কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

নগর কৃষি ও ফল চাষ

ঢাকা শহরে কমপক্ষে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ ছাদ রয়েছে (সাড়ে চার হাজার হেক্টরের বেশি) যা দেশের কোন একটি উপজেলার সমান বা বেশি। যেখানে বাসস্থান, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, ব্যাংক, শপিং মল, কনভেনশন সেন্টার ইত্যাদি বেশি। বিল্ডিং কোডে ২০% সবুজ থাকার কথা থাকলেও মানার বিষয়টি আশাব্যঞ্জক নয়। শহরবাসীর পুষ্টির বিষয়টি মাথায় নিলে ফল চাষ অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হলেও সবজি, ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী গাছ-পালা লাগানোর পরিমাণ শহরে তুলনামূলক বেশি। এটিও আশার বিষয় যে, নগরে সবুজের পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু এর সাথে সাথে পুষ্টি পাওয়ার বিষয়টি গুরুত¦ সহকারে ভাবতে হবে এবং তা এখনই করার উপযুক্ত সময়। তাই নগরে ফল ও সবজি চাষের জন্য ছাদ-বাগানসহ নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল নগরে টেকসই ও জনপ্রিয় করতে হবে। একটি গবেষণায় জানা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন উন্নত দেশে ৭০% এবং বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে ১০০% বাড়াতে হবে। আর নগর কৃষি বললে উলম্ব বা ভার্টিক্যাল ফার্মিং সমার্থকভাবেই চলে আসে।


নগর কৃষি ও বাণিজ্যিক উলম্ব (Commercial vertical urban farming) নগর চাষাবাদ
একবিংশ শতাব্দীতে আরো দ্রুত নগরায়ণের এবং জনসংখ্যা ২০৫০ সালে ৮.৩ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে পৃথিবীর ৩৮% স্থল প্রায় ৮০০ মিলিয়ন হেক্টর ফার্মিং এর আওতায় এবং অতিরিক্ত জনগণকে খাওয়ানোর জন্য এখনকার কৃষি পদ্ধতি ব্যবহার করলে আরো ১০০ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমি প্রয়োজন পড়বে। কিন্তু এই পরিমান কৃষি জমি অবশিষ্ট নাই যার ফলে বাণিজ্যিক ভার্টিক্যাল চাষাবাদ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই যা অবশ্যই নগর কৃষির অন্তর্গত। গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, সুউচ্চ ৩০তলা ভবনে ২৭,৮০০০,০০০ বর্গমিটার ভার্টিক্যাল ফার্ম স্থাপন করা যায় যা দিয়ে ৫০,০০০ মানুষকে খাওয়ানো যাবে যেখান থেকে প্রত্যেক জনকে ২০০০ ক্যালরি প্রতিদিন দেয়া সম্ভব। সুতরাং, বলাই যায়, ভবিষ্যৎ এর জন্য একমাত্র মাধ্যম হবে নগর ভার্টিক্যাল কৃষি ফার্ম। আরো উল্লেখ্য যে, বর্তমান ভূমি কৃষির যে সকল সমস্যা যেমন- পরিবহন সমস্যা, সংরক্ষণ সমস্যার মতো কোন সমস্যা নগর কৃষিতে থাকবে না কারণ নগর কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি ও কলাকৌশলের ফলে প্রত্যেক ফার্ম থেকে ফ্রেশ ফল বা সবজি সরাসরি বাজারজাত করা যাবে যেখানে ডিজাইনার, প্রকৌশলী, পুষ্টিবিদসহ অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং এতে একদল দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।    


বাণিজ্যিক নগর কৃষি আরো টেকসই করা সম্ভব কারণ এতে সেচের পানির অপচয় ৪০-৬০% কমিয়ে এনে ৩-৪গুণ ফলন বাড়ানো যায় যেখানে হাইড্রোপনিক্যালি পুষ্টিউপাদানসমৃদ্ধ পানিকে অটোমেটিক এবং জলবায়ুনিয়ন্ত্রিত বিল্ডিং এ সংরক্ষন করে পুনরায় ব্যবহার করা হয়। যদিও আধুনিক এই প্রযুক্তির ইনডোর ভার্টিক্যাল ফার্মিং এ আর্টিফিসিয়াল খঊউ ষরমযঃ, ধৎঃরভরপরধষ রহঃবষষরমবহপব (অও), ধঁঃড়-রৎৎরমধঃরড়হ রিঃয ংড়ষঁঃরড়হ ব্যবহারের কারণে এককালীন খরচ বেশি হবে বিধায় স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে এর খরচ কমিয়ে আনাটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই জায়গাটিতে সহযোগিতা করতে পারে শেকৃবি ও বাকৃবিতে প্রতিষ্ঠিত ফ্যাব-ল্যাব ও প্রকৌশল বিভাগগুলো; এছাড়াও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে কাজ করলে বাণিজ্যিক নগর ফার্মিং টেকসই ও লাভজনক করা সম্ভব।


আধুনিক নগর চাষাবাদ : বাণিজ্যিক নগর ভার্টিক্যাল ডিভাইস  (ঈড়সসবৎপরধষ ঁৎনধহ াবৎঃরপধষ ভধৎসরহম ফবারপব রিঃয খঊউ ষরমযঃরহম), গ্রিনহাউজ হাইড্রোপনিক (এৎববহযড়ঁংব যুফৎড়ঢ়ড়হরপং), ইকুয়াপনিক্স (অয়ঁধঢ়ড়হরপং) ছাড়াও স্মার্ট ফার্মিং ডিভাইস (ঝগঅজঞ ভধৎসরহম ফবারপব), গ্রিন স্ক্রিন (এৎববহ ঝপৎববহ রিঃয ধঁঃড়- রৎৎরমধঃরড়হ), স্বয়ংক্রিয় সেচসমৃদ্ধ ভার্টিক্যাল লাইন ডিভাইস (ঠবৎঃরপধষ ভধৎসরহম ফবারপব রিঃয ধঁঃড়-রৎৎরমধঃরড়হ), স্বয়ংক্রিয়  ছাদ-বাগান ঠা-াকরণ ডিভাইস (জড়ড়ভঃড়ঢ় পড়ড়ষরহম রিঃয ভড়মমরহম ংুংঃবস)  ইত্যাদি এখন আমাদের দেশেই সম্ভব এবং তা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে একদল উদ্যমী নন-কৃষিবিদ যাদের সাথে মিলে কৃষিবিদগণ কাজ করলে দেশে বাণিজ্যিক নগর চাষে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রাইভেট কোম্পানি সাফল্যজনকভাবে কাজ করছে মাইশা গ্রুপ (গ্রিনহাউজ-নেট মেলন চাষ), প্যারামাউন্ট গ্রুপ (গ্রিনহাউজ হাইড্রোপনিক-লেটুস, নেট মেলন, টমেটো), পারটেক্স গ্রুপ ইত্যাদি।


যে সকল ফল বেশি জনপ্রিয় : ধারণা ছিল নগরে বা ছাদে একটু ছোট জাতের, ঝোপালো ফল-সবজি গাছ লাগানো ভালো, এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে ১৫-২০ বছর যাবত ছাদ-বাগান করে আশা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো। নগরে এবং ছাদে কি হয় না, সব হয়-ছোট জাতের ভিয়েতনামিজ নারিকেল, সব জাতের আম, আমড়া, কামরাঙা, জাম, জামরুল, কদবেল, থাই ও মিসরীয় ডুমুর, আনার, ডালিম, লটকন, থাই লিচু, সিন্দুরী পেয়ারা আম, জাম, হলুদ এবং সাদা ড্রাগন ফল, বারোমাসি আম, বীজহীন লেবু, লাল স্ট্রবেরি পেয়ারা, লাল ইক্ষু, কমলা, বারি মাল্টা,  অ্যাভোকেডো, রাম্বুটান ছাড়াও গতানুগতিক সব দেশি ফলতো এখন সাধারণ বিষয়। বীজ থেকে যে সকল ফল নগরবাসী গতানুগতিক চাষ করে তার মধ্যে করমচা, শরিফা, বিলিম্বি ইত্যাদি কয়েকটি ছাড়া প্রায় সবই কলমের ফল গাছ। আসলে এখন ছাদ-কৃষির কল্যাণে নগরবাসী সব ধরনের ফল গাছই চাষ করার আগ্রহ দেখাচ্ছে।  


গবেষণার হালচাল : বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইঅজও) সবজি নিয়ে কাজের সাথে সাথে স্ট্রবেরি ফল নিয়ে কাজ করছে। এছাড়াও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশ কজন ছোট ছোট পরিসরে ভার্টিক্যাল চাষাবাদ করছে। বীজবিহীন জাম, গ্রাফটেড কাঁঠালও চাষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অনেক নগর কৃষক। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম থেকে অনেকেই বীজ, চারা এনে অনলাইনে বিক্রি করছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। বেশিরভাগ নগর কৃষক কৃষিবিদ নন কিন্তু নিজ আগ্রহ ও নেশা থেকে অনেক নগর কৃষক অপ্রচলিত এবং ভিন্নরকমের, স্বাদের, রংয়ের ফল বীজ ও চারা বিক্রি পেশা হিসেবে নিয়েছেন যার মধ্যে একটি বড় অংশ নারী-কৃষক গবেষণায় আরো বেশি মনোযোগ দেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।


নিরাপদ ও কোয়ালিটি ফল চাষে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি জেনে রাখা ভালো-
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও জৈব চাষাবাদ : ট্রাইকোডার্মা মিশ্রিত সার, বায়োচার, জীবাণুমুক্ত কোকোডাস্ট ইত্যাদি মাটির সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করলে মাটি শোধনের পাশাপাশি গ্রোয়িং মিডিয়ার গুণাগুণ ভালো থাকবে এবং ভালো ফল-সবজি হবে। ভার্মি কম্পোস্ট, রান্নাঘর ও খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ দিয়ে বানানো সার, চা-কম্পোস্ট, ডিম খোসা ভাঙ্গা মিশানো, নতুন মাশরুম কম্পোস্ট (পটাশ ও ফসফরাস আধিক্য), নিম খৈল, সরিষা খৈল, ইত্যাদি ছাড়াও যে কোন বায়োলজিক্যাল কম্পোস্ট ব্যবহার করুন।


রোগ-পোকামাকড় দমন : নিয়ম মেনে রাসায়নিক পেস্টিসাইড ব্যবহার করতে হবে; ফল ও ফল-জাতীয় সবজি চাষে ফল আহরনের কমপক্ষে ২০ দিন আগে থেকে রাসায়নিক সার ব্যবহার না করা। পোকা দমনে ফ্লাইং ইনসেক্ট এর জন্য ফেরোমন ট্রাপ, সোলার লাইট ট্রাপ (কারিগরি সহায়তার জন্য অওঝ, উঅঊ, ঋঅই খঅই-শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় যোগাযোগ করতে পারেন), আঠালো (ঝঃরপশু ঃৎধঢ়) ট্রাপ, পেয়াজ পাতার ও ছোলা পেস্ট বা নির্যাস, রসুনের, গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকার (সর্বাধিক কার্যকরী-ফুলের দোকানে ফেলে দেয়া ফুল) ফুলের নির্যাস ভালো কাজ করবে।


মিশ্র-ফসল : একই সাথে একটি বেডে ফল গাছের ড্রামে বা প্লেন্টার বক্সে ফল গাছের সাথে সাথী ফসল হিসেবে সবজি, ঔষধি ও গাদা চাষ করা। আমাদের দেশে সকল মৌসুমে সকল স্থানে সকল ফল চাষ করা সম্ভব প্লাস্টিক বোতল না ফেলে যে কোন -ফল-ফসলের বীজ চারা লাগিয়ে, নিজেই নিজের অক্সিজেন ফ্যাক্টরি স্থাপন করা যায়।


নগর কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ছাদ-বাগান ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা গবেষণায় জানা যায়, ঢাকা শহরের ৭৬% ছাদ-বাগানী প্রশিক্ষন নিতে চায়। প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার জন্য আপনার নিকটস্থ কৃষি অফিস হর্টিকালচার সেন্টার ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগসহ ফেসবুক গ্রুপগুলো পরামর্শ স্বতঃস্ফূতভাবে প্রদান করে। অনলাইন পোর্টাল করে, ফেসবুকে গ্রুপ করে নিজেদের ফল-ফসল আদান-প্রদান করা। নিরাপদ নগর কৃষির তথ্য ও চাষাবাদের সকল উপাদানের উৎস ও উপাদান আদান-প্রদান করা। সঠিকভাবে ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং শহুরে কৃষি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে ছাদ-বাগান করলে ছাদের ক্ষতি তো হয়ই না বরং টেকসই সবুজ আচ্ছাদন অক্সিজেন সরবরাহ করে বাসস্থান-অফিস ও প্রতিষ্ঠানকে আরো আরামদায়ক ও শান্তিময় রাখবে। ছাদ-কার্নিশ বা ব্যালকনিতে পটে বা টবে আবাদে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যাতে বিল্ডিং বা এপার্টমেন্টের নিচ দিয়ে যাতায়াতকারী পথচারী দুর্ঘটনার শিকার না হন।


নগর-কৃষি প্রচারণা : সম্প্রতি উঅঊ নগর কৃষি প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় শুরুতে ঢাকা শহরে প্রায় ৬০০ ছাদ-বাগান টার্গেট করে কাজ শুরু করেছে। এতে থাকবে প্রচুর প্রশিক্ষণ, হাতে-কলমে শিক্ষা ছাড়াও আরো ছাদ-বাগান প্রতিষ্ঠা করা। এতে একটি বিষয় পরিষ্কার, কৃষি মন্ত্রণালয় নগর কৃষিকে অধিকতর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এখন সবচেয়ে জরুরি যারা ১৫-২০ বছর ছাদ-বাগান বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তাদেরই প্রচেষ্ট্য়া নগর আজ সবুজ ও ফুল-ফল-সবজিময় হচ্ছে, তাদের সাথে নিয়ে সমন্বয় করে কাজ করলে নগর কৃষি বিষয়ক কার্যক্রম সফলতা লাভ করবে।


চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড বাণিজ্যিক নগর ভার্টিক্যাল চাষাবাদকৃত ফল-ফসল বাজারজাত করছে সাফল্যজনকভাবে। অথচ আমরা নগর কৃষি বলতে এখনও ছাদ-কৃষিকেই বুঝাই এবং তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকার পরিকল্পনায় ব্যস্ত। হ্যাঁ, এটা ঠিক শহরে চাষাবাদের একটি বৃহৎ  প্লেস ছাদ এবং এ দিয়ে প্রচুর পরিবারের ফল-ফসলের চাহিদা মিটছে কিন্তু এর পাশাপাশি এখনই ভাবতে হবে  বাণিজ্যিক নগর ভার্টিক্যাল ও ইনডোর চাষাবাদ নিয়ে যা দেশের কৃষি সেক্টরে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে যা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে এশিয়ার বেশ কটি দেশ। আমাদের এখনই সময় আধুনিক নগর কৃষি নিয়ে বেশি বেশি গবেষণা, প্রকল্প নিয়ে কাজ করা। নতুন নতুন সৃজনশীল (ওহহড়াধঃরাব) পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষণার সাথে সাথে নতুন কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং নগর কৃষি বাজার অনলাইন শপ তৈরির মাধ্যমে নগর কৃষি সকলের কাছে পৌঁছে দেয়ার এখনই সময়।

 

ড. এ এইচ. এম. সোলায়মান
সহযোগী অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি, বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১২০৭ ও ফ্যাব ল্যাব ম্যানেজার, ফ্যাব ল্যাব শেকৃবি, মোবাইল : ০১৭১১০৫৪২১৫, ই-মেইল : solaimansau@gmail.com

বিস্তারিত
ফল উন্নয়নে আধুনিক জাত ও প্রযুক্তি

মানুষের পুষ্টি ও সুষম খাবারের জন্য ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুতরাং একটি সুস্থ জাতি বিনির্মাণে ফল চাষ সম্প্রসারণ তথা ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। ফল পুষ্টি উপাদানের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার এবং আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, আঁশ এবং প্রচুর উপকারী হরমোন ও ফাইটোকেমিক্যালস প্রদান করে শরীরকে বিভিন্ন রোগবালাই থেকে সুরক্ষা প্রদান করে, যা সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ফল ঔষধি গুণাগুণে সমৃদ্ধ বিধায় একে ‘রোগ প্রতিরোধী খাদ্যও’ বলা হয়। ফলের অধিক উৎপাদন এবং এর প্রক্রিয়াজাতকৃত দ্রব্য যেমন একদিকে অধিক মুনাফা উপার্জনে সহায়তা করে অপরদিকে দানাজাতীয় খাদ্য শস্যের গ্রহণকেও (intake) পর্যাপ্ত পরিমাণে হ্রাস করে, যা বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছে। প্রায় ৭০ প্রজাতির ফল এদেশে জন্মে এবং যার অধিকাংশই উচ্চমাত্রায় পরপরাগায়িত (cross pollinated)। প্রতিটি প্রজাতিতে আবার রয়েছে প্রচুর ভিন্নতা (variability)। যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের অভাবে কিছু কিছু প্রজাতি ইতোমধ্যে প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দেশে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ জার্মপ্লাজম থেকেই উন্নতমানের জাত উদ্ভাবন তথা ফলের উন্নয়ন সম্ভব। ফলের উন্নয়নের জন্য সচরাচর ব্যবহৃত পদ্ধতিসমূহ সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হলো।


প্রবর্তন (Introduction)
প্রবর্তন বলতে সচরাচর বুঝায় একই বা ভিন্ন মহাদেশ এর অন্তর্ভুক্ত অন্য কোন দেশ থেকে ফল গাছ এনে স্থানীয় পরিবর্তিত আবহাওয়ায় খাপ খাওয়ানো। এমনকি এটি একই দেশের ভিন্ন জেলায় বা প্রদেশেও হতে পারে। এটি দুইভাবে হতে পারে-

 

সরাসরি প্রবর্তন : প্রবর্তিত গাছ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মূল্যায়নের মাধ্যমে সরাসরি জাত হিসেবে মুক্তায়ন।
 

সেকেন্ডারি প্রবর্তন : এক্ষেত্রে প্রবর্তিত গাছ থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে অথবা সংকরায়নের পর পুনরায় মূল্যায়নের মাধ্যমে জাত হিসেবে মুক্তায়ন।

নির্বাচন (Selection)
প্রকৃতিতে জন্মানো অতি উত্তম গুণাবলিসম্পন্ন চারা চাহিদানুযায়ী বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সংগ্রহ করে  যথাযথভােেব বৈশিষ্ট্যকরণ (characterization) এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্বাচিত জার্মপ্লাজমকে জাত হিসেবে মুক্তায়নই হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে জাত উদ্ভাবনের জন্য উত্তম প্রজনন স্টক অপরিহার্য।

১। প্রকৃতিতে যে সকল অতি উত্তম গুণাবলি সম্পন্ন চারা (chance seedling) দেখতে পাওয়া যায় সেগুলো নির্বাচন করা।
২। সবচেয়ে ভালো নির্বাচিত জার্মপ্লাজম /জাতসমূহের অযৌন পদ্ধতিতে বংশ বিস্তার করা।
৩। নির্বাচিত জাতগুলোর আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি যা তাদের ফলন ও অন্যান্য গুণাবলি বৃদ্ধি করবে তার উদ্ভাবন তথা উন্নয়ন করা।
৪। সবচেয়ে ভালো নির্বাচনগুলোর মধ্যে সংকরায়ন করা এবংপুনরায় উত্তম প্রজন্মকে (offspring) জাত হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্বাচন (selection) করা এবং পরবর্তীতে মাতৃ (parent) গাছ হিসেবে ব্যবহার করা এবং এই প্রক্রিয়া পুনঃ পুনঃঅনুসরণ করা।


ফলের প্রজনন স্টকের (breeding stock) (বিভিন্ন ক্রস থেকে পাওয়া পরিবারসমূহ) পরিমাণগত জেনেটিক্স (quantitative genetics) থেকে জানা যায় যে, ফলের উন্নয়নের জন্য এতে প্রচুর জেনেটিক পটেনশিয়াল (potential) রয়েছে এবং এক্ষেত্রে নির্বাচন হচ্ছে ফলের জাত উন্নয়নের জন্য একটি সবচেয়ে দক্ষ পদ্ধতি। অনেক প্রাচীন দেশীয় ফলের জাত রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী জিন বহন করে। সে সমস্ত জিনকে প্রচলিত প্রজনন প্রক্রিয়ায় সংবেদনশীল (susceptible) জাতে স্থানান্তর করে ফলের রোগ পোকা-মাকড় প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা যেতে পারে।


সংকরায়ন (hybridization)
দুটি মাতৃগাছের মধ্যে সংকরায়নের মাধ্যমে উৎপন্ন স্বতন্ত্র উদ্ভিদগোষ্ঠীর চারা থেকে উন্নত জাত উদ্ভাবনের জন্য উন্নতমানের ফলগাছ পাওয়া যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে উচ্চফলনশীল, উন্নত গুণগতমানসম্পন্ন, রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং প্রতিকূল পরিবেশ (বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততা) সহনশীল ফলের জাত হিসেবে মুক্তায়ন করা সম্ভব হবে। ফুলের বায়োলজি, সংশ্লিষ্ট ফল সম্পর্কে সম্যক ধারণা, আবহাওয়াগত কারণ (যেমন- তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, সূর্যকীরণের তীব্রতা, বাতাস), মৃত্তিকাজনিত কারণ (ভূমির ধরন, মাটির প্রকৃতি ইত্যাদি), রোগবালাই, পোকামাকড় ইত্যাদির ওপর সংকরায়নের সাফল্য নির্ভরশীল। ফলের গুণগতমান বা অন্যান্য কোন গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সংকরায়নের মাধ্যমে পরবর্তী বংশধরে (offspring) স্থানান্তর করা হয়। যে সমস্ত গুণাবলি পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তর করতে হবে সে সমস্ত গুণাবলিসম্পন্ন মাতৃগাছ নির্বাচন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সংকরায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বারি আম-৪ নামক হাইব্রিড জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে।


মিউটেশন ব্রিডিং (Mutation breeding)
জেনেটিক মেটেরিয়াল এর কোন বৈশিষ্ট্যে হঠাৎ বংশানুক্রমিক স্থানান্তরযোগ্য পরিবর্তন ঘটানোকে মিউটেশন বলে। ফলের প্রজননবিদগণ প্রধানত জিন ও ক্রোমোসোম মিউটেশন বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু ফল গাছে জিনোম ও সাইটোপ্লাজমিক মিউটেশন ও ঘটে থাকে। কোন একটি প্লান্ট পপুলেশনে মিউটেশনের মাধ্যমে বৈচিত্র্য/বিভিন্নতা (variation) সৃষ্টি করা হয় যা নির্বাচনের একটি অন্যতম ভিত্তি। কিছু কিছু ফলে প্রচলিত (conventional) প্রজনন প্রক্রিয়া প্রযোজ্য নয়। এছাড়া যে সমস্ত ফল গাছ বন্ধ্যা ফল তথা জাইগোটিক ভ্রণসহ বীজ উৎপাদন করতে সক্ষম নয় সে সমস্ত ফলের জাত উন্নয়নের একমাত্র পদ্ধতি হলো মিউটেশন প্রজনন। লেবুজাতীয় ফলের কিছু জাত এ এপোমিক্রিস প্রধানত দেখা যায়।


ফলের প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে মিউটেশন প্রজনন কাজ করতে পারে-
১। প্রকৃতিতে ফলের কোন প্রজাতির যদি কম বৈচিত্র্য (variability) থাকে, ফলে নির্বাচনের মাধ্যমে জাত উন্নয়নের সুযোগ কম থাকে, তখন বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্য;
২। কোন নতুন বৈশিষ্ট্য যেমন- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, কাক্সিক্ষত বৃদ্ধির ধরন অথবা স্ব-অসামঞ্জস্যতা (self-incompatibility) ঘটানোর (induce) জন্য;
৩। অংগজ বংশবিস্তারের মাধ্যমে উৎপন্ন ও সংরক্ষণ করা;
৪। কোন অপ্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যের সাথে স্থাপিত সংযোগ ভেঙে দেয়ার জন্য;
৫। দূরবর্তী সম্পর্কযুক্ত মাতৃগাছ (parent) এর মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দূর করার জন্য এবং
৬। হ্যাপলয়েড তৈরি করার জন্য।


অধিকাংশ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যেমন- বৃদ্ধি, ফলন, ফলের আগাম পরিপক্বতা ইত্যাদি একাধিক জিন (polygenic) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এক্ষেত্রে নির্বাচনের দক্ষতা কার্যকারিতা কম কিন্তু মিউটেশনের কার্যকারিতা (efficiency) বেশি। প্রকৃতিগতভাবে ফল গাছে মিউটেশন ঘটে থাকে এবং এর ফলে ফলের বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাত বিশেষত লেবুজাতীয় ফলে সৃষ্টি হয়েছে, যা পূর্ববর্তী জাতকে সম্পূর্ণভাবে স্থানান্তরিত করেছে। এটি ফলের উন্নয়নে মিউটেশন ব্রিডিংয়ের গুরুত্বকে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাই মিউটেশন পরবর্তীতে ফলের মিউটেন্ট নির্বাচন  ফলের জাত উন্নয়নের একটি শক্তিশালী টুল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
টিস্যু কালচার
কোন একটি উপযোগী মাধ্যমে (culture medium) (in vitro) টিস্যু এর বৃদ্ধিকে টিস্যু কালচার বলে। এটির ফলের উন্নয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ আছে যেমন- হেপ্লয়েড তৈরি, এমব্রায়ো রেসকিউ (embryo rescue), রোগবালাই, লবণাক্ততা, খরা ইত্যাদি প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন।

 

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং
এ পদ্ধতিতে উদ্ভিদ এ জিন পৃথকীকরণ এবং প্রবর্তন করা হয়। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফলের রোগবালাই, লবণাক্ততা, খরা ইত্যাদি প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা যেতে পারে।
ফলের কৌলিসম্পদ (genetic resources) সংরক্ষণ
সারাবিশ্বে গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য যে সমস্ত ফলগাছ সংগ্রহ করে থাকে সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে। এই সংগ্রহসমূহ সচরাচর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় বাণিজ্যিক জাত হিসেবে মুক্তায়নের লক্ষ্যে যথাযথভাবে পরীক্ষা করার জন্য অথবা সংকরায়নে ব্যবহারের জন্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে ফলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ বলতে প্রধানত যে সমস্ত প্রজাতির চাষ হচ্ছে সেগুলোকে সংগ্রহ করা বুঝায়। এক্ষেত্রে প্রচলিত প্রজাতিগুলোর পাশাপাশি অতি প্রাচীন (primitive) প্রজাতিগুলোও সুষ্ঠুভাবে রক্ষা করা দরকার। এছাড়া আলাদাভাবে প্রতিটি জেনোটাইপ সংরক্ষণের চেয়ে জিন পুল সংরক্ষণ করা উত্তম। দেশীয় ফলের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য আমাদের বর্তমানে যে সমস্ত জার্মপ্লাজমের বৈচিত্র্য রয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যসমূহ যেমন- পোকা ও রোগবালাই প্রতিরোধী, বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততা প্রতিরোধী ফলের জাত উন্নয়নে, আমাদের দেশে চাষ হচ্ছে এমন ফলসমূহে বন্য প্রজাতিসমূহ যাতে কৌলিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য রয়েছে, সেগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

আধুনিক জাত ও প্রযুক্তি
ফলের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে আধুনিক জাত ও ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি এর ভূমিকা অপরিসীম। ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, গাজীপুর উষ্ণ এবং অবউষ্ণম-লীয় ফলের উপর নিবিড় গবেষণা পরিচালনা করে আসছে এবং তারই ধারাবাহিকতায় অদ্যাবধি ৩৪টি ফল প্রজাতি যেমন- আম-১১টি, কাঁঠাল-৩টি, কলা-৫টি, পেঁপে-১টি, লিচু-৫টি, পেয়ারা-৪, লেবু-৫টি, কাগজিলেবু-১টি, জারালেবু-১টি, বাতাবিলেবু-৬টি, মাল্টা-২টি, কমলালেবু-৩টি, সাতকরা-১টি, কুল-৫টি, সফেদা-৩টি, নারিকেল-২টি, আমড়া-২টি, কতবেল-১টি, কামরাঙা-২টি, লটকন-১টি, জামরুল-৩টি, আঁশফল-২টি, আমলকী-১টি, বিলাতিগাব-১টি, তৈকর-১টি, জলপাই-১টি, বেল-১টি, নাশপাতি-১টি, প্যাশনফল-১টি, মিষ্টি তেঁতুল-১টি, মিষ্টি লেবু-১টি, রাম্বুটান-১টি, স্ট্রবেরি-৩ টি, ড্রাগনফল-১টি, আ্যাভোকেডো-১টি এর সর্বমোট ৮৪টি জাত ও ১২টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে যার অধিকাংশই সারা দেশে এবং কিছু কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য উপযোগী। বারি আম-৪ সংকরায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত আমের একটি হাইব্রিড নাবী জাত। ইতোমধ্যে বিএআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত কিছু জাত যেমন- বারি মাল্টা-১, বারি আম-৪, বারি পেয়ারা-২ সারাদেশে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত ও কৃষক কর্তৃক সমাদৃত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশে ফলের উৎপাদন বাড়ছে। আমাদের দেশে সারা বছর প্রয়োজনীয় ফলের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন এখনও অনেক কম এবং এ ঘাটতি বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে মিটানো হয়। ফলের বিদ্যমান ঘাটতি মেটানো এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে প্রয়োজন উচ্চফলনশীল জাত, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং সঠিক পরিকল্পনা। তাই ফল গবেষণায় অধিক গুরুত্ব প্রদান করা প্রয়োজন। ফলের কম উৎপাদনশীলতার অন্যতম কারণসমূহ হলো-

 

* উন্নত জাতের পরিবর্তে স্থানীয় (কম উৎপাদনশীল) জাতসমূহের অধিক ব্যবহার (অধিকাংশ বীজের গাছ)
* আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি এর ব্যবহার খুবই কম এবং
* উন্নত জাতের গুণগত মানসম্পন্ন চারা/কলমের অপ্রতুল উৎপাদন ও বিতরণ।

 

পরিশেষে বলা যায়, ফলের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে বারি উদ্ভাবিত আধুনিক জাত ও এদের উৎপাদন প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য কৃষকদের মাঠে প্রদর্শনী বাগান স্থাপন, প্রদর্শনী বাগান এবং গবেষণা কেন্দ্রে মাঠ দিবসের আয়োজন এবং ফলের আধুনিক উৎপাদন কলাকৌশল সম্পর্কিত ফ্যাক্টশিট/লিফলেট/ ফোল্ডার/বুকলেট ফল চাষিদের মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরে বারি কর্তৃক ‘আম উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি’ শীর্ষক একটি ফ্যাক্টশিট প্রস্তুতপূর্বক আম উৎপাদন এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষক এবং মাঠ পর্যায়ের সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের মাঝে বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থ গ্রহণ করা হয়েছে।


প্রতি বছর স্থানীয় জাতের পরিবর্তে (কম উৎপাদনশীল) উন্নত জাতের পর্যাপ্ত পরিমাণে মানসম্পন্ন কলমের চারার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ফলশ্রুতিতে, দেশে গুণগত মানসম্পন্ন ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, যা মানুষের পুষ্টিচাহিদা মিটানোর পাশাপাশি, বাড়তি আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

 

ড. বাবুল চন্দ্র সরকার

মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অ. দা.), ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বারি, গাজীপুর ও সাবেক ফুলব্রাইট ভিজিটিং স্কলার (পোস্ট ডক্টরেট, ইউএসএ)। মোবাইল : ০১৭১৬০০৯৩১৯

বিস্তারিত
পাহাড়ি অঞ্চলে বছরব্যাপী ফল চাষের সম্ভাবনা

দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকায় মোট জমির পরিমাণ ১৮,১৭,১৭২.০ হেক্টর তন্মধ্যে পাহাড়ি ও উঁচু ভূমি ১৬,৭১,৭৯৮.০ হেক্টর (৯২%)। পার্বত্য এলাকায় মোট জমির পরিমাণ ১২,১৫,৫০০.০ হেক্টর। এর মধ্যে মাঝারি উঁচু, মাঝারি নিচু, নদী, খাল ও বসতবাড়ি এলাকা বাদ দিলে মোট চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১১,১৮,৩০০.০ হেক্টর (৮%)। পাহাড়ি এলাকায় মোট চাষযোগ্য জমির মধ্যে রাবার ও বনভূমি ইত্যাদি ২৫% অর্থাৎ ২, ৭৯,৫৭৫.০ হেক্টর বাদ দিলে ৮, ৩৮,৭২৫.০ হেক্টর জমি ফল চাষের আওতায় আনা যেতে পারে।


দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে বছরব্যাপী ফল চাষের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়ি জমি ফল চাষের আওতায় আনা হলে তা থেকে উৎপাদিত ফল এ দেশের সকল মানুষের ফলের চাহিদা পূরণ করে বাড়তি ফল বিদেশে রপ্তানি করে হাজার কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে। ফল সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আর্থিক ও পুষ্টির চাহিদা উন্নয়নে বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প ফল চাষ সম্প্রসারণে এ অঞ্চলকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।


পাহাড়ি এলাকায় বছরব্যাপী ফল চাষ সম্প্রসারণ কর্মকা- বেগবান করার লক্ষ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
 

১. কষ্টসহিষ্ণু ফলের বাগান সৃষ্টিকরণ
 পার্বত্য জেলাগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটের কারণে ফল বাগানে সেচ দিয়ে গাছকে সফলভাবে বাড়তে দিয়ে গাছকে বেশি ফলদানে সক্ষম করে তোলা কষ্ট কর। এ জন্য প্রতিকূল অবস্থায় ফলদানে সক্ষম এমন ফল গাছ রোপণে  প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। ফল চাষকে লাভজনক করতে হলে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি তিন স্তর (Multi-layered fruit garden) বিশিষ্ট ফল গাছের সমন্বয়ে মিশ্র ফল বাগান সৃষ্টি করার প্রাধান্য দিতে হবে।

 

(ক) কষ্ট সহিষ্ণু দীর্ঘমেয়াদি ফল গাছ : কষ্টসহিষ্ণু দীর্ঘমেয়াদি ফল গাছের মধ্যে আম, কাঁঠাল, কুল (দেশি টক কুল), লিচু, বেল, কদবেল, বীজবিহীন বিলাতি গাব, কাজু বাদাম, তেঁতুল (বেশি টক), বরিশালের আমড়া অন্যতম।
 

(খ) মধ্যমেয়াদি অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতা বিশিষ্ট ফল : কষ্ট সহিষ্ণু দীর্ঘমেয়াদি ফল গাছগুলোর প্রকার ভেদ ৫-৯ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট কা- তৈরি করে নিয়ে মধ্যমেয়াদি ফল গাছ রোপণ উপযোগী করা যেতে পারে। এতে মধ্য মেয়াদি, দ্বিতীয় স্তরে রোপিত গাছ আলো-বাতাস পেতে সহায়ক হবে। কমলা, মাল্টা, বিভিন্ন প্রজাতির কাগজি, লেমন (বীজবিহীন কাগজি, এলাচি, জারা/কলম্বো), বাতাবি, পেয়ারা, বারোমাসী আমড়া, ডালিম, বিলিম্বি, তেজপাতা, ড্রাগন ফল অন্যতম।


(গ) স্বল্পমেয়াদি ফল/সবজি আবাদ ব্যবস্থা : ফল বাগান সৃষ্টির প্রথম ৩-৫ বছর পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি ফল ও এলাকা উপযোগী বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও সবজি আবাদের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। ফলের মধ্যে ট্রি পেঁপে অতি লাভজনক। এ গাছ থেকে বারোমাস ধরে ৩ বছর পর্যন্ত একাধারে ফল প্রাপ্তি সুবিধা আছে। এছাড়াও তরমুজ, বাঙি, বিভিন্ন প্রকার মেলন, ক্ষীরা, সবজির মধ্যে প্রচলিত সবজি, (বেগুন, টমেটো, ঢেঁড়স) মসলার মধ্যে মরিচ, আদা, হলুদ, পেঁয়াজ, রসুন, বিলাতি ধনে প্রধান। বাগানের বর্ডারে ঘন করে (৩ ফুট দূরত্বে) উপযোগী জাতের লেবু লাগিয়ে ন্যাচারাল বেড়ার ব্যবস্থা করা যায়। বর্ডারে বারোমাসি সজিনা, তরকারি/বীচি কলা এবং বাংলা কলা রোপণ করেও বাড়তি আয় করা যায়। লম্বা কা- বিশিষ্ট গাছে (কাঁঠাল, বারোমাসি আমড়া) গোল মরিচ, পান, চুঁই ঝাল রোপণ করে বাড়তি আয় করা সহজ।


(ঘ) কলম রোপণ : বেল, কদবেল, তেঁতুল, এ ধরনের ফল গাছের চারা রোপণ করা হলে তা থেকে ফল পেতে ৮-১০ বছর সময় লেগে যায়। অথচ এ সব ফলের কলম রোপণ করা হলে ২-৩ বছর থেকেই ফল পাওয়া সম্ভব এবং ফলের মাতৃগুণাগুণ বজায় রাখা যায়। কদবেল, তেঁতুল, জাম, কাঁঠাল, টক কুল, আম (অতি নাবি/আগাম, বারোমাসি) ইত্যাদি ফলের কলম করে ভালো পটিং মিডিয়া দিয়ে কলম বড় করে নিয়ে মে-জুন মাসের মধ্যে রোপণ করার কাজ সমাধা করা হলে বর্ষা কালের মধ্যেই গাছগুলোর শিকড় মাটির ভিতর দ্রুত ছড়াবে, শুকনা মৌসুমে রোপিত গাছ বেশি বৃদ্ধি পাবে। কিছু গাছের বীজ সরাসরি লাগিয়ে চারা র্৩-র্৪ ফুট লম্বা হলে তার ওপর ইনসিটো গ্রাফটিং করা হলে প্রতিকূল পরিবেশে শিকড় গভীরে ছড়ালে গাছের ভালো বৃদ্ধি ও ফলদান ক্ষমতা বাড়ে। বিশেষ করে কাজু বাদামের ক্ষেত্রে সরাসরি মাদায় বীজ রোপন করা অত্যাবশ্যক। কাঁঠালসহ অন্যান্য ফলের চারা/কলম করা গাছ লাগিয়ে কাক্সিক্ষত জাতের আগাম ফল প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়।


২.বসতবাড়ির আঙিনায় ফল ও অন্য গাছ রোপণ : পারিবারিক ফল বাগান থেকে ফল-ফলাদির মাধ্যমে পুষ্টি আহরণ আমাদের ঐতিহ্য । বসতবাড়ির আশপাশে পরিকল্পিতভাবে উন্নত জাতের লাভজনক ফল বাগান সৃষ্টিতে সহায়তা করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বসতবাড়ির আকার ভেদে সেখানে বাগান সৃষ্টিতে উপযুক্ততা পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটা মডেল তৈরি করে তা বাস্তবায়ন ব্যবস্থা নেয়া। পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থায় ফল ও অন্যান্য ফসল আবাদ নিশ্চিত করতে হবে। বসতবাড়িতে মিশ্র ফল বাগান স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। স্বল্প মেয়াদি ফল (ট্রি পেঁপে, কলা, আনারস ইত্যাদি) ছাড়াও আয় বৃদ্ধিকারক অন্য ফসল (বারোমাসি সজিনা, চুকুর ইত্যাদি) যা পাহাড়ি পরিবারের নিত্যদিনের প্রয়োজন আসে এবং পরিবারের চাহিদা পূরণ করে বাড়তি আয় হয় এমন ফসল আবাদ প্রধান্য দেয়া। সম্ভব হলে কিছু সংখ্যক পরিবারকে অন্য ভাবে (বায়োগ্যাস, সোলার প্লান্ট, রেইন ওয়াটার হারভেস্ট) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া। বসতবাড়ির আশপাশের রাস্তার ধারে তাল, খেজুর, বীচি কলা/বাংলা কলা, বারোমাসি সজিনা ইত্যাদি রোপণে উদ্বুদ্ধ করা।


৩. কমিউনিটি প্লান্টেশন : রাস্তার ধার, ঈদগাহ, গোরস্থান, স্কুল, মাদ্রাসা, বৌদ্ধ বিহার ইত্যাদি ধরনের কমিউনিটি স্থান চিহ্নিত করে ফল চাষের উদ্যোগ নেয়া ।
 

৪. বিদ্যমান ফল গাছগুলোর ফল দান ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ ব্যবস্থা নেয়া : ইতোমধ্যে পাহাড়ি এলাকায় স্থাপিত ফল বাগান থেকে পরিমিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না শুধুমাত্র ব্যবস্থাপনার অভাবে। পুরানো ফলন্ত গাছগুলোর সঠিক পরিচর্যা গ্রহণের মাধ্যমে বেশি ফল প্রাপ্তি নিশ্চিত করণের মাধ্যমে এলাকাবাসীর আর্থিক উন্নয়ন ও ফল চাষকে লাভজনক স্তরে নেয়া যেতে পারে। গাছগুলোকে ট্রেনিং-প্রুনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অফলন্ত ডাল অপসারণ করে আলো-বাতাস চলাচল সুবিধা করা, বাগানে গাছের অপ্রয়োজনীয় গাছের ডালপালা ছাঁটাই/অপসারণ ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাগানকে আগাছা, লতা-পাতা মুক্ত করা, সার প্রয়োগ, রোগ-পোকা দমন, মালচিং দেয়া, সুবিধা থাকলে সেচ দেয়া । ক্ষেত্র বিশেষে রিজুভিনেশন পদ্ধতি অবলম্বনে   অনুন্নত গাছকে উন্নত জাতে রূপান্তর ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
 

৫.হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দান : দলীয় আলোচনা, মাঠ দিবস, ফলচাষিদের সমাবেশে কলম করা, গাছ রোপণ ও পরিচর্যা, মালচিং দেয়া, ট্রেনিং-প্রুনিং, টেরাসিং, হাফমুন টেরাস পদ্ধতি এসব প্রযুক্তিগুলো হাতে-কলমে ফিল্ড ভিজিট কালে প্রশিক্ষণ আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় অধিবাসীদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করা হলে ফল চাষে সফলতা আসতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় মহিলারা অতি কর্মঠ ও নতুন প্রযুক্তি শিখতে ও প্রয়োগ করতে সক্রিয় হয়। এজন্য ফিল্ড ভিজিটকালে মহিলা দলকে চিহ্নিত করে কলম করা ও ফল বাগান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করা। এ ছাড়া মহিলা দলকে সহজ স্থানীয়ভাবে উপযোগী (ডিহাইড্রেশন/রোদে শুকানো) পদ্ধতি অবলম্বনে বা আচার, চাটনি, জ্যাম, জেলি তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে অমৌসুমে ফল প্রাপ্তিতে ব্যবস্থা নেয়া ।


৬. জাত নির্বাচন, কলম তৈরিতে সক্ষমতা আনয়ন : ফল চাষে উৎসাহী চাষিদের এলাকাতে উন্নত দেশি-বিদেশি জাত নির্বাচন করা এবং সেগুলোর কলম তৈরি করা ও বাড়তি কলম বিপণনে অনুপ্রেরণা দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া। বিশেষ করে কাটিং, গুটিকলম ও ক্লেপ্ট/ভিনিয়ার গ্রাফটিং করণে সক্ষম করে তোলা। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দান কাজ ফরমালি/ইনফরমালি দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হলে ফল চাষ সম্প্রসারণে সুফল বয়ে আনবে। এতে স্থানীয় মহিলাদের সম্পৃক্ত করা যুক্তিসঙ্গত হবে ।


৭.দেশি-বিদেশি হাইভ্যালু ফল বাগান সৃষ্টির ব্যবস্থা নেয়া : পার্বত্য জেলাগুলোতে প্রায় ৪০-৭০ বছর আগের পুরনো জাতগুলো নতুন বাগান সৃষ্টিতে এবং বসতবাড়িতে রোপণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমের ক্ষেত্রে প্রধানত আম্রপারপালি ও র‌্যাঙ্গুয়াই ছাড়া বিভিন্ন স্থানীয় পুরাতন জাত ও বীজ থেকে উৎপাদিত অনুন্নত জাত দিয়ে বাগান সৃষ্টিতে সাধারণ বাগানীরা এখনও তৎপর আছে।


 বড় বড় কিছু চাষি হাইভ্যালু দেশি-বিদেশি ফল চাষে সফল হচ্ছে। বিশেষ করে ড্রাগন চাষে কিছুসংখ্যক বাগানির অবদানে অনেকেই আকর্ষিত করছে। পার্বত্য জেলাগুলো রাম্বুটান চাষে অতি উপযোগী। এ অবস্থায় রাম্বুটান, বিদেশি কাঁঠাল, বিদেশি উন্নত জাতের সফেদা, ম্যাংগোস্টিন, পার্সিমন, কাজু বাদামের আধুনিক উন্নত জাত দিয়ে বড় আগ্রহী বাগানীকে দিয়ে এ সব বিদেশি জাতের ফলের চারা/কলম সংগ্রহ ও বাগান সৃষ্টিতে প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা দেয়ার উপর জোর দেয়া প্রয়োজন। থাই শরিফা, নতুন উন্নত জাতের মাল্টা, কমলা, কাগজি লেবু, বাতাবি লেবু, বারোমাসি কাঁঠালসহ অনুরূপ উন্নত জাতের দেশি-বিদেশি বাগান সৃষ্টিতে চাষিকে সহায়তা দেয়া প্রয়োজন।


৮. পার্বত্য অঞ্চলের হর্টিকালচার সেন্টারগুলোর জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও কলম তৈরিতে করণীয় : পার্বত্য জেলার উপযোগী বিভিন্ন জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে তা মাতৃগাছ হিসাবে রোপণ, রক্ষণাবেক্ষণ করা ও তা থেকে চারা/কলম তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বীজ দিয়ে কাঁঠাল চারা তৈরির চেয়ে কলম করার প্রতি জোর দেয়া প্রয়োজন। কাঁঠালের Vegetable meat হিসাবে খাওয়ার প্রচলন বাড়াতে হবে।
 

৯. কেন্দ্রীয়ভাবে উন্নত জাতের চারা/কলম সরবরাহের মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করা ঃ সমতল ভূমির অগ্রগামী হর্টিকালচার সেন্টার থেকে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সম্ভাবনাময়ী ফলের চারা/কলম অত্র এলাকায় সরবরাহের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
 

১০. কাজু বাদাম চাষ : ইন সিটো পদ্ধতিতে কাজুবাদাম চাষ একটি নতুন প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে ২ বছর বয়সের গাছে ফুল-ফল ধরা শুরু হয়। উন্নত কাজুবাদামের জাত যেমন-Giant/Jumbo সংগ্রহ করে বড় ও মাঝারি কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে সম্প্রসারণের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। ৩-৪ বছর আগে ইনসিটো পদ্ধতিতে বপনকৃত হর্টিকালচার সেন্টার রামু, কক্সবাজারের কাজুবাদাম গাছ হতে বীজ সংগ্রহের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ২০০ কেজি বীজ সংগ্রহ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে জুন-জুলাই/১৯ মাসে সম্ভাব্য ১০০০ কেজি বীজের মাধ্যমে প্রায় ৩০০ একর জমিতে বীজ বপন করার কার্যক্রম বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১২ ফুট এবং সারি থেকে সারি দূরত্ব ১২ ফুট হিসেবে পার্বত্য এলাকায় প্রায় ১ লক্ষ গাছের আবাদ করা সম্ভব হবে।

 

ড. মোঃ মেহেদী মাসুদ

প্রকল্প পরিচালক, বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। ফোন : +৮৮০২-৫৫০২৮৩৪৮, ই-মেইল : pdyrfp@gmail.com

বিস্তারিত
বিদেশি ফলের জাত প্রবর্তন, গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ

ফল হলো নিষিক্ত ও পরিপক্ব ডিম্বাধার।  অন্য কথায় ফল বলতে আমরা অনেকেই বুঝি আম, জাম, পেয়ারা, কলা, পেঁপে, কাঁঠাল। এসব ফল দেশের প্রায় সব এলাকাতে জন্মে। এসব ফলকে তাই আমরা বলি প্রচলিত ফল। এসব ফলের বাইরেও অনেক ফল পাওয়া যায়। এসব ফলকে বলা হয় অপ্রচলিত বা স্বল্প পরিচিত ফল। অর্থাৎ এসব ফলের অস্তিত্ব আছে, খুঁজলে পাওয়া যায় কিন্তু যখন তখন চোখে পড়ে না, দেশের সব এলাকায় জন্মে না, গাছের দেখা মেলে খুব অল্প। অনাদিকাল ধরে যেসব ফল এদেশে চাষ হয়ে আসছে সেগুলোই আমাদের দেশি ফল। এ পর্যন্ত এ দেশে মোট ১৩০টি দেশি ফলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৬০টি বুনো ফল। তবে সেসব ফলও  যথেষ্ট পুষ্টিসমৃদ্ধ ও সুস্বাদু। বাকি ৭০টি  ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, নারিকেল, লিচু, কুল, লেবু,  আনারাস, কলা ও পেঁপে এই ১০টি  এ দেশের প্রধান দেশি ফল।


কিন্তু বিদেশি ফল কোনগুলো? সহজে উত্তর হলো- যেসব ফলের উৎপত্তি ও চাষ এ দেশের ভূখণ্ডে বা এ অঞ্চলে নয়, বিদেশেই সেসব  ফলের উৎপত্তি ও বাণিজ্যিক ভাবে চাষাবাদ করা হয়, সেসব ফলকে আমরা বিদেশি ফল বলতে পারি। তর্কটা সেখানেই, ফল তো দেশ চেনে না। তার উপযুক্ত জলবায়ু ও মাটি যেখানে, সেখানে সে জন্মে থাকে। সে অর্থে যেসব ফলের উৎপত্তি  আমাদের অঞ্চলে, সেসব ফলের সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ ফলই হাজার হাজার বছর পূর্বে অন্যান্য দেশ থেকে এ দেশে এসে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং কালক্রমে সেগুলো আমাদের ফলে পরিণত হয়েছে। সব বিদেশি ফল আবার এ দেশে ভালো ফল দেয় না। আবার  এমন অনেক বিদেশি ফল আছে যেগুলো বাংলাদেশে সার্থকভাবে চাষ করা সম্ভব। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, এ ফলগুলোর পরিবেশিক চাহিদার সাথে বাংলাদেশের জলবায়ুর কোন মিল নেই কিন্তু সৌভাগ্যবশত এ ফলগুলোর এমন অনেক জাত আছে যা বাংলাদেশের জলবায়ুতে সাফল্যের সাথে জন্মানো সম্ভব। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অনেকগুলো বিদেশি ফল প্রবর্তন করা হয়েছে। তারমধ্যে অ্যাভোকেডো, ম্যাঙ্গোস্টিন, স্ট্রবেরি, কিউই, রাম্বুটান, লংগান, ল্যাংসাট, জাবাটিকাবা, শান্তল, আপেল, পিচফল, আলুবোখারা, পার্সিমন, এগ ফ্রুট, সাওয়ার সপ, নাশপাতী, প্যসন ফ্রুট, ড্রাগন ফ্রুট এবং ডুরিয়ান অন্যতম। এদের মধ্যে কিউই, আপেল ও  ডুরিয়ান ছাড়া প্রায় সব ফলই এদেশে গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুলোত কমবেশি হচ্ছে এবং কোন কোনটা থেকে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। যা দেখে অনেকে কিছু কিছু ফলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু করেছে এবং কিছু ফলের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করার চিন্তা-ভাবনা করছে। এ দেশে প্রবর্তনকৃত কিছু বিদেশি ফলের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো-
ড্রাগন ফল : ড্রাগন ফলের (Hylocereus sp.) উৎপত্তিস্থল সেন্ট্রাল আমেরিকা। বাংলাদেশে এ ফল ২০০৭ সালে প্রথম প্রর্বতন করেন। এ সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম এ ফলের জাত নিয়ে আসেন থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে। ড্রাগন ফল এ দেশের জলবায়ু ও মাটিতে দারুণভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এখন এ সেন্টার থেকে এ ফলটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বংশ বিস্তার করা হচ্ছে। এ সেন্টার থেকে ড্রাগন ফলের ৪টি জাত (বাউ ড্রাগন ফল-১; বাউ ড্রাগন ফল-২; বাউ ড্রাগন ফল-৩ ও বাউ ড্রাগন ফল-৪) জাতীয় বীজ বোর্ড থেকে নিবন্ধন করেছে এবং সেখান থেকে তারা চারা তৈরি ও সম্প্রসারণ করছেন। সম্প্রসারণের কাজ গুলো বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অসংখ্য বংশানুক্রমিক (PEDIGREE) মাতৃগাছ কৃষকের দোরগোড়ায় সম্প্রসারণ করছে। বংশীয় মাতৃগাছের ক্ষেত্রে এ সেন্টরটি এদেশের মানুষের কাছে অতি পরিচিত, অনন্য। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট  (বারি) থেকে নিবিড়ভাবে গবেষণার ফলে  বারি ড্রাগন ফল -১ নামে  ১টি জাত নিবন্ধন করেছে। ড্রাগন ফলের বেশ কিছু জার্মপ্ল­াজম জনাব কামরুজ্জামান, সাবেক বছরব্যাপী ফল উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর মাধ্যমে নাটোরের মডার্ন হর্টিকালচার সেন্টারে সংগ্রহ করেছে এবং সেখান থেকে তারা চারা তৈরি ও সম্প্রসারণ করছেন।

 

স্ট্রবেরি : স্ট্রবেরি মূলত যেখানে শীতকাল মৃদুভাবাপন্ন ও গ্রীষ্মকাল শুষ্ক সেখানে স্ট্রবেরি ভালো জন্মে। কিন্তু বর্তমানে অনেক উষ্ণম-লীয় জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় নাতিশীতোষ্ণ ও উষ্ণম-লেও এর চাষ হচ্ছে। উষ্ণম-লীয় জাতগুলি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সাফল্যজনকভাবে জন্মানো সম্ভব। প্রাথমিক পরীক্ষায় বাংলাদেশে এর চাষ সফল হয়েছে। স্ট্রবেরির ফল দেখতে কিছুটা লিচুর মতোই কিন্তু আকারে ছোট। স্ট্রবেরির কিছু জাত এ দেশের জলবায়ু ও মাটিতে ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে বলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাবি স্ট্রবেরি-১;  রাবি স্ট্রবেরি-২ ও রাবি স্ট্রবেরি-৩ নামে ৩টি জাত নিবন্ধন করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট  (বারি) থেকে বুদ্ধিদীপ্ত গবেষণার ফলে  বারি স্ট্রবেরি-১ নামে  ১টি জাত  ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্ল­াজম সেন্টার থেকে বাউ  স্ট্রবেরি-১ নামে ১টি জাত নিবন্ধন করেছে। উক্ত জাতগুলো এদেশের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করা হচ্ছে।


রাম্বুটান : রাম্বুটান দক্ষিণ-পূর্র্ব এশিয়ার একটি অন্যতম প্রধান ফল। একে অনেকে Hairy Litchi আবার অনেকে queen of fruits  বলে থাকেন। ফলটি দেখতে লিচুর মতোই কিন্তু খোসার উপর খয়েরি রঙের লম্বা লম্বা লোম থাকে। ইহা একটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও মুখরোচক ফল। রাম্বুটানের আদি জন্মস্থান সম্ভবত মালয়দ্বীপ অথবা থাইল্যান্ডে। শীতকালে মৃদু শীত অথবা প্রায় সারা বছরই উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু বিদ্যমান এমন স্থানে রাম্বুটান সবচেয়ে ভালো জন্মে। বাংলাদেশের জলবায়ুতে সার্থকভাবে রাম্বুটানের চাষ করা সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্ল­াজম সেন্টার থেকে বাউ  রাম্বুটান-১ নামে ১টি জাত নিবন্ধন করেছে। উক্ত জাতটি এদেশের বিভিন্ন এলাকায়  বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করার জন্য বীজ, গুটিকলম, জোড়কলম ও কুঁড়ি সংযোজনের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার করা হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট  (বারি) এর উপর গবেষণা চলছে। কিছু ব্যক্তিগত নার্সারিতে ও ব্যক্তি উদ্যোগে এ ফলের সংগ্রহ কাজ চলছে। এ ছাড়া ধোবাউড়া উপজেলায় ডা. ওসমান সাহেবের বাড়িতে একশটি বড় রাম্বুটানের গাছ আছে সে গাছ থেকে ফল ও হচ্ছে।  তবে সে  ফলের  বীজ বড় ও ফলের আকার ছোট।


অ্যাভোকেডো : অ্যাভোকেডো একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল। এ ফলটির বিশেষ আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এতে শর্করার পরিমাণ কম অথচ তেলের পরিমাণ অনেক বেশি। তাই অনেকে  একে মাখন ফল বলে থাকেন। পুষ্টি সমস্যা নিরসনেএ ফল উল্লেখযোগ্য  অবদান রাখতে পারবে। এ ফলে প্রায় ৮৮% চর্বি থাকে কিন্তু কোলেস্টেরল মুক্ত। মধ্য আমেরিকা অ্যাভোকেডোর আদি জন্মস্থান। বর্তমানে বাংলাদেশে অ্যাভোকেডোর গাছ প্রথম প্রবর্তন হয় মধুপুরের জলছত্র মিশনের তৎকালীন একজন ফাদারের মাধ্যমে।  বর্তমানে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও অন্যান্য পার্বত্য এলাকায় সীমিত আকারে এর চাষ হচ্ছে।


কাজুবাদাম : কাজুবাদাম একটি ‘নাট’ জাতীয় ফল। অনেকে এটিকে ফল না বলে বাদাম বলতে অধিক পছন্দ করেন। আসলে বাদামও এ ধরনের নীরস ফল। বর্তমানে এ ফলটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের উঁচু অঞ্চলে সীমিত আকারে উৎপাদিত হচ্ছে। কাজুবাদামকে একটি অর্থকরী ফসল হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। বৃক্ষ জাতীয় ফলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাজুবাদামের স্থান তৃতীয়। দক্ষিণ আমেরিকা (ব্রাজিল) কাজুবাদামের আদি জন্মস্থান। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে বাউ  কাজুবাদাম -১ নামে ১টি জাত নিবন্ধন করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)ও  বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ভালো জাত অবমুক্ত করার জন্য নিবিড়ভাবে  গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে ।


আঙ্গুর : আঙ্গুর পৃথিবীর প্রাচীনতম ফলসমূহের মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীর বেশিরভাগ মদ তৈরি করা হয় আঙ্গুর থেকে। আঙ্গুর ফল সবার কাছেই সুপরিচিত এবং সমাদৃত। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সীমিত আকারে নি¤œ মানের আঙ্গুর উৎপন্ন হয়ে থাকে। নওগাঁ জেলায় একজন কৃষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আঙ্গুর চাষ শুরু করেছে। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক উষ্ণম-লের দেশেই উৎকৃষ্ট মানের আঙ্গুর উৎপন্ন হচ্ছে। সে দিক থেকে বাংলাদেশে উৎকৃষ্ট মানের আঙ্গুর চাষের প্রচুর সম্ভাবনা হয়েছে। বাংলাদেশে এখনও কোন আঙ্গুরের জাত নেই।
 

ম্যাঙ্গোস্টিন : ম্যাঙ্গোস্টিন এমন একটি ফল যা স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয়। তাই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় একে অনেকে ফলের রানী বলে আখ্যায়িত করেছেন। ম্যাঙ্গোস্টিনের আদি জন্মস্থান হচ্ছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশে সাফল্যজনকভাবে এর চাষ করা সম্ভব। সুনিষ্কাশিত গভীর দোঁআশ মাটি এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী, তবে যেকোন মাটিতেই ম্যাঙ্গোস্টিন চাষ করা যায়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্ল­াজম সেন্টারে একটি গাছে এই বছর সর্ব প্রথম ফল ধরেছে। শীতের শেষে ফুল ফোটে ও বর্ষাকালে ফল পাকে। ফল গোলাকার, দেখতে দেশি গাবের মত। পাকা ফলে সাদা রসাল কোয়া থাকে এবং সহজেই ফল থেকে খোসা ছাড়ানো যায়। ফলের ভক্ষণযোগ্য প্রতি ১০০ গ্রামে ২১ কিলোক্যালরি শক্তি, ১.৩ ভাগ আমিষ, ৪.৮ ভাগ শর্করা, ০.৩ ভাগ খনিজ লবণ, ১২ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও সামান্য পরিমাণ ভিটামিন সিও ক্যারোটিন থাকে।
 

ডুরিয়ান : ডুরিয়ানের বৈজ্ঞানিক নাম Durio zibethinus Murr। ইহা Bombacaceae পরিবারভুক্ত। ইহা মাঝারি থেকে বৃহৎ আকারের চিরহরিৎ বৃক্ষ। ফল দেখতে অবিকল একটি ক্ষুদ্রকার কাঁঠালের মতো, কিন্তু ফলের কাঁটা দীর্ঘ ও খুবই শক্ত। পাকা ফলে চাপ দিলে খোসা লম্বালম্বি পাঁচটি খণ্ডে আলাদা হয়ে যায়। ভেতরে মাত্র কয়েকটি বড় কোয়া থাকে। সাধারণত বীজ দিয়ে ইহার বংশবিস্তার করা হয়, তবে অঙ্গ (ইনাচিং) ও কুড়ি (ফর্কাট) সংযোজন করেও চারা তৈরি করা যায়। বীজের চারা রোপণের ৮-১০ বছর পর ফল ধারণ করে। কোন কোন গাছ পরাগায়নের ব্যাপারে স্ব-অসঙ্গত, এজন্য এক সাথে একাধিক জাতের গাছ লাগানো উচিত। বাংলাদেশে ডুরিয়ান নিয়ে গবেষণা চলছে কিন্তু এখনও কোন সফলতা আসেনি।
 

নাশপাতি : শীত প্রধান জলবায়ুর ফল। সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে অতি সীমিত আকারে ইহার চাষ হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে  পরীক্ষামূলকভাবে নাশপাতি জন্মানো সম্ভব হয়েছে যদিও ইহার ফলন বা ফলের মান খুব সন্তোষজনক হয়নি। সিলেটে যে জাতের চাষ হয় তা সম্ভাবত P. khasiana প্রজাতির, ইহা অনেকটাা বুনো ধরণের, ফল নাশপাতি আকৃতির।
 

পার্সিমন : জাপানের দক্ষিণাঞ্চল ও চীন পার্সিমনের উৎপত্তিস্থান। ইহা জাপানের অন্যতম প্রধান ফল। আমাদের দেশের গাব একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। পার্সিমনের গাছ একটি পত্রমোচক মাঝারি আকারের বৃক্ষ, ফল দেখতে টমেটোর মতো, পাকা অবস্থায় হলুদ বা কমলা, ফুলের বৃত্তি স্থায়ীভাবে ফলের সাথে সংযুক্ত থাকে। ইহার কোন কোন জাতের গাছ কেবলমাত্র স্ত্রীফুল (pistillate constants)। কোন কোনটা কেবলমাত্র পুরুষ ফুল (staminate constants) এবং অন্যান্যগুলো পুরুষ ও স্ত্রী (staminate sporadics) উভয় প্রকার ফুল উৎপাদন করে। সব জাতেই বিশেষ ধরনের আবহাওয়ায় বীজ হীন ফল উৎপাদন  করে। বাংলাদেশে জুলাই-সেপ্টেম্বরে ফল পাকে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টারে ৩টি  বড় গাছ আছে,যা থেকে ২০১০ সাল থেকে ফল দিচ্ছে।


প্যাশন ফল : গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক জায়গাই এখন শৌখিন ফলচাষি টবে, বাড়িতে ও নার্সারির মালিকরা সীমিত আকারে প্যাশন ফলের চাষ করছেন। পাকা ফল কেটে পানি-চিনিতে শরবত করে খাওয়া যায়। প্যাশন ফলের শরবতের স্বাদ ‘ট্যাং’ ড্রিংকসের মতো। সেজন্য প্যাশন ফল এ দেশে ধীরে ধীরে ‘ট্যাং ফল’ অর্থাৎ শরবতি ফল নামে

পরিচিত হয়ে উপ্যাশন ফল : গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক জায়গাই এখন শৌখিন ফলচাষি টবে, বাড়িতে ও নার্সারির মালিকরা সীমিত আকারে প্যাশন ফলের চাষ করছেন। পারুটিফল : লংগান :শানতোল :টক আতা :জাবটিকাবা : ঠেছে। লতানো বর্ষজীবী এ গাছটি তার অবলম্বনকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে যে, তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ফলের নাম দিয়েছেন ‘প্যাশন ফল’। এ ফলের উৎপত্তি দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অঞ্চলে, বিশেষ করে ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনাতে এর ফলের আদি নিবাস বলে ধারণা করা হয়।
 

রুটিফল : ব্রেড ফ্রুট (Bread fruit) ফলের বাংলা নাম দেয়া হয়েছে রুটি ফল। আঠারো শতকের শেষ দিকে বৃটিশ নাবিকেরা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের তাহিতি দ্বীপ থেকে রুটি ফলকে এ উপমহাদেশে নিয়ে আসেন। তাহিতির লোকেরা তখন রুটিফলকেই প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। এখনো বেশ কিছু দেশে রুটি ফল প্রধান খাদ্য। এ ফল থেকে রুটি তৈরি করে খাওয়া হয় বলেই এরূপ নাম। ১৯৮২ সালে সার্ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে যোগ দেয়ার সময় শ্রীলংকার কৃষিমন্ত্রী শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে রুটি ফলের কয়েকটি চারা এ দেশে নিয়ে আসেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট চত্বরে সেগুলো লাগানো হয়েছিল। এখন সেসব গাছে দিব্যি ফল ধরছে।  রুটি ফলের আর একটি বড় গাছ আছে আসাদগেটে, হর্টিকালচার সেন্টারে। সে গাছেও নিয়মিত ফল ধরেছে। কুমিল্লার কোর্টবাড়িতে অবস্থিত বার্ড এ ব্রেডফ্রুট এর ফল পাওয়া যাচ্ছে। রুটি ফলের গাছ বড় বৃক্ষ, ফলের ব্যাস ১০-৩০ সেন্টিমিটার। ফলের গায়ে কাঁঠালের মতো কাঁটা কাঁটা আছে। ফল বীজবিহীন ও বীজধারী, দুই রকমই আছে।
 

লংগান : লিচুর সহোদর এ ফলটি লিচু যখন ফুরিয়ে যায় তখন তার তেষ্টা মেটায়। বিভিন্ন দেশে ফলটি রপ্তানি করেও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, চীন ও সম্প্রতি তাইওয়ানে লংগানের চাষ হচ্ছে। লংগান শব্দটি এসেছে ‘লংইয়ান’ চীনা শব্দটি থেকে। যার অর্থ হল ‘ড্রাগনের চোখ’। ভারত আর বাংলাদেশের বাঙ্গালিদের কাছে এটি ‘আঁশফল’। বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় এর নাম কাঠলিচু। বরিশালে এর নাম নাড়িয়া লিচু। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে বাউ  লংগান -১ও বাউ  লংগান -২ নামে ২টি জাত নিবন্ধন করেছে।
 

শানতোল : শানতোল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি পরিচিত ফল। শানতোলকে কেউ কেউ বুনো ম্যাংগোস্টিন বলেও ডাকেন। বাংলাদেশে এ ফলের চাষ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টারে ও হর্টিকালচার সেন্টার, কল্যাণপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খামারে বেশ কয়েকটি শানতোলের গাছে সফলভাবে ফল ধরছে। দেশের অন্যান্য স্থানেও চাষ সম্ভব। শানতোল ফলের আলাদা একটা সুগন্ধ আছে। যা প্রথমেই যে কোন ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে পারে। তাই নতুন ধরনের এ ফলটির বাজার ভালো পাওয়া যেতে পারে এবং বিদেশে রপ্তানিও করা যেতে পারে। শানতোলের শাঁস সিরাপে সংরক্ষণ করা যায়, জ্যাম বিদেশে রপ্তানিও করা যেতে পারে। এ হিসেবে শানতোল ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পও গড়ে উঠতে পারে।


আলুবোখরার গাছ ও ফল : আলুবোখরা পিচ ও চেরি ফলের নিকট আত্মীয়। আলুবোখরা আদি জন্মস্থান উত্তর আমেরিকা ও জাপান। বড় গাছ ঠাণ্ডা সইতে পারে। গ্রীষ্মকালে (জুন মাসে) ফল পাকে। আলু বোখরার গাছ বড় হতে একটু সময় নেয়। একটু বেশি বয়স না হলে গাছে ফল ধরে না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্ল­াজম সেন্টার ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে  (বারি) এর উপর গবেষণা চলছে। কিছু ব্যক্তিগত নার্সারিতে ও ব্যক্তি উদ্যোগে এ ফলের গাছ সংগ্রহ কারতে দেখা গেছে।
 

টক আতা : টক আতা দেখতে মোটেই আতা বা শরিফার মতো নয়। গায়েু গোটা গোটা দাগ নেই, আছে ফলের গা ভর্তি ক্ষুদে ক্ষুদে কাঁটা। ফল পাকলে অবশ্য কাঁটার অনেকটাই মিলিয়ে যায়। ফলটি সারা বিশ্বেই কম বেশি পরিচিত এর ক্রিমের মতো সাদা নরম রসাল সুস্বাদু শাঁসের জন্য। শাঁস সুগন্ধযুক্ত ও টক স্বাদের। শ^াসে প্রচুর ভিটামিন সমৃদ্ধ।


এ দেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় তথা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে টক আতার গাছ আছে। কেউ চাষে করে না, জঙ্গলে হয়। টক আতার আদি বাসভূমি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে  (বারি) এর উপর গবেষণা চলছে।
 

জাবটিকাবা : জাবটিকাবার আদি নিবাস ব্রাজিল। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে ১৯৫৬ সালে বর্তমান হর্টিকালচার সেন্টার কল্যাণপুর ছিল বিএডিসি ফার্ম। তৎকালে প্রায় ১০০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এ ফার্মের কোয়ার্টার সংলগ্ন এলাকায় পথের ধারে তিনটি জাবটিকার চারা রোপণ করেন তৎকালীন ফার্মের জনৈক উদ্যানতত্ত্ববিদ জনাব আঃ সামাদ। কোথা থেকে কিভাবে তিনি এ চারা সংগ্রহ করেছিলেন তা কেউ আর এখন বলতে পারেন না। এখন আর শুধু কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারেই নয়, জাবাটিকার গাছ ফল দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের জার্মপ্লাজম সেন্টারে,কল্যাণপুর হর্চিকালচার সেন্টারের ফলবাগানে ও দেশে আরও অনেক শৌখিন ফল প্রেমিকদের বাগানে।  


সরকারও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ফলকে জনপ্রিয় ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর জাতীয় পর্যায়ে ফল প্রদর্শনীর আয়োজন করছেন। দেশের প্রতিটি বাড়িতে এই বৃক্ষ রোপণ মৌসুমে অন্তত একটি ফলের চারা রোপণ করা উচিত বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। প্রয়োজন ও প্রাপ্তির ব্যবধানের কারণ একদিকে যেমন সচেতনতার অভাব অন্যদিকে রয়েছে উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা। তাই দেশের খাদ্যপুষ্টির চাহিদা পূরণসহ আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিদেশি ফলের প্রবর্তন, গবেষণা, উন্নয়ন, উৎপাদন ও ব্যবহার অনস্বীকার্য। সুতরাং স্বাদে, গন্ধে, পুষ্টিতে শ্রেয়তর বর্ণিল বিদেশি ফলগুলোর উৎপাদন দেশব্যাপী সারা বছর বাড়িয়ে তুলতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাপনা। এতে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিসরে গড়ে উঠবে আরো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হবে আরো মজবুত ও গতিশীল, দেশবাসী পাবে খাদ্যে পুষ্টিমানসম্পন্ন একটি ভবিষ্যৎ।

 

প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম১ ড. মোঃ শামছুল আলম (মিঠু)২

১উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ ও পরিচালক, জার্মপ্ল­াজম সেন্টার, বাকৃবি, ময়মনসিংহ। ২সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বিনা মোবাইল : ০১৭১১১২৪৭২২, mithuhort@yahoo.com

 

বিস্তারিত
পারিবারিক পর্যায়ে ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ

বিভিন্ন ধরনের ফল বিভিন্ন সময়ে পাওয়া যায়।  যেমন বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে অধিক পরিমাণে ফল পাওয়া যায়।  ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ফল সংরক্ষণ করতে পারলে সারা বছরই ফলের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে পুষ্টি চাহিদা মেটানো সম্ভব। ফল দ্রুত পচনশীল হওয়ায় বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশে ২০-৫০% নষ্ট হয়ে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে ১০০% ফল নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। তাই ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বলতে বুঝায় বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে ফল বিভিন্ন অপচয় ও নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে ফলের পুষ্টি গুণাগুণ বজায় রেখে তা সংরক্ষণের সময় বৃদ্ধি করা। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ফলের আকৃতি, প্রকৃতি, অবয়ব ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণে ফলের গুণগত কোনো পরিবর্তন ঘটে না, শুধু আকৃতি ও প্রকৃতিতে পরিবর্তন ঘটিয়ে ভৌত ও রাসায়নিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে ফল সংরক্ষণ করা হয়।
 

যে সকল কারণে ফল নষ্ট হয়ে যায়
মেটাবলিক পরিবর্তন, জলীয় অংশ কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়, তোলার সময় বা পরে আঘাতজনিত ক্ষত, সঠিক পদ্ধতি না মেনে ফল পরিবহন ও সংরক্ষণ করা, রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ (মোল্ড, ইস্ট, ব্যাকটেরিয়া)।
উল্লিখিত কারণগুলো রোধ করা হয় ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে।

 

ফলসংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্দেশ্য
১. ফলের অপচয় রোধ ও সংরক্ষণ সময় বৃদ্ধি করা।
২.  পুষ্টি ও গুণগত মান বজায় রাখা।
৩.  অর্থনৈতিক অপচয় রোধ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদনকে লাভজনক করা।
৫.  আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়।
৬. মূল্য সংযোজন করার মাধ্যমে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করা।
৮. কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার মাধ্যমে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করা।
১০. অমৌসুমে ফলের প্রাপ্তি ও গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে মূল্য সংযোজন করা।
১১. সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে ফলের মূল্য স্থিতিশীল রাখা।

 

ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি : স্বল্প ব্যয়ে ও পরিসরে পারিবারিক পর্যায়ে কিছু ফলের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতিতে ফলকে আমরা ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারি।
 

ক্যানিং বা টিনজাত করে সংরক্ষণ : আম, আনারস, লিচু প্রভৃতি ফলকে টিনজাত করে রাখা যায়। প্রথমে ফলকে স্টেরিলাইজড বা পাস্তুরীকরণ করে নেয়া হয় এবং ফুড প্রিজারভেটিভ যোগ করে  সুবিধামতো আকারের পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। পাত্রটিকেও স্টেরিলাইজড করে নিতে হবে এবং ফল রাখার পর বায়ুরোধী করে রাখতে হবে। টিনজাত করার পর ডিপ ফ্রিজেও রাখা যায়।


রস হিসেবে ফল সংরক্ষণ : যে কোন রসালো ফল থেকে রস তৈরি করা যায়। ফলের রস সংরক্ষণ করতে হলে টিনের কৌটায় ভরে দ্রুত পাস্তুরীকরণ করে অথবা ৭৫০-৮৫০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় কৌটা সিদ্ধ করে রাখতে হয়। কৌটা অবশ্যই বায়ুরোধী করে রাখতে হবে। অন্যথায় রস নষ্ট হয়ে যাবে। রসের সাথে খাদ্য সংরক্ষণকারী রাসায়নিক সংরক্ষক দ্রব্য যোগ করতে হবে। বাড়িতে রস তৈরি করে বোতলে রাখা যেতে পারে। কিন্তু তাতে সংরক্ষণের নিশ্চয়তা থাকে না। ফলের রসের সাথে চিনি বা সিরাপ মিশিয়ে স্কোয়াশ, ফ্রুট-সিরাপ ও কর্ডিয়াল তৈরি করা হয়। রসে যদি ফলের টুকরা না থাকে তখন তাকে কর্ডিয়াল বলা হয়। স্কোয়াশে কমপক্ষে ১০% ফলের রস থাকতে হবে। ভালো স্কোয়াশে ২৫% পর্যন্ত ফলের রস থাকে।


শুকিয়ে ফল সংরক্ষণ : এমন অনেক ফল আছে যেগুলোকে শুকিয়ে অনেক দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। জলবায়ু শুষ্ক থাকলে রোদেও শুকানো যায়। তাছাড়া ওভেন বা ডিহাইড্রেটর যন্ত্রের সাহায্যে খুব সহজেই শুকানো কাজ সম্পন্ন করা যায়। এ প্রক্রিয়াকে ডিহাইড্রেশন বলে। এ প্রক্রিয়ায় সব ফলকে শুকানো যায় না। কারণ কোন কোন ফলের বুনট, গঠন, বর্ণ ও খাদ্যাংশের এত পরিবর্তন ঘটে যে খাদ্য হিসেবে প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলের মধ্যে সাধারণত কুল, আঙ্গুর (কিসমিস), খুবানী (ধঢ়ৎরপড়ঃ), ডুমুর, নাসপাতি ও খেজুর শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। রোদে শুকাতে হলে এনজাইমের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেওয়ার জন্য শুকানোর পূর্বে ফলকে ফুটন্ত পানিতে কয়েক মিনিট সিদ্ধ করে নিতে হবে। অন্যথায় শুকানোর সময় ফল বিবর্ণ হয়ে যায়। মেশিনে শুকালে সিদ্ধ করতে হবে না। আমাদের দেশে প্রায় সারাবছরই বাতাসের আর্দ্রতা অনেক বেশি থাকে বিধায় ভালোভাবে ফল শুকানো যায় না। শুকানোর পর বায়ুরোধী পাত্রে বা পলিথিনের ব্যাগে ফল সংরক্ষণ করতে হবে।


চিনির দ্রবণে ফল সংরক্ষণ : চিনির দ্রবণে সংরক্ষণ করলে ফলের স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধি পায়। সাধারণত আনারস, লিচু, পিচ, আম, পেঁপে, কমলা, আঙ্গুর, নাসপাতি, মাল্টা প্রভৃতি এভাবে সরংক্ষণ করা যায়। একাধিক ফল একসাথে সংরক্ষণ করে ফ্রুট ককটেল তৈরি করা যায়। কোন কোন সময় চিনির দ্রবণে গ্লুকোজ যোগ করা হয়। ফল সংরক্ষণের জন্য সিরাপের ঘনত্ব কমপক্ষে ৬০% হতে হবে। সাধারণত প্রতি কেজি ফলের জন্য ০.২৫ কেজি চিনি দরকার হয়। তবে ফলের মিষ্টতা অনুযায়ী এর কম বেশিও হতে পারে। সংরক্ষণের জন্য প্রথমে পাকা ফল সুবিধামতো টুকরা ও পরিষ্কার করে নিয়ে পাতলা সিরাপের সাথে জ্বাল দিয়ে সিরাপের ঘনত্ব ৬৫-৭৫% করতে হবে। সিদ্ধ করার সময় ফলের টুকরা যেন গলে না যায় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ছোট আকারের ফল যথা লিচু, চেরি, কমলার কোয়া ইত্যাদি আস্ত ব্যবহার করতে হবে। ঠিকমতো সিদ্ধ করার পর ফল ও সিরাপ টিনে রেখে বায়ুরোধী ছিপি দ্বারা ভালোভাবে বন্ধ করে রাখতে হবে।


চিনির সিরার প্রলেপ দিয়ে ফল সংরক্ষণ : আম, আনারস এবং কাঁঠাল এর স্ল­াইস করে ৩০-৪০% চিনির দ্রবণের প্রলেপ দিয়ে প্রায় ১ বছর সংরক্ষণ করা যায়।
 

লবণের দ্রবণে সবুজ ফল সংরক্ষণ : এই পদ্ধতিতে কাঁচা আম, আমড়া ও জলপাই ৬-৮ মাস ভলো অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায় এবং পরে আচার ও চাটনি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। এই পদ্ধতিতে ফল সংরক্ষণ করতে প্রথমে পরিপুষ্ট কাঁচা ফল পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। তারপর  ফলের আকার অনুযায়ী  দুই বা চার টুকরায় কেটে নিতে হবে এবং ছোট হলে গোটা ফল নেওয়া যায়। ফলগুলো ৬০-৮০০ সে. তাপমাত্রায়  ২-৩ মিনিট ব্লাঞ্চিং করতে হবে এবং ফলগুলো ঠাণ্ডা পানিতে ১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। শতকরা ১০ ভাগ লবণের দ্রবণ তৈরি করে ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে ও ওজন করা অ্যাসিটিক এসিড এবং কেএমএস যোগ করতে হবে। প্লাস্টিক ড্রাম/কনটেইনার ভালোভাবে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে এবং পরে গরম (৮০-৯০০ সে. তাপমাত্রায় পানি) পানিতে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। তারপর ফল/ফলের টুকরো পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত ড্রাম এবং কনটেইনারে রেখে লবণের দ্রবণ যোগ করতে হবে। এবার পাত্রের  মুখে ঢাকনা লাগিয়ে দিয়ে সংযোগস্থলের উপর দিয়ে আঠাযুক্ত টেপ বা  মোম  গলিয়ে ভালোভাবে লাগিয়ে দিতে হবে যাতে পাত্রটি  সম্পূর্ণরূপে বাযুরোধী হয়। পাত্রগুলো পরিষ্কার জায়গায় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। ব্যবহারের পূর্বে দ্রবণে সংরক্ষিত ফল/ফলের টুকরাগুলো পানিতে ধুয়ে গরম পানিতে ডুবিয়ে ৩ মিনিট হালকাভাবে নাড়াচাড়া করতে হবে।


আচার তৈরির মাধ্যমে ফল সংরক্ষণ : আচার অত্যন্ত  সুস্বাদু ও মুখরোচক খাবার। সকল শ্রেণির মানুষের কাছেই আচার খুব লোভনীয় ও আকর্ষণীয় খাবার হিসেবে পরিচিত। যে ফল বা সবজি থেকে আচার তৈরি করা হয় তার উপর আচারের পুষ্টিমান নির্ভর করে। আচারে বিভিন্ন ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ থাকে, যা আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজন। আচার খাবারে স্বাদ  বৃদ্ধি করে। আচারে তেল বা স্নেহ জাতীয় পদার্থ থাকে, যা তাপ শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। যথাযথ নিয়মে তৈরি করলে ফলের প্রায় সব গুণই আচারে অক্ষুণ্ন থাকে।
 

মিশ্রফলের শুকনো পাল্প : কাঁঠাল, আনারস ও আমের পাল্প ২৫:২৮:৭৫ অনুপাতে মিশিয়ে পাতলা শিটের মতো করে কোন পাত্রে রেখে ভালো করে শুকিয়ে নিতে হবে এবং পলিথিনে মুড়িয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে যাতে ধুলাবালু না পড়ে সেজন্য সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।


জ্যাম ও জেলি তৈরির মাধ্যমে ফল সংরক্ষণ : ফলের পাল্প নিয়ে যখন সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয় তখন সেটি জ্যাম এবং ফলের থেকে পরিশ্রুত রস নিয়ে যখন প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয় তখন তাকে জেলি বলে।    
 

ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণ জনপ্রিয় কিছু ফল হতে জ্যাম ও জেলি তৈরির পদ্ধতি
 

পেয়ারার জেলি : ভিটামিন সি সমৃদ্ধ দেশি পেয়ারা জেলি তৈরির জন্য খুবই উপযোগী। পরিপুষ্ট কিন্তু বেশি পাকা নয় এমন পেয়ারাগুলো জেলির জন্য বাছাই করে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নেওয়া হয়। ফলগুলো টুকরো টুকরো করে কেটে সমপরিমাণ পানিতে সিদ্ধ করা হয়। তারপর পাতলা কাপড় দিয়ে ছেঁকে রস আলাদা করে নেওয়া হয়।


জেলি তৈরির জন্য ১ কেজি রসের সাথে ৬৫০ গ্রাম চিনি, ৭ গ্রাম সাইট্রিক এসিড এবং ০.৭৫ গ্রাম সোডিয়াম বেনজয়েট প্রয়োজন হয়। রসের সাথে চিনি মিশিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। মিশ্রণটি মোটামুটি গাঢ় হয়ে আসলে রিফ্রাক্টোমিটার যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং মিশ্রণটিকে ৬৫% টিএসএস পর্যন্ত রান্না করা হয়। রিফ্রাক্টোমিটারের অনুপস্থিতিতে শিটিং পরীক্ষার মাধ্যমে জেলি হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত অবস্থা নির্ণয় করা সম্ভব। মিশ্রণটি মোটামুটি গাঢ়ত্বে আসলে শিটিং পরীক্ষা করা হয়। টিএসএস ৬৪% হলে সাইট্রিক এসিড যোগ করা হয় এবং সামান্য জ্বাল দিয়ে পানিতে সোডিয়াম বেনজয়েট গলিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে দিয়ে চুলা থেকে নামিয়ে ফেলা হয়। জেলি জীবাণুুমুক্ত বোতলে ঢেলে ছিপি এঁটে দেওয়া হয়। ঠা-া হওয়ার পর জেলির উপরে মোম গলিয়ে দেওয়া হয়।


আমড়ার জেলি : দেশজ এই ফলটি প্রক্রিয়াজাত করে নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করা যায়। আমড়া দিয়ে খুবই উন্নতমানের জেলি প্রস্তুত করা সম্ভব। আমড়াগুলো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে কেটে টুকরো করে সামান্য পরিমাণ সিদ্ধ করা হয়। সিদ্ধ করার সময় কাঠের হাতল দিয়ে টুকরাগুলো নাড়াচাড়া করা হয়। পাতলা কাপড়ে ছেঁকে রস আলাদা করে নেওয়া হয়। জেলি তৈরির জন্য ১ কেজি রসের সাথে ৭০০ গ্রাম চিনি, ৬ গ্রাম সাইট্রিক এসিড, ০.৮ গ্রাম সোডিয়াম বেনজয়েট দরকার। রসের সাথে চিনি যোগ করে জ্বাল দেওয়া হয়। রান্নার মাঝামাঝি পর্যায়ে পেকটিন যোগ করা হয়। কাক্সিক্ষত গাঢ়ত্বে না আসা পর্যন্ত রান্না চালিয়ে যাওয়া হয়। আমড়ার জেলি তৈরির পরবর্তী ধাপগুলো পেয়ারার জেলি তৈরির অনুরূপ।


আনারসের জেলি : গ্রীষ্মকালে এ ফলের প্রাপ্র্যতা অনেক বেশি। আনারসের জেলি তৈরির জন্য আনারস কুচি একটি, চিনি দুই কাপ, ফুড কালার সামান্য, পানি আধা কাপ ও লেবুর রস এক চা চামচ প্রয়োজন। প্রথমে একটি ব্লেন্ডারে আনারস কুচির সঙ্গে আধা কাপ পানি মিশিয়ে ভালো করে ব্লে­ন্ড করতে হবে। এবার ঘন মিশ্রণটি একটি প্যানে নিয়ে ১০ মিনিট নাড়তে হবে।
এখন এতে চিনি দিয়ে আরো ২০ থেকে ৩০ মিনিট নাড়তে হবে। এবার এতে ফুড কালার (হলুদ) ও লেবুর রস দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। ঘন হয়ে এলে একটি বোতলে ভরে ঠা-া করে ফ্রিজে রেখে দিলে তৈরি হবে আনারসের জ্যাম।


আনারস জ্যাম : আনারসের পাল্প ৩ কাপ, অ্যাগার অ্যাগার দেড় চা-চামচ, সাইট্রিক অ্যাসিড আধা চা-চামচ, আদাবাটা ১ চা-চামচ, চিনি সাড়ে তিন কাপ, সোডিয়াম বেনজয়েট সিকি চা-চামচ, আনারস এসেন্স ১ চা-চামচ, লবণ আধা চা-চামচ।


আনারস দুই ভাগ করে কাঁটা চামচ দিয়ে কেচে নিতে হয় অথবা ব্লে­ন্ড করে নিতে হবে। এবার চিনিসহ চুলায় সেদ্ধ করতে হবে।  এরপর এর সঙ্গে আদা ও লবণ দিয়ে মিশ্রিত করতে হবে। অ্যাগার অ্যাগার গরম পানি দিয়ে ১০ মিনিট ভিজিয়ে আনারসের মিশ্রণে ঢেলে দিতে হবে। আনারস যখন ঘন থকথকে হয়ে আসবে, তখন চুলা থেকে নামিয়ে সোডিয়াম বেনজোয়েট, সাইট্রিক অ্যাসিড ও পাইনঅ্যাপল এসেন্স দিয়ে মিশিয়ে দিতে হবে। এবার নামিয়ে বয়ামে ঢেলে সংরক্ষণ করতে হবে।


মিশ্রফলের জ্যাম : দেশীয় বিভিন্ন ফলের সংমিশ্রণে উন্নতমানের জ্যাম তৈরি করা যায়। পেয়ারা ও আমড়া ধুয়ে কেটে টুকরো করে সমপরিমাণ পানিতে আধ ঘণ্টা ফুটানো হয়। পরে তা ঠা-া করে নিয়ে মশারির কাপড়ে ছেঁকে পাল্প বা ম- আলাদা করে নেওয়া হয়। পাকা পেঁপের খোসা ছাড়িয়ে পেঁপের ওজনের অর্ধেক পরিমাণ পানি মিশিয়ে ও জ্বাল দিয়ে পাল্প তৈরি করা হয়। মিশ্র ফলের জ্যাম প্রস্তুত করতে উপকরণের অনুপাত হবে;  পেয়ারার পাল্প ১ কেজি, আমড়ার পাল্প ১ কেজি, পেঁপের পাল্প ১ কেজি, চিনি ২.৫ কেজি, সাইট্রিক এসিড ২৫ গ্রাম এবং সোডিয়াম বেনজয়েট ৩ গ্রাম।


ফলের পাল্পসমূহ একত্রে মিশিয়ে তার সাথে চিনি যোগ করে জ্বাল দেওয়া হয়। কাক্সিক্ষত গাঢ়ত্বে না আসা পর্যন্ত রান্না চালিয়ে যেতে হয়। মিশ্রণটি মোটামুটি গাঢ়ত্বে এলে শিটিং পরীক্ষা করা হয় এবং তালের জ্যাম তৈরির পদ্ধতির ন্যায় পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করে এই জ্যাম প্রস্তুত করা হয়।


তালের জ্যাম : তাল থেকে উৎকৃষ্ট মানের জ্যাম তৈরি করা যায়। পাকা তাল থেকে আঁটি আলাদা করে নিয়ে আঁটির ওজনের এক-তৃতীয়াংশ পানি যোগ করে চটকিয়ে মণ্ড তৈরি করা হয়। তালের জ্যাম তৈরির জন্য ১ কেজি মণ্ডের সাথে ১ কেজি চিনি, ১১.৫ গ্রাম পেকটিন, ১২.৫ গ্রাম সাইট্রিক এসিড এবং ১ গ্রাম সোডিয়াম বেনজয়েট প্রয়োজন হয়।


মণ্ডের সাথে চিনি যোগ করে জ্বাল দেওয়া হয়। রান্নার মাঝামাঝি পর্যায়ে পেকটিন যোগ করা হয় এবং কাক্সিক্ষত গাঢ়ত্বে না আসা পর্যন্ত রান্না চালিয়ে যেতে হয়। মিশ্রণটি মোটামুটি কাক্সিক্ষত গাঢ়ত্বে এলে শিটিং পরীক্ষা করা হয়। শিটিং পরীক্ষার পদ্ধতি হলো-মিশ্রণের মধ্যে চামচ ডুবানো এবং ঠাণ্ডা করে চামচ বেয়ে মিশ্রণটিকে পড়তে দেওয়া। যদি এটা একাধারে না পড়ে শিটের আকারে পড়তে থাকে তাহলে বুঝতে হবে জ্যাম তৈরি হয়ে গেছে। শিটিং পরীক্ষায় জ্যাম প্রস্তুত হওয়ার কাছাকাছি বুঝা গেলে সাইট্রিক এসিড পাউডার ক্ষীণধারে মিশ্রণের সাথে যোগ করে সামান্য একটু জ্বাল দেওয়া হয়। তারপর অল্প পরিমাণ পানিতে সোডিয়াম বেনজয়েট যোগ করে চুলা থেকে নামানো হয়। জ্যাম জীবাণুমুক্ত বোতলে ঢেলে ছিপি এঁটে দেওয়া হয়। ঠাণ্ডা হওয়ার পর বোতলের ওপরে মোম গলিয়ে দেওয়া হয়।
ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আমরা এর অপচয় রোধ করে অধিক মানুষের পুষ্টি সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারি এবং সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারি।

 

চন্ডী দাস কু-১  শাহ্ মোহাঃ আকরামুল হক২
মো. আহসানুল হক চৌধুরী৩

১পরিচালক, ২অতিরিক্ত পরিচালক, ৩অতিরিক্ত উপপরিচালক হর্টিকালচার উইং, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৬৪৮৯৯১৯, ই-মেইল : dhw@dae.gov.bd

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook