কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

ইঁদুরের আক্রমণে ক্ষতি এবং এর দমন ব্যবস্থাপনা

ভূমিকা : ইঁদুর জাতীয় প্রাণী বলতে আমরা সদা বর্ধিষ্ণু দাঁত বিশিষ্ট প্রাণী বুঝি। কাঠবিড়ালি, সজারু, ইঁদুর এই প্রাণী বর্গের অন্তর্ভুক্ত। সারা পৃথিবীতে ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর প্রায় ১৭০০টি প্রজাতি আছে। তন্মধ্যে ২০টি প্রজাতি আপদবালাই রূপে চিহ্নিত। ইঁদুর জাতীয় প্রাণীদের কাটাকাটির স্বভাব তার প্রকৃতিগত। দাঁত ছোট রাখার জন্য এরা প্রতিনিয়তই কাঁটাকাটি করে। যদি ইঁদুরের এ অভ্যাস বন্ধ রাখা হয়, তবে তার দাঁত অনেক বড় হয়ে যাবে। সুতরাং দাঁত ছোট রাখার জন্য তাকে প্রতিনিয়তই কাটাকাটি করতে হয়। এক হিসাবে দেখা গেছে যে, ইঁদুর যে পরিমাণ ভক্ষণ করে তার দশ গুণ সে কেটে নষ্ট করে।


বিশ্বের অন্যতম ইঁদুর উপদ্রুত এবং বংশ বিস্তারকারী এলাকা হচ্ছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা। যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এখানকার উপকূলীয় লোনা ও মিঠাপানির মিশ্রণের এলাকাগুলো ইঁদুরের বংশ বিস্তারের জন্য বেশ অনুকূল। ফসলের মাঠ ছাড়াও এ অববাহিকায় অবস্থিত হাট-বাজার ও শিল্পাঞ্চলগুলোতেও ইঁদুরের উপদ্রব বেশি পরিলক্ষিত হয় (ইউএসডিএ, ২০১০)।


ইঁদুর আমাদের বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের একটি প্রাণী। জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করতে ইঁদুরের প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু সময়ে ইঁদুর ফসল ও কৃষকের শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাই জমির শস্য ও গোলার ফসল রক্ষার্থে ইঁদুর দমন করতে হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগ ইঁদুর দমনে পেঁচা নিয়ে গবেষণা করছে। বিশ্বের ইসরায়েল একমাত্র দেশ যারা একমাত্র পেঁচা দিয়ে ইদুর দমন করছে। আমরা জানি ইঁদুরের প্রধান শত্রু পেঁচা, চিল, সাপ, বিড়াল প্রভৃতি। পেঁচা দিয়ে জৈবিক উপায়ে ইঁদুর দমন করা গেলে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা পাবে। সেই সাথে কৃষকও স্বল্প খরচের ফসলি জমির  ও গোলার শস্য ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতির থেকে রক্ষা করতে পারবে।


দানাদার শস্যে ক্ষতির পরিমাণ : বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, প্রতি বছর দুই হাজার কোটি টাকার খাদ্য শস্য ইঁদুরের পেটে চলে যাচ্ছে। ইঁদুর যে শুধুমাত্র দানাদার ফসলের ক্ষতি করে তা নয়, অন্যান্য ফসল, ফলমূল ও আসবাবপত্রেরও ক্ষতি সাধন করে, যেমন- নারিকেল, আলু, ডাল, অন্যান্য সবজি ইত্যাদি। বৈদ্যুতিক তার ও যন্ত্রপাতিও এর হাত থেকে রেহাই পায় না। তাছাড়া ইঁদুর বিভিন্ন ধরনের স্থাপনাও কেটে নষ্ট করে, যার অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক তবে তা মুদ্রা মানে ইতিপূর্বে খুব একটা হিসাব করা হয়নি। সরকারি-বেসরকারি খাদ্য গুদাম, পাউরুটি ও বিস্কুট তৈরির কারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পাইকারি ও খুচরা পণ্য বিক্রেতার দোকানে বিপুল পরিমাণে খাদ্য ইঁদুর নষ্ট করছে যার পরিসংখ্যানও অজানা।


ইঁদুরের আক্রমণের কারণে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন ১১টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফসলের মোট ক্ষতির বিবেচনায় ইঁদুরের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ফিলিপাইন। দেশটির উৎপাদিত ধানের ২০ শতাংশ ইঁদুর খেয়ে ফেলে ও নষ্ট করে। লাওস এ প্রায় ১৫ শতাংশ ধান ইঁদুরের পেটে যায়। বাংলাদেশে ইঁদুরের আক্রমণে বছরে আমন ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ, গম ৪-১২ ভাগ, গোল আলু ৫-৭ ভাগ, আনারস ৬-৯ ভাগ নষ্ট করে। গড়ে মাঠ ফসলের ৫-৭% এবং গুদামজাত শস্য ৩-৫% ক্ষতি করে। ইঁদুর শতকরা ৭ থেকে ১০ ভাগ সেচ নালাও নষ্ট করে থাকে। সেটা ফসলের উৎপাদনের উপর প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) এর এক গবেষণায় দেখা যায়, এশিয়ায় ইঁদুর বছরে যা ধান-চাল খেয়ে নষ্ট করে তা ১৮ কোটি মানুষের এক বছরের খাবারের সমান। শুধু বাংলাদেশে ইঁদুর ৫০-৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার নষ্ট করে। তাছাড়া ইঁদুরের মাধ্যমে মোট ৬০ ধরনের রোগ ছড়ায়।


ইঁদুরের আশ্রয়স্থানসমূহ : গ্রীষ্ম মৌসুমে ইঁদুর সাধারণত ফসলের ক্ষেতে ও গ্রাম এলাকার বিভিন্ন স্থানে গর্ত করে সেখানে অবস্থান করে। কিন্ত বর্ষা মৌসুমে নিম্নভূমি প্লাবিত হলে এবং ফসলের জমিতে বৃষ্টির পানি জমলেই ইঁদুর গিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উঁচু গ্রামীণ সড়ক, বেড়িবাঁধ  ও পুরোনো স্থাপনায় ইঁদুরের দল গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ অবকাঠামোগুলো কাটাকাটি করে ইঁদুর বাসা তৈরি করে। বর্ষা এলে জোয়ার-ভাটার পানির মতো ইঁদুরও বেড়িবাঁধগুলোর জন্য অভিশাপ হয়ে আসে। জোয়ার ভাটা ও বন্যার পানি ফসলের মাঠ ডুবিয়ে দিলে ইঁদুর এসে বেড়িবাঁধ ও গ্রামীণ সড়ক ফুটো করে সেখানে আশ্রয় নেয়। আর ঐ ফুটো দিয়ে পানি প্রবেশ করে বেড়িবাঁধ ও সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


ধান ক্ষেতে ও গুদামে ইঁদুরের আক্রমণ : ইঁদুর ধানগাছের কুশি  তেরছা করে (৪৫ ডিগ্রি কোণে) কেটে দেয়। ধান পাকলে ধানের ছড়া কেটে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ করে জমা রাখে। ধানের জমিতে প্রধানত মাঠের বড় কালো ইঁদুর, মাঠের কালো ইঁদুর ইত্যাদি ক্ষতি করে থাকে। গেছো ইঁদুর গুদামজাত শস্যের ক্ষতিসাধন করে থাকে।


দমন ব্যবস্থাপনা : ইঁদুর দমনে বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক (যেমন-লাইভ ট্র্যাপ, স্ন্যাপ ট্র্যাপ), রাসায়নিক  (যেমন-ফসটক্সিন, মিথাইল ব্রোমাইড ইত্যাদি) ব্যবহার হচ্ছে। ধানের জমিতে ইঁদুর দমনের ক্ষেত্রে জীবন্ত ফাঁদ (live trap) সবচেয়ে কার্যকরী। ফাঁদে টোপ হিসেবে শামুকের মাংস, ধান, নারিকেলের শাঁস, কলা ও শুঁটকি মাছ ব্যবহার করলে ইঁদুর বেশি ধরা পড়ে। তাছাড়া  ধান বা চালের সাথে নারিকেল তৈল টোপ হিসেবে ব্যবহার করলে বেশ কার্যকরী ফলাফল পাওয়া যায়। শস্য গুদাম এবং বসতবাড়িতে ইঁদুর দমনের ক্ষেত্রে আঠাযুক্ত  ফাঁদ বেশি কার্যকরী। ইঁদুর অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী তাই প্রতিদিন একই ধরনের বিষ টোপ ব্যবহার না করে তা পরিবর্তন করে দিতে হবে।
ইঁদুরের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে -

 

জমির আইল সরু (৬x৮ ইঞ্চি) ও আশপাশ আবর্জনা মুক্ত রাখা।
ইঁদুর উপদ্রুত এলাকায় যথাসম্ভব একই সময়ে কর্তন করা যায় এমনভাবে ফসলের চাষ করা।
গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর নিধন করা।
গর্তে পানি অথবা মরিচের ধোঁয়া দিয়ে ইঁদুর বের করে মেরে ফেলা।
বিভিন্ন প্রকারের ফাঁদ ব্যবহার করে ইঁদুর দমন করা।
গাছের কাণ্ডে পিচ্ছিল ধাতব পাত পেচিয়ে ইঁদুরের গাছে উঠা প্রতিরোধ করা।
জৈবিক দমন অর্থাৎ বিড়াল, সাপ, বেজি, পেঁচা, চিল ইত্যাদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
বিভিন্ন ধরনের ইঁদুরনাশক যেমন-একমাত্রা ও বহুমাত্রা বিষ টোপ, গ্যাস বড়ি ইত্যাদি সাবধানতার সাথে ব্যবহার করা।
গোলার শস্য মেঝেতে মাচা করে রাখা।
গুদামজাত শস্যের ক্ষেত্রে ফাঁদ ব্যবহার করে জীবন্ত অবস্থায় ইঁদুর ধরে মারা।
ইঁদুর ধরার জন্য বিশেষ ধরনের আঠালো গ্লু (র‌্যাট গ্লু) কাঠের উপর ব্যবহার করা।
বড় গুদামে শস্য সংরক্ষণের পূর্বে গ্যাস বাষ্প ব্যবহার করা।

 

মীর মোঃ মনিরুজ্জামান কবির১ ড. মো. নজমুল বারী২ ড. শেখ শামিউল হক৩
১বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মোবাইল : ০১৭১২২১৫৪৮৯, ৩মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অ. দা.) এবং বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর-১৭০১

বিস্তারিত
ইঁদুর নিধন অভিযান ২০১৮

কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। ঘরবাড়ি তৈরি ও নগরায়ণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত কৃষি জমি কমতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। বর্তমান সরকারের কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে আজ কৃষির প্রত্যেকটি খাতে উন্নতি সাধিত হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আরও গতিশীল হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক ই-কৃষি খুলে দিয়েছে কৃষিক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগের দুয়ার। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে কৃষি। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় এই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার সফল অভিযোজনের ফলে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। প্রতিবছর ফসলের বালাই ও ইঁদুরের আক্রমণের ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে যা অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে অন্তরায়।


ইঁদুর প্রাণীটি ছোট হলেও ক্ষতির ব্যাপকতা অনেক। এ প্রাণী প্রতিনিয়তই কৃষকের কষ্টার্জিত ফসলের ক্ষতিসাধন করছে যেমন- মাঠের শস্য কেটেকুটে নষ্ট করে, খায় এবং গর্তে জমা করে। এরা যে কোনো খাদ্য খেয়ে বাঁচতে পারে। যে কোনো পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে। অল্প বয়সে বাচ্চা দিতে পারে। ইঁদুরের বিচরণ ক্ষেত্র ফসলের ক্ষেত থেকে শুরু করে বাড়ির শোবার ঘর পর্যন্ত সর্বত্র। আর তাই এদের ক্ষতির দিকটি অনেক বিস্তৃত। এরা মাঠের ফসল, গুদামজাত শস্য, ফল, শাকসবজি, সংরক্ষিত বীজ, কাপড়-চোপড়, কাগজ, লেপ-তোষক ইত্যাদি কাটাকুটি করে আমাদের ক্ষতি সাধন করে। ২০১৩ সালের এক গবেষণা মতে এশিয়ায় ইঁদুর বছরে যা ধান-চাল খেয়ে নষ্ট করে তা ১৮ কোটি মানুষের এক বছরের খাবারের সমান। আর শুধু বাংলাদেশে ইঁদুর ৫০-৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার নষ্ট করে। এরা যে শুধুই কাটাকুটি করে আমাদের ক্ষতি করে তাই নয়, এরা মানুষ ও পশুপাখির মধ্যে প্লে­গ, জন্ডিস, টাইফয়েড, চর্মরোগ, আমাশয়, জ্বর, কৃমিসহ প্রায় ৬০ প্রকার রোগ জীবাণুর বাহক ও বিস্তারকারী। একটি ইঁদুর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭ গ্রাম খাদ্য খেয়ে থাকে। এরা যা খায় তার ৪/৫ গুণ নষ্ট করে। বাংলাদেশের ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই অনিষ্টকারী মেরুদণ্ডী প্রাণী দমন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


ইঁদুর স্তন্যপায়ী, সর্বভুক ও নিশাচর প্রাণী। ইঁদুরের উপরের ও নিচের চোয়ালের সামনের জোড়া দাঁত চোয়ালের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায় এবং এই জোড়া দাঁতের কোন রুট ক্যানেল না থাকায় সামনের কর্তন দন্তগুলো অনবরত সারাজীবন বাড়তে থাকে। আর এই সদা বর্ধিষ্ণু দাঁতকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখার জন্য ইঁদুর সর্বদা কাটাকুটি করতে থাকে। ফলে ইঁদুর যা খায় তার চেয়ে অনেক বেশি খাবার নষ্ট করে থাকে। তাই ইঁদুরের ক্ষতি এত ভয়াবহ। সারা পৃথিবীতে প্রায় ৪১০০টির মতো স্তন্যপায়ী প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে যার মধ্যে ১৭০০টির মতো ইঁদুরের প্রজাতি। প্রজাতি ভেদে ইঁদুর ১৫-৪১ সে.মি. লম্বা এবং ওজনে ১৫-৩২৬ গ্রাম হয়ে থাকে। আমাদের দেশে যে সকল প্রজাতির ইঁদুর দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে নরওয়ে বা বাদামি ইঁদুর, বাতি বা সোলাই ইঁদুর, মাঠের কালো ইঁদুর, মাঠের বড় কালো ইঁদুর, মাঠের নেংটি ইঁদুর, নরম পশমযুক্ত ইঁদুর এবং প্যাসিফিক ইঁদুর উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে নরওয়ে বা বাদামি ইঁদুর ঘরের ও গুদামজাত শস্যের ক্ষতি করে থাকে, ঘরের ইঁদুর বা গেছো ইঁদুর গুদামজাত শস্য, ফলজাতীয় ফসল এবং আসবাবপত্রের ক্ষতি করে, বাতি বা সোলাই ইঁদুর ঘরের বই-পত্র, কাপড়-চোপড় এবং শস্যদানা নষ্ট করে থাকে, মাঠের কালো ইঁদুর সব ধরনের মাঠ ফসল ও গুদামজাত ফসলের ক্ষতি করে থাকে, মাঠের বড় কালো ইঁদুর বোনা আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি করে, মাঠের নেংটি ইঁদুর মাঠের দানা জাতীয় ফসল পাকার পর ফসলের ক্ষতি করে থাকে, নরম পশমযুক্ত ইঁদুর ধান গম বার্লির ক্ষতি করে থাকে এবং প্যাসিফিক ইঁদুর ফলজ গাছ বিশেষ করে নারকেল গাছের ক্ষতি করে থাকে।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক গত পাঁচ বছরে ইঁদুর নিধন অভিযান কর্মসুচি বাস্তবায়নের সুফল এবং রক্ষাকৃত আমন ফসলের পরিমাণ সম্বলিত তথ্য চিত্রটি পরবর্তী পাতায় দেয়া হলো।
সারাবিশ্বে পোলট্রি শিল্প ইঁদুর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে এবং পোলট্রি উৎপাদনকারীদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। পোলট্রি শিল্পে ইঁদুর দ্বারা অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকে লক্ষ্য রেখে মুরগি খামারিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যাতে সমন্বিতভাবে ইঁদুর দমনে অংশগ্রহণ করে এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইঁদুর বর্তমানে পোলট্রি ফার্মে ছোট বাচ্চা ও ডিম খেয়ে ফার্মের মালিকদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতির ধরন, এর ব্যাপকতা ও দমন প্রক্রিয়া অন্যান্য বালাই থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও কৌশলগত। তাই স্থান কাল পাত্রভেদে কৌশলের সঠিক ও সমন্বিত দমন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে ইঁদুর দমন করতে হবে। এতে করে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, ইঁদুর বাহিত রোগ ও পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমানো সম্ভব হবে।


ইঁদুর নিধন অভিযান ২০১৮ এর উদ্দেশ্য
- কৃষক, কৃষানী, ছাত্রছাত্রী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আইপিএম/আইসিএম ক্লাবের সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসহ সর্বস্তরের জনগণকে ইঁদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করা।
- ইঁদুর দমনের জৈবিক ব্যবস্থাসহ লাগসই প্রযুক্তি কৃষি কর্মীগণের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো।
- ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিল্প কারখানা ও হাঁস মুরগির খামার ইঁদুরমুক্ত রাখার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা।
- আমন ফসল ও অন্যান্য মাঠ ফসলে ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা।
- গভীর ও অগভীর নলকূপের সেচের নালার ইঁদুর মেরে পানির অপচয় রোধ করা।
- রাস্তাঘাট ও বাঁধের ইঁদুর নিধনের জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা।
- ইঁদুর বাহিত রোগের বিস্তার রোধ করা এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা।


কর্মসূচির সময়: এক মাসব্যাপী ইঁদুর নিধন অভিযান সারাদেশে একযোগে পরিচালনা করা হবে। জাতীয় পর্যায়ে ইঁদুর নিধন অভিযান, ২০১৮ এর উদ্বোধনের পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অঞ্চল, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উদ্বোধন করা হবে। জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের দিনে বিগত অভিযানের জাতীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ সংখ্যক ইঁদুর নিধনকারীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হবে। অঞ্চল, জেলা পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট জেলার সংসদ সদস্য/জেলা পরিষদ প্রশাসক/উপজেলা চেয়ারম্যান/সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ/পৌরসভার চেয়ারম্যান/মেয়র অথবা তার মনোনীত ব্যক্তির উপস্থিতিতে উদ্বোধন করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য/ জেলা পরিষদ প্রশাসক/ উপজেলা চেয়ারম্যান/সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অথবা তার মনোনীত প্রতিনিধি দ্বারা করাতে হবে।


ইঁদুর নিধনে পুরস্কার প্রদান : যারা পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন তাদের ক্রমানুসারে ১টি ক্রেস্ট, ১টি সনদপত্র ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। বিগত বছরের অভিযান বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা পর্যায়ে পুরস্কার দেয়া হয়ে থাকে। পুরস্কার পাবার যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রাথমিকভাবে অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক যাচাই বাছাই করার পর জাতীয় পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত করে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।


উপসংহার : ইঁদুর দমন পদ্ধতি পোকা ও রোগবালাই দমন পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ ইঁদুর অত্যন্ত চালাক প্রাণী এবং এখানে বিষটোপ ও ফাঁদ লাজুকতার সমস্যা রয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতি ও সঠিক স্থানে দমন পদ্ধতি গ্রহণ না করা হলে দমন ব্যবস্থা ততটা কার্যকর হয় না। একা ইঁদুর মারলে দমন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ ইঁদুর সর্বদা খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য স্থান পরিবর্তন করে থাকে। এজন্য পাড়া প্রতিবেশীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একই দিনে ও একই সময়ে ইঁদুর নিধন করা প্রয়োজন (মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও গণচীনে নির্দিষ্ট দিনে ও নির্দিষ্ট সময়ে এভাবে ইঁদুর নিধন করা হয়)। ইঁদুর দমনের কলাকৌশল অধিক সংখ্যক কৃষকের নিকট পৌঁছানোর জন্য প্রত্যেক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তার ব্লকের ৬০০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন। এ বছর ১৫,০০০ কর্মসূচি পুস্তিকা ও ১০০০০ পোস্টার মুদ্রণ করে অঞ্চল, জেলা ও উপজেলায় পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কর্মসূচি পুস্তিকায় ইঁদুর দমন প্রযুক্তি সংক্ষিপ্ত আকারে সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়া সরকার অনুমোদিত ব্রমাডিওলোন ও জিংক ফসফাইড গ্রুপের ইঁদুর নাশক (যেমন-ল্যানির‌্যাট, ব্রমাপয়েন্ট, রেটক্স, জিংক ফসফাইড ইত্যাদি) বিষটোপ যথেষ্ট পরিমাণে বালাই নাশক ডিলারের দোকানে মজুদ রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইঁদুরের সমস্যা দীর্ঘদিনের, এ সমস্যা পূর্বে যেমন ছিল, বর্তমানেও রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং অংশীদারিত্ব। একা ইঁদুর নিধন করার সাথে সাথে অন্যদের ইঁদুর নিধনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। একা ইঁদুর নিধন করলে সাময়িকভাবে এ সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে, তবে অল্প কিছুদিন পরই আবার অন্য স্থানের ইঁদুর এসে সমস্যার সৃষ্টি করবে। ঘরবাড়ি, গুদাম, হাঁস-মুরগির খামার, অফিস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিনিয়ত ইঁদুরের উপস্থিতি যাচাই করে ইঁদুর নিধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

কৃষিবিদ অমিতাভ দাস
পরিচালক, উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা

বিস্তারিত
ইঁদুর পরিচিতি ক্ষতির ধরন ও সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা

আবহমান বাংলার গৌরবময় ইতিহাস ঐতিহ্য মিশে আছে কৃষির সঙ্গে। প্রাচীনকাল থেকে আমাদের অর্থনীতিতে কৃষি ও কৃষকের অবদান অসামান্য। এদেশের কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কৃষিবান্ধব সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে দেশের জনগণের দৈনন্দিন খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ, শিল্পোৎপাদন, কর্মসংস্থানসহ কৃষি খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য এবং রপ্তানি বাণিজ্যের সম্ভাবনা সমুজ্জল। উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রোগ-বালাই ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীর আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করা একটা চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অনিষ্টকারী মেরুদ-ী প্রাণী দমন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের ফসল উৎপাদন ও গুদামজাত শস্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ইঁদুর এক বড় সমস্যা। মাঠের শস্য কেটে কুটে নষ্ট করে, খায় এবং গর্তে জমা করে। গুদামজাত শস্যে মলমূত্র ও লোমের সংমিশ্রণ করে, মানুষ ও গবাদি পশুদের মধ্যে রোগ-বালাই সংক্রমণ করে,   সর্বোপরি পরিবেশ দূষিত করে। সরকারি বেসরকারি খাদ্য গুদাম, বেকারি, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পাইকারি ও খুচরা পণ্য বিক্রির দোকানে বিপুল পরিমাণে খাদ্য ইঁদুর নষ্ট করে যার প্রকৃত কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিষয়ক সংস্থার এক গবেষণায় দেখা যায় যে, গঙ্গা- ব্রক্ষ্মপুত্র অববাহিকা বিশ্বের অন্যতম ইঁদুর উপদ্রুত এবং বংশবিস্তারকারী এলাকা, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এখানকার উপকূলীয় লোনা ও মিঠা পানির মিশ্রণের এলাকাগুলো ইঁদুরের বংশবিস্তারের জন্য বেশ অনুকূল। মাঠের ফসল ছাড়াও এই অববাহিকায় অবস্থিত হাট বাজার ও শিল্পাঞ্চলগুলোতেও ইঁদুরের দাপট বেশি। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো, মঙ্গলবার, ১৬ জুন/২০১৫)।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (
IRRI)  ইঁদুরের উৎপাতের কারণে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ১১টি দেশকে চিহ্নিত করেছে। ইরির হিসেবে, ফসলের মোট ক্ষতির বিবেচনায় ইঁদুরের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ফিলিপাইন। দেশটির উৎপাদিত ধানের ২০ শতাংশ ইঁদুর খেয়ে ফেলে ও নষ্ট করে। এর পরেই আছে লাওস নামক দেশটি। দেশটির প্রায় ১৫ শতাংশ ধান ইঁদুরের পেটে যায়। ইরির এক গবেষণায় বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় ১০ শতাংশ ধান- গম ইঁদুর খেয়ে ফেলে ও নষ্ট করে। (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মঙ্গলবার, ১৬জুন/২০১৫)। বাংলাদেশে ইঁদুরের কারণে বছরে আমন ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ, গম ফসলে ৪-১২ ভাগ, গোল আলুতে ৫-৭ ভাগ, আনারস ৬-৯ ভাগ নষ্ট হয়। গড়ে মাঠ ফসলের ৫-৭ % এবং গুদামজাত শস্য ৩-৫% ক্ষতি করে। ইরির ২০১৩ সালের এক গবেষণা মতে, এশিয়ায় ইঁদুর বছরে যা ধান-চাল খেয়ে নষ্ট করে, তা ১৮ কোটি মানুষের এক বছরের খাবারের সমান। আর শুধু বাংলাদেশে ইঁদুর ৫০-৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার নষ্ট করে। ১৭০০টি ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর মধ্যে বাংলাদেশে ১২টির অধিক ক্ষতিকারক ইঁদুর জাতীয় প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। প্রজাতিভেদে এদের ওজন ৭০-৪৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। ইঁদুর আকারে ছোট হলেও সারা বছরে সব ধরনের ক্ষতি মিলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করে। ইঁদুর বেড়িবাঁধ ও বিভিন্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে গর্ত করে এবং মাটি সরিয়ে বাঁধ দুর্বল করে ফেলে যার কারণে বাঁধ ভেঙে পানি দ্বারা প্লাবিত হয়ে বাড়ি ঘর, ফসলাদি ও গবাদিপশুর  ক্ষতি হয়ে থাকে। ইঁদুর মাঠের ও ঘরের শস্য নষ্ট করা ছাড়া বৈদ্যুতিক তার, টেলিফোন তার ও কম্পিউটার যন্ত্র কেটেও নষ্ট করে। এদের দ্বারা ক্ষতির পরিমাণ পরিসংখ্যানগত ভাবে নির্ণয় করা স্বভাবতই কঠিন।


স্তন্যপায়ী (Mammalian) শ্রেণীর রোডেনশিয়া (Rodentia) বর্গের অন্তর্ভুক্ত ইঁদুর জাতীয় প্রাণী (Rodent) হলো একটি বিশেষ ধরনের প্রাণী। এ জাতীয় প্রাণী বর্গের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের দাঁতের গঠন ও বিন্যাস। ইঁদুর জাতীয় প্রাণী Rodent শব্দটি  এসেছে তাদের কর্তন দাঁত (Rodere= কাটা,dent = দাঁত)। যা অত্যন্ত তীক্ষ্মও ধারালো বাটালির মতো। এই দাঁত জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাড়তে থাকে। তাই ইঁদুর তাদের দাঁতের গঠন ঠিক রাখার জন্য বা দাঁত ক্ষয় করার জন্য সবসময় কাটাকুটি করে।  বিভিন্ন ধরনের ইঁদুরের মধ্যে কালো ইঁদুর, মাঠের বড় কালো ইঁদুর, নরম পশমযুক্ত মাঠের ইঁদুর ও ছোট লেজ যুক্ত ইঁদুর ধানের ক্ষতি করে। এদের মধ্যে কালো ইঁদুর মাঠে ও গুদামে এবং মাঠের বড় কালো ইঁদুর নিম্ন ভূমির জমিতে বেশি আক্রমণ করে। ইঁদুর যে কোনো পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে দ্রুত বংশ বিস্তার করতে পারে। উপযুক্ত এবং অনুকূল পরিবেশে একজোড়া প্রাপ্ত বয়স্ক ইঁদুর থেকে এক বছরে ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি পেয়ে ২০০০- ৩০০০টি হতে পারে। একটি স্ত্রী ইঁদুরের বয়স ৩ মাস পূর্ণ হলে বাচ্চা দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করে। বাচ্চা প্রসবের পর ২ দিনের মধ্যেই স্ত্রী ইঁদুর পুনরায় গর্ভধারণ করতে পারে। এদের গর্ভধারণ কাল প্রজাতিভেদে ১৮-২২ দিন হয়। সারা বছরই বাচ্চা দিতে পারে তবে বছরে ৫-৭ বার এবং প্রতিবারে ৬-১০টি বাচ্চা জন্ম দিয়ে থাকে। মা ইঁদুর এদের যতœ বা লালন পালন করে থাকে। এদের ১৪-১৮ দিনে চোখ ফোটে। চার (৪) সপ্তাহ পর্যন্ত  মায়ের দুধ পান করে এবং ৩ (তিন) সপ্তাহ পর থেকে শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে। পাঁচ ( ৫) সপ্তাহ পর থেকে এরা মা এর সঙ্গ থেকে আলাদা হয়ে যায়। একটি ইঁদুরের জীবনকাল ২-৩ বছর হয়ে থাকে।
 

মাঠের কালো ইঁদুর বা ছোট ব্যান্ডিকুট ইঁদুর (Bandicota bengalensis) : মাঠ ফসলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে। এদের ওজন প্রায় ১৫০-৩৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং লম্বায় ৭.৫-৩০ সে. মি.। পশম কালো ধূসর রংয়ের।  মাথা ও শরীরের মোট দৈর্ঘ্যরে তুলনায় লেজ কিছুটা খাটো। এরা সাঁতারে পটু। বাংলাদেশের বনাঞ্চল ব্যতীত সর্বত্র এদের দেখা যায় সব জাতীয় কৃষি ফসলেই এদের পাওয়া যায়। এছাড়াও শহর এলাকা, ঘর বাড়ি এবং গুদামেও এদের উপস্থিতি দেখা যায়। এ প্রজাতির ইঁদুর রাস্তাঘাট, পানি সেঁচের নালা, বাঁধ এবং ঘর বাড়ির যথেষ্ট ক্ষতি করে থাকে। এ প্রজাতির একটি ইঁদুর এক রাতে ২০০-৩০০টি ধান বা গমের কুশি কাটতে পারে।


মাঠের বড় কালো ইঁদুর বা বড় ব্যান্ডিকুট ইঁদুর (Lesser bandicoot rat, bandicota indica) : এরা দেখতে মাঠের কাল ইঁদুরের মতো। তবে তাদের চেয়ে আকারে বেশ বড়, মুখাকৃতি সরু এবং এদের ওজন ৩৫০-১০০০ গ্রাম হয়ে তাকে। পেছনের পা বেশ বড় এবং কাল হয়। এ জাতীয় ইঁদুরের রং কালচে ধূসর বা তামাটে বর্ণের। মাথা ও দেহের মোট দৈর্ঘ্যরে তুলনায় লেজ কিছুটা খাটো ও বেশ মোটা। এরাও সাতারে পটু। গর্তে বাস করে, গর্ত ৮-১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এরা সাধারণত মাঠে ধান ফসলের বেশি ক্ষতি করে থাকে। বাংলাদেশের সব নিচু এলাকায় এদের দেখতে পাওয়া যায়। তবে শুকনো  মৌসুমে হাওর, বিল এলাকায় বেশি পাওয়া যায়। দ্বীপ, হাওর ও বিল এলাকায় শুকনার সময় গর্ত করে বাস করে।


গেছো ইঁদুর/ ঘরের ইঁদুর (House/roof rat) Rattus rattus) : গেছো ইঁদুর সাধারণত মাঝারি ধরনের হয়ে থাকে। দেহ লম্বাটে, লালচে, বাদামি বর্ণের। শরীরের নিচের দিকটা সাদাটে বা হালকা বর্ণের। দেহের দৈর্ঘ্য ৭-২২ সে. মি. মাথা ও শরীরের মোট দৈর্ঘ্যরে তুলনায় লেজ লম্বা। লেজের দৈর্ঘ্য ৫-২৩ সে. মি.। এই জাতের ইঁদুর গুদামজাত শস্য, ঘরে রাখা খাদ্যশস্য, ফলমূল, বিভিন্ন সবজি ইত্যাদির ক্ষতি করে থাকে। এ প্রজাতি মাটিতে গর্ত না করে ঘরের মাচায় বা গুপ্ত স্থানে ও গাছে বাসা তৈরি করে বংশবৃদ্ধি করে। এদেরকে সাধারণত বাড়ির আশপাশে, উঁচু এলাকায় ও নারিকেল জাতীয় গাছে বেশি দেখা যায় এবং মাঠে কম দেখা যায়।


ঘরের নেংটি ইঁদুর (House Mouse, Mus musculus) : এই ইঁদুরকে কোনো কোনো এলাকায়  বাত্ত্বি ইঁদুর, কোথাও শইল্লা ইঁদুর নামে বলে থাকে। এরা আকারে ছোট, মাথা ও শরীরের মোট দৈর্ঘ্য ৩-১০ সে. মি. এবং এদের ওজন পূর্ণ বয়স্ক অবস্থায় সাধারণত ১৪-২০ গ্রাম হয়। গায়ের পশম ছাই বা হালকা তামাটে বর্ণের, পেটের পশম কিছুটা হালকা ধূসর বর্ণের। এরা ঘরে বাস করে, গুদামজাত খাদ্যশস্য, ঘরের জিনিস পত্র, কাপড় চোপড়, লেপ তোষক, বই পত্র এমনকি বৈদ্যুতিক তার ইত্যাদি কেটে ব্যাপকভাবে ক্ষতি করে থাকে।


ইঁদুরের উপস্থিতির লক্ষণ সমূহ : কর্তনের শব্দ, নখের দ্বারা আঁচড়ানোর শব্দ, কোনো কিছু বেয়ে ওঠার অথবা নামার শব্দ, ক্ষণস্থায়ী চিচি শব্দ, চলাচলের রাস্তায় মল, নোংরা দাগ, পায়ের ছাপ, ইঁদুর যাতায়াত পথের সৃষ্টি হওয়া ইত্যাদি দ্বারা ইঁদুরের উপস্থিতি অনুমান করা যায়। ইঁদুরের বাসা ও তার আশপাশে ছড়ানো ছিটানো খাবার, ইঁদুরের গন্ধ এবং পোষা প্রাণীর লাফ ঝাপ বা অদ্ভুত আচরণ বা উত্তেজনা ইঁদুরের উপস্থিতি নির্দেশ করে। গুদামের ক্ষতির চিহ্ন দেখে এর আক্রমণের লক্ষণ বোঝা যায়। এ ছাড়াও আক্রান্ত ফসল, গম রাখার বস্তা কাটা দেখে, ইঁদুরের খাওয়া ধানের তুষ দেখে এদের উপস্থিতি বোঝা যায়। ঘরে বা তার পাশে ইঁদুরের নতুন মাটি অথবা গর্ত, ফসলের মাঠে, আইলে ও জমিতে,  বাঁধ, পুল ইত্যাদির পাশে গর্ত দেখে ইঁদুরের উপস্থিতি বোঝা যায়। ইঁদুর বিভিন্ন ফসলে বিভিন্ন ভাবে ক্ষতি করে থাকে। এদের ক্ষতির ধারণা-


ধানক্ষেতে ইঁদুরের ক্ষতির ধরন:  অধিকাংশ সময়ই ইঁদুর মাটি থেকে প্রায় ১০ সে. মি. উপরে কাণ্ড কেটে দেয়। ইঁদুর ধান গাছের কাণ্ড সবসময়ই ৩০-৪৫ ডিগ্রি কোণে তেরছাভাবে কেটে দেয় যার কারণে ধানের কাণ্ড নুয়ে পড়ে। ধান বা গমে যখন শীষ বের হয় তখন ইঁদুর কখনো কখনো ধান বা গমের শীষকে বাঁকিয়ে নিয়ে শুধু শীষ কেটে দেয়। কোনো কোনো সময় ইঁদুর শুধু মাত্র তার দাঁতকে ধারালো এবং স্বাভাবিক রাখার জন্য অথবা বাসা তৈরি করার জন্য ধান কেটে টুকরো টুকরো করে থাকে। গভীর পানির ভাসা আমন ধানে থোর আসার পূর্ব থেকেই ইঁদুরের আক্রমণ দেখা যায়। সাধারণত বড় কালো ইঁদুর ভাসা আমন ধানে ক্ষতি করে থাকে। ইঁদুর   ধান গাছের কাণ্ডের যে অংশ হতে পাতা গজায় তার উপরি ভাগের ডাঁটার মাঝখানের ২ সে. মি. রস যুক্ত নরম অংশ খেয়ে ফেলে।


গম ও বার্লি ক্ষেতে ইঁদুরের ক্ষতির ধরন:  গম উৎপাদনে প্রধান সমস্যা হচ্ছে ইঁদুর। বীজ গজানো থেকে শুরু করে গম কাটা পর্যন্ত মাঠে ইঁদুরের উপদ্রব দেখা যায়। ক্ষেতে গর্ত, নালা ও প্রচুর পরিমাণে মাটি উঠিয়ে গমক্ষেতে ব্যাপক ক্ষতি করে। তবে ইঁদুর শীষ বের হওয়া  অবস্থায় বেশি ক্ষতি করে। শীষ বের হওয়ার শুরু থেকে কুশি কেটে গাছের  নরম অংশের রস খায় ও পরে গাছ কেটে ও গম খেয়ে ফসলের ক্ষতি করে। ইঁদুর গাছ কেটে গমসহ শীষ গর্তে নিয়েও প্রচুর ক্ষতি করে থাকে। একটি ইঁদুর এক রাতে ১০০-২০০টি পর্যন্ত গমের কুশি কাটতে পারে। ফলে গমের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। গমে ও বার্লিতে শীষ বের হওয়ার সময় থেকে গম পরিপক্ব অবস্থা পর্যন্ত ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যায়।


সংগ্রহোত্তর ক্ষতি : প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা  হয় যেখানে ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি দেখা যায়। উষ্ণ ও অবউষ্ণ অঞ্চলে ইঁদুর দ্বারা ক্ষতির পরিমাণ ২-১৫%। বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গেছে, ইঁদুর দ্বারা সংগ্রহোত্তর ক্ষতির পরিমাণ ২.৫-৩০ শতাংশ। ছোট কালো ইঁদুর, গেছো ইঁদুর এবং নেংটি ইঁদুর প্রধানত গুদামে, গবেষণাগারে, অফিসে, বাসাবাড়িতে ক্ষতি করে থাকে। একটি ইঁদুর প্রতি পরিবারে গুদামে বছরে ৪০-৫০ কেজি দানা শস্য ক্ষতি করে থাকে এবং এ ক্ষতির মোট পরিমাণ ৭৫০০০-১০০০০০ মেট্রিক টন।


ইঁদুর দমনের উপযুক্ত সময় : বাসাবাড়িতে ফল ও কনফেকশনারি দোকান, শিল্প কারখানা, মার্কেট, অফিস, সমুদ্র ও বিমানবন্দর ইত্যাদি স্থানে সারা বছর, যে কোনো ফসলের থোর আসার পূর্বে ইঁদুরের সংখ্যা কম থাকে এবং মাঠে খাবার কম থাকে বলে ইঁদুর বিষটোপ সহজে খেয়ে থাকে।


ইঁদুর দমনের উপযুক্ত সময় ও ফসলের স্তর :
সমন্বিত ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা :  বছরের পর বছর ধরে ফসলের মাঠে  ইঁদুর দমন করা হয়ে আসছে তারপরও এ সমস্যা বড় আকারে থেকে যাচ্ছে। তাই সমন্বিত উপায়ে নিয়মিত এর দমন কার্যক্রম চালিয়ে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ইঁদুরকে পুরোপুরি ধ্বংস না করে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের ফসল রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে।


ইঁদুর দমন পদ্ধতি : ইঁদুর দমন পদ্ধতিকে দুভাবে  ভাগ করা যায় যেমন- ক) অরাসায়নিক বা পরিবেশ সম্মতভাবে দমন খ) রাসায়নিক বা বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে দমন।
ক) অরাসায়নিক বা পরিবেশ সম্মতভাবে দমন : কোনো প্রকার বিষ ব্যবহার না করে অর্থাৎ পরিবেশের কোনো রকম ক্ষতি না করে ইঁদুর দমনই হচ্ছে অরাসায়নিক বা পরিবেশ সম্মতভাবে ইঁদুর দমন। এ পদ্ধতিতে বিভিন্ন ভাবে দমন করা যায় যেমন-
মনিটরিং/পরিদর্শন ও সজাগ দৃষ্টির মাধ্যমে;
বসতবাড়ি ও শস্যগুদাম পরিষ্কার রাখা এবং গুদামে ইঁদুর ঢুকতে না পারে এমন ব্যবস্থা করা;
জমির আইল পরিষ্কার ও ছোট রাখা;
প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি গর্ত খোড়া, পানি ও ধোঁয়া দিয়ে দমন;
জৈব নিয়ন্ত্রণ বা পরভোজী প্রাণীর মাধ্যমে ইঁদুর দমন; ইঁদুরের বিভিন্ন প্রাকৃতিক শত্রু যেমন ঈগল, বনবিড়াল, চিল, শিয়াল, পেঁচা, সাপ, গুইসাপ, বেজি ইত্যাদি দিয়ে প্রাকৃতিকভাবেই ইঁদুর দমন করা যায়;
নিবিড়ভাবে ফাঁদ পাতার মাধ্যমে;
ফসলের মাঠে শব্দসৃষ্টিকারী মেটাল/ধাতব নির্মিত কাঠামো ব্যবহার করে;
বপন পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে;
ইঁদুর খাবার অভ্যাস করে;
ইঁদুর দমন কার্যক্রমে দলভিত্তিক সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণে;

 

খ) রাসায়নিক বা বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে দমন : রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর দমন পৃথিবীর  প্রায় সব দেশেই বহু যুগ ধরে চলে আসছে। বিষক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে রাসায়নিক  পদ্ধতিকে দুভাগে ভাগ করা যায়-
১. তীব্র বা তাৎক্ষণিক ইঁদুরনাশক (
Acute rodenticide) : এ ধরনের বিষ খাওয়ার পর দেহে তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়া দেখা দেয় এবং ইঁদুর মারা যায়। যেমন- জিংক ফসফাইড।
২. দীর্ঘ মেয়াদি ইঁদুরনাশক(
Chronic rodenticide) : এ ধরনের বিষ খেলে ইঁদুর তাৎক্ষণিকভাবে  বিষক্রিয়ায় মারা না গেলেও ধীরে ধীরে অসুস্থ বা দুর্বল হয়ে ২-১৪ দিনের মধ্যে মারা যায়। দীর্ঘ মেয়াদি বিষকে দুভাগে  ভাগ করা হয়েছে। একমাত্রা বিষ - একমাত্রা একবার খেলেই ইঁদুর মারা যাবে, যেমন- গমে মিশ্রিত জিংক ফসফাইড বিষটোপ। বহুমাত্রা বিষ-এক্ষেত্রে খেয়ে ইঁদুর মারার জন্য খাওয়াতে হবে যেমনÑগমে মিশ্রিত ব্রোমাডিয়লন বিষটোপ, ল্যানির‌্যাট, ব্রোমাপয়েন্ট, রেকুমিন। উল্লিখিত সবগুলো বিষই বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত।


গ্যাস ট্যাবলেট : বিষ গ্যাস ট্যাবলেট ইঁদুরের গর্তে মরণ গ্যাস সৃষ্টি করে। যেমনÑ ফসটক্সিন ট্যাবলেট, অ্যালুমিনিয়াম ফসফেট।
রাসায়নিক বিষটোপ ব্যবহার পদ্ধতি : জিংক ফসফাইড বিষ বিভিন্ন ধরনের খাবার যেমনঃ নারিকেল, শুঁটকি, বিস্কুট গম ইত্যাদির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এছাড়াও শামুক ভেঙে জিংক ফসফাইড মিশিয়ে দিলে অনেক বেশি কার্যকর হয়।
বিষটোপ একই পাত্রে বা একই স্থানে কমপক্ষে ৩-৪ দিন রাখতে হবে।
প্রতিপাত্রে কমপক্ষে ৫০-১০০ গ্রাম বিষটোপ ব্যবহার করতে হবে।
দীর্ঘ মেয়াদি বিষটোপ যতদিন ইঁদুর খাওয়া বন্ধ না করে ততদিন পাত্রে বিষটোপ রাখতে হবে।
বিষটোপ পাত্র হিসেবে নারিকেলের খোলস, মাটির পাত্র, কলা গাছের খোলস, বাঁশ অথবা পাইপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
গ্যাস ট্যাবলেটের ক্ষেত্রে ইঁদুরের গর্তের মুখ বন্ধ করে দিতে হবে।

 

সাবধানতা :  ইঁদুর মারার বিষ খুব মারাত্মক। এ ক্ষেত্রে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যা নিম্নরূপ
বিষ টোপ তৈরির সময় মাস্ক ব্যবহার বা কাপড় দিয়ে নাক ঢেকে নিতে হবে; বিষটোপ তৈরি ও ব্যবহারের পর  সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে; ছোট শিশু ও বাড়ির গৃৃৃহপালিত পশুপাখি যেন এই বিষটোপের সংস্পর্শে না আসতে পারে সে বিষয়ে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে; সন্ধায় দেয়া বিষটোপ কিছু থেকে গেলে সকালে তা সাবধানে সরিয়ে বা উঠিয়ে রাখতে হবে।
বিষের খালি প্যাকেট অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না; খালি প্যাকেট এবং মরা ইঁদুর মাটির বেশ নিচে নিরাপদ স্থানে পুঁতে ফেলতে হবে; গ্যাস বড়ি ব্যবহারেও সতর্ক থাকতে হবে;
বিষটোপ প্রস্তুত ও প্রয়োগে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং কোনো রকম অসুস্থতা অনুভব করলে সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে;
ইঁদুরের সমস্যা ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে একটি জাতীয় সমস্যা। তাই এ সমস্যা সমাধানে সকলকে একযোগে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এরা সাধারণত গর্তে বাস করে বলে একবারের চেষ্টায় সম্পূর্ণভাবে দমন বা নির্মূল করা সম্ভব নয়। তাই সমন্বিত  এবং সম্মিলিত চেষ্টার মাধ্যমে এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্বাবিত নতুন নতুন লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে দমনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তবেই মূল্যবান ফসল সম্পদ রক্ষাসহ অন্যান্য সেক্টরের নানাবিধ ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। অতএব সমন্বিত, সম্মিলিত এবং সময়পযোগী দমন পদ্ধতি প্রয়োগ করলেই ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

 

জাকিয়া বেগম

উপপরিচালক (সার্ভিলেন্স এন্ড ফোরকাস্টিং), উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবা : ০১৫৫২৪২৭৪০৭

 

বিস্তারিত
কমিউনিটি পরিবেশবান্ধব ইঁদুর ব্যবস্থাপনা

বন্য প্রাণীরা বনে সুন্দর, তখন তারা ক্ষতিকারক বালাই নহে। ইঁদুর জাতীয় প্রাণীরা বন্য প্রাণী। মানুষ যখন বন কেটে ধ্বংস করে, তখন তারা মানুষের ফসলের ও সম্পদের তারা বাঁচার জন্য ক্ষতি করে থাকে। ইঁদুর জাতীয় প্রাণীরা সকল মানুষের নিকট ক্ষতিকারক বালাই হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। হিন্দু ধর্মে ইঁদুর হচ্ছে গনেশ দেবতার বাহক। এ জন্য গনেশ ভক্তগণ ইঁদুরকে মারতেন না, কারণ তাদের বিশ্বাস গনেশ দেবতা অসন্তুষ্ট হতে পারেন। যখন বহুসংখ্যক এসব ভক্তগণ ইঁদুর বাহিত রোগে আক্রান্ত হলেন তখন এদের নিধনের বাধা আর থাকে নাই। প্রাণী জগৎতে ইঁদুরের ভূমিকা ও অবদান অনেক। এদের সংখ্যা বেশি বলে অন্যান্য বন্য প্রাণীরা তাদের প্রোটিনের অভাব পূরণ করতে পারে। পৃথিবীর অনেক মানুষের প্রোটিনের উৎস। দিনাজপুরে ইঁদুর ভোজীরা ম্যাইটা কই হিসেবে অভিহিত করে। পার্বত্য অঞ্চলে শীতকালে বা বর্ষার আগে ইঁদুর ধরে শুঁটকি দিয়ে রাখে এবং বর্ষাকালে খেয়ে থাকে। জার্মানির হ্যামিলন শহরে বংশীবাদক নেই, কিন্তু শুধু ইঁদুরের মাংশ দ্বারা নানান রকমের খাবার তৈরি করে বিক্রি করা হয়। বহু পর্যটক ইঁদুরের মাংশ খাওয়ার জন্য অতি জনপ্রিয় হোটেলে গিয়ে থাকে। মানুষের রোগের নানা ওষুধের কার্যকারিতা ইঁদুরের উপর পরীক্ষার পর মানুষের উপর প্রয়োগ করা হয়। ইঁদুর জাতীয় প্রাণী হচ্ছে-ইঁদুর, কাঠবিড়ালি ও সজারু। চিকা কিন্তু ইঁদুর জাতীয় প্রাণী নহে। চিকা ফসলের পোকামাকড় খেয়ে উপকার করে। কিন্তু নানা রকম রোগ জীবাণুর বিস্তার ঘটাতে পারে। তাই চিকা ফসলের মাঠে এরা উপকারী প্রাণী, কিন্তু ঘরবাড়িতে এরা মানুষের ক্ষতিকারক বালাই।


সব দেশেই ইঁদুরের সমস্যা কম বেশি বিদ্যমান। ইঁদুরের সমস্যা পূর্বেও ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষৎতেও থাকবে। এমন কোনো প্রযুক্তি পৃথিবীতে উদ্ভাবন হয় নাই, যে পদ্ধতি দ্বারা সকল ইঁদুর মেরে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু উদ্ভাবিত পদ্ধতিগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে এদের সংখ্যা কম রেখে, ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং ইঁদুর বাহিত রোগ জীবাণুর বিস্তার রোধ করা সম্ভব। পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিকগণ প্রতি নিয়ত ইঁদুর দমনের প্রযুক্তির উন্নয়ন করে চলছে। সব ইঁদুর দমন কলাকৌশল সব দেশে সমভাবে কাজ হয় না। কারণ প্রজাতি, পরিবেশের ভিন্নতার বিদ্যমান। ইঁদুর দমন পদ্ধতিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করার হয়েছে- ১. অরাসায়নিক, ২. রাসায়নিক এবং ৩. বাইলোজিক্যাল দমন পদ্ধতি। এ তিনটি পদ্ধতির রাসায়নিক দমন পদ্ধতি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল আকারের ব্যবহার হচ্ছে। প্রধান কারণ হলো-সবাই মরা ইঁদুর দেখতে চাই, অর্থাৎ হাতে হাতে ফল পেতে চাই। অরাসায়নিক পদ্ধতি প্রয়োগের পর ফল দেরিতে পাওয়া যায়, কিন্তু কিছুটা কষ্টকর। বাইলোজিক্যাল পদ্ধতি ফলাফল দেরিতে পাওয়া যায়।


ধনী-গরিব, দালান-কোঠার মালিক, ব্যবসায়ী, কৃষক-শ্রমিক, অফিস আদালত, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, মুরগির খামার যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, সেই বলবে ইঁদুরের উৎপাত রয়েছে মানে অনেক ক্ষতি করছে, রাতে ঘুমাতে পারি না ইত্যাদি। অনেকে বলেন রাতের বেলায় চলাচল বা দৌড়াতে দেখি, অনেক সময় দিনের বেলায়ও দেখা যায়। সাধারণত ইঁদুরের সংখ্যা বেশি না হলে চোখে পড়ে না, অর্থাৎ ওই স্থানে ৫-৭টির বেশি ইঁদুর রয়েছে। অফিসে সবাই ইঁদুরের, গর্ত, মল, অল্প ক্ষতি দেখা সত্ত্বেও দমন ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন না। যখন ব্যাপক বা বেশি ক্ষতি করে ফেলে তখন ইঁদুর দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। সকলের এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন ইঁদুরের উপস্থিতি হওয়া বা থাকার অর্থ কিছু না কিছু ক্ষতি করবেই। ইঁদুরের গর্ত দেখা গেলে ইঁদুর দমন ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।


ইঁদুর ফসল ও সম্পদের অনেক ক্ষতি করে থাকে। শুধু তাই নয় ৩০-৩৫ ধরনের রোগের বাহক হিসেবেও কাজ করে ইঁদুর। এ জন্য ইঁদুর দমন করা অত্যন্ত জরুরি। ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব গ্রামীণ ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে এখানে আলোকপাত করা হলো।‌


বাংলাদেশের ইঁদুর ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো
১. দলগতভাবে ইঁদুর মারতে চায় না অথবা অভ্যস্ত নহে। ২. ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতির প্রতি সর্বস্তরের জনসাধারণ গুরুত্ব কম দেয়। ৩. ইঁদুর দ্বারা ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। কিন্তু পোকা দমনের জন্য প্রতিষেধক হিসেবে বালাইনাশক ব্যবহার করে থাকেন।  
৪. ইঁদুরবাহিত রোগ সম্পর্কে সর্বস্তরের মানুষের ধারণা অত্যন্ত কম। ইঁদুরের মলমূত্র, লোম দ্বারা মানুষের মধ্যে রোগের বিস্তার ঘটতে পারে তা বিবেচনা করেন না। রোগের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই কারণ আমাদের দেশে কোনো গবেষণা হয় না। ৫. ইঁদুর রাস্তাঘাট, রেল রোড ও বাঁধের বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক ক্ষতি করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইঁদুর দমনের কোনো ব্যবস্থা বা উদ্যোগ নেয় না। এজন্য এসব স্থানে ইঁদুর নিরাপদে বংশবিস্তার ও বসবাস করতে পারে। ৬. ইঁদুর প্রজাতির সচেতনতা ও স্মরণশক্তির কারণে বিষটোপ ও ফাঁদ লাজুকতা সমস্যা দেখা দেয়। ৭. একটি দমন ব্যবস্থা দ্বারা সফলভাবে ইঁদুর দমন করা বাস্তবে সম্ভব নয়। সাধারণত মানুষ মরা ইঁদুর দেখতে চায়। এজন্য বিষটোপ বেশি ব্যবহার করে। তারা অন্যান্য দমন পদ্ধতি ব্যবহার করতে চায় না। অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব-ইঁদুর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তাদের জ্ঞান ও সচেতনতার অভাব।

 

পরিবেশবান্ধব ইঁদুর ব্যবস্থাপনা কৌশল
পরিবেশবান্ধব ইঁদুর ব্যবস্থাপনা কলাকৌশলের ক্ষেত্রে অনেক বিষয়ের সমন্বয় ঘটানোর প্রয়োজন, অন্যথায় দমনব্যবস্থা ততটা কার্যকর হবে না। সমন্বিত ইঁদুর ব্যবস্থাপনার বিবেচ্য উপাদানগুলো নিচে দেয়া হলো।

 

১. বালাই প্রজাতি : বালাই প্রজাতির ইকোলজি, জীবন বৃত্তান্ত, শারীরতাত্ত্বিক ও আচরণ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। যেমন- কিছু ইঁদুর গর্তে বাস করে (যেমন- মাঠের কালো ইঁদুর, মাঠের বড় কালো ইঁদুর), আবার অন্যান্য প্রজাতি গর্তে বাস করে না (যেমন- গেছো ইঁদুর ও সলই ইঁদুর)। প্রজাতিভেদে পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্য রয়েছে। যেমন- ব্যান্ডিকট দলের প্রজাতির সাথে (গঁং) দলের ইঁদুরের প্রজাতির খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এজন্য সফলভাবে ইঁদুর দমন করতে হলে প্রজাতি অনুসারে ব্যবস্থাপনা কৌশল নির্বাচন করতে হবে।


২. পরিবেশ : এ ক্ষেত্রে খাদ্যের উৎস, পতিত স্থান বা আবর্জনাপূর্ণ স্থান, আবহাওয়া এবং বায়োটাইপস ইত্যাদি পরিবেশকে বিবেচনা করতে হবে। যদি খাদ্যের উৎস বা প্রাচুর্য বেশি বা সহজলভ্য হয় সে ক্ষেত্রে ইঁদুর সহজেই বংশবিস্তারের মাধ্যমে পপুলেশন বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। তিনটি মৌলিক জিনিষ যেমন- খাদ্য পানি ও বাসস্থানের ওপর ইঁদুরের বংশবিস্তারের হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভর করে। এ তিনটির একটি অভাব হলে ইঁদুর সেখানে থাকে না ও বংশবিস্তার করে না। বর্ষার সময়ে মাঠের ইঁদুর উঁচুস্থান, রাস্তাঘাট এবং ঘরবাড়িতে চলে আসে। আবার বর্ষা কমে গেলে ফসলের মাঠে ফিরে যায়। তাই বর্ষার সময় উঁচু স্থান, রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ির ইঁদুর মারা হলে পরে মাঠে ইঁদুর সংখ্যা ও ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। পতিত জায়গা বা আবর্জনাপূর্ণ স্থানে ইঁদুর নিরাপদে বংশবিস্তার করতে পারে। শহরে ডাস্টবিন ও বর্জ্য ফেলার স্থানে ইঁদুর সহজেই বংশবিস্তার করে থাকে। কারণ এসব স্থানের ইঁদুর কেহ মারে না। রোগজীবাণুর বিস্তার ও পরিবেশ দূষণ কমানোর জন্য এসব স্থানের ইঁদুর নিধন করার উদ্যোগ নেয়া একান্ত প্রয়োজন।


৩. লক্ষ্য ফসল : ইঁদুর দমন ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে ফসলের প্রকার, বর্ধনস্তর, কর্তন স্তরের অবস্থা, শস্য, পানি ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। গম, ধান ও ভুট্টা (দানাদার শস্য) ইঁদুরের আক্রমণ মাঠে সবচেয়ে বেশি হয়। যেকোনো ফসলের (চারা হতে কুশি স্তর) দমন ব্যবস্থা গ্রহণ উপযুক্ত সময় ও সহজ এবং কার্যকর হয়। থোড় হতে পাকা স্তরে দমন ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকরা সাধারণত পাকা স্তরে দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন। কৃষকদের মনোভাব পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।


৪. কমিউনিটি অ্যাপ্রোচ : সাধারণত ব্যক্তিগতভাবে ইঁদুর দমন অথবা মেরে থাকে। এতে সফলতার পরিমাণ অত্যন্ত কম। দমনব্যবস্থা অল্প সময়ের জন্য কার্যকর থাকে। কারণ ইঁদুরের খাদ্য, পানি ও বাসস্থানের জন্য সর্বত্র স্থান পররবর্তন করে থাকে। এজন্য মাঠের ফসলের বেশি এলাকা এবং পাড়া অথবা গ্রামের সবাই একত্রে ইঁদুর দমন করা প্রয়োজন। এতে প্রতিবেশির মাঠ অথবা বাড়িতে ইঁদুরের আগমনের সম্ভাবনা কমে যায়। দীর্ঘস্থায়ী ও সফলভাবে ইঁদুর দমন করতে হলে কমিউনিটির সবার অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে এইড-কুমিল্লার পরিবেশবান্ধব ইঁদুর দমন ব্যবস্থার মডেল গ্রহণ করা যেতে পারে (চিত্র-১)।


এইড-কুমিল্লা, নেত্রকোনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরা জেলার ৮টি উপজেলার ১০টি গ্রামে কমিউনিটি বেইজ পরিবেশবান্ধব ইঁদুর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়িত করছে। একটি গ্রামের ২০০টি পরিবার নির্বাচন করে হাতে কলমে ২ দিনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীর ৯৮% মহিলা। প্রত্যেক পরিবারকে একটি ডাইরি দেয়া হয়েছে যাতে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব, নিধনকৃত ইঁদুরের সংখ্যা লিখে রাখতে পারেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২০০ জনকে চারটি দলে বিভক্ত করা হয়েছে। ৫০ জনকে ২টি করে মোট ১০০টি ফাঁদ দেয়া হয়। এই ১০০টি ফাঁদ ২০০টি পরিবার পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করে। প্রতি মাসে (২৮ দিন অন্তর) প্রত্যেক দল (৫০টি পরিবার) ৭ দিন ব্যবহারের জন্য ফাঁদ পেয়ে থাকেন। এ রোটেশন এক বছর করতে পারবেন। তারা এক বছর দলগতভাবে ২০০ পরিবার ইঁদুর মারবে। এর ফলে প্রশিক্ষণার্থীরা ফাঁদের কার্যকারিতা বুঝতে পারবে। তাদের ইঁদুরের সমস্যা, ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে ধারণা জন্মাবে। দলগতভাবে ইঁদুর নিধন করার সুফল বুঝতে পারবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা, জেলা ও অঞ্চল পর্যায়ের কর্মকর্তারা ২ দিনের প্রশিক্ষণে রিসোর্স পার্সোনেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সংশ্লিষ্ট জেলার এনজিও অধীনে প্রকল্পের কর্মকর্তারা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচির অধীনে ১৯ জন পুরুষ ও ১১,২৫৬ জন মহিলাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রত্যেক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পরিবার ৩০-৩৫টি ইঁদুর কিল ফাঁদ দ্বারা মেরেছে বলে জানা গেছে।


গোলাজাত শস্যের ক্ষয়ক্ষতি রোধ গোলাতে শস্যের ৫-১০% ইঁদুর দ্বারা ক্ষতি হয়। প্রত্যেক পরিবারের গড়ে ২০০ কেজি গোলাজাত শস্যের প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা ক্ষতি হয়ে থাকে। এ গোলাজাত শস্যের ক্ষতি ন্যূনতম ব্যয়ে উন্নত গোলা ব্যবহারের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব


বাঁশের তৈরি শস্যদানা গুদামের প্লাটফর্মে উপস্থাপন করা হয়, যেখানকার খুঁটি টিনের পাতা দিয়ে মুড়িয়ে প্রতিরোধক করা হয় যাতে ইঁদুর মাটি হতে গুদামটিতে আরোহণ করতে না পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শস্যদানা গুদামটির ওপরের অংশ অবশ্যই সঠিক টেকসই আবরণ দ্বারা বন্ধ বা ঢেকে রাখতে হবে যাতে ঘরের দেয়াল অথবা ফাঁদ হতে ইঁদুর লাফ দিয়ে অথবা আরোহণ করতে না পারে এমন প্রতিরোধক সম্পন্ন করতে হবে। টিনের পাত অথবা অন্য ধাতব পদার্থ দ্বারা বিদ্যমান গুদাম কাঠামোটির উপরি অংশ ভালোভাবে কুড়িয়ে দিতে হবে। পাশে ঝুলে থাকা প্রান্ত ইঁদুরকে আরোহণ বা উঠতে বিরত রাখবে। ঊইজগ প্রকল্প এলাকার গ্রামে কয়েকটি বাড়িতে কৃষক দ্বারা প্রদর্শন করে ইঁদুর দ্বারা গোলাজাত শস্যের ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে।

   
খড়ের গাদার ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতি রোধ
খড়ের গাদা ইঁদুরের অন্যতম বাসস্থান, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে। খড়ের গাদার নিচে গর্ত খুড়ে ও কেটেকুটে ১০-২০% খড় নষ্ট করে থাকে। এ খড় পশুকে খাওয়ালে ইঁদুরবাহিত রোগ দ্বারা পশু আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। খড়ের গাদা করার সময় মাচা বা মঞ্চ করে রাখলে ইঁদুরের ক্ষতি হতে খড়কে রক্ষা করা সম্ভব। এতে খড়ও ভালো থাকবে। সাধারণত ৬০-৭৫ সেন্টিমিটার উঁচু মাচা তৈরি করে খড়ের গাদা তৈরি করলে এবং মাচার নিচের অংশ সব সময় পরিষ্কার রাখলে ইঁদুরের অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যায়।


গ্লুবোর্ড দ্বারা ইঁদুর দমন
বাজারে মুদির দোকানে ইঁদুর মারার তৈরি গ্লুবোর্ড পাওয়া যায়। ইঁদুরের চলাচলের রাস্তায় পেতে রাখলে ইঁদুর আঠায় আটকা পড়ে, যেতে পারে না। ইঁদুর আটকা পড়ার পর যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি তুলে মেরে ফেলতে হবে। কারণ দেরি হলে, অন্যান্য ইঁদুরা দেখে ফেল্লে ঐ বোর্ডের নিকট যাবে না। তাই একটা ইঁদুর ধরা পরার পর বোর্ডটি অন্যত্র বা একটু দূরে রাখতে হবে।
রাসায়নিক পদ্ধতিতে ইঁদুর দমন

 

১. গ্যাস বড়ি দ্বারা ইঁদুর দমন
রাস্তাঘাট, বেড়িবাঁধ, মহাসড়ক, খালের পাড়ে, সেচের নালায় গর্তের ইঁদুর গ্যাস বড়ি (ফসটোক্সিন ট্যাবলেট) দ্বারা কার্যকরভাবে দমন করা যায়। বর্ষার সময় মাঠের ইঁদুর এ সকল স্থানে গর্ত করে অবস্থান করে। প্রতি নতুন গর্তে একটি গ্যাসবড়ি প্রয়োগ করতে হবে। এর পর সকল গর্তের মুখ মাটি দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। ইঁদুর গর্তের ভিতর হতে বের হলেও মারা যাবে। ইঁদুর নিধন অভিযানের সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ে গর্তের ইঁদুর নিধনের ডেমনস্ট্রেশন করতে পারে। ফসলের মাঠে বা যেকোনো স্থানের গর্তের ইদুর গ্যাস বড়ি দ্বারা দমন করা সহজ ও কার্যকর। গ্যাস বড়ি দ্বারা ৯০-৯৫% গর্তের ইঁদুর নিধন করা যায়।

 

২. বিষটোপ দ্বারা ইঁদুর দমন
কোনো স্থানে বিষটোপ দ্বারা ৬০-৭০% এর বেশি ইঁদুর মারা যায় না। সঠিক মাত্রার বিষটোপ সঠিক স্থানে ও সঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এক গ্রাম বা পাড়ায় সকলে মিলে একদিন বিষ প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। আবার সমস্ত মাঠে একত্রে বিষটোপ প্রয়োগ করলে দমন ব্যবস্থা কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। বিষটোপ প্রয়োগের সাবধানতার নিয়মগুলো অনুসরণ করতে হবে।


জীব দ্বারা ইঁদুর দমন
বাড়িতে বিড়াল পালন করলে ইঁদুরের উপদ্রব কম থাকবে। বনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় ইঁদুর ভোজী প্রাণীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। যেমন- বনবিড়াল, শিয়াল, বেজি, পেঁচা, সাপ ইত্যাদি প্রাণী। এদের যত্রতত্র নিধন করা হতে বিরত থাকতে হবে। বটবৃক্ষ ও বড় বড় গাছে পেঁচা বাস করে। কোনো স্থানে কয়েকটি পেঁচা থাকলে ইঁদুরের উপদ্রব কম থাকবে। কারণ একটি পেঁচা রাতে ৫-১০টি ইঁদুর মারতে পারে। পেঁচার পপুলেশন বাড়ানোর জন্য গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। বটবৃক্ষ যাতে কেটে না ফেলে সেদিকে নজর দিতে হবে। বটবৃক্ষ রোপণের জন্য জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে। এতে পরিবেশ ভালো থাকবে।

উপসংহার : ইঁদুর একটি সামাজিক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে সামাজিকভাবেই করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা সরকারের পক্ষে স্থায়ীভাবে সমাধান করা বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই ঊইজগ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব ইঁদুর ব্যবস্থাপনা মডেল সব জেলায় গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে গ্রামবাসীরা দলীয়ভাবে ইঁদুর নিধনে উদ্বুদ্ধ হবেন। কৃষকদের জ্ঞান বৃদ্ধির মাধ্যমে ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, ইঁদুরবাহিত রোগ জীবাণু রোধ, পরিবেশের দূষণ কমানো এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে। ইঁদুর দমন প্রযুক্তি উন্নয়নের আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ইঁদুর দমন প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, কারণ ইঁদুর দমন প্রযুক্তি অন্যান্য বালাই ব্যবস্থাপনা হতে সম্পূর্ণ বিভন্ন রকমের। ইঁদুর দমন অভিযান বা কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে।

ড. সন্তোষ কুমার সরকার

 

বিস্তারিত
বিদেশি ফল রামবুটান চাষ সম্প্রসারণ

যে সব বিদেশি ফল এ দেশে সফলভাবে লাভজনক হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে তার মধ্যে রামবুটান অন্যতম। এ ফল অনেকটা লিচুর মতো, তবে লিচুর চেয়ে আকারে বড়, ডিম্বাকৃতি, কিছুটা চ্যাপ্টা। পাকা ফল উজ্জ্বল লাল, কমলা বা হলুদ আকর্ষণীয় রঙের হয়ে থাকে। ফলের পুরু  খোসার উপরি ভাগ কদম ফুলের মতো শত শত চুল দিয়ে আবৃত। মালয়েশিয়া ভাষায় রামবুটানের অর্থ চুল। একই কারণে এ ফল চুল বা দাড়ি বিশিষ্ট লিচু বলে অনেকের নিকট পরিচিত। রামবুটান  লিচুর মতোই চিরহরিত, মাঝারি উচ্চতা বিশিষ্ট লম্বা গাছ। বর্ষাকালে জুলাই-আগস্ট মাসে ফল পাকে। অপুষ্ট ফলের রঙ সবুজ থাকে। ফল পুষ্ট হলে উজ্জ্বল লাল/ মেরুন রঙে পরিবর্তন হতে থাকে এবং এর দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে পাকা ফল সংগ্রহ করার উপযোগী হয়।


উৎস ও বিস্তার : মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এ ফলের আদি উৎস। থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনস, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, ব্রুনাই ও শ্রীলংকায় প্রচুর রামবুটান ফল উৎপাদন হয়ে থাকে। এ সব দেশ থেকে অনুরূপ আবহাওয়া বিশিষ্ট দেশে বা দেশের অংশ বিশেষে এ ফলের বিস্তার আরম্ভ হয়। শীতের তীব্রতা কম এমন দেশে যেমন ভারত ও বাংলাদেশের এমন অংশেও এ ফলের বিস্তার ও চাষ জনপ্রিয়তা বাড়ছে।


জলবায়ু : ট্রপিক্যাল ও সাবট্রপিক্যাল আবহাওয়া বিশিষ্ট অঞ্চল রামবুটান চাষের জন্য উপযোগী। এ ফল গাছে শীতের তীব্রতা সহ্য শক্তি নেই বললেই চলে। শীত কালে তাপমাত্রা ১০০ সেলসিয়াসের নিচে নেমে ৫-৭ দিন বিরাজ করলে গাছ মরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশের দক্ষিণ ও পার্বত্য অঞ্চলীয় জেলাসহ বৃহত্তর ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও যশোর জেলায় এ ফল সম্প্রসারণ সম্ভাবনা বিরাজ করছে। রাঙ্গামাটি জেলায় কিছু সংখ্যক রামবুটান গাছে ৩০-৪০ বছর ধরে ফল দিচ্ছে। নেত্রকোনা জেলার কিছু সংখ্যক চাষি প্রায় ২০ বছর ধরে রামবুটান ফল উৎপাদন বিপণন করে বেশ লাভবান হচ্ছে। এছাড়া নরসিংদী উপজেলার শিবপুর জেলায় কয়েক জন রামবুটান চাষির সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তদাঞ্চলে লটকন চাষের পাশাপাশি রামবুটান চাষে অনেকেই আকৃষ্ট হচ্ছে।


বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় রামবুটান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে যাদের রামবুটান বাগানে কাজের অভিজ্ঞতা আছে তারা তথা হতে ফল/বীজ সংগ্রহ করে বাংলাদেশে রামবুটান চাষে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
পুষ্টিগুণ : রামবুটান একটা ঔষধিগুণ সমৃদ্ধ ফল। এ ফলে প্রচুর আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ফাইবার এবং ক্যালোরি রয়েছে। এন্ট্রি অক্সিডেন্টাল গুণ সমৃদ্ধ ফ্যাট ফ্রি এ ফলে সব ধরনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিনস, মিনারেলস রয়েছে।


মাটি :  প্রায় সব ধরনের মাটিতে এ ফল চাষ করা যায়। তবে পানি সেচ ও নিষ্কাশন সুবিধা যুক্ত  উর্বর দো-আঁশ মাটি এ ফল চাষে বেশি উপযোগী। মাটি শক্ত, কাঁকরময় বা বেশি এঁটেল হলে গাছ রোপণের জন্য মাদা তৈরি কালে ৫-৭ ফুট চওড়া ও গভীর করে মাটি সরিয়ে তৈরি গর্ত উপযোগী পটিং মিডিয়া দিয়ে ভরাট করে এ ফল গাছ রোপণ করা হলে বেশি চাষে সফলতা আনা সহজতর হয়। রামবুটান চাষের জন্য মাটির পি-এইচ মাত্রা ৫.৫-৬.৫ হলে ভালো হয়।
 

বংশবিস্তার : প্রধানত বীজ থেকে উৎপাদিত চারা দিয়ে রামবুটান ফল চাষ করা হয়। পাকা ফলের বীজ বের করে তা তাজা অবস্থায় চারা তৈরির কাজে ব্যবহার করতে হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় রামবুটান বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ৫-৭ দিনের বেশি থাকে না। এজন্য বীজ সংগ্রহের পর পরই বীজ বপনের প্রয়োজন হয়। বীজ বসানোর জন্য উপযোগী পটিং মিডিয়া তৈরি করে নেয়া জরুরি। মিডিয়া তৈরির জন্য মোটা বালু (সিলেট স্যান্ড)-২৫%, নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া (কোকোডাস্ট)-২৫%, লতাপাতা বা আর্বজনা পচা জৈব সার- ২৫%, এবং ভিটে মাটি (নার্সারির কাজে ব্যবহার উর্বর মাটি)- ২৫%। এগুলো একত্রে মিশিয়ে তলা ছিদ্র বিশিষ্ট মাটির টব মিশ্রণ দিয়ে ভরাট করে তার ওপর  র্২র্  দূরত্বে বীজ বসাতে হয়। বীজের চওড়া ভাগ নিচে রাখতে হবে এবং বীজ বসানোর পর উপরিভাগ সামান্য মাটি (হাফ ইঞ্চি পুরু) দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। বীজ বপনের আগে ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করে নেয়া ভালো। বীজ বপনের পর এ টবকে আধা ছায়ায় রাখতে হবে। বৃষ্টির পানিতে যেন বেশি ভেজা বা উপরিভাগের মাটি সরে না যায় তা রোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। অঙ্কুরিত বীজ পিঁপড়া খেয়ে  নষ্ট করতে যেন না পারে এ জন্য কীটনাশক ব্যবহার বা অন্য উপায়ে গজানো বীজকে নিরাপদ রাখতে হবে। টবের মাটি যেন শুকিয়ে না যায় এ জন্য মাঝে মাঝে পানি স্প্রে করে হালকাভাবে মাটি ভেজাতে হবে। মাটি সব সময় হালকা ভেজা অবস্থায় থাকবে, প্রয়োজনের বেশি পানি দেয়া উচিত হবে না। বীজ বসানোর ১০-২০ দিনের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হবে, চারা গজানা শুরু করবে।


চারা/কলম সংরক্ষণ : গজানো চারা র্৮র্ -১র্০র্  লম্বা হলে র্৮র্র্ -১র্০র্  মাপের মাটির টবে ভালো পটিং মিডিয়া দিয়ে একেকটা চারা উঠিয়ে আলাদা ভাবে রোপণ করার মাধ্যমে চারাকে স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়তে দিতে হবে। চারার বয়স ৬ মাস হলে গাছের গোড়া ছেড়ে টবের কিনারে র্১র্ -১.র্৫র  গভীর নালা করে ইউরিয়া-২০ গ্রাম, টিএসপি- ৫০ গ্রাম এবং পটাশ ৩০ গ্রাম হারে তিন মাসের ব্যবধানে দু’বার প্রয়োগ করতে হবে। পরবর্তীতে তিন মাসের ব্যবধানে আরো দু’বার এ সারের পরিমাণ দ্বিগুণ হারে বাড়িয়ে প্রয়োগ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। চারার বয়স এক বছর হলে অপেক্ষাকৃত বড় টবে (১র্২র্ -১র্৪র্ ) নতুনভাবে পাটিং মিডিয়া দিয়ে ও অপেক্ষাকৃত বেশি পরিমাণ জৈব সার/ কম্পোস্ট এবং একেকটা গাছের জন্য ২৫০ গ্রাম হাড়ের গুঁড়া মিশিয়ে রিপটিং করতে হবে। সংরক্ষিত চারা আধা ছায়ায় রেখে ১.৫-২ বছরের বয়স্ক বড় চারা জমিতে রোপণের জন্য উপযোগী হয়। এক বছর বয়স্ক চারায় বাডিং, সাইড গ্রাফটিং অথবা জোড় কলম পদ্ধতি অবলম্বনে কলম করা চারা রোপণ করার প্রচলন এখন বাড়ছে।


গাছের লিঙ্গ :  চারা থেকে প্রাপ্ত গাছ তিন ধরনের হয়ে থাকে। এতে পুরুষ, স্ত্রী ও উভলিঙ্গিক গাছের জন্ম হতে পারে। অর্থাৎ বীজের চারায় অনেকটা পেঁপে গাছের মতো ভিন্নতর লিঙ্গের গাছ পাওয়া যায়। পুরুষ গাছ হলে তাতে ফল ধরে না, তবে তা স্ত্রী গাছে পরাগায়নের মাধ্যমে ফল ধরতে সহায়ক হয়। চারার গাছে মাতৃ গুণাগুণ বজায় থাকে না। ফল ধরতে ৫-৬ বছর সময় লেগে যায়। বর্তমানে কলম করা গাছ আমদানি করে কিছু সংখ্যক নার্সারিম্যান  পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে উভয়লিঙ্গিক রামবুটানের কলম করা গাছ বিপণন করছে।


চারা/কলম রোপণ : রামবুটান ফল গাছ প্রধাণত : ৩০ -৩৫ ফুট দূরত্বে রোপণ করা হয়। গাছ রোপণ করার আগে গাছ রোপণের জন্য ‘লে-আউট’ প্লান তৈরি করে নিয়ে নির্ধারিত স্থানে গাছ রোপণের জন্য গর্ত তৈরি করে নেয়া দরকার। সাধারণ অবস্থায় গাছ রোপণের জন্য গর্তের মাপ হবে ৩-৪ ফুট চওড়া ও গভীর। যে সব মিশ্রণ দিয়ে তৈরিকৃত গর্ত ভরাট করতে হবে তা হলো :  


(ক) মোটা বালু (সিলেট স্যান্ড) : ১৫%
(খ)  ৩নং গ্রেডের ইটের মার্বেল সাইজের ছোট খোয়া     : ১৫%
(গ) নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া (কোকাডাস্ট) : ১৫%
(ঘ) উর্বর মাটি ( ভিটে মাটি)    : ২৫%
(ঙ) পচা গোবর/ আর্বজনা পচা : ৩০%


এর সঙ্গে আর মেশাতে হবে হাড়ের গুঁড়া -১ কেজি, ভার্মি কম্পোস্ট- ৫ কেজি, টিএসপি- ৪০০ গ্রাম, এমওপি - ৩০০ গ্রাম, জিপসাম- ৩০০ গ্রাম এবং জিংক, বোরণ ও ম্যাগনেসিয়াম জাতীয় অনুখাদ্য প্রতিটা ৫০ গ্রাম করে। সবগুলো একত্রে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে ১৫ দিন রেখে দেয়ার পর গাছ রোপণের জন্য উপযোগী হবে।


চারা/কলম রোপণ :  সেচ সুবিধা ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলে বছরের যে কোনো সময় রামবুটান চারা/কলম  লাগানো যায়। তবে বর্ষা আরম্ভ হওয়ার আগে এপ্রিল-মে মাসে গাছ রোপণ করা হলে বর্ষা ও শীত আরম্ভের আগে শিকড় দ্রুত ছাড়ানোর সুযোগ পায়। প্রতিকূল অবস্থায় গাছ বেড়ে উঠার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সরেজমিন থেকে চারা/কলম ১র্০র্ -১র্২র্  উঁচু করে তৈরি মাদার মধ্যভাগে রোপণ করলে ভালো হয়। এভাবে রোপণের পর গাছের গোড়া থেকে প্রায় ৩ ফুট দূরে ১র্০র্  চওড়া ও ১র্০র্  গভীর নালা তৈরি করে নালার মাটি দিয়ে বাইরের চারধারে বৃত্তাকারে বাঁধ দিয়ে দেয়া ভালো। এ ব্যবস্থায় শুকনা মৌসুমে গাছের গোড়ায় প্রত্যক্ষভাবে পানি  দেয়ার সুবিধা হয়, নালায় সরবরাহকৃত পানি থেকে প্রয়োজনীয় রস গাছ শুষে নেয়। রোপণের পর অবশ্যই গাছে কাঠি দিয়ে সোজা রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে ঝড়-বাতাসে গাছ হেলে পড়া রোধ হবে, গাছ স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়তে সহায়ক হবে।


পানি সেচ ও নিষ্কাশন : গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকা এবং মাটিতে রসের অভাব উভয়ই রামবুটান গাছের জন্য ক্ষতিকর। এ জন্য বাগানের দু’সারি গাছের মধ্য ভাগে র্২-২.র্৫ চওড়া ও গভীর করে নালার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এ ব্যবস্থায় বাগানে পানি জমা রোধ হবে। শুকনা মৌসুমে অবশ্যই ৮-১০ দিনের ব্যবধানে গাছের গোড়ার চারিধারের মাটি ভালোভাবে ভিজিয়ে প্রয়োজনীয় রসের অভাব দূর করতে হবে।


মালচিং : শুকনা মৌসুমে গাছের গোড়া থেকে ৩-৪ ইঞ্চি ছেড়ে প্রায় ৩ ফুট দূর পর্যন্ত শুকনা খড়কুটো, কচুরিপানা অথবা লতা-পাতা দিয়ে মালচিং দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এ মালচিং র্৪র্ -র্৬র্  পুরু হবে। এ ব্যবস্থায় শুকনা মৌসুমে মাটিতে রস সংরক্ষিত থাকবে, গোড়ার চারধারে আগাছা জন্মানো রোধ হবে। গাছের  শিকড় বৃদ্ধি সহজতর ও সুরক্ষায় সহায়তা হবে। পরে এসব মালচিং দ্রব্য পচে জৈব সারের উৎস হিসাবে কাজ করবে। বর্ষাকলে মালচিং দেয়ার প্রয়োজন হয় না। শুকনা মৌসুমে মালচিং মাটিতে মিশে/পচে গেলে ৩ মাস পরপর পুনরায় নতুন করে মালচিং ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে।  


আধা ছায়ার ব্যবস্থা নেয়া : গাছ রোপণের প্রথম তিন বছর খরা মৌসুমে রোদের তাপ সহ্য ক্ষমতা রামবুটান গাছের কম। এ জন্য গাছের ১.৫-২ ফুট গোড়া ছেড়ে ৫-৬ ফুট উচ্চতায় দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে চট বা ছালার বেড়া দেয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে গাছকে আধা ছায়াদানের ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এ ব্যবস্থায় রোদের তাপে পাতা পুড়ে/জ্বলে যাওয়া রোধ হয়। গাছের গোড়া ছেড়ে কয়েকটা ধৈঞ্চা, বকফুল, অড়হড় গাছ লাগিয়েও আধা-ছায়ার ব্যবস্থা করা যায়। শীতকালে ঘন কুয়াশা ও শীতের তীব্রতা থেকে গাছকে রক্ষা করার জন্য গাছের উপরি ভাগে সাদা পলিথিন সিট দিয়ে কভার দেয়ার মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। গাছের বয়স ৪-৫ বছর হয়ে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই এ গাছের রোদের তাপ ও শীত সহিষ্ণুতা বেড়ে যায়। এ জন্য পরে ফলন্ত গাছে এভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন হয় না।  


ট্রেনিং-প্রুনিং : গাছ যেন চার ধারে বেশি ডাল ছড়ায় এ জন্য গাছ লম্বায় র্৩-র্৪  উঁচু হলেই আগা কেটে প্রথম ৩-৪ টা শাখা তৈরি করে নিয়ে গাছকে উপরে ও পার্শ্বে বাড়তে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এছাড়া ছোট দুর্বল ডাল মাঝে মাঝে ছেঁটে দিলে গাছের কাঠামো সুন্দর হয়ে বেড়ে উঠে। বেশি লম্বা না হয়ে ঝাকড়া গাছে ফল ধরা ও পাড়ার সুবিধা বেশি। এ জন্য ট্রেনিং-প্রুনিং পদ্ধতি অবলম্বনে সেভাবে গাছের কাঠামো তৈরি করে নিতে হবে।  
সার প্রয়োগ : রামবুটান গাছে জৈব উৎস থেকে নাইট্রোজেনের চাহিদা পূরণ করা ভালো। রামবুটান গাছে ফসফরাস সারের চাহিদা অনেক বেশি। বিভিন্ন বয়সী রামবুটান গাছে বছরে যে পরিমাণ সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন তা হলো:  
বিভিন্ন সার বছরে দু বার প্রয়োগ করা ভালো। সুপারিশকৃত ডোজের ৪০% ভাগ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ফুল-ফল ধরার আগে/সময় প্রথমবার প্রয়োগ করতে হবে। এ সময় গাছের গোড়া কোপানো যাবে না। হালকা ভাবে আঁচড়া দিয়ে মাটি আলগা করে সারগুলো গাছের ক্যানোপি (দুপুর বেলা যে পর্যন্ত অংশে রোদ পড়ে) বরাবর ছিটিয়ে দিয়ে মালচিং দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। অবশিষ্ট ৬০% সার ফল সংগ্রহের পর একইভাবে গাছের গোড়ার চারধারে ছিটিয়ে দিয়ে হালকা ভাবে কুপিয়ে তা মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। সার প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই পানি দিয়ে মাটি ভালোভাবে ভেজাতে হবে।


পোকা-মাকড় : এ ফলের খোসা বেশি পুরু এবং সুতালো আবরণ থাকার ফলে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ অনেক কম। তবে মাঝে মাঝে ফল ছিদ্রকারী পোকা, পাতা খেকো লেদা পোকা, মিলিবাগ ও স্কেল পোকার উপদ্রব দেখা যায়। গাছে ফুল-ফল ধরা আরম্ভ করলে নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখা দরকার। পোকার উপদ্রব বেশি দেখা গেলে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় স্প্রে করে তা দমন ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।


পশুপাখির উপদ্রব : রামবুটান ফল পাকলে রাতে বাদুড়, ইঁদুরের উপদ্রব এবং দিনে কাঠবিড়ালি, কাকসহ আরও কয়েক প্রকার পাখির আনাগোনা বাড়ে। রাতে হারিকেন জ্বালিয়ে রাখলে বা টিন বেঁধে শব্দ করলে রাতে বিচরণকারীদের উপদ্রব রোধ করা যায়। দিনের বেলা টিন বাজিয়ে পাখি তাড়ানো যায়। আক্রমণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে লায়লনের জাল দিয়ে গাছের উপরিভাগ ঢেকে দিয়ে তা রোধ করা যায়।


ফল সংগ্রহ :  রামবুটান গাছে মার্চ মাসে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং এপ্রিল মাসে কচি সবুজ রঙের ফল ধরতে আরম্ভ করে। ফুল ফোটার ৩-৪  মাস পর জুলাই-আগস্ট মাসে ফল পাকে। ফল পুষ্ট  হলে সবুজ রঙের ফল হঠাৎ করে লাল, মেরুন রঙে রূপান্তর হতে থাকে। এ অবস্থা শুরু হওয়ার ১৫-২০ দিনের মধ্যে ফল সংগ্রহ করতে হয়। লিচু ফল সংগ্রহের ন্যায় এ ফল হাত দিয়ে সংগ্রহ করা হয়। ফলের থোকার সঙ্গে ১র্০র্ -১র্২র্  ডালসহ ফল সংগ্রহ করা উচিত। এ ব্যবস্থায় তথা হতে নতুন শাখা গজিয়ে পরের বছর বেশি ফল ধরতে সহায়ক হবে।  কোনো কোনো গাছে দ্বিতীয় বার অমৌসুমে কিছু ফুল-ফল ধরতে দেখা যায়।


একটা ফলন্ত বয়স্ক গাছ থেকে বছরে ১৫০-২৫০ কেজি ফল পাওয়া যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় এ ফল বেশি দিন  সংরক্ষণ করা যায় না। ফল পাড়ার ৭ দিনের মধ্যে বিপণন বা আহার কাজ শেষ করতে হয়। তবে ১০-১২০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হলে সেলফ লাইফ আরও ৮-১০ দিন বাড়ানো যায়।


বর্তমানে বাংলাদেশে এ ফলের বাজার মূল্য প্রতি কেজি প্রায় ৪০০-৫০০/- টাকা। নরসিংদী এবং নেত্রকোনার রামবুটান চাষি ৮-১০ বছর বয়স্ক প্রতি গাছের ফল বিক্রি করে প্রায় ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০/- টাকা আয় করে আসছে। তারা প্রতিটা ফলের বীজ ৫-৭ টাকায় বিক্রি করে।


এ লাভজনক ফল চাষে আকৃষ্ট হয়ে অনেকেই রামবুটান ফল চাষ সম্প্রসারণে অনুপ্রেরণা পাচ্ছে এবং এ ফল চাষ সম্প্রসারণ এ দেশে বেগবান হচ্ছে।

 

এম এনামুল হক

মহাপরিচালক (অব:), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং সদস্য, বিশেষজ্ঞ পুল (অচঅ), কৃষি মন্ত্রণালয়, মোবাইল : ০১৯১৭০৫৫২০৫

বিস্তারিত
কবিতা ( আশ্বিন ১৪২৫)

ইঁদুর নিধন
পরিমল কুমার সাহা১

বোকার  ফসল ইঁদুরে খায় ধারণা নয় মিছে,
গর্ত করে থাকে ইঁদুর ধানের গোলার নিচে।
মাঠে ঘাটে বন বাদাড়ে অবাধ বিচরণ,
গ্রাম শহর রাস্তা ঘাটে চলে অনুক্ষণ।
মেঠো ইঁদুর নষ্ট করে ক্ষেতের পাকা ফসল,
গরিব কৃষক সহ্য করে ক্ষতির পুরা ধকল।
যতটুকু খায় ইঁদুর দশগুণ নষ্ট করে
এমন তথ্য পাওয়া যাবে সব কৃষকের ঘরে।
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষক ফলায় ধান,
গর্তে বসে মনের সুখে ইঁদুর ধরে গান।
বিনা চাষে ঘরে বসে অনেক ফসল পাব,
পুত্র-কন্যা সবাই মিলে বছর ধরে খাব।
অবাক হবেন শুনলে ভাই এদের জন্ম হার,
জোড়া ইঁদুর জন্ম দেয় প্রায় তিন হাজার।
বসত বাড়ি দালান কোঠা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ,
গর্তের ভেতর তৈরি করেন ইঁদুর মারা ফাঁদ।
ইঁদুর ছড়ায় প্লেগ জন্ডিস নানা রকম রোগ,
অসচেতন হলে বাড়ে, জন মানুষের দুর্ভোগ।
ইঁদুর ধরুন ইঁদুর মারুন, ইঁদুর করুন শেষ,
বদলে যাবে গ্রাম শহর সারা বাংলাদেশ।
প্রতি বছর নষ্ট করে কোটি টাকার ফসল,
ইঁদুর মেরে কর্মসূচি করতে হবে সফল।
ইঁদুর নিধন সফল হলে মুক্ত হবে দেশ,
বদলে যাবে অর্থনীতি বিশ্ব পরিবেশ।

 

আশ্বিনের সর্বনাশা ইঁদুর
মো. জুন্নুন আলী প্রামাণিক২

ইঁদুরের ভীষণ ক্ষতি আশ্বিনের আমন ক্ষেতে,
লম্বালম্বি গর্তের বাসা কাটাকাটি ধারালো দাঁতে।
কাত্তরানো কষ্টের জ্বালা উপেক্ষিত উন্মুক্ত চোখে,
নিষ্ঠুরতা প্রকাশ ঘটে পৈশাচিক আনন্দ মুখে।
দিবারাত্রি কাটার ফাঁকে কামরায় আরাম করে,
শীষগুলি বাসায় আনে সাড়াশব্দে লুকায় জোরে।
সেবাযত্নে আদর করা আমনের ক্ষেতের মাঝে,
অবুঝের আসর বসে সর্বনাশা ক্ষতির কাজে।
পাকাকাঁচা বুঝে না কিছু কুটকুট কাটার নেশা,
কৃষকের কষ্টের ক্ষেতে ভাবনার করুণ দশা।
সুচতুর আজব প্রাণী দলেবলে চালায় কর্ম,
একগুঁয়ে স্বভাব ভারী নিকৃষ্টের এমন ধর্ম।
বংশের বিস্তার দ্রুত ভবিষ্যৎ চিন্তায় মগ্ন,
ডানেবামে গর্তের কক্ষে বাচ্চাসহ কাটায় লগ্ন।
ইঁদুরের দমন নিয়ে কৃষকের ভাবনা অতি,
সারাদিন উদ্বিগ্ন প্রাণে প্রচেষ্টায় নতুন গতি।
আবিষ্কৃত যান্ত্রিক ফাঁদে ইঁদুরেরা আটকা পরে,
বিষটোপ রাখলে গর্তে তাড়াতাড়ি আহারে মরে।
বড়সাপ থাকলে মাঠে পটাপট ইঁদুর ধরে,
ভয়ানক ছুটার তালে পলায়ন চাষির ঘরে।
বিড়ালেরা ইঁদুর দেখে তামাশায় কামড় মারে।
তপস্যায় নিমগ্ন হয়ে অবশেষে  আহার করে।
বাজপাখি চিলেরা ধরে বৃক্ষশাখে বসিয়ে খায়,
কৃষকের নজরে পরে ইঁদুরের শুধুই ভয়।
আশ্বিনের শুকনো ক্ষেতে আরামের আবাস গড়ে,
জলমগ্ন করলে গর্ত নিরুপায় ইঁদুর মরে।


১৪৪ সবুজ বাগ লেন, মিস্ত্ররী পাড়া, খুলনা, মোবাইল : ০১৭৩১৩৬৬২৫;  ২গ্রাম : বিদ্যাবাগীশ, ডাকঘর ও উপজেলা : ফুলবাড়ী, জেলা : কুড়িগ্রাম; মোবাইল : ০১৭৩৫২০২৭৯৮

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (আশ্বিন ১৪২৫)

ঝর্ণা বেগম, গ্রাম: ভাণ্ডারদহ, উপজেলা: পাটগ্রাম, জেলা: লালমনিরহাট
প্রশ্ন: লেবুর গাছে ভেতরে  আলো ঢুকে না এবং গাছগুলোও বেশ দুর্বল। ভালো লেবু ধরে না। কি করলে লেবু গাছে ভালো ফলন পাব?  

উত্তর:  লেবু গাছের অঙ্গ ছাঁটাই বা প্রুনিং এর পাশাপাশি সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করলে আপনি উপকার পাবেন। এক্ষেত্রে গাছের ভেতরের দিকে যেসব ডালপালা সূর্যের আলো পায় না সেসব দুর্বল ডালপালাগুলো মধ্য ভাদ্র থেকে মধ্য কার্তিক অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ছাঁটাই করে দিতে হবে। এ সময় লেবু গাছের প্রুনিং করার জন্য ভালো সময়। কিন্তু যে কথাটি মনে রাখতে হবে সেটি হলো লেবু গাছের ডালপালা ছাঁটাই করার সাথে সাথে বর্দোপেস্টের প্রলেপ দিতে হবে যাতে করে ছত্রাক আক্রমণ না করতে পারে। আর গাছের গোড়ার দিকে জলশোষক বা ওয়াটার সাকারগুলো বের হলেই কেটে দিতে হবে। লেবু গাছের বয়সভেদে সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বয়স ১-২ বছর হলে পচা গোবর ১৫ কেজি, ইউরিয়া সার ২০০ গ্রাম, টিএসপি সার ২০০ গ্রাম ও এমওপি সার ২০০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে। লেবু গাছের বয়স ৩-৫ বছর হলে পচা গোবর ২০ কেজি, ইউরিয়া সার ৪০০ গ্রাম, টিএসপি সার ৩০০ গ্রাম ও এমওপি সার ৩০০ গ্রাম প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। কিন্তু  লেবু গাছের বয়স ৬ বছর বা তদূর্ধ্ব হলে পচা গোবর ২৫ কেজি, ইউরিয়া সার ৫০০ গ্রাম, টিএসপি সার ৪০০ গ্রাম ও এমওপি সার ৪০০ গ্রাম সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন।  


সিরাজ খন্দকার, গ্রাম: চকগৌরী, উপজেলা: পতœীতলা, জেলা: নওগাঁ
প্রশ্ন: পেঁপে গাছে এক ধরনের পোকার আক্রমণে পাতা ও ফলে সাদা পাউডারের মতো আবরণ পড়ছে। পাতা ও ফল কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে। এমনকি পেঁপে গাছও মারা যাচ্ছে। এ অবস্থায় কি করণীয়?

উত্তর: সাম্প্রতিক সময়ে পেঁপে গাছে এ ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এ সমস্যাটি মিলিবাগ নামক পোকার কারণে হচ্ছে। এ পোকাটি মারাত্মক। সে কারণে মিলিবাগ পোকার আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত পাতা ও কা- সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। কিংবা পুরাতন টুথ ব্রাশ দিয়ে আঁচড়িয়ে পোকা মাটিতে ফেলে মেরে ফেলতে হয়। তবে এগুলো গুটিকয়েক পেঁপে গাছের ক্ষেত্রে করা সম্ভব। কিন্তু পেঁপে বাগানের ক্ষেত্রে ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক ০.২৫ মিলি প্রতিলিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।   


মো. জয়নুল ইসলাম, গ্রাম: চকউদয় নারায়ন, উপজেলা: মান্দা, জেলা: নওগাঁ
প্রশ্ন:  গ্লাডিওলাস ফুলের গোড়া পচে যাওয়া রোধ করবো কিভাবে?

উত্তর: গ্লাডিওলাস ফুলের গোড়া পচা রোধে যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয় সেগুলো হলো- রোগমুক্ত গ্লাডিওলাস বীজকন্দ সংগ্রহ করা; বীজকন্দ তোলার সময় আঘাতজনিত ক্ষত যাতে না হয় সে ব্যবস্থা নেয়া এবং সুষম সার প্রয়োগ করা। কিন্তু যদি গ্লাডিওলাস ফুলের বাগানে গোড়া পচা রোগ দেখা দিলে সে সময়ে কার্বেন্ডাজিম অথবা কার্বোক্সিন ও থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় মাটিতে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। তাহলে গ্লাডিওলাস ফুলের গোড়া পচা রোগ রোধ করা সম্ভব হবে।


সাহেব আলী, গ্রাম: বিষ্ণুগ্রাম,  উপজেলা: পাইকগাছা, জেলা: খুলনা
প্রশ্ন: আখের ডগার মাজরা পোকা দমনের জন্য কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, জানাবেন।

উত্তর: আখের ডগার মাজরা পোকা দমন বেশ কয়েকটি উপায়ে করা যায় সেগুলো হচ্ছে-হাত দিয়ে ডগার মাজরা পোকার মথ ও হাত বা হাসুয়ার সাহায্যে সামান্য পাতাসহ ডিমের গাদা সংগ্রহ করে ধ্বংস করা। এছাড়া ডগার মাজরা পোকা আক্রান্ত গাছ গোড়ার কাছ থেকে কেটে পোকাসহ ধ্বংস করে ফেলা। আর এ কাজটি করা হয় জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত। কীটনাশক প্রয়োগ করেও ক্ষতিকর এ পোকা দমন করা যায়। সেক্ষেত্রে আখের সারির উভয় পাশে অগভীর নালা কেটে নালার মধ্যে কার্বোফুরান গ্রুপের দানাদার কীটনাশক হেক্টর প্রতি ৪০ কেজি মার্চ ও মে মাসে নালায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। তাহলেই আখের ডগার মাজরা পোকা দমন করা সম্ভব হবে।


আশরাফুল কবীর, গ্রাম: বালাগ্রাম  উপজেলা: জলঢাকা, জেলা: নীলফামারী
প্রশ্ন: তুলা গাছের বলে এক ধরনের বাদামি ও কালচে দাগ দেখা যায় এবং তুলার বলগুলো ভেতর থেকে পচে শুকিয়ে যায়। এমনকি তুলার বলগুলো বিকৃত হয়ে যায়। এ সমস্যা রোধে কি করতে হবে?

উত্তর: তুলা গাছের এ সমস্যাটি অ্যানথ্রাকনোজ রোগের কারণে হয়ে থাকে। এ রোগ প্রতিরোধে তুলা গাছের মরাপাতা ও পরিত্যক্ত অংশ পুড়ে ফেলতে হবে। এছাড়া কার্বেন্ডাজিম অথবা কার্বোক্সিন ও থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করলে এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। জমি তৈরির সময় সুষম সার প্রয়োগ করাও দরকার। কারণ মাটিতে পটাশিয়ামের অভাব দেখা দিলে এ রোগ হতে পারে। সেজন্য জমিতে পরিমিত পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া প্রপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে গাছের পাতা ও ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে উল্লিখিত ছত্রাকনাশক তুলা গাছে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার ¯েপ্র করতে হবে। তবেই আপনি সুফল পাবেন।  


শওকত হোসেন, গ্রাম: ফলিয়ামারী, উপজেলা: ময়মনসিংহ সদর, জেলা: ময়মনসিংহ
প্রশ্ন: নারকেল গাছের নারকেলের ভেতর শাঁস হয় না। কি করলে এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে?  

উত্তর: নারকেলের এ সমস্যাটিকে বন্ধ্যা বা চিটা নারকেল বলে। এ সমস্যা হলে নারকেলের ফলের বাইরে খোসা ও খোল স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠে কিন্তু ভেতরে শাঁস থাকে না। আবার কখনও কখনও শুধু পানি থাকে কিন্তু শাঁস থাকে না। আবার কখনও আংশিক শাঁস থাকে কিন্তু পানি থাকে না। এ ধরনের সমস্যা প্রতিকারে গাছ প্রতি বরিক এসিড ৫০ গ্রাম ও এমোনিয়াম মলিবডেট গাছে প্রয়োগ করলে সুফল পাওয়া যায়। এছাড়া নারকেল গাছের বয়স অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ করাও ভীষণ জরুরি। এভাবে নারকেল গাছের পরিচর্যা করলে এ সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব।   

 
রওশন আলম, গ্রাম: পিরোজপুর, উপজেলা: মেহেরপুর সদর, জেলা: মেহেরপুর
প্রশ্ন: সিলভার কার্প মাছে পেটফুলা রোগ হয়েছে। এ রোগের প্রতিকার সম্পর্কে জানাবেন।

উত্তর: সিলভার কার্প মাছে পেটফুলা রোগ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়ে থাকে। সাধারণত শীতের প্রাক্কালে ও শীতকালে এ রোগ বেশি হয়ে থাকে। এ রোগের লক্ষণগুলো হলো- রোগাক্রান্ত মাছের পেট ও আঁইশের নিচে পানি জমে। মাছের পেট ফুলে বেলুনের মতো আকার ধারণ করে, চামড়ায় ঘা হয় ও অন্ত্র ফুলে যায়। এছাড়া আঁইশ আলগা হয়ে যায়। এ সমস্যা প্রতিকারে প্রতি কেজি খাবারে ২৫০ মি. গ্রাম রেনাভেট মিশিয়ে ৪-৭ খাওয়াতে হবে। তবেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাছাড়া এ সমস্যা প্রতিরোধের জন্য সুষম খাদ্য প্রয়োগ, জৈব সার কম দেয়া এবং প্রতি শতকে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করলে সুফল পাওয়া যাবে।

 
আরশেদ খান, গ্রাম: লখাইডাঙ্গা, উপজেলা: মনিরামপুর, জেলা: যশোর
প্রশ্ন: রুই মাছে সাদা দাগ রোগ হয়েছে। কি করলে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাব?

উত্তর: এ রোগে মাছের পাখনা, কানকো ও দেহের উপর সাদা দাগ দেখা যায়। মাছের ক্ষুধামন্দা এবং দেহের স্বাভাবিক পিচ্ছিলতা লোপ পেয়ে খসখসে হয়ে যায়। ইকথায়োপথেরিয়াস প্রজাতি এ রোগের কারণ। এ রোগ প্রতিকারে ১ পিপিএম তুঁতে পানিতে গোসল দেয়া কিংবা শতকরা ২.৫ ভাগ লবণ পানিতে কয়েক মিনিটের জন্য রাখা যতক্ষণ পর্যন্ত মাছ লাফিয়ে না পড়ে। এছাড়া এ ধরনের রোগ যাতে না হয় সেজন্য শামুকজাতীয় প্রাণী পুকুর থেকে সড়িয়ে ফেলা। শতকরা ২.৫ ভাগ লবণ পানিতে ৫-৭ মিনিট গোসল দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে পোনা মজুদ করতে হয়। তাছাড়া রোদে শুকনা জাল পুকুরে ব্যবহার করাও দরকার। আরেকটি বিষয় অনুসরণীয় সেটি হলো মাছের স্বাভাবিক সংখ্যা বজায় রেখে অতিরিক্ত মাছ সরিয়ে নেয়া।


শেফালী খাতুন, গ্রাম: সারানপুর, উপজেলা:  গোদাগাড়ী, জেলা: রাজশাহী
প্রশ্ন: গরুর গা খসখসে এবং ঘা হচ্ছে। এ অবস্থায় কি করণীয়?

উত্তর: ইনজেকশন ভারমিক প্রতি ২৫ কেজি গুরুর দেহের ওজনের জন্য ১ সিসি ১ বার চামড়ার নিচে পুশ করতে হবে। যদি সমস্যাটি বেশি হয় তবে ৭ দিন পর বুস্টার ডোজ আবারও ১ বার দিতে হবে। এছাড়া ইনজেকশন অ্যাসটাভেট ১০০ কেজি গরুর দেহের ওজনের জন্য ৫সিসি. করে দৈনিক ১ বার ৩ থেকে ৫ দিন মাংসে পুশ করতে হবে এবং ইনজেকশন অ্যামক্সিভেট ১ ভায়েল করে রোজ ১ বার ৩ দিন মাংসে পুশ করতে হবে। এসব ব্যবস্থা নিলে আপনার গরুর সমস্যা দূর হয়ে যাবে।


হাবিবুর রহমান, গ্রাম: করোলিয়া, উপজেলা: তেরখাঁদা, জেলা: খুলনা
প্রশ্ন: গাভী হিটে আসছে না। এ অবস্থায় কি করণীয়?

উত্তর: এ রোগ হরমোনের ভারসাম্য হলে হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ভিটা এভিই (১০০ সিসি) ১০০ কেজি ওজনের জন্য ২০ মিলি করে প্রতি সপ্তাহে ১ বার করে ১ মাস খাওয়ানোর পাশাপাশি কৃমির ট্যাবলেটও দিতে হবে। তাছাড়া ফার্টাজাইল ইনজেকশন ৫ মিলি প্রতি গাভীর মাংসপেশিতে দিলে গাভী ১৭ দিন পরপরই গরম হবে।


কৃষির যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে  কোনো জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ এ নাম্বারে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত যে কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে। তাছাড়া কৃষিকথার গ্রাহক হতে বার্ষিক ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকা মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ এ ঠিকানায় পাঠিয়ে ১ বছরের জন্য গ্রাহক হতে পারেন। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিকে কৃষিকথা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।

 

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন
উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবা : ০১৭১১১১৬০৩২, ঃ
taufiquedae25@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
কার্তিক মাসের (আশ্বিন ১৪২৫)

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, সবাইকে হৈমন্তীয় শুভেচ্ছা। হেমন্ত বাংলা ঋতুচক্রের এক কাব্যিক উপাখ্যান। সংস্কৃতিতে ঐতিহ্যে হেমন্ত যেমন সুন্দরের কাব্য শশি তেমনি কৃষি ভুবনের চৌহদ্দিতে এমাস কাজে কর্মে ব্যস্ততায় এক স্বপ্নীল মধুমাখা আবাহনের অবতারণা করে। সোনালি ধানের সম্ভার সুঘ্রাণে ভরে থাকে বাংলার মাঠ প্রান্তর। কৃষক মেতে ওঠে ঘাম ঝরানো সোনালি ফসল কেটে মাড়াই ঝাড়াই করে শুকিয়ে গোলা ভরতে। সাথে সাথে শীতকালীন ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো শুরু করতে। তাহলে আসুন আমরা জেনে নেই কার্তিক মাসে সমন্বিত কৃষির সীমানায় কোন কাজগুলো আমাদের করতে হবে।


আমন ধান : এ মাসে অনেকের আমন ধান পেকে যাবে তাই রোদেলা দিন দেখে ধান কাটতে হবে। আগামী মৌসুমের জন্য বীজ রাখতে চাইলে প্রথমেই সুস্থ সবল ভালো ফলন দেখে ফসল নির্বাচন করতে হবে। এরপর কেটে, মাড়াই-ঝাড়াই করার পর রোদে ভালোমতো শুকাতে হবে। শুকানো গরম ধান ঝেড়ে পরিষ্কার করে ছায়ায় রেখে ঠা-া করে বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ রাখার পাত্রটিকে মাটি বা মেঝের ওপর না রেখে পাটাতনের ওপর রাখতে হবে। পোকার উপদ্রব থেকে রেহাই পেতে ধানের সাথে নিম, নিশিন্দা, ল্যান্টানার পাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে মিশিয়ে দিতে হবে।


গম : কার্তিক মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে গম বীজ বপনের প্রস্তুতি নিতে হয়। দো-আঁশ মাটিতে গম ভালো হয়। অধিক ফলনের জন্য গমের আধুনিক জাত যেমন- আনন্দ, বরকত, কাঞ্চন, সৌরভ, গৌরব, বারি গম-২৬, বারি গম-২৭, বারি গম-২৮, বারি গম-২৯, বারি গম-৩০, বারি গম-৩১ অথবা বারি গম-৩২ বপন করতে হবে। বীজ বপনের আগে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক (প্রোভেক্স ২০০ বা ভিটাভেক্স ২০০) দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। সেচযুক্ত চাষের জন্য বিঘাপ্রতি ১৬ কেজি এবং সেচবিহীন চাষের জন্য বিঘাপ্রতি ১৩ কেজি বীজ বপন করতে হবে। ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার জমি তৈরির শেষ চাষের সময় এবং ইউরিয়া তিন কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। বীজ বপনের ১৩-২১ দিনের মধ্যে প্রথম সেচ প্রয়োজন এবং এরপর প্রতি ৩০-৩৫ দিন পর ২ বার সেচ দিলে খুব ভালো ফলন পাওয়া যায়।


আখ : এখন আখের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। ভালোভাবে জমি তৈরি করে আখের চারা রোপণ করা উচিত। আখ রোপণের জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ৯০ সে.মি থেকে ১২০ সে.মি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৬০ সে.মি রাখতে হয়। এভাবে চারা রোপণ করলে বিঘাপ্রতি ২২০০-২৫০০টি চারার প্রয়োজন হয়।


ভুট্টা : ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এ সময় যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে এবং জমি তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে। ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো বারি ভুট্টা-৬, বারি ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৩, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৪, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৫, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৬, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৮, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১১, বারি মিষ্টি ভুট্টা-১, বারি বেবি কর্ন-১ এসব। খরা প্রধান এলকায় বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩ আবাদ করতে পারেন।


সরিষা ও অন্যান্য তেল ফসল : কার্তিক মাস সরিষা চাষেরও উপযুক্ত সময়। সরিষার প্রচলিত জাতগুলোর মধ্যে টরি-৭, রাই-৫, কল্যাণীয়া, সোনালি, সম্পদ, বারি সরিষা-৬, বারি সরিষা-৭, বারি সরিষা-৮, বারি সরিষা-৯, বারি সরিষা-১০, বারি সরিষা-১১, বারি সরিষা-১২, বারি সরিষা-১৩, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-১৬, বারি সরিষা-১৭, বিনাসরিষা-৭. বিনাসরিষা-৮, বিনাসরিষা-৯ ও বিনাসরিষা-১০ উল্লেখযোগ্য। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে বিনা চাষে টরি-৭, বারি সারিষা-৯ বা কল্যাণীয়া টিএস-৭২ রোপণ করুন। জাতভেদে সামান্য তারতম্য হলেও বিঘাপ্রতি গড়ে ১ থেকে ১.৫ কেজি সরিষার বীজ প্রয়োজন হয়। বিঘাপ্রতি ৩৩-৩৭ কেজি ইউরিয়া, ২২-২৪ কেজি টিএসপি, ১১-১৩ কেজি এমওপি, ২০-২৪ কেজি জিপসার ও ১ কেজি দস্তা সারের প্রয়োজন হয়। সরিষা ছাড়াও অন্যান্য তেল ফসল যেমন- তিল, তিসি, চিনাবাদাম, সূর্যমুখী এ সময় চাষ করা যায়।


আলু : আলুর জন্য জমি তৈরি ও বীজ বপনের উপযুক্ত সময় এ মাসেই। হালকা প্রকৃতির মাটি অর্থাৎ বেলে দো-আঁশ মাটি আলু চাষের জন্য বেশ উপযোগী। ভালো ফলনের জন্য বীজ আলু হিসেবে যে জাতগুলো উপযুক্ত তাহলো স্টেফি, এলগার, এটলাস, এজিলা. লেডি রোসেটা, কারেজ, এসটেরিক্স, ডুরা, প্রভেন্টো, জারলা, ডায়ামন্ট, মুল্টা, কার্ডিনাল, প্যাট্রেনিজ, হীরা, গ্রানোলা, বিনেলা এসব। প্রতি একর জমি আবাদ করতে ৬০০ কেজি বীজ আলুর দরকার হয়। এক একর জমিতে আলু আবাদ করতে ১৩০ কেজি ইউরিয়া, ৯০ কেজি টিএসপি, ১০০ কেজি এমওপি, ৬০ কেজি জিপসাম এবং ৬ কেজি দস্তা সার প্রয়োজন হয়। তবে এ সারের পরিমাণ জমির অবস্থাভেদে কম-বেশি হতে পারে। তাছাড়া একরপ্রতি ৪-৫ টন জৈব সার ব্যবহার করলে ফলন অনেক বেশি পাওয়া যায়। আলু উৎপাদনে আগাছা পরিষ্কার, সেচ, সারের উপরিপ্রয়োগ, মাটি আলগাকরণ বা কেলিতে মাটি তুলে দেয়া, বালাই দমন, মালচিং করা আবশ্যকীয় কাজ। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে বিনা চাষে মালচিং দিয়ে আলু আবাদ করা যায়।


মিষ্টি আলু : নদীর ধারে পলি মাটিযুক্ত জমি এবং বেলে দো-আঁশ প্রকুতির মাটিতে মিষ্টি আলু ভালো ফলন দেয়। তৃপ্তি, কমলা সুন্দরী, দৌলতপুরী, বারি মিষ্টি আলু-৪, বারি মিষ্টি আলু-৫, বারি মিষ্টি আলু-৬, বারি মিষ্টি আলু-৭, বারি মিষ্টি আলু-৮, বারি মিষ্টি আলু-৯, বারি মিষ্টি আলু-১০, বারি মিষ্টি আলু-১১, বারি মিষ্টি আলু-১২ ও বারি মিষ্টি আলু-১৩ আধুনিক মিষ্টি আলুর জাত। প্রতি বিঘা জমির জন্য তিন গিটযুক্ত ২২৫০-২৫০০ খ- লতা পর্যাপ্ত। বিঘাপ্রতি ৪-৫টন গোবর/জৈবসার, ১৬ কেজি ইউরিয়া, ৪০ কেজি টিএসপি, ৬০ কেজি এমওপি সার দিতে হবে।


ডাল ফসল : মুসুর, মুগ, মাসকলাই, খেসারি, ফেলন, অড়হর, সয়াবিন, ছোলাসহ অন্যান্য ডাল এ সময় চাষ করতে পারেন। এজন্য উপযুক্ত জাত নির্বাচন, সময় মতো বীজ বপন, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, পরিচর্যা, সেচ, বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করতে হবে।


শাকসবজি : শীতকালীন শাকসবজি চাষের উপযুক্ত সময় এখন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বীজতলায় উন্নতজাতের দেশি-বিদেশি ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, বাটিশাক, টমাটো, বেগুন এসবের চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। আর গত মাসে চারা উৎপাদন করে থাকলে এখন মূল জমিতে চারা রোপণ করতে পারেন। মাটিতে জো আসার সাথে সাথে শীতকালীন শাকসবজি রোপণ করতে হবে। এ মাসে হঠাৎ বৃষ্টিতে রোপণকৃত শাকসবজির চারা নষ্ট হতে পারে। এ জন্য পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। রোপণের পর আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ, সেচ নিকাশসহ প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হবে। তাছাড়া লালশাক, মুলাশাক, গাজর, মটরশুটির বীজ এ সময় বপন করতে পারেন।


অন্যান্য ফসল : অন্যান্য ফসলের মধ্যে এ সময় পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ধনিয়া, কুসুম, জোয়ার এসবের চাষ করা যায়। সাথী বা মিশ্র ফসল হিসেবেও এসবের চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যায়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে জমিতে পানি কচু বপন করতে পারেন। সেচ নালা সংস্কার ও মেরামত করতে হবে।


প্রাণিসম্পদ: সামনে শীতকাল আসছে। শীতকালে পোল্ট্রিতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়ে যায়। রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, বসন্ত রোগ, কলেরা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। এসব রোগ থেকে হাঁস-মুরগিকে বাঁচাতে হলে এ মাসেই টিকা দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। গত মাসে ফুটানো মুরগির বাচ্চার ককসিডিয়া রোগ হতে পারে। রোগ দেখা দিলে সাথে সাথে চিকিৎসা করাতে হবে। গবাদিপ্রাণীর আবাসস্থল মেরামত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গবাদিপ্রাণিকে খরের সাথে তাজা ঘাস খাওয়াতে হবে। ভুট্টা, মাসকালাই, খেসারি রাস্তার ধারে বা পতিত জায়গায় বপন করে গবাদিপ্রাণীকে খাওয়ালে স্বাস্থ্য ও দুধ দুটোই বাড়ে। রাতে অবশ্যই গবাদিপ্রাণীকে বাহিরে না রেখে ঘরের ভিতরে রাখতে হবে। তা নাহলে কুয়াশায় ক্ষতি হবে। গবাদিপ্রাণীকে এ সময় কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হবে। এছাড়া তড়কা, গলাফুলা রোগের বিষয়ে সচেতন থাকলে মারাত্মক সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।


মৎস্যসম্পদ : এ সময় পুকুরে আগাছা পরিষ্কার, সম্পূরক খাবার ও সার প্রয়োগ করতে হবে। জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও জরুরি। রোগ প্রতিরোধের জন্য একরপ্রতি ৪৫-৬০ কেজি চুন প্রয়োগ করতে পারেন। অংশীদ্বারিত্বের জন্য যেখানে যৌথ মাছ চাষ সম্ভব নয় সেখানে খুব সহজে খাঁচায় বা প্যানে মাছ চাষ করতে পারেন। এছাড়া মাছ সংক্রান্ত যে কোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা মৎস অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।


সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, শীতকাল আমাদের কৃষির জন্য একটি নিশ্চিত মৌসুম। শুকনো মৌসুম বলে এসময় মাটিতে রস কম থাকে। তাই ফসলে চাহিদা মাফিক সেচ প্রদান নিশ্চিত করতে পারলে আপনার জমির ফলন অনেক বেড়ে যাবে। আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আধুনিক কৃষির সবকটি কৌশল সঠিক সময়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছতে পাবর। কৃষির যে কোনো সমস্যায় ১৬১২৩ নম্বরে কল করে নিতে পারেন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। আপনাদের সবার জন্য শুভ কামনা।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন
তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, মোবা : ০১৯১১০১৯৬১০, ইমেইল : ioag@ais.gov.bd

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook