কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

নির্বিঘ্নে বোরো আবাদে সতর্কতা ও করণীয়

বোরো ধান বাংলাদেশের মোট উৎপাদনে গুরুত্বপূর্র্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বোরো ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৫ থেকে ২.০ টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। গত বছর ১৯.১৫ মিলিয়ন টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৮.০১ মিলিয়ন টন। আগামী বোরো উৎপাদন নির্বিঘ্ন করার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বোরো আবাদে সঠিক জাত নির্বাচন সমস্যা, কৃষিতাত্ত্বিক ও সার ব্যবস্থাপনা সমস্যা, রোগ-বালাই ও সেচজনিত প্রতিবন্ধকতাগুলো এবং সম্ভাব্য প্রতিকার ব্যবস্থা তুলে ধরা হলো-

 

জাত নির্বাচনে সতর্কতা ও করণীয়
বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমি ৩০টি বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে বিভক্ত। ধান এমন একটা ফসল যা দেশের প্রায় সব পরিবেশ অঞ্চলে চাষাবাদ করা গেলেও কৃষি পরিবেশ অঞ্চল ভেদে এর অভিযোজনশীলতায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষক অনেক সময় এলাকা ভিত্তিতে সঠিক জাত নির্ধারণ করতে পারেন না। যেমন- কোনো কৃষকের জমিতে ১৫০ দিনের কম জীবনকাল সম্পন্ন জাত (যেমন-ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৪৭) ভালো হবে কিন্তু না জানার কারণে সেখানে কৃষক ১৫০ দিনের বেশি জীবনকাল সম্পন্ন জাত নির্বাচন করেন; যেমন- বিআর১৪, ব্রি ধান২৯। তাছাড়া কৃষক অনেক সময় গুণগত মানসম্পন্ন বীজের অভাবে সুস্থ সবল চারা উৎপাদন করতে পরে না। তালিকা অনুযায়ী কৃষি ইকোসিস্টেম ও ভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে সঠিক জাত নির্বাচন করতে হবে।


অঞ্চল উপযোগী জাতগুলোর সীমাবদ্ধতা    
মার্চ-এপ্রিলে অতিবৃষ্টি। পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যা। স্বল্পমেয়াদি, ঠাণ্ডা সহনশীল উচ্চফলনশীল জাতের অভাব। হাওর (বৃহত্তর সিলেট, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ) এ অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উঁচু জমির জন্য ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০ এবং ব্রি ধান৫৮ । মাঝারি নিম্ন জমিতে ব্রি ধান২৮, ব্রি হাইব্রিড ধান ৩ ও ৫ আর নিম্ন জমিতে ব্রি ধান২৮ বৃহত্তর রাজশাহী চলনবিল ও
অন্যান্য  অঞ্চল : বিআর১৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫
বরেন্দ্র অঞ্চল : বিআর২৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৬৩, হাইব্রিড ধান৩ ও ৫। ব্রাউশ হিসেবে : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৮ ও ব্রি ধান৫৮ ঠাণ্ডায় ধানের চারা উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ধান লাগানোর পরে পুনরায় রোপণ করতে হয়। মার্চ-এপ্রিলে অতিবৃষ্টির ফলে চলনবিলের নিম্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়ে দীর্ঘ জীবনকালের বোরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
 

বৃহত্তর রংপুর অপেক্ষাকৃত নিম্ন অঞ্চল : বিআর১৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৩, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫।
 

অপেক্ষাকৃত উঁচু ও বেলে দো-আঁশ অঞ্চলে ব্রাউশ হিসেবে : বিআর২৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৫৮ ও ব্রি ধান৬২।
 

ঠাণ্ডা সহনশীল জাত : ব্রি ধান৩৬, ব্রি ধান৫৫ ও ব্রি ধান৬৯। শীতে চারা মারা যায়; ধানের প্রজনন পর্যায়ে ঠাণ্ডার কারণে চিটা হয়ে যায়; ব্রাউশ ধান জুন মাসের উচ্চ তাপমাত্রার কারণে চিটা হয়; মাটির বুনট বেলে দো-আঁশ হওয়ায় সেচ সংখ্যা অনেক বেশি লাগে। ধানের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়।    
 

বৃহত্তর কুষ্টিয়া জাতগুলো : বিআর২৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৩ ও  ব্রি হাইব্রিড ধান৫।


বৃহত্তর যশোর জলাবদ্ধ অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৩ ও  ব্রি হাইব্রিড ধান৫।


অন্যান্য অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৩ ও  ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ জলাবদ্ধতা ও বাদামি গাছ ফড়িং পোকার আক্রমণ ও ব্লাস্ট রোগ সহনশীল স্বল্প জীবনকালের জাত দরকার। Nutrient use efficient জাতের অভাব।

   
বৃহত্তর খুলনা অলবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৩ ও  ব্রি হাইব্রিড ধান৫। মৃদু লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬৭ ও বিনা ধান১০। মাঝারি 
মাত্রায় লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান৬৭ ও বিনা ধান১০। পিট বেসিনের আওতায় নিম্ন অঞ্চল : ব্রি ধান২৮,  ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫। সঠিক জাত, কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা ও ১৫ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলায় চারা উৎপাদন ও ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে রোপণ সম্পন্ন করতে পারলে ফাল্গুন-চৈত্র মাসের সর্বোচ্চ লবণাক্ততা এড়িয়ে ভালো ফলন পাওয়া যায়।    
 

বৃহত্তর বরিশাল ও পটুয়াখালী অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা কবলিত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৭৪, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫। মৃদু লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৬৭, বিনা ধান১০। মাঝারি মাত্রায় লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান৪৭,  ব্রি ধান৬৭, বিনা ধান৮ ও বিনা ধান১০ অলবণাক্ত অঞ্চলে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে ধানের পরিপক্ব পর্যায়ে উচ্চ জোয়ারের কারণে বোরো ধান নষ্ট হয়। উঁচু এলাকায় ১৫ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলায় চারা উৎপাদন করে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে রোপণ সম্পন্ন করতে হবে।  

   
বৃহত্তর ঢাকা ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৭৪,  ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ শিল্প বর্জ্য বোরো উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করেছে। সেচের পানিতে ক্ষতিকর ভারী ধাতু মিশ্রিত।    

 

বৃহত্তর ফরিদপুর জোয়ার-ভাটাকবলিত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৫৮, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫। উঁচু অঞ্চল : বিআর২৬, ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান৬৩। পিট বেসিনের আওতায় নিম্ন অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫  উচ্চমাত্রায় ফসফরাস গ্রহণক্ষম জাতের অভাব (পিট বেসিন)।


চিকন ও উচ্চ মাত্রার অ্যমাইলোজ সম্পন্ন হাইব্রিড ধানের জাতের অপ্রতুলতা।    
 

বৃহত্তর চট্টগ্রাম পাহাড়ি ভ্যালি অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬০,ব্রি ধান৬৯, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫।
অলবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৯, ব্রি ধান৭৪, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫।

 

লবণাক্ত অঞ্চল : ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬৭, বিনা ধান-৮ বিনা ধান-১০ পাহাড়ি উপজাতিয় জনগোষ্ঠীর উপযোগী ধানের জাতের অভাব। লবণাক্ত অঞ্চলে ব্রি ধান৬৭ এবং বিনা ধান১০ এর বীজের অপ্রতুলতা।    
 

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অপেক্ষাকৃত নিঞ্চল অঞ্চল (হাওর) : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫। অপেক্ষাকৃত মধ্য উঁচু অঞ্চল : বিআর২৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৭৪, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ মার্চ-এপ্রিলে অতিবৃষ্টি। পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যা।    


কুমিল্লা বিআর১৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৫৮, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ জলাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় বোরো চাষে দেরি হয়। ফলে বোরো ধান কাটার সময় হঠাৎ বৃষ্টি হলে পাকা বোরো ধান অনেক ক্ষেত্রে তলিয়ে যায়।


বৃহত্তর সিলেট হাওর অঞ্চলের বাহিরে (মধ্য উঁচু জমিতে) : বিআর১৪, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৫৮, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ মার্চ-এপ্রিলে অতিবৃষ্টি। পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যা।   

কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা
চারা তৈরি : অনেক সময় কৃষক অনুর্বর জমিতে এবং গাছের ছায়ায় বীজতলা করেন ফলে চারার গুণগত মান খারাপ হয়। পরবর্তীতে সে চারা হতে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায় না। আদর্শ বীজতলা হতে সুস্থ্য সবল চারা হবে, কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যাবে, বীজের সঠিক হার বজায় থাকে এবং বীজ সাশ্রয় হয়।

 

বেশি বয়সী চারার ব্যবহার : কৃষক নানা কারণে বেশি বয়সের চারা মাঠে রোপণ করে। বেশি বয়সের চারা হতে বেশি কুশি হয় না পরবর্তীতে ফলন কমে যায়। বোরো মৌসুমে অবশ্যই ৩৫-৪৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। সঠিক বয়সের চারা রোপণ করলে সর্বোচ্চ কুশির সংখ্যা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া সম্ভব। সাধারণত ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণের উপযুক্ত সময়।


সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ : অনেক এলাকার কৃষক সুষম সার ডিএপি/টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক ব্যবহার করে না। কোনো কোনো এলাকা টিএসপি, এমওপি ব্যবহার করে। কিন্তু জিপসাম এবং জিংক সার ব্যবহার করে না। গাছের বাড়-বাড়তির এবং পর্যাপ্ত কুশি উৎপাদনের জন্য সুষম সার প্রয়োগ করা খুবই জরুরি। কৃষকের জমির উর্বরতা বিবেচনা করে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে।
 

নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে সতর্কতা : কৃষক চারা লাগানোর ৭-১০ দিনের ভেতর একবার এবং ফুল আসার আগে আরেকবার উপরিপ্রয়োগ করেন। কিন্তু কুশি আসা ও কুশি উৎপাদনের সময় সার প্রয়োগ করে না। ফলে কুশির সংখ্যা কমে গিয়ে ফলন কমে যায়। আবার অনেক সময় পিআই আসার ৫-১০ দিন আগে যে ইউরিয়া সার দিতে হয় তা সঠিক সময় প্রয়োগ করে না। এ সময়ে সার দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো ইউরিয়া সার দিতে না পারলে ধানের ছড়ায় দানার সংখ্যা কমে যায় ফলে ফলন কম হয়। ক্রান্তিকাল (Critical Period) সময়ে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
 

সঠিক সময়ে আগাছা দমন : আগাছা সঠিক সময়ে দমন না করলে বোরো মৌসুমে প্রায় ৩০-৪০ ভাগ পর্যন্ত ফলন কমে যায়। বোরো মোৗসুমে চারা লাগানোর পর দুইবার/তিনবার আগাছা পরিষ্কার করতে হয় বা সঠিক আগাছানাশক প্রয়োগ করে আগাছা দমন করা যায়। বোরো মৌসুমে আগাছা দমনের ক্রান্তিকাল (Critical time) হলো ৪৫-৫০ দিন। সে সময় পর্যন্ত আগাছামুক্ত রাখতে পারলে ফসলের ক্ষতি হবে না। বোরো মৌসুমে চারা লাগানোর অন্তত ৪৫ দিন পর্যন্ত আগাছামুক্ত রাখতে হবে।


জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো : জমিতে জৈব সার তথা ধইঞ্চা বা গোবর সার বা খামারজাত সার ব্যবহার করলে অন্যান্য অজৈব সার যেমন- ইউরিয়া, ডিএপি/টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সারের কার্যকারিতা বাড়ে। জমির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ে। জমির ভৌতিক, জৈবিক ও রাসায়নিক পরিবর্তন এর ফলে পরবর্তীতে ফলন বাড়ে। রোপা আমন কাটার পর যে ১৫-৩০ দিন জমি পতিত থাকে তখন ধৈইঞ্চা বা অন্যান্য জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া ২০ সেমি. ধানের খড় কাটার সময় জমিতে রেখে দিলে ক্রমান্বয়ে জমিতে জৈব সার ও পটাশের পরিমাণ বড়ে।
 

রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও করণীয়
বোরো মৌসুমে পোকামাকড়ের আক্রমণে ধানের ফলন ১৩% পর্যন্ত কমতে পারে। এর মধ্যে থ্রিপস, বাদামি গাছফড়িং, সাদা-পিঠ গাছ ফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকা, মাজরা পোকা, গান্ধীপোকা, শীষকাটা লেদাপোকা ও ইঁদুর অন্যতম। সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে এসব পোকার আক্রমণে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

থ্রিপস
থ্রিপস পোকা বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক উভয় অবস্থায় ধানের পাতার রস শুষে খায়; ধানের বীজতলা এবং প্রাথমিক কুশি অবস্থায় গাছ বেশি আক্রান্ত হয়; সব মৌসুমে এ পোকার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়; আক্রান্ত গাছের পাতাগুলো লম্বালম্বিভাবে মুড়িয়ে সুঁচের মতো আকার ধারণ করে; খুব বেশি আক্রান্ত পাতা শুকিয়ে মারা যায়। আক্রান্ত জমিতে ইউরিয়া ব্যবহার করতে হয়; আক্রমণ বেশি হলে ফাইফানন ৫৭ ইসি, মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি, সেভিন ৮৫ ডব্লিউপি অথবা ডার্সবান  ২০ ইসি এর যে কোনো একটি অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করুন।

 

বাদামি গাছ ফড়িং
বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক বাদামি গাছফড়িং উভয়ই ধান গাছের গোড়ায় বসে রস শুষে খায়; এক সাথে অনেক পোকা রস শুষে খাওয়ার ফলে গাছ প্রথমে হলদে ও পরে শুকিয়ে মারা যায় এবং দূর থেকে পুড়ে যাওয়ার মত দেখায়; বাদামি  গাছফড়িংয়ের এ ধরনের ক্ষতিকে ‘হপার বার্ন’ বা ‘ফড়িং পোড়া’ বলে; ধানের শীষ আসার সময় বা তার আগে ‘হপার বার্ন’ হলে কোনো ফলনই পাওয়া যায় না। আলোক ফাঁদ ব্যবহার; জমিতে পোকা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা; উর্বর জমিতে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ না করা; পোকার আক্রমণ অর্থনৈতিক ক্ষতির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছলে (চারটি ডিমওয়ালা পেট মোটা পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকা বা ১০ টি বাচ্চা গাছ ফড়িং বা উভয়ই) প্লিনাম ৫০ডব্লিউজি, একতারা ২৫ডব্লিউজি, মিপসিন ৭৫ডব্লি­উপি, এডমায়ার ২০এসএল, সানমেক্টিন ১.৮ইসি, এসাটাফ ৭৫এসপি, প্ল­াটিনাম ২০এসপি অথবা মার্শাল ২০ইসি কীটনাশকের বোতলে বা প্যাকেটে উল্লিখিত অনুমোদিত সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করার মাধ্যমে এ পোকা দমন করতে হবে।

 

পাতা মোড়ানো পোকা
এ পোকার ক্ষতিগ্রস্ত পাতায় প্রথমদিকে সাদা লম্বা খাওয়ার দাগ দেখা যায়। খুব বেশি ক্ষতি করলে পাতাগুলো পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়। আলোক ফাঁদ ব্যবহার; জমিতে পার্চিং; ইউরিয়া সারের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিহার; জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেভিন ৮৫এসপি, ডার্সবান ২০ইসি অথবা মিপসিন ৭৫ডব্লি­উপি এর যে কোনো একটি অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করা প্রয়োজন।  

 

মাজরা পোকা
মাজরা পোকা শুধু কীড়া অবস্থায় গাছের ক্ষতি করতে পারে; কীড়াগুলো গাছের মাঝখানের ডিগ কেটে ফেলে; ফলে ডিগ মারা যায়। গাছে শীষ বা ছড়া আসার আগে এরকম ক্ষতি হলে একে ‘মরা ডিগ’ বলে। ‘মরা ডিগ’ হলে সে গাছে আর ধানের শীষ বের হয় না; আর গাছে থোর হওয়ার পর বা শীষ আসার সময় যদি কীড়াগুলো ডিগ কেটে দেয় তাহলে শীষ মারা যায় একে মরা শীষ’ বলে। এর ফলে শীষের ধানগুলো চিটা হয়ে যায় এবং শীষ সাদা হয়ে যায়। মাজরা পোকার ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলুন; ক্ষেতে ডাল-পালা পুঁতে দিয়ে পোকা খেকো পাখির সাহায্যে পোকার সংখ্যা কমানো যায়; সন্ধ্যার সময় আলোক ফাঁদের সাহায্যে মথ আকৃষ্ট করে মেরে ফেলুন; ধান কাটার পর নাড়া পুড়িয়ে ফেলুন; ক্ষেতে মরা ডিগ শতকরা ১০-১৫ ভাগ অথবা মরা শীষ শতকরা ৫ ভাগ পাওয়া গেলে ভির্তাকো ৪০ডব্লি­উজি, ডার্সবান  ২০ইসি, মার্শাল ২০ইসি, সানটাপ ৫০এসপি, অথবা বেল্ট ২৪ডব্লিউজি এর যে কোনো একটি অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করুন।

 

নেক ব্লাস্ট
নেক ব্লাস্ট ধানের একটি মারাত্মক ছত্রাকজনিত রোগ। ধানের ফুল আসার পর শীষের গোড়ায় এ রোগ দেখা দেয়। বোরো মৌসুমে সাধারণত ব্যাপকভাবে নেক ব্লাস্ট রোগ হয়ে থাকে; আক্রান্ত শিষের গোড়া পচে যায় এবং ভেঙে পড়ে দিনের বেলায় গরম ও রাতে ঠা-া, দীর্ঘ শিশিরে ভেজা সকাল, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, ঝড়ো আবহাওয়া এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি এ রোগের জন্য খুবই অনুকূল। কৃষক যখন জমিতে নেক ব্লাস্ট রোগের উপস্থিতি শনাক্ত করেন, তখন জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যায়। সেজন্য কৃষক ভাইদের আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। যেসব জমির ধান নেক ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়নি, অথচ ওই এলাকায় রোগের অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করছে, সেখানে ধানের শীষ বের হওয়ার সাথে সাথেই অথবা ফুল আসা পর্যায়ে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন ট্রুপার (৫৪ গ্রাম/বিঘা) অথবা নেটিভো (৩৩ গ্রাম/বিঘা) অথবা ট্রাইসাক্লাজল গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ৬৬ লিটার পানিতে মিশিয়ে শেষ বিকালে ৫-৭ দিন অন্তর দুইবার আগাম স্প্রে করতে হবে; ব্লাস্ট রোগের প্রাথমিক অবস্থায় জমিতে পানি ধরে রাখতে পারলে এ রোগের ব্যাপকতা অনেকাংশে হ্রাস পায়।

 

পাতাপোড়া
ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া বোরো মৌসুমে ধানের অন্যতম একটি প্রধান রোগ। রোগের শুরুতে পাতার অগ্রভাগ বা কিনারায় পানি চোষা শুকনা দাগ দেখা যায়। দাগগুলো আস্তে আস্তে হালকা হলুদ রঙ ধারণ করে পাতার অগ্রভাগ থেকে নিচের দিকে বাড়তে থাকে। শেষের দিকে আংশিক বা সম্পূর্ণ  পাতা ঝলসে যায় এবং ধূসর বা শুকনো খড়ের মতো রঙ ধারণ করে। বেশি পরিমাণ ইউরিয়া সারের ব্যবহার, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা রোগের জন্য অনুকূল। ঝড় ও বৃষ্টির পরে মাঠে রোগটির বিস্তার দ্রুত হয়। ঝড়-বৃষ্টি এবং রোগ দেখার পরপরই ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে; রোগের প্রাথমিক অবস্থায় ৬০ গ্রাম এমওপি, ৬০ গ্রাম থিওভিট ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে প্রয়োগ করতে হবে; থোড় বের হওয়ার আগে রোগ দেখা দিলে বিঘাপ্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে; পর্যায়ক্রমে ভেজা ও শুকনা পদ্ধতিতে (AWD) সেচ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে।

 

বাকানি
ধানের বাকানি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব বেশি। বিশেষত সিলেট, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ অঞ্চলে এটি একটি বড় সমস্যা। ধানের বাকানি রোগের লক্ষণ বীজতলা ও ধানের জমিতে কুশি অবস্থায় পরিলক্ষিত হয়। আক্রান্ত চারা বা গাছ লম্বা হয়ে যায় এবং কখনও কখনও সুস্থ গাছের চেয়ে দ্বিগুণ লম্বা হয়ে যায়। এ গাছগুলো লিকলিকে হয় এবং ফ্যাকাশে সবুজ রঙ ধারণ করে। বাকানি রোগটি মাটি ও বীজের মাধ্যমে ছড়ায়। ফলে চারা গাছে বাকানির লক্ষণ দেখা দেয়। তাপমাত্রা বেশি হলে এ রোগের আক্রমণ বেড়ে যায়। মাটিতে অধিক মাত্রায় ইউরিয়া সারের প্রয়োগ বাকানি রোগের দ্রুত বিস্তার ঘটতে পারে। রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করা; বীজতলা সবসময় পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা; একই জমি বার বার বীজতলা হিসাবে ব্যবহার না করা; অটিস্টিন ৫০ডব্লিউপি বা নোইন দ্বারা চারা শোধন করা (১ লিটার পানিতে ৩ গ্রাম অটিস্টিন ৫০ডব্লিউপি বা নোইন মিশিয়ে তাতে ধানের চারা ১০-১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা); আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলা।

 

চারাপোড়া বা ঝলসানো
চারাপোড়া বা ঝলসানো ছত্রাকজনিত রোগ। রোগটির ফলে বোরো মৌসুমে বীজতলায় শতকরা ২৫-৩০ ভাগ এবং ট্রেতে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ ধানের চারা নষ্ট হয়। বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার আগেই আক্রান্ত বীজ পচে যেতে পারে; অঙ্কুরিত হবার পর আক্রান্ত চারা আস্তে আস্তে শুকিয়ে মরে যেতে পারে যা পরবর্তীতে পুড়ে যাওয়ার মতো মনে হয়; শিকড় ও চারার গোড়ার দিকটা কালচে রঙের হয় এবং অনেক সময় সাদা ছত্রাক কাণ্ড, চারার গোড়াতে দেখা যায়। রোগাক্রান্ত চারা দূর থেকে হলদেটে দেখায়; এ রোগ সাধারণত উঁচু জমিতে ও শুকনা বা কম ভেজা মাটিতে বেশি হয়; মাটি, আক্রান্ত নাড়া, আগাছা ও পচা আবর্জনা এ রোগ বিস্তারের জন্য দায়ী। প্রতি লিটার পানিতে ২-৩ মিলি এজোক্সিস্ট্রবিন অথবা পাইরাক্লোস্ট্রবিন মিশিয়ে ১৮-২০ ঘণ্টা বীজ শোধন করা; বেশি শীতের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন না করা; শৈত্যপ্রবাহ চলাকালীন এবং রাতে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা; রোগ দেখা দিলে জমি বা বীজতলায় পানি ধরে রাখা; এজোক্সিস্ট্রবিন অথবা পাইরাক্লোস্ট্রবিন২ মিলি/ লিটার পানিতে মিশিয়ে বীজতলা/ট্রেতে স্প্রে করা।

 

সেচজনিত প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকার
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাবনা, বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সেচ কাজে বিঘ্নতা ঘটছে। হাওড় এলাকার এপ্রিল-মে মাসে কিছু স্থানে ভূপরিস্থ (ছোট নদী, খাড়ি, নালা ইত্যাদি) পানির অভাবে বোরো ফসলের শেষ পর্যায়ে সেচ প্রদানে সম্ভব না হওয়ায় প্রায়শই ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। উপকুলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির জন্য এবং উপকূলীয় অলবণাক্ত এলাকায় সেচ অবকাঠামোর অভাবে বোরো চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। বরেন্দ্র এলাকায় সেচসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির সুষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং পানি সাশ্রয়ী শস্যবিন্যাস প্রচলন। স্বল্প ডিসচার্জের গভীর নলকূপের ব্যবহার করা যেতে পারে। হাওর এলাকায় বিদ্যমান ছোট নদী, খাড়ি, নালাগুলো পুনর্খনন করে ভূপরিস্থ পানির মজুদ বৃদ্ধিকরণ। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা দিয়ে সম্পূরক সেচ প্রদান করে বোরো উৎপাদন সুনিশ্চিত করা। উপকূলীয় এলাকায় সরকারি পর্যায়ে সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন।

 

*ড. মো. শাহজাহান কবীর ** ড. মো. আনছার আলী
*** কৃষিবিদ এম আবদুল মোমিন

*মহাপরিচালক, **পরিচালক (প্রশাসন ও সাধারণ পরিচর্যা), *** ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি গাজীপুর

বিস্তারিত
নির্বিঘ্নে বোরো উৎপাদনে পার্চিং, আলোর ফাঁদ এবং অন্যান্য কৌশল...

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি কৃষির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষির উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। আর সে উন্নয়ন অভিযাত্রায় বালাইয়ের আক্রমণ ও ক্ষতি মুক্ত কৃষিই আমাদের কাঙ্খিত। রোগ পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক দমন পদ্ধতি ব্যবহারের চেয়ে জৈবিক দমন পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব এবং গ্রহণযোগ্য। অনেক জৈবিক দমন পদ্ধতির মধ্যে পার্চিং ও আলোর ফাঁদ আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। বিষয় দুইটির গুরুত্ব অনুধাবন করে কৃষি মন্ত্রণালয় তার সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সারা দেশে পরিবেশবান্ধব এ দুইটি পদ্ধতির সম্প্রসারণকল্পে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। ধান উৎপাদনে পার্চিং এবং আলোর ফাঁদ বেশ কার্যকর এবং লাভজনক। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে এ দুইটি কৌশল সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে নির্বিঘ্নে বোরো উৎপাদনে সুবিধা পাওয়া যায়।


পার্চিং (Perching)
পার্চিং একটি ইংরেজি শব্দ, মানে ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে দেয়া। ফসলের জমিতে ডাল, কঞ্চি, বাঁশের খুঁটি এগুলো পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করলে পাখি ক্ষতিকারক পোকার মথ, বাচ্চা, ডিম খেয়ে পোকা দমন করে। পোকা দমনের এ পদ্ধতিকে পার্চিং বলা হয়। ফসলের পোকা দমনের এ পদ্ধতি অত্যন্ত কম ব্যয়বহুল বলতে গেলে ব্যয়বিহীন এবং পরিবেশবান্ধব। পার্চিং দুই প্রকরের। ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। মরা ডালপালা পুঁতে দিলে তা হবে ডেড পার্চিং এবং ধইঞ্চা, অড়হর এসব জীবন্ত জমিতে পুঁতে দিলে তা হবে লাইভ পার্চিং।


ডেড পার্চিং (Dead Perching)
খুঁটির গোড়ালিতে বা নিচের অংশে গিড়া রেখে ৬-৬.৫ ইঞ্চি লম্বা করে বাঁশের খ- কাটতে হবে। খণ্ডের নিচের দিকে গিড়া থাকলে কেউ সহজে খুঁটি তুলতে পারবে না। খুঁটির নিচের অংশে ২-২.৫ ইঞ্চি লম্বা বাঁশের ফালি তারকাটা দিয়ে আড়াআড়িভাবে আটকিয়ে দিতে হবে। খুঁটির নিচের অংশে সুচালো বা চোকা করা যাবে না। সুচালো করলে অন্য কেউ সহজে তুলে নিয়ে যাবে। প্রতিটি বাঁশ খ- থেকে ১২-১৮টি ফালি বা খুঁটি হবে। খুঁটি বেশি মোটা করলে চুরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই যথাসম্ভব বাঁশের বাতার খুঁটি পাতলা করতে হবে। খুঁটি বা ফালির আগায় প্রায় ১০-১২ ইঞ্চি সেকশন করে চারটি ফালি তুলতে  হবে। ১০-১২ অংশের সেকশন সুতলির সাহায্যে নিচের দিকে এমনভাবে হেলে আনতে হবে যেন পাখি আরামে বসার উপযোগী হয়। একটি সুচালো ও শক্ত বাঁশের ফলা দিয়ে অথবা শাবলের সহায়তায় ৮-১০ ইঞ্চি গভীর করে গোড়ার আলসহ পার্চিং নরম মাটিতে পুঁতে দিতে হবে। মাটি একটু শক্ত হলে বা জমে গেলে সে পার্চিং অন্য কেহ সহজে তুলে নিতে পারবে না। এতে করে পার্চিং চুরি বন্ধ হবে।


পার্চিং টিকে চুনের দ্রবণে চুবালে অনেকটা ধবধবে সাদা দেখাবে এবং ক্ষেতের অনেক দূর থেকে দৃষ্টিগোচরে আসবে। চুনের পরিবর্তে সাদা পেইন্ট দিয়েও পার্চিংয়ের ওপরের অংশকে রঙ করা যাবে। আর মাটিতে পুতার অংশে আলকাতরা দিয়ে লেপে দিলে খুঁটির স্থায়িত্ব বেশি হয়। রঙ বা সাদা না করেও পাখি বসানোর ব্যবস্থা করা যায়। পার্চিং আইল থেকে বেশ দূরে দেয়াই ভালো এবং জমির যে অংশে চলাচলের অসুবিধা আছে সেখানে স্থাপন করা ভালো। পার্চিংয়ের খুঁটি সরাসরি মাটিতে না পুঁতে একটি শাবল বা সুচালো অন্য কোনো কিছু দিয়ে চাপা গর্ত করে সেখানে গভীরভাবে স্থাপন করে গোড়ার মাটি চেপে দিতে হবে। সুষ্ঠু ব্যবস্থার জন্য এক বিঘা জমিতে ৬-৮ টি পার্চিং দিতে হবে। আগের কৌশলের মতো খুঁটি তৈরি করে তার ওপরের অংশে ডালের আগা,  ছোট ঝোপ ঝাড়ের কর্তিত অংশ এবং শুকনা মরিচ গাছ, শুকনা বেগুন গাছ বা শাখা বা কঞ্চি বেঁধে দিতে হবে। ডাল বা কঞ্চি লম্বালম্বিভাবে না বেঁধে আড়াআড়িভাবে বেঁধে দিলে পাখি বসতে সুবিধা হবে। ডাল/কঞ্চি/ঝাড় অন্তত  ২-৩ টি স্থানে বাঁধন দিতে হবে। অনেক দূর থেকে তা দৃষ্টিগোচরে আসবে।


লাইভ পার্চিং (Live Perching) : লাইভ পার্চিং বা আফ্রিকান ধৈঞ্চা (Sesbania rostrata) দিয়ে পার্চিং এর ব্যবস্থা করা যায়। দেশি ধৈঞ্চা দিয়েও লাইভ পার্চিং করা যায় তবে দেশি ধৈঞ্চার পার্চিং বেশির ভাগ ক্ষেতে মারা যায়। তাছাড়া অড়হর দিয়ে ও লাইভ পার্চিং করা যায়। অড়হরও বেশ কয়েক বছর টিকে থাকে। ৪০-৪৫ দিন বয়সের আফ্রিকান ধৈঞ্চার গাছ থেকে প্রতি গাছে ২-৩টি প্রায় ২.৫-৩ ফুট লম্বা সাইজের কাটিং নিতে হয়।


ধান রোপণের ২-৩ দিনের মধ্যে আফ্রিকান ধৈঞ্চার কাটিং লাগাতে হয়। ৩ দিনের বেশি বিলম্ব হলে সফলতার হার ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। রোদের সময় কাটিং না লাগিয়ে বৃষ্টির সময় লাগালে সফলতার হার বাড়বে। লাইভ পার্চিং ঝোপালো হলে পরিমিত ছাঁটাই করে দেয়া দরকার। এক বিঘা জমিতে ৬টি লাইভ পার্চিং করা দরকার। আমন ধান কাটার সময় পার্চিংয়ের আফ্রিকান ধৈঞ্চার বীজ পরিপক্ব হয়। তাই ধান কাটার সময় এবং বীজ সংগ্রহ করে ভালোভাবে শুকিয়ে পরবর্তী মৌসুমের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। আমন মৌসুমের মতো বোরো মৌসুমেও আফ্রিকান ধৈঞ্চা বা দেশি ধৈঞ্চা দিয়ে লাইভ পার্চিং করা সম্ভব। তবে কাটিংয়ের সফলতার হার খুবই কম। তাই এ কাজে পলিব্যাগে তৈরি ধৈঞ্চার চারা দিয়ে লাইভ পার্চিং করলে ফল বেশি ভালো হয়। বোরো মৌসুম বা শীতকালে লাইভ পার্চিং করার জন্য আফ্রিকান ধৈঞ্চা বা দেশি ধৈঞ্চার পুরনো বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। আমন ধান ক্ষেতে স্থাপিত আফ্রিকান ধৈঞ্চার আর্লি ফ্লাস থেকে নভেম্বর মসের ১ম সপ্তাহে পরিপক্ব নতুন বীজ পাওয়া যায়।  


পলিব্যাগে পট মিক্সার ভরে প্রতি ব্যাগে ১-৩টি বীজ দিতে হবে। পলিব্যাগে বীজ দেয়ার সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো উপায়ে নভেম্বর মাসের ১০ তারিখের আগে পলিব্যাগে বীজ দিতে হবে। বীজ বুনতে দেরি করলে চারার বাড়বাড়তি থেমে থাকবে। বীজ বোনার পর পলিব্যাগ রোদে রাখতে হবে এবং পানি দেয়াসহ সব যত্নাদি যথানিয়মে নিতে হবে। ২৫ নভেম্বের থেকে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে চারাকে কমপক্ষে ১০-১৪ ইঞ্চি বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিসেম্বরে চারার বৃদ্ধি না হলেও গাছে ফুল আসবে সে ফুল ভেঙে দেয়া ভালো হবে তবে ফুল ভেঙে না দিলেও চলবে। ১০-১৪ ইঞ্চি সাইজের চারা ব্যাগসহ ব্যাগের তলা সামান্য কেটে দিয়ে বোরো ধান রোপণের পর যথা সম্ভব তাড়াতাড়ি লাগাতে হবে। শীতে চারার বৃদ্ধি কিছুটা কমে থাকলেও, শীত কমার সাথে সাথে চারার বৃদ্ধি শুরু হবে।


আলোর ফাঁদ (Light Trap)
ফসল ক্ষেতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কৌশল অনুসরণ করার পাশাপাশি যদি রাতে আলোর ফাঁদ ব্যবহার করি সেক্ষেত্রে ক্ষতিকর অনেক পোকামাকড়ের উপস্থিতি সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারি। সেজন্য ফাঁদ হিসেবে অন্ধকারে বাতি জ্বালানো হয়। বাতি জ্বালালে পোকামাকড় সেদিকে আকৃষ্ট হয়। এরপর সেসব পোকা গিয়ে পড়ে বাতির নিচে রাখা গামলার ভেতরে। গামলায় পানির সাথে থাকে ডিটারজেন্ট বা সাবানের ফেনা। ওই ফেনায় গিয়ে বসলে বা পড়লে পোকামাকড় উঠতে পারে না। এরপর ধানের জন্য ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত করা হয়। ফাঁদে আটকাপড়া পোকা শনাক্ত করা যায় সহজে। পরে পোকার উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ধান রক্ষায় কোনো ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কৃষকের পরামর্শ দেয়া সম্ভব হয়। আলোর ফাঁদ স্থাপনের মাধ্যমে মূলত পোকামাকড়ের উপস্থিতি জরিপ করা হয়। আলোর ফাঁদ বাদামি গাছফড়িং শনাক্ত ও নিধনে ভূমিকা রাখে। বাদামি গাছফড়িং ধানের জন্য অন্যতম ক্ষতিকর পোকা। এ পোকার আক্রমণে ফসলের ২০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেতে পোকা দমনে ‘আলোর ফাঁদ’ প্রযুক্তি ব্যাপক সফলতা পাচ্ছে। একইসাথে পোকা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার করতে পারছেন। রাতের বেলা উজ্জ্বল আলোয় ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে জড়ো হয় বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। সে পোকামাকড়ের আলোর নিচে রাখা বড় পাত্রে ভর্তি সাবান বা ডিটারজেন্ট মাখা পানিতে ডুবে আটকা পড়ে। এরপর পোকা শনাক্ত করে কৃষকদের ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। ক্ষেতের পোকামাকড় দমন ও চিহ্নিত করার জন্য কৃষক প্রয়োজনমাফিক বালাইনাশক প্রয়োগ করতে পারেন। তাছাড়া অসংখ্য পোকা ডিটারজেন্ট মাখা পানিতে ডুবে মারা যায়। ক্ষেতের পোকা দমনে আলোর ফাঁদ একটি সফল প্রযুক্তি। এটি ব্যবহারে কৃষক সহজেই ক্ষেতে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পারেন। নিশ্চিত করতে পারেন তার পরিশ্রমে অর্জিত ফসল। আর এভাবেই বাংলাদেশ একদিন জৈব কৃষিতে অনেকটুকু এগিয়ে যাবে।


জৈব পদ্ধতি (Oranganic Methods) : কালের পরিক্রমায় বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া। আমাদের পূর্বপুরুষরা জৈব কৃষির ওপর নির্ভর করেই চালিয়েছেন তাদের চাষাবাদ। আস্তে আস্তে জৈব কৃষির স্থান দখল করে রাসায়নিক তথা আধুনিক কৃষি। জৈব কৃষি হলো কৃষি উৎপাদনে জৈব উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে অরাসায়নিক পদ্ধতিতে কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করা। অধিক উৎপাদন নিশ্চিত হলেও আমরা হারিয়েছি আমাদের প্রকৃতি নির্ভর ঐতিহ্য। প্রকৃতি নির্ভর কৃষি উৎপাদন হারানোর ফলে আমাদের অজান্তেই এসেছে মাটি দূষণ, পানি দূষণ, বায়ু দূষণ, ফসল দূষণ এবং পরিবেশ দূষণ। আমরা দূষণের মধ্যে ডুবে আছি। দূষণের দরুন জনজীবন বিপন্ন ও বিপর্যস্ত। সবুজ ও নির্মল ধরণী এখন হুমকির সম্মুখীন। যত্রতত্র অহেতুক রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের কারণে এখন সুস্থ সবল জীবন যাপন করা কঠিন। বিশ্ব এখন জৈব কৃষির সন্ধানে। জৈবকৃষিই আমাদের দুরবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে। জৈব কৃষি-আমাদের পরম বন্ধু। জৈব কৃষি বাস্তবায়নে কিছু বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার।


জৈব সারের ব্যবহার : যতটা সম্ভব জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। আপনার আমার প্রত্যেকের বাড়ির ফেলনা আবর্জনা, বর্জ্য, লতাপাতা দিয়ে জৈবসার তৈরি করে জমিতে ব্যবহার করতে পারি। গোবর, খামারজাত সার, খৈল, ছাই, ভার্মি কম্পোস্ট, সবুজ সার ও জীবাণুসার ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা বাড়ানো সম্ভব। এসব জৈব সার ব্যবহারে মাটির উপকার ছাড়া কোনো ক্ষতি হয় না। জৈব সার পরিবেশের বন্ধু ও পরিবেশবান্ধব। বসতবাড়িতে সীমিত সবজি, ফুল, ফল ও মসলা চাষে সার কম লাগে। এসব ফসল চাষে জৈব সারই যথেষ্ট হতে পারে; রাসায়নিক সারের তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। মূলত জৈব সার অধিক সুস্বাদু, পুষ্টিকর ও উচ্চ গুণাগুণ সম্পন্ন সবজি ও ফল উপহার দিতে পারে। বিশুদ্ধ কৃষি পণ্য উৎপাদনে বর্তমান কৃষিতে জৈব কৃষি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


সবুজ সারের চাষ : সবুজ সার হিসেবে দেশি ধৈঞ্চার চাষ করে গাছে ফুল আসার সময় মাটিতে মিশিয়ে দিলে মাটিতে নাইট্রোজেন যোগ হয়। আফ্রিকান ধৈঞ্চার চাষ করে মাটিতে মিশিয়ে দিলে আরও বেশি নাইট্রোজেন যোগ হয়। এর ফলে মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং ইউরিয়া সারের কাজ পাওয়া যায়। একইভাবে শন, বরবটি ও ফেলনের মত কোমল ও রসালো শস্যের চাষ করে ফুল আসার সময় মাটির সাথে মিশিয়ে সবুজ সার তৈরি করা যায়।


উর্বরতা বৃদ্ধিকারী ফসলের চাষ : শিম, ডাল বা শুঁটি জাতীয় শস্যের শিকড়ে নাইট্রোজেন গুটি থাকে যা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। এসব ফসল বেশি চাষ করলে এবং ফসল পরিপক্ব হওয়ার পর না তুলে শুঁটি কেটে নিয়ে গাছ মাটিতে মিশিয়ে দিলে নাইট্রোজেন ও জৈব পদার্থ যোগ হয়।


ফসলের অবশিষ্টাংশ পচিয়ে সার তৈরি : ধান, গম, চীনা, কাউন ও অন্যান্য ফসল কাটার সময় মাটি বরাবর না কেটে অন্তত ৬ ইঞ্চি গোড়া রাখার পর কাটা উচিত। পরে চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে জমিতে থাকা গোড়াগুলো পচে জৈব সারে পরিণত হয় এবং মাটির উর্বরতা বাড়ে।


অরাসায়নিক পদ্ধতিতে বালাই দমন : পরিবেশ দূষণের জন্য বালাইনাশকের যত্রতত্র ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি দায়ী। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনকে প্রাধান্য দেয়া হয়। যেমন-আধুনিক চাষাবাদ : সুস্থ বীজ ব্যবহার, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, সঠিক দূরত্বে রোপণ, সমকালীন চাষাবাদ, সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার ও সঠিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বালাই দমন করা যায়। যান্ত্রিক দমন : জমিতে ডালপালা পোঁতা, আলোর ফাঁদ ব্যবহার, হাতজাল দিয়ে পোকা ধরে মারা, পোকার ডিম, গাদা ও আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে ধ্বংস করে বালাই দমন করা যায়। বালাইসহনশীল জাত ব্যবহার : বালাইসহনশীল বিভিন্ন জাতের ফসল চাষ করে বালাই আক্রমণ এড়ানো যায়  জৈবিক উপায়ে দমন : উপকারী বা বন্ধু পোকা, ব্যাঙ ও অন্যান্য প্রাণী সংরক্ষণ করে এদের মাধ্যমে ক্ষতিকারক পোকার ডিম, পুত্তলি, কীড়া ধ্বংস করার ব্যবস্থা করতে হবে। নিমের নির্যাস থেকে তৈরি ‘নিমবিসিডিন’ একটি উৎকৃষ্ট মানের উদ্ভিজ্জ কীটনাশক। অরাসায়নিক পদ্ধতিতে বালাই দমন করা সম্ভব না হলে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার বিরত রেখে উদ্ভিজ্জ বালাইনাশক ব্যবহার করে বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা, শাকসবজির বিভিন্ন পোকা এবং ধানের মাজরা, বাদামি গাছফড়িং ও পাতা মোড়ানো পোকা দমন করা যায়।


আগাছা দমন : খুব সহজেই আমরা আমাদের দেশীয় যন্ত্রপাতি নিড়ানি, খুরপি, কোদাল, উইডার দিয়ে অরাসায়নিক পদ্ধতিতে আগাছা দমন করতে পারি। তাই আগাছানাশকের মতো রাসায়নিক বিষ ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ করার কোনো প্রয়োজন হয় না।


জৈব পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণ : বীজ কৃষির প্রধান ও মৌলিক অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। বীজ ১২ শতাংশ আর্দ্রতায় এলেই ঠাণ্ডা করে সংরক্ষণ পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজকে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী মাটির পাত্র, টিন, পলিথিন বস্তা, ড্রাম ব্যবহার করা যায়। তবে মাটির পাত্র হলে অবশ্যই আলকাতরার প্রলেপ দিতে হবে। সবসময়ই সংরক্ষণ পাত্রটিকে ভালোভাবে বাযুরোধী করে মুখ বন্ধ করে দিতে হবে। পাত্রটির তলায় অবশ্যই কাঠ, খড় বা অন্য কিছু দিয়ে মাটি বা ফ্লোর থেকে আলাদা করে রাখতে হবে। বীজ সংরক্ষণে ও আলু গুদামজাতকরণে শুকনো নিম, নিসিন্দা ও বিষকাটালির পাতা একটি কার্যকর কীটনাশক পোকা দমনে উপকারী। এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে বীজ নিরাপদ থাকবে। যেহেতু জৈব কৃষি আমাদের পরম বন্ধু, জৈব কৃষি হলো কৃষি উৎপাদনের আদি পদ্ধতি এবং নির্ভেজাল তাই জৈব পদ্ধতিতে কৃষি উৎপাদনের দিকে আমাদের সবাইকে মনোযোগী হতে হবে। আসুন আমাদের সবার সম্মিলিতভাবে এবং আন্তরিক প্রচেষ্টায় নির্বিঘ্নে চলতি বোরো ধান উৎপাদন কর্মসূচি সফল করি।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*

*পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা

 

বিস্তারিত
বিনা বোরো ধানের জাত

বিনাধান-৮ : পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতা ৯০-৯৫ সেন্টিমিটার এবং হেলে পড়ে না। জীবনকাল ১৩৫-১৪০ দিন। আলোক অসংবেদনশীল বোরো ধানের জাত। কুশি অবস্থা থেকে পরিপক্বতা পর্যন্ত ৮-১০ ডিএস/মিটার এবং চারা অবস্থায় ১২-১৪  ডিএস/মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহনশীল। ডিগপাতা খাড়া এবং লম্বা। পরিপক্ব অবস্থা পর্যন্ত পাতা এবং কাণ্ড সবুজ থাকে। ধান উজ্জ্বল, শক্ত এবং চাল মাঝারি মোটা। বিনাধান-১০ স্বাভাবিক অবস্থায় বীজতলায় বীজ ফেলা থেকে ফসল পাকা অবধি ১৩০-১৩৫ দিন পরে কাটা যায়। দেশের লবণাক্ত ও অলবণাক্ত উভয় এলাকায় এ জাতটি চাষের উপযোগী। তবে অলবণাক্ত এলাকায় ফলন কিছুটা বেশি পাওয়া যায়।


এ জাতের বীজ নভেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহ হতে শুরু করে ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলায় ফেলার উপযুক্ত সময়। জাতটির চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী রোপা আমন জাতের মতোই ভারী, পুষ্ট ও রোগবালাই মুক্ত বীজ বাছাই করে বপনের আগে বীজ শোধন করা ভালো। পাঁচ শতাংশ (২০০ বর্গমিটার) পরিমাণ  বীজতলায় ১০ কেজি বীজ ফেলা যায়। নভেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহ হতে শুরু করে ডিসেম্বর মাসের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলা তৈরি করে ৩৫-৪০ দিনের চারা রোপণ করলে ভালো ফসল পাওয়া যায়।


চারার বয়স ও রোপণ পদ্ধতি : ডিসেম্বর মাসের ২য় সপ্তাহ হতে ৩য় সপ্তাহ পর্যন্ত ৩৫-৪০ দিনের চারা লাইন করে রোপণ করলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়। ২/৩টি সুস্থ সবল চারা একত্রে এক গুছিতে রোপণ করতে হবে। সারি হতে সারির দূরত্ব ২০ সেমি. এবং সারিতে গুছির দূরত্ব ১৫ সেমি. থাকা ভালো।


সার প্রয়োগ প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ২১০-২৩০, টিএসপি ১১০-১২০ এমওপি ৬০-৮০ জিপসাম ১৮-২০ দস্তা ১.৫-২.০ কেজি।  


রোপণের জন্য জমি তৈরির শেষ চাষের আগে সম্পূর্ণ টিএসপি, এমপি, জিপসাম এবং দস্তা জমিতে সমভাবে ছিটিয়ে চাষের মাধ্যমে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সারের অর্ধেক পরিমাণ চারা রোপণের ৭-৮ দিন পর এবং বাকি অর্ধেক ৩০-৩৫ দিন পর উপরিপ্রয়োগ করতে হবে অথবা এক তৃতীয়াংশ চারা রোপণের ৭-৮ দিন পর, এক তৃতীয়াংশ চারা রোপণের ১৮-২০ দিন পর এবং শেষ তৃতীয়াংশ চারা রোপণের ৩০-৩৫ দিন পর জমির উর্বরতার ওপর নির্ভর করে প্রয়োগ করতে হবে। অনুর্বর জমিতে হেক্টরপ্রতি জিপসাম ৫০ কেজি (একর প্রতি ২০ কেজি) এবং দস্তা সার ৪ কেজি (একর প্রতি ১.৬ কেজি) হারে দেয়া যেতে পারে। ইউরিয়া সার প্রয়োগের ২/১ দিন আগে জমির অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আগাছা দমন করতে হবে। জমির উর্বরতা ও ফসলের অবস্থায় ওপর নির্ভর করে ইউরিয়া সার প্রয়োগ মাত্রার তারতম্য করা যেতে পারে।


এ জাতের ধানের পরিচর্যা অন্যান্য উফশী জাতের মতোই। এর জীবনকাল কম বিধায় চারা রোপণের পর আগাছা দেখা দিলে দ্রুত নিড়ানি যন্ত্র বা হাতের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার ও মাটি নরম করতে হবে। ধান পাকার ১০-১২ দিন আগে জমির পানি শুকিয়ে ফেলা ভালো। রোগ বালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ দেখা দিলে নিকটস্থ কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার উপদেশ মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিলে প্রচলিত তরল বা দানাদার কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া খোল ঝলসানো, ব্যাক্টেরিয়াল লিফব্ল­াইট বা পাতা ঝলসানো ও অন্যান্য রোগ দেখা দিলে উপযুক্ত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। খোল ঝলসানো, কা- পচা রোগ দেখা দিলে বেনলেট, হোমাই, বেভিস্টিন বা টপসিন মিথাইল মাত্রা অনুযায়ী প্রয়োগ করা যেতে পারে।


বিনাধান-১০
পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতা ১০০-১১০ সেন্টিমিটার এবং হেলে পড়ে না। জীনবকাল ১২৫-১৩০ দিন। উচ্চফলনশীল ও আলোক অসংবেদনশীল বোরো ধানের জাত। কুশি অবস্থা থেকে পরিপক্বতা পর্যন্ত ১০-১২ ডিএস/মিটার এবং চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহনশীল। ডিগপাতা খাড়া এবং লম্বা। পরিপক্ব অবস্থা পর্যন্ত পাতা এবং কা- সবুজ থাকে। ধান উজ্জ্বল, শক্ত এবং চাল লম্বা ও মাঝারি। দেশের লবণাক্ত ও অলবণাক্ত উভয় এলাকায় এ জাতটি চাষের উপযোগী। তবে অলবণাক্ত এলাকায় ফলন কিছুটা বেশি পাওয়া যায়।
এ জাতের বীজ নভেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহ হতে শুরু করে ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলায় ফেলার উপযুক্ত সময়।

 

চাষাবাদ পদ্ধতি : জাতটির চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী বোরো জাতের মতোই।


বীজ বাছাই ও শোধন : ভারী, পুষ্ট ও রোগবালাই মুক্ত বীজ বাছাই করতে হয় এবং বপনের আগে বীজ শোধন করা ভালো।


বীজতলা তৈরি : পাঁচ শতাংশ (২০০ বর্গমিটার পরিমাণ বীজতলায় ১০ কেজি বীজ ফেলা যায়। জুন মাসের শেষ সপ্তাহ হতে জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ (আষাঢ়ের ২য় সপ্তাহ হতে শেষ সপ্তাহ) পর্যন্ত বীজতলা তৈরি করে ২০-২৫ দিনের চারা রোপণ করলে ভালো ফসল পাওয়া যায়। তবে জুলাইয়ের শেষ (শ্রাবণের দ্বিতীয়) সপ্তাহ পর্যন্তও বীজতলা করা যায়।


চারার বয়স ও রোপণ পদ্ধতি : ডিসেম্বর মাসের ২য় সপ্তাহ হতে ৩য় সপ্তাহ পর্যন্ত ৩৫-৪০ দিনের চারা লাইন করে রোপণ করলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়। ২/৩টি সুস্থ সবল চারা একত্রে এক গুছিতে রোপণ করতে হবে। সারি হতে সারির দূরত্ব ২০ সেমি. এবং সারিতে গুছির দূরত্ব ১৫ সেমি. থাকা ভালো। সারের মাত্রা এবং প্রয়োগ পদ্ধতি বিনাধান ৮-এর মতোই।
এ জাতের ধানের পরিচর্যা অন্যান্য উফশী জাতের মতোই। এর জীবনকাল কম বিধায় চারা রোপণের পর আগাছা দেখা দিলে দ্রুত নিড়ানি যন্ত্র বা হাতের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার ও মাটি নরম করতে হবে। ধান পাকার ১০-১২ দিন আগে জমির পানি শুকিয়ে ফেলা ভালো।


রোগ বালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ দেখা দিলে নিকটস্থ কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার উপদেশ মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিলে প্রচলিত তরল বা দানাদার কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া খোলা ঝলসানো, ব্যাক্টেরিয়াল লিফব্লাইট বা পাতা ঝলসানো ও অন্যান্য রোগ দেখা দিলে উপযুক্ত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। খোল ঝলসানো, কা- পচা রোগ দেখা দিলে বেনলেট, হোমাই, বেভিস্টিন বা টপসিন মিথাইল মাত্রা অনুযায়ী প্রয়োগ করা যেতে পারে।


বিনাধান-১৮
এটি উচ্চফলনশীল বোরো ধানের জাত। উচ্চফলনশীল বোরো ধানের জাত ব্রি ধান-২৯ এর চেয়ে ১২-১৫ আগে পাকে অথচ ব্রি ধান-২৯ এর সমান ফলন দেয়। গাছ শক্ত বলে হেলে পড়ে না । পাতা গাঢ় সবুজ, লম্বা ও চওড়া। ডিগ পাতা খাড়া। জীবনকাল-বোরো মৌসুমে ১৪৫-১৫০ দিন । যথোপযুক্ত পরিচর্যায় বোরো মৌসুমে হেক্টর প্রতি ৭.৫-৮.০ টন ফলন দেয়। রান্নার পর ভাত ঝরঝরে হয় এবং দীর্ঘক্ষণ রাখলে নষ্ট হয় না। জাতটি বিভিন্ন রোগ যথা- পাতা পোড়া, খোল পচা ও কা- পচা ইত্যাদি রোগ তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিরোধ করতে পারে। এছাড়া এ জাতটির প্রায় সব ধরনের পোকার আক্রমণ, বিশেষ করে বাদামি গাছ ফড়িং, গলমাছি ও পামরি পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি। বিনাধান-১৮ বোরো মৌসুমের জন্য আনুমোদিত হলেও জাতটি আউশ মৌসুমে চাষ করা যায়। লবণাক্ত এলাকা ছাড়া দেশের প্রায় সব মধ্যম উঁচু ও মধ্যম নিচু জমিতে বিশেষ করে বৃহত্তম রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল, যশোর, ঢাকা এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে জাতটির অধিক ফলন পাওয়া যায়।


প্রতি হেক্টর জমি চাষের জন্য ২৫-৩০ কেজি বা একর প্রতি ১০-১২ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। ভারী, পুষ্ট ও রোগবালাই মুক্ত বীজ বাছাই করতে হয় এবং বপনের আগে বীজ শোধন করা ভালো। বোরো মৌসুমে অঞ্চল ভেদে ২০ কার্তিক থেকে ৫ অগ্রহায়ণ পর্যন্ত পাঁচ শতাংশ (২০০ বর্গমিটার) পরিমাণ বীজতলায় ১০ কেজি বীজ ফেলা যায়। বোরো মৌসুমে ৩৫-৪৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে ৫০ দিনের চারা রোপণ করলেও তেমন ক্ষতি হয় না। বেশি বয়সের চারা লাগালে ফলন কমে যায়, তাই বোরো মৌসুমের জন্য ৬ সপ্তাহের বেশি বয়সের চারা রোপণ করা কোনো অবস্থাতেই উচিত নয়। বীজতলায় চারা করার পর লাইন করে চারা রোপণ করলে ফলন বেশি হয়। রোপণের সময় জমিতে ছিপছিপে পানি থাকলেই চলে। প্রতি গুছিতে একটি করে সতেজ চারা রোপণ করাই যথেষ্ট। প্রয়োজনে ২-৩টি সুস্থ-সবল চারা একত্রে এক গুছিতে রোপণ করা যেতে পারে। সারি থেকে সারির দূরত ২০-২৫ সেন্টিমিটার এবং সারিতে গুছির দূরত্ব ১৫-২০ সেন্টিমিটার থাকা ভালো। চারা রোপণের ৭-১০ দিনের মধ্যে কোনো চারা মারা গেলে সেখানে নতুন চারা রোপণ করতে হবে। বিনা অন্যান্য জাতের তুলনায় সামান্য বেশি সারের প্রয়োজন হয় এবং একই পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে হয়।


চারা রোপণের পর আগাছা দেখা দিলে দ্রুত নিড়ানি যন্ত্র বা হাতের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার ও মাটি নরম করতে হবে। চারা রোপণের পর থেকে জমিতে ৫-৭ সেন্টিমিটার (২-৩ ইঞ্চি) পানি রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ধান গাছে যখন কাইচথোড় আসা শুরু করে তখন পানির পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো উচিত। ধান পাকার ১০-১২ দিন আগে জমির পানি শুকিয়ে ফেলা ভালো।

 

রোগ ও পোকামাকড় দমন : রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ দেখা দিলে নিকটস্থ কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার উপদেশ মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা নিলে প্রচলিত তরল বা দানাদার কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া খোলা ঝলসানো, ব্যাক্টেরিয়াল লিফব্লাইট বা পাতা ঝলসানো ও অন্যান্য রোগ দেখা দিলে উপযুক্ত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। খোল ঝলসানো, কাণ্ড পচা রোগ দেখা দিলে বেনলেট, হোমাই, বেভিস্টিন বা টপসিন মিথাইল মাত্রা অনুযায়ী প্রয়োগ করা যেতে পারে।


ফসল কাটা, মাড়াই ও সংরক্ষণ : শীষে ধান পেকে গেলেই ফসল কাটতে হবে। অধিক পাকা অবস্থায় ফসল কাটলে অনেক ধান ঝরে পড়ে, শীষ ভেঙে যায়। শিষের শতকরা ৮০ ভাগ ধানের চাল শক্ত ও স্বচ্ছ হলে ধান ঠিক মতো পেকেছে বলে বিবেচিত হবে। মাড়াই করার পর ধান অন্তত ৪-৫ দিন রোদে ভালোভাবে শুকানোর পর ঝেড়ে গোলাজাত করতে হবে।
 

বিনাধান-১১ : আমন মৌসুমের জন্য অনুমোদিত হলেও জাতটি প্রায় সারা বছরই চাষ করা যায়।  


দেশের আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে রোপা আমন মৌসুমে ২০-২৫ দিন পর্যন্ত জলমগ্ন হলেও প্রচলিত আমন জাতের তুলনায় বেশি ফলন প্রদান করে। এছাড়া জাতটি স্বল্পমেয়াদি বিধায় এ জাতটি কর্তন করে পরবর্তী রবি ফসল সঠিক সময়ে চাষ করা যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় এর জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন এবং জলমগ্ন অবস্থায় ২০-২৫ দিন ডুবে থাকলে জীবনকাল ১২০-১২৫ দিন। যথোপযুক্ত পরিচর্যায় জলমগ্ন অবস্থায় প্রতি হেক্টরে ৪.০-৪.৫ টন (একরে ৪০-৫০ মণ) এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ৫.০-৫.৫ টন (একরে ৫০-৬০ মণ) ফলন দেয়।


বিশেষ গুণ : ধান চাষ বৃদ্ধির সাথে সাথে তেল ও ডাল জাতীয় শস্যের জমি কমে যাচ্ছে। ফলে এ দুইটি শস্যের মোট উৎপাদন কমে গেছে। বিনাধান-১১ উচ্চফলনশীল এবং এর জীবনকাল তুলনামূলকভাবে অনেক কম বলে এ জাতটি চাষ করে সঠিক সময়ে তেল ও ডাল ফসল চাষ করা সম্ভব হবে। এছাড়া গম ও আলুর  চাষও ভালোভাবে করা যায়। ফলে এসব ফসলের উৎপাদনও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। লবণাক্ত এলাকা ছাড়া দেশের প্রায় সব রোপা আমন অঞ্চল বিশেষ করে আকস্মিক বন্যা প্রবণ এলাকা যেখানে বন্যার পানি এসে ২০-২৫ দিনের মধ্যেই পানি নেমে যায়।


বপনের সময় : জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হতে জুলাই মাসের ২য় সপ্তাহের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপণের উপযুক্ত সময়।


চারার বয়স ও রোপণ পদ্ধতি : জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ হতে আগস্টের শেষ সপ্তাহ অর্থাৎ শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হতে শুরু করে ভাদ্র মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ২০-২৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বেশি বয়সের চারা লাগালে ফলন কমে যায়, তাই ৪ সপ্তাহের বেশি বয়সের চারা রোপণ করা কোনো অবস্থাতেই উচিত নয়। বীজতলায় চারা করার পর লাইন করে চারা রোপণ করলে ফলন বেশি হয়। ২-৩টি সুস্থ-সবল চারা একত্রে এক গুছিতে রোপণ করতে হবে। সারি হতে সারির দূরত্ব ২০ সেমি. এবং সারিতে গুছির দূরত্ব ১৫ সেমি. থাকা ভালো। এ জাতে বিনা ৮-এর তুলনায় কিছু কম সার দিতে হয়।


বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় জমি ডুবে গেলে সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি ভিন্নতর হবে। সেক্ষেত্রে জমি তৈরির সময়  যে পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে তাহলো-ইউরিয়া ৯০-২০০ কেজি, টিএসপি ১৩০-১৪০ কেজি, এমওপি ৩০-৪০, জিপসাম ৩০-৪০ এবং দস্তা ০৯-১১ কেজি দিতে হবে।


যদি ধান গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধি পর্যায়ে বন্যা হয় তাহলে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার ১০ দিন পরে প্রথম কিস্তিতে হেক্টরপ্রতি ৪৫ কেজি (একরে ১৮ কেজি) ইউরিয়া সার এবং হেক্টরপ্রতি ২৩ কেজি (একরে ৯ কেজি) এমওপি (পটাশ) সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম কিস্তিতে ২০-২৫ দিন পর হেক্টরপ্রতি ৪৫ কেজি (একরে ১৮ কেজি) ইউরিয়া দ্বিতীয়বার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। তবে জমির উর্বরতার অনুযায়ী ইউরিয়া সারের মাত্রা কম-বেশি হতে পারে।


বিনাধান-১১ চাষে সতর্কতা : ২০-২৫ দিন  জলমগ্ন থাকার পর বন্যার পানি জমি থেকে সরে যাওয়ার পরে গাছের শিকড় পচে কালো রঙ ধারণ করবে। এ অবস্থায় কমপক্ষে ৭ দিন জমিতে নামা যাবে না। ৭ দিন পর যখন নতুন চারা/কুশি গজাবে তখন জমিতে সার প্রয়োগসহ অন্যান্য পরিচর্যা করা যাবে। জমি থেকে বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর গাছের পাতায় পলি কিংবা বালি জমতে পারে। ফলে পাতার স্টোমাটা বন্ধ হয়ে পাতা জ্বলে সাদা হয়ে যেতে পারে। তাই বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পরিষ্কার পানি স্প্রে মেশিনের সাহায্যে গাছের পাতা ধুয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার ১০-২০ দিন পর জলজ আগাছাসহ অন্যান্য আগাছা এবং ধানের পচা পাতা পরিষ্কার করে দিতে হবে। যে সব এলাকায় বন্যার পানি এসে ২০-২৫ দিনের মধ্যে পানি নেমে যায় এবং ক্ষেতে কোনো পানি জমে থাকে না এমন জমিতে বিনাধান-১১ চাষ করা যাবে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর জমিতে ১০-২৪ সেমি. (৪-১২ ইঞ্চি) পানি থাকা স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘদিন ৩৫-৪০ সেন্টিমিটার (১৪-১৬ ইঞ্চি) এর বেশি পানি থাকে, এমন জমিতে এ জাতটি চাষ করা যাবে না।

 

ড. মির্জা মোফাজাজল ইসলাম*

*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, বিনা, ময়মনসিংহ, +৮৮০১৭১৬২৮০৭২০, mirza_islam@yahoo.com

 

বিস্তারিত
লবণাক্ত সহিষ্ণু জাতের বোরো ধান ব্রি ধান৬১

বোরো মৌসুমে ধান গাছ প্রচুর সূর্য কিরণ পায়, সার বেশি গ্রহণ করে অথচ গাছ ও পাতা হেলে পড়ে না, ফলবান কুশি বেশি হয় এবং পরিশেষে অধিক ফলন পাওয়া যায়। তাই এ মৌসুমে উচ্চফলনশীল জাতের বোরো ধানের চাষ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এ মৌসুমে বিভিন্ন জাতের উচ্চফলনশীল বোরো ধানের চাষ হয়। এদের মধ্যে ব্রি ধান৬১ একটি নতুন জাতের লবণাক্ততা সহিষ্ণু উচ্চফলনশীল বোরো ধান।


ব্রি ধান৬১ এর বৈশিষ্ট্য
ব্রি ধান৬১ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মিটার (৩ সপ্তাহ পর্যন্ত) লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। তাছাড়া এ জাতটি অঙ্গজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায় পর্যন্ত লবণাক্ততা সংবেদনশীল সকল ধাপে (Salt sensitive stage) ৮ ডিএস/মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করে ফলন দিতে সক্ষম, যা প্রচলিত উচ্চফলনশীল জাত ব্রি ধান২৮ পারে না। এ জাতটি ব্রি ধান৪৭ এর মতো লবণ সহ্য করতে পারে। শীষ থেকে ধান সহজে ঝরে পড়ে না। পূর্ণবয়স্ক ধানগাছ ৯৫ সেমি. পর্যন্ত লম্বা হয়। এর জীবনকাল ১৪৫-১৫০ দিন। লবণাক্ততার মাত্রা ভেদে হেক্টরপ্রতি ৩.৮-৭.৪ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। যা ব্রি ধান২৮ এর থেকে ১.৫ টন/হে. বেশি। এ ধানের চাল মাঝারি চিকন। এক হাজার পুষ্ট দানার ওজন প্রায় ২১ গ্রাম। চালে প্রোটিনের পরিমাণ ৮.৮% এবং অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২২%।


জমির প্রকৃতি : মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু জমি এ ধান চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে।
 

জমি তৈরি : ধানের চারা রোপণের জন্য জমি কাদাময় করে উত্তমরূপে তৈরি করতে হবে। এজন্য জমিতে প্রয়োজন মতো পানি দিয়ে মাটি একটু নরম হলে ১০-১৫ সেমি. গভীর করে সোজাসুজি ও আড়াআড়িভাবে ৪/৫টি চাষ ও মই দিতে হবে যেন মাটি থকথকে কাদাময় হয়। প্রথম চাষের পর অন্তত ৭ দিন জমিতে পানি আটকে রাখা প্রয়োজন। এর ফলে জমির আগাছা, খড় ইত্যাদি পচনের ফলে গাছের খাদ্য বিশেষ করে অ্যামোনিয়াম নাইট্রোজেন জমিতে বৃদ্ধি পায়।


সার ব্যবহার : বোরো মৌসুমে ধানের আশানুরূপ ফলন  পেতে জমিতে পরিমাণ মতো জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা দরকার। ব্রি ধান৬১ জাতের বোরো ধান চাষের জন্য বিঘাপ্রতি ৪০ কেজি ইউরিয়া, ১৪ কেজি টিএসপি, ১৬ কেজি এমওপি, ১৪ কেজি জিপসাম ও ১.৫ কেজি জিংক সালফেট সার প্রয়োগ করতে হয়। শেষ চাষের সম সবটুকু টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট সার প্রয়োগ করা উচিত। ইউরিয়া সার সমান তিন ভাগ করে চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর ১ম, ৩৫-৪০ দিন পর ২য় এবং ৫০-৫৫ দিন পর ৩য় কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার ছিটিয়ে মাটির সাথে হাত দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং মাটিতে দূষিত বাতাস থাকলে তা বের হয়ে যাবে।


চারা রোপণ : ব্রি ধান৬১ জাতের ধান ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর এর মধ্যে বীজ বপন করে বীজতলা থেকে ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারা সাবধানে তুলে এনে সারি করে রোপণ করতে হবে। এ মৌসুমে সারি থেকে সারি ২০-২৫ সেমি. এবং চারা থকে চারা ১৫-২০ সেমি. দূরত্বে লাগাতে হবে। জমির উর্বরতা ও জাতের কুশি ছড়ানোর ওপর ভিত্তি করে এ দূরত্ব কম বা বেশি হতে পারে। প্রতি গোছায় ২/৩টি সুস্থ ও সবল চারা ২.৫-৩.৫ সেমি. গভীর রোপণ করতে হবে। খুব গভীরে চারা রোপণ করা ঠিক নয়। এতে কুশি গজাতে দেরি হয়। কুশি ও ছড়া কম হয়। কম গভীরে রোপণ করলে তাড়াতাড়ি কুশি গজায়, কুশি ও ছড়া বেশি হয় ও ফলন বাড়ে। তাই কম গভীরে চারা রোপণের সময় জমিতে ১.২৫ সেমি. এর মতো ছিপছিপে পানি রাখা ভালো। কাদাময় অবস্থায় রোপণের গভীরতা ঠিক রাখার সুবিধা হয়। রোপণের পর জমির এক কোনায় কিছু বাড়তি চারা রেখে দিতে হয়। এতে রোপণের ১০-১৫ দিন পরে যেসব জায়গায় চারা মরে যায় সেখানে বাড়তি চারা থেকে শূন্যস্থান পূরণ করা যায়। এর ফলে জমিতে একই বয়সের চারা রোপণ করা হয়।


সেচ ব্যবস্থাপনা : গাছের প্রয়োজনমাফিক সেচ দিলে সেচের পানির পূর্ণ ব্যবহার হয়। বোরো ধানের জমিতে সব সময় পানি ধরে রাখতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। বোরো মৌসুমে সাধারণত ধানের সারা জীবনকালে মোট ১২০ সেমি. পানির প্রয়োজন। তবে কাইচ থোড় আসার সময় থেকে ধানের দুধ হওয়া পর্যন্ত পানির চাহিদা দ্বিগুণ হয়। এ সময় জমিতে দাঁড়ানো পানি রাখতে হয়। কারণ থোড় ও ফুল অবস্থায় মাটিতে রস না থাকলে ফলন কমে যায়। ধানের চারা রোপণের পর থেকে কোনো অবস্থায় কতটুকু পানির দরকার তা নিম্নে সারণিতে দেয়া হলো।  

সারণি ১

ধান গাছের অবস্থা/সময় পানির পরিমাণ
চারা রোপণের সময় ২-৩ সেমি.
চারা রোপণ থেকে পরবর্তী ১০ দিন পর্যন্ত ৩-৫ সেমি.
চারা রোপণের ১১ দিন থেকে থোড় আসা পর্যন্ত ২-৩ সেমি.
কাইচ থোড় আসার সময় থেকে ধানের ফুল ফোটা পর্যন্ত ৫-১০ সেমি.


ধান কাটার ১০-১২ দিন আগে জমির পানি পর্যায়ক্রমে বের করে দিতে হবে। এছাড়া ক্ষেত থেকে মাঝে মাঝে পানি বের করে দিয়ে জমি শুকিয়ে নিতে হবে। এতে মাটিতে জমে থাকা দূষিত বাতাস বের হয়ে যাবে এবং চারাগুলো মাটির জৈব পদার্থ থেকে সহজে খাবার গ্রহণ করতে পারবে। তবে জমির মাটি যেন ফেটে না যায়। সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জমিতে চুল ফাটা দেখা দেয়া মাত্র পুনরায় সেচ দিতে হবে। মাটি শুকিয়ে গেল জমি ফেটে যাবে এবং সেচের পানিও ফাটল দিয়ে চুইয়ে বিনিষ্ট হবে।


আগাছা দমন : সাধারণত বোরো ধানের বেলায় চারা রোপণের পর থেকে ৪০-৫০ দিন পর্যন্ত জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। এ সময়ের মধ্যে অন্তত ২-৩ বার জমির আগাছা পরিষ্কার করা দরকার। ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করেই ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করা উচিত। অন্যথায় আগাছার উপদ্রব বেড়ে যায়।

বিভিন্নভাবে আগাছা দমন করা যেতে পারে। যেমন- পানি ব্যবস্থাপনা, জমি তৈরি পদ্ধতি, নিড়ানি যন্ত্রের ব্যবহার, হাত দিয়ে টেনে উঠানো ইত্যাদি। নিড়ানি যন্ত্র ব্যবহারের জন্য ধান সারিতে লাগানো দরকার। এ যন্ত্র ব্যবহারের ফলে কেবলমাত্র দুই সারির মাঝের আগাছা দমন হয়। কিন্তু দুই গুছির মাঝের যে আগাছা বা ঘাস থেকে যায় তা হাত দিয়ে টেনে তুলে পরিষ্কার করতে হবে। সংগৃহীত ঘাসে যদি পরিপক্ব বীজ না থাকে তবে তা পায়ের সাহায্যে মাটির ভেতরে পুঁতে দিলে পচে জৈব সারে পরিণত হবে।


পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন : বোরো মৌসুমের শুরুতে শীতের প্রকোপ বেশি থাকায় পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশ কম থাকে। কিন্তু তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে পোকার আক্রমণের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। বোরো ধানে সাধারণত পামরি, মাজরা, থ্রিপস, বাদামি গাছ ফড়িং, সাদা পিঠ গাছ ফড়িং ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ হতে পারে।
তাছাড়া বোরো ফসলে টুংরো, ব্লাস্ট, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া ও পোড়া পচা, ছত্রাকজনিত কা- পচা, খোলপোড়া, খোলপচা, পাতার বাদামি দাগ ও বাকানি রোগ দেখা দিতে পারে। ধানের এসব রোগ ও পোকা দমনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।


ধান কর্তন : বোরো ধান সঠিক সময়ে কাটা ও মাড়াই করা উচিত। চৈত্র-বৈশাখ মাসে বোরো ধান পাকে। পাকার সঙ্গে সঙ্গে ধান কেটে বাড়ি নিয়ে আসতে হয়। কারণ যে কোনো মুহূর্তে ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাছাড়া নিচু জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হলে এবং কাটতে দেরি করলে বৃষ্টির পানিতে অনেক সময় পাকা ধান তলিয়ে যেতে পারে। তাই পাকা ধান মাঠে না রেখে সময়মতো কেটে নিলে ফলনের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা কমানো যায়।
 

ফলন : লবণাক্ততার মাত্রাভেদে হেক্টরপ্রতি গড়ে ৩.৮-৭.৪ টন পর্যন্ত ব্রি ধান৬১ এর ফলন পাওয়া যায়।

 

মো. আবদুর রহমান*

*উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, তেরখাদা, খুলনা

 

বিস্তারিত
বিনাধান-১৪ : নতুন প্রতিশ্রুতিশীল ধানের জাত

সাধারণত অগ্রহায়ণ- পৌষ মাসে বোরো ধানের বীজতলা করা হয় ও পৌষ-মাঘ মাসে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। মাঘ মাসের পরে বোরো ধান রোপণ করলে ফুল আসা পর্যায়ে উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করায় পুংরেণু অকার্যকর হয়ে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। এ কারণে চাষি ভায়েরা যে সব জমিতে বোরো ধান চাষ করেন সে সব জমিতে আমন ধানের পরে  অন্য কোনো ফসল আবাদ না করে  সরাসরি বোরো ধান চাষ করেন। ফলশ্রুতিতে দেশে ডাল, তেল ও গম ফসল উৎপাদনের আওতায় জমির পরিমাণ আশানুরূপভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ টন ডাল, ১০-১২ লাখ টন ভোজ্যতেল ও ৩০ লাখ টন গম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যার জন্য প্রতি বছর প্রায় ২৭,০০০ কোটি টাকার সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় যা দিয়ে প্রতি বছর একটি করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ আনুমানিক ৮২ লাখ হেক্টর যা নাকি আবার প্রতি বছর শতকরা এক ভাগ হারে কমছে। এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ডাল, তেল ও  গম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন (১১০-১২০ দিন) আমন ধানের জাত ও  নাবিতে রোপণ উপযোগী (ফাল্গুনের ১ম সপ্তাহ হতে চৈত্রের ২য় সপ্তাহ) বোরো ধানের জাত প্রয়োজন। বর্তমানে আমন মৌসুমে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন আমন ধানের জাত বিনাধান-৭, বিনাধান-১৬, বিনাধান-১৭, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৫৬  ও ব্রি ধান৬২ চাষ করে সহজেই ডাল, তেল ও গম আবাদ করা যায়। কিন্তু বোরো ধানের মাত্র একটি জাত আছে যা নাবিতে রোপণ করা যায়, সেটি বিনাধান-১৪। বিনাধান-১৪ ব্রাউশ ধান নামে সমধিক পরিচিত। বর্তমানে এটি জিরাশাইলের বিকল্প হিসাবে উত্তরাঞ্চলে চাষ হচ্ছে। পরাগায়নের সময় উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল বিনাধান-১৪ একটি আগাম পাকা (১০৫-১২৫দিন) জাত যা ফাল্গুন ১ম সপ্তাহ হতে চৈত্রের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত রোপণ করা যায়। ফলে এর ফুল আসে এপ্রিল মাসে যখন বাংলাদেশে বাতাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৩-৩৬˚সে. এর মধ্যে উঠানামা করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসের গড় তাপমাত্রা ২৫˚সে. এর ওপর হলে ধানের ফলন কমতে শুরু করে এবং ৩৬˚ সে. হলে ধানের কোনো দানা পুষ্ট হতে পারে না। কিন্তু বিনাধান-১৪ এরকম অবস্থায়ও গড়ে ৬.৮৫ টন/হে. ফলন দিতে সক্ষম।


বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৬-৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে প্রতি বছর বোরো ধানের চাষ হয় এবং প্রায় ৬.০ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয় যা হতে ৭.০ লাখ টন সরিষা উৎপাদিত হচ্ছে। যদি বোরো চাষের আওতাধীন উক্ত জমির মধ্যে ১৫ লাখ হেক্টর জমিতে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন আমন ধানের জাত (বিনাধান-৭)-উচ্চফলনশীল সরিষা জাত (বিনাসরিষা-৪)- ব্রাউশ ধানের জাত (বিনাধান-১৪) এ শস্যক্রম সম্প্রসারণ সম্ভব হয় তবে ৩০ লাখ টন  অতিরিক্ত সরিষা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে সর্বমোট ৩৭ লাখ টন সরিষা উৎপাদন সম্ভব হবে যা থেকে ১৩-১৪ লাখ টন ভোজ্যতেল পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে বর্তমানে ভোজ্যতেলের মোট চাহিদা ১২ লাখ টন (জনপ্রতি প্রতিদিন ২২ গ্রাম ধরে ১৬ কোটি মানুষের জন্য)।


 অন্যদিকে বর্তমানে বাংলাদেশে  প্রায়  ৯.০ লাখ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ডাল ফসল চাষ হচ্ছে যা হতে ১০.০ লাখ টন ডাল উৎপাদিত হচ্ছে। যদি বোরো চাষের আওতাধীন ৪৬-৪৮ লাখ হেক্টর জমির মধ্যে আরও ১০ লাখ হেক্টর জমিতে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন আমন ধানের জাত (বিনাধান-৭)-উচ্চফলনশীল ডালের জাত (বিনামসুর-৬/বিনখেসারি-১)- ব্রাউশ ধানের জাত (বিনাধান-১৪) এ শস্যক্রম সম্প্রসারণ সম্ভব হয় তবে ২০ লাখ টন  অতিরিক্ত ডাল পাওয়া যাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে সর্বমোট ৩০ লাখ টন ডাল উৎপাদন সম্ভব হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে ডালের মোট চাহিদা ২২ লাখ টন (জনপ্রতি প্রতিদিন ৪৫ গ্রাম ধরে ১৬ কোটি মানুষের জন্য)।


একইভাবে  বর্তমানে বাংলাদেশে  প্রায় ৫.০ লাখ হেক্টর জমিতে গমের চাষ হচ্ছে যা হতে ১৩.০ লাখ টন গম উৎপাদিত হচ্ছে। যদি উপরোক্ত বোরো চাষের আওতাধীন জমির মধ্যে আরও ৫.০ লাখ হেক্টর জমিতে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন আমন ধানের জাত (বিনাধান-৭)-উচ্চফলনশীল গমের জাত (বিনাগম-১)- ব্রাউশ ধানের জাত (বিনাধান-১৪) এ শস্যক্রম সম্প্রসারণ সম্ভব হয় তবে ২০ লাখ টন  অতিরিক্ত গম পাওয়া যাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে মোট ৩৩ লাখ টন  গম উৎপাদন সম্ভব হবে যা আমাদের মোট গমের বর্তমান চাহিদার চেয়ে  মাত্র ৭.০ লাখ টন কম।


বাংলাদেশে বর্তমানে বোরো ধানের জাতগুলোর মধ্যে ব্রি ধান২৮ বোরো চাষের আওতাধীন জমির অর্ধেকেরও বেশি জমিতে চাষ হচ্ছে। ব্রি ধান২৮ এর গড় ফলন ৬.০ টন/হে.। অপরদিকে বিনাধান-১৪ এর গড় ফলন ৬..৮৫ টন/হে.। যদি ব্রি ধান-২৮ এর পরিবর্তে বিনাধান-১৪ ভিত্তিক শস্যক্রম তিনটি অনুসরণ করা যায় তবে একদিকে বাংলাদেশ ডাল ও ভোজ্যতেল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ করবে পাশাপাশিভাবে গমের উৎপাদন ও বহুগুণে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং ৩০ লাখ হেক্টর জমি হতে প্রায় ২৫ লাখ ৫০ হাজার টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদন সম্ভব হবে।


নিম্নে বিনাধান-১৪ এর উদ্ভাবন, শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদন কৌশল আলোচনা করা হলো-


উদ্ভাবনের ইতিহাস
বিনাধান-১৪ এর মিউট্যান্ট সারি নং- আরএম(১)-২০০(সি)-১-১০। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকার স্থানীয় ধানের জাত আঁশফলের বীজে কার্বন আয়ন রশ্মি প্রয়োগ করে এর কৌলিক বৈশিষ্ট্যে স্থায়ী পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয়েছে। পরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নাবি বোরো  মৌসুমে অর্থাৎ লম্বা জীবনকালসম্পন্ন সরিষা কাটার পরে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের ২য় সপ্তাহ হতে মার্চ মাসের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত রোপণ করে সন্তোষজনক ফল পাওয়ায় জাতীয় বীজ বোর্ড এটিকে নাবি বোরো মৌসুমে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য ২০১৪ সালে ছাড় করে।


শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য
বিনাধান-১৪ এ আধুনিক উফশী বোরো  জাতের প্রায় সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতা ৮৫-১০০ সেমি. এবং হেলে পড়ে না,  জীবনকাল ১০৫-১২৫ দিন, ধানের রঙ উজ্জ্বল স্বর্ণালী বর্ণের এবং বেশ লম্বা ও চিকন। ১০০০ ধানের ওজন ২৩.১৮ গ্রা. এবং গড় ফলন ৬.৮৫ টন/হে.।


প্রচলিত জাতের তুলনায় এর বৈশিষ্ট্য
বিনাধান-১৪ প্রচলিত স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন বোরো ধানের জাত  ব্রি ধান২৮ অপেক্ষা উচ্চতায় খাটো এবং প্রায় ৪-৫ দিন আগে পাকে। ধান ও চাল ব্রি ধান২৮ এর চেয়ে লম্বা্ ও চিকন। জীবনকাল কম ও উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল হওয়ায় ফেব্রুয়ারি মাসের ২য় সপ্তাহ হতে মার্চ মাসের ৩য় সপ্তাহে রোপণ করলেও মে মাসের ২য় সপ্তাহ হতে জুন মাসের ১ম সপ্তাহে কাটা যায়। বিনাধান-১৪ জাতটির চালে প্রায় শতকরা ১০ ভাগ আমিষ আছে যা ধানের অন্যান্য জাতের তুলনায় প্রায় শতকরা ২ ভাগ বেশি। দেরিতে রোপণসহ স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন হওয়ায় এ জাতটি অন্যান্য বোরো ধানের জাত অপেক্ষা শতকরা ২০-৩০ ভাগ সেচের পানি সাশ্রয়ী। বাংলাদেশে এখন প্রায় প্রতি বছরই শীতকালে অতি নিম্ন তাপমাত্রার কারণে ধানের চারা মারা যায় ফলে কৃষক দিশা হারা হয়ে পড়ে। বিনাধান-১৪ যেহেতু ফেব্রুয়ারি মাসের ২য় সপ্তাহ থেকে মার্চ মাসের ৩য় সপ্তাহ পর্যন্ত লাগাতে হয় এ কারণে এর চারা জানুয়ারি মাসের ৩য় সপ্তাহে (যখন তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে) বীজতলায় ফেলতে হয়। এ কারণে বিনাধান-১৪ এর চারা উৎপাদন নিম্ন তাপমাত্রার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

চাষাবাদ পদ্ধতি
বপন সময় : এ জাতের বীজ অঞ্চল ভেদে  জানুয়ারি মাসের ২য় সপ্তাহ হতে জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলায় ফেলা যায়।  বীজতলায় চারা করার পর লাইন করে চারা রোপণ করতে হয়। রোপণের জন্য চারার বয়স ৩০-৪০ দিন হতে হবে। তবে চারার বয়স ৫০-৬০ দিন হলেও ফলনে তেমন তারতম্য হয় না।


রোপণের সময় ও দূরত্ব : ফেব্রেুয়ারি মাসরে ২য় সপ্তাহ হতে মার্চ মাসের ৩য় সপ্তাহ পর্যন্ত চারা রোপণ করা যাবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৮ ইঞ্চি ও চারা হতে চারার দূরত্ব ৬ ইঞ্চি রাখতে হবে।

 

সারের মাত্রা ও প্রয়োগ : হেক্টরপ্রতি ২৬০-৩২৫ কেজি ইউরিয়া, ১০০-১৪০ কেজি টিএসপি ও মিউরেট অব পটাশ ৬৫-১১০ কেজি, জিপসাম ৫ কেজি জিংক সালফেট এবং ৫.৮৮ কেজি বরিক এসিড প্রয়োগ করতে হবে। তবে ক্ষেত্র বিশেষে ইউরিয়া কিছুটা কম দেয়া যায়। পুরো টিএসপি, মিউরেট অব পটাশ, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বরিক এসিড জমি তৈরির শেষ চাষের সময় একবারে প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার সমান তিন ভাগে  ভাগ করে প্রথম ভাগ রোপণের ৭-১০ দিন পরে বাকি ইউরিয়া রোপণের ২৫ ও ৩৫ দিনের মধ্যে উপরি প্রয়োগ করতে হয়। জাতটির জীবনকাল কম বলে তিন বার ওপর প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটু ঘন ঘন সময়ে ইউরিয়া ওপর প্রয়োগ করতে হয়।


আগাছা-রোগ-পোকা দমন : ধানের মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ দেখা দিলে ক্লোরানট্রানলিপি্রোল গ্রুপের কোরাজনে বা ভিরতাকো ব্যবহার করা যেতে পারবে। কোরাজনে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৩ মিলি বা ভিরতাকো প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১.৫ গ্রাম ৫ শতক জমির জন্য প্রয়োগ করতে হবে। ধানের খোলপোড়া রোগের জন্য হেক্সাকোনাজল বা ডাইফনোকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি একরে ২০০ মিলি মাত্রায় প্রয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়াও ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ দেখা দিলে ট্রুপার প্রতি একরে ১৬০ গ্রাম মাত্রায় প্রয়োগ করা যায়।


আন্তঃপরিচর্যা : অন্যান্য উফশী বোরো ধান  জাতের মতোই। চারা রোপণের পর আগাছা দেখা দিলে নিড়ানি বা হাতের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার এবং মাটি নরম করতে হবে।


ফসল কর্তন : অঞ্চলভেদে এপ্রিলের মাঝামাঝি হতে মে মাসের মাঝামাঝি র্পযন্ত।


আঞ্চলিক উপযোগিতা : দেশের প্রায় সব উঁচু ও মধ্যম উঁচু জমিতে বিশেষ করে মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, চলনবিল, রংপুর, লালমনিরহাট, কুমিল্লা, মাগুরা, কুষ্টিয়া, যশোর, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহে ভালো ফলন আশা করা যায়।
 

বিনাধান-১৪ চাষে চাষি ভাইদের যে যে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে
মাঘ মাসের শেষ সপ্তাহের আগে রোপণ করা যাবে না।

 

যেসব জমিতে পানি আটকে থাকে সেসব জমিতে লাগানো যাবে না।
 

ধান হলদে রঙ ধারণ করার সাথে সাথে জমি শুকিয়ে  ফেলতে হবে।
 

ধান অতিরিক্ত পরিপক্ব হওয়ার আগে কাটতে হবে।

সবশেষে যে বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো যেহেতু বিনাধান-১৪ বোরো মৌসুমে ধান লাগানো শেষ হওয়ারও অনেক পরে লাগাতে হয় সেহেতু বিচ্ছিন্নভাবে দু’এক টুকরা জমিতে না লাগিয়ে পুরো একটি ব্লকের সব জমিতে লাগাতে হবে। সেক্ষেত্রে আমন মৌসুমে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন আমন ধান কাটার পর উচ্চফলনশীল সরিষা/গম/গোলআলু/ মসুর/খেসারি/শীতকালীন শাকসবজি চাষের পর বিনাধান-১৪ চাষ করতে হবে। এতে করে সেচ নিয়ে যে বিড়ম্বনা সেটি আর থাকবে না এবং রোগ-পোকা-মাকড়ের আক্রমণও অনেক কম হবে।

 

*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, বিনা, ময়মনসিংহ-২২০২;০১৭১০৭৬৩০০৩

 ড. মো. অবুল কালাম আজাদ*

বিস্তারিত
বীজ ধান উৎপাদন ও সংরক্ষণ কলাকৌশল

বীজ কৃষির ভিত্তি। বীজ জীবন্ত এবং প্রয়োজনীয় সব উপাদান দ্বারা এমন অনুপমভাবে সুসজ্জিত যে সঠিক সময়ে আকাঙিক্ষত স্থানে অনুকূল পরিবেশ পেয়ে নতুন বংশধরের সূচনা করতে পারে। এ জীবন্ত বস্তুটিকে পরবর্তী মৌসুম পর্যন্ত ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যেসব কাজ ও কৌশল অবলম্বন করতে হয় সেগুলোকেই বীজ সংরক্ষণ বলে। বীজ সংরক্ষণ মৌলিক তত্ত্বের একটি প্রধান নীতি হলো, যে গুণগত মান নিয়ে বীজ গুদামে ঢোকে, বাহিরে আসার পর সে মান তার চেয়ে ভালো নাও হতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, বীজ যতই ভালো হোক না কেন তা যদি ভালোভাবে সংরক্ষণ করা না যায় তবে সে বীজ ভালো থাকবে না। সংরক্ষণকালীন সময়ে বীজের জীবন এবং বীজের মান নির্ভর করে  বীজ ফসল কর্তনপূর্ব ও পরবর্তী কাজগুলো সঠিকভাবে করা হয়েছে কিনা তার ওপর। তাই ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির মূল উপকরণই হচ্ছে উন্নতমানের বীজ। বাংলাদেশে ভালো বীজের ব্যবহার অত্যন্ত অপ্রতুল। এর কারণ একদিকে সরকারি পর্যায়ে ভালো বীজের উৎপাদন ও বিতরণের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপর্যাপ্ত। অন্যদিকে বেসরকারি পর্যায়ে ভালো বীজের উৎপাদন ও বিতরণের ব্যবস্থা এখনও বিশ্বস্তভাবে গড়ে উঠেনি। এছাড়া চাষি পর্যায়েও ভালো বীজের ব্যবহারের গুরুত্ব ব্যাপকভাবে গ্রহণ হয় নাই। বর্তমানে প্রায় ৯০% কৃষক নিজেদের  উৎপাদিত বীজ দ্বারাই নিজেদের চাহিদা পূরণ করে থাকেন। কিন্তু এ বীজ প্রকৃত গুণগত মানসম্পন্ন নয় বলে অধিক ফলন লাভ প্রায় অসম্ভব। কৃষক পর্যায়ে উন্নতমানের বীজ উৎপাদনের কলাকৌশল এবং বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তির অপ্রতুলতা মুখ্য কারণ। অন্যদিকে যেহেতু কৃষকের রক্ষিত ধানই বীজ সরবরাহের প্রধান উৎস, সেহেতু বেশিরভাগ কৃষকই তাদের রক্ষিত বীজ ধান বদলান না, যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের রক্ষিত বীজের গুণগতমান নষ্ট হয়ে যায়। অতএব ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকের রক্ষিত বীজের গুণগতমান উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে। কৃষকের জমিতে ধান বীজ উৎপাদন, বাছাই এবং সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার ওপর কৃষককে সচেতন করতে পারলে এ উদ্দেশ্য সফল করা সহজ হবে। কৃষক যাতে তাদের জমিতে উন্নতমানের বীজ উৎপাদন, বাছাই ও বর্ধনের উন্নতি পদ্ধতি এবং বীজ সংরক্ষণে উন্নত কলাকৌশল সম্পর্কে সচেতন হয়ে মানসম্পন্ন বীজ ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের ফলন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য  ভূমিকা পালন করতে পারেন তার বলিষ্ঠ প্রচেষ্টা নেয়া প্রয়োজন।


বীজ উৎপাদনের আধুনিক পদ্ধতি
কেবলমাত্র আধুনিক ধানের জাত ব্যবহার করলেই ভালো বীজ উৎপাদন আশা করা যায় না। মানসম্পন্ন বীজ পেতে হলে ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন সরবরাহ ও উপযুক্ত পরিবেশের জোগান দেয়া দরকার। ধান চাষের জন্য যথাসময়ে বীজ বপন ও চারা রোপণ যেমন জরুরি তেমনি সার, সেচ, কীটনাশক ইত্যাদি প্রয়োগের উপযুক্ত সময় এবং প্রয়োগবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। বীজ ধানের ভালো ফলন পেতে হলে জাত নির্বাচন থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ফসলের পরিচর্যা করে যেতে হবে।


ধান বীজ সংরক্ষণপূর্ব চাষি ভাইদের করণীয়
ক্ষেতে অবস্থিত ফসল থেকে কাঙ্খিত গাছগুলো একটি একটি করে বাছাই করে বা ক্ষেতের শস্যের অংশ বিশেষকে বীজের জন্য চিহ্নিত/বাছাই করতে হবে। ক্ষেতের বেশি সবল ও সুস্থ অংশ বাছাই করার জন্য মাঠের অংশ বিশেষ শনাক্ত করা উচিত।

 

ক্ষেতে অবস্থিত কাক্সিক্ষত প্রতিটি গাছ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সাধ্যমতো ক্ষেতের কিনারা বাদ দিয়ে ভেতর থেকে এমন গাছ বাছাই করতে হবে যেগুলো সঠিক জাতের এবং বেশ পুষ্ট ও সুস্থ হয়।
 সহজভাবে শনাক্তকরণের জন্য বাছাই করা প্রতিটি গাছ কাঠি দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে। বীজ সংগ্রহের জন্য পরিপক্ব অবস্থায় প্রথম বাছাই করা গাছ কাটতে হবে এবং পরে মাঠের অবশিষ্ট ফসল কাটা উত্তম।


বীজের জন্য কেটে নেয়া গাছগুলো আলাদাভাবে রাখতে হবে যাতে এগুলো একই ফসলের সাথে অন্যগাছের দানা মিশে না যায়। বীজের গুণাগুণ নষ্ট হওয়া রোধের জন্য বাছাই করা গাছগুলো ভালোভাবে শুকাতে হবে।


বীজের জন্য ক্ষেতের অংশ বিশেষ বাছাই পদ্ধতির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শস্যক্ষেতের মাঝ থেকে অথবা যতদূর সম্ভব ভেতর থেকে অংশ বিশেষ নির্বাচন করা দরকার।
সংরক্ষিত এলাকার প্রতি নিয়মিত বিশেষ দৃষ্টিসহ উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণ করার পর, ফসল পাকার সময় গাছের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা দরকার যাতে বিজাতীয় গাছ কেটে সরিয়ে ফেলা যায়।


জমিতে ধান পাকলে বা ধান গাছ শুকিয়ে গেলে ধান কাটায় বিলম্ব করা মোটেই উচিত নয়। এতে কিছু ধান ঝরে পড়তে পারে এবং ধানের শীষকাটা লেদাপোকা এবং পশুপাখির আক্রমণ হতে পারে। শীষের অগ্রভাগ থেকে ধান পাকা শুরু হয়।


কাছে গিয়ে সারা ক্ষেতের ধান পাকা পরীক্ষা করতে হবে। শীষের অগ্রভাগের শতকরা ৮০ ভাগ ধানের চাল শক্ত ও স্বচ্ছ এবং শীষের নিচের শতকরা ২০ ভাগ ধানের চাল আংশিক শক্ত ও স্বচ্ছ হলে ধান ঠিকমতো পেকেছে বলে বিবেচিত হবে।


ধান মাড়াই করার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গা বেছে নেয়া দরকার। কাঁচাখোলার ওপর সরাসরি ধান মাড়াই না করে চাটাই বা হোগলার ওপর ধান রেখে পা দিয়ে বা উপযুক্ত মাড়াই যন্ত্রের সাহায্যে ধীরে ধীরে মাড়াই করা দরকার। অথবা ধানের আটি তিন বাড়ি দিয়ে যে পুষ্ট-ভারী ধান পাওয়া যাবে শুধুমাত্র সেগুলোকেই কুলা দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার ও শুকানোর পরে বীজ হিসাবে নেয়া যাবে।


এভাবে ধান মাড়াই করলে ধানের ক্ষতি কম হয় এবং ধান পরিষ্কার থাকে। বীজ ধান এভাবে মাড়াই করার পর অন্তত পক্ষে ৪-৫ বার রোদে শুকিয়ে নেয়া দরকার। বাদলা দিন থাকলে ধান মাড়াই করা ও শুকানো কষ্টকর হয়। সেজন্য  শীষ কেটে ছোট ছোট আঁটি করে ঘরের ভেতর ঝুলিয়ে দিয়ে শুকানো যায়। না হলে ধানের বীজ গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
 

বীজ সংরক্ষণ : বীজ ধান ঠিকমতো সংরক্ষণ না করলে একদিকে কীটপতঙ্গ ও ইঁদুর নষ্ট করে, অপরদিকে গজানোর ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বীজ ধান থেকে আশানুরূপ সংখ্যক চারা পাওয়া যায় না। বীজ ধান কাটা ও মাড়াইয়ের পর ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপগুলো মেনে চলা প্রয়োজন।


বীজ সংরক্ষণের আগে পর পর কয়েকবার রোদে অথবা প্রয়োজনে ড্রায়ারের সাহায্যে ভলোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে যেন বীজের আর্দ্রতা শতকরা ১২ ভাগের নিচে থাকে। দাঁত দিয়ে বীজ কাটলে কট কট শব্দ করে তাহলে বুঝতে হবে বীজ ঠিকমতো শুকিয়েছে।


বড় বড় পুষ্ট ধান বাছাই কবে নিতে হবে। কুলা দিয়ে ঝেড়ে ১.৭৫-২.৫০ মিলিমিটার (জাতের ওপর নির্ভর করে) ছিদ্র বিশিষ্ট তারের দড়ির ছাঁকনি দিয়ে বাছাই করে নেয়া যেতে পারে।
যে পাত্রে বীজ রাখা হবে তাতে যেন কোনো ছিদ্র না থাকে। বীজ রাখার জন্য তেলের ড্রামে কিংবা বিস্কুট বা কেরোসিনের টিন প্রভৃতি ধাতব পাত্র ব্যবহার করা ভালো।


 ধাতব ব্যবহার করা সম্ভব না হলে মাটির মটকা, কলস, প্লাস্টিক ড্রাম বা মোট পলিথিনের থলি ব্যবহার করা যেতে পারে। পাত্র ভালোভাবে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিতে হবে। মাটির পাত্র হলে পাত্রের বাইরের গায়ে আলকাতরা দিয়ে দুইবার প্রলেপ দিতে হবে।


রোদে শুকানো বীজ ঠাণ্ডা করে পাত্রে ভরতে হবে। পাত্রটি সম্পূর্ণ বীজ দিয়ে ভরাট করে রাখতে হবে। যদি বীজের পরিমাণ কম হয় তবে বীজের ওপর কাগজ বিছিয়ে তার ওপর শুকানো বালি অথবা ছাই দিয়ে পাত্র পরিপূর্ণ করতে হবে।


এবার পাত্রের মুখ ভালোভাবে বন্ধ করতে হবে যেন বাতাস ঢুকতে না পারে। বীজের পাত্র মাচায় রাখা ভালো যাতে পাত্রের তলা মাটির সংস্পর্শে না আসে। গুদামে বায়ু চলাচলের পার্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে।


বীজ কখনও সেঁতসেঁতে জায়গায় সংরক্ষণ করা ঠিক নয়। সংরক্ষণ করা বীজ মাঝে মাঝে পরীক্ষা করা দরকার যাতে কোনো প্রকার পোকামাকড় বা ইঁদুর ক্ষতি করতে না পারে।
 দরকার হলে বীজ বের করে মাঝে মধ্যে শুকিয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে পরবর্তী মৌসুমে বীজ ব্যবহার, বিক্রয় বা বিতরণের আগে অবশ্যই বীজ গজানোর পরীক্ষা করা দরকার। সেক্ষেত্রে কমপক্ষে ৮০টি সুস্থ-স্বাভাবিক চারা গজিয়েছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।


সুতরাং খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের জন্য ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিই একমাত্র পথ। আর এ ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির মূল উপকরণই হচ্ছে সুস্থ, সবল, এবং সুপুষ্ট উন্নতমানের বীজ। জেনে রাখা ভালো বীজকে বলা হয় ‘শান্তির দূত’; ‘ভালো বীজে করলে চাষ, ফলন দ্বিগুণ,মিটবে আশ’।

 

কৃষিবিদ মো. তারিক হাসান*
*সাবেক মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫    

 

বিস্তারিত
বিচিকলা ফেলনা নয় আছে অনেক গুণ

বিচি কলা (Musa acuminata), Musaceae পরিবারভুক্ত একটি ফল উৎপত্তি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় (নিউগিনি, আগ ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন)। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৮০০০ বছর পূর্ব থেকে এটি মানুষ চাষ করে আসছে। বসতবাড়িতে চাষ করা হয় এমন গাছপালার মধ্যে এটি প্রথম দিকের উদাহরণ। কলা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ফল, যা সারা বছর পাওয়া যায়। স্বল্পমেয়াদি হয় অঞ্চলের আবহাওয়া উপযোগী সহজে চাষ করা যায় বিধায় বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায় কলার চাষ হয়। পাকা কলা অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন,  সুস্বাদু ও সহজপ্রাপ্য বলে সবার কাছে সমাদৃত। কলা একটি ক্যালরি সমৃদ্ধ ফল। বাংলাদেশে অনেক জাতের কলার চাষ হয়। এর মধ্যে অমৃতসাগর, সবরি, চম্পা, কবরী, মেহেরসাগর, বারি কলা-১, বারি কলা-৩, বারি কলা-৪ জাতগুলো বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। এছাড়া বিভিন্ন জাতের আনাজি বা কাঁচাকলা ও বিচিকলা সীমিত আকারে উৎপাদিত হয়ে থাকে।


বিচিকলা ব্যতিক্রমধর্মী এক ধরনের কলা, সাধারণত কলা বীজবিহীন (parthenocarpic) ফল হলেও এতে প্রচুর বীজ থাকে। বিচি কলার গাছ বেশ উঁচু, লম্বা ও অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু হয়ে থাকে। ফলে ঝড়, তুফান কিংবা জলাবদ্ধতা তেমন ক্ষতি করতে পারে না। বিভিন্ন ধরনের কলা রোপণের পর থেকে ১০-১২ মাসে ফল আহরণ করা গেলেও, বিচি কলা পরিপক্ব হতে আঠার মাস সময় লাগে। বিশেষ কোনো যত্ন ছাড়াই বিচিকলা ভালোভাবে জন্মানো যায়।  ফলের ওজন ১৫০-২০০ গ্রাম । পাকা ফল হলুদ রঙের এবং মিষ্টি, চামড়া তুলনামূলকভাবে পুরু, সুমিষ্ট এবং তাপমাত্রায় অধিক সময় সংরক্ষণ করা যায়। দেশের গ্রামাঞ্চলে সর্বসাধারণের কাছে বিচিকলা অত্যন্ত জনপ্রিয়।


উদ্ভিদতত্ত্ব : এটি চিরসবুজ ও বহুবর্ষজীবী এর ভুয়া/নকল কাণ্ড (Pseudostem) কন্দ (corm) থেকে উৎপন্ন শক্তভাবে জড়ানো Leaf sheath দ্বারা তৈরি। পুষ্পমঞ্জরি ভুয়া কাণ্ড (trunk) থেকে সমান্তরাল বা তেড়ছাভাবে (oblique) বের হয়ে আসে। ফুলগুলো সাদা থেকে হলুদাভ সাদা এবং মাটি থেকে ওপরের দিকে জন্মে (negatively geotropic)। একটি পুষ্পমঞ্জরিতে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল থাকে। স্ত্রী ফুল পুষ্পমঞ্জরির গোড়ার দিকে ও পুরুষ ফুল অগ্রভাবে থাকে। ফলকে বেরি বলা হয়। ফলের আকার এর ভেতরের বীজের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে। একটি ফলে ১৫ থেকে ৬২টি বীজ থাকতে পারে। একটি কাঁদিতে  (bunch) ৬১ থেকে ১৬২ টি ফল থাকতে পারে। প্রতিটি বীজ তার ৪ গুণ আকারের শর্করাযুক্ত পাল্প তৈরি করে।


কলার পুষ্টিমান : পাকা বিচি কলায় প্রচুর পরিমাণে শর্করা বিদ্যমান, যা শক্তির অন্যতম উৎস। বিভিন্ন  প্রকার ভিটামিন এ, বি৬, সি এবং ডি এর একটি অসাধারণ উৎস। এটি পটাশিয়ামের একটি অনন্য উৎস, যেখানে একজন মানুষের দৈনিক প্রয়োজনের ২৩% পটাশিয়াম একটি কলা থেকে পাওয়া যায়। পটাশিয়াম পেশি নিয়ন্ত্রণ করে। কলার পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনা কমায়। শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতিদিন প্রয়োজনীয় বি৬ এর ৪১% ই কলায় থাকে। কলায় প্রচুর লৌহ থাকে।


ঔষধিগুণ : বিচি কলার অনেক ঔষধি (medical benefits) গুণ আছে। কলায় প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, নাইট্রোজেন এবং ফসফরাস থাকে, যা শরীরে স্বাস্থ্যকর টিস্যু গঠনে কাজ করে। কলা গাছের সব অংশের ঔষধি  ব্যবহার রয়েছে। ফুল ব্রংকাইটিস, আমাশয় এবং আলসার, রন্ধনকৃত ফুল ডায়বেটিস গাছের কষযুক্ত (astringent) রস হিস্টেরিয়া, কুষ্ঠ, জ্বর, রক্তক্ষরণ বন্ধ, স্থায়ী আমাশয় এবং ডায়রিয়া গাছের শিকড় পরিপাকজনিত সমস্যা এবং আমাশয়ে ব্যবহৃত হয়। কলার বীজের মিউসিলেজ (mucilage) ডায়রিয়া হলে ব্যবহৃত হয়। সম্পূর্ণ পাকা কলার খোসা ও পাল্পে ছত্রাক বিরোধী ও অ্যান্টিবায়োটিক গুণাবলি পাওয়া যায়। সবুজ কলার খোসা ও পাল্পের দ্বারা তৈরি ছত্রাকনাশক টমেটোর ছত্রাকজনিত রোগ দমনে ব্যবহৃত হয়। Naorepinephrine, dopamine এবং Serotonin পাকা কলার পাল্প ও খোসায় থাকে। প্রথম দুটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। Serotonin গ্যাস্ট্রিকজনিত নিঃসরণ (serotonin) রোধ করে এবং অন্ত্রীয় মসৃণ মাংসপেশীকে উদ্দীপিত করে। কলা অন্ত্রীয় সমস্যা বিশেষত আলসার নিরাময়ের জন্য কাজ করে। কলা গ্যাস্ট্রিকজনিত অম্লত্ব (acidity) প্রশমন করে। কলা কোষ্টকাঠিন্য  (constipation) দূরীকরণে সাহায্য করে। কলার ভুয়া কাণ্ডের ভেতরের কোনো অংশ থেকে প্রস্তুত রস কিডনি ও মূত্রাশয়ের পাথর দূরীকরণে উপকারী। কলা মানুষের কৃমিজনিত সমস্যা দূরীকরণে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, শুধুমাত্র ২টি কলা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে ৯০ মিনিটের কাজ করার শক্তি পাওয়া যায়। কলায় tryptophan নামক এক প্রকার প্রোটিন থাকে, যা শরীরে serotonin এ রূপান্তরিত  হয় এবং অবসাদ মুক্ত রাখে। কলা ওজন কমাতে সাহায্য করে।


স্থানীয় জাত বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায়/অঞ্চলে এ কলা এঁটে কলা, বাইশ্যাকলা, আইট্টা কলা, বিচি কলা নামে পরিচিত। কিছু স্থানীয় জাত হলো- বতুর আইটা (Batur Aita) : ভুয়া কাণ্ডের উচ্চতা ৩৩৫-৪২৭ সেন্টিমিটার। মাঝারি আকারের এঁটে কলার অগ্রভাগ একটু ভোঁতা প্রকৃতির। প্রতি কাঁদিতে ৭-১৪টি ফানা এবং ৮০-১৫০ টি কলা থাকে। প্রতি ফানায় ১৬-১৮টি কলা হয়। কাঁদির ওজন ১৪-২৫ কেজি। কলার সংখ্যা  ১০০-২০০। প্রতিটি কলা ১৩-১৮ সেমি. দীর্ঘ। কলা খেতে খুব মিষ্টি। গোমা (Goma) : ভুয়া কাণ্ড ২৭৪-৩৩৫ সেন্টিমিটার উঁচু। এটি কিছুটা গোলাকার এঁটে কলা। কলার দৈর্ঘ্য ৯-১১ সেন্টিমিটার। কাঁদিতে ৪-৬ টি বা ততোধিক ফানা এবং ৬০-৭৫টি কলা ধরে। ফানায় কলার সংখ্যা ১১-২৫। কাঁদির ওজন ৯-১৩ কেজি। কলায় বীজের সংখ্যা ৩৫-৬০টি। জপ-কদলি (Japkadali) : গাছ প্রায় ২৭৪-৩৩৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ হয়। এটি দেখতে এঁটে কলার মতো। তবে কখনও কখনও আনাজি কলারূপেও ব্যবহৃত হয়। এ কলাটি প্রায় বীজশূন্য (২-৪টি বীজ) বলে এটি বেশ জনপ্রিয়।  দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার। কাঁদিতে ৫-৮টি ফানা এবং ৬০-১৫০টি কলা হতে পারে। কাঁদির ওজন ১২-২৪ কেজি। নিয়াইল্লা (Nialya) : এটা এত উন্নতমানের বিচি কলা নয়। এটি কদাচিৎ দেখা যায়। কলা  ১০-১৩ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এবং কিছুটা গোলাকার ভাবাপন্ন। বীজ ৬০-১০০টি। শাংগি আইটা (Shangi Aita) : গাছের উচ্চতা ৩০৫- ৪২৭ সেন্টিমিটার। এ বৃহদাকারের এঁটে কলাটি ময়মনসিংহের স্থান বিশেষে ভিম আইটা ও  উত্তর শ্রীহট্টের খাসিয়ারা কর্তৃক কাইতশিং নামে অভিহিত হয়। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র দেখা যায়। বেশ মিষ্টি। দৈর্ঘ্যে ১৫-১৮ সেন্টিমিটার ও বেশ চওড়া হয়। কাঁদিতে ৭-১১ ফানা এবং কাঁদির ওজন ১৭-৩০ কেজি হয়। বীজের সংখ্যা ১৫০-২৩০ এর  মতো।


বংশবিস্তার : অন্যান্য জাতের কলার মতো বিচিকলা গাছের রাইজম বা গোড়া থেকে উৎপন্ন অসি চারা বা সাকার বা তেউরের সাহায্যে বংশ বিস্তার হয়ে থাকে। অসি তেউর (sword sculler)  মূল কন্দ থেকে বের হয়। গোড়া থেকে উপরের দিকে সরু দেখতে অনেকটা তলোয়ারের মতো।  অসি তেউড়ের পাতা সরু সুচালো গুড়ি বড় এবং চারা শক্তিশালী। বিচিকলা বীজ বা সাকার দ্বারা বংশবিস্তার করা যায়। নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য এখনও বীজ গবেষণায় ব্যবহৃত হয়। পরিপক্ব বীজ বপনের ২-৩ সপ্তাহ পর অংকুরোদগম হয়। বীজ কয়েক মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত সতেজ (viable) অর্থাৎ সংরক্ষণ করা যায়। অনেক বন্য প্রজাতি (frugivorous বাদুর, পাখি, কাঠবিড়ালি, ইদুঁর, বানর এ ফল খায়  এবং বীজকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে ছড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কলা থেকে উৎপন্ন গাছ (plantlets) বীজ থেকে উৎপন্ন গাছের তুলনায় বেশি বাঁচে।  


রোপণ :  বছরের যে কোনো সময়েই বিচি কলার চারা রোপণ করা যায়। তবে কলা রোপণের উত্তম সময়, আশ্বিন-কার্তিক (মধ্য সেপ্টেম্বর-মধ্য নভেম্বর), মাঘ-ফাল্গুন (মধ্য জানুয়ারি-মধ্য মার্চ) এবং চৈত্র-বৈশাখ (মধ্য মার্চ- মধ্য মে)। অতিমাত্রায় বর্ষা ও অতিরিক্ত শীতের সময় চারা না লাগানোই উত্তম। বিশেষ কোনো যত্ন ছাড়াই বিচি কলা ভালোভাবে জন্মানো যায়। তবে ভালো ফলন পেতে হলে বা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করতে হলে, জমি ভালোভাবে চাষ করে ২.০ মিটার দূরে ও ৬০x৬০x৬০ সেন্টিমিটার আকারের গর্ত খনন করতে হবে। প্রতি গর্তে সম্পূর্ণ গোবর/আবর্জনা পচাসার, টিএসপি, জিপসাম, জিঙ্ক সালফেট এবং বরিক এসিড সার গর্ত তৈরির সময় গর্তে দিয়ে ১৫-২০ দিন পর চারা রোপণ করতে হবে ।


সার প্রয়োগ : গাছপ্রতি আর হেক্টরপ্রতি সার লাগবে ইউরিয়া ৫০০ গ্রাম ও ১২৫০ কেজি, টিএসপি ৪ গ্রাম ও ১ হাজার কেজি, এমওপি ৬ গ্রাম ও ১৫ কেজি, জিপসাম ২ গ্রাম ও ৫ কেজি, দস্তা ৪. গ্রাম ও ১১ কেজি এবং বরিক এসিড ২ গ্রাম ও ৫ কেজি। পরিমাণ মতো গোবরের সাথে সম্পূর্ণ গোবর, টিএসপি, জিপসাম, জিঙ্ক সালফেট এবং বরিক এসিড সার গর্ত তৈরির সময় গর্তে দিতে হয়। ইউরিয়া ও এমওপি চারা রোপণের ২ মাস পর থেকে ২ মাস পরপর ৩ বারে এবং ফুল আসার পর আরও একবার গাছের চারদিকে ছিটিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। জমির আর্দ্রতা কম থাকলে সার দেয়ার পর হালকা পানি সেচ দিতে হবে।


পানি সেচ ও নিকাশ : শুকনো মৌসুমে ১৫-২০ দিন অন্তর অন্তর সেচ দিতে হবে। বর্ষার সময় বাগানে যাতে পানি জমতে না পারে, তার জন্য নালা করে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
 

সাকার বা চারা ছাঁটাই : চারা রোপণের পর থেকে কলার কাদি বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত গাছের গোড়ায় কোনো চারা রাখা উচিত নয়। কাদি সম্পূর্ণ বের হওয়ার পর গাছপ্রতি একটি করে চারা রেখে বাকি চারাগুলো কাঁচি বা হাঁসুয়া দিয়ে মাটির সমতলে কেটে ফেলতে হবে। সময়মতো আগাছা দমন, অপ্রয়োজনীয় পাতা পরিষ্কার, খুঁটি ও গোড়ায় মাটি দেয়া, মোচা অপসারণ, কাঁদি ঢেকে দেয়া ইত্যাদি পরিচর্যা করতে হবে।


কলা সংগ্রহ ও ফলন : রোপণের ১৮-২০ মাসের মধ্যেই সাধারণত সব জাতের বীচি কলা  পরিপক্ব হয়ে থাকে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করলে কলার গাঁয়ের শিরাগুলো তিন-চতুর্থাংশ পুরো হলেই কাটতে হয়। তাছাড়াও কলার অগ্রভাগের পুষ্পাংশ শুকিয়ে গেলেই বুঝতে হবে কলা পুষ্ট হয়েছে। সাধারণত মোচা আসার পর ফল পুষ্ট হতে ৩-৪ মাস সময় লাগে। কলা কাটার পর কাঁদি শক্ত জায়গায় বা মাটিতে রাখলে কলার গায়ে কালো দাগ পড়ে এবং কলা পাকার সময় দাগওয়ালা অংশ তাড়াতাড়ি পচে যায়। উপযুক্ত পরিচর্যা করলে প্রতি কাঁদি কলার ওজন ১৭-২০ কেজি ও ১৪০-১৬০টি কলা এবং প্রতি হেক্টরে গড়ে ২৫ টন  ফলন পাওয়া সম্ভব।


বালাই ব্যবস্থাপনা : সচরাচর এ কলা রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী।


কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকার পূর্ণাঙ্গ বিটল কচি পাতা ও কচি কলার সবুজ অংশ চেঁচে খেয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দাগ সৃষ্টি করে। কলা বড় হওয়ার সাথে সাথে দাগগুলো আকারে বড় হয় এবং কালচে বাদামি রঙ ধারণ করে। দাগযুক্ত কলা বসন্ত দাগের মত দেখায়।
 

প্রতিকার : ছিদ্রযুক্ত পলিথিন দিয়ে কলার কাঁদি ব্যাগিং করে এ পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যায়। কলা বের হওয়ার আগেই কাঁদির চেয়ে বড় আকারে দুইমুখ খোলা বিশিষ্ট ছিদ্রযুক্ত পলিথিন ব্যাগের এক মুখ দিয়ে মোচাকে আবৃত করে কাঁদির সাথে আলতোভাবে বেঁধে দিতে হয়


পানামা রোগে প্রথমে আক্রান্ত গাছের নিচের পাতাগুলোর কিনারা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। তারপর আস্তে আস্তে এটি মধ্যশিরার দিকে অগ্রসর হয় এবং গাঢ় বাদামি রঙ ধারণ করে। পরে ওপরের পাতাগুলো হলুদ হতে শুরু করে। ব্যাপকভাবে আক্রান্ত পত্রফলক পত্রবৃন্ত ভেঙে ঝুলে পড়ে। ফলে ভুয়াকাণ্ডটি শুধু স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক সময় ভুয়াকাণ্ডের গোড়া লম্বালম্বিভাবে ফেটে যায়। ভুয়াকাণ্ড এবং শিকড় আড়াআড়িভাবে কাটলে খাদ্য সঞ্চালন নালীর মধ্যে লালচে-কালো রঙ এর দাগ দেখা যায়। রোগমুক্ত চারা রোপণ; রোগাক্রান্ত গাছ শিকড় ও চারাসহ তুলে জমি থেকে সরিয়ে ফেলা; রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করা; আক্রান্ত জমিতে ৩-৪ বছর কলার চাষ করা যাবে না। জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করা।
 

কলা সংগ্রহ : সাধারণত : মোচা আসার পর ফল পুষ্ট হতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। কলার গায়ের শিরাগুলো তিন চতুর্থাংশ পুরু হলেই কলা সংগ্রহ করতে হবে। কলার অগ্রভাগের পুষ্পাংশ শুকিয়ে গেলেই বুঝা যায় কলা পুষ্ট হয়েছে। সংগ্রহের সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যেন কলার ছড়া বা কাঁদি মাটিতে পড়ে না যায়। এতে আঘাতজনিত কারণে কলায় পচন ধরতে পারে। কাঁদি কাটার পর ছায়াযুক্ত স্থানে কলার পাতা বিছিয়ে উল্টাভাবে রাখতে হবে।


সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা : ফানা কলার কাদি থেকে আলাদা করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যাতে কাঁচি/ছুরির অগ্রভাগ দিয়ে কলার গায়ে কোনো আঘাত না লাগে। কাঁদি থেকে কলা আলাদা করার সময় কষ বের হয় এ কষ অপসারণ করার জন্য মাটিতে কলা পাতা বিছিয়ে তার ওপর কলার ফানাগুলো রাখতে হবে যাতে এক ফানার কষ অন্য ফানার কলায় না লাগে। কলার ফানার ধূলিবালু ও কষ পরিস্কার করার জন্য বড় পাত্রে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ফেলতে হবে। ছায়াযুক্ত স্থানে বাতাসে/ফ্যানের বাতাসে কলার ফানা শুকিয়ে নিতে হবে। কলা পরিবহনের সময় প্লাস্টিক ক্রেটে কলার ফানাগুলো স্তরে স্তরে সাজাতে হবে। দুইটি স্তরের মাঝখানে খবরের কাগজ অথবা সাদা কাগজ ব্যবহার করলে কলার আঘাতজনিত ক্ষতি অনেকাংশে কমে যাবে। এতে কলার গুণগতমান ঠিক থাকবে ও বেশি মূল্যে বাজারজাত করা যাবে।

 

ড. বাবুল চন্দ্র সরকার * ড. মনোরঞ্জন ধর**
 ড. মদন গোপাল সাহা***

* প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ** মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, ***উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বারি,গাজীপুর

বিস্তারিত
ঝালের সেনসেশন বোম্বাই মরিচ

আসুন নিজের গাছে বোম্বাই মরিচ ফলাই মাত্র ১ মাসে! পতিত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে পারেন বোম্বাই মরিচ। বোম্বাই মরিচ, মরিচের একটি প্রজাতি, যা প্রচণ্ড ঝালের কারণে সমধিক পরিচিত। অন্যান্য আরও বহু নামে পরিচিত হলেও কোথাও কোথাও নাগা মরিচ, কামরাঙা মরিচ কিংবা ভূত জলোকিয়া নামেও পরিচিত। পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমে এর প্রচ- ঝালের কারণে একে অনেক সময়ই হয়তো ভুল করে, ভূত মরিচ বলা হয়ে থাকে। স্কোভিল (Scoville: ঝাল পরিমাপের মানদণ্ড) অনুযায়ী এর মান ১০+++। তবে মূলত সুগন্ধ আর স্বাদের জন্যই এর এত কদর। একটু চেষ্টা করলেই বাণিজ্যিকভাবে আমরা মাত্র ১ মাসে ফলাতে পারি এ মরিচ।
 

কোথায় পাবেন বীজ
যে কোনো নার্সারি, হর্টিকালচার সেন্টার বা গ্রামের হাট বাজার থেকেও কেনা যায় বোম্বাই মরিচের চারা। তবে বিশ্বস্ত উৎস হতে চারা ক্রয় করলে জাত ও চারার মান সম্পর্কে নিশ্চিত থাকা যায়। বীজ থেকেও চারা উৎপাদন করে রোপণ করা যায় সে ক্ষেত্রে ভালোমানের প্যাকেটজাত বীজ ব্যবহার করতে হবে।

 

জলবায়ু
এ মরিচ শীত ও গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ যায়। ফসলের প্রাথমিক অবস্থায় অল্প বৃষ্টিপাত এবং ফসলের বাড়বাড়তির সময় পরিমিত বৃষ্টিপাত হলে মরিচ খুব ভালো হয়। অতিরিক্ত ও পরিমাণের কম বৃষ্টিপাত মরিচের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে ফুল ও ফল ধরা কমে যায় এবং অধিক আর্দ্রতায় ফল পচে যায়। ফলের পরিপক্বতার সময় শুকনো আবহাওয়া থাকলে এর গুণগতমান ও রঙ অক্ষুণ্ন থাকে। বেশি বৃষ্টিপাত ও মেঘলা আকাশে ফুল ধারণে সমস্যা হয়।

 

জমি নির্বাচন
জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ উর্বর দো-আঁশ মাটি চাষাবাদের বেশি ভালো। অম্লমাটিতে মরিচের চাষ করা হলেও ক্ষারীয় মাটিতে ফলন ভালো হয় না অর্থাৎ মাটির পিএইচ ৫.৫ হতে ৭.০ এর মধ্যে থাকতে হবে। ছায়ামুক্ত ও বৃষ্টির সময় পানি দাঁড়ায় না এমন উঁচু জমি মরিচ চাষের উপযোগী। বন্যাবিধৌত পলি এলাকায় মাঝারি ও উঁচুভিটা যেখানে বর্ষার পর ভাদ্র অর্থাৎ আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যখন জো অবস্থা আসে সেখানে মরিচ ভালো হয়। বিশেষ করে সেচ এলাকায় অথবা নদী, নালা, খাল বা দীঘির আশপাশে, বাগানের রাস্তা, পানের বরজ, লেবু কমলা, পেঁপে, কলাসহ অন্যান্য দ্রুতবর্ধনশীল ফল বাগান, সবজি বাগানের পাশে, ঘরের কাছে, উঁচু ভিটায়, বোম্বাই মরিচ চাষ করা যায় অনায়াসে। উঁচু করে মাটি তুলে প্লট বানিয়ে বোম্বাই মরিচের চারা রোপণ করতে হয়। আগেই বীজতলায় পলিথিনে চারা তৈরি করে নিতে হবে। সরাসরি বপন করেও আবাদ করা যায় কিন্তু এতে বীজ বেশি লাগে, সময় বেশি লাগে এবং আর্থিক ক্ষতি হয়। ৩ ফুট চওড়া বেডে ২ লাইন বোম্বাই মরিচের চারা লাগাতে হয়।


পরিচর্যা
পারিবারিকভাবে কম পরিমাণে চাষ করলে তেমন যত্নআত্তির প্রয়োজন পড়ে না। তবে বাণ্যিজ্যিকভাবে আবাদ করলে জমি তৈরি প্রয়োজনীয় জৈব রাসায়নিক সার ২ থেকে আড়াই ফুট দূরে লাইন এবং গর্তে চারা রোপণ করতে হয়। সাধারণত শীতকালে চারা রোপণের একটা হুজুক দেখা দেয়। তবে সতর্কভাবে লাগালে সারা বছর লাগানো যায়। সারের পরিমাণ অনেকটা সাধারণ মরিচের মতো। তবে গাছ বড় এবং বেশি দিন বাঁচে বলে প্রতি বছর সার দিতে হয়। যেহেতু বোম্বাই মরিচ বহুবর্ষজীবী তাই গাছপ্রতি যত্ন আবশ্যকীয়। পানির প্রতি বেশ অনুভূতি প্রবণ। পানিবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। চারা লাগানোর দেড় ২ মাস পর থেকেই ফুল ধরে এবং ফুল আসার ১ মাসের মধ্যে খাবার উপযোগী হয়। কাঁচামরিচ যেমন বেশি কাঁচা অবস্থায় ঝাল থাকে না কিন্তু বোম্বাই মরিচ ছোট অবস্থায়ও ঝাল থাকে এবং সুগন্ধিতে মাতোয়ারা করে ফল ধরার শুরু থেকেই।


রোগবালাই
বোম্বাই মরিচের অল্প কিছু পোকামাকড় সমস্যা। এর মধ্যে পাতা কোঁকড়ানো, থ্রিপস পোকা, অতিক্ষুদ্র গাঢ় বাদামি মাকড়সা, জাবপোকা, ফলছিদ্রকারী পোকা অন্যতম। আর রোগের মধ্যে কা- পচা, ঢলেপড়া রোগ, মরিচপচা, ডগা শুকিয়ে যাওয়া ও ফল পচা বা অ্যানথ্রাকনোজ উল্লেখযোগ্য। আবাদের শুরু থেকে সুস্থ সবল চারা রোপণ, সুষম সার প্রয়োগ, সেচ নিকাশ, আগাছা দমন, পানি সেচ, আক্রান্ত পাতা বা ডাল ছিঁড়ে ফেলা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে অর্থাৎ ক্লিন আবাদের ফলে বোম্বাই মরিচ উৎপাদন ফলন আশাতীত ভালো হবে।


বারান্দা বা ছাদে বোম্বাই মরিচ চাষ
প্রতিটি চারা লাগানোর আগে মাটি প্রস্তুত করে নিতে হবে। প্রতিটি ১০ ইঞ্চি টবের জন্য ১/৩ গোবর (২ ভাগ মাটি, ১ ভাগ গোবর), ২ চিমটি টিএসপি, ১ চিমটি ইউরিয়া, ১ চিমটি পটাশ সার, অল্প পরিমাণ সরিষার খৈল দিয়ে ৪-৫ দিন মাটি রোদে শুকাতে দিন। তারপর এ মাটিতে চারা লাগানো হয়। চারা যদি সবল না হয় তাহলে দিনে ২-৩ বার ইউরিয়া মিশ্রিত পানি স্প্রে করলে চারা সবল হয়ে যাবে।


সপ্তাহে ১ দিন মাটি খুঁচিয়ে আলগা করে দেবেন, আর আগাছা সরিয়ে দেবেন। চারা লাগানোর ২০-২৫ দিনের মধ্যেই ফুল আসবে গাছে। আর সেই ফুল থেকে আস্তে আস্তে ধরতে শুরু করবে আপনার প্রিয় বোম্বাই মরিচ। মরিচ যত বেশি দিন গাছে থাকবে তত ঝাল হবে।


খুব নিচের শাখাগুলো কেটে/ভেঙে ফেলবেন, নাহলে গাছের জোর কমে যাবে, মরিচ হবে ছোট। গাছ রাখবেন কড়া রোদে, ছায়ায় থাকলে মরিচ ধরবে না।
১টা মরিচ গাছ অনেক দিন ফল দেবে। আর ১টা গাছে যে পরিমাণ মরিচ ধরে তা খেয়েই শেষ করা কঠিন।


২-৪টা গাছ হলে পোকামাকড় হাতেই মেরে দমন করা যায়। গাছ বেশি হলে অথবা কীটনাশক দিতে চাইলে মরটাস ব্যবহার করা যায় তবে শাকসবজিতে কীটনাশক ব্যবহার না করাই ভালো।
এবার নিজেই একবার চেষ্টা করে দেখুন কত সহজে ফলানো যায় আপনার প্রিয় বোম্বাই মরিচ।

 

(*এখানে ১ মাসে ফলনের ব্যাপারটা বলা হয়েছে চারা লাগানোর ক্ষেত্রে। বীজ থেকে ফলন পেতে সময় আড়াই থেকে তিন মাস লাগতে পারে।)

 

কৃষিবিদ মো. আসিফ ইকবাল*

তথ্য সূত্র : ইন্টারনেট
*আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, কুমিল্লা অঞ্চল, কুমিল্লা, মোবাইল: ০১৭১৫৪৩৬৯০৫  Email:t.asif@gmail.cm

বিস্তারিত
গবাদিপশুর ধনুষ্টঙ্কার রোগ

আমাদের দেশের জন্য গবাদিপশু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ৩৩.৩৫ মিলিয়ন ছাগল এবং ১.১৬ মিলিয়ন ভেড়া আছে। আমাদের দেশে ছাগল ও ভেড়া অন্যতম ছোট রুমিনেন্ট প্রাণী, যাকে বলা হয় গরীবের বন্ধু। আমাদের দেশের ছাগলের মাংস ও চামড়া বিশ্ববিখ্যাত। ভেড়ার লোম ও মাংস খুবই উন্নতমানের। ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল তৈরি করা যায়। এদের মাংস এবং দুধ যেমন খুবই উন্নত মানের প্রোটিনের উৎস তেমনি এর চামড়া অন্যতম অর্থকরী পণ্য। এভাবে গবাদিপশু আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমাদের দেশে ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতীয় ছাগলই বেশি পাওয়া যায়। যেহেতু অধিকাংশ ছাগলের চামড়ার রঙ কালো তাই একে বলা হয় ব্ল্যাক বেঙ্গল। ছাগল ও ভেড়া পালনে রোগবালাই প্রধান অন্তরায়। ফলে প্রতি বছরই এদের উৎপাদন ও ব্যাহত হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে পশুর যেসব রোগ দেখা যায় সাধারণত সেগুলো হচ্ছে ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাসজনিত। এর মধ্যে ধনুষ্টঙ্কার উল্লেখযোগ্য একটি রোগ। এখন জেনে নেই ধনুষ্টঙ্কার রোগ সম্পর্কে।


ধনুষ্টঙ্কার মানুষসহ প্রায় সব গৃহপালিত পশুর জীবাণু ঘটিত একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ। এরোগে দাঁত কপাটি বা চোয়াল লেগে যায় বলে একে লক জ্ব বলা হয়। অতিবেদন টেটানি ও খিঁচুনি এ রোগের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। ক্লস্ট্রিডিয়াম টেটানি (Clostridium tetani) জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট টকসিন এ রোগের কারণ। এটি গ্রাম পজিটিভ অ্যান-অ্যারোবিক জীবাণু। এ জীবাণু কার্বোহাইড্রেট ফারমেন্ট করে না। এ জীবাণু স্পোর সৃষ্টি করে। এ স্পোর অনেক বছর মাটিতে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। শুধু তাই নয়, ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ৩০ থেকে ৬০ মিনিট টিকে থাকতে সক্ষম। তবে ১১৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ২০ মিনিটে বিনষ্ট হয়। এ ব্যাকটেরিয়া প্রধানত দুই প্রকৃতির টকসিন সৃষ্টি করে নিউরোটকসিন বা টিটানোস্পাজমিন (tetanospasmin) - এটি সক্রিয় টকসিন যা রোগ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হেমোলাইসিন (Haemolysin) যা রক্ত হেমোলাইসিস করে তবে রোগ সৃষ্টিতে তেমন কোন ভূমিকা নেই।


টিটেনাস জীবাণু স্বাভাবিক অবস্থায় পশুর পরিপাকতন্ত্রে বাস করে এবং মলের সাথে বেরিয়ে মাটিতে স্পোর অবস্থায় থাকে। এ দূষিত মাটির সংস্পর্শে গভীর ক্ষত দিয়ে এ জীবাণু দেহে প্রবেশ করে। তবে ক্ষতের কোষ কলা বিনষ্ট হয়ে অ্যানঅ্যারোবিক অবস্থার সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এ স্পোর সুপ্ত অবস্থায় থাকে। পশুর প্রসবকালীন এ জীবাণুর স্পোর জনননালির মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। এছাড়া খোজা করা, লেজ কাটা শিয়াল কুকুরে কামড়ানো, নাভির ক্ষত, দাঁতলোলা এসবের ক্ষতের মাধ্যমে এ জীবাণুর স্পোর সংক্রমিত হয়ে মড়ক আকারে টিটেনাস রোগ হবার তথ্য রয়েছে। প্রধানত গভীর ক্ষত, প্রসবকালীন, খোঁজা করা এসব সময় এ জীবাণুর স্পোর প্রবেশ করে ক্ষত স্থানে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। ক্ষত স্থানের টিস্যু বিনষ্ট হলে বিনষ্ট টিস্যুতে অক্সিজেন লোপ পেয়ে অ্যানঅ্যারোবিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় এ জীবাণু বংশ বৃদ্ধি করেই নিউরোটকসিন সৃষ্টি করে। ব্লাড ব্রেন ব্যারিয়ার থাকায় এ টকসিন পেরিফেরাল স্নায়ুর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে। এ টকসিন স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে স্নায়ুর তেমন কোনো পরিবর্তন সাধন করে না কিন্তু অতিসংবেদ্যতা (hypersensitivity) সৃষ্টি করে। নিউরোটকসিন প্রধানত দুইভাবে কাজ করে। প্রথমত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর ক্রিয়া স্পাজম (সবিরাম পেশীয় সংকোচন ও শিথিলকরণ) জনিত খিঁচুনি এবং দ্বিতীয়ত পেশির স্নায়ুপ্রান্তে সরাসরি ক্রিয়া করে ফলে টনিক (অবিচ্ছিন্ন পেশির সংকোচন) খিঁচুনি হয়।


সাধারণত এ রোগের সুপ্তিকাল ১ থেকে ৩ সপ্তাহ। তবে অনেক সময় মাস পর্যন্ত হতে দেখা যায়। মেষ, ছাগলের লেজ কাটা, খোঁজ করা বা লোম কাটার ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এ রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। সব প্রজাতির পশুর এ রোগের ক্লিনিক্যাল উপসর্গ প্রায় একই রকম। রোগের প্রথম দিকে দেহের বিভিন্ন অংশের মাংসপেশি শক্ত হয়। মাঢ়ির মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে দাঁত কপাটি লাগে। তাই এ রোগকে লক জ্ব বলা হয়। এ অবস্থায় পশু কিছু খেতে পারেনা। মুখ দিয়ে লালা ঝরে। পশুর মাংসপেশি শক্ত হবার ফলে পশু কাঠের মতো দাঁড়িয়ে থাকে এবং পড়ে গেলে উঠানো যায় না।


যে কোনো শব্দে পশু চমকে উঠে। এতে মাংসপেশি শক্ত সংকোচন হওয়া  বৃদ্ধি পায়। শ্বাসরোধ হয়ে পশু মৃত্যুবরণ করে।
রোগের প্রথম পর্যায়ে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু শেষ অবস্থায় মাংসপেশীর ক্রমাগত সংকোচন ও শক্ত হওয়ার ফলে দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় (১০৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। এ রোগে মেষ ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে মারা যায়।


অতি সম্প্রতি দুর্ঘটনাজনিত আঘাত, বাচ্চা প্রসব, অস্ত্রোপাচার, খোঁজা করার ইতিহাস এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপসর্গ বিশেষ করে পেশির স্পাজম, থর্ড আইলিড পক্ষাঘাতের কারণে বেরিয়ে আসা ও লক জ্ব এসব পরীক্ষা করে এ রোগ নির্ণয় করা যায়। সুনির্দিষ্ট রোগ নিরূপণের জন্য ক্ষতস্থান থেকে সোয়ার সংগ্রহ করে অ্যানঅ্যারোবিক মিডিয়ায় কালচার, গ্রাম স্ট্রেইন ও বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষা করে এ রোগের জীবাণু শনাক্ত করা যায়। এ জীবাণু কার্বোহাইড্রেট ফারমেন্ট করে না।


প্রধানত ৪টি মূল নিয়মে এ রোগে আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা করা যায়। যদি দেহে কোনো ক্ষত পাওয়া যায় তবে ক্ষতের মধ্যে অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম (ATS) দিয়ে ক্ষতের টকসিন বিনষ্ট করতে হবে। অতপর হাইড্রোজেন পার অক্সাইড বা অন্য কোনো জীবাণুনাশক ওষুধ দিয়ে ক্ষতস্থান সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার করে সরাসরি পেনিসিলিন ইনজেকশন দিতে হবে। ক্ষতে প্রথমে অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম প্রয়োগ না করে শুধু হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ও পেনিসিলিন প্রয়োগেও ক্ষতের টকসিন শোষিত হয়। কোনো ক্ষত পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে আক্রান্ত পশুর প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১০ হাজার ইউনিট পেনিসিলিন হিসেবে শিরা বা পেশির মধ্যে দিনে দুইবার করে ৫ থেকে ৬ দিন ইনজেকশন দিতে হয়। দেহের রেসিডিউয়্যাল টকসিনকে নিউট্রোলাইজ করে দেহের টকসিন বিনষ্ট করার জন্য অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম ইনজেকশন দিতে হয়। তবে সাধারণত উপসর্গ প্রকাশের পর এ চিকিৎসায় তেমন সুফল পাওয়া যায় না। মেষ ও ছাগলে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫হাজার ইউনিট ইনজেকশন দিতে হয়।


শ্বাসরোধ প্রতিরোধ মাংসপেশির টেটানি শিথিল বা হ্রাস করার জন্য ওষুধ প্রয়োগ করা। ক্লোরাল হাইড্রেট ও ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ইনজেকশন দিতে হবে। ক্লোরাল হাইড্রেট ২% সলুশন প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১ মিলি হিসেবে শিরার মধ্যে ইনজেকশন দিতে হবে। সম্পৃক্ত ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ৩৫ মিলি হিসেবে দিনে দুইবার করে প্রথম ১০ দিন এবং একবার করে পরবর্তী ১০ দিন ত্বকের নিচে ইনজেকশন দিতে হয়। ক্লোরপ্রোমাজিন হাইড্রোক্লোরাইড (লারগ্যাকটিল) প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ০.৪ মিলিগ্রাম হিসেবে শিরায় এবং ১ মিলিগ্রাম হিসেবে মাংসপেশিতে প্রত্যহ ইনজেকশন দিতে হয়। এছাড়া অ্যাসিটাইল প্রোমাজিন প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ০.০৫ মিলিগ্রাম হিসেবে দিনে দুইবার করে ৮ থেকে ১০ দিন মাংসপেশি বা শিরায় ইনজেকশন দিতে হয়।
 

সহায়ক চিকিৎস
প্রয়োজনে শিরায় ডেক্সট্রোজ স্যালাইন দিতে হবে এবং স্টোমাক টিউবের সাহায্যে খাওয়াতে হবে।
পশুকে অন্ধকার ঘরে ও নির্জন স্থানে রাখতে হবে যাতে কোনো উপদ্রব পশুর উত্তেজনা সৃষ্টি করতে না পারে।
প্রয়োজনে ডুস দিয়ে পায়খানা ও ক্যাথেটার দিয়ে প্রস্রাব করাতে হবে।

 

প্রতিরোধ

স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থায় অস্ত্রোপচার
অস্ত্রোপচারের সময় ত্বক পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক পদার্থ লাগিয়ে জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। খোঁজা করা , লেজকাটা, লোম কাটা এসব কাজ করার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

অস্ত্রোপচারের সময় ত্বকের নিচে অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম (ATS) ও ইনজেকশন দিলে ১০-২৪ দিন এ রোগ প্রতিরোধ হয়। মেষ শাবক ও ছাগলের জন্য ২০০ ইউনিট প্রয়োগে কাজ হয়।
 

ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিরোধ
টিটেনাস টকসয়িড ইনজেকশন বা অ্যালাম প্রিসিপিটেড ফরমালিন ট্রিটেড টকসি এনজুটিক এলাকায় এ টিকা একবার ইনজেকশন দেয়ার ১০-১৪ দিনের মধ্যে দেহে সক্রিয় ইমুনিটি সৃষ্টি করে এবং প্রায় ১ বছর সক্রিয় থাকে। এ টিকা ১২ মাস পর পুনরায় প্রয়োগে আজীবন ইমুনিটি সৃষ্টি হয়।

 

প্রয়োজনে অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম ও টিটেনাস টকসিয়ড একই পশুকে এক সাথে প্রয়োগ করা যায়। তবে ভিন্ন সিরিঞ্জে ভিন্ন স্থানে প্রয়োগ করতে হয়।
 

গর্ভবতী পশুর গর্ভাবস্থায় শেষ সপ্তাহে টকসয়িড ইনজেকশন দিলে কলস্ট্রামে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডিজ থাকে যা খেয়ে বাচ্চার ১০ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত দেহে এ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মে। বাচ্চার বয়স ১০ সপ্তাহ হলে ০.৫ মিলিলিটার টকসয়িড মাংসপেশি বা ত্বকের নিচে ১২ সপ্তাহ পর পুনরায় ইনজেকশন করতে হয়। পরে বছরে একবার করে ইনজেকশন দিলেই এ রোগ প্রতিরোধ হয়।

 

কৃষিবিদ ডা. হাসান তানভির রিফাত*

* মাধবী কুঞ্জ, রায়পুর, নোয়াখালী

বিস্তারিত
ইলিশের অব্যাহত উৎপাদনে অনুসরণীয় কার্যক্রম

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে লোনা ও স্বাদু পানিতে বিচরিত মাছের বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তন হয়। যার সাথে মাছের প্রজননচক্র, মাছের দেশান্তর গতিবেগ, বাঁচা ও মরার হার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। ফলে মাছের মোট উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও জলজ দূষণের ফলে ইলিশ মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন, নতুন ইলিশের সংযোজন (Recruitment) পদ্ধতি এবং দেশান্তর প্রকৃতির স্বাভাবিক আচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ।


জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে নিম্নে বর্ণিত ইলিশের মজুদের সম্ভাব্য পরিবর্তন হতে পারে-


ক. ইলিশের ঝাঁক মোহনার নিম্নাঞ্চলে স্থানান্তরের সম্ভাবনা;
খ. সাধারণ জেলেদের ইলিশ আহরণ নাগালের বাইরে চলে যাবে;
গ. অস্বভাবিক জলবায়ু এর পরিবর্তনের সাথে সাথে বঙ্গোপসাগরে সাইক্লোনের তীব্রতা বাড়তে থাকবে যার ফলে সাধারণ জেলেদের ইলিশ আহরণ প্রক্রিয়া প্রায় অসম্ভব হবে;
ঘ. গঙ্গা, ব্রক্ষ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর অববাহিকার পানি প্রবাহ হ্রাস পেলে ইলিশের প্রজননে ব্যহত হতে পারে;
ঙ. পানি দূষণের (শিল্পবর্জ্য ও কীটনাশক) ফলে অদূর ভবিষ্যতে ইলিশের প্রজনন ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে।
নিম্নে ইলিশের স্বাদু ও লোনা পানির বার্ষিক আহরণ থেকে বলা যেতে পারে যে, ইলিশের আহরণ দিনে দিনে লোনা পানিতে বাড়ছে (চিত্র-১)। এতে প্রতীয়মান হয় যে, ইলিশের প্রজনন মোহনার নিম্নাঞ্চলে সরে যাচ্ছে ।


ইলিশ আমাদের দেশের মাছ যা ভৌগোলিক নির্দেশক (Geographical Indicator) হিসাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। ইলিশ মাছ প্রাকৃতিকভাবে দ্রুত দেশান্তর প্রকৃতির তবে নদীগুলোর পানির দূষণ ও জলবায়ু ক্রমাগত পরিবর্তন হতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের দেশান্তর প্রকৃতির গতি (Migration Route) পরিবর্তন হতে পারে । ইলিশ ডিম পাড়ে স্বাদু পানিতে এবং পরে লবণাক্ত পানিতে ফিরে যায় । অতএব দ্রুত স্থান পরিবর্তনশীল এ প্রজাতির মাছের (ইলিশ) ওপর বাংলাদেশে আরও ফলপ্রসূ গবেষণার প্রয়োজন আছে যেমন-


-ইলিশের প্রকৃত প্রজনন ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়ায় চলমান গবেষণার প্রয়োজন;
 

-শুধু ২২ দিনব্যাপী ইলিশ ধরা ও বিক্রি বন্ধ রাখলেই সন্তোষজনক উৎপাদন সম্ভব নাও হতে পারে যে কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃত্রিম প্রজননও অত্যাবশ্যক;
 

-মোহনার নিম্নাঞ্চলে কৃত্রিম হ্যাচারি ও গবেষণাগার স্থাপন;
 

-দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার জন্য দক্ষ বৈজ্ঞানিকদের কাজ করা;
 

-প্রত্যেক বছর জাতীয় সেমিনারের মাধ্যমে গবেষণার দিকনির্দেশনা প্রদান;
 

-ঞধংশ ঋড়ৎপব গঠন করে ইলিশ মাছের গবেষণার ওপর জোরদার করা ।
 

ইলিশ মাছের ডিমধারণ ক্ষমতা (Fecundity) :
ইলিশ মাছের ডিমধারণ ক্ষমতা ১.৫-২০ লাখ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এর সাথে সাথে ইলিশের ডিম ধারণ ক্ষমতা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে যা গড়ে ১২ লাখে দাঁড়িয়েছে যা ইলিশের মোট উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখ যোগ্যহারে ব্যাহত করবে (Akter, et, ২০০৭)। উল্লেখ্য যে, উভয় প্রকার (স্বাদু ও লবণাক্ত) পানিতে ইলিশের ঝাঁকের ডিম ধারণ ক্ষমতা কমছে ।


জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে ইলিশের লিঙ্গ বৈষম্য (Sex Ratio) :
ইলিশের মজুদ ব্যবস্থপনায় লিঙ্গ বৈষম্য একটি অন্যতম বিশেষ দিক। নিম্নে সময়ের সাথে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রের লিঙ্গ বৈষম্যের একটি চিত্র বিভিন্ন গবেষকের গবেষণার ফল (টেবিল-১) দেখানো হলো-

ক্রমিক নং এলাকার নাম পুরুষের ও মহিলা ইলিশের অনুপাত Reference
প্রজনন ক্ষেত্র (নিম্নাঞ্চল) ১:১.৬০ Shohidullah et al.., 1999
প্রজনন ক্ষেত্র (নিম্নাঞ্চল) ১:১.৮৬ Anisur Rahman et al., 2015
প্রজনন ক্ষেত্র (নিম্নাঞ্চল) ১:১.৯৪ Anisur Rahman et al., 2017
প্রজনন ক্ষেত্র (নিম্নাঞ্চল) ১:২:০০ Anisur Rahman et al., 2017


টেবিল-১ : জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রের লিঙ্গের অনুপাত
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ইলিশের ঝাঁকের প্রজনন ক্ষেত্র মোহনায় নিম্নাঞ্চলে সরে যাচ্ছে । ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রে (নিম্নাঞ্চল) ইলিশের লিঙ্গ বৈষম্য ক্রমান্বয়ে  বাড়ছে (টেবিল-১)। বিভিন্ন গবেষকের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে পুরুষ ইলিশের সংখ্যার চেয়ে স্ত্রী ইলিশের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় পুরুষ ও স্ত্রী মাছের সংখ্যার অসংগতিপূর্ণ বৈষম্য হয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রজনন হার কমে যাবে যার ফলে ইলিশের মোট উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বলা যেতে পারে ইলিশের অব্যাহত উৎপাদনের লক্ষ্যে ২২ দিনব্যাপী ইলিশ ধরা ও বিক্রি বন্ধই  যথেষ্ট নয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে ইলিশের কৃত্রিম প্রজননের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক ।
 

ইলিশের প্রজনন চক্র (Breeding Cycle) :  
ইলিশ মাছ প্রাকৃতিকভাবে বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র্য মোতাবেক সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মোহনা অঞ্চলে ডিম পাড়ে। বর্তমানে ইলিশের Breeding Frequency, প্রজননক্ষম ইলিশ সংরক্ষণ ও মজুদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২২ দিনব্যাপী ইলিশ ধরা ও বিক্রি বন্ধ করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান সহায়ক হিসাবে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে ইলিশের ডিম ধারণ ক্ষমতা ও অসম লিঙ্গ বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে, যা দীর্ঘয়োদে ইলিশের উৎপাদন ব্যাহত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে । এ অবস্থায়, কৃত্রিম প্রজনন বাস্তবায়ন এবং ক্ষেত্র তৈরির মতো বিকল্প ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অতিব জরুরি।


ইলিশ মাছের কৃত্রিম প্রজনন (Artificial Breeding) :
বর্তমানে বাংলাদেশে এখনও ইলিশের কৃত্রিম প্রজনন এর জন্য কোনো হ্যাচারি স্থাপনাসহ অন্য কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি গতিশীল গবেষণালব্দ ইনস্টিটিউট যেখানে এ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশের গবেষণালব্দ ফল সরকারি পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে তা নিঃসন্দেহে  প্রসংশার যোগ্য। প্রবন্ধকার  ড. মো. শহীদুল্লাহ মিয়া ১৯৮৭-১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পুকুরে ইলিশ মাছ চাষসহ ইলিশ মাছের মজুদ নিরূপণসহ ইলিশের গতিবিদ্যা গবেষণায় সরাসরি জড়িত ছিলেন।


ইলিশের দেশান্তর প্রকৃতি ও প্রজনন বৈশিষ্ট্য Atlantic Salmon প্রজাতি মাছের অনুরূপ। উন্নত দেশে স্যামন মাছের প্রজনন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ঘটেছে। উন্নত বিশ্বে (ইউরোপিয়ান দেশ, ডেনমার্ক, নরওয়ে ও আমেরিকাতে) স্যামন মাছের কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমে সফল হয়েছে যদিও স্যামন মাছ ইলিশ প্রজাতির মতোই দেশান্তর প্রকৃতির Anadromous । এ মাছটিও স্বাদু ও লবণাক্ত পানিতে বিচরণ করে প্রাকৃতিকভাবে স্বাদু পানিতে ডিম পাড়ে। স্যামন মাছের কৃত্রিম প্রজননের ফলে এ মাছের উৎপাদনে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। স্যামন মাছে দ্বিতীয় বছরে পরিপক্বতা আসে এবং এরা সমুদ্র থেকে বিপরীত স্রোতে নদীতে আসে। স্যামন মাছের কৃত্রিম প্রজনন কৃত্রিম উপায়ে স্রোতের মাধ্যমে করা সম্ভব হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ইলিশ মাছের বেলায় কৃত্রিম প্রজনন সম্ভব হবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।


এসব বিষয় বিবেচনা করে ইলিশ মাছের কৃত্রিম প্রজননের জন্য বাস্তবমুখী গবেষণা কার্যক্রম, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এখন অতিব জরুরি এবং এটি সময়ের দাবি।

 

অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল্লাহ মিয়া*
*পরিচালক, কলেজ অব এগ্রিকালচারাল সাইন্সেস, আইইউবিএটি বিশ্ববিদ্যালয়, drshohidullah@iubat.edu # ০১৭৪৮১৯০৪৭৪

বিস্তারিত
কবিতা (পৌষ ১৪২৪)

নবান্ন
দুলাল চন্দ্র সরকার*

শরতের অবসানে হেমন্তের আগমনে
মাঠ আজ পরিপূর্ণ ধানে
মাঠে মাঠে পাকা ধান কৃষক গাহিছে গান
নবান্নের শুভ আগমনে ॥

নবান্ন এসেছে দ্বারে কৃষকের ঘরে ঘরে
নতুন চাউলের হবে প্রয়োজন
তাই কৃষক কাস্তে হাতে মাথাল পরিয়া মাথে
মাঠে মাঠে ধান কাটার করে আয়োজন ॥

ধানের মধুরও গন্ধে কৃষকরা মহানন্দে
দিনভর কাটিল যে ধান
কৃষাণীর তাতে যত্নের সাথে
আয়োজন করে খাবারের নানা উপাদান ॥

আতপ চাউলের সাথে দুগ্ধ মিশিয়ে তাতে
মধুময় মিষ্টান্ন করে যে রন্ধন
অগ্রহায়ণের প্রথম দিনে বিলাইবে জনে জনে
এত বাঙালির প্রীতির বন্ধন ॥

শুধু নয় পিঠা পুলি নানা শাকসবজি তুলি
রাঁধিল নানা ব্যঞ্জনের বাহার
বাঙালিরা মাছে-ভাতে মিষ্টি-দধি লইয়া পাতে
হাঁপুস-হুঁপুস করে যে আহার ॥

 ভোজনের অবসান হাতে লইয়া পান
মুখে গুজে দেয় জনে জনে
শহর কিংবা গ্রাম খাবারের ধুমধাম
প্রতি বছর এই নবান্নের দিনে ॥

অগ্রহায়ণে কাটে ধান সদানন্দ চাষির প্রাণ
অভাব নাই কারও কোন ঘরে
কৃষক-কৃষাণী মিলে পাকা ধান ঘরে তুলে
নবান্নের আয়োজন সবে মিলে করে ॥

এটাই বাঙালির গর্ব মাসে মাসে নানা পর্ব
পর্বে পর্বে নানা উপাচার,
যুগে যুগে নবান্ন আসে প্রতি অগ্রহায়ণ মাসে
এটাই বাঙালির কৃষ্টি স্বাধিকার ॥

 

 

চাষির সফলতা
মো. জুন্নুন আলী প্রামাণিক**


পৌষের শিশিরে ভেজা চাষির অনুপ্রেরণা বেশি,
ফসল রক্ষায় মগ্ন প্রাণের চমৎকার খুশি।
শ্রমের আড়ালে শস্য প্রচুর শাকসবজি কত,
নিজের পরের খাদ্য জোগায় কৃষকবৃন্দ যত।

রাতের বেলার বানা পিঠায় সকাল বেলা নাশতা,
ধবল শীতের ভিড়ে লুকায় পল্লীবাসীর রাস্তা।
বিজয়ে বরেণ্য চাষি কৃষিতে অগ্রাধিকার পায়,
বিপুল আনন্দে শস্য সেবায় উৎসাহিত হয়।

নতুন নতুন আশা ভরসা সফলতার পথে,
বিপুল ফলার জন্য নিশ্চিত প্রযুক্তিগুলো সাথে।
গমের ক্ষেতের পাশে সরিষা ডাল ফসল আলু,
সুষম মাত্রার সার সেচের ব্যবস্থাবলি চালু।

বিপদ বালাই এলে উপায় কৃষিবিদের কাছে,
অবস্থা মতন দ্রুত ব্যবস্থা ওষুধপত্র আছে।
তাইতো চাষির মস্ত ভাবনা সর্বক্ষণিক পিছে,
আলস্যে সময় নষ্ট করলে সব কিছুই মিছে।

তরুণ সব ক্ষেতে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা,
সঠিক সেবায় মাটি ছড়ায় ফলনরাশি সদা।
ভোরের বকেরা ধুতি পরিয়ে দূরদূরান্তে ডাকে,
আশিস জানায় ভরা মাঠের রুপলহরী দেখে।

বিশুদ্ধ সবজি অতি উত্তম স্বাস্থ্য সম্মত তাই,
মানবদেহের ক্ষতি করে না দুর্ভাবনাও নাই।
বাংলা মাসের সঙ্গে কৃষির ফসলমেলা বসে,
দায়িত্ব আলাদা মাস বদলে সারা বছর আসে।

সময় যখন প্রিয় অধিক জলবায়ুর বলে,
পৌষের কৃষিতে চাষি সফল নানাফসল ফলে।।

*পরিচালক (অব), সরেজমিন উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, **বিদ্যাবাগীশ, ডাকঘর ও উপজেলা : ফুলবাড়ী, জেলা : কুড়িগ্রাম, মোবাইল : ০১৭৩৫২০২৭৯৮

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (পৌষ ১৪২৪)

মো. আবদুল ওয়াহাব, গ্রাম : যাদবপুর, উপজেলা : আলমডাঙ্গা, জেলা : চুয়াডাঙ্গা
প্রশ্ন : বাড়িতে একটি কাঁঠালগাছ আছে। কিন্তু কাঁঠাল পাকার আগে ফেটে যায়, কোষগুলোর গোড়ার দিকে শলার মতো হয় এবং রস কম হয়। এ অবস্থায় করণীয় কী?

উত্তর : কাঁঠাল পাকার আগে ফেটে যায় শারীরবৃত্তীয় কারণে। আর বেশির ভাগ সময়েই এটি ঘটে থাকে সেচের অভাবে। সেজন্য ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে  ১৫ দিন অন্তর পানি সেচ দিলে কচি ফল ঝরা, ফলন ও ফলের গুণগতমান বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ফলের ফেটে যাওয়াও রোধ হয়। তবে আরেকটি কথা মনে রাখা দরকার, কাঁঠাল গাছের জাতভেদে কাঁঠাল ফল অনেক সময়ই ফেটে যায়। সেজন্য কাঁঠাল গাছের নিয়মিত পরিচর্যা ও বর্ষার আগে ও পরে সুষম সার প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।


মো. আল মামুন, গ্রাম : খঙ্গাপাড়া, উপজেলা : পঞ্চগড় সদর, জেলা : পঞ্চগড়
প্রশ্ন : বাঁধাকপির গোড়া পচে যায়, এর প্রতিকার কী?

উত্তর : বাঁধাকপির গোড়া পচে যায় ছত্রাকের আক্রমণের কারণে। রোগাক্রান্ত বাঁধাকপির গোড়ায় কার্বেনডাজিম গ্রুপের যেমন অটিস্টিন ১ গ্রাম এবং থিরাম ও কার্বক্সিল গ্রুপের যেমন প্রোভ্যাক্স ১ গ্রাম উভয়ই একসাথে ১ লিটার  পানিতে মিশিয়ে বিকাল বেলায় বাঁধাকপির গোড়ায় স্প্রে করতে হবে। এভাবে ৭ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করলেই আপনি সুফল পাবেন।  

 

মো. রুবেল হোসেন, গ্রাম : বেদেরপুকুর, উপজেলা : কাহারোল, জেলা : দিনাজপুর
প্রশ্ন : কৃষি জমিতে ডলোচুন ব্যবহারের নিয়ম কী?

উত্তর : জমির পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ কিছু ধরনের মাটিতে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয়। সেক্ষেত্রে মাটির পিএইচ মান জানা খুব জরুরি। পিএইচ মানের ওপর ভিত্তি করে ডলোচুনের মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়। মাটির পিএইচ মান ৪.৫ থেকে ৫.৫ হলে প্রতি শতক জমিতে ৬ কেজি ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয়। আর যদি মাটির পিএইচ মান ৫.৬ থেকে ৬.৫ হয় তবে প্রতি শতকে ডলোচুন লাগে ৪ কেজি। এছাড়া মাটির পিএইচ মান যদি ৫.৬ থেকে ৬.৫ হয় প্রতি শতক জমিতে ২ কেজি হারে ডলোচুন ব্যবহার করতে হয়। মাটির পিএইচ মান ৭ বা ৭ এর ওপরে গেলে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয় না।


মো. রবিউল ইসলাম, গ্রাম : তাহেরপুর, উপজেলা : বাগমারা, জেলা : রাজশাহী
প্রশ্ন : লাউ গাছের কাণ্ড ফেটে আঠা বের হচ্ছে, কী   করব?

উত্তর : লাউ গাছের কা- ফেটে গিয়ে আঠা বের হওয়া এ রোগকে গ্যামোসিস বা আঠা ঝরা রোগ বলে। এ রোগ দমনে বোর্দোমিকশ্চার ব্যবহার করলে সুফল মিলে। এটি তৈরির জন্য ১০ গ্রাম তুঁতে, ১০ গ্রাম চুন ও ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে তৈরি করতে হয়। এ মিকশ্চারটি তৈরির পদ্ধতিটি হচ্ছে। প্রথমে মাটি বা প্লাস্টিকের একটি পাত্রে ১০ গ্রাম চুন ভালোভাবে গুঁড়া করে নিতে হবে। এরপর আরেকটি পাত্রে ১০ গ্রাম তুঁতে ভালোভাবে গুঁড়া করে নিতে হবে। তারপর প্রত্যেকটি পাত্রে ৫০০ মিলি পানি মিশিয়ে ভালো করে দ্রবণ তৈরি করতে হবে। তারপর দুইটি পাত্রের দ্রবণটিকে আরেকটি পাত্রে ঢেলে একটা কাঠের কাঠি দিয়ে ভালো করে নাড়াচাড়া করে বিকাল বেলায় নিয়মমাফিক স্প্রে করতে হয়। বোর্দোমিকশ্চার তৈরির ১২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার করতে হয়। নাহলে ভালো ফল পাওয়া যায় না। বোর্দোমিকশ্চার ব্যবহার করা ছাড়াও আপনি সানভিট/ব্লিটক্স প্রতি লিটার পানিতে ৪ গ্রাম ভালোভাবে মিশিয়ে রোগাক্রান্ত লাউ গাছে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে পারেন। তবেই আপনি কাক্সিক্ষত পানের ফলন পাবেন।


মো. রাশেদুল হাসান, গ্রাম : পাঠানতলা, উপজেলা : সিলেট সদর, জেলা : সিলেট
প্রশ্ন : শিম গাছের পাতাগুলো কোঁকড়া হচ্ছে এবং পাতায় হলুদ রঙের ছোপ ছোপ দাগ হচ্ছে, কীভাবে প্রতিকার করব?

উত্তর : শিম গাছে জাব পোকার আক্রমণ হলে পাতা কোঁকড়ে যায়। সেজন্য জাব পোকা দমনের জন্য ইমিডাক্লোরোপিড গ্রুপের  যেমন এডমায়ার  প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি মিশিয়ে বিকাল বেলায় স্প্রে করলে জাব পোকার আক্রমণ রোধ হবে। আর পাতায় হলুদ রঙের ছোপ ছোপ দাগের কারণটি হচ্ছে হলুদ মোজাইক ভাইরাসের আক্রমণ। সেক্ষেত্রে আক্রান্ত গাছ নষ্ট করে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া ভবিষ্যতে ভালো শিমের ফলনের জন্য রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করলে কিংবা ভালো উৎস হতে প্যাকেটজাত ভালোমানের বীজ ব্যবহার করলে অবশ্যই ভালো ফলন পাবেন।


লাল মিয়া, গ্রাম : দড়িচর, উপজেলা : হোমনা, জেলা : কুমিল্লা
প্রশ্ন : হাঁস দাঁড়াতে পারছে না। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। পালকগুলো এলোমেলো হয়ে আছে এবং ঝিমাচ্ছে। কী করব? পরামর্শ চাই।  

উত্তর : হাঁসের প্লেগ রোগ হয়েছে। এ রোগ প্রতিরোধে ৩ সপ্তাহ বা তার বেশি বয়সের সুস্থ হাঁসকে ডাকপ্লেগের ভ্যাকসিন দিতে হয়। তাহলে আপনি এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ পাওয়ার জন্য সম্ভব হলে আপনার কাছের উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে  যোগাযোগ করতে পারেন।


হুমায়ুন কবির, গ্রাম : পূর্বভীষণদই, উপজেলা : হাতিবান্ধা, জেলা : লালমনিরহাট
প্রশ্ন : গরুর জ্বর ১০৬ ডিগ্রি। পায়ের ওপর ফুলে গেছে। খোঁড়াচ্ছে, পেট ফুলে গেছে। এর প্রতিকার কী?

উত্তর : গরুর বাদলা রোগ হয়েছে। পেনিসিলিন বা এমপিসিলিন ইনজেকশন দিতে হবে। সাথে অ্যান্টিহিস্টামিনিক ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হবে। স্টোমাপ্লেক্স ভেট পাউডার খাওয়াতে হবে। এ রোগ প্রতিরোধে ৩ মাস থেকে ৩ বছর বয়স্ক পশুকে চামড়ার নিচে বাদলা রোগের টিকা প্রয়োগ করতে হবে।


আল্লামা ইকবাল, গ্রাম : সামাইর, উপজেলা : সাভার, জেলা : ঢাকা
প্রশ্ন : পুকুরে বেশি পরিমাণে গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করার কারণে মাছ মারা যাচ্ছে, কী করব?
উত্তর : সাধারণত রাক্ষুসে বা অচাষকৃত মাছ মারার জন্য ফসটক্সিন বা গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়। পুকুরের পানিতে এ গ্যাস ট্যাবলেট দেয়ার কারণে মরা মাছগুলো জাল টেনে উঠিয়ে ফেলতে হবে। না হলে এসব মরা মাছ পুুকুরের তলদেশে পচে গ্যাসের সৃষ্টি করবে। আপনার সমস্যাটি থেকে মুক্তি পেতে পুকুরে নতুন পানি ঢুকাতে হবে। পুকুরে শতকপ্রতি ৫০০ গ্রাম করে চুন প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ ও কম্পোস্ট সার দিয়ে পুকুরের পানির রঙ সবুজ করতে হবে। তারপর পুকুরে পোনা মজুদ করতে হবে ।


মো.  বোরহান উদ্দিন, গ্রাম : মল্লিকপাড়া  উপজেলা : শিবগঞ্জ, জেলা : বগুড়া
প্রশ্ন : পানির ওপর লাল স্তর পড়েছে, কীভাবে দূর    করব?

উত্তর : এগুলো এক ধরনের প্ল্যাংটন। এগুলোকে কাপড় দিয়ে টেনে অথবা ধানের খড় বা কলার পাতা দিয়ে দড়ি তৈরি করে টানা দিয়ে লাল স্তরটি তুলে ফেলতে হবে। এ সময় খাবার এবং রাসায়নিক সার বন্ধ রাখতে হবে। এছাড়া পুকুরের পানিতে পর্যাপ্ত সূর্যালোক যেন পৌঁছাতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য পুকুর পাড়ে যদি বড় বড় গাছ থাকে সেগুলোর ডালপালা কেটে দিতে হবে।


কৃষির যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কল সেন্টারের ১৬১২৩ এ নাম্বারে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটি ব্যতীত যে কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে। তাছাড়া কৃষিকথার গ্রাহক হতে বার্ষিক ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকা মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ এ ঠিকানায় পাঠিয়ে ১ বছরের জন্য গ্রাহক হতে পারেন। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিকে কৃষিকথা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।

 

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন*
*উপজেলা কৃষি অফিসার এলআর, সংযুক্ত কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা

বিস্তারিত
মাঘ মাসের কৃষি (পৌষ ১৪২৪)

মাঘ মাসের কনকনে শীতের হাওয়ার সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাঝে মাঝে সৃষ্ট শৈত্যপ্রবাহ শীতের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে যায়। কথায় আছে মাঘের শীতে বাঘ পালায়। কিন্তু আমাদের কৃষকভাইদের মাঠ ছেড়ে পালানোর কোনো সুযোগ নেই। কেননা এ সময়টা কৃষির এক ব্যস্ততম সময়। আর তাই আসুন আমরা সংক্ষেপে জেনে নেই মাঘ মাসে কৃষিতে করণীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোঃ
 

বোরো ধান
ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে; ধানের চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর প্রথম কিস্তি, ৩০-৪০ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি এবং ৫০-৫৫ দিন পর শেষ কিস্তি হিসেবে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে;
বোরো ধানে নিয়মিত সেচ প্রদান, আগাছা দমন, বালাই ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে;
রোগ ও পোকা থেকে ধান গাছকে বাঁচাতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, আন্তঃপরিচর্যা, যান্ত্রিক দমন, উপকারী পোকা সংরক্ষণ, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা, আলোর ফাঁদ এসবের মাধ্যমে ধানক্ষেত বালাইমুক্ত করতে পারেন;
এভাবে রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে শেষ উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

 

গম
গমের জমিতে যেখানে ঘন চারা রয়েছে তা পাতলা করে দিতে হবে;
গম গাছ থেকে যদি শিষ বেড় হয় বা গম গাছের বয়স ৫৫-৬০ দিন হয় তবে জরুরিভাবে গম ক্ষেতে একটি সেচ দিতে হবে। এতে গমের ফলন বৃদ্ধি পাবে; ভালো ফলনের জন্য দানা গঠনের সময় আরেকবার সেচ দিতে হবে;
গম ক্ষেতে ইঁদুর দমনের কাজটি সবাই মিলে একসাথে করতে হবে ।


ভুট্টা
ভুট্টা ক্ষেতে গাছের গোড়ার মাটি তুলে দিতে হবে; গোড়ার মাটির সাথে ইউরিয়া সার ভালো করে মিশিয়ে দিয়ে জমিতে একটি সেচ দিতে হবে; গাছের নিচের দিকের মরা পাতা ভেঙে দিতে হবে;
ভুট্টার সাথে সাথী বা মিশ্র ফসলের চাষ করে থাকলে সেগুলোর প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হবে।

 

আলু
আলু ফসলে নাবিধসা রোগ দেখা দিতে পারে। সে কারণে স্প্রেয়িং শিডিউল মেনে চলতে হবে;
মড়ক রোগ দমনে দেরি না করে ২ গ্রাম ডায়থেন এম ৪৫ অথবা সিকিউর অথবা ইন্ডোফিল প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে নিয়মিত স্প্রে করতে হবে; মড়ক লাগা জমিতে সেচ দেয়া বন্ধ করতে হবে;
তাছাড়া আলু ফসলে মালচিং, সেচ প্রয়োগ, আগাছা দমনের কাজগুলোও করতে হবে;  
গাছের বয়স ৯০ দিন হলে মাটির সমান করে গাছ কেটে দিতে হবে এবং ১০ দিন পর আলু তুলে ফেলতে হবে;
আলু তোলার পর  ভালো করে শুকিয়ে বাছাই করতে হবে এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

তুলা
তুলা সংগ্রহের কাজ এ মাস থেকেই শুরু করতে হবে।
তুলা সাধারণত ৩ পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। শুরুতে ৫০% বোল ফাটলে প্রথম বার, বাকি ফলের ৩০% পরিপক্ব হলে দ্বিতীয় বার এবং অবশিষ্ট ফসল পরিপক্ব হলে শেষ অংশের তুলা সংগ্রহ করতে হবে;
রৌদ্রময় শুকনা দিনে বীজ তুলা উঠাতে হয়; ভালো তুলা আলাদাভাবে তুলে ৩-৪ বার রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে; ভালো তুলার সাথে যেন আক্রান্ত তুলা কখনো না মেশে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে ।

 

ডাল ও তেল ফসল
মসুর, ছোলা, মটর, মাসকালাই, মুগ, তিসি এ সময় পাকে;
সরিষা, তিসি বেশি পাকলে রোদের তাপে ফেটে গিয়ে বীজ পড়ে যেতে পারে, তাই এগুলো ৮০ ভাগ পাকলেই সংগ্রহের ব্যবস্থা নিতে হবে;
ডাল ফসলের ক্ষেত্রে গাছের গোড়াসহ না উঠিয়ে মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি রেখে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। এতে জমির উর্বরতা এবং নাইট্রোজেন সরবরাহ বাড়বে।

 

শাকসবজি
বেশি ফলন পেতে শীতকাল শাকসবজি যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ওলকপি, শালগম, গাজর, শিম, লাউ, কুমড়া, মটরশুঁটি এসবের নিয়মিত যত্ন নিতে হবে;
টমেটোর মারাত্মক পোকা হলো ফলছিদ্রকারী পোকা; আইপিএম পদ্ধতিতে এ পোকা দমন করতে হবে;
এ সময় চাষিভাইরা টমেটো সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে পারেন। আধা পাকা টমেটোসহ টমেটো গাছ তুলে ঘরের ঠাণ্ডা জায়গায় উপুড় করে ঝুলিয়ে টমেটোগুলোকে পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। পরবর্তীতে ৪-৫ মাস পর্যন্ত অনায়াসে টমেটো খেতে পারবেন।
শীতকালে মাটিতে রস কমে যায় বলে সবজি ক্ষেতে চাহিদামাফিক সেচ দিতে হবে।

 

গাছপালা
শীতে গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ দিতে হবে;
গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হবে এবং আগাছামুক্ত রাখতে হবে;
সাধারণত এ সময় আম গাছে মুকুল আসে। গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগ পর্যন্ত আক্রান্ত গাছে টিল্ট-২৫০ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি অথবা ২ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। আমের আকার মটর দানার মতো হলে গাছে ২য় বার স্প্রে করতে হবে;
এ সময় প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার নিম্ফ দেখা যায়। আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার আগেই একবার এবং এর একমাস পর আর একবার প্রতি লিটার পানির সাথে ১.০ মিলি সিমবুস/ফেনম/ডেসিস ২.৫ ইসি মিশিয়ে গাছের পাতা, ফুল ও ডালপালা ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।

 

প্রাণিসম্পদ
শীতকালে পোলট্রিতে অপুষ্টি, রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব সমস্যা দেখা যায় ; মোরগ-মুরগির অপুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধানে প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন এ, সি, ডি, ই, কে ও ফলিক এসিড সরবরাহ করতে হবে;
শীতের তীব্রতা বেশি হলে পোলট্রি শেডে অবশ্যই মোটা চটের পর্দা লাগাতে হবে এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে;  
পোলট্রি লিটারে অ্যামোনিয়া গ্যাস রোধে ১ বর্গফুট জায়গায় ১ কেজি হারে অ্যামোনিল পাউডার মিশাতে হবে;
গোখামারে শীতকালে মোটা চটের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি।  নাহলে গাভীগুলো তাড়াতাড়ি অসুস্থ হয়ে যাবে।

 

মৎস্যসম্পদ
পুকুরে পানি কমে দূষিত হয়ে যায় বলে শীতকালে মাছের বিশেষ যত্ন নিতে হবে;
কার্প ও শিং জাতীয় মাছে ড্রপসি বা উদর ফোলা রোগ দেখা দেয়;
মাছের ক্ষত রোগ যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে, আর এ রোগের প্রতিকারে প্রতি কেজি খাদ্যের সাথে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন বা স্ট্রেপটোমাইসিন পর পর ৭ দিন খাওয়াতে হবে;

 

মাছ চাষ বিষয়ে যে কোনো পরামর্শের জন্য কাছের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
সুপ্রিয় পাঠক, সংক্ষেপে মাঘ মাসে কৃষিতে করণীয় কাজগুলোর উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরা হলো। আপনারা আপনাদের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয়ে কাজ করলে সফলতা আসবেই। কৃষির যেকোনো সমস্যায় উপজেলা কৃষি অফিস, উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করে অথবা কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে কল করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে পারেন।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*

* তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত

Share with :
Facebook Facebook