপজেলা : গোপালগঞ্জ সদর, জেলা : গোপালগঞ্জ

প্রশ্ন : জলপাই ফলে দাদের মতো খসখসে দাগ পড়ে। বাজারে কম দাম পাই। সমস্যার সমাধান জানাবেন?  
উত্তর :  জলপাই গাছের গোড়ার মাটিতে বোরন নামক পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হলে জলপাই ফলের গায়ে দাদের মতো খসখসে দাগ পড়ে। আর এতে করে ফলের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায় এবং বাজারে দামও কম পাওয়া যায়। এ সমস্যা প্রতিকারে বর্ষার শেষ দিকে গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম হারে বরিক এসিড বা ১০০ গ্রাম হারে বোরাক্স প্রয়োগ করতে হবে। এসব ব্যবস্থা নিলে আপনি উপকার পাবেন।  

 

মো: রাকিব, গ্রাম : চানপুর, উপজেলা : জগনাথপুর, জেলা : সুনামগঞ্জ

প্রশ্ন :   কদবেল গাছের ছাঁটাইকরণ সম্পর্কে জানাবেন।  
উত্তর :  কদবেল গাছের ছাঁটাইকরণ সাধারণত কদবেলের চারা/কলমের ছোট অবস্থায় করা হয়।  কারণ চারা/ কলমের ছোট অবস্থায় কদবেল গাছ ঝোপালো হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। সে কারণে চারা রোপণের পর গোড়ার দিকে ১.০ থেকে ১.৫ মিটার পর্যন্ত সমস্ত ডাল ছাঁটাই করতে হবে। তারপর কদবেল গাছের উপর দিকের চারপাশে ৪ থেকে ৫টি ডাল রেখে দিতে হবে যাতে করে কদবেল গাছের সুন্দর কাঠামো তৈরি হয়। তাছাড়া ফল সংগ্রহ শেষে গাছের অপ্রয়োজনীয় মড়া ও রোগাক্রান্ত ডালপালা ছেঁটে দেয়া প্রয়োজন। এভাবে কদবেল গাছ ছাঁটাই করলে সুফল পাবেন।     

 

মো: জাহিদ হাসান, গ্রাম : ভানরদীঘিপাড়া, উপজেলা : বালিয়াডাঙ্গি, জেলা : ঠাকুরগাঁও

প্রশ্ন : রাম্বুতান ফল গাছের বংশবিস্তার সম্পর্কে জানাবেন।
উত্তর :   অঙ্গজ বা বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করা যায়। তবে গাছের মাতৃগুণ বজায় রাখতে অঙ্গজ উপায়ে বংশবিস্তার করা উত্তম। কুঁড়ি সংযোজন, বায়বীয় দাবা কলম ও সংযুক্ত দাবা কলম পদ্ধতিতে রাম্বুতানের বংশবিস্তার করা যায়। এক থেকে দুই বছর বয়সী শাখা থেকে সুপ্ত কুঁড়ি সংগ্রহ করে ৮ থেকে ১২ মাস বয়সের রুটস্টকে সংযোজন করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে সংযুক্ত দাবা কলম পদ্ধতির সফলতার হার বেশি। এ ছাড়া ১০০০ থেকে ১৫০০ পিপিএম ঘনত্বের আইবিএ ব্যবহার করে বায়বীয় দাবা কলম পদ্ধতির সফলতা বৃদ্ধি করা যায়।   

 

বাদল সাহা, গ্রাম : প্যারাডাইসপাড়া, উপজেলা : টাঙ্গাইল সদর, জেলা : টাঙ্গাইল

প্রশ্ন :  কামরাঙা ফল পচে যায় এবং গাছের পাতা ঝরে পড়ে। কী করণীয়?
উত্তর : কামরাঙা গাছের পাতা ও ফলে অ্যানথ্রাকনোজ রোগের আক্রমণে এ ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। এ রোগটি ছত্রাকের আক্রমণে হয়। এ রোগ হলে পাতা, ফুল ও ফলে ছোট ছোট বাদামি দাগ পড়ে। দাগগুলো আস্তে আস্তে বড় হয়ে কালো রঙ ধারণ করে এবং আক্রান্ত স্থান পচে যায়। এ রোগ দমনে আক্রান্ত পাতা, ফুল ও ফল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আর রোগ দেখা দিলে কার্বেনডাজিম গ্রুপের নোইন ৫ ডব্লিউপি প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন অন্তর ২ বা ৩ বার সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যাবে।

 

সুনীল চন্দ্র রায়, গ্রাম : তালুকগোলনা, উপজেলা : জলঢাকা, জেলা : নীলফামারী

প্রশ্ন :  বেগুন গাছের জাবপোকা দমন সম্পর্কে জানাবেন।  
উত্তর :  বেগুন গাছের জাবপোকা দমনের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয় সেগুলো হলো- বেগুন সংগ্রহের পর ফসলের অবশিষ্টাংশ নষ্ট করে ফেলা। আঠালো হলুদ ফাঁদ ব্যবহার করা। এ ছাড়া বায়োনিম প্লাস ১ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত পাতায় স্প্রে করা। এ ছাড়াও ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের যেমন এডমায়ার প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি ভালোভাবে মিশিয়ে স্প্রে করলে উপকার পাবেন।

 

মৎস্য বিষয়ক
মোস্তাফিজুর রহমান, গ্রাম: বালাগ্রাম, উপজেলা : জলঢাকা, জেলা : নীলফামারী

প্রশ্ন : প্রোবায়োটিক কী? কিভাবে কাজ করে জানতে চাই।
উত্তর : ‘প্রোবায়োটিক’ এর সহজ অর্থ জীবনের জন্য’। গ্রিক শব্দ ‘প্রো’ অর্থাৎ ‘ফর’ বা ‘জন্য’ এবং ‘বায়োস’ অর্থাৎ লাইফ বা জীবন হতে প্রোবায়োটিক শব্দটির উৎপত্তি।  প্রোবায়োটিক হচ্ছে জীবন্ত অণুজীবের সমষ্টি, যা পোষক যেমনÑমাছ, চিংড়ি ইত্যাদি দেহের অভ্যন্তরে অথবা বাইরের পরিবেশে অর্থাৎ মাটি ও পানি অবস্থিত অণুজীবসমূহকে অনুকূলে পরিবর্তন করে। তাছাড়া প্রোবায়োটিকসমূহ খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধিসহ এর পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাণীদেহে রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করে এবং প্রাণীদেহে বাইরে অবস্থিত সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে প্রাণীর উপর উপকারী প্রভাব ফেলে। প্রোবায়োটিকের কাজ: প্রোবায়োটিকসমূহ এমন কিছু পদার্থ নিঃসরণ করে যা রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ধ্বংস করে বা এদের বংশবিস্তার রোধ করে। প্রোবায়োটিকসমূহ খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুসমূহের সাথে প্রতিযোগিতা করে তাদের বিস্তার রোধ করে। পোষক দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। জলাশয়ের মাটি ও পানির গুণাগুণ বৃদ্ধি করে। জলাশয়ে ফাইটোপ্লাংটনের স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখার পাশাপাশি গুণগত মানও বৃদ্ধি করে। পোষক দেহে এনজাইম উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য হজমে সহায়তা করার পাশাপাশি এর সর্Ÿোচ্চ ব্যবহারও নিশ্চিত করে।   

 

আকতার হোসেন, গ্রাম : বিষ্ণুগ্রাম উপজেলা :  পাইকগাছা, জেলা : খুলনা

প্রশ্ন : চিংড়ির খোলস নরম হয়ে গেছে। কী করব?  
উত্তর : পুষ্টিকর খাদ্য, খাবারে ক্যালসিয়ামের অভাব এবং  পুকুরে দূষিত গ্যাস সৃষ্টি হলে এ রকম হয়। সে কারণে এ সমস্যার সমাধানে পুকুরের পানি পরিবর্তন করতে হবে এবং একরপ্রতি ৫০ কেজি ডলোমাইট চুন প্রয়োগ করতে হবে। এভাবে পুকুরে ব্যবস্থাপনা করলে আপনি উপকৃত হবেন।

 

প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
আনোয়ার হোসেন, গ্রাম : জলিশা, উপজেলা : দুমকি, জেলা : পটুয়াখালী
প্রশ্ন : আমার বাছুরের বয়স ১৫ দিন। নাভী ফুলে গেছে। জ্বর আছে, নাভীতে পুঁজ হয়েছে। এমতাবস্থায় কী করণীয়?

উত্তর : নাভীর ক্ষতস্থান টিংচার-আয়োডিন দ্বারা পরিষ্কার করতে হবে। নাভী পেকে গেলে একটু কেটে সম্পূর্ণ পুঁজ বের করে ফেলতে হবে। পরে জীবাণুনাশকযুক্ত পানি দ্বারা পরিষ্কার করে কাটা জায়গার মধ্যে টিংচার আয়োডিনযুক্ত গজ ঢুকাতে হবে। একদিন পরপর এভাবে পরিষ্কার করে গজ ঢুকাতে হবে। এছাড়া পেনিসিলিন অথবা স্ট্রেপটোমাইসিন ইনজেকশন দিতে হবে।     

 

নকিব হাসান, গ্রাম : বালাপাড়া, উপজেলা : কাউনিয়া, জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : আমার মুরগির খুব ডায়রিয়া হচ্ছে। ডানা ঝুলে পড়েছে। একদম নিস্তেজ হয়ে গেছে। কী করব?

উত্তর : অ্যামক্সাসিলিন অথবা সিপ্রোক্লক্সাসিন গ্রুপের ওষুধ খাওয়াতে হবে এবং সাথে ইলেকট্রোমিন পাউডার খাওয়াতে হবে।
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)

 

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন


উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল নং ০১৭১১১১৬০৩২, ঃধঁভরয়ঁবফধব২৫@মসধরষ.পড়স

 

 

বিস্তারিত
মাশরুম চাষ : ঘরে বসে আয়

মাশরুম অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণসম্পন্ন খাবার। এতে আছে প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, অ্যামাইনো এসিড, অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। স্বাদ, পুষ্টি ও ঔষধিগুণের কারণে ইতোমধ্যেই এটি সারা দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাশরুম চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ যুবকরা মাশরুম চাষ করছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গৃহিণীরাও চাষ করছেন। অর্থাৎ আমাদের দেশে ঘরোয়াভাবে এবং বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে। মাশরুম চাষ আমাদের দেশের বেকার সমস্যা সমাধান এবং বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে মাশরুম বিশেষ অবদান রাখতে পারে।


কেন চাষ করবেন : এটি ঘরের ফসল, চাষের জন্য কোনো আবাদি জমির প্রয়োজন হয়না। যার মোটেই চাষের জমি নাই তিনিও বসত ঘরের পাশের অব্যবহৃত জায়গায় অথবা ঘরের উত্তর পাশের বারান্দা ব্যবহার করে অধিক পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন করতে পারেন। বীজ উৎপাদনের জন্য যেসব কাঁচামালের প্রয়োজন হয় যেমন- খড়, কাঠের গুঁড়া, কাগজ, গমের ভুসি ইত্যাদি তা সহজলভ্য ও সস্তা। এদেশের আবহাওয়াওমাশরুম চাষের জন্য অত্যান্ত উপযোগী। সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ মাশরুম চাষ করতে পারেন। পারিবারিক শ্রমকে কাজে লাগানো যায়। তাকে তাকে চাষ করা যায়। স্বল্প পুঁজি ও শ্রম ব্যয় করে অধিক আয় করা সম্ভব। এছাড়াও মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কর্তৃক কৃষকবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হওয়ায় বাংলাদেশে মাশরুম চাষ সহজ হয়েছে।


যেভাবে শুরু করবেন : মাশরুম চাষের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট প্রতি কর্মদিবসে ‘মাশরুম অবহিতকরণ ও কার্যক্রম প্রদর্শন’ শীর্ষক অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে। আবাসিক সুবিধার প্রয়োজন হলে স্থানীয় কৃষি অফিসের সুপারিশ সংবলিত একখানা আবেদনপত্র অত্র ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক বরাবর দাখিল করতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে আপনি মাশরুম চাষ, স্পন উৎপাদন, মাশরুম বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিখতে পারবেন।


প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর প্রয়োজন পুঁজি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক করতে হবে দৈনিক কী পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন করবেন এবং নিজের স্পন নিজেই উৎপাদন করবেন কিনা। এরপর স্থান নির্বাচন, প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ, যন্ত্রপাতি ক্রয় ইত্যাদি।


পুঁজি : প্রাথমিকভাবে ৫,০০০-৫০,০০০/- মাশরুম চাষ শুরু করা সম্ভব। বীজ উৎপাদনের জন্য মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক ড. নিরদ চন্দ্র সরকার স্যারের উদ্ভাবিত স্টেরিলাইজেশন কাম ইনোকুলেশন চেম্বার ব্যবহার করলে লাগে মাত্র ৮০০০/-। যন্ত্রটি ব্যহারের সুবিধা হলো একইসাথে বীজ/সাবস্ট্রেট জীবাণুমুক্তকরণ এবং বীজ প্রতিস্থাপন/ ইনোকুলেশন করা যায় অর্থাৎ আটোক্লেভ ও ক্লিনবেঞ্চের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
 

ঝুঁকি : মাশরুম চাষের জন্য যেসব যন্ত্রপাতি বর্তমানে ব্যবহার করা হয় তাতে কোনো প্রকার ঝুঁকি নেই। ড. নিরদ চন্দ্র সরকার স্যারের উদ্ভাবিত পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতিতে স্পন উৎপাদন করলে কন্টামিনেশন নেই বলে ঝুঁকি কম। এছাড়া এটি যেহেতু ঘরের ফসল সেকারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মুক্ত।
মাস্টার মাদার কালচার সংগ্রহ : মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট অথবা মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রশিক্ষিত যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হতে সংগ্রহ করা যাবে।

 

সহজ পদ্ধতিতে বীজ উৎপাদন : মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক ড. নিরদ চন্দ্র সরকার উদ্ভাবিত স্টেরিলাইজেশন কাম ইনোকুলেশন চেম্বার ব্যবহার করে একদিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন মানুষ সহজেই স্পন প্যাকেট উৎপাদন করতে পারে। নিজের বীজ নিজে উৎপাদন করলে মাশরুম উৎপাদন খরচ কমে যাবে।
 

মাশরুম উৎপাদন ক্যালেন্ডার অনুসরণ : মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত মাশরুম উৎপাদন ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে চাষ করলে সারা বছর ভালো ফলন পাওয়া যায় বিধায় লাভবান হওয়া সম্ভব। মাশরুম উৎপাদন ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে চাষ করলে শীত এবং গ্রীষ্মে ফলনের পার্থক্য কমানো সম্ভব।
 

কম সময়ে দ্রুত ফলন : পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতিতে স্পন প্যাকেট উৎপাদন করলে মাইসেলিয়াম দ্বারা পরিপূর্ণ হতে ১০-১৫ দিন সময় লাগে। এছাড়া জাতভেদে স্পন প্যাকেট কর্তনের ৩-৭ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায় বিধায় বিনিয়োগকৃত অর্থ অল্প সময়ে তুলে আনা সম্ভব।


বাজার সম্ভাবনা : আমাদের দেশের বড় বড় শহরগুলোর বিভিন্ন হোটেল, সুপারশপ ও চাইনিজ রেস্টুরেন্টগুলোতে মাশরুমের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় কাঁচাবাজার, ফ্রাইশপ, মুদি দোকান, গলির মোড়, বাসস্ট্যান্ড ইত্যাদি জায়গায় বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। মাশরুম শুকিয়ে দূর-দূরান্তে বিক্রি করা সম্ভব এমনকি বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ধারণায় মাশরুম হাট গড়ে উঠেছে এবং বিভিন্ন জেলার কাঁচা ও শুকনা মাশরুম বিক্রির ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করা হয়।


প্রশিক্ষণ নিয়ে যে কেউ শুরু করতে পারেন এই মাশরুম চাষ। আর ঘরে বসে আয় করতে পারেন বাড়তি কিছু টাকা। একজন মানুষ যেকোনো কাজের বা চাকরির পাশাপাশি মাশরুম চাষকরে বাড়তি কিছু আয় করতে পারেন। আবার মাশরুমই হতে পারে তার বাঁচার/আয়ের একমাত্র উৎস। এভাবে দেশের অনেকেই মাশরুম চাষ করে নিজে ভাগ্য বদল করেছেন।

 

ড. আখতার জাহান কাঁকন

উপজেলা কৃষি অফিসার (এলআর), খামারবাড়ি, ঢাকা। সংযুক্ত : মাশরুম বিশেষজ্ঞ, মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, সাভার, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৮১৩৭১১৩, ই-মেইল :  kakon.smdp@gmail.com

 

বিস্তারিত
বরিশাল অঞ্চলের খই-মুড়ির ধান

যে যুগে বেকারি বা কনফেকশনারি ও ফাস্ট ফুড ছিল না তখন চিড়া, খই, মুড়িই ছিল গ্রাম বাংলার অন্যতম জল খাবার এবং অতিথি আপ্যায়নের সামগ্রী, লৌকিকতার প্রধান উপকরণ। এখন যেমন শরবত, স্কোয়াশ, কোকা কোলা, ফান্টা ইত্যাদি হলো আপ্যায়নের পানীয়- সে যুগে ছিল ডাবের পানি। এখনো গ্রাম বাঙলায় আপ্যায়নের এই রীতি বহমান। তবে আধুনিকতার মিশেলে সেই ঐতিহ্য মূলধারাটি অনেক জায়গাতেই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এর কারণ বহুবিধ। বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও রুচি পরিবর্তনের পাশাপাশি বর্তমান ব্যস্ত ও কর্মচঞ্চল জীবনধারায় বাড়ির মেয়েদের খই মুড়ি ভাজার জন্য আলাদা সময় কোথায়? তাছাড়া এসব করতেও আলাদা একটা দক্ষতা ও কৌশলের প্রয়োজন হয় যা বাঙালি পরিবারগুলোতে বংশপরম্পরায় রপ্ত হয়। দাদি দিদিমা পারলে নাতনিরাও পারে, শাশুড়ি জানলে পুতের বউকে শিখিয়ে যায়। কিন্তু তারাই যদি না জানেন তাহলে এই জানা শেখাটা আসবে কোথা থেকে? এর জন্য তো আলাদা কোনো পাঠশালা বা বই নেই। এটা একান্তই আমাদের লৌকিক ক্রিয়া ও মৌখিক লোকজ ধারা। এ ছাড়া খই, মুড়ি, মুড়কি, চিড়া তো আর সব ধানের চালে হয় না। তার জন্য বিশেষ বিশেষ জাতের ধান লাগে। একটা লোকগানের মাধ্যমে আমরা সে পরিচয় পাই-
কচ্-কচা-কচকচ্-কচা-কচ্ ধান কাটিরে
(ও ভাই) ঝিঙ্গাশাইলের হুড়–ম ভালা
বাঁশফুলেরই ভাত
লাহি ধানের খইরে
দইয়ে তেলেসমাত্ ।...
কস্তুরগন্ধীর চাউলের আলা
সেই চাউলেরই পিঠা ভালা
সেই পিঠায় সাজিয়ে থালা
দাও কুটুমের হাতে রে।
বলা বাহুল্য ওসব জাতের সবই দেশি বা স্থানীয় জাতের ধান। এগুলো নিম্নফলা হওয়ায় সেগুলোর আবাদ প্রায় উঠেই যাচ্ছে। হাজার দশেক ধান্যজাতের সম্ভার থেকে এখন ৯ হাজার ৯০০ জাতই হয়ত লুপ্ত হয়ে গেছে। বিন্নি ধানের খই আর শালি ধানের চিড়ার দেখা তাই বাজারে পাওয়া মুশকিল। সৌভাগ্য যে, প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে বরিশালের অনেক জমিতে আধুনিক জাতের ধান চাষ করা সম্ভব হয় না। সে কারণেই বরিশাল অঞ্চলে এখনো টিকে আছে আমাদের প্রাচীনকালের অনেক ধানের জাত। বলতে হয় অনেক কৃষক কিছুটা বাধ্য হয়েই সেসব জাতের ধান চাষ ধরে রেখেছে। স্থানীয় সেসব জাতের অধিকাংশ জাতের ধানই চাষ করা হয় আমন মৌসুমে। এসব স্থানীয় জাতের মধ্যে অনেক জাতের ধান থেকে খুব ভালো মানের খই ও মুড়ি তৈরি করা হয়, চিড়াও তৈরি করা যায়। এসব জাত তাই স্থানীয় কৃষকদের কাছে ‘খই-মুড়ির ধান’ হিসেবে পরিচিত। বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে খই-মুড়ির ধানের যেসব জাতের নাম পাওয়া গেছে তা তালিকায় উল্লেখ করা হলো। এসব জাতের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা আধুনিক জাত উন্নয়নে জার্মপ্লাজম হিসেবে প্রজননের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। হারিয়ে যাওয়ার আগেই তাই এসব জাত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া দরকার।


চিড়া কুটতে ঢেঁকি লাগে, মুড়ি ভাজতে ঝাঝর। বাঙলা থেকে এসব উপকরণও এখন বিলুপ্তপ্রায়। আর এক আগ্রাসন হলো চিড়া মুড়ির কল। আধুনিকতার স্পর্শে এখন মুড়ি ভাজা হচ্ছে যান্ত্রিক কলে, চিড়াও বানানো হচ্ছে মেশিনে। অনেক পরিমাণে চিড়া মুড়ি দ্রুত করা যায় দেখে এসব কলের চাহিদা বর্তমানে যথেষ্ট বেড়েছে। তাছাড়া মেশিন বলে কথা। এখন ওসব মেশিনের ধাক্কায় পড়ে যান্ত্রিক কৌশলে এখন আধুনিক ধানের জাত বিআর২৮ ধান থেকেই ভালো মুড়ি তৈরি হচ্ছে, এখন আর মুড়ি বা হুড়–ম ভাজতে ঝিঙ্গাশাইল ধানের দরকার হয় না। কিন্তু মুরুব্বিরাই ভালো বলতে পারবেন, ছোটবেলায় তারা যে মুড়ি চিড়া খেয়েছেন, তার স্বাদ কি এখনকার প্যাকেট মুড়ি চিড়ার মতো ছিল? হয়ত আমরাও দেশি মুরগির ডিমের স্বাদ ভুলে যেমন ফার্মের মুরগির ডিমের স্বাদে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, একদিন সে রকম কলের মুড়িতেও অভ্যস্ত হয়ে যাব। ভুলে যাব, আদিতে মুড়ি কি রকম ছিল! তবু ভাগ্য ভালো যে, কলে এখনো খই ভাজা ও মুড়কি তৈরি শুরু হয়নি।


ধান থেকে খই বানানো হয়। তাই বলে সব জাতের ধানে কিন্তু খই হবে না। দেশি ধানের অনেক জাত আছে যেগুলো থেকে খই হয়। এসব জাতকে বলা হয় খইয়া ধান। বিন্নি বা বিনি ধানের খই সবচেয়ে ভালো হয়। সেসব জাতের ধান ভালো করে রোদে শুকিয়ে শুকনো বালিতে চুলায় ভাজতে হয়। একটা মাটির খলা বা পাত্র কাঠের গরম করা হয়। অধিক গরম পাত্রের মধ্যে এক মুঠ ধান ছেড়ে দিলেই ফট ফট করে খই ফুটতে থাকে। এজন্য যেসব লোক বেশি কথা বলে তাদের সে স্বাভাবিকে অনেক সময় এর সাথে তুলনা করে বলা হয়, মুখে যেন কথার খই ফুটছে। খই ফোটার সময় শলার ঝাড়– দিয়ে নাড়তে হয়। খই ফুটলেও ফোটা খইয়ের সাথে অনেক ধানের তুষ বা খোসা লেগে থাকে। ওগুলো হাতে বেছে ছাড়াতে হয়। পরে সেসব খই খাওয়ার উপযুক্ত হয়। একে বলে ‘সাদা খই’। সাদা খই দই দিয়ে খেতে খুব মজা। আমাদের কর্ন ফ্লেক্স নেই, কিন্তু খই আছে। দুধে ডুবিয়ে খই ভিজিয়ে খেতে কর্ন ফ্লেক্সের চেয়েও সুস্বাদু লাগে। খইয়ে গুড় মাখিয়ে বানানো হয় ‘মুড়কি’। মুড়কি ও সাদা খই একসাথে মিশিয়ে খেতেও ভালো লাগে। এ ছাড়া খই থেকে খই ছাতু ও খইয়ের মোয়াও বানানো হয়।


ধান থেকে হাতে দেশি পদ্ধতিতে মুড়ি ভাজা এ জটিল প্রক্রিয়া। বিশেষ অভিজ্ঞতা ছাড়া এ কাজ করা যায় না। মুড়ির ধান মাড়াইয়ের পর তা পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়। রোদে ধানের রস টানার পর তা ভাপ দিয়ে হালকা সেদ্ধ করা হয়। এরপর তা ৩-৫ দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর আবার ভাপে সেদ্ধ করা হয়। একটা বড় হাঁড়িতে পানি ফোটে। এর ওপরে ছিদ্রযুক্ত একটি পাত্রে ধান রেখে একটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এতে পানির ভাপে ধান সেদ্ধ হয়। এ সময় ধানের মুখ ফাটলে তা তোলা বা নামানো হয়। সেদ্ধ ধান একটু আঠালো হলে তাতে মুড়ি ভালো হয়। সেদ্ধ করার সময় ধান যদি বেশি সেদ্ধ হয়ে ভাতের মতো গলে যায় তবে তাতে আর মুড়ি হবে না। এরপর সেদ্ধ করা ধান আবার রোদে শুকানো হয়। যখন চাল শক্ত হয়ে যায় তখন তোলা হয়। এরপর কলে বা ঢেঁকিতে ভানা হয়। তুষ-কুঁড়া পরিষ্কার করে মুড়ির চাল বানানো হয়। মুড়ি ভাজার আগে একটি মাটির পাতিলে চালে লবণ পানি ছিটিয়ে মাখা হয়। লবণ পানি এমনভাবে মাখানো হয় যাতে সবগুলো চালে তা মাখে। মাটির পাত্রে তাপ দিয়ে এসব চাল একটা কাঠি দিয়ে অনবরত নাড়তে হয়। তাপে চালগুলো যখন লাল হয়ে ওঠে তখন পাশে আর একটি চুলায় রাখা পাত্রের গরম বালির মধ্যে ঢেলে গইর দিলে মুড়ি হয়ে যায়। পাশে ছিদ্রযুক্ত আর একটি পাত্র বা ঝাঝরে ঢেলে পিছা বা শলা দিয়ে নেড়ে মুড়ি থেকে বালিকে আলাদা করা হয়। সেসব বালি আবার চুলায় বসানো হয় ও তাতে একইভাবে মুড়ি ভাজা চলতে থাকে। সাধারণত এক কেজি চালে এক কেজি মুড়ি হয়। স্থানীয় বাজারে এক কেজি চালের দাম প্রায় ৪০ টাকা, এক কেজি মুড়ি বিক্রি হয় ৭০-৮০টাকায়। মুড়ি গুড়ে পাক দিয়ে বানানো হয় মুড়ির মোয়া। ঝাল মুড়ি অনেকেরই একটি প্রিয় খাবার।


খই মুড়ির ধান
সব জাতের ধানে খই মুড়ি হয় না। খই মুড়ির জন্য বিশেষ জাতের ধান লাগে। উপকূলীয় অঞ্চল সেসব আদি জাতের ধানের এক অপূর্ব ভাণ্ডার। নানা কারণে বরিশালের খ্যাতি রয়েছে। এর মধ্যে বরিশালের মোটা মুড়িও খ্যাতির একটি কারণ। মোটা দানার চাল থেকে সুস্বাদু এই মুড়ি তৈরি হয় যা এ দেশের অন্য অঞ্চলে দেখা যায় না। এ অঞ্চলে শুধু নয়, দেশের অন্যান্য স্থানেও এ মুড়ির কদর রয়েছে। বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি প্রভৃতি জেলায় যত জাতের ও যে পরিমাণে খই মুড়ির ধান উৎপন্ন হয় তা অন্যান্য জেলায় দেখা যায় না। ঝালকাঠি জেলা মুড়ি শিল্পের জন্য বিখ্যাত। বহু লোক মুড়ি ভাজা ও ব্যবসাকে জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে। অনুসন্ধান করলে হয়তো এ অঞ্চলে শতাধিক জাতের খই-মুড়ির ধান পাওয়া যাবে। তবে দ্রুত এসব জাত বিলুপ্ত হতে চলেছে। আগে যেসব জমিতে এসব জাতের ধান ছাড়া অন্য জাতের ধান আবাদের কোনো সুযোগ ছিল না। এখন খই মুড়ির ধান চাষের জমিতে উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ব্রিধান ৪৭, ব্রিধান ৫২, ব্রিধান ৫৭, ব্রিধান ৬২ ইত্যাদি জাতের ধান খই মুড়ির ধানের জায়গায় জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। সরেজমিনে এসব জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরে খই মুড়ির যেসব জাতের নাম পাওয়া গেছে তা তালিকা ১-এ দেয়া হলো। এসব জাতের মধ্যে মোতা মোটা জাতের মুড়ি সবচেয়ে ভালো হয় এবং এ জাতটি এ অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় জাত। বৌয়ারি জাতের ধানের খই ভালো হয়। তবে বেশি ভালো খই হয় খৈয়া ধানের। খৈয়া ধানের রং কালো, শুঙ লম্বা, জীবনকাল ১২০ থেকে ১৩০ দিন, খই হালকা সুগন্ধযুক্ত, মিষ্টি, বড় ও খই কামরাঙার মতো খাঁজবিশিষ্ট। এ জাতের ধান থেকে তৈরি করা খই সাধারণত প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে বাজারে বিক্রি হয়। ধানের দর মণপ্রতি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা।


খই মুড়ির ধানের চাষাবাদ
খই মুড়ির ধান চাষ করা হয় আমন মৌসুমে। রোপা পদ্ধতিতে এসব জাতের ধান চাষ করা হয়। মাঠের ধানের জমি ছাড়া চরেও এসব ধান চাষ করা হয়। ধানের চারা তৈরি করে প্রায় দুই মাস বয়সী কয়েকটা চারা গোছ ধরে চাষ করা কাদাময় জমিতে রোপণ করা হয়। শুধু ইউরিয়া ছাড়া অন্য কোনো সার দেয়া হয় না। আগাছা সাফ করতে হয়। এসব ধানে তেমন কোনো রোগ-পোকার উপদ্রব হয় না। ১৫০ থেকে ১৬০ দিন এসব ধানের জীবনকাল। শ্রাবণে ধান লাগিয়ে অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটা হয়।

মৃত্যুঞ্জয় রায়

উপপরিচালক (এলআর), ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। ঔষধি গাছ (১ম ও ২য় খণ্ড), ডাল, তেল ও মসলা ফসল চাষ, ফলের রোগ, ধানের রোগ, শাকসবজির পোকামাকড় ইত্যাদি বইয়ের লেখক। মোবাইল : ০১৭১৮২০৯১০৭ মোবাইল :  kbdmrityun@yahoo.com

 

বিস্তারিত
ভবিষ্যৎ ‘খাদ্য উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য নিরাপত্তায়’ বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের দেশ। প্রাকৃতিকভাবেই উর্বর জমির এ দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আর্থসামাজিক এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা সম্ভব। বিবিএস ২০১৪-১৫ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৩০ লাখ এবং প্রতি বছর ২০-২২ লাখ লোক জনসংখ্যায় যোগ হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা যদি ১.৩৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন লোকসংখ্যা হবে প্রায় ২৩ কোটি। এই বাড়তি জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ আবশ্যক। জিডিপিতে কৃষি সেক্টরের অবদান ১৫.৩৩% এবং কৃষি সেক্টরে ফসল খাতের অবদান ৫৪.২৭% (অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৬)। বৈশ্বিক হিসেবে বিশ্বের ১৬ কোটি হেক্টর ধানি জমিতে ৪৭ কোটি টন চাল উৎপন্ন হয়। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের যে জনসংখ্যা হবে তার চাহিদা পূরণ করতে প্রয়োজন হবে আরও ২৫ ভাগ বাড়তি উৎপাদন। ইউএনডিপির একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ২.৮৫ ভাগ এবং ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ১.২২ ভাগে। এই হারে বাংলাদেশে ২০৫০ সালে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২১ কোটি ৫৪ লাখ এবং স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে অর্থাৎ ২০৭১ সালে ২৪ কোটি ২৮ লাখে এসে স্থিতিশীল হবে (BRRI, 2015)। সর্বোপরি ২৫ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করার চিন্তা মাথায় রেখে বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে (BRRI, 2015)।


সরকারের জনবান্ধব কৃষিনীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন- ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি সারে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি এবং তেলের মূল্য হ্রাস, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি প্রদান, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, উন্নত মানের ধানের বীজ সরবরাহ, প্রতিকূলতা সহিষ্ণুু জাত উদ্ভাবন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের ফলে বিগত বছরগুলোয় চালের উৎপাদন ৩.৪ লাখ টন হারে বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দানা শস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ অভূত সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে চালের উৎপাদন ৩ কোটি ৪৭ লাখ টন। শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে চালের উৎপাদন হবে ৪ কোটি ৭২ লাখ টন এবং এর বিপরীতে ২০৫০ সালে ২১ কোটি ৫৪ লাখ লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে ৩ কোটি ৭৯ লাখ টন অর্থাৎ ২০৫০ সালে দেশে ৯৩ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে।


জনগণের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে ‘পুষ্টি সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা’ কার্যক্রম পরিচালনার ফলে খাদ্য তালিকায় গুণগত পরিবর্তন আসছে। জনগণ ভাতের পরিবর্তে রুটি ব্যবহার করছে এবং ফলমূল ও সবজির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ফসলের উন্নত জাত ও টেকসই উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করে গ্রামীণ জনগণের কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্যবিমোচন করা হচ্ছে সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। ধান, গম, ভুট্টা, পাট, তুলা, আঁখ এবং অন্যান্য শস্য যেমন-কন্দাল ফসল, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফল, ফুল, মসলা ইত্যাদির নতুন জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণবিদগণ বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চল অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব ফসলের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছেন। বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা যেমন-খরা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা এবং অধিক তাপমাত্রাসহিষ্ণু তথা উচ্চফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন সংক্রান্ত গবেষণা অব্যাহত আছে।


সরকার দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষির ন্যায় দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিকেও উন্নয়নের জন্য মাস্টার প্লান গ্রহণ করছে। সপ্তমপঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, জাতীয় কৃষি নীতি, জাতীয় বীজ নীতি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG) এর সাথে সঙ্গতি রেখে দেশের জনগণের পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তা বিধানকল্পে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য নিরাপদ খাদ্য (Safe food) উৎপাদন, পশ্চাৎপদ নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পাহাড়ি অঞ্চলে ফলের বাগান সৃষ্টি ও সবজি আবাদের বিস্তার এবং অনুন্নত চর অঞ্চলে সমন্বিত কৃষি সহায়ক প্রকল্পসহ বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে ফসল উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্তরে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
* ক্রমান্বয়ে কৃষি জমি হ্রাস (বার্ষিক ০.৭৩% বা ৬৮,৭৬০ হেক্টর হারে) (সূত্র : এসআরডিআই-২০১৩);
* জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব যেমন- বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, উচ্চ তাপমাত্রা, নতুন নতুন পোকামাকড় এবং রোগবালাইয়ের প্রার্দুভাব;
* সেচের পানির অপ্রতুলতা;
* পানি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব;
* ক্রমবর্ধমান হারে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া;
* অধিক ফলন পার্থক্য (High Yield Gap);
* উচ্চ মাত্রায় সংগ্রহোত্তর ক্ষতি (২০ থেকে ৩৫%);
* মাটির উর্বরতা হ্রাস;
* কৌলি সম্পদের অবক্ষয়;
* অপর্যাপ্ত বাজার ব্যবস্থাপনা;
* ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার;
* গবেষণা ও সম্প্রসারণ খাতে অপ্রতুল বাজেট;
 * ফলনসীমা (Yield ceiling) অতিক্রম করতে না পারা;
* কৃষি উপকরণ ব্যবহারে দক্ষতার অভাব;
* পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাব;
* মানসম্পন্ন বীজের অপর্যাপ্ততা;
* শিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও কৃষক সংযোগে দুর্বলতা;
* কৃষক প্রশিক্ষণের স্বল্পতা;
* পুষ্টি সম্পর্কে অজ্ঞতা;
* খাদ্যাভাস পরিবর্তন না করা;
* মাঠ পর্যায়ের সম্প্রসারণকর্মীদের তদারকি এবং কমিন্টমেন্টের অভাব;
* কৃষিকাজে তরুণ শ্রেণির আগ্রহের অভাব;
* কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ধীরগতি;
* স্বল্প সুদে ঋণের অপ্রতুলতা; এবং
* সংগ্রহোত্তর কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে উদ্যোক্তার অভাব।

 

চ্যালেঞ্জ উত্তরণে গৃহীতব্য পদক্ষেপসমূহ
* ফসলের উচ্চফলনশীল, পুষ্টিমান সম্পন্ন ও প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু এবং স্থানভিত্তিক জাত উদ্ভাবন;
* বিলুপ্ত প্রায় ফসলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রজনন কাজে ব্যবহার;
* উন্নত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন;
* মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ;
* কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভিত্তিক লাগসই ফসল নির্বাচন ও ফসল বিন্যাস নির্ধারণ;
* উত্তম কৃষি পদ্ধতি ((Good Agricultural Practices) ) বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ;
* জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি (খরা, বন্যা, জলাবদ্ধতা, অধিক তাপমাত্রা ইত্যাদি) মোকাবিলায় গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ;
* কৃষিতে জীব প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও
* উচ্চ তাপসহিষ্ণু ইত্যাদি ফসলের জাত ও অন্যান্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা;
* পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের নিমিত্ত বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদন;
* শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা;
* কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে উৎসাহিত করা;
* সাপ্লাই ও ভেলুচেইন এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের ওপর গবেষণা পরিচালনা করা;
* এনএআরএস (NARS) কর্তৃক উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফসলের নতুন জাতের পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রজনন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ;
* শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি উদ্ভাবন;
* উদ্ভাবিত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি হস্তান্তর;
* কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তি (আইসিটি) এর প্রয়োগ বৃদ্ধি করা;
* সমন্বিত খামার পদ্ধতি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা;
* কৃষিতে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করণ;
* উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ;
* বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি গবেষণা, মাঠ ও কৃষক পর্যায়ে ফলনের পার্থক্য কমানো;
* জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়নের লক্ষ্যে খাদ্যভিত্তিক পুষ্টি (ফলিত পুষ্টি) সংক্রান্ত গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন;
* খাদ্যচক্রে (NARS) ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব (Heavy Metal) বিষয়ে গবেষণা এবং ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ;
* গণমাধ্যম ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারসহ কৃষি মেলা, বিশ্বখাদ্য দিবস, পুষ্টি সপ্তাহ, পরিবেশ দিবস ইত্যাদি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সব স্তরের

 

জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ;
* বিভিন্ন শিক্ষাস্তরের কারিকুলামে ফলিত পুষ্টি বিষয়ক পাঠসমূহ যথাযথ অন্তর্ভুক্ত বা হালনাগাদকরণ, পাঠ প্রণয়ন এবং প্রণয়নে সহায়তা প্রদান;
* টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে ধানসহ অন্যান্য ফসলের আধুনিক জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কৌলিতাত্ত্বিক অর্জন বা
* জেনেটিক গেইন ত্বরান্বিতকরণে ফসলের জাত উদ্ভাবনে জীব প্রযুক্তিসহ অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি;
* ঘঅজঝ এর মাধ্যমে কৃষিতে মৌলিক গবেষণাকে উৎসাহ প্রদান);
* মাটির উর্বরতা ও সার ব্যবস্থাপনায় আইন প্রণয়ন এবং জমিতে জৈব সার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা;
* অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা অঞ্চলের জন্য উচ্চফলনশীল ধানের জাতের পাশাপাশি স্থানভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, স্বাদু পানির পরিকল্পিত ব্যবহার, শস্য চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি, উপযুক্ত ফসল ভিত্তিক শস্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে উৎপাদন বাড়ানো;
* পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় বোরো চাষ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাই টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল রাখাসহ কম পানি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করা।
*  ব্রি, বিনার মাধ্যমে আউশের আধুনিক জাতের উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ ;
* ধানের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মধ্য-স্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, চাষিরা ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই সরাসরি কৃষকের নিকট হতে ধান সংগ্রহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
* ফসল উৎপাদনে প্রয়োজন অনুযায়ী বালাইনাশক ব্যবহার করা এবং জৈব বালাই নাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি করা;
*  শিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও কৃষক সংযোগ জোরদার করা;
* কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাধ্যমে প্রর্দশনী স্থাপন করে কৃষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা (চীনে কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়);
* বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল ও নদী পুনঃখনন এবং ডিস্যালানাইজেশন ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভূ-উপরস্থ পানির বর্ধিত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ। রাবার ড্যাম, স্লুইস গেট, ফ্লাস গেট, ডাগ ওয়েল, হাজামজা পুকুর সংস্কার, আইল ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণপূর্বক সেচ সুবিধা উন্নয়ন করা;
*  বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষককে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ওপর দেশে/বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ বৃদ্ধি করা;
* বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন;
* কৃষিপণ্য সংরক্ষনাগার স্থাপন;
* কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে উদ্যেক্তা পর্যায়ে প্রণোদনা প্রদান এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা; এবং
* চাষাবাদে যান্ত্রিকীকরণ উৎসাহিতকরণ।

 

আমরা জানি কৃষিতে নানাবিধ সমস্যা আছে যার সমাধান ও রয়েছে। আমরা কৃষিতে অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি। বিশ্বের পাট রপ্তানিতে ১ম, পাট ও ফল উৎপাদনে ২য়, সবজি উৎপাদনে ৩য়, ধান উৎপাদনে ৪র্থ, আম উৎপাদনে ৭ম, আলু উৎপাদনে ৮ম, পেয়ারা উৎপাদনে ৮ম ও ফল উৎপাদনে ২৮তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরলস প্রচেষ্টা বর্তমান কৃষিকে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে কৃষক তার উৎপাদিত দ্রব্যের যথাযথ মূল্য  পেতে হলে বিশেষ করে ধান ও আলুসহ অন্যান্য ফসলে কৃষককে ফসল সংগ্রহের সময় উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে বাজার ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। তবে এখানে কৃষককে সংগঠিত হতে হবে। যেখানে কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আরও গতিশীল করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

 

ড. মোঃ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার

উপপরিচালক (কৃষি সম্প্র. ও গ্রামীণ অর্থনীতি), জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি (নাটা), সেল : +৮৮-০১৮১৫৫৯৭৩০৪ e-mail : dhossain1960@yahoo.com

বিস্তারিত
এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশনের সেকাল-একাল

কৃষিকাজ শুরুর ইতিহাস প্রাচীন। মানব সভ্যতার বিকাশের সাথে কৃষি কাজ সম্পৃক্ত। আমাদের দেশে কৃষির এই অবস্থায় আনতে অনেক ধাপ পার হতে হয়েছে। আমাদের কাছের দেশ চীনের ইউনান রাজত্ব কাল থেকে শুরু করলে এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশনের ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো। আধুনিক এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন শুরু হয়েছিল ইউনিভার্সিটি ট্রিনিটি কলেজের এক্সটেনশন হিসেবে। ১৮৬৭ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি ট্রিনিটি কলেজ ফেলো জেমস স্টুয়ার্ট প্রথম বললেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত জ্ঞান ও আবিষ্কৃত ফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ক্রমে ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন এক আন্দোলনে পরিণত হলো। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি ১৮৭৩ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে এক্সটেনশন এডুকেশন কথাটি গ্রহণ করে। আমেরিকায় এগ্রিকালচারাল এক্সটেশন শুরু হয় ‘ল্যান্ড গ্রান্ট কলেজ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ক্রমে এটি ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীব্যাপী।


‘Helping People help themselves shape their Behaviour in desirable direction’


(মানুষের সাহায্য করা যাতে তারা নিজেরা নিজেদের সাহায্য করতে পারে তাদের ‘ব্যবহার’- এ বাঞ্চিত পরিবর্তন বলতে মূলত জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও দক্ষতা বোঝায়। এই দর্শন এবং Learning by doing (নিজে করে শেখা) আর Seeing is believing (নিজের চোখে দেখে বিশ্বাস করা) এই নীতিই হল এক্সটেশন এডুকেশনের ভিত্তি।  


আমেরিকাতে এক্সটেশন এডুকেশনের নীতি কৃষিতে প্রয়োগ করে ওই দেশের কৃষিতে যথেষ্ট উন্নতি হয়। কৃষি গবেষণালব্ধ আধুুনিক জ্ঞান ও উন্নত প্রযুক্তি বিদ্যার প্রয়োগ করে কৃষির উন্নতি সম্ভব হয়েছিল তাই ঞৎধহংভবৎ ড়ভ ঞবপযহড়ষড়মু (প্রযুক্তি বিদ্যার হস্তান্তর) ড়ৎ ফরভভঁংরড়হ ড়ভ রহহড়াধঃরড়হ  হয়ে উঠল এগ্রিকালচারাল এক্সটেশনের সমার্থক।

 
এক সময় কৃষিতে এলো সবুজ বিপ্লবের সেøাগান। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ১৯৬০-৭০ সালে কৃষিতে সবুজ বিপ্লব ঘটাতে সাহায্য করেছিল এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন। সবুজ বিপ্লবের টেউ আমাদের দেশে ও লেগেছিল। বঙ্গবন্ধু দেশের কৃষির উন্নতি ও এই পেশার সাথে জড়িত কৃষি গ্রাজুয়েটদের ১৯৭৩-৭৪ সালে সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির পদ মর্যাদা প্রদান করেন।  


সবুজ বিপ্লবের সময় ধান, গম, উচ্চফলনশীল বীজ, সেচের জন্য বৈদ্যুতিক শক্তির সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, রাসায়ানিক সার, কীটনাশক আগাছানাশক ব্যবহার করে সবুজ বিপ্লব নিশ্চিত করেছিল। ওই সময় দেশে আই আর-৮  জাতের ধান চাষ করে ধানের ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছিল।


কিন্তু এসব ব্যবহার করে প্রকৃতির বিশেষ করে পরিবেশের দূষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি, স্বাস্থ্যগত, আর্থসামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।
দেশে কৃষি উপকরণ বিশেষ করে উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়ানিক সার চাষিদের কাছে পৌঁছে দেয়াসহ সেচ যন্ত্র চাষিদের মধ্যে ভাড়ায় প্রদান সেবা করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন কাজ করেছে। ১৯৮০-৮১ পর্যন্ত এ দেশের চাষিদের বিভিন্ন অফিসে কৃষি সেবা পাওয়ার জন্য যেতে হতো। পাট চাষিদের পরামর্শের জন্য পাট সম্প্রাসরণ সহকারী, কৃষির অন্যান্য পরামর্শের জন্য ইউএএ (ইউনিয়ন এগ্রিকালচার অ্যাসিসট্যান্টের কাছে যেতে হতো। কৃষি সেবা এক জায়গায় থেকে পাওয়াসহ অনেক বিষয় চিন্তা করে ১৯৮১-৮২ এর দিকে United Agriculture Service কৃষির ০৫টি ডিপার্টমেন্ট একত্রিত করে  Department of Agriculture Extension সৃষ্টি করা হয়েছে।


একসময় প্রতিটি ইউনিয়নে একজন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ফসলের নিবিড়তা, সেচকৃত এলাকা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা এনে প্রতিটি ইউনিয়কে ২/৩টি ব্লকে বা কৃষি ব্লকে বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি ব্লকে একজন ব্লক সুপারভাইজার নিয়োজিত করা হয়। প্রতিটি ব্লককে ০৮টি সাবব্লকে বিভক্ত করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ সহকারীরা অর্থাৎ কৃষি বিভাগের সেবা প্রদানের নিমিত্তে টিএন্ডভি (ট্রেনিং অ্যান্ড ভিজিট) পদ্ধতিতে কাজ করা হতো। ব্লক সুপার ভাইজারগণ সাব ব্লকে ঘুরে ঘুরে চাষিদের পরামর্শ প্রদান, প্রদর্শনী স্থাপনসহ অন্যান্য কাজ করতেন। ব্লক সুপার ভাইজারগণ তাদের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে কাজ করতেন। সপ্তাহের ০১ দিন প্রশিক্ষণ থানা/উপজেলা সদরে, পরবর্তী সপ্তাহে ১ দিন রিটার্ন রিপোর্ট দাখিল করতে হতো। এভাবে মাসে ৪ বার উপজেলা/থানা সদরে আসতে হতো। সম্প্রসারণ সেবা প্রদানে ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ের থেকে গ্রুপ অ্যাপ্রোচ বা দলীয় আলোচনার ওপরে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রসারণ সেবা প্রদানে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয়


 ১। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত কৃষি বিভাগ চাষিদের পরামর্শ প্রদান, কৃষি উপকরণ বিতরণ সব কিছুই বিনামূল্যে প্রদান করে থাকে। কৃষি বিষয় পরামর্শ প্রদান করার ক্ষেত্রে দেখা গেছে অনেক চাষি বিনামূল্যে কিছু পেতে আগ্রহী। সম্প্রসারণ কর্মীরা চাষি/চাষি দলের সাথে দেখা করলে প্রথমেই জানতে চায় আমাদের জন্য কি এনেছেন?


২। মাঠ পর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের যে পাক্ষিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেন এগুলো বাস্তবভিত্তিক হতে হবে।
 

৩। মাঠ কর্মকর্তাদের আবাসিক ব্যবস্থা না থাকায়, সম্প্রসারণকর্মীদের বিরাট অংশ দূর দূরান্ত থেকে প্রতিদিন কর্মস্থলে যেতে হয়। এর ফলে সম্প্রসারণ সেবা প্রদানে বিঘœ সৃষ্টি হয়।


৪। মাঠ কর্মীদের তার কর্ম এলাকায় কাজের যথাযথ ভ্রমণ ভাতা প্রদান করা হয় না। এসব সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের ভেবে চিন্তে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।  


বর্তমানে কৃষি সেবা প্রদানে NATP এর আওতায় অনেক ইউনিয়নে ফিয়াক (FIAC) স্থাপন করা হয়েছে। Farmers information Agricultural Centre সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানে চাষিরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেয়ে থাকে। এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে কৃষি বিভাগের একটি কক্ষে অফিস স্থাপন করা হয়েছে। এই জায়গায় কৃষকরা এসে পরামর্শ নিতে পারে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষক সেবা কেন্দ্র স্থাপন ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ (পাইলট) প্রকল্প এর মাধ্যমে মাঠ কর্মকর্তাদের আবাসিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।


কৃষকগণ যেসব স্টেকহোল্ডাদের মাধ্যমে সেবা পেতে পারেন সেগুলোর মধ্যে কৃষি তথ্য সার্ভিস ৪৯৯টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর করে যাচ্ছে।  


কৃষি কল সেন্টারে যেকোনো মোবাইল ফোন থেকে ১৬১২৩ নম্বরে ফোন করে কৃষি উৎপাদনে সমস্যা বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বন, পরিবেশ ও পুষ্টি বিষয়ক যেকোনো সহজ সরল সময় উপযোগী পরামর্শ পেতে পারেন।


এভাবে সম্প্রসারণ কর্মীরা ব্লক পর্যায়ে তাদের কর্ম পরিকল্পনায় বাস্তবভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব বিষয় অন্তরভুক্ত করতে হবে। রাসায়নিক সারের সঙ্গে জৈবসার ব্যবহারে উৎসাহিত করা, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরস্থ পানি ব্যবহারে পরামর্শ, ফসলের চাহিদা ভিত্তিক সেচ প্রদান, বীজ শোধনের উপকারিতা, শুকনা বীজতলা, কোল্ড ইনজুরির হাত থেকে বীজতলা রক্ষায় বীজতলা ঢেকে দেয়া, ফসলের মাদা তৈরিতে মাটির উপরিভাগের সাথে খড় বা নাড়া দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে মাটি শোধনকরণ, মাটির সাথে নারকেলের ছোবড়া বা অন্যান্য আচ্ছাদন দিয়ে মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করার বিষয়ে পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।


সর্বশেষে বলতে হয় এক্সটেশন এডুকেশনের ভাষায় Helping People help themselves-কথাটি সম্প্রসারণ কর্মীদের সর্বদা মনে রাখা প্রয়োজন।

 

কৃষিবিদ অসিত কুমার সাহা

প্রাক্তন উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, গোপালগঞ্জ। মোবাইল নম্বর : ০১৭১২-২৫৭০৬১

 

বিস্তারিত
ডেইরি খামারে ম্যাস্টাইটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে ১০টি কৌশল

যারা ডেইরি খামার করছেন কিন্তু গাভীর ম্যাস্টাইটিস রোগের ঝামেলায় পড়েননি এরকম খামারি খুব কমই আছে। খামারে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটাতে পারে এই রোগটি। কিন্তু আপনি ১০টি সহজ উপায় অবলম্বন করলে সহজেই এই রোগকে প্রতিহত করতে পারেন। তবে প্রথমে জানতে হবে ম্যাস্টাইটিস রোগটি কি?                  
ম্যাস্টাইটিস : ম্যাস্টাইইটিস হল গাভীর ওলানে বা বাঁটে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা যাবে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় প্রদাহ বলে। সাধারণ ওলানের দুধ নির্গত হবার জন্য ওলানের যে টিস্যুগুলো আছে সেগুলো যদি কোনো কারণে আক্রান্ত হয় তাহলে ওলান ফুলে গিয়ে দুধ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয় এমনকি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গাভীর শরীরে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। সাধারণত ওলান যদি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, ক্ষতিকর রাসায়নিক ওলেন প্রবেশ করে অথবা কোনো ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস দ্বারা ওলান আক্রান্ত হয় তাহলে এই রোগ হতে পারে।


এই রোগ প্রতিরোধের সহজ ১০টি উপায় নিচে জানিয়ে দিলাম। আশা করি নিজের খামারকে রক্ষা করতে পারবেন।
 

১. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খামার : গরুর খামার সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যাতে করে গাভী সব সময়ে স্বস্তিতে থাকতে পারে। গাভী যদি স্বস্তিতে থাকে তাহলে অক্সটসিন হরমোন ভালোভাবে নির্গত হতে পারে। গাভীর মাথা থেকে নিসৃত এই হরমোন অধিক বেশি দুধ উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পরিষ্কার খামারে ম্যাস্টাইটিস রোগ তৈরি করতে পারে এমন ক্ষতিকর জীবাণুর পরিমাণ একদম কমে যায়।


  খামারে ফ্লোরটি নিয়মিইত ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। খুব গরম, খুব আর্দ্র আবহাওয়ায় গাভীটি যাতে স্বস্তিতে থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যদি গাভীর জন্য কোনো ধরনের বিছানা দেওয়া হয় তবে সেটা যেন অজৈব পদার্থ দিয়ে তৈরি হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণে অজৈব পদার্থে ক্ষতিকর জীবাণু কম জন্মায়।


২. পরিষ্কার ওলান : খামার ম্যাস্টাইটিস মুক্ত রাখতে হলে গাভীর ওলান অবশ্যই পরিষ্কার রাখতে হবে। দুধ দোহনের আগে অবশ্যই দুধের বাঁটগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। এর ফলে দুধ দোহনের সময় ওলানে এবং বাঁটে লেগে থাকা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াগুলো বাঁটের ভেতর ঢুকতে পারে না।
অনেক রকমের ব্যাকটেরিয়া আছে যারা মাটিতে এবং গোবরে লেগে থাকে। এর মধ্যে স্ট্রপ্টো কক্কা, ই.কোলাই এবং এন্টারোব্যাকটার খুবই মারাত্মক। যারা সহজেই বাঁটের মধ্য দিয়ে ওলানে পৌঁছে যেতে পারে। ওলানে যখন মাটি, গোবর ইত্যাদি লেগে থাকে তখন তারা বাঁটের চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। তাই দুধ দোহনের পূর্বে অবশ্যই ওলানে লেগে থাকা ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। তা না হলে দুধ দোহনের জন্য যখনই বাঁটে চাপ পরে তখনি এ সব ব্যাকটেরিয়া বাঁটের ছিদ্র পথে ভেতরে প্রবেশ করে ওলনাকে অসুস্থ করে ফেলতে পারে।


 ওলানের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন জীবাণু পানির মাধ্যমেও পরবাহিত হতে পারে। তাই পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যেসব ওলানে বা বাঁটে অতিরিক্ত কাদা-গোবর লেগে থাকে, সেসব ক্ষেত্রে পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে। পানি জোরে জোরে দেওয়া যাবে না। আর চেষ্টা করতে হবে পানি যত কম ব্যবহার করা যায় ততই ভালো।


 যে নল বা পাত্র দিয়ে পানি দেওয়া হয় সেটি বয়ে নিয়ে আসতে পারে হাজার হাজার জীবাণু, যা ওলান নষ্ট করার জন যথেষ্ঠ। তার মধ্যে সিউডোমোনাস জাতের ব্যাক্টেরিয়াগুলো খুবই মারাত্মক। তাই এসব নল প্রত্যেকবার ব্যবহারের পূর্বে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। তাছাড়া ব্যবহারের পর পানি জমিয়ে রাখা যাবে না।


৩. ওলান পরীক্ষা করা : প্রত্যেক বার দুধ দোহনের পূর্বে ওলান ভালো করে পরীক্ষা করে নিতে হবে। অনেক সময় দুধের বাঁটে ক্ষত ছিঁড়া, এমনি ঘা পর্যন্ত থাকতে পারে। এ রকম সমস্যা থাকলে ওই সব বাঁটে দুধ দোহনের মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। এ সব বাঁটে ম্যাসটাইটিস হবার ঝুঁকি থাকে বেশি। তাই বাঁটে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।


৪. দুধ দোহনের পূর্বে বাঁট পরিষ্কার করা : যেকোনো একটা ভালো জীবাণুনাশোক দিয়ে দুধ দোহনের পূর্বেই বাঁটগুলো ডুবিয়ে নিতে হবে। এর ফলে ওলানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষতিকর জীবাণুর পরিমাণ কমবে। যার ফলে বাটে ম্যাস্টাইটিস হবার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে। কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড জীবাণুনাশক এর মধ্যে দুধের বাঁট ডুবিয়ে রাখতে হবে। জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করার চেয়ে ডুবিয়ে রাখলে ফল বেশি পাওয়া যায়।


   যে পাত্রে জীবাণুনাশক নিয়ে বাঁট ধোয়া হবে সেটি ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। একবার ডুবানোর পর অবশিষ্ট তরল ফেলে দিতে হবে। তা না  সে পাত্রই আবার ব্যাক্টেরিয়ার বাহক হতে পারে। যা নতুন গাভীকে আক্রান্ত করতে পারে।


৫. বাঁট পরিষ্কার করে মুছে ফেলা : জীবাণুনাশকে ডুবানোর পর সেই বাঁট পরিষ্কার তোয়ালে বা কাপড় দিয়ে মুছে শুষ্ক করে ফেলতে হবে। যদি সম্ভব হয় তাহলে প্রতিটি গরুর জন্য আলাদা আলাদা কাপড় বা তোয়ালে ব্যবহার করলে ভালো। খেয়াল করতে হবে যেন ওলান বা বাঁটের মুখে কোনো ধরনের মাটি, গোবর বা অন্য কোনো পদার্থ লেগে না থাকে।


    বাঁট শুকনো থাকলে মিল্কিং মেশিন ভালোভাবে কাজ করে। যদি বাঁট ঠিকমতো পরিষ্কার এবং শুষ্ক না হয় তাহলে দুধ দোহনের সময় বাঁটে ক্ষত হতে পারে, ছিঁড়ে যেতে পারে, ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। ফলে ম্যাস্টাইটিস তৈরি করে ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।


৬. ম্যাশিন স্থাপনের পূর্বে দুধ পরীক্ষা/দোহন : দুধ দোহনের ম্যাশিন স্থাপনের পূর্বে প্রতিটি বাঁট থেকে সামান্য দুধ নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে হবে কোনো ধরনের স্বাভাবিকতা আছে কি না? এর ফলে দুধ সংগ্রহের পূর্বে দুধের মান এবং ওলানের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক অবস্থা জানা যায়।


    এর আরও একটি সুবিধা হলো। এটি অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণে উদ্দীপ্ত করে। এ অক্সিটোসিন হরমোন দুধ উৎপাদন ও দুধ বের হওয়ার সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।


    জীবাণুনাশক দ্বারা ধৌত করার পূর্বে বা পরে এই কাজটি করা যায়। তবে প্রত্যেকটি পদ্ধতিই ডেইরি খামারের জন্য উপকারী।
 

৭. দুধ দোহনের যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার : যে সব লোকজন দুধ দোহনের মেশিন ব্যবহার করবে তাদের অবশ্যই এই বিষয়ে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ করতে হবে। এই যন্ত্রটি কিভাবে স্থাপন করতে হবে, কিভাবে আলাদা করতে হবে তা ভালোভাবে জানতে হবে।
    মিল্কিং মেশিন স্থাপনের সময় যে কোনো ধরনের বাতাস জমা না থাকে সেই দিকে খেয়ার রাখতে হবে।

 

৮. দুধ দোহনের সময় মনিটরিং : দুধ দহনের সময় সব কাজ ভালোভাবে তদারকি করতে হবে।
 

৯. খাদ্যাভ্যাস : দুধ দোহনের পর গাভীকে খাবার দিয়ে ব্যস্ত রাখতে হবে। যাতে গাভীটি দাঁড়িয়ে  থাকে। দুধ দোহনের সময় দুধের নালিগুলো বড় হয়ে যায়। যা স্বাভাবিক হতে অনেক সময় এক ঘণ্টাও লেগে যায়। তাই এই সময় গাভীকে ব্যস্ত রেখে দাঁড়িয়ে রাখতে পারলে ভালো।
 

১০. খাদ্যে ভিটামিন ই ও সেলেনিয়াম : গাভীর ওলানের সুরক্ষার জন্য ভিটামিন ই এবং সেলেনিয়াম খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই গাভীর দৈনিক খাবারে ভিটামিন ই এবং সেলেনিয়ামের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

 

ডা. সুচয়ন চৌধুরী

ভেটেরিনারি সার্জন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর রাঙ্গামটি সদর, রাঙ্গামাটি। মোবাইল নং : ০১৭১৮৬৩০২৬৮,

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook