কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

সুগন্ধি চাল : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বিশেষ জাতের ধান থেকে সুগন্ধি চাল তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে এলাকাভিত্তিক প্রচুর সুগন্ধি ধান আবাদের প্রচলন আছে। দেশি জাতগুলোর চাল আকারে ছোট ও অনেকটা গোলাকার হয়। সুগন্ধি ধানের জাতগুলোর বেশির ভাগই আলোক সংবেদনশীল, দিনের দৈর্ঘ্য কমে গেলে হেমন্ত কালে ফুল ও দানা গঠন হয়। প্রধানত আমন মৌসুমে (খরিফ-২ তে) সুগন্ধি ধানের চাষ করা হয়। এ মৌসুমে প্রায় ১০% জমিতে সুগন্ধি ধানের আবাদ করা হয়। প্রধান পোলাও, বিরিয়ানি, কাচ্চি, জর্দা, ভুনা-খিচুড়ি, ফিরনি, পায়েশসহ আরও নানা পদের সুস্বাদু ও দামি খাবার তৈরিতে সুগন্ধি চাল বেশি ব্যবহার হয়। বিয়ে, পূজা-পার্বণ, সেমিনার, ওয়ার্কশপসহ সব ধরনের অনুষ্ঠানে সুগন্ধি চালের ব্যবহার অতি জনপ্রিয়। অনেক সচ্ছল পরিবারে, বনেদি ঘরে সাধারণ চালের পরিবর্তে সুগন্ধি (কাটারিভোগ, বাংলা মতি) সিদ্ধ চালের ভাত খাওয়ার রেওয়াজ অহরহ দেখা যায়।

 

ছক-১ : সুগন্ধি ধানের জাত ও তার বৈশিষ্ট্য

ক্রমিক নং

    জাত

  জাতের বৈশিষ্ট্য

মৌসুম ও  জীবনকাল ফলন 

ফলন (হেক্টরপ্রতি)

১.    

ব্রিধান-৩৪

আলোক সংবেদনশীল, কালিজিরার মতো দানা ছোট, ফলন কালিজিরার দ্বিগুণ, গাছের উচ্চতা ১১৭ সেন্টিমিটার।

আমন মৌসুমি, ধান পাকতে সময় লাগে ১৩৫ দিন, (১৯৯৭ সালে অবমুক্ত), উচ্চতা ১২৫ সেন্টিমিটার।

৩.৫ টন

২.   

ব্রিধান-৩৭ 

ধানের রঙ, চালের আকার কাটরিভোগের মতো, তবে কাটারিভোগের চেয়ে ৫-৭ দিন নাবি, ধানের আগায় শুঙ আছে। 

আমন মৌসুমি, ধান পাকতে সময় নেয় ১৪০ দিন, ১৯৯৮ সালে অবমুক্ত করা হয়।       

৩.৫ টন

৩.  

 ব্রিধান-৩৮

আলোক সংবেদনশীল, ধানের অগ্রভাগে শুঙ আছে, চালের আকার অপেক্ষাকৃত লম্বা ও সুগন্ধিযুক্ত, গাছের উচ্চতা ১২৫ সেন্টিমিটার।

আমন মৌসুমি, ধান পাকতে সময় নেয় ১৪০ দিন ১৯৯৮ সালে অবমুক্ত করা হয়। 

৩.৫ টন

৪.  

 ব্রিধান-৫০

(বাংলা মতি)    চাল লম্বা, চিকন ও সাদা। গাছের উচ্চতা ৮২ সেন্টিমিটার, ফলন খুব বেশি।

 বোরো মৌসুমে চাষ উপযোগী, এ জাতের জীবন কাল-১৫৫ দিন, ২০০৮ সালে অবমুক্ত করা হয়।   

৬ টন

৫.  

ব্রিধান-৬৩ (সরু বালাম)

অনেকটা পাকিস্তানি বাসমতির মতো লম্বা, সুগন্ধ নেই, তবে চাল মূল্যবান ও ভাতের স্বাদ বেশি। চাল সরু, রান্নার পর লম্বায় ভাতের আকার বাড়ে, গাছের উচ্চতা ৮৬ সেন্টিমিটার। 

বোরো মৌসুমে চাষযোগ্য, জীবন কাল ১৪৮-১৫০ দিন, এ জাত ২০১৪ সালে অবমুক্ত করা হয় ।   

৬.৭ টন

৬.   

বিনা ধান-৯

কালিজিরা ও ব্রি ধান-৩৮ এর চেয়ে ২৫-৩০ দিন আগে পাকে, এ দুটি (কালিজিরা ও ব্রি ধান৩৮) জাতের চেয়ে চাল চিকন লম্বা এবং ফলন বেশি।    

আমন মৌসুমি, জীবনকাল ১২৩ দিন, এ জাত ২০১২ সালে অবমুক্ত করা হয়।   

৩.৭ টন

৭.  

 বিনা ধান-১৩  

 সরু, লম্বা, সুগন্ধি চাল, কালিজিরা জাত থেকে উদ্ভাবিত, কালিজিরার তুলনায় বেশি উজ্জ¦ল, কিছুটা কালো বর্ণের।  

আমন মৌসুমি, জীবন কাল ১৩৮-১৪২ দিন, এ জাত ২০১৩ সালে অবমুক্ত করা হয়।   

৩.৫ টন

চাইনিজ, ইটালিয়ান, ইন্ডিয়ান হোটেল/ রেস্টুরেন্ট, পাঁচ তারকা হোটেল/ মোটেল পর্যটন কেন্দ্রে প্রধানত সুগন্ধি চালের ভাত, পোলাও নানা পদের খাবার পরিবেশনে সুগন্ধি চাল ব্যবহার করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এ দেশি অতি উন্নত মানের সুগন্ধি চালের জাতগুলো সম্বন্ধে ধারণা ও প্রচারণার অভাব দেখা যায়। এর ফলে নামি-দামি হোটেলে আমাদের জনপ্রিয় সুগন্ধি ধানের জাতগুলোর পরিবর্তে বিদেশি বাসমতি জাতের চাল ব্যবহার প্রচলন মাঝে মাঝে দেখা যায়। এ অবস্থার উন্নয়নে ও দেশি সুগন্ধি জাতগুলো যেন তারা নানা পদের খাদ্য তৈরিতে বেশি আগ্রহী হয়, সেজন্য সব ধরনের উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থা নেয়া অত্যাবশ্যক।
 

জাত
বিভিন্ন জেলায় অঞ্চলভিত্তিক প্রচুর সুগন্ধি ধানের জাত আছে। জাতগুলোর মধ্যে অধিকাংশই অতি সুগন্ধি। এ জাতগুলো প্রধানত চিনি গুঁড়া, কালিজিরা, কাটারিভোগ, তুলসীমালা, বাদশাভোগ, খাসখানী, বাঁশফুল, দুর্বাশাইল, বেগুন বিচি, কাল পাখরী অন্যতম। হালকা সুগন্ধযুক্ত জাতগুলোর মধ্যে পুনিয়া, কামিনী সরু, জিরাভোগ, চিনি শাইল, সাদাগুরা, মধুমাধব, গোবিন্দভোগ, দুধশাইল প্রধান।
প্রচলিত জাতগুলোর বেশির ভাগই হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ক্ষমতা তুলনামূলক অনেক কম। এজন্য সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রচলিত সুগন্ধি ধানের জাতগুলো উন্নয়নে ও নতুন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে তৎপর হয়। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে মোট ৫টি এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে দুটি মিলে এ দেশে মোট ৭টি সুগন্ধি ধানের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। অবমুক্ত করা এসব ধানের জাত ও তার বৈশিষ্ট্য ছক-১ এ তুলে ধরা হলো। (ছক-১ দেখুন)।

 

দেশি সুগন্ধি চাল জনপ্রিয়করণ ব্যবস্থা
এ দেশে উদ্ভাবিত ও প্রচলিত সুগন্ধি ধানের জাতগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে যেভাবে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল ততটা অনুসরণ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এ কারণে ঢাকাসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরের নামি-দামি হোটেল মোটেল ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এ দেশি সুগন্ধি চালগুলো থেকে তৈরি নানা পদের খাবার পরিবেশন অর্জন কাক্সিক্ষত মাত্রায় খুব একটা দেখা যায় না। উৎপাদক ও গবেষকদের এ চাল উৎপাদন এবং উদ্ভাবন তৎপরতার পাশাপাশি নামি-দামি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মোটেলে দেশি সুগন্ধি চাল ব্যাপকহারে জনপ্রিয়করণ ব্যবস্থা নেয়া সংশ্লিষ্ট সবারই কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে করণীয় দিকগুলোর কিয়দংশ তুলে ধরা হলো-
ক. গুরুত্বপূর্ণ হোটেল মোটেলগুলোর ও পরিবেশিত খাদ্যতালিকা নিরূপণ : ঢাকাসহ বড় বড় শহরস্থ নামি-দামি হোটেলগুলোর শুরুতেই একটা তালিকা তৈরি করে নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা চাল দিয় যেসব খাদ্য আইটেম তৈরি করে পরিবেশন করে থাকে সেগুলো সংগ্রহ করে নিতে হবে। নির্ধারিত সার্ভে ফরম তৈরি করে নিয়ে তা পূরণ ব্যবস্থা করা হলে কাক্সিক্ষত তথ্য বেরিয়ে আসবে। এরপর দেশের দামি বাবুর্চিকে (টমি মিয়া) দিয়ে আমাদের উপযোগী সুগন্ধি চাল দিয়ে সব ধরনের রেসিপি তৈরি করে নিয়ে তার ছবিসহ উপকরণ বিবরণী উল্লেখ করে উন্নত মানের আকর্ষণীয় রঙিন পুস্তিকা তৈরি করে নিতে হবে। সে আলোকে হাতে-কলমে এ রেসিপির অনুসরণে খাদ্য তৈরি করে তালিকাভুক্ত নামি-দামি হোটেলে প্রশিক্ষণ আয়োজনের মাধ্যমে হাতে-কলমে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বুদ্ধকরণ দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। এছাড়াও হোটেলগুলোর তালিকাবহির্ভূত কিছু নতুন রেসিপি চিহ্নিত করে তা ওইসব দামি হোটেলগুলোতে জনপ্রিয় করার ব্যবস্থা একইভাবে নিতে হবে। এ কাজের দায়িত্ব এআইএস, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এমনকি কে.জি.এফ এর মাধ্যমে নতুন প্রকল্প সহায়তা আকারে জনপ্রিয় করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন উদ্যোগ নিতে হবে।
খ. সুগন্ধি চালে তৈরি ফাস্ট ফুড : দেশ-বিদেশে আজ কাল নানা পদের আধা সিদ্ধ চালের সঙ্গে কিছু পরিমাণ ডাল, সবজি ও প্রক্রিয়াজাত মিট একত্রে মিশিয়ে ম্যালামাইন জাতীয় গ্লাসে বা মগে সংরক্ষণ করে তা সিল করে বিপণন করা হয়। ফাস্ট ফুড দোকান থেকে তা কিনে উপরের মোড়ক সরিয়ে তাতে পরিমাণমতো গরম পানি মেশানো হলে তা উপাদেয় পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। যুবক-যুবতী বিশেষ করে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এ খাবার অতি জনপ্রিয়। সুগন্ধি চাল দিয়ে এ ধরনের ফাস্ট ফুডের অনুকরণে তা তৈরি ও বিপণনে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিলে সুগন্ধি চাল জনপ্রিয়করণে গুরুত্বপূর্ণ একনতুন মাত্রা যোগ হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এ ফাস্ট ফুড তৈরির রেসিপি তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করে তা উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানকে তা বাজারজাত করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
গ. খাদ্য মেলার আয়োজন : এ উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থাকে বেগবান করতে হলে এলাকাভিত্তিক দিনব্যাপী কিছু সংখ্যক খাদ্য মেলার আয়োজন করার প্রয়োজন হবে। সেখানে বিদেশি মিশনসহ বিভিন্ন তালিকাভুক্ত হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মোটেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের জন্য দাওয়াত পত্র বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারীরা খাদ্য তৈরি প্রক্রিয়া ও দেশি সুগন্ধি চালের নানা গুণাগুণ সরেজমিন দেখে উদ্বুদ্ধ ও আকর্ষিত হবে।
ঘ. ভিডিও তৈরি করে তা সরবরাহ : দেশি সুগন্ধি চাল সংশ্লিষ্ট হরেক রকম খাবার ও এর তৈরি রেসিপির ভিডিও তৈরি করে নানা পদের আকর্ষণীয় খাবারগুলোর প্রচার উপযোগী দিকগুলো তা হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে সরবরাহ করে তাদের এ খাবার পরিবেশনে আকৃষ্ট করার ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশি সুগন্ধি চালের উপকারী ও আকর্ষণীয় দিকগুলো সুন্দরভাবে ভিডিওতে তুলে ধরে প্রচারের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সুগন্ধি চালের তৈরি খাদ্য পরিবেশন : রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যেন দেশি সুগন্ধি চালের তৈরি নানা পদের আকর্ষণীয় খাদ্য পরিবেশিত হয় সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও যেন একই পন্থা অবলম্বন করতে সক্রিয় হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
চ. বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যবহার : দেশি সুগন্ধি চাল ব্যবহার জনপ্রিয়করণের লক্ষ্যে গণমাধ্যম ব্যবহারের সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। সে মতে সরকারি/বেসরকারি রেডিওগুলোতে যেন সুগন্ধি চাল ও তা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন খাবারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়, তার সুব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে বিভিন্ন টেলিভিশনে কৃষি বিষয়ক সংশ্লিষ্ট সব অনুষ্ঠানে এমনকি টকশোতে দেশি সুগন্ধি চাল ও তা থেকে তৈরি খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে ব্যাপক প্রচার ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে।
ছ. ওয়ার্কশপ ও সেমিনার আয়োজন : দেশি সুগন্ধি চালের ওপর আঞ্চলিক ও কেন্দ্রীয়ভাবে সেমিনার/ওয়ার্কশপ আয়োজনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থাকবে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণবিদ, নামি-দামি হোটেলের বাবুর্চি, ম্যানেজার, উৎপাদনকারী ও বিভিন্ন মিডিয়া ব্যক্তিবর্গ। আলোচনায় যেসব সুপারিশমালা উঠে আসবে সে আলোকে উৎপাদনকারীরা প্যাকিং, গ্রেডিং, লেবেলিংয়ের মান উন্নয়ন এবং তা থেকে নিত্যনতুন সুস্বাদু খাবার তৈরি ও পরিবেশন জনপ্রিয়করণে সংশ্লিষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হবে।

 

সুগন্ধি চাল আমদানি ও রপ্তানি পরিস্থিতি  
এ দেশে সুগন্ধি চালের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি উৎপাদিত সুগন্ধি চালের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বিদেশিদের কাছে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রচলিত জাতগুলোর আকার ও আকর্ষণীয় সুগন্ধকরণে বিভিন্ন দামি খাবার তৈরিতে উপযোগিতা সুবিধার দিকগুলো বিবেচনায় এ দেশি সুগন্ধি চালের চাহিদা বহির্বিশ্বে প্রচুর রয়েছে। পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভারতের লম্বা-সরু বাসমতি চালের বিদেশে যে একচেটিয়া বাজার ছিল তা কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছে বলা যায়। বিচিত্র স্বাদ ও রুচির পরিবর্তন আনয়নে বিকল্প চাল হিসেবে এ দেশি সুগন্ধি চালের প্রতি আগ্রহ বিদেশিদের মাঝে বৃদ্ধি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বৈধ ও অবৈধ পথে এমন কি যাত্রীদের বিদেশ ভ্রমণকালে কয়েক কেজি সুগন্ধি চাল, এমনকি কাটারিভোগ জাতের সুগন্ধি চিড়া সঙ্গে নেয়ার আগ্রহ অহরহ লক্ষ করা যায়। এ চাহিদা পূরণে সাধারণ রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি স্বনামধন্য দেশি প্রক্রিয়াজাতকারকরাও পিছিয়ে নেই। তাদের হরেক পণ্যের সঙ্গে এ দেশি সুগন্ধি চাল সুন্দরভাবে প্যাকিং করে তা রপ্তানি করতে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে।
সুগন্ধি চাল রপ্তানির জন্য সরকারিভাবে বিদেশি বাজার সৃষ্টির বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা একান্ত দরকার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলায় সুগন্ধি চাল ও তা থেকে উৎপাদিত হরেক রকম খাবার প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হলে বিদেশি ক্রেতারা এ দেশি সুগন্ধি চালের প্রতি আরও আগ্রহী হবে। আমাদের বিদেশি মিশনগুলো দেশের বৈচিত্র্যময় সুগন্ধি চাল জনপ্রিয় করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এ সুগন্ধি চালের রকমারি খাবার উপস্থাপন করেও তারা ভোজন বিলাসীদের বিভিন্নভাবে আকৃষ্ট করতে পারে। ইউএন মিশনে বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার  ডিফেন্স অফিসিয়াল কর্মরত আছে। তাদের প্রদত্ত দায়িত্ব পালন ছাড়াও তারা বাংলাদেশী কালচার ও এদেশে উৎপাদিত পণ্য বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এদেশি সুগন্ধি চাল ও তা থেকে তৈরি রকমারি খাবার প্রচলন ব্যবস্থা নিয়ে তারাও অনন্য অবদান রাখতে পারে।
যেহেতু সুগন্ধি চাল একটা নন- পেরিশেবল আইটেম, সেলফ লাইফ ৫-৭ মাসেরও বেশি, এ জন্য ‘জলজ পথে’ কম খরচে দেশি সুগন্ধি চাল রপ্তানি সুবিধাকে কাজে লাগানো সহজ। রপ্তানির জন্য সুন্দর আকর্ষণীয় মোড়ক ব্যবহার ও তাতে বাংলাদেশের উপযোগী ব্র্যান্ড ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি এ সুগন্ধি চালের গুণাবলি ও বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার তৈরির সংক্ষিপ্ত নিয়মাবলি সংবলিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্যাকেটের উপরে বা ভেতরে ছোট ফোল্ডার আকারে প্রদানের ব্যবস্থা নিয়ে ক্রেতা সাধারণকে সহজেই আকৃষ্ট করা যাবে।
চাল মিলিং করা
এ দেশের প্রচলিত জাতের সুগন্ধি চাল মিলিং ব্যবস্থায় তেমন কোনো সমস্যা নেই। পাশাপাশি ঢেঁকি ছাঁটা সুগন্ধি চাল তৈরি করার প্রচলন এখনও মাঝে মাঝে দেখা যায়। দেশি পুরাতন মিল যা এ্যাংগেল বার দিয়ে তৈরি তাতেও দেশি সুগন্ধি চাল তৈরি করতে তেমন একটা অসুবিধা হয় না। তবে বাসমতি ধরনের সুরু-লম্বা চাল (বাংলা মতি, ব্রিধান-৬৩) মিলিং করা এ দেশের পুরনো মডেলের মিলিং যন্ত্র (এ্যাংগের বার বিশিষ্ট) দিয়ে সম্ভব হয় না। এ ধরনের বহু পুরানো মিলিং যন্ত্র ভরত অনেক আগেই সরকারিভাবে বাতিল করে আধুনিক অটো রাইস মিল সর্বস্তরে চালু করেছে। এ দেশে আধুনিক অটো রাইস মিল প্রচলন শুরু হলেও তার পাশাপাশি পুরাতন মডেলের চালের মিল এখনও রয়ে গেছে। বর্তমানে রাইস ব্রান থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদন প্রচলন বাড়ছে। পুরনো মডেলের রাইস মিল দিয়ে এ ব্রান প্রাপ্তি সম্ভব হয় না। এসব গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা বিবেচনায় ভারতের মোত একই পন্থা অবলম্বন করে পুরনো রাইস মিলগুলোর পুনর্বাসন উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
এ ধরনের প্রচার প্রচারণা ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে এ দেশের উৎপাদিত সুগন্ধি চালের ব্যবহার ও বাজার প্রসারিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বিধায় তার ইচ্ছা বাস্তবায়নে এ বিষয়ে  সংশ্লিষ্ট সবারই দেশের ও দশের বৃহত্তর স্বার্থে তৎপর হওয়া অত্যাবশ্যক।

 

কৃষিবিদ এম এনামুল হক*

*মহাপরিচালক (অব:), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

বিস্তারিত
পাট ফসলে আগাম ফুল : কারণ ও প্রতিকার

পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। পাটের ব্যবহারিক উপযোগিতা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ইত্যাদি বিবেচনা করে পাটকে ‘সোনালী আঁশ’ বলে অভিহিত করা হয়। পাট ও পাট জাতীয় আঁশ ফসল সারা বিশ্বে তুলার পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আঁশ ফসল হিসেবে অবস্থান করছে। আট থেকে ১০ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাট ও এ জাতীয় আঁশ ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৫-৬% আসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে। এ ফসল নিজেই মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭.৫-৮.০ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয় যা থেকে প্রায় ৮০ লাখ বেল পাট আঁশ উৎপন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় শতকরা ১০-১২ ভাগ পাট চাষ এবং পাটশিল্প যেমন প্রক্রিয়াকরণ, আঁশ বাঁধাই, গুদামজাতকরণ, স্থানান্তর ও বিপণন ইত্যাদি কাজের সাথে জড়িত।

বাংলাদেশে প্রধানত দুই প্রকার পাট ফসল চাষ হয়। একটি তোষা ও অন্যটি দেশি বা সাদা পাট। দেশি পাটের পাতার স্বাদ তিতো এবং ফলগুলো গোলাকার এবং খাঁজকাটা। এ পাট নিচু জমিতে উৎপাদন করা যায় এবং পরিপক্ব অবস্থায় কয়েক ফুট পানির নিচে থাকতে পারে। তবে তোষা পাটের পাতার স্বাদ তিতো হয় না এবং এর ফল লম্বা ক্যাপসুলের মতো হয়, আগা চোখা। এ পাট কোনো অবস্থাতেই গোড়ায় পানি জমা সহ্য করতে পারে না তাই নিচু জমিতে এ পাট চাষ করা য়ায় না ।
সাধারণত দেশি পাট ১৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এবং তোষা পাট ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত বপন করার উপযুক্ত সময়। তবে জাতভেদে এ সময়ের কিছু পার্থক্য দেখা যায়। যদি কোনো পাটের জাত তার উপযুক্ত সময় এর চেয়ে আগাম বপন করা হয় তবে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ফলন কমে যায়। যখন পাটের জাত সময় মতো বপন করা হয়, তখন সাধারণত ফুল আসে আগস্ট মাস, অর্থাৎ তখন দিনের আলোর দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করে। পাট হলো একটি খাটো দিন দৈর্ঘ্য ফসল। তাই পাট ফসলও অন্যান্য স্বল্প দৈর্ঘ্য দিনের ফসলের ন্যায় ফটো পিরিয়ড (আলোক দৈর্ঘ্য) সংবেদনশীল।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, খরা বা অন্য কোনো বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এমন কোনো পরিবেশে পাট চাষ করলে, সেই পাট ফসলে আগাম বা অপরিপক্ব অবস্থায় ফুল চলে আসে। নিচু জমিতে বপন করা পাটে অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগাম বৃষ্টি/বন্যার সময় যখন চাষিরা আগাম পাট বপন করে অর্থাৎ উপযুক্ত সময়ের আগেই, তখন ওই পাট ফসলের জমিতে ১-২ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন গাছেই ফুল দেখা দেয়। বিশেষ করে এ আগাম ফুল দিনের স্বল্প আলোক দৈর্ঘ্যরে তারতম্যের জন্যই হয়ে থাকে।
আগাম ফুল আসার মূল কারণগুলো হলো-
১. পাট জাতের উপযুক্ত সময়ের পূর্বে বপন করা ।
২. লম্বা খরা, শুষ্ক বায়ু প্রবাহ, কোনো কারণে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, মাটির দুর্বল উর্বরতাশক্তি, জলাবদ্ধতা, মেঘাচ্ছন্ন-আবহাওয়া, দিনরাতের তাপমাত্রার পার্থক্য খুবই কমে যাওয়া ইত্যাদি।
আগাম ফুল পাট ফসলের ওপর প্রভাব-
১. পাটের গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়।
২. শাখা-প্রশাখা জন্মানো শুরু হয়।
৩. খুবই দ্রুততার সাথে ফলন ও আঁশের মান খারাপ হয়।

 

বাংলাদেশে মার্চের শেষে দিনের দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ১২ ঘণ্টা এবং এপ্রিলের মাঝা মাঝি অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল এ দৈর্ঘ্য হয় ১২.৫ ঘণ্টার ওপরে। মার্চের শেষে দেশি এবং মধ্য সময়ে তোষা পাট জাত বপন করলে অপরিপক্ব অবস্থায় ফুল আসার ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। অনেক সময় মাঠের মধ্যে কিছু গাছে  এদিক সেদিক আগাম ফুল দেয়া যায়। এটা আঁশ উৎপাদনের জন্য তেমন প্রভাব ফেলে না। কারণ আগাছা পরিষ্কার বা গাছ পাতলাকরণের সময় সেগুলো তুলে ফেলা হয় অথবা এ অবস্থাতেই বাড়তে দেয়া যায় মধ্য আগস্ট পর্যন্ত ফসল প্রয়োজনীয় ফুল আসা শুরু হয়। এ সময় দিনের দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করে এবং কমতে কমতে ১২.৫ থেকে ১২ ঘণ্টায় পৌঁছায়। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত দেশি ও তোষা (আঁশ উৎপাদনের জন্য) পাটের জাত ও প্রকৃত বপন সময় ছক-১ এ দেখান হলো।    
পাটের দেশি তোষা উভয় জাতই স্বল্প দিন দৈর্ঘ্যরে ফসল। দিন দৈর্ঘ্য ১২.৫ ঘণ্টা বা তার নিচে হলেই পাট ফসলে আগাম ফুল আসবে। লম্বা দিন দৈর্ঘ্য যেমন ১২.৫ ঘণ্টা বা তার বেশি হলে ফুল আসা বিলম্বিত হয়। দিন দৈর্ঘ্য ১০-১২ ঘণ্টা হলে ৩০-৩৫ দিন বয়সের যে কোনো পাট গাছে ফুল চলে আসে। এরূপ দিন দৈর্ঘ্যর প্রভাব দেশি পাটের চেয়ে তোষা পাটে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
পূর্বে দেখা গেছে, দেশি জাত সি-৬ এবং ডি-১৫৪ যদি মধ্য বা শেষ মার্চের পূর্বে বপন করা হতো তবে আগাম ফুল দেখা দিত এবং তোষার জাত ও-৪ যদি মধ্য এপ্রিলের পূর্বে বপন করা হতো তবে অপরিপক্ব ফুল দেখ দিত (আহমেদ, ১৯৮৯)। বাংলাদেশে মার্চের শেষ পর্যন্ত দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ঘণ্টা থাকে এবং এটা মধ্য এপ্রিলের সময়েই বৃদ্ধি পেয়ে ১২.৫ ঘণ্টার ওপরে চলে যায়। তাই দেশি পাট মার্চের শেষ সময় থেকে এবং তোষা পাট মধ্য এপ্রিল থেকে বপন শুরু করলে এ অপরিপক্ব আগাম ফুল এর প্রভাব থাকে না। যদিও ফসলের মাঠে এদিক-সেদিক কিছু গাছে ফুল দেখা দিলেও তা আঁশ উৎপাদনে তেমন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে না।

 

অপরিপক্ব বয়সের ফুলের জন্য দায়ী বিষয়গুলো
১. যেহেতু পাট স্বল্প দিবা দৈর্ঘ্য সহিষ্ণু ফসল, তাই দেশি পাটের কিছু জাত মধ্য-মার্চের পূর্বে এবং কিছু জাত শেষ মার্চের পূর্বে বপন করলে আগাম ফুল দেয়। তেমনি তোষার ও-৪ জাতটি যদি মধ্য এপ্রিলের পূর্বে বপন করা হয় তবে গাছে ফুল আসে।
২. তোষা জাতের পাটের ফসলের শতকরা কিছু গাছ অপরিপক্ব অবস্থায় ফুল দেখা দিয়ে থাকে। তবে সেগুলো জাতের সাথে কৌলিক বিশুদ্ধতায় ভিন্ন হয়, সেগুলো পাতার চেহারা দেখে চেনা যায় আবার অনেক সময় পার্থক্য করাও কঠিন হয়। এগুলো সাধারণত লোকাল জাতের সাথে বা বীজ উৎপাদনের সময় স্বল্প দূরত্বে থাকায় ক্রস পলিনেশনের ফলে তৈরি হয়ে থাকে। এ রকম অনেক সময় প্রজনন বীজের মধ্যেও পাওয়া যায়।
৩. উচ্চ উর্বরতা ও আর্দ্রতা থাকা, মাটিতে পাট বীজ বপন করলে স্বাস্থ্যগত কারণেই গাছের জন্ম ও বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং সাথে সাথে আগাম ফুলও দেখা দেয়, যা ক্রিটিক্যাল ফটোপিরিয়ডে পরে বপন করলে দেখা যায় না।
বোর্স (১৯৭৪-৭৬) এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, দেশি ও তোষা উভয় পাটের ফুলই দিবারাত্রির তাপমাত্রার পার্থক্যের জন্য তাপমাত্রাগুলো যেমন ৩২/২৭, ২৭/২৭, ২৪/২৪ ডি.সে. এর সাথে রাতের তাপমাত্রাখান ১৭ ডি.সে. পার্থক্য বিবেচনা করা হয়। এ অবস্থায় প্রায় ২০ দিন আগেই ফুল চলে আসে। অথচ ৯ ঘণ্টা ফটোপিড়িয়ড এ ফুল চলে আসে যা বাংলাদেশর সাধারণ স্বল্প দৈর্ঘ্য দিন ১০ ঘণ্টার চেয়ে অনেক কম।
ওয়াসেক  (১৯৮২) প্রতিবেদন করেছেন যে, পানির স্বল্পতার প্রভাব পাটের বেশি ফুল আসাকে বিলম্বিত করে, যেখানে খরা আরো বেশি প্রভাব ফেলে। আবার গোট্রিজ (১৯৬৯) বলেছেন পানির স্বল্পতা পাটে দ্রুত ফুল আসাকে প্রভাবিত করে। জোহানসেন (১৯৮৫) বলেন পাটের আঁশের ফলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হলো পাট ফসলের ফুল ধরার সময়টি। কারণ ফুল আসার সাথে সাথে পাট গাছের কাণ্ডের উপরি অংশে শাখা প্রশাখার বিস্তার ঘটে এবং প্রধান কাণ্ডের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। পাটের স্বল্প দিবা দৈর্ঘ্যর ফুল আসা সাধারণত নির্ভর করে দেশি পাটের জন্য প্রায় ১২ ঘণ্টা এবং তোষা পাটের জন্য ১২.৫ ঘণ্টা। তিনি আরও বলেন তাপমাত্রার বৃদ্ধি বিশেষ করে রাত্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে পাট ফসলে দ্রুত ফুল আসে। বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা যদি ২০ ডি. সে. এর কম হয় তবে মাটি থেকে চারা গজানো এবং ছোট বয়সের পাট গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফলে অল্প বয়সেই ফুল আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

 

অনেকের মতে, বীজের বয়স পাট ফসলে ফুল আসার জন্য দায়ী। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ১-২ বছরের পুরাতন বীজ অথবা নতুন বীজ, যে কোনো বীজ যদি তার অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ভালো থাকে (৮০% এর উপরে) তবে কোনো ফুল আসে না এবং সমান বৃদ্ধি ও ফলন হয়। বিজেআরআই এর উদ্ভাবিত অনেক জাত আছে যেমন বিজেআরআই দেশি পাট-৫, ও-৯৮৯৭, বিজেআরআই তোষা পাট-৪, বিজেআরআই তোষা পাট-৫ ইত্যাদি মাঠে বপন করার পর কিছু আগাম ফুল হলেও তা আঁশের ফলনে বা গাছের বৃদ্ধিতে বা আঁশের গুণগতমানে তেমন কোনো ব্যঘাত ঘটায় না।
শুধু পাট নয় অন্য যে কোনো ফসলের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, গাছের বৃদ্ধির সময় যে কোনো কারণে যদি বৃদ্ধিতে বাধার প্রভাব পরে তবে গাছ দ্রুততার সাথে প্রজনন পর্যায়ে চলে যায় এবং গাছে ফুল দেখা দেয়।
অপরিপক্ব বয়সের ফুলের প্রভাব থেকে প্রতিকার পাওয়ার উপায়  
পাট ফসলের আঁশ উৎপাদনের সময় আগাম/অপরিপক্ব বয়সে ফুল আসা খুবই বিপদজ্জনক। কখনো কখনো এ কারণে পাটের ফলন ও আঁশের মান খারাপ হয় এবং কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক কথায় বলতে গেলে পাটের আগাম ফুলের প্রভাব দূর করতে হলে উপযুক্ত সময়ে বীজ বপন করতে হবে। তাছাড়া  জমির দুর্বল উর্বরতা, জলাবদ্ধতা, খরা, শুষ্ক বায়ু প্রবাহ, দিবা রাত্রির তাপমাত্রার পার্থক্যের পরিমাণ বেশি হওয়া, মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া ইত্যাদি। এমনকি যদি দিনের আলোক দৈর্ঘ্য তার পরিমিত মাত্রা ছাড়িয়ে য়ায়, তখনও ফুল দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটা সাধারণত মে, জুন এমন কি জুলাই মাসেও হতে পারে। অতএব, প্রকৃত অর্থে পাট ফসল কে আগাম বা অপরিপক্ব বয়সের ফুল থেকে রক্ষা করতে হলে বিশুদ্ধ পাট জাতের বীজ ব্যবহার করতে হবে এবং উপযুক্ত সময় বীজ বপন করতে হবে। বৃষ্টি না হলে বা কমে হলে, বীজ বপনের পর অন্তত এক বার জমিতে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। অতিরিক্ত উর্বর না হলেও মোটামুটি উর্বরতা সমৃদ্ধ জমিতে পাট ফসল চাষ করতে হবে। তবেই আমাদের দেশের পাটচাষিদের মানের আশা পূরণ হবে। উচ্চফলন ও ভালোমানের আঁশে কৃষকের মাচা ভরে উঠবে, কৃষক ভাইয়েরা অর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

কৃষিবিদ ড. মো. মাহবুবুল ইসলাম*
*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা-১২০৭। মোবাইল : +৮৮০১৫৫২৪১৬৫৩৭

 

বিস্তারিত
গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার ও উপকারিতা

বাংলাদেশে একটি নতুন কৃষি প্রযুক্তি চালু হয়েছে, যা কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের কোনো কোনো জেলায় কৃষক ব্যবহার করে ব্যাপক সুফল পেয়েছেন। প্রযুক্তিটির নাম মাটির গভীরে ইউরিয়া  প্রয়োগ প্রযুক্তি বা Urea Deep Placement (UDP) Technology এটি প্রায় ২০ বছর আগে চালু হলেও গত ৫ বছর ধরে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলসহ ২২টি জেলায় ব্যাপকভাবে কৃষকরা ব্যবহার করে লাভবান হয়েছেন।   
মাটির গভীরে সারপ্রয়োগ প্রযুক্তি কী? এটি মূলত ছিটিয়ে ইউরিয়া ব্যবহারের একটি অত্যন্ত কার্যকর বিকল্প। এ পদ্ধতির মর্মকথা হচ্ছে মাটির গভীরে সার (গুটি ইউরিয়া) প্রয়োগ, যার মাধ্যমে সার সাশ্রয় হয় ও ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়। এ পদ্ধতির দুইটি ধাপ। প্রথমে একটি মেশিনের (ব্রিকেট মেশিন) মাধ্যমে প্রচলিত গুঁড়া ইউরিয়াকে গুটি ইউরিয়ায় রূপান্তর এবং দ্বিতীয়ত মাটির ৩-৪ ইঞ্চি নিচে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ।
গুটি ইউরিয়া : গুটি ইউরিয়া কোনো নতুন সার নয়। এটি গুঁড়া ইউরিয়া সারেরই রূপান্তর। বাংলাদেশেই উদ্ভাবিত একটি মেশিনের (ব্রিকেট মেশিন) মাধ্যমে গুটি ইউরিয়া সহজেই তৈরি করা যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে দুই সাইজের গুটি ইউরিয়া তৈরি করা হয়। আউশ ও আমন মৌসুমের জন্য ১.৮ গ্রাম এবং বোরো মৌসুমের জন্য ২.৭ গ্রাম ওজনের গুটি। গুটি ইউরিয়ায় গুঁড়া ইউরিয়ার মতোই ৪৬ ভাগ নাইট্রোজেন বিদ্যমান।  
গুটি ইউরিয়া ব্যবহার কেন লাভজনক : গুটি ইউরিয়া বাজারে প্রচলিত গুঁড়া ইউরিয়ার তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক। কারণ গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে ধানের ফলন ১৫-২৫% বৃদ্ধি পায়, ইউরিয়া সার তিন ভাগের এক ভাগ লাগে তথা ২০-২৫% খরচ সাশ্রয় হয় এবং আগাছা দমনের খরচ ৩০-৫০% ভাগ কমে যায়। এক হেক্টর জমিতে গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে ধানের ফলন অন্তত ১০০০ কেজি বাড়ে। অর্থাৎ কৃষক অতিরিক্ত ফলনের মাধ্যমে বাড়তি ১৫০০০ টাকা (প্রতি কেজি ধান ১৫ টাকা করে) আয় করতে পারবে।
গুটি ইউরিয়া প্রতি হেক্টরে আউশ আমন ধানে মাত্র ১১২ কেজি এবং উফশী বোরো ধানে ১৭০ কেজি প্রয়োগ করতে হয়। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ফার্টিলাইজার গাইড ২০১২ অনুযায়ী গুঁড়া ইউরিয়া আউশ ও আমন ধানে অন্তত প্রতি হেক্টরে গড়ে ২০০ কেজি ও বোরো ধানে ৪৩৪ কেজি প্রয়োগ করতে হয়। বোরো ধানে যদি ৪০০ কেজি গুঁড়া ইউরিয়াও প্রয়োগ করা হয় তাহলে কৃষকের খরচ পড়বে ৬৪০০ টাকা (প্রতি কেজি ১৬ টাকা করে) অথচ গুটি ইউরিয়া ১৭০ কেজি প্রদানে খরচ পড়ে মাত্র ৩০৬০ টাকা (প্রতি কেজি ১৮ টাকা করে)। অতএব, গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে হেক্টরপ্রতি সাশ্রয় হয় ৩৩৪০ টাকা।
গুটি ইউরিয়ার উপকারিতা : গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের উপকারিতা অনেক। গুটি ইউরিয়া একবার প্রয়োগ করলেই চলে, ধান পাকা পর্যন্ত আর প্রয়োগ করতে হয় না। গুটি ইউরিয়া ব্যবহৃত জমিতে ঘাস বা আগাছা কম হয়। খড়ে পুষ্টিমান বেশি থাকে। পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের উপদ্রব কম হয়। গুটি ইউরিয়া গুঁড়া ইউরিয়ার মতো তিনভাবে অপচয় হয় না। অর্থাৎ বাতাসে উবে যায় না, মাটির গভীরে চুইয়ে অপচয় হয় না এবং পানির সাথে বিলে বা নদী-নালায় চলে যায় না। ফলে পরিবেশ ভালো থাকে। সার কম লাগে বিধায় ভরা মৌসুমে সারের অভাব থাকে না। ইউরিয়া সার ২০-২৫% কম লাগে এবং ধানের ফলন ১৫-২৫% বৃদ্ধি পায়। কৃষক লাভবান হয়।
গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ পদ্ধতি : গুটি ইউরিয়া কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের পূর্বশর্ত হচ্ছে লাইনে চারা রোপণ। চারা রোপণের ৭ দিনের মধ্যে মাটি শক্ত হওয়ার আগে জমিতে ২-৩ সেমি. পানি থাকা অবস্থায় গুটি ইউরিয়া মাটির ৩-৪ ইঞ্চি নিচে প্রয়োগ করতে হয়। জমিতে ২০
×২০ সেমি. (৮×৮ ) দূরত্বে লাইন থেকে লাইন এবং চারা থেকে চারার দূরত্বে ধানের চারা বোপণ করতে হবে। এরপর প্রতি চার গোছার মাঝখানে একটি করে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। গুটি ইউরিয়া হাতেও প্রয়োগ করা যায়। তাছাড়া বারি (BARI) ও আইএফডিসি উদ্ভাবিত প্রয়োগ যন্ত্র (Applicator) দিয়েও প্রয়োগ করা যায়।
অধিক ফলন লাভে করণীয় : গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে অধিক ফলন পেতে হলে অন্যান্য যা করণীয় তা হচ্ছে ভালো জাতের ফলন সম্পন্ন বীজ ব্যবহার, অন্যান্য প্রয়োজনীয় সার ব্যবহার, সময়মতো সেচ প্রয়োগ, বেলে মাটিতে ব্যবহার না করা, সময়মতো পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন।  শুধু ধান নয়, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলেও ব্যবহার করা যায়।
বর্তমানে অন্তত ১২০০ ব্রিকেট মেশিনের মাধ্যমে আইএফডিসির উদ্যোগে দেশে প্রায় ২ লাখ টন গুটি ইউরিয়া উৎপাদন ও ব্যবহার হচ্ছে। ফলে গুঁড়া ইউরিয়া ব্যবহার আস্তে আস্তে হ্রাস পাচ্ছে।
গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে দেশ ও কৃষক অনেক লাভবান হচ্ছে। ইউরিয়া ব্যবহার হ্রাস পাওয়ায় ইউরিয়া সার সাশ্রয় হচ্ছে ও ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সার আমদানি ও চাল আমদানি ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
এখন সময় এসেছে এই সার সাশ্রয়ী, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার। এতে কৃষক লাভবান হবে ও দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ ব্যাপারে ব্যাপকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই সময়।

কৃষিবিদ মাহমুদ হোসেন*

*মহাব্যবস্থাপক (অব.), বিএডিসি, মোবা. ০১৮৩৭৩৫৩৯৭০

 

বিস্তারিত
ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ

বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের প্রায় ৮০% জনগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি অনেকটাই কৃষিনির্ভর। বিভিন্ন কৃষি পণ্য উৎপাদনের জন্য যেসব অনুকূল পরিবেশগত উপাদান প্রয়োজন তার সবই এখানে আছে। কৃষি পণ্যের মধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ফল একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। দেশীয় ফলের পাশাপাশি বিদেশি ফলেরও সাফল্যজনক আবাদ চলছে। আমাদের দেশে সারা বছরই কোনো না কোনো ফল পাওয়া যায়। কোনো কোনো ফলের আবাদ হয় সারা বছর। তবে অধিকাংশ ফলই মৌসুমি। মৌসুমি ফলের মধ্যে ইতোমধ্যে কয়েকটি ফলের আবাদ অন্য ঋতুতেও শুরু হয়েছে। ফলভেদে পুষ্টিগুণ, ঔষধিগুণ, ঘ্রাণ, বর্ণ, স্বাদ এসবের ভিন্নতা আমাদের দেশের ফলে এনেছে বৈচিত্র্য।

স্বাস্থ্য সংরক্ষণে পৃথিবীতে যত খাবার আছে সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বের দিক দিয়ে ফলের স্থান সবার ওপরে। কার্বহাইড্রেট ও প্রোটিনের উপযুক্ত মাত্রায় অবস্থিতির পাশাপাশি আছে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ লবণের সুষম অবস্থান। তাই শরীর সুস্থ ও সবল রাখতে ফলের প্রয়োজনীয়তার কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কাজেই সারা বছর ফলের আবাদ ও প্রাপ্যতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। ফলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপকারী পুষ্টি উপাদানের অধিকাংশই বিভিন্ন ফলে আছে। প্রাকৃতিকভাবেই অধিকাংশ ফলে চর্বি ও সোডিয়াম কম থাকে, কোলেস্টেরল থাকে না বললেই চলে। ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে পটাসিয়াম, খাদ্য আঁশ, ভিটামিন সি ও ফলিক এসিড। ধারণ করা হয়, শরীরের জন্য উপকারী হাজারও রকমের যৌগ ফলে থাকে, যা এখন পর্যন্ত নির্নীত হয়নি।
ফলে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান যেভাবে আমাদের শরীরে কাজ করে তাহলো পটাসিয়ামসমৃদ্ধ ফল গ্রহণ করলে নিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ বজায় থাকে এবং কিডনিতে পাথর জন্মানোর ঝুঁকি কমে যায়। পটাসিয়ামসমৃদ্ধ ফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কলা, কমলা, বরই, পিচফল ও বিশুষ্কিত খেজুর। ফলের খাদ্য আঁশ রক্তের কোলস্টেরল কমায় এবং ফলশ্রুতিতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমিয়ে থাকে। খাদ্যে আঁশ পেতে হলে ফলের জুস না খেয়ে পুরো ফল খাওয়ার ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ভিটামিন সি দৈহিক কোষ বৃদ্ধি ও মেরামতে ভূমিকা রাখে। দেহের জখম নিরময় ও দাঁত সুস্থ রাখতে কাজ করে। দেহের মুক্ত রেডিক্যাল প্রশমনে এটি এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল হলো কমলা, আম, আপেল ও আঙুর। ফলিক এসিড দেহের লাল রক্তিকনিকা তৈরিতে ফলেট ভূমিকা রাখে। গর্ভবর্তী মেয়েদের জন্য এটি খুবই গুরত্বপূর্ণ। ফলেটসমৃদ্ধ ফল হলো- কমলা ও কলা। প্রোটিন দেহকোষ তৈরি ও ক্ষয়পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এনজাইম, জিন ও হরমোন তৈরিতে প্রোটিন সহযোগিতা করে। প্রোটিনসমৃদ্ধ ফল হচ্ছে খেজুর, ডুমুর ও চীনাবাদাম। কিছু কিছু চর্বি শরীরে উপকারী ভূমিকা রাখে এবং এরা অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড সরবরাহ করে। এ ধরনের চর্বি অধিকাংশ ফলে আছে। চর্বি শরীরে ভিটামিন এ, ডি ও ই-এর শোষণে ভূমিকা রাখে। যেসব ফলে অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড থাকে সেগুলোর মধ্যে জলপাই, চীনাবাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশে ১৩০টিরও বেশি ফল আছে। তার মধ্যে কিছু বেশি উল্লেখযোগ্য ফল হলো আম, আনারস, কাঁঠাল, কালজাম, নারিকেল, কলা, পেয়ারা, লিচু, জলপাই, আঙুর, বাতাবিলেবু, খেজুর, তাল, বেল, তরমুজ, বরই, তেঁতুল, আমড়া, পেঁপে, কমলা এসব। ফল খেলে আমাদের যেসব উপকার হয়
ক. শরীরে সুস্থতা প্রদান করে গ্রহণযোগ্য ওজন বজায় রাখতে সহায়তা করে; হৃদরোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে; কোলস্টেরল ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাজ করে; বয়স বাড়ার সাথে হাড়ের যে ক্ষয় হয় তা কমিয়ে দেয়; কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়; মানসিক অস্থিরতা ও বিষণœতা প্রশমনে ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া ফল চাষে জন্য যথেষ্ট উপযোগী।
বিভিন্ন চিত্তাকর্ষক বর্ণ ও ঘ্রাণ আমাদের ফলে এনেছে বিশষে ধরনের বৈশিষ্ট্য। বর্ণভেদে মানবদেহে ফলের উপকারেও ভিন্নতা রয়েছে। কয়েকটি বর্ণের ফলের কার্যকারিতা এমন-
নীল বা বেগুনি-লাল : এ বর্ণের ফলে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সাথে জড়িত বিভিন্ন মাত্রায় ফাইটোকেমিক্যাল যেমন এনথোসায়ানিন ও ফিনোলিক থাকে। এসব যৌগ এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। নীল বা বেগুনি-লাল বর্ণের ফল ব্যবহারে- কিছু কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে; মূত্রাশয় নালি ভালো থাকে; স্মৃতিশক্তি উন্নত হয়। লাল বা বেগুনি-লাল বর্ণের ফলের মধ্যে রয়েছে: কালজাম, বিশুষ্কিত বরই, বেগুনি-লাল বর্ণের ডুমুর, বেগুনি-লাল বর্ণের আঙুর ও কিশমিশ। সবুজ ফলে লিউটিন ও ইনডোল ফাইটোকেমিক্যাল থাকে। এ বর্ণের ফলের উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে- কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিরোধ করে; দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে; হাড় ও দাঁত শক্ত রাখে। সবুজ ফলের মধ্যে সবুজ আপেল, সবুজ আঙুর, লেবু, সবুজ নাশপাতি ও অ্যাভোকেডো উল্লেখযোগ্য। সাদা ফল : সাদা ও বাদামি ফল বিভিন্ন মাত্রায় ফাইটোমিক্যাল বহন করে। রসুনে এলিসিন এবং মাশরুমে সেলেনিয়াম থাকে। এ নিয়ে যথেষ্ট গবেষণার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের ফল থেকে যেসব উপকার পাওয়া যেতে পারে তা হলো- হৃৎপি- সুস্থ থাকে; কোলস্টেরল মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে; কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে। উল্লেখযোগ্য সাদা ফল হচ্ছে- কলা, বাদামি নাশপাতি, খেজুর ও সাদা পিচফল।
হলুদ বা কমলা ফল : এ বর্ণের ফল বিভিন্ন মাত্রায় এন্টিঅক্সিডেন্ট যেমন ভিটামিন ‘সি’ বহন করে। অন্যান্য এন্টিঅক্সিডেন্ট হলো- ক্যারোটিনয়েড ও বায়োফ্লাভোনয়েড। এগুলোর উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হলো- হৃৎপি- ভালো রাখে; দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে; রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে; কিছু কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। হলুদ বা কমলা বর্ণের ফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- হলুদ আপেল, হলুদ ডুমুর, লেবু, আম, কমলা, পেঁপে, পিচ, হলুদ নাশপাতি, আনারস, হলুদ তরমুজ, মিষ্টিকুমড়া ও হলুদ টমেটো। লাল ফল : এ ধরনের ফলে বিদ্যমান ফাইটোকেমিক্যাল হলো- লাইকোপেন ও এনথোসায়ানিন। লাল ফলের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হলো- হৃৎপি- ভালো রাখে; স্মৃতিশক্তি উন্নত রাখে; মূত্রনালী ভালো রাখে; কিছু কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। উল্লেখযোগ্য লাল ফল হচ্ছে : লাল আপেল, লাল কমলা, লাল আঙুর, লাল নাশপাতি, তরমুজ, স্ট্রবেরি ও টমেটো। তবে উৎপাদিত ফলের অধিকাংশই মৌসুমি। ফলকে সারা বছর ব্যবহার উপযোগী করতে প্রয়োজন উপযুক্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাপনা। এতে কৃষির ভিত হবে মজবুত ও বহুমুখী। উৎপাদিত ফলের অপচয় বহুলাংশে হবে রোধ। কৃষক পাবে উৎপাদিত ফলের উপযুক্ত বাজার। দেশে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিসরে গড়ে উঠবে আরও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং সে সাথে ঘটবে অব্যবহৃত বা অপর্যাপ্তভাবে ব্যবহৃত শ্রমের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। জাতীয় কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হবে মজবুত ও গতিশীল।
আমাদের দেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফল ও ফলজাত পণ্য। কাজেই ফলের আবাদ বাড়ানো ও বহুমুখী করা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য অনুকূল পরিবেশ বয়ে আনবে। ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের কথা বিবেচনা করলে, গাছে পরিপক্ব পাকা ফল নির্বাচন করা দরকার। উন্নতমানের প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্য পেতে এ বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আমাদের দেশে থাকা সহায়ক উপাদানসমূহ হচ্ছে-
১. মৌসুমে ফলের সহজপ্রাপ্যতা ও স্বল্প বাজার মূল্য;
২. অন্যান্য দেশের তুলনায় অব্যবহৃত প্রচুর শ্রমের উপস্থিতি ও তার স্বল্পমূল্য;
৩. দেশে ও বিদেশে প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা;
৪. এ কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পানি, যা দেশের সর্বত্রই পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে;
৫. মোড়কীকরণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ রাসায়নিক দ্রব্য এখন আমাদের দেশে সহজেই পাওয়া যায়;
৭. সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রবর্ধনের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে বিধায় ক্ষুদ্র পরিসরে খাদ্য বা ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে-এসেপসিস বা খাদ্য থেকে অনুজীবকে দূরে সরিয়ে রাখা; খাদ্য থেকে অনুজীব অপসারণ; অবায়বীয় অবস্থার সৃষ্টি; শুষ্কীকরণ; নিম্ন তাপমাত্রার প্রয়োগ; উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োগ; রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার; তেজস্ক্রিয় রশ্মির ব্যবহার; অনুজীবের যান্ত্রিক বিনাশকরণ। সংরক্ষিত ফল : বিভিন্ন পদ্ধতিতে খাদ্য সংরক